Table of Contents
![]() |
|
Previous Part.......
অ্যালগরিদমের খাঁচায় ‘ইলম’ (জ্ঞান)-এর নির্বাসন
একবিংশ শতাব্দীর এই পাদে দাঁড়িয়ে মানুষের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটকে কেবল একটি সাধারণ প্রযুক্তিগত রূপান্তর বা যান্ত্রিক আধুনিকায়ন বলে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আব্বাসীয় বাগদাদে কিতাব যেখানে ছিল রূপান্তরের এক জীবন্ত কাঁচামাল এবং অনুবাদ ছিল জ্ঞানকে সভ্যতার কার্যকর শক্তিতে রূপান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আধুনিক বিশ্ব সেখানে তথ্যের এক উদ্দেশ্যহীন ও অন্তহীন অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছে। বিগত দুই দশকে ইন্টারনেটের বিবর্তন, বিশেষত জেন-জি (Gen-Z) বা ডিজিটাল নেটিভদের চেতনায় অ্যালগরিদমের একচ্ছত্র ক্যুরেশন মানুষের প্রথাগত চিন্তার কাঠামোকে এক গভীরতম জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সময়কে তাত্ত্বিকভাবে তথ্যের যুগ বলা হলেও এটি আসলে এক গভীর হিকমাহর বা প্রজ্ঞার দুর্ভিক্ষ। তথ্য কখনো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ইলম’ বা প্রজ্ঞায় রূপ নেয় না। মানুষ এখন আর জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর ও দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি পার হতে চায় না। বরং করপোরেট বিগ-টেকের তৈরি করা ডিজিটাল পুঁজিবাদ মানুষের মনকে খণ্ডিত ও অতি-উদ্বেলিত করে তুলছে। মানুষ এখন আর মূল পাণ্ডুলিপির ঘনিষ্ঠ পাঠ বা ক্লোজ রিডিং করতে আগ্রহী নয়। স্ক্রিনের ওপর অনবরত আঙুল ঘষতে ঘষতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি করা রেডিমেড কোটেশন কার্ড বা পনেরো সেকেন্ডের চটকদার ভিডিও দেখে শতাব্দীর গভীরতম বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে এক নিমিষে বাতিল করে দেওয়া আজকের প্রজন্মের প্রধান অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তথ্যের এই অনিয়ন্ত্রিত গতি মানুষের ভেতরের গভীর মননশীলতা এবং স্বাধীন বিচারবুদ্ধিকে অবশ করে দিচ্ছে। মানুষ প্রচুর তথ্য বা ইনফরমেশন সংগ্রহ করছে, কিন্তু সত্যের বিচার করার ক্ষমতা চিরতরে হারাচ্ছে। তারা প্রতিদিন অজস্র ধর্মীয় ফতোয়া বা স্লোগান মুখস্থ শুনছে, কিন্তু তার ভেতরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, শাস্ত্রীয় স্তর এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা অনুধাবন করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। ডিজিটাল ক্যাপিটালিজম বা আধুনিক কর্পোরেট পুঁজিবাদের এই যুগে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি হয়েছে। ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়ার এই দুনিয়ায় তথ্য এখন আর মুক্ত সত্যের বাহক নয়, বরং তা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি পণ্য মাত্র। বিগ-টেক কোম্পানিগুলোর তৈরি করা প্রফিট-ড্রাইভেন অ্যালগরিদম মানুষের কৌতূহলকে সত্যের দিকে নিয়ে যায় না, বরং তাকে তার নিজস্ব পূর্বনির্ধারিত পক্ষপাত বা ফিল্টার বাবলসের গোলকধাঁধায় আটকে রাখে।
সমকালীন দার্শনিক বিয়ুং-চুল হান এই সংকটের গভীরতা মেপে একে ‘ইনফোক্রেসি’ বা তথ্যভিত্তিক এক নতুন শাসনব্যবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, আমরা এখন আর মাটির পৃথিবীতে বাস করি না এবং আকাশের নিচে আশ্রয় খুঁজি না। আমাদের পৃথিবী এখন গুগল আর্থ আর ক্লাউড তথা মেঘের ডিজিটাল সাম্রাজ্য দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এই পার্থিব শৃঙ্খলা যখন একটি ডিজিটাল শৃঙ্খলার কাছে হার মানে, তখন বস্তু বা থিংসের দুনিয়াটি ‘নন-থিংস’ বা তথ্যের এক অন্তহীন গোলকধাঁধার নিচে চাপা পড়ে যায়। আমরা আজ চারপাশের দুনিয়ায় স্থিরতা ও শান্ত ভাব চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। তথ্যের এই সুনামি আমাদের প্লাবিত করছে বটে, কিন্তু আমাদের মননশীলতাকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দিচ্ছে। হানের এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আমাদের দেখায়, আমরা আজ দিনরাত অগাধ তথ্য খুঁজছি কিন্তু প্রকৃত কোনো জ্ঞান লাভ করতে পারছি না। আমরা অনবরত যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন করে যাচ্ছি কিন্তু প্রকৃত কোনো জীবন্ত সমাজের অংশ হতে পারছি না। আমরা কোটি কোটি ডেটা এবং কন্টেন্ট সেভ করে রাখছি কিন্তু আমাদের স্মৃতিশক্তি ও বিচারবুদ্ধির কোনো যত্ন নিতে পারছি না (Byung-Chul Han, Non-things: Upheaval in the Lifeworld, pp. 1-12)।
মানুষের মনোযোগের এই চরম বিনাশ আজকের তরুণ প্রজন্মকে এক গভীর বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তারা স্ক্রিনের ওপর অনবরত ভেসে ওঠা চটকদার লাইক, শেয়ার এবং রিটুইটের সংখ্যাকে জ্ঞানের মাপকাঠি মনে করছে। এই ব্যবস্থা মানুষের কৌতূহলকে সত্য-অন্বেষণের হাতিয়ার বানানোর বদলে বাণিজ্যিক লাভের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে।
হানের আরেকটি তীব্র সতর্কতা আমাদের সমকালীন জ্ঞান-রাজনীতি বোঝার জন্য এক অবিরুদ্ধ আয়না হিসেবে কাজ করে। তিনি দেখিয়েছেন, এই ডিজিটাল তথ্য-শাসনব্যবস্থা মানুষের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে জখম করছে যেখানে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটিই চিরতরে হারিয়ে যায়। এই পোস্ট-ফ্যাক্টুয়াল ইনফরমেশন সোসাইটি বা উত্তর-বাস্তবধর্মী তথ্য-সমাজে মানুষ আর সত্যের দৃঢ়তা বা তার গভীরতা দাবি করে না। তারা কন্টেন্টের চটকদার উপস্থাপন এবং তাৎক্ষণিক আবেগের উদ্দীপনা পেলেই সন্তুষ্ট থাকে। সত্য অর্জন করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন কাজ। কিন্তু আধুনিক মানুষ সেই সময় দিতে রাজি নয় (Byung-Chul Han, Infocracy: Digitization and the Crisis of Democracy, pp. 14-22)।
এই অলস মনস্তত্ত্বের কারণে মানুষের ভেতরের ‘ফিকর’ বা গভীর তাত্ত্বিক চিন্তা পুরোপুরি নির্বাসিত হয়েছে। মানুষ এখন কোনো মত বা তত্ত্বের প্রমাণ ও শাস্ত্রীয় যৌক্তিকতা বিচার করার চেয়ে তার সামাজিক মাধ্যমের ভাইরালিটি বা জনপ্রিয়তা দেখে তার সত্যতা নির্ধারণ করে। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ইলমের যে সম্মান ও মর্যাদা ছিল, যেখানে প্রতিটি তথ্যকে বর্ণনাকারী ও সূত্রের কঠোর কষ্টিপাথরে যাচাই করা হতো, আজ ভার্চুয়াল দুনিয়ার করপোরেট স্বার্থের বন্যায় সেই সততা সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। একদল তরুণ পশ্চিমা একাডেমিয়ার তৈরি করা বিনির্মাণ বা ডিকনস্ট্রাকশনের আধুনিক এজেন্ডাগুলোকে অন্ধভাবে গিলছে, আর অন্যদল ধর্মরক্ষার নামে মানুষের সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক জিজ্ঞাসাকেই ফতোয়া দিয়ে স্তব্ধ করে দিতে চাচ্ছে। দুই পক্ষের কেউই বুঝতে পারছে না, ওহীর স্ফটিকস্বচ্ছ আলোর সাথে আকলে সালিম বা বিশুদ্ধ বিচারবুদ্ধির যে মিলবন্ধন ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগে ছিল, তা আজ এই দুই চরমপন্থার কারণে চিরতরে পঙ্গু হয়ে পড়েছে।
এই মানসিক জরাগ্রস্ততা এবং যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের দাসত্ব উম্মাহকে কীভাবে এক অবশ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত জাতিতে পরিণত করেছে, তার পূর্বাভাস আমরা আল্লামা ইকবালের দর্শনেও খুঁজে পাই। ইকবাল তাঁর বিখ্যাত ‘বাঙ্গে দারা’ কাব্যের অন্তর্গত ‘যুহদ্ আউর রিন্দী’ নামক গজলটি রচনা করেছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে। যখন মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক পতন, বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা এবং পাশ্চাত্য উপনিবেশবাদের চাপে নাভিশ্বাস উঠছিল। ইকবাল লক্ষ্য করেছিলেন, ধর্মীয় চিন্তার দুটি চরমপন্থা তৈরি হয়েছে। এক দিকে যারা ধর্মকে শুধু বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও কঠোর আইনে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে, অন্যদিকে যারা ধর্মের প্রতি সমস্ত নিষ্ঠাই ছেড়ে দিয়ে উচ্ছৃঙ্খল স্বাধীনতার পথ বেছে নিয়েছে। এই দুই চরমপন্থার মাঝে ইকবাল খুঁজতে চেয়েছিলেন একটি তৃতীয় পথ—যেখানে শরিয়তের বাহ্যিক কাঠামো থাকবে, কিন্তু তার সাথে থাকবে অন্তরের প্রেম, বাস্তববাদিতা, যুক্তি-দর্শন ও আত্ম-উপলব্ধির শক্তি [খলিফা আব্দুল হাকিম; ফিকরে ইকবাল, পৃষ্ঠা: ২৪০]।
এই গজলের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব হলো ‘যুহদ’ (শুষ্ক বুজুর্গী) ও ‘রিন্দী’ (প্রেমিক মুক্তচিন্তক)—দুটি পরস্পরবিরোধী মানসিকতার সংঘাত। ‘যুহদ’ বা শুষ্ক তপস্যা হচ্ছে এমন এক মানসিকতা যা নিজেকে অভ্রান্ত জ্ঞানী ভাবলেও আসলে প্রাণহীন। এটি শরিয়তের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, রিচুয়াল ইবাদাত ও কঠোর আইনের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, কিন্তু বাস্তবতা, অন্তরের প্রেম ও যুক্তির সঞ্চারকে অস্বীকার করে। অন্যদিকে ‘রিন্দী’ হচ্ছে সেই স্বাধীনচেতা সত্তা যা যুহদের বাহ্যিক আড়ম্বরতা অগ্রাহ্য করে, বুকে প্রেম নিয়ে সরাসরি সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যায়। এটি শরিয়তের প্রতি আনুগত্য রাখলেও তার সাথে মিলিয়ে নেয় বাস্তব দুনিয়ার তাগিদ, আধ্যাত্মিক প্রেম ও অন্তর্দৃষ্টিকে। ইকবাল এই গজলের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন, যুহদরা যখন রিন্দীদের বহুমাত্রিক সত্তাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন তাঁদের ন্যায় রিন্দীকেও বাহ্যিক আচারের এবং প্রথাবদ্ধ দ্বীনি মিজাজের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে চায়। আর সমাজের প্রবীণ অভিভাবকেরা তথা ধর্মীয় গুরুরা ‘উদ্বেগ’-এর আবরণে রিন্দের স্বাধীন চিন্তাকে ‘বিশৃঙ্খলা’ বলে শাসন করতে চান [খাজা গোলাম সাইয়্যিদীন; ইকবালস এডুকেশনাল ফিলোসফি, আশরাফ পাবলিকেশন্স, লাহোর, পৃষ্ঠা: ৯৩]।
ইকবাল এই গজলের প্রথমার্ধ জুড়ে যুহদের প্রতীকী চরিত্রটির মনস্তত্ত্বকে ভেতর থেকে উন্মোচিত করেছেন। তিনি প্রথমেই যুগের অহংকারী শায়খের মুখোশ খুলে দেন—যে নিজেকে সর্বজ্ঞানী (‘ইবনে সিনা’) ভাবলেও আসলে রূপক ভাষা বোঝে না, যার মধ্যে অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি নেই, কিন্তু অন্যদের আত্মিক মত্ততা এবং দূরদর্শিতাকে ‘অবাধ্যতা’ বলে উড়িয়ে দেয় এবং নিজের অনুসারী বাড়ানোর জন্য অলৌকিকতার গল্প বানায় [গোলাম রসূল মেহের; মাতালিবে ইকবাল, কিতাব মঞ্জিল, করাচি, পৃষ্ঠা: ৮৯-৯২]। যেখানে যুহদ, রিন্দের ঐশ্বরিক প্রেমময় মত্ততা অর্থাৎ উম্মার জন্য তড়প ও বাস্তবতাবোধকে সত্যিকারের মদ্যপের ‘মদ্যপান’ এবং 'মাতলামি, পাগলামি' বলে ভুল বুঝে; সেখানে ইকবাল দেখিয়েছেন এটি আসলে যুহদের নিজস্ব বোধিচিত্তের অভাব। যুহদ যখন ইকবালের সূফি-কলন্দর-মলামতি (প্রেমিক সাধক, মুক্তচারী দরবেশ, লোকনিন্দা-বরণকারী) এই বহুমাত্রিক রূপকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন তাকে ‘পাপী’ বা ‘বিপথগামী’ ট্যাগ দিয়ে বসে। কিন্তু কবি যুহদের এই কুৎসার মুখে থেমে যাননি, বরং প্রজ্ঞাময় হাসিতে যুহদের সমস্ত আক্রমণকে আত্মশুদ্ধির উপকরণে পরিণত করেছেন, যা সূফি দর্শনের অহং-শূন্যতার উচ্চতর স্তর [খলিফা আব্দুল হাকিম; ফিকরে ইকবাল, পৃষ্ঠা: ২৪৫-২৪৮]। ইকবাল এই গজলের মাধ্যমেই মানুষের ভেতরের সেই আধ্যাত্মিক তেজের অভাবকে চিহ্নিত করতে গিয়ে লিখেছিলেন যে, মানুষ যখন প্রকৃত হিকমাহ হারিয়ে ফেলে, তখন তার ইবাদতও এক ধরনের যান্ত্রিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এই কবিতার উপযোগিতা আজকের ডিজিটাল যুগে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, কারণ আজকের তথ্য-বিস্ফোরণের যুগে মানুষ ‘লাইক’ ও ‘ভিউ’ আর ঘরানার কাছে বাহবা পাওয়াকে প্রজ্ঞার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলেছে—যা যুহদের সেই বাহ্যিক আড়ম্বরেরই একটি আধুনিক সংস্করণ। অন্যদিকে, যারা কর্পোরেট অ্যালগরিদমের নকশা করা সত্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করে, তারাও একধরনের উচ্ছৃঙ্খল স্বাধীনতার ভুল পথে হাঁটছে। ইকবাল চেয়েছেন, মানুষ যেন বাহ্যিক আচার ও অন্ধ অনুকরণের শেকল ভেঙে নিজের বিবেক ও যুক্তি দিয়ে সত্যের সন্ধান করে।
ইকবাল তাঁর রচনায় ধর্মের যে প্রকৃত স্পিরিট বা মিজাজ বর্ণনা করেছেন, সেখানে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, প্রকৃত জ্ঞান বা দ্বীন মানুষকে মাটির জড়তা থেকে মুক্ত করে তার আত্মসত্তার সন্ধান দেয় (Allama Iqbal, Bang-e-Dara, p. 90)। অথচ আজকের জেন-জি প্রজন্ম, মাটির সেই চিরায়ত জড়তাকেও হার মানায় এমন ডিজিটাল জালে আবদ্ধ। যেখানে অ্যালগরিদমের নকশা করা বানোয়াট বয়ান আর ভাইরাল সত্য তাদের চিন্তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। তারা অন্ধের মতো সেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গল্পগুলোকে সত্য ভেবে গ্রহণ করে, নিজেরা কোনো কিছু যাচাই না করেই। অন্যদিকে, এই প্রজন্মের আরেকটি অংশ ডিজিটাল পর্দায় আঁকড়ে আছে দ্বীনের ঘরানা ও গোড়ামির পুরোনো বাঁধনকে। যেন সেগুলোই চিরন্তন সত্য, এর বাইরে কোনো পথ নেই। প্রথাবদ্ধ ঘরানার অনুসরণকেই পরম নিষ্ঠা মনে করে তারা অন্ধ অনুকরণের পথে হাঁটতে থাকে। আর ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে নিজের ভেতরের সহজাত আগুন—যাকে ইকবাল বলেছেন ‘খুদি’, আত্মশক্তি এবং নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অমূল্য সত্ত্বা। ফলে আগল পড়ে যায় 'রিন্দী' হয়ে উঠার খোলা দিগন্তে।
ইকবাল এই গজলের দ্বিতীয়ার্ধে নাটকীয়ভাবে দৃশ্যপট পরিবর্তন করেন। ব্যক্তিগত সংঘাত এখন সামাজিক মজলিসের মহাবিতর্কে রূপ নেয়। যেখানে যাহিদের ফতোয়া, বন্ধুর প্রতিরক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত ইকবালের সেই বিখ্যাত রসাত্মক বিজয়—এই অংশটিই কবিতার চূড়ান্ত দার্শনিক বার্তা বহন করে [চিশতি, ইউসুফ সালিম; শরহে বাঙ্গে দারা, ইলমি কুতুব খানা, লাহোর, পৃষ্ঠা: ১৭৪-১৭৬]।
মজলিসে বসে যাহিদ ইকবালের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি প্রথমে স্বীকার করেন, ইকবাল একজন বড় কবি এবং মানুষ হিসেবেও ভালো। কিন্তু তারপরেই ফতোয়া দেন—ইকবালের এই ‘রিন্দী’ ও ‘ঔদ্ধত্য’ ইসলামের জন্য ক্ষতিকর। এটি যাহিদের একটি সুকৌশলী পদক্ষেপ। প্রথমে প্রশংসা করে নিজেকে উদার প্রমাণ করা, তারপর ধ্বংসাত্মক অভিযোগ আনা [গোলাম রসূল; মাতালিবে ইকবাল, কিতাব মঞ্জিল, করাচি, পৃষ্ঠা: ৯২]। যাহিদের কাছে ইসলাম মানে কেবল অতীতের স্থবিরতা ও ধরাবাঁধা নিয়ম; ইকবালের ‘খুদি’ জাগরণ তাঁর কাছে দ্বীনের ‘ক্ষতি’ বলে প্রতীয়মান হয়।
কিন্তু মজলিস থেকে কবির এক বন্ধু (যিনি স্বয়ং কবির প্রজ্ঞাবান সত্তার প্রতীক) প্রতিবাদ করে ওঠেন। তিনি যাহিদকে বলেন, ইকবালকে সাধারণ পাপীদের কাতারে ফেলা বুদ্ধির চরম খামতি। যাহিদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো এতটাই একরৈখিক যে, তিনি সাধারণ সামাজিক পাপাচার আর উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা এবং বাস্তব দুনিয়ার বাস্তববাদিতার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না [খলিফা আব্দুল হাকিম; ফিকরে ইকবাল, মাজলিসে তরক্কিয়ে আদব, লাহোর, পৃষ্ঠা: ২৪৮]। বন্ধু স্পষ্ট করেন, ইকবালের ‘ময়খানা (মদ্যশালা)-এর সাথে সম্পর্ক’ মানে সাধারণ পাপাচার নয়; এটি হলো সূফি পরিভাষায় ‘নিসবত’ বা আত্মিক সংযোগ। ইকবাল আসলে একজন সূফি, কলন্দর এবং সমাজের পরম সম্মানিত পুরুষ। যিনি রুমি, হাফিজ ও মনসুর হাল্লাজের সেই ঐতিহ্যবাহী সূফি ধারার অনুসারী, যা বাহ্যিক আচারসর্বস্ব ধর্মের উর্ধ্বে ওঠে অন্তরের সত্য এবং এর থেকে উদ্ভূত সমগ্র বাস্তবতা ধারণ করে [আসলাম আনসারী; ইকবালিয়াত কা তানকীদী মুতালায়া, মাকতাবায়ে দানিয়াল, করাচি, পৃষ্ঠা: ১১৫]।
বন্ধু আরও বলেন, যাহিদ যাকে ইসলামের ক্ষতি বলছেন, ইকবালের সেই রিন্দীর মূল লক্ষ্যই হলো ইসলামের প্রকৃত বিজয় ও পুনর্জাগরণ। ইকবালের রিন্দী মূলত একটি কাব্যিক শৈলী। তিনি সুরা, সরাইখানা, মদ—এসব রূপকের মাধ্যমে কোরআনের প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক মিলনের কথা বলছেন। এটি ইসলামের আত্মাকে বাঁচানোর জন্য প্রথাগত ভাষার সীমানা ভাঙার এক অভিনব কৌশল [জাবেদ ইকবাল; জিন্দারূদ, গুলাম আলী অ্যান্ড সন্স, লাহোর, পৃষ্ঠা: ১৩৫]। এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে ইকবাল দুই চরিত্রের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্য তুলে ধরেন। যাহিদের চোখে ইকবাল ভুল পথের অনুরাগী একজন মদ্যপ বা পাপী; অন্যদিকে ইকবালের চোখে যাহিদের ধর্ম এতটাই ভঙ্গুর যে, মুক্তচিন্তা ও বাস্তববাদিতার সামান্য হাওয়ায় তা ভেঙে পড়ার ভয় থাকে [খাজা গোলাম সাইয়্যিদীন; ইকবালস এডুকেশনাল ফিলোসফি, আশরাফ পাবলিকেশন্স, লাহোর, পৃষ্ঠা: ৯৭]।
কবিতার শেষ দিকে বন্ধু, যাহিদকে একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে ফেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ইকবালের তওবার ব্যাপারে যাহিদের কী আশা? যাহিদ যদি বলেন ‘আশা নেই’, তবে তিনি ইসলামের রহমতকে অস্বীকার করছেন। আর যদি বলেন ‘আছে’, তবে তিনি স্বীকার করছেন, ইকবাল বর্তমানে পথভ্রষ্ট। ফলত চিরাচরিত সেই ফতোয়ার অভ্যাস ফুটে উঠবে, 'মতের মিল না হলেই গোমরাহ'। যাহিদ তাই হেসে চালাকির সাথে উত্তর দেন—"হ্যাঁ, দোয়া করো, হয়তো এই ‘সেহেরে আশাম বা প্রভাতী রিন্দ’ বদলে যাবে"। কিন্তু এখানেই ইকবালের চূড়ান্ত ব্যঙ্গ। ‘সেহেরে আশাম’ বা প্রভাতী মদ্যপ শব্দটি সূফি পরিভাষায় সেই উচ্চস্তরের সাধককে বোঝায় যিনি শেষ রাতে ইবাদতে মত্ত থাকেন। যাহিদ নিজের অজান্তেই কবির আধ্যাত্মিক উচ্চতা স্বীকার করে নেন [খলিফা আব্দুল হাকিম; ফিকরে ইকবাল, পৃষ্ঠা: ২৫০]।
এই ‘তওবা’র প্রশ্ন ও জবাব থেকেই জন্ম নেয় একটি ‘পয়গাম’। বন্ধু বুঝতে পারলেন, যাহিদ নিজের অজান্তেই ইকবালের আধ্যাত্মিক উচ্চতা স্বীকার করেছেন। তিনি সুযোগ নিয়ে মজা করে যাহিদকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি এই মহান বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ(?) বার্তাটি ইকবালকে পৌঁছে দেব?’ যাহিদ অত্যন্ত আহ্লাদিত হয়ে বলেন—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! পৌঁছে দাও!’ যাহিদ ভাবছেন, তিনি ইকবালকে শেষবারের মতো ‘নসিহত’ করে জয় পেলেন। অথচ তিনি বুঝতে পারেন না, এই বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যমেই কবি পুরো ঘটনাটি—যাহিদের ফতোয়া, বন্ধুর জবাব, যাহিদের ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’—সবকিছু কবিতার মোড়কে চিত্রিত করে দিলেন যাহিদদের নির্বুদ্ধিতার চিরন্তন প্রতীক হিসেবে। কবিতায় যাহিদের এই শেষ কথাটিতে (‘হ্যাঁ হ্যাঁ! পৌঁছে দাও!’)-এ যাহিদের যে উৎসাহ, তা তাঁর আত্মবিশ্বাসের চরম সীমা। কিন্তু কবি সেই উৎসাহকেই তাঁর শেষ শ্লোকে ব্যবহার করেন যাহিদের বোকার স্বর্গে বাস করার চিরস্থায়ী প্রমাণ হিসেবে, ব্যঙ্গাত্মকভাবে। এই শেষ লাইনটি পাঠকের মনে এক অপার রসবোধ ও দার্শনিক তৃপ্তি তৈরি করে। এটা ঠিক তেমনই অমর হয়ে গেল, যেমন অমর হয়ে গেল ইকবালের ‘রিন্দী’ চেতনা। আর চিরকালের জন্য ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত হলো যাহিদের সংকীর্ণতা, অহংকার ও বাস্তব-বোধহীন আত্মতৃপ্তি। যদিও তিনি ভাবছিলেন তাঁর বার্তা পাঠিয়ে ইকবালকে নসিহত ও সংশোধন করছেন। এটাই হলো যাহিদের ওপর রিন্দের শৈল্পিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চূড়ান্ত বিজয় [জাবেদ ইকবাল; জিন্দারূদ, গুলাম আলী অ্যান্ড সন্স, লাহোর, পৃষ্ঠা: ১৩৬]। কারণ যাহিদের জয় ছিল ক্ষণিকের আত্মতৃপ্তি; ইকবালের জয় হলো রিন্দী চেতনার অমরত্ব—যুগে যুগে রিন্দীরা ইকবালের চেতনায় জাগ্রত হবে, যারা যাহিদের চেতনায় ঘুমিয়ে যায়।
ইকবালের এই গজলের সামগ্রিক বার্তা হলো, প্রকৃত জ্ঞান ও ধর্মীয় চেতনা কখনো বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা অন্ধ অনুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা প্রবাহিত হয় অন্তরের প্রেম, যুক্তি-দর্শন, বাস্তবতা ও আত্ম-উপলব্ধির সমন্বয়ে। যুহদের শুষ্কতা আর রিন্দের স্বাধীনতা—এই দুইয়ের সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইকবাল দেখিয়েছেন, সত্যের পথ হলো মধ্যপথ। যেখানে আইনের কাঠামো থাকবে, কিন্তু তার সাথে থাকবে প্রাণবন্ত আত্মিকতা ও বাস্তবতাবোধ। এই বার্তাই আজকের ডিজিটাল যুগে আমাদের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, যখন আমরা অ্যালগরিদমের তৈরি ‘সত্য’ আর বাহ্যিক গ্রহণযোগ্যতার ফাঁদে বন্দি হয়ে নিজের ‘খুদি’কে হারিয়ে ফেলছি।
ইকবাল তাঁর ‘জরবে কালিম’ কাব্যগ্রন্থের ‘মেহরাবে গুল আফগান কে আফকার’ শীর্ষক কবিতায় এই অন্ধ অনুকরণ এবং চিন্তার বন্ধ্যাত্বকে সরাসরি আক্রমণ করে তরুণদের পরাধীন মনস্তত্ত্বের গোড়ায় কুঠারাঘাত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অন্য কারও অন্ধ দাসত্ব করার চেয়ে নিজের চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি।
اگر تقلید کی روش ہی رہ گئی امت میں
تو سمجھ لو کہ خون ہو گیا اس کا ضمیر
"আগর তাক্বলীদ কী রওয়াশ হী রেহ গায়ি উম্মাত মেঁ
তো সমঝ লো কেহ খুন হো গায়া ইসকা যমির"
অনুকরণের এই পঁচা রীতির ওপরেই যদি উম্মাহ চিরকাল টিকে থাকে; তবে বুঝে নিও এই জাতির প্রদীপ্ত বিবেক ও মনন চিরতরে খুন হয়ে গেছে। (আল্লামা ইকবাল, বাঙ্গে দারা, ১৯২৪, পৃষ্ঠা ১১৫)
এই পঙক্তিতে ইকবালের মূল তাত্ত্বিক বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার। কোনো জাতি যখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং অতীতের কিতাবকে কেবল মুখস্থ করার অলঙ্কার বানায়, তখন সেই জাতি আর নতুন কোনো ইতিহাস বা জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে না। আজকের জেন-জি প্রজন্মের সংকটও ঠিক এখানেই—তারা পশ্চিমা কর্পোরেট আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ করছে, অথবা পুরোনো আইনি ফতোয়াকে না বুঝে সমাজকে অবশ করে রাখছে। জ্ঞান যখন তার সামগ্রিক রূপ হারিয়ে কেবল খণ্ডিত রাজনৈতিক প্রচারণা বা কর্পোরেট স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেই সমাজে হিকমা'র অবসান ঘটে। আজকের বায়তুল হিকমাহর অনুপস্থিতি কোনো ভৌগোলিক লাইব্রেরির ধ্বংসের গল্প নয়, এটি হলো মানুষের মন থেকে ইলমকে নির্বাসন দিয়ে সেখানে যান্ত্রিক অ্যালগরিদম কিংবা অন্ধ অনুকরণের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক নীরব বুদ্ধিবৃত্তিক ট্র্যাজেডি। যদি উম্মাহকে আবার বিশ্বমঞ্চে নিজের স্থান পুনরুদ্ধার করতে হয়, তবে অতীত গৌরবগাথার অলস পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে সময়ের এই সৃজনশীল প্রবাহের সাথে তাল মেলাতে হবে। অ্যালগরিদম ও অতীতের চর্বিত-চর্বনের অদৃশ্য শেকল ভেঙে তরুণ প্রজন্মকে পুনরায় মৌলক বাস্তবতার গভীর পাঠ এবং ইশকের অপরাজেয় শক্তিতে জাগ্রত হতে হবে। নতুবা এই তথ্য-বিস্ফোরণের যুগেও আমরা এক চিরস্থায়ী মানসিক দাসত্বেই বন্দি থেকে যাব।
ইকবাল এখানে ‘তাকলীদ’ (অন্ধ অনুসরণ) এবং ‘যমীর’ (বিবেক/আত্মসচেতনতা)-এর মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, যা ‘যুহদ্ আউর রিন্দী’-এর দ্বন্দ্বকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। তাঁর মতে, কোনো জাতি যতক্ষণ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং অতীতের কিতাব বা পাশ্চাত্যের তৈরি করা মতবাদকে কেবল মুখস্থ করার অলঙ্কার বানায়, তখন সেই জাতির ‘যমীর’ বা বিবেক মৃতপ্রায় হয়ে যায়। বায়তুল হিকমা'র জ্ঞানচর্চা ছিল অতীতের অন্ধ ‘তাকলীদ’-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে প্রতিটি জ্ঞানকে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও আত্ম-উপলব্ধির কষ্টিপাথরে যাচাই করা হতো। 'হাকাইকুল আশইয়া ওয়াল আহওয়াল' অর্থাৎ, বাস্তব দুনিয়া ও অবস্থার প্রেক্ষিত সত্যকে স্বীকার করেই সেখানে জ্ঞানচর্চা চলত। আজকের ডিজিটাল যুগে ‘তাকলীদ’ নতুন রূপ পেয়েছে। হয় অ্যালগরিদমের তৈরি করা ‘ট্রেন্ডিং সত্য’-কে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া। পশ্চিমা একাডেমিয়ার ফ্যাশনেবল তত্ত্বকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা। অথবা ধর্মীয় ফতোয়াবাজির পুরনো খোলসে আবদ্ধ থাকা। এই দুই চরমপন্থাই এক প্রকার অন্ধ ‘তাকলীদ’-এর আধুনিক সংস্করণ। ইকবাল সতর্ক করে দিয়েছেন, এই অভ্যাস চিরস্থায়ী হলে জাতির মননশক্তি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে [মুহাম্মদ ইকবাল; বাঙ্গে দারা, গুলাম আলী অ্যান্ড সন্স, লাহোর, ১৯২৪, পৃষ্ঠা: ১১৫]।
এইখানেই ‘যুহদ্ আউর রিন্দী’ এবং এই দুই লাইনের কবিতাংশ পরস্পরের পরিপূরক হয়ে যায়। যাহিদ হলো প্রথাবদ্ধ ‘তাকলীদ’-এর মূর্ত প্রতীক। যে কেবল বাহ্যিক কর্তৃত্ব, আচারসর্বস্ব দ্বীন এবং অন্ধ অনুকরণ চেনে; বাস্তবতা, অন্তরের সত্য এবং প্রথাবিরুদ্ধ সমকালীন উপযোগিতা মানতে নারাজ। আর রিন্দ হলো অতীতের অন্ধ ‘তাকলীদ’-বিরোধী সেই সত্তা, যে নিজের ‘যমীর’-কে জাগিয়ে তোলেছে এবং পরম সত্য ও আত্মসত্তায় বিশ্বাসী। যে বাস্তব দুনিয়া ও যামানার বাস্তবতা (হাকাইকুল আশইয়া ওয়াল আহওয়াল সাবিতাতুন) মেনে চলে এবং ‘আকল’ ও ‘ইশক’-এর সমন্বয়ে সত্যের সন্ধান করে। বায়তুল হিকমাহ বা ইসলামের সোনালি যুগের জ্ঞানচর্চা ছিল এই ‘যমীর’-চালিত চর্চা। বায়তুল হিকমার মনীষীরা—আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, আল-বেরুনি প্রমুখ—যুক্তিবাদ ও আধ্যাত্মিকতাকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতেন। তাঁদের জ্ঞানচর্চা ছিল ‘যমীর’-সচেতন, যেখানে ধর্ম ও যুক্তি, অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি, ইহকালীন বাস্তবতা এবং পরকালীন আধ্যাত্মিকতা পরস্পর হাত ধরাধরি করে হাঁটতো।
ইকবালের ভাষায়, ‘যমীর’ যখন খুন হয়ে যায়, তখন কোনো জাতিই আর নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে না। তারা কেবল অতীতের পুনরাবৃত্তি বা পরের অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত থাকে। আমাদের সময়ের প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল এলগরিদম কিংবা শতাব্দীর ভাগাড় থেকে জন্ম নেওয়া ঘরানার অন্ধ ‘তাকলীদ’-এ লিপ্ত থেকে যাব, নাকি বায়তুল হিকমার সেই ‘যমীর’-সচেতন, সৃজনশীল ও প্রাণবন্ত জ্ঞানচর্চার পুনর্জাগরণ ঘটাব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে উম্মাহর আগামী দিনের গতিপথ। ইকবালের ‘যুহদ্ আউর রিন্দী’ এবং ‘তাকলীদ’-এর এই দুই কবিতাংশ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে সেই দার্শনিক অস্ত্র—এখন সেটি ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব।
ল্যাবরেটরি যখন মিম্বার: নিউরোসায়েন্স ও বায়োলজির আধুনিক ‘পুরোহিততন্ত্র’
একবিংশ শতাব্দীর এই মধ্যভাগে দাঁড়িয়ে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো ল্যাবরেটরিকে আধুনিক ‘মিম্বার’ বা চূড়ান্ত নৈতিক সিদ্ধান্তের বেদিতে পরিণত করার এক পদ্ধতিগত প্রবণতা। বিজ্ঞান যখন তার নিজস্ব সীমানা ও অনুসন্ধান পদ্ধতির গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের ধর্ম, নৈতিকতা, অর্থ এবং অস্তিত্বের শেষ বিচারক সাজতে শুরু করে, তখন তা আর বিজ্ঞান থাকে না। তা মূলত রূপান্তরিত হয় ‘বিজ্ঞানবাদ’ বা সায়েন্টিজমে (scientism)। আধুনিক মুসলিম মনস্তত্ত্ব এবং বৈশ্বিক সমাজ এই নতুন ধরনের পুরোহিততন্ত্রের দ্বারা চরমভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। একজন আধুনিক বস্তুবাদী জীববিজ্ঞানী যখন ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ (DNA) বা জিনোম সিকোয়েন্স পরীক্ষা করে মিম্বারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে বসেন, মানুষের নৈতিকতা, পাপ-পুণ্য কিংবা স্বাধীন ইচ্ছা বা ফ্রি উইল (free will) বলতে আসলে কিছুই নেই। এগুলো সবই জৈবিক বিবর্তনের অন্ধ মেকানিজম মাত্র। তখন মানুষের আত্মিক ভিত্তির ওপর এক মরণঘাতী আঘাত নেমে আসে। বিজ্ঞানের নিজস্ব পদ্ধতি ও প্রমাণের ক্ষেত্রটি চেনার ক্ষেত্রে এই যে চরম অজ্ঞতা, তা মানুষের মন থেকে চিরতরে হিকমাহ বা প্রজ্ঞার অবসান ঘটাচ্ছে। অথচ প্রতিটি শাস্ত্রের নিজস্ব একটি স্তর এবং পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গণিত যে ধরনের নিশ্চয়তা দেয়, চিকিৎসাবিজ্ঞান সেই পদ্ধতিতে চলে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান যে অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়ায়, অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্সের ক্ষেত্র তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সব শাস্ত্রকে এক ঝুড়িতে ফেলে এক অন্ধ বিজ্ঞানবাদের অধীনে নিয়ে আসা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের লক্ষণ।
সমকালীন জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের গভীরে যাওয়ার জন্য উনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সংস্কারক আল্লামা শিবলী নোমানীর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আল-মামুন’ আমাদের জন্য এক অনন্য দার্শনিক দর্পণ হিসেবে কাজ করে। শিবলী তাঁর এই ধ্রুপদী গ্রন্থে আব্বাসীয় খলিফা আবদুল্লাহ আল-মামুনের আমল এবং সে যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তেজনার এক নিখুঁত বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, খলিফা মামুন যখন গ্রিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যাকে বায়তুল হিকমা'র মাধ্যমে ইসলামি তামাদ্দুনের কেন্দ্রে নিয়ে আসছিলেন, তখন তাঁর মূল লক্ষ্য কেবল বই অনুবাদ করা ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের যৌক্তিক শৃঙ্খলা বা রেশনাল ডিসিপ্লিন তৈরি করা। কিন্তু সেই জ্ঞান-আন্দোলনের ভেতরে একটি ভয়াবহ মেথডোলজিক্যাল বা পদ্ধতিগত ভুল লুকিয়ে ছিল, যা পরবর্তীতে ‘মিহনা’ বা রাষ্ট্রীয় জবরদস্তির রূপ নিয়েছিল। শিবলী স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, মুতাজিলা দার্শনিকগণ যখন গ্রিক দর্শনের অবরোহনমূলক বা ডিডাক্টিভ (deductive) যুক্তিকাঠামোকে অন্ধভাবে ঈমানের কেন্দ্রে বসিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তারা শাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট সীমানা ভুলে গিয়েছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, জ্যামিতি বা গণিতের নিশ্চয়তা যেভাবে প্রমাণিত হয়, আল্লাহর সিফাত বা ঐশী গুণাবলিকেও ঠিক সেই যান্ত্রিক যুক্তির ছাঁচে ফেলে পরিমাপ করা সম্ভব। এই পদ্ধতিগত ভুলের কারণে বিজ্ঞান ও দর্শন তখন আর সত্যের সেবক থাকেনি, বরং তা খলিফার প্রশাসনিক লাঠিতে পরিণত হয়েছিল, যা সাধারণ আলেম ও মানুষের ইমান পরীক্ষা করতে নেমেছিল (আল্লামা শিবলী নোমানী, আল-মামুন, ইসলামী একাডেমি লাহোর, ২০১৭, পৃষ্ঠা ১৪৫-১৫২)।
শিবলী নোমানীর এই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আজকের আধুনিক বিজ্ঞানবাদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে সত্য। শিবলী নোমানী তাঁর ‘আল-মামুন’-এর দ্বিতীয় অংশে ঠিক সেই সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভারসাম্যহীনতার পরিণতি নিয়েই আলোচনা করেছেন, যেখানে দার্শনিক জবরদস্তি সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান ও যুক্তিকে বিষিয়ে তোলে এবং সমাজ রক্ষণশীলতার আত্মরক্ষামূলক ঘেরাটোপে চলে যায়। বস্তুত, আজকের মেটেরিয়ালিস্ট বিজ্ঞানী বা নিউরোসাইন্টিস্টগণ ঠিক আব্বাসীয় যুগের মুতাজিলাদের মতোই একই মেথডোলজিক্যাল ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন। ল্যাবরেটরিতে বসে মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার বা সিন্যাপসের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা অবশ্যই বিজ্ঞানের একটি বৈধ পদ্ধতি। কিন্তু সেই পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে যখন কোনো বিজ্ঞানী এই রায় দিয়ে বসেন, মানুষের ‘রূহ’ বা আত্মার কোনো অস্তিত্ব নেই। মানুষের চেতনার গভীরতম অতিপ্রাকৃতিক অভিজ্ঞতাগুলো কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়া মাত্র। তখন তিনি মূলত ল্যাবরেটরির সীমানা লঙ্ঘন করে মিম্বারে চড়ে বসেন।
শিবলী তাঁর গ্রন্থে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন, মামুনের সোনালি যুগে জ্ঞানচর্চা যখন সামাজিক ও প্রশাসনিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল, তখন কীভাবে সমাজের একটি বড় অংশ বাস্তবমুখী জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চা থেকে বিমুখ হয়ে এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছেন, যখন যুক্তি ও দর্শনকে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই জ্ঞানের প্রতি এক গভীর অনাস্থা তৈরি হয় এবং তারা বাস্তবতার বিপরীতে এক প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব গড়ে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞান ও দর্শন আর সত্যের সেবক থাকেনি; বরং তা খলিফার প্রশাসনিক লাঠিতে পরিণত হয়েছিল। যা সাধারণ আলেম ও মানুষের ঈমান পরীক্ষা করতে নেমেছিল। ঠিক যেমনটি আজকের বিজ্ঞানবাদী আখ্যানগুলো প্রায়শই করে থাকে। শিবলীর মতে, এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো পদ্ধতিগত অন্ধতা। মুতাজিলারা যেমন জ্যামিতি ও গণিতের অবরোহমূলক যুক্তিকাঠামোকে অন্ধভাবে আল্লাহর সিফাতের ওপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞানীরাও পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের আবরণে আধ্যাত্মিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে গিয়ে একই গভীর গর্তে পতিত হচ্ছেন। বিজ্ঞানবাদ যখন মানুষের অর্থ ও উদ্দেশ্যের জগতকে ধ্বংস করে দেয়, তখন সমাজ বাধ্য হয়ে অন্ধ ভীরুতা বা প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে ধাবিত হয়। যা আজকের দুনিয়ায়ও সমানভাবে দৃশ্যমান। এই প্রসঙ্গে শিবলী নোমানী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, সত্যের পথে পদ্ধতিগত সহিষ্ণুতা ও সীমাবোধই হলো প্রকৃত জ্ঞানান্বেষণের প্রাণ। আর কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গিকে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব দেওয়া মানেই ইতিহাসের সেই একই গলিপথে ফিরে যাওয়া, যেখানে বুদ্ধিবৃত্তি চরম উৎকর্ষের বদলে চরম বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয় (আল্লামা শিবলী নোমানী, আল-মামুন, ইসলামি একাডেমি লাহোর, ২০১৭, পৃষ্ঠা ১৮০-১৮৫)।
আধুনিক ইন্টারনেটের বিস্তার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে বিজ্ঞানবাদী পুরোহিততন্ত্র আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। ইন্টারনেট, সেক্যুলার হসটিলিটি বা ধর্মহীন শত্রুভাবাপন্নতার এক বিশাল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞানের নামে এমন সব চটকদার কোটেশন কার্ড বা ছোট ভিডিও তৈরি করা হয়, যা তরুণদের মনে এই বিভ্রম তৈরি করে যে, বিজ্ঞান ও ধর্ম আসলে দুটি চিরস্থায়ী যুদ্ধমান পক্ষ। অথচ এই যান্ত্রিক মহাবিশ্বের ধারণাটি মানুষের তৈরি করা একটি কৃত্রিম বিভেদ মাত্র। আধুনিক কদাচারী বিজ্ঞানীগণ ল্যাবরেটরির ডেটা বা উপাত্তকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন ল্যাবরেটরিই মানুষের জীবনের একমাত্র পথপ্রদর্শক। এর ফলে মানুষের ভেতরের ‘আকল’ বা বুদ্ধি তার চিরন্তন উৎস ওহী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অহংকারী ও ধ্বংসাত্মক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। মানুষ জ্যামিতিতে দক্ষ হতে পারে, কিন্তু তাই বলে স্রষ্টাতত্ত্বে বা নৈতিকতার ফয়সালায় তার অনুমান শেষ কথা হয়ে যেতে পারে না।
এই পদ্ধতিগত অন্ধত্বের বিরুদ্ধে আল্লামা ইকবালের সেই চিরন্তন দার্শনিক সতর্কবার্তা আমাদের সমকালীন মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির পথ দেখায়। ইকবাল তাঁর বিখ্যাত ‘বাঙ্গে দারা’ কাব্যের অন্তর্গত ‘আকল ও দিল’ বা ‘বুদ্ধি ও হৃদয়’ নামক তাত্ত্বিক সংলাপে এই দুই শক্তির পারস্পরিক সীমানা ও মর্যাদা অত্যন্ত চমৎকারভাবে শাণিত ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তিনি বুদ্ধি বা আকলকে বাহ্যিক জগতের অতন্দ্র প্রহরী বললেও হৃদয়ের অতীন্দ্রিয় উপলব্ধিকে চূড়ান্ত সত্যের আলো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আজকের একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক মানুষ যখন ডেটা, অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর কেবলই দৃশ্যমান বস্তুগত চাহিদার গোলকধাঁধায় বন্দি, তখন ইকবালের এই সতর্কবার্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মানুষ নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবছে, কিন্তু তার ভেতরের আত্মিক শান্তি সম্পূর্ণ উধাও। এই মনস্তাত্ত্বিক অন্ধত্ব থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই রূপক মহাকাব্যিক সংলাপে, যেখানে মানুষের ভেতরের দুই আদিম চালিকাশক্তি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল।
ইকবাল এই সংলাপটি সাজিয়েছেন এক মহাজাগতিক নাট্যমঞ্চে। তিনি বুদ্ধি ও হৃদয়কে দুই পরস্পরবিরোধী কিন্তু পরিপূরক সত্তা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। একজন যুক্তির প্রতিনিধি, অন্যজন অনুভূতি ও আধ্যাত্মিক প্রেমের। আকলের কণ্ঠে রয়েছে বিজ্ঞান, দর্শন ও জাগতিক জয়ের অহংকার; দিলের কণ্ঠে রয়েছে আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি, ভালোবাসা ও পরম সত্তার প্রত্যক্ষ উপলব্ধি। ইকবাল কখনও আকলকে পুরোপুরি খারিজ করেননি, আবার দিলকে কেবল আবেগের প্রতীকও রাখেননি। বরং তিনি ধীরে ধীরে সংলাপের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন, চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছাতে আকলের যুক্তি যেমন দরকার, তেমনি দিলের অন্তর্দৃষ্টিও অনিবার্য।
কল্পনায় আঁকা এক অন্তহীন মহাজাগতিক প্রান্তর, যেখানে একদিকে রয়েছে দৃশ্যমান বস্তুজগত আর অন্যদিকে অদেখা আধ্যাত্মিকতার সীমানা। এই প্রান্তরের একপাশে এসে দাঁড়াল ‘আকল’ বা বুদ্ধি। তার অবয়বজুড়ে এক তীব্র তীক্ষ্ণ আলো। তার একহাতে রয়েছে দূরবীক্ষণ যন্ত্র যা দিয়ে সে নক্ষত্রের গতিবিধি মাপে। অন্যহাতে গণিতের বিশাল খাতা, যেখানে সে প্রকৃতির জটিল সূত্রগুলোকে বন্দি করে। আকল হলো মানুষের সেই যুক্তিবাদী মন, যা প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস করে না। ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব আর বৈজ্ঞানিক সমীকরণ দিয়ে পৃথিবীকে শাসন করতে চায়।
তার ঠিক বিপরীতে, প্রান্তরের অন্যপ্রান্তে শান্ত, নিস্পৃহ এবং নিস্তব্ধভাবে অবস্থান করছিল ‘দিল’ বা হৃদয়। তার কোনো জাঁকজমকপূর্ণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছিল না। সে ছিল কেবল এক ফোঁটা জীবন্ত লাল রক্ত। কিন্তু সেই মাংসপিণ্ডের গভীর থেকে এক অপূর্ব, মৃদু অথচ অবিচল অতীন্দ্রিয় আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। যা পুরো প্রান্তরকে এক পরম শান্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছিল।
আকল নিজের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, শিল্পবিপ্লব, সভ্যতার অগ্রগতি আর জাগতিক আধিপত্যের দিকে তাকিয়ে অহংকারে অন্ধ হয়ে গেল। সে ভাবল, এই হৃদয়ের মতো দুর্বল, আবেগপ্রবণ উপাদানের কোনো মূল্যই নেই আধুনিক জগতে। একদিন সে দিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ডঙ্কা বাজাতে শুরু করলো,
عقل نے ایک دن یہ دل سے کہا
بھولے بھٹکے کی رہنما ہوں میں
"আক্বল নে এক দিন দিল সে কাহা
ভুলে ভটকে কি রাহনুমা হুঁ ম্যাঁয়"
বুদ্ধি এক দিন হৃদয়কে অহংকার করে বলল, এই জগতের সমস্ত পথহারা মানুষের একমাত্র পথপ্রদর্শক তো আমিই।
সে নিজের ক্ষমতার পরিধি তুলে ধরে বলল, হে দিল! তুমি তো কেবল এক কোণে বসে আবেগ আর কান্নাকাটি করতে জানো। কিন্তু একটু তাকিয়ে দেখো এই সভ্যতার দিকে। মানুষ যখন আদিম যুগে অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছিল, তখন আমি তাকে আগুন জ্বালাতে শিখিয়েছি। চাকা আবিষ্কার করে দিয়েছি। আজ মানুষ বনে-জঙ্গলে গুহা ছেড়ে আলিশান অট্টালিকায় বাস করছে, মহাসড়কে তীব্র গতিতে গাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে—এই সব পথহারা মানুষকে পথ দেখিয়ে আলোর দিকে নিয়ে আসার একমাত্র কৃতিত্ব আমার। আমি না থাকলে মানুষ আজ পশুর মতো জীবনযাপন করত। তাই মানুষের জীবনের আসল রাহনুমা বা গাইড তো আমিই!
সে নিজের ক্ষমতাকে কেবল এই মাটির পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ রাখল না। মহাকাশ বিজ্ঞানের দম্ভ প্রকাশ করে আকল বলতে থাকল, "আমি থাকি মাটিতে, কিন্তু আমার বিচরণ আকাশেও। দেখো তো, আমার পৌঁছানোর পরিধি কত দূর! তুমি তো এই ক্ষুদ্র মানবদেহের অন্ধকার খাঁচায় বন্দি হয়ে আছ। তোমার সীমানা কেবল এই চার ইঞ্চি বুকের ভেতরেই শেষ। আর আমার ক্ষমতা দেখেছ? আমার শরীর হয়তো এই মাটিতে ঘোরাফেরা করে, কিন্তু আমার তৈরি রকেট, দূরবীন আর চিন্তা আজ কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের মহাকাশ, গ্যালাক্সি আর ব্ল্যাকহোলের রহস্য ভেদ করছে। চাঁদে পা রাখছি, মঙ্গলে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছি। আমার পৌঁছানোর পরিধি কত উচ্চে, তা কি তোমার এই ক্ষুদ্র রক্তপিণ্ড দিয়ে কখনো কল্পনা করতে পারো?
আকল নিজেকে শুধু আবিষ্কারক হিসেবেই থামিয়ে রাখল না, সে নিজেকে ইসলামের ইতিহাসের চিরঞ্জীব পথপ্রদর্শক হযরত খাযিরের (আ.) সাথে তুলনা করে বলল, "দুনিয়ায় মানুষকে পথ দেখানোই আমার কাজ। আমি যেন খাযিরের মতো, যার পদধূলি বরকতময়।" তার দাবি হলো, মানুষ জীবনের যেকোনো সমস্যায় পড়লে যুক্তির আশ্রয় নেয়। লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজ ব্যবস্থা, আইন, অর্থনীতি, রাজনীতি—সবকিছুই আকলের নিয়মে চলে। আর তাই আকল নিজেকে খাযিরের মতো অতন্দ্র প্রহরী দাবি করে, যে মানবজাতিকে অন্ধকূপ থেকে টেনে বের করে প্রগতির আলোতে নিয়ে যায়।
সে নিজেকে ঈশ্বরের সৃষ্টিজগতের পরম ব্যাখ্যাকারী বা ‘মুফাসসির’ হিসেবে দাবি করে বললো, "আমি এই মহাবিশ্বরূপী জীবন-গ্রন্থের ব্যাখ্যাকারী। আমার মাঝেই স্রষ্টার মহিমার প্রকাশ ঘটে।" আকল হাত উঁচিয়ে গর্জন করে বলল, "এই যে মহাবিশ্ব বা 'কিতাবে হাস্তি', এর প্রতিটি পাতার রহস্য, পরমাণুর গঠন, কোয়ান্টাম মেকানিক্স—সবকিছুর ব্যাখ্যা আমিই তো মানুষকে দিচ্ছি। স্রষ্টা যে কত বড় বড় গ্যালাক্সি বানিয়েছেন, তা আমার মাধ্যমেই মানুষ জানতে পারছে। তাই প্রভুর মহিমার আসল প্রকাশ তো আমার বিজ্ঞান আর দর্শনের মাধ্যমেই ঘটছে।" এখানে আকল এর জবানে আল্লামা ইকবাল এক ইউনিভার্সাল ট্রুথ বলে দিলেন। কোনো সমাজ কতটা উন্নত, সভ্য এবং সমৃদ্ধ, সেটা তার জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং দর্শন দেখেই বুঝা যায়। এগুলোর সম্পর্ক 'দিল' তথা আধ্যাত্মিকতার সাথে নয়। ফলত একটা সমাজে আধ্যাত্মিকতা চরম লেভেলে থেকেও বখে যাওয়া এবং পঁচে যাওয়া সমাজ হতে পারে; আকল তথা বিজ্ঞান ও দর্শনের অভাবে।
এমনিভাবে কোনো সমাজ বৈরাগ্যবাদে আক্রান্ত কি না, সেটাও বুঝা যাবে তাদের মধ্যে যুগের 'আকলি জ্ঞান' কতটুকু আছে -তা দেখে। তাদের নিজেদের বৈরাগী দাবি করা বা না করায় কিছুই আসে যায় না। আকলি জ্ঞানহীন সমাজ মানেই বৈরাগ্যবাদে আক্রান্ত -বৈরাগী সমাজ। যেহেতু দুনিয়া এবং এ সংক্রান্ত জ্ঞানের সম্পর্ক আকলের সাথে। দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতা যদি হয় বৈরাগ্যতা, তাহলে নিঃসন্দেহে ওই সমাজ, বৈরাগী সমাজ। আর বৈরাগী সমাজ যে পঁচা-দুর্গন্ধযুক্ত হয় বলাই বাহুল্য। সেজন্যই চিরসবুজ, চিরসতেজ, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুগন্ধিময় রাসুল সা. তাঁর উম্মতকে বৈরাগী হতে নিষেধ করেছেন।
আবার আধ্যাত্মিকতা বিহীন সমাজও বস্তুবাদে আক্রান্ত —একটি প্রাণহীন, যান্ত্রিক সমাজ। আকল যদি সমাজকে দেয় অগ্রগতির গতিবেগ, তবে দিল বা আধ্যাত্মিকতা দেয় সেই গতির সঠিক দিকনির্দেশনা। তাই আকল ও দিল, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এই ভারসাম্যহীনতাই সমাজকে হয় বৈরাগ্যের অন্ধকূপে ফেলে, না হয় বস্তুবাদের মরূদ্যানে পথহারা করে। একটি পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্ত সভ্যতার জন্য তাই আকলের আলো আর দিলের উত্তাপ —উভয়েরই সমান প্রয়োজন। যা 'দিলের' আলাপের মধ্য দিয়ে আল্লামা ইকবালও স্পষ্ট করে দেন।
এবার আকল দিলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শেষ আঘাতটি হানল, "আর তুমি? তুমি তো কেবল এক ফোঁটা তুচ্ছ রক্ত! তোমার নিজের কোনো আলো নেই। আর আমি হলাম এই গোটা মহাবিশ্ব নামক রত্নের আসল দ্যুতি। যা পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত আলোকিত করে রাখছে।"
এইভাবে আকল নিজের জাগতিক বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তি ও দূরদর্শিতার চরম অহংকার প্রকাশ করল। সে নিজেকে মানবজাতির একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইল এবং হৃদয়কে এক ফোঁটা তুচ্ছ রক্ত বলে অবজ্ঞা করল। ইকবাল এই প্রথম পর্বে আকলের যুক্তি-অহংকারকে চূড়ান্ত উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যাতে পাঠক বুঝতে পারে বিজ্ঞান যখন নিজেকেই প্রভু ভেবে বসে, তখন তার ভাষা কতটা দম্ভপূর্ণ ও সংকীর্ণ হয়ে ওঠে।
আকল যখন তার জাগতিক বিজ্ঞান, মহাকাশ জয়, দর্শন আর খাযির আ. এর সাথে তুলনা করে নিজেকে মানবজাতির একমাত্র পথপ্রদর্শক ও সৃষ্টির ব্যাখ্যাকারী বলে দম্ভভরে ঘোষণা করল, তখন পুরো প্রান্তরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। আকল ভাবল, তার এই অকাট্য যুক্তির সামনে হৃদয়ের আর কিছুই বলার নেই। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ দেখে দিল হয়তো লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছে।
কিন্তু ঠিক তখনই, সেই অন্ধকার খাঁচায় বন্দি থাকা এক ফোঁটা রক্তপিণ্ডের ভেতর থেকে একটি মৃদু কম্পন শুরু হলো। সেই কম্পন কোনো ভয়ের ছিল না। তা ছিল এক পরম আত্মিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আকলের বিজ্ঞান, যন্ত্রপাতি আর দূরবীক্ষণের দিকে দিল তাকাল এক পরম করুণাময় মায়াবী দৃষ্টিতে। যেন সে একটি ছোট্ট শিশুকে তার তৈরি কাগজের নৌকা নিয়ে অহংকার করতে দেখছে। দিল খুব ভালো করেই জানত, আকল যা কিছু বলছে তা কেবল এই দৃশ্যমান, মরণশীল ও সীমাবদ্ধ পৃথিবীর খেলা। বুদ্ধি যেখানে এসে অন্ধ হয়ে যায়, হৃদয়ের রাজ্য সেখান থেকেই শুরু হয়।
দিল অত্যন্ত শান্ত ও মধুর কণ্ঠে বলল,
دل نے سن کر کہا یہ سب سچ ہے
پر مجھے دیکھ، کس فضا میں ہوں میں
"দিল নে সুন কর কাহা ইয়েহ সব সচ হ্যায়
পর মুঝে দেখ, কিস ফাযা মে হুঁ ম্যাঁয়"
হৃদয় এ কথা শুনে বলল, তোমার সব দাবিই সত্য। কিন্তু এবার আমার দিকে তাকাও, আমি কোন স্তরে বাস করি!
দিল আকলকে বলল, "হে আকল! আমি তোমার কোনো বিজ্ঞান, অর্জন বা আবিষ্কারকে অস্বীকার করছি না। তুমি চাকা আবিষ্কার করেছ, অট্টালিকা গড়েছ, মহাকাশে রকেট পাঠিয়েছ—সব সত্য।" কিন্তু তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছ, তুমি কোন স্তরে বাস করো আর আমার রাজত্ব কোন স্তরে? তুমি বাস করো বস্তু, লাভ-ক্ষতি, স্বার্থ আর হিসাব-নিকাশের এই সংকীর্ণ ধূলির ধরায়। আর আমার বিচরণ হলো আধ্যাত্মিকতা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর পরম শান্তির এক অসীম মুক্ত আকাশে।
দিল তার আধ্যাত্মিক কণ্ঠস্বরকে আরও উচ্চে তুলে বলল, "হে আকল! তুমি জীবনের রহস্যকে বাইরে থেকে দেখো, সূত্রে মেলাও, তথ্যের স্তূপ জমাও। "তু সমঝতি হ্যায় রাযে হাস্তি কো".... তুমি ল্যাবরেটরিতে বসে, বইয়ের পাতা উল্টে, দূরবীন দিয়ে জীবনের রহস্যকে কেবল দূর থেকে বোঝার চেষ্টা করো। কিন্তু আমি? আমি সেই সত্যকে বোঝার জন্য কোনো বাহ্যিক যন্ত্রের ওপর নির্ভর করি না। আমি আমার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সত্যকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করি—"আঁখ সে দেখতা হুঁ ম্যাঁ" (আমি যা কিছু সত্য, তা সরাসরি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করি)। তোমার জ্ঞান হলো পরোক্ষ, ল্যাবরেটরির কারসাজির তথ্য; আমার জ্ঞান হলো প্রত্যক্ষ ও জীবন্ত।"
ইকবাল এই রূপকের মাধ্যমে আমাদের দেখান, বুদ্ধি বা বিজ্ঞান মানুষকে জাগতিক জীবনের লজিস্টিকস দিতে পারে। তাকে বাহ্যিক প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে। কিন্তু জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্থ ও উদ্দেশ্যের সন্ধান সে একা দিতে পারে না। দিল আকলকে এই সত্য মনে করিয়ে দিতে গিয়ে বলল, "তোমার সম্পর্ক হলো বাহ্যিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সাথে—"জাহিরি ইলম সে হ্যায় তেরা সিলসিলা" (তোমার সম্পর্ক বাহ্যিক জ্ঞানের সাথে)। আর আমি পরিচিত ভেতরের আধ্যাত্মিক আনন্দ ও অনুভূতির সাথে—"বাতিনে কাইফ সে আশনা হুঁ ম্যাঁ" (আমি পরিচিত অন্তরের আধ্যাত্মিক অবস্থার সাথে)। মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস—ভালোবাসা, দয়া, আধ্যাত্মিক প্রশান্তি—এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র নেই। তুমি কখনো সেগুলোকে টেস্টটিউবে বন্দি করতে পারবে না।
দিল আরও গভীরে গিয়ে বলল, আকলের সবচেয়ে বড় রোগ হলো, সে সবকিছুতে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারে না। সে অনন্তকাল ধরে দর্শনের গোলকধাঁধায় ছটফট করে। বুদ্ধি যখন নিজেকেই প্রভু ভেবে বসে, তখন মানুষের সভ্যতা এক যান্ত্রিক নরকে পরিণত হয়। যা আমরা আজকের পারমাণবিক অস্ত্র ও কর্পোরেট পুঁজিবাদের যুগে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দিল বলল, "তুমি জ্ঞান ও দর্শনের গোলকধাঁধায় ছটফট করো—"ইলম কি ইনতিহা হ্যায় তু" (তুমি হলে জ্ঞানের শেষ সীমানা, যেখানে পৌঁছে মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে)। আর আমি সেই অস্থিরতার প্রতিষেধক। "হুসন কা ইবতিদা হুঁ ম্যাঁ" আমি হলাম অপার্থিব সৌন্দর্য ও প্রেমের আদি সূচনা, যা সেই অস্থিরতাকে শান্তিতে রূপান্তরিত করে।
দিল আকলকে স্পষ্ট করে দিল, "তুমি বড় বড় লাইব্রেরির বইয়ের ভেতর, দর্শন আর যুক্তির জটিল জালে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত ছটফট করছ। একটা প্রশ্নের উত্তর পেলে তুমি দশটা নতুন প্রশ্ন তৈরি করো, আর সেই কারণেই তুমি চিরকাল অস্থির। কিন্তু আমি মানুষের বুকে পবিত্র প্রেমের বেদনা হয়ে আসি। যা মানুষের ভেতরের সমস্ত অহংকার ও জাগতিক লোভ-লালসাকে পুড়িয়ে ছারখার করে তাকে পবিত্র করে তোলে। বিজ্ঞান যদি হৃদয়ের আলো বা ওহীর শাসনের অধীনে না থাকে, তবে তা মানবতার জন্য সবচেয়ে বড় মহামারী হয়ে দাঁড়ায়।
শিবলী নোমানী এবং আল্লামা ইকবালের এই সম্মিলিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংশ্লেষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বায়তুল হিকমাহর আসল মেজাজ বা স্পিরিট ছিল প্রতিটি শাস্ত্রকে তার নিজস্ব ওজনে মাপা। ওহীকে মানতে হবে কারণ মানুষ নিজেই চূড়ান্ত সত্যের উৎস নয়, আর আকলকে ব্যবহার করতে হবে কারণ মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টিজগৎ বুঝতে হবে। এই ভারসাম্য হারালে একদিকে তৈরি হয় প্রশ্নহীন ধর্মীয় জড়তা, আর অন্যদিকে জন্ম নেয় ওহীহীন যুক্তির অহংকার। দিল এই সত্যটি আকলকে বুঝিয়ে বলল, "যেখানে তুমি এসে থমকে দাঁড়াও, যেখানে তোমার জ্ঞানের শেষ সীমা। আর এখান থেকেই আমার পরম সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক প্রেমের আদি ব্যাকরণ শুরু হয়। তুমি স্রষ্টাকে যুক্তির গোলকধাঁধায় খুঁজে বেড়াও। ওটাই তোমার তীব্র আকাঙ্ক্ষা—"তু খুদা জো হ্যায় আরজু তেরি" (তুমি ঈশ্বর-সন্ধানী)। কিন্তু আমি? আমার ভেতরে স্বয়ং মহিমান্বিত ঈশ্বরের দর্শন মেলে—"খুদা বীনে কিবরিয়া হুঁ ম্যাঁ" (আমি ঈশ্বর-দর্শনকারী)।" আকল কেবল ঈশ্বর-সন্ধানী (খুদা-জু)। সে যুক্তি, দর্শন ও বইপত্র দিয়ে স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু কখনো তাঁকে ছুঁতে পারে না। পক্ষান্তরে, দিল হলো ঈশ্বর-দর্শনকারী (খুদা-বিন)। যুক্তির সীমানা পেরিয়ে সে স্রষ্টার মহিমা নিজের ভেতর সরাসরি অনুভব করে। ইকবাল এখানে বলে দিচ্ছেন, আকল যেখানে থমকে যায়, হৃদয়ের অন্তর্দৃষ্টি সেখান থেকে শুরু হয়।
আজকের দিনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানকে তার নিজস্ব গবেষণার সীমানার মধ্যে রাখা এবং মানুষের রূহ ও নৈতিকতার জগতকে কর্পোরেট বিজ্ঞানবাদের থাবা থেকে মুক্ত করা। বিজ্ঞান থেকে নয়। আর এর জন্য উভয়টি —আকল (বিজ্ঞান) এবং দিল (আধ্যাত্মিকতা) আত্মস্থ করা অপরিহার্য। যা জানা থাকে না, তাতে পথপ্রদর্শকও হওয়া যায়। ইমাম গাজ্জালী, ইবনে রুশদরা দর্শন আত্মস্থ করে পথপ্রদর্শক হয়েছেন, ত্যাগ করে নয়। তাই আধুনিক বিজ্ঞান ও দুনিয়ার বাস্তবতা আত্মস্থ করে, যতক্ষণ না উম্মা'কে এই শাস্ত্রীয় স্তর ও মেথডোলজির পার্থক্য বুঝাতে আমরা পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল এক অদৃশ্য বৈজ্ঞানিক পুরোহিততন্ত্রের খাঁচায় বন্দি হয়ে ছটফট করতে থাকবে উম্মাহ। আর নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব চিরতরে হারিয়ে যাবার পথ উন্মুক্ত রবে।
ইকবালের কবিতায় "দিল" আকলের প্রতিটি কথার জবাব দিতে দিতে যেন আরও উচ্চতর এক শক্তির অধিকারী হয়ে উঠল। আকলের দূরবীক্ষণ যন্ত্র, গণিতের খাতা, দর্শনের পাহাড়—সবকিছু যেন হৃদয়ের সেই মৃদু আলোর সামনে ধুলিস্মাৎ হতে লাগল। আকল প্রথমবারের মতো থমকে দাঁড়াল। তার মুখে আর সেই আগের অহংকারী হাসি নেই। সে বুঝতে পারল, তার প্রতিটি যুক্তির পেছনে দিল এমন এক সত্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে যা যুক্তির ভাষায় বলা যায় না; কেবলই অনুভব করা যায়।
দিল এবার তার চূড়ান্ত অস্ত্রটি ছুড়ে দিল। সে আকলকে বলল, "হে আকল! তুমি সময় ও স্থানের খাঁচায় বন্দি, তোমার হিসাবের জগৎ কেবল আজ আর কালের মাঝে আবদ্ধ। তুমি দুনিয়ার পথের গাইড। কিন্তু মানুষের অনন্ত মহাকালের যে যাত্রা অসীম মহাকাশের অন্তে, তার পথপ্রদর্শক কে?" তার কণ্ঠে তখন এক গভীর স্বর্গীয় প্রতিধ্বনি—
تو زمان و مکاں سے رشتہ بپا
طائر سدرہ آشنا ہوں میں
"তু যমাঁ ও মকাঁ সে রিশতা বপা
তায়েরে সিদরাহ আশনা হুঁ ম্যাঁ"
তোমার সম্পর্ক সময় ও স্থানের সাথে, কিন্তু আমি সিদরাতুল মুনতাহা-পরিচিত পাখি। যার সম্পর্ক ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমানের মহাকাল পেরিয়ে ঈশ্বরীয় সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছে।
আকল দিশাহারা হয়ে জিজ্ঞেস করল, "সিদরাতুল মুনতাহা? এটা কোন দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায়? কোন সূত্রে এর হিসাব আছে?" দিল মৃদু হেসে বলল, "এটা দেখা যায় না, বোঝা যায় না—এটা শুধু অনুভব করা যায়। বিশ্বাস করা যায়, ভালোবাসার চোখে দেখা যায়। তুমি যেখানে হিসাবের শেষ সীমায় এসে থেমে যাও, সেখান থেকে আমার যাত্রা শুরু হয়।"
এবার দিল তার সর্বশেষ ও সবচেয়ে শক্তিশালী কথাটি বলল। তার গোটা সত্তা যেন এক অপার্থিব নূরে ভরে উঠল—
کس بلندی پہ ہے مقام مرا
عرش رب جلیل کا ہوں میں
"কিস বুলন্দি পে হ্যায় মাকাম মেরা
আ'রশে রব্বে জালিল কা হুঁ ম্যাঁয়"
দেখো, আমার মর্যাদা কত উচ্চে! আমি তো মহিমান্বিত প্রতিপালকের আরশের সিংহাসনেরই অংশ।
এখানে ইকবাল হৃদয়ের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ আসনে বসাচ্ছেন। আরশ হলো মহাজাগতিক কর্তৃত্বের প্রতীক। যা যুক্তি ও গণিতের আওতার বাইরে। দিল দাবি করছে, "আমার স্থান সেই অনন্ত আরশের সঙ্গে। কারণ আমি প্রেম, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতা দিয়ে মানুষকে স্রষ্টার সবচেয়ে কাছে নিয়ে যাই।" এই লাইনে ইকবাল স্পষ্ট করে দেন, মানুষের চূড়ান্ত উচ্চতা তার বুদ্ধির যন্ত্রপাতিতে নয়, তার হৃদয়ের আল্লাহ-সচেতনতায় নিহিত।
এই কথায় আকলের হাত থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র পড়ে গেল। গণিতের খাতাটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আকল হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে হৃদয়ের সামনে মাথা নত করে বলল, "আমি ভেবেছিলাম আমি সবকিছু, কিন্তু আমি তো কিছুই নই। আমি কেবল সীমার মধ্যে ঘোরাফেরা করি, আর তুমি সীমার অতীত।"
দিল আকলের মাথায় হাত রেখে বলল, "তুমি ভুল করোনি, আকল। তুমি আমার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পৃথিবীতে চলতে হলে তোমারও দরকার আছে। তুমি মানুষকে খাবার দাও, বাসস্থান দাও, প্রযুক্তি দাও, দর্শন-বিজ্ঞানের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচন করে দাও—এসব কাজও অপরিহার্য। কিন্তু তুমি যখন আমার সীমানায় পা দিতে চাও, যখন তুমি প্রেম-ভালোবাসা, আত্মা, স্রষ্টা, অতিপ্রাকৃতিক জগত—এসব বিষয় যুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাও, তখন তুমি নিজেকেই অন্ধ করে ফেলো। তুমি তখন আর বিজ্ঞানী থাকো না, হয়ে যাও এক পুরোহিত, যে তার নিজের তৈরি যন্ত্রপাতির পূজা করে।"
এইভাবে দিল তার প্রতিটি কথার মাধ্যমে আকলের জাগতিক অহংকারকে একের পর এক আঘাত করে প্রমাণ করে, বুদ্ধি যেখানে তার সীমায় এসে থমকে দাঁড়ায়, হৃদয়ের অসীম আধ্যাত্মিক রাজ্য সেখান থেকেই শুরু হয়। বুদ্ধি কেবল তথ্য জোগায়, কিন্তু হৃদয় দেয় অর্থ, উদ্দেশ্য আর পরম শান্তি। ইকবাল এই সংলাপের মধ্য দিয়ে যে চূড়ান্ত শিক্ষা দিতে চেয়েছেন তা হলো, আকল ও দিল একে অপরের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আধুনিক মানুষ আকলকে দিলের সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছে, এর পরিণতি আমরা আজ দেখছি। এই মহাকাব্যিক সংলাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বুদ্ধি যখন হৃদয়ের অধীনস্থ হয়, তখন মানুষ হয়ে ওঠে প্রকৃত মুক্ত। ওহী আর যুক্তি, অন্তর্দৃষ্টি আর পর্যবেক্ষণ—দুটোই মিলে তৈরি করে পূর্ণ মানুষ। একটি বাদ দিলে মানুষ হয় অন্ধ, আর অন্যটি বাদ দিলে হয় যান্ত্রিক। আকল পথ দেখায়, দিল দেখায় গন্তব্য। এই উপলব্ধিই আমাদের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির চাবিকাঠি। ইকবালের এই মহাকাব্যিক সতর্কবার্তা তাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি দার্শনিক পাঠ।
শিকড়হীন মুক্তচিন্তা বনাম অন্ধ ঘরের দেয়াল—মুসলিম মনস্তত্ত্বের দ্বিবিধ অবক্ষয়
একবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে দাঁড়িয়ে সমকালীন মুসলিম মনস্তত্ত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল এক ভয়াবহ ও আত্মঘাতী দ্বিবিধ সংকটে নিমজ্জিত। ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগে জ্ঞানের দরজা যেখানে প্রশ্ন ও শাস্ত্রীয় শৃঙ্খলার জন্য উন্মুক্ত ছিল, আজকের মুসলিম সমাজ সেখানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ও চরমপন্থী গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। মানুষের চিন্তার এই গভীর ফাটল উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল সোভরেইনটিকে (intellectual sovereignty) ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
এই সংকটের শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ইতিহাসের সেই বিন্দুতে, যেখানে ইসলামি চিন্তার গতিপথ আমূল বদলে গিয়েছিল। আলজেরীয়-ফরাসি দার্শনিক মোহাম্মদ আরকুন বলেছেন, এক সময় ইসলামি বিশ্বে দর্শন, কালাম ও বিভিন্ন বিতর্কের মধ্য দিয়ে চিন্তার একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ ছিল। গ্রিক দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও বিজ্ঞান আরবি লোগোস্ফিয়ারে প্রবেশ করে এক নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক উন্মেষ ঘটায়। কিন্তু আটশো থেকে তেরোশো সালের মধ্যে এই উন্মেষ ঘটলেও, তেরোশো সালের পর ধীরে ধীরে সেই উন্মুক্ত চিন্তার দরজা বন্ধ হয়ে যায় (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 13-14)।
আরকুন এ প্রসঙ্গে 'অচিন্তিত' (unthought) ও 'অচিন্তনীয়' (unthinkable)-এর ধারণা দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি সমাজ ও ভাষার নিজস্ব একটি 'লোগোস্ফিয়ার' বা মানসিক-ভাষিক জগৎ আছে। এই লোগোস্ফিয়ারের ভেতরেই নির্ধারিত হয় কী নিয়ে চিন্তা করা যায় আর কী নিয়ে চিন্তা করা যায় না। যখন কোনো চিন্তাধারা 'অচিন্তনীয়' ঘোষিত হয়, তখন তা আর আলোচনার বিষয়বস্তু থাকে না—বরং তা হয়ে ওঠে এক ধরনের নিষিদ্ধ অঞ্চল (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, p. 12)। আরকুনের মতে, ইসলামি চিন্তার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হলো ইবনে রুশদের (আভেরোয়েসের) মৃত্যুর পর দর্শনকে ইসলামি চিন্তাধারা থেকে কার্যত বহিষ্কার করা হয়। অথচ এই একই ইবনে রুশদ লাতিন খ্রিস্টান ইউরোপে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 13-14)। ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান (১৮২৩-১৮৯২ খ্রি.) ১৮৮৩ সালে জামালুদ্দিন আফগানীর সাথে এক বিতর্কে বলেছিলেন, সেমিটিক জাতি (আরব ও ইহুদি) দর্শনের উপযোগী নয়। অথচ আরকুন দেখিয়েছেন, ইবনে রুশদের নির্মূলের পর ইসলামি চিন্তা যে পথে হেঁটেছে, তা মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ফল, দার্শনিক অক্ষমতার ফল নয় (Carl W. Ernst, Following Muhammad: Rethinking Islam in the Contemporary World pp. 20-21)।
প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় আর্নেস্ট রেনান দাবি করেছিলেন, ইসলাম বিজ্ঞান ও দর্শনের সাথে বেমানান। তাঁর যুক্তি ছিল, ইসলাম মূলত একটি আরব ধর্ম। আর আরবরা ‘সেমিটিক জাতি’-এর অন্তর্ভুক্ত। যাদের ‘পরমাণুবাদী’ (atomistic) মানসিকতা দার্শনিক সংশ্লেষণে অক্ষম। অর্থাৎ, রেনান বিশ্বাস করতেন, আরব ও ইহুদিরা অর্থাৎ, এই ‘সেমিটিক’ জাতির মানুষেরা স্বভাবগতভাবেই দর্শন চর্চার উপযুক্ত নয়।
ড. আরকুন এই রেনান-আফগানি বিতর্ককে ব্যবহার করে ইসলামি চিন্তার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উন্মোচন করেছেন। আরকুনের মতে, ইবনে রুশদের (আভেরোয়েসের) মৃত্যুর পর ইসলামি চিন্তাধারা থেকে দর্শনকে যে কার্যত বহিষ্কার করা হয়েছিল, সেটি কোনো ‘জাতিগত অক্ষমতা’ বা ‘সেমিটিক মানসিকতার সীমাবদ্ধতা’-র ফল ছিল না। বরং এটি ছিল "খাঁটি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ফল"। অর্থাৎ, মুসলিম শাসকরা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দেখল, দার্শনিক চিন্তা তাঁদের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তখন তারা ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দিল। মুতাজিলা ও অন্যান্য যুক্তিবাদী চিন্তাধারাকে দমন করল আর আশআরি মতবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করল। আরকুন দেখান, ইবনে রুশ যদি দার্শনিকভাবে ‘অক্ষম’ হতেন, তাহলে তিনি লাতিন খ্রিস্টান ইউরোপে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত কেন এত প্রভাবশালী ছিলেন? বরং ইসলামি বিশ্বে তাঁর নির্মূল ছিল রাজনৈতিক ইচ্ছার ফল—দার্শনিক অক্ষমতার নয় (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, Introduction, pp. 13-14)।
ভাবগতভাবে রেনানের বক্তব্য ছিল জাতিগত ও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের একটি ঔপনিবেশিক কুসংস্কার। যা প্রমাণ করত, ‘পশ্চিমা’ সভ্যতা স্বাভাবিকভাবেই উচ্চতর। আরকুন সেটিকে উল্টে দিয়ে দেখান, ইসলামি বিশ্বে দর্শনের পতন ঘটেছিল বাইরের কোনো জাতিগত ত্রুটির কারণে নয়, বরং ভেতরের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির চাপে। আর এই উপলব্ধিই আজকের মুসলিম মনস্তত্ত্বের সংকট বুঝতে আমাদের সাহায্য করে।
কিন্তু এখন আমাদের একদল পশ্চিমা মরীচিকার পেছনে ছুটে নিজেদের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করছে, আর অন্যদল অন্ধ ঘরের দেয়াল তুলে নিজেদের অজ্ঞতাকে তাকওয়া বলে প্রচার করছে। এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে দাঁড়িয়ে উম্মাহ এক গভীরতম খাঁচায় বন্দি হয়ে ছটফট করছে। কিন্তু কেন এই দুই চরমপন্থা? কেন মাঝখানের পথটি আজ এত দুর্বল?
আরকুন একে 'আইডিওলজিক্যাল রিডাকশনিজম' বা আদর্শিক সংকীর্ণতা বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ, মানুষ জটিল বাস্তবতাকে কয়েকটি সরল আদর্শিক ছাঁচে ফেলে বোঝার চেষ্টা করে। যেমন—আজকের তরুণ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন অনেকে সরাসরি ‘এটা দাজ্জালী ব্যবস্থা হারাম’ বা ‘এটা পশ্চিমা ষড়যন্ত্র’—এই দুই ছাঁচের যেকোনো একটিতে ফেলে দেন। অথচ প্রকৃত প্রশ্নটি অনেক গভীর—এই প্রযুক্তিগুলো ইসলামি নৈতিকতার সাথে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, নাকি হতে পারে না? আরকুন বলবেন, এই সরলীকরণই ‘আইডিওলজিক্যাল রিডাকশনিজম’। এটি জটিল বাস্তবতাকে বোঝার পথে বড় প্রতিবন্ধক। কারণ এটি মানুষকে প্রকৃত জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান থেকে বিরত রাখে। আরকুন চান, আমরা ইতিহাস, ভাষা ও সমাজবিজ্ঞানের সাহায্যে ‘অচিন্তিত’ (unthought) বিষয়গুলোকে সামনে এনে নতুন করে ভাবি।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়ান দার্শনিক সৈয়দ মুহাম্মদ নাকিব আল-আত্তাস এই সংকটকে দেখেছেন 'কনফিউশন অব নলেজ' বা জ্ঞানের বিভ্রান্তি হিসেবে। তাঁর মতে, পশ্চিমা সভ্যতা জ্ঞানকে তার আত্মিক ও ঐশী উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুবাদী হাতিয়ারে পরিণত করেছে (Syed Muhammad Naquib al-Attas, Islam and Secularism, pp. 15-32)। আল-আত্তাসের ভাষায়, জ্ঞান যখন তার 'আদব' বা শাস্ত্রীয় স্তর হারিয়ে ফেলে, তখন তা আর জ্ঞান থাকে না—বরং হয়ে ওঠে অস্ত্র। ‘আদব’ মানে শুধু শিষ্টাচার নয়; এটি হলো প্রতিটি জিনিসকে তার সঠিক স্থানে রাখার জ্ঞান ও চর্চা। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যখন পাশ্চাত্যের ‘ফ্রিডম অফ স্পিচ’-এর ধারণাটি ইসলামি সমাজে হুবহু প্রয়োগ করতে চায়, তখন সে ‘আদব’-এর অভাবেই তা করে। কারণ ইসলামে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’-র স্থান ও মাত্রা ভিন্ন। অথবা যখন কেউ ফরমালিন ব্যবহার করে ফল পাকানোর কথা ভাবে—সে জানে যে এটা লাভজনক (একটি ‘জ্ঞান’), কিন্তু ‘আদব’-এর অভাবে সে বুঝতে পারে না, এই জ্ঞান কোথায় থামানো উচিত। কারণ এটা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। জ্ঞান যখন তার ‘স্থান’ হারায়, তখন সেটাই ‘আদব’-এর বিলুপ্তি। আর এই 'আদব' বা মর্যাদাবোধের বিলুপ্তিই আজকের উম্মাহর সবচেয়ে বড় রোগ। ইসলামে 'আদব'-এর ধারণাটি অনেক ব্যাপক। তাই বলা হয় "আদ-দ্বীনু হুয়াল আদাব" দ্বীন আদবেরই নাম।
আরকুন যেমন বলেছেন, আমরা ভাবতে ভুলে যাচ্ছি। ফলে জটিল বিষয়গুলোকে সরল ছাঁচে ফেলে দিচ্ছি। আর আল-আত্তাস বলেছেন, আমরা জানতে ভুল করছি, তাই জ্ঞানের সঠিক স্থান ও সীমা চিহ্নিত করতে পারছি না। এই দুই ভুলের সম্মিলনেই আজকের উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট এত গভীর ও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানি-আমেরিকান দার্শনিক ফজলুর রহমান এই সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন 'ইজতিহাদ'-এর দরজা পুনরায় খোলার মধ্যে। তিনি 'ডাবল মুভমেন্ট' থিওরি দিয়েছেন। অর্থাৎ, প্রথমে কুরআনের মূল বার্তাকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বোঝা, তারপর সেই বার্তাকে আজকের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইজতিহাদের দরজা খোলার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ, যা আজকের উম্মা'তে নেই বললেই চলে।
মোহাম্মদ আরকুন মুসলিম মনের এই স্থবিরতা ও সংকটকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। আরকুনের মতে, অতীতে ইসলামি চিন্তা যখন বহুবিধ বিতর্ক, কালামচর্চা এবং দর্শনের মুখোমুখি হয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করত, আধুনিক মুসলিম মন সেখানে নিজের চারপাশের দেয়াল তুলে এক ধরনের বদ্ধ পরিমণ্ডল তৈরি করেছে। তারা নিজেদের ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট যুগের ফিকহী বা কালামী সমাধানকে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় মনে করে আজকের জটিল বাস্তবতার ওপর হুবহু চাপিয়ে দিতে চায়। এর ফলে সমাজে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে সমকালীন কোনো জটিল অর্থনৈতিক, সামাজিক বা প্রযুক্তিগত সংকট নিয়ে নতুন কোনো চিন্তাভাবনা করাকেই ধর্মদ্রোহিতা বলে গণ্য করা হয়। আরকুনের এই তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ আমাদের দেখায়, যখন কোনো সমাজ নিজের চিন্তার দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 24-38)।
আরকুন আরও স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, এই মনস্তাত্ত্বিক ভীরুতার কারণে মুসলিম বিশ্বের তরুণদের একটি বড় অংশ চরম হীনম্মন্যতায় ভুগছে। তারা যখন নিজেদের ঘরের ভেতরে আধুনিক যুগের কোনো প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর খুঁজে পায় না, তখন তারা বাধ্য হয়ে পশ্চিমা সেক্যুলার দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পশ্চিমা সেক্যুলার অ্যাকাডেমিয়া আবার এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগায়। তারা বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে মানুষের ঈমান ও নৈতিকতার গোড়ায় আঘাত হানে। ফলে তরুণরা এক জঘন্য মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের শিকার হয়, যাকে আরকুন ‘কালচারাল অ্যালিয়েনেশন’ বা সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 112-118)। এই শিকড়হীন মুক্তচিন্তা মানুষকে কোনো সত্যের নোঙর দেয় না, বরং তাকে এক অন্তহীন সংশয়বাদ ও অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে ভেতরের রক্ষণশীল সমাজ এই তরুণদের ফিরিয়ে আনার কোনো বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক পদ্ধতি জানেন না। তাদের একমাত্র হাতিয়ার হলো সামাজিক বর্জন বা কাফের ও গোমরাহ ফতোয়া দিয়ে সমাজ থেকে বের করে দেওয়া, যা মূলত সংকটকে আরও বেশি ঘনীভূত করে তোলে।
শিকড়হীন মুক্তচিন্তার মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা
এই ‘সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা’ আসলে কী? এটি হলো সেই অবস্থা, যখন একজন মানুষ নিজের সাংস্কৃতিক শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, অথচ নতুন যে সংস্কৃতিতে সে প্রবেশ করে, সেখানেও সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। সে দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে—না তার নিজের, না পরের। আর এই অবস্থাই তাকে এক চরম মানসিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়। আরকুনের সমসাময়িক সমালোচকেরা তাঁকে অভিযুক্ত করেছেন, তিনি নিজেও “পশ্চিমা আলোকায়ন ও সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন”। অর্থাৎ, আরকুন যে রোগের কথা বলেছেন, সেই রোগে তিনি নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলেন কিনা—সেটা আজও বিতর্কের বিষয়।
এই শিকড়হীন মুক্তচিন্তা মানুষকে কোনো সত্যের নোঙর দেয় না, বরং তাকে এক অন্তহীন সংশয়বাদ ও অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে ভেতরের রক্ষণশীল সমাজ এই তরুণদের ফিরিয়ে আনার কোনো বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক পদ্ধতি জানেন না। ফলে যুগের মানুষ ও প্রবহমান সমাজের সাথে রক্ষণশীল সমাজের তৈরি হয় বিস্তর গ্যাপ ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব। কেউ কাউকেই নিজের মনে করেন না। কাছাকাছিও আসতে চান না। একই ঘরে বাস করা সত্ত্বেও দুই মনস্তত্ত্বে সৃষ্টি হয় বিশাল সংকট।
‘এপিস্টেমিক কলোনিয়ালিজম’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক ঔপনিবেশিকতা ধারণাটি এই সংকটকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। ড. মুহাম্মদ উসমান ফারুকের মতে, ইসলামি বিশ্বের সংকট ‘এপিস্টেমিক কলোনিয়ালিজম’ (epistemic colonialism)-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ‘রাজনৈতিক ঔপনিবেশিকতা’ যেখানে মানুষকে শাসন করে, ‘এপিস্টেমিক কলোনিয়ালিজম’ সেখানে মানুষের মনকে শাসন করে—জ্ঞানব্যবস্থার মাধ্যমে। এটি ইউরোসেন্ট্রিক জ্ঞানব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে কাজ করে। ফারুকের মতে, ঔপনিবেশিকতার সমাপ্তির পরেও এই জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে টিকে থাকে।
ফারুক একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফেজের ঐতিহ্যবাহী রিয়াদে বা লাহোরের হাভেলিতে বসবাসের অভিজ্ঞতার সাথে আধুনিক উঁচু অ্যাপার্টমেন্টের তুলনা করুন। আধুনিক ভবনে সুইমিং পুল, ফিটনেস সেন্টার থাকতে পারে, কিন্তু সেখানে থাকে না খোলা আকাশের সঙ্গে মেলানো ঐতিহ্যবাহী জানালা, যা প্রাকৃতিক জগতের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। এই রূপকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা হয়তো আধুনিকতার সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি, কিন্তু আমাদের চিন্তার স্থাপত্যই বদলে গেছে। এই “এপিস্টেমিক কলোনিয়ালিজম” থেকে মুসলিম মনকে মুক্ত করতে হলে ইউরোসেন্ট্রিক জ্ঞানব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। (Faruque, Muhammad U. (2024). "Decolonizing the Muslim mind: A philosophical critique." The Philosophical Forum, 55(4), 353-375)।
এই দ্বিবিধ অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সমকালীন মালয়েশিয়ান দার্শনিক ও ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের পুরোধা সৈয়দ মুহাম্মদ নাকিব আল-আত্তাস এক অবিরুদ্ধ তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। আল-আত্তাস তাঁর কালজায়ী গ্রন্থ ‘ইসলাম অ্যান্ড সেক্যুলারিজম’ বা ‘ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ নামক কাজে দেখিয়েছেন, আধুনিক উম্মাহর সবচেয়ে বড় রোগটি হলো ‘কনফিউশন অব নলেজ’ বা জ্ঞানের বিভ্রান্তি এবং ‘লস অব আদব’ তথা মর্যাদাবোধের বিলুপ্তি। তাঁর মতে, পশ্চিমা সভ্যতা জ্ঞানকে তার আত্মিক ও ঐশী উৎস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুবাদী হাতিয়ারে পরিণত করেছে। যার মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা ও প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত আধুনিক বুদ্ধিজীবীগণ যখন এই আত্মাহীন পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বকে কোনো ফিল্টারিং বা যাচাই ছাড়াই ইসলামি সমাজে ঢুকিয়ে দেন, তখন সমাজের সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। আল-আত্তাস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই শিকড়হীন প্রগতিবাদের সমালোচনা করে একে উম্মাহর আত্মিক আত্মহত্যার শামিল বলে ঘোষণা করেছেন (Syed Muhammad Naquib al-Attas, Islam and Secularism, pp. 15-32)।
আল-আত্তাসের ‘আদব’-এর ধারণাটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘আদব’ শুধু শিষ্টাচার নয়। এটি জ্ঞান ও সত্তার স্তরক্রমের স্বীকৃতি। আল-আত্তাসের মতে, শিক্ষা হলো ‘তাদিব’—অর্থাৎ, ধীরে ধীরে আদব স্থাপন করার প্রক্রিয়া। যখন জ্ঞান তার আদব হারায়, তখন তা আর জ্ঞান থাকে না বরং হয়ে ওঠে অস্ত্র। আর এই আদবের বিলুপ্তিই আজকের উম্মাহর সবচেয়ে বড় রোগ। আল-আত্তাসের ‘তাদিব’-ভিত্তিক শিক্ষামডেল শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিককে একীভূত করে। তাঁর মতে, পশ্চিমা সেক্যুলার জ্ঞান যখন কোনো ফিল্টার ছাড়াই ইসলামি সমাজে প্রবেশ করে, তখন তা ‘আদব’-কে ধ্বংস করে এবং জ্ঞানের বিভ্রান্তি তৈরি করে।
আল-আত্তাস একই সাথে মুসলিম সমাজের ভেতরের সেই অন্ধ রক্ষণশীলতা ও জাহেলিয়াতকেও সমানভাবে দায়ী করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জ্ঞান যখন তার আদব বা শাস্ত্রীয় স্তর হারিয়ে ফেলে, তখন অযোগ্য ও অর্ধশিক্ষিত মানুষ সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক বিষয়ে ফতোয়া দিতে শুরু করে। উলামা ও চিন্তাবিদদের একটি বড় অংশ আজ সময়ের দাবি মেটাতে ব্যর্থ হয়ে কেবল দলীয় কোন্দল, উপদলীয় কুৎসা রটনা এবং নিজেদের সংকীর্ণ মাদরাসা বা খানকাহর দেয়াল পাহারা দিতে ব্যস্ত রয়েছেন। তারা মনে করছেন, চিন্তাকে স্তব্ধ করে রাখাই হয়তো দ্বীন রক্ষা করার একমাত্র উপায়। কিন্তু বাস্তবে এই স্থবিরতা দ্বীনকে রক্ষা করছে না, বরং তরুণ প্রজন্মকে ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে (Syed Muhammad Naquib al-Attas, The Concept of Education in Islam, pp. 45-51)। আল-আত্তাসের এই গভীর তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, বায়তুল হিকমার আসল রূপ ছিল ওহীর সত্যকে কেন্দ্রে রেখে বাইরের জ্ঞানকে নিজের ভাষায় পরীক্ষা করা। কোনো অন্ধ অনুকরণ বা অন্ধ প্রত্যাখ্যানের ভীরুতা সেখানে ছিল না।
ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.) রাহি. এই সংকটকে আরও গভীরভাবে দেখেছেন। নদভী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মাযা খাসিরাল আলাম বি ইনহিতাতিল মুসলিমীন' (মুসলমানদের অধঃপতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো) গ্রন্থে, মুসলিমদের পতনের দুটি প্রধান কারণ দেখিয়েছেন। এক, তারা নিজেদের দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে; দুই, তারা বিজ্ঞান আয়ত্ত করতে পারেনি। নদভীর মতে, পশ্চিমা সভ্যতা চিত্তাকর্ষক বৈজ্ঞানিক অর্জন সত্ত্বেও আধ্যাত্মিক শূন্যতা, নৈতিক আপেক্ষিকবাদ ও সামাজিক বিভক্তির সমাজ তৈরি করেছে। নদভী পাশ্চাত্য সভ্যতার হৃদয়ে আধ্যাত্মিক সংকটের কথা বলেছেন এবং মুসলিম অভিজাতদের বুদ্ধিবৃত্তিক নির্ভরশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
নদভীর ‘মাগরিবি দুনিয়া সে সাফ সাফ বাতেঁ' গ্রন্থটি এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে লন্ডন, বার্লিন ও লিডসের মতো ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত এই বক্তৃতাগুলোতে নদভী দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রকৃতিকে জয় করলেও মানুষের জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর—উদ্দেশ্য, আত্মীয়তা, পরিবার, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও জীবনের চূড়ান্ত অর্থ ইত্যাদি সম্পর্কে—সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নদভী এখানে একটি ‘তৃতীয় পথ’ প্রস্তাব করেছেন। তিনি ইসলামকে পশ্চিমা ছাঁচে ঢালার আত্মসমর্পণমূলক প্রবণতা এবং পশ্চিমা সবকিছুকে বর্জনের চরমপন্থা—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি পশ্চিমা শক্তিকে স্বীকার করেছেন, কিন্তু এর বস্তুবাদী ভিত্তির সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে জ্ঞান থেকে বিশ্বাসকে বিচ্ছিন্ন করা, ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া—বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্র, সামাজিক ভাঙন ও ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মুসলিম শ্রোতাদের উদ্দেশ্যেও নদভী সমান সরল ভাষায় বলেছেন। তিনি মুসলিম অভিজাতদের বুদ্ধিবৃত্তিক নির্ভরশীলতার সমালোচনা করেছেন, যারা পশ্চিমা মডেল অনুকরণ করে নিজের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক প্রামাণ্যতা ও গভীর আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মরক্কোর দার্শনিক ত্বাহা আব্দুর রহমান (জন্ম ১৯৪৪) এই সংকটকে আরেকটি মাত্রা দিয়েছেন। ত্বাহা আব্দুর রহমানের ‘রুহ আল-হাদাসা’ (আধুনিকতার আত্মা) গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্য আধুনিকতা কেবল যুক্তিবাদকে প্রাধান্য দিয়েছে। তিনি পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে ‘আদর্শ আধুনিকতা’ থেকে দূরবর্তী বলে সমালোচনা করেছেন এবং ইসলামি আধুনিকতার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা আত্মিক-নৈতিকতার কাছাকাছি। তাঁর মতে, পাশ্চাত্য আধুনিকতা দুটি দিক ও দুটি উপাদান দ্বারা নির্ধারিত। তিনি যুক্তি ও নৈতিকতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। ত্বাহা আব্দুর রহমানের প্রকল্পটি একটি বৈশ্বিক বার্তা হিসেবে কাজ করে, যা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে। ওয়েল হাল্লাক তাঁকে “ইসলামের কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র হলো নৈতিকতা—এই দাবির সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ” বলে অভিহিত করেছেন।
এই চিন্তাবিদদের বিশ্লেষণ আমাদের এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, শিকড়হীন মুক্তচিন্তা ও অন্ধ রক্ষণশীলতা—এই দুই চরমপন্থা আসলে একই রোগের দুটি লক্ষণ। একটি, আত্ম-অস্বীকার, অন্যটি আত্ম-অন্ধ। আর এই দুইয়ের মাঝখানেই হারিয়ে গেছে ‘আদব’-এর সেই সোনালি সুতো, যা জ্ঞান ও আত্মাকে একসূত্রে বাঁধে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে। হাউজ অব উইজডম এর যুগে। কিন্তু এই ফিরে যাওয়া মানে অতীতে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য শেকড়কে শক্তিশালী করা। নতুবা এই অন্ধগলির অন্ত আর আসবে না।
অন্ধ প্রাচীরের স্থাপত্য—ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক নির্মাণকৌশল
কিন্তু এই ‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’ আসলে কীভাবে তৈরি হলো? কারা তৈরি করল? আর কেনই বা তৈরি হলো? এই দেয়াল কি চিরন্তন? নাকি এটি ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে মানুষের হাতে গড়ে ওঠা একটি কাঠামো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ইতিহাসের সেই মুহূর্তে, যখন ইসলামি চিন্তার গতিপথ আমূল বদলে গিয়েছিল। আর এই বদলের গল্পটা শুরু হয় কুরআনের সংকলন ও প্রামাণ্যকরণের প্রক্রিয়া দিয়ে।
আরকুন দেখিয়েছেন, উসমান রাযি.-এর খেলাফতের সময় কুরআনের যে মাসহাফ বা সংকলনটি প্রামাণ্য ঘোষণা করা হয়, তার আগে আরও অনেকগুলো কুরআনের কোডেক্স বা পাণ্ডুলিপি ছিল। যেগুলোর প্রত্যেকটিতেই কিছু না কিছু ভিন্নতা ছিল। কিন্তু যখন উসমানি মাসহাফকে ‘একমাত্র প্রামাণ্য’ ঘোষণা করা হয়, তখন অন্যান্য সব কোডেক্স ধ্বংস করে ফেলা হয়। আরকুন একে ‘অফিসিয়াল ক্লোজড কর্পাস’ (Official Closed Corpus) বা ‘বদ্ধ সরকারি গ্রন্থসম্ভার’ নামে চিহ্নিত করেছেন (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 228-229)। ক্যাথারিনা ফোলকার তাঁর গবেষণায় আরকুনের এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছেন, “অন্যান্য কোডেক্স ধ্বংস করা হয়েছিল ‘বিবাদ এড়াতে’—যাতে নির্বাচিত ওহীর প্রামাণ্যতা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি না হয়” (Katharina Volker, “Arkoun's Study of the Quran,” SOCARX, p. 3)। কাজটি ছিলো কুরআনের পাঠ্যকে ‘একটি’ নির্দিষ্ট আকারে জমাট বাঁধানোর প্রক্রিয়া। যা মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনও ছিলো। এই ‘বদ্ধ কর্পাস’-ই পরবর্তী সময়ে ইসলামি চিন্তার সীমানা নির্ধারণ করে দিল। কী নিয়ে চিন্তা করা যাবে আর কী নিয়ে করা যাবে না। আর এই সীমানা নির্ধারণই, ইসলামি দুনিয়ায় চিন্তার মৌলিক রেখা টেনে দেয়।
আরকুন এই প্রক্রিয়াকে আরও গভীরভাবে বুঝতে দিয়েছেন ‘কুরআনিক বাস্তবতা’ (Qur'anic Reality - QR) ও ‘ইসলামি বাস্তবতা’ (Islamic Reality - IR)-এর মধ্যে পার্থক্যের মাধ্যমে। ফোলকারের মতে, QR হলো সেই সময়কাল যখন কুরআন মৌখিকভাবে অবতীর্ণ হচ্ছিল। একটি উন্মুক্ত, চলমান ও কথোপকথনমূলক বক্তৃতা, যেখানে মানুষ প্রশ্ন করত, প্রতিক্রিয়া জানাত, এমনকি কখনো কখনো আপত্তিও তুলত (Katharina Völker, “Arkoun's Study of the Quran,” SOCARX, pp. 6-7)। যেমনটা ঘটেছিল প্রথম দিকের মুসলিমদের মধ্যে। তাঁরা নবীজির কাছে সরাসরি প্রশ্ন করতেন, নতুন আয়াতের অর্থ বুঝতে চাইতেন, আর সেই প্রশ্নের জবাবেও নতুন আয়াত নাজিল হতো। এই ছিল QR-এর জীবন্ত, প্রাণবন্ত পরিবেশ। আর IR হলো পরবর্তী পর্যায়। যখন সেই মৌখিক বক্তৃতা লিপিবদ্ধ হয়ে একটি লিখিত গ্রন্থে পরিণত হলো এবং তারপর ধীরে ধীরে সেটি ব্যাখ্যাকারীদের (মুফাসসির, ফকিহ, আলেম) হাতে একটি বদ্ধ কর্তৃত্বে পরিণত হলো। ফোলকারের ভাষায়, এই IR পর্যায়ে “মূল মৌখিক বক্তৃতাটি ধীরে ধীরে লিখিত গ্রন্থের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়” (Katharina Völker, “Arkoun's Study of the Quran,” SOCARX, p. 7)। অর্থাৎ, QR ছিল জীবন ও প্রশ্নের স্পন্দন; IR হলো সেই স্পন্দনকে একটি কাঠামোয় বন্দি করে ফেলার প্রক্রিয়া। এখানে প্রশ্ন করার জায়গা কমে গেল, ব্যাখ্যা হয়ে গেল একমুখী, এবং কর্তৃত্ব স্থাপিত হলো কয়েকজন বিশেষজ্ঞের হাতে। তাই ‘স্পন্দনকে বন্দি করা’ বলা হয়েছে—কারণ জীবন্ত প্রক্রিয়াটিকে থামিয়ে একটি কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলা হলো। পরবর্তীতে এই QR থেকে IR-তে উত্তরণের মাধ্যমেই তৈরি হয় ‘অন্ধ দেয়াল’-এর ভিত্তি প্রাচীর। অর্থাৎ, যখন QR-এর সেই উন্মুক্ত, প্রশ্ন-সহিষ্ণু পরিবেশটি IR-এর বদ্ধ কাঠামো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হলো, তখনই তৈরি হলো ‘অন্ধ দেয়াল’। যা পরবর্তী সময়ে ইসলামি চিন্তাকে সংকুচিত করে, নতুন প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করে, এবং শুধু পুরোনো ব্যাখ্যাগুলোকে পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য করে। প্রশ্ন করার যে স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল, তাকে যখন আইনি-ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোয় বেঁধে ফেলা হলো, তখনই তৈরি হলো বদ্ধ কাঠামো অন্ধকার গলি। যা আজও ইসলামি চিন্তাকে আবদ্ধ রেখেছে।
আরকুন এই রূপান্তরকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন, যা জার্নাল আর্টিকেলে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। প্রথম স্তর—মৌখিক উচ্চারণের স্তর। এখানে আল্লাহর বাণী মুখে মুখে প্রচারিত হচ্ছিল, শ্রোতা-বক্তার মধ্যে একটি সরাসরি ও সজীব সম্পর্ক ছিল। দ্বিতীয় স্তর—লিখিত রূপান্তরের স্তর। যখন এই বাণীগুলোকে লিপিবদ্ধ করা হলো এবং একটি নির্দিষ্ট সংকলন (মাসহাফ) তৈরি করা হলো। তৃতীয় স্তর—ব্যাখ্যার স্তর। যখন সেই লিখিত গ্রন্থকে ঘিরে তৈরি হলো অসংখ্য ব্যাখ্যা, ভাষ্য ও তাফসির—যা ধীরে ধীরে নিজেরাই কর্তৃত্বে পরিণত হলো (Jurnal Syahadah, “Mohammad Arkoun's Renewal Method,” pp. 12-14)। আর এই তিনটি স্তরের প্রতিটিতেই চিন্তার পরিধি ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। মৌখিক পর্যায়ে ছিল উন্মুক্ত সম্ভাবনা, লিখিত পর্যায়ে সেটি কিছুটা সীমিত হলো, আর ব্যাখ্যার পর্যায়ে তা প্রায় সম্পূর্ণ বদ্ধ হয়ে গেল। এই বদ্ধতা তৈরি করল মানবীয় সীমারেখা—যেখানে নতুন কোনো প্রশ্নের জায়গা নেই, আছে কেবল পুরোনো ব্যাখ্যাগুলোকে পুনরাবৃত্তি করার ব্যবস্থা।
এই বদ্ধ কর্পাস তৈরির প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ধর্ম’ ধারণাটি নিজেই একটি আধুনিক ইউরোপীয় নির্মাণ। দ্বীন-এর ধারণা নয়। কারণ দ্বীন, ধর্ম, রিলিজিয়নে রয়েছে বিস্তর ফারাক। ইসলাম হলো, দ্বীন।
‘ধর্ম’ ধারণার ইউরোপীয় নির্মাণ ও ইসলামি রাষ্ট্রের আধুনিক ধারণা: একটি বিস্তারিত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ
আমরা আজকে ‘ধর্ম’ শব্দটি ব্যবহার করি এত সহজে, যেন এটি একটি চিরন্তন, সর্বজনীন ও স্বতঃসিদ্ধ ধারণা। কিন্তু সত্যি বলতে, ‘ধর্ম’ বা ‘রিলিজিয়ন’—এই শব্দটির বর্তমান অর্থ ও ব্যবহার খুব বেশি পুরনো নয়। এটি একটি আধুনিক ইউরোপীয় নির্মাণ, যা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে শতাব্দীজুড়ে। রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত। আর এই নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই ‘ইসলাম’-কে একটি ‘ধর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করার কাজটি সম্পন্ন হয়েছে, যা আজকের মুসলিম চিন্তার সংকটের অন্যতম মূল কারণ।
‘রিলিজিয়ন’ শব্দটির আদি অর্থ ও সিসেরো থেকে অগাস্টিন পর্যন্ত বিবর্তন
রোমান দার্শনিক সিসেরো (Cicero) (খ্রিস্টপূর্ব ১০৬-৪৩) তাঁর On the Nature of the Gods (দেবতাদের প্রকৃতি) গ্রন্থে ‘রিলিজিও’ (religio) শব্দটির উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, এটি এসেছে ‘রিলিগেরে’ (relegere) ধাতু থেকে, যার অর্থ 'বারবার পড়া' বা 'মনোযোগ দিয়ে পালন করা'। তখন ‘রিলিজিও’ বলতে বোঝাত কর্তব্যবোধ ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন; ধর্মতত্ত্ব বা বিশ্বাসের কোনো বিষয় ছিল না (Ernst, Carl W. (2003). Following Muhammad: Rethinking Islam in the Contemporary World. Chapel Hill: University of North Carolina Press, 2003, p. 68)। সিসেরোর কাছে ‘রিলিজিও’ ছিল একটি গুণ, একটি চর্চা—কোনো বিশ্বাস-ব্যবস্থা বা মতবাদ নয়। সিসেরোর ‘রিলিজিও’ কর্তব্যবোধ ও আনুষ্ঠানিক কিছু কাজকর্ম।
লাতিন লেখকরা সাধারণত এই শব্দটি বহুবচনে ব্যবহার করতেন—‘রিলিজিওনেস’ (religiones) অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক কর্তব্য। এতে কোনো ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়বস্তু ছিল না; বরং ছিল দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের অনুভূতি। আমরা আজও এই অর্থের একটি ছাপ পাই ইংলিশের দৈনন্দিন ভাষায়। ইংলিশে এখনো ব্যবহার হয়, বলা হয়, He reads the daily paper religiously অর্থাৎ, “সে প্রতিদিনের সংবাদপত্র ধর্মীয়ভাবে (দায়িত্বের সাথে) পড়ে"।
খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে (প্রায় ৩৯০ খ্রিস্টাব্দে) সেন্ট অগাস্টিন ‘অফ ট্রু রিলিজিয়ন’ (De Vera Religione) নামে একটি সম্পূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। এখানে তিনি ‘রিলিজিয়ন’-কে একটি নতুন অর্থ দেন। অগাস্টিনের মতে, সত্য ধর্ম হলো স্রষ্টাকে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করা। একটি সঠিক বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উপযুক্ত মনোভাব ও কর্মের সাথে সংযুক্ত করা।
অগাস্টিনের এই ধারণায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
প্রথমত, অগাস্টিনের কাছে ‘সত্য ধর্ম’ ছিল শুধু একবচনে। শুধু 'রিলিজিয়ন', রিলিজিয়াস নয়।। অর্থাৎ, শুধু একটি ধর্ম, অন্যসব ছিল ‘মিথ্যা’ বা ‘পৌত্তলিকতা’। তাঁর কোনো ‘বহুধর্ম’-এর ধারণা ছিল না।
দ্বিতীয়ত, ধর্ম এখন একটি বিষয়বস্তুতে পরিণত হলো যার রয়েছে শক্তিশালী ধর্মতাত্ত্বিক ও মতবাদগত বিষয়বস্তু।
তৃতীয়ত, সঠিক মনোভাব ও কর্মের উৎস হিসেবে কর্তৃত্ব স্থাপিত হলো খ্রিস্টান চার্চে—যা মানবজাতিকে খ্রিস্টের সাথে সংযুক্তকারী ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। ধর্ম এখন আর একটি বিমূর্ত শিক্ষা নয়; বরং এটি নির্ভর করে সময় ও স্থানে প্রকাশিত প্রত্যাদেশের ওপর (Ernst, Carl W. (2003). Following Muhammad: Rethinking Islam in the Contemporary World. Chapel Hill: University of North Carolina Press, 2003, p. 68-69)।
অগাস্টিনের ধর্মকে তত্ত্বে এবং মতবাদে রূপান্তর খ্রিস্টধর্মের বিকাশে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ধর্মতাত্ত্বিক সত্যকে চার্চের আইনি কর্তৃত্বের সাথে সংযুক্ত করা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে খ্রিস্টান ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
আধুনিক ‘বহুধর্ম’ ধারণার আবির্ভাব—গ্রোটিয়াস ও ঔপনিবেশিক যুগ
অগাস্টিনের প্রায় চৌদ্দশ বছর পর, ডাচ আইনবিদ ও ধর্মতত্ত্ববিদ হুগো গ্রোটিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫ খ্রি.) ‘অন দ্য ট্রুথ অফ দ্য ক্রিশ্চিয়ান রিলিজিয়ন’ (De Veritate Religionis Christianae) গ্রন্থে ‘ধর্ম’-এর ধারণায় আরেকটি বিরাট পরিবর্তন আনেন। শিরোনামটি অগাস্টিনের বইয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও, এর মধ্যে পার্থক্য সুগভীর।
গ্রোটিয়াসের সময়ে ইউরোপে ধর্মযুদ্ধ (প্রোটেস্ট্যান্ট-ক্যাথলিক) চলছিল। এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ধর্ম একটি বহুবচনযুক্ত বিশেষ্য। তিনি দেখলেন, খ্রিস্টান জগতেই একাধিক ধর্ম বা মতবাদ আছে, যারা সবাই একই কর্তৃত্ব দাবি করে। গ্রোটিয়াস খ্রিস্টধর্মের ভেতরের এই বিভাজনকে এড়িয়ে তাঁর দৃষ্টি বাইরের দিকে ঘুরালেন এবং অ-খ্রিস্টান গোষ্ঠীগুলোকেও ‘ধর্ম’ হিসেবে বর্ণনা করলেন—যদিও সেগুলো তার ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মিথ্যা ধর্ম ছিল।
গ্রোটিয়াসের বইটি মূলত ছিল ইউরোপীয় নাবিকদের জন্য একটি বিতর্ক ম্যানুয়াল, যা অর্থনৈতিক ও সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে তৈরি। এটি তাদের ইহুদি, মুসলিম ও পৌত্তলিকদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল (Carl W. Ernst, Following Muhammad, pp. 40-42)।
১৬৩২ সালে প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদের শিরোনাম ছিল ‘ট্রু রিলিজিয়ন এক্সপ্লেইন্ড অ্যান্ড ডিফেন্ডেড অ্যাগেইনস্ট ইয়ে আর্চেনিমিজ দেরেওফ ইন দিজ টাইমস’।
এই শিরোনামের প্রতিটি শব্দই গুরুত্বপূর্ণ। ‘ট্রু রিলিজিয়ন’—এখানে একমাত্র খ্রিস্টধর্মকেই ‘সত্য ধর্ম’ বলে দাবি করা হয়েছে, বাকি সব ধর্মকে ‘মিথ্যা’ বা ‘ভ্রান্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘আর্চেনিমিজ’ বা ‘প্রধান শত্রু’ বলতে ইহুদি, মুসলিম ও পৌত্তলিকদের বোঝানো হয়েছে, যারা সে-সময় ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের কাছে ‘ভিন্ন ধর্মাবলম্বী’ ছিল। ‘ইন দিজ টাইমস’—এই ‘সময়’ বলতে প্রোটেস্ট্যান্ট-ক্যাথলিক ধর্মযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরবর্তী পর্বকে বোঝানো হয়েছে। যখন ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা মনে করেছিল, এখন তাদের উচিত আভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে বাইরের ‘শত্রুদের’ বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। বাইরের শত্রু কারা? নিজেদের ভিতরকার মতবাদগত লড়াই রেখে তারা আসল শত্রু হিসেবে কাদের চিহ্নিত করলো? উত্তর ওই বইয়ের শুরুতেই আছে।
ওই বইয়ের মুখবন্ধের চিত্রে ‘রিলিজিয়ন’-কে একটি রূপক নারীমূর্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি নিউ টেস্টামেন্ট ও ওল্ড টেস্টামেন্টের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন।
এই নারীমূর্তিটি ‘সত্য ধর্ম’ বা খ্রিস্টধর্মের প্রতীক। তাকে দুটি ধর্মগ্রন্থের মাঝখানে দাঁড় করানো হয়েছে—ওল্ড টেস্টামেন্ট (ইহুদি ধর্মগ্রন্থ) ও নিউ টেস্টামেন্ট (খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থ)। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে খ্রিস্টধর্মই সেই সেতু যা ইহুদি ধর্মকে পূর্ণতা দিয়েছে এবং খ্রিস্টধর্মই হলো চূড়ান্ত সত্য। অন্য ধর্মগুলো—ইসলাম, পৌত্তলিকতা—এই ছবির মূল কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছে; তাদের আলাদা করে পাশে বসানো হয়েছে খ্রিস্টধর্মের ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে।
চারপাশে খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম (মুসলিমরা সেখানে ‘দ্য টার্কে’ নামে চিহ্নিত) ও পৌত্তলিক—প্রত্যেকের সাথে প্রাসঙ্গিক বাইবেলের ভার্স উল্লেখ করা হয়েছিল।
লক্ষণীয় হলো, মুসলিমকে ‘মুসলিম’ না বলে ‘দ্য টার্কে’ (তুর্কি) নামে ডাকা হয়েছে। এর কারণ সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে ‘মুসলিম’ বলতে সাধারণ মানুষ বুঝত মূলত অটোমান তুর্কিদের, যারা তখনও ইউরোপের জন্য সামরিক হুমকি ছিল (১৬৮৩ সালে তারা ভিয়েনা অবরোধ করেছিল)। এর আগে আরবরা নেতৃত্বে থাকায় 'দ্য এরাবস' বলে মুসলিমদের বুঝানো হতো। ‘তুর্কি’ শব্দটি ব্যবহার করে ইংরেজ পাঠকদের মনে অটোমান সাম্রাজ্যের ভীতি জাগানো হচ্ছিল, যা ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান জনমত গঠনে সহায়ক ছিল। প্রতিটি ধর্মের পাশে বাইবেলের আয়াত বসানো হয়েছিল—যেমন ইহুদির পাশে তাদের ‘অবিশ্বাস’ সম্পর্কিত ভার্স, মুসলিমের পাশে ‘মিথ্যা নবী’ সম্পর্কিত ভার্স—যাতে খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব ‘প্রমাণিত’ হয়।
মুসলিম সম্পর্কে নোটে লেখা ছিল, “তুর্কি তার হাতে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা দিয়ে সে তার ধর্ম রক্ষা করে, যা মাহোমেট (মুহাম্মদ) নামক একজন মিথ্যা নবীর (নাউজুবিল্লাহ) কাছ থেকে এসেছে, যাকে সাধারণভাবে খ্রিস্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।”
এই নোটটির প্রতিটি শব্দে ইউরোপীয় ইসলামবিদ্বেষের পুরোনো ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে। ‘তরবারি’ দ্বারা ইসলামকে সহজাতভাবে হিংস্র ও জবরদস্তিমূলক প্রচারক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যদিও বাস্তবে খ্রিস্টানরা নিজেরাও শতাব্দী ধরে ক্রুসেড ও ঔপনিবেশিক যুদ্ধে তরবারি ব্যবহার করেছে। ‘মিথ্যা নবী’ বলে শেষ নবী মুহাম্মদ সা.-কে খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সেই পুরোনো অপবাদে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মধ্যযুগে দান্তে থেকে মার্টিন লুথার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ‘খ্রিস্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন’—দাবি করা হয়েছে, বাইবেলেই মুহাম্মদের মতো ‘মিথ্যা নবী’ আসার পূর্বাভাস দেওয়া আছে (যা ভুয়া এবং নির্জলা মিথ্যাচার। বরং বাইবেলেই বলা হয়েছে আখেরি নবী হবেন মুহাম্মাদ সা.। সর্বশেষ সত্য নবী। বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন রহমতুল্লাহ কিরানভী রাহি.-এর দুই খণ্ডে লিখা "ইযহারুল হক" গ্রন্থটি)। সেখানে ইহুদি ধর্মকে তাদের সহোদর হিসেবে চিহ্নিত করে, আব্রাহামিক হওয়া সত্ত্বেও ইসলামকে খ্রিস্টধর্মের কোনো সহোদর ধর্ম হিসেবে না দেখে বরং একটি পূর্বাভাসিত শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যাকে খ্রিস্টানদের প্রতিহত করতেই হবে।
গ্রোটিয়াসের উপসংহার ছিল স্পষ্ট, “সমগ্র বিশ্বে অন্য কোনো ধর্ম নেই, ছিল না, যা পুরস্কারের উৎকর্ষতার জন্য বেশি সম্মানজনক, আদেশের জন্য বেশি পরিপূর্ণ ও নিখুঁত। অথবা যে পদ্ধতিতে এটি প্রচার ও প্রসারিত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল তার জন্য বেশি বিস্ময়কর হতে পারে, খ্রিস্টধর্ম ছাড়া” (Carl W. Ernst, Following Muhammad, pp. 40-42)।
গ্রোটিয়াস এখানে তিনটি মানদণ্ডে খ্রিস্টধর্মকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করছেন। এক. ‘পুরস্কার’—খ্রিস্টধর্মে স্বর্গ ও মুক্তির যে প্রতিশ্রুতি, তা অন্য ধর্মের চেয়ে মহৎ। দুই. ‘আদেশ’—খ্রিস্টীয় নৈতিকতা ও বিধানগুলো অন্য ধর্মের চেয়ে পরিপূর্ণ। তিন. ‘প্রচারপদ্ধতি’—যেভাবে খ্রিস্টধর্ম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে, তা অন্য ধর্মের চেয়ে বিস্ময়কর। কার্ল আর্নস্ট এই উপসংহারটিকে ‘আধুনিক ধর্ম ধারণার ভিত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ এখানে ধর্ম আর ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়; এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে পরিণত হয়েছে। যেখানে খ্রিস্টধর্মকে ‘বিশ্বসেরা’ প্রমাণ করা হচ্ছে—ঠিক যেমন আজ কোনো বিজ্ঞাপনে পণ্যকে সেরা দাবি করা হয়। এই ‘শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা’ পরবর্তী ঔপনিবেশিক যুগে ‘সভ্যতার মিশন’ ও ‘শ্বেত মানুষের বোঝা’-এর ন্যায্যতা দিতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
গ্রোটিয়াসের এই ধারণায় ‘ধর্ম’-এর কয়েকটি নতুন বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। প্রথমত, অগাস্টিনের মতো মতবাদগত সত্য ও আইনি কর্তৃত্ব খ্রিস্টধর্মের জন্য দাবি করা হয়—কিন্তু এখন খ্রিস্টধর্ম হলো প্রতিযোগিতায় থাকা কয়েকটি ধর্মের একটি।
দ্বিতীয়ত, এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপট হলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার যুগ—যা কলম্বাসের সময় থেকে শুরু হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে পূর্ণ গতিপ্রাপ্ত হয়।
তৃতীয়ত, ধর্ম এখন একটি প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বাস ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের ধারণায় পরিণত হয়—যার প্রেক্ষাপট হলো সাম্রাজ্যবাদ ও মিশনারি কার্যক্রম।
‘ইসলাম’-কে একটি ধর্মীয় ক্যাটাগরি হিসেবে চিহ্নিতকরণ: এডওয়ার্ড লেনের পাশ্চাত্যে ‘ইসলাম’ শব্দের প্রবর্তন
গ্রোটিয়াসের তুলনামূলক কাঠামো এবং কার্ল আর্নস্টের বিশ্লেষণ ধর্মকে একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মাঠে দাঁড় করায়, যেখানে খ্রিস্টধর্মকে অন্যান্য ঐতিহ্যের তুলনায় ‘শ্রেষ্ঠ’ বা ‘সেরা পণ্য’ হিসেবে প্রমাণিত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার বিচার যদি খ্রিস্টীয় মানদণ্ডেই চলে, তাহলে অন্যান্য ধর্মীয় ঐতিহ্যকেও ঠিক একই ধরনের সুসংহত, নামাঙ্কিত ও পদ্ধতিগত কাঠামোতে ফেলে সাজাতে হবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপীয় প্রাচ্যবাদী পণ্ডিত ও ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা বিশ্বের নানা বিশ্বাস ও প্রথাকে একটি ‘বৈজ্ঞানিক’ শ্রেণিবিন্যাসের আওতায় আনার উদ্যোগ নেন। যেকোনো বিশ্ব-শাসক হয়ে ওঠা জাতিকে তার মনস্তত্ত্বের আদলে এটা করতে হয়। মুসলিমরাও যখন বিজয়ী এবং বিশ্ব-পরিচালক ছিলো তখন তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তাঁদেরকেও এই একই অনিবার্য কাজটি করতে হয়েছিল। মুসলিমরা ছিলেন এই জ্ঞানের পাইওনিয়ার। প্রথম উদ্ভাবক। কারণ বিজিত জনগণকে শাসনের জন্য শুধু তরবারি বা কর আদায় যথেষ্ট নয়; তাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও আইন-আদর্শকে বুঝে সেই অনুযায়ী প্রশাসনিক কাঠামো গড়তে হয়। না হলে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা যায় না। আব্বাসীয় খলিফাদের দরবারে যেমন আল-বিরুনি ও ইবনে হাজমরা ধর্মতুলনামূলক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন শুধু জ্ঞানের তৃষ্ণায় নয়, বরং হিন্দু, খ্রিস্টান ও ইহুদি প্রজাদের ধর্মীয় পরিমণ্ডল বুঝে রাজস্বনীতি ও আইন প্রণয়নের জন্য; তেমনি উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় শক্তিগুলো ‘ইসলাম’-কে একটি সংজ্ঞাবদ্ধ ধর্মীয় ক্যাটাগরিতে ফেলার মাধ্যমে ভারত, মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঔপনিবেশিক শাসনকে ‘বৈজ্ঞানিক’ ও ‘ন্যায়সঙ্গত’ প্রমাণের ভিত্তি তৈরি করছিল। সংক্ষেপে, বিশ্বশক্তির মঞ্চে দাঁড়ানো প্রতিটি সভ্যতার জন্যই ‘অপর’ ধর্মকে শ্রেণিবদ্ধ করা, নামকরণ করা ও নিজের মানদণ্ডে বিচার করা একটি অপরিহার্য ক্ষমতা-কুশলী কৌশল, ঐচ্ছিক কোনো একাডেমিক শখ নয়। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী খ্রিস্টীয় পরিভাষা ‘মোহামেডানিজম’ (মুহাম্মদ-প্রবর্তিত মতবাদ) তখন ক্রমেই অযথার্থ ও ভ্রান্ত বলে প্রতীয়মান হতে থাকে তাদের কাছে। কারণ এই নাম ধর্মটির মূল প্রতিপাদ্য—আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ—কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছিল। তাই আপাত-নিরপেক্ষ ও অভ্যন্তরীণ সারকে তুলে ধরার প্রয়োজন থেকেই তারা ধীরে ধীরে স্থানীয় আরবি পরিভাষাটিকেই গ্রহণ করতে শুরু করে। সেই ধারণাগত ও আভিধানিক পরিবর্তনের সূত্র ধরেই ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপীয় পণ্ডিতরা ‘ইসলাম’ শব্দটিকে একটি ধর্মের নাম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ইংরেজ পণ্ডিত এডওয়ার্ড লেন (১৭৯৭-১৮৭৬ খ্রি.) ছিলেন প্রথম ইউরোপীয় লেখক যিনি ১৮৩৬ সালে তাঁর ‘ম্যানার্স অ্যান্ড কাস্টমস অফ দ্য মডার্ন ইজিপশিয়ান্স’ বইয়ে ‘ইসলাম’ শব্দটিকে একটি ধর্মের নাম হিসেবে ইংরেজিতে প্রবর্তন করেন।
লেন লিখেছেন, “মোহাম্মদ যে 'রিলিজিয়ন' (ধর্ম) শিক্ষা দিয়েছেন, আরবরা সাধারণভাবে তা ‘আল-ইসলাম’ বলে ডাকে” (Carl W. Ernst, Following Muhammad, p. 216, n. 7)। কার্ল আর্নস্ট তাঁর "Following Muhammad" গ্রন্থের পাদটীকায় (পৃ. ২১৬, টীকা ৭) এডওয়ার্ড লেনের ‘ইসলাম’ শব্দটি ব্যবহারের বিবরণ দিয়েছেন। লেন ১৮৩৬ সালের প্রথম সংস্করণে ‘মোহামেডান ধর্ম’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেছিলেন এবং ‘ইসলাম’-এর আগে আরবি নির্দেশক ‘এল-’ (আল-) ধরে রেখেছিলেন, যা শব্দটির বিদেশি স্বাদ সংরক্ষণ করেছিল। তিনি লিখেছিলেন "The Mohammadan religion is generally called by the Arabs, el-Islám". তবে ১৮৬০ সালের পঞ্চম সংস্করণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন আনেন। তিনি ‘মোহামেডান’ শব্দটি বাদ দেন এবং বাক্যটি পুনর্বিন্যাস করে লিখেন, "The religion which Mohammad taught is generally called by the Arabs 'El-Islam". লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘মোহামেডান’ অপশব্দটি পরিহার করা; ‘এল-’ (আরবি আল-) তিনি অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। আর্নস্ট একে ‘সতর্কতামূলক পদক্ষেপ’ (tentative move) বলে অভিহিত করেছেন। কারণ প্রথম প্রকাশনায় লেন ‘ইসলাম’-এর আগে নির্দেশকটি ধরে রেখে শব্দটিকে ইংরেজি পাঠকের কাছে একটি বিদেশি ও অপরিচিত পরিভাষা হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। পঞ্চম সংস্করণে তিনি শুধুমাত্র ‘মোহামেডান’ বর্জন করেছিলেন—যেটি মুসলিমদের কাছে আপত্তিকর ছিল। কারণ তারা মনে করেন ধর্মটি মুহাম্মদ সা.-এর ব্যক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ এবং তাঁর কাছ থেকে আসা দ্বীন। কিন্তু ‘এল-’ ধরে রেখে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, এটি এখনও একটি আরবি শব্দ, ইংরেজি নয়। অর্থাৎ, ‘এল-’ বাদ পড়েনি, বরং ‘মোহামেডান’ বাদ পড়েছে; এবং এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটিই ইঙ্গিত দেয় যে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপীয় পণ্ডিতরা কীভাবে ‘ইসলাম’-কে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় ক্যাটাগরি হিসেবে ইংরেজি ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। (Carl W. Ernst, Following Muhammad, p. 216, n. 7)।
লেনের এই পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ‘মোহামেডান’ (Mohammadan) শব্দটি এড়াতে সচেষ্ট ছিলেন, যা তখন ইউরোপে মুসলিম ধর্মের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ‘ইসলাম’-কে একটি ‘ধর্ম’ (religion) হিসেবে ক্যাটাগরিকরণ করলেন—যা ছিল সম্পূর্ণ ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে।
আরকুনের বিশ্লেষণ: ক্যাটাগরিকরণের পরিণতি
ইসলামকে ‘ধর্ম’ (Religion) বলে চিহ্নিত করার ঘটনাটি একটি নিরপেক্ষ অনুবাদ নয়; বরং এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ক্যাটাগরিকরণের ঘটনা। এই ক্যাটাগরিকরণের মাধ্যমে ইসলাম তার ঐতিহাসিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের মতো একটি ‘বস্তু’ (object)-তে পরিণত হয়। যাকে ইচ্ছামতো বিশ্লেষণ, তুলনা এমনকি মানুষের পক্ষ থেকে অন্যান্য ধর্মের মতো যেনো বিনির্মাণও করা যায়। আলজেরীয়-ফরাসি দার্শনিক মোহাম্মদ আরকুন এই প্রক্রিয়াটিকে ‘অস্তিত্বগত উপড়ে ফেলা’ (existential displacement) ও ‘অচিন্তিত’-এর সৃষ্টি বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ ইসলামের ক্ষেত্রে যা চিন্তাই করা যায় না, তার উদ্ভব ঘটানো হলো (Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, Introduction, pp. 9-11)।
এই ক্যাটাগরিকরণের ইতিহাস ইতিপূর্বে আমরা দেখলা। কীভাবে সপ্তদশ শতাব্দীর ডাচ আইনবিদ হুগো গ্রোটিয়াস (Hugo Grotius) ১৬৩২ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের মুখবন্ধে ইসলামকে (যাকে তিনি ‘দ্য টার্কে’ বা তুর্কি বলে চিহ্নিত করেছেন) হাতে তরবারি নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেখিয়েছেন। যেন ইসলাম সহজাতভাবে হিংস্র ও জবরদস্তিমূলক। তিনি খ্রিস্টধর্মকে ‘সেরা পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করলেন, যার তুলনায় অন্য ধর্মগুলোর কোনো মূল্যই নেই। এরপর এডওয়ার্ড লেন (Edward Lane) ১৮৩৬ সালে ‘মোহামেডান ধর্ম’-এর বদলে ‘ইসলাম’ শব্দটি একটি ধর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। পঞ্চম সংস্করণে (১৮৬০) তিনি ‘মোহামেডান’ শব্দটি বর্জন করলেও ‘এল-’ (আল-) অক্ষুণ্ণ রেখে বোঝাতে চাইলেন যে এটি এখনও একটি ‘বিদেশি পণ্য’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু নামকরণে কী আসে যায়? কেন এই ক্যাটাগরিকরণ এত মারাত্মক? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পাশ্চাত্য ‘ধর্ম’-এর সংজ্ঞার ভেতর। যা ইসলামি ‘দ্বীন’-এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
পাশ্চাত্যে ‘ধর্ম’ একটি খণ্ডিত কাঠামো। সেখানে আইন-রাজনীতি ‘ঐচ্ছিক’। পাশ্চাত্য যখন ইসলামকে ‘ধর্ম’ ক্যাটাগরিতে ফেলে, তখন তার আইন (শরীয়ত), রাজনীতি (সিয়াসা) ও অর্থনীতি (মুয়ামালাত)-কে ‘ঐচ্ছিক’ বা ‘বহিরাগত’ বলে সাব্যস্ত করে। আর এর পেছনে তিন স্তরের একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রক্রিয়া কাজ করে, যা পাশ্চাত্যের নিজস্ব খ্রিস্টীয়-সেকুলার ঐতিহ্যের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে। সেগুলো হলো, প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’, আলোকায়নের ‘ব্যক্তিগত-জনগণের বিভাজন’, এবং ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টধর্মের ‘আইন-বিচ্ছিন্ন’ চরিত্র।
ক. প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার: ধর্মকে থিওলজি বা আকিদা (অন্তরের ব্যাপার) বানানোর প্রজেক্ট
খ্রিস্টধর্মের ভেতর থেকেই আইনের প্রতি এক ধরনের ‘অবিশ্বাস’ কাজ করত। পৌল (St. Paul) বলেছিলেন, “মানুষ ধার্মিক হয় আইনের কাজের দ্বারা নয়, বরং বিশ্বাসের দ্বারা” (রোমানস্ ৩:২৮)। মার্টিন লুথার ১৫২০ সালে The Freedom of a Christian-এ এই ধারণাকে চূড়ান্ত রূপ দিয়ে বললেন, “বিশ্বাস একা মানুষকে ধার্মিক করে, কোনো কাজ নয়” (Luther, Freedom of a Christian, 1520, অনুচ্ছেদ ২৫-২৭)। লুথারের যুক্তি ছিল—যীশু এসে মোজাইক আইন (Mosaic Law) বা মোশির বিধান-কে পূর্ণ করেছেন; এখন আইন নয়, অনুগ্রহ ও বিশ্বাসই মুক্তির পথ। ফলে খ্রিস্টধর্মের কেন্দ্র সরে গেল গির্জার আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক কর্তব্য থেকে—এবং ঠেকে দাঁড়ালো ব্যক্তির অন্তরের বিশ্বাসে। ‘ধর্ম’ হয়ে গেল একটি ‘অভ্যন্তরীণ অনুভূতি’, যার সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র বা অর্থনীতির সম্পর্ক নেই (Ernst, 2003, pp. 68-69)।
খ. লকের ‘ব্যক্তিগত-জনগণের বিভাজন’: ধর্মকে ‘ঘরের মধ্যে বন্দী’ করা
জন লক (১৬৩২–১৭০৪ খ্রি.) ১৬৮৯ সালে A Letter Concerning Toleration-এ দ্বিতীয় স্তম্ভটি স্থাপন করলেন। তিনি যুক্তি দিলেন, “একজন শাসকের কাজ হলো নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষা করা—আত্মার মুক্তি নয় অর্থাৎ আধ্যাত্মিক বিষয়াদির সাথে রাষ্ট্রের কোনো কাজ নেই। সেটা চার্চ ও ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার”। (এটা দূর করতে গেলে ইসলামের রাষ্ট্রীয় দ্বীনের চরিত্রও দেখাতে হয়। ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত দ্বীন নয়। এখানেই মাওলানা মওদূদি রাহি. 'তা'বিরের গলতি' তথা প্রকাশভঙ্গিতে সমস্যা করেছেন। সেজন্যই মাওলানা ওয়াহিদ উদ্দীন খান রাহি. এটাকে 'তা'বির কি গলতি' বলে চিহ্নিত করে বই লিখেছেন) (Locke, 1689, অনুচ্ছেদ ৭-৮)। লকের এই বিভাজন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক করার দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করল। তার মতে, ধর্ম হলো ‘ব্যক্তিগত ক্ষেত্র’ (private sphere)-এর বিষয়, আর আইন, রাজনীতি ও অর্থনীতি হলো ‘জনগণের ক্ষেত্র’ (public sphere)। যেখানে মানুষের যুক্তি ও সম্মতিই শাসক (Ernst, 2003, p. 69)। ধর্ম এখন ‘ব্যক্তির ঘরের মধ্যে বন্দী’। আর বাইরের পৃথিবী, আইন, আদালত, রাজপ্রাসাদ, বাজার—সবই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘যুক্তিবাদী’ বিষয়। যেখানে মানুষের তৈরি আইন (পজিটিভ আইন) ও সামাজিক চুক্তি চলবে।
গ. খ্রিস্টধর্মের ‘আইন-বিচ্ছিন্ন’ ঐতিহ্য ও রোমান আইন গ্রহণ
ইহুদি ধর্মে বিস্তারিত আইন (হালাখা) আছে, কিন্তু খ্রিস্টধর্মে তা ছিল না। যীশু নৈতিকতা ও মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। খ্রিস্ট বলেছিলেন, “যা সিজারের তাই সিজারকে, আর যা ঈশ্বরের তাই ঈশ্বরকে দাও” (মার্ক ১২:১৭)। যা ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। খ্রিস্টধর্মে থিওলজি ও নৈতিকতা থাকলেও ‘আইনের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি’ ছিল না (Ernst, 2003, pp. 68-69)। এই আইনের অভাব পূরণ করতেই খ্রিস্টজগৎ রোমান আইন (Corpus Juris Civilis)-কে বরণ করে নেয়। রোমান আইন ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, মানবসৃষ্ট ও যুক্তিভিত্তিক—যা ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ফলে পাশ্চাত্যের মানসিকতায় ‘আইন’ কোনোদিন ‘ধর্ম’-এর অংশই হয়নি; এটি তাদের কাছে সিরিফ ‘পৃথিবীর (জাগতিক) কাজ’। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাই পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’-কে আইন-বিচ্ছিন্ন করে দিল এবং ইসলামের শরীয়তকে ‘ধর্মের বহিরাগত’ বলে দেখার মানসিকতা তৈরি করল (Ernst, 2003, pp. 68-69)। ধর্মকে জাগতিক এবং পারলৌকিক বলে বিভাজনের ধারণা এবং বিশ্বাস, খ্রিস্টান মানসজাত। এটা তাদের মনোজগত থেকে উদ্ভূত। ইসলামের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামের মধ্যে দুনিয়াবি আর উখরোওয়ি বা পারলৌকিক বলে আলাদা কোনো ধারণাই নাই। একজন মানুষ কোর্ট-কাচারি পরিচালনা করে যদি ইসলাম মতো, তার এটাই আখেরাতের কাজ। আর আরেকজন মানুষ নামাজ পড়ে কিংবা শহীদ হয় মানুষ দেখানোর জন্য, তার এটা দুনিয়ার কাজ। আখেরাতের নয়।
এখন এই তিন স্তরের সমন্বয়—লুথারের ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’ (আইন বর্জন), লকের ‘ব্যক্তিগত এবং জনগণের জন্য কাজের বিভাজন’ (ধর্মকে ঘরের মধ্যে বন্দী করা), এবং খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে আইনের অনুপস্থিতি ও রোমান আইন গ্রহণ—মিলে পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’-এর যে খণ্ডিত কাঠামো তৈরি করেছে, তাতে আইন, রাজনীতি ও অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবেই ‘ঐচ্ছিক’ বা ‘বহিরাগত’ হয়ে যায়। কারণ পাশ্চাত্যের সংজ্ঞায় ধর্মের কাজ হলো ব্যক্তির আত্মিক মুক্তি, যা ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কিত কিছু আচার-আচরণ। আর পৃথিবী বা দুনিয়ার কাজ হলো, মানুষের যুক্তি ও সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।
যখন এই খণ্ডিত চশমা দিয়ে ইসলামকে দেখা হয়, তখন ইসলামের শরীয়ত (স্রষ্টা প্রদত্ত আইন), সিয়াসাহ (আল্লাহর নির্ধারিত শাসন) ও মুয়ামালাত (আল্লাহর বিধান বাণিজ্য ও অর্থনীতি)—এগুলোকে ‘ধর্মের বাড়াবাড়ি’ বা ‘ঐচ্ছিক সংযোজন’ বলে মনে হয় (Ernst, 2003, pp. 68-69)। পাশ্চাত্যের যুক্তি হলো—আইন তো মানুষের তৈরি, রাজনীতি তো ক্ষমতার খেলা, অর্থনীতি তো মুনাফার বিজ্ঞান—এগুলোর সঙ্গে ‘আত্মার মুক্তি’-র কী সম্পর্ক? এই যুক্তিতে ইসলামকে শুধু ‘পাঁচ কালিমা’ বা ‘নামাজ-রোজা’-তে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়, আর বাকি সব কিছুকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘ঐচ্ছিক’ বলে চিহ্নিত করা হয় (Ernst, 2003, pp. 68-69)।
খ্রিস্টধর্ম যেমন নৈতিকতা ধরে রেখেছে, কিন্তু আইন রোমানদের ছেড়ে দিয়েছে এবং আধুনিক যুগে সেকুলারিজম থিওলজি বা ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা দখল করলেও নৈতিকতার জায়গা খ্রিস্টিয়ানিটির কাছেই রয়ে গেছে, তেমনি পাশ্চাত্য ইসলামের শরীয়ত, সিয়াসা ও মুয়ামালাতকে ‘ঐচ্ছিক’ দেখে। কারণ তাদের ঐতিহ্যে এগুলো কখনো ধর্মের অংশ ছিল না। বর্তমানে ‘মানবাধিকার ধর্ম’ (Civil Religion) সেই নৈতিকতার জায়গা দখল করতে চাইছে, যা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত কাঠামোকেই আরও সুসংহত করছে।
ইসলামে ‘দ্বীন’-এর সামগ্রিক কাঠামো: কেন আইন-রাজনীতি ‘অবিচ্ছেদ্য’?
অন্যদিকে, ইসলামের কেন্দ্রীয় শব্দ ‘দ্বীন’ আরবি ‘দাল-ইয়া-নূন’ ধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘ঋণ, কর্তব্য, বিচার, আনুগত্য, জীবন-পদ্ধতি’ ইত্যাদি। কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা, إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ— “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে দ্বীন হলো ইসলাম” (সূরা আল-ইমরান, ৩:১৯)। এখানে ‘দ্বীন’ থিওলজি তথা ধর্মতত্ত্ব নয়, যাকে শুধুই ‘বিশ্বাসগত বিষয়’ মনে করা হয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক, বিধান ও জীবনপথ। যেখানে আকীদা (থিওলজি), শরীয়ত (আইন) ও আখলাক (নৈতিকতা) পরস্পরের সাথে এমনভাবে মিলিত যে একটিকে ছাড়া অন্যটি কল্পনা করা যায় না। প্রত্যেকটি তাসবির দানার ন্যায় অপরটির সাথে সংযুক্ত। একটিতে ব্যাঘাত আসলে অন্যগুলোও বিশৃঙ্খল এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। যে অবস্থায় বর্তমান মুসলিম উম্মাহ আছে। লাইফের কোনোকিছুই আমাদের এখন ঠিক নাই এই কারণেই যে, আমরা দ্বীন বিচ্ছিন্ন। এইজন্যই রাসুল সা. বলেছিলেন, যতক্ষণ দ্বীনে ফিরে না আসবো আমরা, ততক্ষণ মার খেতেই থাকবো। ইসলামের প্রতিটি বিষয়ের এই সংযুক্তির নেপথ্য অনেক কারণ কাজ করে।
ক. তাওহিদের সার্বভৌমত্ব: কেন আইন স্রষ্টার দ্বীনের অংশ?
ইসলামের মূল ভিত্তি বা প্রথম স্তম্ভ হলো ‘তাওহিদ’। শুধু এই অর্থে না যে, স্রষ্টা বা আল্লাহ একক, বরং এই অর্থে, সমগ্র সৃষ্টিও তাঁর সমস্ত শাসন ও কর্তৃত্বও তাঁরই। কুরআন বলে, أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ — “সাবধান! সৃষ্টি ও আদেশ—উভয়ই তাঁর” (সূরা আল-আরাফ, ৭:৫৪)। অর্থাৎ, যিনি মানুষ ও এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জানেন কীভাবে তা পরিচালনা করতে হবে। তাই শরীয়ত (আইন) হলো, স্রষ্টার পক্ষ থেকে মানবজীবনের জন্য নির্ধারিত পথ। এটি কোনো মানুষের তৈরি ‘পজিটিভ আইন’ নয়; এটি স্রষ্টার সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন। আর রাজনীতি (সিয়াসা) হলো সেই আইনের বাস্তবায়ন ও সমাজের শাসন—যা দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন করাই অসম্ভব। কারণ শাসক ক্ষমতাবান হলেও তিনি আল্লাহর আইনের অধীন। এজন্যই ইমাম আবু হানিফা রাহি. আল-ফিকহুল আকবারে বলেছেন, “শরীয়তের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, যা রাজনীতি ও অর্থনীতি ছাড়া সম্ভব নয়”। এই তাওহিদি ভিত্তিই ইসলামি ‘দ্বীন’-কে পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ থেকে মৌলিকভাবে পৃথক করে। কারণ এখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সমগ্র জীবনকে পরিব্যাপ্ত করে, শুধু উপাসনা বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে নয়।
খ. নবী (সা.)-এর যুগপৎ ভূমিকা: আইন-রাজনীতি-নৈতিকতার মূর্ত প্রতীক
পাশ্চাত্যে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা (যেমন খ্রিস্ট) ছিলেন মূলত ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষক, আর রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল সিজার বা সম্রাটের। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) একই ব্যক্তিত্বে ছিলেন "নবী, রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপতি, বিচারক ও কূটনীতিক"। তিনি মসজিদে ইমামতি করেছেন, যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করেছেন, বাণিজ্যের বিধান দিয়েছেন, এবং মদিনায় একটি বহু-ধর্মী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার ভিত্তি ছিল ‘মদিনা সনদ’ (Constitution of Medina), যা ইতিহাসের প্রথম লিখিত সামাজিক চুক্তিগুলোর একটি। এই মডেলই প্রমাণ করে, দ্বীনে ঈমান (বিশ্বাস) ও আমল (কর্ম) (আমল মানে জাস্ট রিচুয়াল কিছু ইবাদত নয়। দ্বীনের সর্বকর্ম)—পরস্পর-নির্ভর। রাসূল (সা.)-এর জীবন ছিল এই সমন্বয়ের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। যেখানে আইন, রাজনীতি ও নৈতিকতা একীভূতভাবে কাজ করত। এই যুগপৎ ভূমিকাই ইসলামি ‘দ্বীন’-এর দ্বিতীয় স্তম্ভ। যা প্রমাণ করে, দ্বীন কখনো ব্যক্তিগত বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, ধর্মের ন্যায়।
গ. উম্মাহ ও সামাজিক ন্যায়বিচার: কেন অর্থনীতি দ্বীনের অংশ?
ইসলামে যাকাত কেবল ব্যক্তিগত ফরজ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি স্তম্ভও। ইসলামি রাষ্ট্র এর দেখভালও করতে বাধ্য। যা গরিব-দুঃখী ও সমাজের অনগ্রসর অংশের অধিকার। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا— “তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) নাও, যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে ও উত্তম করবে” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১০৩)। অর্থাৎ, অর্থনীতি শুধু ব্যক্তিগত মুনাফার বিষয় নয়; এটি "আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যম"। ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতি হলো, সম্পদ কেবল ব্যক্তির নয়, এটি সমাজের আমানত। আর যাকাত হলো সেই আমানতের ন্যায্য বণ্টনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। ইবনে তাইমিয়া রাহি. "আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ, ফি ইসলাহির রায়ী' ওয়ার রায়ি'য়্যাহ" গ্রন্থে বলেছেন, “শরীয়তের মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার ও কল্যাণ; রাজনীতি হলো সেই লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম—অতএব এটি দ্বীনের অংশ”। এই অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ধারণাই ইসলামি ‘দ্বীন’-এর তৃতীয় স্তম্ভ। যা প্রমাণ করে, দ্বীন কখনো ব্যক্তিগত মুনাফা বা ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
আরকুনের ‘অচিন্তিত’ চিন্তা: কীভাবে এই বিভাজন মুসলিম চিন্তাকে শিকড়হীন করে?
মোহাম্মদ আরকুন তাঁর ‘Critique of Islamic Reason’-এ দেখিয়েছেন, যখন ইউরোপীয় প্রাচ্যবাদীরা ইসলামকে ‘ধর্ম’ ক্যাটাগরিতে ফেললেন, তখন তারা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘দ্বীন’-এর আন্তঃসম্পর্কিত স্তরগুলিকে আলাদা করে ফেললেন (Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, p. 205)। এই বিভাজনই ‘অচিন্তিত’ (unthought) সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ ইসলামের ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সামাজিক মাত্রাগুলো নিয়ে তাদের মনোজগতে চিন্তা করা হয়নি, বা তাদের জায়গা থেকে চিন্তা করা যায়নি। ফলে একটি বিশাল অন্ধকার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
আরকুনের ভাষায়, “যখন ইসলামকে ‘ধর্ম’ বানানো হলো, তখন তার ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সামাজিক মাত্রাগুলোকে উপেক্ষা করা শুরু হলো। আর এই উপেক্ষাই তৈরি করল ‘অচিন্তিত’-এর একটি বিশাল ক্ষেত্র” (Arkoun, Introduction, p. 10)। এর ফলাফল কী?
শরীয়ত (আইন) হয়ে গেল ‘ধর্মীয় আইন’ দ্বীন নয়। আর আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মের আইন হতে পারে এটা ভাবতেই পারে না। ফলে প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার আইনের সাথে শরিয়ত হয়ে গেলো সাংঘর্ষিক এবং তাই ‘ঐচ্ছিক’ বা ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে পরিগণিত হয়ে গেলো। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে শরীয়ত হলো দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে পরিচালিত করে।
সিয়াসাহ (রাজনীতি) হয়ে গেল ‘ধর্মের অপব্যবহার’। এজন্যই সেক্যুলার রাজনীতির ধারক-বাহকরা ইসলামপন্থীদের বুঝতে না পেরে ধর্মীয় রাজনীতিকে ধর্মের অপব্যবহার সাব্যস্ত করে। যাকে পশ্চিমা মিডিয়ায় ‘ইসলামি মৌলবাদ’ (Islamic fundamentalism) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে রাজনীতি হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম, যা দ্বীনের অংশ।
আখলাক (নৈতিকতা) হয়ে গেল ‘ব্যক্তিগত মূল্যবোধ’—যার সঙ্গে রাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে আখলাক হলো দ্বীনের আত্মিক কেন্দ্র, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়কেই পরিচালিত করে।
আরকুন এই প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট চিন্তাকে ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ (rootless free thought) বলেছেন। যে চিন্তা ইসলামের আদি উৎস, কুরআনের ভাষাগত জটিলতা (বালাগাত), এবং সুফি-দার্শনিক ঐতিহ্যের (ইবনে আরাবি, মোল্লা সদরা) গভীরতা উপেক্ষা করে—শুধু পশ্চিমা যুক্তিবাদী মানদণ্ডে ইসলামকে বিচার করে (Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, p. 16)। মুসলিম চিন্তাবিদরা যখন আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হন, তখন তারা এই বিভাজনকে ‘স্বাভাবিক’ মনে করতে শুরু করেন। ফলে তারা নিজেদের ঐতিহ্যকে বুঝতে পারেন না বা বুঝলেও তা পশ্চিমা মানদণ্ডে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। আরকুন একে ‘আত্ম-উপনিবেশিকতা’ (self-colonization) বলেছেন। যা ইসলামের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং আজও মুসলিম চিন্তার সংকটের মূল কারণ (Arkoun, pp. 15-16)।
হাদিসে জিব্রাইল: দ্বীনের ত্রিমাত্রিক কাঠামো ও ‘অচিন্তিত’-এর প্রতিষেধক
এই ‘অচিন্তিত’-এর প্রতিষেধক হিসেবে আরকুন নিজেও পরোক্ষভাবে ইসলামের সেই মৌলিক শিক্ষার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। যদিও তিনি সেটা সরাসরি হাদিসের মাধ্যমে বলেননি। তবে সত্য হলো এর প্রতিষেধক নিহিত আছে হাদীসে জিব্রিলেই। যেখানে রাসূল (সা.) দ্বীনকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন—ইসলাম, ঈমান ও ইহসান—এবং শেষে বলেছেন, “ইনি জিব্রাইল, তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন” (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং ৮)।
পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ ধারণা যখন ইসলামকে দেখে, তারা দেখে শুধু বাহ্যিক আচার-আনুষ্ঠানিকতা। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত—এই কয়েকটি কাজকে তারা ‘ইসলাম’ বলে চিহ্নিত করে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ। কেন? কারণ ইসলামের ‘দ্বীন’-এর আরও দুটি স্তর রয়েছে, যা পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ ধারণায় একেবারেই অনুপস্থিত। আর এই অনুপস্থিতি থেকেই জন্ম নেয় আরকুনের ‘অচিন্তিত’ (unthought) টার্মটি। এই খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীতে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ কাঠামোটি তুলে ধরে হাদিসে জিব্রাইল।
‘উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বসে ছিলাম। তখন আমাদের কাছে এক ব্যক্তি এলেন, যার পোশাক ছিল অত্যন্ত সাদা এবং চুল ছিল কুচকুচে কালো। তার মধ্যে ভ্রমণের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না, আর আমাদের কেউ তাকে চিনতেও পারছিল না। তিনি রাসূল (সা.)-এর সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসে নিজের হাঁটু তাঁর হাঁটুর সাথে লাগিয়ে দু’হাত নিজের উরুর ওপর রাখলেন এবং বললেন:, ‘হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন।’
রাসূল (সা.) বললেন, ‘ইসলাম হলো—তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ (মা'বুদ) নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তুমি সালাত কায়েম করবে; যাকাত আদায় করবে; রমজানের রোজা রাখবে; এবং যদি সামর্থ্য থাকে, তবে বাইতুল্লাহর হজ করবে।’
লোকটি বলল, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ আমরা আশ্চর্য হলাম—সে নিজেই প্রশ্ন করছে, আবার নিজেই সত্যায়ন করছে!
এরপর লোকটি বলল, ‘আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন।’
রাসূল (সা.) বললেন, ‘ঈমান হলো—তুমি আল্লাহতে, তাঁর ফেরেশতাগণে, তাঁর কিতাবসমূহে, তাঁর রাসূলগণে, শেষ বিচারের দিনে এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস করবে।’
লোকটি বলল, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’
এরপর লোকটি বলল, ‘আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।’
রাসূল (সা.) বললেন, ‘ইহসান হলো—তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি তাকে দেখছ; আর যদি তুমি তাকে না দেখ, তবে (জানো যে) তিনি তোমাকে দেখছেন।’
লোকটি বলল, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’
এরপর লোকটি চলে গেলে রাসূল (সা.) বললেন,‘ইনি ছিলেন জিব্রাইল। তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।’ (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং ৮)।
এই হাদিসটি আরকুনের ‘অচিন্তিত’-এর সরাসরি প্রতিষেধক। কারণ এখানে রাসূল (সা.) স্বয়ং দ্বীনকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন—ইসলাম, ঈমান ও ইহসান—এবং শেষে তিনি স্পষ্ট বলে দিচ্ছেন, দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ রূপটি আসলে কী। তিনি বলেছেন, “ইনি জিব্রাইল, তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন” । অর্থাৎ, এই তিনটি একত্রেই দ্বীন; একটি বাদ দিলে দ্বীন অসম্পূর্ণ। এখন এই তিনটি স্তর কী বোঝায়, আর পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ ধারণা কী বুঝায়? পাশ্চাত্যের ধর্ম ধারণা কীভাব শুধু প্রথম স্তরেই আটকে থাকে, এবং কীভাবে এই তিন স্তরের সমন্বয় ‘অচিন্তিত’-কে দূর করে—তা ধাপে ধাপে দেখা যাক।
প্রথম স্তর: ইসলাম (বাহ্যিক আত্মসমর্পণ ও আইনি কাঠামো)
ইসলাম হলো দ্বীনের সবচেয়ে বাহ্যিক ও দৃশ্যমান স্তর। এটি হলো, তাওহীদের স্বীকৃতি দিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত সেইসব মৌলিক কাজ, আইনি ও আচারিক কাঠামো মেনে নেওয়া যাকে আমরা শরীয়ত বলি। যা একজন ব্যক্তিকে মুসলিম সমাজের সাথে যুক্ত করে। এটি চিহ্নিত করে—কে মুসলিম, কে নয়। এগুলো অস্বীকার কিংবা মানতে অস্বীকৃতি জানালে বুঝে যায়, কে মুমিন আর কে মুমিন নয়। রাসূল (সা.) ইসলামকে পাঁচটি স্তম্ভের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেছেন। (১) সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ (মা'বুদ) নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল (কালিমা), (২) সালাত কায়েম করা, (৩) যাকাত দেওয়া, (৪) রমজানের রোজা রাখা, (৫) সক্ষম হলে হজ করা।
কিন্তু শুধু এই স্তরটিই যথেষ্ট নয়। কারণ কেউ বাহ্যিকভাবে এসব কাজ করলেও তার অন্তরে বিশ্বাস (ঈমান) নাও থাকতে পারে। তাই কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে,
قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَٰكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا
“বেদুইনরা বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি।’ বলো, ‘তোমরা ঈমান আননি; বরং বলো, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৪)। অর্থাৎ, ইসলাম (বাহ্যিক আত্মসমর্পণ) এবং ঈমান (অন্তরের বিশ্বাস)—এ দু'টি ভিন্ন স্তর। কিন্তু দুটোই দ্বীনের অংশ। কোনো ব্যক্তি ইসলামের সকল বিধান বাহ্যিকভাবে পালন করতে পারে, কিন্তু তার অন্তরে বিশ্বাস নাও থাকতে পারে। যেমন, মক্কার মুনাফিকরা এই কাজগুলো করতো কিন্তু তাদের অন্তরে ঈমান ছিলো না। এই কারণেই ইসলাম ও ঈমান—এই দু'টি স্তর আলাদা এবং দু'টিই দ্বীনের পরিপূরক।
পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ ধারণা যখন ইসলামকে দেখে, তারা কেবল এই প্রথম স্তরটিকেই ‘ইসলাম’ বলে চিহ্নিত করে। তারা নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত—এই আচার-আনুষ্ঠানিকতাকেই ‘ধর্ম’ বলে। কিন্তু ঈমান ও ইহসান—এই দুটি স্তর পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’-এর কাঠামোতে একেবারেই অনুপস্থিত। এই কারণেই পাশ্চাত্য, ইসলামের আইন (শরীয়ত), রাজনীতি (সিয়াসাহ) ও অর্থনীতি (মুয়ামালাত)-কে ‘ঐচ্ছিক’ বা ‘বহিরাগত’ বলে মনে করে। কারণ তাদের সংজ্ঞায় ধর্ম হলো কেবল আচার-আনুষ্ঠানিকতা, আর বাকি সব হলো ‘পার্থিব’ বিষয় যা মানুষের যুক্তি ও সম্মতি নির্ধারণ করবে (Ernst, Following Muhammad, 2003, pp. 68-69)।
দ্বিতীয় স্তর: ঈমান (অন্তরের বিশ্বাস ও জ্ঞানগত ভিত্তি)
রাসূল (সা.) ঈমানকে ছয়টি বিষয়ের ওপর বিশ্বাসের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করেছেন। (১) আল্লাহতে বিশ্বাস, (২) তাঁর ফেরেশতাগণে বিশ্বাস, (৩) তাঁর কিতাবসমূহে বিশ্বাস, (৪) তাঁর রাসূলগণে বিশ্বাস, (৫) শেষ দিনে (আখিরাতে) বিশ্বাস এবং (৬) তাকদীরের ওপর বিশ্বাস। ঈমান হলো দ্বীনের "অভ্যন্তরীণ ও জ্ঞানগত স্তর"। এটি হলো আকীদা (থিওলজি)—যা একজন মুসলিমের বিশ্বাসের ভিত্তি। ইসলামের বাহ্যিক কাজগুলো (যা প্রথম স্তরে ছিল) তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেগুলো এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ায়। ঈমান হলো ভিতরের সেই সারবত্তা যা বাহ্যিক কাজকে আত্মিক অর্থ দেয়। যেমন, নামাজ পড়া শুধু একটি শারীরিক ক্রিয়া নয়; এটি আত্মিক প্রশান্তিরও বিষয়। তবে এটি আত্মিক প্রশান্তি তখনই আনে, যখন নামাজের মধ্য দিয়ে মুসলিম আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করে। আর এই অনুভূতি আসে ঈমান থেকে।
ঈমান হলো ‘অন্তরের বিষয়’—এটি সরাসরি দেখা যায় না। কেবল বাহ্যিক আচরণ ও কর্মের মাধ্যমে অনুমান করা যায়। কিন্তু ঈমান ও ইসলাম—এই দুটি পরস্পর-নির্ভরশীল। ইসলাম হলো ‘আমল’ (কর্ম), আর ঈমান হলো ‘আকীদা’ (বিশ্বাস)। একজন ব্যক্তি ইসলামের বাহ্যিক বিধান পালন করতে পারে, কিন্তু ঈমান না থাকলে তার আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। আবার, শুধু ঈমান থাকলেও ইসলামের বাহ্যিক বিধান পালন না করলে তা অসম্পূর্ণ। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَذَٰلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
“আর তাদেরকে এ ছাড়া কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে একনিষ্ঠভাবে, তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ থাকবে, সালাত কায়েম করবে ও যাকাত দেবে; আর এটাই হলো সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন” (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮:৫)। এখানে ‘দ্বীন’-এর মধ্যে ইবাদত, সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ থাকা, সালাত ও যাকাত তথা শারিরীক ও অর্থনৈতিক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল বিষয় একীভূত। আয়াতে ঈমান (একনিষ্ঠতা) ও ইসলাম (সমস্ত শরিয়ত)—এই দুটি একসাথে দ্বীন গঠন করে।
পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ যেখানে মূলত ‘বিশ্বাস’ (belief)-কে কেন্দ্র করে, সেখানে ঈমানের এই জ্ঞানগত ও আত্মিক দিকটি রয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্য, ঈমানের ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রা’-কে উপেক্ষা করে। কারণ পাশ্চাত্যের ‘বিশ্বাস’ হলো ব্যক্তিগত; কিন্তু ইসলামি ঈমান ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের সাথে যুক্ত। ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের মধ্যে আছে ‘রাসূলগণে বিশ্বাস’—যার অর্থ রাসূল (সা.)-এর প্রদত্ত আইন (শরীয়ত) ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি (সিয়াসাহ)-ও মেনে চলা। কিন্তু পাশ্চাত্য এই অংশটিকে ‘ধর্মের বাইরে’ ফেলে দেয়।
তৃতীয় স্তর: ইহসান (আধ্যাত্মিক চেতনা ও নৈতিক পরিপূর্ণতা)
রাসূল (সা.) ইহসানকে সংজ্ঞায়িত করলেন, “তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি তাকে দেখছ; আর যদি তুমি তাকে না দেখ, তবে (জানো যে) তিনি তোমাকে দেখছেন।” ইহসান হলো, দ্বীনের "সবচেয়ে অন্তরঙ্গ ও আধ্যাত্মিক স্তর"। এটি ইসলাম ও ঈমানের পরিপূর্ণতা ও চূড়ান্ত পর্যায়। এটি হলো, আখলাক (নৈতিকতা) ও তাসাউফের (আধ্যাত্মিকতা) মূল। যেখানে ইসলাম হলো বাহ্যিক কাজ, ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস, সেখানে ইহসান হলো, "আল্লাহর সান্নিধ্যে নিজেকে অনুভব করা"। এমন একটি অবস্থা যেখানে মুসলিম শুধু আইন মানে না বা শুধু বিশ্বাস রাখে না; বরং সে "প্রতিটি কাজে আল্লাহর উপস্থিতি" অনুভব করে এবং সেই অনুভূতি থেকেই তার কাজে নৈতিকতা ও সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
ইহসানের এই অবস্থায় একজন মুসলিমের জন্য ‘আমল’ (কর্ম), ‘আকীদা’ (বিশ্বাস) ও ‘আখলাক’ (নৈতিকতা)—তিনটি একীভূত হয়ে যায়। এটি কোনো অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং ইসলাম ও ঈমানের পরিপূর্ণতা। যেমন, সালাত পড়ার সময় ইহসানের অর্থ হলো—শুধু শারীরিক ক্রিয়া শেষ করা নয়, বরং সালাতের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করা। তাঁর সামনে নিজেকে উপস্থিত অনুভব করা। আর এই অবস্থাই একজন মুসলিমকে পূর্ণাঙ্গ ‘মুমিন’-এ পরিণত করে।
পাশ্চাত্যের 'ধর্মে' ইহসানের কোনো স্থান নেই। কারণ ইহসান হলো এমন একটি অবস্থা যা ব্যক্তির আত্মিক চেতনাকে ইসলামের প্রতিটি কাজে তথা সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সাথে যুক্ত করে। পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ যেখানে ব্যক্তির অন্তরের বিষয়, ব্যক্তিগত আচার, সেখানে ইহসান হলো ‘খোদার উপস্থিতি’ অনুভবের সাথে জীবনযাপন। যার অর্থ হলো, সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি—সবকিছুই আল্লাহর সামনে পরিচালিত হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ কাঠামোতে একেবারেই অনুপস্থিত
তিন স্তরের সমন্বয়: পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ও ‘অচিন্তিত’-এর পরাভব
হাদিসের শেষে রাসূল (সা.) যখন বললেন, “ইনি জিব্রাইল, তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন” , তখন তিনি বোঝালেন, ইসলাম, ঈমান ও ইহসান—এই তিনটি একত্রে দ্বীন। একটি বাদ দিলে দ্বীন খণ্ডিত হয়ে যায়। এই তিন স্তরের সমন্বয়ই ইসলামকে ‘দ্বীন’—একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। কেবল ধর্ম যা কিছু ইবাদতের নাম, দ্বীন নয়। পুরোটা মিলেই দ্বীন হয়। দ্বীনে কায়্যিম বা সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন।
আরকুন যেমন দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ ধারণা যখন ইসলামকে শুধু প্রথম স্তরে (ইসলামের আচারে) সীমাবদ্ধ করে, তখন দ্বীনের দ্বিতীয় (ঈমান) ও তৃতীয় (ইহসান) স্তরগুলো ‘অচিন্তিত’ থেকে যায়। কিন্তু হাদীসে জিব্রিল স্পষ্ট করে বলে দেয়, ইসলাম, ঈমান ও ইহসান এই তিনটি একত্রে দ্বীন হয়। অর্থাৎ, ইসলামের আইন (শরীয়ত), বিশ্বাস (আকীদা) ও নৈতিকতা (ইহসান-আখলাক)—এই তিনটি পরস্পর-নির্ভর ও অবিচ্ছেদ্য। একে আলাদা করলে যেমন দ্বীন অসম্পূর্ণ হয়, তেমনি আরকুনের ‘অচিন্তিত’-ও তখনই দূর হয়, যখন আমরা এই তিন স্তরকে একসাথে দেখি।
পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ যখন ইসলামের আইন, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে ‘ঐচ্ছিক’ বলে মনে করে, তখন তারা আসলে ইহসানের সেই চেতনাকে উপেক্ষা করে—যেখানে আল্লাহর সামনে প্রতিটি কাজ করার অর্থ হলো, সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতিও আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এই কারণেই পাশ্চাত্য ইসলামের ‘দ্বীন’-কে বুঝতে পারে না; তারা ইসলামকে একটি খণ্ডিত ‘ধর্ম’ হিসেবে দেখে, যা দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ কাঠামোকে অস্বীকার করে। আর এই অস্বীকারই আরকুনের ‘অচিন্তিত’-এর মূল কারণ (Ernst, 2003, pp. 68-69)।
কিন্তু গ্রোটিয়াসের সেই ‘শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা’, লেনের ‘আল-ইসলাম’-এর সাবধানী উচ্চারণ এবং আরকুনের ‘অচিন্তিত’-এর ধারণা—এই তিনটি সূত্র মিলিয়ে আমরা দেখতে পাই, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে ক্যাটাগরিকরণের এই প্রক্রিয়াটি আসলে একটি ‘অস্তিত্বগত উপড়ে ফেলার’ (existential displacement) ঘটনা। এর ভয়াবহ পরিণতি হলো,
এক. ইসলাম তার আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐক্য হারায়। ইসলামি চিন্তা যখন ‘ধর্ম’ ও ‘রাষ্ট্র’-কে পৃথক করার পশ্চিমা মডেলের মুখোমুখি হয়, তখন সে নিজেদের ঐতিহ্যের সেই গভীর স্তরগুলোর সাথে অপরিচিত থাকে যা এই পৃথকীকরণকে অগ্রাহ্য করে। ফলে ইসলামি আইন, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বা ‘পুরোনো’ বলে ফেলে দেওয়া হয় (Arkoun, p. 205)। যা বাস্তবেই আমাদের দেমাগে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে। আমরা সত্যি সত্যি "ইবাদাতে মাকসূদাহ" বা মূখ্য ইবাদাত বলে ইসলামের নিত্যনৈমিত্তিক আচারগুলোকে আকড়ে ধরে, বাকি বিষয়গুলোকে "ইবাদাতে গায়র মাকসূদাহ" বা গৌণ ইবাদত সাব্যস্ত করে পিছনে ফেলে রেখেছি। এমন প্রান্তিকতা তাই ডেকে এনেছে আরেক প্রান্তিকতা; রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই দ্বীন সাব্যস্ত করার প্রবণতা। উভয়টিই খণ্ডিত চিন্তা ও আচরণ। বস্তুত এগুলোকে গায়র মাকসূদাহ সাব্যস্ত করা থেকেই উলামা ও বুদ্ধিজীবী মহলে নেমে আসে চরম স্থবিরতা, মানসিক দাসত্ব এবং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন সমস্যার সমাধানে ‘ইজতিহাদ’ বা স্বাধীন গবেষণার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে বসে থাকার প্রবণতা। যেমনটি ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি আল্লামা ইকবাল বলেছেন। তিনি মনে করতেন, ইসলামের মৌলিক ও শাশ্বত মূলনীতিগুলো অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে এর আইনি ব্যবস্থার গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। নিজস্ব মৌলিক আইনি কাঠামো নির্মাণ অপরিহার্য। হয়তো ভাবা হয়, জবাব শুধু ইবাদাতে মাকসূদার ক্ষেত্রেই নেওয়া হবে। যদিও বিষয় এমন নয়। গায়র মাকসূদাহ বলে আমরা এতটাই গুরত্বহীন করে দিয়েছি দ্বীনের দুই তৃতীয়াংশ যে, ওজুর সমান গুরুত্বও এগুলোর ভাগ্যে জুটেনি। ওজুও ইবাদাতে গায়র মাকসূদাহ। কিন্তু তাহারাত বা পবিত্রতা অধ্যায় যেভাবে এখনো গুরুত্ব পায়, এটি নিয়ে কাজ করা হয়, দ্বীনের বাকি দুই তৃতীয়াংশ ততটাই গুরুত্বহীন হয়ে আছে। ইবাদাতে মাকসূদাহ হিসেবে শুধু নামাজের হিসেব নেওয়া হবে নাকি? আর পবিত্রতার নেওয়া হবে না? প্রস্রাব থেকে পাকসাফ না থাকায় কবরে শাস্তির হাদীসটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। তাই ইবাদাতে গায়র মাকসূদাহ বলে যেরকম ফেলে রাখা হয়েছে এগুলোকে পাঠ ও মাঠ থেকে সাইডপার্টে, সেটা চূড়ান্ত লেভেলে "দ্বীন" বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।
দুই. "শিকড়হীন মুক্তচিন্তা" মুসলিম সমাজকে একটি ‘দ্বৈত পরিচয়ে’ (dual identity) ফেলে দেয়। যেখানে একজন মুসলিম মসজিদে গিয়ে ‘ঈমান’-এর কথা বলে, কিন্তু অফিস বা আদালতে গিয়ে সেক্যুলার আইন ও পশ্চিমা মূল্যবোধ মেনে চলে। এই দ্বৈততা এক ধরনের ‘মানসিক বিভক্তি’ (cognitive dissonance) তৈরি করে। যা আজকের মুসলিম সমাজের নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ (Arkoun, p. 205)।
তিন. বর্তমানে ‘মানবাধিকার ধর্ম’ (Civil Religion) খ্রিস্টীয় নৈতিকতার জায়গা দখল করতে চাইছে। যা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত কাঠামোকেই আরও সুসংহত করছে এবং ইসলামকে তার পূর্ণাঙ্গ ‘দ্বীন’ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
সারকথা হলো, হাদীসে জিব্রিল আরকুনের ‘অচিন্তিত’-এর প্রতিষেধক। কারণ এটি প্রমাণ করে, ইসলামকে শুধু ‘ধর্ম’ (অর্থাৎ শুধু ইসলামের প্রথম স্তর) বানালে তার ঐতিহাসিক, আত্মিক ও সামাজিক মাত্রাগুলো উপেক্ষিত হয়, যা আরকুন ‘অচিন্তিত’ বলেছেন। কিন্তু যখন আমরা ইসলাম, ঈমান ও ইহসান—এই তিন স্তরকে একসাথে দেখি, তখনই ইসলাম তার পূর্ণাঙ্গ ‘দ্বীন’-রূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং পাশ্চাত্যের খণ্ডিত ‘ধর্ম’-এর সংকট থেকে মুসলিম সমাজ বেরিয়ে আসতে পারে। এই তিন স্তরের সমন্বয়ই ইসলামের ‘পূর্ণাঙ্গ দ্বীন’-এর মূল ভিত্তি, যা ইহুদি ধর্মের আইন ও খ্রিস্টধর্মের নৈতিকতার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে আব্রাহামিক দ্বীনের চূড়ান্ত রূপ। যার পরে আর নবী নাই, নবীর দরকারও নাই।
‘অচিন্তিত’-এর বাস্তব পরিণতি: শিক্ষা, রাজনীতি ও আত্ম-উপনিবেশিকতা
পাশ্চাত্যের খণ্ডিত ‘ধর্ম’ ক্যাটাগরিতে ইসলামকে ফেলে দেওয়ার ফলে শুধু তত্ত্বেই সংকট তৈরি হয়নি; তার বাস্তব প্রভাব পড়েছে মুসলিম সমাজের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে—শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক চিন্তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে। আরকুন এই তিন স্তরকেই ‘অচিন্তিত’-এর ফল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, Introduction, pp. 9-11)।
১. শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট: ‘দ্বৈত মন’ (Dual Mind) ও ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা’।
যখন কেউ স্কুলে পড়ে, তখন কী শেখে? ভূগোল, ইতিহাস, গণিত, বিজ্ঞান ইত্যাদি। এসব বিষয়ের কোনো উৎস কি কুরআন বা হাদিস থেকে দেখানো হয়? অবশ্যই না। এগুলো দেখা হয় এসেছে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে। যা মূলত ধর্মনিরপেক্ষ (secular) ও যুক্তিবাদী (rational)। অন্যদিকে, মসজিদে বা মাদ্রাসায় পড়ানো হয় ধর্মীয় শিক্ষা—তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ ইত্যাদি। এই দুই শিক্ষার মধ্যে কোনো সেতুবন্ধন নেই। একজন মুসলিম ছাত্র সকালে স্কুলে গিয়ে পড়ে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব, আর বিকেলে মসজিদে গিয়ে শোনে—আল্লাহ মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। এই দুই শিক্ষার মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য আনবে? আরকুন এই অবস্থাকে ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা’ (epistemic violence) বলেছেন (Arkoun, p. 205)।
এই সহিংসতার ফলে তৈরি হয় ‘দ্বৈত মন’ (dual mind)। একটি মন যা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরে রাখে, আরেকটি মন যা বাস্তব জগৎ পরিচালনা করে। আরকুনের ভাষায়, “যখন ইসলামকে ‘ধর্ম’ বানানো হলো, তখন তার মহাজাগতিক, ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সামাজিক মাত্রাগুলোকে উপেক্ষা করা শুরু হলো” (Arkoun, Introduction, p. 10)। এর মানে হলো—শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামের ঐতিহাসিক মাত্রা (ইতিহাস), ভাষাগত মাত্রা (আরবি সাহিত্য) ও সামাজিক মাত্রা (অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান) -কে বাদ দেওয়া হলো। ইসলামি শিক্ষায় শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শুধু ফিকহ (আইন) ও কালাম (থিওলজি) রইল। আর বাকি পুরা দুনিয়া পশ্চিমা সেক্যুলার জ্ঞান দিয়ে পূরণ করা হলো।
এর ফল কী? একজন মুসলিম ছাত্র যখন ইতিহাস পড়ে, সে পশ্চিমা ইতিহাসের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ শেখে—গ্রিস, রোম, রেনেসাঁ, এনলাইটেনমেন্ট—যেখানে ইসলামি সভ্যতার অবদানকে ‘অন্ধকার যুগ’-এর একটি ছোট্ট অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সে কখনো শেখে না, কীভাবে ইসলামি সভ্যতা বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত—এই সব ক্ষেত্রে পশ্চিমাকে পথ দেখিয়েছে (Ernst, Following Muhammad, 2003, pp. 152-156)। যখন সে এটা জানে না, তখন ধীরে ধীরে তার মনে তৈরি হয়, "হায়, আমাদের ঐতিহ্যে তো কিছু নেই, সব তো পশ্চিমাদের।" আর এই মনোভাবই আরকুনের ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ (rootless free thought)-এর ভিত্তি তৈরি করে (Arkoun, p. 16)।
আরেকটি দিক হলো—ধর্ম ও বিজ্ঞানকে আলাদা করে ফেলায় ইসলামি বিজ্ঞান বলতে যা বোঝানো হয়, তা হয় মরিস বুকাইলি-স্টাইলের অ্যাপোলজেটিক। এর অর্থ হলো—যখন ধর্ম ও বিজ্ঞানকে আলাদা করে ফেলা হয়, তখন ইসলামি বিজ্ঞান বলতে যা বোঝানো হয়, তা মূলত মরিস বুকাইলি (Maurice Bucaille)-এর মতো একটি নির্দিষ্ট ‘আত্মপক্ষসমর্থনমূলক’ (apologetic) পদ্ধতিতে পরিণত হয়।
মরিস বুকাইলি (১৯২০-১৯৯৮ খ্রি.) ছিলেন একজন ফরাসি চিকিৎসক (সার্জন)। ১৯৭৬ সালে তিনি The Bible, The Qur’an and Science’ (বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান) নামে একটি বই প্রকাশ করেন। বইটি মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়।
বুকাইলির মূল পদ্ধতি ছিল কুরআনের কিছু আয়াতকে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে তুলনা করা। তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, কুরআনে এমন কিছু তথ্য রয়েছে যা ৭ম শতাব্দীতে কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান সেগুলো আবিষ্কার করেছে। যেমন—ভ্রূণবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য তিনি বিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে কুরআনের ‘ঐশ্বরিক’ উৎস প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।
তিনি বাইবেলের সমালোচনা করেছেন এবং সৃষ্টিবাদকে (creationism) সমর্থন করেছেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল—প্রমাণ করা যে, ইসলাম প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ (harmony) এবং কুরআনই একমাত্র নির্ভুল ধর্মগ্রন্থ। কুরআন নির্ভুল গ্রন্থ ধ্রুব সত্য। কিন্তু তাঁর এই পদ্ধতির কিছু সমস্যা আছে।
তার এই পদ্ধতিকে ‘অ্যাপোলজেটিক’ (Apologetic) বলা হয়। ‘অ্যাপোলজেটিক’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘অ্যাপোলজিয়া’ (apologia) থেকে, যার অর্থ ‘আত্মপক্ষসমর্থন’ বা ‘প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্য’। ধর্মতত্ত্বে ‘অ্যাপোলজেটিক্স’ বলতে বোঝায়, কোনো ধর্ম বা বিশ্বাসকে যুক্তি, প্রমাণ বা বিজ্ঞানের সাহায্যে রক্ষা করা ও তার সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা।
বুকাইলির পদ্ধতিকে ‘অ্যাপোলজেটিক’ বলা হয়, কারণ তিনি বিজ্ঞানকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন কুরআনের সত্যতা প্রমাণের জন্য। তিনি কুরআনকে বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে যাচাই করেছেন এবং দেখাতে চেয়েছেন যে কুরআন বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরি মেলে। যাতে sceptic বা সন্দেহবাদীদের কাছে ইসলামকে ‘যৌক্তিক’ ও ‘বৈজ্ঞানিক’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
এটি মূলত একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক’ (defensive) ও ‘প্রমাণবাদী’ (evidentialist) পদ্ধতি। যেখানে বিজ্ঞানকে চূড়ান্ত সত্যের মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয় এবং কুরআনকে সেই মানদণ্ডে ফিট করানোর চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু এই পদ্ধতির কিছু সমস্যা আছে:-
এক. বিজ্ঞানকে চূড়ান্ত মানদণ্ড করা: এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানকে এমন একটি চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরা হয়, যা কখনো পরিবর্তিত হয় না। অথচ বিজ্ঞান নিজেই ক্রমবিকাশশীল। আজকের ‘সত্য’ আগামীকাল ভুল প্রমাণিত হতে পারে। কুরআনকে যদি কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাথে বাঁধা দেওয়া হয়, তবে সেই তত্ত্ব বদলে গেলে কুরআনের ‘প্রমাণ’ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
দুই. কুরআনের মূল উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা: কুরআন মূলত একটি ‘হিদায়াতের’ (guidance) গ্রন্থ, বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক নয়। বুকাইলি-স্টাইল কুরআনের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক বার্তাকে গৌণ করে ফেলে এবং শুধু ‘বিজ্ঞানসম্মত’ দিকগুলোকে সামনে আনে।
তিন. নির্বাচনী পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে কুরআনের এমন আয়াতগুলোকে তুলে ধরা হয় যা বিজ্ঞানের সাথে মেলে, আর যে আয়াতগুলো মেলে না বা বোঝা যায় না, সেগুলোকে উপেক্ষা করা হয় বা ‘রূপক’ বলে চালানো হয়। এটি একটি ‘পক্ষপাতমূলক’ (selective) পদ্ধতি।
চার. বৈজ্ঞানিক তাফসিরের সরলীকরণ: বুকাইলি-স্টাইল কুরআনের ‘বৈজ্ঞানিক তাফসির’-কে একটি জনপ্রিয় ধারায় পরিণত করলেও, এটি প্রাচীন মুসলিম পণ্ডিতদের (যেমন ইবনে সিনা, আল-বিরুনি) গভীর দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে উপেক্ষা করে। যেখানে যুক্তি ও প্রত্যাদেশকে একীভূত করার ‘উদীয়মান যুক্তি’ (emerging reason)-এর পথ ছিল—যা আজ শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে (Ernst, p. 156)।
ফলে যখন ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্ম ও বিজ্ঞানকে আলাদা করে ফেলা হয় (মাদ্রাসায় ধর্ম, স্কুলে সেক্যুলার বিজ্ঞান), তখন ইসলামি বিজ্ঞান হয়ে ওঠে বুকাইলির মতো ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ (reactive) ও ‘প্রতিরক্ষামূলক’ একটি প্রচেষ্টা। যেখানে শুধু কুরআনের আয়াতগুলোকে বিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে দেখানো হয়, কিন্তু বিজ্ঞান চর্চার প্রকৃত পদ্ধতি বা ইসলামি দর্শনের সাথে তার কোনো গভীর সম্পর্ক থাকে না। এটি ইসলামি সভ্যতার সেই গৌরবময় বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনে না, বরং পশ্চিমা বিজ্ঞানের সামনে ইসলামকে ‘সাবমিসিভ’ (submissive) ও ‘অ্যাপোলজেটিক’ করে তোলে। ফলে মুসলিম শিক্ষার্থী বিজ্ঞান চর্চা করেও তার ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ খুঁজে পায় না। বিজ্ঞান হয়ে ওঠে একটি বিচ্ছিন্ন, প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়, যা ইসলামি চেতনা ও দর্শনের সাথে কোনো সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে না।
২. রাজনৈতিক চিন্তায় সংকট: ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বনাম ‘সেকুলার রাষ্ট্র’-এর দ্বন্দ্ব
পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ ক্যাটাগরি যখন ইসলামকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করল, তখন মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তায় একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হলো, ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ কি সম্ভব? আর ‘সেকুলার রাষ্ট্র’ কি ইসলামি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য?
আরকুন দেখিয়েছেন, যখন পাশ্চাত্যের খণ্ডিত চশমা দিয়ে ইসলামকে দেখা হয়, তখন ইসলামের শরীয়ত (আইন) ও সিয়াসাহ (রাজনীতি)—এগুলোকে ‘ধর্মের বাড়াবাড়ি’ বলে মনে হয় (Arkoun, p. 205)। অথচ ইসলামি ‘দ্বীন’-এর দৃষ্টিতে রাজনীতি হলো শরীয়তের বাস্তবায়ন। কিন্তু পাশ্চাত্যের সংজ্ঞায় ধর্মের কাজ হলো আত্মার মুক্তি, আর রাজনীতির কাজ হলো ক্ষমতার বণ্টন—এই দুইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
এর ফল হলো, মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তা দুটি খুঁটির মাঝখানে দোদুল্যমান। একদিকে আছে ইসলামপন্থীরা, যারা বলে, ‘ইসলামই হলো রাষ্ট্র, রাজনীতি ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়’। অন্যদিকে আছে সেকুলার মুসলিমরা। যারা বলে, ‘ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়, রাজনীতি পৃথিবীর কাজ’। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের ভেতরে কখনো প্রশ্ন উঠে না ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ মানে কী? পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’ ছকে তা হয় খিলাফতের নস্টালজিয়া, আর সেকুলার পক্ষে তা হয় ‘অতীতের অন্ধকার যুগ’। উভয় পক্ষই ইসলামের ঐতিহাসিক বাস্তবতা, যেখানে খিলাফত ছিল নিরন্তর সংগ্রামের ফল—সেটি উপেক্ষা করে (Ernst, pp. 131-132)।
এই দ্বন্দ্বের শেকড় হলো, মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা যখন ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণা তৈরি করতে চান, তখন তারা পাশ্চাত্যের ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটিকেই ব্যবহার করেন। অথচ ইসলামি ঐতিহ্যে ‘দ্বীন’ ও ‘দাওলা’ (রাষ্ট্র) ছিল একটি অখণ্ড সত্তা, যা পাশ্চাত্যের ‘চার্চ অ্যান্ড স্টেট’-এর মতো আলাদা ছিল না। আরকুনের ভাষায়, এই বিভাজনই ‘অচিন্তিত’-এর জন্ম দেয়। যেখানে ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাস, তার বহুত্ব (যেমন বিভিন্ন খিলাফত, সালতানাত, আমিরাত) এবং স্থানীয় প্রথার সাথে তার মিশ্রণ—সবকিছু উপেক্ষিত হয় (Arkoun, pp. 15-16)।
৩. ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ ও ‘আত্ম-উপনিবেশিকতা’ (Self-Colonization)
আরকুন সবচেয়ে বেশি বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তা হলো, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে নিজেদের ঐতিহ্যকে ‘অচিন্তিত’ করে ফেলে। তিনি একে ‘আত্ম-উপনিবেশিকতা’ (self-colonization) বলেছেন (Arkoun, p. 16)।
এর মানে হলো, যখন একজন মুসলিম বুদ্ধিজীবী পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে পশ্চিমা দর্শন, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান শেখে, তখন সে পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী মানদণ্ডকেই ‘সার্বজনীন’ মনে করতে শুরু করে। সে যখন ইসলামি ঐতিহ্যকে বিশ্লেষণ করে, তখন সে পশ্চিমা ‘ধর্ম’ ক্যাটাগরিটি ব্যবহার করে। যা ইসলামের জন্য প্রযোজ্য নয়। আর তখনই সে ইসলামের সেই সব দিক—যা পাশ্চাত্যের ‘ধর্ম’-এর সাথে খাপ খায় না (যেমন শরীয়ত, সিয়াসাত, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ইত্যাদি)—সেগুলোকে ‘প্রাচীন’, ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বা ‘অযৌক্তিক’ বলে ফেলে দেয়।
এই উপেক্ষাই ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ তৈরি করে। যে চিন্তা ইসলামের ইতিহাস, তার ভাষাগত সৌন্দর্য (বালাগাত), এবং সুফি-দার্শনিক ঐতিহ্যের গভীরতা (ইবনে আরাবি, মোল্লা সদরা) উপেক্ষা করে শুধু যুক্তিবাদী বিচার করে। ফলে মুসলিম বুদ্ধিজীবী নিজের ঐতিহ্যকে এবং দ্বীনকে ‘বস্তু’ (object) বানিয়ে ফেলে—ঠিক যেমন পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবাদীরা করেছিল (Ernst, p. 216, n. 7)।
আরকুনের মতে, এই ‘আত্ম-উপনিবেশিকতা’ই ইসলামি চিন্তার প্রধান বাধা। কারণ যখন মুসলিম বুদ্ধিজীবী নিজেই নিজের ঐতিহ্যকে ‘অচিন্তিত’ করে ফেলে, তখন তার জন্য ঐতিহ্য থেকে নতুন কিছু শেখার কোনো সুযোগ থাকে না। সে শুধু পাশ্চাত্যকেই অনুসরণ করে, আর নিজের ঐতিহ্যকে ‘অতীত’-এ ফেলে রাখে (Arkoun, p. 16)।
আরকুনের ‘উদীয়মান যুক্তি’ (Emerging Reason): ‘অচিন্তিত’ থেকে বেরিয়ে আসার পথ
আরকুন কিন্তু শুধু সংকট দেখাননি; তিনি একটি পথও দেখিয়েছেন। ‘উদীয়মান যুক্তি’ (emerging reason)। এটি পাশ্চাত্যের খণ্ডিত যুক্তি ও ইসলামের ঐতিহ্যগত কর্তৃত্ববাদী যুক্তি—এই উভয়ের বাইরে গিয়ে ইসলামের ‘দ্বীন’-কে তার পূর্ণাঙ্গ কাঠামোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।
এই ‘উদীয়মান যুক্তি’-র তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
এক.ঐতিহাসিকতা (Historicity)। আরকুন বলেন, ইসলামি চিন্তাকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। কুরআন ও হাদীসকে তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন না করে, বরং ঐতিহাসিকভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। কিন্তু এই ঐতিহাসিকতা পাশ্চাত্যের ‘ধর্মীয় ইতিহাস’-এর মতো নয়, যা ধর্মকে একটি ‘বস্তু’ বানিয়ে ফেলে; বরং এটি ইসলামের আত্মিক ও সামাজিক মাত্রা একসাথে দেখে (Arkoun, p. 205)।
দুই. বহুত্ববাদ (Pluralism)। আরকুন মনে করেন, ইসলামি চিন্তায় একক কর্তৃত্ব (monopoly of authority) থাকা উচিত নয়। পাশ্চাত্যের খণ্ডিত ‘ধর্ম’ যেখানে একটি একক ‘সত্য’-কে প্রতিষ্ঠা করে, আরকুনের ‘উদীয়মান যুক্তি’ বহুত্বকে স্বীকার করে। তিনি বলেন, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যাখ্যা (তাফসির), বিভিন্ন আইনি মতামত (ফিকহি মাযহাব) এবং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক পথ (তাসাউফ)—এই বৈচিত্র্যই ইসলামের শক্তি (Arkoun, Introduction, pp. 15-16)।
তিন. সমালোচনামূলক চেতনা (Critical Consciousness)। আরকুনের মতে, ইসলামি চিন্তাকে পাশ্চাত্যের মতো সমালোচনামূলক হতে হবে, কিন্তু পাশ্চাত্যের মতো ‘বস্তুকরণ’ নয়। অর্থাৎ, ইসলামের ঐতিহ্যকে সমালোচনার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, কিন্তু তাকে ‘অচিন্তিত’ করে ফেলা যাবে না। যেভাবে আছে সেভাবেই এগুলো চূড়ান্ত ভাবা যাবে না। এই সমালোচনামূলক চেতনা ইসলামের ‘দ্বীন’-কে তার পূর্ণাঙ্গ কাঠামোতে ফিরিয়ে আনতে পারে। যেখানে আইন, রাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিকতা—সবকিছু একীভূত হবে (Arkoun, p. 205)।
খিলাফত বিলুপ্তি ও ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর ধারণার উৎপত্তি
‘অচিন্তিত’-এর সংকটের চূড়ান্ত রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটে ১৯২৪ সালে, যখন উসমানি খিলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়। এই ঘটনা মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয় এবং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর আধুনিক ধারণার জন্ম দেয়। পাশ্চাত্য যখন ইসলামকে ‘ধর্মে’ সীমাবদ্ধ করল, তখন তার রাজনৈতিক মাত্রাটি ‘বহিরাগত’ ও ‘ঐচ্ছিক’ বলে বিবেচিত হলো। কেননা, খ্রিস্টীয়-সেকুলার ঐতিহ্যে ‘ধর্ম’ ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচার-আনুষ্ঠানিকতার বিষয়, আর রাজনীতি, আইন ও অর্থনীতি ছিল ‘পার্থিব’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ক্ষেত্র (Ernst, Following Muhammad, 2003, pp. 68-69)। ইসলামকে যখন এই খণ্ডিত কাঠামোতে ফেলা হলো, তখন তার পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ধারণা, যেখানে আকীদা, শরীয়ত ও আখলাক একীভূত—ভেঙে পড়ল। আর এর চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিণতি হলো খিলাফত বিলুপ্তি। যা ছিল দ্বীন ও দাওলার (রাষ্ট্র) মধ্যে ঐতিহাসিক সেতু।
খিলাফত ছিল সেই বাঁধন যা ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মাত্রাকে একসাথে আবদ্ধ রাখত। নবী (সা.)-এর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকারী হতেন, ‘আমিরুল মুমিনিন’ (বিশ্বাসীদের নেতা)। যার কর্তৃত্ব ছিল শরীয়তের বাস্তবায়ন ও উম্মা'র শাসন। পাশ্চাত্যের খণ্ডিত ‘ধর্ম’-ছকে এই সেতুটি ছিল ‘বহিরাগত’ ও ‘ঐচ্ছিক’। কিন্তু ইসলামি ঐতিহ্যে খিলাফত ছিল উম্মা'র আত্মিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক। এর বিলুপ্তি মানে হলো, পাশ্চাত্য এখন ইসলামের ওপর থেকে রাজনৈতিক আবরণটিও তুলে নিতে চায়, যেন ইসলাম সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশ্বাসে পরিণত হয় (Ernst, 2003, p. 132)।
খিলাফতের ধারণা কিন্তু একদিনে বিলুপ্ত হয়নি। এর একটি দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস রয়েছে। ১২৫৮ সালে বাগদাদের পতন ঘটলো। মোঙ্গল আক্রমণে আব্বাসি খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ ধ্বংস হয় এবং খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহকে হত্যা করা হয়। এটি খিলাফতের জন্য এক নির্মম ঘটনা। কারণ এর আগে খিলাফত ছিল ইসলামি বিশ্বের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব। কিন্তু বাগদাদ পতনের পরও খিলাফতের ধারণা বেঁচে ছিল। মামলুক সুলতানরা মিশরে একটি প্রতীকী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে উসমানি সুলতানরা ‘খলিফা’ উপাধি ধারণ করতে থাকেন।
উসমানি সাম্রাজ্য (১২৯৯-১৯২৩ খ্রি.) ধীরে ধীরে খিলাফতের প্রতীকী কর্তৃত্ব দাবি করতে শুরু করে। ১৭৭৪ সালে রাশিয়ার সাথে একটি সন্ধিতে উসমানিরা প্রথমবারের মতো ‘খলিফা’ উপাধিটি ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবি হিসেবে ব্যবহার করে। তবে এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক কৌশল, রাশিয়ার ভূখণ্ডের মুসলিমদের ওপর কর্তৃত্ব দাবি করার জন্য (Ernst, 2003, pp. 131-132)। সুলতান আব্দুল হামিদ দ্বিতীয় (১৮৭৬-১৯০৯ খ্রি.) এই উপাধিটিকে প্যান-ইসলামিক একটি অস্ত্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে মুসলিম জনমতকে একত্রিত করার জন্য। কিন্তু এই কৌশল ব্যর্থ হয়, কারণ আধুনিক জাতীয়তাবাদ (nationalism) তখনই মুসলিম বিশ্বে দানা বেঁধে উঠছিল। আরব, তুর্কি, পারস্য—সবাই আলাদা জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে শুরু করেছিল। খিলাফতের এই বিবর্তন এবং একটি কার্যকরী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতীকী কর্তৃত্বে পরিণত হওয়া, ইসলামি রাজনীতির ‘অচিন্তিত’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কেননা, খিলাফতের প্রকৃত প্রকৃতি ও তার ঐতিহাসিক বহুত্বকে উপেক্ষা করে পরবর্তীতে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর একটি আদর্শায়িত মডেল তৈরি করা হয়, যা বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক।
১৯২৪ সালে খিলাফতের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর তুরস্কের জাতীয় পরিষদ ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ উসমানি খিলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে। মুস্তফা কামাল পাশা এই সিদ্ধান্ত নেন ধর্মনিরপেক্ষ (secular) তুরস্ক প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে। এর আগে ১৯২২ সালে সালতানাত বিলুপ্ত করা হয়েছিল। শেষ উসমানি খলিফা আব্দুল মজিদ দ্বিতীয়কে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এই বিলুপ্তি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবসান ছিল না; এটি ছিল উম্মা'র আত্মিক ঐক্যের প্রতীকী সমাপ্তি। যা পাশ্চাত্যের খণ্ডিত ‘ধর্ম’-কাঠামোর চূড়ান্ত জয় হিসেবে দেখা হয়।
খিলাফত বিলুপ্তির প্রতিক্রিয়া, ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর আধুনিক প্রকৃতি ও বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি
খিলাফত বিলুপ্তির পর মুসলিম চিন্তাবিদরা দুটি পথে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একদল (যেমন হাসান আল-বান্না, মাওলানা মওদূদি) খিলাফত পুনরুদ্ধারের জন্য ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণা তৈরি করেন। যা ছিল পাশ্চাত্যের ‘রাষ্ট্র’ ধারণার সাথে ইসলামি শরীয়তের একটি সংমিশ্রণ। অন্যদল (যেমন, কামাল পাশার মতো লোকেরা) পাশ্চাত্যের সেকুলার রাষ্ট্র মডেল গ্রহণ করে। যা ইসলামি ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণরূপে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় (Ernst, Following Muhammad, 2003, pp. 133-136)।
মিশরীয় সংস্কারক মুহাম্মদ রশিদ রেজা (১৮৬৫-১৯৩৫ খ্রি.) খিলাফত বিলুপ্তি ও পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতার প্রতিক্রিয়ায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর আধুনিক ধারণা তৈরি করেন এবং ‘আল-মানার’ পত্রিকার মাধ্যমে তা প্রচার করেন। ১৯২৮ সালে হাসান আল-বান্না মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। যার মূল স্লোগান ছিল, “আল-কুরআনু দাস্তুরুনা” (কুরআন আমাদের সংবিধান) (Ernst, 2003, pp. 133-134)। ১৯৪১ সালে ভারতে মাওলানা আবুল আ‘লা মওদুদী "জামায়াতে ইসলামী" প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব প্রদান করেন।
কিন্তু উভয় পক্ষই—ইসলামিস্ট ও সেকুলারিস্ট—ইসলামি ঐতিহ্যের সেই গভীর স্তরটি উপেক্ষা করে যান, যেখানে ‘দ্বীন’ (ধর্ম-বিশ্বাস) ও ‘দাওলা’ (রাষ্ট্র-শাসন) ছিল একটি অখণ্ড, জৈব সত্তা। পরস্পর-বিরোধী নয়, পৃথকও নয়; বরং একটি নৈতিক মহাবিশ্বের দুই দিক। ইসলামিস্টরা মূলত খিলাফতের তেরোশো বছরের বৈচিত্র্যময় ও বহু-স্তরীভূত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সরলীকরণ করে পাশ্চাত্যের আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র, কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র ও সার্বভৌম আইন প্রণয়নের কাঠামোর সাথে শরিয়ার একটি যান্ত্রিক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ফেলেন। পাশ্চাত্যের তৈরি পাটাতন হুবহু রেখে ইসলামকে খাপ খাইয়ে দেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা আরকি। অনেকে আবার এর মধ্যে আবর্তিত বিষয়কে দ্বীনের মৌলিক চরিত্রও ভেবে বসেন। তারা খেয়াল করেননি, ঐতিহাসিক খিলাফতে শাসক বা খলিফা কখনো আইন প্রণেতা নন, বরং শরিয়ার বাস্তবায়নকারী মাত্র। আর আইনি কর্তৃত্ব ছিল বিকেন্দ্রীভূত ও উলামাদের হাতে ন্যস্ত। যেখানে শাসকের নির্বাহী ক্ষমতা (সুলতানিজম) ও উলামাদের আইনি কর্তৃত্ব পরস্পরের পরিপূরক ছিল, কখনো একে অপরের বিকল্প নয় (Wael B. Hallaq, The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity's Moral Predicament, New York: Columbia University Press, 2012, p. 89)। অন্যদিকে, সেকুলারিস্টরা ‘দ্বীন’-কে শুধু ব্যক্তিগত আচার-আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ মডেলকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তারা ইসলামের ন্যায়বিচার, সামাজিক কল্যাণ ও শাসনের নৈতিক দিকনির্দেশনাকে জনজীবন থেকে নির্বাসিত করেন। যেন ‘দ্বীন’ ও ‘দাওলা’ কখনোই একটি সাধারণ সত্তার দুই দিক ছিল না (Carl W. Ernst, Following Muhammad: Rethinking Islam in the Contemporary World, Chapel Hill: University of North Carolina Press, 2003, p. 134)। অথচ আবুল হাসান আল-আমিরি (৩০০-৩৮১ হিজরি) রাহি. সুন্দরভাবে এই সমন্বয়কে ফুটিয়ে তোলে বলেছেন, “আদ-দ্বীনু ওয়াস সিয়াসাতু তাওআমান” অর্থাৎ ইসলামের দ্বীন ও সিয়াসত তথা রাজনীতি যমজ ভাই। যার অর্থ, এগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একই উৎস থেকে উদ্ভূত ও একই লক্ষ্যের দিকে ধাবিত। যেখানে একজনের শক্তিই অন্যজনের প্রাণশক্তি। আর এই উপেক্ষাই আরকুনের ‘অচিন্তিত’-কে আরও গভীর ও সংকটময় করে তোলে (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, London: Saqi Books, 2002, p. 205)। কারণ মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা যখন পাশ্চাত্যের ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটি ব্যবহার করে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ তৈরি করতে চান, অথবা বিপরীতে, পাশ্চাত্যের সেকুলার মডেলকে আঁকড়ে ধরেন—তখন তারা ইসলামের ঐতিহাসিক বহুত্ব (বিভিন্ন খিলাফত, সালতানাত, আমিরাত) ও স্থানীয় প্রথার সাথে তার জৈব মিশ্রণ, সবকিছুকে একপাশে সরিয়ে রাখেন। যা সমস্যা সমাধানের বদলে জটিল করে তোলে (Arkoun, 2002, p. 205)।
আর্নস্টের মতে, ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর নতুন ধারণাটি পুরোপুরি আধুনিক। এটি ঔপনিবেশিকতার প্রতিক্রিয়ায় তৈরি একটি রাজনৈতিক প্রজেক্ট। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যখন মুসলিম বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিল, তখন মুসলিমরা প্রতিক্রিয়ায় একটি ‘বিকল্প রাষ্ট্র’-এর ধারণা তৈরি করল। যা ছিল মূলত পশ্চিমা রাষ্ট্রধারণারই একটি প্রতিচ্ছবি (Ernst, 2003, pp. 133-136)।
হাল্লাকের ‘অসম্ভব রাষ্ট্র’: আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে শরিয়ার অসামঞ্জস্য
ওয়েইল হাল্লাক (Wael B. Hallaq) তাঁর The Impossible State (২০১২) গ্রন্থে যুক্তি দেন, আধুনিক রাষ্ট্রের যে কোনো সংজ্ঞায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণাটি অসম্ভব ও আত্মবিরোধী (Hallaq, The Impossible State, 2012, Introduction, p. vii)। হাল্লাকের মতে, এই অসামঞ্জস্যের মূল কারণ হলো আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রাক-আধুনিক ইসলামি শাসনের মধ্যে "মৌলিক কাঠামোগত ও দার্শনিক পার্থক্য"। এই পার্থক্য কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অধিবিদ্যাগত ও নৈতিক স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি মনে করেন, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট মূলত এই দুই পরস্পরবিরোধী কাঠামোকে একই ছাদের নিচে আনার ব্যর্থ প্রচেষ্টার ফল (Hallaq, 2013, p. viii)।
প্রসঙ্গক্রমে হাল্লাক দেখান, উনবিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশবাদী ইউরোপ কীভাবে শরিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করে ফেলে। এর ফলে মুসলিম সমাজ আজ এক অ্যাপোরিয়ার (অমীমাংসিত দ্বন্দ্বের) মুখোমুখি। একদিকে আধুনিক রাষ্ট্রের অস্তিত্বগত বাস্তবতা, অন্যদিকে শরিয়াভিত্তিক শাসন কায়েমের নৈতিক আকাঙ্ক্ষা (Hallaq, 2013, p. viii-ix)। হাল্লাক মনে করেন, এই দ্বন্দ্ব থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, আধুনিক রাষ্ট্র কোনো নিরপেক্ষ হাতিয়ার নয়; বরং এটি নিজস্ব অধিবিদ্যা ও মূল্যবোধ নিয়ে আসে, যা শরিয়ার সাথে মিলতে পারে না (Hallaq, 2013, p. 155-156)।
প্রথমত, আধুনিক রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের (sovereignty) ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রই চূড়ান্ত আইনি কর্তৃত্বের অধিকারী। হাল্লাক দেখান, আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব একটি ‘কল্পিত ধারণা’ (fictitious concept)। এটি ‘জাতির ইচ্ছা’ নামক বিমূর্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে এবং এই রাষ্ট্র নিজেই তার নিজস্ব অধিবিদ্যা (metaphysics) সৃষ্টি করে (Hallaq, 2013, p. 25, 27)। অন্যদিকে, ইসলামি ঐতিহ্যে সার্বভৌমত্ব ছিল সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর। শাসক (সুলতান বা খলিফা) কখনো আইন প্রণেতা ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন শরিয়ার বাস্তবায়নকারী ও রক্ষাকারী (Hallaq, 2013, p. 43-44)। শেরম্যান জ্যাকসনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে হাল্লাক বলেন, রাষ্ট্রব্যক্তি (সুলতান) ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভাণ্ডার নয়। ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য সৃষ্ট হয়নি; বরং রাষ্ট্র বিদ্যমান ব্যক্তির কল্যাণের জন্য। সুলতান বা শাসক কোনো ‘পোপ’ বা ‘আইন প্রণেতা’ নন। খ্রিস্টান ইউরোপে চার্চের পোপ যেমন ধর্মীয় আইন বলার অধিকার রাখতেন, ইসলামে সুলতানের তেমন কোনো অধিকার নেই। সুলতান কোনো নতুন ধর্মীয় বিধান তৈরি করতে পারেন না। তিনি কেবল শরিয়ার (ইসলামি আইন) বাস্তবায়নকারী মাত্র। তিনি যদি আইন তৈরি করেন, সেটি প্রশাসনিক কাজের জন্য, ধর্মীয় কর্তৃত্বের জন্য নয়। ইসলামের ধারণায়, মানুষের অস্তিত্ব রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়ার জন্য নয়। আধুনিক রাষ্ট্র বলে—"দেশের জন্য প্রাণ দাও, দেশ সবকিছুর উর্ধ্বে।" কিন্তু ইসলাম বলে—"মানুষ আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি হয়েছে, রাষ্ট্রের যন্ত্রপাতি হওয়ার জন্য নয়।" যুদ্ধে যাওয়া বা কর দেওয়ার সময় মানুষ রাষ্ট্রের কথা ভাবে, কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য হলো ভালো মানুষ হওয়া, আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকা। রাষ্ট্র হলো একটি ‘ব্যবস্থা’ মাত্র, মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। ইসলামে রাষ্ট্র মানুষের সেবা করার জন্য, মানুষ রাষ্ট্রের সেবা করার জন্য নয়। রাষ্ট্র হলো একটি ‘হায়ার্ড সার্ভিস’ (ভাড়াটে সেবক)। হাল্লাক অন্য জায়গায় এটাকে ‘ভাড়াটে সুলতানিজম’ বলেছেন। ঠিক যেমন মানুষ বাড়ি পাহারার জন্য একজন পাহারাদার রাখেন—যিনি বাড়ির মালিক নন, বরং বাড়ি সামলানোর জন্য আছেন—তেমনই সুলতান বা রাষ্ট্র হলো উম্মাহর (সমাজের) পাহারাদার। তার কাজ হচ্ছে মানুষের জীবন, সম্পদ, ধর্ম ও মর্যাদা রক্ষা করা। যদি রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণ না করে, তবে তার অস্তিত্বের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। (Hallaq, 2013, p. 43)। কার্ল শ্মিটের ভাষায়, আধুনিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো হলো ধর্মতাত্ত্বিক ধারণার ধর্মনিরপেক্ষ রূপান্তর। যেখানে একসময় সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ছিলেন, এখন সেখানে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সার্বভৌম ইচ্ছা (Hallaq, 2013, p. 28)।
হাল্লাক আরও বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ (প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী) নিজেই আইন প্রণয়ন করে এবং তা কার্যকর করে। অন্যদিকে, ইসলামি ব্যবস্থায় সুলতান ছিলেন শরিয়ার রক্ষক। তিনি আইন করতে পারতেন না; বরং শরিয়ার নির্দেশ পালন করতেন। এই কারণেই ইসলামি ইতিহাসে ‘দাওলা’ (রাজবংশ) ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু উম্মাহ ও শরিয়া ছিল চিরন্তন (Hallaq, 2013, p. 62-63)। সুলতান ক্বাজীদের (বিচারক) নিয়োগ-বরখাস্ত করলেও কখনো বিচারের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। কারণ বিচারকের কর্তৃত্ব ছিল শরিয়া-ভিত্তিক, শাসকের ইচ্ছা-ভিত্তিক নয় (Hallaq, 2013, p. 60-61)।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক রাষ্ট্র আইনের কোডিফিকেশন ও কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। হাল্লাক ম্যাক্স ওয়েবারের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখান, রাষ্ট্রের এই যুক্তিবাদী আমলাতান্ত্রিক যন্ত্র জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নাগরিকের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে (Hallaq, 2013, p. 30-32)। কিন্তু ঐতিহাসিক ইসলামি শাসনে আইনের বহুত্ব (legal pluralism) ছিল স্বাভাবিক ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য (Hallaq, 2013, p. 58)। স্থানীয় ক্বাজী (বিচারক) ও উলামারা স্বাধীনভাবে শরিয়া ব্যাখ্যা করতেন। মুফতিরা বিনামূল্যে ফৎওয়া প্রদান করতেন, যা আদালতের জন্য আইনি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করত (Hallaq, 2013, p. 53-54)। অন্যদিকে, প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যাপারে সুলতানের নির্বাহী ক্ষমতা ছিল শরিয়ার পরিপূরক। হাল্লাক এই নির্বাহী ক্ষমতাকে ‘নির্বাহী সুলতানিজম’ (executive sultanism) নামে অভিহিত করেছেন। এটি শরিয়ার বিকল্প ছিল না, বরং পরিপূরক ছিল—একটি অপরটিকে পুষ্ট করত (Hallaq, 2013, p. 60-67)।
কেবল তাই নয়, মুসলিম আদালত ছিল নিঃশুল্ক ও সহজলভ্য। সেখানে উকিলের প্রয়োজন হতো না, কারণ সাধারণ মানুষ নিজেই আইন বুঝতেন। বিচারক (ক্বাজী) শুধু বিচার করতেন না, তিনি সমাজের অভিভাবকও ছিলেন। এতিম, বিধবা ও দরিদ্রদের দেখাশোনা করতেন। মসজিদ, রাস্তা, সেতু ও হাসপাতাল নির্মাণ তদারকি করতেন (Hallaq, 2013, p. 55-57)। এই সামাজিক অন্তর্নিহিততা আধুনিক রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। যেখানে বিচারক রাষ্ট্রের কর্মচারী এবং আইন প্রয়োগের জন্য উকিল ও ফি-এর প্রয়োজন হয় (Hallaq, 2013, p. 55-56)।
তৃতীয়ত, আধুনিক রাষ্ট্র নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি শাসনব্যবস্থা। হাল্লাক যুক্তি দেন, ইস/অট (Is/Ought) ও ফ্যাক্ট/ভ্যালুর মধ্যে যে বিভাজন আধুনিক দর্শন ও আইনে সৃষ্টি হয়েছে, তা নৈতিকতাকে আইন, অর্থনীতি ও বিজ্ঞান থেকে পৃথক করেছে (Hallaq, 2013, p. 75-79)। এর বিপরীতে, ইসলামি শাসনের লক্ষ্য ছিল ‘সৎ জীবন’ (the good life)-এর জন্য নৈতিক আত্ম-গঠন। আবু হামিদ আল-গাজ্জালির ইহইয়াউ উলূমিদ্দীনের উদ্ধৃতি টেনে হাল্লাক দেখান কীভাবে নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জের মতো ‘আত্ম-প্রযুক্তি’ (technologies of the self) একজন মুসলিমের অন্তর্নিহিত নৈতিক সত্তা গঠন করত (Hallaq, 2013, p. 129-135)। হাল্লাকের মতে, আধুনিক রাষ্ট্র যে ধরনের ‘প্রজা’ (subject) তৈরি করে তা ইসলামি নৈতিক আদর্শের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আধুনিক রাষ্ট্র দক্ষ, উৎপাদনশীল, জাতীয়তাবাদী ও রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগে প্রস্তুত প্রজা তৈরি করে (Hallaq, 2013, p. 107-108, 160-161)। কিন্তু ইসলামি শাসনের প্রজা আত্মশুদ্ধি, আত্ম-যত্ন ও পরকালীন দায়বোধে গঠিত হয় (Hallaq, 2013, p. 98)।
হাল্লাক ফুকোর ‘আত্ম-প্রযুক্তি’ ও ওয়েবারের ‘লৌহ খাঁচা’ (Iron Cage)-এর ধারণা ব্যবহার করে এই পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেন। আধুনিক রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা ও জাতীয়তাবাদ তৈরি করে ‘লৌহ খাঁচা’-বন্দী মানুষ। যে শুধু দক্ষ ও বস্তুবাদী, কিন্তু আত্মিক দিক থেকে খণ্ডিত, নার্সিসিস্টিক ও নৈতিকভাবে দরিদ্র (Hallaq, 2013, p. 107-109)। অন্যদিকে, ইসলামি আত্ম-প্রযুক্তি মানুষকে তৈরি করে আত্ম-সচেতন, সহানুভূতিশীল ও সম্প্রদায়-কেন্দ্রিক, যার কাছে বস্তুগত সম্পদ গৌণ এবং আত্মশুদ্ধি মুখ্য (Hallaq, 2013, p. 135-137)।
সুতরাং হাল্লাক মনে করেন, আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোতে শরিয়াকে বাস্তবায়নের যে প্রচেষ্টা, তা ব্যর্থ হওয়া অনিবার্য। কারণ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আইনের একচেটিয়াকরণ ও নৈতিকতা-বিচ্ছিন্ন কাঠামো শরিয়ার সর্বোচ্চ নৈতিক আদেশের সাথে কখনো মিলিত হতে পারে না (Hallaq, 2013, p. 157-158)। তার মতে, সমাধান হলো আধুনিক রাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে ইসলামের সমৃদ্ধ নৈতিক উৎসগুলোর দিকে ফিরে তাকানো। ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ফিরিয়ে আনার জন্য নয়, বরং সেই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্প্রদায়-কেন্দ্রিক মূল্যবোধ থেকে আধুনিকতার নৈতিক সংকট মোকাবিলার নতুন পথ খোঁজা।
শেষ পর্যন্ত হাল্লাক মনে করেন, এই অসামঞ্জস্য শুধু ইসলামি বিশ্বের সমস্যা নয়। এটি আধুনিক সভ্যতার সামগ্রিক নৈতিক সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। পরিবেশ ধ্বংস, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসলামের নৈতিক উৎস পশ্চিমা দার্শনিকদের (যেমন ম্যাকিনটায়ার ও টেলর-দের) জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। হাল্লাকের ভাষায়, "আধুনিকতার পুনর্গঠনে ইসলামি শাসন ও মুসলিমদের একক দায়িত্ব নেই; এই সংকট সবার"। হাল্লাকের ভাষায়, "পৃথিবীতে শান্তিতে একত্রে বসবাস করা নিশ্চয়ই একটি কঠিন কাজ, হয়তো আরেকটি আধুনিক ইউটোপিয়া। কিন্তু আধুনিকতাকে একটি পুনর্গাঠনিক নৈতিক সমালোচনার অধীন করা কেবল ইসলামি শাসনের উত্থানের জন্যই নয়, বরং আমাদের বস্তুগত ও আত্মিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শর্ত। শুধুমাত্র মুসলিম দেশগুলো বা ইসলামি সিভিলাইজেশনই আজ সংকটের মধ্যে পড়েছে—এমনটা নয়। পৃথিবীতে এখন যে সমস্যা চলছে (যুদ্ধ, পরিবেশ দূষণ, সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানুষের একাকীত্ব), সেগুলো শুধু ‘ইসলামি বিশ্বের’ সমস্যা নয়। এই দুরবস্থা সবার—পশ্চিমা, পূর্বা, সব সভ্যতারই।" (Hallaq, 2013, p. 119)। তাই তিনি আশা প্রকাশ করেন, পশ্চিমা ও ইসলামি উভয় ঐতিহ্যই একদিন নৈতিকতাকে কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র (central domain) হিসেবে স্থাপন করতে সক্ষম হবে, যা পৃথিবীকে টেকসই ও শান্তিময় করে তুলতে পারে।
জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’: শরিয়ার সীমা ও ‘ধর্মীয় সেক্যুলার’-এর ধারণা
শেরম্যান জ্যাকসন (Sherman Jackson) তাঁর The Islamic Secular (২০২৪) গ্রন্থে হাল্লাকের ‘অসম্ভব রাষ্ট্র’ তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন। জ্যাকসনের মতে, শরিয়া মানবজীবনের সব ক্ষেত্রকে আচ্ছাদিত করে না; বরং এর একটি সীমাবদ্ধ পরিসর রয়েছে (Jackson, The Islamic Secular, 2024, Introduction, p, 1)।
জ্যাকসন তাঁর এই যুক্তির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেখান, শরিয়ার এই সীমাবদ্ধতা কোনো আধুনিক বা পাশ্চাত্যের চাপে সৃষ্ট নয়; বরং এটি ইসলামি আইনি ঐতিহ্যের অভ্যন্তরেই গভীরভাবে প্রোথিত। স্বয়ং নবী মুহাম্মদ সা. যখন খেজুর গাছের পরাগায়ন সম্পর্কে কৃষকদের পরামর্শ দিলেন প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীত এবং কৃষকরা ব্যর্থতার কথা জানালেন, তখন তিনি বলেছিলেন, “তোমরা তোমাদের দুনিয়াবি বিষয়ে বেশি জানো” (আনতুম আ’লাম বিউমুরি দুনিয়াকুম) [Jackson, ‘The Islamic Secular’, p. 10]। এই ঐতিহাসিক সাক্ষ্যই ইঙ্গিত দেয়, দুনিয়াবি জটিলতা ও অভিজ্ঞতামূলক বিষয়গুলো ওহীর প্রত্যক্ষ পরিসরের বাইরে পড়ে এবং সেটাই হলো ইসলামি সেক্যুলারের (ইসলামি ধর্মনিরপেক্ষতার) উৎস।
জ্যাকসনের পরিভাষায় ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ মানে একটি ‘ধর্মীয় সেক্যুলার’ (religious secular)। এই ধারণাটি বোঝার জন্য প্রথমে বুঝতে হবে তিনি ‘সেক্যুলার’ ও ‘ধর্মীয়’—এই দুইয়ের সম্পর্ককে কীভাবে দেখেন। পাশ্চাত্যে হুগো গ্রোটিয়াস (Hugo Grotius) সপ্তদশ শতকে যে ‘ঈশ্বর নেই বলে ধরে নিয়ে কাজ করা’ (etsi Deus non daretur)–এর নীতি প্রচার করেন, সেটার বিপরীতে জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ চলে ‘ঈশ্বর আছেন’—এই সচেতনতার ভেতর থেকেই (Jackson, p. 2)। অর্থাৎ, এই পরিসরে মানুষ শরিয়ার সরাসরি কোনো হুকুম বা টেক্সট ছাড়াই যুক্তি, অভিজ্ঞতা, রুচি, কল্পনা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তা করে "ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়", বরং ধর্মের বৃহত্তর লক্ষ্য (যেমন, জীবন রক্ষা, সমাজের কল্যাণ, পরিবারের সৌহার্দ্য) পূরণের জন্যই। জ্যাকসনের ভাষায়, “শরিয়ার বাইরে” বলতে বোঝায় ‘শরিয়ার প্রত্যক্ষ আইনি বা নুসুসের পরিসরের বাইরে’। ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে’ নয় (Jackson, p. 11-12)। একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ইসলাম বিবাহে ‘মুহাব্বত ও রহমত’ (প্রেম ও করুণা)-এর নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রকাশের উপায় "স্ত্রীর জন্য ফুল আনা, নাকি তার পছন্দের কোনো দুষ্প্রাপ্য খাবার আনা" সেটা শরিয়ার বিষয় নয়। জ্যাকসন এক্ষেত্রে বলেন, একজন ‘ভালো মুসলিম’ স্বামী ‘খারাপ চুম্বনকারী’ বা ‘খারাপ কথাবার্তা বলার মানুষ’ হতে পারেন। কারণ রোমান্টিকতা ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা শরিয়ার আইনি পরিসরের বাইরে পড়ে, কিন্তু তা ইসলামি সেক্যুলারের অন্তর্গত। কারণ তা ইসলামের সরাসরি আইনের আওতায় নয়, আবার ইসলাম ধর্মের বাহিরেও নয় (Jackson, p. 16)। অর্থাৎ, ‘ধর্মীয় সেক্যুলার’ হলো সেই পরিসর যেখানে মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধকে সামনে রেখে জাগতিক জটিলতা মোকাবিলা করে, কিন্তু তা করার জন্য শরিয়ার কোনো নির্দিষ্ট আইনি বিধানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য নয়।
জ্যাকসন ‘শরিয়ার বাইরে’ (non-sharia) কিন্তু ‘ইসলামের ভেতরে’ থাকা পরিসরটিকে ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ (The Islamic Secular) নামে অভিহিত করেন। পাশ্চাত্যের ‘সেক্যুলার’ যেখানে ধর্ম থেকে মুক্তি বোঝায়, সেখানে তাঁর মতে ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ হলো ধর্মের পরিপূরক, একটি ‘ধর্মীয় সেক্যুলার’ (religious secular)। জ্যাকসন আরও স্পষ্ট করে বলেন যে ‘মাশরু'’ (শরিয়া-সম্মত) ও ‘গায়রে-মাশরু'’ (অ-শরিয়া) এই পার্থক্যটি মুসলিম আইনবিদ ও মতবিশেষজ্ঞদের মধ্যে শতাব্দীজুড়ে আলোচিত একটি বিষয়। জাহিরি মাজহাবের ফকিহরা যুক্তি দিতেন, ওহি যা প্রত্যক্ষভাবে বলে, তার বাইরে আল্লাহর কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই [Jackson, p. 8-9]। অন্যদিকে, আল-গাজ্জালি (মৃ. ১১১১ খ্রি.) এমনকি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকেও ‘শরিয়া-বহির্ভূত’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ ‘শরিয়া এই বিজ্ঞানসমূহকে না সমর্থন করে, না নিষেধ করে’ (وَلَيْسَ فِي الشَّرْعِ تَعَرُّضٌ لِهَذِهِ الْعُلُومِ بِالنَّفْيِ وَلَا الْإِثْبَاتِ "ওয়া লাইসা ফিশ-শারয়ি তাআ'ররুযু লিহাযিহিল উলুমি বিন-নাফয়ি ওয়ালাল ইসবাত") "আর শরিয়তে এই বিজ্ঞানগুলোর (গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রাকৃতিক নিয়ম ইত্যাদি) পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বিরোধ নেই।" [Jackson, p. 10-11]। অর্থাৎ, এই পরিসরে মানুষের যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা কাজ করে এবং অবশ্যই সেটা ইসলামের বৃহত্তর নৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে।
হাল্লাক ও জ্যাকসনের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো "শরিয়ার পরিসর (scope) নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি"। হাল্লাক যুক্তি দেন, শরিয়া একটি অসীম (unbounded) ব্যবস্থা—এটি মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। আর আধুনিক রাষ্ট্রও একটি অসীম সার্বভৌম সত্তা যা নিজের আইনি কর্তৃত্বকে সর্বত্র বিস্তৃত করতে চায়। তাই হাল্লাকের মতে, এই দুই অসীম শক্তির সংঘাত অনিবার্য ও অমীমাংসিত; এ কারণেই ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণাটি অসম্ভব (Hallaq, The Impossible State, 2013, p. 51, 157-158)। অন্যদিকে, জ্যাকসন হাল্লাকের এই ভিত্তিটিকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি দেখান, ইসলামি আইনি ঐতিহ্যে শরিয়াকে কখনোই অসীম বলে গণ্য করা হয়নি। বরং ‘মাশরু'’ ও ‘গায়রে-শর’-এর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য সর্বদা বিদ্যমান ছিল (Jackson, p. 7-8)। জ্যাকসনের মতে, শরিয়া তার নিজের মধ্যে স্বেচ্ছায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। যেমনটি আমরা নবীর ‘তোমরা দুনিয়াবি বিষয়ে বেশি জানো’–ঘটনায় দেখি। তাই আধুনিক রাষ্ট্রের অনেক কার্যক্রম (অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রশাসন, নীতি-নির্ধারণ) শরিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়; বরং তারা ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর অন্তর্গত, যা ইসলামের বৃহত্তর নৈতিক কাঠামোর অংশ (Jackson, p. 14-15)। সংক্ষেপে, হাল্লাক যেখানে দ্বন্দ্বকে অমীমাংসিত দেখেন, জ্যাকসন সেখানে একটি সমন্বয়ের পথ দেখান। এমনভাবে দেখান, যেনো ইসলামি মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু জাগতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় যুক্তি, বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
জ্যাকসন যুক্তি দেন, জীবনের জটিলতা ও আকস্মিকতা সামলাতে শুধু ওহী ও শরিয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন “যুক্তি, কল্পনা, রুচি, প্রতিভা, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ইত্যাদি”—যা ফিকহি চিন্তার পরিসরের বাইরে পড়তে পারে, কিন্তু মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার অংশ (Jackson, 2024, p. 78)। বস্তুত ইসলামের পুরো কাঠামো সামনে রাখলে দেখা যায়, এই বিষয় নতুন নয়। ইসলামের অতীত শাসনে ক্বাযীরা (বিচারকরা) এবং মুজতাহিদ ইমামরা এরকম অনেক বিষয় চিন্তা-ফিকির ও যাওক্বে সালিম বা সুরুচির ভিত্তিতে সমাধান দিয়েছে। যুগে যুগে এরকম করতেও বলেছেন। অবশ্যই উরফ বা সমাজের চলমান বাস্তবতা ইসলামি আইন প্রণয়নে অন্যতম স্তম্ভ। এই ‘মাশরু'’ শরিয়াসম্মত বিষয়ের পরিসরের কার্যকারিতা বুঝতে জ্যাকসন ইমাম আল-কারাফির (মৃ. ১২৮৫ খ্রি.) ‘হুকুম’ ও ‘তাসাররুফ’-এর পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। আল-কারাফির মতে, ‘হুকুম’ হলো শরিয়া-সম্মত বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত; কিন্তু ‘তাসাররুফ’ হলো শাসকের বিবেচনাধীন সিদ্ধান্ত। যা জনকল্যাণের ভিত্তিতে পরিবর্তনযোগ্য এবং যেখানে জনগণের প্রতিবাদ ও সংশোধনী বৈধ [Jackson, p. 18-19]। যেমন, উমর (রা.) অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তির ক্ষেত্রে এক বছরের ‘জালা ওয়াতান’ বা দেশান্তরের ‘হুকুম’ (শরিয়তের মূল বিধান) থাকা সত্ত্বেও, জনকল্যাণের স্বার্থে সেটির ‘তাসাররুফ’ বা প্রয়োগগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে কারাদণ্ডের নিয়ম প্রবর্তন করেন। এই ‘তাসাররুফ’-এর পরিসরটিই ইসলামি সেক্যুলারের ভিত্তি—যেখানে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত নীতিকে ‘ঈশ্বরের আইন’ দাবি না করে বরং একটি অস্থায়ী, যাচাইযোগ্য সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে জনগণ অর্থনীতি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যনীতির মতো বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা ও যুক্তির ভিত্তিতে সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে, এবং তা ধর্মদ্রোহিতা নয়, বরং ইসলামের অংশ [Jackson, p. 19]।
জ্যাকসন আসলে বোঝাতে চান, মুসলিম সমাজের সামনে ‘হয় পুরোপুরি শরিয়া-শাসিত রাষ্ট্র, নয় সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষতা’—এই দ্বিধাবিভক্তিটি (binary dichotomy) সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তিনি প্রস্তাব দেন একটি ‘মধ্যবর্তী পথ’ (middle ground)। যেখানে শরিয়া তার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা মেনে নেয়, এবং মানুষের জাগতিক জটিলতা (অর্থনীতি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, শিল্প, সংস্কৃতি, নীতি-নির্ধারণ) পরিচালিত হয় মুসলিমদের নিজস্ব যুক্তি, কল্পনা, রুচি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে—তবে তা ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিধির ভেতরেই থেকে। জ্যাকসনের মতে, ‘শরিয়া’ ও ‘ইসলাম’ সমার্থক নয় (Jackson, p. 22)। শরিয়া হলো ইসলামের সেই অংশ যা সরাসরি ওহিভিত্তিক বিধান দেয়; কিন্তু ইসলাম তার চেয়ে অনেক বড়। এতে রয়েছে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি ও মানুষের জীবন-দর্শন ইত্যাদি। গুণে গুণে অন্তত ৪০ থেকে ৪৪ টি ক্ষেত্র দেখানো যাবে, যেখান থেকে ইসলাম তার আইন উৎপাদন করে। মুসলিম শাসনামলে করেছেও। এই বৃহত্তর ইসলামি কাঠামোর ভেতরেই ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ কাজ করে। এর একটি চমৎকার উদাহরণ জ্যাকসন নিজেই দিয়েছেন, মিশরের সংস্কারক মুহাম্মদ আবদুহ (মৃ. ১৯০৫ খ্রি.) বিবাহে নারী-পুরুষের মধ্যে ‘নৈতিক দায়িত্ব’ (ওয়াজিবাতে আদাবিয়্যাহ)–এর অনুপস্থিতির সমালোচনা করেছিলেন। জ্যাকসনের মতে, ফকিহরা এই ‘নৈতিক দায়িত্ব’ বাদ দিয়েছিলেন কারণ সেগুলো শরিয়ার পরিসরের বাইরে পড়ে। স্বামী তার নৈতিক দায়িত্ব তথা ভালোবাসা ও করুণা কীভাবে প্রকাশ করবে, সেটা সংস্কৃতি ও সময়-নির্ভর বিষয়। যা শরিয়ার আইনি বিধানের আওতায় আনা সম্ভব নয় (Jackson, p. 15-16)। আবদুহ যদি বুঝতেন, এটি একটি ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর বিষয়, তাহলে তিনি ফকিহদের ওপর এত কঠোর সমালোচনা না করে বরং সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তনের ওপর জোর দিতেন। পরিশেষে, জ্যাকসনের তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো, "ইসলাম ধর্মকে রক্ষা করতে হলে শরিয়াকে সবকিছুর সমাধান দিতে বাধ্য করা উচিত নয়"। বরং মানুষকে ‘ধর্মীয় সেক্যুলার’-এর পরিসরে যুক্তি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত—তবে সবকিছুই ‘ঈশ্বর আছেন’ এই সচেতনতার ভেতর দিয়েই হবে। এটাই জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর মূলমন্ত্র (Jackson, p. 22-23)। বস্তুত এটা ইসলামের "ইহসান" ধারণা (আল্লাহ আমার সামনে আছেন) ধারণ করে, ইসলামের বৃহত্তর উসুলে কাজ করারই ওপর নাম। যেটা বলা যায়, ফিকহি বা মাযহাবি উসুলের উর্ধ্বে উঠে ইসলামের দ্বীনি তথা সার্বিক-জীবনব্যবস্থার বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির উসুল।
এই দৃষ্টিতে, আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা ভুল। কারণ এটি শরিয়াকে ইসলামের সাথে ‘সমাপ্ত’ (co-terminus) করে ফেলে। বাস্তবে, শরিয়ার বাইরে একটি ‘বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিসর’ (differentiated realm) রয়েছে, যেখানে শরিয়ার সরাসরি কোনো হুকুম নেই, কিন্তু যা ইসলামের বৃহত্তর পরিসরের অংশ। এই পরিসরেই আধুনিক রাষ্ট্রের অনেক কার্যক্রম (অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রশাসন) পরিচালিত হতে পারে। শরিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক না হয়ে, বরং তার পরিপূরক হিসেবে। তাঁর মতে ইসলামের ঐতিহাসিক শাসনগুলোতে এর যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে। পরিশেষে জ্যাকসন জোর দিয়ে বলেন, ইসলামি সেক্যুলার পাশ্চাত্যের মতো ‘ঈশ্বর নেই বলে ধরে নেওয়া’ (etsi Deus non daretur)-এর ওপর নয়, বরং ‘ঈশ্বর আছেন’ এই সচেতনতার ভেতরেই চলে [Jackson, p. 2]। একারণে এখানে ধর্মীয় উদাসীনতা বা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না, বরং মানুষের জাগতিক কর্মকাণ্ড ধর্মীয় দায়বোধের অংশ হয়ে ওঠে। জ্যাকসনের এই ধারণা যেমন মুসলিম সমাজে শরিয়ার ভুল ব্যাখ্যা দূর করতে পারে, তেমনি হাল্লাকের ‘অসম্ভব রাষ্ট্র’ তত্ত্বকেও একটি নতুন কোণ থেকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেয়। যদিও জ্যাকসনের প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক মোহাম্মদ ফাদেল প্রশ্ন তুলেছেন, সুন্নি ধর্মতত্ত্ব নিজেও কি খারিজি ও শিয়া মতবাদকে দমন করতে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ যুক্তি ব্যবহার করেনি? তবে জ্যাকসন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ ধর্মের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয় [Jackson, p. 39-40]।
খিলাফতের ঐতিহাসিক বহুত্ব ও ইসলামের রাজনৈতিক ধারার প্রাণবন্ততা
খিলাফতের ধারণা—আমরা যাকে সাধারণত ‘ইসলামি শাসন’ নামে চিনি, বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। আধুনিক মুসলিম মননে ‘খিলাফত’ বলতে আমরা প্রায়শই একটি আদর্শায়িত, সময়হীন ও স্থবির প্রতিষ্ঠান কল্পনা করি। অথচ ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আব্বাসি, উমাইয়া, উসমানি, মুঘল, সাফাভি—প্রত্যেকটি শাসনব্যবস্থা ছিল এক একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে শরিয়া ও ইসলামি আদর্শের এক অনন্য মিশ্রণ। এই বৈচিত্র্যই খিলাফতের প্রকৃত প্রাণশক্তি।
খিলাফতের প্রথম মাত্রা, আইনের বহুত্ব (Legal Pluralism)। আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে সার্বভৌমত্বের সাথে চিহ্নিত করে, সেখানে ঐতিহাসিক খিলাফতে আইনের উৎস ছিল বহুমুখী। মুসলিম শাসকরা কখনো আইন প্রণেতা ছিলেন না; তারা ছিলেন শরিয়ার বাস্তবায়নকারী। আইনি কর্তৃত্ব ছিল উলামাদের নিকট, যারা কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যার মাধ্যমে যুগোপযোগী সমাধান দিতেন। শাসকের হাতে ছিল নির্বাহী ক্ষমতা—যা হাল্লাক ‘নির্বাহী সুলতানিজম’ নামে চিহ্নিত করেছেন। আর উলামাদের হাতে ছিল ‘আইনি কর্তৃত্ব’ (Hallaq, The Impossible State, 2012, P. 49-52)। এই দ্বৈত কাঠামোই ছিল ইসলামি শাসনের মেরুদণ্ড, যা আইনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়ে একটি নৈতিক ও আত্মিক দায়িত্বে পরিণত করেছিল।
খিলাফতের দ্বিতীয় মাত্রা, স্থানীয় অভিযোজনশীলতা। খিলাফত কখনোই একই সাজে সাজানো ফ্যাক্টরি ছিল না। উসমানি সাম্রাজ্যের ‘কানুননামা’ বা মুঘলদের ‘ফতোয়ায়ে আলমগিরি’—সবই স্থানীয় প্রথা ও প্রয়োজনের সাথে শরিয়ার সমন্বয়ের অসাধারণ দৃষ্টান্ত। ইসলামি আইনের মৌলিক নীতিগুলো (মাকাসিদ) অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োগের স্তরে অভূতপূর্ব নমনীয়তা ছিল খিলাফতের অন্যতম শক্তি। কার্ল আর্নস্ট যেমন দেখিয়েছেন, “উসমানি সুলতানরা ‘খলিফা’ উপাধিটি ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবি হিসেবে ব্যবহার করলেও, তা ছিল মূলত রাজনৈতিক কৌশল। রাশিয়ার ভূখণ্ডের মুসলিমদের ওপর কর্তৃত্ব দাবি করার জন্য” (Ernst, Following Muhammad, 2003, pp. 131-132)। এ থেকেই বোঝা যায়, রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতা কখনোই খিলাফতের একমাত্র নির্ধারক ছিল না; বরং সময়, স্থান ও চাহিদা অনুযায়ী এর অভিযোজন ঘটেছে।
খিলাফতের তৃতীয় মাত্রা, বহু-জাতিক সহাবস্থান। খিলাফত কখনোই একটি ‘জাতি-রাষ্ট্র’ ছিল না; এটি ছিল বহু-জাতিক, বহু-ধর্মীয় ও বহু-আইনি সাম্রাজ্য। উসমানি ‘মিল্লাত’ ব্যবস্থা, মুঘল আমলের হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান, অথবা সাফাভি ইরানের ধর্মীয় বৈচিত্র্য—সবই ইসলামি শাসনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে, ইসলামের রাজনৈতিক কাঠামো সংখ্যালঘুদের আইনি ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি দিত (Ernst, 2003, pp. 118-119)। এই সহাবস্থানই খিলাফতের তৃতীয় মাত্রা, যা ‘সকলের জন্য ইসলাম’ নয়, বরং ‘ইসলামি পরিবেশে সকলের সহাবস্থান’-এর একটি বাস্তব মডেল উপস্থাপন করে।
এই তিনটি মাত্রা—আইনের বহুত্ব, স্থানীয় অভিযোজনশীলতা ও বহু-জাতিক সহাবস্থান—মিলে খিলাফতের ‘বহুমাত্রিক’ চরিত্র গঠন করে। এই বহুমাত্রিকতাই আজকের ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর এককেন্দ্রিক, সার্বভৌম ও আদর্শায়িত মডেলের বিপরীতে একটি কার্যকর বিকল্প পথ দেখাতে পারে। আর এই বিকল্প পথের ভিত্তি স্থাপনের জন্য আমাদের দরকার এক গভীর দার্শনিক ও আইনি পুনর্বিন্যাস। যা ইকবালের ইজতিহাদ, হাল্লাকের সমালোচনা ও জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর আলোকে সম্ভব।
‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’: ইজতিহাদের চেতনা, আধুনিক রাষ্ট্রের সমালোচনা, ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ ও সমকালীন চ্যালেঞ্জের সমন্বিত কাঠামো
খিলাফতের ঐতিহাসিক পরিসর—যেখানে আব্বাসি, উমাইয়া, উসমানি, মুঘল, সাফাভি—প্রত্যেকটি শাসনব্যবস্থাই ছিল স্থানীয় প্রথা, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও শরিয়ার এক অনন্য মিশ্রণ (Carl W. Ernst, Following Muhammad: Rethinking Islam in the Contemporary World, Chapel Hill: University of North Carolina Press, 2003, pp. 131-132)। এই বহুত্ব কেবল ইতিহাসের এক প্রসঙ্গ নয়; বরং তা আজকের ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর এককেন্দ্রিক, সার্বভৌম ও আদর্শায়িত মডেলের বিপরীতে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তুলে ধরে। ঐতিহাসিক খিলাফতের এই প্রাণবন্ত অভিযোজনশীলতাকে কীভাবে সমসাময়িক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরিত করা যায়? কীভাবে এখানে আইনি গোঁড়ামি ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণের দোলাচল থেকে মুক্ত থেকে ইসলামের নৈতিক মহাবিশ্ব বিকশিত হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনটি পৃথক কিন্তু পরস্পর-পূরক চিন্তাধারা আমাদের পথ দেখায়। আল্লামা ইকবালের ইজতিহাদের চেতনা, ওয়াইল হাল্লাকের আধুনিক রাষ্ট্র-সমালোচনা, এবং শেরম্যান জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর সূক্ষ্ম ধারণা। এই তিন সূত্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর ভিত্তি। এমন একটি কাঠামো যা আইনের বহুত্ব, শরিয়ার সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি, বিকেন্দ্রীকৃত নৈতিক কর্তৃত্ব ও সমষ্টিগত ইজতিহাদকে একীভূত করে আধুনিকতার নৈতিক সংকট মোকাবিলার একটি অভিনব উপায় উপস্থাপন করে।
১. ইজতিহাদের চেতনা: সময়ের সৃজনশীল প্রবাহে আইনি গতিশীলতার দার্শনিক পুনরুদ্ধার
ইসলামি আইনি চিন্তার ইতিহাসে ‘ইজতিহাদের দরজা বন্ধ’—এই আপাত-ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীটি গ্রহণ করার মধ্যেই উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক পতনের বীজ নিহিত ছিল। ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা গিয়েছে পূর্বের অধ্যায়ে। আমরা দেখেছি ইকবালের চিন্তায় কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় ইসলাম প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। আমরা দেখেছি, আল্লামা ইকবাল তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ The Reconstruction of Religious Thought in Islam (১৯৩৪)-এর ষষ্ঠ বক্তৃতায় এই স্থবিরতার শিকড় সন্ধান করেন এবং ‘অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তা’ ও ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ভীরুতা’-কে তার মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, Lahore: Sang-e-Meel Publications, 1934 (reprint 2004), pp. 118-120)। ইকবালের দৃষ্টিতে, ইসলাম তার আদি সত্তায় কখনোই একটি নিস্প্রাণ, অপরিবর্তনীয় আইনতন্ত্র ছিল না; বরং এটি একটি চিরন্তন চলিষ্ণু ও বিকাশমান জীবনব্যবস্থা। যার শ্বাস-প্রশ্বাস নির্ভর করে যুগের নতুন চ্যালেঞ্জের সাথে খাপ খাওয়ানোর সামর্থ্যের ওপর (Iqbal, pp. 122-125)।
এই অভিযোজনশীলতার মূল চাবিকাঠি হলো ‘ইজতিহাদ’। যা শরিয়তের শাশ্বত মূলনীতিগুলোকে (মাকাসিদ) অক্ষুণ্ণ রেখে সময়ের অজানা জটিলতার মুখে নতুন আইনি সমাধান উদ্ভাবনের এক অনন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ (Iqbal, p. 133)। ইকবাল শুধু একটি তাত্ত্বিক আহ্বানই করেননি; তিনি এই গতিশীলতাকে মহাজাগতিক দর্শনের ভিত্তিতে স্থাপন করেছেন। ফরাসি দার্শনিক অঁরি বার্গসঁ-এর ‘পিউর ডিউরেশন’ (Pure Duration) তত্ত্ব এবং হাদিসে কুদসিতে আল্লাহর আদেশ ‘লা তাসুব্বুদ দাহরা…’ (তোমরা সময়কে গালি দিও না, কারণ আমিই সময়)-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, সময় একটি জীবন্ত, অবিভাজ্য ও অবিরাম সৃজনশীল মহাপ্রবাহ (Iqbal, pp. 52-54)। যেহেতু সমগ্র মহাবিশ্ব এবং মানবসমাজ এই সৃজনশীল প্রবাহের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই ইসলামের ফিকরি মানসিকতা, তার আইনি কাঠামো বা ফিকহ শাস্ত্রের স্থবির হয়ে থাকার আর কোনো দার্শনিক যৌক্তিকতা থাকে না (Iqbal, pp. 126-127)। এই সময়-দর্শন ইজতিহাদকে কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং ইসলামি বিশ্বদর্শনের একটি অপরিহার্য মহাজাগতিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ইকবালের সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও দূরদর্শী প্রস্তাব হলো ‘সমষ্টিগত ইজতিহাদ’ (Collective Ijtihad)। আধুনিক বাস্তবতায় কেবল উলামা শ্রেণির হাতে আইন প্রণয়ের কর্তৃত্ব দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাম্যও নয়। তিনি সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, আধুনিক যুগের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক জটিলতা এত গভীর যে, অতীতের মতো কোনো একক প্রতিভাবান ইমামের পক্ষে একা হাতে ইজতিহাদ করা আর সম্ভব নয় (Iqbal, pp. 135-140)। তাই তিনি আধুনিক যুগের নির্বাচিত ‘গণতান্ত্রিক আইনসভা’ (Legislative Assembly)-কে ইজতিহাদের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রস্তাব করেন। এই আইনসভার ভেতরে শরিয়ত বিশেষজ্ঞ এবং সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন প্রায়োগিক বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিবর্গের—উলামা, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, বিজ্ঞানী ও আইনবিদদের—একটি বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা প্যানেল গঠিত হবে। যারা নতুন আইনের খসড়া তৈরি এবং তা ইসলামের মূল স্পিরিটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সহায়তা করবে (Iqbal, p. 144)। ইকবালের মতে, ‘ইজমা’ (আইনি ঐকমত্য)-এর চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট আলেম গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। বর্তমান যুগে ‘ইজমা’ কেবল তখনই সম্ভব, যখন এই ইজতিহাদের ক্ষমতাটিকে আলেমদের একক ক্ষেত্র থেকে স্থানান্তরিত করে একটি নির্বাচিত মুসলিম আইনসভার হাতে ন্যস্ত করা হবে (Iqbal, p. 146)। এভাবে ইকবাল একদিকে যেমন ইজতিহাদের দরজা পুনরায় উন্মোচন করে ইসলামের গতিশীল রূপ ফিরিয়ে এনেছেন, অন্যদিকে তেমনি একটি মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আধুনিক আইনসভাকে (সমাজের ধারণাগত) পাদ্রীতন্ত্র ও মোল্লাতন্ত্রের আধিপত্য এবং ফিকহি স্থবিরতার উভয় সংকট থেকে মুক্ত করার এক চিরসবুজ ঐতিহাসিক রূপরেখা অঙ্কন করেছেন (Iqbal, p. 136)।
২. ওয়েইল হাল্লাক: আধুনিক রাষ্ট্রের গঠনগত অসামঞ্জস্য ও সার্বভৌমত্বের দ্বন্দ্ব
ইকবাল যদিও ইজতিহাদের মাধ্যমে ইসলামের আইনি প্রাণশক্তি পুনরুদ্ধারের একটি অনন্য দার্শনিক ভিত্তি স্থাপন করেছেন, তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত প্রকৃতি তথা এর সার্বভৌমত্ব, আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ এবং নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে বিস্তারিত সমালোচনায় যাননি। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন ওয়েইল হাল্লাক তাঁর যুগ-নির্ণায়ক গ্রন্থ The Impossible State (২০১২)-এ। হাল্লাক এখানে একটি মৌলিক ও সাহসী যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণাটি কেবল অসম্ভবই নয়, বরং তা আত্মবিরোধী এবং ইসলামের ঐতিহাসিক নৈতিক প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। (Wael B. Hallaq, The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity's Moral Predicament, New York: Columbia University Press, 2012, Introduction, p. xiii)।
হাল্লাকের যুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে সার্বভৌমত্বের ধারণা। আধুনিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো মানবসৃষ্ট সার্বভৌমত্ব—যেখানে রাষ্ট্র বা জাতীয় আইনসভাই চূড়ান্ত আইনি কর্তৃত্বের অধিকারী। অন্যদিকে, ইসলামি ঐতিহ্যে সার্বভৌমত্ব ছিল সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর; শাসক বা খলিফা ছিলেন শরিয়ার বাস্তবায়নকারী মাত্র, আইন প্রণেতা বা উৎস নন (Hallaq, 2012, p. 89)। হাল্লাক যুক্তি দেন, এই দুটি ধারণা—মানবসৃষ্ট সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও ঐশী আইনি কর্তৃত্ব—একই কাঠামোতে স্থান পেতে পারে না। আধুনিক রাষ্ট্রের যেকোনো সংস্করণেই সার্বভৌমত্বের উৎস মানুষ; আর শরিয়া-ভিত্তিক শাসনে আইনের উৎস হলো আল্লাহর ওহী। এই মৌলিক দ্বন্দ্বই ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-কে একটি ‘অসম্ভব’ প্রকল্পে পরিণত করে। কারণ এখানে শাসককে একই সাথে আইনের অধীন ও আইনের উৎস হতে হয়—যা ইসলামি দৃষ্টিতে শিরকের পর্যায়ে পড়ে (Hallaq, 2012, p. 89)।
দ্বিতীয়ত, হাল্লাক আধুনিক রাষ্ট্রের নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতা-কে একটি গভীর সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন। আধুনিক রাষ্ট্র দাবি করে, সে নিরপেক্ষ। সব ধর্ম, সব নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমান দূরত্ব বজায় রাখে। কিন্তু হাল্লাকের মতে, এই নিরপেক্ষতা আসলে এক ধরনের নৈতিক শূন্যতা তৈরি করে। যেখানে রাষ্ট্র শুধু ক্ষমতা ও স্বার্থের খেলায় পরিণত হয় এবং ‘প্রজা’ তৈরি করে যারা আইন মেনে চলে কিন্তু নৈতিকভাবে উদাসীন (Hallaq, 2012, Chapter 3, p. 60)। ইসলামি ঐতিহ্যে, শাসনের লক্ষ্য কখনোই নিরপেক্ষ থাকা ছিল না; বরং তা ছিল ‘সৎ জীবন’ (the good life)-এর জন্য নৈতিক আত্ম-গঠন ও আত্ম-শুদ্ধি। এই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক রাষ্ট্রের যন্ত্রসভার সাথে কখনোই মিলিত হতে পারে না (Hallaq, 2012, p. 65)।
তৃতীয়ত, হাল্লাক আইনের কোডিফিকেশন ও কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র-এর সমালোচনা করেন। আধুনিক রাষ্ট্র সর্বত্র সমান ও একই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ঐতিহাসিক ইসলামি শাসনে আইনের বহুত্ব (legal pluralism) ছিল স্বাভাবিক ও কাম্য। স্থানীয় ক্বাজী (বিচারক) ও উলামারা স্বাধীনভাবে শরিয়া ব্যাখ্যা করতেন, এবং প্রশাসনিক ব্যাপারে সুলতানের নির্বাহী ক্ষমতা (যাকে হাল্লাক ‘নির্বাহী সুলতানিজম’ বলেন) ছিল শরিয়ার পরিপূরক, এর বিকল্প নয় (Hallaq, 2012, Chapter 2, pp. 34-40)।
তবে হাল্লাকের এই বিধ্বংসী সমালোচনা আমাদের কেবল অসহায় সংকটে ফেলে দেয় না; বরং এটি একটি ইতিবাচক পথও নির্দেশ করে। আমাদের আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোর বাইরে গিয়ে ইসলামের সমৃদ্ধ নৈতিক উৎস, স্থানীয় প্রথা ও বিকেন্দ্রীকৃত আইনি ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকাতে হবে (Hallaq, 2012, p. 280)। এই বিন্দুতেই হাল্লাক ইকবালের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত হন। ইকবাল যেমন ইজতিহাদের মাধ্যমে আইনি স্থবিরতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, হাল্লাক তেমনই আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোগত স্থবিরতা ও কেন্দ্রীকরণের সমালোচনা করেছেন। উভয়েই "পরিবর্তন, অভিযোজনশীলতা ও বিকেন্দ্রীকরণ"-কে ইসলামি চিন্তার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Iqbal, p. 133; Hallaq, 2012, Introduction, p. xv)।
৩. শেরম্যান জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’: শরিয়ার সীমারেখা ও ধর্মীয়-সেক্যুলারের সম্ভাবনা
ইকবালের গতিশীলতা ও হাল্লাকের কাঠামোগত সমালোচনা—এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান পূরণ করে একটি ব্যবহারিক ও বাস্তবসম্মত মাত্রা যোগ করেন শেরম্যান জ্যাকসন তাঁর সাম্প্রতিক গ্রন্থ The Islamic Secular (২০২৪)-এ। জ্যাকসন হাল্লাকের ‘অসম্ভব রাষ্ট্র’ তত্ত্বকে খণ্ডন না করে বরং তাকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দেন। তিনি যুক্তি দেন, "শরিয়া মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে আচ্ছাদিত করে না; বরং এর একটি স্পষ্ট সীমাবদ্ধ পরিসর রয়েছে, এবং এই সীমাবদ্ধতা ইসলামের দুর্বলতা নয়, বরং তার বাস্তববাদী শক্তি" (Sherman Jackson, The Islamic Secular, New York: Oxford University Press, 2024, Introduction, p. 3)।
জ্যাকসন ‘শরিয়ার বাইরে’ কিন্তু ‘ইসলামের ভেতরে’ থাকা সেই বিস্তৃত পরিসরটিকে ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ (The Islamic Secular) নামে অভিহিত করেন। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এটিকে পাশ্চাত্যের সেক্যুলারিজম থেকে পৃথক করেন; পাশ্চাত্য সেক্যুলার যেখানে ধর্ম থেকে মুক্তি বা ধর্মকে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে, সেখানে ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ হলো ধর্মের পরিপূরক—একটি ‘ধর্মীয় সেক্যুলার’ (religious secular)। যা ইসলামি নৈতিকতা ও বিশ্বদৃষ্টিকে জনগণের ক্ষেত্রে সক্রিয় রাখে (Jackson, 2024, Chapter 1, p. 12)। ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলাপ আমরা পেয়েছি। প্রাসঙ্গিক হিসেবে এখানে মেইন পয়েন্টগুলো টাচ করতে হচ্ছে।
জ্যাকসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, “শরিয়ার উৎস (কুরআন ও হাদিস এর সরাসরি টেক্সট) দিয়ে যা নির্ধারণ করা যায় না, সেগুলো ‘শরিয়ার বাইরে’ কিন্তু ‘ইসলামের বাইরে’ নয়” (Jackson, 2024, p. 45)। এর অর্থ হলো, দৈনন্দিন জীবনযাপন, অর্থনৈতিক লেনদেনের নতুন রূপ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার, বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের জটিল কৌশল—যেসব বিষয়ে সরাসরি কোনো 'নস' (নির্দিষ্ট আয়াত বা হাদিস) নেই, সেগুলোকে ‘অ-ইসলামি’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ বলে বর্জন না করে, ইসলামের নৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে যুক্তি, কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে (Jackson, 2024, p. 78)। আধুনিক জীবনের জটিলতা এত বেশি যে, শুধু ওহী ও শরিয়ার কঠোর পাঠ দিয়ে তা সামলানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানবিক যুক্তি ও সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা। যা ফিকহি গৎবাঁধা চিন্তার পরিসরের বাইরে পড়তে পারে, কিন্তু মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ (Jackson, 2024, p. 78)। ইসলামের দ্বীনি উসুল আবহমানকাল থেকেই এরকম প্রগতিশীল। তারমধ্যে জমাটবদ্ধতা নেই। জ্যাকসন যে তত্ত্ব পেশ করছেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত কিছু নয়। ইসলামের মধ্যে পূর্ব থেকেই নিহিত বিষয় হাজির করছেন। অর্থাৎ, ইসলাম দিয়েই ইসলামকে রাষ্ট্রে সাজানোর ফর্মুলা দিচ্ছেন। অধিকন্তু, তাঁর "ইসলামিক সেক্যুলারিটি" বা ধর্মীয় নিরপেক্ষতা আর আমাদের "ধর্মনিরপেক্ষ" হওয়া এক জিনিস নয়। আমরা তথা ধর্ম পালনকারীদের "ধর্মনিরপেক্ষতা" প্রয়োগ হয় সকল ধর্মের উপর। সকল ধর্ম বিবেচনায় আমরা হই ধর্মনিরপেক্ষ। আর জ্যাকসনের "ধর্মীয় নিরপেক্ষতা" মানে, ধর্ম আমাদের বিবেচনায় নিয়ে সে হয় নিরপেক্ষ। যেনো ধর্ম বলে, "যাও আমি তোমাদের কিছু বিষয়ে কোনো পক্ষই নিবো না। কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান দিবো না। তোমাদের হাতে সেগুলো ছেড়ে দিলাম। নিজেদের মেধা, জ্ঞান, রুচি, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে আমার নৈতিকতা ও উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেরা নির্ধারণ করে নাও সেগুলো।"
জ্যাকসন আরও স্পষ্ট করেছেন যে, “ওরিয়েন্টালিস্ট ও ইসলামিস্ট উভয় ধারণাই শরিয়া ও ইসলামকে গুলিয়ে ফেলে। তারা শরিয়াকেই ইসলাম সাব্যস্ত করে ইসলামকে এই মাত্রাতেই সমাপ্ত (co-terminus) করে ফেলে। যাতে অবস্থা দাঁড়ায়, শরিয়ার দ্বারা শাসিত হয় না, এমন কোনো বিষয় বা প্রেক্ষাপট ইসলামে নেই। অথচ বাস্তবতা এমন নয়” (Jackson, 2024, p. 115)। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামকে একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ, অনমনীয় ও প্রতিক্রিয়াশীল কাঠামোতে আবদ্ধ করে ফেলে। যা ধীরে ধীরে ইসলামের ঐতিহাসিক বহুত্ব ও অভিযোজনশীলতাকে ধ্বংস করে। জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ এই সংকীর্ণতা থেকে মুক্তির পথ দেখায় এবং একটি মধ্যম পথ প্রদর্শন করে। যেখানে মুসলিম সমাজ তার নৈতিক নোঙর ধরে রেখে আধুনিক বিশ্বের সাথে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে (Jackson, 2024, p. 115)।
এই বিন্দুতে জ্যাকসন, ইকবাল ও হাল্লাকের সাথে এক অভিন্ন সূত্রে গেঁথে যান। ইকবালের সময়-দর্শন এবং জ্যাকসনের ‘জীবনের জটিলতা’—উভয়েই "পরিবর্তনের অনিবার্যতা ও শরিয়ার প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা" স্বীকার করে (Iqbal, p. 133; Jackson, 2024, p. 78)। ইকবাল যেমন ইজতিহাদের মাধ্যমে সময়ের সাথে তাল মেলানোর কথা বলেছেন, জ্যাকসন তেমনই ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর মাধ্যমে শরিয়ার বাইরের বিষয়গুলোকে ইসলামের নৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে স্বীকার করেছেন (Jackson, 2024, Introduction, p. 3)। আবার হাল্লাক যেমন আধুনিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত কাঠামোর সমালোচনা করে বিকেন্দ্রীকরণের পথ দেখিয়েছেন, জ্যাকসন তেমনই শরিয়ার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে একটি "বহুকেন্দ্রিক ও স্তরীভূত কাঠামো"-র পথ দেখান। যেখানে কেন্দ্রীয় শরিয়া কেবল মৌলিক নৈতিক ও আইনি প্যারামিটার (মাকাসিদ ও কুল্লি নীতি) নির্ধারণ করবে, আর বাকি বিষয় স্থানীয় প্রথা, চাহিদা ও মানবিক যুক্তির (ইজতিহাদের) ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে (Hallaq, 2012, p. 89; Jackson, 2024, p. 78)।
তিন সূত্রের সমন্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা: ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর কাঠামোগত দর্শন
ইকবালের ইজতিহাদের চেতনা, হাল্লাকের রাষ্ট্র-সমালোচনা ও জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’—এই তিনটি পৃথক কিন্তু পরিপূরক চিন্তাধারার সমন্বয়ে ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর একটি কার্যকর ও দার্শনিকভাবে সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব। এই কাঠামো কোনো দিন-প্রতি দিনের প্রশাসনিক ‘পণ্ডিতি’ বা ফাইলের খুঁটিনাটিতে জড়ায় না। বরং এটি শাসনের দার্শনিক স্তরবিন্যাস, কর্তৃত্বের বিভাজন ও নৈতিক তত্ত্বাবধানের একটি বহুমাত্রিক মডেল উপস্থাপন করে।
ঐতিহাসিক খিলাফতের দ্বৈত কাঠামো (শাসকের নির্বাহী সুলতানিজম ও উলামার আইনি কর্তৃত্ব) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এ আমরা তিনটি স্বতন্ত্র কিন্তু পরস্পর-সংযুক্ত স্তর কল্পনা করতে পারি।
প্রথমটি হলো, নির্বাহী ও অর্থনৈতিক স্তর। যা সম্পূর্ণরূপে জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর আওতায় পরিচালিত হবে। এখানে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন প্রশাসন, অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নীতি, ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক আইন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত—যেগুলোর বিষয়ে শরিয়ায় সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই—সেগুলো ইসলামি নৈতিকতার (আমানত, ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ, সুদ-মুক্ত লেনদেন, পরিবেশ সচেতনতা) আলোকে পরিচালিত হবে। এখানে ইকবালের প্রস্তাবিত ‘সমষ্টিগত ইজতিহাদ’-এর বিশেষজ্ঞ প্যানেলগুলো আইন প্রণয়নে সহায়তা করবে। যাতে নতুন সিদ্ধান্তগুলো ইসলামের মূল স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
দ্বিতীয় স্তর হলো, আইনি ও বিচারিক স্তর। যা সরাসরি শরিয়া ও ফিকহি মাযহাবগুলোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে, বিশেষত ব্যক্তিগত আইন (পারিবারিক, বিবাহ, উত্তরাধিকার, ওয়াকফ) ও নাগরিক বিবাদগুলোতে। কিন্তু এখানেও হাল্লাকের আইনের বহুত্ব ও বিকেন্দ্রীকরণের নীতি প্রয়োজ্য হবে। অর্থাৎ, কোনো কেন্দ্রীয় আইনসভা সব অঞ্চলের জন্য একই ফিকহি সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেবে না, বরং স্থানীয় উলামা ও ক্বাজীদের স্বাধীনতা থাকবে নিজ নিজ অঞ্চলের প্রথা, সংস্কৃতি ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী ফতোয়া ও রায় প্রদানের। যেমনটি খেলাফত ব্যবস্থায় ছিলো।
তৃতীয় স্তর হলো, নৈতিক ও তত্ত্বাবধায়ক স্তর। একটি স্বাধীন ‘নৈতিক পরিষদ’, যা উলামা, দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত। এই পরিষদের কাজ হবে নির্বাহী ও আইনি উভয় স্তরের সিদ্ধান্তসমূহ ইসলামের মাকাসিদ (শরিয়ার উদ্দেশ্যাবলি) ও কুল্লি নীতির (সর্বজনীন নৈতিক নীতির) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা—তা পর্যবেক্ষণ করা। তবে এখানে খেয়াল রাখতে হবে, এই পরিষদের মতামত হবে ‘শূরা’ বা পরামর্শ-ভিত্তিক এবং ইকবালের ভাষায় তা হবে ‘অ-আবদ্ধকারী’ (non-binding) যাতে ইজতিহাদের প্রাণশক্তি বিধ্বস্ত না হয় (Iqbal, p. 147)।
এই তিন স্তরের পাশাপাশি, জ্যাকসনের ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা। যেখানে শরিয়ার বিধান নেই, সেখানে ‘অ-ইসলামি’ বলে আখ্যা না দিয়ে তাকে ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ পরিসর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া (Jackson, 2024, p. 45)। এই পরিসরে রয়েছে, শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সামষ্টিক অর্থনীতি ইত্যাদি। যেগুলোতে সরকার ও সমাজ যুক্তি, বিজ্ঞান ও ইসলামি নৈতিকতার সম্মিলিত আলোকে সিদ্ধান্ত নেবে। যা একদিকে যেমন গোঁড়ামিমুক্ত, অন্যদিকে তেমনি নৈতিকভাবে সজাগ।
হাল্লাক যেমন দেখিয়েছেন, ইসলামি ঐতিহ্যে আইনি কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত নয় (Hallaq, 2012, p. 89)। তাই ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এ জাতি-রাষ্ট্রের বদলে একটি বিকেন্দ্রীকৃত ফেডারেল বা কনফেডারেল কাঠামো অধিক গ্রহণযোগ্য। যেখানে আঞ্চলিক সরকারগুলো স্থানীয় প্রথা ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী শরিয়া প্রয়োগের নমনীয়তা পাবে। ইকবাল যেমন ‘সাধারণতন্ত্রী শাসন ব্যবস্থা’কে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেছেন (Iqbal, p. 136)। তেমনি এই বিকেন্দ্রীকরণ আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে খাপ খাইয়ে খিলাফতের ঐতিহাসিক বহুত্বকে ধারণ করতে সক্ষম।
অবশেষে, ঐতিহাসিক খিলাফতে কোনো জাতীয় আইনি সংস্কার প্রয়োজন হলে, তা কখনোই একক শাসকের ফরমান দ্বারা নয়, বরং উলামা ও নেতৃস্থানীয় সমাজের সম্মিলিত ইজতিহাদ ও ইজমার (ঐকমত্য) মাধ্যমে হতো। আধুনিক প্রেক্ষাপটে, ইকবালের প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি জাতীয় ‘ইজতিহাদ কাউন্সিল’ গঠন করা যায়। যেখানে উলামা, আইনবিদ, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও সমাজবিজ্ঞানীরা একত্রে বসে নতুন সমস্যার সমাধান করবেন। এই কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত সমগ্র জাতির জন্য ‘ইজমা’ তথা সম্মিলিত আইনের মর্যাদা পাবে এবং শরিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী হবে।
সমকালীন চ্যালেঞ্জ ও ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
বিশ্ব এখন অভূতপূর্ব গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, জলবায়ু, অর্থনীতি ও জনসংখ্যার গঠন এমন সব প্রশ্ন তুলেছে, যার কোনো সরাসরি উত্তর কুরআন বা হাদিসের সাধারণ পাঠে নেই। এই পরিস্থিতিতে ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর প্রাসঙ্গিকতা পরীক্ষা করা অপরিহার্য। কারণ এটি কেবল অতীতের নস্টালজিয়া নয়; বরং বর্তমানের কয়েকটি অসহ্য সংকটের সম্ভাব্য সমাধান উপস্থাপন করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডিজিটাল নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি আধুনিক প্রযুক্তি মানব জীবনের মৌলিক সংজ্ঞাই পাল্টে দিচ্ছে। কৃত্রিম জরায়ু, জিন এডিটিং (ক্রিস্পার), ডেটা সার্বভৌমত্ব ও অ্যালগরিদমিক শাসন—এসব বিষয়ে প্রচলিত ফিকহি কাঠামো পুরোপুরি নীরব। ইকবাল যেমন যুক্তি দিয়েছিলেন, ইজতিহাদকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর ‘সমষ্টিগত ইজতিহাদ’ কাউন্সিলে প্রযুক্তিবিদ, চিকিৎসক ও নীতিশাস্ত্রবিদরা উলামাদের সাথে বসে এমন নৈতিক নির্দেশিকা তৈরি করতে পারেন, যা ইসলামের ‘মাকাসিদ’ (মানব কল্যাণ, আত্মার মর্যাদা ও পরিবেশের ভারসাম্য) রক্ষা করে। জ্যাকসনের ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর পরিসরে এই বিষয়গুলো পড়ে, যেখানে সরাসরি শরিয়ার বিধান না থাকলেও ইসলামি নৈতিকতা (যেমন, গোপনীয়তা রক্ষা, অপত্যজন্মের পবিত্রতা) অক্ষুণ্ণ থাকে।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু ন্যায়বিচার অবক্ষয়ে, আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু ইসলামি ঐতিহ্যে ‘আমীন’ (বিশ্বাসযোগ্য রক্ষক) ও ‘মিজান’ (ভারসাম্য) ধারণা রয়েছে। হাল্লাক যেমন দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র তার নৈতিক উত্তরাধিকার হারিয়ে ফেলেছে এবং শুধু ‘বৃদ্ধি’ ও ‘উৎপাদন’-এর পূজারী হয়ে দাঁড়িয়েছে (Hallaq, 2012, p. 89)। ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর বিকেন্দ্রীকৃত ও নৈতিক-ভিত্তিক নির্বাহী স্তরটি স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। যা ঐতিহাসিক খিলাফতের ‘হিমা’ (সংরক্ষিত অঞ্চল) নীতির আধুনিক সংস্করণ।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পুঁজিবাদের বিকল্প উপস্থাপন দরকার। বিশ্বের অধিকাংশ সম্পদই এখন কয়েকটি বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে কেন্দ্রীভূত। ইসলামের সুদ-মুক্ত অর্থনীতি, জাকাত ও ওয়াকফ ব্যবস্থা মূলত সম্পদের পুনর্বণ্টনকে উৎসাহিত করে। ইকবাল যেমন আহ্বান জানিয়েছেন, মুসলিম সমাজকে তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের মডেল তৈরি করতে হবে, যা পাশ্চাত্য সাম্যবাদ ও পুঁজিবাদ উভয়ের বাইরে ইনসাফের অর্থনীতি (Iqbal, p. 145)। ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এর ‘ইসলামিক সেক্যুলার’ অর্থনৈতিক নীতি সুদের পরিবর্তে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের (মুদারাবা, মুশারাকা) ভিত্তিতে ব্যাংকিং ও বিনিয়োগের আধুনিক রূপ তৈরি করতে পারে। যা আর্থিক সঙ্কটের ঝুঁকি কমায়।
জাতি-রাষ্ট্রে নানা সংকটের উদ্ভব হচ্ছে এবং উদারনৈতিক গণতন্ত্রের অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে। পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্র আজ মেরুকরণ, বিভাজন ও মিথ্যা তথ্যের সাম্রাজ্যে জর্জরিত। অন্যদিকে, ইসলামি রাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মডেল হিসেবে যা হাজির করা হয়, তাতেও অনেক গোঁড়ামি ও স্বৈরাচার দেখা যায়। ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’ এই উভয় ফাঁদ এড়ায়। এটি যেমন হাল্লাকের আলোকে রাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে, তেমনি ইকবালের আলোকে নির্বাচিত আইনসভার মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। এটি অধিকার ও কর্তব্যের এমন একটি সমন্বয় সৃষ্টি করে, যা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নৈতিক দায়িত্ববোধের সাথে যুক্ত করে। আর তা আধুনিকতার বিভ্রান্ত সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
এই ব্যবস্থা উগ্রবাদ ও যাজকতন্ত্র টাইপ হুজুরতন্ত্র বা মোল্লাতন্ত্র বলে সমাজের বিরুপ ধারণারও অবসান ঘটায়। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। বর্তমান বিশ্বে মানুষ একদিকে আইএস বা দায়েশের মতো উগ্রপন্থীদের ইসলামের নামে সহিংসতা ছড়ানো দেখছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মোল্লাতন্ত্র ধর্মকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার বানায়। জ্যাকসন যেমন সতর্ক করেছেন, শরিয়াকেই ইসলাম সাব্যস্ত করে, এখানেই ইসলামের সমাপ্তি টানার প্রবণতাই মূলত উগ্রবাদের জন্ম দেয়। ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’ এই সংকটের সমাধান দেয়। কারণ এখানে আইনের বহুত্ব ও ‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর স্বীকৃতির কারণে কোনো একক গোষ্ঠী ধর্মের একচ্ছত্র ব্যাখ্যাকারী হয়ে উঠতে পারে না। নৈতিক তত্ত্বাবধায়ক স্তরটি উলামাদের চরম ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করে। যা ফিকহি ‘ইখতিলাফ’ (মতবিরোধ)-এর সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করে।
বহু-সাংস্কৃতিক ও বহু-ধর্মীয় সমাজের সহাবস্থানও নিশ্চিত হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিম অভিবাসী ও সংখ্যালঘুরা ক্রমাগত পরিচয় সংকটে ভোগে। ঐতিহাসিক খিলাফতের ‘মিল্লাত’ ব্যবস্থা যেমন অমুসলিম সংখ্যালঘুদের স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল, একই নীতি ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’-এ প্রতিফলিত হয়। যেখানে অমুসলিমরা তাদের নিজস্ব পারিবারিক আইনে স্বাধীন থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সমান অংশীদার হবে। ববর্তমান দুনিয়ার বাস্তবতায় এই তিন চিন্তকের রাষ্ট্রচিন্তা পাঠ করে মনে হয়, এই চিন্তাগুলোর সমন্বিত উক্ত ব্যবস্থা, আধুনিক বহুত্ববাদী সমাজের জন্য একটি কার্যকর ইসলামি মডেল হতে পারে। যা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভীতিও দূর করে দেয়। বহু-জাতের, বহু-মানসের, বহু-বর্ণের, বহু-ধর্মের সহাবস্থানের একটি সুষম রাষ্ট্রকল্প।
বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্বের পুনরুদ্ধার ও বৈশ্বিক নৈতিক সংকট মোকাবিলা
‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর প্রচলিত আধুনিক ধারণা, যা খিলাফতের একটি আদর্শায়িত, সার্বভৌম ও এককেন্দ্রিক প্রতিরূপ মাত্র— তা ঐতিহাসিক খিলাফতের বৈচিত্র্য, বহুত্ব ও অভিযোজনশীলতাকে কেবল উপেক্ষাই করে না, বরং ইসলামের আত্মিক-নৈতিক মহাবিশ্বকে একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। অথচ ইসলামের মহা-বৈশ্বিক রূপ এর বিপরীত, যেমনটি দেখিয়েছেন ইকবাল। ইসলামের আইনি কাঠামো স্থির নয়। নিজস্ব সময়দর্শন ও ইজতিহাদের মাধ্যমে এটি আধুনিক রাষ্ট্রকেও পুনরায় সংজ্ঞায়িত করতে পারে (Iqbal, p. 133)। আবার হাল্লাক সতর্ক করে দিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌম কাঠামোতে শরিয়ার বাস্তবায়ন একটি অসম্ভব ও আত্মবিরোধী প্রকল্প (Hallaq, 2012, Introduction, p. xiii; p. 280)। অন্যদিকে, জ্যাকসন সেই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের একটি ব্যবহারিক দরজা খুলে দিয়েছেন—‘ইসলামিক সেক্যুলার’-এর ধারণার মধ্য দিয়ে। যা শরিয়ার সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে ইসলামের বৃহত্তর নৈতিক পরিসরকে সক্রিয় রাখে (Jackson, 2024, Introduction, p. 3; p. 115)।
আরকুনের ‘অচিন্তিত’-এর আলোকে, খিলাফত বিলুপ্তি ও ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর উত্থান—এই দ্বৈত ঘটনা ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটকে চিহ্নিত করে (Arkoun,The Unthought in Contemporary Islamic Thought, 2002, p. 205)। মুসলিম চিন্তাবিদরা যখন পাশ্চাত্যের খণ্ডিত ‘ধর্ম’ ও ‘রাষ্ট্র’-এর দ্বৈত কাঠামোর মধ্যে ইসলামকে ফিট করানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেন, তখন তারা ইসলামের ঐতিহাসিক বহুত্ব ও তার আত্মিক-নৈতিক মাত্রাকে উপেক্ষা করেন (Arkoun, 2002, p. 205)।
‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’ সেই বুদ্ধিবৃত্তিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের একটি দার্শনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা। এটি শুধু অতীতের নস্টালজিয়া নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু বিপর্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য, উদার গণতন্ত্রের সংকট এবং উগ্রবাদের মতো সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি কার্যকর উত্তর হতে পারে। এই মডেল ঐতিহাসিক খিলাফতের বহুত্ব, ইকবালের ইজতিহাদের গতিশীলতা, হাল্লাকের বিকেন্দ্রীকরণ ও জ্যাকসনের ব্যবহারিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি "বহুকেন্দ্রিক, অভিযোজনশীল ও নৈতিক-ভিত্তিক বিকল্প"। ইকবাল যেমন তাঁর অমর বাণীতে বলেছেন, “যখন একটি জাতি নিজের ওহীর মূল স্পিরিটকে ধারণ করে নিজের বুদ্ধির জোরে নিজের সমস্যার সমাধান নিজে তৈরি করে, তখনই কেবল তার বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়” (Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 151)। ‘বহুমাত্রিক শরিয়া-শাসন’ সেই বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের একটি আস্থাবান ও যুগোপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ। যা ইসলামের রাজনৈতিক ও আইনি চিন্তাকে তার ঐতিহাসিক প্রাণশক্তি ও মানবিক উদারতায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। একই সাথে ভবিষ্যতের অজানা সংকটের মুখেও টিকে থাকার এবং নিজেকে খাপ খাওয়ানোর উপাদানও এতে নিহিত রয়েছে।
‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’ যেভাবে তৈরি হলো: এর উৎস ও ভাঙার পথ
এইভাবে, ধাপে ধাপে—কুরআনের ‘বদ্ধ কর্পাস’ তৈরি, QR থেকে IR-তে উত্তরণ, মৌখিক থেকে লিখিত থেকে ব্যাখ্যায় কর্তৃত্বের স্থানান্তর, ‘ইসলাম’-কে একটি ধর্মীয় ক্যাটাগরি হিসেবে ইউরোপীয় নির্মাণ, খিলাফত বিলুপ্তির পর ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর আধুনিক স্বপ্ন, এবং সেই স্বপ্নের ‘সর্বগ্রাসী’ ব্যাখ্যা—এই সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের সেই ‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’।
এই দেয়ালের তিনটি স্তম্ভ:
প্রথম স্তম্ভ, ক্যাটাগরিকরণ। ইসলামকে একটি ‘ধর্মীয় বস্তু’-তে পরিণত করা, যা তার আত্মিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন।
দ্বিতীয় স্তম্ভ, রাজনৈতিককরণ। ইসলামকে একটি ‘রাষ্ট্রীয় আদর্শ’-এ পরিণত করা, যা ঔপনিবেশিকতার প্রতিক্রিয়ায় তৈরি।
তৃতীয় স্তম্ভ, সর্বগ্রাসীকরণ। ইসলামকে সবকিছু ঢেকে ফেলার একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা, যা শরিয়ার সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে।
কুরআন-হাদীসের আলোকে উত্তরণের পথ:
কুরআনে রাষ্ট্রের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মডেল দেওয়া হয়নি। বরং দেওয়া হয়েছে নীতি ও দিকনির্দেশনা। যেমন, وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ — “তুমি সৎকাজের আদেশ দাও ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো” (সূরা লোকমান, ৩১:১৭)। রাষ্ট্রের রূপ ও কাঠামো সময় ও প্রেক্ষাপটভেদে পরিবর্তনশীল—এটি ইজতিহাদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْر
“যখন কোনো শাসক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়, সে দুই সওয়াব পায়; আর যদি ইজতিহাদ করে ভুল করে, সে একটি সওয়াব পায়” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে ভুল-শুদ্ধ থাকতে পারে। কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় নয়। তাই ‘সর্বগ্রাসী’ দৃষ্টিভঙ্গি ইজতিহাদের চেতনার পরিপন্থী। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ لاَ يَجْمَعُ أُمَّتِي عَلَى ضَلاَلَةٍ “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতকে ভ্রষ্টতার ওপর একত্রিত করবেন না” (সুনানে তিরমিযী, ২১৬৭)। এছাড়াও উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহি. বলেছিলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিগণ মতপার্থক্য না করলে আমি আনন্দিত হতাম না। কারণ তাঁরা সবাই একমত হয়ে গেলে (ভিন্ন মত পোষণকারী) গোমরাহ হয়ে যেত। কিন্তু তাঁরা মতভেদ করায় সাধারণ মানুষের জন্য (আমলের) প্রশস্ততা তৈরি হয়েছে (ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৯০)।” এই হাদিস ও সাহাবিদের বাণী স্পষ্ট করে যে, ইসলামি ঐতিহ্যে ইজতিহাদের দরজা খোলা রয়েছে এবং একাডেমিক বা তাত্ত্বিক মতপার্থক্যকে একটি যৌক্তিক গণ্ডির ভেতর 'প্রশস্ততা' হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
তবে বর্তমান যুগে এসে এই 'বৈচিত্র্য ও প্রশস্ততা'র সংজ্ঞাকে চরমভাবে বিকৃত করা হয়েছে। ইসলামের সোনালী যুগের সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক ভারসাম্যপূর্ণ মতভেদ আর আজকের সমাজে মুসলিম পণ্ডিত ও আমাদের নিজেদের মধ্যকার চলমান হিংসাত্মক দলীয় কোন্দল, একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি এবং অহমিকাভিত্তিক মতানৈক্য—কখনোই এক নয়। সোনালী যুগের দ্বিমত ছিল সত্য উন্মোচনের আন্তরিক প্রয়াস। আর আজকের কোন্দল হলো গোষ্ঠীগত অহংকার ও পারস্পরিক বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। কুরআন এবং হাদীসের অকাট্য নীতি অনুযায়ী, এই অন্ধ দলীয় সংকীর্ণতা কোনো রহমত নয়, বরং এটি একটি সুপ্ত গজব এবং দ্বীন ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। যেটা আল্লামা ইকবালও সাব্যস্ত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই জাতীয় বিভক্তিকে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ
“তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, অন্যথায় তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি ও গৌরব বিলুপ্ত হবে” (সূরা আনফাল, আয়াত: ৪৬)। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধ্বংসাত্মক কাদা ছোড়াছুড়ির পরিণতি সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক করে তাঁর অমিয় বাণী রেখে গেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ وَلاَ تَحَسَّسُوا وَلاَ تَجَسَّسُوا وَلاَ تَنَافَسُوا وَلاَ تَحَاسَدُوا وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا
“তোমরা অপরের প্রতি কুধারণা করা থেকে বেঁচে থাকো, কেননা কুধারণা বড় মিথ্যা কথা। একে অপরের দোষ খুঁজো না। গোয়েন্দাগিরি করো না, পরশ্রীকাতর হয়ো না, পারস্পরিক হিংসা ও বিদ্বেষ রেখো না এবং একে অপরের প্রতি পিঠ প্রদর্শন (সম্পর্কচ্ছেদ) করো না। তোমরা বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি এই দলাদলির করুণ রূপকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি বলেছিলেন
العَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَالخِلَافُ شَرٌّ
“তাড়াহুড়ো শয়তানের পক্ষ থেকে, আর (অন্ধ জেদ ও দলাদলির) মতভেদ হলো এক মহা মন্দ বা অনিষ্ট” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নম্বর: ১৯৬০, ইমাম বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, ৩/১৪৪)। সুতরাং, যখন মুসলিম পণ্ডিত সমাজ জ্ঞানতাত্ত্বিক সৃজনশীলতা হারিয়ে উগ্র দলাদলিতে লিপ্ত হন, তখন তা সমাজে ইসলামের সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়। এটি প্রমাণ করে, সত্যের খাতিরে একাডেমিক দ্বিমত পোষণ করা যদি রহমত হয়, তবে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ভাইয়ে ভাইয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করা দ্বীন ও মিল্লাতের জন্য নিশ্চিত এক বিপর্যয়।
আশার আলো হলো, অন্ধ ঘরের এই দেয়াল চিরন্তন নয়। এটি মানুষের হাতে গড়া। আর যা মানুষের হাতে গড়া, তা মানুষের হাতেই ভাঙাও সম্ভব। কিন্তু ভাঙার জন্য প্রয়োজন সঠিক ইতিহাস বোধ, ভাষা বোধ, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আত্মবোধ। যতদিন আমরা ইসলামকে তার ঐতিহাসিক, ভাষাগত, আত্মিক ও সহজাত প্রেক্ষাপটে দেখতে না শিখব, ততদিন এই দেয়াল আমাদের বন্দি করে রাখবে। আরকুন যেমন বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন একটি ‘এমার্জিং রিজন’—একটি উদ্ভাসমান যুক্তি। যা আধুনিকতার অর্জনকে স্বীকার করে, কিন্তু ধ্রুপদী ঐতিহ্যের আত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে অস্বীকার করে না (Mohammed Arkoun, The Unthought, pp. 23-28)। আল-আত্তাস যেমন বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন ‘আদব’-এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আখলাকের পুনর্গঠন। যা জ্ঞান ও সত্তার স্তরক্রমকে স্বীকৃতি দেয় (Syed Muhammad Naquib al-Attas, The Concept of Education in Islam, pp. 45-51)। এই দুই পথ মিলিয়েই আমরা খুঁজে পেতে পারি ‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’-এর বাইরের আলো। যেখানে রয়েছে ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ ও ‘অন্ধ রক্ষণশীলতা’—উভয় চরমপন্থার বাইরে উম্মাহর জন্য একটি সম্ভাব্য মুক্তির পথ।
"অন্ধ ঘরের দেয়ালের" পরিণতি ও আরকুনের পদ্ধতিগত হাতিয়ার
এই দ্বিবিধ অবক্ষয়ের বিপরীতে আরকুন শুধু রোগ নির্ণয়ই করেননি, তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতিগত কাঠামোও তৈরি করেছেন। আর সেটাই হলো তাঁর সবচেয়ে বড় প্রকল্প—‘ইসলামিক রিজনের সমালোচনা’ (Critique of Islamic Reason)।
আরকুনের এই প্রকল্পটি মূলত ধ্রুপদী ‘ইজতিহাদ’-কে সম্প্রসারিত করার একটি প্রয়াস। জার্নাল আর্টিকেলে বলা হয়েছে, আরকুন “ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন” ছিলেন এবং তাঁর মতে, “ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব যা দীর্ঘকাল ধরে মুসলিমদের যুক্তিতে ইসলামি অর্থোডক্সি গঠন করেছে”—সেটিই মূল বাধা (Jurnal Syahadah, “Mohammad Arkoun's Renewal Method,” p. 6)। আরকুন মনে করেন, এই বাধার কারণেই মুসলিমরা কুরআনের মূল বার্তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই তিনি ‘ইজতিহাদের’ ধারণাকে সম্প্রসারিত করে একটি ‘সমালোচনামূলক’ প্রকল্প তৈরি করতে চেয়েছেন। যা কেবল আইনি বিষয়েই নয়, বরং ইতিহাস, ভাষা, সমাজ ও মানবিক বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
এই প্রকল্পের মূল হাতিয়ার হলো আরকুনের ‘প্রগতিশীল-রিগ্রেসিভ পদ্ধতি’ (Progressive-Regressive Method)। আরকুনের মতে, ইতিহাসের স্তর খুঁড়তে গেলে আমাদের দুটি দিক থেকে কাজ করতে হয়। একটি হলো ‘রিগ্রেসিভ’ অর্থাৎ, অতীতে ফিরে যাওয়া। ঐতিহাসিক স্তরগুলোর ভেতর থেকে ‘অচিন্তিত’ ও ‘অচিন্তনীয়’ বিষয়গুলোকে উন্মোচন করা। আর অন্যটি হলো ‘প্রগতিশীল’ অর্থাৎ, সেই উন্মোচনকে ব্যবহার করে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য নতুন অর্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 217-218)। এই পদ্ধতিটি আরকুনকে শুধু ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং এর ভেতর থেকে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করতে সাহায্য করে।
এছাড়া আরকুন তিনটি বিশেষ পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়েছেন, যা জার্নাল আর্টিকেলে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
প্রথমটি হলো, সেমিওটিক-লিঙ্গুইস্টিক পদ্ধতি। এটি পাঠ্যকে তার উৎপাদন ও বক্তৃতার কাঠামোতে বিশ্লেষণ করে। এর কাজ হলো “পাঠ্যে ব্যবহৃত কোডগুলো চিহ্নিত করা। যা তার শব্দার্থিক অর্থ তৈরি করে এবং কোন ভাষাগত প্রক্রিয়া এই সীমিত অর্থ তৈরি করে এবং কার জন্য এই অর্থ তৈরি হয়” (Jurnal Syahadah, “Mohammad Arkoun's Renewal Method,” p. 17)। অর্থাৎ, আরকুন কুরআনের ভাষাকে একটি ‘জীবন্ত বক্তৃতা’ হিসেবে দেখতে চান৷ যা তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কী অর্থ বহন করেছিল—তা বোঝার জন্য। যেমন, কুরআনের ‘আয়াত’ শব্দটি শুধু ‘বাক্য’ নয়, এটি একটি ‘চিহ্ন’ বা ‘নিদর্শন’। যা প্রকৃতি ও ইতিহাসের ভেতর দিয়ে আল্লাহর সত্তার দিকে ইঙ্গিত করে। সেমিওটিক পদ্ধতি এই চিহ্নগুলোর স্তর-ভেদে অর্থ উন্মোচন করে।
দ্বিতীয়টি হলো, ঐতিহাসিক-সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি। এটি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। আরকুনের মতে, এই পদ্ধতি “ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে ঐতিহাসিক উদ্দেশ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করে” এবং ধর্মতাত্ত্বিক-গোঁড়ামিপূর্ণ পদ্ধতি যেসব মাত্রা বাদ দিয়েছে, ঐতিহাসিকতা ও সমাজতাত্ত্বিক গ্রহণযোগ্যতা সেগুলোকে সামনে আনে (Jurnal Syahadah, “Mohammad Arkoun's Renewal Method,” p. 18)। যেমন, কুরআনের যেসব আয়াত যুদ্ধ-বিগ্রহ বা সামাজিক আইন নিয়ে এসেছে, সেগুলোকে শুধু চিরন্তন হুকুম হিসেবে না দেখে, সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। ঐতিহাসিক-সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি এই প্রেক্ষাপট উন্মোচন করে।
এখানে যে পদ্ধতির কথা বলা হলো, আরকুন এটিকে কুরআন বোঝার ‘ঐতিহাসিক-নৃতাত্ত্বিক পাঠ’ (historical-anthropological reading) বলে অভিহিত করেছেন (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought (London: Saqi Books, 2002, P. 48)।
তিনি বলেন, ধর্মতাত্ত্বিক-গোঁড়ামিপূর্ণ (dogmatic-theological) পদ্ধতি কুরআনকে ‘ঈশ্বরের অবিকল বিধানের বাণী’ হিসেবে পড়ে। যেখানে প্রতিটি আয়াত কালাতীত, স্থান-কাল নিরপেক্ষ ও চিরন্তন বিধান। কিন্তু আরকুন প্রশ্ন তোলেন, এই ‘চিরন্তনতা’ কীভাবে ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে (৭ম শতাব্দীর আরবে) অবতীর্ণ হলো? তার উত্তর হলো, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে যদি "ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া (historical process) হিসেবে দেখা হয়, তাহলে আমরা দেখতে পাই, কুরআনের বাণী একটি নির্দিষ্ট সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে (Mecca ও Medina-র উপজাতীয় সমাজে) ‘উদিত’ হয়েছে এবং সেই প্রেক্ষাপটেই এর অর্থ প্রথমে গৃহীত বা বর্জিত হয়েছে (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought (London: Saqi Books, 2002, p. 55)।
তাই তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কুরআনের প্রতিটি আক্ষরিক বিধান চিরন্তন’—এটা মানতে গেলে এই ঐতিহাসিক পদ্ধতি কীভাবে সম্ভব? এখানেই আসে আরকুনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পার্থক্য ‘মেথডোলজিক্যাল সাসপেনশন’ (methodological suspension) বা ‘পদ্ধতিগত স্থগিতকরণ’ (Arkoun, 2002, P. 73)।
আরকুন বলেন, একজন ইতিহাসবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী যখন কুরআন পড়েন, তখন তিনি ধর্মতাত্ত্বিক বিচারকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন। অর্থাৎ, তিনি বলেন না “কুরআন আল্লাহর বাণী নয়” বা “এটি মিথ্যা”। বরং তিনি বলেন, “আমি এখন ধর্মতাত্ত্বিক সত্য-মিথ্যার বিচার না করে, ভাষাগত, ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্নগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই বিচারকে স্থগিত রাখছি” (Arkoun, 2002, p. 73)।
এটা ঠিক যেমন একজন চিকিৎসক রোগীর ‘আত্মা’ নিয়ে বিতর্ক না করে তার ‘শারীরিক উপসর্গ’ পরীক্ষা করেন, তেমনই আরকুন কুরআনের ‘ঐশী উৎস’ নিয়ে বিতর্ক না করে তার ‘ঐতিহাসিক আবির্ভাবের শর্ত’ (conditions of emergence) পরীক্ষা করতে চান (Arkoun, 2002, P. 57)।
প্রশ্ন আসে, তাহলে ‘চিরন্তন বিধান’ আর ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট’—এই দুইয়ের সমন্বয় কীভাবে সম্ভব? আরকুন এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনেছেন, ‘কুরআনিক ফ্যাক্ট’ (Qur’anic fact) ও ‘ইসলামিক ফ্যাক্ট’ (Islamic fact)-এর পার্থক্য (Arkoun, 2002, P. 109)।
‘কুরআনিক ফ্যাক্ট’ হলো, কুরআনের আদি মৌখিক উচ্চারণ (oral enunciation), যা ৬১০-৬৩২ সালের আরব সমাজে একটি ‘আধ্যাত্মিক-সামাজিক আন্দোলন’ হিসেবে কাজ করেছিল। এখানে আয়াতগুলোর ‘আপতিক অর্থ’ (contingent meaning) ছিল, যুদ্ধ-বিগ্রহ, বংশগত দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত।
‘ইসলামিক ফ্যাক্ট’, হলো পরবর্তীকালে রাষ্ট্র (খিলাফত) ও আইনবিদদের (উলামা) হাতে কুরআনকে ‘বদ্ধ সরকারি করপাস’ (Official Closed Corpus)-এ পরিণত করা এবং সেই আয়াতগুলোর আইনকে আক্ষরিকভাবেই ‘চিরন্তন ও সর্বকালীন আইন’ (eternal divine law) হিসেবে ঘোষণা করা (Arkoun, 2002, P. 114-115)।
আরকুনের মতে, ‘চিরন্তন বিধান’ ধারণাটি ঐতিহাসিক ‘কুরআনিক ফ্যাক্ট’-এর ওপর ধর্মতাত্ত্বিকদের ‘পবিত্রীকরণ’ (sacralization) ও ‘কালাতীতকরণ’ (transcendentalization)-এর ফল। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সমাজের জন্য দেওয়া নির্দেশনা (যেমন সূরা তাওবাহ-এর ৫ নং যুদ্ধের আয়াত) পরে ‘সর্বকালের জন্য চিরন্তন বিধান’-এ রূপান্তরিত হয়। যখন রাষ্ট্র (খিলাফত) ও ঐতিহ্য-কাতর গোড়ার ধর্মতাত্ত্বিকরা (fundamentalists) এই আয়াতটিকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে ছিঁড়ে নিয়ে ‘সর্বকালের জন্য চিরন্তন আইন’ হিসেবে ঘোষণা করলেন (Arkoun, 2002, P. 108-109)।
আরকুন কুরআনের বাণীকে চিরন্তন "ঐশীবাণী হওয়াকে অস্বীকার করেন না", বরং তিনি ‘ঐশীত্বের ভাষ্য’ (theological discourse)-কে ‘ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ থেকে আলাদা রাখেন। তাঁর যুক্তি হলো, “ঈশ্বরের বাণী চিরন্তন হতে পারে, কিন্তু সেই বাণী যখন মানবভাষায় (আরবি) এবং মানবসমাজে (সপ্তম শতাব্দীর আরবে) অবতীর্ণ হয়, তখন তার ‘অর্থায়ন’ (interpretation) ও ‘প্রয়োগ’ (application) ঐতিহাসিক ও সামাজিক শর্তের অধীনস্থ হয়” (Arkoun, 2002, P. 90-91)।
যেমন, সূরা ৯-এর ‘তরবারির আয়াত’ (৯:৫) যদি চিরন্তন হয়, তাহলে আজও কেন সব মুসলিম তা আক্ষরিকভাবে প্রয়োগ করে না? কারণ ইতিহাস ও সমাজ পরিবর্তিত হয়েছে। আরকুন বলেন, ঐতিহাসিক-সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি এই ‘পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট’-কে সামনে আনে, যা ধর্মতাত্ত্বিক পদ্ধতি ‘অচিন্তিত’ (unthought) রেখে দেয় (Arkoun, 2002, P. 93)।
উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, একজন পিতা তাঁর ছোট ছেলেকে বললেন, “রাস্তা পার হওয়ার সময় আমার হাত ধরে থেকো।” এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের (ছেলেটির শৈশবকালের) জন্য একটি নির্দেশনা। কিন্তু ছেলেটি যখন বড় হলো, তখন পিতা যদি বলেন, “তুমি আজীবন আমার হাত ধরে রাস্তা পার হবে”—এটা যেমন অযৌক্তিক, তেমনই কুরআনের কোনো আয়াতকে (যা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংকটে নাযিল হয়েছিল) ‘সর্বকালের চিরন্তন বিধান’ বানিয়ে ফেলাও সমান অযৌক্তিক। আরকুনের ঐতিহাসিক পদ্ধতি কাজ করে ‘পিতার সেই আদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট’ বোঝানোর জন্য। যাতে আমরা বুঝতে পারি কোন আদেশ চিরন্তন নীতি (যেমন সুরক্ষা) এবং কোনটি সময়োপযোগী নির্দেশনা (হাত ধরা)।
মোহাম্মদ আরকুনের মতে, কুরআন ও ইসলামি চিন্তাধারার পুনঃপঠনের জন্য তিনটি পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গির তৃতীয় ও সর্বশেষ পদ্ধতি হলো, ‘ধর্মতাত্ত্বিক মনোভাব’।
আরকুনের মতে, ‘ধর্মতাত্ত্বিক মনোভাব’ বলতে বোঝায় জ্ঞানের সকল প্রক্রিয়ায় ধর্মতত্ত্বকে পদ্ধতিগত নিয়মরূপে প্রয়োগ করা। এর অর্থ হলো, ধর্মীয় বিশ্বাস ও জ্ঞানকে কেবল বিমূর্ত বা ঐতিহ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, মানুষের আবেগ-অনুভূতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মানসিক গঠনপ্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত করে বোঝার চেষ্টা করা।
আরকুন জোর দিয়ে বলেন, বিশ্বাস (faith) একটি অত্যন্ত জটিল মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া। তিনি বিশ্বাসকে কেবল যুক্তির কাঠগড়ায় বিচার করতে চান না। তিনি মনে করেন, বিশ্বাস সাধারণত দমন করা কঠিন এমন ভালোবাসার আবেগ, জটিল স্মৃতি, অস্পষ্ট কল্পনা ও যুক্তির দৃঢ় দাবির সাথে মিলে কাজ করে।
এই ধর্মতাত্ত্বিক মনোভাব বাস্তবায়নের জন্য আরকুন "নতুন সামাজিক বিজ্ঞান ও জ্ঞানের মনোবিজ্ঞানের" সাহায্য নেওয়ার পক্ষপাতী। তাঁর মতে, ওহী (revelation) ও বিশ্বাসের অধ্যয়নকে সমৃদ্ধ করতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে:
ক. ইতিহাস (History)। ধর্মীয় ঘটনাবলীকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা।
খ. নৃতত্ত্ব (Anthropology)। ধর্মীয় বিশ্বাসকে মানবিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা।
গ. সমাজবিজ্ঞান (Sociology)। ধর্ম ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা।
ঘ. মনোবিজ্ঞান (Psychology)। বিশ্বাসের মানসিক ও আবেগগত দিকগুলি অনুধাবন করা।
উদাহরণস্বরূপ, কুরআনের কোনো আয়াত বা কোনো ধর্মীয় বিধান নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। "প্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিক পদ্ধতি" সাধারণত আয়াতটির আক্ষরিক অর্থ বা প্রথাগত ব্যাখ্যার ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে, "আরকুনের ধর্মতাত্ত্বিক মনোভাব" নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলি তুলে ধরবে,
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। আয়াতটি কোন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে নাজিল হয়েছিল? তখনকার সমাজের অবস্থা কেমন ছিল?
২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ। এই বিধানটি তখনকার সমাজে কী প্রভাব ফেলেছিল? এটি কীভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথার সাথে সম্পর্কিত?
৩. মানসিক ও আবেগগত দিক। এই আয়াত বা বিধানটি বিশ্বাসীদের মনে কী ধরনের আবেগ (ভালোবাসা, ভয়, আশা) সৃষ্টি করে? এটি কীভাবে তাদের স্মৃতি ও কল্পনার সাথে যুক্ত?
৪. যুক্তির ভূমিকা। এই বিধানটি কি যুক্তিসঙ্গত? এটি কি আধুনিক যুক্তি ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বর্তমানে এটির প্রায়োগিক বিজ্ঞান কী হতে পারে?
এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরকুন ধর্মীয় বিধানকে কেবল একটি স্থির ও অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে না দেখে, বরং 'একটি গতিশীল, মানবিক ও ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া' হিসেবে দেখতে চান। যা মানুষের আবেগ, যুক্তি, স্মৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে সংযুক্ত। (Perwira, Humaidi & Nasrullah, “Mohammad Arkoun’s Renewal Method for Reading the Qur’an and Islamic Sciences,” Jurnal Syahadah, Vol. XII, No. 1, April 2024, p. 18)
আরকুন ‘ধর্মতাত্ত্বিক মনোভাব’ (Theological Attitude) নামে যে পদ্ধতির কথা বলেছেন, তার মূল কথা হলো—ধর্ম ও বিশ্বাসকে বুঝতে গেলে শুধু ধর্মগ্রন্থ বা যুক্তির দিকে তাকালেই চলবে না; বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব (psychology), সমাজতত্ত্ব (sociology) ও ইতিহাসকেও বিশ্লেষণে আনতে হবে।
তিনি প্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিকদের সমালোচনা করে বলেন, তাঁরা বিশ্বাসকে অনেক শুষ্ক ও যান্ত্রিকভাবে দেখেন। অথচ বাস্তবে বিশ্বাস হলো মানুষের আবেগ, ইতিহাস, কল্পনা ও যুক্তির একটি জটিল ও গতিশীল মিশ্রণ। তাই ধর্মীয় জ্ঞানকে পুনর্নির্মাণ করতে হলে এই জটিলতাকে স্বীকার করে নতুন সামাজিক বিজ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে। এই তিনটি পদ্ধতি মিলে আরকুনের ‘ইসলামিক রিজনের সমালোচনা’-কে একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করে, যা ‘অন্ধ দেয়াল’-এর প্রতিটি ইটকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে সাহায্য করে।
আরকুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘এমার্জিং রিজন’ বা উদ্ভাসমান যুক্তি। তিনি এই ধারণাটি তৈরি করেছেন আধুনিকতার অর্জন ও ধ্রুপদী ঐতিহ্য, উভয়টি অস্বীকার না করে একটি নতুন আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের পথ খুঁজতে। আরকুনের মতে, এই উদ্ভাসমান যুক্তি “অগত্যা আধুনিক যুক্তির একটি সম্প্রসারণশীল বিবর্তনমূলক রৈখিক প্রক্রিয়া হিসেবে উদ্ভাসিত হয় না। এটি আধুনিকতার প্রচুর অর্জনকে উপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু এটি ধর্মীয় অনুপ্রেরণার সাথে যুক্ত জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমস্ত উত্তরাধিকারকেও আগে থেকেই অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে না” (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 23-28)। অর্থাৎ, এমার্জিং রিজন একটি সেতু—যা একদিকে আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের অর্জনকে স্বীকার করে, অন্যদিকে ধ্রুপদী ইসলামি ঐতিহ্যের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে অস্বীকার করে না। এটি মুসলিম মনকে ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ ও ‘অন্ধ রক্ষণশীলতা’—এই দুই চরমপন্থার বাইরে একটি তৃতীয় পথ দেখায়।
আরকুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক হাতিয়ার হলো ‘ভায়োলেন্স, স্যাক্রেড অ্যান্ড ট্রুথ’ (Violence, Sacred and Truth) ত্রিভুজ। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ‘সত্য’ (হক্ব) ধারণা—যা কুরআনের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য—ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সামাজিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফোলকারের মতে, আরকুন এই ধারণাটি ব্যবহার করে দেখান, “ইসলামকে প্রায়ই ‘দ্বীন আল-হক্ক’ বা সত্য ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়—যা অন্যান্য ধর্মের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে” (Katharina Völker, “Arkoun's Study of the Quran,” SOCARX, p. 5)। আরকুনের মতে, এই ‘হক্ব’-এর ধারণা যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন তা ‘স্যাক্রেড’ বা পবিত্রতার আবরণে ‘ভায়োলেন্স’ বা সহিংসতাকে বৈধতা দেয়। সূরা তওবার ৯:৫ আয়াতকে—যা ‘তরবারির আয়াত’ নামে পরিচিত—আরকুন এই ত্রিভুজের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন। এই আয়াতটি যখন তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে (মক্কা বিজয়ের পর মুশরিকদের সাথে চুক্তির প্রেক্ষাপট) পড়া হয়, তখন এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতির নির্দেশনা। কিন্তু যখন একে ‘স্যাক্রেড’ বা চিরন্তন পবিত্র সত্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন তা ‘ভায়োলেন্স’-কে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এই ত্রিভুজটি ‘ইলম ও হিকমা’-র স্রোত পুনরুদ্ধারের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে। কারণ আরকুন দেখান, কীভাবে সত্যের ধারণাকে তার রাজনৈতিক অপব্যবহার থেকে মুক্ত করে পুনরায় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করানো যায়।
এই দ্বিবিধ অবক্ষয় রোধে আরকুনের পাশাপাশি আরও অনেক চিন্তাবিদ বিভিন্ন পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন। কেউ শিক্ষার ভিত্তি পুনর্নির্মাণের কথা বলেছেন, কেউ সভ্যতাগত পুনর্জাগরণের শর্তাবলী চিহ্নিত করেছেন, কেউ আবার পশ্চিমা অনুকরণ ও প্রত্যাখ্যান—এই দুই চরমপন্থার বাইরে একটি ‘তৃতীয় পথ’-এর প্রস্তাব দিয়েছেন। আর কেউ নৈতিকতাকে কেন্দ্রে রেখে আধুনিকতার একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই চারজন চিন্তাবিদ—সৈয়দ মুহাম্মদ নাকিব আল-আত্তাস, মালিক বেন্নাবি, সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী ও ত্বাহা আব্দুর রহমান—প্রত্যেকেই ভিন্ন পথে হলেও একই লক্ষ্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। মুসলিম মনকে তার ‘আদব-আখলাক’, ‘আত্মা’, ‘ঐতিহাসিক চেতনা’ ও ‘নৈতিকতা’-র সাথে পুনঃসংযুক্ত করা। আর এই পুনঃসংযোগই হতে পারে ‘অন্ধ দেয়াল’-এর বাইরে যাওয়ার প্রথম ধাপ।
মালয়েশিয়ান দার্শনিক সৈয়দ মুহাম্মদ নাকিব আল-আত্তাস তাঁর ‘দ্য কনসেপ্ট অফ এডুকেশন ইন ইসলাম’ গ্রন্থে শিক্ষার একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি ‘তাদিব’ শব্দটিকে শিক্ষার মূল ধারণা হিসেবে প্রস্তাব করেছেন, যা ‘তালিম’ (শিক্ষাদান) বা ‘তারবিয়াত’ (প্রতিপালন)-এর চেয়ে অনেক বেশি গভীর (Syed Muhammad Naquib al-Attas, The Concept of Education in Islam, pp. 45-51)। আল-আত্তাসের মতে, ‘আদব ও আখলাক’-এর মূল অর্থ হলো নিজের স্থান সম্পর্কে সচেতনতা, জ্ঞান ও সত্তার স্তরক্রমকে বোঝা, এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করা (Syed Muhammad Naquib al-Attas, The Concept of Education in Islam, p. 22)। এটি কেবল শিষ্টাচার নয়; এটি একটি অস্তিত্বগত বোধ। যা মানুষকে জানায় সে কে, তার স্রষ্টার সাথে তার সম্পর্ক কী, সৃষ্টিজগতে তার অবস্থান কী, এবং অন্যান্য সৃষ্টির প্রতি তার দায়িত্ব কী। আল-আত্তাস ‘আদব’-কে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। নিজের সাথে আদব (আত্মশুদ্ধি), সমাজের সাথে আদব (সামাজিক দায়িত্ব), এবং স্রষ্টার সাথে আদব (আল্লাহ-সচেতনতা)। তাঁর মতে, শিক্ষার প্রকৃত নাম ‘তা'দিব’। কারণ এটি ‘আদব’-কে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়া। ‘তা'দিব’-এর মধ্যে তিনটি উপাদান একীভূত, ‘ইলম’ (জ্ঞান), ‘তা'লিম’ (শিক্ষাদান) ও ‘তারবিয়াত’ (প্রতিপালন) (Jurnal Syahadah, “Mohammad Arkoun's Renewal Method,” p. 6)। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইসলামে জ্ঞান ছাড়া কোনো আমল মূল্যবান নয়, এবং আমল ছাড়া কোনো জ্ঞান মূল্যবান নয় (Syed Muhammad Naquib al-Attas, The Concept of Education in Islam, p. 48)।
আল-আত্তাস তাঁর ‘ইসলাম অ্যান্ড সেক্যুলারিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পশ্চিমা সভ্যতা জ্ঞানকে তার আত্মিক ও ঐশী উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুবাদী হাতিয়ারে পরিণত করেছে (Syed Muhammad Naquib al-Attas, Islam and Secularism, pp. 15-32)। তাঁর মতে, পশ্চিমা ‘সেক্যুলারিজম’ হলো জ্ঞান থেকে ‘আদব’-কে অপসারণ করার নামান্তর। যখন জ্ঞান তার ‘আদব’ হারায়, তখন তা আর জ্ঞান থাকে না, হয়ে ওঠে অস্ত্র। মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত আধুনিক বুদ্ধিজীবীগণ যখন এই আত্মাহীন পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বকে কোনো ফিল্টারিং বা যাচাই ছাড়াই ইসলামি সমাজে ঢুকিয়ে দেন, তখন সমাজের সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। আল-আত্তাস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই শিকড়হীন প্রগতিবাদের সমালোচনা করে একে উম্মাহর আত্মিক আত্মহত্যার শামিল বলে ঘোষণা করেছেন। এই প্রসঙ্গে বায়হাকি ‘শু‘আবুল ঈমান’-এ আবু সাঈদ খুদরি রাযি. ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি থেকে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার কোনো ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেন তার সুন্দর নাম রাখে এবং তাকে আদব-শিক্ষা দেয়। যখন সেই সন্তান বালেগ হয়, তখন তাকে যেন বিবাহ দেয়। যদি বালেগ হওয়ার পরও বিবাহ না দেয় এবং (সন্তান) পাপে লিপ্ত হয়, তবে সেই পাপের বোঝা পিতার ওপর বর্তাবে” (বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান, ১১/১৩৭)। হাদিসটি পিতাকে তিনটি নির্দেশ দিয়েছে—সুন্দর নাম রাখা, আদব-শিক্ষা দেওয়া, এবং বালেগ হলে বিবাহ দেওয়া। এটি দেখায়, ‘আদব’ একটি সামগ্রিক দায়িত্ব। যা সন্তানের দুনিয়াবি ও আখেরাতি কল্যাণ উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি ‘বিনা প্রশ্নে আনুগত্য’-এর বিপরীতে একটি ‘দায়িত্বশীল কর্তৃত্ব’-এর ধারণা দেয়।
আল-আত্তাসের এই ‘আদব’-কেন্দ্রিক বিশ্লেষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে, পাকিস্তানি-আমেরিকান দার্শনিক ফজলুর রহমান (১৯১৯-১৯৮৮ খ্রি.) এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি পদ্ধতিগত কাঠামো প্রস্তাব করেছেন। যা ‘ডাবল মুভমেন্ট’ থিওরি (Double Movement Theory) নামে পরিচিত (Fazlur Rahman, Islam and Modernity, p. 5)। ফজলুর রহমান বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামি চিন্তাবিদ এবং ‘নব্য-আধুনিকতাবাদ’ (Neo-Modernism)-এর প্রবর্তক। তাঁর মতে, কুরআনের মূল বার্তা ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও নৈতিক সংস্কার। যা তিনি কুরআনের ‘নৈতিক আদর্শ’ (moral ideal) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফুকাহারা সেই বার্তাকে সরু আইনি কাঠামোতে আবদ্ধ করে ফেলেন। ফলে কুরআনের মূল আত্মাটি ইতিহাসের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি ‘ডাবল মুভমেন্ট’ পদ্ধতির প্রস্তাব করেন।
এই পদ্ধতির প্রথম আন্দোলন হলো বর্তমান থেকে অতীতে ফিরে যাওয়া। এই ধাপে মুফাসসিরকে বর্তমান সময়ের সমস্যা ও প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে হবে। এর দুটি স্তর রয়েছে। প্রথমত, কুরআনের সামগ্রিক বার্তা ও বিশ্বদৃষ্টি (worldview) বোঝা। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট আয়াতগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে (শানে নুযুল, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে) পড়া। এই ধাপে ‘সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান’ (specific legal rulings) ও ‘নৈতিক আদর্শ’ (moral ideal)-এর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। নৈতিক আদর্শ হলো চিরন্তন ও সর্বজনীন; অন্যদিকে, আইনি বিধানগুলো ছিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উত্তর। তবে অবশ্যই সকল আইনি বিধান ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উত্তর হিসেবে ইজতেহাদের অনুমতি দেয় না। কিছু বিধান এমন আছে, যা সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হলে সেই সুনির্দিষ্ট আইন সর্বযুগে প্রযোজ্য।
দ্বিতীয় আন্দোলন হলো অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসা। প্রথম আন্দোলন থেকে প্রাপ্ত সার্বজনীন নৈতিক নীতিগুলোকে (যেমন—ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবাধিকার) বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করতে হবে। এই ধাপে বর্তমান সময়ের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এরপর সেই বিশ্লেষণের আলোকে নৈতিক আদর্শগুলোকে বাস্তবায়নের নতুন উপায় খুঁজতে হবে। যেমন, সুদ নিষিদ্ধ করার পেছনের নৈতিক আদর্শ—অর্থাৎ অর্থনৈতিক শোষণ দূরীকরণ। এই নৈতিকতা থেকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ে ‘মুদারাবা’ (profit-sharing) ও ‘মুশারাকা’ (partnership) মডেল ব্যবহার করা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P) ইসলামি ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা সরাসরি লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি করে নেবেন, কোনো নির্দিষ্ট সুদ ছাড়াই।ফজলুর রহমানের মতে, এই পদ্ধতি কুরআনকে শুধু আক্ষরিক ও খণ্ডিতভাবে না পড়ে, বরং সামগ্রিক ও প্রাসঙ্গিকভাবে বুঝতে সাহায্য করে। এটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক—উভয় মাত্রাকে গুরুত্ব দেয় এবং ইজতিহাদকে একটি সুসংহত পদ্ধতিগত ভিত্তি প্রদান করে। ফজলুর রহমানের এই পদ্ধতি শুধু আইনি বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্যও প্রযোজ্য।
ফজলুর রহমানের এই পদ্ধতি আল-আত্তাসের ‘আদব’-এর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আল-আত্তাস যেমন বলেছেন, জ্ঞান তার ‘আদব’ হারালে তা অস্ত্রে পরিণত হয়, ফজলুর রহমান তেমন বলেছেন, ইজতিহাদ তার পদ্ধতি হারালে তা নিষ্প্রাণ পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হয়। উভয়েই একমত যে, বর্তমান উম্মাহর সংকট মোকাবিলায় পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া নয়, বরং নতুন করে চিন্তা করার সাহস ও পদ্ধতি প্রয়োজন।
আলজেরিয়ান চিন্তাবিদ মালিক বেন্নাবি মুসলিম বিশ্বের পতনের কারণ ও ‘নাহদা’ (পুনর্জাগরণ)-এর শর্ত নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তাঁর ‘শুরুত আন-নাহদা’ (Conditions of the Renaissance) গ্রন্থটি ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয়, যা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বেন্নাবি ইবনে খালদুনের সভ্যতাগত চক্রতত্ত্বকে আরও গভীর করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিটি সভ্যতার উত্থান-পতনের পেছনে তিনটি মৌলিক উপাদান কাজ করে। যাকে তিনি ‘আল-ইনসান’ (মানুষ), ‘আত-তুরাব’ (মাটি) ও ‘আল-ওয়াক্ত’ (সময়/ইতিহাস) নামে চিহ্নিত করেছেন।
‘আত-তুরাব’ হলো সেই ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যা সভ্যতার উত্থান-পতন নির্ধারণ করে। মুসলিম সভ্যতার ‘তুরাব’ হলো আরব-ইসলামি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, যা থেকে বর্তমান প্রজন্ম বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ‘আল-ইনসান’ হলো সেই মানবিক শক্তি যা এই ‘তুরাব’-কে কাজে লাগিয়ে সভ্যতা গড়ে তোলে কিন্তু মুসলিম সমাজে মানুষ তার নিজস্ব ঐতিহাসিক চেতনা হারিয়ে ফেলেছে। ‘আল-ওয়াক্ত’ হলো সেই ঐতিহাসিক সময়, যার মধ্যে পুনর্জাগরণ ঘটতে হবে। বেন্নাবি মুসলিম পতনের দুটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ‘আল-কাবিলিয়্যাহ লিল-ইস্তি‘মার’ (Colonisibility)—উপনিবেশিত হওয়ার মানসিক প্রবণতা বা যোগ্যতা, যখন ইসলামি সমাজ (পোস্ট-মুওয়াহহিদুন যুগে) তার নিজস্ব গতিশীলতা ও আধ্যাত্মিক শক্তি হারিয়ে ভেতর থেকে স্থবির হয়ে পড়ে এবং বাহ্যিক শক্তির অধীনতা মেনে নেওয়ার উপযোগী হয়। দ্বিতীয়ত, ‘আল-ইস্তি‘মার’—বাহ্যিক উপনিবেশবাদ। যা এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বস্তুগতভাবে পরাধীন করে ফেলে। বিশেষ করে ‘আল-ইস্তি‘মার আল-ফিকরি’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশের ফলে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানতত্ত্ব মুসলিম মনকে এমনভাবে প্রভাবিত করল যে, সে নিজের ঐতিহ্যকে ‘অপদার্থ’ মনে করতে শুরু করল। বেন্নাবির মতে, পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজন প্রথমত, নিজেদের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিকতা’ থেকে মুক্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে; এবং তৃতীয়ত, নিজেদের সভ্যতাগত অবদান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। বেন্নাবি মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় সভ্যতার অগ্রগতি ব্যাখ্যা করেছেন। সভ্যতা হলো ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল। যেখানে ধর্মীয় ধারণাগুলো মানুষের কর্মকে প্রভাবিত করে এবং সেই কর্ম আবার নতুন ধারণার জন্ম দেয়। এই প্রক্রিয়া যখন থেমে যায়, তখন সভ্যতা স্থবির হয়ে পড়ে। বেন্নাবি ‘ওয়াক্ত’ (সময়)-এর ধারণাকে আরও গভীর করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস একটি ‘জীবন্ত প্রক্রিয়া’, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত পরস্পর-সংযুক্ত। অতীতকে ভুলে গেলে বর্তমান অর্থহীন হয়ে যায়, আর বর্তমানকে না বুঝলে ভবিষ্যত নির্মাণ করা যায় না।
ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রাহি. এই সংকট থেকে উত্তরণের একটি ‘তৃতীয় পথ’ প্রস্তাব করেছেন। তাঁর ‘স্পিকিং প্লেইনলি টু দ্য ওয়েস্ট’ বা 'মাগরিব সে কুছ সাফ-সাফ বাতেঁ' গ্রন্থটি ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়। যা পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছে মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করার একটি অনন্য প্রচেষ্টা। নদভী পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ ও গোঁড়ামি প্রত্যাখ্যান—এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তিনি পশ্চিমা শক্তিকে স্বীকার করেছেন, কিন্তু এর বস্তুবাদী ভিত্তির সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছেন। নদভীর ‘তৃতীয় পথ’-এর মূল ভিত্তি হলো ‘আত্মিক পুনর্জাগরণ’। নদভী পাশ্চাত্য সভ্যতার হৃদয়ে আধ্যাত্মিক সংকটের কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রকৃতিকে জয় করলেও মানুষের জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর—উদ্দেশ্য, আত্মীয়তা, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও জীবনের চূড়ান্ত অর্থ ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতা বস্তুগত উন্নতিতে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু এই সাফল্যের সাথে সাথে তার আত্মা হারিয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে, মুসলিম সমাজ তার আত্মাকে ধরে রাখতে গিয়ে বস্তুগত উন্নতিতে এমনভাবে পিছিয়ে পড়েছে, অতীত গৌরবও ম্লান মনে হয়। নদভীর ‘তৃতীয় পথ’ হলো, পশ্চিমার বস্তুগত প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকে আত্মস্থ করা, কিন্তু তার বস্তুবাদী দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করা। আর এই আত্মস্থকরণের জন্য প্রয়োজন ইসলামি আত্মার পুনর্জাগরণ। যা কুরআন ও সুন্নাহর গভীর তাত্ত্বিক ও দার্শনিক পাঠের মাধ্যমে সম্ভব। নদভী মুসলিম অভিজাতদের বুদ্ধিবৃত্তিক নির্ভরশীলতার সমালোচনা করেছেন। যারা পশ্চিমা মডেল অনুকরণ করে নিজের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা তথা নিজস্ব শেকড় থেকে দর্শন নির্মাণ, সাংস্কৃতিক প্রামাণ্যতা ও গভীর আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মরক্কোর দার্শনিক ত্বাহা আব্দুর রহমান এই সংকটকে আরেকটি মাত্রা দিয়েছেন। তাঁর ‘রূহ আল-হাদাসা’ (The Spirit of Modernity) গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্য আধুনিকতা কেবল যুক্তিবাদকে প্রাধান্য দিয়েছে, কিন্তু নৈতিকতাকে উপেক্ষা করেছে।ত্বাহা আব্দুর রহমানের মতে, পাশ্চাত্য আধুনিকতা হলো ‘বিচ্ছিন্ন যুক্তি’—যা নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অন্যদিকে, ইসলামি ঐতিহ্যে রয়েছে ‘সংযুক্ত যুক্তি’—যা ওহী ও নৈতিকতার সাথে যুক্ত। তিনি পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে ‘আদর্শ আধুনিকতা’ থেকে দূরবর্তী বলে সমালোচনা করেছেন এবং ইসলামি আধুনিকতার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা আত্মিক-নৈতিকতার কাছাকাছি। ত্বাহা আব্দুর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ‘নৈতিক ফিল্টার’-এর ধারণা। তিনি বলেন, পাশ্চাত্য আধুনিকতার সবকিছুকে বিনা যাচাইয়ে গ্রহণ করা যায় না। প্রয়োজন একটি ‘নৈতিক ফিল্টার’, যা নির্ধারণ করবে কোন জ্ঞান বা প্রযুক্তি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়। এই ফিল্টারের মানদণ্ড হলো ইসলামি নৈতিকতা, যা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদ্ভূত। পুনর্জাগরণের জন্য এই ‘সংযুক্ত যুক্তি’-কে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। ত্বাহা আব্দুর রহমানের প্রকল্পটি একটি বৈশ্বিক বার্তা হিসেবে কাজ করে। যা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ইসলামি নৈতিকতার ভিত্তিতে একটি বিকল্প আধুনিকতার প্রস্তাব দেয়।
এই ছয়জন চিন্তাবিদ—আল-আত্তাস, ফজলুর রহমান, বেন্নাবি, আলী নদভী, ত্বাহা আব্দুর রহমান ও মোহাম্মদ আরকুন—প্রত্যেকেই ভিন্ন পথে হলেও একই লক্ষ্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন: মুসলিম মনকে তার ‘আদব-আখলাক (আখলাক মানে মানে শুধু চলা-ফেরা ও চরিত্রের শিষ্টাচার নয়। "আদ-দ্বীনু হুয়াল আদাব" অর্থাৎ 'দ্বীন মানেই আদব' কথার মর্মবাণী)’, ‘পদ্ধতি’, ‘আত্মা’, ‘ঐতিহাসিক চেতনা’ ও ‘নৈতিকতা’-র সাথে পুনঃসংযুক্ত করা। আল-আত্তাসের আদব-ভিত্তিক শিক্ষা, ফজলুর রহমানের ডাবল মুভমেন্ট পদ্ধতি, বেন্নাবির সভ্যতাগত পুনর্জাগরণ, নদভীর তৃতীয় পথ, ত্বাহা আব্দুর রহমানের নৈতিক ফিল্টার, আরকুনের কুরআন ও ইসলামি চিন্তাধারার পুনর্পাঠ পদ্ধতি ও এমার্জিং রিজন—এই স্রোতগুলো মিলে তৈরি করতে পারে একটি নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো, যেখানে ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ ও ‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’—এই দুই চরমপন্থার বাইরে একটি সম্ভাব্য মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে ইমাম হিসেবে থাকতে পারে আল্লামা ইকবালের সামগ্রিক ভাবনা। বিশেষ করে তার খুদি ও গতিশীল ইজতিহাদের দর্শন। এই পথে আমরা ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ থেকে ‘সক্রিয় নির্মাতা’-তে রূপান্তরিত হতে পারি। আর সেটাই হতে পারে উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সম্মিলিত পথ—আরকুনের 'পলিটিক্স অফ হোপ', আল-আত্তাসের 'তাজদিদ' ও উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার
ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’ তৈরি হয়েছে—কুরআনের ‘বদ্ধ কর্পাস’ থেকে শুরু করে ‘ইসলাম’-কে একটি ধর্মীয় ক্যাটাগরি হিসেবে ইউরোপীয় নির্মাণ, খিলাফত বিলুপ্তির পর ঔপনিবেশিক কাঠামোতে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’-এর আধুনিক স্বপ্ন, এবং সেই স্বপ্নের ‘সর্বগ্রাসী’ ব্যাখ্যা। সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের সেই সংকট, যার ভেতরে বন্দি হয়ে উম্মাহ ছটফট করছে। আরকুন যেমন সংকটের গভীরতা ও ঐতিহাসিক শেকড় উন্মোচন করেছেন, আল-আত্তাস, ফজলুর রহমান, বেন্নাবি, আলী নদভী ও ত্বাহা আব্দুর রহমান—প্রত্যেকেই ভিন্ন পথে এই দেয়াল ভাঙার পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন। আল-আত্তাস দিয়েছেন ‘আদব’-ভিত্তিক শিক্ষার কাঠামো। ফজলুর রহমান দিয়েছেন ‘ডাবল মুভমেন্ট’-এর পদ্ধতিগত হাতিয়ার। বেন্নাবি দিয়েছেন সভ্যতাগত পুনর্জাগরণের শর্তাবলী। নদভী দিয়েছেন পশ্চিমা অনুকরণ ও প্রত্যাখ্যানের বাইরে একটি ‘তৃতীয় পথ’। আর ত্বাহা আব্দুর রহমান দিয়েছেন ‘নৈতিক ফিল্টার’-এর ধারণা। এখন প্রশ্ন হলো, এই সব পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলন কীভাবে একটি সম্ভাব্য মুক্তির পথ তৈরি করতে পারে? আর সেই পথে কীভাবে আমরা ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ থেকে ‘সক্রিয় নির্মাতা’-তে রূপান্তরিত হতে পারি?
আরকুনের ‘এমার্জিং রিজন’ বা উদ্ভাসমান যুক্তি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। আরকুন এই ধারণাটি তৈরি করেছেন আধুনিকতার অর্জন ও ধ্রুপদী ঐতিহ্য—উভয়কে অস্বীকার না করে একটি নতুন আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের পথ খুঁজতে (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, pp. 23-28)। আরকুনের মতে, এই উদ্ভাসমান যুক্তি কোনো রৈখিক বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া নয়। এটি আধুনিকতার অর্জনকে স্বীকার করে, কিন্তু ধর্মীয় অনুপ্রেরণার সাথে যুক্ত জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকেও অস্বীকার করে না। অর্থাৎ, এমার্জিং রিজন একটি সেতু—যা ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’-এর অরাজকতা ও ‘অন্ধ রক্ষণশীলতা’-এর ভীরুতা, এই দুই চরমপন্থার বাইরে একটি সম্ভাব্য তৃতীয় পথ দেখায়। আরকুনের মতে, এই উদ্ভাসমান যুক্তি শুধু পাশ্চাত্য আধুনিকতার অর্জনগুলোকে গ্রহণ করে না; বরং ইসলামি ঐতিহ্যের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে একটি নতুন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সূচনা করে, যা ‘অচিন্তিত’ ও ‘অচিন্তনীয়’-এর সীমানা ভেঙে নতুন চিন্তার সম্ভাবনা উন্মোচন করে (Mohammed Arkoun, The Unthought in Contemporary Islamic Thought, p. 28)।
এই এমার্জিং রিজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আরকুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—‘পলিটিক্স অফ হোপ’ বা আশার রাজনীতি। আরকুন বিশ্বাস করতেন, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের সমন্বয়ে একটি নতুন আশার রাজনীতি তৈরি করা সম্ভব, যা অতীতের ভুল-বিচ্যুতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। আরকুনের ‘পলিটিক্স অফ হোপ’-এর মূল কথা হলো, ইতিহাসের গভীরে থেকে শিক্ষা নেওয়া, কিন্তু অতীতে আটকে না থেকে বরং ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা। তিনি মনে করতেন, ইতিহাস কেবল পুনরাবৃত্তি নয়; এটি একটি সৃজনশীল প্রক্রিয়া। যেখানে মানবিক চেতনা তার ভুল-বিচ্যুতি থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পথ তৈরি করতে পারে। এই আশার রাজনীতি ‘অন্ধ দেয়াল’-এর ভেতর বন্দি উম্মাহকে একটি নতুন দিগন্ত দেখায়। যেখানে হতাশা ও নিরাশার বদলে সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনার জায়গা তৈরি হয়।
আরকুনের এই ‘পলিটিক্স অফ হোপ’-এর সাথে আল-আত্তাসের ‘তাজদিদ’ বা পুনর্জাগরণের ধারণা মিলে যায়। আল-আত্তাসের ‘তাজদিদ’ মানে শুধু অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়; এটি হলো একটি গভীর আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। যেখানে উম্মাহ তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও ‘আদব’-কে পুনঃআবিষ্কার করে এবং তাকে আধুনিক যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে (Syed Muhammad Naquib al-Attas, The Concept of Education in Islam, pp. 45-51)। আল-আত্তাসের ‘তাজদিদ’-এর মূল ভিত্তি হলো ‘আদব’-এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যা জ্ঞান ও সত্তার স্তরক্রমকে স্বীকৃতি দেয় এবং মানুষকে তার স্রষ্টা, সমাজ ও নিজের সাথে সঠিক সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করে। আল-আত্তাসের মতে, ‘তাজদিদ’ কেবল ধর্মীয় সংস্কার নয়; এটি একটি সামগ্রিক সভ্যতাগত পুনর্জাগরণ। যা শিক্ষা, নৈতিকতা, রাজনীতি ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনে।
এই ‘তাজদিদ’-এর বাস্তবায়নের জন্য ফজলুর রহমানের ‘ডাবল মুভমেন্ট’ পদ্ধতি একটি কার্যকরী হাতিয়ার সরবরাহ করে। ফজলুর রহমান যেমন দেখিয়েছেন, কুরআনের মূল বার্তা ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও নৈতিক সংস্কার তথা একটি ‘নৈতিক আদর্শ’। কিন্তু ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে ফুকাহারা (ইসলামের আইনবিদগণ) সেই আদর্শকে সরু আইনি কাঠামোতে বন্দি করে ফেলেন (Fazlur Rahman, Islam and Modernity, p. 5)। ‘ডাবল মুভমেন্ট’-এর মাধ্যমে প্রথমে সেই নৈতিক আদর্শকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে চিহ্নিত করা যায়, তারপর তাকে বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োগের নতুন পথ খুঁজে বের করা যায়। এটি ইজতিহাদকে একটি সুসংহত পদ্ধতিগত ভিত্তি প্রদান করে—যা ‘অন্ধ রক্ষণশীলতা’-র বিকল্প একটি গতিশীল চিন্তার জগৎ তৈরি করে।
বেন্নাবির ‘শুরুত আন-নাহদা’ (পুনর্জাগরণের শর্তাবলী) এই ‘তাজদিদ’ ও ‘ডাবল মুভমেন্ট’-এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো চিহ্নিত করে। বেন্নাবি দেখিয়েছেন, পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজন ‘আল-ইনসান’ (মানুষ), ‘আত-তুরাব’ (মাটি/সময়) ও ‘আল-ওয়াক্ত’ (সময়/ইতিহাস)-এর সঠিক সমন্বয়। অর্থাৎ, সঠিক মানুষ, সঠিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সঠিক সময়—এই তিনটি উপাদান একত্রিত হলে পুনর্জাগরণ সম্ভব। বেন্নাবির মতে, মুসলিম সমাজে ‘আল-ইনসান’-এর সংকট হলো, মানুষ তার নিজস্ব ঐতিহাসিক চেতনা হারিয়ে ফেলেছে এবং পশ্চিমা মূল্যবোধে নিজেকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে চায়। তাই পুনর্জাগরণের প্রথম শর্ত হলো ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিকতা’ থেকে মুক্তি। যা ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’-র মূল কারণ। দ্বিতীয় শর্ত হলো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সঠিকভাবে বোঝা। যা না বুঝার ফলে ‘অন্ধ রক্ষণশীলতা’-র ভিত্তি তৈরি হয়। আর তৃতীয় শর্ত হলো নিজেদের সভ্যতাগত অবদান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। যা উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের চাবিকাঠি।
নদভীর ‘তৃতীয় পথ’ এই পুনর্জাগরণের জন্য একটি কার্যকরী দিকনির্দেশনা দেয়। নদভী পশ্চিমা অনুকরণ ও পশ্চিমা প্রত্যাখ্যান—এই দুই চরমপন্থার বাইরে একটি পথ দেখিয়েছেন। যেখানে পশ্চিমার বস্তুগত প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকে আত্মস্থ করা যায়, কিন্তু তার বস্তুবাদী দর্শন ও নৈতিক আপেক্ষিকবাদকে প্রত্যাখ্যান করা যায়। নদভীর ‘তৃতীয় পথ’-এর মূল ভিত্তি হলো ‘আত্মিক পুনর্জাগরণ’। যা কুরআন ও সুন্নাহর গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে সম্ভব। এই পথে মুসলিম সমাজ পশ্চিমার অন্ধ অনুকরণ ও অন্ধ প্রত্যাখ্যান—উভয় থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বকীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশের পথ খুঁজে পেতে পারে।
ত্বাহা আব্দুর রহমানের ‘নৈতিক ফিল্টার’ এই পথকে আরও সুসংহত করে। তিনি দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্য আধুনিকতার সবকিছুকে বিনা যাচাইয়ে গ্রহণ করা যায় না—প্রয়োজন একটি ‘নৈতিক ফিল্টার’, যা নির্ধারণ করবে কোন জ্ঞান বা প্রযুক্তি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়। এই ফিল্টারের মানদণ্ড হলো ইসলামি নৈতিকতা। যা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদ্ভূত। ত্বাহা আব্দুর রহমানের মতে, পাশ্চাত্য আধুনিকতা হলো ‘বিচ্ছিন্ন যুক্তি’, যা নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অন্যদিকে, ইসলামি ঐতিহ্যে রয়েছে ‘সংযুক্ত যুক্তি’, যা ওহী ও নৈতিকতার সাথে যুক্ত। পুনর্জাগরণের জন্য এই ‘সংযুক্ত যুক্তি’-কে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যা ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’-র বিকল্প একটি সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো তৈরি করে।
এই পাঁচটি স্রোত—আরকুনের ‘এমার্জিং রিজন’ ও ‘পলিটিক্স অফ হোপ’, আল-আত্তাসের ‘তাজদিদ’ ও ‘আদব’, ফজলুর রহমানের ‘ডাবল মুভমেন্ট’, বেন্নাবির পুনর্জাগরণের শর্তাবলী, নদভীর ‘তৃতীয় পথ’, এবং ত্বাহা আব্দুর রহমানের ‘নৈতিক ফিল্টার’—মিলে তৈরি করতে পারে একটি সমন্বিত বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো। এই কাঠামোতে আরকুনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত কঠোরতা, আল-আত্তাসের আদব-ভিত্তিক শিক্ষা, ফজলুর রহমানের দ্বি-স্তরভিত্তিক তাফসির পদ্ধতি, বেন্নাবির ঐতিহাসিক চেতনা, নদভীর আত্মিক পুনর্জাগরণ এবং ত্বাহা আব্দুর রহমানের নৈতিক ফিল্টার—সবগুলোই একসাথে কাজ করতে পারে। এই সম্মিলিত পথে আমরা ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ ও ‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’, এই দুই চরমপন্থার বাইরে একটি সম্ভাব্য মুক্তির পথ খুঁজে পেতে পারি। আর এইসবের জন্য প্রধানত যা দরকার তা হলো, আল্লামা ইকবালের 'খুদির জাগরণ' এবং 'গতিশীল ইজতেহাদী মস্তিষ্ক'। তবেই আমাদের পুনর্গঠন এবং সভ্যতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব। এই সমগ্র চিন্তা এবং দুই প্রান্তিকতা থেকে বের হওয়ার পথ ও পন্থা বস্তুত এককভাবে কারও মধ্যে পাওয়া গেলে, তিনি হলেন আল্লামা ইকবাল।
এই পথে ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ থেকে ‘সক্রিয় নির্মাতা’-তে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন—প্রথমত, ঐতিহাসিক চেতনা পুনরুদ্ধার; দ্বিতীয়ত, ‘আদব’-এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা; তৃতীয়ত, কুরআন বোঝার একটি সুসংহত পদ্ধতি (যেমন, ডাবল মুভমেন্ট থিওরি) গ্রহণ; চতুর্থত, বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি; পঞ্চমত, পশ্চিমা অনুকরণ ও প্রত্যাখ্যান—উভয়ের বাইরে একটি তৃতীয় পথ গ্রহণ; এবং ষষ্ঠত, জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে নৈতিকতার ফিল্টারের মধ্যে দিয়ে পরিশোধন করা। আর আল্লামা ইকবালের নেতৃত্বে সেগুলো একত্রিত হলে উম্মাহ তার বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। যেখানে সে নিজের ঐতিহ্য ও আধুনিক বাস্তবতা, উভয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্বকীয় ও গতিশীল চিন্তার ও সভ্যতার জগৎ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এই সাত সত্য একত্রিত করলেই আমরা ‘অন্ধ ঘরের দেয়াল’-এর বাইরের আলো দেখতে পাব। যেখানে ‘শিকড়হীন মুক্তচিন্তা’ ও ‘অন্ধ রক্ষণশীলতা’—উভয় চরমপন্থার বাইরে উম্মাহর জন্য একটি সম্ভাব্য মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়। এই পথে আমরা ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ থেকে ‘সক্রিয় নির্মাতা’-তে রূপান্তরিত হতে পারি। আর সেটাই হতে পারে উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যতক্ষণ না উম্মাহ এই শাস্ত্রীয় স্তর ও মেথডোলজির পার্থক্য বুঝতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কেবল এক অদৃশ্য বৈজ্ঞানিক পুরোহিততন্ত্রের খাঁচায় বন্দি হয়ে ছটফট করতে থাকব এবং নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব চিরতরে হারিয়ে ফেলব। কিন্তু যেদিন আমরা এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পারব এবং এই সম্মিলিত পথে এগোতে শুরু করব, সেদিনই উম্মাহর জন্য একটি নতুন ভোরের সূচনা হবে। যেখানে জ্ঞান ও আত্মা, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, যুক্তি ও নৈতিকতা—সবকিছুই মিলেমিশে একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সভ্যতা গড়ে তুলতে পারবে।
মেধার লুণ্ঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক খরা—কেন আমাদের নাসিরুদ্দিন তুসিরা হারিয়ে যায়?
আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ধর্ম চিন্তার চিন্তার পুনর্গঠনে সবচেয়ে প্রধান ভূমিকায় দরকার এক ঝাঁক মেধাবী ও এপিস্টেমোনিকাল মানুষ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই উত্তর-আধুনিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে নির্মম অথচ অনালোচিত ট্র্যাজেডি হলো তার মেধার পদ্ধতিগত লুণ্ঠন এবং এক প্রকাণ্ড প্রাতিষ্ঠানিক খরা। বায়তুল হিকমাহ কেবল কোনো কিংবদন্তিসম গ্রন্থাগার বা বায়বীয় নস্টালজিয়া ছিল না। সেটি ছিল ইসলামী সভ্যতার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক জ্ঞান-অর্থনীতি (patronage economy) এবং একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর (institutional framework) জীবন্ত যুগলবন্দী। আজ আধুনিক মুসলিম সমাজে মেধা বা প্রতিভার জন্ম হলেও তা টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম বুদ্ধিবৃত্তিক ইকোসিস্টেম বা জ্ঞানীয় পরিবেশ খুঁজে পাচ্ছে না। এর ফলে জন্ম নিচ্ছে এক ভয়াবহ ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধার চোরাচালান। আমাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়, সরকারি এবং বেসরকারি কাঠামো আজ উপযুক্ত গবেষণাগার, বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের স্বাধীনতা এবং মেধার সঠিক কদরের অভাবে এক স্থায়ী বন্ধ্যাত্বে পতিত হয়েছে। এর পেছনে প্রধানত যেভাবে কাজ করছে এক শ্বাসরুদ্ধকর আমলাতান্ত্রিক পরিবেশ এবং ক্ষমতার বলয়ে থাকা এলিটদের চরম বুদ্ধিবৃত্তিক উদাসীনতা, তেমনি গৎবাঁধা চিন্তার গোঁড়ামি চোরাবালিও দায়ি। জ্ঞান তার সুরক্ষার জন্য সবসময় একটি নিরাপদ ও বাস্তববাদী জমিন খুঁজে নেয়। যখন কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড জ্ঞানীদের জন্য কারাগার বা অবহেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়, তখন মেধা সেখান থেকে অন্য তীরে হিজরত করতে বাধ্য হয়।
বর্তমানের এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ও মেধার স্থানান্তরের মনস্তত্ত্বকে বোঝার জন্য ইরানের প্রখ্যাত সমকালীন চিন্তাবিদ এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হামিদ দাবাশি এক গভীর তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক হাজির করেছেন। দাবাশি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পোস্ট-অরিয়েন্টালিজম: নলেজ অ্যান্ড পাওয়ার ইন আ টাইম অব টেনশন’ বা ‘উত্তর-প্রাচ্যবাদ: উত্তেজনার যুগে জ্ঞান ও ক্ষমতা’ নামক প্রামাণ্য গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে জ্ঞান উৎপাদনের চেয়ে জ্ঞান দমনের এক যান্ত্রিক কারখানায় পরিণত হয়েছে। দাবাশির মতে, আধুনিক মুসলিম বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানীয় সৃজনশীলতা বা মৌলিক চিন্তার বিকাশ ঘটায় না। বরং এগুলো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট কাঠামোর জন্য একদল বাধ্যগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মেরুদণ্ডহীন টেকনোক্র্যাট তৈরি করে। যখনই কোনো তরুণ বা গবেষক এই প্রাতিষ্ঠানিক ছকের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো পদ্ধতি বা সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে চান, তখনই তিনি রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র এবং দলীয় ঘরানানির্ভর একচেটিয়া আধিপত্যের মুখোমুখি হন। দাবাশির এই সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, যখন কোনো রাষ্ট্রে মেধার মূল্যায়ন ও নিরাপত্তার চরম অভাব ঘটে, তখন সেই সমাজের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ মনগুলো বাধ্য হয়ে অন্য উন্নত বা দূরবর্তী রাষ্ট্রে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয় খোঁজেন (Hamid Dabashi, Post-Orientalism: Knowledge and Power in a Time of Tension, pp. 34-48)।
দাবাশি আরও তীব্রভাবে দেখিয়েছেন, এই প্রাতিষ্ঠানিক খরার কারণে মুসলিম উম্মাহর চিন্তাজগতে এক ধরনের গভীর বিচ্ছিন্নতা ও দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। দেশীয় কাঠামোতে যখন গবেষণার ন্যূনতম বাজেট থাকে না, যখন পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা বা অনুবাদ প্রকল্পের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় তহবিল বরাদ্দ করা হয় না, তখন মেধাবীরা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তববাদী কাঠামোর দিকে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়া আবার এই মেধাগুলোকে নিজেদের করপোরেট ও জ্ঞানীয় স্বার্থে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে। ফলে মুসলিম বিশ্ব নিজের কাঁচামাল বা মেধা নিজেই লুণ্ঠন হতে দেয়। অথচ পেছনে ফেলে যাওয়া চেনা নগরী বা ভূখণ্ডটি রয়ে যায় এক স্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক খরায়, যা আজকের মুসলিম দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে অত্যন্ত বেদনদায়কভাবে দৃশ্যমান হয় (Hamid Dabashi, Theology of Discontent: The Ideological Foundation of the Islamic Revolution in Iran, pp. 112-120)।
এই সংকটের ঐতিহাসিক ও সমাজবৈজ্ঞানিক শিকড় সন্ধান করতে গিয়ে প্রখ্যাত ফিলিস্তিনী-আমেরিকান চিন্তাবিদ ডক্টর ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘দ্য ইম্পসিবল স্টেট’ বা ‘অসম্ভব রাষ্ট্র’ নামক তাত্ত্বিক কাজে এই প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের এক গভীরতম আলাপ করেছেন। হাল্লাক দেখিয়েছেন, আধুনিক নেশন-স্টেইট বা জাতিরাষ্ট্রের যে যান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আইনি-রাজনৈতিক কাঠামো পশ্চিমা উপনিবেশের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা ইসলামের ঐতিহ্যবাহী ওয়াকফ ব্যবস্থা ও স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগে বায়তুল হিকমাহ বা পরবর্তীকালের মাদরাসা ও গবেষণাকেন্দ্রগুলো কোনো স্বৈরাচারী খলিফা বা সুলতানের মর্জিমাফিক চলত না। সেগুলো ওয়াকফ নামক এক স্বাধীন অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে জ্ঞান উৎপাদন করত। রাষ্ট্র সেখানে পৃষ্ঠপোষকতা করত বটে, কিন্তু উলামা ও বিজ্ঞানীদের চিন্তার ওপর লাঠি ঘুরাতে পারত না। কিন্তু আধুনিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দাসত্বে বন্দি করে ফেলেছে। পাশাপাশি এগুলোর কর্ণধারদের মানসিক দাসত্বও ভয়ঙ্কর। যার ফলে জ্ঞান তার নৈতিক ও মুক্ত মেজাজ হারিয়ে সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে (Wael B. Hallaq, The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity's Moral Predicament, pp. 55-72)। ঔপনিবেশিক যুগ (১৯শ-২০শ শতাব্দী) এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকটকে আরও গভীর করে। ব্রিটিশ ও ফরাসি উপনিবেশবাদীরা ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস বা পুনর্গঠিত করে পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। "ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছিল। কারণ তারা জানত, জ্ঞান যেখানে স্বাধীন, সেখানে উপনিবেশবাদ কখনো টেকসই হতে পারে না" (Hallaq, Restating Orientalism: A Critique of Modern Knowledge, New York: Columbia University Press, 2018, p. 145)। এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে মুসলিম সমাজে একটি ‘দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থা’ তৈরি হয়। একদিকে ধর্মীয় মাদ্রাসা, অন্যদিকে পাশ্চাত্য-অনুকৃত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে কোনো সেতুবন্ধন তৈরি হয়নি; ফলে জ্ঞানচর্চা খণ্ডিত ও দিশাহীন হয়ে পড়ে।
সমকালীন মুসলিম বিশ্বে এই প্রাতিষ্ঠানিক খরার সবচেয়ে বড় শিকার হলো মেধাবী মানুষজন। আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজ মেধার চাষ করে না, বরং তাকে দমিয়ে রাখতে চায়। কারণ স্বাধীন চিন্তা সর্বদা উপর মহল ও গৎবাঁধা ব্যবস্থার জন্য হুমকি। এই বাঁধার ফলে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে মেধাবী মানুষজন পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। প্রতিবছর হাজার হাজার মুসলিম মেধাবী পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যায়, কিন্তু তাদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশও নিজ দেশে ফিরে আসে না।
হাল্লাক তাঁর আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের গভীর অভিজ্ঞতা থেকে আরও প্রমাণ করেছেন, এই প্রাতিষ্ঠানিক বিকলাঙ্গতার কারণে আধুনিক মুসলিম সমাজের পণ্ডিতরা সময়ের দাবি মেটাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একদল আধুনিক শিক্ষিত মানুষ ভাবছেন পশ্চিমা আইনি ও বৈজ্ঞানিক মডেলিটিকে হুবহু ধার করাই হয়তো উন্নতির একমাত্র পথ, অথচ তারা এর ভেতরের আত্মাহীন ও ধ্বংসাত্মক রূপটি দেখতে পাচ্ছেন না। আর অন্যদল কেবল ধর্মতাত্ত্বিক চর্বিত-চর্বনেই উত্তরণের পথ খুঁজছেন। হাল্লাকের এই গভীর তত্ত্ব আমাদের শেখায়, মেধা বা প্রতিভা কোনো শূন্যস্থানে বা কেবল বক্তৃতার আবেগে বাঁচে না। মেধার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেম লাগে, যা আধুনিক মুসলিম বিশ্বে আজ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত (Wael B. Hallaq, Restating Orientalism: A Critique of Modern Knowledge, pp. 143-156)। এই প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্বের এক জলজ্যান্ত ঐতিহাসিক রূপ আমরা দেখেছি, মঙ্গোল আক্রমণের পরবর্তী ইতিহাসে। ১২৫৮ সালের সেই ভয়ংকর রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারিতে বাগদাদ যখন ধ্বংস হয়ে গেল, তখন খলিফার আবেগসর্বস্ব সুর ও ফাঁকা বুলি হালাকু খানের নিখুঁত সামারিক গণিতের সামনে মুহূর্তে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বিজ্ঞানী ও দার্শনিক নাসিরুদ্দিন তুসি হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জ্ঞানকে টিকিয়ে রাখতে হলে আগে প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয় লাগবে। তাই তিনি শেষ পর্যন্ত মঙ্গোল ইলখানিদের তৈরি করা মারাগা মানমন্দিরের (Maragheh Observatory) প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ব্যবহার করেই ইসলামি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের ধারাটিকে রক্ষা করেছিলেন। আজকের যুগেও আমাদের সেরা মেধাবীরা মাতৃভূমির ক্ষয়িষ্ণু ও জরাগ্রস্ত পরিবেশ থেকে বাঁচতে পশ্চিমা বিশ্বের বাস্তববাদী কাঠামোর দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন। এটি কোনো সাধারণ হিজরত নয়, এটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক খরার কারণে একটি সভ্যতার প্রধান চালিকাশক্তি বা জ্ঞানীয় কাঁচামাল চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এক নির্মম সমকালীন ট্র্যাজেডি। এই খরা ও অর্বাচীনতা থেকে উত্তরণের উপায় নিশ্চিত করা ছাড়া দ্বিবিধ অবক্ষয়—'শিকড়হীন মুক্তচিন্তা' এবং 'অদ্ধ ঘরের দেয়াল বা অন্ধ রক্ষণশীলতার' কবল থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার পথ রুদ্ধ। বাস্তবে আজকের প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনই পারে উম্মাহর জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতাকে নতুন প্রাণ দিতে। শুধু অতীতের নস্টালজিয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর ও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে।

Post a Comment