Table of Contents
![]() |
| ফররুখ আহমদ: মুসলিম কাব্য-চেতনা, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও হারানো সভ্যতার প্রতি আকুলতা |
Previous Part.......
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের লড়াই শুধু রাজনীতির ময়দানে আটকে থাকেনি। ভোট, সংগঠন, প্রস্তাব, রাষ্ট্র, ভাষা আন্দোলন—এসব তার ইতিহাসের দৃশ্যমান মুখ। কিন্তু একটি জাতিগত সত্তা শুধু রাজনৈতিক দাবিতে বাঁচে না। সে নিজের ভাষায় স্বপ্ন দেখে। নিজের পরাজয়কে রূপক বানায়। নিজের হারানো গৌরবকে কবিতায় ডাকে। নিজের অপমানের বিরুদ্ধে কল্পনার ভিতর দুর্গ তোলে।
রাজনীতি তাকে অধিকার চাইতে শেখায়। সাহিত্য তাকে নিজের মুখ দেখতে শেখায়।
ইতিপূর্বে বাঙালি মুসলমানের যে দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে—বাংলা ও ইসলাম, ভাষা ও মিল্লাত, মাটি ও আকিদা, হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতির চাপ এবং মুসলিম আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা—সেটি সাহিত্যেও ফিরে আসে। প্রশ্নটি তখন আর শুধু রাষ্ট্রের থাকে না। প্রশ্ন হয়, সে কোন ভাষায় নিজের অতীতকে ডাকবে? কোন প্রতীকে নিজের পতন বুঝবে? কোন কাব্যিক আকাশে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করবে?
বাংলা ভাষার প্রধান সাহিত্যিক ধারায় মুসলমানের এই সভ্যতাগত দিগন্ত দীর্ঘদিন অস্বস্তিকর ছিল। বাঙালি মুসলমানকে গ্রাম, দারিদ্র্য, লোকজ রীতি, পল্লীজীবন ও আঞ্চলিকতার মধ্যে রাখা যায়। তাতে বাংলা সাহিত্যিক মানচিত্র খুব বেশি নড়ে না। কিন্তু তাকে আন্দালুস, বাগদাদ, আরব সাগর, সিন্দাবাদ, পাঞ্জেরী, মিল্লাত, পতন ও পুনর্জাগরণের বৃহৎ ইতিহাসে দাঁড় করানো হলে মানচিত্র বদলে যায়। তখন সে শুধু বাংলার প্রান্তিক মুসলমান থাকে না। সে হারানো মুসলিম সভ্যতার সন্তান হয়ে ওঠে।
ফররুখ আহমদ এই অস্বস্তিকর সাহিত্যিক দিগন্তের কবি। অস্বস্তিকর কারণ তিনি বাংলা ভাষাকে হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতির একক ঘর হতে দেন না। অস্বস্তিকর কারণ তিনি বাঙালি মুসলমানকে কেবল পল্লির মানুষ, দরিদ্র কৃষক, লোকজ চরিত্র বা ভাষাগত বাঙালি হিসেবে রাখেন না। তিনি তাকে দাঁড় করান বৃহত্তর মুসলিম ইতিহাসের সামনে। আন্দালুস, বাগদাদ, মরু, সমুদ্র, সিন্দাবাদ, পাঞ্জেরী, পতন ও জাগরণ—এসব তাঁর কবিতায় শুধু প্রতীক নয়। এগুলো বাঙালি মুসলমানের হারানো সভ্যতাগত আত্মমর্যাদার ভাষা।
এই অস্বস্তি তৈরি হয় সেই সাহিত্যিক জমিনে, যেখানে বাংলা বলতে দীর্ঘদিন রবীন্দ্রীয় রুচি, হিন্দু অভিজাত আধুনিকতা এবং কলকাতাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক মানদণ্ডকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়েছে। সেই জমিনে মুসলমানের ইতিহাস থাকলেও তা প্রান্তে। তার আরবি-ফারসি শব্দ থাকলেও তা সন্দেহে। তার ঈমানি কল্পনা থাকলেও তা “ধর্মীয়” বলে আলাদা তাকের বই। ফররুখ এই ব্যবস্থার ভিতরেই অন্য দরজা খুলেছেন। তাঁর কবিতায় বাংলা ভাষা মুসলমানের ইতিহাস বহন করে। মিল্লাতের ক্ষত বহন করে। হারানো গৌরবের ডাক বহন করে। এই কারণেই তিনি শুধু কবি নন। তিনি সাহিত্যিক বাঙালিত্বের সীমা পরীক্ষা করা এক কঠিন উপস্থিতি।
তাঁকে শুধু “ইসলামী কবি” বলা তাই যথেষ্ট নয়। এই পরিচয় সত্য, কিন্তু অসম্পূর্ণ। ফররুখের কবিতায় ইসলামী শব্দ আছে। কিন্তু শুধু শব্দ নেই। আছে আত্মমর্যাদাহীন বর্তমানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের আগুন। তিনি ধর্মীয় প্রচারের কবি নন। তিনি সেই মুসলমান মানুষের কবি, যে নিজের ভাষায় নিজের হারানো আকাশ দেখতে চায়।
ফররুখ নিজের অবস্থান লুকাননি। তিনি এক জায়গায় লিখেছিলেন, একজন আনন্দিত খ্রিস্টান যুবক যেমন নিজের পূর্বপুরুষের মহৎ ইতিহাস, সাহিত্য ও mythology (পুরাণ-ঐতিহ্য)-কে ভালোবাসতে পারে, তেমনি একজন আনন্দিত মুসলিম যুবক হিসেবে তিনিও Islamism (ইসলামী চেতনা) এবং নিজের পূর্বপুরুষের মহৎ ইতিহাস, সাহিত্য ও mythology (পুরাণ-ঐতিহ্য)-কে ভালোবাসেন। এই বাক্যে তাঁর কাব্যিক অবস্থান প্রায় স্পষ্ট। তিনি লজ্জিত মুসলমান নন। তিনি ধার-করা বাঙালি নন। তিনি নিজের ঐতিহ্যকে কবিতার ভাণ্ডার হিসেবে গ্রহণ করেন। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পূর্বকথা, পৃ. ১৮)
এই মন্তব্য বাংলা সাহিত্যচর্চার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখে। ইউরোপীয় কবি যদি গ্রিক-রোমান mythology (পুরাণ-ঐতিহ্য), বাইবেল, মধ্যযুগ, রেনেসাঁ, গির্জা, দেবদূত, পাপ ও মুক্তির ভাষা নিয়ে আধুনিক কবিতা লিখতে পারে, তাহলে বাঙালি মুসলমান কবি কেন কোরআনি শব্দ, নবী-ইতিহাস, আন্দালুস, বাগদাদ, সিন্দাবাদ, আরব-সমুদ্র, মরু, মসজিদ, পাঞ্জেরী, মর্দে মুমিন ও মিল্লাত নিয়ে বাংলা কবিতা লিখতে পারবে না? কেন এক ঐতিহ্য সাহিত্য, আর অন্য ঐতিহ্য “ধর্মীয় প্রচার”?
ফররুখ এই অসম বিচার মানেননি। তাঁর কবিতা বাংলা ভাষায় মুসলমানের কল্পনাশক্তিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। কল্পনাশক্তি এখানে হালকা শব্দ নয়। একটি জাতি নিজের হারানো শক্তি আগে কল্পনায় ফিরে পায়, তারপর রাজনীতিতে, সমাজে, শিক্ষায়, রাষ্ট্রে। যে মানুষ নিজেকে কেবল পরাজিত হিসেবে দেখে, সে উঠে দাঁড়াতে পারে না। যে মানুষ নিজের অতীতকে শুধু লজ্জা হিসেবে দেখে, সে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। ফররুখ বাঙালি মুসলমানের সামনে সেই লজ্জার বিপরীতে এক সভ্যতাগত আয়না ধরেছেন।
তাঁর কবিতায় সমুদ্র বারবার ফিরে আসে। শুধু জলরাশি হিসেবে নয়। অভিযাত্রার প্রতীক হিসেবে। সিন্দাবাদ সেখানে শিশুকাহিনির নাবিক নয়; মুসলিম কল্পনার অভিযাত্রী। পাঞ্জেরী শুধু জাহাজের পথপ্রদর্শক নয়; অন্ধকারে পথ হারানো এক সমাজের জাগরণ-ডাক। এইসব প্রতীক বুঝতে হলে ফররুখকে কেবল শব্দের কারুকাজ দিয়ে পড়া যাবে না। তাঁর কবিতায় প্রতীক মানে ইতিহাসের ক্ষত। প্রতীক মানে সভ্যতার হারানো দিকনির্দেশ। প্রতীক মানে পতনের পরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা।
বাংলা সাহিত্যচর্চার একটি বড় অংশ এই জায়গায় অস্বস্তিতে পড়ে। কারণ ফররুখ বাঙালি মুসলমানকে ছোট ঘরে রাখেন না। তিনি তাকে শুধু গ্রামীণ, দরিদ্র, লোকজ, পল্লীমুখী চরিত্র হিসেবে রাখেন না। তিনি তাকে আন্দালুসের পতনের সঙ্গে যুক্ত করেন। বাগদাদের আলো-অন্ধকারের সঙ্গে যুক্ত করেন। আরব সাগরের নাবিকের সঙ্গে যুক্ত করেন। মুসলিম মিল্লাতের দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করেন। এতে বাঙালি মুসলমানের কল্পনার আকার বড় হয়ে যায়।
যে সাহিত্যিক বাঙালিত্ব বাঙালি মুসলমানকে ভাষার ঘরে রাখে, কিন্তু তার মিল্লাতের ইতিহাসকে অস্বস্তিকর মনে করে, ফররুখ তার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ। যে সেক্যুলার সাহিত্যরুচি ধর্মীয় প্রতীককে শিল্পের নিচু স্তরে নামিয়ে রাখে, ফররুখ তার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ। যে হিন্দু অভিজাত রুচি নিজের পুরাণকে সাহিত্যিক ঐতিহ্য বলে গ্রহণ করে, কিন্তু মুসলমানের ইসলামী ইতিহাসকে “সাম্প্রদায়িক” বলে দূরে ঠেলে দেয়, ফররুখ তার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ। যে মুসলমান নিজেও নিজের ঐতিহ্য নিয়ে লজ্জিত, ফররুখ তার কাছেও অস্বস্তিকর। কারণ তিনি তাকে মনে করিয়ে দেন—তোমারও ইতিহাস আছে, তোমারও ভাষা আছে, তোমারও হারানো জাহাজ আছে।
ফররুখকে আড়াল করার পদ্ধতিও তাই সরল। তাঁকে শুধু পাকিস্তানপন্থী বলা যায়। শুধু ইসলামী কবি বলা যায়। শুধু বিশেষ আদর্শের কবি বলা যায়। এইসব label (লেবেল) সুবিধাজনক। এতে তাঁর সঙ্গে কাব্যিক ও সভ্যতাগত লড়াই করতে হয় না। তাঁর ভাষা, ছন্দ, প্রতীক, ইতিহাসবোধ, মুসলিম নন্দনচেতনা, বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক আত্মমর্যাদা—এসব নিয়ে সত্যিকারের আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া যায়। একটি শব্দ লাগিয়ে তাক বন্ধ করলেই হলো।
কিন্তু ফররুখকে এভাবে বন্ধ করা যায় না। কারণ তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক সময়ের কবি নন। তিনি একটি অনুপস্থিত সভ্যতার কবি। তাঁর কবিতায় যে ব্যথা, তা একক রাষ্ট্রের ব্যথা নয়। বহু শতাব্দীর পতন, পরাজয়, আত্মবিস্মৃতি এবং পুনরুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সেখানে কাজ করে। তাঁর সিন্দাবাদ কোনো শিশুপাঠ্য নাবিক নয়। সে হারানো মুসলিম মানুষের অন্তর্জাহাজ। তাঁর পাঞ্জেরী কোনো সাদামাটা রাত্রির প্রহরী নয়। সে অন্ধকারে দাঁড়ানো মিল্লাতের কাছে জেগে থাকার আহ্বান।
এই কারণে ফররুখকে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের ইতিহাসে ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি প্রান্তিক কবি নন। তাঁকে প্রান্তে রাখা হয়েছে। পার্থক্য বড়।
বাংলা ভাষার যে ঘরকে দীর্ঘদিন হিন্দু অভিজাত রুচি স্বাভাবিক মানদণ্ড বানিয়েছে, ফররুখ সেই ঘরে মুসলমানের জানালা খুলেছেন। তাঁর জানালা দিয়ে দেখা যায় মরু, সমুদ্র, মসজিদ, জাহাজ, মিনার, আন্দালুস, ঈমান, পাঞ্জেরী, জাগরণ, মিল্লাত ও হারানো গৌরবের দীর্ঘ দিগন্ত। এই দৃশ্য বাংলা ভাষার বাইরে নয়। বরং বাংলা ভাষার দিগন্ত বাড়ায়।
যে সাহিত্য নিজের মুসলমান কবিকে অস্বস্তি দিয়ে পড়ে, সে সাহিত্য নিজেরই একটি অঙ্গ কেটে ফেলে।
ফররুখ ও মুসলিম কাব্যচেতনার পুনর্জাগরণ
ফররুখ আহমদের কাব্যচেতনা বুঝতে হলে তাঁর কবিতার ভিতরে ঢুকতে হয়। বাইরে দাঁড়িয়ে “ইসলামী কবি” বললে তাঁর মাপ পাওয়া যায় না। তাঁর কবিতায় ইসলাম আছে, কিন্তু তা শুধু বিশ্বাসের ভাষা নয়। আছে সভ্যতার পতন, আত্মমর্যাদার ক্ষত, অন্ধকারে দিশা খোঁজার ব্যাকুলতা। আছে এমন এক যাত্রা, যেখানে মানুষ ঘর ছেড়ে সমুদ্রের দিকে যায়, কিন্তু সেই সমুদ্র শুধু প্রকৃতি নয়। ইতিহাসের দরিয়া।
তিনি ধর্মকে কবিতায় এনেছেন, কিন্তু খুতবার ভাষায় নয়। তিনি ইতিহাসকে এনেছেন, কিন্তু পাঠ্যবইয়ের মতো নয়। তিনি হারানো মুসলিম জগতকে বাংলা শব্দে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই ফিরিয়ে দেওয়া শুরু হয় ভাষা থেকে। কারণ ভাষা শুধু উচ্চারণ নয়; ভাষা একটি জাতির কল্পনার মানচিত্র।
“সিন্দাবাদ” কবিতার শুরুতেই ফররুখ বাংলা কবিতার প্রচলিত দরজা বদলে দেন।
“কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ,
শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক,
ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ,
পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ বয়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক;
নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দবাদ!”
এই স্তবকের শব্দগুলো শুধু শব্দ নয়। “মখমল” হারানো আরামের চিহ্ন। “সফর” স্থির জীবন ভেঙে বেরিয়ে পড়ার নাম। “দরিয়া” বাংলার নদীজীবনকে সমুদ্রের বিস্তারে নিয়ে যায়। “মউজ”, “সফেদ”, “পাহাড়-বুলন্দ”—এসব শব্দ বাংলা কবিতায় মুসলমানি শব্দভাণ্ডারের অন্যরকম ধ্বনি তৈরি করে। ফররুখ কৃত্রিমভাবে আরবি-ফারসি শব্দ ঢোকাননি। তাঁর কাব্যিক জগতের দরকারেই এগুলো এসেছে। “ফররুখ কাব্যগীতি” আলোচনায় “সিন্দাবাদ” কবিতার শব্দবিন্যাস, আরবি-ফারসি মেজাজ এবং allusion (ইঙ্গিত)-এর দিকটি বিশেষভাবে ধরা হয়েছে। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ২৬১–২৬২)
এই ভাষা বাঙালি মুসলমানের কল্পনার আকার বদলায়। পল্লির মানুষ হঠাৎ সমুদ্রের সামনে দাঁড়ায়। ঘরের মানুষ সফরে বের হয়। কৃষকের সঙ্গে নাবিকের সম্পর্ক তৈরি হয়। নদীর সঙ্গে দরিয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়। বাংলা ভাষার ভিতরে মুসলমানের হারানো যাত্রা-মানস ফিরে আসে।
ফররুখের সিন্দাবাদ শিশুকাহিনির নাবিক নয়। সে মুসলিম অভিযাত্রার প্রতীক। ঘরে বসে থাকা মানুষ নয়; সাগরের মানুষ। বিপদের মানুষ। হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসার মানুষ। এই সিন্দাবাদী রূপকের ভিতরে বাঙালি মুসলমানের নিজের ইতিহাস ঢুকে পড়ে। যে সমাজ ক্ষমতা হারিয়েছে, শিক্ষা হারিয়েছে, কাব্যিক আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে, সে আবার যাত্রার ভাষা খুঁজছে। ফররুখ তাকে সেই ভাষা দেন। ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি গ্রন্থে “এক সিন্দবাদী নাবিক” নামে আলাদা প্রবন্ধ থাকা শুধু সুন্দর শিরোনাম নয়; ফররুখের কাব্যিক মেজাজ ধরার দরজা। তিনি স্থিরতার কবি নন। তাঁর ভিতরে জাহাজের টান আছে। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ১৪৭–১৪৮)
“সিন্দাবাদ” এগোয় আরও গভীর অস্থিরতার দিকে।
“আহা, সে নিকষ আকীক বিছানো কতদিন পরে ফিরে
ডেকেছে আমাকে নীল আকাশের তীরে,
ডেকেছে আমাকে জিন্দিগী আর মওতের মাঝখানে
এবার সফর টানবে আমাকে কোন স্রোত কেবা জানে!”
এই “জিন্দিগী আর মওতের মাঝখানে” দাঁড়ানো মানুষই ফররুখের মানুষ। নিরাপদ ঘরের মানুষ নয়। আয়েশী জীবনের মানুষ নয়। সে জানে না কোন স্রোত তাকে টানবে, তবু দরিয়া ডাকলে যেতে হয়। ফররুখের কাছে জীবন মানে ঝুঁকি। কাব্যচেতনা মানে শুধু অনুভূতির সৌন্দর্য নয়; অস্তিত্বের পরীক্ষা।
এই অস্তিত্বপরীক্ষা খুব দ্রুত আয়েশী জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
“কেটেছে রঙিন মখমল দিন ওজুদে চিকনা সরে,
তবু দূরচারী সফরের ঢেউ ভেসে এল বন্দরে,
হাতীর হাওদা ওঠাও মাহুত কিংখাব কর শেষ;
আজ নিতে হবে জংগী সাঁজোয়া মাল্লার নীল বেশ।”
এখানে “মখমল দিন” আর “মাল্লার নীল বেশ” একে অন্যের বিপরীতে দাঁড়ায়। একদিকে আরাম, অলসতা, পুরোনো আভিজাত্যের স্মৃতি। অন্যদিকে সফর, যুদ্ধ, নাবিকের কঠিন পোশাক। ফররুখের পুনর্জাগরণচেতনা এই দ্বন্দ্বে তৈরি। তিনি মুসলমানকে শুধু তার অতীতের গৌরব দেখান না; তাকে বলেন, আয়েশের পোশাক খুলে ফেলো। দরিয়া ডেকেছে। সফর শুরু হয়েছে।
এই ডাক আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
“রোষে ফুলে ওঠে কালাপানি যেন সুবিশাল আজদাহা,
মউজের মুখে ভাসছে কিশতী শ্বেত,
জানি না এবার কোন স্রোতে মোরা হব ফিরে গুমরাহা
কোথায় খুলবে নওল ঊষার রশ্মিধারা সফেদ;
কোথায় জাহাজ হবে ফের বানচাল,
তক্তায় ভেসে কাটবে আবার দরিয়ায় কতকাল;
সে কথা জানি না, মানি না সে কথা দরিয়া ডেকেছে নীল!”
ফররুখ ঝুঁকিকে লুকান না। “কালাপানি” আজদাহার মতো ফুলে ওঠে। কিশতী ভাসে। গুমরাহ হওয়ার ভয় আছে। জাহাজ বানচাল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তক্তায় ভেসে থাকার অপমান আছে। তবু দরিয়ার ডাক অস্বীকার করা যায় না। জাগরণ তাঁর কাছে নিরাপদ বিছানা নয়। জাগরণ সমুদ্রযাত্রা। মরণ, বিপদ, ভাঙন, ভুল স্রোত—সব জেনেও যাত্রা।
এই জেদই তাঁকে শুধু অতীতগর্বের কবি হতে দেয় না। তিনি সহজ গৌরবের কবি নন। তিনি ঝুঁকির কবি।
“জড়তার রাত শেষ হয়ে এল আজ,
কেটেছে পল্কা নরম আয়েশ আশরতে বহুদিন,
মর্চে ধরেছে কব্জায়; ম্লান তাজ।
আজ ফুঁড়ে চলো দরিয়ার সংগিন,
ভাঙো এ নরম মখমলে ছাওয়া দিন;
মাতমি-লেবাস ফেলে আজ পরো মাল্লার নীল সাজ।”
এই স্তবকে ফররুখের পুনর্জাগরণচেতনার মূল সুর ধরা পড়ে। “জড়তার রাত” শুধু অলস সময় নয়; সভ্যতার দীর্ঘ অচলতা। “মর্চে ধরেছে কব্জায়” পংক্তিটি নির্মম। ক্ষমতা হারানো শুধু সিংহাসন হারানো নয়; শক্তির কব্জায় মরচে ধরা। “মাতমি-লেবাস” ফেলে “মাল্লার নীল সাজ” পরার ডাক শোক থেকে কর্মে যাওয়ার ডাক। এখানেই তাঁর কাব্যচেতনা প্রচার নয়, আত্মপুনর্গঠন।
“সিন্দাবাদ” কবিতার আরেক জায়গায় নাবিকের আত্মবিশ্বাস গাঢ় হয়।
“দরিয়ার ডাকে এক লহমায় ভাঙে আমাদের ভুল,
প্রকাশিত নীল দিন;
দেখে সফরের প্রসারিত পথ দিগন্ত-স্রোতলীন।”
দরিয়ার ডাক ভুল ভাঙায়। এখানে সমুদ্র কেবল স্থান নয়; স্মরণশক্তি। যে সমাজ নিজেকে ভুলে গেছে, দরিয়া তাকে আবার মনে করায় সে চলার মানুষ। “প্রসারিত পথ” শুধু ভৌগোলিক পথ নয়; কল্পনার বিস্তার। বাঙালি মুসলমানের সংকুচিত আত্মপরিচয়ের সামনে ফররুখ এই বিস্তার খুলে দেন।
এই বিস্তার তাঁর কবিতায় বারবার বাণিজ্য, রত্ন, সমুদ্র, জাহাজ, পণ্য, সওদা, নাবিক ও অজানা দ্বীপের চিত্রে ফিরে আসে।
“জড়ো করি লাল, পোখরাজ আর ইয়াকুত ভরা দিন
দরিয়ার বুকে নামায়েছি ফের বে-দেরেগ সংগীন,
সমুদ্র-সিনা ফেড়ে ছুটে চলে কিশতী, স্বপ্ন সাধ;
নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দবাদ!”
এই পংক্তিগুলোতে কাব্যিক ঐশ্বর্য ও যাত্রা একসঙ্গে কাজ করছে। “লাল”, “পোখরাজ”, “ইয়াকুত”—এসব শুধু রত্ন নয়; হারানো মুসলিম বাণিজ্যমানস, সাগরপথ, অভিযাত্রা ও বিশ্ব-দিগন্তের স্মারক। “সমুদ্র-সিনা ফেড়ে” কিশতী ছুটে চলে। ফররুখের কল্পনায় মুসলমান মানুষ শুধু ইতিহাসের ভুক্তভোগী নয়; সে সমুদ্রভেদী।
এই যাত্রা ফররুখের কাছে শেষ পর্যন্ত ঈমানি ও নৈতিক। শুধু রোমাঞ্চ নয়।
“রাতে জেগে শুনি খোদার আলমে বিচিত্র কল্লোল
তারা ছিটে পড়ে মধ্য সাগরে জাহাজে জাগায় দোল,
আমরা নাবিক জংগী জোয়ান ইশারা পেয়েছি কত
মউজের মুখে তাই ভেসে যাই টুকরা খড়ের মত।”
এই স্তবকে সমুদ্রের ওপর আকাশ খুলে যায়। খোদার আলম, তারা, জাহাজ, দোল, ইশারা—সব মিলে যাত্রা কেবল মানবিক সাহস নয়; সৃষ্টিজগতের ইঙ্গিতধর্মী অভিজ্ঞতা। নাবিক “জংগী জোয়ান”, কিন্তু সে অন্ধ শক্তির মানুষ নয়। সে ইশারা পায়। সে মহাবিশ্বের আওয়াজ শুনে। এখানে Islamic imagination (ইসলামী কল্পনাশক্তি) সরাসরি কাজ করছে, কিন্তু তা বাহুল্যধর্মী নয়। কবিতার দৃশ্যেই তা মিশে গেছে।
“সিন্দাবাদ” তাই বাঙালি মুসলমানকে ছোট ঘর থেকে বের করে। সে বলে, তুমি শুধু আঘাতপ্রাপ্ত নও। তুমি যাত্রী। তুমি শুধু পরাজিত নও। তুমি পথহারা। পথহারানো মানুষকে প্রথমে পথের কথা মনে করাতে হয়। ফররুখ সেই কাজ করেন।
“পাঞ্জেরী”তে এই পথহারানো আরও অন্ধকার মুখ পায়। বিখ্যাত প্রশ্নটি একা উদ্ধৃত করলে কবিতার ওজন কমে যায়। স্তবকটি পড়তে হয়।
“রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে:
অসীম কুয়াশা জাগে শুন্যতা ঘেরি।
রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?”
এখানে রাত প্রকৃতির রাত নয়। আসমান মেঘে ভরা, সেতারা ওঠেনি, হেলাল জাগেনি। মাস্তুলে পাঞ্জেরী আছে, দাঁড় টানছে আরেকজন, কিন্তু দিশা নেই। অন্ধকারের সঙ্গে কুয়াশা মিশেছে। এই দৃশ্য পথহারা সমাজের। পাঞ্জেরীকে তাই ডাকতে হয়। সে শুধু পাহারাদার নয়। সে জাগ্রত দায়িত্ব।
তারপর ইতিহাসের ক্লান্তি এসে পড়ে।
“দীঘল রাতের শ্রান্ত সফর শেষে
কোন দরিয়ার কালো দিগন্তে আমরা পড়েছি এসে?
একী ঘন-সিয়া জিন্দিগানীর বা’ব
তোলে মর্সিয়া ব্যথিত দিলের তুফান-শ্রান্ত খা’ব,
অস্ফুট হয়ে ক্রমে ডুবে যায় জীবনের জয়ভেরী।
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
সম্মুখে শুধু অসীম কুয়াশা হেরি।
রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?”
এই স্তবক ফররুখের কাব্যচেতনার কেন্দ্রীয় দলিলের মতো। “দীঘল রাত” দীর্ঘ পতন। “শ্রান্ত সফর” ইতিহাসের ক্লান্ত যাত্রা। “কালো দিগন্ত” সামনে পথ না দেখা। “মর্সিয়া” শোকের সুর। “জয়ভেরী” ডুবে যাচ্ছে। একসঙ্গে শোক, যাত্রা, অন্ধকার, যুদ্ধস্মারক, দিশাহীনতা। ফররুখ বক্তৃতা করেন না। দৃশ্য তৈরি করেন। সেই দৃশ্যের ভিতর দিয়ে জাতির মানসিক অবস্থা প্রকাশ পায়।
ফররুখের কবিতা এই জায়গায় lyric poet (গীতিকবি)-এর সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাঁর কবিতায় গীতি আছে, সুর আছে, ব্যক্তিগত আর্তির ঘনতা আছে। কিন্তু শুধু হৃদয়ের সঙ্গীত নয়। তার পেছনে epic impulse (মহাকাব্যিক তাগিদ) কাজ করে। তিনি একক মানুষের কান্না থেকে শুরু করে মিল্লাতের রাত পর্যন্ত পৌঁছান। তাঁর “আমি” অনেক সময় “আমরা”-তে বদলে যায়। তাঁর নাবিক একা নয়; সে জাতির নাবিক। তাঁর পাঞ্জেরী এক জাহাজের নয়; এক ইতিহাসের পাঞ্জেরী।
তাই তাঁকে শুধু lyric poet (গীতিকবি) হিসেবে পড়লে কম পড়া হয়। আবার শুধু propaganda poet (প্রচারকবি) বললে অন্যায় হয়। ফররুখের কাব্যে lyric (গীতি), epic impulse (মহাকাব্যিক তাগিদ), moral call (নৈতিক ডাক), এবং historical imagination (ঐতিহাসিক কল্পনা) একসঙ্গে কাজ করে। তাঁর কবিতা ব্যক্তিমানুষের হৃদয় থেকে শুরু হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে একটি বিস্তৃত জাতিগত শরীরে পৌঁছায়।
“পাঞ্জেরী”র আরেক স্তবকে অন্ধকার ব্যক্তিগত থাকে না। ক্ষুধিত মানুষ, মজলুমের বেদনা, বন্দরের দায়—সব এসে পড়ে।
“ওকি বাতাসের হাহাকার,-ওকি
রোণাজার ক্ষুধিতের!
ওকি দরিয়ার গর্জন,- ওকি বেদনা মজলুমের!
ওকি ক্ষুধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী!
পাঞ্জেরী!
জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি;
জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি;
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরী, কত দেরী ॥”
এখানে ফররুখের ইসলামি কাব্যচেতনা সামাজিক হয়ে ওঠে। শুধু সভ্যতার পতন নয়; ক্ষুধার মুখও আছে। শুধু মিল্লাতের গৌরব নয়; মজলুমের বেদনা আছে। “কৈফিয়ত” শব্দটি ভয়ংকর। পাঞ্জেরী শুধু রাতের হিসাব দেবে না; মানুষের কাছেও জবাবদিহি করবে। এই নৈতিক চাপ ছাড়া ফররুখকে বোঝা যায় না। তিনি শুধু অতীতের কবি নন। তিনি দায়ের কবি।
এইখানেই তাঁর ইসলামী কাব্যচেতনা স্লোগান থেকে আলাদা। স্লোগান ক্ষুধাকে সহজে ব্যবহার করে। ফররুখ ক্ষুধার সামনে দাঁড় করান। স্লোগান মজলুমের নাম নেয়; ফররুখ মজলুমের বেদনা শুনতে বাধ্য করেন। পাঞ্জেরীকে জাগতে হবে, কারণ বন্দরে মানুষ আছে। ক্ষুধিত মুখ আছে। নীরব ভ্রুকুটি আছে। ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়; জবাবদিহিরও।
এই কাব্যচেতনার ভিতরে allusion (ইঙ্গিত)-এর স্তরও কাজ করে। “ফররুখ কাব্যগীতি” প্রবন্ধে তাঁর কবিতার allusion (ইঙ্গিত) প্রসঙ্গে হযরত খিজির, হলাকু-হাবাকাশীর মতো অনুষঙ্গের কথা এসেছে। অর্থাৎ তাঁর কবিতার ভিতরে মুসলিম ইতিহাস ও কাহিনির গভীর স্তর কাজ করে। সাধারণ পাঠক অনেক সময় এই স্তর ধরতে পারে না। কিন্তু এগুলো বাদ দিলে ফররুখের কবিতার দিগন্ত ছোট হয়ে যায়। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ২৬২)
“সাত সাগরের মাঝি” এই জাগরণের আরেক বিস্তৃত রূপ। কবিতার শুরুতেই ভোর, জোয়ার, জাহাজ ও ঘুম একসঙ্গে দাঁড়ায়।
“কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হ’ল জানি না তা’।
নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু, তুমি জাগলে না?
সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ,
অচল ছবি সে, তসবির যেন দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ।
হালে পানি নাই, পাল তার ওড়ে নাকো,
হে নাবিক! তুমি মিনতি আমার রাখো;
তুমি উঠে এসো, তুমি উঠে এসো মাঝি মাল্লার দলে
দেখবে তোমার কিশতি আবার ভেসেছে সাগর জলে,”
জোয়ার এসেছে, জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু হালে পানি নেই। পাল ওড়ে না। সুযোগ এসেছে, মানুষ অচল। ইতিহাসের দরজা খুলেছে, মাঝি ঘুমায়। এই ঘুম ব্যক্তির নয়; জাতির। ফররুখ বারবার এই ঘুম ভাঙাতে চান। তাঁর কাব্যজগতে জাহাজ অচল থাকতে পারে না। পালের কাজ উড়তে থাকা। মাঝির কাজ উঠে দাঁড়ানো।
“সাত সাগরের মাঝি”তে হারানো সফরের স্মরণও আসে।
“ভুলেছ’ কি সেই প্রথম সফর জাহাজ চ’লেছে ভেসে
অজানা ফুলের দেশে,
ভুলেছ’ কি সেই জামরুদ তোলা স্বপ্ন সবার চোখে
ঝলসে চন্দ্রলোকে,
পাল তুলে কোথা জাহাজ চলেছে কেটে কেটে নোনা পানি,
অশ্রান্ত সন্ধানী।
দিগন্ত নীল-পর্দা ফেলে সে ছিঁড়ে
সাত সাগরের নোনা পানি চিরে চিরে।”
এখানে অতীত nostalgia (অতীতমুগ্ধতা) নয়। এটি হারানো গতির স্মরণ। “প্রথম সফর” শুধু প্রাচীন কাহিনি নয়; মুসলিম মানুষের অভিযাত্রিক শক্তির স্মরণ। “অশ্রান্ত সন্ধানী” শব্দজোড়া ফররুখের কাব্যমানস ধরতে সাহায্য করে। যে সমাজ একদিন সন্ধানী ছিল, সে আজ অচল। এই তুলনা কবিতার ভিতরে নিঃশব্দ আঘাত তৈরি করে।
তারপর বর্তমানের কঠিন নির্দেশ আসে।
“আজকে তোমার পাল ওঠাতেই হবে,
ছেঁড়া পালে আজ জুড়তেই হবে তালি,
ভাঙা মাস্তুল দেখে দিক করতালি,
তবুও জাহাজ আজ ছোটাতেই হবে।”
ফররুখের জাগরণচেতনা এখানে সবচেয়ে বাস্তব। পাল ছেঁড়া। মাস্তুল ভাঙা। অবস্থা নিখুঁত নয়। তবু জাহাজ ছোটাতে হবে। সম্পূর্ণ শক্তি ফিরে এলে যাত্রা শুরু হবে—এমন বিলাসিতা নেই। ভাঙা অবস্থাতেই যাত্রা। ছেঁড়া পালে তালি দিয়েই সমুদ্র। এটি মুসলিম পুনর্জাগরণের কঠিন কাব্যনৈতিকতা।
এখানে হাল ছেড়ে দেওয়া নিষিদ্ধ। পরাজয় আছে, কিন্তু পরাজয়ের মধ্যে বসে থাকা নেই। ভাঙা পাল, ভাঙা মাস্তুল, তবু যাত্রা। ফররুখের কাব্যচেতনার ভিতরে এই অস্বস্তিকর জেদ কাজ করে।
কবিতার আরেক জায়গায় রাত্রি, ক্ষুধা ও হেরা একসঙ্গে আসে।
“এখানে এখন রাত্রি এসেছে নেমে,
তবু দেখা যায় দূরে বহুদূরে হেরার রাজ-তোরণ,
এখানে এখন প্রবল ক্ষুধায় মানুষ উঠছে কেঁপে,
এখানে এখন অজস্র ধারা উঠছে দু’চোখ চেপে
তবু দেখা যায় দূরে বহুদূরে হেরার রাজ-তোরণ...”
“হেরা” এখানে শুধু পবিত্র স্থান নয়। এটি ওহি, নবুয়ত, শুরু, আলো, নৈতিক বিপ্লবের প্রতীক। তার সামনে আছে ক্ষুধা, অশ্রু, রাত্রি। ফররুখের কবিতায় আধ্যাত্মিকতা বাস্তবতা থেকে পালায় না। হেরার রাজ-তোরণ দূরে দেখা যায়, কিন্তু কাছে মানুষ ক্ষুধায় কাঁপছে। এই দ্বৈততা তাঁর ইসলামি কাব্যচেতনার গভীরতা। তিনি শুধু মরমি আলো দেখেন না; ক্ষুধার শরীরও দেখেন।
শেষের দিকে “সাত সাগরের মাঝি” আবার যাত্রার ভাষায় ফিরে আসে।
“সে পথে যদিও পার হতে হবে মরু
সে পথে যদিও দরিয়ার নোনা পানি
তবুও সে পথে আছে মঞ্জিল, জানি আছে ছায়াতরু
পথে আছে মিঠে পানি।
তবে পাল খোলো, তবে নোঙ্গর তোলো;
এবার অনেক পথ শেষে সন্ধানী!
হেরার তোরণ মিলবে সম্মুখে জানি।
তবে নোঙ্গর তোলো
তবে তুমি পাল খোলো,
তবে তুমি পাল খোলো ॥”
এই সমাপ্তি ফররুখের কাব্যচেতনার সারাংশ। পথে মরু আছে, নোনা পানি আছে, কিন্তু মঞ্জিলও আছে, ছায়াতরুও আছে, মিঠে পানিও আছে। বিপদ ও আশ্বাস পাশাপাশি। মৃত্যু ও যাত্রা পাশাপাশি। ক্লান্তি ও দিশা পাশাপাশি। “পাল খোলো” শুধু নাবিকের নির্দেশ নয়; ঘুমন্ত মিল্লাতের প্রতি আহ্বান।
এই তিন কবিতা একসঙ্গে পড়লে ফররুখের মুসলিম কাব্যচেতনার প্রকৃতি পরিষ্কার হয়। “সিন্দাবাদ” যাত্রা শুরু করে। “পাঞ্জেরী” অন্ধকারে জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে। “সাত সাগরের মাঝি” ভাঙা পাল নিয়েও জাহাজ চালানোর শপথ নেয়। তিনটির ভিতরে সমুদ্র আছে, রাত আছে, জাহাজ আছে, দিশা আছে, ক্ষুধা আছে, হেরা আছে। এগুলো আলাদা আলাদা প্রতীক নয়; এক কাব্যিক মানচিত্র।
এই মানচিত্রে বাঙালি মুসলমান ছোট থাকে না। সে পল্লির মানুষ, কিন্তু শুধু পল্লির নয়। সে ক্ষুধার মানুষ, কিন্তু শুধু ক্ষুধার নয়। সে পরাজিত, কিন্তু শুধু পরাজিত নয়। তার সামনে দরিয়া আছে, পেছনে হেরা আছে, ভিতরে পাঞ্জেরীর প্রশ্ন আছে, হাতে ছেঁড়া পাল আছে। এই সব মিলেই ফররুখ বাংলা ভাষায় মুসলিম কাব্যচেতনার পুনর্জাগরণ ঘটান।
এইখানে তাঁর কবিতা রবীন্দ্রীয় ধ্যানমগ্নতার সঙ্গে আলাদা হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের জগৎ বৃহৎ, গভীর, মানবিক। কিন্তু ফররুখের জগৎ অন্য। তিনি এক পরাজিত মুসলিম সমাজের বুকের ভিতর থেকে কথা বলেন। তাঁর কণ্ঠে ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা থাকলেও তার পেছনে আছে মিল্লাতের ভার। তাঁর স্বপ্ন ব্যক্তিগত মুক্তি নয়; সমষ্টিগত জাগরণ। তাঁর শব্দে তাই অনেক সময় ঢাকের শব্দ আছে, জাহাজের ঘণ্টা আছে, যুদ্ধের দূর সুর আছে, ফজরের আগের অন্ধকার আছে।
তাঁর কাব্যভাষার স্বাতন্ত্র্য এখানেই। তিনি বাংলা ভাষায় এমন শব্দ, প্রতীক ও ইতিহাস আনেন, যেগুলোকে দীর্ঘদিন প্রান্তে রাখা হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যিক রুচির কেন্দ্রে সংস্কৃত পুরাণ, বৈষ্ণব রস, শাক্ত প্রতীক, দেবদেবীর গল্প, গীতা বা উপনিষদের ভাবচ্ছায়া সহজেই সাহিত্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু আরবি-ফারসি শব্দ, কোরআনি অনুষঙ্গ, মুসলিম অভিযাত্রা, সিন্দাবাদ, পাঞ্জেরী, মর্দে মুমিন, সমুদ্রযাত্রা—এসব এলেই তাকে অনেক সময় আলাদা করে দেখা হয়েছে। যেন এগুলো বাংলা ভাষার ভিতরের বস্তু নয়, বাইরে থেকে আনা। এই বিচার নিরপেক্ষ নয়।
ফররুখ এই অসম বিচার ভেঙেছেন। তিনি বাংলা ভাষায় ইসলামী চিহ্ন বসিয়েছেন লজ্জা ছাড়া। কোরআনি ইঙ্গিত, আরবি-ফারসি শব্দ, মুসলিম ইতিহাস, মসজিদ, মিনার, মরু, সিন্দাবাদ, পাঞ্জেরী—এসব তাঁর কাছে ধার করা সাজ নয়। এগুলো তাঁর নিজস্ব কাব্যিক উপাদান। যে ঘরে আগে অন্যের প্রতীক স্বাভাবিক ছিল, সেখানে তিনি মুসলমানের প্রতীককে স্থাপন করেছেন। এতে বাংলা ভাষা গরিব হয়নি। বাংলা ভাষার ভাণ্ডার বড় হয়েছে।
ফররুখের পুনর্জাগরণচেতনা রাজনৈতিক স্লোগানের অনুবাদ নয়। এটি কবিতার ভিতর মুসলিম মানুষের মানসিক পুনর্গঠন। যে মানুষ নিজের ঐতিহ্য নিয়ে লজ্জিত ছিল, তাকে তিনি বললেন—তোমার ইতিহাস আছে। যে মানুষ নিজের ভাষায় মুসলমানি শব্দ বসাতে দ্বিধা করছিল, তাকে দেখালেন—বাংলা ভাষা তা বহন করতে পারে। যে মানুষ নিজের বর্তমানকে চূড়ান্ত ভেবেছিল, তাকে তিনি সমুদ্রের দিকে তাকাতে শেখালেন।
এইখানে তাঁর কাজ সবচেয়ে মূল্যবান। তাঁর আগে মুসলমান কবি ছিল, ইসলামী ভাবও ছিল। কিন্তু ফররুখের হাতে তা একটি বৃহত্তর civilizational imagination (সভ্যতাগত কল্পনা)-এ রূপ নেয়। পল্লির মুসলমান, পতিত মিল্লাত, হারানো আন্দালুস, সাগরের নাবিক, রাতের পাঞ্জেরী, ক্ষুধিত মানুষের নীরব ভ্রুকুটি, হেরার দূর তোরণ—সব এক কাব্যিক মানচিত্রে এসে দাঁড়ায়।
এই মানচিত্র ছাড়া বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক আত্মপরিচয় অসম্পূর্ণ। যে জাতিগত সত্তা নিজের রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, অথচ নিজের কাব্যিক আকাশ ফিরিয়ে আনে না, তার জাগরণ অর্ধেক থেকে যায়। ফররুখ সেই আকাশ ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর কবিতা সেই ফেরার ডাক।
একটি ঘুমন্ত সমাজের পাশে তিনি শুধু প্রদীপ ধরেননি; পাল খুলতেও বলেছেন।
এখানে ফররুখের ইসলামী কাব্যচেতনা কোনো স্লোগান নয়। স্লোগানে ইতিহাস ছোট হয়ে যায়। ফররুখ ইতিহাসকে ছোট করেননি। তিনি পরাজয়ের গভীরে গেছেন। মুসলমানের পতন তাঁর কাছে কেবল রাজনৈতিক পরাজয় নয়; এটি আত্মবিস্মৃতি, নৈতিক শিথিলতা, কল্পনাশক্তির মৃত্যু এবং দিশাহীনতার সংকট। তাই তাঁর কবিতায় বারবার দিশা খোঁজার বিষয় আসে। পাঞ্জেরী দরকার হয়, মাঝি দরকার হয়, জাহাজ দরকার হয়। জাতি চলবে কীভাবে, তা না জানলে ঈমানও সামাজিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে না।
এই কাব্যচেতনার ভিতরে বাঙালি মুসলমানের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত। বাংলার মুসলমান দীর্ঘদিন নিজের সাহিত্যিক চেহারা নিয়ে দ্বিধায় ছিল। সে বাংলা ভাষায় লিখবে, কিন্তু কী নিয়ে লিখবে? শুধু পল্লিজীবন? শুধু দারিদ্র্য? শুধু লোকগাথা? নাকি নিজের ইসলামী অতীত, মিল্লাতের ব্যথা, হারানো সভ্যতার আহ্বান, আত্মমর্যাদার সংগ্রামও বাংলা কবিতার বিষয় হবে? ফররুখ এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন কবিতায়। তিনি বলেছেন, মুসলমানের ইতিহাস বাংলা কবিতার বাইরে নয়।
এই উত্তর বাংলা সাহিত্যিক অভ্যাসের জন্য সহজ ছিল না। কারণ এতে বাঙালি মুসলমানের কল্পনা বড় হয়ে যায়। সে আর শুধু প্রান্তিক চরিত্র নয়। সে এক বিশ্ব-ইতিহাসের সন্তান। তার পরাজয়ও বড়, তার আকাঙ্ক্ষাও বড়। তাকে ছোট করে রাখার জন্য যে সাহিত্যিক ভাষা তৈরি হয়েছিল, ফররুখ সেই ভাষার ভিতরে ভাঙন ধরান। তিনি বলেন না, বাংলা ছাড়ো। তিনি বলেন, বাংলার ভিতরে তোমার হারানো দিগন্ত ফিরিয়ে আনো।
এ কারণেই ফররুখের কবিতা পড়তে গেলে “ইসলামী” শব্দটিকে ভয় পেলে চলবে না। আবার “ইসলামী” শব্দ বলেই সবকিছু মাফ করে দিলেও চলবে না। তাঁর কবিতার শক্তি যাচাই করতে হবে ভাষা, ছন্দ, প্রতীক, ঐতিহাসিক কল্পনা এবং সভ্যতাগত তাগিদের ভিতরে। কোথাও তিনি অতিরিক্ত উচ্চারণ করেছেন, কোথাও সময়ের রাজনৈতিক আবেগ কাব্যের ওপর চাপ ফেলেছে—এসব নিয়ে আলাদা আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রকল্পকে ছোট করা যাবে না। তিনি বাংলা ভাষায় মুসলিম কল্পনাশক্তির এক বড় দরজা খুলেছেন।
“ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য” সংকলনের প্রাথমিক আলোচনাগুলোতে তাঁর স্বতন্ত্র কাব্যচেতনা ও কাব্যভাষার প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। সেখানে ফররুখকে কেবল আবেগী বা ধর্মীয় কবি হিসেবে নয়, বাংলা কবিতায় আলাদা উচ্চারণ নির্মাণকারী কবি হিসেবে পড়ার ইঙ্গিত আছে। “ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি” সংকলনের সূচিবিন্যাসেও একই ব্যাপার দেখা যায়। ইসলামী আদর্শ, স্বাতন্ত্র্যচেতনা, সিন্দবাদী রূপক, মহাকাব্যিক প্রতীক—সব মিলিয়ে তাঁকে একটি বড় সাহিত্যিক পরিসরে স্থাপন করার চেষ্টা আছে। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৮–১৫; ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ১১–১৩)
এইসব কারণেই ফররুখের কাব্যচেতনা পুনর্জাগরণের কাব্যচেতনা। তিনি শুধু অতীত স্মরণ করেন না; অতীতের ভিতর থেকে বর্তমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি শুধু হারানো গৌরবের গান করেন না; হারানোর কারণ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি করেন। তিনি শুধু মুসলমানকে তার গৌরব দেখান না; তার ঘুমও দেখান। এই দুই কাজ একসঙ্গে করতে পারাই তাঁর শক্তি।
যে কবি শুধু সান্ত্বনা দেন, তিনি জাতিকে ঘুম পাড়াতে পারেন। যে কবি শুধু গালি দেন, তিনি জাতিকে ক্লান্ত করেন। ফররুখ দুটোই এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন। তিনি আঘাত করেন, কিন্তু আঘাতের ভিতরে পথ রাখেন। তিনি অতীত ডাকেন, কিন্তু অতীতকে মৃত প্রদর্শনী বানান না। তিনি অন্ধকার দেখান, কিন্তু পাঞ্জেরীকে ডাকেন। এই ডাকই তাঁর কবিতার প্রাণ।
বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক আত্মপরিচয়ে ফররুখ তাই একটি কেন্দ্রীয় নাম। তাঁর কবিতা ছাড়া বাংলা ভাষায় মুসলিম সভ্যতাগত কল্পনার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে। তাঁকে বাদ দিলে বাংলা কবিতার ক্ষতি হয়, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয় বাঙালি মুসলমানের নিজের। কারণ তখন সে নিজের এক শক্তিশালী কাব্যিক আয়না হারায়। আর একটি জাতি আয়না হারালে তার চেহারা ভুলে যায়।
আন্দালুস বা স্পেন: হারানো গৌরবের ভাষা
আন্দালুস মুসলিম ইতিহাসের এক অদ্ভুত নাম। উচ্চারণ করলেই মনে হয়, পাথরের দেয়ালে এখনো আলো আটকে আছে। কর্ডোভা, গ্রানাডা, আলহামরা, কমলা-বাগান, ফোয়ারা, মসজিদের খিলান, গ্রন্থাগারের দীর্ঘ সারি—সব মিলিয়ে যেন হারানো এক আকাশ। কিন্তু এই আকাশের দিকে তাকাতে গিয়ে মানুষ খুব সহজে অলস হয়ে যায়। সৌন্দর্যেরও মাদকতা আছে। হারানো প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর নিজের বর্তমানের দায় ভুলে ঘরে ফিরে আসে।
ফররুখ আহমদের কাব্যচেতনা এই অলস দীর্ঘশ্বাসের বিরুদ্ধে। তাঁর কবিতায় হারানো গৌরব ঝুলন্ত ছবি নয়। তা ঘুম ভাঙানোর কাঁটা। আন্দালুস তাঁর কবিতায় সবসময় নাম ধরে আসে না, কিন্তু পতিত মুসলিম সভ্যতার যে দীর্ঘ ছায়া তাঁর কাব্যের ওপর পড়ে আছে, তার ভিতর আন্দালুসকে না দেখলে ছবির একটি বড় অংশ অন্ধকারে থেকে যায়। একদিন মুসলিম মানুষ জ্ঞান, শহর, নৌযাত্রা, বাণিজ্য, কবিতা, স্থাপত্য, চিকিৎসা, দর্শন ও রাষ্ট্রশক্তির ভাষায় পৃথিবীর সঙ্গে কথা বলত। পরে সেই মানুষই আত্মবিস্মৃত, ক্ষতবিক্ষত, দিশাহীন। ফররুখ এই ব্যবধানের কবি।
তাঁর হারানো গৌরবের ভাষা তাই প্রদর্শনীর ভাষা নয়। তিনি অতীতকে “ছিল” বলে রেখে দেন না। অতীতকে বর্তমানের সামনে দাঁড় করান। তখন স্মরণ আর নিরীহ থাকে না। তা জেরা হয়ে ওঠে।
কী হারালে?
কেন হারালে?
হারানোর পর কী করলে?
এই তিন প্রশ্ন ছাড়া আন্দালুস-স্মরণ সস্তা আবেগে নেমে যায়। ফররুখ আবেগহীন কবি নন। কিন্তু তাঁর আবেগ স্থির থাকে না। তা দায়ে রূপ নেয়। হারানো প্রাসাদ তাঁর কাছে শুধু সৌন্দর্যের স্মারক নয়; পতনের সাক্ষী। হারানো বাগান শুধু রূপের বস্তু নয়; আত্মবিস্মৃতির অভিযোগ। ম্লান তাজ শুধু রাজনীতির প্রতীক নয়; মর্যাদাহীন বর্তমানের আয়না।
এইখানে ফররুখ সাধারণ অতীতগৌরব থেকে আলাদা। সাধারণ গৌরবচর্চা বলে, আমাদের একদিন সভ্যতা ছিল। ফররুখের ভিতরের কণ্ঠ বলে, ছিল, কিন্তু এখন তুমি কী? সাধারণ গৌরবচর্চা অতীতকে সাজায়। ফররুখ অতীতকে বর্তমানের ঘাড়ে বসান। সে আরাম ভাঙায়, আত্মপ্রবঞ্চনা ভাঙায়, আয়েশী ঘুমে আগুন ধরায়।
আন্দালুস মুসলিম মানসে এক ধরনের collective wound (সমষ্টিগত ক্ষত)। এই ক্ষত শুধু রাজনীতি হারানোর নয়। জ্ঞান হারানোর, ভাষার মহিমা হারানোর, নগরসভ্যতার নকশা হারানোর, সৌন্দর্যের কর্তৃত্ব হারানোর। একটি সভ্যতা যখন হারায়, তখন শুধু সীমানা হারায় না। সে নিজের উচ্চতার ধারণাও হারায়। পরাজয়ের দীর্ঘ অভ্যাস মানুষকে ছোট জীবনকে নিয়তি ভাবতে শেখায়।
ফররুখ এই ছোট হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তিনি বাঙালি মুসলমানকে বলেন না—তুমি শুধু গ্রাম, তুমি শুধু দারিদ্র্য, তুমি শুধু প্রান্ত। তিনি তার কল্পনায় ফেরত আনেন সাগর, সফর, রত্ন, দূর দিগন্ত, হেরার আলো, ক্ষুধিত মানুষের দায়। এর মধ্যে আন্দালুস এক বিশেষ প্রেতছায়া। নাম উচ্চারিত হোক বা না হোক, হারানো সভ্যতার যে আলো-অন্ধকার তাঁর কবিতায় কাজ করে, তা স্পেনের পতনের সঙ্গে আত্মীয়তা রাখে।
তবে ফররুখকে সরলভাবে “আন্দালুস-বিলাপের কবি” বানালে তাঁকে ছোট করা হবে। তিনি শুধু স্পেন হারানোর কবি নন। তিনি সেই মুসলিম মানুষের কবি, যার কাছে স্পেন, বাগদাদ, সমুদ্র, হেরা, পল্লিবাংলা—সব এক বিস্তৃত ইতিহাসবোধে এসে মেশে। তাঁর কবিতায় আন্দালুস একক ভূগোল নয়; পতিত সভ্যতার প্রতীকী দরজা। এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায়, মুসলিম মানুষের হারানো গৌরব যেমন আছে, তেমনি তার নৈতিক ব্যর্থতাও আছে।
এই কারণেই তাঁর কাব্যে শোক একা থাকে না। শোকের সঙ্গে আত্মসমালোচনা থাকে। “সিন্দাবাদ” কবিতায় তিনি যে আয়েশী জীবন ভাঙতে চান, তা শুধু ব্যক্তিগত আরাম নয়; ইতিহাসের পরাজয় ভুলে বসে থাকা এক মানসিকতা।
“জড়তার রাত শেষ হয়ে এল আজ,
কেটেছে পল্কা নরম আয়েশ আশরতে বহুদিন,
মর্চে ধরেছে কব্জায়; ম্লান তাজ।
আজ ফুঁড়ে চলো দরিয়ার সংগিন,
ভাঙো এ নরম মখমলে ছাওয়া দিন;
মাতমি-লেবাস ফেলে আজ পরো মাল্লার নীল সাজ।”
“ম্লান তাজ” শব্দদুটি ছোট, কিন্তু তার ভিতর বড় ইতিহাস আছে। আন্দালুসের ইতিহাসে তাজ ম্লান হয়েছে। প্রাসাদ বেঁচে থেকেও ক্ষমতা চলে গেছে। খোদাই আছে, কিন্তু অধিকার নেই। স্থাপত্য আছে, কিন্তু জাতির হাতে তার চাবি নেই। ফররুখের কাব্যে এই ম্লান তাজ শোকের বস্তু হয়ে থাকে না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন—মাল্লার নীল সাজ পরো। অর্থাৎ কাঁদা যথেষ্ট নয়। সফর দরকার।
আন্দালুসের স্মরণকে যদি শুধু হারানো সৌন্দর্যের ভাষায় রাখা হয়, তবে তা মুসলিম আত্মপরিচয়ের কাজে অর্ধেক। ফররুখের কাছে সৌন্দর্য নৈতিকতা ছাড়া সম্পূর্ণ নয়। প্রাসাদ যদি থাকে কিন্তু মানুষ ক্ষুধিত থাকে, তবে সে গৌরব মিথ্যা। আলহামরার দেয়াল যদি মনে থাকে, কিন্তু বন্দরের ক্ষুধিত মুখ দেখা না যায়, তবে স্মরণ অন্ধ। তিনি মুসলিম ইতিহাসকে কেবল মুকুট, মিনার ও রত্নে আটকে রাখেন না। তিনি ক্ষুধার মুখও সামনে আনেন।
হারানো সভ্যতার ভাষা তাই তাঁর কাছে দুই ধারার। একদিকে মর্যাদার পুনরুদ্ধার। অন্যদিকে দায়ের পুনরুদ্ধার। শুধু বলা নয়—আমাদের জ্ঞান ছিল। প্রশ্নও—আজ আমাদের জ্ঞান কোথায়? শুধু বলা নয়—আমাদের স্থাপত্য ছিল। প্রশ্নও—আজ আমাদের ঘর কাদের জন্য? শুধু বলা নয়—আমাদের তাজ ছিল। প্রশ্নও—আজ আমাদের মানুষের মাথা কেন নত?
এই প্রশ্নগুলো ফররুখকে স্লোগান থেকে দূরে রাখে। তিনি সভ্যতার শোককে কবিতায় নেন, কিন্তু সভ্যতার নাম নিয়ে আত্মম্ভরিতা করেন না। তাঁর কবিতায় হারানো গৌরবের ভাষা বারবার কাজের ভাষায় বদলে যায়। নোঙ্গর তুলতে হবে। পাল খুলতে হবে। ভাঙা জাহাজও চালাতে হবে। এর মানে, অতীতের সৌন্দর্য বর্তমানের শ্রম দাবি করে। যে অতীত শ্রম দাবি করে না, তা নেশা।
“সাত সাগরের মাঝি”তে এই অচলতার দৃশ্য খুব স্পষ্ট।
“দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু, তুমি জাগলে না?
সাত সাগরের মাঝি চেয়ে দেখো দুয়ারে ডাকে জাহাজ,
অচল ছবি সে, তসবির যেন দাঁড়ায়ে রয়েছে আজ।
হালে পানি নাই, পাল তার ওড়ে নাকো,”
জোয়ার এসেছে, কিন্তু জাহাজ চলে না। পাল আছে, কিন্তু ওড়ে না। হাল আছে, কিন্তু পানিহীন। দৃশ্যটি প্রায় আন্দালুস-পরবর্তী মুসলিম ইতিহাসের রূপক হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভাবনা দরজায় দাঁড়ায়, কিন্তু সমাজের হাত চলে না। অতীত আছে, কিন্তু গতি নেই। গৌরব আছে, কিন্তু জাগরণ নেই।
এই অচলতার বিপরীতে ফররুখ ফের মনে করান হারানো যাত্রা।
“ভুলেছ’ কি সেই প্রথম সফর জাহাজ চ’লেছে ভেসে
অজানা ফুলের দেশে,
ভুলেছ’ কি সেই জামরুদ তোলা স্বপ্ন সবার চোখে
ঝলসে চন্দ্রলোকে,
পাল তুলে কোথা জাহাজ চলেছে কেটে কেটে নোনা পানি,
অশ্রান্ত সন্ধানী।”
এই “প্রথম সফর” কোনো শিশুকাহিনি নয়। এটি মুসলিম সভ্যতার প্রথম সাহসের রূপক। অজানা ফুলের দেশ, জামরুদ তোলা স্বপ্ন, নোনা পানি কেটে চলা জাহাজ—এসবের ভিতরে বাণিজ্য, জ্ঞান, ভূগোল, সাহস, কল্পনা, অভিযাত্রা একসঙ্গে কাজ করে। আন্দালুসের মতো সভ্যতা এই যাত্রামন ছাড়া জন্মায় না। যে জাতি অজানা ফুলের দেশে যায় না, সে গ্রানাডা গড়তে পারে না। যে জাতি নোনা পানি চিরে না যায়, সে জ্ঞান, শহর, শিল্প, কৃষি ও ভাষার বিস্তৃত দিগন্তও বানাতে পারে না।
ফররুখ এই ইতিহাসকে সরাসরি তথ্যের ভাষায় বলেন না। তিনি দৃশ্য দেন। জাহাজ দেন। রত্ন দেন। নোনা পানি দেন। দিগন্ত দেন। তাঁর কাব্যভাষার আরবি-ফারসি মেজাজ, দরিয়া-সফর-কিশতী-সিন্দবাদ-জাতীয় শব্দপ্রবাহ, এবং allusion (ইঙ্গিত)-এর ব্যবহারের দিকে “ফররুখ কাব্যগীতি” আলোচনায় বিশেষ নজর আছে। এই ভাষা বাহুল্য নয়; হারানো মুসলিম বিশ্বমানচিত্রকে বাংলায় ফেরানোর পদ্ধতি। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ২৬১–২৬২)
আন্দালুসের গৌরবের ভাষায় রত্নের উপস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু ফররুখের রত্ন শুধু অলংকার নয়।
“জড়ো করি লাল, পোখরাজ আর ইয়াকুত ভরা দিন
দরিয়ার বুকে নামায়েছি ফের বে-দেরেগ সংগীন,
সমুদ্র-সিনা ফেড়ে ছুটে চলে কিশতী, স্বপ্ন সাধ;”
“লাল”, “পোখরাজ”, “ইয়াকুত”—এসব শব্দ কাব্যে ঐশ্বর্য আনে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি আনে হারানো বাণিজ্য ও সমুদ্রসভ্যতার আবহ। আন্দালুস শুধু মসজিদ আর প্রাসাদের নাম নয়; বাণিজ্যও ছিল, শহরও ছিল, জ্ঞানচক্রও ছিল, রুচিও ছিল, বাজারও ছিল, ভাষার মিশ্রণও ছিল। ফররুখের এই রত্ন-ভাষা মুসলিম সভ্যতার সেই বিস্তৃত জীবনকেই মনে করায়।
কিন্তু ঠিক সেই জায়গাতেই তাঁর কবিতা আঘাত দেয়। রত্ন আছে, কিন্তু জাহাজ বানচাল হতে পারে। ঐশ্বর্য আছে, কিন্তু গুমরাহ হওয়ার ভয়ও আছে।
“কোথায় জাহাজ হবে ফের বানচাল,
তক্তায় ভেসে কাটবে আবার দরিয়ায় কতকাল;
সে কথা জানি না, মানি না সে কথা দরিয়া ডেকেছে নীল!”
এই পংক্তিগুলোর ভিতরে আন্দালুসের প্রকৃত শিক্ষা আছে। পতনের সম্ভাবনা জেনেও সফর বন্ধ করা যাবে না। জাহাজ ভাঙতে পারে। মানুষ তক্তায় ভাসতে পারে। ইতিহাস আবার আঘাত করতে পারে। তবু দরিয়া ডেকেছে। সভ্যতার পুনর্গঠন কখনো নিরাপদ মানুষের কাজ নয়। সে ঝুঁকির কাজ।
স্পেন হারানোর পর মুসলিম কল্পনায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, ফররুখ সেই ক্ষতকে শুধু কান্নায় রাখেন না। তাঁর কাছে হারানো গৌরবের ভাষা মৃত স্মারকচর্চা নয়। এর ভিতরে আছে জিজ্ঞাসা, লজ্জা, দায় এবং পথের নির্দেশ। “পাঞ্জেরী”র রাত তাই আন্দালুসের পরবর্তী অন্ধকারের সঙ্গেও পড়ে।
“দীঘল রাতের শ্রান্ত সফর শেষে
কোন দরিয়ার কালো দিগন্তে আমরা প’ড়েছি এসে?
একী ঘন-সিয়া জিন্দিগানীর বা’ব
তোলে মর্সিয়া ব্যথিত দিলের তুফান-শ্রান্ত খা’ব,
অস্ফুট হ’য়ে ক্রমে ডুবে যায় জীবনের জয়ভেরী।”
“জয়ভেরী” ডুবে যায়। এই একটি চিত্রেই অনেক ইতিহাস ঢুকে পড়ে। বিজয়ের শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে। শোকের মর্সিয়া উঠছে। সফর আছে, কিন্তু শ্রান্ত। দরিয়া আছে, কিন্তু কালো দিগন্ত। এখানে হারানো আন্দালুস, পতিত বাগদাদ, ভাঙা সাম্রাজ্য, পরাজিত সমাজ—সব এক অন্ধকার ভাষায় এসে মিশতে পারে। ফররুখের শক্তি এখানেই। তিনি একটি নির্দিষ্ট ঘটনার চেয়ে বড় মানসিক ভূগোল বানান।
কিন্তু এই শোকের ভিতরেও তাঁর চোখ শুধু অতীতে আটকে থাকে না। “পাঞ্জেরী”তে ক্ষুধিত মানুষের মুখ এসে পড়ে।
“ওকি দরিয়ার গর্জন,- ওকি বেদনা মজলুমের!
ওকি ক্ষুধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী!
পাঞ্জেরী!
জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি;
জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি;”
এখানে আন্দালুসের গৌরবচর্চা পরীক্ষা দিতে বাধ্য। যে স্মরণ ক্ষুধিত মুখ দেখে না, সে মিথ্যা। যে অতীতগৌরব মজলুমের বেদনা শুনে না, সে কাব্যিক সাজ। ফররুখের কাছে হারানো সভ্যতার ভাষা সামাজিক দায় ছাড়া সম্পূর্ণ নয়। মুসলিম পুনর্জাগরণ যদি শুধু প্রাসাদ, মিনার, তাজ ও রত্নে আটকে যায়, তবে তা নিজের মানুষকে ভুলে যায়। পাঞ্জেরীকে তাই বন্দরে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে হবে।
এই জায়গায় ফররুখের হারানো গৌরববোধ একেবারে আলাদা। তিনি আন্দালুসকে মুসলিম অহংকারের সস্তা পতাকা বানান না। তিনি তাকে নৈতিক আয়না বানান। সেই আয়নায় প্রশ্ন দেখা যায়—তোমাদের সভ্যতা ছিল, কিন্তু তোমাদের মানুষ আজ ক্ষুধিত কেন? তোমাদের জাহাজ ছিল, কিন্তু তোমাদের পাঞ্জেরী ঘুমায় কেন? তোমাদের তাজ ছিল, কিন্তু কব্জায় মরচে ধরল কীভাবে?
ফররুখের স্পেন তাই “সোনালি অতীত” নয়। স্পেন হলো পতনের শিক্ষা। যে শিক্ষা বলে, সভ্যতা হারায় প্রথমে ভিতরে। বাইরে পতাকা নামে পরে। আগে জড়তা আসে, আয়েশ আসে, ভুলে যাওয়া আসে, দায়হীনতা আসে, অচল জাহাজ আসে। তারপর একদিন দেখা যায় তাজ ম্লান। দরিয়া সামনে, কিন্তু সাহস নেই। জোয়ার এসেছে, কিন্তু হালে পানি নেই।
বাংলা সাহিত্যের ভিতরে এই আন্দালুসীয় পরিসর অস্বস্তিকর হওয়ার কারণও এখানেই। বাংলা সাহিত্যিক রুচি দীর্ঘদিন বাঙালি মুসলমানকে ছোট ভৌগোলিক ঘরে পড়তে অভ্যস্ত। পল্লি, অভাব, লোকজ জীবন, ধর্মীয় আবহ—এসব পর্যন্ত তাকে রাখা যায়। কিন্তু সে যদি আন্দালুসের সঙ্গে আত্মীয়তা দাবি করে, যদি তার বাংলা ভাষার ভিতরে স্পেনের পতনের প্রতিধ্বনি আসে, যদি তার কল্পনায় হেরা ও গ্রানাডা একই নৈতিক মানচিত্রে দাঁড়ায়, তখন প্রচলিত সাহিত্যিক বাঙালিত্বের ঘর নড়ে ওঠে।
কারণ তখন বাঙালি মুসলমান শুধু বাংলা ভাষার প্রান্তিক চরিত্র নয়। সে একটি বিশ্বসভ্যতার উত্তরাধিকারী। তার ক্ষুধা স্থানীয়, কিন্তু তার অপমান বিশ্বঐতিহাসিক। তার ভাষা বাংলা, কিন্তু তার ব্যথা কর্ডোভার অন্ধকার পর্যন্ত যায়। তার মাটির গন্ধ পূর্ববাংলার, কিন্তু তার কল্পনায় সাত সাগরের ঢেউ লাগে। এই বিস্তারকে গ্রহণ করা সহজ নয়। তাই ফররুখকে ছোট করা সুবিধাজনক। তাঁকে শুধু “ইসলামী” বললেই এই দিগন্ত এড়ানো যায়।
ফররুখের কাব্যভাষার আরবি-ফারসি ধ্বনি, সিন্দবাদী রূপক, ঐতিহ্যচর্চা ও allusion (ইঙ্গিত)-এর ব্যবহার নিয়ে ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য গ্রন্থে যে আলোচনা আছে, তা এই বিস্তার বোঝার জন্য দরকারি। সেখানে তাঁর ভাষার ভিন্নতা কোনো বিচ্ছিন্ন অলংকার নয়; মুসলিম ঐতিহ্যের কাব্যিক পুনঃপ্রবেশ। ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি গ্রন্থে সিন্দবাদী নাবিক ও সাত সাগরের মাঝি প্রসঙ্গও দেখায়, তাঁর কাব্যিক মানস স্থির পল্লিজীবনে আটকে ছিল না; তা বৃহত্তর সভ্যতাগত যাত্রার দিকে খোলা। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ২৬১–২৬২, ৩০২; ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ১৪৭–১৪৮, ৩৯৮)
এই জায়গায় আন্দালুসকে বাংলা ভাষায় আনা মানে স্পেনের ইতিহাস অনুবাদ করা নয়। এর মানে—বাংলা ভাষায় মুসলিম পতনবোধের এক মহাদেশ খোলা। যে ভাষায় আগে বাঙালি মুসলমানকে শুধু স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিতরে পড়া হতো, সে ভাষায় এখন হারানো সভ্যতার উচ্চতা, ভাঙন, দায় ও পুনর্গঠনের প্রশ্ন ঢুকে পড়ে। এতে বাংলা ভাষা ভারী হয় না। গভীর হয়।
ফররুখের আন্দালুস তাই ভূগোলের চেয়ে বেশি ইতিহাসবোধ। স্পেন তাঁর কাছে হারানো রাজ্যের নাম নয়; পতনের ব্যাকরণ। কীভাবে সভ্যতা নিজের আলো হারায়, কীভাবে সৌন্দর্য স্মারকে পরিণত হয়, কীভাবে বিজয়ের ভাষা মর্সিয়ায় বদলে যায়, কীভাবে মানুষ নিজের জাহাজের পাশে ঘুমিয়ে থাকে—এই সব প্রশ্নের কাব্যিক নাম আন্দালুস।
কিন্তু তাঁর কবিতা সেখানে শেষ হয় না। যদি শেষ হতো, তবে তিনি বিলাপের কবি হয়ে থাকতেন। তিনি বিলাপ ভাঙেন। তাঁর হারানো গৌরবের ভাষা শেষ পর্যন্ত মঞ্জিলের ভাষা। পথের ভাষা। পাল খোলার ভাষা। তিনি জানেন, হারানো স্পেন ফিরবে না সেই পুরোনো রূপে। কিন্তু হারানো মর্যাদা নতুন মানুষে ফিরে আসতে পারে। হারানো নৈতিক শক্তি নতুন যাত্রায় ফিরে আসতে পারে। হারানো কল্পনাশক্তি বাংলা কবিতার ভিতর নতুন দরজা খুলতে পারে।
এই হারানোর বিপরীতে ফররুখ শেষ আশ্রয় খোঁজেন হেরায়। “সাত সাগরের মাঝি”তে রাত্রি ও ক্ষুধার ভিতরেও দূরে দেখা যায় হেরার রাজ-তোরণ।
“এখানে এখন রাত্রি এসেছে নেমে,
তবু দেখা যায় দূরে বহুদূরে হেরার রাজ-তোরণ,
এখানে এখন প্রবল ক্ষুধায় মানুষ উঠছে কেঁপে,
এখানে এখন অজস্র ধারা উঠছে দু’চোখ চেপে
তবু দেখা যায় দূরে বহুদূরে হেরার রাজ-তোরণ...”
এই দৃশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্দালুস হারাতে পারে। স্পেন চলে যেতে পারে। তাজ ম্লান হতে পারে। জাহাজ ভাঙতে পারে। কিন্তু হেরা উৎস হিসেবে থাকে। হেরা মানে প্রথম আলো, ওহির শুরু, নৈতিক বিপ্লবের জন্ম, মানুষকে নতুন করে গড়ার উৎস। ফররুখ হারানো আন্দালুসকে হেরার সঙ্গে যুক্ত করেন। কারণ পুনর্জাগরণ শুধু পুরোনো প্রাসাদ ফেরত আনা নয়। পুনর্জাগরণ মানে উৎসে ফিরে গিয়ে নতুন মানুষ তৈরি করা।
এইখানে তাঁর Islamic imagination (ইসলামী কল্পনাশক্তি) গভীর। তিনি মুসলিম সভ্যতার পতন নিয়ে লিখলেও কেবল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের কবি নন। তাঁর চোখে নৈতিক পুনর্গঠন ছাড়া সভ্যতার পুনরুত্থান অসম্ভব। আন্দালুস ছিল আলো, কিন্তু হেরা উৎস। স্পেন ছিল মহিমা, কিন্তু ওহি দিশা। তাই তাঁর কবিতার মঞ্জিল শুধু রাজমুকুট নয়; হেরার তোরণ।
এই তোরণের দিকে যাওয়ার পথ সহজ নয়।
“সে পথে যদিও পার হতে হবে মরু
সে পথে যদিও দরিয়ার নোনা পানি
তবুও সে পথে আছে মঞ্জিল, জানি আছে ছায়াতরু
পথে আছে মিঠে পানি।
তবে পাল খোলো, তবে নোঙ্গর তোলো;
এবার অনেক পথ শেষে সন্ধানী!
হেরার তোরণ মিলবে সম্মুখে জানি।”
মরু আছে, নোনা পানি আছে। মঞ্জিলও আছে। ছায়াতরু আছে। মিঠে পানিও আছে। ফররুখের হারানো গৌরবের ভাষা এখানেই পূর্ণতা পায়। তিনি অতীতের ক্ষতকে ভবিষ্যতের পথ বানান। আন্দালুসের পতন তাঁকে হতাশায় শেষ করে না। বরং বলে—নোঙ্গর তোলো। পাল খোলো। পথ কঠিন, কিন্তু পথ আছে।
এই কারণেই আন্দালুস তাঁর কাছে মৃত অতীত নয়। এটি বর্তমানের বিরুদ্ধে নীরব অভিযোগ এবং ভবিষ্যতের দিকে কঠিন আহ্বান। যে জাতি শুধু হারানো প্রাসাদ দেখে, সে দর্শক। যে জাতি প্রাসাদের ধ্বংস দেখে নিজের ঘুম ভাঙায়, সে পথিক। ফররুখ বাঙালি মুসলমানকে দর্শক বানাতে চাননি। পথিক বানাতে চেয়েছেন।
এই পথিকের হাতে বাংলা ভাষা আছে। কিন্তু সেই ভাষায় শুধু নদীর বাঁক নয়; আছে নোনা পানির দূর স্বাদ, কর্ডোভার সন্ধ্যা, গ্রানাডার পতন, হেরার তোরণ, ক্ষুধিত মানুষের নীরব চোখ, আর নতুন সফরের অস্থির ডাক। এই সব মিলেই ফররুখের হারানো গৌরবের ভাষা তৈরি হয়।
এই ভাষা বাংলা সাহিত্যের প্রান্তে রাখার জিনিস নয়। কারণ এতে বাংলা ছোট হয় না; বরং বাংলা নিজের হারানো মুসলিম আকাশ ফিরে পায়।
ফররুখ, রবীন্দ্রীয় বাঙালিত্ব ও বাংলা ভাষার মালিকানা
ভাষার মালিকানা কোনো দপ্তরের কাগজে লেখা থাকে না। ভাষার মালিকানা তৈরি হয় রুচির ভিতরে। কার শব্দ “স্বাভাবিক”, কার শব্দ “ভারী”, কার প্রতীক “সাহিত্য”, কার প্রতীক “ধর্মীয়”, কার ইতিহাস “মানবিক”, কার ইতিহাস “সাম্প্রদায়িক”—এসব সিদ্ধান্তের ভিতরেই ভাষার আসল ক্ষমতা লুকানো থাকে। বাংলা ভাষা সবাই ব্যবহার করে, কিন্তু বাংলা ভাষার সাহিত্যিক ঘরে সবাই সমান সহজে ঢুকতে পারে না।
ফররুখ আহমদের সঙ্গে রবীন্দ্রীয় বাঙালিত্বের সংঘাত এই জায়গায়। এটি রবীন্দ্রনাথ বনাম ফররুখের সস্তা লড়াই নয়। রবীন্দ্রনাথকে ছোট করলে ফররুখ বড় হন না। বরং তখন আলোচনাই নষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার এক বিরাট শিখর। তাঁর ভাষা, সুর, ভাব, মানবদৃষ্টি, প্রকৃতি-অনুভব, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা—এসব বাংলা সাহিত্যকে এমন উচ্চতা দিয়েছে, যাকে এড়িয়ে বাংলা সাহিত্য বোঝা যায় না। Britannica রবীন্দ্রনাথকে বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতি-চিন্তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করে। সমস্যা রবীন্দ্রনাথ নন। সমস্যা হলো, রবীন্দ্রনাথের বিশাল উপস্থিতিকে যখন বাংলা ভাষার একমাত্র স্বাভাবিক আকাশ বানানো হয়, তখন অন্য আকাশগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
রবীন্দ্রীয় বাঙালিত্ব বলতে এখানে কোনো একক কবির ব্যক্তিগত সৃষ্টিকে বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে সেই সাংস্কৃতিক মানদণ্ড, যেখানে বাংলা ভাষার পরিশীলিত রূপ কল্পনা করা হয়েছে এক ধরনের কলকাতাকেন্দ্রিক, হিন্দু অভিজাত, সংস্কৃতঘেঁষা, ভদ্ররুচির ভিতরে। এই রুচির নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। কিন্তু বিপদও আছে। কারণ যে রুচি নিজেকে “বাংলা” বলে প্রতিষ্ঠা করে, সে অন্য রুচিকে “অন্য” করে দেয়। তখন মুসলমানি শব্দ, আরবি-ফারসি ধ্বনি, ইসলামী প্রতীক, মসজিদ-মিনার-হেরা-সিন্দাবাদ-পাঞ্জেরীর দিগন্ত বাংলা ভাষার ভিতরে থেকেও যেন ব্যাখ্যা চায়। এই ব্যাখ্যা চাওয়াটাই ক্ষমতার লক্ষণ।
একজন কবি যদি পুরাণ, উপনিষদ, বৈষ্ণব রস, শাক্ত প্রতীক, দেবদেবীর ছায়া, গীতা বা ব্রাহ্মধর্মীয় ভাব নিয়ে বাংলা কবিতা লেখেন, সেটি সহজেই “সাহিত্যিক ঐতিহ্য” নামে গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু একজন মুসলমান কবি যদি কোরআনি ইশারা, নবী-ইতিহাস, হেরা, মর্সিয়া, মিল্লাত, দরিয়া, কিশতী, সিন্দাবাদ, পাঞ্জেরী, জিন্দিগী, মওত, মঞ্জিল, হেলাল—এসব নিয়ে বাংলা কবিতা লেখেন, তখন অনেক পাঠকের কানে তা “ধর্মীয়” হয়ে ওঠে। যেন একটি ঐতিহ্য নন্দন, অন্যটি পরিচয়-রাজনীতি। একটি সংস্কৃতি, অন্যটি সাম্প্রদায়িকতা। এই বিচার শাসন করতে চায়।
ফররুখ এই বিচারকে ভেঙেছেন। তিনি বাংলা ভাষার দরজায় দাঁড়িয়ে অনুমতি চাননি। তিনি বাংলা ভাষার ভিতরে নিজের উত্তরাধিকার বসিয়েছেন। তিনি জানতেন, বাংলা তাঁর ভাষা। এই ভাষায় তিনি মুসলমানের ইতিহাস, পরাজয়, তৃষ্ণা, ক্রোধ, জাগরণ, ঈমানি কল্পনা, হারানো সভ্যতার আকুতি—সবই বলবেন। কারণ বাংলা ভাষা যদি সত্যিই বাংলা হয়, তবে সে শুধু এক সম্প্রদায়ের পুরাণ, এক শ্রেণির রুচি, এক শহরের উচ্চারণ, এক সাংস্কৃতিক স্মারকের ভাষা হতে পারে না। সে বাংলার মুসলমানেরও ভাষা, তার পরাজয়েরও ভাষা, তার আত্মমর্যাদারও ভাষা।
ফররুখের কাব্যভাষা এই মালিকানার ঘোষণা। তাঁর ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দ আছে, কিন্তু সেগুলো সাজসজ্জা নয়। এগুলো ভাষার ভিতরে মুসলমানি জীবনবোধের পেশি। তিনি “সফর” বললে যাত্রা শুধু চলাচল থাকে না; তা নিয়তিপরীক্ষা হয়। তিনি “মঞ্জিল” বললে গন্তব্য শুধু স্থান নয়; তা নৈতিক লক্ষ্য হয়। তিনি “মর্সিয়া” বললে শোক শুধু কান্না নয়; সভ্যতার মৃত্যুস্বর হয়। তিনি “হেলাল” বললে চাঁদ শুধু আকাশের বস্তু নয়; মুসলিম সময়বোধের চিহ্ন হয়ে ওঠে। এই শব্দগুলো বদলে দিলে শুধু শব্দ বদলায় না; কাব্যের ভেতরের পৃথিবী বদলে যায়।
এই জায়গায় ফররুখকে “কঠিন”, “ভারী”, “অতিরিক্ত আরবি-ফারসি”, “ধর্মীয়” বলে সরিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোন ভাষা কঠিন? কার জন্য কঠিন? যে পাঠক সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ, পুরাণের চরিত্র, ব্রাহ্মধর্মীয় ভাব, বৈষ্ণব রস, উপনিষদীয় ইঙ্গিত বুঝতে প্রস্তুত, সে কেন মুসলমানি শব্দভাণ্ডারের সামনে এসে হঠাৎ অস্বস্তিতে পড়ে? সমস্যাটা কি ভাষার, না পাঠকের অভ্যাসের?
বাংলা ভাষার সাহিত্যিক পাঠককে দীর্ঘদিন এক ধরনের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করা হয়েছে। সেই পরিচিতির ফলে কিছু শব্দ স্বাভাবিক, কিছু প্রতীক মহৎ, কিছু রূপক গভীর, কিছু ধর্মীয় ইঙ্গিত সার্বজনীন বলে মনে হয়েছে। অন্যদিকে মুসলমানি শব্দ ও প্রতীককে অনেক সময় লোকসাহিত্য, পুঁথি, মক্তব, গ্রাম্যতা বা সাম্প্রদায়িকতার ঘরে রেখে পড়া হয়েছে। অথচ বাংলার পুঁথি সাহিত্য নিজেই বাংলা, আরবি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দি শব্দভাণ্ডারের মিশ্রণে গড়ে ওঠা এক মুসলমানি সাহিত্যধারা হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ মুসলমানি শব্দ বাংলা ভাষার বাইরে থেকে হঠাৎ এসে পড়েনি; বাংলা ভাষার দীর্ঘ সামাজিক ও সাহিত্যিক চলাচলের ভিতরেই ছিল। ফলে ফররুখ যখন সেই শব্দগুলোকে উচ্চ কবিতার কেন্দ্রে বসালেন, তখন তা শুধু নন্দনগত ঘটনা ছিল না; ছিল সাহিত্যিক ক্ষমতার ওপর আঘাত। তিনি যেন বললেন—বাংলা ভাষার উচ্চ আসনে মুসলমানের শব্দও বসবে।
এই বাক্য উচ্চারণ না করেও তাঁর কবিতা এ কাজ করেছে। এইখানে ফররুখের গুরুত্ব শুধু কবি হিসেবে নয়, ভাষা-রাজনীতির এক কঠিন উপস্থিতি হিসেবে। তিনি বাংলা ভাষাকে ভাঙেননি। তিনি বাংলা ভাষার মালিকানা বিস্তৃত করেছেন। যে ভাষাকে এক ধরনের রুচি নিজের ঘর বানিয়ে নিয়েছিল, তিনি সেখানে অন্য দরজা খুলেছেন।
রবীন্দ্রীয় বাঙালিত্বের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য তাই শত্রুতার নয়; কেন্দ্রীয়তার। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম, বিশ্বমানবতা, আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তির মুক্তি—এসব অসামান্য শক্তি পায়। কিন্তু রবীন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের ভেতর বাঙালিত্বের যে আদর্শ চেহারা দাঁড়িয়েছে, সেখানে মুসলমানের ঐতিহাসিক ক্ষত, মিল্লাত-চেতনা, পরাজিত সভ্যতার স্মরণ, হেরা-আন্দালুস-বাগদাদ-দরিয়ার দিগন্ত সবসময় স্বাভাবিক জায়গা পায় না। মুসলমান সেখানে থাকতে পারে, কিন্তু অনেক সময় নিজের ধার কমিয়ে। নিজের শব্দ মুছে। নিজের ইতিহাস নরম করে। নিজের ঈমানি উচ্চারণকে সৌজন্যপূর্ণ করে। ফররুখ এই সৌজন্যপূর্ণ আত্মসংকোচ মানেননি।
তাঁর কবিতা যেন ভদ্রসভায় ঢুকে দাঁড়ানো এক নাবিক। তার পোশাকে সমুদ্রের লবণ, তার মুখে দরিয়ার শব্দ, তার চোখে হারানো শহরের আগুন। তাকে বসার জায়গা দিতে হলে সভার নিয়ম বদলাতে হয়। এই নিয়ম বদলাতেই অস্বস্তি। কারণ সাহিত্যিক কেন্দ্র সবসময় নিজেকে কেন্দ্র বলে চিনতে চায় না। সে নিজেকে “স্বাভাবিক” বলে চালায়। ফররুখ সেই স্বাভাবিকতার ওপর প্রশ্নচিহ্ন বসান।
বাংলা ভাষার মালিকানা নিয়ে এটাই আসল লড়াই। ভাষা কার? শুধু সেই মানুষের, যে ভাষাকে সংস্কৃত-পরিশীলিত রূপে লেখে? শুধু সেই রুচির, যা কলকাতার সাহিত্যিক অভিজাত বৃত্তে গ্রহণযোগ্য? শুধু সেই ঐতিহ্যের, যেখানে হিন্দু পুরাণ ও ব্রাহ্ম ভাব সহজে মানবিকতা পায়? না কি সেই মুসলমানেরও, যার ঘরে আরবি-ফারসি শব্দ বহুদিন ধরে আছে, যার মায়ের মুখে “দুনিয়া”, “আখেরাত”, “দোয়া”, “নসিব”, “হায়াত”, “মায়া”, “গুনাহ”, “মাফ”, “মেহমান”, “খবর”, “হিসাব”—এসব শব্দ বাংলা হয়ে গেছে?
এই সাধারণ কথাটাই সাহিত্যিক পরিসরে সহজ ছিল না। বাংলা ভাষার জনজীবনে মুসলমানি শব্দ বহু পুরোনো। ফারসি দীর্ঘকাল বাংলার শাসন, দরবার, দাপ্তরিক সংস্কৃতি ও উচ্চ ভাষিক চলাচলের সঙ্গে যুক্ত ছিল; বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি-তুর্কি উৎসের বহু শব্দ প্রবেশ করেছে। কিন্তু সাহিত্যিক মর্যাদার ঘরে তাদের গ্রহণ সবসময় সমান ছিল না। লোকভাষায় চলা শব্দ উচ্চকবিতায় উঠলে অনেকের কানে লাগে। কারণ উচ্চকবিতা কেবল ভাষার ব্যাপার নয়; শ্রেণি, ধর্ম, শহর, শিক্ষা, রুচি, ক্ষমতা—সব মিলে তা তৈরি হয়।
তাঁর ভাষা পুঁথির সরল পুনরাবৃত্তি নয়। আবার রবীন্দ্রীয় সুরে গলে যাওয়া মুসলমানি আবছায়াও নয়। তাঁর ভাষায় তীক্ষ্ণতা আছে। ধাতব ঝংকার আছে। সমুদ্রের শব্দ আছে। আরবি-ফারসি শব্দের ওজন আছে। কখনো তা মসৃণ নয়। কিন্তু সব সত্যই মসৃণ ভাষায় আসে না। পরাজিত সভ্যতার বুকের ভিতর থেকে যে ভাষা ওঠে, তার গায়ে দাগ থাকবে। ফররুখের ভাষায় সেই দাগ আছে।
এই দাগকে অনেকেই সৌন্দর্যের বিরুদ্ধে ভাবতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সৌন্দর্য বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু মসৃণতা? শুধু সুরেলা কোমলতা? শুধু ধ্যানমগ্নতা? শুধু প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংলাপ? তাহলে ইতিহাসের ভাঙা জাহাজ, ক্ষুধিত মানুষের মুখ, হেরার তোরণ, মর্সিয়ার শোক, ম্লান তাজ, মরচে ধরা কব্জা—এসব কোথায় যাবে? এদেরও তো ভাষা চাই। ফররুখ সেই ভাষা তৈরি করেছেন।
রবীন্দ্রীয় বাঙালিত্বের শক্তি তার ব্যাপক মানবিক সুরে। কিন্তু সেই সুর যখন একমাত্র বৈধ বাঙালিত্ব হয়ে ওঠে, তখন সমস্যা শুরু হয়। কারণ মানুষের ইতিহাস একরকম নয়। বাংলার হিন্দু অভিজাতের ইতিহাস, ব্রাহ্মধর্মীয় নবজাগরণের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ইতিহাস, পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকসমাজের ইতিহাস, মক্তব-মাদরাসা-ফারসি-আরবি-উর্দু সংযোগে গড়ে ওঠা মুসলমানি ভাষাজগত—সব একই ছাঁচে ঢালা যায় না। ঢালতে গেলে কেউ না কেউ বিকৃত হবে। বাংলা সাহিত্য দীর্ঘকাল মুসলমানকে হয় লোকজ করে, নয় ধর্মীয় করে, নয় পশ্চাৎপদ করে, নয় ব্যতিক্রমী করে পড়তে অভ্যস্ত হয়েছে। ফররুখ এই অভ্যাসে বাধা।
তিনি বাঙালি মুসলমানকে সাহিত্যিকভাবে ছোট হতে দেন না। তাঁর মুসলমান চরিত্র শুধু গ্রামীণ দরিদ্রতা নয়। শুধু পল্লির কষ্ট নয়। শুধু আঞ্চলিক উচ্চারণ নয়। সে ইতিহাস বহন করে। সে হারানো সভ্যতার সন্তান। সে আধ্যাত্মিক প্রশ্ন বহন করে। সে ক্ষুধিত মানুষের দায় বহন করে। সে নিজের ভাষায় সমুদ্র ডাকে। এই জায়গায় ফররুখের কাব্যভাষা বাঙালি মুসলমানকে শুধু ভাষাভিত্তিক বাঙালিত্বে আটকে রাখে না; তাকে মিল্লাত, ইতিহাস, নৈতিকতা ও সাহিত্যিক মর্যাদার সমন্বয়ে দাঁড় করায়।
এখানে আপত্তি উঠতে পারে—তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ বাঙালি মুসলমানকে বাদ দিয়েছিলেন? প্রশ্নটি এত সরল নয়। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক মহিমা নিজের জায়গায় আছে। কিন্তু রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যে রবীন্দ্রীয় বাঙালিত্ব তৈরি হয়েছে, তা অনেক সময় রবীন্দ্রনাথের চেয়েও সংকীর্ণ। কবির সৃষ্টির চেয়ে তাঁর নামে নির্মিত সংস্কৃতি বেশি কর্তৃত্বশালী হয়ে ওঠে। সেখানে গান, ভাষা, উৎসব, অনুভূতি, মানবিকতার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো “বাংলা” নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কাঠামোর বাইরে মুসলমানি কাব্যভাষা প্রবেশ করলে তাকে গ্রহণ করতে কষ্ট হয়।
ফররুখ এই কষ্টের নাম প্রকাশ করেন। তিনি ঘোষণা দিয়ে নয়, কাব্য দিয়ে বলেন—বাংলা ভাষা এক দরজার ঘর নয়। এখানে হিন্দু পুরাণ থাকবে, থাকবে বৈষ্ণব রস, থাকবে শাক্ত প্রতীক, থাকবে ব্রাহ্ম ভাব; কিন্তু থাকবে হেরা, থাকবে মদিনা, থাকবে আন্দালুস, থাকবে দরিয়া, থাকবে মর্সিয়া, থাকবে পাঞ্জেরী, থাকবে ক্ষুধিত মানুষের কৈফিয়তও। যে বাংলা এগুলো বহন করতে পারে না, সে বাংলা অসম্পূর্ণ।
ফররুখের ভাষা তাই কেবল ধর্মীয় identity marker (পরিচয়-চিহ্ন) নয়। এটি aesthetic claim (নান্দনিক দাবি)। তিনি দাবি করেন—মুসলমানি শব্দও সুন্দর হতে পারে। ইসলামী প্রতীকও জটিল হতে পারে। আরবি-ফারসি ধ্বনিও বাংলা ছন্দে শক্তি দিতে পারে। মুসলিম ইতিহাসও উচ্চ কবিতার উপাদান হতে পারে। মিল্লাতের ক্ষতও ব্যক্তিমানুষের হৃদয়ের মতোই কবিতার বিষয় হতে পারে।
এই দাবি বাংলা সাহিত্যিক রুচির জন্য কঠিন। কারণ এতে সাহিত্যিক কেন্দ্রকে নিজের সীমা স্বীকার করতে হয়। বলতে হয়, এতদিন আমরা যে বাংলাকে স্বাভাবিক বলেছি, তা সম্পূর্ণ বাংলা নয়। তা এক বড় অংশের বাংলা, কিন্তু একমাত্র বাংলা নয়। ফররুখ এই অসম্পূর্ণতা দেখিয়ে দেন।
এইখানে তাঁর ভাষা “প্রতিবাদী” হলেও শুধু প্রতিবাদ নয়। তিনি কেবল নাকচ করেন না। তিনি নির্মাণ করেন। তাঁর কবিতায় মুসলমানি বাংলা কোনো সঙ্কুচিত গোষ্ঠীভাষা নয়; তা মহাকাব্যিক পরিসর নিতে পারে। “সিন্দাবাদ” ও “সাত সাগরের মাঝি” নিয়ে আগের আলোচনায় দেখা গেছে, তাঁর শব্দভাণ্ডার শুধু বিদেশি রঙ নয়, বৃহত্তর মুসলিম ইতিহাসের কাব্যিক মানচিত্র। ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য গ্রন্থে তাঁর কাব্যভাষা, ইসলামী চেতনা ও ঐতিহ্যচর্চা আলাদা আলোচনার বিষয় হয়েছে; “ফররুখ কাব্যগীতি” আলোচনায় তাঁর “সিন্দাবাদ” কবিতার আরবি-ফারসি শব্দমেজাজ ও allusion (ইঙ্গিত)-এর দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি গ্রন্থে তাঁর সিন্দবাদী নাবিক-স্বভাব ও সাত সাগরের মাঝি প্রসঙ্গও এই বৃহত্তর কাব্যমানস বোঝার পথ খুলে দেয়। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ২৬১–২৬২, ৩০২; ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ১৪৭–১৪৮, ৩৯৮)
কিন্তু শুধু কাব্যভাষার বিশেষত্ব বললে কথাটা শেষ হয় না। প্রশ্ন হলো, এই ভাষার বিরুদ্ধে অস্বস্তি কেন তৈরি হলো? কারণ ফররুখ বাংলা ভাষায় মুসলমানের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেন। আত্মমর্যাদাহীন মুসলমানকে সাহিত্য সহ্য করতে পারে। দরিদ্র মুসলমান, লোকজ মুসলমান, হাস্যরসের মুসলমান, ব্যাকগ্রাউন্ডের মুসলমান, সামান্য ধর্মাচারী মুসলমান—এসবকে সাহিত্য গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু আত্মমর্যাদাবান মুসলমান, যে বাংলা ভাষায় দাঁড়িয়ে নিজের সভ্যতাকে ডাকে, নিজের ইতিহাস দাবি করে, নিজের শব্দকে কেন্দ্রস্থলে বসায়—সে অস্বস্তিকর। ফররুখ সেই অস্বস্তিকর মুসলমানের কবি।
তিনি বাংলা ভাষায় মুসলমানের জন্য আলাদা ঘর বানাননি। বরং বাংলা ঘরের মালিকানায় মুসলমানের অংশ দাবি করেছেন। এই পার্থক্য বড়। আলাদা ঘর বানালে মূল ঘর অক্ষত থাকে। কিন্তু মালিকানার দাবি উঠলে মূল ঘরের দেওয়াল বদলাতে হয়। ফররুখ সেই বদল দাবি করেন। তাঁর কবিতা বলে, বাংলা ভাষার ভেতরে মুসলমানি উচ্চারণ কোনো অতিথি নয়। এটি ঘরেরই একটি পুরোনো অথচ দমিয়ে রাখা কক্ষ।
এই কক্ষ খুললে বাংলা ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং নিজের ইতিহাসের সঙ্গে সৎ হয়। কারণ বাংলা ভাষার মাটিতে মুসলমানের রক্ত, শ্রম, দোয়া, গান, বাজার, ফসল, দরবার, যুদ্ধ, প্রেম, মক্তব, আযান, পীর-মুরিদ, নৌবাণিজ্য, শহর, গ্রাম—সব আছে। সেই ভাষা যদি সাহিত্যে এসে মুসলমানের ইতিহাস বহন করতে না পারে, তবে দোষ ভাষার নয়; রুচির।
রবীন্দ্রীয় বাঙালিত্বের সঙ্গে ফররুখের দূরত্ব তাই বাংলা ভাষার দুই সম্ভাবনার দূরত্ব। একদিকে মসৃণ, পরিশীলিত, মানবিক, সুরেলা, সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বাঙালিত্ব। অন্যদিকে ক্ষতবিক্ষত, দগ্ধ, সমুদ্রগামী, মিল্লাত-সচেতন, আরবি-ফারসি ধ্বনিসম্পন্ন, নৈতিক তাগিদে অস্থির মুসলমানি বাঙালিত্ব। প্রথমটি বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছে। দ্বিতীয়টিকে বারবার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফররুখ সেই প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের দিকে হাঁটেন।
এই হাঁটা সহজ ছিল না। কারণ তাঁর ভাষা অনেক সময় প্রচলিত পাঠকের আরাম ভাঙে। তাঁর শব্দে ধাতবতা আছে, ঘনত্ব আছে, কখনো অতিরিক্ত ভারও আছে। কিন্তু এই ভারও ইতিহাসের ভার। একটি পতিত সভ্যতার ভাষা সবসময় হালকা হবে কেন? একটি আত্মমর্যাদা-হারা জাতির কবি সবসময় কোমল হবে কেন? যে কবি ঘুম ভাঙাতে চায়, তার ভাষায় আঘাত থাকবে। ফররুখের ভাষা সেই আঘাত বহন করে।
তাই তাঁকে “রবীন্দ্রনাথের বিপরীত” বললে ছোট করা হয়। তিনি বিপরীত নন। তিনি অনুপস্থিত অংশ। বাংলা ভাষার যে অংশ রবীন্দ্রীয় রুচির ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, ফররুখ সেখানে আলো ফেলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে মুছে দেন না; বাংলা ভাষার একক রবীন্দ্রীয় মালিকানাকে প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, বাংলা ভাষার ইতিহাস আরও বড়। এতে বৈষ্ণব আছে, শাক্ত আছে, ব্রাহ্ম আছে, লোকধর্ম আছে, নদী আছে, পল্লি আছে—আর আছে মুসলমানের মিল্লাত, হেরা, আন্দালুস, দরিয়া, ক্ষুধা, জবাবদিহি, পুনর্জাগরণ।
এই দাবি মানলে বাংলা সাহিত্য আরও বড় হয়। না মানলে বাংলা সাহিত্য নিজের একটি অঙ্গ কেটে ফেলে।
ফররুখের কাব্যভাষা তাই শুধু সাহিত্যিক পরীক্ষা নয়; বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের এক সাংস্কৃতিক দলিল। সে বলে, মুসলমান বাংলা ভাষায় নিজেকে অনুবাদ করবে না। নিজের শব্দ মুছে গ্রহণযোগ্য হবে না। অন্যের রুচিতে নিজেকে ছোট করে ভদ্রতা দেখাবে না। সে বাংলা ভাষায় নিজের ইতিহাসের পূর্ণতা দাবি করবে।
ফররুখ তাই সাময়িক দরকারের কবি নন। তিনি কেবল অস্বস্তির কাঁটা নন; তিনি নির্মাণের দলিল। বাংলা ভাষা যখনই নিজের পূর্ণ ইতিহাসের দিকে তাকাবে, তাকে ফররুখের সামনে দাঁড়াতেই হবে। কারণ তিনি প্রমাণ করে গেছেন—মুসলমান বাংলা ভাষার অতিথি নয়। সে এই ভাষার মালিকদের একজন।
কেন ফররুখকে আড়াল করা হয়?
ফররুখ আহমদকে আড়াল করার কাজটি সরল নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে হয়নি। তাঁকে বাতিল করা হয়নি, আবার পূর্ণভাবে গ্রহণও করা হয়নি। তাঁকে রাখা হয়েছে, কিন্তু একধরনের সীমানার ভিতরে। তাঁর নাম আছে, তাঁর কবিতা আছে, তাঁর কয়েকটি পংক্তি আছে; কিন্তু তাঁর ভাষার রাজনীতি, তাঁর মুসলিম সভ্যতাগত কল্পনা, তাঁর নৈতিক ক্রোধ, তাঁর বাংলা ভাষার ওপর দাবির শক্তি—এসবকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় আনা হয়নি। এই পদ্ধতিই বেশি কার্যকর। সরাসরি মুছে দিলে প্রতিবাদ ওঠে। আংশিক স্বীকৃতি দিয়ে ছোট করলে ক্ষতি গভীর হয়।
ফররুখকে ঘিরে সবচেয়ে পরিচিত tagging (তকমা-লাগানো) হলো—“ইসলামী কবি”। কথাটি মিথ্যা নয়। তাঁর কবিতায় ইসলাম আছে, গভীরভাবেই আছে। Banglapedia তাঁর কবিতাকে Pakistani and Islamic ideals (পাকিস্তানি ও ইসলামী আদর্শ)-প্রাণিত বলে, Muslim culture (মুসলিম সংস্কৃতি)-এর গৌরব ও Muslim awakening (মুসলিম জাগরণ)-এর আহ্বানের সঙ্গে যুক্ত করে; একই entry-তে তাঁর কবিতায় Arab-Persian legacy (আরব-ফারসি উত্তরাধিকার) এবং Arabic-Persian words (আরবি-ফারসি শব্দ)-এর প্রাচুর্যের কথাও বলা হয়েছে। (Banglapedia) কিন্তু একটি পরিচয় সত্য হলেই তা কবির পূর্ণ পরিচয় হয়ে যায় না। “ইসলামী কবি” যদি তাঁর দরজা খোলে, ঠিক আছে। কিন্তু যদি দরজা বন্ধ করে, তাহলে সেটি আর পরিচয় নয়; সেটি খাঁচা।
ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য গ্রন্থে ফররুখের কাব্যভাষা, ইসলামী চেতনা, ঐতিহ্যচর্চা ও “ফররুখ কাব্যগীতি” আলাদা আলোচনার বিষয় হয়েছে; “সিন্দাবাদ” কবিতার আরবি-ফারসি শব্দমেজাজ ও allusion (ইঙ্গিত)-এর দিকও সেখানে আলোচিত। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ২৬১–২৬২, ৩০২) একইভাবে ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি গ্রন্থে তাঁর “এক সিন্দবাদী নাবিক” সত্তা, সাত সাগরের পরিসর, স্বাতন্ত্র্যচেতনা ও কাব্যিক ব্যক্তিত্বকে একাধিক স্তরে ধরার চেষ্টা আছে। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ১১–১৩, ১৪৭–১৪৮, ৩৯৮) অর্থাৎ ফররুখকে শুধু ধর্মীয় আবেগের কবি বানিয়ে রাখলে বইয়ের ভিতরেই পাওয়া বহুস্তরীয় ফররুখকে ছোট করা হয়।
দ্বিতীয় tagging (তকমা-লাগানো) হলো—“পাকিস্তানপন্থী কবি”। এটিও হাওয়ায় তৈরি হয়নি। ১৯৪৭-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানি বাংলা কবিতার একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গের কবিতাধারা থেকে আলাদা মুসলিম/পাকিস্তানি স্বর তৈরি করতে চেয়েছিল। Banglapedia-র Poetry entry-তে বলা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের কবিরা Pakistani ideals (পাকিস্তানি আদর্শ) ও Muslims-এর glory (মুসলমানদের গৌরব) উদ্যাপনকারী এক আলাদা বাংলা কবিতার ধারা নির্মাণের চেষ্টা করেন, এবং সেখানে ফররুখ আহমদের নামও আছে। (Banglapedia) Banglapedia-র Bangla Literature entry-তেও দেখা যায়, partition (দেশভাগ)-এর পর পূর্ববঙ্গের কবিরা কলকাতাকেন্দ্রিক ধারা থেকে আলাদা নিজস্ব কবিতা গড়ার চেষ্টা করছিলেন; ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস ও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদও তাদের বিষয় হয়ে ওঠে, এবং ফররুখকে এই ধারার সবচেয়ে prominent (উল্লেখযোগ্য) কবি হিসেবে ধরা হয়েছে। (Banglapedia)
কিন্তু এখানেই বিচারপদ্ধতির প্রশ্ন। একজন কবির রাজনৈতিক অবস্থান আলোচ্য হতে পারে। হওয়া উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে তাঁর সমস্ত সাহিত্যিক অস্তিত্বকে আটকে দেওয়া সমালোচনা নয়; সেটি বাছাই করা বিচার। বাংলা সাহিত্যে অনেক কবি-লেখকের রাজনৈতিক সীমা, যুগের বিভ্রম, মতাদর্শিক ঝোঁক, সামাজিক অন্ধত্ব আছে। তাঁদের আমরা শুধু একটি রাজনৈতিক শব্দে শেষ করি না। তাঁদের ভাষা, রূপ, প্রভাব, ঐতিহাসিক অবস্থান, শিল্পীসত্তা—সব মিলিয়ে পড়ি। ফররুখের ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতিগত ন্যায্যতা অনেক সময় রক্ষা করা হয়নি।
এই অন্যায় আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, ফররুখ শুধু রাষ্ট্রীয় আদর্শের কবি নন। Banglapedia তাঁর “লাশ” কবিতাকে ১৯৪৪ সালের Bengal famine (বাংলার দুর্ভিক্ষ)-এর সঙ্গে যুক্ত করে এবং বলে, এই কবিতার মাধ্যমেই তিনি খ্যাতি পান। (Banglapedia) অর্থাৎ ক্ষুধা, লাশ, সামাজিক বিপর্যয়, মানুষের হাহাকার—এসব তাঁর কাব্যের বাইরে ছিল না। যে কবি দুর্ভিক্ষ দেখেছেন, ক্ষুধিত মানুষের মুখ দেখেছেন, মজলুমের বেদনা শুনেছেন, তাঁকে শুধু “পাকিস্তানপন্থী” বলে বন্ধ করলে তাঁর কাব্যের সামাজিক স্নায়ু কেটে ফেলা হয়।
তৃতীয় tagging (তকমা-লাগানো) হলো—“কঠিন ভাষার কবি”। এই কথাটির ভিতরেও অর্ধসত্য আছে। ফররুখের ভাষা সহজ রবীন্দ্রীয় মসৃণতায় চলে না। তাঁর শব্দে আরবি-ফারসি ধ্বনি আছে, মর্সিয়া আছে, মঞ্জিল আছে, হেলাল আছে, সফর আছে, কিশতী আছে, দরিয়া আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কঠিন কার কাছে? যে পাঠক সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ, পুরাণ, উপনিষদীয় ইঙ্গিত, বৈষ্ণব রস, শাক্ত প্রতীক, ব্রাহ্ম ভাব—এসব বুঝতে অভ্যস্ত, সে আরবি-ফারসি শব্দে এসে হঠাৎ কেন থামে? সমস্যাটি কি ফররুখের ভাষার, না সাহিত্যিক পাঠকের একপক্ষীয় প্রশিক্ষণের?
বাংলা মুসলমানি শব্দভাণ্ডার বাংলা ভাষার বাইরে থেকে হঠাৎ এসে পড়েনি। Banglapedia-র Puthi Literature entry-তে পুঁথি সাহিত্যকে Bangla, Arabic, Urdu, Persian and Hindi vocabulary (বাংলা, আরবি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দি শব্দভাণ্ডার)-এর মিশ্রণে লেখা বিশেষ সাহিত্যধারা বলা হয়েছে; এর রচয়িতা ও পাঠকও মূলত মুসলমান সমাজ। (Banglapedia) আবার Banglapedia-র Persian entry বলে, সাতশ বছরের ফারসি উত্তরাধিকার বাংলা ভাষায় স্থায়ীভাবে গেঁথে গেছে; হাজার হাজার ফারসি শব্দ standard Bangla (প্রমিত বাংলা ) ও আঞ্চলিক কথ্যভাষা—দুই জায়গাতেই আছে। (Banglapedia)
তাহলে ফররুখের আরবি-ফারসি শব্দ কোনো অচেনা বোঝা নয়। এটি বাংলা ভাষার ভিতরেই থাকা এক ঐতিহাসিক স্তর। পার্থক্য শুধু এই—তিনি সেই স্তরকে পুঁথি, লোকপ্রবাহ বা মুসলমানি কথ্যভাষার ঘর থেকে তুলে modern high poetry (আধুনিক উচ্চকবিতা)-এর কেন্দ্রে বসিয়েছেন। এখানেই অস্বস্তি। কারণ ভাষার সামাজিক ব্যবহার এক জিনিস, সাহিত্যিক মর্যাদার কেন্দ্রে প্রবেশ আরেক জিনিস। ফররুখ দ্বিতীয় কাজটি করেছেন।
চতুর্থ পদ্ধতি ছিল তাঁকে “বিশেষ ধারার কবি” বানিয়ে রাখা। এই কথাটি ভদ্র শোনায়, কিন্তু এর ভিতরে প্রান্তিকীকরণের চাল আছে। “বিশেষ ধারার” মানে অনেক সময় দাঁড়ায়—মূল আলোচনার বাইরে, নির্দিষ্ট পাঠকের জন্য, নির্দিষ্ট আদর্শের ঘরে। অথচ ফররুখের কাব্যিক পরিসর এই সংকীর্ণতা মানে না। তাঁর কাব্যচেতনা নিয়ে আগের আলোচনায় দেখা গেছে, তাঁকে শুধু বিশ্বাসের কবি বা শুধু ধর্মীয় কবি হিসেবে ধরা যায় না; তাঁর কাব্যে lyric (গীতি), epic impulse (মহাকাব্যিক তাগিদ), moral call (নৈতিক ডাক), historical imagination (ঐতিহাসিক কল্পনা)—সব একসঙ্গে কাজ করে। এই বহুস্তরীয় পাঠের ইঙ্গিত দুই ফররুখ-সংকলনের সূচিবিন্যাস ও প্রবন্ধ-বিন্যাসেও আছে। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৮–১৫; ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ১১–১৩)
রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের বিরাট শিখর। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে নতুন গদ্য-পদ্যরূপ ও কথ্যভাষার ব্যবহারে নবায়ন করেন, এবং তিনি ২০ শতকের ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্রষ্টা হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক উচ্চতা আর রবীন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের একচ্ছত্রতা এক জিনিস নয়। সমস্যা দ্বিতীয় জায়গায়।
যখন কোনো একটি রুচি “বাংলা”র স্বাভাবিক মানদণ্ড হয়ে যায়, তখন অন্য রুচির কবিকে বারবার নিজের বাংলা প্রমাণ করতে হয়। ফররুখের কবিতার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি বাংলা লিখছেন, কিন্তু তাঁর বাংলা যেন ব্যাখ্যা চায়। তাঁর শব্দ কেন এমন? তাঁর প্রতীক কেন ইসলামি? তাঁর ইতিহাস কেন মিল্লাতকেন্দ্রিক? তাঁর কল্পনায় হেরা, মদিনা, আন্দালুস, দরিয়া, মর্সিয়া, পাঞ্জেরী কেন? এই প্রশ্নগুলো পাঠের জন্য করা হলে ঠিক। কিন্তু যদি এগুলো গ্রহণ না করার অজুহাত হয়, তবে তা সাহিত্যিক ক্ষমতার প্রশ্ন।
ফররুখকে আড়াল করার আরেকটি পদ্ধতি হলো তাঁর রাজনৈতিক সময়কে তাঁর কাব্যের ওপর চিরস্থায়ী শাস্তি হিসেবে চাপানো। পাকিস্তান-আদর্শের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আছে ছিল। কিন্তু ফররুখ আহমদ তাঁর সময়ের বাস্তবতা বুঝেছিলেন বলেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং তৎকালীন ঐতিহাসিক পরিস্থিতির আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল যৌক্তিক ও ন্যায্য। তিনি যে আদর্শে বিশ্বাস করেছিলেন, তা কোনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা এবং জাগরণের আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত হয়েছিল।
ফররুখ মনে করতেন, আত্মপরিচয়হীন কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না। তাই তিনি মুসলিম ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং সভ্যতার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি ছিল পশ্চাৎমুখিতা নয়, বরং আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। সে অর্থে তিনি তাঁর বিশ্বাসে আন্তরিক ছিলেন এবং নিজের সময়ের চ্যালেঞ্জের একটি সৎ উত্তর খুঁজেছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আজকের মানদণ্ডে অপরাধের আসনে বসানো ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়। একজন মানুষকে তাঁর যুগ, তাঁর অভিজ্ঞতা এবং তাঁর সামনে উপস্থিত বাস্তব সমস্যার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হয়। সেই বিচারে ফররুখ আহমদ ভুল পথে নয়, বরং তাঁর বিবেক ও বিশ্বাস অনুসারে একটি ন্যায্য অবস্থানেই ছিলেন।
তাই ফররুখকে শুধু একজন কবি হিসেবে নয়, বরং আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং জাতিগত জাগরণের একজন চিন্তক হিসেবেও স্মরণ করা উচিত। তাঁর অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর বিশ্বাসকে অবৈধ বা লজ্জাজনক হিসেবে দেখার কোনো ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা নেই; বরং অনেকের কাছে তা ছিল এবং এখনও আছে একটি সঙ্গত ও সম্মানজনক অবস্থান।
এইখানে “লাশ” কবিতার প্রসঙ্গটি আবার দরকারি। দুর্ভিক্ষের কবি ফররুখকে যদি শুধু রাষ্ট্র-আদর্শের কবি বলা হয়, তবে তাঁর সামাজিক চোখকে মুছে দেওয়া হয়।, “লাশ” ১৯৪৪ সালের দুর্ভিক্ষের সঙ্গে যুক্ত এবং সেটিই তাঁর খ্যাতির গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এই তথ্য ফররুখ-পাঠে ভারসাম্য আনে। তিনি শুধু মুসলিম গৌরবের কবি নন; তিনি ক্ষুধারও কবি। শুধু হারানো সাম্রাজ্যের কবি নন; মানুষের লাশের সামনে দাঁড়ানো কবিও।
আড়াল করার আরেকটি সূক্ষ্ম পদ্ধতি হলো তাঁকে পাঠ্যসূচিতে রেখে নিরাপদ করে ফেলা। কবিকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে তাকে ছোট করে পড়ানো যায়। “পাঞ্জেরী”র একটি বিখ্যাত পংক্তি, “সাত সাগরের মাঝি”র কিছু রোমাঞ্চ, “সিন্দাবাদ”র সামান্য শব্দরঙ—এসব রাখা যায়; কিন্তু তাঁর কাব্যের ভাষা-রাজনীতি, মুসলমানি আত্মমর্যাদা, পুঁথি-উত্তর শব্দধারা, আরবি-ফারসি ঐতিহ্যের আধুনিকীকরণ, রবীন্দ্রীয় কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়ানো সাহস—এসব না খুললে ফররুখের ধার ভোঁতা হয়ে যায়। তাঁকে পড়ানো হলো, কিন্তু তাঁর দাঁত তুলে। এই নিরাপদীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ ফররুখের শক্তি শুধু তাঁর বিষয়বস্তুতে নয়; তাঁর অবস্থানে। তিনি বাংলা ভাষার ভেতরে মুসলমানের মালিকানা দাবি করেন। তিনি মুসলমানকে বাংলা ভাষার অতিথি করেন না। তাঁর কাব্যভাষা বলে, মুসলমানি শব্দ কোনো ব্যতিক্রম নয়; বাংলা ভাষারই এক ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক স্তর। পুঁথি সাহিত্য, ফারসি দাপ্তরিক উত্তরাধিকার, জনজীবনের আরবি-ফারসি শব্দভাণ্ডার—এসবের পটভূমিতে ফররুখের ভাষা অস্বাভাবিক নয়; বরং দমিয়ে রাখা এক ধারার আধুনিক উচ্চারণ।
ফররুখকে আড়াল করা হয়েছে কারণ তাঁকে পুরোপুরি গ্রহণ করলে বাংলা সাহিত্যিক কেন্দ্রকে নিজের সীমা স্বীকার করতে হয়। বলতে হয়, বাংলা ভাষার একমাত্র বৈধ সাহিত্যিক চেহারা কলকাতাকেন্দ্রিক, সংস্কৃতঘেঁষা, হিন্দু অভিজাত রুচির মধ্যে শেষ নয়। বলতে হয়, মুসলমানি বাংলা শুধু লোকজ, পুঁথি, মক্তব, ধর্মীয় আবেগ বা প্রান্তিকতার ভাষা নয়; তা উচ্চকবিতারও ভাষা। বলতে হয়, বাংলা কবিতায় হেরা যেমন আসতে পারে, তেমনি কর্ডোভা; মর্সিয়া যেমন আসতে পারে, তেমনি জয়ভেরী; ক্ষুধা যেমন আসতে পারে, তেমনি মিল্লাত। এই স্বীকারোক্তি সহজ নয়।
তাই ফররুখকে আড়াল করা হয়েছে tagging (তকমা-লাগানো)-এর মাধ্যমে। “ইসলামী”—যাতে তাঁকে ধর্মীয় তাকেই রাখা যায়। “পাকিস্তানপন্থী”—যাতে রাজনৈতিক অস্বস্তি দিয়ে সাহিত্যিক আলোচনা বন্ধ করা যায়। “কঠিন ভাষা”—যাতে পাঠকের সীমাকে কবির দোষ বানানো যায়। “বিশেষ ধারা”—যাতে তাঁকে কেন্দ্রে না এনে সম্মানসূচক প্রান্তে রাখা যায়।
কিন্তু এই চারটি tagging (তকমা-লাগানো) একসঙ্গে করলেও ফররুখ শেষ হন না। বরং তাঁর প্রয়োজনীয়তা আরও পরিষ্কার হয়। কারণ যাকে এতভাবে ছোট করতে হয়, তার ভিতরে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা প্রতিষ্ঠিত রুচির আরাম নষ্ট করে। ফররুখ সেই আরাম নষ্ট করেন।
তাঁকে ফেরত আনার অর্থ মূর্তি বানানো নয়। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সময়ের সীমা, অতিরিক্ত উচ্চারণ, আদর্শিক আবেগ—এসব নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন থাকবে পাঠের ভিতরে, বাতিলের ভিতরে নয়। ফররুখকে ফিরিয়ে আনা মানে তাঁকে কেবল “মুসলিম গৌরবের কবি” বানানোও নয়। বরং তাঁকে ভাষা, ইতিহাস, নন্দন, ক্ষুধা, আত্মমর্যাদা, মুসলিম সভ্যতাগত কল্পনা ও বাংলা সাহিত্যিক মালিকানার প্রশ্নে পড়া।
যে বাংলা সাহিত্য নিজের মুসলমান কবিকে শুধু তকমায় আটকে রাখে, সে নিজেরই ইতিহাস ছোট করে।
ফররুখকে আড়াল করার ইতিহাস তাই শুধু একজন কবির অবিচার নয়। এটি বাংলা ভাষার স্মৃতিহীনতার দলিল। আর ফররুখকে ফেরত আনা মানে সেই স্মৃতিহীনতার বিরুদ্ধে বাংলা ভাষাকেই তার পূর্ণ শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া।
হারানো আকাশ ফেরত আনার কবি
ফররুখ আহমদকে ফিরিয়ে আনার অর্থ তাঁকে মূর্তি বানানো নয়। মূর্তি বানালে কবি মরে যায়। কবিকে দরকার হয় পাঠে, তর্কে, ভাষার ভিতরে, আত্মপরিচয়ের ঝড়ের মধ্যে। ফররুখকে দরকার সেই কারণেই। তিনি শুধু একটি যুগের কবি নন। তিনি বাঙালি মুসলমানের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা এক কাব্যিক উচ্চতার সাক্ষী।
তাঁর কবিতা পড়ে বোঝা যায়, বাঙালি মুসলমান কেবল পল্লির মানুষ নয়। কেবল ভাষাভিত্তিক বাঙালি নয়। কেবল দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বঞ্চনা, লোকজ সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক জীবনের চরিত্র নয়। সে আরও বড় কিছু বহন করে। তার পেছনে আছে মিল্লাত, হারানো সভ্যতা, হেরা, আন্দালুস, সমুদ্র, জাহাজ, মর্সিয়া, জয়ভেরী, ক্ষুধিত মানুষের নীরব দাবি, আর আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো মানুষের দায়। ফররুখ এই বিস্তৃত আত্মপরিচয়কে বাংলা কবিতায় জায়গা দিয়েছেন।
এই কাজটি সহজ ছিল না। কারণ বাংলা সাহিত্যিক রুচির ভিতরে মুসলমানের উচ্চারণ দীর্ঘদিন সহজ ছিল না। মুসলমানের দারিদ্র্য নেওয়া যায়, লোকজতা নেওয়া যায়, পল্লির বিষণ্নতা নেওয়া যায়; কিন্তু মুসলমান যদি নিজের সভ্যতাগত উচ্চতা নিয়ে দাঁড়ায়, নিজের ভাষার অধিকার দাবি করে, নিজের হারানো আকাশের কথা বলে—তখন অস্বস্তি তৈরি হয়। ফররুখ সেই অস্বস্তিকে ভয় করেননি।
ফররুখের গুরুত্ব তাই স্থায়ী। তিনি বাংলা ভাষায় মুসলমানের শব্দকে অতিথি করেননি। তিনি তাকে ঘরের জিনিস করেছেন। “দরিয়া”, “সফর”, “মঞ্জিল”, “মর্সিয়া”, “হেলাল”, “জিন্দিগী”, “মওত”—এসব শব্দ তাঁর কবিতায় এসে শুধু অর্থ দেয় না; ইতিহাসের দরজা খোলে। বাংলা ভাষার একটি দমিয়ে রাখা স্তর উচ্চকবিতার কেন্দ্রে উঠে আসে। এটিই তাঁর কাব্যভাষার বড় দাবি। ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য গ্রন্থে তাঁর কাব্যভাষা ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আলাদা আলোচনার উপস্থিতি এই দাবি বোঝার পথ খুলে দেয়। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৩০২)
কিন্তু ফররুখ শুধু ভাষার কারিগর নন। তিনি আত্মমর্যাদার কবি। তাঁর কবিতায় মুসলমান মানুষ কাঁদে, কিন্তু শুধু কাঁদে না। সে জাগতে চায়। সে প্রশ্ন করে। সে নিজের পতন দেখে। নিজের ভুলও দেখে। তার সামনে সমুদ্র আছে, কিন্তু হাল ভাঙা। পাল ছেঁড়া। তারপরও যাত্রা বন্ধ নয়। ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি গ্রন্থের “এক সিন্দবাদী নাবিক” প্রসঙ্গ ফররুখের এই যাত্রামুখী কবি-স্বভাব ধরার দরজা খুলে দেয়। তিনি স্থিরতার কবি নন; তাঁর কাব্যে চলার তাগিদ আছে। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ১৪৭–১৪৮)
এই যাত্রার গভীরতা বোঝার জন্য “সাত সাগরের মাঝি” গুরুত্বপূর্ণ। সেটি নিছক রোমাঞ্চ নয়, নিছক নাবিক-কল্পনাও নয়। সেখানে ঘুমন্ত মাঝি আছে, অচল জাহাজ আছে, ভাঙা পাল আছে, তবু নোঙ্গর তোলার ডাক আছে। এই রূপক বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের ওপর বসে যায়। সে হারিয়েছে, কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। সে ক্লান্ত, কিন্তু অক্ষম নয়। সে ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু তাকে ডাকা যায়। এই কাব্যিক বিস্তার ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি গ্রন্থে “সাত সাগরের মাঝি” প্রসঙ্গে আলাদা গুরুত্ব পায়। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃ. ৩৯৮)
ফররুখকে তাই শুধু “ইসলামী কবি” বলা যায়, কিন্তু সেখানে থামা যায় না। ইসলামী চেতনা তাঁর কেন্দ্রে আছে, কিন্তু তাঁর কাজ কেন্দ্র থেকে বাইরে বিস্তৃত। তিনি বিশ্বাসকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ইতিহাসকে ভাষার সঙ্গে। ভাষাকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে। আত্মমর্যাদাকে সামাজিক দায়ের সঙ্গে। এই বহুস্তরীয় ফররুখকে ধরার জন্যই ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য গ্রন্থের প্রাথমিক বিন্যাসে কাব্যচেতনা, ইসলামী চেতনা, ঐতিহ্যচর্চা ও কাব্যভাষা আলাদা আলোচ্য হয়ে ওঠে। (ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, পৃ. ৮–১৫)
একইভাবে তাঁকে শুধু রাজনৈতিক সময়ের কবি বানিয়েও শেষ করা যায় না। তিনি সময়ের ভিতর ছিলেন। তাঁর ভুল, সীমা, আবেগ, রাজনৈতিক অবস্থান—এসব আলোচনার বাইরে নয়। কিন্তু একজন কবির সময় তাকে ব্যাখ্যা করে; তাকে শেষ করে না। ফররুখের কাব্যের ভিতরে যে ক্ষুধা, জবাবদিহি, হারানো মর্যাদা, ভাষার দাবি, জাগরণের ডাক—এসব কোনো এক রাষ্ট্রীয় মুহূর্তে আটকে থাকে না। তাই তাঁর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু সেই প্রশ্ন তাঁর কবিতাকে বাতিল করার অস্ত্র হতে পারে না।
বড় কবি সবসময় নিজের সময়ের চেয়ে বড় হন। ফররুখও তেমন। তাঁর ভিতরে ১৯৪০-এর দশক আছে, পাকিস্তান-প্রশ্ন আছে, পূর্ববাংলার মুসলমান আছে, বাংলা ভাষার লড়াই আছে। কিন্তু এর সঙ্গে আছে আরও বড় ইতিহাস। আছে মুসলিম সভ্যতার পতনবোধ, আছে হারানো উচ্চতার শোক, আছে আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার তাগিদ। এই বৃহত্তর মানচিত্র ছাড়া ফররুখকে পড়লে তাঁকে ছোট করা হয়।
তিনি বাঙালি মুসলমানকে ছোট থাকতে দেননি। এই কথাটিই তাঁর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক অপরাধ এবং সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক কীর্তি।
ছোট থাকতে দিলে সবাই খুশি থাকত। তাকে পল্লির দরিদ্র মানুষ হিসেবে রাখা যেত। সামান্য ধর্মাচারী চরিত্র হিসেবে রাখা যেত। লোকজ আঞ্চলিকতার সুন্দর বিষণ্নতায় রাখা যেত। কিন্তু ফররুখ তাকে দাঁড় করালেন ইতিহাসের সামনে। বললেন, তোমার ভাষা আছে, তোমার ক্ষত আছে, তোমার নৈতিক দায় আছে, তোমার হারানো সভ্যতা আছে, তোমার সামনে মঞ্জিলও আছে। এই উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ঘরকে অস্বস্তিতে ফেলে। কিন্তু এই অস্বস্তিই দরকার ছিল।
ফররুখকে ফিরিয়ে আনা মানে তাঁর সব কথা মেনে নেওয়া নয়। তাঁকে নির্ভুল বানানো নয়। তাঁকে রাজনৈতিক দায়মুক্ত করা নয়। বরং তাঁকে পূর্ণভাবে পড়া। তাঁর কাব্যের শক্তি যেখানে আছে, তা স্বীকার করা। তাঁর সীমা যেখানে আছে, তা বিচার করা। কিন্তু তাঁকে tagging (তকমা-লাগানো)-এর ঘরে আটকে না রাখা।
তাঁর দরকার আজও আছে, কারণ বাংলা ভাষায় মুসলমানের সাহিত্যিক আত্মমর্যাদার প্রশ্ন এখনো শেষ হয়নি। ভাষা নিয়ে গর্ব করা সহজ। কিন্তু ভাষার ভিতরে কার ইতিহাস জায়গা পাবে, কার শব্দ মর্যাদা পাবে, কার ব্যথা উচ্চ কবিতার বিষয় হবে—এই প্রশ্নগুলো এখনো জীবিত। ফররুখ সেই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়ানো কবি।
আর যদি একদিন এই প্রশ্নের ন্যায্য উত্তরও আসে, তবু ফররুখ দরকারি থাকবেন। কারণ তিনি কেবল প্রতিবাদের কবি নন; তিনি নির্মাণের কবি। তিনি শুধু বলেছেন, মুসলমানকে জায়গা দাও—এতটুকু নয়। তিনি দেখিয়েছেন, সেই জায়গা কেমন হতে পারে। কীভাবে বাংলা ভাষা মুসলমানের ইতিহাস বহন করতে পারে। কীভাবে ইসলামী প্রতীক উচ্চ কবিতার রূপ নিতে পারে। কীভাবে ক্ষুধা, হেরা, সমুদ্র, মর্সিয়া, মঞ্জিল, জবাবদিহি—সব একই কাব্যিক শরীরে দাঁড়াতে পারে।
এইখানেই ফররুখের স্থায়িত্ব। তিনি কোনো বিতর্কের মেয়াদে শেষ হন না। বিতর্ক শেষ হলেও নির্মাণ থাকে। তাঁর কাব্যভাষা সেই নির্মাণের দলিল।
বাংলা ভাষা যখনই নিজের পূর্ণ ইতিহাসের দিকে তাকাবে, তাকে ফররুখের সামনে দাঁড়াতেই হবে। কারণ তিনি প্রমাণ করে গেছেন—মুসলমান বাংলা ভাষার অতিথি নয়। সে এই ভাষার মালিকদের একজন। তার শব্দ এই ভাষার শব্দ। তার ইতিহাস এই ভাষার ইতিহাস। তার হারানো আকাশও এই ভাষার আকাশ।
ফররুখ সেই আকাশ ফেরত আনতে চেয়েছিলেন। বাংলা ভাষার দরজায় তিনি অতিথি হয়ে দাঁড়াননি; মালিকানার দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কবিতা তাই শুধু অতীতের শোক নয়, একটি জাতিগত সত্তার উচ্চারণ—আমরাও এই ভাষার মানুষ, এই ইতিহাসের সন্তান, এই আকাশের উত্তরাধিকারী।

Post a Comment