Loading...

আল্লামা ইকবাল—চিন্তার পুনর্জাগরণ, ইশক ও আকলের মিলবন্ধন

 আল্লামা ইকবাল—চিন্তার পুনর্জাগরণ, ইশক ও আকলের মিলবন্ধন
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    আল্লামা ইকবালের চিন্তার পুনর্জাগরণ, ইশক ও আকলের মিলবন্ধনের প্রতীকী চিত্র   seosazzadchy

    আল্লামা ইকবালের দর্শনে আকল, ইশক, খুদি এবং ওহী-বিজ্ঞানের সমন্বয় মুসলিম পুনর্জাগরণের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে

    Previous Part.......

    জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের বহুমাত্রিকতা এবং দুই চরমপন্থার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব


    বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দাঁড়িয়ে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল যখন সমকালীন মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক অবক্ষয় এবং ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনস্থ পঙ্গু রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন তিনি এই পতনকে সস্তা কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, মুসলিম উম্মাহর এই বাহ্যিক দাসত্ব ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত দশা ছিল মূলত এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী epistemological crisis (জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট)-এর অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৩-১৫)। তাঁর কালজয়ী ইংরেজি দার্শনিক বক্তৃতা সংকলন The Reconstruction of Religious Thought in Islam (ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন)-এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘Knowledge and Religious Experience’ (জ্ঞান ও ধর্মীয় অভিজ্ঞতা)-এ তিনি মানুষের চিন্তার ইতিহাসের এই গভীর ফাটলকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। ইকবাল দেখিয়েছেন, মানবজাতি বিশ্বকে বোঝার এবং নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত, চরমপন্থী এবং ক্ষতিকর দর্শনের গোলকধাঁধায় আটকে গেছে, যার একটি ইউরোপে এবং অন্যটি প্রাচ্যের মুসলিম সমাজে সক্রিয় ছিল।


    ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানালোকের সেই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তিবাদ—যা রেনে দেকার্তের সংশয়বাদ থেকে শুরু করে ডেভিড হিউম ও জন লকের চরম অভিজ্ঞতাবাদের পথ ধরে বিকশিত হয়েছিল—মানব অস্তিত্বকে কেবল একটি বস্তুগত, গাণিতিক এবং ল্যাবরেটরির যান্ত্রিক সমীকরণে রূপ দিয়েছিল (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৭-১৮)। ইকবাল সচেতন, স্বাধীন, চিন্তাশীল ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হিসেবে মানুষের মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের সভ্যতার প্রতি আসক্তিই এদেশীয় মানুষের সর্বনাশের কারণ। তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার উপকরণগুলোকে বস্তুবাদী এবং তার প্রকৃতিকে সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইকবাল বলেন, "পাশ্চাত্যের যাঁতাকলে (পিষ্ট হয়ে) মানবতা ক্রন্দন করছে, পাশ্চাত্যের অভিশাপে মানবজীবন বিপর্যন্ত।" তাঁর প্রশ্ন, হে প্রাচ্যের জাতিসমূহ, তোমরা কি জানো আজ আমাদের করণীয় কী? প্রাচ্যের দিনগুলো পুনরায় আলোকিত হচ্ছে, (প্রাচ্যের) হৃদয়ে বিপ্লব দানা বেঁধে উঠছে, রাত্রি অতিক্রান্ত হয়েছে এবং সূর্য-উদ্ভাসিত হয়েছে। তার (পাশ্চাত্যের) কারণেই মানুষের যাবতীয় সমস্যা, তার কারণেই মানবতার যত ভোগান্তি (জাফর আহমদ ভূঁইয়া, 'ইকবালের কবিতায় মানুষ ও মানবতা', সাহিত্য পত্রিকা, পৃ. ৪৮-৪৯)। এই যান্ত্রিক যুক্তিবাদ মানুষের বুদ্ধিকে তার চিরন্তন আত্মিক ও ঐশ্বরিক উৎস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে তাকে একটি স্বার্থপর, আগ্রাসী এবং খণ্ডিত হাতিয়ারে পরিণত করে, যা বাহ্যিক প্রকৃতিকে জয় করতে পারলেও মানুষের ভেতরের ‘রুহ’ বা আত্মাকে সম্পূর্ণ হত্যা করে ফেলেছিল (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 11-16)।


    এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, তৎকালীন মুসলিম সমাজের চিন্তাশীল এবং ধর্মীয় অংশটি আক্রান্ত হয়েছিল এক ধরনের বিকৃত, নিস্তেজ এবং চরম সুফিবাদী নিষ্ক্রিয়তার দ্বারা। ফলে মুসলিম সমাজের সেরা মেধাবীরা বাস্তব কর্মজগৎ, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং সামাজিক দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে এক মরমি পলায়নবাদের (mystic escapism) অন্ধ কুয়াশায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, যেখানে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কোনো মূল্য বা গুরুত্ব অবশিষ্ট ছিল না।


    অথচ প্রকৃত অলীগণ যাঁরা আল্লাহর হেদায়াতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন, তাঁরা কখনোই সমাজ থেকে পলায়ন করেননি। বরং তারা অত্যাচার-অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, কিন্তু পাপীদের ঘৃণা করেননি। ভালোবাসা ও অন্তরের আন্তরিক প্রেম দিয়ে তারা পাপীদেরকে আল্লাহর খাঁটি বান্দায় পরিণত করেছেন এবং পথভ্রষ্টদের পথের দিশা প্রদান করেছেন। এভাবে তাঁদের হেদায়াতী কর্মের মাধ্যমেই যুগে যুগে আল্লাহর দ্বীন জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে থাকে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ২৬)।


    এই জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের, অর্থাৎ ইউরোপীয় বস্তুবাদী যুক্তিবাদ ও প্রাচ্যের আত্মিক পলায়নবাদের মধ্যকার ফাটলের একটি গভীর ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মুসলিম সভ্যতার ভেতরেই, ইমাম গাজ্জালী (১০৫৮-১১১১ খি.) ও ইবনে রুশদের (১১২৬-১১৯৮ খ্রি.) মধ্যকার বিখ্যাত দ্বন্দ্বে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৮)।


    ইবনে রুশদ ছিলেন এরিস্টটলের দর্শনের একনিষ্ঠ ধারক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমেই পরম সত্যে পৌঁছানো যায়। তিনি গ্রিক দর্শনের আলোকে কুরআন ও ইসলামী বিশ্বাসকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন এবং জগত ও আত্মার অবিনশ্বরতার মতবাদকে সমর্থন করেছিলেন। তবে তিনি একে আল্লাহর সৃষ্টির ক্ষমতা থেকে আলাদা করেননি, বরং বলেছেন আল্লাহ প্রতিনিয়ত এই জগতকে অস্তিত্বশীল রাখছেন (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৮)। তবে ইকবালের দৃষ্টিতে, ইবনে রুশদ গ্রিক যুক্তিবাদের প্রতি এতটাই মোহিত হয়েছিলেন যে, তিনি কুরআনের মূল বাস্তবমুখী ও আরোহনমূলক (inductive) পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে ফেলেন। এর ফলে তিনি এমন একটি নিষ্প্রাণ জীবনদর্শনের উদ্ভবে সাহায্য করেছিলেন, যা মানুষকে তার নিজের অস্তিত্ব, তার সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব এবং বিশ্বজগতের সাথে তার গভীর সম্পর্কের সম্বন্ধে অন্ধ করে দিয়েছিল (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 18)। উল্লেখ্য যে, Inductive Method বা আরোহনমূলক পদ্ধতি বলতে বুঝায়, বিশেষ বিশেষ উদাহরণ, পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ সত্যে বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। অর্থাৎ উপাত্ত থেকে তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া।  আর Deductive Method  বা অবরোহনমূলক পদ্ধতি বলতে বুঝায়, কোনো সাধারণ তত্ত্ব বা পূর্বনির্ধারিত ধারণা থেকে বিশেষ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। তত্ত্ব থেকে উপাত্তে পৌঁছানোর পদ্ধতি। গ্রিক দর্শন ছিল অবরোহনমূলক (Deductive)। তারা কেবল মনস্তাত্ত্বিক অনুমান ও বিমূর্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে যুক্তি সাজাতো। ইবনে রুশদ এই গ্রিক অনুমানের জালে বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো আরোহনমূলক (Inductive)। কুরআন মানুষকে চারপাশের জগত পর্যবেক্ষণ করতে, মহাজাগতিক নিদর্শন দেখতে, ইতিহাস ঘাঁটতে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার (Empirical/Inductive) মাধ্যমে সত্য আবিষ্কারের তাগিদ দেয়।


    ইকবাল মনে করতেন, ইসলামই মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম আরোহনমূলক (Inductive) বা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেছিল। কিন্তু ইবনে রুশদ কুরআনের এই বাস্তবমুখী আরোহনমূলক ধারাকে বাদ দিয়ে গ্রিকদের নিষ্প্রাণ অবরোহনমূলক যুক্তিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।


    অন্যদিকে, ইমাম গাজ্জালী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'তাহাফাতুল ফালাসিফা' (দার্শনিকদের অসংগতি)-তে গ্রিক যুক্তিবাদের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে, শুধু যুক্তির ভিত্তিতে চরম সত্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়, কারণ মানুষের চিন্তাশক্তি একান্ত সীমাবদ্ধ। ইকবাল ইমাম গাজ্জালীর এই কাজের প্রশংসা করে তাঁকে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের (Immanuel Kant) সাথে তুলনা করেছেন। ইকবাল লিখেছেন, জার্মানিতে কান্ট যেভাবে অগভীর যুক্তিবাদ বা বুদ্ধিবাদ ভেঙে দিয়েছিলেন, গাজ্জালীও ইসলামের জগতে গ্রিক যুক্তিবাদের অহংকার বা সীমাবদ্ধতা ঠিক সেভাবেই উন্মোচন করেছিলেন। (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 18)। গাজ্জালী যুক্তিবাদকে চ্যালেঞ্জ করে ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ও আত্মিক উপলব্ধিকে প্রাধান্য দেন। তিনি অনুভব করেন যে, আত্মার প্রকৃত জ্ঞান লাভের জন্য যুক্তি-তর্কের পথ বরং প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তাই তিনি সুফি পদ্ধতিতে আত্মশুদ্ধি ও সরাসরি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্যেই মুক্তির পথ খুঁজে পান। ইমাম গাজ্জালী যুক্তি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে (Thought and Intuition) একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত ও শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। ইকবাল বলেন, Ghazali, finding no hope in analytic thought, moved to mystic experience, and there found an independent content for religion. অর্থাৎ গাজ্জালী যখন বিশ্লেষণাত্মক চিন্তায় (যুক্তিবাদে) কোনো আশা খুঁজে পেলেন না, তখন তিনি রহস্যময় বা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার (mystic experience)-এর দিকে ধাবিত হলেন এবং সেখানেই ধর্মের একটি স্বাধীন ভিত্তি খুঁজে পেলেন। গাজ্জালী মনে করেছিলেন যুক্তি মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাই তিনি যুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করে সুফিবাদের পথ ধরেন। ইকবাল এখানে গাজ্জালীর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। ইকবাল বলেন, যুক্তি (Thought) এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি (Intuition) আসলে একে অপরের পরিপন্থী নয়, বরং এরা একই গাছের দুটি ভিন্ন শাখা। যুক্তি ধাপে ধাপে সত্যের দিকে এগিয়ে যায়, আর আধ্যাত্মিকতা এক নিমেষে সত্যকে সরাসরি উপলব্ধি করে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 19)।


    বস্তুবাদী অতি-বুদ্ধিবৃত্তি কিংবা স্থবির, নিস্তেজ, অবশ ও চরম মাত্রার সুফিবাদী নিষ্ক্রিয়তার মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব মূলত ছিল, বুদ্ধি (আকল) ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা (ইশক/দিল)-এর লড়াইয়ের একটি আদি সংস্করণ। ইবনে রুশদ যেখানে জ্ঞানের জন্য শুধু বুদ্ধির ওপর নির্ভর করতে চেয়েছিলেন, গাজ্জালী সেখানে বুদ্ধিকে উপেক্ষা করে শুধু অন্তরের উপলব্ধিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এই দ্বন্দ্ব মুসলিম বিশ্বের চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। একদিকে যেমন ইবনে রুশদের পথ ধরে ইউরোপে রেনেসাঁর ভিত্তি তৈরি হয়, অন্যদিকে গাজ্জালীর পথ ধরে সুফিবাদের বিকৃত রূপ সমাজে নিষ্ক্রিয়তা ও অসাড়তার জন্ম দেয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 20)।


    ইকবাল এই দ্বন্দ্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে দেখান যে, এই দুই চরমের কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ নয়। ইবনে রুশদের শুধু বুদ্ধিনির্ভর দর্শন আত্মাকে হত্যা করে; আবার গাজ্জালীর শুধু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতানির্ভর পদ্ধতি সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। ইবনে রুশদ বুদ্ধিকে এতটাই একক প্রাধান্য দিয়েছিলেন যে, আধ্যাত্মিক বা ঐশী সত্যকেও গ্রিক যুক্তির ছাঁচে ফেলে পরিমাপ করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে ধর্ম তার জীবন্ত বা গতিশীল রূপ হারিয়ে একটি নিষ্প্রাণ তত্ত্বে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল। এটি মানুষকে শুষ্ক যুক্তি ও বইয়ের পাতায় বন্দি করে ফেলেছিল, যা জীবনের জীবন্ত ও বাস্তবমুখী রূপকে হরণ করে। অন্যদিকে ইমাম গাজ্জালী শুধু দিলের দিকে নযর দেন। তিনি যুক্তির ওপর ভরসা হারিয়ে পুরোপুরি সুফিবাদের রহস্যময় অভিজ্ঞতার (Mystic experience)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি বুদ্ধিকে এক প্রকার বর্জনই করেছিলেন, যা মানুষকে জগত সংসার ও বাস্তব বিজ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে কেবল অন্তর্মুখী করে তোলে। এটি যুক্তিবাদকে পুরোপুরি বর্জন করে মানুষকে অতি-আধ্যাত্মিক ও অন্তর্মুখী করে তুলেছিল, যার ফলে মুসলিম সমাজ জাগতিক বিজ্ঞান ও কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে।


    আল্লামা ইকবালের 'বাঙ্গে দারা' গ্রন্থের ১০৬ নং কবিতা এই বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলে। ইকবাল যখন এই গজলটি লিখছেন, তখন মুসলিম বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক পরাধীনতায় নিমজ্জিত। এর মূল কারণ ছিল দর্শনের দুটি চরমপন্থী ধারা, যার আদি সংস্করণ ছিলেন ইবনে রুশদ এবং ইমাম গাজ্জালী।


    ইকবাল মনে করতেন, ইবনে রুশদ এবং গাজ্জালী— দুজনেই সত্যের একটি করে দিক গ্রহণ করেছিলেন এবং অন্য দিকটি বর্জন করেছিলেন। তাঁর মতে, এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব আসলে কৃত্রিম। মানুষের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য আকল এবং ইশক উভয়েরই প্রয়োজন। আকল বা বুদ্ধি মানুষকে বাহ্যিক জগত জয় করতে সাহায্য করে (বিজ্ঞান), আর ইশক বা হৃদয় মানুষকে ভেতরের জগত পরিষ্কার করে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করে। এই গজলের প্রতিটি শেরে ইকবাল মূলত এই দুই চরমপন্থী ধারাকে ভেঙে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, গতিশীল ও কর্মমুখী জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন।


    আধ্যাত্মিকতার চরম স্তর (অন্ধ মোহভঙ্গ) করতে ইকবাল বলেন,


    "মজনু নে শহর ছোড়া তো সহরা ভি ছোড় দে

    নাজ্জারে কি হওয়াস হো তো লায়লা ভি ছোড় দে"


    অর্থাৎ, মজনু যদি (লায়লার খোঁজে) চেনা শহর ছেড়েই থাকে, তবে তার উচিত এই চেনা মরুভূমিও ছেড়ে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়া। আর তোমার মনে যদি পরম সত্যকে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে লায়লার মতো পার্থিব রূপের মোহও ত্যাগ করো।


    তিনি বুঝাতে চাইলেন, গাজ্জালীর মতো শুধু সূফিবাদের চেনা গণ্ডিতে আটকে না থেকে পরম সত্যের খোঁজে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করো। ইমাম গাজ্জালী জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে যখন শুষ্ক যুক্তিবাদের পথ পরিহার করেন, তখন তিনি কেবল মানুষের অন্তরের অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতাকেই (Mystic Experience) সত্য লাভের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এই ধারা পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজকে চোখ বন্ধ করে, জগত-সংসার থেকে বিমুখ হয়ে খানকাহ বা হুজরার কোণে বসে কেবলই ব্যক্তিক আত্মার শুদ্ধি অর্জন করতে শেখায়। যাকে আল্লামা ইকবাল 'নিষ্ক্রিয় সূফিবাদ' বলে অভিহিত করেছেন। ইকবালের মতে, পরম সত্য বা আল্লাহকে কেবল চোখ বন্ধ করে নিজের অবচেতনে খুঁজলে সত্যের অন্বেষণ পূর্ণতা পায় না; বরং চোখ মেলে আল্লাহর জীবন্ত নিদর্শন, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্ব, প্রকৃতির রহস্যময় নিয়মাবলি এবং মানুষের ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করতে হবে। কুরআন মানুষকে বারবার এই জাগতিক সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি ফেরানোর যে তাগিদ দিয়েছে, তা আসলে আধুনিক বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি তথা আরোহনমূলক (Inductive) পদ্ধতিরই রূপান্তর। ইকবাল বিশ্বাস করতেন, ল্যাবরেটরিতে বসে একজন বিজ্ঞানীর প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করার যে অন্বেষা, তা একজন সুফির আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাই প্রথাগত সুফিবাদের জগত-সংসারত্যাগী "ফানা" বা বিলীন হওয়ার ধারণাকে পুনর্গঠন করে, মহাবিশ্বের প্রতিকূলতাকে জয় করার মাধ্যমে মানুষের "খুদি" বা কর্মমুখী আত্মসত্তাকে জাগ্রত করাই ছিল ইকবালের মূল লক্ষ্য।


    নিয়তিবাদের অসারতা ও কর্মের আহ্বান করে ইকবাল বলেন, 


    "খুদ ক্বাহেরে আফলাক হ্যায় তু আপনে জাহাঁ কা

    কিস গায়েব কে ধোকে মেঁ হ্যায়, তাকদীর কো রোতা?"


    অর্থাৎ, তুমি নিজেই তোমার এই জগতের ভাগ্যবিধাতা বা আকাশকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি (এই কথাকেই অন্যভাবে বলি "আমার ভুবনে আমি স্বাধীন")। তুমি কোন অদৃশ্য মোহের ধোঁকায় পড়ে আছ যে, হাত গুটিয়ে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে কাঁদছ?


    "তাক্বলিদ কি রওয়াশ সে তো বেহতর হ্যায় খুদখুশি

    রস্তা ভি ঢুন্ড, খিজির কা সওদা ভি ছোড় দে"


    অর্থাৎ, অন্যের অন্ধ অনুকরণ করে বেঁচে থাকার চেয়ে আত্মহত্যা করাও ভালো। নিজের পথ নিজেই খুঁজে নাও, পথপ্রদর্শক খাযির (আ.)-এর ওপর চিরকাল নির্ভর করার চুক্তিও ছেড়ে দাও।


    ইবনে রুশদ যেভাবে গ্রিক দর্শনের অন্ধ অনুকরণ করেছিলেন, ইকবাল তার বিরোধিতা করে নিজের 'খুদি' বা আত্মশক্তিকে জাগ্রত করতে বলছেন।


    "সওদাগরি নেহি, ইয়ে ইবাদত খুদা কি হ্যায়

    অ্যায় বে-খবর! জাযা কি তামান্না ভি ছোড় দে"


    অর্থাৎ, আল্লাহর ইবাদত কোনো ব্যবসা বা সওদাগরি নয়। হে অসচেতন মানুষ! পরকালে কেবল পুরস্কার বা বেহেশত পাওয়ার লোভের আশা ত্যাগ করে নিঃস্বার্থভাবে স্রষ্টাকে ভালোবাসো।


    আকল (ইবনে রুশদ) ও ইশক (গাজ্জালী)-এর চরম সমন্বয় করে ইকবাল বলেন, 


    "আচ্ছাহ হ্যায় দিল কে সাথ রহে পাসবানে আক্বল

    লেকিন কভি কভি ইসে তনহা ভি ছোড় দে"


    অর্থাৎ, অন্তরের (ইশকের) সাথে পাহারাদার বা প্রহরী হিসেবে বুদ্ধি (আকল) থাকাটা খুবই ভালো। কিন্তু মাঝেমধ্যে এই অন্তরকে সম্পূর্ণ একা ও স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়াও উচিত।


    এটিই ইকবালের মূল বার্তা— মানুষের জীবনে ইবনে রুশদের 'আকল' বা বুদ্ধি থাকবে পাহারাদার হিসেবে, কিন্তু চূড়ান্ত সত্য উপলব্ধি ও সাহসিকতার জন্য গাজ্জালীর 'দিল' বা হৃদয়কে মুক্ত করে দিতে হবে। আল্লামা ইকবালের জ্ঞানতাত্ত্বিক দর্শনে 'আকল' (যুক্তি) এবং 'ইশক' (হৃদয়ের উপলব্ধি) কোনো পরস্পরবিরোধী সত্তা নয়, বরং একই পরম সত্যে পৌঁছানোর দুটি ভিন্ন স্তর। তিনি মনে করতেন, ইবনে রুশদের অনুসৃত শুষ্ক বুদ্ধিবাদ মানুষের জীবনকে কেবল বাহ্যিক বস্তুগত হিসাব-নিকাশ এবং সীমানার বেড়াজালে বন্দি করে ফেলে। এই আকল বা যুক্তি মানুষের জাগতিক জীবন পরিচালনার জন্য, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার জন্য এবং সত্যের পথকে সুরক্ষিত রাখার জন্য একজন অতন্দ্র প্রহরীর মতো অপরিহার্য। তবে যুক্তির এই পথটি অবরোহনমূলক এবং ধীরগতির হওয়ায় তা মানুষকে কেবল সীমানার দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু সীমানা পেরিয়ে পরম সত্যের অসীম সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার মতো অদম্য সাহসিকতা জোগাতে পারে না। এখানেই ইকবাল ইমাম গাজ্জালীর সেই 'দিল' বা অন্তরের অতিন্দ্রীয় উপলব্ধিকে স্বাধীন করার তাগিদ দিয়েছেন। মানুষের আত্মিক মুক্তি, চূড়ান্ত সত্যের প্রত্যক্ষ দর্শন এবং জীবনের বড় বড় বিপ্লবী সিদ্ধান্তগুলোর জন্য বুদ্ধির হিসাব-নিকাশকে পেছনে ফেলে হৃদয়ের আবেগকে মুক্ত করে দিতে হয়। ইকবালের দৃষ্টিতে, বুদ্ধি যখন হৃদয়ের আলোকে পথ দেখায় এবং হৃদয় যখন বুদ্ধির পাহারায় নিজের খুদিকে বিকশিত করে, তখনই মানুষের চিন্তা ও কর্মের এক পূর্ণাঙ্গ ভারসাম্যপূর্ণ রূপ আত্মপ্রকাশ করে।


    একই কবিতায় ছদ্ম-সূফিবাদের সমালোচনা করে ইকবাল বলেন, 


    "তু আগর সূফি হ্যায় তো হো যা ফানা হাক্ব মেঁ

    খুদ কা জিকির ভি ছোড় দে, সূফি কা চর্চা ভি ছোড় দে"


    অর্থাৎ, তুমি যদি সত্যিই সূফি হতে চাও, তবে নিজেকে পরম সত্যের (আল্লাহ কাজের) মধ্যে বিলীন করে দাও। নিজের নামের জিকির এবং সমাজে 'আমি একজন বড় সূফি'— সূফিয়ানা এই ভাব এবং আত্মঅহমিকার চর্চাও ত্যাগ করো।


    অন্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রত্যাখ্যান করে তাঁর অনির্বাণ উচ্চারণ, 


    "ওয়ায়েজ সুবুত লায়ে জো ম্যয় কে জাওয়াজ মেঁ

    ইকবাল কো ইয়ে জিদ হ্যায় কে পিনা ভি ছোড় দে"


    অর্থাৎ, ধর্মের ব্যাখ্যাকারী বা ওয়াজকারী যদি মদ্যপানকে (বা কোনো অন্যায়কে) বৈধ প্রমাণ করার জন্য কোনো চমৎকার যুক্তি বা দলিলও নিয়ে আসে; ইকবালের এমন জেদ যে, সে তবুও মদ্যপান করাই ছেড়ে দেবে।


    তিনি বুঝাচ্ছেন, ওয়ায়িজরা উল্টাপাল্টা কল্পকাহিনির পোতাশ্রয়ে নানা অবৈধ বিষয়কেও বৈধতার প্রলেপ দিয়ে দেয়। কোনো কোনো সময় উলামা শ্রেণির কেউ কেউ নিজেদের পক্ষে যায় ফতোয়াকে তেমন তালে ঘুরিয়ে দেন। দলভারী এবং দলীয় মাহাত্ম্য প্রচারে শরিয়ার অপছন্দ এমন কথাবার্তার অবতারণাও করা হয়। মানুষকে সেগুলো গেলাতেও চাওয়া হয়। ইকবাল বলেন, এমন মৌলভী যদি শুষ্ক যুক্তি দিয়ে কোনো ভুল জিনিসকে জায়েজ করতে চায়, তবে বিবেক বা অন্তরের আলো দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ইকবালের হৃদয় এসব বিষয় এতো ভালো করে চেনে যে, সে তা ভুল সাব্যস্ত করতে এবং ত্যাগ করতে জেদ ধরে বসে যাবে।


    বস্তুত, ইকবালের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটেছিল ঠিক (ইবনে রুশদের বুদ্ধি আর গাজ্জালীর ইশক) এই দুই চরম মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি অবিচ্ছেদ্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং গতিশীল বৈপ্লবিক সংশ্লেষ তৈরি করার মাধ্যমে। যা তিনি তাঁর গদ্য ও কাব্যে ‘আকল’ (বুদ্ধি) এবং ‘ইশক’ (প্রেম বা পরম আধ্যাত্মিক আকুলতা)-এর মিলবন্ধন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৩৫)। ইকবাল পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক আকল বা বুদ্ধিকে পুরোপুরি বর্জন করার কোনো সস্তা ও সংকীর্ণ আবেগসর্বস্ব পথ বেছে নেননি, বরং তিনি ইমানুয়েল কান্টের দর্শনের উদাহরণ টেনে বুদ্ধির সীমাটি পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন যে, বুদ্ধি ছাড়া মানুষ যেমন অন্ধ, তেমনি ইশক বা আত্মিক প্রেম ছাড়া বুদ্ধি চরম জালেম ও ধ্বংসাত্মক (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৬)। বুদ্ধি মানুষকে বস্তুগত বিশ্বের বাহ্যিক সত্য উন্মোচন করতে সাহায্য করে এবং তাকে এই বাস্তব পৃথিবীর লজিস্টিকসের ওপর নিয়ন্ত্রণ দেয়, আর ইশক বা প্রেম সেই অর্জিত ক্ষমতাকে একটি উচ্চতর নৈতিক, মানবিক ও ঐশ্বরিক লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করে উম্মাহর মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি নিশ্চিত করে। এভাবেই ইকবাল গাজ্জালী ও ইবনে রুশদের দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করে এমন একটি পথ তৈরি করলেন, যেখানে আকল ও ইশক—বুদ্ধি ও প্রেম—পরস্পরের পরিপূরক হয়ে মানবসভ্যতাকে নতুন দিগন্তের দিকে নিয়ে যায়। তিনি তাঁর বিখ্যাত "জওয়াবে শিকওয়া"য় ঘোষণা করেন, 


    "আকল হায় তেরী সিপার, ইশক হায় শমশীর তেরী

    মেরী দারউইশ! খেলাফত হ্যায় জাহাঁগীর তেরি।"


    "বুদ্ধি তোমার ঢাল, আর প্রেম তোমার তলোয়ার;

    হে আমার দরবেশ! (সারা) বিশ্বের নেতৃত্বই তোমার।"


    আকল এবং ইশকের মিলবন্ধনের একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত হলো মাওলানা রুমি ও শামসে তাবরিজের সাক্ষাৎ। রুমি যখন তাঁর পুস্তকসমূহের স্তূপের মধ্যে জ্ঞানের গর্বে আত্মমগ্ন, তখন শামস এলেন এবং তাঁর সমস্ত পুস্তক পানিতে ফেলে দিলেন। রুমির চিৎকারের জবাবে শামস যখন একটি ইশারায় সব পুস্তক অক্ষত উদ্ধার করলেন, তখন রুমি বুঝতে পারলেন, আকলের জ্ঞান সীমাবদ্ধ, প্রকৃত জ্ঞান ইশকের আলোয় উদ্ভাসিত হয়। মূলত ইশক ছাড়া আকল পথভ্রষ্ট, আকল ছাড়া ইশক অন্ধ। 


    আকল মানুষকে বস্তুগত পৃথিবীর হিসাব-নিকাশ, বিজ্ঞান-দর্শন এবং যুক্তি শেখায়। কিন্তু এটি মানুষকে স্বার্থপরতা বা অহংকারের (যেমনটি রুমির বইয়ের স্তূপের প্রতি ছিল) দিকে নিয়ে যেতে পারে। শামসে তাবরিজ যখন বইগুলো পানিতে ফেলে দিলেন, তিনি আসলে রুমির ভেতরের সেই অহংকারকে ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন, শুধু বই পড়ে বা বস্তুগত যুক্তি দিয়ে পরম সত্য বা খোদার সন্ধান পাওয়া যায় না; তার জন্য হৃদয়ের আলো (ইশক) প্রয়োজন।


    ইকবাল দাঁড়িয়ে থাকেন ঠিক এই পয়েন্টটেই। শামসে তাবিরিজ আর রুমির মিলবন্ধনের মধ্যখানে। ইকবাল চেয়েছেন, আকল ও ইশকের একটি ভারসাম্যপূর্ণ মিলবন্ধন। তাঁর মতে, শুধু আকল (বুদ্ধি ও বস্তুগত শক্তি) মানুষকে চালাক, শক্তিশালী ও বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত করে। কিন্তু হৃদয়ে প্রেম না থাকলে মানুষ পারমাণবিক বোমা বানিয়ে অন্য মানুষকে ধ্বংস করতে দ্বিধা করে না (যা আমরা আধুনিক বিশ্বে দেখি)।  অন্যদিকে শুধু ইশক (অতি মাত্রায় আধ্যাত্মিকতা) মানুষকে দরবেশ বানায় ঠিকই, কিন্তু বস্তুগত শক্তি না থাকায় তারা দুনিয়ায় মজলুম ও পরাধীন হয়ে পড়ে। তাই ইকবালের দর্শন হলো, বুদ্ধি বা বস্তুগত শক্তি হবে নিজেদের ঢাল (আত্মরক্ষার হাতিয়ার), আর ঐশ্বরিক প্রেম ও নৈতিকতা হবে তলোয়ার তথা বিজয় ছিনিয়ে আনার চালিকাশক্তি। এই দুইয়ের মিলন হলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে 'জাহাঁগীর' বা বিশ্বজয়ী হতে পারে। 


    'খুদি'র মেথডলজি এবং বিলোপবাদী আধ্যাত্মিকতার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ


    আল্লামা ইকবালের সমগ্র দার্শনিক ইমারতের মূল ভিত্তিপ্রস্তর এবং তাঁর চিন্তার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো তাঁর অনন্য ‘খুদি’ (Selfhood বা আত্মসত্তা) তত্ত্ব। যা তিনি তাঁর অমর ফারসি কাব্যগ্রন্থ "আসরারে খুদি" (The Secrets of the Self)-এর প্রতিটি চরণে অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং যুক্তিগ্রাহ্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। খুদি বলতে ইকবাল সাধারণ প্রচলিত বা লৌকিক অর্থে কোনো অহংকার, আত্মম্ভরিতা, অহমিকা বা সংকীর্ণ স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিকতাকে বোঝাননি; বরং তাঁর গভীর দর্শনে খুদি হলো মানুষের ভেতরের সেই সুপ্ত, সচেতন, পরম সক্রিয় এবং গতিশীল আত্মিক কেন্দ্রবিন্দু, যা তাকে মহাবিশ্বের অন্য সব সৃষ্টি এবং জড়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য এক মর্যাদা দেয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 1-4)। খুদি হলো মানুষের সেই অনন্য ব্যক্তিসত্তা যা তাকে জড় জগতের অন্ধ নিয়মের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং কর্ম করার ক্ষমতা দান করে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৯)। ইকবালের মতে—"মাটির মানুষের অন্তরে তাদের প্রকাশ আকাশ ছাড়িয়ে গেছে তারার জাহান। খুদীর সংরক্ষণ জীবনের প্রাণশক্তি, অন্যথা অনর্থক মৃত্যুর শীতলতা তথা নিশ্চল কাহিনী" (ইকবালের কবিতায় মানুষ ও মানবতা, সাহিত্য পত্রিকা, পৃ. ৫০)।


    ইকবাল তাঁর এই দর্শনে তৎকালীন প্রাচ্যের এবং বিশেষ করে মুসলিম সমাজের সেই প্রচলিত আধ্যাত্মিকতার তীব্র ও আপসহীন বিরোধিতা করেছেন। যা মনে করত মানুষের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক লক্ষ্য হলো, ঈশ্বরের বিশাল সত্তার সাগরে বুদবুদের মতো নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বকে বিলীন বা 'ফানা' করে দেওয়া (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ২৫-২৬)। এই বিলোপবাদী ও অস্তিত্ব-বিধ্বংসী আধ্যাত্মিকতার মূলে তীব্র আঘাত করে ইকবাল দাবি করেন, মানুষের প্রকৃত সৃষ্টিগত লক্ষ্য নিজেকে ঈশ্বরের মধ্যে হারিয়ে ফেলা বা বিলুপ্ত করা নয়, বরং পরম সত্তার সান্নিধ্যে নিজের স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট খুদি বা আত্মসত্তাকে অক্ষুণ্ণ রেখে তাকে আরও বেশি শক্তিশালী, সুদৃঢ় এবং অমর করে তোলা (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১১-১৩)। তিনি মনে করতেন, ড্রপ বা জলের ফোঁটা যেমন সমুদ্রের সাথে মিশে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে, মানুষের আত্মা তেমন নয়। মানুষের আত্মার কাজ হলো সমুদ্রের বুকেই নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে এক একটি উজ্জ্বল মুক্তায় পরিণত হওয়া।


    তিনি তাঁর বিখ্যাত দর্শনে একেই ‘ব্যক্তিত্বের সুদৃঢ়করণ’ বা the fortification of the ego হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা নিষ্ক্রিয় আত্মত্যাগের বদলে সক্রিয় আত্মপ্রতিষ্ঠার কথা বলে। এই খুদির জাগরণকে তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী রূপান্তরের মহৌষধ মনে করতেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 118-120)। ইকবাল ঘোষণা করেছেন,


    "খুদী’র জোরেই মুসলমানের ঘটতে পারে পূর্ণ বিকাশ

    খুদীই যদি যায় হারিয়ে তাহলে সে অন্যেরই দাস।"

    (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ৪৭)।


    খুদির জাগরণের একটি অপূর্ব ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো খায়বার যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)-এর বীরত্ব। যখন মুসলিম বাহিনী ইহুদিদের সুরক্ষিত কামুস দূর্গ জয় করতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) পতাকা প্রদান করলেন হযরত আলীর হাতে। তিনি কামুস দূর্গের বিশাল লৌহকপাট তুলে নিলেন এবং সেটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধ করলেন। এমন এক আত্মবিশ্বাস ও খুদির প্রকাশ, যা ইতিহাসে বিরল (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ৮২-৮৩)। এই ঘটনা প্রমাণ করে, খুদি যখন জাগ্রত হয়, তখন মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে।


    আল্লামা ইকবালের 'খুদিতত্ত্ব' (Philosophy of Self/Ego) ইসলামের ইতিহাস ও দর্শনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়। ইকবাল সুফিবাদের ভুল ব্যাখ্যার কারণে সৃষ্ট মুসলিম সমাজের "নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণ" বা বৈরাগ্যবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি এমন এক 'খুদি' বা আত্মশক্তির কথা বলেছেন, যা মানুষকে কর্মমুখী ও অপরাজেয় করে তোলে। ইকবালের দর্শনে 'মর্দে মুমিন' বা আদর্শ মানুষের সর্বোচ্চ প্রতীক হলেন হযরত আলী (রা.)। আল্লামা ইকবাল তাঁর বিখ্যাত ফারসি কাব্যগ্রন্থ 'আসরারে খুদি' (আত্মার রহস্য)-তে হযরত আলীর বীরত্ব ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে খুদির জাগরণের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।


    খায়বারের কামুস দুর্গটি ছিল তৎকালীন সময়ে আরবের অন্যতম দুর্ভেদ্য দুর্গ। একের পর এক সেনাপতি যেখানে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, সেখানে হযরত আলী (রা.)-এর বিজয় কেবল শারীরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং তা ছিল তাঁর ভেতরের 'খুদি' বা ঐশী আত্মবিশ্বাসের জাগরণ। ইকবাল বিশ্বাস করতেন, মানুষের খুদি যখন আল্লাহর ইচ্ছার সাথে একাত্ম হয়ে যায়, তখন সে প্রকৃতির নিয়মকেও জয় করতে পারে। হযরত আলীর কামুস দুর্গের বিশাল কপাটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার ঘটনাটি মূলত সেই অপরাজেয় আত্মিক শক্তিরই বাস্তব রূপ। ইকবালের কবিতার পঙ্ক্তিটি স্পষ্ট করে, যে জাতির খুদি বা আত্মমর্যাদাবোধ হারিয়ে যায়, তারা মানসিকভাবে অন্যের দাসে পরিণত হয়। বর্তমান সময়ে মুসলমানদের জন্য ইকবালের এই দর্শন আরও একধাপ এগিয়ে দাসত্ব থেকে মুক্তির "মনস্তাত্ত্বিক মহৌষধ"। যা হীনম্মন্যতা দূর করে আত্মপ্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।


    ইকবাল এই ঔপনিবেশিক দাসত্বের মনস্তত্ত্বের গোড়ায় কুঠারাঘাত করে ঘোষণা করেন, মানুষ কেবল এই মহাবিশ্বের কোনো নিষ্ক্রিয় দর্শক বা পূর্বনির্ধারিত নিয়তির অসহায় পুতুল নয়; বরং সে হলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর প্রকৃত খলিফা। ইকবালের মতে,

    "তুমি হে মানুষ, কর্তব্যের বোঝা বইতে করো না অস্বীকার।

    না হলে পাবে না লাভ করতে সে স্বর্গ, যেখানে আল্লাহর নৈকট্য।

    আইনের বিধান মেনে চলো, হে অমনোযোগী আত্মা

    অবাধ্যতার পরিণামই পরাধীনতা" (ইকবালের কবিতায় মানুষ ও মানবতা, সাহিত্য পত্রিকা, পৃ. ৫১)।


    জ্ঞানতাত্ত্বিক অখণ্ডতা এবং ওহীর আলোয় প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক পাঠ


    আল্লামা ইকবাল তাঁর জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে ওহী বা ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে আধুনিক বিজ্ঞানের বা বুদ্ধির সমান্তরাল এবং সমান নির্ভরযোগ্য ও বাস্তব সত্যের একটি উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 11-16)। The Reconstruction of Religious Thought in Islam-এর 'Knowledge and Religious Experience' প্রবন্ধের মাঝামাঝি অংশে তিনি দর্শনের অত্যন্ত জটিল পরিভাষা ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান যেভাবে পঞ্চেন্দ্রিয় এবং বাহ্যিক অনুভূতির (sense-perception) মাধ্যমে বস্তুগত বিশ্বের আচরণকে পর্যবেক্ষণ করে জ্ঞান লাভ করে, ঠিক একইভাবে মানুষের ভেতরের গভীর আত্মিক বা ধর্মীয় অনুভূতিও সত্য অনুসন্ধানের একটি অত্যন্ত বাস্তব, বস্তুনিষ্ঠ এবং পরীক্ষালব্ধ পদ্ধতি। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন, যারা কুরআনের তত্ত্বজ্ঞান অর্জন করতে চায়, তাদের জন্য প্রয়োজন অতীন্দ্রিয় জ্ঞান। যা কেবল আত্মার গভীরতম স্তরে প্রবেশ করেই লাভ করা সম্ভব। তাঁর ভাষায়, "The ‘heart’ is a kind of inner intuition or insight which, in the beautiful words of Rumi, feeds on the rays of the sun and brings us into contact with aspects of Reality other than those open to sense-perception." অর্থাৎ, ক্বলব বা হৃদয় হলো এক ধরণের অন্তর্জ্ঞান বা অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি, যা রুমির সুন্দর ভাষায়—সূর্যের আলো থেকে নিজের খাদ্য গ্রহণ করে এবং আমাদের সামনে পরম সত্যের এমন কিছু দিক উন্মোচন করে যা সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা বস্তুগত বুদ্ধির অতীত।


    ইকবাল এই অধ্যায়ে পরিষ্কার করেছেন, কুরআন কেবল একটি চিন্তার বই নয়, এটি কর্মেরও বই। তাই কুরআনের প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান বুঝতে হলে কেবল তাত্ত্বিক বুদ্ধিই যথেষ্ট নয়। তিনি দেখিয়েছেন, এই অতীন্দ্রিয় জ্ঞান অর্জন করতে হলে মানুষকে তার বাহ্যিক চেতনা বা অহং (Ego) থেকে সরে এসে চেতনার গভীরতর স্তরে (Mystic or Religious Experience) প্রবেশ করতে হয়, যা সম্পূর্ণ বাস্তব এবং পরীক্ষাযোগ্য।


    আল্লামা ইকবাল তাঁর The Reconstruction of Religious Thought in Islam গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে মানুষের অতীন্দ্রিয় জ্ঞান এবং অন্তর্দৃষ্টির (Intuition) আলোচনাটি পবিত্র কুরআনের দুটি নির্দিষ্ট সূরার আয়াত উদ্ধৃত করে ব্যাখ্যা করেছেন।

    ثُمَّ سَوَّاهُ وَنَفَخَ فِيهِ مِن رُّوحِهِ ۖ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالأَبْصَارَ وَالأَفْئِدَةَ ۚ قَلِيلا مَّا تَشْكُرُونَ


    "অতঃপর তিনি তাকে সুঠাম করলেন এবং তার মধ্যে তাঁর রূহ থেকে ফুঁকে দিলেন। আর তিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ ও অন্তকরণ (হৃদয়/ক্বলব) সৃষ্টি করলেন। তোমরা খুব সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।" (সূরা আস-সাজদাহ্‌, আয়াত: ০৯)


    এই আয়াতের "الأَفْئِدَةَ" (হৃদয়সমূহ বা ক্বলব) শব্দটিকে চিহ্নিত করে ইকবাল বলেন, ক্বলব কেবল রক্ত সঞ্চালনের অঙ্গ নয়। এটি মূলত একটি অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি (Inner Intuition or Insight)। সাধারণ পঞ্চেন্দ্রিয় এবং বুদ্ধি (চোখ ও কান) যেখানে পৌঁছাতে পারে না, ক্বলব বা আত্মার গভীরতম স্তর পরম সত্যের সেই দিকগুলোর সাথে মানুষের সংযোগ করিয়ে দেয়।


    বাহ্যিক চোখ অন্ধ হওয়া আর ভেতরের অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি বা ক্বলব অন্ধ হওয়ার পার্থক্য বোঝাতে ইকবাল সূরা হজ্জ-এর ৪৬ নং আয়াতের শেষ অংশটি উল্লেখ করেন।

    أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا ۖ فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ


    "তবে কি তারা দেশ ভ্রমণ করেনি, যাতে তাদের ক্বলব (হৃদয়) হতো যা দ্বারা তারা বুঝতে পারত এবং কান হতো যা দ্বারা তারা শুনতে পারত? বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত ক্বলব বা হৃদয়সমূহ।" (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৪৬)।


    ইকবাল এই আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, মানুষ যদি কেবল বাহ্যিক বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে আত্মার গভীরতম স্তরে প্রবেশ না করে, তবে তার ভেতরের অতীন্দ্রিয় চোখ অন্ধ হয়ে যায়। কুরআনের আসল তত্ত্ব ও গভীর ঐশী জ্ঞান অর্জন করতে হলে এই বক্ষস্থিত হৃদয়ের ভেতরের আলোর উন্মেষ ঘটানো অপরিহার্য। (The Reconstruction of Religious Thought in Islam ( Oxford University Press সংস্করণ). Chapter 1: Knowledge and Religious Experience (জ্ঞান ও ধর্মীয় অভিজ্ঞতা). Page 14-15)।


    ইকবাল অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি দিয়েছেন, সত্যের এই দুই উৎস বা পদ্ধতি—অর্থাৎ বাহ্যিক বিজ্ঞান এবং অভ্যন্তরীণ ওহী—একে অপরের বিরোধী বা সাংঘর্ষিক নয়, বরং এরা মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য একে অপরের পরম পরিপূরক (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 1-2)।


    ইকবালের মতে, বুদ্ধি (Intellect) এবং অন্তর্জ্ঞান (Intuition) একই পরম সত্যের দুটি ভিন্ন মাত্রা। যা অর্গানিকভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত। বিজ্ঞান যেখানে প্রকৃতির বাহ্যিক ‘আয়াত’ বা নিদর্শনসমূহকে খণ্ডিতভাবে (Sectional) বিশ্লেষণ করে, ওহী বা ধর্মীয় অভিজ্ঞতা সেখানে সত্যকে সামগ্রিকভাবে (Ultimate Reality as a whole) স্পর্শ করে (Ibid, p. 1-2)। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি, তিনি ইমাম গাজ্জালীর সমালোচনা করে দেখিয়েছেন, বুদ্ধিকে সম্পূর্ণ বর্জন করে কেবল আধ্যাত্মিকতার ওপর নির্ভর করলে জ্ঞানতত্ত্ব পূর্ণতা পায় না, ঠিক যেমনটি ঘটে কেবল বস্তুবাদের ওপর নির্ভর করলে।


    ইকবাল দেখিয়েছেন, আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান জগৎকে একটি নিস্প্রাণ বস্তু (Dead Material Mechanism) হিসেবে দেখে, যার ফলে বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের বাহ্যিক ক্ষমতা বাড়ালেও তার ভেতরের নৈতিক দেউলিয়াত্ব দূর করতে পারেনি। পাশ্চাত্যের এই যান্ত্রিক বিশ্ববীক্ষা (Mechanical View of Nature) প্রকৃতিকে আত্মাহীন ও উদ্দেশ্যহীন মনে করে, যা মানুষকে কেবল ক্ষমতার অন্ধ দাসে পরিণত করেছে (Ibid, p. 147-148)।


    এর বিপরীতে ইকবাল আল-কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রমাণ করেছেন, এই বিশ্বজগৎ কোনো নিস্প্রাণ জড় পদার্থ নয়, বরং এটি আল্লাহর সদা-প্রবহমান সৃষ্টিশীল অহং-এর (Creative Ego-এর) একটি জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ (Ibid, p. 7-8)। ইউরোপীয় বিজ্ঞান কেবল 'ফিকর' বা বাহ্যিক গবেষণাকে আঁকড়ে ধরায় তা নৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে, যা মানবসভ্যতাকে এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত করেছে।


    এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি বিজ্ঞান ও ওহীর সমন্বয়ে আল-কুরআনের সেই চিরন্তন 'যিকর' (আধ্যাত্মিক স্মরণ) এবং 'ফিকর'-এর (বৈজ্ঞানিক চিন্তার) সমন্বিত রূপটি পেশ করেছেন, যা বর্ণিত হয়েছে সূরা আল-ইমরানের ১৯০-১৯১ নম্বর আয়াতে,

    إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ ﴿١٩٠﴾ الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَٰذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ﴿١٩١﴾

    "নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে (এবং বলে), 'হে আমাদের রব! আপনি এগুলো বৃথা সৃষ্টি করেননি, আপনি অত্যন্ত পবিত্র; অতএব আপনি আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।' (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৯০-১৯১)।


    ইকবাল দেখিয়েছেন, এই আয়াতে আল্লাহ 'যিকর' (আধ্যাত্মিক স্মরণ) এবং 'ফিকর' (সৃষ্টিজগৎ নিয়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তা)-কে একসাথে জুড়ে দিয়েছেন। পাশ্চাত্যের ভুল হলো তারা কেবল 'ফিকর' (বিজ্ঞান) নিয়েছে কিন্তু 'যিকর' (আধ্যাত্মিকতা) বর্জন করেছে। আর মুসলিমদের অধঃপতনের কারণ হলো, তারা কেবল 'যিকর' নিয়েছে 'ফিকর' (বিজ্ঞান) ছেড়ে দিয়েছে। ইকবালের মতে, কুরআনের প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান হলো এই বিজ্ঞান ও ওহীর এমন এক যুগপৎ আলো, যা মানুষকে একই সাথে বৈজ্ঞানিক দিক থেকে শক্তিশালী এবং নৈতিক দিক থেকে উন্নত ‘মর্দে মুমিন’ হিসেবে গড়ে তোলে।


    এই গভীর দার্শনিক দূরদর্শিতার আলোকেই ইকবাল পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত গতিশীল ও আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক রি-রিডিং বা নতুন ব্যাখ্যা বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করেন। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে দেখান, কুরআন মানুষকে কোনো অলীক কাল্পনিক জগতে বাস করতে বলে না, বরং তা বারবার মানুষকে ‘আফাক’ (বাহ্যিক প্রকৃতি বা মহাবিশ্ব) এবং ‘আনফুস’ (মানুষের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্ব) ও ইতিহাসের অমোঘ পরিবর্তনের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকাতে এবং তা থেকে শিক্ষা নিতে নির্দেশ দেয়, যা আসলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনোভঙ্গিরই মূল চালিকাশক্তি (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 14-18)।


    আল্লামা ইকবাল সমকালীন মুসলিম সমাজকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছিলেন, আধ্যাত্মিকতা বা দ্বীনের দোহাই দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান, গণিত ও বাস্তব জ্ঞানচর্চার ময়দান ত্যাগ করা আসলে কুরআনের মূল স্পিরিট এবং ইসলামের গতিশীল মেজাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হওয়ার শামিল (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ৪৭)। ইকবাল জ্ঞানকে কোনো খণ্ডিত রূপে দেখেননি; বরং বস্তুগত জগতকে জয় করাকেই তিনি আধ্যাত্মিকতা অর্জনের প্রথম ধাপ বলে মনে করতেন।


    ইকবালের রচনাকর্ম পাঠ করে মানুষ ও মানবতাকে আবিষ্কার করতে হলে, তাঁর ধর্ম-চিন্তার অনুধাবন অপরিহার্য। তিনি ইসলামকে শুধু আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব সাধারণ ধর্মের মত করে দেখেননি। ইসলামকে গ্রহণ করেছেন পরিপূর্ণ জীবন দর্শন ও জীবন ব্যবস্থা হিসেবে। কারণ এই ধর্মই পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের সামগ্রিক জীবনকে। আর জীবনচর্চার ভেতর দিয়েই বিকশিত হয় মানবিকতাবোধ। ইকবালের দৃষ্টিতে ধর্মের সংজ্ঞা হলো,

    "ধর্ম কি জানো?

    মৃত্তিকা থেকে উত্থান।

    যেন এ আত্মা খুঁজে পায় তার সত্তার সন্ধান।"

    (জাফর আহমদ ভূঁইয়া, 'ইকবালের কবিতায় মানুষ ও মানবতা', সাহিত্য পত্রিকা, ১৯৯৯, পৃ. ৫২; মূল কাব্যগ্রন্থ: আল্লামা ইকবাল, বাঙে দারা, ১৯২৪, পৃ. ৯০)


    ইকবাল তাঁর বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থ The Reconstruction of Religious Thought in Islam-এ উল্লেখ করেছেন, বিজ্ঞান এবং ধর্ম আসলে একই পরম সত্যের (Ultimate Reality) দিকে ধাবিত হওয়ার দুটি ভিন্ন পথ। বিজ্ঞান বাহ্যিক প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, আর ধর্ম মানুষের ভেতরের সত্তাকে জাগ্রত করে। জ্ঞানকে যখন এভাবে একটি অখণ্ড, অবিভাজ্য এবং মহাজাগতিক সত্তা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মধ্যকার সমস্ত কৃত্রিম ও রাজনৈতিক সংঘাত চিরতরে দূর হয়ে যায় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 98-103)।


    মানুষের এই জাগতিক জ্ঞান (আকল) এবং আধ্যাত্মিক প্রেমের (ইশক) মিলবন্ধনে কীভাবে নিজের সত্তাকে বা ‘খুদি’কে চেনা যায়, তা তিনি তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থগুলোতে ফুটিয়ে তুলেছেন। ইশকের দরিয়ায় বহতা সুর তোলে ইকবাল উচ্চারণ করেন,


    "খুদি কো কর বুুলন্দ এতনা কেহ হর তাকদীর সে পহলে,

    খোদা বান্দে সে খুদ পুছে বাতা তেরি রেযা কেয়া হ্যায়।"


    নিজের সত্তাকে এতোটাই উচ্চতায় নিয়ে যাও, যেন প্রতিটি ভাগ্য লেখার আগে, খোদা নিজে বান্দাকে জিজ্ঞেস করেন— বলো, তোমার ইচ্ছাটা কী?


    আবার দুনিয়া জয়ের অপার সম্ভাবনার দোয়ার খোলে হাঁক ছাড়েন,


    "তু শাহীঁ হ্যায় পরওয়াজ হ্যায় কাম তেরা,

    তেরে সামনে আসমাঁ অওর ভি হ্যায়ঁ।"


    তুমি তো এক বাজপাখি, উড্ডয়নই তোমার কাজ; তোমার সামনে জয় করার জন্য পড়ে আছে আরও বহু আকাশ।


    "সিতারোঁ সে আগে জাহাঁ অওর ভি হ্যায়ঁ,

    আভি ইশক কে ইমতেহাঁ অওর ভি হ্যায়ঁ।"


    তারকারাজির ওপারেও রয়েছে জয় করার মতো আরও অনেক জগত; ভালোবাসার ও আত্মোপলব্ধির পরীক্ষা এখনও অনেক বাকি। (বা'লে জিবরিল (Bal-e-Jibril), ১৯৩৫, গজল নং ৫৩ এবং ৬০)।


    ইকবালের এই দর্শনে, মানুষের 'আকল' বা জাগতিক বিজ্ঞান হলো ডানা মেলার প্রাথমিক শক্তি, কিন্তু শুধু আকল দিয়ে পরম সত্যকে ছোঁয়া যায় না। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক অখণ্ডতার একটি বিস্ময়কর উদাহরণ হলো, পবিত্র কুরআনের সুরা কাহাফে বর্ণিত হযরত মুসা (আ.) ও খাযির (আ.)-এর সাক্ষাতের ঘটনা। একজন নবী, যিনি সরাসরি আল্লাহর প্রতিনিধি এবং শরীয়তের বাহ্যিক ও যৌক্তিক জ্ঞানের অধিকারী, তিনি 'ইলমে লাদুন্নি' বা বিশেষ ঐশী ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের গভীরতা বোঝার জন্য খাযির আ.-এর সন্ধানে যাত্রা করেন। তিনটি ঘটনার মাধ্যমে তিনি দেখতে পান, বাহ্যিক বিজ্ঞান বা যৌক্তিক দৃষ্টিতে যা খারাপ বা ক্ষতিকর মনে হয়, তার ভেতরে গভীর মহাজাগতিক কল্যাণ ও ঐশী পরিকল্পনা লুকিয়ে থাকে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, কেবল জাগতিক আকল বা বাহ্যিক বিজ্ঞানচর্চার একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে।


    মানুষ যখন ইকবালের দর্শনের 'শাহীন' বা বাজপাখির মতো নিজের সত্তাকে চিনে ফেলে, তখন সে ওহী বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ডানায় ভর করে সেই বস্তুগত সীমার দেয়াল ভেঙে অসীমের সন্ধান পায়। অর্থাৎ, বিজ্ঞান মানুষকে মাটির পৃথিবী জয় করতে শেখায়, আর আধ্যাত্মিকতা বা ওহী সেই জয়ী মানুষকে খোদার ইচ্ছার সাথে একাত্ম করে দেয়।


    আল্লামা ইকবালের এই অখণ্ড জ্ঞানতত্ত্ব এবং খুদির মেথডলজি মুসলিম সমাজকে যুগপৎ শুষ্ক তাত্ত্বিক বাহাস এবং মরমি নিষ্ক্রিয়তার অন্ধকার কুয়াশা থেকে বের করে এনে, এক অভূতপূর্ব গতিশীলতার দিগন্ত উন্মোচন করে দেয় (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ৪৭-৪৮)। আকল এবং ইশকের এই পরম মিলবন্ধন এবং নিজের ভেতরের সুপ্ত খুদিকে চেনার মধ্য দিয়েই কেবল একটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বে আক্রান্ত জাতি তার আত্মিক শৃঙ্খল ভাঙার সাহস অর্জন করতে পারে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ.৪৮)। যখন এই আত্মিক জাগরণ ও মহাজাগতিক অখণ্ডতা অর্জিত হয়, তখন মানুষের তৈরি কৃত্রিম ভৌগোলিক সীমানা, বর্ণ ও জাতিগত অহংকার পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়। মানুষ তখন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের দেয়াল ভেঙে এক বৈশ্বিক মানবতার পতাকাতলে এসে দাঁড়ায়। ইকবালের দর্শনে বিশ্বমানবতার এই রূপটি তাঁর অমর রুবাই বা চতুষ্পদীতে অনন্যভাবে ফুটে উঠেছে,


    নাহ্ আফগানীম ওয়া নাহ্ তুর্ক ওয়া তাতারীম,

    চামান জাদীম ওয়া আয্ এক শাখ্সারীম।

    তামীজে রাঙ্গ ও বু বার মা হারামাস্ত্,

    কে মা পারওয়ার্দাহে এক নও-বাহারীম।


    আমরা আফগান নই, তুর্কি নই, তাতারও নই;

    আমরা এক বাগানের সন্তান এবং একই বৃক্ষশাখার অংশ।

    রঙ ও সুবাসের বৈষম্য করা আমাদের জন্য হারাম;

    কারণ আমরা সবাই একই বসন্তের আবহাওয়ায় প্রতিপালিত হয়েছি। (কাব্যগ্রন্থ: পয়য়ামে মাশরিক, ১৯২৩)।

    অর্থাৎ, বিজ্ঞান মানুষকে মাটির পৃথিবী জয় করতে শেখায়, আধ্যাত্মিকতা বা ওহী সেই জয়ী মানুষকে স্রষ্টার ইচ্ছার সাথে একাত্ম করে দেয়, এবং এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা 'পূর্ণাঙ্গ মানুষ' বা 'মুমিন' সমগ্র পৃথিবীকে ভালোবাসার এক অভিন্ন বাগানে পরিণত করে।


    জ্ঞান যখন কেবল কিতাবি পাণ্ডিত্য অর্জনের অলঙ্কার না হয়ে নিজের ভেতরের আত্মসত্তাকে জাগিয়ে তোলার এবং আল্লাহর খলিফা হিসেবে এই বাস্তব পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত নতুন করে বিনির্মাণ করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই কেবল একটি প্রকৃত, টেকসই এবং সভ্যতাগত বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ সম্ভবপর হয়। যা ইকবালের চিন্তার মূল কেন্দ্রে প্রবহমান।


    ইজতিহাদের গতিশীলতা—আইনি অচলাবস্থার দার্শনিক ব্যবচ্ছেদ এবং ইসলামের গতিশীল মেজাজ


    আল্লামা ইকবাল তাঁর দার্শনিক ইমারতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ইসলামের আইনি ও সামাজিক কাঠামোর পুনর্গঠনকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Reconstruction of Religious Thought in Islam-এর ষষ্ঠ বক্তৃতা ‘The Principle of Movement in the Structure of Islam’ (ইসলামী ব্যবস্থায় গতিশীলতার নীতি)-এ তিনি উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার অন্যতম মূল কারণ হিসেবে ‘অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তা’ বা ইজতিহাদ-বিমুখতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 118-120)।


    এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, ইসলামে সাধারণ মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম বা মাযহাবের আইনি অনুসরণ (তাকলিদ)—যা শরিয়তের একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি—ইকবাল এর যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেননি। বরং তাঁর মূল আপত্তি ছিল উলামা ও বুদ্ধিজীবী মহলের চরম স্থবিরতা, মানসিক দাসত্ব এবং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন সমস্যার সমাধানে ‘ইজতিহাদ’ বা স্বাধীন গবেষণার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে বসে থাকার প্রবণতার বিরুদ্ধে। তিনি মনে করতেন, ইসলামের মৌলিক ও শাশ্বত মূলনীতিগুলো অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে এর আইনি ব্যবস্থার গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। ইকবাল অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি দেন, ইসলাম তার আদি সত্তায় কোনো স্থবির, অপরিবর্তনীয় বা নিস্প্রাণ সামাজিক আইনতন্ত্র নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন চলিষ্ণু ও বিকাশমান জীবনব্যবস্থা। (প্রাগুক্ত)।


    ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম সমাজ যখন থেকে ‘ইজতিহাদের দরজা বন্ধ’ হওয়ার কাল্পনিক তত্ত্বটি মেনে নিয়েছে, তখন থেকেই ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক পতন শুরু হয়েছে। ইকবাল এই আইনি জড়াগ্রস্ততাকে একটি গভীর সভ্যতাগত মনস্তাত্ত্বিক রোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 122-125)। তিনি দেখিয়েছেন, অতীতে মুসলিম আইনবিদগণ সমকালীন বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে যে ফিকহী সমাধানগুলো তৈরি করেছিলেন, সেগুলোকে চিরন্তন এবং অলঙ্ঘনীয় ঐশ্বরিক আইন মনে করাটাই ছিল পরবর্তী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় মেথডলজিক্যাল ভুল। এই ভুলের কারণে জীবিত সমাজটি অতীতের এক মৃত আইনি কাঠামোর শেকলে বন্দী হয়ে পড়ে।


    ইকবাল জোর দিয়ে বলেন, ইসলামের মূল আইনগত স্পিরিট হলো ধ্রুবক ও চলকের (permanence and change-এর) এক অনন্য কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 135-140)। কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নির্দেশনসমূহ শাশ্বত এবং অপরিবর্তনীয় ঠিকই, কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগ এবং শাখা-প্রশাখার আইনি ব্যাখ্যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত মানব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৪৫-১৪৬)। যখন কোনো সমাজ এই পরিবর্তনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে অতীতের আইনি কাঠামোকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে, তখন সেই সমাজ সময়ের রেস থেকে ছিটকে পড়তে বাধ্য।


    "তিনি মুসলিম আইনবিদদের এই চরম রক্ষণশীলতাকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ভীরুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 129-130)। ইকবাল তাঁর দার্শনিক কাব্যেও প্রথাবদ্ধ ও স্থবিরতাপন্থী আলেমদের এই সংকীর্ণ মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত উর্দু কাব্যগ্রন্থ ‘জরবে কালিম’-এর অন্তর্গত ‘মুল্লা অউর খানকাহ’ বা 'মোল্লা ও খানকাহ' পর্বের ২ নম্বর কাব্যে বলেন,


    দ্বীনে কাফির ফিকর ও তদবীর ও জিহাদ,

    দ্বীনে মোল্লা ফী সাবীলিল্লাহ ফাসাদ।


    অমুসলিম বা কাফেরদের ধর্ম হলো গভীর চিন্তা, সঠিক পরিকল্পনা এবং ক্রমাগত জীবনসংগ্রাম। আর মোল্লাদের স্বরচিত ধর্ম হলো আল্লাহর রাস্তায় কেবলই দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।


    এই দুই পঙক্তিতে আল্লামা ইকবাল প্রথাবদ্ধ চরম স্থবিরতার বিরুদ্ধে তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাত করেছেন। তিনি একটি বিপরীত চিত্র তুলে ধরে বুঝিয়েছেন, বর্তমান যুগে অমুসলিমরা যেখানে গভীর চিন্তা (ফিকর), বাস্তবমুখী জীবন-পরিকল্পনা (তদবীর) এবং ক্রমাগত জীবনসংগ্রামের (জিহাদ) মাধ্যমে নিজেদের সমাজকে গতিশীল রাখছে, সেখানে একশ্রেণীর রক্ষণশীল আলেম ইসলামের গতিশীল রূপটিকে আড়াল করে ফেলেছেন। তাদের তৈরি করা সংকীর্ণ ও অনমনীয় ধর্মব্যাখ্যা উম্মাহর মধ্যে কোনো গঠনমূলক পরিবর্তন আনার বদলে কেবলই অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা (ফাসাদ) তৈরি করছে।


    পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা থেকে প্রত্যেক সমাজে, প্রত্যেক যুগে, ইতিহাসের প্রত্যেকটি বাঁকে এমন জড়তাগ্রস্ত, অন্ধ উলামা সমাজের প্রাধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে কী? তিনি বলেন, 


    মুল্লা কা রওশন জমীর তাযা নিয়ায,

    খানকাহ কা নামদার বে-সূয ও সায।


    মোল্লাদের প্রদীপ্ত বিবেক কেবলই নিত্যনতুন চাটুকারিতা বা আনুষ্ঠানিকতায় মগ্ন, আর নামকরা খানকাহগুলো আজ ভিতরের আসল প্রাণশক্তি ও ঐশী তাড়নাহীন।


    কবিতার শেষ দুই পঙক্তিতে তিনি উম্মাহর এই বুদ্ধিবৃত্তিক জড়তার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়কেও উন্মোচিত করেছেন। তিনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলছেন, এমন সমাজের রক্ষণশীল আলেমদের নিজস্ব চিন্তা যেমন নতুন কোনো সত্যকে গ্রহণ করতে পারে না, তেমনি বড় বড় আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা নামকরা খানকাহগুলোও আজ তাদের আসল প্রাণশক্তি, আন্তরিকতা এবং ভেতরের গতিময় তাড়না (সূজ ও সায) সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। ফলে সামগ্রিকভাবে মুসলিম সমাজ কোনো নতুন ইমারত গড়ে তোলার বদলে কেবলই অন্ধ অনুকরণের এক অন্ধকার চক্রে বন্দি হয়ে পড়ে।


    তিনি মুসলিম আইনবিদদের এই চরম রক্ষণশীলতাকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ভীরুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 129-130)। ইকবালের মতে, এই স্থবিরতার বিরুদ্ধে ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহি.। বাগদাদ ধ্বংসের পাঁচ বছর পরে, ১২৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইসলামের আইনি স্থবিরতার বিরুদ্ধে কঠোর লেখনী ধারণ করেন। তিনি হাম্বলী মাযহাবের ঐতিহ্য ত্যাগ করে স্বাধীন ইজতিহাদের অধিকারী বলে দাবি জানান এবং মাযহাবসমূহের অপরিবর্তনীয়তার ধারণার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 132)। ইকবাল উল্লেখ করেছেন, ইবনে তাইমিয়া তাঁর সমসাময়িক যুগের প্রাচীন আইনবিদদের অনুসৃত ‘ইজমা’ (Consensus)-এর প্রথাবদ্ধ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন, গতিশীলতাহীন এমন অন্ধ সামাজিক বা আইনি ঐকমত্যই মূলত সমাজে সর্বপ্রকার কুসংস্কারের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 132)।


    অতীতের মহান ইমামগণ যেমন ইমাম আবু হানিফা বা ইমাম শাফেয়ী কখনো দাবি করেননি, তাঁদের দেওয়া সমাধানগুলো কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত নতুন সমস্যার জন্য একক ফয়সালা। তাঁরা নিজস্ব যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইজতিহাদ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী যুগের আলেমরা ইজতিহাদের সেই সৃজনশীল প্রক্রিয়াটিকে বাদ দিয়ে কেবল তাঁদের তৈরি করা সিদ্ধান্তের নিখুঁত 'নকলনবিশ' বা অনুকরণকারীতে পরিণত হয়েছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 145-146)।


    ইকবাল এই তাকলিদের সংস্কৃতিকে ইসলামের মূল তাওহীদী দর্শনের পরিপন্থী মনে করতেন। কারণ তাওহীদ মানুষকে কেবল এক আল্লাহর দাসত্ব করতে শেখায়, যা মানুষের মনকে সমস্ত মানুষের তৈরি চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 147)। কিন্তু অন্ধ অনুকরণ মানুষের চিন্তার সেই স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাকে পূর্বসূরিদের মেধার দাসে পরিণত করে। এই মনস্তাত্ত্বিক শেকল না ভাঙলে মুসলিম উম্মাহর পক্ষে কোনো নতুন জ্ঞান বা আইনি ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়া অসম্ভব (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 148-149)।


    সময়ের সৃজনশীল প্রবাহ এবং মহাজাগতিক পরিবর্তনের কুরআনিক দর্শন


    ইসলামের আইনি গতিশীলতাকে কেবল একটি প্রয়োজন হিসেবে না দেখে ইকবাল একে একটি মহাজাগতিক ও দার্শনিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 122-125)। তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রহমানের সেই বিখ্যাত আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেন, যেখানে বলা হয়েছে—আল্লাহ প্রতিনিয়ত নতুন কোনো মহিমান্বিত সৃষ্টিশীল কাজে রত আছেন। ইকবালের মতে, এই মহাবিশ্ব কোনো স্থির বা সমাপ্ত হয়ে যাওয়া বস্তু নয়, এটি একটি অবিরত বিকাশমান এবং ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া (an ongoing creative process) (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ২৩-২৪)।


    এই মহাজাগতিক দর্শনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইকবালের আইনতত্ত্বের মূল কথা হলো, মানুষের সামাজিক জীবনও স্থির থাকতে পারে না (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 126-127)। ইতিহাস প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিস্থিতি, জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ এবং অভূতপূর্ব সামাজিক সংকটের জন্ম দেয়। আইন যদি এই চলমান পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারে, তবে তা এক সময় মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং সমাজের স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 131-132)।


    এই বুদ্ধিবৃত্তিক ভীরুতা এবং আইনি জড়তা থেকে মুসলিম উম্মাহকে মুক্ত করার জন্য আল্লামা ইকবাল ইসলামের একটি অত্যন্ত মৌলিক অথচ বিস্মৃতপ্রায় দার্শনিক ভিত্তি উন্মোচন করেছেন, যা মূলত ইসলামের 'সময়তত্ত্ব' বা কালের দর্শনের সাথে জড়িত। ইকবাল এখানে ফরাসি দার্শনিক অঁরি বার্গসঁ-র একটি যুগান্তকারী তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে ইসলামের কাল বা সময়ের ধারণার একটি গভীর তুলনামূলক সংশ্লেষ হাজির করেছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 52-54)। বার্গসঁ তাঁর দর্শনে প্রমাণ করেছিলেন যে, মানুষ সাধারণত সময়কে যেভাবে বোঝে, তা প্রকৃত সময় নয়। সাধারণ মানুষ বা ধ্রুপদী বিজ্ঞান সময়কে মাপে সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা কিংবা দিন ও বছরের যান্ত্রিক স্কেলে। একে বলা হয় ‘সিরিয়াল টাইম’ (Serial Time) বা ধারাবাহিক সময়। এই ধারাবাহিক সময় হলো মূলত একটি স্পেস বা স্থানের মতো, যেখানে সময়কে টুকরো টুকরো করে খণ্ডিত করা যায়। কিন্তু বার্গসঁ এবং আল্লামা ইকবালের মতে, প্রকৃত সময় কোনো যান্ত্রিক স্কেলে খণ্ডিত করার বিষয় নয়। বরং সময় হলো একটি জীবন্ত, অবিভাজ্য এবং ক্রমাগত সৃষ্টিশীল মহাপ্ৰবাহ। যাকে বার্গসঁ ‘পিউর ডিউরেশন’ (Pure Duration) বা বিশুদ্ধ সময়-প্রবাহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই বিশুদ্ধ সময় হলো একটি গভীর নদীর মতো, যা প্রতি মুহূর্তে নিজেকে নতুন করে সৃষ্টি করে এবং এর কোনো একটি বিন্দুকে অন্য বিন্দু থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।


    আল্লামা ইকবাল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেখিয়েছেন, আধুনিক দর্শনের এই ‘পিউর ডিউরেশন’-এর ধারণার চেয়েও গভীর ও আধ্যাত্মিক একটি সময়ের দর্শন ইসলামের মূল উৎসের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। তিনি আল-কুরআনের গভীর অধ্যয়ন এবং ইসলামের একটি বিখ্যাত হাদিসে কুদসির ওপর ভিত্তি করে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উম্মাহকে সতর্ক করে বলেছেন, "তোমরা সময় বা কালকে গালি দিও না, কারণ আল্লাহ নিজেই সময়" (লা তাসুব্বুদ দাহরা, ফা ইন্নাল্লাহা হুয়াদ দাহর। সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৪৬; সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৪৮২৬)। এই হাদিসে কুদসির গভীরতম দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করে ইকবাল প্রমাণ করেছেন, সময় কোনো জড় বা সৃষ্টিগত বস্তু নয়, বরং সময় হলো স্বয়ং আল্লাহর একটি অতিপ্রাকৃতিক সিফাত বা জীবন্ত গুণ। যেহেতু পরম সত্ত্বা আল্লাহ চিরঞ্জীব এবং গতিময়, তাই তাঁর এই কালগত সিফাত বা সময়ও চরমভাবে গতিশীল এবং নিত্যনতুন সৃষ্টির জন্মদাতা। কুরআনুল কারিমেও আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি দিন বা মুহূর্ত আল্লাহর এক একটি নতুন মহিমান্বিত প্রকাশ বা রূপ (কুল্লা ইয়াওমিন হুয়া ফী শা'ন)। এর অর্থ হলো, এই সৃষ্টিজগৎ কোনো সমাপ্ত বা স্থির কোনো ভাস্কর্য নয়; বরং এটি একটি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রসারিত হতে থাকা জীবন্ত সত্ত্বা (Growing Universe)। আল্লাহ প্রতি মুহূর্তে এই মহাবিশ্বে নতুন নতুন মাত্রা, নতুন নতুন সত্য এবং নতুন নতুন বাস্তবতার বিকাশ ঘটাচ্ছেন।


    যখন আমরা বুঝতে পারি, মহাবিশ্ব এবং মানবসমাজ সময়ের এই সৃজনশীল প্রবাহের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত সামনের দিকে বয়ে চলেছে, তখন ইসলামের ফিকরি মনস্তত্ব, আইনি কাঠামো বা ফিকহ শাস্ত্রের স্থবির হয়ে থাকার আর কোনো যৌক্তিকতা থাকে না। ইকবাল যুক্তি দেখান, মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা যদি সময়ের সিফাতের কারণে প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়, তবে কয়েক শতাব্দী আগের কোনো সামাজিক বা আইনি ফতোয়াকে কিংবা চিন্তাকে আজ হুবহু এবং অপরিবর্তনীয়ভাবে আধুনিক মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের মূল স্বভাবেরই পরিপন্থী। ইসলামের আইনি এবং ফিকরি (বুদ্ধিবৃত্তি) ব্যবস্থা যদি এই জীবন্ত সময়-প্রবাহের সাথে তাল মেলাতে না পারে, তবে তা তার কার্যকারিতা হারিয়ে একটি মৃত ও প্রাচীন ঐতিহ্যে পরিণত হবে। অতএব, বিশ্বজগতের এই জীবন্ত ও সৃজনশীল প্রগতির সাথে পা মিলিয়ে চলার জন্য ইসলামের আইনি এবং ফিকরি কাঠামোকে প্রতিনিয়ত একটি অভ্যন্তরীণ রূপান্তর এবং ক্রমাগত প্রগতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ইসলামের এই অভ্যন্তরীণ রূপান্তর, যুগোপযোগী সংস্কার এবং আইনি ব্যবস্থার সচলতা বজায় রাখার যে ঐশ্বরিক চাবি আল্লাহ উম্মাহকে দিয়েছেন, তার মূল নামই হলো ‘ইজতিহাদ’ (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 133)। ইজতিহাদ শরিয়তকে পরিবর্তনের কোনো হাতিয়ার নয়, বরং শরিয়তের শাশ্বত মূলনীতিগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখে সময়ের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন আইনি সমাধান খুঁজে বের করার এক অনন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। ইকবাল তাই ইজতিহাদকে ইসলামের কাঠামোর মধ্যে ‘গতিশীলতার নীতি’ (Principle of Movement) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা উম্মাহকে অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সময়ের স্রষ্টা আল্লাহর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শেখায়। চিন্তার ও বুদ্ধিবৃত্তির অপার সম্ভাবনার দুয়ার খোলে দেয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, জীবন ও দর্শনের অবারিত ঝর্ণা অব্যাহত রাখার জন্যই আল্লাহ তায়ালা ইজতেহাদের মোহনা বন্ধ করে দেননি। নতুবা মানবসভ্যতা বিকারগস্ত হয়ে যেতো। জ্ঞানের রাজ্য জরাগ্রস্ততায় ভোগে বিরানভূমিতে পরিণত হতো। অন্ধকার আর অন্ধত্বের কুসংস্কারে ছেঁয়ে যেতো সবুজ দুনিয়া।


    ফলত, যখন ইসলামের আইনি সত্তা তার এই চলিষ্ণু মেজাজ হারিয়ে ফেলে, তখন ধর্মের মূল বাণী মানুষের জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে। ইকবাল সমকালীন আলেমদের সমালোচনা করে বলেন, তাঁরা মনে করছেন আইনি ও ফিকরি কাঠামোকে অপরিবর্তিত রাখাই বুঝি ধর্মকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 135)। কিন্তু বাস্তবে এই স্থবিরতা ধর্মকে রক্ষা করছে না, বরং তা আধুনিক মানুষকে ধর্মের বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়ে ফেলছে। ফলে তরুণ প্রজন্ম বাধ্য হয়ে পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ আইনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 137)।


    ইকবালের ইজতিহাদ তত্ত্ব তাই কেবল কতিপয় আইনি বিধি সংশোধনের নাম নয়, এটি হলো মুসলিম মনন ও চিন্তাকে মহাজাগতিক পরিবর্তনের সাথে একাত্ম করার এক গভীর দার্শনিক মহড়া। তিনি চিন্তায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করতে চেয়েছেন। তিনি চাননি মুসলিমরা পাশ্চাত্যের আইনকে অন্ধভাবে ধার করুক, বরং তিনি চেয়েছিলেন ইসলামের নিজস্ব খনি থেকে ইজতিহাদের কোদাল দিয়ে নতুন যুগের উপযোগী আইনি মুক্তা উত্তোলন করা হোক। আর তা কেবলই ওহীর চিরন্তন আলোকে অক্ষুণ্ণ রেখে বুদ্ধির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।


    সমষ্টিগত ইজতিহাদ: আধুনিক গণতান্ত্রিক আইনসভার প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা


    আল্লামা ইকবালের আইন দর্শনের সবচেয়ে বৈপ্লবিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দিক হলো তাঁর ‘সমষ্টিগত ইজতিহাদ’ বা Collective Ijtihad-এর তত্ত্ব (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 135-140)। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, আধুনিক যুগের জটিলতা এত বেশি যে, অতীতের মতো কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে—তিনি যতই বড় আলেম বা মুজতাহিদ হোন না কেন—এককভাবে ইজতিহাদ করা এবং সমস্ত বিষয়ের সমাধান দেওয়া আর সম্ভব নয়। আধুনিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির মতো জটিল বিষয়ে সঠিক আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 140-141)।


    এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট দূর করার জন্য ইকবাল আধুনিক যুগের নির্বাচিত ‘গণতান্ত্রিক আইনসভা’ বা Legislative Assembly-কে ইসলামের ইজতিহাদের একমাত্র বৈধ কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। তিনি মনে করতেন, ইসলামের আদি যুগের ‘শূরা’ বা পরামর্শের যে রাজনৈতিক স্পিরিট ছিল, আধুনিক যুগে তার একমাত্র বাস্তব এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো এই নির্বাচিত পার্লামেন্ট (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 138-139)। আইনসভার সদস্যদের সমষ্টিগত রায় বা ইজমার মাধ্যমেই আধুনিক রাষ্ট্রে ইসলামের আইনি পুনর্গঠন হতে হবে।


    ইকবাল এই আধুনিক আইনসভার ভেতরের একটি বড় শূন্যতা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি জানতেন যে, আধুনিক পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্যই—যারা সাধারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন—তাদের পক্ষে শরিয়তের গভীর নীতি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং জটিল ফিকহি মেথডলজি (আইনশাস্ত্রের পদ্ধতি) সম্পর্কে পূর্ণ বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রাখা সম্ভব নয়। তবে এই বাস্তবসম্মত ত্রুটি বা শূন্যতার সমাধানে তিনি কোনো থিওক্র্যাটিক (ধর্মতান্ত্রিক) বা মোল্লাতান্ত্রিক সর্বোচ্চ পরিষদ কিংবা আলেমদের এমন কোনো সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব করেননি, যা জনগণের নির্বাচিত পার্লামেন্টের ওপর কোনো ‘ভেটো’ দিতে পারে কিংবা সংসদকে অকার্যকর করে দিতে পারে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 143)। কারণ ইকবাল মনে করতেন, ইসলামে কোনো যাজকতন্ত্র বা চার্চ ব্যবস্থার স্থান নেই। 


    তিনি বরং এক অনন্য ও প্রগতিশীল পদ্ধতির কথা বলেছেন। যেখানে আধুনিক আইনসভার ভেতরেই শরিয়ত বিশেষজ্ঞ এবং সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন প্রায়োগিক বিষয়ের অগ্রগণ্য ব্যক্তিবর্গের (যেমন অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, বিজ্ঞানী ও আইনবিদদের) সমন্বয়ে এক একটি অখণ্ড সাব-কমিটি বা বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা প্যানেল গঠিত হবে। এই সাব-কমিটিগুলোর মূল কাজ হবে পার্লামেন্টের সাধারণ সদস্যদের নতুন নতুন আইনের খসড়া বা বিল তৈরিতে সাহায্য করা এবং সেগুলোকে ইসলামের মূল স্পিরিটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা দেওয়া (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 144)।


    এখানেই লুকিয়ে আছে আল্লামা ইকবালের আইনি দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক রহস্য। ইকবাল পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ইজমার (আইনি ঐকমত্যের) চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট আলেম গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না। ধ্রুপদী যুগে মুসলিম সমাজগুলো দ্বীনকে নিজেদের মতানুসারে গড়ার দ্বন্দ্বে বিভক্ত না থাকায় আলেমদের ব্যক্তিগত মতামতের মাধ্যমে ইজমা সম্ভব হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে নানামুখী উপদল, ফেরকা ও চিন্তার জন্ম হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে আলেমদের একক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অসম্ভব। তাই বর্তমান যুগে ‘ইজমা’ কেবল তখনই সম্ভব, যখন ইজতিহাদ বা স্বাধীন আইনি গবেষণার এই ক্ষমতাটি আলেমদের একক ক্ষেত্র থেকে স্থানান্তরিত করে একটি নির্বাচিত ‘মুসলিম আইনসভা’র (Legislative Assembly) হাতে ন্যস্ত করা হবে।


    ইকবালের মূল লক্ষ্য ছিল, আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার থাকবে একমাত্র জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সার্বভৌম পার্লামেন্টের হাতে। এই জনপ্রতিনিধিরা আইনসভার ভিতরে থাকা বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও ফিকহি মেথডলজিকে ‘কাঁচামাল’ বা ইনপুট হিসেবে কাজে লাগিয়ে নতুন আইন পাস করবেন। এভাবে আল্লামা ইকবাল একদিকে যেমন ইজতিহাদের দরজা উন্মুক্ত করে ইসলামের গতিশীল রূপ ফিরিয়ে এনেছেন, অন্যদিকে তেমনি একটি মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আধুনিক আইনসভাকে পাদ্রীতন্ত্র টাইপ মোল্লাতন্ত্রের আধিপত্য ও ফিকহি স্থবিরতার উভয় সংকট থেকে মুক্ত করার এক চিরসবুজ ঐতিহাসিক রূপরেখা অঙ্কন করেছেন।


    সমষ্টিগত ইজতিহাদের এই তত্ত্বের একটি আধুনিক প্রয়োগ দেখা যায় তুরস্কের জাতীয় মহাসভায়। ইকবালের মতে, তুরস্কের মুসলিম আইনবিদরা ইজতিহাদের মাধ্যমেই খিলাফতকে একটি সংসদের হাতে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৩৩)। তিনি বলেন, “সাধারণতন্ত্রী শাসন ব্যবস্থা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, শুধু তা-ই নয়, অধিকন্তু আজকের মুসলিম জগতের উদ্ভূত নব নব সমস্যা নিয়ন্ত্রণক্ষেত্রে এই শাসন ব্যবস্থাই একান্তভাবে প্রয়োজনীয়” (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 136)।


    ইকবালের এই 'কালেক্টিভ ইজতিহাদ' তত্ত্ব মুসলিম বিশ্বের প্রচলিত ধর্মীয় রাজনীতির কাঠামোকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয়। এটি একদিকে যেমন রাজতন্ত্র বা একনায়কত্বকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলামের অন্তর্নিহিত মজলিসে শূরার মেজাজকে পুনরুজ্জীবিত করে, অন্যদিকে তেমনি আলেম ও আধুনিক শিক্ষিত সমাজের মধ্যকার শত বছরের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করার এবং একে ওপরের কাছাকাছি আসার এক বাস্তব সেতু তৈরি করে। ইলম তথা জ্ঞান এবং ক্ষমতার এই অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক মিলবন্ধনই কেবল একটি আধুনিক ও গতিশীল ইনসাফের রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে পারে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 146)।


    উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব এবং অনুকরণপ্রিয়তার শৃঙ্খল মুক্তি


    ইকবালের ইজতিহাদ দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মুসলিম উম্মাহর হারানো intellectual sovereignty বা বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করা (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 148-149)। তিনি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, আধুনিক মুসলিম সমাজ যখনই কোনো নতুন সংকটের মুখোমুখি হয়, তখনই তারা হয় অতীতের কিতাবের পাতা উল্টে হুবহু সেই প্রাচীন সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে, নয়তো সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে পাশ্চাত্যের তৈরি করা কোনো রেডিমেড থিওরি বা আইন নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 147)।


    ইকবাল প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয়টিকে অর্থাৎ, পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণকে আরও বেশি বিপজ্জনক মনে করেন। কারণ পাশ্চাত্যের আইন ও সামাজিক থিওরিগুলো বিকশিত হয়েছে তাদের নিজস্ব ইতিহাস, চার্চের সাথে দ্বন্দ্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদের প্রেক্ষাপটে। যার সাথে সহজাত প্রকৃতির ধর্ম ইসলামের বাস্তববাদের কোনো সম্পর্ক নেই (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 148)। সেই আইনকে যদি কোনো মুসলিম সমাজ নিজের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিচার না করে হুবহু ধার করে, তবে তা সেই সমাজের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। ইকবাল একে বলতেন ‘অন্যের চোখে বিশ্বকে দেখার আত্মঘাতী রোগ’ (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 149)।


    ইজতিহাদের কাজ হলো উম্মাহকে এই দ্বিবিধ দাসত্ব থেকে মুক্ত করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস জোগানো। যখন একটি জাতি নিজের ওহীর মূল স্পিরিটকে ধারণ করে নিজের বুদ্ধির জোরে নিজের সমস্যার সমাধান নিজে তৈরি করে, তখনই কেবল তার বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 151)। ইকবালের মতে, আধুনিক ইউরোপীয় বিজ্ঞানের অনেক ভালো দিক রয়েছে যা মুসলিমদের শেখা উচিত, কিন্তু সেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে ইসলামের নিজস্ব তাত্ত্বিক ও নৈতিক কাঠামোর অধীনে, পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ জীবনদর্শনসহ নয়।


    আল্লামা ইকবাল পরাধীন ভারতবর্ষের মুসলিম উম্মাহর পতনকে কেবল একটি রাজনৈতিক ধস হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখছেন একটি গভীর রূহানি ও বৌদ্ধিক সংকট হিসেবে। তাঁর মতে, অতীত ঐতিহ্যকে কেবল একটি জাদুঘর বা কান্নার বস্তু বানিয়ে রাখা উম্মাহর জন্য আত্মঘাতী। তিনি উম্মাহর তরুণ সমাজকে আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা অতীতকে জড় স্থবিরতায় বন্দি না রেখে, তাকে ভবিষ্যতের নতুন ইমারত গড়ার এক একটি শক্তিশালী পাথর হিসেবে ব্যবহার করে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 154)। এই বৈপ্লবিক রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার হলো 'ইজতিহাদ' বা স্বাধীন চিন্তার পুনরুজ্জীবন। ইজতিহাদ হলো সেই গতিশীল চালিকাশক্তি, যা অতীতের মৌলিক শিক্ষাকে ভবিষ্যতের নিত্যনতুন বাস্তবতার সাথে যুক্ত করে উম্মাহর চলিষ্ণু সত্তাকে চিরকাল সচল রাখে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৪৫)।


    এই বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতায় ইকবাল আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শন এবং রাজনীতি থেকে ধর্মের বিচ্ছেদের তীব্র সমালোচনায় অবতীর্ণ হোন। তাঁর মতে, নৈতিকতাহীন রাজনীতি হলো মানবতার জন্য এক চরম অভিশাপ। এই গভীর সত্যটি তিনি তাঁর বিখ্যাত উর্দু কাব্যগ্রন্থ 'বালে জিবরিল'-এর দ্বিতীয় অংশের ৬১ নম্বর গজলে ফুটিয়ে তুলেছেন। ইকবাল বলেন,

    "যামিস্তানী হাওয়া মেঁ গরচে থী শমশীর কী তেজী,

    না ছুটে মুঝ সে লন্ডন মেঁ ভী আদাবে সাহরে-খেযী।"


    শীতের বাতাসে যদিও ছিল তলোয়ারের মতো তীব্রতা,

    তা সত্ত্বেও লন্ডনে আমার ভোরবেলা জাগার ও ইবাদতের অভ্যাসটি ছুটে যায়নি।


    এই প্রথম দুই লাইনে ইকবাল তাঁর ইউরোপ প্রবাসের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, পশ্চিমা সভ্যতার চরম বস্তুবাদী ও কনকনে ঠাণ্ডা পরিবেশেও তিনি তাঁর আত্মিক চেতনা ও ইসলামের মৌলিক অনুশাসন (তাহাজ্জুদ কিংবা ফজরের নামাজ) থেকে বিচ্যুত হোননি। এটি মূলত প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের 'খুদি' বা আত্মিক সত্তাকে টিকিয়ে রাখার এক চমৎকার ব্যক্তিগত উদাহরণ।


    "কহীঁ সরমায়ায়ে মেহফিল থী মেরী গরম-গুফতারী,

    কহীঁ সব কো পরেশাঁ কর গায়ী মেরী কম-আমিযী।"


    কোথাও আমার তেজোদীপ্ত বাগ্মিতা ছিল সভার প্রধান আকর্ষণ,

    আবার কোথাও আমার এই একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা সবাইকে ব্যাকুল করে তুলত।


    এখানে ইকবাল তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। একদিকে তিনি যখন মঞ্চে বক্তৃতা দিতেন, তাঁর সংগ্রামী বাণী ও দর্শন মানুষকে আলোড়িত করত। অন্যদিকে, সমকালীন মানুষের ভেতর নৈতিক মূল্যবোধের অভাব দেখে তিনি এক ধরণের একাকীত্ব বা আত্মমগ্নতায় ভুগতেন। তিনি বুঝিয়েছেন, সত্যিকারের চিন্তাবিদগণ স্থূল প্রচারের চেয়ে অন্তরের গভীর উপলব্ধিকে বেশি প্রাধান্য দেন।


    "যিমামে কার আগার মজদুর কে হাথোঁ মেঁ হো ফির কিয়া!

    ত্বরীকে কোহকান মেঁ ভী ওহী হীলে হেঁ পারওয়িযী।"


    কর্মের লাগাম যদি মজদুরের হাতে চলেও যায়, তবে কী লাভ!

    যদি পর্বত খননকারীর (ফরহাদের) নীতিতেও সেই একই 'পারভেজী'র (খসরুর) কূটকৌশল ও শোষণ থেকে যায়।


    এই দুই লাইনে ইকবাল পুঁজিবাদের বিপরীতে কেবল বাহ্যিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অসারতা তুলে ধরেছেন। ফারসি সাহিত্যের বিখ্যাত চরিত্র ফরহাদ (যে পাহাড় কেটে পথ তৈরি করেছিল অর্থাৎ শ্রমিক) এবং পারভেজ (অত্যাচারী রাজা বা পুঁজিপতি)-এর রূপক ব্যবহার করে তিনি বুঝিয়েছেন, ক্ষমতার হাতবদল হয়ে যদি রাষ্ট্রক্ষমতা মজদুর বা সর্বহারার হাতেও আসে, কিন্তু মানুষের ভেতরের নৈতিক মানসিকতা পরিবর্তন না হয়—তবে সেই মজদুরও একদিন পুঁজিপতির মতো শোষক হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, কেবল অর্থনৈতিক বা কাঠামোগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, মানুষের আত্মিক ও রূহানি পরিশুদ্ধিই আসল।


    রাজনীতি থেকে ধর্মের বিচ্ছেদের পরিণতি নিয়ে তারপর বলেন,


    "জালালে পাদশাহী হো কেহ জমহুরী তামাশা হো,

    জুদা হো দ্বীন সিয়াসাত সে তো রাহ জাতী হ্যায় চেঙ্গিজী।"


    রাজকীয় রাজতন্ত্রের দাপটই হোক কিংবা পশ্চিমা গণতন্ত্রের তামাশা; রাজনীতি থেকে যদি 'দ্বীন' (ধর্ম ও নৈতিকতা) বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে সেখানে কেবল 'চেঙ্গিজী' (বর্বরতা) ও নিষ্ঠুরতাই অবশিষ্ট থাকে।


    এই শ্লোকটি ইকবালের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি। প্রাচ্যের কবি এখানে স্পষ্ট করেছেন, শাসনব্যবস্থার বাইরের রূপটি কেমন, তা বড় বিষয় নয়। এটা কোনো একনায়কতান্ত্রিক রাজতন্ত্র (পাদশাহী) হতে পারে, কিংবা আধুনিক পশ্চিমা বহুদলীয় গণতন্ত্র (জমহুরী তামাশা) হতে পারে। শাসনকাঠামো যা-ই হোক না কেন, তার ভেতর থেকে যদি ঐশী ও মানবিক নৈতিকতার (দ্বীন-ধর্মের) বিলুপ্তি ঘটে, তবে সেই রাষ্ট্রযন্ত্র অবধারিতভাবে সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়নের স্টিমরোলার বা চেঙ্গিস খানের মতো বর্বরতায় রূপ নেয়।


    তারপর বর্তমান সভ্যতার পতন ও ঐতিহাসিক শিক্ষা উচ্চারণ করেন,


    "সওয়াদে রোমাতুল কুবরা মেঁ দিল্লী ইয়াদ আতি হ্যায়,

    ওহী ইবরত, ওহী আজমত, ওহী শানে দিল আভেজী।"


    মহিমান্বিত রোম নগরীর বিশাল ধ্বংসাবশেষের বুকে দাঁড়িয়ে আমার (পরাধীন) দিল্লির কথা মনে পড়ে;

    সেই একই ঐতিহাসিক শিক্ষা, সেই একই হারিয়ে যাওয়া মহিমা, আর সেই একই চিত্তাকর্ষক রূপের বিষণ্ণতা।


    শেষ দুই লাইনে ইকবাল ইতিহাসের এক অমোঘ নিয়তি ও শিক্ষা (ইবরাত) তুলে ধরেছেন। রোম সাম্রাজ্য একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু নৈতিক অবক্ষয় এবং বস্তুবাদের চরম লালসায় তা ধ্বংস হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে। একইভাবে মুসলিমদের দিল্লির গৌরবও আজ বিলুপ্ত। ইকবাল সমকালীন বিশ্বকে সতর্ক করছেন, আজকের আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতাও যদি তাদের বস্তুবাদী অহংকারে অন্ধ হয়ে নৈতিকতাহীন 'জমহুরী তামাশা' বা ছদ্মবেশী সাম্রাজ্যবাদ চালিয়ে যায়, তবে রোম ও দিল্লির মতোই তাদের পতনও অনিবার্য।


    একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আল্লামা ইকবালের এই শতাব্দীপ্রাচীন অবলোকন এক নির্মম সত্য হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আজকের তথাকথিত উন্নত ও আধুনিক বিশ্ব যে 'জমহুরী তামাশা' বা কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তা প্রায়শই নৈতিক শূন্যতার শিকার। যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বড় বড় রাষ্ট্র এবং বিশ্ব সংস্থাগুলো মানবাধিকারের ফাঁকা বুলি আউড়িয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক লাভ ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে নিরীহ দেশগুলোর ওপর যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও ঔপনিবেশিক কূটকৌশল চাপিয়ে দেয়, তখন ইকবালের সেই 'ধর্মহীন রাজনীতিই চেঙ্গিজী'—বাণীটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়।


    ইকবাল যেখানে ইসলামের মৌলিক তাওহিদ তত্ত্ব ও সামগ্রিক জীবনদর্শন থেকে নৈতিকতার উৎস সন্ধান করেছেন, তা কোনো সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। তা ছিল দেশ, কাল ও বর্ণের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন মানবতাবোধের এক পরম ইশতেহার। যা শাসককে করে তোলে আমজনতার প্রতি দায়বদ্ধ এবং মজলুমের প্রতি সহানুভূতিশীল। পুঁজিবাদ ও নব্য-সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট আজকের অশান্ত বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে, কেবল political বা কাঠামোগত ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; বরং রাজনীতি ও সমাজনীতিকে পুনরায় রূহানি মূল্যবোধ ও ঐশী নৈতিকতার ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো অপরিহার্য—এটাই ইকবালের কবিতার সমকালীন ডাক। মুসলিম উম্মাহ যখন এই জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব লাভ করবে, তখন তাঁরা আর ইতিহাসের নিষ্ক্রিয় বস্তু বা দর্শক থাকবে না। আবার ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি ও বিশ্বসভ্যতার পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হবে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 155)।


    বাইতুল হিকমা’র উত্তরাধিকার ও নতুন বৈশ্বিক ভিশন: ইতিহাস-দর্শনে নস্টালজিয়া বনাম ভবিষ্যতের চালিকাশক্তি


    সভ্যতাগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল ইতিহাসের পাঠকে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও গতিশীল দার্শনিক ভিত্তি দান করেছেন। তাঁর মতে, কোনো জাতির জন্য তার অতীত ঐতিহ্য কেবল রোমান্টিক নস্টালজিয়া বা কান্নার বস্তু হতে পারে না; বরং ইতিহাস হলো একটি অবিরত প্রবহমান ধারা, যার মূল কাজ বর্তমানকে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের ক্যানভাস বিনির্মাণ করা (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 122-125)। আল্লামা ইকবাল তাঁর "জাভিদ নামা (১৯৩২)" কাব্যগ্রন্থে মুসলিম সমাজের অতীত-বিলাসিতা, সৃজনশীলতা হারানোর মনস্তাত্ত্বিক সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেছেন।


    তিনি তাঁর বিখ্যাত ফারসি কাব্যগ্রন্থ জাভিদ নামাতে দেখিয়েছেন, মুসলিম সমাজ যখন তার সৃজনশীল ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন সে অতীতকে একটি পবিত্র যাদুঘর বানিয়ে তার ভেতরে আত্মতৃপ্তি খোঁজে।


    জাভিদ নামা'র বুধ গ্রহের অধ্যায়ে (Falak-e-Utarid বা বুধ গ্রহের আকাশ-এ) ইকবাল প্রাচ্যের মহান নেতা জামালউদ্দিন আফগানি এবং উসমানীয় সংস্কারক সাইদ হালিম পাশার মুখোমুখি হন। সেখানে তাঁরা প্রাচ্য ও মুসলিম সমাজের পতন নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। আফগানি ও হালিম পাশার জবানিতে ইকবাল দেখান, মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা অন্ধ অনুকরণে ব্যস্ত অথবা নিজেদের অতীত গৌরব নিয়ে নিষ্ক্রিয় বসে আছে। তারা ধর্মের গতিশীল রূপ (যেমন, ইজতিহাদ বা সৃজনশীল চিন্তাভাবনা) হারিয়ে কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে আঁকড়ে ধরেছে, যা সমাজকে জড় বা মৃত বস্তুর মতো স্থবির করে দেয়।


    ইকবাল সেখানে মুসলিম উম্মাহর এই অন্ধ অনুকরণ, সৃজনশীলতা এবং স্থবিরতার (তাক্বলীদ বনাম ইজতিহাদের) পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে লিখেন,


    "ক্বলবে-উ দর নক্বশে মাযী মুর্দাহ আস্ত,

    নফসে-উ আজ সুযে ফরদা মুর্দাহ আস্ত।

    আছরে নও রা কোহনা-হা রা বুত-গারীস্ত,

    ক্বীসসাহে পীরানে আফসানাহ খ্বানীস্ত।"


    তাদের হৃদয় অতীতের নকশার (স্মৃতির) ভেতরেই মরে গেছে, আর আগামীদিনের (ভবিষ্যতের) উন্মাদনা বা আগুন থেকে তাদের নিঃশ্বাস আজ বঞ্চিত। নতুন যুগকে পুরনো ছাঁচে ফেলে মূর্তিপূজা (অন্ধ অনুকরণ) করা হচ্ছে, আর আমাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল পূর্বপুরুষদের গল্পের আসর বসানো।


    ইকবাল বুঝিয়েছেন, অতীত ঐতিহ্য কোনো সমাজের জন্য প্রেরণার উৎস হওয়া উচিত, অহংকারের অন্ধ কারাগার নয়। সমাজ যখন নতুন চিন্তা বা 'ইজতিহাদ' বন্ধ করে দেয়, তখন তারা কেবল পূর্বপুরুষদের ইতিহাস রূপী 'যাদুঘর' পাহারা দেওয়া শুরু করে এবং এক মিথ্যা আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। কবিতার 'সুযে ফরদা' (আগামীদিনের আগুন) শব্দবন্ধটি দিয়ে ইকবাল দেখিয়েছেন, মুসলমানরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের সাহস হারিয়ে ফেলেছে। তারা আজ ইতিহাস রোমন্থন করেই নিজেদের বর্তমানের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে চায়।


    বইয়ের একেবারে শেষে ইকবাল তাঁর পুত্র জাভিদকে সম্বোধন করে নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে একটি দীর্ঘ বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি তরুণদের সতর্ক করেছেন, তারা যেনো কেবল পূর্বপুরুষদের ইতিহাস নিয়ে অহংকার করে নিজেদের বর্তমানকে নষ্ট না করে। বরং নিজেদের ভেতরে নতুন দুনিয়া সৃষ্টির ক্ষমতা (সৃজনশীলতা) তৈরি করে।


    তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি এই অধ্যায়ে বলেন, কেবল বংশ বা ইতিহাসের গৌরব মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, যদি না তার মাঝে নিজস্ব কর্মক্ষমতা থাকে,


    "হার্ফে পূচ আস্ত ঈঁকেহ মা আজ ইয়েকে রাগীম,

    রীশাহে মা আজ ইয়েকী শাখ ও রাগীম।

    আছলে ইনসান আজ আমল দানী কেহ চীস্ত?

    আদামী আজ যাদানি দীগার জালীস্ত।"


    আমরা সবাই একই রক্তের বা একই বংশের, আমাদের শেকড় একই শাখা আর একই শিরা থেকে এসেছে —এই অহংকারটি একটি অন্তঃসারশূন্য কথা। কর্মের কষ্টিপাথরে মানুষের আসল পরিচয় কী, তুমি কি তা জানো? মানুষের প্রকৃত প্রকাশ ঘটে তার দ্বিতীয় জন্ম বা আধ্যাত্মিক ও সৃজনশীল পুনর্জাগরণের মাধ্যমে।


    ইকবাল তরুণ সমাজকে এই বার্তা দিচ্ছেন, পূর্বপুরুষের গৌরবগাথা কোনো জাদুঘরের প্রদর্শনী নয়; যা দেখে অলস বসে থাকতে হবে। প্রকৃত মানুষ বা জীবন্ত জাতি তারাই, যারা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের কর্মের (আমাল) মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন জগত বা নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে।


    ইকবাল এই মানসিক জড়তার তীব্র সমালোচনা করে দাবি করেন, ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো অতীতের অর্জনগুলোকে নতুন যুগের চ্যালেঞ্জের আলোতে পুনঃমূল্যায়ন করা এবং সেগুলোকে ভবিষ্যতের নতুন ইমারত গড়ার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 127-129)।


    ইকবালের ইতিহাস-দর্শনটি ইউরোপীয় হেগেলীয় বা মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মতো কোনো যান্ত্রিক বা পূর্বনির্ধারিত নিয়তিবাদ নয়। তিনি ইতিহাসকে দেখেন মানুষের ‘খুদি’ বা আত্মসত্তার সমষ্টিগত বিকাশ এবং পরীক্ষাগার হিসেবে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 52-54)। মানব ইতিহাস হলো আল্লাহর এক পরম মহাজাগতিক সিফাত বা গুণের বাহ্যিক প্রকাশ। যেখানে প্রতিটি জাতি তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক কর্মের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৭)। যখন কোনো সমাজ তার সৃজনশীল চিন্তা বন্ধ করে দেয়, তখন ইতিহাস তার হাত থেকে নেতৃত্বের লাগাম কেড়ে নিয়ে অন্য কোনো গতিশীল সমাজের হাতে তুলে দেয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 131-132)। মুসলিম উম্মাহকে যদি আবার বিশ্বমঞ্চে নিজের স্থান পুনরুদ্ধার করতে হয়, তবে অতীত গৌরবগাথার অলস পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে সময়ের সৃজনশীল প্রবাহের সাথে তাল মেলাতে হবে। সময়ের বাগডোর নিজেদের হাতে নিতে হবে। এরজন্য যেরকম এবং যে পর্যায়ের কুরবানী ও প্রচেষ্টা, উপায়-উপকরণ, পথ ও পন্থা অবলম্বন করা লাগে, করতে হবে। কেবল উসুলে ফিকহ বা উসুলে মাযহাব নয়; বরং উসুলে দ্বীন বা উসুলে ইসলামের ব্যাপক, সামগ্রিক এবং প্রশস্ত আলোর ঝলকানিতে; আযিমত-রুখসত-জরুরত-ইস্তেহসান, শরিয়ার ছাড় ও ফাঁকফোকর, তাবীল-তাফসীর ইত্যাদিকে আমাদের হাতিয়ার হিসেবে নিতে হবে। এগুলোর সামষ্টিক রূপই দ্বীন। এসবের কিছুই দ্বীনের বাহিরে নয়। তাই পূর্ণ দ্বীনকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের জাঁনেসার হওয়ার বিকল্প নেই।


    অলসতা-অসাড়তা, ব্যক্তিগত ঠাটঠমক, ভাব রাজ্যের রাজপুত্রের স্বভাব, অন্যদের থেকে নিজেকে শ্রেষ্ঠ, বড় এবং শায়খি মনোভাবের অন্ধকার গলি-ঘুপচি ছেড়ে সমাজের অন্য দশজন মানুষের কাতারে নেমে, তাদের কাঁধে কাঁধ মেলাতে হবে। তাদের একজন হয়ে নিজের আপন এই সমাজ ও সাধারণকে জাগিয়ে তুলতে হবে। কারণ আমাদের সভ্যতার সমাপ্তি নেই। তাই আমাদেরও সমাজ ছেড়ে পাঁচতলা কিংবা সাততলায় উঠে ঠাকুরদের ন্যায় ব্রাহ্মণী মেজাজের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতীতের গৌরব ভবিষ্যতে টেনে নেওয়ার দায় এড়ানোর কোনো জো নেই। এই দায়িত্ব আদায়ের মাপকাঠিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত কে কতটুকু সম্মানার্হ আর কে কতটুকু পরিত্যাজ্য। দায়িত্ব আদায় না করেও অনুসরণীয়, সম্মানীয়, শ্রদ্ধার পাত্র হওয়ার সুযোগ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ধর্মের ঠাকুর, ভিক্ষু বা পাদ্রীদের সমাজে থাকতে পারে, ইসলামের মুসলিম সমাজে এর কোনোই অনুমোদন নেই। এখানে দায়িত্ব আদায়ের মাত্রাতেই সম্মান আর এর অবহেলাতেই অসম্মান নিহিত। কারণ এটি চির প্রগতিশীল, চিরহরিৎ, চিরন্তন প্রবহমান এবং বিকাশমুখী ধর্ম। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্ট ধর্মের ন্যায় শুধু ঠাকুর, ভিক্ষু এবং পাদ্রীদের ন্যায় কেবল উলামার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়া অনুসরণীয়-অনুকরণীয় এবং শ্রদ্ধার পাত্র হওয়ার কিছু নয়। অতীতেও এরকম ছিলো না। অতীতের যাঁরা আজ স্মরণীয়-বরণীয়, তাঁরা তাদের কাজ ও দায়িত্ব আদায়ের কারণেই এই স্থানে নিজেদের আসীন করতে পেরেছেন। এমন অনেক প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ উলামা আছেন অতীতের, যাদের নাম পর্যন্ত আমরা জানি না। কারণ, তাঁরা তাঁদের যুগের দায় এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে বহন করেননি, তাই আজ উম্মতের জন্য কোনো কাজের নয় সেইসব হায়াত। অঘোষিতভাবেই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হয়েছে তাঁদের স্থান।


    আল্লামা ইকবাল তাই জোর দিয়ে বলেন, অতীতের বড় বড় বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন বা বৈজ্ঞানিক বিপ্লবগুলো কোনো সমাপ্ত বিন্দু ছিল না; সেগুলো ছিল এক একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। সেগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায় আমাদের (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 133)। ইসলামের সোনালি যুগের মনীষীরা যে বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অন্ধ অনুকরণের কোনো শেকল নয়; বরং তা ছিল আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি মজবুত প্ল্যাটফর্ম (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৪৫)। ইকবাল উম্মাহর বুদ্ধিজীবী সমাজকে সতর্ক করে দেন, অতীতকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে, আমরা বর্তমানের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এক কাল্পনিক অতীতে বাস করব (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 148-149)। প্রকৃত ঐতিহ্যপ্রিয়তা হলো অতীতের সেই গতিশীল স্পিরিট বা প্রাণশক্তিকে ধারণ করা, যা একসময় নতুন নতুন জ্ঞান ও সভ্যতা নির্মাণে সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।


    ইতিহাসের এই গতিশীল পাঠের একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত হলো, ইবনে খালদুনের ঐতিহাসিক চিন্তাধারা। ইকবালের মতে, ইবনে খালদুনই প্রথম ঐতিহাসিক যিনি ইতিহাসকে সময়ের বুকে একটি অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ হিসেবে দেখেছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 123-124)। তিনি সমাজের উত্থান-পতনকে একটি জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা 'আসাবিয়্যাত' বা সমষ্টিগত সংহতির ওপর নির্ভরশীল। ইবনে খালদুনের এই দর্শন প্রমাণ করে, ইতিহাসের কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সবকিছুই একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ। বর্তমানেও আমাদের সময়ে যা হচ্ছে, যেসব সমস্যা এবং সম্ভাবনা বিরাজ করছে, সুখ এবং দুঃখের যেসব আখ্যান তৈরি হচ্ছে, জীবনে, রাষ্ট্রে, ঘরে এবং বাইরে যেসব অনুকূল এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজিত; সবই সেই সূত্রে গাথা। সবকিছুই আমাদের নিজেদের চর্চা করা এক বৃহত্তর সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মফল; আমাদের হাতের কামাই (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 124)।


    গ্রিক-আরবি সংশ্লেষের মেথডলজি এবং প্রাথমিক মেথডলজিক্যাল ভুলের ব্যবচ্ছেদ


    আল্লামা ইকবাল ইসলামের প্রাথমিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং তাত্ত্বিক সমালোচনা হাজির করেছেন, যা তাঁর The Reconstruction of Religious Thought in Islam-এর পঞ্চম বক্তৃতা ‘The Spirit of Muslim Culture’-এ ('মুসলিম তামাদ্দুনের মর্মকথা'তে) বিস্তারিত এসেছে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রাথমিক যুগের মুসলিম চিন্তাবিদগণ যখন গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানকে অনুবাদ এবং আপন করে নিচ্ছিলেন, তখন তাঁরা এক গভীর মেথডলজিক্যাল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছিলেন। গ্রিক দর্শনের মূল স্পিরিট ছিল মূলত অবরোহনমূলক যুক্তিনির্ভর (speculative and deductive)। যা বাস্তব জগৎ এবং ইন্দ্রিয়জাত পর্যবেক্ষণকে অবজ্ঞার চোখে দেখত এবং কেবল বিমূর্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে সত্য অনুসন্ধান করতে চাইত (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 114-115)। এর বিপরীতে পবিত্র কুরআনের মূল স্পিরিট ছিল সম্পূর্ণ আরোহনমূলক ও বাস্তবমুখী (inductive and empirical)। যা মানুষকে বাস্তব প্রকৃতি ও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেয়।


    ইকবালের মতে, প্রাথমিক যুগের মুসলিম দার্শনিকরা—যেমন ইবন রুশদ বা আল-ফারাবি—গ্রিক দর্শনের তাত্ত্বিক জাঁকজমক দেখে এতটাই মোহিত হয়েছিলেন, তাঁরা কুরআনের এই মৌলিক আরোহনমূলক ও পরীক্ষামূলক মেথডলজিকে গ্রিক ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 115-116)। এটি ছিল মুসলিম সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ট্র্যাজেডি। কারণ এর ফলে ওহীর গতিশীল ও বাস্তবমুখী শিক্ষাগুলো গ্রিক দর্শনের এক নিস্প্রাণ ও বিমূর্ত গোলকধাঁধায় আটকে গিয়েছিল, যা সমাজকে বাস্তব বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়েছিল (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 116-117)।


    তবে ইকবাল একই সাথে দেখিয়েছেন, মুসলিম মনন চিরকাল এই গ্রিক শৃঙ্খলে বন্দী থাকেনি; বরং পরবর্তী যুগের চিন্তাবিদ যেমন ইবন হাইসাম, আল-বিরুনী এবং ইবন খালদুন গ্রিক দর্শনের এই বিমূর্ত সীমাকে ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন এক পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৮)।


    আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল দেখিয়েছেন, আধুনিক বিজ্ঞান কোনো বিদেশি বা বিজাতীয় বস্তু নয়; এটি ইসলামের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক মেথডলজিরই একটি হারিয়ে যাওয়া সন্তান। তিনি দাবি করেন, আধুনিক ইউরোপীয় বিজ্ঞান আসলে মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত এই আরোহনমূলক বা পরীক্ষামূলক পদ্ধতির (Inductive Method-এর) একটি বর্ধিত ও বিকশিত রূপ, যা রজার বেকন (১২১৪-১২৯৪ খ্রি.) বা ফ্রান্সিস বেকনের (১৫৬১-১৬২৬ খ্রি.) হাত ধরে ইউরোপে প্রবেশ করেছিল (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 115-116)।


    ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী, "মুসলিম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের উত্তরাধিকারিগণের নিকটেই রজার বেকন আরবী ভাষা ও আরবীয় বিজ্ঞান শিখেছিলেন। তিনি অথবা তাঁর সম-নামীয় বৈজ্ঞানিক কেউই পরীক্ষামূলক পদ্ধতি প্রবর্তনের কৃতিত্বের অধিকারী নন। রজার বেকন ইউরোপে মুসলিম বিজ্ঞান ও পদ্ধতির একজন প্রচারক ছাড়া অধিক কিছু ছিলেন না" ((Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 118)।)


    ইকবাল তাঁর বিখ্যাত ফারসি কাব্যগ্রন্থ "পয়য়ামে মাশরিক্ব (Message from the East)"-এ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ইউরোপের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ভেতরের মূল আলোটি আসলে মুসলমানদের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব থেকেই ধার করা। ইকবাল বলেন,


    "হিকমতে ফিরিঙ্গিঁয়া ময়খানাহ এস্ত,

    নূরে-উ আজ শো'লায়ে সিনায়ে মস্ত।

    ইলমে হক্ব রা কুফরে গোফতন জাহলে নেস্ত,

    হিকমতে খোদ রা বাহ আশরার ফুরুখতন কুফরাস্ত" (পয়য়ামে মাশরিক্ব (১৯২৩), ১০৭ নম্বর রুবাই')।


    পশ্চিমাদের এই বিজ্ঞান ও প্রজ্ঞা তো একটি মদ্যালয় (উন্মাদনার জায়গা), কিন্তু এর ভেতরের মূল আলোটি আমাদেরই সিনাই পাহাড়ের অগ্নিশিখা থেকে প্রাপ্ত।

    সত্য জ্ঞানকে (না বুঝে বা আপাতদৃষ্টিতে) কুফর বলাটা আসল মূর্খতা নয়; তবে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানকে দুষ্টদের হাতে ছেড়ে দেওয়াটাই আসল মূর্খতা এবং কুফর।


    ইকবাল বলছেন, অনেক মানুষ বা আলেমরা না বুঝে পশ্চিমা বিজ্ঞানকে 'কুফর' বা ধর্মদ্রোহিতা বলেন, এটাকে আমি বড় মূর্খতা বা অপরাধ মনে করি না। কারণ তারা এর ভেতরের সত্যটা চেনে না। কিন্তু আসল অপরাধ বা কুফরি হলো, যে বিজ্ঞান ও আরোহনমূলক পদ্ধতি (Inductive Method) মূলত মুসলমানদেরই আবিষ্কার ছিল, তাকে নিজেদের অবহেলা ও অলসতার কারণে পশ্চিমাদের (দুষ্টদের বা আত্মিকতাহীনদের) হাতে সঁপে দেওয়া এবং নিজের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলা। অর্থাৎ,বিজ্ঞানকে কুফর বলা যতটা না বড় অজ্ঞতা, তার চেয়ে কোটি গুণ বড় অপরাধ আর অজ্ঞতা হলো, নিজেদের জ্ঞানকে অন্যের গোলামিতে ছেড়ে দেওয়া।


    কিন্তু ইউরোপ মুসলিমদের এই জ্ঞান ও বিজ্ঞানের পদ্ধতিকে গ্রহণ করার সময় এর আত্মিক ও নৈতিক সংযোগটি কেটে ফেলে, তাকে সম্পূর্ণ বস্তুবাদী করে তোলে। বিজ্ঞানের এই আত্মিক শূন্যতার সমালোচনা করে ইকবাল তাঁর "বালে জিবরিল (Gabriel's Wing)"-এ লিখেন,


    "ইউরোপ মেঁ বহুৎ, রওশনাইয়ে ইলম ও হুনার হ্যায় মগর,

    হক্ব ইয়ে হ্যায় কেহ বে-চশমায়ে হায়ওয়াঁ হ্যায় ইয়ে জুলমাত।

    ইয়ে ইলম, ইয়ে হিকমত, ইয়ে তদাব্বুর, ইয়ে হুকুমত,

    পিতে হ্যায় লহু, দেতে হ্যায় তা'লিমে মুসাউয়াত" (বা'লে জিবরিল' (১৯৩৫): ৪৫ নম্বর রুবাই)।


    ইউরোপে বিজ্ঞানের আলোর কোনো কমতি নেই সত্য,

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের সেই 'অমৃতের ঝর্ণা'র চারপাশে কোনো আত্মিক আলো নেই—তা অন্ধকার।

    তাদের এই বিজ্ঞান, এই প্রজ্ঞা, এই রাজনীতি আর এই শাসনব্যবস্থা—মুখে সাম্যের বাণী ছড়ায়, অথচ নেপথ্যে মানুষের রক্ত চোষে (বস্তুবাদের কারণে)।


    বিজ্ঞান যখন নৈতিকতা ও খোদায়ী আলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা মানব সভ্যতার জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে, তা ইকবাল তাঁর ফারসি কাব্যগ্রন্থ "পয়য়ামে মাশরিক্ব (Message from the East)"-এর "হিকমতে ফরঙ্গ" কবিতায় তুলে ধরেছেন।


    "হিকমতে ফরঙ্গ আঁ আফতে জাঁ,

    নিগাহাশ তেয ও রূহশ না-তওয়াঁ।

    কারে-উ তা'মীরে দুনিয়ায়ে দিগর,

    লেকিন আন্দোহী কেহ ফরযামাশ যিয়াঁ।"


    পশ্চিমাদের এই বিজ্ঞান মানুষের আত্মার জন্য এক মহামারী।

    কারণ, এর দৃষ্টি অত্যন্ত তীব্র ও প্রখর হলেও এর ভেতরকার আত্মাটি দুর্বল ও মৃত।

    এর কাজ হলো বাহ্যিক এক নতুন পৃথিবী গড়ে তোলা।

    কিন্তু বড় দুঃখের বিষয়—এর চূড়ান্ত পরিণতি কেবলই ধ্বংস আর ক্ষতি।


    ইকবালের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মুসলিম সমাজকে এক অভূতপূর্ব সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাস দেয়। তিনি নিখুঁতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন, পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কোনো বিজাতীয় মেথডলজি নয়। তাই মুসলিমদের জন্য আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা করা কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মসমর্পণ বা হীনম্মন্যতার বিষয় নয়, বরং নিজেরই হারানো ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করার এক স্বাভাবিক ও অত্যন্ত জরুরি প্রক্রিয়া।


    আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি আধ্যাত্মিকতার এক নতুন জৈব সংশ্লেষ


    অতীতের এই মেথডলজিক্যাল ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ইকবাল আধুনিক যুগের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক-আধ্যাত্মিক সংশ্লেষের (organic synthesis) প্রস্তাব করেছেন। তিনি মনে করতেন, আধুনিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সাথে ইসলামের আধ্যাত্মিক চেতনার কোনো মৌলিক বিরোধ নেই; বরং আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান (যেমন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স) বস্তু বা ম্যাটারের যে নিস্প্রাণ ও স্থির ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে, তা ইসলামের আধ্যাত্মিক বিশ্বদর্শনের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ৪৩)। বিজ্ঞান এখন পদার্থকে কেবল একটি জড় বস্তু হিসেবে দেখে না, বরং একে শক্তির এক একটি গতিশীল কেন্দ্র হিসেবে দেখে। যা ইকবালের ‘খুদি’ বা গতিশীল সত্তার দর্শনের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 40-45)। ইকবালের খুদি হলো, জীবনের সেই মূল চালিকাশক্তি, যা প্রতিটি সত্তাকে অনন্য, সক্রিয় এবং সৃজনশীল করে তোলে। আধুনিক বিজ্ঞান যেভাবে বলে যে জড় বস্তুর গভীরে রয়েছে শক্তির অনন্ত উৎস, ঠিক তেমনি ইকবাল মনে করেন মানুষের ভেতরে বা প্রতিটি অস্তিত্বের মূলে রয়েছে ‘খুদি’র এক একটি গতিশীল কেন্দ্র। এই খুদি বা আত্মসত্তা যত বেশি জাগ্রত ও সক্রিয় হয়, মানুষ বা বস্তু তত বেশি শক্তিশালী ও বিকশিত হয়। 


    আইজ্যাক নিউটনের আমলের পুরোনো বিজ্ঞান মনে করত, এই মহাবিশ্বটা আসলে একটা বিশাল ‘যান্ত্রিক ঘড়ি’ বা মেশিনের মতো। ঈশ্বর এই ঘড়িটা তৈরি করে চাবি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন, আর এটা একটা নির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত নিয়মে একটানা চলছে। এই ধারণায় মহাবিশ্বের নিজস্ব কোনো প্রাণ বা স্বাধীনতা নেই। পাথর, মাটি বা পরমাণু—সবকিছুই একদম জড় ও অন্ধ বস্তু, যা প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য।


    আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা এসে বিজ্ঞানের এই পুরোনো যান্ত্রিক চিন্তাকে গুঁড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞান দেখায়, প্রকৃতির একদম গভীরে থাকা অতিপারমাণবিক কণাগুলো (যেমন ইলেকট্রন) কোনো ফিক্সড বা ছক-বাঁধা নিয়মে চলে না। তারা কখন কেমন আচরণ করবে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। সেখানে কোনো অন্ধ বাধ্যবাধকতা নেই, বরং আছে এক ধরনের স্বাধীন ‘সম্ভাবনা’ বা Probability।


    আল্লামা ইকবালও তাঁর দর্শনে এই যান্ত্রিক মহাবিশ্বের ধারণাকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর মতে, মহাবিশ্ব কোনো মৃত কঙ্কাল বা স্থবির বস্তু নয়। এটি একটি জীবন্ত, গতিশীল এবং প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা সৃষ্টি। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের এই ‘অনিশ্চয়তা নীতি’ মূলত ইকবালের সেই দাবিকেই প্রমাণ করে, প্রকৃতি কোনো অন্ধ মেশিন নয়, তার ভেতরেও এক ধরনের স্বাধীনতার স্পন্দন রয়েছে।


    কোয়ান্টাম স্তরে বিজ্ঞানীরা যখন আলো বা ইলেকট্রনের মতো কণাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেন, তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। কণাগুলো কোনো রোবটের মতো আচরণ করে না। পরিবেশ ও পর্যবেক্ষকের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তারা নিজেদের রূপ ও গতিপথ বদলে ফেলে। বিজ্ঞানীদের কাছে কণাগুলোর এই আচরণকে মনে হয় যেন তাদের নিজস্ব একটা ‘স্বাধীন সত্তা’ বা চয়েজ রয়েছে। তারা বাহ্যিক যান্ত্রিক নিয়মের শৃঙ্খল ভেঙে নিজেদের ভেতরের অবিনশ্বর শক্তিকে প্রকাশ করে।


    ইকবাল যাকে ‘খুদি’ বা আত্মসত্তা বলেছেন, তার মূল কথাই হলো, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি, সক্রিয়তা এবং সৃজনশীলতা। যার খুদি যত বেশি জাগ্রত, সে বাইরের পরাধীনতার শৃঙ্খল তত বেশি ভাঙতে পারে। ইকবাল মনে করতেন, এই খুদি বা আত্মসত্তা কেবল মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। মহাবিশ্বের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু বা কণার মধ্যেও এই খুদির একটি প্রাথমিক বা সুপ্ত স্তর লুকিয়ে আছে। পরমাণুর ভেতরের এই যে নিজস্ব ‘খুদি’ বা স্বাধীন শক্তি, সেটিই আধুনিক বিজ্ঞানীদের ল্যাবরেটরিতে কোয়ান্টাম কণার ‘অনিশ্চিত ও স্বাধীন আচরণ’ হিসেবে ধরা দিয়েছে।


    আল্লামা ইকবাল স্রষ্টাকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘Ultimate Ego’ বা পরম সত্তা হিসেবে। তাঁর মতে, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্ব স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; বরং এটি স্রষ্টারই প্রতিনিয়ত অনন্ত ও অবিরাম সৃজনশীল ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। যেহেতু মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা সেই পরম স্রষ্টার শক্তি থেকেই উদ্ভূত, তাই প্রতিটি কণার ভেতরেই একটি ঐশ্বরিক গতিশীল সত্তা কাজ করছে।


    এই দর্শনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, সৃষ্টির কোনো কিছুই স্থবির বা থমকে থাকার জন্য তৈরি হয়নি। প্রতিটি কণা তার ভেতরের নিজস্ব খুদি বা গতিশীল সত্তাকে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত নিজেকে বিকশিত করছে। এক অন্ধকার জড় অবস্থা থেকে জীবনের দিকে, আর জীবন থেকে এক চরম নিখুঁত পূর্ণতার (Perfection) দিকে পুরো সৃষ্টিজগৎ প্রতিনিয়ত ধাবিত হচ্ছে। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের গতিশীল শক্তি আর ইকবালের আধ্যাত্মিক খুদি—উভয়ই আসলে প্রকৃতির এই চিরন্তন ও স্বাধীন অগ্রযাত্রা বা পূর্ণতার অভিসারকেই নির্দেশ করে।


    ইকবাল এমন এক নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর রূপরেখা দিয়েছেন, যেখানে বিজ্ঞান হবে মানুষের বাহ্যিক চোখ এবং আধ্যাত্মিকতা বা ওহী হবে তার ভেতরের অন্তর্দৃষ্টি (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ২৫-২৬)। বিজ্ঞান মানুষের বাহ্যিক ক্ষমতা ও প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে, আর আধ্যাত্মিকতা সেই ক্ষমতাকে মানুষ ও সভ্যতা ধ্বংসের কাজে ব্যবহার না করে বিশ্বকল্যাণ এবং ঐশ্বরিক লক্ষ্য অর্জনের পথে পরিচালিত করবে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 18-20)। এই দুইয়ের মিলবন্ধন ছাড়া মানব সভ্যতাকে রক্ষা করা অসম্ভব। কারণ ইউরোপীয় বস্তুবাদী বিজ্ঞান মানুষকে যান্ত্রিক দানবে রূপান্তর করেছে, আর বিজ্ঞানহীন আধ্যাত্মিকতা মুসলিম সমাজকে করেছে পঙ্গু ও দুর্বল। কোনটাই পূর্ণ খুদির পরিচয় নয়। দু'টির কোনোটিই এককভাবে পূর্ণতার দিকে অভিসারও নয় (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 97-98)। এই দুই চরম সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার একটি সমন্বিত ও অখণ্ড জ্ঞানতত্ত্ব


    এই জৈব সংশ্লেষটি অর্জনের জন্য ইকবাল মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল পুনর্গঠন করার আহ্বান জানিয়েছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 135-140)। তিনি চাননি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেবল পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ তৈরি করুক। আবার তিনি এটাও চাননি, ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলো আধুনিক যুগের বাস্তব জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল প্রাচীন কিতাবের বৃত্তে বন্দী থাকুক। তাঁর ভিশন ছিল এমন এক নতুন প্রজন্মের গবেষক ও বিজ্ঞানী তৈরি করা, যারা একাধারে আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্স, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করবেন এবং একই সাথে তাঁদের অন্তরে থাকবে ওহীর গভীর আলো এবং ইশকের অপরাজেয় শক্তি। এই নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চমার্গীয় ব্যক্তিরাই কেবল আধুনিক বিশ্বের শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 146)।


    নতুন বৌদ্ধিক বসন্ত এবং বিশ্বনেতৃত্বের বিকল্প বৈশ্বিক রোডম্যাপ


    আল্লামা ইকবালের সমগ্র দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বে একটি নতুন ‘বৌদ্ধিক বসন্ত’ (Intellectual Renaissance) ঘটিয়ে বিশ্ব সভ্যতার বিকল্প বৈশ্বিক রোডম্যাপ বা ভিশন হাজির করা (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 154)। তিনি তাঁর বিখ্যাত উর্দু কাব্যগ্রন্থ জরবে কালিম (The Rod of Moses)-এ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, পশ্চিমা পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্র—উভয় দর্শনই মানুষের আত্মাকে খণ্ডিত করেছে এবং মানবতাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পুঁজিবাদ মানুষকে বানিয়েছে অর্থের দাস, আর সমাজতন্ত্র মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা খুদিকে হত্যা করে তাকে রাষ্ট্রের একটি নিস্প্রাণ পুতুলে রূপান্তর করেছে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 148)। এই দুই ব্যর্থ দর্শনের বিপরীতে ইসলামই পারে মানবতাকে এক প্রকৃত সুষম, ইনসাফভিত্তিক এবং আধ্যাত্মিক সমাজ কাঠামোর সন্ধান দিতে।


    ইকবাল কেবল তাত্ত্বিক মুখে এই দাবি করেননি; তিনি তাঁর কবিতায় এই বিকল্প ভিশনের একটি জীবন্ত ছবি এঁকেছেন। তিনি কৃষক-মজুরের শোষণের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শোষিত ও মেহনতি মানুষের বৈপ্লবিক জাগরণ এবং ধনীদের বিলাসবহুল পুঁজিবাদী শাসনকাঠামো ভেঙে ফেলার বজ্র-সংকল্প ঘোষণা করে তিনি তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ "বালে জিবরিল (Gabriel's Wing)-এর ‘ফরমানে খুদা ফারিশতঁউ সে’ (আল্লাহর নির্দেশ ফেরেশতাদের প্রতি) কবিতায় বলেন,


    اٹھو! مری دنیا کے غریبوں کو جگا دو

    کاخِ امرا کے در و دیوار ہلا دو

    "উটঠো! মেরি দুনিয়া কে গরিবোঁ কো জাগা দো

    কাখে উমারা কে দর ও দিওয়ার হিলা দো"


    তোমরা ওঠো এবং আমার পৃথিবীর গরিবদের জাগিয়ে দাও! আমির-ওমরাদের (শোষক ও ধনীদের) প্রাসাদের দরজা ও প্রাচীর (ভিতসহ) কাঁপিয়ে দাও।


    گرماؤ غلاموں کا لہو سوزِ یقیں سے

    کنجشکِ فرومایہ کو شاہیں سے لڑا دو

    "গরমাও গুলামোঁ কা লহু সোযে ইয়াকিঁ সে

    কুঞ্জেশকে ফরুমায়া কো শাহিন সে লড়া দো।"


    দাসদের (নিপীড়িতদের) ঠাণ্ডা রক্তে বিশ্বাসের আগুন জ্বেলে উষ্ণ করো। সামান্য এক চড়ুই পাখিকে (দুর্বলদের) বাজপাখির (পুঁজিবাদী শাসক ও শোষকদের) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামিয়ে দাও!


    سلطانیِ جمہور کا آتا ہے زمانہ

    جو نقشِ کہن تم کو نظر آئے، مٹا دو

    "সুলতানিয়ে জমহুর কা আতা হ্যায় যামানাহ

    জো নক্বশে কুহন তুম কো নযর আয়ে, মিটা দো।"


    গণমানুষের সার্বভৌমত্বের (জনগণের সাথে ইনসাফি শাসনের) যুগ সমাগত! অতীত শোষণের পুরোনো যে চিহ্নই চোখের সামনে দেখবে, তা নিশ্চিহ্ন করে দাও!


    جس کھیت سے دہقاں کو میسر نہیں روزی

    اس کھیت کے ہر خوشۂ گندم کو جلا دو

    "জিস খেত সে দেহক্বান কো মায়াসসার নেহি রোজি

    উস খেত কে হার খোশায়ে গান্দুম কো জালা দো।"


    যে ক্ষেত থেকে একজন কৃষক তার দুবেলার অন্ন (রুজি) পায় না—সেই ক্ষেতের উৎপাদিত গমের প্রতিটি শীষে আগুন লাগিয়ে দাও!


    ইকবালের দর্শন অনুযায়ী, "জমির ফসল পুড়িয়ে দেওয়া" কেবল একটি কৃষিভিত্তিক রূপক নয়, বরং এটি সমাজের প্রতিটি পরজীবী ও অমানবিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত বৈপ্লবিক ফতোয়া। বাহ্যিকভাবে এটি সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থা এবং বুর্জোয়া পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে এক তীব্র হুংকার হলেও, ইকবালের সমগ্র দর্শন ও চিন্তাকাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে ‘ক্ষেত’ বা ‘ফসল’ কেবল কৃষিকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই চরনদ্বয় তার অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, একটা সমাজের শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রী ও সমাজের অন্যান্য প্রতিটি সেক্টর এবং প্রতিষ্ঠান। ইকবাল এখানে একটি রূপক (Metaphor) ব্যবহার করেছেন, যার আওতায় সমাজের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান (Institutions) চলে আসে। 


    সমাজের যেকোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার মূল অংশীদারদের, সমাজের মানুষের কল্যাণ সাধন করতে ব্যর্থ হয়, তার প্রকৃত দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে, কাজে লাগার বদলে বোঝা বাড়াতে থাকে, তবে সেই শোষক, অপদার্থ এবং মৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। এই চরণের আলোকে সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোর ব্যবচ্ছেদ অপরিহার্য।


    ১. শিক্ষাব্যবস্থা ও মেধার লুণ্ঠন:


    আল্লামা ইকবালের মতে, শিক্ষা হলো মানুষের ‘খুদি’ বা আত্মিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলার এবং চিন্তার স্বাধীনতা দেওয়ার পবিত্র ক্ষেত্র। কিন্তু আধুনিক পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা মূলত পুঁজিপতিদের জন্য ‘নিস্প্রাণ পুতুল’ বা করপোরেট দাস তৈরি করার কারখানা। ঠিক একইভাবে, প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাও চরম স্থবির, অলস, প্রাণহীন এবং যুগ-জিজ্ঞাসা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তা যুবকদের কর্মমুখী বা বৈপ্লবিক করার পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় ও ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকা এক অলস ও নিশ্চল শ্রেণীতে পরিণত করছে।


    এই চরণদ্বয়ের শিক্ষানুযায়ী যে আধুনিক বা ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা তরুণ প্রজন্মের আত্মাকে অবশ করে দেয়, তাদের সৃজনশীল ও স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, এবং দিনশেষে তাদের কেবল পুঁজিপতিদের করপোরেট দাস কিংবা সমাজের এক একজন নিশ্চল ও অন্ধ অনুসারী বানায়—তা কোনো প্রকৃত শিক্ষা নয়। ইকবালের স্পষ্ট বার্তা, যে বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষার্থীর মননে নৈতিকতা, দূরদৃষ্টি, আধ্যাত্মিকতা, মানবতা, যুগ সচেতনতা এবং বুদ্ধিবৃত্তির প্রকৃত বিকাশ ঘটাতে পারে না, সেই বন্ধ্যা ও গোলামি  এবং পরনির্ভরশীল মানসিকতা তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা ধ্বংস অনিবার্য।


    ইকবাল তাঁর বিখ্যাত উর্দু কাব্যগ্রন্থ 'বালে জিবরিল' (Gabriel's Wing)-এর ৪২ নম্বর গজলে এই প্রাণহীন, আত্মিক তেজহীন জড় শিক্ষাধারা এবং মাদরাসা-খানকা'র স্থবিরতার চিত্রটি অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে তুলে ধরেছেন।


    یہ پیغام دے گئی ہے مجھے بادِ صبح گاہی

    کہ خودی کے عارفوں کا ہے مقام پادشاہی

    "ইয়ে পয়গাম দে গায়ি হ্যায় মুঝে বাদে সুবহে গাহি

    কেহ খুদি কে আরিফোঁ কা হ্যায় মাকামে পাদশাহি।"


    ভোরের হাওয়া আমাকে এই বার্তা দিয়ে গেছে, যারা নিজেদের চিনেছে (খুদিকে জাগ্রত করেছে), তাদের আসল মাকাম বা স্থান হলো রাজকীয় সিংহাসন।

    گلا تو گھونٹ دیا اہلِ مدرسہ نے تیرا

    کہاں سے آئے صدا لا الہ الا اللہ

    "গলা তো ঘোঁট দিয়া আহলে মাদ্রাসা নে তেরা

    কাহাঁ সে আয়ে সদা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ?"


    মাদ্রাসা ও স্কুলের কাণ্ডারীরা (তথা প্রথাগত এই শিক্ষাব্যবস্থা) তো তোমার মনের সেই টগবগে আগুন ও আত্মাকে গলা টিপে হত্যা করেছে! (এই অবশ, অলস এবং নিশ্চল বুঝ ও চিন্তাকেই দ্বীনের সুরা বানিয়ে পান করিয়ে দেওয়া হচ্ছে) এখন তোমার ভেতর থেকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)-এর সেই জ্যান্ত ও বৈপ্লবিক ধ্বনি কীভাবে আসবে? যা এই কালিমার রূহ ধারণ করে।

    مری سادگی بھی دیکھو، مرے عجز کو بھی جانو

    مری عاجزی ہی بن گئی مری کج کلاہی

    "মেরি সাদেগী ভি দেখো, মেরে ইজয্ কো ভি জানো

    মেরি আজিযী হি বান গায়ি মেরি কজ কুলাহী।"


    আমার সরলতাও দেখো, আবার আমার বিনয়কেও জানো; শেষ পর্যন্ত আমার এই বিনয় আর আত্মনিবেদনই আমার রাজকীয় অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট হয়ে উঠেছে।


    نہ مرید بن کے رہو، نہ بنو کسی کے مرشد

    کہ یہاں کے پیر و مرشد تو ہیں رہزنِ الٰہی


    "না মুরিদ বান কে রাহো, না বানো কিসি কে মুরশিদ

    কেহ ইয়াহাঁ কে পীর ও মুরশিদ তো হ্যায় রাহজানে ইলাহী।"


    তুমি অন্ধ মুরিদ বা ভক্ত হয়েও থেকো না, আবার ক্ষমতার মোহে কারো অন্ধ পীর বা মুরশিদ হতেও যেও না। কারণ এই স্থবির যুগের তথাকথিত পীর-মুরশিদেরা খোদায়ী পথের ডাকাত (রাহজান) ছাড়া আর কিছুই নয়।


    اٹھی تھی جو موجِ طوفانِ بلا خیزِ محبت

    وہ دبا دی ہے امامتِ شیخِ کم نگاہی


    "উটঠী থী জো মৌজে তুফানে বালা খিযে মহব্বত

    ওহ দাবা দী হ্যায় ইমামতে শায়খে কম নিগাহী।"


    মানুষের হৃদয়ে ঐশ্বরিক প্রেমের যে বৈপ্লবিক তুফান ও ঢেউ জেগে উঠেছিল, এই সংকীর্ণমনা ও দূরদৃষ্টিহীন প্রথাগত শায়খ বা ধর্মগুরুদের ইমামতি (নেতৃত্ব) তাকে দাবিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।


    جو ہوا تھا قہرِ دوراں سے، ہوا ہے وہ بھی دیکھا

    نہ ملی مجھے تو بس اک دلِ باصفا کی راہی


    "জো হুয়া থা ক্বাহরে দউরাঁ সে, হুয়া হ্যায় ওহ ভি দেখা

    না মিলী মুঝে তো বাস ইক দিলে বা-সাফা কী রাহী।"


    জামানার অত্যাচারে যে বিপর্যয় ঘটার ছিল তা তো ঘটছেই এবং আমি তা দেখেছি; কিন্তু আফসোস! আমি সমাজ বা প্রতিষ্ঠানে কোথাও একটিও খাঁটি ও কলুষমুক্ত হৃদয়ের মানুষের দেখা পেলাম না।

    میں اٹھا ہوں مدرسہ سے، میں اٹھا ہوں خانقاہ سے

    نہ وہاں کوئی زندگی ہے، نہ کوئی سوزِ آہی


    "ম্যাঁয় উটঠা হুঁ মাদ্রাসা সে, ম্যাঁয় উটঠা হুঁ খানক্বাহ সে

    নাহ ওয়াহাঁ কোয়ি জিন্দেগী হ্যায়, না কোয়ি সূযে আহী।"


    তাই তো আমি প্রথাগত মাদরাসা থেকেও উঠে চলে এসেছি, আবার প্রাণহীন খানকাহ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। কারণ ওখানে না আছে কোনো স্পন্দনশীল জীবন, আর না আছে কোনো গভীর আত্মিক ব্যাকুলতা বা আগুন। (Allama Iqbal, Bal-i-Jibril, 1935, Ghazal No. 42, p. 74)।


    আল্লামা ইকবালের এই গজলটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,  তিনি প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে (চাই জেনারেল হোক বা মাদ্রাসা শিক্ষা হোক) মুসলিম উম্মাহর পরাধীনতা ও অলসতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, স্কুল-কলেজগুলো যুবকদের পাশ্চাত্যের মানসিক গোলাম বানাচ্ছে; আর স্থবির, অলস, প্রাণহীন এবং যুগ-জিজ্ঞাসা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন প্রথাগত মাদরাসা ও খানকাহগুলো দ্বীনের বৈপ্লবিক চেতনাকে আক্ষরিক ও জড় তাত্ত্বিক বিতর্কে বন্দি করে ফেলেছে। যে শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার মূল উদ্দেশ্য ছিলো, মানুষের ভেতরের ‘ঈমানি তেজ’ এবং ‘খুদি’ বা খোদায়ী আত্মমর্যাদা জাগ্রত করা, সেই শিক্ষা এবং পীর-মুরিদী যখন নিজে স্থবির ও সমাজের এলিটদের অনুগত হয়ে পড়ে, তখন তা তরুণদের মেধা ও আত্মার টগবগে আগুনকে গলা টিপে হত্যা করে। এমন অকার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা ও পীর-নীতির কারণেই তরুণ প্রজন্মের আত্মিক তেজ ও বৈপ্লবিক চেতনা বিনষ্ট হচ্ছে। যুবকদের কর্মমুখী বা বৈপ্লবিক করার পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় ও ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকা এক অলস শ্রেণীতে পরিণত করছে। তাই ইকবালের বিকল্প রোডম্যাপের অন্যতম প্রধান দাবি হলো এমন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করা, যা একদিকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে এবং অন্যদিকে মানুষের আত্মাকে করপোরেট দাসত্ব ও ধর্মীয় স্থবিরতা—উভয় সংকট থেকে মুক্ত করবে।


    ২. বিচার ও আইনি ব্যবস্থা (The Legal and Judicial System):


    পুঁজিবাদী সমাজে আইন ও আদালত প্রায়শই ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করার এবং গরিবদের দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। যে আদালত বা আইনি কাঠামো একজন মজদুর, কৃষক বা অসহায় সাধারণ মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার এবং ইনসাফ দিতে পারে না; বরং টাকার জোরে যেখানে জালিমরা পার পেয়ে যায়—সেই বিচারব্যবস্থা সমাজের জন্য একটি অভিশাপ। ইকবালের এই চরণ দু'টি বলছে, যে আইন মেহনতি মানুষকে নিরাপত্তা দেয় না, সেই শোষক আইনি ফ্রেমওয়ার্ক বা 'নক্বশে কুহন' (পুরোনো জীর্ণ দলিল) ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়াই প্রকৃত ইনসাফ।


    ৩. অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং সেক্টর (Financial Institutions):


    আধুনিক ব্যাংকিং ও সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত সম্পদকে গুটিকয়েক ধনীর হাতে কুক্ষিগত করে রাখে। যে অর্থব্যবস্থা ও করপোরেট পলিসি শ্রমিকের ঘাম এবং কৃষকের রক্ত পানি করা উপার্জনকে লুণ্ঠন করে বড় বড় পুঁজিপতিদের ব্যাংকের ভল্ট ভারী করে—তা মানবতাবিরোধী। এই শোষক অর্থনৈতিক ক্ষেতের ‘গমের শীষ পুড়িয়ে দেওয়ার’ অর্থ হলো—সুদভিত্তিক ও একচেটিয়া পুঁজিবাদী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলোপ ঘটিয়ে ইসলামের যাকাত ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতি চালু করা।


    ৪. রাজনৈতিক কাঠামো ও আমলাতন্ত্র (State Bureaucracy):


    গণতন্ত্রের নামে যে ছদ্মবেশী পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক রাজত্ব চলে, ইকবাল তাকে তীব্র ঘৃণা করতেন। যে রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসনব্যবস্থা সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় টিকে থাকে, অথচ আমলারা ও শাসকেরা সাধারণ জনগণের মৌলিক অধিকার (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা) নিশ্চিত করতে পারে না—তা একটি অচল ও ব্যর্থ ব্যবস্থা। ইকবালের চূড়ান্ত বার্তা হলো, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি সেক্টরকে অবশ্যই মানুষের আত্মিক ও বস্তুগত কল্যাণে নিয়োজিত হতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষকে শোষণ করে কেবল অভিজাতদের (আমির-ওমরাদের) স্বার্থ রক্ষা করে, তবে ‘ফরমানে খুদা’র মূল শিক্ষা হলো সেই অমানবিক ব্যবস্থার আমূল উচ্ছেদ ঘটিয়ে একটি শোষণহীন, খোদায়ী ইনসাফভিত্তিক নতুন বৈশ্বিক সমাজ কাঠামো গড়ে তোলা।


    বস্তুত তাঁর "বালে জিবরিল"-এর এই চরণ দু'টি (জিস খেত সে দেহক্বান কো মায়াসসার নেহি রোজি / উস খেত কে হার খোশায়ে গন্দম কো জালা দো") এমন প্রতিটি ক্ষেত্র, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ব্যবস্থা কিংবা অবকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যে তার মূল দায়িত্ব আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে।


    এরপর ইকবাল বলেন (বালে জিবরিল-এর ৪২ নং কবিতায়),

    کیوں خالق و مخلوق میں حائل رہیں پردے

    پیرانِ کلیسا کو کلیسا سے اٹھا دو!

    "কিউঁ খালিক ও মাখলুক মেঁ হাইল রাহেঁ পরদে

    পিরানে কালিসা কো কালিসা সে উটঠা দো!"


    কেন সৃষ্টিকর্তা আর সৃষ্টির মাঝে ধর্মের নামে দেয়াল ও পর্দা ঝুলে থাকবে? গির্জা ও উপাসনালয়ের সেই ভণ্ড পুরোহিতদের বের করে দাও!


    বাহ্যিকভাবে আল্লামা ইকবাল এখানে গির্জার পুরোহিতদের কথা বললেও, তাঁর মূল ক্ষুরধার তীরটি হলো, মুসলিম সমাজের সুবিধাবাদী ও ভণ্ড পীরতন্ত্রের দিকে। ইকবালের মতে, আল্লাহ এবং তাঁর বান্দার সম্পর্ক অত্যন্ত সরাসরি, আত্মিক ও প্রেমের; সেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ধর্মকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা আধুনিক পীরতন্ত্র সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মাঝে এক দুর্ভেদ্য প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল তুলে দিয়েছে, যা মানবতাকে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়।


    এখানে ইকবাল সমাজের ওই প্রকার ভণ্ড পীরদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন, যারা ধর্মের ভয় দেখিয়ে ও অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে চলেছে। এরা মুরিদদের পকেট কেটে, নজরানা আর হাদিয়ার টাকায় নিজেদের আলিশান ‘বালাখানার’ পর বালাখানা গড়ে তুলছে, অথচ তাদের অন্ধ মুরিদেরা অনাহারে-অর্ধাহারে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। মেহনতি মানুষের রক্ত পানি করা উপার্জনে এই ধর্ম ব্যবসায়ীদের ব্যাংক লকারগুলো সোনার তোলায় আর সিন্দুক নগদ অর্থে উপচে পড়ছে। অথচ যেখানে আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং ইসলামের প্রকৃত হক্কানী পীর-মাশায়েখদের আসল আদর্শ ছিল ধনীদের কাছ থেকে হাদিয়া ও সদকা নিয়ে তা অভাবী-অসহায় গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া, সেখানে এই আধুনিক শোষকেরা ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার কাছ থেকেই শুধু নিয়ে যাওয়ার ‘হাদিয়া-খোর’ পীর হয়ে উঠেছে। গরিব মুরিদ কোন নরক যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছে, তার ন্যূনতম খোঁজ রাখার ফুসরতও তাদের নেই। ইকবালের চূড়ান্ত উপলব্ধি হলো—ধর্মের পবিত্র পোশাক পরে যারা শোষণের এই আধুনিক করপোরেট কারখানা খুলে বসেছে, তারা আসলে খোদায়ী পথের ডাকাত। তাই মানবতাকে আধ্যাত্মিক দাসত্ব ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্ত করতে হলে এই ভণ্ড পুরোহিত ও পীরদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং নেতৃত্ব থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া অপরিহার্য।


    حق را بسجودے، صنماں را بطوافے

    بہتر ہے چراغِ حرم و دیر بجھا دو

    "হাক রা ব-সুজুদে, সানামাঁ রা ব-তাওয়াফে

    বেহতার হ্যায় চেরাগে হরম ও দায়ের বুঝা দো।"


    যেখানে আল্লাহর ইবাদত কেবল লোকদেখানো সিজদায় আর ক্ষমতার পুতুলদের তাওয়াফ করায় (কমিটি পূজা কিংবা সমাজের এলিটদের তোয়াজ-তমিজ করে চলায়) সীমাবদ্ধ—তার চেয়ে ভালো হয় মসজিদ আর মন্দিরের প্রদীপগুলো চিরতরে নিভিয়ে দাও!


    میں ناخوش و بیزار ہوں مرمر کی سلوں سے

    میرے لیے مٹی کا حرم اور بنا دو

    "ম্যাঁয় না-খুশ ও বেজার হুঁ মারমার কি সিলোঁ সে

    মেরে লিয়ে মিট্টি কা হরম আউর বানা দো।"


    আমি অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত (মসজিদের) এই মার্বেল পাথরের চাঁইগুলোর ওপর, আমার (ইবাদতের) জন্য কাদা-মাটির আর একটি সাধারণ হারাম (মসজিদ) তৈরি করো। (খোদায়ী সমাজ তৈরি করো। যেখানে সবকিছু আবর্তিত হবে কেবল খোদাকে ঘিরে)।


    تہذیبِ نوی کارگہِ شیشہ گراں ہے

    آدابِ جنوں شاعرِ مشرق کو سکھا دو!

    "তাহজিবে নওয়ি কারগাহে শিশাগারাঁ হ্যায়

    আদাবে জুনুঁ শায়ে'রে মাশরিক কো সিখা দো!"


    এই আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা কাঁচের তৈরি একটি ভঙ্গুর কারখানা মাত্র। যাও, প্রাচ্যের কবিকে (ইকবাল নিজেকে বুঝিয়েছেন) বিপ্লবের সেই ঐশ্বরিক উন্মাদের ব্যাকরণ ও আদব শিখিয়ে দাও (Allama Iqbal, Bal-i-Jibril, 1935, Poem No. 131, 'Farman-i-Khuda', p. 123)।


    এই কবিতাটি মূলত এর আগের দুটি কবিতা—‘লেনিন খোদা কে হুজুর মে’ (আল্লাহর দরবারে লেনিন) এবং ‘ফারিশতোঁ কা গীত’ (ফেরেশতাদের গান)-এর একটি স্বর্গীয় উত্তর। পুঁজিবাদ ও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অমানবিক শ্রেণী-শোষণ, সাম্রাজ্যবাদী কূটকৌশল এবং ধনী-গরিবের তীব্র বৈষম্যের যে চিত্র লেনিন আল্লাহর দরবারে আরজি হিসেবে পেশ করেছিলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ফেরেশতাদের প্রতি এই 'ফরমান' বা নির্দেশ জারির মাধ্যমে যেনো তার বৈপ্লবিক জবাব দিয়েছেন।


    এখানে ইকবালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের তিনটি মূল দিক উন্মোচিত হয়।


    ১. পুঁজিবাদের যবনিকাপাত (সুলতানিয়ে জমহুরি)। ইকবাল স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, রাজতন্ত্র ও অর্থলোভী পুঁজিবাদের দিন শেষ। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন সাধারণ শোষিত মেহনতি মানুষের দিন আসছে।

    ২. ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার ও কৃষকের অধিকার। ইকবালের দৃষ্টিতে জমি ও প্রকৃতির প্রকৃত মালিক কোনো ব্যক্তি বা পুঁজিপতি নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ। তাই যে জমিতে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও একজন কৃষক তার দুবেলার অন্ন বা রুজি পায় না, সেই জমির ফসল শোষকদের পকেটে যাওয়ার চেয়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া শ্রেয়।

    ৩. ধর্মীয় ভণ্ডামির অবসান। পুঁজিবাদীরা যেভাবে ধর্মকে নিজেদের শোষণের হাতিয়ার বানায়, তার বিরুদ্ধে ইকবাল খড়গহস্ত হয়েছেন। লোকদেখানো উপাসনা এবং শাসকগোষ্ঠীর তল্পিবাহক পুরোহিত-মোল্লাদের খাঁচায় বন্দী ধর্মকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।


    ধনাত্মক বা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার নির্মম শ্রেণী-শোষণ এবং ধনী-গরিবের তীব্র বৈষম্য সম্পর্কে তাঁর কণ্ঠ সদা প্রতিবাদী এবং পথনির্দেশক৷ তিনি মনে করতেন, যে জমিতে কঠোর শ্রম দিয়েও কৃষক ফল ভোগ করতে পারে না, সেই জমির মালিকানা বুর্জোয়াদের হাতে থাকা এক মহা অন্যায়। শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনির ফল কেন কেবল পরজীবী পুঁজিপতিরা ভোগ করবে? ধনী-গরিবের এই বৈষম্য এবং কলকারখানার মালিকদের অমানবিক রূপ সম্পর্কে তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন তাঁর প্রথম উর্দু কাব্যগ্রন্থ "বাঙ্গে দারা (The Call of the Marching Bell)"-এর 'খিজিরে রাহ' (পথপ্রদর্শক খাযির) কবিতার ‘পুঁজি ও শ্রম’ (সরমায়াহ ও মেহনত) নামক উপ-পরিচ্ছেদে। শ্রমিকের প্রতি মহাবিশ্বের চিরন্তন বার্তা বহন করে ইকবালের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়,


    بندۂ مزدور کو جا کر مرا پیغام دے  

    خضر کا پیغام کیا ہے یہ پیامِ کائنات


    "বান্দায়ে মজদুর কো জা কর মেরা পয়গাম দে

    খিজির কা পয়গাম ক্যায়া হ্যায় ইয়েহ পয়ামে কায়েনাত"


    যাও, শ্রমিককে গিয়ে আমার বার্তা দাও।

    খিজিরের বার্তা আসলে কী? এটি তো পুরো মহাবিশ্বের বার্তা।


    প্রারম্ভিক এই শেরে ইকবাল সরাসরি শ্রমিক শ্রেণিকে সম্বোধন করে তাঁকে তাঁর ঐশী ও প্রাকৃতিক মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, শ্রমিকের অধিকার কোনো ব্যক্তিগত দয়া বা পথপ্রদর্শকের বিশেষ অনুগ্রহ নয়; বরং এই সৃষ্টিজগতের শাশ্বত বিধান। বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতিতে শ্রমিকদের প্রায়ই 'খরচ' বা 'সম্পদ' হিসেবে দেখা হয়, অথচ ইকবাল মনে করিয়ে দেন, শ্রমিকই মহাবিশ্বের আসল চালিকাশক্তি—যার অস্তিত্বের ওপরেই সমগ্র অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।


    ছলনাকারী পুঁজিপতি এবং শ্রমিকের ভঙ্গুর ভাগ্য নিয়ে বলেন,

    اے کہ تجھ کو کھا گیا سرمایہ دارِ حیلہ گر  

    شاخِ آہو پر رہی صدیوں تلک تیری برات


    "অ্যায় কেহ তুঝ কো খা গায়া সরমায়া দারে হিলা গর

    শাখে আহু পর রহী সদইয়োঁ তলক তেরী বরাত"


    ওহে শ্রমিক! ছলনাকারী পুঁজিপতি তোমাকে গ্রাস করে ফেলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী তোমার ভাগ্যের চাবিকাঠি ছিল হরিণের শিংয়ের মতো ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত আশ্রয়ে।


    ইকবাল শ্রমিক জীবনের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। হরিণের শিং যেমন ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল, তেমনি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের চাকরি, আয় ও সামাজিক নিরাপত্তা চরমভাবে অনিশ্চিত। বর্তমান বিশ্বে 'শূন্য-ঘণ্টার চুক্তি' (Zero-hour contracts), 'গিগ ইকোনমি' এবং স্বেচ্ছাচারী ছাঁটাইয়ের যুগে শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত মালিকের ইচ্ছা ও বাজারের ওঠানামার করুণায় নির্ভরশীল, যা তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে রাখে।


    পারিশ্রমিক বনাম ধনীদের করুণার যাকাতের বাস্তব হালত উল্লেখ করে বলেন,

    دستِ دولت آفریں کہ مُزد یوں ملتی رہی  

    اہلِ ثروت جیسے دیتے ہیں غریبوں کو زکات


    "দস্তে দৌলত আফরীঁ কো মুযদ্ ইউঁ মিলতী রহী

    আহলে ছরওয়াত জ্যায়সে দেতে হ্যাঁয় গরিবোঁ কো যাকাত"


    সম্পদ সৃষ্টিকারী হাত (শ্রমিক) যখন মজুরি পায়, তখন তা এমনভাবে দেওয়া হয় যেনো ধনীরা গরিবদের যাকাত বা ভিক্ষা দিচ্ছে।


    পুঁজিবাদের অন্যতম নিষ্ঠুর কুফল এখানে ধরা পড়ে। যে হাতটি প্রকৃত মূল্য ও সম্পদ সৃষ্টি করে, তাকে তার প্রাপ্য দেওয়ার পরিবর্তে তা একটি 'করুণা' বা 'সদকা' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে (ই-লার্নিংয়ে জবের অভিজ্ঞতায় নিজেও এটা দেখতে পেয়েছি। জুলুমী দুনিয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্যই কিছুদিন সেই অঙ্গনে কাটাতে চেয়েছিলাম)। বর্তমান শিল্পকারখানায় বেতন প্রদানের মনস্তত্ত্বটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী—শ্রমিক যেন মালিকের দয়ায় বেঁচে থাকে। অথচ বাস্তব সত্য হলো, মালিকের বিলাসিতা ও পুঁজির পাহাড় নির্মাণের একমাত্র উপাদান হলো সেই শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত। ইকবাল এই বৈরী চিত্রকে অত্যন্ত স্পষ্ট কণ্ঠে তুলে ধরেছেন।

    মোহগ্রস্ততার ফাঁদ ও অজ্ঞতার প্রতারণা বুঝিয়ে বলেন,


    ساحر الموُط نے تجھ کو دیا برگِ حشیش  

    اور تو اے بے خبر سمجھا اِسے شاخِ نبات


    "সাহিরে আলামুত নে তুঝ কো দিয়া বারগে হাশিশ

    আওর তু অ্যায় বে-খবর সমঝা ইসে শাখে নাবাত"


    আলামুতের জাদুকর তোমাকে দিয়েছে শুকনো ঘাসের পাতা (আফিমের নেশা), আর তুমি অজ্ঞ হয়ে সেটাকে ভেবেছ জীবন্ত সবুজ ডালপালা।


    ইকবাল এখানে ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। "আলামুত" ছিল মধ্যযুগের একটি বিখ্যাত দুর্গ, যা হাসান ইবনে সাব্বাহ নামক এক শক্তিশালী বাতেনী হাশাশীন নেতার ঘাঁটি ছিলো। সে তাঁর এই দুর্গ থেকে চতুরতা, ভীতি ও রহস্যময় কৌশলের মাধ্যমে মানুষকে বশে রাখতো এবং তাদের মনে এমন এক মোহ সৃষ্টি করে রাখতো, যাতে তারা নিজেদের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে না পারে। ইকবাল এই ঐতিহাসিক চরিত্র ও দুর্গকে ব্যবহার করে আধুনিক পুঁজিবাদী মালিক শ্রেণিকে চিত্রিত করেছেন।


    ঠিক যেমন আলামুতের জাদুকর মানুষকে তার মায়াজালে আবদ্ধ করত, তেমনই পুঁজিপতিরাও নানা ফাঁদ, ছলনা ও চটকদার ডায়লগ ও লোভের মাধ্যমে শ্রমিকদের মোহগ্রস্ত করে রাখে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শ্রমিকের হাতে তুলে দেয় শোষণ ও ধ্বংসের শুষ্ক উপাদান—যেমন ফালতু বোনাস হিসেবে সামান্য কিছু টাকা, ইনক্রিমেন্টের লোপ, কিস্তির ফাঁদ, ঋণের জাল, কিংবা সস্তা বিনোদন। কিন্তু ভোগবাদী প্রচারণা, চাকচিক্যপূর্ণ বিজ্ঞাপন এবং প্রদর্শনীপূর্ণ জীবনযাপনের মায়ায় এই শুষ্ক পাতাকে তারা "উন্নত জীবনের সজীব প্রতীক" হিসেবে চিহ্নিত করে। সাধারণ শ্রমিক এই কৃত্রিম স্বপ্নের 'আফিমে' বুঁদ হয়ে যায় এবং নিজের প্রকৃত স্বার্থ, শ্রেণি-চেতনা ও ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে যায়।


    ইকবালের এই চতুর্থ শ্লোকটি তাই শ্রমিকদের প্রতি এক কঠোর সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা প্রতারণার এই জাল চিনতে না পেরে শোষকদের দেওয়া নিষ্প্রাণ জিনিসকেই সত্যিকারের উন্নতি ভেবে ধরা খায়। তিনি তাদেরকে এই "কল্পনার জাল থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব দেখতে" আহ্বান জানান তিনি। বাস্তবে তাদের ঘামের মূল্য পুঁজিপতিরা লুটে নিচ্ছে, আর তারা নিজেরাই হচ্ছে সেই উৎপাদনের প্রকৃত চালিকাশক্তি।


    বিভাজনের কৃত্রিম দেয়াল নিয়ে বলেন, 

    نسل، قومیّت، کلیسا، سلطنت، تہذیب، رنگ  

    خواجگی نے خوب چن چن کر بنائے مُسکِرات


    "নসল, কওমিয়্যাত, কালিসা, সালতানাত, তাহজীব, রঙ

    খাজাগী নে খূব চুন চুন কর বানায়ে মুস্কিরাত (নেশাদার বস্তু)"


    বর্ণ, জাতি, গির্জা, রাজতন্ত্র, সভ্যতা, রং—আভিজাত্য শ্রেণি এগুলো বেছে বেছে নেশার ওষুধ (মাদক) বানিয়েছে।


    শোষক গোষ্ঠী চিরকাল 'ভাগ করো এবং শাসন করো' নীতিতে বিশ্বাসী। তারা জাতি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে রাখে, যাতে শ্রমিকরা কখনো ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এই কৃত্রিম 'মাদক'-এরই বহিঃপ্রকাশ, যা শ্রমিক শ্রেণির চেতনাকে চিরকাল স্তব্ধ করে রেখেছে।


    কল্পনার দেবতা ও জীবন-পুঁজির লুট সম্পর্কে বলেন,

    کٹ مرا ناداں خیالی دیوتاؤں کے لئے  

    سُکر کی لذّت میں تو لٹوا گیا نقدِ حیات


    "কাট মরা নাদাঁ খেয়ালি দেওতাউঁ কে লিয়ে

    সুকর কি লজ্জত মেঁ তু লুটওয়া গায়া নক্বদে হায়াত"


    হে আমার মূর্খ (ভাই), কল্পনার দেবতাদের পেছনে তুই কাটা পড়ে গেলি। আর মাদকের লোভে তুই নিজের জীবনের নগদ মূলধন লুটিয়ে ফেললি।


    পুঁজিপতি শুধু কলকারখানার মালিক বা ব্যবসায়ী নন; বরং ধর্মীয় গোড়ামি, জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক আদর্শ—এগুলোর মাধ্যমেও একই শোষণ প্রক্রিয়া চলে। সেখানেও অনেক 'পুঁজিপতি' আছেন, যারা তাদের হাতে থাকা দ্বীন-ধর্ম, মতাদর্শ বা আদর্শকে 'পুঁজি' হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে 'শ্রমিক'-এর মতো খাটান। তাদের হাড়ভাঙা শ্রমে তাদের ব্যবসা বা প্রভাব হয় রমরমা।


    ইকবাল উপরের এই দুই শ্লোক পুঁজিবাদের এক অসাধারণ বহুমাত্রিক রূপ উন্মোচন করেছেন। সাধারণভাবে আমরা 'পুঁজিপতি' বলতে বুঝি কলকারখানা বা ব্যবসার মালিক—যারা অর্থের পুঁজি খাটিয়ে শ্রমিকদের শোষণ করে। কিন্তু ইকবাল এখানে আরও গভীরে গিয়ে দেখিয়েছেন যে "শোষণের এই কাঠামো শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মাত্রায়ও বিদ্যমান।"


    প্রথমত, ধর্মীয় গোড়ামি নিজেই এক বিশাল 'কারখানা'। ধর্মীয় নেতা বা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের হাতে থাকা 'দ্বীন'-কে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে, সাধারণ অনুসারীদের শ্রমিক-তুল্য করে খাটাতে পারে অতিসহজে। কারণ এখানে আবেগ কাজ করে, তাই মানুষকে ম্যানুপলেট করা অত্যন্ত সহজ হয়। অনুসারীরা ধর্মীয় বিধিনিষেধ, আচার-আচরণ ও বিশ্বাসের নামে নিজেদের সময়, অর্থ ও শক্তি উৎসর্গ করে—যার বিনিময়ে তারা পায় শুধু 'স্বর্গের প্রতিশ্রুতি' বা 'আখেরাতের মুক্তি'। আর সেই প্রতিশ্রুতির ফাঁদেই তারা প্রকৃতপক্ষে এক ধরণের "মেন্টাল শ্রমিক (মানসগত কর্মী)" হয়ে ওঠে। যাদের অন্ধ আনুগত্যে ধর্মীয় গোড়ামির ব্যবসা রমরমা হয়ে ওঠে।


    দ্বিতীয়ত, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিও একই প্রক্রিয়ায় চলে। রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলো 'জাতি', 'স্বাধীনতা', 'গৌরব'—এইসব শব্দকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে তাদের রাজনৈতিক শ্রমিক বানিয়ে নেয়। কর্মীরা হাড়ভাঙা খাটুনি দেয়, প্রাণ দেয়, আর নেতারা সেই আন্দোলনের ফল ভোগ করে -ক্ষমতা, অর্থ ও প্রতিপত্তি লাভ করে। এখানেও শ্রমিক-পুঁজিপতির সম্পর্ক একই, শুধু কারখানার জায়গায় এসেছে রাজনৈতিক ময়দান।


    তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন শিক্ষা, গণমাধ্যম, সিনেমা, বা সামাজিক রীতি-নীতি—এগুলোর মাধ্যমেও একই শোষণ চলে। 'সভ্যতা', 'কালচার' বা 'আধুনিকতা'র নামে সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করে নির্দিষ্ট আচরণ, পোশাক, জীবনযাত্রা মেনে চলতে বাধ্য করা হয়। যা আসলে কোনো উন্নতি নয়, বরং "সাংস্কৃতিক পুঁজিপতির" শোষণমূলক ব্যবসা।

    ইকবালের ভাষায়, এই ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো "কল্পনার দেবতা" —যাদের পেছনে ছুটে সাধারণ মানুষ (শ্রমিক) তার নিজের বাস্তব স্বার্থ, অর্থনৈতিক মুক্তি ও বাস্তব অকৃত্রিম চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে। তারা 'মাদক'-এর মতো এই বিভ্রান্তিতে বুঁদ হয়ে থাকে, যেনো তারা কোনো মহান লক্ষ্যের জন্য কাজ করছে। অথচ বাস্তবে তারা কেবল পুঁজিপতিদের স্বপ্নের ফাঁদে নিজের জীবন-পুঁজি লুটিয়ে দিচ্ছে।


    ইকবাল বলতে চান, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই শোষণের ধরণ একই। কারও পুঁজি অর্থ, কারও পুঁজি ধর্ম, কারও পুঁজি জাতীয়তাবাদ, কারও পুঁজি সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তি। আর প্রত্যেক পুঁজিপতির পেছনে থাকে এক দল শ্রমিক—যারা খাটে, কিন্তু ভোগ করে না। ভোগ করে সেইসব পুঁজির পুঁজিপতিরা। এই কবিতা তাই শুধু কলকারখানার শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের কবিতা নয়; এটি "সর্বস্তরের শোষণের বিরুদ্ধে এক সার্বজনীন বিদ্রোহের কবিতা"। যতদিন না মানুষ এই 'কল্পনার দেবতা'গুলোর মোহ ত্যাগ করে নিজের প্রকৃত স্বার্থ উপলব্ধি করবে, ততদিন শোষণ চলতেই থাকবে—শুধু তার রূপ বদলাবে।


    সরল শ্রমিকের বিরুদ্ধে কৌশলী পুঁজিপতির জয় হয় যেভাবে,

    مکر کی چالوں سے بازی لے گیا سرمایا دار  

    اِنتہائے سادگی میں کھا گیا مزدور مات


    "মকর কী চালোঁ সে বাজি লে গায়া সরমায়া দার

    ইনতেহায়ি সাদেগী মেঁ খা গিয়া মজদুর মাত"


    ছলনা ও চালাকির খেলায় জিতে গেল পুঁজিপতি। আর চরম সরলতার কারণে হেরে গেল শ্রমিক।


    ইকবালের এই শ্লোকটি শোষণের চিরায়ত কৌশল ও তার পরিণতি তুলে ধরে। তিনি দেখান—পুঁজিপতিরা আইনি ফাঁকফোকর, জটিল চুক্তিপত্র, আর্থিক কৌশল এবং শ্রমবিরোধী নীতিমালার মাধ্যমে শ্রমিককে পরাজিত করে। অপরদিকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তারা একই পদ্ধতিতে ভিন্ন কিছু কৌশল ব্যবহার করে।


    অর্থনৈতিক স্তরে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শ্রমিক ইউনিয়ন ভাঙতে, স্বল্পমূল্যে শ্রম কিনতে এবং চুক্তিভিত্তিক অনিশ্চয়তা তৈরি করতে সদা সচেষ্ট। অপরপক্ষে শ্রমিক আইনি জটিলতা বুঝতে না পেরে, ঐক্য গড়ে তুলতে না পেরে এবং নানা বিভাজনে জর্জরিত হয়ে সর্বদা পরাজিত হয়। কিন্তু এই কৌশল শুধু কারখানার মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।


    ধর্মীয় কারখানায় ধর্মীয় নেতারা তাদের হাতে থাকা 'ধর্ম'-কে পুঁজি করে, এর উপযোগী কিছু "আধ্যাত্মিক ও সামাজিক" কৌশল প্রয়োগ করেন। পদ্ধতি সেইম সেইম, মাত্রা ও কৌশল শুধু ভিন্ন। যেমন 'অবিশ্বাসী', 'গোমরাহ', 'বেহেশত-দোজখ' ইত্যাদির ভয় দিয়ে অনুসারীদের বশে রাখা। অনুসারীরা ধর্মীয় বিধিনিষেধের জটিলতা বুঝতে না পেরে অন্ধভাবে মেনে চলে, বিভক্ত হয়ে পড়ে, আর ফলস্বরূপ পরাজিত হয়—যদিও তারা ভাবে যে তারা সফল হচ্ছে, জাতিকে 'মুক্ত' করছে পরাধীনতার এবং অধর্মের শৃঙ্খল থেকে।


    রাজনৈতিক পুঁজিপতিরা তাদের হাতে থাকা জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা, গৌরব ও ঐতিহ্য—এসব বিমূর্ত ধারণাকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। তারা একটি বিশেষ ভাষা ও প্রতীকের জাল তৈরি করে। হতে পারে সেটা ইতিহাসের মধ্যভাগ থেকে তোলে আনা একটি কাপড়, কোনো কৃত্রিম সঙ্গীত, হঠাৎ কারও মাথা থেকে বের হওয়া কোনো মিনার বা স্তম্ভ কিংবা কৃত্রিমভাবে নায়ক বানিয়ে মহান করে তোলা কিছু নেতার ছবি। যেগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আবেগী বানিয়ে বিবাগী করে তোলা হয়। তাদের মিশন ও ভিশনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে নেয়। এই প্রতীকগুলোকে তারা এতটাই পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় করে তোলে যে, মানুষ তাদের যুক্তিবাদী চিন্তা করতে পর্যন্ত ভুলে যায়।


    তারা "আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো" যেমন, সংসদ, আদালত, প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা ইত্যাদিকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা এমনভাবে সাজায়, সাধারণ মানুষ মনে করে এগুলো তাদের স্বার্থে কাজ করছে, কিন্তু বাস্তবে এগুলো রাজনৈতিক পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার ঢাল মাত্র।


    রাজনৈতিক পুঁজিপতিরা সেই আবেগ জিইয়ে রাখতে আবার বিভাজনের কৌশল প্রয়োগ করে। একদলকে বলে 'তোমরা এদেশের প্রকৃত সন্তান', অন্যদলকে বলে (কর্মে বুঝায়) 'তোমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক'। এই বিভাজনে সাধারণ মানুষ নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, আর এইসব পুঁজিপতিরা নিরাপদে থাকে। তারা ভয়ের রাজনীতিও করে। শত্রু চিহ্নিত করে, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি করে, আর মানুষকে ক্রমাগত সন্ত্রস্ত রাখে। যাতে সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রকৃত শ্রেণি-স্বার্থ নিয়ে ভাবার সময় না পায়।


    তারা আশার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে বাঁধে—'আমরা এসেছি পরিবর্তন আনতে', 'একবার সুযোগ দাও'। কিন্তু সেই পরিবর্তন কখনো আসে না; বরং মানুষ বারবার সেই প্রতিশ্রুতির পেছনে ছুটে নিজের সময়, শক্তি ও জীবন-পুঁজি ধ্বংস করতে থাকে।


    অন্যদিকে সাংস্কৃতিক পুঁজিপতিরা খোলে বসে আছে সভ্যতার কারখানা। তারা 'কালচার', 'সভ্যতা', 'আধুনিকতা', 'রুচি', 'শিক্ষা', 'উন্নয়ন'—এরকম কিছু শব্দকে পুঁজি বানায়। আর কাজে লাগায় গণমাধ্যম, শিক্ষা ব্যবস্থা, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি, বিনোদন শিল্প—এরকম কিছু প্রতিষ্ঠান।


    তারা তাদের মনোজগত অনুযায়ী একটি 'আদর্শ জীবনযাত্রা' তৈরি করে, মানুষ কী পরবে, কী খাবে, কী দেখবে, কী ভাববে—সব কিছু নির্ধারণ করে দেয়। যারা এই নির্ধারিত জীবনযাত্রা মেনে চলে, তাদের 'সভ্য', 'আধুনিক', উয়েল কালচার্ড' ও 'উন্নত' বলে সম্মান দেয়। যারা মেনে চলে না, তাদের 'অসভ্য', 'পশ্চাৎপদ', 'খেত', 'ব্যাকডেটেড' ও 'অশিক্ষিত' বলে হেয় করে। এই সামাজিক চাপে সাধারণ মানুষ নিজের ইচ্ছা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে বিসর্জন দেয় এবং পুঁজিপতিদের তৈরি সেই আদর্শে নিজেকে গঠন করতে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।


    সাংস্কৃতিক পুঁজিপতিরা অত্যন্ত সুকৌশলে "শিক্ষাব্যবস্থাকে" বিশেষভাবে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে মরিয়া থাকে। পাঠ্যবই, সিলেবাস ও শিক্ষার ধরন এমনভাবে সাজাতে চায় তারা, যেনো মানুষ নির্দিষ্ট একটি চিন্তাধারায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। যেখানে শ্রেণি-চেতনা, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা বিকল্প চিন্তার কোনো স্থান না থাকে না। তারা 'ভাষা'কেও পুঁজি করে। একটি নির্দিষ্ট ভাষা, তাদের নির্ধারিত প্যাটার্ন, উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার, ভাষার স্ট্রাকচার বা উপভাষাকে 'মার্জিত', 'প্রমিত', 'বিশুদ্ধ' আর অন্যটিকে 'অশুদ্ধ', 'অপ্রমিত', 'গাইয়া' হিসেবে চিহ্নিত করে, যদিও সেটা দেশের বৃহত্তর মানুষের মুখের এবং বুকের ভাষাও হয়। তারা এটা করে যাতে ভাষার মাধ্যমেই উঁচুনিচু, এলিট ও প্রলেতারিয়েতের আকাশ-পাতাল সামাজিক বিভাজন তৈরি করা যায়।


    তারা ভোগবাদী সংস্কৃতি তৈরি করে—যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারণ হয় তার সম্পদ, পোশাক, গাড়ি, বাড়ি—এই বাহ্যিক বিষয় দ্বারা। মানুষ ক্রমাগত নতুন নতুন পণ্য কিনতে বাধ্য হয়, ঋণগ্রস্ত হয়, আর সেই ঋণের বোঝায় চিরদিনের জন্য পুঁজিপতিদের শ্রমিক হয়ে থাকে। তারা 'বিনোদন শিল্পের' মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখে। সিনেমা, সিরিয়াল, সোশ্যাল মিডিয়া, স্পোর্টস—এসবের মাধ্যমে মানুষ তার প্রকৃত সমস্যা ভুলে থাকে এবং এক কৃত্রিম জগতে বাস করে। এই সবকিছুই খেদমত করতে থাকে মূলত পুঁজিবাদী সিস্টেমের। আর এই কাজ যারা আঞ্জাম দেয় তারা প্রত্যেকেই পুঁজিবাদী এবং ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থারূপী দেবতার সেবায়েত।


    তাই শোষণ কখনোই শুধু অর্থনৈতিক কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফলত ইকবাল দেখান, প্রতিটি স্তরেই এক একটি 'কারখানা' গড়ে ওঠে, যেখানে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের দ্বন্দ্ব নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। ধর্মীয় পুঁজিপতি তার হাতে থাকা 'দ্বীন'-কে পুঁজি করে অনুসারীদের খাটায়; রাজনৈতিক পুঁজিপতি 'জাতীয়তাবাদ, কৃত্রিম নায়ক, অরক্ষিত স্বাধীনতা ও গৌরব'কে পুঁজি করে কর্মীদের দিয়ে আন্দোলন করায়; সাংস্কৃতিক পুঁজিপতি 'কালচার, সভ্যতা, আধুনিকতা ও রুচি'কে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট জীবনযাত্রায় বাধ্য করে। সব জায়গাতেই কাঠামো এক—পুঁজি আছে, শ্রমিক আছে, আর আছে শোষণ ও গোলামী।


    এই সব স্তরে কৌশলও একই—আবেগ জাগানো, ভয় দেখানো, বিভাজন তৈরি করা, আশার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং বিভ্রান্তির জাল বিছানো। ধর্মীয় নেতা যেমন 'বেহেশত-দোজখ'-এর ভয় দেখিয়ে অনুসারীদের বশে রাখে, রাজনৈতিক নেতা তেমনই 'শত্রু-বন্ধু'-র বিভাজন তৈরি করে কর্মীদের নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে ব্যস্ত রাখে। সাংস্কৃতিক অভিজাতরা 'সভ্য-অসভ্য'-এর ফাঁদে মানুষকে আটকে রাখে। পুঁজিপতিরা এই কৌশলগুলো এতটাই নিপুণভাবে প্রয়োগ করে যে শ্রমিকরা (অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক যে-ই হোক) তার সরলতা, বিভাজন ও অজ্ঞতার কারণে সর্বদা পরাজিত হয়—পুঁজিপতিরা জেতে, শ্রমিকেরা হারে।


    ইকবালের তাই সকল শ্রমিককে এক গভীর সতর্কবার্তা দেন। শুধু কলকারখানার মালিকই পুঁজিপতি নয়; যেকোনো 'কল্পনার দেবতা' (ধর্মীয় গোড়ামি, জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা, সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তি) যার পেছনে ছুটে তুমি নিজের সময়, শক্তি ও জীবন-পুঁজি লুটিয়ে ফেলছ, সেই দেবতার উপাসকই আসলে পুঁজিপতির শ্রমিক। তিনি আহ্বান জানান—এই কৌশল চিনতে শেখো; চিনে নাও কে আসল পুঁজিপতি, আর কোথায় তোমার প্রকৃত স্বার্থ।


    বৈশ্বিক জাগরণ ও নতুন যুগের সূচনার ডাক দেন ইকবাল,

    اُٹھ کہ اب بزمِ جہاں کا اور ہی انداز ہے  

    مشرق و مغرب میں تیرے دور کا آغاز ہے


    "উঠ কেহ আব বজমে জাহাঁ কা আওর হী আন্দাজ হ্যায়

    মাশরিক ও মাগরিব মেঁ তেরে দৌর কা আগাজ হ্যায়"


    জেগে ওঠো, বিশ্বমঞ্চের রীতি এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে—সবখানেই তোমার (শ্রমিকের) যুগের সূচনা হচ্ছে।


    ইকবালের এই চরণ যুগান্তকারী এক প্রত্যয় বহন করে। তিনি শোষিত জনতার সেই অন্তর্নিহিত শক্তির কথা বলেন, যা একদিন বৈশ্বিক সচেতনতার স্তরে পৌঁছে তার অস্তিত্বের পরিচয় দেবে। তার বিশ্বাস ছিল, শ্রমিক শ্রেণির জাগরণ কোনো স্থানিক বা সাময়িক ঘটনা নয়; এটি কালের অনিবার্য পরিণতি।


    বর্তমান ভৌগোলিক সীমানা-বিবর্জিত বিশ্বে ডিজিটাল মাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহ সেই জাগরণকে ত্বরান্বিত করেছে। কোনো এক প্রান্তের যেকোনো সংগ্রাম এখন মুহূর্তেই অন্য প্রান্তে স্পন্দন সৃষ্টি করে। নিপীড়নের ছবি, প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর এবং ঐক্যের বার্তা—সবকিছু এখন তরঙ্গায়িত হয় সীমানা পেরিয়ে। পুঁজির সেই চিরায়ত আধিপত্য, যা একসময় অচলায়তন বলে মনে হতো, এখন ক্রমশ তার ভিত্তি হারাচ্ছে। গণবিস্ফোরণ, প্রতিবাদী আওয়াজ, এবং বিকল্প অর্থনৈতিক চিন্তা, সব মিলিয়ে সর্বক্ষেত্রে জেঁকে বসা সকল পুরোনো কাঠামোকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইকবালের সেই দূরদর্শী চিন্তা আজকের বাস্তবতায় মূর্ত হয়ে উঠছে।


    আত্মসম্মানের উচ্চতা ও ক্ষুদ্র দানে তুষ্টি না,

    ہمّتِ عالی تو دریا بھی نہیں کرتی قبول  

    غنچہ ساں غافل تیرے دامن میں شبنم کب تلک


    "হিম্মতে আলী তো দরিয়া ভী নেহী করতী কবুল

    গুঞ্চা সাঁ গাফিল তেরে দামন মেঁ শবনম কব তলক"


    উচ্চ সাহস ও আত্মসম্মান তো পুরো সমুদ্রকেও (দান হিসেবে) গ্রহণ করে না। হে অজ্ঞ কুঁড়ি, কখন পর্যন্ত তুই শিশিরবিন্দুকে নিজের আঁচলে ধরে রাখবি?


    ইকবাল শ্রমিকের আত্মমর্যাদাবোধকে জাগিয়ে তুলেছেন। একজন উৎপাদকের মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে, তার কাছে সমুদ্রও যেন সামান্য; পক্ষান্তরে মালিকের দেওয়া সামান্য বোনাস বা কর্পোরেট উপহার নিতান্তই তুচ্ছ শিশিরবিন্দু মাত্র। বর্তমান করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে শ্রমিকদের যা কিছু দেওয়া হয়, তা তাদের প্রকৃত প্রাপ্যের তুলনায় নগণ্য। ইকবাল বলেন, এই ক্ষুদ্র দানে তুষ্ট না হয়ে নিজের উচ্চ মর্যাদা উপলব্ধি করো।

    ইকবাল দেখান, জনতার জাগরণই প্রকৃত আনন্দ, বাদশাহি গল্প নয়,

    نغمۂ بیداریِ جمہور ہے سامانِ عیش  

    قِصّۂ خواب آورِ اِسکندر و جم کب تلک


    "নগমায়ে বেদারিয়ে জমহুর হ্যায় সামানে আ'য়েশ

    কিসসায়ে খোয়াব আওয়ারে ইস্কান্দার ও জম কব তলক"


    সাধারণ মানুষের জাগরণের সুরই প্রকৃত আরাম ও জীবনের উপকরণ। আলেকজান্ডার ও জমশেদের ঘুমপাড়ানি গল্প আর কতদিন শুনবে?


    ক্ষমতাশালী বাদশাহ ও প্রাচীন রাজাদের গৌরবগাথা মানুষের চেতনাকে স্তব্ধ করে শোষণকে চিরস্থায়ী করে রাখে। ইকবাল স্পষ্ট ঘোষণা করেন, প্রকৃত আমোদ-আহ্লাদ হলো যখন জনগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয়ে ওঠে। বর্তমান গণমাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের অতীত ইতিহাস আওড়ানো হয় যেন শ্রমিকরা বর্তমান শোষণ ভুলে থাকে। ইকবাল এখানে জমশেদ ও আলেকজান্ডারের গল্পকে ‘ঘুমপাড়ানি গল্প’ বা ‘নিদ্রা-উদ্রেককারী কাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কেননা, রাজা-বাদশাহদের এই ধরনের মহিমাগাথা সাধারণ মানুষকে তাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞান ও উদাসীন রাখে।


    ইকবাল বলতে চেয়েছেন—এই সব পুরোনো রাজসভার গল্প-গাঁথা শুনে আর কী লাভ? বরং এখন জাগ্রত হওয়ার, নিজের অধিকার বুঝতে পারার ও শ্রেণী-চেতনা অর্জনের সময় এসেছে। প্রকৃত জীবনের সুর হলো সাধারণ মানুষের জাগরণ, রাজা-বাদশাহের কিংবদন্তি নয়। কিন্তু পুঁজিবাদী দুনিয়া এসব গল্পগাথার মোড়কে মানুষের কাছে শাসককে অপরাজেয় এবং মহান করে তোলে। যাতে নির্বিঘ্নে তাদের তৈরি করা সিস্টেমে নিজেদের ভিশনের মানুষ তথা শাসনব্যবস্থা কাজ চালিয়ে যেতে পারে। কবি তাই সেই বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সরব হতে বলেন। সচেতন করে তোলেন আমাদের ঘুমন্ত সংজ্ঞা।


    আশার আলো দেখান, পুরনো তারা ডুবে যায় নতুন সূর্যের উদয় হলে,

    آفتابِ تازہ پیدا بطنِ گیتی سے ہوا  

    آسماں ڈوبے ہوئے تاروں کا ماتم کب تلک


    "আফতাবে তাজা পয়দা বতনে গীতি সে হুয়া

    আসমাঁ ডোবে হুয়ে তারোঁ কা মাতম কব তলক"


    "নতুন সূর্যের উদয় হয়েছে জগতের গর্ভ থেকে।

    আকাশ কতদিন ডুবে যাওয়া তারাদের জন্য শোক করবে?


    পুরোনো শোষক কাঠামো, পুরোনো রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব দিগন্তে বিলীন হতে থাকা তারার মতো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। গণজাগরণের নতুন সূর্য (প্রতিটি সেক্টরের কর্মী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের) উদয় হওয়ার সময় হয়েছে। সমাজকে পুরোনো শোক ও গৌরবগাথা নয়, নতুন সম্ভাবনার দিকে তাকাতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পুরোনো ধনতন্ত্রের মডেল যখন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, তখন এই চরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

    মানুষের আদি ও আসল প্রকৃতিই ভাঙ্গতে পারে সকল শৃঙ্খল,

    توڑ ڈالیں فطرتِ اِنساں نے زنجیریں تمام  

    دوریِ جنّت سے روتی چشمِ آدم کب تلک


    "তোড় ডালেঁ ফিতরতে ইনসাঁ নে জিঞ্জিরেঁ তামাম

    দূরিয়ে জান্নাত সে রোতি চশমে আদম কব তলক"


    অকৃত্রিম মানবপ্রকৃতিই পারে সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে।

    আদমের চোখ আর কতদিন জান্নাতের দূরত্বে কাঁদবে?


    মানুষের অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক প্রবৃত্তি স্বাধীনতা চায়। ইকবাল বলেন, শ্রমিকের প্রকৃতির মধ্যেই শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার অপার শক্তি রয়েছে। 'আদমের চোখ' কথাটি মানবজাতির চিরন্তন আকাঙ্ক্ষাকে প্রতীকায়িত করে—ন্যায্য, সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন। শ্রমিক যতদিন তার সুপ্রাপ্য 'জান্নাত' (মানবিক সমাজ) থেকে বঞ্চিত থাকবে, ততদিন সে কাঁদবে। কিন্তু ইকবাল ঘোষণা করেন, সেই কান্নার অবসান অবশ্যম্ভাবী, কারণ প্রকৃতি নিজেই শৃঙ্খল ভাঙার সময় ডেকে এনেছে।


    শোষণের এই চিরায়ত কাঠামো—ধর্মীয় গোড়ামি, কর্পোরেট কৌশল, সাংস্কৃতিক বাধ্যবাধকতা, রাজনৈতিক আদর্শ—যেখানেই শোষক তার ফন্দি এঁটেছে, সেখানেই খেটে খাওয়া মানুষের সহজাত মননের গভীরে মুক্তির জন্য এক সুর বেজে উঠেছে। ইকবাল মনে প্রাণে বিশ্বাসী ছিলেন, এই নিপীড়িতের ভেতরেই দাসত্বের আড়াল ভেদ করে ওঠার মতো অসাধারণ সামর্থ্য নিহিত। ধর্মীয় অনুসারী হোক, রাজনৈতিক কর্মী হোক, সাংস্কৃতিক চাপে থাকা সাধারণ মানুষ হোক কিংবা কারখানার মজদুর—প্রত্যেকের ভেতরেই সেই চিরায়ত চেতনা জ্বলজ্বল করে, যা একদিন জেগে ওঠবেই। মানবিক আবেগ-আর্তি বহুদিন ধরে একটি সুবিচারমূলক আবাসের স্বপ্ন বুনে আসছে; আদমের চোখ যেমন জান্নাতের জন্য ব্যাকুল, তেমনই প্রতিটি শ্রমিকের মনও তার প্রাপ্য সমাজের জন্য আকুল হয়। যতক্ষণ না সেই আবাস তাদের জন্য উন্মুক্ত হয়, ততক্ষণ এই আর্তি থামার নয়। কিন্তু ইকবালের দৃঢ় ঘোষণা, এই আর্তির সমাপ্তি অনিবার্যভাবে ঘটবেই। কারণ সময়ের চক্র নিজেই সেই মুহূর্তের আয়োজন করে রেখেছে, যখন প্রকৃতি জেগে উঠে বন্ধন ছিন্ন করতে। এটা কোনো রোমান্টিক কল্পনা নয়; এটি ইতিহাসের অনিবার্য গতি। যা ধর্মীয় গোড়ামি, রাজনৈতিক কৌশল বা সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তির কোনো বন্ধনেই চিরকাল আটকে রাখা যায় না।

    ইকবাল জানান, বসন্তের ঘোষণায় এখন শিকল ছেঁড়ার পালা,


    باغبانِ چارہ فرماسے یہ کہتی ہے بہار  

    زخمِ گُل کے واسطے تدبیرِ مرہم کب تلک


    "বাগবানে চারা ফর্মাসে ইয়েহ কেহতী হ্যায় বাহার

    জখমে গুল কে ওয়াস্তে তাদবীরে মরহম কব তলক"


    মালি যখন ওষুধের ব্যবস্থা চায়, তখন বসন্ত বলে

    ফুলের ঘায়ের জন্য মলমের চিকিৎসা আর কতদিন চলবে?


    ইকবালের এই চরণটি অত্যন্ত গভীর এক রূপক। এখানে "বসন্ত" কেবল ঋতু নয়; এটি মানুষের অকৃত্রিম প্রকৃতি, সময়ের আবর্তন ও ইতিহাসের অনিবার্য গতি। যা ঘোষণা করে, শোষণের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সারানোর জন্য ছোটখাটো সংস্কার, দান-খয়রাত বা কর্পোরেট দায়বদ্ধতা আর যথেষ্ট নয়।


    আমরা যদি ধর্মীয় গোড়ামির কারখানায় তাকাই, সেখানে নানা ধরনের গোঁজামিল পাই। সাময়িক কিছু আচার-আচরণে পরিবর্তন আনা হয়, কিছু সংস্কার-সংহতির কখনো আশ্বাস দেওয়া হয় (বাস্তবায়ন করা হোক বা না হোক)। অনুসারীদের মধ্য থেকে বিশেষ বিশেষ দেখে কিছু সুবিধার ব্যবস্থাও করা হয়। ইকবালের ভাষায় যা হলো "জখমে গুলের জন্য তদবিরে মরহম"। কিন্তু গোড়ামির মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে; অনুসারীরা ঠিক আগের মতোই খাটে, আর ধর্মীয় পুঁজিপতিরা ঠিক আগের মতোই ফল ভোগ করে।


    রাজনৈতিক কারখানাতেও ক্ষমতাবানরা মাঝে মধ্যে কিছু 'জনহিতকর' আইন পাস করে, কিছু কর ছাড় দেয়, অথবা কোনো প্রকল্প ঘোষণা করে—যেন সাধারণ মানুষ ভাবে পরিবর্তন আসছে। কিন্তু সেই 'মলম' শুধু ক্ষণিকের আরাম দেয়; রাজনৈতিক কাঠামো, ক্ষমতার অসম বণ্টন ও শোষণের মূল প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ণ থাকে। কর্মীরা আবার পুরোনো খাদে ফিরে যায়, আর নেতৃত্ব আবার পুরোনো কৌশলে তাদের খাটায়।


    কর্পোরেট জগতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো 'কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা' (CSR), 'উৎসব বোনাস', 'বেতন কাঠামোতে সামান্য ইনক্রিমেন্ট'—এসব 'মলম' দিয়ে শ্রমিকদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু শ্রমিকের মূল পাওনা, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ন্যায়সঙ্গত দাবির অধিকার—এসব থেকে তারা বঞ্চিতই থাকে। প্রকৃত শোষণের ঘা রয়ে যায়, শুধু উপর থেকে কিছু পট্টি বেঁধে দেওয়া হয়।


    সাংস্কৃতিক স্তরে 'কালচার' ও 'আধুনিকতা'র নামে কিছু হরকত পরিলক্ষিত করে তোলা হয়। কিছু পরিবর্তন আনা হয়, যেমন শিক্ষার ধরনে হালকা সংস্কার, গণমাধ্যমে কিছু বিষয়ে 'উদার' দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু মূল সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। সাধারণ মানুষ ঠিক আগের মতোই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তৈরি জীবনযাত্রায় বাধ্য থাকার সবকই পেতে থাকে


    এমনিভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু পাঠ্যবই পরিবর্তন, কিছু নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্তি, এরকম 'পট্টি' দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার মূল কাঠামো, যা শ্রেণি-চেতনা ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে বাধা দেয়, তা অক্ষুণ্ণ থাকে।


    ইকবাল ঘোষণা করেন—এই ধরনের 'তাদবিরে মরহম বা পট্টি বেঁধে ক্ষত ঢাকা'র যুগ শেষ। প্রকৃত 'বসন্ত' তখনই আসবে যখন গোড়ামির ভিত্তি, রাজনৈতিক কাঠামো, কর্পোরেট শোষণ, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে। ছোটখাটো সংস্কার, ক্ষণিকের সুবিধা, কর্পোরেট দান বা আধা-উদারনীতি দিয়ে শোষণের বহুমুখী ক্ষত আর ঢাকা যায় না। ইকবালের আহ্বান, এখন দরকার নতুন সমাজ-কাঠামো, নতুন চেতনা ও নতুন প্রভাত। বসন্ত এসেছে; এসব পট্টির বাঁধা ডিঙিয়ে শিকল ছেঁড়ার পালা।


    তাই তিনি আত্ম-আবিষ্কারের আহ্বান করে বলেন,

    کِرمکِ ناداں طوافِ شمع سے آزاد ہو  

    اپنی فطرت کے تجلّی زار میں آباد ہو


    "কিরমাকে নাদাঁ তাওয়াফে শামা সে আজাদ হো

    আপনি ফিতরত কে তাজাল্লি যার মেঁ আবাদ হো"


    হে অজ্ঞ কীট (পতঙ্গ), মোমবাতির চারপাশে পাক খাওয়ার আসক্তি থেকে মুক্ত হও। নিজের প্রকৃতির ঐশ্বর্যময় আলোয় প্রতিষ্ঠিত হও।


    এটি চূড়ান্ত ও সার্বিক স্বাধীনতার ডাক। শ্রমিককে তথাকথিত নেতা, মালিক, ধর্মীয় গোড়ামি বা রাজনৈতিক প্রতীকদের চারপাশে ঘুরে নিজেকে বিধ্বংসী আগুনে পুড়িয়ে ফেলার বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। ইকবাল শ্রমিকের নিজস্ব সহজাত মানবিক গুণাবলি, সৃজনশীল শক্তি ও প্রতিভাকে আবিষ্কার করার নির্দেশ দেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষদের নিজস্ব সংগঠন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তোলার যে অপরিহার্য প্রয়োজন, এই চরণ তারই চূড়ান্ত ঘোষণা ও পথনির্দেশ।


    আল্লামা ইকবালের 'পুঁজি ও শ্রম' উপ-পরিচ্ছেদের এই শেরগুলো নিছক কোনো কবিতা নয়। এগুলোর এক একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক দলিল। শোষিত মানবতার মুক্তির এক অনবদ্য ইশতেহার। তিনি অত্যন্ত সহজ, বোধগম্য ও একইসঙ্গে তীক্ষ্ণ ভাষায় প্রমাণ করেছেন, পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক কখনো নৈতিক বা মানবিক নয়; এটি চিরকাল ছলনা, প্রতারণা ও কৃত্রিম বিভাজনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কবিতাটি যেমন শোষকের কৌশল উন্মোচন করে, তেমনি শ্রমিকের আত্মমর্যাদা জাগ্রত করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে আত্ম-আবিষ্কারের পথ দেখায়।


    আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট—যেখানে করপোরেট সাম্রাজ্যবাদ, অসম বণ্টন, কৃত্রিম সংকট, এবং প্রান্তিক শ্রমিকের ন্যূনতম আয়ের লড়াই—ইকবালের এই দর্শনকে শতবর্ষ পরেও অম্লান ও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি কেবল বিদ্রোহের ডাক দেননি; বরং একটি নতুন সভ্যতার রূপরেখা দিয়েছেন যেখানে 'জীবনের আইন' (কানুনে হায়াত) মানুষের শ্রমের মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইকবালের চিরন্তন বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যতদিন পর্যন্ত উৎপাদকের প্রাপ্য তার হাতে ফিরে না যায় এবং কৃত্রিম বিভাজনের দেয়াল ভেঙে যায়, ততদিন পর্যন্ত সামাজিক বৈষম্য বিমোচন, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সামগ্রিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। আর সামগ্রিক অগ্রগতি ছাড়া একটা দেশ ও জাতি কখনো নিজেকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে আসীন করতে পারে না। এই কবিতা তাই শোষিতের অস্ত্র, জাগরণের প্রেরণা এবং অবিচারের বিরুদ্ধে চিরায়ত এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।


    পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের গভীর তাত্ত্বিক সংকট ও ইকবালের প্রস্তাবনা


    বর্তমান বিশ্বে পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের যে দ্বন্দ্ব, তা কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত মানুষের অস্তিত্বের সংজ্ঞায়নের লড়াই। কার্ল মার্ক্স যখন উনিশ শতকের শিল্প বিপ্লবের চরম বৈষম্যের জবাবে তাঁর 'দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ' ও সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব হাজির করেন, তখন তা শোষিত শ্রেণির মাঝে আশার আলো জ্বেলেছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক ও কবি আল্লামা ইকবাল সমাজতন্ত্রের এই বস্তুবাদী ভিত্তির এক গভীর ও অমোঘ আধ্যাত্মিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'জারবে কালিম'-এর 'সিয়াসিয়াতে মাশরিক্ব ও মাগরিব' (প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের রাজনীতি) অধ্যায়ের ‘ইশতিরাকিয়াত’ (সমাজতন্ত্র) কবিতায় ইকবাল দেখিয়েছেন, সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভুল হলো তারা মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বকে কেবল 'পেটের ক্ষুধা' বা অর্থনৈতিক উপাদানে নামিয়ে এনেছে। মানুষের যে একটি রূহ বা 'খুদি' (সত্তা) আছে, তা মার্ক্সবাদ অস্বীকার করে। ইকবাল তার কবিতার প্রথম শ্লোকে রুশ বিপ্লবের প্রতি আংশিক সমর্থন করে বলেন,


    قوموں کی روش سے مجھے ہوتا ہے یہ معلوم  

    بے سود نہیں روس کی یہ گرمی رفتار

    "কওমোঁ কি রওশ সে মুঝে হোতা হ্যায় ইয়ে মালুম

    বে-সূদ নেহি রোশ কি ইয়ে গর্মিয়ে রফতার"


    বিশ্বের জাতিসমূহের বর্তমান অবস্থা দেখে আমার মনে হচ্ছে—রাশিয়ার এই তীব্র অগ্রযাত্রা ও বৈপ্লবিক গতি, তা একেবারে বৃথা বা অর্থহীন নয়।


    ইকবাল এখানে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব এবং সমাজতন্ত্রের উত্থানকে একটি ঐতিহাসিক ঝাঁকুনি হিসেবে দেখছেন। ইউরোপের পুঁজিবাদ যেভাবে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই তীব্র প্রতিরোধকে তিনি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। শোষকদের সিংহাসন কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য এই বৈপ্লবিক গতির প্রয়োজন ছিল, এবং ইকবাল তা স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি।


    তারপর জরাজীর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানবমন বলে,


    اندیشہ ہوا شوخی افکار پہ مجبور  

    فرسودہ طریقوں سے زمانہ ہوا بیزار

    "আন্দেশা হুয়া শোখিয়ে আফকার পে মজবুর

    ফারসূদা তরিকোঁ সে জামানা হুয়া বেজার"


    মানুষের চিন্তাভাবনা আজ নতুন ও সাহসী রূপ ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে; কারণ বর্তমান যুগ পুরনো, জরাজীর্ণ ও বৈষম্যমূলক পদ্ধতিগুলোর ওপর চরম বিরক্ত।


    ইকবাল বলছেন, রাজতন্ত্র, সামন্তবাদ এবং শোষক পুঁজিবাদের পুরনো নিয়মগুলোর ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বিশ্ব এক চরম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজতন্ত্র মূলত মানুষের এই জরাজীর্ণ ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভের ফসল। মানব মস্তিষ্ক বা 'আন্দিশা' এখন বাধ্য হয়েছে নতুন কোনো ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে।


    প্রকৃতির গোপন সত্যের উন্মোচন করে বলেন,


    انساں کی ہوس نے جنھیں رکھا تھا چھپا کر  

    کھلتے نظر آتے ہیں بتدریج وہ اسرار


    "ইনসাঁ কি হাওয়াস নে জিনেঁ রাখা থা ছুপা কার

    খুলতে নযর আতে হ্যাঁয় ব-তদরীজ উয়োহ আসরার"


    মানুষের লোভ ও স্বার্থপরতা এতদিন ধরে যে সত্য ও রহস্যগুলোকে লুকিয়ে রেখেছিল, প্রকৃতির নিয়মে ধীরে ধীরে সেই গোপন রহস্যগুলো উন্মোচিত হচ্ছে।


    পুঁজিবাদী পুঁজিপতিরা তাদের চরম লোভের কারণে সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছিল এবং সাধারণ মানুষকে বোঝাত, দরিদ্ররা দরিদ্রই থাকবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এসে প্রমাণ করে দিল, সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার নয়। শোষণের এই নগ্ন সত্য ও প্রকৃতির সাম্যের নিয়মটি এখন বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কিন্তু তারা এর সমাধান যেখানে খুঁজছে সেখানেও রয়েছে আরও প্রগাঢ় অন্ধকার। তাই ইকবাল মুসলিম উম্মাহর প্রতি আহ্বান ও কুরআনের সমাধান প্রস্তাব করে বলেন,


    قرآن میں ہو غوطہ زن اے مرد مسلماں  

    اللہ کرے تجھ کو عطا جدت کردار

    "কুরআন মেঁ হো গোত্বাহ যন আয় মর্দে মুসলমাঁ

    আল্লাহ করে তুঝ কো আতা জিদ্দতে কিরদার"


    হে মুসলমান! তুমি আল্লাহর পবিত্র কুরআনের গভীর সাগরে ডুব দাও। আল্লাহ যেন তোমার চরিত্রে এক নতুন, আধুনিক ও বৈপ্লবিক রূপান্তর দান করেন।


    এটিই তাঁর কবিতার টার্নিং পয়েন্ট। ইকবাল সমাজতন্ত্রের বিপ্লবকে দেখছেন, আবার তার সীমাবদ্ধতাও জানেন। তাই তিনি মুসলিম সমাজকে বলছেন—তোমাদের সমাজতন্ত্রের পেছনে অন্ধের মতো ছোটার প্রয়োজন নেই। অর্থনৈতিক ইনসাফ বা সাম্যের যে মূল চেতনা রাশিয়া আজ ডঙ্কা বাজিয়ে প্রচার করছে, তা চৌদ্দশ বছর আগেই কুরআনে দেওয়া হয়েছে। মুসলমানরা যদি কুরআনের বিধান (যাকাত, সদকা, ফিতরা, উশর, মীরাস ইত্যাদি) সঠিকভাবে অনুসরণ করত, তবে পৃথিবীতে পুঁজিবাদী শোষণ থাকত না। ইকবাল চান, মুসলমানরা যেন কুরআনের জ্ঞানে বলীয়ান হয়ে এক নতুন বৈপ্লবিক চরিত্রের অধিকারী হয়। ন্যায়পরায়ণতার তথা ইনসাফের অর্থনীতি কায়েম করে।


    মার্ক্সবাদের মূল অসারতা প্রকাশ করে বলেন,

    تفریق اگر ہو تو فقط پیٹ کی تفریق  

    ہے کارل کے افکار کا تفکر کا یہ محمود


    "তাফরিক আগার হো তো ফাকাত পেট কি তাফরিক

    হ্যায় কার্ল কে আফকার কা তাফাক্কুর কা ইয়ে মাহমুদ"


    মানুষের বৈচিত্র্য ও বিভেদ যদি কেবল পেটের ক্ষুধাতেই সীমাবদ্ধ হয়, তবে কার্ল মার্ক্সের চিন্তাভাবনার চূড়ান্ত অর্জন কেবল এটাই, সে মানুষকে একটি রূহহীন নিস্প্রাণ পুতুলে রূপান্তর করেছে।


    ইকবাল এখানে মার্ক্সীয় দর্শনের মূল অসারতাকে আঘাত করেছেন। মার্ক্সবাদ মানুষকে কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি 'বাই-প্রোডাক্ট' মনে করে। সেখানে ব্যক্তির চেয়ে 'শ্রেণি' বড়। রাষ্ট্র বা দলই সব, ব্যক্তি কেবল একটি উৎপাদনশীল যন্ত্র। ইকবাল এর তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, মানুষের পেট যেমন সত্য, তার রূহ বা আত্মাও ঠিক তেমনি সত্য। শরীর টিকিয়ে রাখতে অন্ন বা রুটি দরকার, কিন্তু মানবত্ব টিকিয়ে রাখতে দরকার নৈতিকতা, প্রেম ও খোদাভীতি। মানুষের সব সমস্যাকে কেবল "পেটের ক্ষুধা" বা রুটি-রুজির ফ্রেমে দেখা মানুষের মর্যাদার অবমাননা। মার্ক্সবাদ মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটানোর ব্যবস্থা করতে গিয়ে তার ভেতরের 'খুদি' বা আত্মাকে হত্যা করেছে। ফলে সমাজতন্ত্রে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সমান হলেও শেষ পর্যন্ত একটি রূহহীন, নিস্প্রাণ পুতুল বা যন্ত্রে পরিণত হয়। যার বাস্তব চিত্র আজকের চীন। যেখানে মানুষ কেবল রাজনৈতিকভাবেই বন্দি নয়; বরং অর্থনৈতিক ও যান্ত্রিকভাবে মানুষ এমন এক শৃঙ্খলে আবদ্ধ যেখানে সকাল-সন্ধ্যা কেবল 'পেটের দায়ে' রোবটের মতো দৌড়াচ্ছে।


    চীনে বহুল আলোচিত একটি শব্দ হলো '৯৯৬'। যা ৯৯৬ ওয়ার্কিং আওয়ার সিস্টেম" (996 Working Hour System) নামে পরিচিত। চীনা ভাষায় এটিকে বলা হয় "996 gongzuo zhi, 'গংজুও ঝি' অর্থ কর্মপদ্ধতি বা কাজের নিয়ম। এর আরেকটি নাম বেশ পরিচিত। ৯৯৬ আইসিইউ" (996.ICU)। ২০১৯ সালে চীনা প্রোগ্রামাররা গিটহাবে একটি অনলাইন প্রতিবাদ শুরু করেন। তাদের স্লোগান ছিল,"তুমি যদি ৯৯৬ শিফটে কাজ করো, তবে তোমার জায়গা হবে আইসিইউ (Intensive Care Unit) তথা হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে"। এর পর থেকে এটি এই ব্যঙ্গাত্মক নামেও বেশ পরিচিতি পায়। এই সংখ্যার অর্থ হলো, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ আর সপ্তাহে ৬ দিন অবিরাম পরিশ্রম। এই কারণে তারা '৯৯৬' বলে। 


    সেখানকার মানুষ কোনো পারিবারিক জীবন, মানসিক শান্তি বা আধ্যাত্মিক চিন্তার সময় পায় না। মানুষ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে যন্ত্রের মতো দৌড়ায়, কারখানায় বা ডেস্কে গিয়ে রোবটের মতো ঘাম ঝরায় এবং রাতে এসে নিস্প্রাণদেহে ঘুমিয়ে পড়ে। তাদের জীবন কেবল 'পেটের ক্ষুধা' মেটানো আর বেঁচে থাকার এক অন্তহীন চক্রে আটকে গেছে। মানুষের ভেতরের 'খুদি' বা অনন্য আত্মমর্যাদা প্রকাশের কোনো সুযোগই সেখানে অবশিষ্ট নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতো পরিশ্রম আর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে পাচ্ছে কতটুকু?


    পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের জন্ম হলেও, চীনের রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রে শ্রমিকরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির তুলনায় নামমাত্র বা অতি সামান্য মজুরি পায়। চীনের বিশাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো এই সস্তা শ্রম (Cheap Labor)। একজন সাধারণ শ্রমিক বা কর্পোরেট কর্মী দিন-রাত এক করে যে পণ্য উৎপাদন করছে, তার সিংহভাগ লভ্যাংশ চলে যায় রাষ্ট্রীয় তহবিলে এবং গুটিকয়েক বড় পুঁজিপতির পকেটে। সাধারণ মানুষ কেবল ততটুকুই পায়, যা দিয়ে তারা কোনোমতে এই যান্ত্রিক জীবনটা টিকিয়ে রাখতে পারে—অর্থাৎ ঠিক যতটুকু কেবল 'পেট' চালাতে প্রয়োজন।


    সমাজতন্ত্রের মূল কথা ছিল—সম্পদের মালিক হবে জনগণ। কিন্তু চীনের বাস্তব চিত্র হলো, সেখানে এক অভিনব 'রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ' (State Capitalism) তৈরি হয়েছে। চীনের সমস্ত বড় বড় শিল্পকারখানা, জমি এবং খনিজ সম্পদের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির। এমনিভাবে কমিউনিস্ট পার্টির অনুগত একশ্রেণির অতি-ধনী বা বিলিয়নিয়ার (যেমন আলিবাবা, টেনসেন্ট বা হুয়াওয়ের মতো টেক জায়ান্টের মালিকরা) সম্পদের পাহাড় গড়ছে। কিন্তু রাষ্ট্র যখনই মনে করে, তখনই সেই সম্পদ বা ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিতে পারে। এখানে সাধারণ মানুষ বা শ্রমিকের সম্পদের ওপর কোনো প্রকৃত মালিকানা নেই। তারা কেবল রাষ্ট্র এবং দলের তৈরি করা বিশাল এক অর্থনৈতিক মেশিনের ছোট ছোট নাট-বল্টু বা যন্ত্রাংশ মাত্র।


    চীন ইকবালের এই কবিতার মূল সুরকে একবিংশ শতাব্দীতে এসে সত্য প্রমাণ করেছে। কার্ল মার্ক্স ভেবেছিলেন ধর্মের আফিম থেকে মানুষকে মুক্ত করে পেটের ভাত নিশ্চিত করলেই মানুষ সুখী হবে। কিন্তু চীন আজ প্রমাণ করেছে, মানুষের ভেতরের নৈতিকতা, প্রেম, এবং খোদাভীতিকে (রূহানিয়াত) হত্যা করে তাকে কেবল অর্থনৈতিক উপাদান দিয়ে চালালে, মানুষ একসময় তার মানবিক সত্তাই হারিয়ে ফেলে; যান্ত্রিক অথবা রোবটিক লাইফের হয়ে যায়।


    আজকের চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের কোটি কোটি মানুষ আজ টাইম টু টাইম ঘড়ির কাঁটা ধরে দৌড়ানো এক একটি জীবন্ত রোবট। মার্ক্স ও মাওবাদের হাত ধরে তৈরি হওয়া এই ব্যবস্থা মানুষকে ক্ষুধার অন্ন হয়তো দিয়েছে, কিন্তু তার বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে মানুষের 'খুদি' বা তার আত্মার স্বাধীনতা। ভুলিয়ে দিয়ে তার আসল পরিচয়।


    ইকবালের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো 'খুদি'। যা মানুষের ভেতরের সেই খোদা-প্রদত্ত আত্মমর্যাদা, রূহানি শক্তি এবং অনন্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। কার্ল মার্ক্সের তত্ত্ব মূলত 'দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ' এবং অর্থনৈতিক উপাদানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইকবাল মনে করেন, শুধু অর্থনৈতিক বিভেদ দূর করলেই মানুষের জীবনের পরম লক্ষ্য অর্জিত হয় না। মানুষের রূহানি এবং নৈতিক বিকাশ থমকে দাঁড়ালে মানবসভ্যতা অন্ধ হয়ে যায়।


    আল্লামা ইকবাল সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সমতার ধারণাকে (পুঁজিবাদের শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কারণে) পুরোপুরি ফেলে দেননি, কিন্তু এর নাস্তিক্যবাদ ও আধ্যাত্মহীনতাকে তীব্র ঘৃণা করতেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত ফারসি মহাকাব্য 'জাভিদ নামাতে' (Javid Nama, 1932)-এ কার্ল মার্ক্স এবং তাঁর তত্ত্বের এই আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে চিহ্নিত করে একটি যুগান্তকারী রুবাইয়াত রচনা করেছেন।


    صاحبِ سرمایہ از نسلِ خلیل

    یعنی آں پیغمبرِ بے جبرئیل

    ایں کلیمِ بے تجلی، ایں مسیحِ بے چلیپا

    نیست پیغمبر و لیکن در بغل دارد کتاب


    "ছাহিবে ছরমায়া আয নছলে খলীল,

    ইয়া'নি আঁ পয়গম্বরে বে-জিবরাঈল

    ইঁ কলীমে বে-তাজাল্লী, ইঁ মসীহে বে-চালীপা,

    নেস্তে পয়গম্বর ও লেকিন দর বগল দারদ কিতাব"


    'ডাস ক্যাপিটাল’ (পুঁজি) গ্রন্থের প্রণেতা তো খলীলুল্লাহ হযরত ইব্রাহিম আ.-এর বংশধর (যেহেতু মার্ক্স ইহুদি বংশোদ্ভূত ছিলেন)। তাকে দেখে মনে হয়, সে যেন জিবরাইল (আ.)-এর ওহী ছাড়াই একজন নবী বা বার্তাবাহক! সে এক ঐশ্বরিক আলোহীন মুসা (কলীম) এবং ক্রুশবিহীন ঈসা (মসীহ)। সে নিজে কোনো নবী বা পয়গম্বর নয়, অথচ তার বগলে একটি কিতাব নিয়ে ফিরছে।


    ইকবাল এখানে অত্যন্ত চমৎকার ও গভীর কিছু রূপক ব্যবহার করেছেন। মার্ক্স একটি কিতাব রচনা করে ভেবেছিলেন পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা এর ফর্মুলায় মুছে যাবে। যেনো পয়গাম্বরদের ঐশ্বরিক কিতাবের ন্যায় কোনো কিতাব তিনি নিয়ে এসেছেন জমিনে। পাশাপাশি তৎকালীন দুনিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীও মার্ক্সকে তাদের সকল দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তির ত্রাণকর্তা ভেবে বসেছিল, যেভাবে নবীদের ভাবা হয়। মার্ক্স ছিলেন আবার ইহুদি। তাই ইহুদিদের কাছে আসা মুক্তির ত্রাণকর্তা দুই নবীর নাম সামনে এনে, তিনি তাদের বুঝালেন তোমরা মার্ক্সকে হযরত মুসা (কলীমুল্লাহ) ও হযরত ঈসা (মসীহ)-এর মতো গ্রহণ করে নিতে চাচ্ছো এই কারণে যে, মার্ক্স পৃথিবীর মজলুম ও শোষিত মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন; যা বাহ্যিকভাবে তোমাদের কাছে আসা নবীদের চরিত্রের মতো। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও ঘাটতি হলো, তাঁর এই মতবাদে বাস্তব কোনো আসমানী আলো (ওহী) বা রূহের আধ্যাত্মিকতা নাই। যা ছাড়া মানবসভ্যতা তার কাঙ্খিত হেদায়াত এবং আলোর দেখা কখনো পাবে না।


    তাই ইকবাল তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন "বিনে নূর মুসা, বিনে ক্রুশ ঈসা" হিসেবে। অর্থাৎ, মুসা (আ.) যেমন আল্লাহর তাজাল্লি বা নূর দেখেছিলেন এবং সেই নূর তাওরাতে করে নিয়ে এসেছিলেন, মার্ক্সের চিন্তায় সেই রূহানি আলো নেই। আবার ঈসা (আ.) যেভাবে (তাদের বিশ্বাসমতে) মানবজাতির জন্য নিজের জীবন ত্যাগ করে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন, মার্ক্সের কাছে সেই আত্মিক উচ্চতা নেই। তার কাছে কেবল একটি পার্থিব কিতাব ('ডাস ক্যাপিটাল') আছে, যা মানুষকে কেবল বৈষয়িক বা জাগতিক ফ্রেমে বন্দি করে।


    ইকবাল বুঝিয়েছেন, শরীর টিকিয়ে রাখতে অন্ন বা রুটি দরকার, কিন্তু মানবত্ব টিকিয়ে রাখতে দরকার নৈতিকতা, প্রেম ও খোদাভীতি। মানুষের সব সমস্যাকে কেবল "পেটের ক্ষুধা" বা রুটি-রুজির ফ্রেমে দেখা মানুষের মর্যাদার চরম অবমাননা। মার্ক্সবাদ মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটানোর ব্যবস্থা করতে গিয়ে তার ভেতরের খুদি বা আত্মাকে হত্যা করেছে। ফলে এই সমাজতান্ত্রিক দর্শনে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে তার সাথে বাস করা শ্রেণির সমান হওয়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত একটি রূহহীন, নিস্প্রাণ পুতুল বা যান্ত্রিক দাসে পরিণত হয়।


    ইকবাল বিশ্বাস করতেন, ইসলাম এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা দেয় যা পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র কোনোটিই দিতে পারে না। ইসলামে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ভিত্তিতে মানুষ সব ধরনের জাগতিক গোলামি (তা সে পুঁজি বা রাষ্ট্র যাই হোক) থেকে মুক্ত হয়। ইসলামে যাকাত ও সাদাকার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাতে সম্পদ কেবল ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত না থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, ইসলাম অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্তার বিকাশ ঘটায়। এখানে পেট এবং আত্মা—উভয়েরই খোরাক নিশ্চিত হয়।


    ইকবালের এই কবিতাটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার জন্য এক মহা সতর্কবার্তা। কেবল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া বা বৈষয়িক প্রবৃদ্ধি অর্জনই মানব জীবনের শেষ কথা নয়। মানুষ যদি তার রূহানি সত্তা বা 'খুদি'কে হারিয়ে ফেলে, তবে সে যতই সাম্যের বুলি আওড়াক না কেন, সে মূলত এক যান্ত্রিক দাসত্বেই বন্দি থাকে। কার্ল মার্ক্সের চিন্তা মানুষকে পেটের ক্ষুধার দ্বন্দ্বে নামিয়ে এনে যে ভুল করেছিল, ইকবাল মানুষকে তার ঐশ্বরিক রূহের সন্ধান দিয়ে সেই ভুলের সংশোধন করেছেন। প্রকৃত মুক্তি কেবল অর্থনৈতিক সাম্যে নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জাগরণের মাধ্যমে এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে।


    একইভাবে, পাশ্চাত্য সমাজব্যবস্থার ভণ্ডামি উন্মোচন করতে গিয়ে তিনি "বালে জিবরিল" গ্রন্থের ঐতিহাসিক ‘লেনিন খোদা কে হুজুর মেঁ’ (আল্লাহর দরবারে লেনিন) কবিতায় পুঁজিবাদের অমানবিক রূপ প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি পুঁজিপতিদের বাহ্যিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রক্তচোষা চরিত্রকে তুলে ধরেন। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত এই কবিতাটি বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে ইকবাল পশ্চিমা পুঁজিবাদের নিখুঁত জবানবন্দি ফুটিয়ে তুলেছেন। ইকবাল কল্পনা করে দেখিয়েছেন—লেনিন যখন মৃত্যুর পর আল্লাহর মুখোমুখি হন, তখন তিনি স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়ে পশ্চিমা পুঁজিবাদের শোষণের এক দীর্ঘ অভিযোগনামা পেশ করেন। সৃষ্টিজগতে আল্লাহর নিদর্শন দিয়ে শুরু করেন ইকবাল,


    اے انفس و آفاق میں پیدا تری آیات  

    حق یہ ہے کہ ہے زندہ و پائندہ تری ذات


    "আয় আনফুস ও আফাক মেঁ পয়দা তেরি আয়াত

    হক ইয়ে হ্যায় কেহ হ্যায় জিন্দা ও পায়েন্দা তেরি জাত"


    হে স্রষ্টা! মানুষের অন্তর ও বিশ্বজগতে তোমার নিদর্শন বিদ্যমান। সত্য হলো—তুমি চিরঞ্জীব ও স্থায়ী সত্তা।


    লেনিন যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হন, তিনি প্রথমেই স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর নিদর্শন সম্পর্কে স্বীকারোক্তি দেন। ইকবাল এখানে দেখান, যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নাস্তিক ছিলেন, তিনিও মৃত্যুর পর ঐশ্বরিক সত্যের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হন। এটি পশ্চিমা বস্তুবাদের চূড়ান্ত পরাজয়ের ইঙ্গিত।

     তারপর যুক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বলেন,


    میں کیسے سمجھتا کہ تو ہے یا کہ نہیں ہے  

    ہر دم متغیر تھی خرد کی نظریات


    "ম্যায় কেয়সে সমঝতা কেহ, তু হ্যায় ইয়া কেহ নেহি হ্যায়

    হর দম মতাগায়্যির থি খিরদ কি নযরিয়াত"


    আমি কীভাবে বুঝব যে, তুমি আছো কি নেই? কারণ মানুষের যুক্তি-বুদ্ধি তো প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তনশীল।


    ইকবাল এখানে মানবিক যুক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। পশ্চিমা দার্শনিকরা যুক্তির মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটনের দাবি করে, কিন্তু যুক্তি নিজেই পরিবর্তনশীল ও আপেক্ষিক। ঐশ্বরিক সত্য যুক্তির উর্ধ্বে; এটি অনুভবের বিষয়, গণনার নয়।


    প্রকৃতির চিরন্তন সংগীতের তাৎপর্য উচ্চারণ করে বলেন,

    محرم نہیں فطرت کے سرود ازلی سے  

    بینائے کواکب ہو کہ دانائے نباتات


    "মাহরাম নেহি ফিতরত কে সরুদে আজালি সে

    বীনায়ে কাওয়াকিব হো কেহ দানায়ে নাবাতাত"


    মহাবিশ্বের নক্ষত্রবিজ্ঞানী হোক কিংবা উদ্ভিদবিজ্ঞানী—প্রকৃতির সেই চিরন্তন ও আদিম সুরের আসল রহস্য কারো জানা নেই।


    ইকবাল বিজ্ঞান ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী তারারা গণনা করে, উদ্ভিদবিদ গাছপালা বিশ্লেষণ করে—কিন্তু কেউই প্রকৃতির মর্মবাণী ও সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন করতে পারে না। পশ্চিমা বিজ্ঞান বাহ্যিক জগৎ আবিষ্কার করলেও আধ্যাত্মিক সত্য থেকে বঞ্চিত।


    গির্জার ভণ্ডামি উন্মোচন করে বলেন,

    آج آنکھ نے دیکھا تو وہ عالم ہوا ثابت  

    میں جس کو سمجھتا تھا کلیسا کی خرافات


    "আজ আঁখ নে দেখা তো উয়োহ আ'লম হুয়া সাবিত

    ম্যাঁ জিস কো সমঝতা থা কালিসা কি খুরাফাত"


    আজ চোখ খুলে দেখলাম—যে জগৎকে আমি গির্জার কুসংস্কার ভাবতাম, তা আসলে সত্য।


    লেনিন পৃথিবীতে গির্জার অধর্মী ভণ্ডাচারের কারণে ধর্মীয় আচার-আচরণকে কুসংস্কার মনে করতেন। কিন্তু আল্লাহর দরবারে এসে তিনি বুঝতে পারেন—আধ্যাত্মিক জগৎ বাস্তব; যা তিনি ভুল বুঝেছিলেন। ইকবাল এখানে পশ্চিমা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভণ্ডামি ও প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন।


    মানবতার অসহায় অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন,

    ہم بند شب و روز میں جکڑے ہوئے بندے  

    تو خالق آثار و نگارندہ آنات


    "হাম বন্দে শব ও রোজ মেঁ জাকড়ে হুয়ে বান্দে

    তু খালিক্বে আসার ও নিগারিন্দায়ে আনাত"


    আমরা দিন ও রাতের (সময়ের) বন্ধনে বন্দি থাকা সাধারণ দাস, আর  তুমি সময়ের স্রষ্টা ও যুগের চিত্রকর।


    মানুষ সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ, অথচ আল্লাহ সময়েরও স্রষ্টা। ইকবাল দেখান, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষকে সময়ের দাস বানায়। ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী জীবন চলে। অথচ স্রষ্টা সেই সময়কেও সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃত মুক্তি হলো সময়ের গোলামি থেকে বেরিয়ে আসা।


    দার্শনিকদের অক্ষমতা তোলে ধরেন,

    ایک بات اگر مجھ کو اجازت ہو تو پوچھوں  

    حل کر نہ سکے جس کو حکیموں کے مقالات


    "এক বাত আগর মুঝ কো ইজাযত হো তো পূছোঁ

    হল কর না সিকে জিস কো হাকিমোঁ কে মাক্বালাত"


    যদি অনুমতি দাও, একটি কথা জিজ্ঞাসা করি। যার সমাধান দার্শনিকদের গ্রন্থেও নেই।


    লেনিন আল্লাহর কাছে সেই প্রশ্নটি উত্থাপন করতে চান যা পৃথিবীর সব দার্শনিক সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইকবাল ইঙ্গিত করেন, পশ্চিমা দর্শন (অ্যারিস্টটল থেকে মার্ক্স পর্যন্ত) মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি; কারণ তারা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করেছে।


    হৃদয়ের চিরন্তন জিজ্ঞাসা দরজ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, 

    جب تک میں جیا خیمۂ افلاک کے نیچے  

    کانٹے کی طرح دل میں کھٹکتی رہی یہ بات


    "জব তক ম্যায় জিয়া খায়মায়ে আফলাক কে নীচে

    কাঁটে কি তারাহ দিল মেঁ খটকতি রহী ইয়েহ বাত"


    এই আকাশের তাবুর নিচে যতদিন আমি বেঁচে ছিলাম, একটি বিষয় কাঁটার মতো আমার হৃদয়ে সারাক্ষণ বিঁধছিল।


    লেনিন বলেন—সারাজীবন এই প্রশ্নটি তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। ইকবাল দেখান, আধ্যাত্মিক সত্যের প্রতি মানুষের অন্তর্নিহিত আকর্ষণ কখনো মরে না। পুঁজিবাদী বস্তুবাদী কিংবা আবদ্ধ কোনো ধর্মীয় চিন্তার শিক্ষা যতই চাপিয়ে দেওয়া হোক, মানুষ তার সত্তার গভীরে ঐশ্বরিক সন্ধান চালায়। আল্লাহ তায়ালা মানুষের ভিতরেই সত্যান্বেষণের এক আগুন রেখেছেন, যখন সেটা জ্বলে ওঠে টালবাহানা আর ছলচাতুরীপূর্ণ কোনো ব্যাখ্যা কিংবা বুঝ দিয়ে দমানো যায় না। যতক্ষণ সেই আগুন নিভিয়ে রাখা হয় ততক্ষণই একজন মানুষকে ভুলভাল চিন্তার অনুগামী বানিয়ে দাসের মতো অনুসারী বানানো যায়।


    ইকবালের কথার বন্যায় এবার আবেগ,

    گفتار کے اسلوب پہ قابو نہیں رہتا  

    جب روح کے اندر متلاطم ہوں خیالات


    "গুফতার কে উসলুব পে কাবু নেহি রহতা

    জব রূহ কে আন্দর মুতালাত্বিম হুঁ খেয়ালাত"


    যখন আত্মার মধ্যে তরঙ্গায়িত হয় চিন্তার বন্যা, তখন কথার শৈলী আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না।


    লেনিনের আবেগোদ্বেগ প্রকাশ পায়। ইকবাল দেখান, ঐশ্বরিক সত্যের সম্মুখীন হলে যুক্তি-তর্কের বাঁধা ভেঙে যায়। আত্মার গভীর গভীর অনুভূতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে। পুঁজিবাদ মানুষকে আবেগহীন যন্ত্র বানাতে চায়, কিন্তু আত্মা তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলে।


    পশ্চিমা জ্ঞানের অন্ধকার দিকটি স্পষ্ট করে ইকবাল বলেন, 

    یورپ میں بہت روشنی علم و ہنر ہے  

    حق یہ ہے کہ بے چشمۂ حیواں ہے یہ ظلمت


    "ইউরপ মেঁ বহুত রউশনিয়ে ইলম ও হুনার হ্যায়

    হক ইয়েহ হ্যায় কেহ বে-চশমায়ে হায়ওয়াঁ হ্যায় ইয়ে জুলমাত"


    ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো অনেক। কিন্তু সত্য হলো, এই আলো জীবনদায়ী ঝর্ণাবিহীন অন্ধকার মাত্র।


    ইকবাল পশ্চিমা সভ্যতার চরম সমালোচনা করেন। তথাকথিত 'আলো'—বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প—যদি আধ্যাত্মিকতার ঝর্ণা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তা প্রকৃতপক্ষে অন্ধকার। পুঁজিবাদ মানুষকে বাহ্যিকভাবে আলোকিত করে, কিন্তু অন্তরকে শূন্য ও নিস্প্রাণ রাখে।


    ব্যাংক বনাম গির্জার তুলনামূলক পাঠ, 

    رعنائی تعمیر میں، رونق میں، صفا میں  

    گرجوں سے کہیں بڑھ کے ہیں بنکوں کی عمارات


    "রা'নায়িয়ে তা'মির মেঁ, রওনক্ব মেঁ, সাফা মেঁ

    গির্জোঁ সে কহীঁ বাড়হ কে হেঁ ব্যাঙ্ককোঁ কি ইমারাত"


    স্থাপত্যের সৌন্দর্য, জাঁকজমক ও শ্বেতশুভ্রতায় গির্জার চেয়ে ব্যাংকের ভবন অনেক বেশি উন্নত।


    ইকবাল প্রতীকীভাবে দেখান, পশ্চিমা সমাজে অর্থের উপাসনা ধর্মীয় উপাসনাকে ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকের ইমারত যেখানে আধুনিকতার প্রতীক, গির্জা সেখানে পিছিয়ে পড়েছে। এটি পুঁজিবাদের 'অর্থপূজা'র চূড়ান্ত রূপ।


    যন্ত্রের শাসনে হচ্ছে হৃদয়ের মৃত্যু,

    ہے دل کے لیے موت مشینوں کی حکومت  

    احساسِ مروت کو کچل دیتے ہیں آلات


    "হ্যায় দিল কে লিয়ে মওত মাশিনোঁ কি হুকুমাত

    এহসাসে মুরুউওয়াত কো কুচল দেতে হ্যাঁয় আলাত"


    মানুষের হৃদয়ের জন্য এই মেশিনের শাসন হলো সাক্ষাৎ মৃত্যু। কারণ কৃত্রিম যন্ত্রগুলো মানুষের পারস্পরিক সহানুভূতি ও মানবিক বোধকে পিষে চূর্ণ করে দেয়।


    ইকবাল পুঁজিবাদের সবচেয়ে মারাত্মক মানসিক ব্যাধি চিহ্নিত করেন। ‘দিল’, যা প্রেম, করুণা ও আধ্যাত্মিকতার আধার, তা মরে যায়। মানুষ নিজেই একটি অনুভূতিহীন যন্ত্রে পরিণত হয়। যন্ত্রের কোনো দয়া-মায়া নেই; পুঁজিবাদের যান্ত্রিক নিয়ম মানুষের ভেতরকার মমতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতাকে সম্পূর্ণ কুচকে ফেলে (এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ নিজের লাইফে পেয়েছি ই-লার্নিংয়ে জবের সুবাদে। পুঁজিবাদের এই ঘৃণ্য রূপের সামান্য হলেও চাক্ষুষ সাক্ষী হতে পেরেছি সেখানে)।


    ভাগ্যের চাল ও পরিকল্পনার পরাজয়

    آثار تو کچھ کچھ نظر آتے ہیں کہ آخر  

    تدبیر کو تقدیر کے شاطر نے کیا مات


    "আসার তো কুছ কুছ নজর আতে হ্যাঁয় কেহ আখির

    তাদবীর কো তাকদীর কে শাতির নে কিয়া মাত"


    কিছু কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে, ভাগ্যের চতুর খেলোয়াড় মানুষের সমস্ত পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টাকে পরাস্ত করে দিয়েছে।


    ইকবাল আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পুঁজিপতিরা যতই পরিকল্পনা (তাদবীর) করুক, ভাগ্য বা ইতিহাসের গতি (তাকদীর) তাদের কৌশলকে পরাজিত করবে। দাবায় যেমন 'শাতির' শেষ পর্যন্ত জিতে যায়, তেমনই ইতিহাসের মহান শক্তি পুঁজিবাদের চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দেবে।


    তখন শোষকদের আড্ডায় আসবে কম্পন,

    مے خانے کی بنیاد میں آیا ہے تزلزل  

    بیٹھے ہیں اسی فکر میں پیران خرابات


    "ময়খানে কি বুনিয়াদ মেঁ আয়া হ্যায় তাযালযুল

    বয়ঠে হ্যাঁয় ইসি ফিকর মেঁ পীরানে খারাবাত"


    মদের আড্ডার তথা শোষকদের সাম্রাজ্যের ভিত আজ প্রকম্পিত। আর সেই চিন্তায় মদের বুড়ো রক্ষক বা জালিম শাসকরা অস্থির হয়ে পড়েছে।


    ‘ময়খানা (মদ্যশালা)’ এখানে পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী শক্তির প্রতীক। তাদের সাম্রাজ্য কাঁপছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, শ্রমিক আন্দোলন সব মিলিয়ে পুঁজিবাদের ভিত্তি দুর্বল। ‘পীরানে খারাবাত’ তথা যারা এ ব্যবস্থা পরিচালনা করে, তারা আজ আতঙ্কিত। কারণ বুঝতে পারছে তাদের সাম্রাজ্য আর বেশিদিন টিকবে না।


    শোষকদের মুখের কৃত্রিম আভা নিয়ে বলেন,

    چہروں پہ جو سرخی نظر آتی ہے سر شام  

    یا غازہ ہے یا ساغر و مینا کی کرامات


    "চেহরোঁ পে জো সুরখি নজর আতি হ্যায় সরে শাম

    ইয়া গাযা হ্যায় ইয়া সাগর ও মীনা কি কারামাত"


    সন্ধ্যাবেলায় শোষক এলিটদের চেহারায় যে লালচে উজ্জ্বলতা বা রক্তের আভা দেখা যায়, তা তাদের স্বাস্থ্য বা প্রকৃত জাঁকজমক নয়। তা মূলত কৃত্রিম পাউডার-মেকআপ অথবা মজলুমের রক্তে ভরা শরাবের পেয়ালার কারামত।


    ইকবাল তীব্র ব্যঙ্গ করেন। পুঁজিপতিদের বাহ্যিক জাঁকজমক, ক্লাবের ঝাড়বাতিতে তাদের মুখের লালিমা, আভিজাত্য, সবই কৃত্রিম। একদিকে প্রসাধনী (গাযা), অন্যদিকে মজলুমের রক্তে ভরা পেয়ালা (সাগর ও মীনা), এই আভা তাদের শোষণেরই প্রতিফলন, প্রকৃত কোনো মহত্ত্ব নয়।


    পাশ্চাত্য সভ্যতার ব্যর্থতা ঘোষণা করে বলেন,

    بیکاری و عریانی و مے خواری و افلاس  

    کیا کام ہیں فرنگی مدنیت کی فتوحات


    "বেকারি ও উরিয়ানি ও ময়খারি ও আফলাস

    কিয়া কাম হেঁ ফারাঙ্গি মাদানিয়াত কি ফুতুহাত"


    বেকারত্ব, নগ্নতা, মদ্যপান আর চরম দারিদ্র্য, এগুলো কি পাশ্চাত্য সভ্যতার বিজয়ের নিদর্শন?


    ইকবাল পশ্চিমা সভ্যতার তথাকথিত 'অগ্রগতি'কে প্রশ্ন করেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, সব কিছু সত্ত্বেও পশ্চিমা সমাজ বেকারত্ব, নৈতিক অবক্ষয় ও চরম দারিদ্র্যে ভুগছে। লুণ্ঠন ছাড়া, উপনিবেশ ছাড়া তাদের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা মহা দায়। ভিতর থেকে এরকম দেউলিয়া অবস্থা তাদের। এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রমাণ।


    আধ্যাত্মিক শূন্যতায় প্রযুক্তির হালত,

    وہ قوم کہ فیضان سمائی سے ہو محروم  

    حد اس کے کمالات کی ہے برق و بخارات


    "উয়োহ কওম কেহ ফয়যানে সামায়ি সে হো মাহরুম

    হদ্দ উস কে কামালাত কি হ্যায় বারক্ব ও বুখারাত"


    যে জাতি ঐশ্বরিক অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত, তার উন্নতির সীমা হলো বিদ্যুৎ ও বাষ্পশক্তি (পার্থিব প্রযুক্তি)।


    এই বিদ্যুৎ-বাষ্পের প্রতিটি উৎপাদনের পেছনে রয়েছে শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি, ঘাম ও রক্ত। যা পুঁজিপতিরা নিজেদের মুনাফার জন্য শোষণ করে; অথচ আধ্যাত্মিক দৃষ্টিহীনতার কারণে সেই শ্রমের মর্যাদা তারা কখনো স্বীকার করে না। ইকবাল দেখান, পশ্চিমা জাতি যদিও প্রযুক্তিতে উন্নত, কিন্তু আধ্যাত্মিক শূন্যতার কারণে তাদের অগ্রগতি সীমাবদ্ধ। বিদ্যুৎ, বাষ্প, ডিজিটাল প্রযুক্তি এসব বাহ্যিক উন্নতির প্রকৃত উপকারিতা লাভ হয় আত্মার উৎকর্ষে। এই বস্তুবাদী উন্নতির প্রতিটি স্তরেই শ্রমিকের শরীর-মন-সময় নিঃশেষিত হয়। কিন্তু পুঁজিপতিরা তার মূল্য দেয় না; বরং সেই শ্রমকে তারা নিজেদের পুঁজি বৃদ্ধির হাতিয়ার বানায়। ইকবাল এখানে শ্রমের প্রতি পশ্চিমা সমাজের এই অবজ্ঞা ও শোষণকে ইঙ্গিত করেন।


    এবার লেলিন আল্লাহর কাছে শ্রমিকের তিক্ত সময় নিয়ে অভিযোগ করে বলেন,

    تو قادر و عادل ہے مگر تیرے جہاں میں  

    ہیں تلخ بہت بندۂ مزدور کے اوقات


    "তু কাদির ও আদিল হ্যায় মাগার তেরে জাহাঁ মেঁ

    হ্যাঁয় তালখ বহুত বান্দায়ে মজদুর কে আওকাত"


    তুমি সর্বশক্তিমান ও ন্যায়পরায়ণ, কিন্তু তোমার এই পৃথিবীতে শ্রমিকের জীবনযাপন অত্যন্ত তিক্ত! নিদারুণ কষ্টের! 


    লেনিন আল্লাহর কাছে শ্রমিকের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। স্রষ্টা যেমন ন্যায়পরায়ণ, পৃথিবী তেমনই এর ঠিক উল্টো শোষণে কেনো পূর্ণ? ইকবাল এখানে 'অমঙ্গলের সমস্যা' উত্থাপন করেন। উত্তর হলো, মানুষের দেওয়া কৃত্রিম ব্যবস্থাই দায়ী, আল্লাহর সৃষ্ট ব্যবস্থা নয়; তাই পুঁজিবাদী কাঠামো পরিবর্তন করা জরুরি।


    আল্লা'র দরবারে লেলিনের চূড়ান্ত প্রশ্ন, কবে ডুববে পুঁজির জাহাজ?

    کب ڈوبے گا سرمایہ پرستی کا سفینہ؟  

    دنیا ہے تری منتظرِ روزِ مکافات


    "কব ডুবেগা সারমায়া পরস্তি কা সাফিনা?

    দুনিয়া হ্যায় তেরি মুন্তাজিরে রোজে মুকাফাত"


    হে আল্লাহ! এই অর্থপূজা ও পুঁজিবাদের শোষণের জাহাজ আর কতদিন ভাসবে? এটি কবে ডুববে? শোষিত পৃথিবী আজ এই জালিম ব্যবস্থার চূড়ান্ত শাস্তির দিনের (روزِ مکافات-এর) অপেক্ষায় প্রহর গুনছে (Allama Iqbal, Bal-i-Jibril, 1935, 'Lenin Khuda Ke Hazoor Mein', p. 144)।


    ইকবালের এই চূড়ান্ত প্রশ্নটি সমগ্র কবিতার কেন্দ্রবিন্দু। ‘রোজে মুকাফাত’ কেবল পরকালের নয়; এটি এই মর্ত্যের বুকেই জালিম ব্যবস্থার পতন ও শোষিত মানুষের জাগরণের দিন। ইকবাল বিশ্বাস করতেন, যে ব্যবস্থা অন্যায়ের ওপর টিকে থাকে, প্রকৃতি বা আল্লাহর নিয়মে তার ধ্বংস অনিবার্য।


    লেনিনের এই অভিযোগ ও প্রশ্নের পর কবিতার দৃশ্যপট পুরোপুরি পাল্টে যায়। এ যেন খোদা প্রদত্ত এক পশ্চিমা ঝঞ্ঝার হুঙ্কার, যা কাঁপিয়ে দিয়েছে দ্বান্দ্বিক বৈষম্যের সমাজব্যবস্থার অস্থির চিত্র। খোদা নিজেই যেন পুঁজিবাদী জালিমের বিরুদ্ধে অগ্নিকণ্ঠ; তিনি নিজেই পাঠ করছেন আগামীর বিপ্লবের মেনিফেস্টো। ফেরেশতারাও যেন প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষক-মজুরের বেশে পৃথিবীতে আগমনের জন্য। লক্ষ্য একটাই, কৃষক-মজুর তথা মাজলুম মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মেলাবে ইনসাফ ও ইনকিলাবের লড়াইয়ে।


    ইকবালের বয়ানে খোদা নিজেই বিপ্লবের মন্ত্র পাঠ করেন পরের কবিতা "ফরমানে খোদা"-তে,


    اوٹھو، میری دنیا کے غریبوں کو جگا دو

    کاخِ امرا کی در و دیوار ہلا دو

    "উটঠো মেরি দুনিয়া কে গরিবোঁ কো জাগা দো

    কাখে উমারা কি দর ও দিওয়ার হিলা দো"


    ওঠো হে ফেরেশতারা, আমার দুনিয়ার গরিবদের জাগিয়ে দাও।

    (তাদের বিপ্লবমুখী হতে বলো। হে দুনিয়ার মাজলুমেরা, বিপ্লবী হয়ে)জালেম শাসকদের প্রাসাদের ভিত নাড়িয়ে দাও।


    جس کھیت سے دہقان کو میسر نہیں روزی

    اس کھیت کے ہر خوشۂ گندم کو جلا دو

    "জিস খেত সে দেহকাঁ কো মায়াসসার নেহি রোজি

    ইস খেত কে হর খোশায়ে গান্দুম কো জ্বালা দো"


    কৃষক যেখানে পায় না ন্যায্য হিস্যা সেখানে তোমরা যাও

    সে জমির প্রতিটি শীষে আগুন ধরিয়ে দাও।


    এমন বিপ্লবাত্মক আহ্বানের মধ্য দিয়ে খোদা যেন তার আরশেও শান্তি পান না; নেমে আসতে চান মজলুমের মিছিলে। তাই বলেন,


    میں ناخوش و بیزار ہوں مرمر کی سلوں سے

    میرے لیے مٹی کا حرم اور بنا دو

    "ময়ঁ নাখুশ ও বেজার হোঁ মারমার কি সিলোঁ সে

    মেরে লিয়ে মিট্টি কা হরম আওর বানা দো"

    তখতে বসেও নাখোশ আমি, খাস মহলে নেই আরাম,

    মজলুমের পাশে মাটির ঘরে, বানাও আমার ঘর হারাম (এই সমাজ ভেঙে খোদায়ী সমাজ গড়ার আদেশ আসে)।


    উল্লেখ্য, এই ফরমানে খোদা’ অংশটি ‘লেনিন খোদা কে হুজুর মে’ কবিতারই চূড়ান্ত পর্যায়। যা নিয়ে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। সত্যের প্রকৃত দর্শন হলো, সে সবসময় নিপীড়িতের পাশে থাকে। পুঁজিবাদী জুলুমের বিষবাষ্পে এ দুনিয়া যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন, সেখানে মজলুমের পক্ষাবলম্বন করা, তাঁর সপক্ষে কথা বলা, তাঁর হাতকে শক্তিশালী করা খোদ পয়গম্বরের কাজের অনুরূপ। ফেরেশতাদেরকে মজলুমের কাতারে শামিল হওয়ার মধ্য দিয়ে খোদা যেন প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার হুকুম করছেন। এ এক নয়া জিন্দেগির নয়া বন্দোবস্ত। 


    আল্লামা ইকবালের ‘লেনিন খোদা কে হুজুর মে’ কবিতাটি পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এক চিরায়ত বিদ্রোহের দলিল। তিনি দেখান, পশ্চিমা সভ্যতা যতই জ্ঞান-বিজ্ঞান, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলুক, তার মূল চালিকাশক্তি হলো রক্তচোষা অর্থপূজা। যন্ত্রের শাসনে মানুষ তার হৃদয় ও মানবিক বোধ হারিয়ে ফেলে; শ্রমিকের জীবন হয় তিক্ত ও অনিশ্চিত। লেনিনের জবানিতে ইকবাল সেই সব অভিযোগ উত্থাপন করেন, যা পশ্চিমা দার্শনিকরা কখনো সমাধান করতে পারেননি। কিন্তু ইকবাল হতাশ নন। তিনি ঘোষণা করেন, এই শোষণের জাহাজ একদিন ডুববেই। ইতিহাসের গতি ও আল্লাহর বিচার তা অনিবার্য করে তুলেছে। খোদা নিজেই যেনো ফেরেশতা নিয়ে শোষিতের পক্ষে এই বিপ্লবী মিছিলে শামিল হতে চান। শুধু উদ্যোক্তার প্রয়োজন। দুনিয়া থেকে শুধু কিছু আয়োজক দরকার। কারণ এটাই দুনিয়া পরিচালনার নেযাম। যারা প্রতিষ্ঠা করবেন ইনসাফের সমাজ। প্রকৃত মুক্তি তাই পুঁজির দাসত্বে নয়, বরং আধ্যাত্মিক জাগরণ ও নৈতিক সমাজ বিনির্মাণে। যেখানে প্রতিটি শ্রমিক, প্রতিটি মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার পায়, প্রতিটি হৃদয় মানবিক মমতায় সজীব থাকে। আর এই দায়িত্ব বহন করতে হবে আমাদের; মুসলিমদের। কারণ, আল্লাহ এই দায়িত্ব মুসলিমদের জন্যই অবধারিত করেছেন। তাঁদের সৃষ্টিই করেছেন মানুষের জন্য। যুগে যুগে মাজলুমের ভাগ্য বদল হয়েছে তাঁদের হাত ধরেই। তাই জেগে উঠতে হবে এই উম্মা'কে। নতুন দরিয়ার নোনা পানি ডাকছে, নতুন সিন্দাবাদকে পাল তোলে হাল ধরতেই হবে এ কিশতির। ফররুখ তাই বলেন,


    "ভেঙে ফেলে আজ খাকের মমতা আকাশে উঠেছে চাঁদ,

    দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালুর বাঁধ,

    ছিঁড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল-অবসাদ,

    নতুল পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ!"


    ইসলামের বিকল্প বৈশ্বিক ভিশন


    ইকবাল স্পষ্ট করেছেন, এই দুই চরমপন্থার (সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের) কোনোটিই মানুষের মুক্তি এনে দিতে পারবে না। পুঁজিবাদ মানুষকে ব্যক্তিস্বার্থের পশূ বানায়, আর সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় যাতাকলে ব্যক্তির 'খুদি' বা আত্মাকে পিষে মারে। এর বিপরীতে আল্লামা ইকবালের প্রস্তাবিত ‘বৌদ্ধিক বসন্ত’ হলো পবিত্র কুরআনের তওহিদভিত্তিক সুষম অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনব্যবস্থা। ইসলাম একদিকে মানুষের ব্যক্তিগত মালিকানা ও স্বাধীনতার (খুদি) অধিকার দেয়, অন্যদিকে যাকাত, সাদকা, সুদ নিষিদ্ধকরণ ও মিরাস আইনের মাধ্যমে সমাজে ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করে সম্পদের পাহাড় গড়া রোধ করে। ইকবালের মতে, আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতাহীন রাজনীতি বা অর্থনীতি কেবলই ধ্বংস ডেকে আনে। একমাত্র ইসলামের ইনসাফি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ কাঠামোই পারে বিশ্ব সভ্যতাকে এই গভীর নৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে রক্ষা করতে।


    এই বিকল্প ভিশনটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 151)। ইকবাল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম জনসমষ্টিকে একটি ভৌগোলিক বা জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা থেকে বের করে এনে এক অখণ্ড বৈশ্বিক ‘উম্মাহ’ বা universal brotherhood-এর ধারণায় উজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ১৩০)। তিনি মনে করতেন, জাতীয়তাবাদের আধুনিক পশ্চিমা ধারণাটি মানবজাতিকে বিভক্ত করার একটি নতুন রাজনৈতিক মূর্তিপূজা বৈ কিছুই নয় (The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 148)। তিনি তাঁর কবিতায় একটি আন্তর্জাতিক মানবতার বাণী ঘোষণা করেছেন।


    ‘বাঙ্গে দারা’ (১৯২৪) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘ওয়াত্বানিয়াত’ (وطنیت) কবিতাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ধর্মীয় দর্শন এবং ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সাহিত্যের এক অনন্য দলিল। এখানে ইকবাল ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে (Territorial Nationalism-কে) ‘শের্ক’ বা মূর্তিপূজার আধুনিক রাজনৈতিক রূপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আধুনিকতার নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক বলয় চিহ্নিত করে বলেন,

    اس دور میں مے اور ہے، جام اور ہے، جم اور  

    ساقی نے بنا کی روشِ لطف و ستم اور


    "ইস দৌর মেঁ ময় অউর হ্যায়, জাম অউর হ্যায়, জম আউর

    সাকী নে বিনা কী রাওয়িশে লুতফ-ও-সিতম আউর"


    এই আধুনিক যুগে মদিরা আলাদা, পানপাত্র আলাদা, এমনকি সম্রাট জমশীদও (অতীতের গালগল্প কিংবা ক্ষমতার প্রতীক) আলাদা। মদ্যপরিবেশক (সাকী) তার অনুগ্রহ ও নিগ্রহের এক সম্পূর্ণ নতুন ধারা প্রবর্তন করেছে।


    ইকবাল ফারসি রূপক ব্যবহার করে বিংশ ও একবিংশ শতকের বৈশ্বিক পরিবর্তন চিহ্নিত করেছেন। ‘ময়’ (মদ) হলো ভাবাদর্শ, ‘জাম’ (পানপাত্র) রাষ্ট্রকাঠামো, ‘জম’ (সম্রাট জমশীদ) ক্ষমতার প্রতীক এবং ‘সাকী’ আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি বিশ্বজুড়ে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা তৈরি করেছে যা একদিকে ‘লুতফ’ অনুগ্রহ তথা আপাত স্বাধীনতার লোভ দেখায়, অন্যদিকে ‘সিতম’ বা পরোক্ষ শোষণের জাল বিস্তার করে।


    সেই জালে শিকার হয়ে মুসলিম সমাজের (বিশেষ করে আরব বিশ্বের) বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব সম্পর্কে বলেন,

    مسلم نے بھی تعمیر کیا اپنا حرم اور  

    تہذیب کے آزر نے ترشوائے صنم اور


    "মুসলিম নে ভী তা'মির কিয়া আপনা হরম আউর

    তাহযীব কে আজর নে তরোশওয়ায়ে সনম আউর"


    মুসলমানরাও আজ নিজেদের জন্য এক ভিন্ন ইবাদতগাহ (হারাম শরীফ) নির্মাণ করেছে; আধুনিক সভ্যতার ‘আযর’ (মূর্তির কারিগর) আজ নতুন নতুন প্রতিমা খোদাই করছে।


    ইব্রাহিম (আ.)-এর পিতা ‘আযর’ ছিলেন মূর্তিপূজারী। ইকবাল পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক সভ্যতাকে ‘আযর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মুসলমান সমাজও এই বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের শিকার হয়ে নিজেদের তাওহীদী কেন্দ্রকে বিসর্জন দিয়ে আছে।

    আধুনিক জাতীয়তাবাদ—সর্ববৃহৎ নব্য-দেবতা গ্রহণ সম্পর্কে বলেন,

    ان تازہ خداؤں میں بڑا سب سے وطن ہے  

    جو پیرہن اس کا ہے، وہ مذہب کا کفن ہے


    "ইন তাজা খুদাওউঁ মেঁ বড়া সব সে ওয়াতান হ্যায়

    জো পায়রাহান ইস কা হ্যায়, উয়োহ মাজহাব কা কাফান হ্যায়"


    আধুনিক যুগের এই নতুন দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দেবতা হলো ‘দেশ’ তথা ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ। এই দেবতার গায়ে যে পোশাক জড়ানো রয়েছে, তা আসলে ধর্মের কাফনস্বরূপ।


    বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের (১৯৩৬-২০১৫ খ্রি.) ‘ইমাজিন্ড কমিউনিটিজ’-এর বহু আগেই ইকবাল বুঝতে পেরেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষকে ‘দেশমাতৃকা’র কাল্পনিক পূজায় লিপ্ত করে। আধুনিক জাতীয়তাবাদ আসলে মানুষের মনকে বেঁধে ফেলার একটা ফাঁদ। যা বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন পরে বলেছিলেন, আধুনিক জাতীয়তার ধারণা হলো একটা ‘মনগড়া কল্পনা’। মানে, মানুষ কোনো ভৌগোলিক সীমানাকে এমনভাবে ভালোবাসে যেন সেটা তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, অথচ সেটা আসলে মানুষের তৈরি একটা ধারণা মাত্র (Kunkler, M., & Sevea, I. S. (2018). "Nation as a Neo-Idol: Muslim Political Theology and the Critique of Secular Nationalism." Religions, 9(11), 355)।


    ইকবাল এই ধারণাটি আরও গভীরভাবে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, এই জাতীয়তাবাদের আভিজাত্য, পতাকা, সীমানা, অতি দেশপ্রেম -এগুলো মানুষের আত্মিক চেতনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটা শবপোশাকের মতো। ঠিক যেমন মৃতদেহকে কাফনে মুড়ে দেওয়া হয়, তেমনি জাতীয়তাবাদের এই জাঁকজমকপূর্ণ আড়ম্বর মানুষের আসল মানবিক ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে মুড়ে ফেলে। তাকে মেরে ফেলে। যেমন, আধুনিক তুর্কী ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের কাফন দিয়ে মুস্তফা কামাল পাশা ইসলামি খেলাফতকে দাফন করে দেয়। বস্তুত, মানুষ যখন নিজের সবকিছু ভুলে শুধু ‘আমার দেশ’-এর পেছনে অন্ধভাবে ছোটে, তখন সে আসলে তার অন্তরের বিশ্বজনীনতা, মানবতা ও অন্যের প্রতি সহানুভূতি হারিয়ে ফেলে। জাতীয়তাবাদের এই পোশাক যতই চমকপ্রদ হোক, তা আসলে মানুষের আত্মার মৃত্যুর চিহ্ন বহন করে।


    মুহাম্মাদী দ্বীনের ধ্বংসকারী মূল উয়েপন মার্ক করে দেখিয়ে দেন,

    یہ بت کہ تراشیدہء تہذیبِ نوی ہے  

    غارت گرِ کاشانہء دینِ نبوی ہے


    "ইয়ে বুত কেহ তরাশিদায়ে তাহযীবে নওয়ি হ্যায়

    গারাৎগারে কাশানায়ে দ্বীনে নাবাওয়ি হ্যায়"


    এই যে মূর্তি, যা নতুন পশ্চিমা সভ্যতার দ্বারা খোদাই করা হয়েছে—এটি মূলত মুহাম্মাদী দ্বীনের গৃহকে লুণ্ঠন ও ধ্বংসকারী।


    রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ‘দ্বীন’ জাতি-বর্ণ-গোত্রের ভেদ চূর্ণ করে ‘উম্মাহ’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমা আধুনিকতা থেকে প্রসূত ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ মুসলিমদের সেই বিশ্বজনীন ঘরকে টুকরো টুকরো করে লুণ্ঠন করে চলেছে।

    প্রাচীন দৃশ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতি উৎসাহিত করে বলেন,

    نظارہء دیرینہ زمانے کو دکھا دے  

    اے مصطفوی خاک میں اس بت کو ملا دے!


    "নাযযারায়ে দেরীনা যামানে কো দেখা দে

    এ মুস্তফাওয়ি খাক মেঁ ইস বুত কো মিলা দে!"


    সেই প্রাচীন ও শাশ্বত দৃশ্যটি তুমি এই আধুনিক বিশ্বকে আবার দেখিয়ে দাও। হে মুহাম্মাদী চেতনার সৈনিক (মুস্তফাবী), এই (জাতীয়তাবাদের) মূর্তিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দাও!


    আল্লামা ইকবালের বিশ্বখ্যাত উর্দু ভাষ্যকার অধ্যাপক ইউসুফ সালিম চিশতী এবং আরব ও আ'জমের চিন্তাবিদ মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রাহি. তাঁর ‘নুকুশে ইকবাল’ গ্রন্থে এই লাইনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ‘নাযযারায়ে দেরীনা’ বা প্রাচীন দৃশ্য বলতে ইকবাল ইসলামের আদি যুগ এবং মক্কা বিজয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে বুঝিয়েছেন, যেখানে কা’বা ঘরের ভেতর থেকে ৩৬০টি প্রাচীন জড় মূর্তিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।


    রাষ্ট্রচিন্তক ড. ইকবাল সিং সেভিয়ার গবেষণা (The Political Philosophy of Muhammad Iqbal: Islam and Nationalism in Late Colonial India) নির্দেশ করে, ইকবাল এখানে আধুনিক মুসলিমদের ‘মুস্তফাবী’ বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বৈপ্লবিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্বোধন করছেন। ইকবালের মতে, আধুনিক পশ্চিমা ‘সেকুলার নেশন-স্টেট’ বা ভৌগোলিক রাষ্ট্রকাঠামো মানুষের মননে যে কৃত্রিম বিভেদের প্রাচীর ও উগ্র স্বাদেশিকতার ‘নতুন মূর্তি’ তৈরি করেছে, তা ভাঙার আধ্যাত্মিক দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ভাঙচুর নয়, বরং মানবমনকে ভৌগোলিক মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত করে এক সর্বজনীন আধ্যাত্মিক মুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান।

    তাওহীদের শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 

    بازو ترا توحید کی قوت سے قوی ہے  

    اسلام ترا دیس ہے، تو مصطفوی ہے

    "বাযু তেরা তাওহীদ কী কুউওয়াত সে কউয়ী হ্যায়

    ইসলাম তেরা দেস হ্যায়, তু মুস্তফাওয়ি হ্যায়।


    তোমার বাহু তো তাওহীদের (একত্ববাদের) শক্তিতে বলীয়ান। ইসলামই হলো তোমার প্রকৃত দেশ, আর তুমি হলে মুহাম্মাদ মুস্তফার (সা.)-এর অনুসারী (তোমার পরিচয় তুমি মুসলিম এবং মুস্তফার অনুসারী 'মুস্তফাবী')।


    ইকবাল মুসলিমদের ‘খুদী’ জাগ্রত করে মনে করিয়ে দেন, মুসলিমদের শক্তির উৎস ভূখণ্ড নয়, তাওহীদের চেতনা। একজন মুমিনের প্রকৃত দেশ হলো ইসলাম। আর তার পরিচয় সে মুস্তফা সা.-এর বিশ্বজনীন উম্মত। এই চেতনার দ্যোতনাতেই সে পেতে পারে প্রকৃত আযাদী। বিশ্বনবীর বিশ্ব-উম্মত হওয়া সত্ত্বেও, ছোট্ট ভূখণ্ডে বন্দী থেকে কোটি কোটি জনসংখ্যা নিয়ে হাঁসফাঁশ না করে, বিশ্বের খোলা ময়দানে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার এক মহাজাগতিক আহ্বান করছেন তিনি।

    বিশ্ব-সমাজে ডানাঝাপটাতে মাছের মতো দেশহীন মুক্তি লাভের পথনির্দেশ করে বলেন,

    ہو قیدِ مقامی تو نتیجہ ہے تباہی  

    رہ بحر میں آزادِ وطن صورتِ ماہی


    "হো ক্বয়েদে মাক্বামী তো নতীজা হ্যায় তবাহী

    রহ্ বাহার মেঁ আযাদে ওয়াতান সূরতে মাহী"


    যদি স্থানীয় বা ভৌগোলিক সীমানার কয়েদখানায় বন্দী হও, তবে তার অবধারিত পরিণতি হলো ধ্বংস। এই বিশাল পৃথিবীর সমুদ্রের মাঝে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানা ছাড়াই আযাদ বা মুক্ত থাকো—ঠিক মাছের মতো।


    সমুদ্রের অন্তহীন জলরাশি। যেখানে নেই কোনো কাঁটাতারের সীমানা। নেই পাসপোর্ট-ভিসার প্রাচীর। নেই জাতীয়বাদের আধিপত্য। নেই কোনো কৃত্রিম মানচিত্রের সীমারেখা। পুরো জলরাশি মাছের জন্য তার নিজস্ব আবাস। যেখানে সে নির্দ্বিধায় বিচরণ করে, কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য না রেখেই। আল্লামা ইকবাল তাঁর ‘ওয়াতানিয়াত’ কবিতার এই শ্লোকে মাছের এমন বিচরণের উপমার মাধ্যমে মানুষের আত্মা ও তার মানবিক অধিকারকে একই অসীমতার সাথে তুলনা করেছেন। যা কোনো ভৌগোলিক ফ্রেমে বন্দী হতে পারে না।


    এটি ইকবালের বিশ্বজনীন মানবতার দর্শনের এক অসাধারণ শিল্পরূপ। তিনি এখানে ‘মাহী’ (মাছ) এবং ‘বাহর্’ (সমুদ্র)-এর উপমা ব্যবহার করে মানুষকে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে গিয়ে আত্মিক মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। আরবি সুফি তত্ত্বের গভীর প্রভাব এই দর্শনের পেছনে কাজ করেছে, বিশেষ করে মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী (১১৬৫–১২৪০ খ্রি.)-এর ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ বা ‘সত্তার ঐক্য’ তত্ত্ব। ইবনুল আরাবী মনে করতেন, সমগ্র সৃষ্টিজগতে আল্লাহর অস্তিত্ব বিরাজিত৷ তাই কোনো কিছুই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর থেকে পৃথক নয়, বরং সবকিছু একই সূত্রে বাঁধা। ইকবাল এই তত্ত্বকে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করেছেন। বলেছেন যে, ঠিক যেমন সৃষ্টিজগৎ এক, তেমনই মানবজাতিও এক। জাতি, ধর্ম, ভাষা, সীমানা—এসব কৃত্রিম বিভাজন (Mir, M. (2006). Iqbal: Poet, Philosopher, and Legacy. Oxford University Press.p. 142-145)।


    ইকবালের ‘খুদী’ (আত্ম) দর্শনে মানুষকে একটি অসীম সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা কোনো কৃত্রিম সীমানায় আবদ্ধ নয়। মুস্তানসির মীর (Mustansir Mir) তাঁর ‘Iqbal: Poet, Philosopher, and Legacy’ (2006) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ইকবালের রূপকবিদ্যায় ‘বাহর্’ (সমুদ্র) এবং ‘মাহী’ (মাছ)-এর উপমা ব্যবহার করে তিনি আসলে সীমানাহীন এক বিশ্ব-নাগরিকত্বের (Borderless Cosmopolitanism-এর) পক্ষে কথা বলেছেন, যা পশ্চিমা ভৌগোলিক পরিচয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত (Mir, 2006, p. 142)। অধ্যাপক মীর ইকবালের কাব্যিক কল্পনাশক্তিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, এই উপমার মাধ্যমে ইকবাল মানবাত্মার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছেন—যে আকাঙ্ক্ষা সব কৃত্রিম বন্ধন থেকে মুক্তি চায় (Mir, 2006, p. 144)।


    যখন মানুষ নিজেকে ‘কয়দে মাকামী’ বা স্থানীয় ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে, তখন তার মধ্যে জন্ম নেয় সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী অহংকার। ইংরেজ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাক্টন (Lord Acton, জন এমেরিক এডওয়ার্ড ডালবার্গ-অ্যাক্টন, ১৮৩৪–১৯০২ খ্রি.) তাঁর ‘The History of Freedom and Other Essays’ (১৯০৯)-গ্রন্থে আধুনিক জাতীয়তাবাদকে ‘উন্মাদনার অন্বেষণ’ (Pursuit of Insanity) বলে অভিহিত করেছেন এবং আধুনিক রাষ্ট্রকে ‘টোটালিটারিয়ান (সর্বগ্রাসী) ও নিপীড়ক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Acton, The History of Freedom and Other Essays, 1909, p. 270-300)। ইকবাল লর্ড অ্যাক্টনের এই সমালোচনাকে কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক রূপে ধারণ করেছেন। ইকবাল সিং সেভিয়া তাঁর ‘The Political Philosophy of Muhammad Iqbal: Islam and Nationalism in Late Colonial India’ (২০১২)-গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন, ইকবাল ইউরোপীয় আধুনিকতার রাজনৈতিক রূপরেখা বুঝতে লর্ড অ্যাক্টনের মতো সমালোচকদের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। অ্যাক্টন যেভাবে জাতীয়তাবাদকে ধর্মের অধীনস্থ করার হাতিয়ার ভাবতেন, ইকবালও তাঁর ‘ওয়াতানিয়াৎ’ কবিতায় ঠিক একই কারণে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে ‘দ্বীন’ বা জীবনব্যবস্থার ধ্বংসকারী (গারাৎকারে কাশানায়ে দ্বীন) বলেছেন (Sevea, 2012, p. 148-152)। সেভিয়া আরও দেখান, ইকবাল কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে একটি ‘নব্য-পৌত্তলিক মূর্তি’ (Neo-Idol) হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যা মানুষকে তার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত করে (Sevea, 2012, p. 150)।


    মাছ যেমন জল থেকে ডাঙায় উঠলে বা ছোট পাত্রে বন্দী হলে মারা যায়, মানুষও তেমনি তার বিশ্বজনীন উদার চেতনা হারিয়ে ফেলে—যখন সে সংকীর্ণ সীমানায় নিজেকে আবদ্ধ করে। আবুল হাসান আলী নদভী (১৯১৪–১৯৯৯ খ্রি.) তাঁর ‘নুকুশে ইকবাল' (১৯৫৩)-গ্রন্থে ইকবালের ‘হিজরত’ ও ‘মাহী’ (মাছ)-এর রূপকটিকে সুফি তত্ত্বের ‘আলা-মাকান’ (স্থানাতীত আধ্যাত্মিক সত্তা) এবং ইসলামের আদি বিশ্বজনীনতার এক আধুনিক রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (Nadwi, 1953, p. 320-330)। নদভী দেখিয়েছেন, ইকবালের মতে ‘স্বদেশপ্রেমের উগ্রতা’ মানুষকে তার মানবিকতার আধ্যাত্মিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মাছ ছোট পাত্রে বন্দী হলে মারা যায়। এই উগ্রতা শেষ পর্যন্ত মানবজাতিকে বিশ্বযুদ্ধ ও পারস্পরিক ধ্বংসলীলায় (তবাহীতে) ঠেলে দেয়, যা ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দিয়েছে (Mir, 2006, p. 146; Nadwi, 1953, p. 328)।


    ইকবালের এই দর্শন ‘কসমোপলিটানিজম’ (Cosmopolitanism) বা বিশ্বজনীন মানবতার এক অনন্য উদাহরণ। কসমোপলিটানিজম বলতে বোঝায়, মানুষ তার পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট দেশ, ভাষা বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং নিজেকে ‘বিশ্বের নাগরিক’ হিসেবে দেখবে এবং সমস্ত মানবজাতিকে একই পরিবারের সদস্য মনে করবে। সাম্প্রতিক গবেষণায় সাদ মালুক দেখিয়েছেন, ইকবালের দার্শনিক চিন্তাধারা কসমোপলিটানিজমের মূল নীতিগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এতে বৌদ্ধিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক—সকল মাত্রায় কসমোপলিটান দিক বিদ্যমান (Malook, "Muhammad Iqbal as a Cosmopolitan Philosopher," Bazyaft 41, no. 2 (2022): 3-16)। ইকবালের ‘উম্মাহ’ ধারণা ঠিক এই বিশ্বজনীন মানবতারই একটি ইসলামি রূপ। যা ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বহুজাতিক সম্প্রদায় গঠনের কথা বলে।


    ইকবালের এই শ্লোকটি শুধু একটি কবিতার লাইন নয়, এটি মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা। ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ মানুষকে বিভক্ত করে, তাকে আগ্রাসী ও হিংস্র করে তোলে এবং তার আত্মিক ও মানবিক সত্তাকে ধ্বংস করে। ইকবাল আমাদের আহ্বান জানিয়েছেন, মাছের মতো মুক্ত হও, সমুদ্রের মতো অসীম, কোনো কৃত্রিম সীমানায় নিজেকে বন্দী করো না। এই বার্তা আজকের বিশ্বেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, যখন জাতীয়তাবাদ আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো ক্রমশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইকবালের দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের আসল পরিচয় তার পাসপোর্ট বা সীমানায় নয়, বরং তার মানবিকতা, তার নৈতিক মূল্যবোধ এবং তার বিশ্বজনীন উদারতার মধ্যে নিহিত। নির্দিষ্ট সীমানার জাতীয়তাবাদে সামান্য কিছু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়। পুরো পৃথিবীর মানুষকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। পক্ষান্তরে বিশ্বনাগরিক হওয়ার মাধ্যমে একজন মানুষের দায়বদ্ধতায় কোনোরূপ তারতম্য ছাড়াই পুরো বিশ্বের সৃষ্টি অন্তর্ভুক্ত থাকে। যা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সেই দায়বদ্ধতার চেয়েও অধিক দায় ও দায়িত্ব এবং উদারতার বাহু প্রসারিত করার অনুভূতি জাগ্রত করে। ফলত নির্দিষ্ট ভূখণ্ডগত জাতীয়তা মানুষকে যতটা সংকীর্ণ, অমানবিক এবং কপট করে তোলে, তারচেয়ে হাজার গুণ মানবিক এবং দয়ার্দ্র হতে বলে ইকবালের দর্শনের এই জাতীয়তা। এর ভিতরে থাকে প্রতিটি ভূখণ্ডের প্রতিটি মানুষ ও প্রাণী। মানবসভ্যতার কিছু অংশকে আপন আর কিছু অংশকে পর ভাবার শিক্ষা দেয় না। তাই যতক্ষণ না মানুষ এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের মায়াবী প্রতিমা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে, ততক্ষণ পৃথিবীতে যুদ্ধ, পুঁজিবাদী শোষণ এবং দুর্বল জাতির ওপর সবলের অত্যাচার বন্ধ হবে না।


    প্রয়োজনে উপায়-উপকরণ হাসিলের জন্য কিংবা নিজেদের সুদৃঢ় করতে হিজরতের বিশ্বজনীন দর্শন প্রস্তাব করে বলেন,

    ہے ترکِ وطن سنتِ محبوبِ الٰہی  

    دے تو بھی نبوت کی صداقت پہ گواہی


    "হ্যায় তর্কে ওয়াতান সুন্নাতে মাহবুবে এলাহী

    দে তু ভী নবুউওয়াত কী সাদাকাত পে গাওয়াহী"


    নিজের ভৌগোলিক দেশ বা অঞ্চলের মায়া ত্যাগ করা (হিজরত) স্বয়ং আল্লাহর মাহবুবের (সা.) এক মহান সুন্নাত। তুমিও এই ঐতিহাসিক ত্যাগের মাধ্যমে নবুয়তের এই বিশ্বজনীন সত্যতার সাক্ষ্য দাও।


    এখানে ইকবাল হিজরতের (Migration-এর) একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্পাঠ খাড়া করেছেন। সাধারণত হিজরতকে কেবল একটি ঐতিহাসিক দেশত্যাগ বা আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ইকবালের দর্শনে হিজরত হলো ‘ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের শিকল ছেঁড়ার এক মহোত্তম ঘোষণা’। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানসিকতা থেকে হিজরত করে বৈশ্বিক হয়ে ওঠার মানসিকতা ধারণ করতে বলেন।


    রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কার মায়া ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তখন তিনি মক্কার রক্ত ও মাটির সম্পর্ককে ছিন্ন করে ঈমানের ভিত্তিতে এক ‘বিশ্বজনীন সমাজ’ বা ‘মিছাকে মদিনা (মদিনা সনদ)-’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ইকবাল বুঝিয়েছেন, ইসলামের নবী কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের গোত্রীয় জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে আসেননি, বরং তিনি এসেছিলেন পুরো পৃথিবীকে একটি ইবাদতগাহ এবং একক মানব পরিবারে রূপান্তর করতে। হিজরতের এই দর্শন প্রমাণ করে, একজন মুমিনের আদর্শিক আনুগত্য তার ভৌগোলিক জন্মভূমির চেয়ে অনেক বড় এবং এটিকেই নবুয়তের সর্বজনীন সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রামাণ্য দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আলী নদভী রাহি. তাঁর 'নুকুশে ইকবাল' গ্রন্থে।


    স্বদেশ ধারণা: রাজনীতি বনাম নবুওয়াত, ইকবাল বলেন, 

    گفتارِ سیاست میں وطن اور ہی کچھ ہے  

    ارشادِ نبوت میں وطن اور ہی کچھ ہے


    "গুফ্‌তারে সিয়াসাত মেঁ ওয়াতান আউর হি কুছ হ্যায়

    ইরশাদে নুবুউওয়াত মেঁ ওয়াতান আউর হি কুছ হ্যায়"


    সমকালীন চতুর রাজনীতির সংলাপে ‘দেশ’ বা ‘মাতৃভূমি’র অর্থ সম্পূর্ণ এক জিনিস; আর মুহাম্মাদী নবুওয়াতের ঐশী বাণীতে ‘দেশ’ বা ‘স্বদেশ’-এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক জিনিস।


    “ডিসকোর্স অন ন্যাশনালিজম: পলিটিক্যাল আইডিওলজিস অফ টু মুসলিম ইন্টেলেকচুয়ালস, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি এন্ড আল্লামা ইকবাল" শীর্ষক প্রবন্ধটির আলোকে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, ইকবাল এখানে পশ্চিমা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Modern Political Modernity) এবং ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছেন (Rasheed & Ahmad, Discourse on Nationalism: Political Ideologies of Two Muslim Intellectuals, Maulana Hussain Ahmad Madani and Allama Muhammad Iqba, 2019, pp. 127-147


    আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘গুফতারে সিয়াসাত’-এ বা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংলাপে ‘ওয়াতান’ বা দেশ হলো, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ড। যার সার্বভৌমত্ব কোনো ঐশী আইনের অধীন নয়, বরং তা কেবল এর সীমানা এবং সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই ধর্মনিরপেক্ষ ধারণা ধর্মকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে তাকে ব্যক্তিজীবনের চার দেয়ালে বন্দী করে।


    এর বিপরীতে, ‘ইরশাদে নুবুউওয়াত’ বা নবুয়তের দৃষ্টিতে স্বদেশের ধারণাটি মাটি বা রক্তের সাথে যুক্ত নয়, বরং তা যুক্ত ‘আকিদা’, ‘ইনসাফ’ এবং ‘নৈতিক মূল্যবোধের’ সাথে। নবুয়তের স্বদেশে একজন মজলুমের কোনো সীমানা থাকে না, সেখানে পুরো পৃথিবীর মানুষ আল্লাহর বান্দা হিসেবে এক এবং অভিন্ন। ইকবাল এখানে স্পষ্ট করছেন, পশ্চিমাদের নকল করে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে মুসলমানরা ঝুঁকছে, তা নবুয়তের সর্বজনীন মানবিক দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে (Sevea, The Political Philosophy of Muhammad Iqbal: Islam and Nationalism in Late Colonial India, 2012, pp. 126-163)।

    পুঁজিবাদের হাতিয়ার হিসেবে পশ্চিমারা এই জাতীয়তাবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে, 

    اقوامِ جہاں میں ہے رقابت تو اسی سے  

    تسخیر ہے مقصودِ تجارت تو اسی سے


    "আকওয়ামে জাহাঁ মেঁ হ্যায় রাক্বাবাত তো ইসি সে

    তাসখীর হ্যায় মাকসুদে তিজারত তো ইসি সে"


    পৃথিবীর জাতিগুলোর মধ্যে আজ যে মরণপণ হিংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা (রাক্বাবাত), তার মূল কারণ এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ। আর বাণিজ্যের নামে অন্য দেশকে গ্রাস বা দাস বানানোর (তাসখিরের) যে গোপন উদ্দেশ্য, তাও চালিত হয় এই জাতীয়তাবাদের দ্বারাই।


    ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের সমালোচনা তত্ত্ব এবং ইকবালের রাজনৈতিক অর্থনীতির তুলনামূলক গবেষণাগুলো ইকবালের এই লাইনের এক অসামান্য বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরে। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল (Frankfurt School) হলো, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের ‘ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ’-এর সাথে যুক্ত একদল চিন্তাবিদ। যারা ‘সমালোচনা তত্ত্ব’ (Critical Theory) নামে এক নতুন দার্শনিক ধারা তৈরি করেন (Horkheimer, 1937, “Traditional and Critical Theory,” Zeitschrift fur Sozialforschung, 6(2), pp. 245-294)। এই দলের প্রধান ব্যক্তিত্বরা হলেন, ম্যাক্স হরখাইমার (১৮৯৫–১৯৭৩ খ্রি.), থিওডর আদর্নো (১৯০৩–১৯৬৯ খ্রি.), হার্বার্ট মার্কুজ (১৮৯৮–১৯৭৯ খ্রি.), ওয়াল্টার বেনিয়ামিন (১৮৯২–১৯৪০ খ্রি.) এবং পরে ইয়ুর্গেন হাবারমাস (১৯২৯–বর্তমান)। তাদের মূল প্রশ্ন ছিল, পুঁজিবাদ, যুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি—এগুলো কি সত্যিই মানুষকে মুক্তি দেয়, নাকি নতুন করে দাস বানায়? তাদের মতে, পুঁজিবাদী সমাজ ‘ইনস্ট্রুমেন্টাল রিজন’ (যন্ত্রগত যুক্তি) তৈরি করেছে, যেখানে সবকিছু হিসাব-নিকাশ ও লাভ-ক্ষতির মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়। মানুষ নিজেও হয়ে ওঠে নিছক একটি ‘উৎপাদনের হাতিয়ার’ (Adorno & Horkheimer, 1944, Dialectic of Enlightenment, pp. 1-30)। এই যুক্তি মানুষকে নৈতিকতা, প্রেম, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।


    ইকবাল ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের সমসাময়িক ছিলেন না (তিনি ১৯৩৮ সালে মারা যান, আর ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রধান কাজ আসে ১৯৪০-এর দশকে), কিন্তু তাঁর চিন্তায় পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে তীব্র ও গভীর সমালোচনা আছে। যা থিওরিটিক্যালি পরবর্তীতে এসে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের চিন্তাবিদরাও করেছেন। কিন্তু ইকবাল সময়ের আগেই এই সময়কে দেখতে পেয়েছেন; যখন দুনিয়া পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও জাতীয়তাবাদের ঝলকানিতে বিভোর ছিলো (Sevea, 2012, The Political Philosophy of Muhammad Iqbal, pp. 126-163)। ইকবাল এখানে কেবল একজন ধর্মীয় চিন্তাবিদ নন, বরং একজন ঝানু রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ইউরোপের ‘ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটালিজম’ বা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের নগ্ন রূপটি ধরে ফেলেছেন। ইকবাল দেখেছিলেন, পশ্চিমা পুঁজিবাদ শুধু অর্থনৈতিক শোষণই করে না; এটি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিমা শিক্ষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির মডেলগুলো মুসলিম সমাজকে তার ঐতিহ্য ও পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইকবালের মতে, পশ্চিমা পুঁজিবাদের এই রূপ মুসলিম বিশ্বের জন্য হুমকি। কারণ এটি মানুষকে তার ‘খুদী’ (আত্মচেতনা) থেকে বঞ্চিত করে (Iqbal, 1934, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, pp. 145-148)। ইকবাল পুঁজিবাদের তীব্র সমালোচনা করলেও তিনি সমাজতন্ত্রের নাস্তিক্যবাদী রূপকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বিকল্প ছিল ইসলামি নৈতিকতা, তাওহীদ ও উম্মাহ-ভিত্তিক ইনসাফের অর্থনীতি।


    ইকবালের মতে, 'ওয়াতান' বা ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ হলো পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। পশ্চিমা পুঁজিপতিরা তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজার ও মুনাফার স্বার্থে উগ্র জাতীয়তাবাদের (Chauvinism) জন্ম দেয়। এই উগ্র স্বাদেশিকতার আফিম খাইয়ে তারা নিজ দেশের সাধারণ মানুষকে অন্য স্বাধীন দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দেয়। ইকবালের ‘রাক্বাবাত’ (প্রতিদ্বন্দ্বিতা) শব্দটি মূলত ইউরোপের সেই ঔপনিবেশিক কাড়াকাড়িকে নির্দেশ করে, যা পরবর্তীতে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল (Sevea, The Political Philosophy of Muhammad Iqbal: Islam and Nationalism in Late Colonial India, 2012, pp. 140-145)। আর ‘তাসখীর মাকসুদে তিজারত’ (বাণিজ্যের মাধ্যমে গ্রাস) বলতে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ফরাসি ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের মতো শোষণের কথা বুঝিয়েছেন। যেখানে বাণিজ্যের পতাকা উড়িয়ে আসলে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের মানুষের সার্বভৌমত্ব ও সম্পদ হরণ করা হয় (Sevea, 2012, p. 150)।

    ইকবাল দেখান, দুর্বলের উপর অত্যাচারের পথ উন্মুক্ত করে দেয় এই কপট কূপাবদ্ধ জাতীয়তাবাদের অনৈতিক রাজনীতি,

    خالی ہے صداقت سے سیاست تو اسی سے  

    کمزور کا گھر ہوتا ہے غارت تو اسی سے


    "খালী হ্যায় সাদাক্বাত সে সিয়াসত তো ইসি সে

    কমযোর কা ঘর হোতা হ্যায় গারাৎ তো ইসি সে"


    বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি যে সত্য ও নৈতিকতা (সদাক্বত) থেকে সম্পূর্ণ শূন্য, তার মূল কারণ এই জাতীয়তাবাদ। আর এই বিষাক্ত ধারণার কারণেই দুর্বল জাতিগুলোর ঘরবাড়ি আজ লুন্ঠন ও ধ্বংস (গারাৎ) হচ্ছে।


    ‘ওরিয়েন্টালিজম’ এখানে প্রাসঙ্গিক —ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো কীভাবে দুর্বল প্রাচ্যকে ‘অনুন্নত’ ও ‘পশ্চাৎপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের শোষণকে বৈধতা দিয়েছে, সেটি বোঝানোর জন্য।


    ইকবাল এখানে আধুনিক রাজনীতির এক মর্মান্তিক সত্য তুলে ধরেছেন। পশ্চিমা ধাঁচের ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ রাজনীতিকে নৈতিকতা ও সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ ও শেষ কথা। এই নৈতিকতাশূন্য রাজনীতির পেছনে রয়েছে ইউরোপীয় রাজনৈতিক দর্শনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ‘ম্যাকিয়াভেলীয় রাজনীতি’ (Machiavellian Politics) এবং ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik)। ইতালীয় দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭ খ্রি.) তাঁর The Prince (১৫৩২)-গ্রন্থে যে তত্ত্ব দিয়েছেন, সেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নৈতিকতা, সত্য ও ইনসাফকে ত্যাগ করা যায়। প্রয়োজনে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, এমনকি নিষ্ঠুর হওয়াও বৈধ, যদি তা রাষ্ট্রের স্বার্থে হয়। আর ‘রিয়েলপলিটিক’ হলো উনিশ শতকের জার্মান চিন্তাবিদদের দেওয়া তত্ত্ব। যা বলে, রাজনীতি আদর্শ বা নৈতিকতার দ্বারা নয়, বরং বাস্তব ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত। ইকবাল এই দুই তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলো মূলত এই নীতিতেই চলে। তারা মুখে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়ের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখে (Sevea, 2012, The Political Philosophy of Muhammad Iqbal, pp. 126-163)।


    এখন প্রশ্ন হলো, এই নৈতিকতাশূন্য রাজনীতি কীভাবে টিকতে পারে? এর উত্তর দেয় ‘ওরিয়েন্টালিজম’ তত্ত্ব। এডওয়ার্ড সাইদ (১৯৩৫-২০০৩ খ্রি.) তাঁর Orientalism (১৯৭৮)-গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে ‘প্রাচ্য’-কে—যার মধ্যে ইসলামি বিশ্ব ও এশিয়া পড়ে—একটি নিষ্ক্রিয়, পশ্চাৎপদ ও অনুন্নত অঞ্চল হিসেবে চিত্রিত করেছে (Said, 1978, Orientalism, pp. 1-30)। এই চিত্রায়নের মাধ্যমে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক আধিপত্যকে ‘সভ্যতার প্রচার’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, পশ্চিমা শক্তিগুলো প্রথমে ‘ওরিয়েন্টালিজম’-এর মাধ্যমে প্রাচ্যকে দুর্বল ও অনুন্নত হিসেবে চিহ্নিত করে। তারপর ‘ম্যাকিয়াভেলীয়’ ও ‘রিয়েলপলিটিক’-এর নীতিতে সেই ‘অনুন্নত’ অঞ্চলগুলোকে লুণ্ঠন করে; সেগুলোকে 'সভ্য' এবং 'উন্নত' করে গড়ে তোলার নামে। ইকবাল এখানে এই দ্বৈত কৌশলকেই চিহ্নিত করেছেন। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি প্রথমে প্রাচ্যকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে, তারপর সেই দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাদের ধ্বংস করে।


    জাতীয়তাবাদের এই অনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় বলি হয় বৈশ্বিকভাবে ‘কমযোর’ বা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো। উগ্র জাতীয়তাবাদ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে এই আত্মঅহংকার দেয় যে, নিজেদের সীমানার ভেতরের মানুষের সুখের জন্য বাইরের অন্য যেকোনো দুর্বল দেশের মানুষের ওপর বোমা ফেলা, তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা বৈধ। ইকবাল বিশ শতকের শুরুতেই আফগানিস্তান, ইরান, লিবিয়া এবং উসমানীয় খিলাফতের ওপর পশ্চিমাদের যে পৈশাচিক আগ্রাসন ও ধ্বংসলীলা (গারাৎ) দেখেছিলেন, তার মনস্তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ ও তার সঙ্গী ‘ওরিয়েন্টালিজম’-কেই দায়ী করেছেন (Sevea, 2012, p. 150)।


    মানবজাতির বিভাজন ও ইসলামের শিকড় মুণ্ডন চলে যেভাবে, 

    اقوام میں مخلوقِ خدا بٹتی ہے اس سے

    قومیتِ اسلام کی جڑ کٹتی ہے اس سے


    "আকওয়াম মেঁ মাখলুকে খোদা বাটতী হ্যায় ইস সে

    কওমিয়্যাতে ইসলাম কী জড় কাটতী হ্যায় ইস সে"


    আল্লাহর পবিত্র সৃষ্টি বা সমগ্র মানবজাতিকে (মাখলুকে খোদাকে) কৃত্রিম খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে দেয় এই জাতীয়তাবাদ। আর এর ফলেই ইসলামের সেই বৈশ্বিক ও বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের (কওমিয়্যাতে ইসলামের) গোড়া কাটা পড়ে।


    ইকবালের ‘ওয়াতানিয়াত’-এর সমাপনী শ্লোকে তিনি জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে চরম পরিণতি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ আল্লাহর সৃষ্ট সমগ্র মানবজাতিকে কৃত্রিম খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে দেয় এবং ইসলামের সেই বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের শিকড় কেটে দেয়, যা কোনো সীমানাকে স্বীকার করে না। ‘মাখলুকে খোদা’ বা আল্লাহর সৃষ্টি বলতে তিনি সমগ্র মানবজাতিকে বোঝাচ্ছেন —জাতি, বর্ণ, ভাষা বা দেশ নির্বিশেষে। আর ‘ইসলামের বিশ্বজনীন ভাতৃত্ব’ (কওমিয়্যাতে ইসলাম) হলো, ‘উম্মাহ’। যার ভিত্তি কোনো মাটি বা রক্ত নয়, বরং ‘কালিমায়ে তাওহীদ’ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)। ইকবাল দেখিয়েছেন, যখন মানুষ আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে বাদ দিয়ে একটি ভৌগোলিক মানচিত্রকে নিজের সর্বোচ্চ পরিচয় হিসেবে মানতে শুরু করে, তখন সে ইসলামের সেই বৈশ্বিক মন-সংযোগ এবং বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের শিকড়টিকে কেটে ফেলে (Mir, 2006, Iqbal: Poet, Philosopher, and Legacy, p. 142)।


    এই কৃত্রিম বিভাজনের বাস্তব রূপ হলো কাঁটাতার, সীমানা প্রাচীর, ভিসা ও পাসপোর্ট, যা মানুষকে ভৌগোলিক খাঁচায় আবদ্ধ করে। ইকবালের ‘ওয়াতান’-বিরোধী অবস্থান মূলত এই কৃত্রিম বাঁধাগুলোর বিরুদ্ধেই ছিল। যা মানুষকে তার স্বাভাবিক চলাচল, জীবনধারণ ও মানবিক সম্পর্ক থেকে বঞ্চিত করে। এই কৃত্রিম সীমানাগুলো শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তারা তাদের স্বেচ্ছাচারিতার জন্য কখনো সীমান্ত বন্ধ করে, কখনো খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে, যা ইকবালের ‘তাসখীরে তিজারত’ (বাণিজ্যের মাধ্যমে গ্রাস)-এরই আধুনিক রূপ (Sevea, 2012, The Political Philosophy of Muhammad Iqbal, p. 150)।


    এই কৃত্রিম সীমানার মাধ্যমেই "কৃত্রিম জনসংখ্যা সংকট" সৃষ্টি করা হয়। একদিকে যেমন সীমান্ত পেরিয়ে আসা শরণার্থীদের ‘বোঝা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অন্যদিকে তেমনই স্থানীয় জনসংখ্যাকে ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। আর ঠিক একই কৌশলে "কৃত্রিম খাদ্যসঙ্কট"ও তৈরি করা হয়। যখন কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, অবরোধ বা সীমানা বন্ধের মাধ্যমে অন্য দেশে খাদ্যের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করে, তখন তা ইকবালের ‘রাকাবাত’ (প্রতিদ্বন্দ্বিতা) ও ‘গারাৎ’ (ধ্বংস)-এর আধুনিক প্রকাশ ঘটে (Sevea, 2012, p. 150)।


    ইকবালের ‘খুদী’ (আত্মচেতনা) দর্শন মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে বলে। কৃত্রিম সঙ্কটের মাধ্যমে যখন কোনো দেশকে খাদ্য বা অন্য মৌলিক চাহিদার জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়, তখন তা ইকবালের ‘খুদী’-র পরিপন্থী। ইকবালের মতে, প্রকৃত মুক্তি আসে আত্মনির্ভরশীলতা ও বিশ্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে। যেখানে কাঁটাতার, সীমানা ও কৃত্রিম সঙ্কটের কোনো স্থান নেই।


    এই শ্লোকের তাত্ত্বিক গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় ‘উখুওয়াহ আল-ইনসানিয়াহ’ (সর্বজনীন মানবভ্রাতৃত্ব) ধারণার আলোকে। যা ইসলামি দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারণা বলে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা ভাষা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ পরস্পর ভাই, কারণ তারা একই স্রষ্টার সৃষ্টি। ড. খলিফা আব্দুল হাকিম (১৮৯৩-১৯৫৯ খ্রি.), ইকবালের সমসাময়িক ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইকবাল-বিশারদ, তাঁর ‘ফিকরে ইকবাল’ (১৯৫১)-গ্রন্থে ইকবালের এই চিন্তাকে আরও সুস্পষ্ট করেছেন। হাকিম দেখিয়েছেন, ইকবাল কীভাবে পশ্চিমা ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি বিশ্বজনীন উম্মাহ-এর মধ্যে পার্থক্য টেনেছেন, এবং কীভাবে ‘খুদি’ ও ‘উম্মাহ’-র দর্শন ইসলামি চিন্তার আলোকে একটি বিকল্প সমাজব্যবস্থা প্রস্তাব করে। যেখানে কৃত্রিম সীমানা, জনসংখ্যা সংকট ও খাদ্যসঙ্কটের মতো মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের অবকাশ নেই।


    ইকবালের মতে, ইসলাম এসেছিল মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে, আর পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ এসে মানুষকে টুকরো টুকরো করে পরস্পরের শত্রু বানিয়ে দিল। এই শ্লোকটি তাই ইকবালের বিশ্বজনীন মানবতাবাদের চূড়ান্ত ঘোষণা। যা কৃত্রিম সীমানা, কাঁটাতার, মনুষ্যসৃষ্ট জনসংখ্যা ও খাদ্যসঙ্কট ইত্যাদি কৃত্রিম বাঁধার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন সতর্কবার্তা। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের এই মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে না দিতে পারবে, ততক্ষণ পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। "সমাজে বিজ্ঞানের প্রভাব" বইয়ে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলও (১৮৭২-১৯৭০ খ্রি.) হুবহু এই মতটি গ্রহণ করেছেন। তিনিও দেখিয়েছেন, পৃথিবী ততদিন পর্যন্ত শান্ত হবে না, যতদিন 'ওয়ান আর্থ, ওয়ান স্টেইট এন্ড ওয়ান ন্যাশন' না হবে।


    ইকবালের এই বার্তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক বিশ্বে জাতীয়তাবাদ আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে—ইউরোপে, এশিয়ায়, আমেরিকায়—আর তার ফলশ্রুতিতে দেখা যাচ্ছে যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, অর্থনৈতিক অবরোধ ও মানবিক বিপর্যয়। ইকবাল আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষের আসল পরিচয় তার পাসপোর্টে নয়, তার মানবিকতায়।


    আল্লামা ইকবালের ‘ওয়াতানিয়াৎ’ কবিতাটি কেবল এক সেট পঙ্ক্তিমালা নয়; এটি পশ্চিমা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার (Western Political Modernity) বিরুদ্ধে এক তীব্র ‘মেটা-ক্রিটিক’ বা মহাপর্যালোচনা। ড. মুহম্মদ ইকবালের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দর্শনের মূল গ্রন্থ The Reconstruction of Religious Thought in Islam এবং বৈশ্বিক রাষ্ট্রচিন্তার তত্ত্বসমূহকে একত্রিত করলে এই কবিতার তিনটি প্রধান তাত্ত্বিক স্তম্ভ উন্মোচিত হয়।


    ১. আধুনিক পৌত্তলিকতা ও পরিচয়তত্ত্ব (Modern Idolatry & Identity Politics)


    ফরাসি দার্শনিক সমাজবিজ্ঞানী রেমন্ড অ্যারন (১৯০৫–১৯৮৩ খ্রি.) এবং জার্মান চিন্তাবিদ কার্ল শমিট (১৮৮৮–১৯৮৫ খ্রি.) আধুনিক রাষ্ট্রকে যেভাবে ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতার বিকল্প’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, ইকবাল তার সমান্তরালে একে ‘নতুন মূর্তিপূজা’ বলেছেন। প্রাচীনকালে মানুষ সোনা, রুপা বা পাথরের মূর্তি পূজা করত। আধুনিক যুগে মানুষ ‘দেশমাতৃকা’ বা ‘Nation-State’ নামক এক বিমূর্ত ভৌগোলিক প্রতিমা তৈরি করেছে। মানুষ এখন পতাকার জন্য রক্ত দেয়, সীমানার জন্য অন্য মানুষকে হত্যা করে—যা মূলত প্রাচীন গোত্রীয় অন্ধতারই আধুনিক রূপ (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 148)। ইকবালের মতে, তাওহীদের মূল নির্যাস হলো মানুষের আত্মাকে এই সমস্ত কৃত্রিম ও পার্থিব পরিচয় (Identity) থেকে মুক্ত করে এক পরম ও অসীম সত্তার সাথে যুক্ত করা।


    ২. কসমোপলিটানিজম বনাম টেরিটোরিয়াল ন্যাশনালিজম (Cosmopolitanism vs Territorial Nationalism)


    জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪ খ্রি.) তাঁর ‘পার্পেচুয়াল পিস’ (Perpetual Peace) তত্ত্বে এক বিশ্ব-নাগরিকত্বের (Cosmopolitanism) স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমাদের সেই কসমোপলিটানিজম শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও পুঁজিবাদের দাসত্বে রূপ নেয়। ইকবাল এর বিপরীতে ইসলামের ‘উম্মাহ’ ধারণাকে এক প্রকৃত এবং কার্যকর বিশ্বজনীন মানবতাবাদ হিসেবে খাড়া করেন।


    ৩. পুঁজিবাদের আধিপত্য ও উত্তর-উপনিবেশবাদী বয়ান


    ইকবাল ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের গবেষকদের বহু আগেই ধরতে পেরেছিলেন, পশ্চিমা ডেমোক্রেসি এবং নেশন-স্টেইটের ধারণা আসলে পুঁজিবাদের এক মোড়ক মাত্র। জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী রাষ্ট্রকে আগ্রাসনের নৈতিক বৈধতা দেয়। ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (Cultural Hegemony) তৈরি করে তারা দুর্বল জাতির সম্পদ লুণ্ঠন করে।


    ইকবাল স্পষ্ট করেছেন, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের এই মডেল যদি মুসলিম বিশ্ব বা প্রাচ্যের দেশগুলো অন্ধভাবে অনুকরণ করে, তবে তারা কখনোই প্রকৃত স্বাধীন হতে পারবে না, বরং নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও জাতিগত দাঙ্গায় ধ্বংস হয়ে যাবে (যার বাস্তব প্রমাণ আমরা আজকের মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত দেখছি)।


    সামগ্রিকভাবে, ‘ওয়াতনিয়াৎ’ কবিতার মাধ্যমে আল্লামা ইকবাল বিশ্বমানবতাকে এক বিশাল আধ্যাত্মিক, বৌদ্ধিক ও উদার সমুদ্রের দিকে আহ্বান করেছেন। তিনি মানুষকে মাটির প্রতিমার নবরূপ "নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের" উপাসনা ছেড়ে আদর্শের প্রতিভূ হতে বলেন। তাঁর দর্শন অনুযায়ী, মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার নৈতিক মূল্যবোধ, তার ঈমান এবং তার মানবিক উদারতার দ্বারা—কোনো কৃত্রিম মানচিত্রের সীমানা দ্বারা নয়। এখানে ইকবাল কেবল ইসলামের কবি নন, তিনি নিখিল বিশ্বের শোষিত-লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানবতার মুক্তির এক মহান কসমোপলিটান দার্শনিক।


    ইকবালের এই রোডম্যাপের মূল ভিত্তি হলো, মুসলিম উম্মাহ আর কখনো ইতিহাসের পেছনে হাঁটবে না, বরং সে নিজে ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করবে। তাকে এই বিশ্বনেতৃত্বের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। সকল শোষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত মানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে। পৃথিবীর সকল জালিমের কাছ থেকে সে তার কৃতকর্মের হিসাব নেবে। এই গুরুভার বহনের বাস্তব সক্ষমতা এবং মনস্তত্ত্ব কেবল এই উম্মার শেকড়েই আছে (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 155)। এর জন্য প্রয়োজন নিজের আত্মসত্তা বা খুদিকে চেনা, ইজতিহাদের মাধ্যমে আধুনিক যুগের সমস্ত জটিল সমস্যার নিজস্ব মৌলিক সমাধান তৈরি করা এবং বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মিলবন্ধনে এক নতুন মানবতাবাদী সভ্যতার জন্ম দেওয়া। যে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে "ইবলিস কি মজলিসে শূরা' (শয়তানের পরামর্শ সভা) কবিতায় ইকবাল বলেন,


    "হর নফস ডরতা হো ইস উম্মত কে বেদারি সে মেঁ

    হ্যায় হকিকত যিছ কে দ্বীঁ কি ইহতিসাবে কায়েনাত"


    ইবলিস তার উপদেষ্টাদের বলছে, আমি প্রতি মুহূর্তে (প্রতি শ্বাসে) ভয় পাই এই মুসলিম উম্মাহর জেগে ওঠাকে! যার দ্বীনের আসল কাজই হলো, সমগ্র কায়েনাত বা বিশ্বব্যবস্থার জবাবদিহিতা ও বিচার (ইনসাফ) নিশ্চিত করা।


    "ইবলিস কি মজলিসে শূরা" মূলত একটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক ইশতেহার। এর মাধ্যমে ইকবাল সতর্ক করেছেন, পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ শয়তানেরই কৌশল। তিনি মুসলিম বিশ্বকে আহ্বান জানিয়েছেন তার আসল শক্তি, অর্থাৎ ইসলামের বৈপ্লবিক চেতনা ও ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে। এই চেতনাই একমাত্র শক্তি, যা শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং মানবজাতির জন্য প্রকৃত মুক্তি ও ন্যায়বিচার বয়ে আনতে পারে।


    ইকবাল এই কবিতায় একটি নাটক সাজিয়েছেন। যেখানে মূল চরিত্র ইবলিস (শয়তান) এবং তার সাথে রয়েছে তার পাঁচজন অত্যন্ত চতুর উপদেষ্টা (Advisors)। তারা প্রত্যেকে আধুনিক পৃথিবীর একেকটি ফিতনা বা ব্যবস্থার প্রতীক (যেমন, কেউ রাজতন্ত্রের পক্ষের, কেউ পুঁজিবাদের মগজ ধোলাইকারী, কেউ আবার সমাজতন্ত্রের উত্থানে ভীত, কেউ উলামা সমাজের মাথার কন্ট্রোলার)। ১৯৩৬ সালের নভেম্বরের এক নিঝুম রাতে ইবলিস তার উপদেষ্টাদের নিয়ে বসেছে। যেখানে ইবলিস অত্যন্ত অহংকার ও গর্বের সাথে নিজের সফলতার খতিয়ান তুলে ধরছে।

    ইবলিসের উদ্বোধনী ভাষণ (শ্লোক ১-৫)

    یہ عناصر کا پرانا کھیل! یہ دنیائے دوں

    ساکنانِ عرش اعظم کی تمناوں کا خوں


    "ইয়েহ আ'নাসির কা পুরানা খেল! ইয়েহ দুনিয়ায়ে দুঁ!  

    সাকিনানে আরশে আ'যম কি তামান্নাউঁ কা খুঁ!


    উপাদানসমূহের (পশ্চিমা বস্তুবাদী দর্শন (Materialism-এর) এই প্রাচীন খেলা! এই নীচ পৃথিবী! মহান আরশের বাসিন্দাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার রক্ত!


    শয়তান তার বক্তৃতা শুরু করছে মানবসভ্যতার এক গভীর হতাশার চিত্র দিয়ে। ‘আ'নাসির কা পুরানা খেল’ বলে ইবলিস শুধু মাটি-পানি-আগুন-বাতাসের সংঘর্ষ বোঝাচ্ছেন না; বরং সে ইঙ্গিত করছে ডারউইনের বিবর্তনবাদ, মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং পশ্চিমা সভ্যতার যান্ত্রিক দর্শনের দিকে। যে দর্শন মানুষকে আত্মা ও নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু পদার্থের খেলায় পরিণত করেছে। আর ‘সাকিনানে আরশে আ'যম কি তামান্নাউঁ কা খুঁ’—এই পঙ্ক্তিতে ইকবাল ফেরেশতাদের সেই ঐতিহাসিক আপত্তির কথা স্মরণ করছেন, যখন তারা আদম সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিলেন। ফেরেশতারা আশা করেছিলেন পৃথিবীতে শান্তি ও পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ইবলিস আনন্দের সাথে বলছে, আজ মানুষের পতন ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ফেরেশতাদের সেই আশা রক্তাক্ত হয়েছে। পৃথিবী এখন তারই আখড়া, যেখানে আদমের সন্তানরা পশুতে পরিণত হয়েছে।


    اس کی بربادی پہ آج آمادہ ہے وہ کارساز  

    جس نے اس کا نام رکھا تھا جہانِ کاف و نوں


    "ইস কি বরবাদি পে আজ আমদাহ হ্যায় ওহ কারেসাজ  

    জিস নে ইস কা নাম রাখা থা জাহানে কাফ ও নূঁ"


    আজ সেই কারিগর (আল্লাহ) এর ধ্বংসের জন্য প্রস্তুত,  

    যিনি এর নাম রেখেছিলেন ‘কুন’ (হও)-এর জগৎ।


    এখানে ইবলিস একটি বিস্ময়কর দাবি করে বসেছে। সে বলছে, আল্লাহ নিজেই যেন এই পৃথিবী ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছেন। ‘কারেসাজ’ শব্দটি দ্বারা ইকবাল আল্লাহকে ‘কারিগর’ বা ‘সৃষ্টিকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। ‘কাফ’ ও ‘নূন’ হলো আরবি বর্ণমালার দুটি অক্ষর, যা কুরআনে ‘কুন ফাইয়াকুন’ (হও, আর তা হয়ে যায়)-এর প্রতি ইঙ্গিত। ইবলিস ব্যঙ্গ করে বলছে, যে জগৎ ‘হও’ শব্দের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল, আজ তার স্রষ্টাই যেন সেটি ধ্বংস করতে চাইছেন। এর মাধ্যমে শয়তান বোঝাতে চায়, বর্তমান পৃথিবীর জঘন্য অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, মহান স্রষ্টাও আর এটিকে অব্যাহত রাখতে চাচ্ছেন না। এটি একটি শক্তিশালী রূপক—যেখানে ইবলিস মনে করে সে পুরোপুরি জয়ী হয়েছে, এমনকি আল্লাহও যেন তার সৃষ্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।


    میں نے دکھلایا فرنگی کو ملوکیت کا خواب  

    میں نے توڑا مسجد و دیر و کلیسا کا فسوں


    "ময় নে দেখলায়া ফারাঙ্গি কো মুলুকিয়াত কা খাব  

    ময় নে তোড়া মসজিদ ও দয়র ও কালিসা কা ফুসূঁ"


    আমি ইউরোপীয়দের সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছি;  

    আমি মসজিদ, মন্দির ও গির্জার জাদু ভেঙে দিয়েছি।


    শয়তান তার প্রথম বড় দাবি করছে। ‘ফারাঙ্গি’ বলতে সে ইউরোপীয় জাতিগুলোকে বোঝাচ্ছে। ইবলিস বলছে, ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা যে আজ বিশ্বজুড়ে উপনিবেশ স্থাপন করে অর্ধেক মানবজাতিকে দাস বানিয়েছে, তার পেছনে তারই হাত আছে। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ মূলত শয়তানের দেওয়া একটি ‘স্বপ্ন’—যেখানে তারা নিজেদের উন্নত ও শ্রেষ্ঠ ভাবে, আর বাকি সব জাতিকে তারা তুচ্ছ ও অপরিষ্কার মনে করে। এমন জনগোষ্ঠীকে বিশ্বনেতৃত্বের স্বপ্ন দেখিয়েছে যারা এর যোগ্যই না। অযোগ্য ও অপদার্থদের সে বিশ্ব-শাসনের আসনে সমাসীন করে দিতে পেরে গর্ব করছে। অন্যদিকে, ‘মসজিদ ও দয়র ও কালিসা’ অর্থাৎ মুসলিম মসজিদ, খ্রিস্টান গির্জা ও ইহুদি উপাসনালয় সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক বার্তাকে সে ‘ফুসূঁ’ (জাদু) বলে অভিহিত করেছে, যা সে ভেঙে দিয়েছে। অর্থাৎ, সে মানুষকে ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে আটকে রেখেছে, কিন্তু ধর্মের আসল সামাজিক ও নৈতিক শক্তিকে হত্যা করেছে। মানুষ এখন গির্জা-মসজিদে নামাজ-প্রার্থনা করে, কিন্তু শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না।


    میں نے ناداروں کو سکھلایا سبق تقدیر کا  

    میں نے منعم کو دیا سرمایہ داری کا جنوں


    "ময় নে নাদারোঁ কো সিখলায়া সবক তাক্বদীর কা  

    ময় নে মুনয়া'ম কো দিয়া সরমায়া দারি কা জুনূঁ"


    আমি দরিদ্র বেচারাদের ভাগ্যবাদের শিক্ষা দিয়েছি;  

    আর ধনীদের দিয়েছি পুঁজিবাদের উন্মাদনা।


    ইবলিস এখানে তার সবচেয়ে মারাত্মক কৌশল উন্মোচন করছে। একদিকে সে গরিব-মজলুম মানুষদেরকে ‘ভাগ্যবাদ’ শিখিয়েছে। ‘সবক্ব তাক্বদির কা’ মানে সেই শিক্ষা, যা বলে ‘তুমি জন্মেই গরিব, এটাই তোমার কপাল, মাথা পেতে নাও, কোনো প্রতিবাদ করো না, আল্লাহ যা দিয়েছেন তাই নিয়ে থাকো, এটাই তোমার নিয়তি।’ এই শিক্ষাটি শোষকদের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক। কারণ এর ফলে শোষিতরা বিদ্রোহ করে না। অন্যদিকে, সে ধনী-পুঁজিপতিদের মধ্যে ‘সরমায়াহ দারি কা জুনূঁ’ বা পুঁজিবাদের উন্মাদনা ঢেলে দিয়েছে। অর্থাৎ, সে ধনীদেরকে অত্যন্ত লোভী, অন্যায়ভাবে সম্পদ জমাকারী এবং মানুষের রক্ত-ঘাম শোষণকারী বানিয়ে তুলেছে। এই দ্বিমুখী কৌশলের মাধ্যমে, একদিকে গরিবকে স্তব্ধ আর অন্যদিকে ধনীকে আরও ধন-সম্পদের পাগল করে, সে পুরো শোষণ ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করেছে। ইকবাল এখানে আধুনিক পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি উন্মোচন করেছেন। পুঁজিবাদ বাঁচে গরিবের নিষ্ক্রিয়তা এবং ধনীর অমর্যাদাকর লোভের ওপর।


    کون کر سکتا ہے اس کی آتشِ سوزاں کو سرد  

    جس کے ہنگاموں میں ہو ابلیس کا سوزِ دروں  

    جس کی شاخیں ہوں ہماری آبیاری سے بلند  

    کون کر سکتا ہے اس نخلِ کہن کو سرنگوں


    "কৌন কর সাকতা হ্যায় ইস কি আতিশে সূযাঁ কো সর্দ  

    জিস কে হাঙ্গামোঁ মেঁ হো ইবলিস কা সোজে দরূঁ  

    জিস কি শাখেঁ হোঁ হামারি আবিয়ারি সে বুলন্দ  

    কৌন কর সাকতা হ্যায় ইস নখলে কুহন কো সারাঙ্গূঁ!"


    কে নিভাতে পারে সেই জ্বলন্ত আগুন,  

    যার হাঙ্গামার পেছনে রয়েছে ইবলিসের অন্তর্দহন?  

    যার শাখাগুলো আমাদের সিঞ্চনে উন্নত,  

    কে পারে সেই পুরোনো বৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে?


    ইবলিস অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী হয়ে ওঠে। ‘আতিশে সূযাঁ’ বা জ্বলন্ত আগুন, বর্তমান শয়তানি বিশ্বব্যবস্থা। যার উত্তেজনা, যুদ্ধ,-বিগ্রহ এবং হাঙ্গামার পেছনে রয়েছে ইবলিসের নিজস্ব অন্তর্দহন (সূযে দরূঁ)। সে বুঝিয়েছে, এই ব্যবস্থা তার নিজের আবেগ, ঘৃণা ও ক্ষোভের ফল। এটি ঠাণ্ডা করার বা থামানোর সাধ্য কারও নেই। দ্বিতীয় অংশে সে নিজেদের (শয়তানি শক্তি) ‘আবিয়ারি’ (সিঞ্চন) বলে উল্লেখ করছে। অর্থাৎ, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, বৈরাগ্যবাদ ইত্যাদিতে তারা গাছের মতো পানি দিয়ে বড় করে তুলেছে। এর শাখাপ্রশাখা এখন এতটাই বিস্তৃত যে ‘নখলে কুহন’ (পুরোনো বৃক্ষ)। এই পুরোনো শোষণব্যবস্থাকে কেউ উপড়ে ফেলতে পারবে না। ইবলিসের এই অহংকার শুধু তার দৃষ্টিভঙ্গি নয়; এটি বর্তমান বৈশ্বিক পুঁজিবাদী, ধর্মীয় গোড়ামি, স্বৈরাচারী ব্যবস্থার আত্মবিশ্বাসকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে। যেখানে মনে করা হচ্ছে ‘কোনো বিকল্প নেই’ (TINA—There Is No Alternative)। ইকবাল এখানে শয়তানের মুখে সেইসব বিষয় রেখে এসবের ধারকদের অহংকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।


    ইবলিসের এই অহংকারের পরেই সভায় প্রথম উপদেষ্টা দাঁড়ায়। যে ইবলিসের ব্যবস্থার প্রশংসা করে আরও কিছু রূপরেখা যোগ করে। তার চেহারায় আত্মবিশ্বাস ও প্রশংসার ভাব। ইবলিসের প্রতি তার অগাধ আনুগত্য এবং নিজেদের তৈরি শয়তানি শাসনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে সেই ভীরুতা নেই, যা এই জাতির সোনালী সময়ে ছিলো। বরং রয়েছে এক ধূর্ত বুদ্ধিমত্তা, যে বুদ্ধি দিয়ে সে আজকের যুগের আলেম সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাসকশ্রেণির মগজে কাজ করে। সে ইবলিসের অর্জনকে আরও সুসংহত করতে চায়, কিন্তু একইসঙ্গে বাস্তবতার কঠিন হিসেব নিয়েও সচেতন।


    প্রথম উপদেষ্টার ভাষণ (শ্লোক ৬-১২)

    اس میں کیا شک ہے کہ محکم ہے یہ ابلیسی نظام  

    پختہ تر اس سے ہوئے خوئے غلامی میں عوام


    "ইস মেঁ কিয়া শক হ্যায় কেহ, মুহকাম হ্যায় ইয়েহ ইবলিসি নেযাম

    পুখতাতর ইস সে হুয়ে খোয়ে গুলামি মেঁ আ'ওয়াম"


    এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ইবলিসি ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মজবুত। এর ফলে সাধারণ মানুষ দাসত্বের মানসিকতায় আরও বেশি পরিপক্ব ও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।


    প্রথম উপদেষ্টা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করছে, শয়তান যা কিছু তৈরি করেছে, তা কোনো দুর্বল কাঠামো নয়। বরং এটি অত্যন্ত শক্ত, অটুট ও সুসংহত। কিন্তু সে শুধু ব্যবস্থার শক্তির কথা বলে না; সে বলে, সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দাসত্বের ‘অভ্যাস’ (খোয়ে গুলামি) আরও পোক্ত হয়েছে। 


    এই পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত গভীর। ইকবাল এখানে দেখিয়েছেন, শোষণ কেবল বাইরের শৃঙ্খল নয়; এটি অভ্যন্তরীণ মানসিকতায় পরিণত হলে তা আরও ভয়ঙ্কর। মানুষ যখন দাসত্বে ‘অভ্যস্ত’ হয়ে যায়, তখন সে নিজের শৃঙ্খলকে ভালোবাসতে শুরু করে। এরিস্টটলের ভাষায়, কেউ কেউ ‘প্রকৃতিগতভাবে দাস’। আর হেগেলের দ্বান্দ্বিকতায়, দাস একসময় প্রভুর অস্তিত্বের ওপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে, সে প্রভু ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারে না। প্রথম উপদেষ্টা এই মানসিক দাসত্বকেই শয়তানের সবচেয়ে বড় কীর্তি বলে ঘোষণা করছে। আজকের বিশ্বে আমরা দেখি, মানুষ গণতন্ত্র, ভোগবাদ ও মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের শৃঙ্খলিত করে। এই যে আত্ম-দাসত্ব, এটিই ইবলিসের সবচেয়ে বড় ফাঁদ।


    ہے ازل سے ان غریبوں کے مقدر میں سجود  

    ان کی فطرت کا تقاضا ہے نمازِ بے قیام


    "হ্যায় আযল সে ইন গরিবোঁ কে মুকাদ্দর মেঁ সুজূদ  

    ইন কি ফিতরাত কা তাক্বাযা হ্যায় নামাজে বে ক্বিয়াম"


    অনাদিকাল থেকেই এই দরিদ্রদের ভাগ্যে কেবল সেজদা (নত হওয়া, পরাধীনতা) লেখা। যেনো তাদের স্বভাবের দাবি হলো ‘দাঁড়ানো ছাড়া নামাজ’ (অর্থাৎ কোনো আন্দোলন, বিপ্লব বা প্রতিবাদ ছাড়া নিষ্ক্রিয় গোলামী)।


    প্রথম উপদেষ্টা গরিব-শোষিত মানুষদের নিয়ে একটি বিপজ্জনক তত্ত্ব পেশ করছে। সে বলছে, তাদের ভাগ্যে ‘সুজূদ’ লেখা। অর্থাৎ তারা যেন চিরকাল মাথা নত করেই থাকে। সে তাদের ‘ফিতরত’-কে দোষারোপ করছে। বলছে এটিই যেনো তাদের স্বভাব এবং অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ‘নামাজে বে ক্বিয়াম’ অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি রূপক। নামাজে দাঁড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। কিন্তু প্রথম উপদেষ্টা বলছে, গরিবদের জন্য উপযুক্ত হলো ‘দাঁড়ানো ছাড়া নামাজ’। অর্থাৎ, তারা যেন কোনো প্রতিরোধ, কোনো আন্দোলন, প্রতিবাদের জন্য দাঁড়ানো, কিছুই করছে না। শুধু মাথা নত করে, তাসবিহ গুনে, প্রার্থনা করে আর অন্যদিকে তাদের ওপর জুলুম চলতে থাকে। ইকবাল এখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করছেন, যা মানুষকে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায় না। বরং তাদের নিষ্ক্রিয় ও আত্মসমর্পণকারী বানায়। এই শিক্ষাটি পুঁজিবাদের জন্য অমৃত। কারণ যদি প্রতিটি সেক্টরের (ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক) শ্রমিকরা প্রতিবাদ না করে, তবে এগুলোর মুনাফা চিরকাল প্রবাহিত হতে থাকবে।


    آرزو اول تو پیدا ہو نہیں سکتی کہیں  

    ہو کہیں پیدا تو مرجاتی ہے یا رہتی ہے خام


    "আরযু, আওয়াল তো পায়দা হো নেহি সাকতি কাহীঁ  

    হো কাহীঁ পায়দা তো মরজাতি হ্যায়, ইয়া রেহতি হ্যায় খাম!"


    আশা—প্রথমত কোথাও জন্মাতেই পারে না;  

    যদি কোথাও জন্মায়, তবে তা মরে যায় অথবা অপ্রস্ফুটিত (অপরিণত) থেকে যায়! (হে আল্লাহ, এই প্রজন্ম যেনো এই ভুল না করে! জাগিয়ে দাও তাঁদের! ইকবালীয় তড়প আর যাতনা অন্তরে পয়দা করে দাও!)


    প্রথম উপদেষ্টা এখানে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছে, শোষিত মানুষের মধ্যে কোনো জেগে উঠার কোনো আকাঙ্খা বা আশা (আরযূ) জন্মায়ই না। কারণ শোষণ এতটাই নিপীড়নমূলক, মানুষ বাঁচার তাগিদেই সব আশা হারিয়ে ফেলে। আর যদি কারও মধ্যে কোনো আশা জাগ্রত হয়, কোনো স্বপ্ন, কোনো বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায় অথবা অপরিণতই থেকে যায়। তা কখনো পূর্ণতা পায় না, আলোতেই আসে না বা আসতে দেওয়া হয় না।


    یہ ہماری سعی پیہم کی کرامت ہے کہ آج  

    صوفی و ملا ملوکیت کے بندے ہیں تمام


    "ইয়েহ হামারি সা'ইয়ে পয়হাম কি কারামাত হ্যায় কেহ আজ  

    সূফী ও মোল্লা মুলুকিয়াত কে বন্দে হ্যাঁয় তামাম!"


    আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমেরই এই মহান কীর্তি যে, আজ সুফি ও মোল্লারা (ধর্মীয় নেতারা) সবাই রাজতন্ত্র ও শাসকশ্রেণির দাসে পরিণত হয়েছে!


    প্রথম উপদেষ্টা যে কথাটি সবচেয়ে গর্বের সাথে বলছে, তা হলো—ধর্মীয় নেতৃত্বের আত্মসমর্পণ। ‘সা'ইয়ে পয়হাম’ অর্থাৎ নিরন্তর প্রচেষ্টার সাথে শয়তানি শক্তি এতদিন ধরে যে কাজ করেছে, তার চূড়ান্ত ফল হলো, ইসলামের নামে যারা কথা বলে, যারা মসজিদ-মাদ্রাসার ইমাম, যারা সুফি-দরবেশ হিসেবে পরিচিত, তাঁরাও এখন শাসকশ্রেণির অনুগত দাসে পরিণত হয়েছে। 


    ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, খিলাফতের সময় আলেমরা ছিলেন শাসকের সমালোচক, জনগণের কণ্ঠস্বর। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন মুসলিম বিশ্ব দখল করে, তারা আলেমদের দুভাবে ব্যবহার করে। এক দলকে তারা নিজেদের পক্ষে এনে ধর্মীয় ফতোয়া দিয়ে শাসনকে বৈধতা দেয়, আর অন্যদলকে তারা সুফিবাদ ও বৈরাগ্যে ডুবিয়ে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখে। প্রথম উপদেষ্টা এই সাফল্যকেই সবচেয়ে বড় ‘কারামত’ বা মহান কীর্তি বলে ঘোষণা করছে। কারণ ধর্ম যতদিন নেতৃত্ব দেয়, ততদিন অন্যায় টেকেনি; কিন্তু যখন ধর্মীয় নেতৃত্ব শাসকের দাসে পরিণত হয়, তখন ইসলামের বৈপ্লবিক শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। এটি ইকবালের সবচেয়ে তিক্ত ও বাস্তবসম্মত সমালোচনা।


    طبع مشرق کے لیے موزوں یہی افیون تھی  

    ورنہ قوالی سے کچھ کم تر نہیں علمِ کلام


    "তবয়ে' মাশরিক্ব কে লিয়ে মওজুঁ ইয়েহি আফিইয়ুঁ থি  

    ওরনাহ ক্বাওয়ালি সে কুছ কমতর নেহি ইলমে কালাম"


    প্রাচ্যবাসীর স্বভাবের জন্য এই আফিমই (মাদক) ছিল উপযুক্ত;  

    নইলে ‘কালাম’ (ধর্মতত্ত্ব ও আকিদার জটিল বিতর্ক) কাওয়ালি থেকে কোনো অংশে কম ছিল না।


    এই পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ব্যঙ্গাত্মক। প্রথম উপদেষ্টা বলছে, প্রাচ্য বা মুসলিম সমাজের 'তবিয়ত’ বা স্বভাব যেহেতু কিছুটা আবেগপ্রবণ ও দার্শনিক, তাই তাদের জন্য ‘আফিউন’ বা মাদকের মতো উপযুক্ত জিনিস হলো এই ‘কালাম’ বা ধর্মতত্ত্ব এবং আকিদার জটিল বিতর্ক। মানুষ যখন ‘ইলমে কালাম’-এ ডুবে থাকে, আল্লাহর সিফাত, নবীদের ইসমাত, মি'ইয়ারে সাহাবা, কুরআনের সৃষ্টি-অসৃষ্টি, ঈসার মৃত্যু-জীবন, কিয়ামতের কাঠামো ইত্যাদি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে মেতে থাকে, তখন তারা বাস্তবের রাজনীতি ও শোষণ ভুলে যায়। ইবলিসের প্রথম উপদেষ্টা বলছে, এই কালাম আসলে কাওয়ালি বা সংগীতের থেকেও কম বিপজ্জনক নয়। কাওয়ালি মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য নেশায় ডুবায়, কিন্তু ‘কালাম’ বা আকিদার এই বিতর্ক মানুষের মগজে এমন এক জটিল জাল বুনে দেয় যে, সারা জীবন তারা বাস্তবতা থেকে দূরে থাকে, আর নিজেকে অত্যন্ত ‘পণ্ডিত’ মনে করে। ইকবাল এখানে স্পষ্ট করে বলেছেন, যে ধর্মতত্ত্ব মানুষকে বাস্তবতা থেকে গাফিল রাখে, সময়ের মূখ্য কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে রাখে, তা শয়তানের আফিম (মদ)।


    ہے طواف و حج کا ہنگامہ اگر باقی تو کیا  

    کند ہو کر رہ گئی مومن کی تیغِ بے نیام


    "হ্যায় তওয়াফ ও হজ্জ কা হাঙ্গামা আগর বাকি তো কিয়া

    কুন্দ হো কর রাহ গায়ি মোমিন কি তেগে বে নিয়াম!"


    যদি তাওয়াফ ও হজ্জের আয়োজন চলতেই থাকে, তাহলে কী হয়েছে? মুমিনের খাপছাড়া তলোয়ার তো ভোঁতা ও নিষ্প্রভ হয়ে গেছে!


    ইবলিসের প্রথম উপদেষ্টা এখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বাহ্যিক জাঁকজমক ও প্রকৃত শক্তির মধ্যে পার্থক্য দেখাচ্ছে। তার মতে, লোকেরা যদি কাবা তাওয়াফ করে, হজ্জ করে, এই আয়োজনগুলো চলতেই থাকে, তাতে আমাদের (শয়তানি শক্তির) কিছু যায়-আসে না। কারণ সেইসব আনুষ্ঠানিকতা মুমিনের আসল অস্ত্র—‘তেগে বে-নিয়াম’ (খাপছাড়া তলোয়ার)—কে ভোঁতা ও নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। 


    ইসলামের ইতিহাসে তলোয়ার কেবল অস্ত্র নয়; এটি ইনসাফ ও সত্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক। সাহাবিরা যখন বদরের ময়দানে দাঁড়াতেন, তখন তাদের তলোয়ার ছিল ইনসাফের প্রতীক, ন্যায়ের ঝংকার। তারা জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু আজ মুসলমানরা যদিও শুধু হজ্জ-তাওয়াফ তথা বাহ্যিক ধর্মীয় রিচুয়াল কিছু করে, কিন্তু জালিমের বাতিল রাজত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না। তার সেই ইনসাফের তলোয়ার ভোঁতা হয়ে গেছে। এটি পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ইসলামের মূল চেতনাকে হত্যা করে, "শয়তানের খোদাতন্ত্র" বহাল রাখার কূটকৌশলের নিখুঁত বর্ণনা।


    کس کی نومیدی پہ حجت ہے یہ فرمانِ جدید  

    ہے جہاد اس دور میں مردِ مسلماں پر حرام


    "কিস কি নউমিদি পে হুজ্জত হ্যায় ইয়েহ ফরমানে জাদিদ

    হ্যায় জেহাদ ইস দৌর মেঁ মর্দে মুসলমান পে হারাম"


    কার হতাশা ও নিরাশার ওপর ভিত্তি করে এই নতুন ফরমান (আইন) জারি করা হয়েছে? এই যুগে জিহাদ (ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রাম) মুসলমান পুরুষের ওপর হারাম ঘোষণা করা হয়েছে!


    প্রথম উপদেষ্টা সবচেয়ে তিক্ত সত্যটি এখানে বলছে। সে জানে, কোনো শাসক বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ যেনো নতুন একটি ‘ফরমান’ জারি করেছে, যাতে জিহাদকে (ন্যায়ের জন্য সংগ্রামকে) হারাম বলা হয়েছে। ‘কিস কি নউমিদি পে হুজ্জত’ অর্থাৎ, এই ফরমান কার হতাশার কারণে এলো? প্রশ্নটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। ইবলিস ও তার উপদেষ্টারা হয়তো শাসকদের মধ্যে এই হতাশা তৈরি করেছিল, ইসলামের জিহাদী চেতনা সমগ্র ব্যবস্থার জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই তারা ফতোয়া দিল ‘এই যুগে জিহাদ করা হারাম’। 


    ঐতিহাসিকভাবে, ব্রিটিশ শাসনামলে অনেক আলেম জিহাদকে ‘হারাম’ ফতোয়া দিয়েছিলেন, যাতে মুসলমানরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে। ইকবাল এই ফতোয়াবাজিকেই শয়তানের সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যখন কোনো জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে ‘হারাম’ বা ‘পাপ’ মনে করতে শুরু করে, তখন তার পতন অনিবার্য। এটি পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রেরও একটি কৌশল। তারা তাদের সঙ্গী উলামাকে ব্যবহার করে, ধর্মীয় ভাষ্য ব্যবহার করে জনগণের প্রতিরোধকে স্তব্ধ করতে চাই। ছাত্রজনতা ও সাধারণ জনগণ যখন জুলুমের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে, তখন ব্রিটিশদের তাবেদার সেইসব আলেমের ন্যায় এরাও এটাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে সেমিনার-সেম্পোজিয়ামের দিন-তারিখ ঘোষণা করে। কোনো অডিটোরিয়াম হলে জালিমের ঝলকানো বাতি-সজ্জায় মাজলুমকে সন্ত্রাস ফতোয়া দেবার মহা-আয়োজন তারা করে। বাংলাদেশের জুলাইয়েও দেওবন্দী পরিচয় দাতা একদল আলেম এরকম করতে দ্বিধা করেনি। অথচ দেওবন্দ কখনো জুলুমের সঙ্গী হওয়ার শিক্ষা দেয় না। তাই এটা ছিলো, অপাত্র দেওবন্দীদের মানসজাত একটি বিকৃত রূপ। অবশেষে নাটেরগুরু পালিয়ে গেলে তারা সেটা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। 


    দ্বিতীয় উপদেষ্টার প্রশ্ন ও প্রথম উপদেষ্টার জবাব:


    ইবলিসের উদ্বোধনী ও প্রথম উপদেষ্টার (শ্লোক ১২ পর্যন্ত) এই আশাবাদী ও তেলবাজি বক্তব্য শুনে দ্বিতীয় উপদেষ্টা অধৈর্য হয়ে ওঠে। সে প্রথম উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে বলে—


    خبر ہے سلطانیٔ جمہور کا غوغا کہ شر؟  

    تو جہاں کے تازہ فتنوں سے نہیں ہے با خبر


    "খবর হ্যায় সুলতানিয়ে জমহুর কা গৌগা কেহ শর?

    তু জাহাঁ কে তাজা ফিতনোঁ সে নেহি হ্যায় বা-খবর!"


    গণতন্ত্রের এই কোলাহল কি ভালো? (নাকি তা অমঙ্গল?)  

    তুমি কি বিশ্বের নতুন ফিতনা ও বিপদগুলোর ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ?


    দ্বিতীয় উপদেষ্টা প্রথম উপদেষ্টার অতি-আত্মবিশ্বাসে সতর্ক হয়। সে বলেন, ‘সুলতানিয়ে জমহুর’ বা ‘গণতন্ত্রের শাসন’-এর যে শোরগোল বিশ্বজুড়ে উঠেছে, তা কি আমাদের জন্য সত্যিই ভালো? এখানে সে ইউরোপে ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া ‘গণতন্ত্র’ ও ‘প্রজাতন্ত্র’-এর ধারণার প্রতি ইঙ্গিত করছে। সে ভয় পাচ্ছে, এসব নতুন ধারণা হয়তো শয়তানের তৈরি পুরোনো রাজতন্ত্রের শাসন-শোষণের কাঠামো ভেঙে ফেলতে পারে।


    প্রথম উপদেষ্টা এই প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলে এবং সাথেসাথে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের আসল রূপ উন্মোচন করে বলে—

    ہوں، مگر میری جہاں بینی بتاتی ہے مجھے  

    جو ملوکیت کا اک پردہ ہو کیا اس سے خطر


    "হুঁ, মাগার মেরি জাহাঁ বীনি বতাতি হ্যায় মুঝে

    জো মুলুকিয়্যত কা এক পর্দা হো কিয়া ইস সে খতর!"


    হ্যাঁ, কিন্তু আমার বিশ্বদৃষ্টি (দূরদর্শিতা) আমাকে বলে—  

    যদি এটি রাজতন্ত্রের কোনো পর্দা বা আবরণ হয়, তাহলে কী সমস্যা এতে?


    প্রথম উপদেষ্টা অত্যন্ত চতুরতার সাথে দ্বিতীয় উপদেষ্টার ভয় উড়িয়ে দেয়। সে বলে, আধুনিক গণতন্ত্র আসলে রাজতন্ত্রেরই একটি নতুন পর্দা। রাজতন্ত্রের মতোই নির্দিষ্ট কিছু পারিবারিক ধারায়, গোষ্ঠীতে এবং গুটিকয়েক মানুষের হাতেই এই ক্ষমতা আবদ্ধ আছে। এর ভেতরে শোষণের পুরোনো কাঠামো অটুট আছে, শুধু বাইরের ভাষা ও পোশাক বদলানো হয়েছে। তাই এতে ভয়ের কিছু নেই।


    ہم نے خود شاہی کو پہنایا ہے جمہوری لباس  

    جب ذرا آدم ہوا ہے خود شناس و خود نگر


    "হাম নে খুদ শাহি কো পহনায়া হ্যায় জমহুরি লেবাস

    জব যরা আদম হুয়া হ্যায় খুদ শিনাস ও খুদ নিগর"


    আমরা নিজেরাই রাজতন্ত্রকে বা স্বৈরাচারকে পরিয়ে দিয়েছি গণতন্ত্রের পোশাক। যখন মানুষ কিছুটা আত্মসচেতন হয়েছে, নিজেকে চিনতে ও নিজের দিকে তাকাতে শিখেছে।


    প্রথম উপদেষ্টা স্বীকার করছে যে, মানুষ কিছুটা ‘খুদ শিনাস ও খুদ নিগর’ (আত্মসচেতন ও আত্মদর্শী) হয়েছে। তাই তাদের চোখে সরাসরি রাজতন্ত্র খারাপ লাগে। তাই শয়তানি শক্তি আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখা, রাজতন্ত্রের মুখোশ পাল্টিয়ে তাকে ‘গণতন্ত্র’, ‘প্রজাতন্ত্র’, ‘মানবাধিকার’ ইত্যাদি নামে উপস্থাপন করেছে। এটি ইকবালের অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি পর্যবেক্ষণ। আজকের বিশ্বে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পুঁজিপতি ও কর্পোরেট লবিরা কীভাবে ভোটের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে, তা দেখে আমরা ইকবালের এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা অনুভব করি।


    کاروبارِ شہر یاری کی حقیقت اور ہے  

    یہ وجود میر و سلطاں پر نہیں ہے منحصر


    "কারোবারে শাহরিয়ারি কি হাকিকত আউর হ্যায়

    ইয়ে উজূদ মীর ও সুলতাঁ পে নেহি হ্যায় মুনহাসির"


    রাষ্ট্র পরিচালনার (শহর ও রাজ্য চালানোর) প্রকৃত ব্যাপারটি অন্যরকম। এটা কোনো আমির, রাজা বা শাসকের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়।


    প্রথম উপদেষ্টা এখানে রাষ্ট্রের কাঠামো ও প্রকৃত ক্ষমতার কথা বলছে। প্রকৃত শাসন শাসকের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে পুরো ব্যবস্থা, অর্থনীতি, আমলাতন্ত্র ও সামরিক শক্তির ওপর। রাজা থাকুক বা প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী, যে কাঠামোতে পুঁজির প্রবাহ, ঋণের জাল ও সামরিক চুক্তি থাকে, সেই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। তাই ভীত হওয়ার কিছু নেই।


    مجلسِ ملت ہو یا پرویز کا دربار ہو  

    ہے وہ سلطاں، غیر کی کھیتی پہ ہو جس کی نظر


    "মজলিসে মিল্লাত হো ইয়া পারভেজ কা দরবার হো

    হ্যায় ওহ সুলতাঁ, গয়ের কি খেতি পে হো জিস কি নজর!"


    ‘মিল্লাতের পরিষদ’ (সংসদ) হোক বা ‘পারবেজের (শাসকের) রাজদরবার’ হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তো সেই শাসক-শ্রেণি ক্ষমতায় থাকে, যার দৃষ্টি থাকে অন্যের (জনগণের) জমি ও সম্পদের ওপর!


    প্রথম উপদেষ্টা গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পায় না। সে বলছে, সংসদ হোক বা বাদশাহর দরবার, উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনরা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে। ‘গয়ের কি খেতি’ অর্থাৎ অন্যের জমি, অন্যের শ্রমের ফল—এগুলোর ওপরই তাদের নজর থাকে। এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চিরন্তন সত্য, শাসক যেই হোক না কেন, উৎপাদনের উপকরণ ও সম্পদ সবসময়ই কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, আর জনগণ তার উৎপাদিত ফসল থেকে বঞ্চিত হয়।


    تو نے کیا دیکھا نہیں مغرب کا جمہوری نظام؟  

    چہرہ روشن، اندروں چنگیز سے تاریک تر


    "তো নে কিয়া দেখা নেহি মাগরিব কা জমহুরি নেযাম?

    চেহরা রওশন, আন্দরূঁ চেঙ্গিজ সে তারিক তর!


    তুমি কি পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখনি?  

    এর চেহারা (বাহ্যিক রূপ) অত্যন্ত উজ্জ্বল, কিন্তু এর ভেতর চেঙ্গেজ খানের (নিষ্ঠুর স্বৈরাচারের) চেয়েও বেশি অন্ধকার!


    প্রথম উপদেষ্টা তার ভাষণের চূড়ান্ত অংশে পশ্চিমা গণতন্ত্রের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সে বলে, বাহির থেকে গণতন্ত্র দেখতে খুব সুন্দর—ভোট, স্বাধীনতা, মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা—সবই মনে হয় জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু তার ভেতরের কাঠামো চেঙ্গিজ খানের চরম স্বৈরাচার ও রক্তপাতের চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর। কারণ চেঙ্গিজ সরাসরি তরবারি দিয়ে মানুষ কাটত; কিন্তু পশ্চিমা গণতন্ত্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক ঋণের ফাঁদ, গুপ্তহত্যা, মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা আর ভোটের বিভ্রমের মাধ্যমে পুরো জাতিকে দাস বানিয়ে ফেলে। যা আরও মারাত্মক।


    ইকবালের এই উপলব্ধি ১৯৩৬ সালের পরিস্থিতির চেয়েও আজকের বিশ্বে অধিক বাস্তব। ১৯৩৬ সালে পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো (বিশেষত ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকা) যখন উপনিবেশগুলোতে অত্যাচার চালাচ্ছিল, তখন তারা নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক’ বলত। আজও তারা সেই একই নামে এবং তন্ত্রে পৃথিবীর দেশে-দেশে যুদ্ধংদেহী বীভৎসতা নিয়ে উন্মাদ হয়ে ফিরছে। ইকবাল তাদের ভণ্ডামি সেকালেই উন্মোচন করে দিয়েছেন।


    পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভণ্ডামি উন্মোচন করে প্রথম উপদেষ্টা যখন এখনো ইবলিসি শাসন বজায় আছে দেখিয়ে দ্বিতীয় উপদেষ্টাকে চুপ করিয়ে দিলো, তখন সভার পরিবেশ বদলে গেল। প্রথম উপদেষ্টার আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য শুনে বাকি উপদেষ্টারা কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও, তৃতীয় উপদেষ্টা দাঁড়িয়ে পড়লো। তার মুখে যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছায়া। সে ইবলিস ও অন্য সভাসদদের সম্বোধন করে মার্ক্সবাদী হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ বলতে লাগলো,

    روح سلطانی رہے باقی تو پھر کیا اضطراب  

    ہے مگر کیا اس یہودی کی شرارت کا جواب؟


    "রূহে সুলতানি রহে বাকি তো ফির কিয়া ইজতেরাব

    হ্যায় মাগার কিয়া ইস ইহুদি কি শারারত কা জওয়াব?"


    রাজত্বের আত্মা যদি বেঁচে থাকে, তবে আর কী চিন্তা?  

    কিন্তু এই ইহুদির দুষ্টুমির জবাব কী?


    তৃতীয় উপদেষ্টা প্রথমেই সভার পরিবেশে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। সে বলছে, যেকোনো তন্ত্রে-মন্ত্রে ইবলিসি শাসনের মূল চেতনা যদি অক্ষুণ্ণ থাকে, তাহলে গণতন্ত্র বা নতুন কোনো ব্যবস্থা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। কারণ ওগুলো তো আমাদেরই শাসনের রূপান্তর। কিন্তু সে যে প্রশ্ন উত্থাপন করল, তা সভায় এক ভিন্ন ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করলো। ‘ইস ইহুদি’ এই ইহুদি বলে এখানে সে কার্ল মার্ক্সের প্রতি ইঙ্গিত করছে। 


    মার্ক্সের ‘ডাচ ক্যাপিটাল’ ও কমিউনিস্ট ইস্তেহার শুধু অর্থনৈতিক তত্ত্ব ছিল না; এটি ছিল পুরোনো শাসনব্যবস্থার ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর এক দার্শনিক অস্ত্র। তৃতীয় উপদেষ্টা বুঝতে পারছে, মার্ক্সবাদ কেবল ইউরোপের রাজতন্ত্রের পোশাক বদলাচ্ছে না, বরং তার গোড়াতেই কুঠারাঘাত করছে। তাই সে ইবলিসের কাছে প্রশ্ন তুলছে—এই নতুন ফিতনার মোকাবিলা করার মতো কোনো কৌশল আমাদের আছে কি?


    وہ کلیم بے تجلی! وہ مسیح بے صلیب

    نیست پیغمبر ولیکن در بغل دارد کتاب


    "ওহ কালিম বে তাজাল্লি! ওহ মাসিহ বে সালিব!

    নেস্তে পয়গাম্বর, ওয়া লেকিন দর বগল দারদ কিতাব!


    সে ‘কালিম’ (মূসা) কিন্তু আলোহীন! সে ‘মসীহ’ (ঈসা) কিন্তু ক্রুশহীন! সে নবী নয়, কিন্তু বগলে কিতাব (ডাস ক্যাপিটাল) নিয়ে আছে!


    তৃতীয় উপদেষ্টা মার্ক্সকে ব্যঙ্গের ছলে এক ভয়ানক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। ‘কালিমুল্লাহ’ হলো মূসা (আ.)-এর উপাধী, যিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। কিন্তু মার্ক্স সেই ‘কালিম’ যার কোনো ঐশ্বরিক আলো বা তূর পর্বতের তাজাল্লী নেই। ‘মাসীহ’ হলেন ঈসা (আ.)। যিনি খ্রিস্ট বিশ্বাস অনুযায়ী ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন (কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি আসমানে জীবিত আছেন)। কিন্তু মার্ক্স সেই ‘মাসীহ’ যার কোনো ক্রুশ নেই। অর্থাৎ তিনি কোনো ত্যাগ বা আত্মত্যাগের আদর্শ বহন করেন না। তিনি নবী নন, এটা তৃতীয় উপদেষ্টা স্বীকার করছে। কিন্তু তারপর সে যে কথাটি বলে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘দর বগল দারদ কিতাব’—তার বগলে একটি কিতাব আছে। 


    এই কিতাব হলো ‘ডাস ক্যাপিটাল’ (Das Kapital)। মার্ক্স নবী না হলেও, তার এই কিতাব পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোর মতোই এই কিতাবও এক নতুন বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং তা করেছে ধর্মের বিকল্প হিসেবে, ধর্মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে। তৃতীয় উপদেষ্টা এই সত্যকে ভয় পাচ্ছে, একজন নবী নয় এমন ব্যক্তির একটি বই কীভাবে এত বিপ্লব ঘটাতে পারে? এটি শয়তানি দরবারের জন্য এক নতুন ধরণের হুমকি। যা ধর্মীয় কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে কিন্তু আমাদেরই মেইন অস্ত্র বস্তুবাদী দর্শনের মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত করতে পারে। এমন হলে তো আমরা অস্ত্রহারা হয়ে যাবো।


    کیا بتاؤں کیا ہے کافر کی نگاہِ پردہ سوز  

    مشرق و مغرب کی قوموں کے لیے روز حساب


    "কিয়া বাতাউঁ কিয়া হ্যায় কাফির কি নিগাহে পর্দা সোয

    মাশরিক ও মাগরিব কি কওমোঁ কে লিয়ে রোজে হিসাব!"


    কী বলব, কাফেরের দৃষ্টি কতটা পর্দা-বিদারক!  

    প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জাতিগুলোর জন্য এটি হবে হিসাবের দিন!


    তৃতীয় উপদেষ্টা এখানে মার্ক্সের দৃষ্টিভঙ্গির শক্তিকে স্বীকার করছেন। ‘পর্দা সোয’ যে দৃষ্টি পর্দা ছিঁড়ে ফেলে, অর্থাৎ যা সমস্ত আবরণ, প্রতারণা ও ধোঁকাকে উন্মোচন করে। মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণ পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও খ্রিস্টধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা শোষণের কাঠামোকে উন্মোচিত করেছে। এটি কেবল ইউরোপের জন্য নয়; ‘মাশরিক-মাগরিব’, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় জাতির জন্যই এটি এক বিচারের দিন বয়ে এনেছে। 


    তৃতীয় উপদেষ্টা বুঝতে পারছে, মার্ক্সবাদী চেতনা যদি একবার প্রাচ্যের মুসলিম জনগণের মধ্যেও প্রবেশ করে, তবে তারা শুধু পশ্চিমা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং নিজেদের শোষক রাজতন্ত্র ও অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করতে পারে। এটি শয়তানি দরবারের জন্য দ্বিগুণ বিপদ। কারণ মার্ক্সবাদ ধর্মের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় (যে জায়গাটা তাদের হাতিয়ারের উৎসমুখ), আবার শোষণের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিতও করে।


    اس سے بڑھ کر اور کیا ہوگا طبیعت کا فساد  

    توڑ دی بندوں نے آقاؤں کے خیموں کی طناب


    "ইস সে বাড়হ কর আউর কিয়া হোগা তবিয়'ত কা ফাসাদ

    তোড় দি বন্দোঁ নে আকাউঁ কে খায়মোঁ কি তানাব!"


    এর চেয়ে বড় প্রকৃতির বিকৃতি আর কী হতে পারে?  

    বন্দারা তাদের মনিবদের খুঁটির দড়ি ভেঙে দিয়েছে!


    তৃতীয় উপদেষ্টা এখানে মার্ক্সবাদী বিপ্লবের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি তুলে ধরছে। 'তবিয়ত কা ফাসাদ' প্রকৃতির বিকৃতি শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সে বলছে, প্রকৃতির যে শৃঙ্খলা শতাব্দী ধরে চলে আসছে—যেখানে কেউ মনিব, কেউ দাস—সেই শৃঙ্খলাই মনে হচ্ছে, এই ইহুদি ভেঙে দেবে। দাসরা তাদের মনিবদের তাঁবুর খুঁটির দড়ি ছিঁড়ে ফেলবে। 


    এই চিত্রটি অত্যন্ত শক্তিশালী। মনিবের তাঁবু হলো তার ক্ষমতার প্রতীক। যে তাঁবু তাকে সুরক্ষা দেয়, যে তাঁবুর নিচে সে বসে শাসন করে। কিন্তু যখন দাসেরা সেই তাঁবুর দড়ি ছিঁড়ে ফেলে, তখন তাঁবু ভেঙে পড়ে, মনিব উন্মুক্ত হয়ে যায়, তার ক্ষমতা ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়। মার্ক্সবাদী বিপ্লব ঠিক এই কাজটি করছে—শোষকদের ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। তৃতীয় উপদেষ্টা এই দৃশ্য কল্পনা করেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। কারণ এটি কেবল রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দার্শনিক ব্যবস্থা। যা ধর্ম, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির পুরোনো কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানায়।


    তৃতীয় উপদেষ্টার এই ভীতিকর বক্তব্য শুনে চতুর্থ উপদেষ্টা দাঁড়ায়। সে তৃতীয় উপদেষ্টার উদ্বেগকে কিছুটা হালকা করতে মনস্থির করলো। ইতিহাসের দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখাতে চাইল, সাম্রাজ্য ও শাসনব্যবস্থার পতন নতুন কিছু নয়, এটি বারবার ঘটেছে।


    توڑ اس کا رومتہ الکبریٰ کے ایوانوں میں دیکھ  

    آل سیزر کو دکھایا ہم نے پھر سیزر کا خواب


    "তোড় ইস কা রুমাতুল কুবরা কে এওয়ানোউঁ মেঁ দেখ

    আলে সিজার কো দিখায়া হাম নে ফির সিজার কা খাব"


    রোমের রাজপ্রাসাদে তার ধ্বংসের দিকে একটু তাকাও। আমরা সিজারের বংশধরদের আবারও সিজারের স্বপ্ন দেখিয়েছি।


    চতুর্থ উপদেষ্টা তৃতীয় উপদেষ্টাকে ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সে বলছে, রোমের রাজপ্রাসাদে একসময় সেই সাম্রাজ্যের ধ্বংস দেখেছিলাম। রোমান সাম্রাজ্য একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি ছিল, কিন্তু তাও ধ্বংস হয়ে গেলো। তারপরও ’আলে সিজার'—সিজারের বংশধররা—আবারও সিজারের স্বপ্ন দেখেছে। অর্থাৎ, নতুন নতুন শক্তির উত্থান হয়েছে, তারা আবারও সাম্রাজ্য নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছে। 


    চতুর্থ উপদেষ্টা এখানে বলতে চাইছে, মার্ক্সবাদ বা সমাজতন্ত্র যতই ভয়ঙ্কর হোক না কেন, ইতিহাসে এরকম অনেক বিপ্লব এসেছে। রোমান সাম্রাজ্য পড়েছে, নতুন শক্তি এসেছে, তারপর আবার পুরোনো শক্তি ফিরে এসেছে। শয়তানি ব্যবস্থা এত সহজে ধ্বংস হয় না; এটি নিজেকে নতুন রূপে পুনর্গঠিত করে। তাই তৃতীয় উপদেষ্টার এত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।


    کون بحر روم کی موجوں سے ہے لپٹا ہوا  

    گاہ بالد چوں صنوبر، گاہ نالد چوں رباب


    "কৌন বাহরে রোম কি মওজোঁ সে হ্যায় লেপটা হুয়া

    গাহ বালাদ চূঁ সানাওবার, গাহ নালাদ চূঁ রবাব"


    কে রোমান সাগরের ঢেউয়ের সাথে জড়িয়ে আছে?  

    কখনো সানাওবারের (পাইন গাছের) মতো উঁচুতে, কখনো বীণার মতো ক্রন্দনরত।


    এই পঙ্ক্তিতে চতুর্থ উপদেষ্টা ইউরোপের ইতিহাসের উত্থান-পতনের এক অপূর্ব চিত্র এঁকেছে। ‘বাহরে রোম’ বা ভূমধ্যসাগর—যা ইউরোপীয় সভ্যতার দোলনা। এই সাগরের ঢেউয়ের সাথে যারা জড়িয়ে আছে, তারা হচ্ছে ইউরোপীয় জাতিগুলো। কখনো তারা সানাওবার বা পাইন গাছের মতো উঁচুতে ওঠে, অর্থাৎ সাম্রাজ্য, শক্তি ও সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে। ‘সানাওবার’ (পাইন গাছ) হলো চিরসবুজ, লম্বা ও দৃঢ়—যা আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। এটি উত্থান, সমৃদ্ধি, শক্তি ও সাম্রাজ্যের শিখরের প্রতীক। যখন ইউরোপীয় সভ্যতা শক্তিশালী ছিল, তখন তারা সানাওবারের মতো উঁচুতে ছিল। আবার কখনো তারা রবাব বা বীণার মতো ক্রন্দনরত হয়, অর্থাৎ পতন, বিপর্যয় ও দুরবস্থায় পড়ে। রাবাব’ (এক ধরনের বীণা) যা বাদ্যযন্ত্র—ক্রন্দনরত ও বিলাপকারী। এটি পতন, দুর্বলতা ও বিলাপের প্রতীক। যখন ইউরোপে দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ বা পতন আসে, তখন তারা বীণার মতো কান্নাকাটি করে।


    চতুর্থ উপদেষ্টা এখানে ইউরোপীয় সভ্যতার চক্রাকার ইতিহাসের কথা বলছেন। উত্থান-পতনের এই খেলা চিরকাল চলবে। মার্ক্সবাদ হয়তো নতুন এক উত্থান এনেছে, কিন্তু তা চিরস্থায়ী হবে না। শয়তানি শক্তি ধৈর্য ধরলে আবারও তার রাজত্ব ফিরে পাবে।


    তবে তৃতীয় উপদেষ্টা চতুর্থ উপদেষ্টার এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তে সন্তুষ্ট নয়। সে কটাক্ষের সাথে জবাব দেয়,

    میں تو اس کی عاقبت بینی کا کچھ قائل نہیں  

    جس نے افرنگی سیاست کو کیا یوں بے حجاب


    "ময় তো ইস কি আ'ক্বিবত বীনি কা কুছ ক্বায়েল নেহি

    জিস নে আফরাঙ্গি সিয়াসত কো কিয়া ইউঁ বে হিজাব!"


    আমি তার দূরদর্শিতার কিছুই বিশ্বাস করি না,  

    যে ইউরোপীয় রাজনীতিকে এমন নিঃসংকোচ (উন্মুক্ত) করেছে!


    তৃতীয় উপদেষ্টা মার্ক্সের দূরদর্শিতাকে অস্বীকার করছে। সে বলছে, মার্ক্স হয়তো ইউরোপীয় রাজনীতির গোপনীয়তা ও প্রতারণা উন্মোচন করেছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তার ভবিষ্যৎবাণী সত্য হবে। তিনি যা করেছেন, তা হলো ইউরোপীয় রাজনীতির কুৎসিত দিকগুলো জনসমক্ষে এনে দেওয়া—যা শয়তানি দরবারের জন্য অস্বস্তিকর, কিন্তু অস্থায়ী। 


    তৃতীয় উপদেষ্টা এখানে এক ধরনের অহংকার প্রকাশ করছে—শয়তানি শক্তি এত সহজে পরাজিত হবে না, মার্ক্সের দর্শনই শেষ কথা নয়। কিন্তু তার এই কথার ভেতরেও এক অস্বস্তি লুকিয়ে আছে। সে মার্ক্সের প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারছে না, তাই তার দূরদর্শিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।


    তৃতীয় ও চতুর্থ উপদেষ্টার বিতর্ক চলাকালীন পঞ্চম উপদেষ্টা দাঁড়িয়ে পড়ল। সে বাকিদের মতো বিতর্কে সময় নষ্ট না করে সরাসরি ইবলিসকে সম্বোধন করল। তার বক্তব্য ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ ও গম্ভীর। যেন সে সমস্ত উপদেষ্টাদের চূড়ান্ত উদ্বেগের সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরছে,


    اے ترے سوزِ نفس سے کارِ عالم استوار  

    تو نے جب چاہا کیا ہر پردگی کو آشکار


    "আয় তেরে সোযে নফস সে কারে আলম উস্তওয়ার

    তু নে জব চাহা কিয়া হর পর্দেগি কো আশকার"


    হে (ইবলিস), তোমার অন্তর্দহনের কারণেই বিশ্বের কাজ সুসংহত;  

    তুমি যখন চাও, সব গোপন বিষয় উন্মোচন করো।


    পঞ্চম উপদেষ্টা প্রথমেই ইবলিসের শক্তির প্রশংসা করে—এক ধরনের তোষামোদ বা তেলবাজি করল। সে বলছে, ‘সোযে নফস’—তোমার অন্তর্দহন, তোমার ক্ষোভ ও ঘৃণা—সেই শক্তি যা এই বিশ্বে এসব তন্ত্রমন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে। ইবলিসের এই অন্তর্দহনই হলো সেই অদৃশ্য ইঞ্জিন, যা বিশ্বের শাসনব্যবস্থা, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণকে টিকিয়ে রেখেছে। ইবলিসের চিরন্তন বিদ্রোহ ও মানুষের প্রতি তার ঘৃণাই বাস্তবিক অর্থে বিশ্বের ‘কারবার’ (ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনীতি) চালাচ্ছে। আর তুমি যখন চাও, তখন সব গোপন রহস্য উন্মোচন করতে পারো। এই কথার মাধ্যমে ইবলিসকে খুশি করতে চায়, কিন্তু তারপরই সে কঠিন সত্যি বলতে শুরু করবে। ইকবাল এখানে বলতে চেয়েছেন, পশ্চিমা সভ্যতা, তার প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি, এবং অবিরাম ভোগবিলাসী সংস্কৃতি আসলে 'সোযে নফস'-এরই বহিঃপ্রকাশ। যা মূলত ঈর্ষা, লোভ ও অহংকারকে ঘিরে আবর্তিত হয়। পঞ্চম উপদেষ্টা ইবলিসের চোখে আয়না ধরিয়ে দিচ্ছে, তুমি নিজেকে বিশ্বের কর্তা মনে করো, কিন্তু আসলে তোমার এই শক্তি নির্ভর করছে মানুষের অন্তর্নিহিত দুর্বলতার ওপর। মানুষ যদি জেগে যায় আর এসব থেকে মুক্তি খুঁজতে লাগে, তাহলে তোমার রাজত্ব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।


    آب و گل تیری حرارت سے جہانِ سوز و ساز  

    ابلہِ جنت تری تعلیم سے دانائے کار


    "আব ও গিল তেরি হারারাত সে জাহানে সোয ও সায

    আবলাহে জান্নাত তেরি তা'লিম সে দানায়ে কার"


    পানি ও মাটির এই বিশ্ব তোমার তাপ ও উত্তেজনা থেকেই সজীব, কর্মঠ ও সুসংহত হয়ে গড়ে উঠেছে। এটাই সেই ‘জাহানে সোয ও সায’ (জ্বালা-উদ্দীপনা ও সৃষ্টির জগৎ), যা পৃথিবীর প্রকৃত উষ্ণতা ও গতিশীলতার উৎস। আর জান্নাতের বোকারাও তোমার শিক্ষায় কাজে পারদর্শী হয়েছে।


    পঞ্চম উপদেষ্টা এখানে ইবলিসের প্রভাবের ব্যাপ্তি বর্ণনা করছে। ‘আব ও গিল’ পৃথিবীর মাটি ও পানি সবকিছুই যেনো ইবলিসের তাপে উত্তপ্ত। এমনকি ‘আবলাহে জান্নাত" জান্নাতের সরল বাসিন্দা (ফেরেশতা) যারা, তারাও ইবলিসের শিক্ষায় ‘দানায়ে কার’ কাজে দক্ষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ইবলিসের প্রভাব এতটাই গভীর যে, পবিত্র সত্তারাও তার কৌশল শিখে ফেলেছে। 


    এই পঙ্ক্তিতে পঞ্চম উপদেষ্টা ইবলিসের ক্ষমতার প্রশংসা করলেও, সে একটি অন্তর্নিহিত সত্যও বলছে। পঞ্চম উপদেষ্টা ইবলিসকে এখানে  প্রচুর প্রশংসা ও তোষামোদ করছে (যেমন আগের পঙ্ক্তিতে ‘কারে আলম উস্তওয়ার’ বলেছে)। বলতে চাইছে—“হে ইবলিস! তোমার প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে, জান্নাতের ফেরেশতারাও (যারা ছিল অমায়িক ও পবিত্র) তোমার কৌশলের কারণে ‘চতুর’ ও ‘কর্মদক্ষ’ হয়ে গেছে! যদি ফেরেশতারাও ইবলিসের কৌশল শিখে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ইবলিসের প্রভাব সীমাহীন—কিন্তু এই প্রভাব কি চিরকাল টেকবে? কারণ, ঠিক পরবর্তী পঙ্ক্তিতেই তিনি বলবে “তোমার ইউরোপীয় যাদুকররা (শিষ্যরা) এখন অযোগ্য হয়ে পড়েছে, আমি তাদের বুদ্ধিতে আস্থা রাখি না”। অর্থাৎ, এই প্রশংসা ছিল ধোঁকা; সে ইবলিসের সামনে প্রকৃত বিপদ (মার্ক্সবাদ) তুলে ধরছিলো।


    تجھ سے بڑھ کر فطرت آدم کا وہ محرم نہیں  

    سادہ دل بندوں میں جو مشہور ہے پروردگار

    "তুঝ সে বাড়হ কর ফিতরাতে আদম কা ওহ মাহরাম নেহি

    সাদা দিল বন্দোঁ মেঁ জো মাশহুর হ্যায় পারওয়ারদিগার"


    আদমের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা তোমার চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ আর কেউ নেই; যাকে সরল বিশ্বাসীরা ‘প্রভু’ বলে জানে। অর্থাৎ, মানুষের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, লোভ, অহংকার ও কামনা-বাসনার চাবিকাঠি আল্লাহর চেয়েও বেশি ইবলিসের হাতে।


    পঞ্চম উপদেষ্টা এখানে একটি গভীর দার্শনিক সত্য বলছে। মানুষের প্রকৃতির সবচেয়ে গভীর রহস্য ইবলিসের কাছেই উন্মুক্ত—আল্লাহর চেয়েও বেশি। যাকে সরল বিশ্বাসীরা পারওয়ারদিগার বলে জানে, সেই আল্লাহ হয়তো মানুষের দুর্বলতা ও পাপের গভীরতা সম্পর্কে ইবলিসের মতো জানেন না। 


    এটি একটি ভয়ঙ্কর স্বীকারোক্তি। ইকবাল এখানে আক্ষরিক ধর্মতত্ত্ব বলছেন না; তিনি মানব-মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক বাস্তবতা বলছেন। শয়তান মানুষের মনস্তত্ত্ব, তার লোভ, ভয়, অহংকার ও দুর্বলতা সম্পর্কে এতটাই গভীরভাবে জানে যে, সে মানুষকে যেকোনো দিকে চালিত করতে পারে। পঞ্চম উপদেষ্টা এই সত্যকে কাজে লাগিয়ে ইবলিসকে বুঝাতে চায়, তোমার শক্তি অসীম, তবুও তুমি কি নিশ্চিত যে, এই শক্তি চিরকাল টিকবে?


    کام تھا جن کا فقط تقدیس و تسبیح و طواف  

    تیری غیرت سے ابد تک سرنگوں و شرمسار


    "কাম থা জিন কা ফাকাত তাকদিস ও তাসবিহ ও তওয়াফ

    তেরি গাইরত সে আবদ তক সারাঙ্গূঁ ও শর্মসার"


    যাদের কাজ ছিল শুধু পবিত্রতা ঘোষণা, তাসবিহ ও তাওয়াফ,  

    তারা তোমার ঈর্ষায় চিরকাল নত ও লজ্জিত।


    পঞ্চম উপদেষ্টা ফেরেশতাদের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—যাদের কাজ ছিল শুধু আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা, তাসবিহ পড়া ও আরশের চারপাশে তাওয়াফ করা। কিন্তু ইবলিসের ঈর্ষা ও হিংসা তাদের চিরকালের জন্য নত ও লজ্জিত করে রেখেছে। ফেরেশতারাও ইবলিসের সামনে পরাজিত, তারা মানুষের প্রকৃতির জটিলতা বুঝতে পারেনি, আর ইবলিস তা বুঝেছে। 


    কিন্তু এই পঙ্ক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে পঞ্চম উপদেষ্টার উদ্বেগ। ফেরেশতারাও যদি ইবলিসের কাছে পরাজিত হয়, তাহলে কি কোনো শক্তি ইবলিসকে পরাজিত করতে পারে? নাকি এমন কোনো শক্তি আছে যা ইবলিসের চেয়েও শক্তিশালী?


    گرچہ ہیں تیرے مرید افرنگ کے ساحر تمام  

    اب مجھے ان کی فراست پر نہیں ہے اعتبار


    "গারচে হ্যাঁয় তেরে মুরিদ আফরাঙ্গ কে সাহির তামাম

    আব মুঝে ইন কি ফিরাসাত পে নেহি হ্যায় এ'তেবার"


    যদিও ইউরোপের সব যাদুকর (পুঁজিপতি, সাম্রাজ্যবাদী) তোমার অনুসারী, তবে এখন আমি তাদের বুদ্ধিতে আস্থা রাখি না।


    পঞ্চম উপদেষ্টা এখানে ইউরোপীয় পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কথা বলছে, যাদের সে ‘সাহির’ বা যাদুকর বলে বুঝাচ্ছে। তারা জাদুর মতো প্রভাব বিস্তার করে ইবলিসের সাম্রাজ্য পৃথিবী জুড়ে বজায় রাখে। তারা ইবলিসের একনিষ্ঠ অনুসারী, ইবলিসের কৌশলেই বিশ্ব পরিচালনা করে। কিন্তু পঞ্চম উপদেষ্টা বলছে, এখন সে তাদের বুদ্ধিতে আর আস্থা রাখে না। 


    কেন? কারণ (তখনকার দুনিয়ায়) মার্ক্সবাদী চ্যালেঞ্জ এতটাই শক্তিশালী যে, ইউরোপের পুরোনো যাদুকররা আর তাকে সামলাতে পারছে না। তারা হয়তো ইবলিসের কাছ থেকে কৌশল শিখেছে, কিন্তু মার্ক্সবাদ তাদের সব কৌশলকে অচল করে দিচ্ছে। এটি পঞ্চম উপদেষ্টার কণ্ঠে এক গভীর হতাশা। শয়তানি শক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্ররাও এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে।


    وہ یہودی فتنہ گر، وہ روحِ مزدک کا بروز  

    ہر قبا ہونے کو ہے اس کے جنوں سے تار تار


    "ওহ ইহুদি ফিতনাগর, ওহ রূহে মাজদাক কা বুরুজ

    হর ক্বাবা হোনে কো হ্যায় উস কে জুনূঁ সে তার তার”


    সেই ইহুদি ফিতনাবাজ, সেই মাজদাকের আত্মার আবির্ভাব; তার উন্মাদনায় প্রতিটি পোশাক ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।


    পঞ্চম উপদেষ্টা মার্ক্সকে ইহুদি ফিতনাগর বলে অভিহিত করছে। আবার তাকে অত্যন্ত প্রাচীন এক ইতিহাসের সাথে যুক্ত করছেন মাজদাকের আত্মার আবির্ভাব বলে।


    মাজদাক ছিলেন সাসানীয় সাম্রাজ্যের একজন ধর্মীয় সংস্কারক (৫ম-৬ষ্ঠ শতক), যিনি সম্পদের পুনর্বণ্টন ও সাম্যবাদের এক রূপ প্রচার করেছিলেন। তিনি ধনীদের সম্পদ ও নারীদের ‘সাধারণ সম্পত্তি’ করার কথা বলেছিলেন—যা তৎকালীন শাসকশ্রেণির জন্য ছিল চরম হুমকি। শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু পঞ্চম উপদেষ্টা বলছে, মার্ক্সের মাধ্যমে মাজদাকের সেই পুরোনো চেতনা আবার ফিরে এসেছে এবং তা আরও শক্তিশালী। ‘হর ক্বাবা’ প্রতিটি পোশাক, অর্থাৎ সমাজের প্রতিটি স্তর তার উন্মাদনায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।


    পঞ্চম উপদেষ্টা এখানে মার্ক্সবাদকে শুধু একটি নতুন মতবাদ নয়, বরং ইতিহাসের এক পুরোনো চ্যালেঞ্জের পুনরুত্থান হিসেবে দেখছে। যা বারবার দমন করা হয়েছে, কিন্তু বারবার ফিরে আসছে।


    زاغ دشتی ہو رہا ہے ہمسرِ شاہیں و چرغ  

    کتنی سرعت سے بدلتا ہے مزاجِ روزگار


    "যাগে দাশতি হো রহা হ্যায় হামসরে শাহীন ও চরগ

    কিতনি সারআ'ত সে বদলতা হ্যায় মিযাজে রোজগার"


    মাঠের কাক ঈগল ও চিলের সমকক্ষ হচ্ছে;  

    কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে যুগের স্বভাব!


    পঞ্চম উপদেষ্টা এখানে এক বিপ্লবী রূপান্তরের চিত্র এঁকেছে। 'যাগে দাশতি’ বা মাঠের কাক, যে ছিল তুচ্ছ, নীচ, শক্তিহীন—সে এখন ‘শাহীন ও চরগ’ ঈগল ও চিলের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। অর্থাৎ শক্তিশালী শিকারি পাখিদের সমান স্তরে পৌঁছে গেছে। 


    এটি শ্রেণিব্যবস্থার ভাঙনের প্রতীক। যারা ছিল নীচু, শোষিত, তারা এখন শক্তিশালীদের সমকক্ষ। আর এই পরিবর্তন ঘটছে কী দ্রুত গতিতে! পঞ্চম উপদেষ্টা আতঙ্কিত, সমাজের এই রূপান্তর এত দ্রুত ঘটছে যে, শয়তানি শক্তি তার সাথে তাল মিলাতে পারছে না।


    چھا گئی آشفتہ ہو کر وسعتِ افلاک پر  

    جس کو نادانی سے ہم سمجھے تھے اک مشتِ غبار


    "ছা গায়ি আশোফতা হো কর ওসআ'তে আফলাক পর

    জিস কো নাদানি সে হাম সমঝে থে এক মুশতে গোবার"


    আকাশের বিস্তৃতি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তা, যাকে আমরা অজ্ঞতার কারণে এক মুঠো ধূলিকণা ভেবেছিলাম।


    পঞ্চম উপদেষ্টা এখানে মার্ক্সবাদী বিপ্লবের ব্যাপ্তি নিয়ে কথা বলছে। যে আন্দোলন, যে চিন্তাধারা এবং যাকে তারা এক মুঠো ধূলিকণা ভেবেছিল, তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন মনে করেছিল, তা এখন আকাশের বিস্তৃতি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপ নাড়িয়ে দিচ্ছে।


    এটি শয়তানি অহংকারের বিরুদ্ধে এক কঠিন সত্য—তারা মার্ক্সবাদকে অবমূল্যায়ন করেছিল। কিন্তু তা এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এবং সব সীমানা অতিক্রম করে ফেলেছে। পঞ্চম উপদেষ্টা স্বীকার করছে, তাদের বুদ্ধি এখানে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারেনি।


    فتنۂ فردا کی ہیبت کا یہ عالم ہے کہ آج  

    کانپتے ہیں کوہسار و مرغزار و جوئبار


    "ফিতনায়ে ফরদা কি হায়বত কা ইয়েহ আলম হ্যায় কেহ আজ 

    কাঁপতে হ্যাঁয় কোহসার ও মার্গজার ও জুয়েবার"


    আগামীর ফিতনার ভয়াবহতা এমন যে, আজ পাহাড়, সবুজ মাঠ ও নদীগুলো কাঁপছে (ভয়ে প্রকম্পিত)৷


    পঞ্চম উপদেষ্টা তার বক্তব্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বলছে, ইউরোপের কমিউনিস্ট বিপ্লব ও শ্রমিক আন্দোলন এতটাই শক্তিশালী যে, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোও (যা ইবলিস তৈরি করেছিল) তার ভয়ে প্রকম্পিত। পাহাড়-মাঠ-নদী—এগুলো আসলে রূপকভাবে ‘পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ ও রাজতন্ত্রের অটুট কাঠামো’-কে নির্দেশ করছে।


    ইকবাল এখানে ‘পরিবর্তনের অনিবার্যতা’-র কথা বলেছেন। পঞ্চম উপদেষ্টা ইবলিসকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, যে ব্যবস্থা তুমি পাহাড়ের মতো দৃঢ় মনে করছ, তা ভেঙে পড়ছে। এটি ইবলিসের অহংকারের প্রতি এক তীব্র কটাক্ষ।


    میرے آقا! وہ جہاں زیر و زبر ہونے کو ہے  

    جس جہاں کا ہے فقط تیری سیادت پر مدار


    "মেরে আক্বা! উয়োহ জাহাঁ জের ও জবর হোনে কো হ্যায়

    জিস জাহাঁ কা হ্যায় ফাকাত তেরি সিয়াদাত পর মাদার"


    হে আমার প্রভু! সেই সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা এখন ধ্বংস ও বিপর্যস্ত হতে চলেছে, যে বিশ্বের অস্তিত্ব শুধু তোমারই শাসন ও কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল।


    এটি পঞ্চম উপদেষ্টার দীর্ঘ সতর্কবাণীর চূড়ান্ত ও সবচেয়ে তীব্র অংশ। সে পাহাড়-মাঠ-নদী কাঁপার কথা বলার পর সরাসরি ইবলিসকে সম্বোধন করে এই কথাটি বললো।


     ইবলিসের রাজত্ব কোনো আদর্শ, ন্যায় বা ঐশ্বরিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি শুধু তার ব্যক্তিগত শোষণ, প্রতারণা ও মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর দক্ষতার ওপর টিকে আছে। পঞ্চম উপদেষ্টা এখানে ইঙ্গিত করছে—যদি সেই ভিত্তি (মানুষের অজ্ঞতা ও বিভাজন) একবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তবে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।


    সে ইবলিসের চোখে আয়না ধরিয়ে দিচ্ছে, “তোমার রাজত্ব চিরস্থায়ী নয়। এই নতুন বিপ্লব তোমার সেই ভিত্তিকেই আঘাত করছে, যা তুমি তৈরি করেছিলে।” এটি ছিল ইবলিসের জন্য এক চরম ধাক্কা, কারণ সে নিজেকে অনন্ত ও অজেয় মনে করতো। পঞ্চম উপদেষ্টা এই কথার মাধ্যমে প্রমাণ করলো, সে শুধু তোষামোদকারী উপদেষ্টা নয়; একজন দূরদর্শী উপদেষ্টা বটে। যে ইবলিসের আসল দুর্বলতা চিহ্নিত করে দিতে পারে।


    ইকবাল এখানে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও শ্রেণি-সংগ্রামের তত্ত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, কিন্তু এই কবিতাতেই সতর্কও করেছেন, এটি আধ্যাত্মিকতার শূন্যতা তৈরি করে। পঞ্চম উপদেষ্টার এই কথার ভেতর দিয়েই ইকবাল দেখিয়েছেন—পুঁজিবাদ, একনায়কতন্ত্র ও রাজতন্ত্র যেমন শয়তানি, তেমনি খুদি বিবর্জিত সমাজতন্ত্রও শুধু এক শয়তানকে অপসারণ করে আরেক শয়তানকে বসায়। আর এই দ্বন্দ্বের মাঝেই ইবলিসি সাম্রাজ্যের জন্য প্রকৃত বিপদ হলো, মুসলিম উম্মা'র জাগরণ। যা ইবলিস সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।


    পঞ্চম উপদেষ্টা যখন তাঁর দীর্ঘ ও ভীতিপ্রদ বক্তব্য শেষ করলো, তখন সভার পরিবেশ এক গভীর চাপে ঘনীভূত হয়ে উঠল। উপদেষ্টাদের মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার হলো। তাঁরা ইবলিসের দিকে তাকালো। সে এই চরম সংকটের উত্তরে কী বলে, তা শোনার জন্য। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর ইবলিস উঠে দাঁড়াল। তাঁর গলায় আত্মবিশ্বাস, তীক্ষ্ণতা ও এক ধরনের দার্শনিক প্রশান্তি। সে উপদেষ্টাদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলো। একের পর এক তাদের উদ্বেগ উড়িয়ে দিতে লাগলো এবং শেষ পর্যন্ত নিজের আসল ভয়ের কথা স্বীকার করতে।


    ইবলিসের জবাব: সমাজতন্ত্র ও পশ্চিমা ব্যবস্থাকে তুচ্ছ করে,

    ہے مرے دستِ تصرف میں جہانِ رنگ و بو

    کیا زمیں، کیا مہر و مہ، کیا آسماںِ تو بتو

    "হ্যায় মেরে দস্তে তাসাররুফ মেঁ জাহানে রঙ ও বু

    কিয়া জামিঁ, কিয়া মহর ও মাহ, কিয়া আসমাঁ-ই তু ব তু"


    আমার কর্তৃত্বের হাতে রয়েছে রঙ-গন্ধের এই জগৎ;

    কী পৃথিবী, কী সূর্য-চন্দ্র, কী আকাশ—সবই আমার অধীন।


    ইবলিস তাঁর জবাব শুরু করেছে এক চরম আত্মবিশ্বাসের সাথে। সে দাবি করছে সমগ্র বস্তুজগৎ—‘জাহান-ই-রঙ্গ ও বু’ অর্থাৎ ভৌত জগৎ তার কর্তৃত্বাধীন। শুধু পৃথিবী নয়, সূর্য, চন্দ্র ও আকাশও তাঁর হাতের মুঠোয়। এটি কেবল অহংকারের উক্তি নয়; বরং ইবলিস এখানে বস্তুবাদী দর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করছে। যে দর্শন বলে, রিয়েলিটি হলো শুধু বস্তু। আর বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত ক্ষমতা। ইবলিস তাঁর এই দাবির মাধ্যমে উপদেষ্টাদের বোঝাতে চাইছে, মার্ক্সবাদ বা সমাজতন্ত্র যতই বড় হুমকি হোক না কেন, তা বস্তুবাদী চিন্তারই একটি শাখা। আর বস্তুবাদ যেহেতু তাঁর রাজ্যের অংশ, তাই সে তা নিয়ে ভীত নয়।


    دیکھ لیں گے اپنی آنکھوں سے تماشا غرب و شرق

    میں نے جب گرما دیا اقوام یورپ کا لہو

    "দেখ লেঁ গে আপনি আঁখোঁ সে তামাশা গার্ব ও শার্ক

    ময় নে জব গরমা দিয়া আকওয়ামে ইউরোপ কা লহু"


    নিজ চোখে দেখবে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের তামাশা;

    যখন আমি ইউরোপের জাতিগুলোর রক্ত গরম করে দিলাম।


    ইবলিস এখানে তাঁর সাম্রাজ্যবাদী কৌশল উন্মোচন করছে। সে ইউরোপের জাতিগুলোর মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, উপনিবেশের লোভ ও যুদ্ধের উন্মাদনা সৃষ্টি করাকে বোঝাচ্ছে। সে বলছে, ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে, তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, উভয়ের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। এটি বিশ্বযুদ্ধগুলোর প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত। ইবলিস বুঝাতে চাইছে, সে ইউরোপের রাজনীতির চালিকাশক্তি।


    کیا امامانِ سیاست، کیا کلیسا کے شیوخ

    سب کو دیوانہ بنا سکتی ہے میری ایک ہو!

    "কিয়া ইমামানে সিয়াসত, কিয়া কালিসা কে শুয়ূখ

    সাব কো দিওয়ানা বানা সাকতি হ্যায় মেরি এক ‘হো’!


    রাজনীতির নেতা হোক বা গির্জার পাদ্রি—সবাইকে পাগল বানাতে পারে আমার একটি ‘হও’ (আদেশ)!


    ইবলিস এখানে তাঁর ক্ষমতার চূড়ান্ত দাবি করছে। একটি মাত্র ‘হও’ আদেশ দ্বারাই সে রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মীয় পাদ্রিদের পাগল বানিয়ে দিতে পারে। এটি কুরআনের ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা হয়ে যায়)-এর প্রতি এক ব্যঙ্গাত্মক ইঙ্গিত। ইবলিস বলতে চাইছে, স্রষ্টার যেমন সৃষ্টির জন্য একটি ‘হও’ বলাই যথেষ্ট, তারও তেমনি ধ্বংস ও বিভ্রান্তির জন্য তার যেকোনো অনুসারীদের একটি ‘হও’ বলাই যথেষ্ট। তার দাবি, অধর্মীয় ধর্ম ও রাজনীতির নেতৃত্ব তারই ইশারায় চলে। প্রকৃতপক্ষে তারা কেউই শাসক নন, বরং সে তাদের পিছনে থাকা অদৃশ্য শক্তি।


    کار گاہِ شیشہ جو ناداں سمجھتا ہے اسے

    توڑ کر دیکھے تو اس تہذیب کے جام و سبو

    "কার-গাহে শিশা জো নাদাঁ সমঝতা হ্যায় উসে

    তোড় কর দেখে তো ইস তাহজিব কে জাম ও সবু"


    যে লোক কাঁচের এই কারখানাকে (পশ্চিমা কাঁচের সভ্যতাকে) অজ্ঞতাবশত বুঝে (গ্রহণ করে) বসে আছে, সে যদি একবার তা ভেঙে চুরমার করে দেখে, তবে দেখতে পাবে এ সভ্যতা কিছু খালি পেয়ালা ও মদের কলসি মাত্র!


    ইবলিস এখানে পশ্চিমা সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্য ও অন্তর্নিহিত শূন্যতার কথা বলছে। কাঁচের কারখান হলো পশ্চিমা সভ্যতা। যা বাহির থেকে দেখতে চকচকে, স্বচ্ছ ও সুন্দর। কিন্তু ইবলিস বলছেন, যে ‘নাদাঁ’ (অজ্ঞ) মনে করে এটি শক্ত, সে যদি এটিকে ভেঙে ফেলে, তবে দেখতে পাবে এটি কেবল ‘জাম ও সবু’ (পেয়ালা ও জগ)। অর্থাৎ খালি, ভঙ্গুর ও অর্থহীন। ইবলিস তাঁর উপদেষ্টাদের বোঝাচ্ছে, পশ্চিমা গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সভ্যতা, সবই বাহ্যিক জাঁকজমক; এর ভেতরে কোনো নৈতিক শক্তি নেই। তাই তা টেকসই নয়।


    دستِ فطرت نے کیا ہے جن گریبانوں کو چاک

    مزدکی منطق کی سوزن سے نہیں ہوتے رفو

    "দস্তে ফিতরত নে কিয়া হ্যায় জিন গিরিবানোঁ কো চাক

    মাজদাকি মন্তিক কি সূযন সে নেহি হোতে রফু"


    প্রকৃতির হাত মানুষের যে সকল অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও কামনা-বাসনা সৃষ্টি করেছে, মাজদাকের দর্শন দিয়ে সেগুলোকে মেরামত করা সম্ভব নয়।


    ইবলিস এখানে মার্ক্সবাদী সমালোচনার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরছে। ‘দস্তে ফিতরাত’ (প্রকৃতির হাত) বলতে সে মানব প্রকৃতির গভীর, অমার্জনীয় দুর্বলতাগুলোকে বোঝাচ্ছে। যেমন লোভ, অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, ক্ষমতার দম্ভ ও আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি। এই গিরেবানগুলো (বক্ষদেশের ছিদ্র) প্রকৃতি নিজেই ছিঁড়ে ফেলেছে। মানুষের এই স্বাভাবিক দুর্বলতাগুলো হলো এমন ‘ছিদ্র’ বা ‘ফাটল’, যা দিয়ে শয়তান সহজেই মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে। মাজদাকের সাথে মার্ক্সকে তুলনা করায় ইবলিস বলছে, ‘মাজদাকি মন্তিক’ (মাজদাকের যুক্তি তথা মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র) এসব ছিদ্র সেলাই করতে পারে না। মার্ক্সবাদী দর্শন (সমাজতন্ত্র) অর্থনৈতিক বৈষম্যের সমাধান চায়, সম্পদের পুনর্বণ্টন চায়। কিন্তু ইবলিস কটাক্ষ করে বলছে, এই যুক্তি দিয়ে মানুষের অন্তর্নিহিত লোভ, ঈর্ষা বা অহংকার দূর করা যায় না। কারণ সেগুলো অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে যায় না; সেগুলো দূর করতে প্রয়োজন আত্মিক ও নৈতিক বিপ্লব (যা ইসলামের ‘তাযকিয়া’ বা ‘খুদি’-চেতনা দেয়)।


    ইবলিস এই কথার মাধ্যমে বোঝাতে চাইছে, সমাজতন্ত্র তাঁর জন্য হুমকি নয়। কারণ তা বস্তুবাদী চিন্তার মধ্যেই আটকে থাকে, যা ইবলিসের রাজ্যের অংশ। প্রকৃত হুমকি হলো ইসলাম, যা মানুষকে তার প্রবৃত্তি অতিক্রম করতে শেখায়।


    کب ڈرا سکتے ہیں مجھ کو اشتراکی کوچہ گرد

    یہ پریشاں روزگار، آشفتہ مغز، آشفتہ ہو

    "কব ডরা সাকতে হ্যাঁয় মুঝ কো ইশতিরাকি কুচা-গার্দ

    ইয়েগ পারেশাঁ রোজগার, আশোফতা-মগজ, আশোফতা হো"


    কখন ভয় দেখাতে পারে আমাকে সমাজতন্ত্রের পথশিশুরা?

    এরা জীবন-সংগ্রামে বিপর্যস্ত, মস্তিষ্কে বিভ্রান্ত ও চরম বিশৃঙ্খল এক দল!


    ইবলিস এখন সরাসরি পঞ্চম উপদেষ্টাকে জবাব দিচ্ছে। ‘ইশতিরাকি কুচা-গার্দ’ (সমাজতন্ত্রের পথশিশু) বলতে সে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের বুঝিয়েছে। সে তাদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল (পারেশাঁ রোজগার), বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অস্থির (আশোফতা মগজ) এবং সামগ্রিকভাবে বিশৃঙ্খল (আশোফতা হো) আখ্যা দিয়েছে। ইবলিসের দৃষ্টিতে, সমাজতন্ত্র একটি অস্থির, অপরিণত ও বিভ্রান্তিকর মতবাদ -যারা নিজেদের জীবিকা নিয়েই অস্থির, যাদের চিন্তা-চেতনায়ও কোনো সুস্থিরতা নেই, আর যারা সর্বতোভাবে এক বিশৃঙ্খল সত্তা। যাদের কোনো গভীর আধ্যাত্মিক বা নৈতিক ভিত্তিও নেই। এটি কেবল বস্তুগত অসন্তোষের প্রকাশ, যা ইবলিস সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।


    ইবলিসের আসল ভয় মুসলিম উম্মাহর জাগরণ। তাই সে বলে, 

    ہے اگر مجھ کو خطر کوئی تو اس امت سے ہے

    جس کی خاکستر میں ہے اب تک شرارِ آرزو

    "হ্যায় আগার মুঝ কো খতর কোয়ি তো ইস উম্মত সে হ্যায়

    জিস কি খাকিস্তার মেঁ হ্যায় আব তক শারারে আরজু"


    যদি কোনো বিপদ থাকে, তবে তা এই উম্মতের কাছ থেকেই আছে; যার ছাইয়ের মধ্যে এখনো আশার স্ফুলিঙ্গ জ্বলছে।


    ইবলিস এখানে তার সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি দিচ্ছে। সমাজতন্ত্রকে সে তুচ্ছ করলেও, মুসলিম উম্মাহকে প্রকৃত হুমকি হিসেবে দেখে। ইবলিস এখানে কোনো সাময়িক ভয়ের কথা বলছে না; উম্মতের জাগরণকে সে তার অস্তিত্বের জন্য চরম ও স্থায়ী হুমকি হিসেবে দেখছে। ‘খাকিস্তার’ (ছাই), মুসলিম উম্মাহ বাহ্যিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত, পরাজিত ও নিদ্রিত মনে হলেও, তার ভেতরে এখনো ‘শারারে আরজু’ (আশার স্ফুলিঙ্গ) জ্বলছে। ইবলিস জানে, এই স্ফুলিঙ্গ যেকোনো সময় আগুন হয়ে ফুটে উঠতে পারে। এটি ইকবালের ‘খুদি’ (আত্মসত্তা) দর্শনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেখানে দেখিয়েছেন তিনি বিশ্বাস করেন, মুসলিম উম্মাহর ভেতরে একটি অবিনশ্বর আত্মাশক্তি লুকিয়ে আছে, যা সঠিক আহ্বানে জাগ্রত হতে পারে।


    خال خال اس قوم میں اب تک نظر آتے ہیں وہ

    کرتے ہیں اشکِ سحر آگاہی سے جو ظالم وضو

    "খাল-খাল ইস কওম মেঁ আব তক নজর আতে হ্যাঁয় উয়োহ

    করতে হ্যাঁয় আশকে সেহর আগাহি সে জো জালিম ওজু"


    এই উম্মতের মধ্যে এখনো বিক্ষিপ্তভাবে (কোথাও কোথাও) তাদের দেখা যায়; যারা সজাগ চেতনায় ভোরের অশ্রু দিয়ে অত্যাচারীর (মোকাবিলার) জন্য ওজু (আত্মশুদ্ধি ও প্রস্তুতি) সম্পন্ন করে।


    ইবলিস স্বীকার করছে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এখনো কিছু মানুষ আছেন যারা জাগ্রত। ‘আশকে সেহর’ (প্রভাতের অশ্রু) বলতে সে তাঁদের রাতজাগা যন্ত্রণা ও প্রার্থনাকে বোঝাচ্ছে। ‘আগাহি’ (সচেতনতা) হলো তাদের বৈশিষ্ট্য। তাঁরা অন্ধভাবে নয়, বরং সচেতনভাবে জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁরা অত্যাচারীকে মোকাবিলা করার জন্য ভোরের অশ্রু ও সজাগ চেতনাকে সঙ্গী করে নিজেদেরকে পবিত্র ও প্রস্তুত করে। ইবলিসের প্রকৃত ভয় তাঁদের নিয়েই। কারণ তাঁরা সংখ্যায় কম হলেও, তাঁদের সচেতনতা, উম্মাহ চেতনা ও সংকল্প অত্যন্ত শক্তিশালী।


    جانتا ہے، جس پہ روشن باطنِ ایام ہے

    مزدکیت فتنۂ فردا نہیں، اسلام ہے

    "জান্তা হ্যায়, জিস পে রওশন বাতিনে আইয়্যাম হ্যায়

    মাজদাকিয়াত ফিতনায়ে ফরদা নেহি, ইসলাম হ্যায়"


    সে জানে, যার কাছে যুগের বাস্তবতা স্পষ্ট—মাজদাকিবাদ (সমাজতন্ত্র) আগামীর ফিতনা নয় (ইবলিসি সাম্রাজ্যের জন্য), ইসলাম (আসল হুমকি)।


    ইবলিস এখানে উপদেষ্টাদের ভ্রান্ত ধারণা সংশোধন করে দিচ্ছে। যার ‘বাতিনে আইয়াম’ (যুগের অন্তর্নিহিত সত্য) সম্পর্কে দৃষ্টি আছে, তিনি জানেন যে, ‘মাজদাকিয়াত’ (সমাজতন্ত্র) প্রকৃত হুমকি নয়। প্রকৃত হুমকি হলো ‘ইসলাম’। কারণ ইসলাম কেবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন, যা আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুবাদকে সমন্বয় করে এবং তা ইবলিসের বস্তুবাদী কৌশলকে সম্পূর্ণরূপে চ্যালেঞ্জ জানায়।


    جانتا ہوں میں یہ امت حاملِ قرآں نہیں

    ہے وہی سرمایہ داری بندۂ مومن کا دیں

    "জান্তা হুঁ ময় ইয়েহ উম্মত হামিলে কুরআঁ নেহি

    হ্যায় ওহি সারমায়া-দারি বান্দায়ে মোমিন কা দ্বীঁ"


    আমি জানি এই উম্মত কুরআনের বাহক নয়;

    মুমিন বান্দার ধর্মও তো পুঁজিবাদই হয়ে গেছে।


    ইবলিস এখানে একটি তিক্ত সত্য স্বীকার করছে। সে জানে, বর্তমান মুসলিম উম্মত প্রকৃতপক্ষে কুরআনের বাহক নয়। তাঁরা কুরআনের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বার্তা থেকে বিচ্যুত। তাঁরা ‘সারমায়া-দারি’ (পুঁজিবাদ)কেই নিজেদের ধর্ম বানিয়ে ফেলেছে। এটি ইকবালের সেই সমালোচনার প্রতিধ্বনি, যা তিনি তাঁর অন্যান্য রচনায়ও করেছেন—মুসলিমরা ইসলামের বৈপ্লবিক চেতনা ভুলে পশ্চিমা বস্তুবাদের অনুকরণ করছে।


    جانتا ہوں میں کہ مشرق کی اندھیری رات میں

    بے ید بیضا ہے پیرانِ حرم کی آستیں

    "জান্তা হুঁ ময় কেহ মাশরিক কি আন্ধিরি রাত মেঁ

    বে-ইয়াদে বায়যা হ্যায় পিরানে হারাম কি আস্তিঁ"


    আমি ভালো করেই জানি, প্রাচ্যের ঘোর অমানিশায় হারামের বুযুর্গদের আস্তিনের ভিতরে (হাতাতে) আর সেই ‘উজ্জ্বল শুভ্রহাত’ (মূসার মতো ঐশ্বরিক শক্তি) নেই।”


    ইবলিস এখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা তুলে ধরছে। ‘মাশরিক কি আন্ধিরি রাত’—প্রাচ্যের অন্ধকার যুগ—এখন চলছে। আর এই অন্ধকারে ‘পিরানে হারাম’ মসজিদের বুজুর্গদের ‘আস্তিন’ (হাতা) শূন্য। তাদের কাছে কোনো ‘ইয়াদে বাইজা’ বা উজ্জ্বল হাত নেই। অর্থাৎ মুসা আ-এর সেই মু'জিজা তথা দ্বৈবশক্তিতে পথ দেখানোর সামানা নেই। যারা কাবা ও মসজিদের রক্ষক, যাদের কথা জনগণ শোনে, যারা ইসলামের মুখপাত্র। ইবলিস খুশিতে বলছে—এই নেতাদের ‘আস্তিন’ (হাতা) বা হাত এখন ‘বে-ইয়াদে বাইজা’ —তাদের হাতে আর সেই ঐশ্বরিক শক্তি ও নেতৃত্বের দীপ্তি নেই। তারা অক্ষম, নির্বোধ ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিহীন।


    এটি ইবলিসের আত্মতৃপ্তি ও একইসঙ্গে গভীর ভয়-এর বহিঃপ্রকাশ। ইবলিস খুশি, প্রাচ্যের সবচেয়ে সম্মানিত ধর্মীয় নেতারা আজ এতটাই দুর্বল যে, তাদের হাতে কোনো ‘মুজিজা’ বা বৈপ্লবিক শক্তি নেই। তারা অন্ধকার যুগে নীরব, নিষ্ক্রিয় ও শাসকদের দাসে পরিণত হয়েছে। তাই ইবলিসের রাজত্ব নিরাপদ। কিন্তু পরবর্তী লাইনগুলোতে আমারা ইবলিসকে ভীত-চিন্তিত দেখতে পাবো। কারণ তার আশঙ্কা এই অন্ধকারের মধ্যেই হয়তো আবার কেউ জাগ্রত হবে, অথবা এই নেতারা যদি কখনো প্রকৃত ‘ইয়াদে বাইজা’ ফিরে পায়, তবে তার রাজত্বের ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু এখন সে খুশিতে তার উপদেষ্টাদের বলছে, ধর্মীয় নেতারা আজ এতটাই শক্তিহীন যে, তারা সমাজকে কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেন না। তাঁরা নিজেরাই পুঁজিবাদ ও আধুনিক শাসনতন্ত্রের হাতে বন্দী।


    ইকবাল এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় নেতৃত্বের পতন ও তাদের আধুনিক যুদ্ধে অপ্রস্তুততাকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি এখানে দেখাচ্ছেন, তাঁরা আজ রাজনীতি ও সামাজিক ইনসাফের ময়দানে নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। তাঁদের হাত ‘বে-ইয়াদে বাইজা’ তথা নেতৃত্বের উপযোগী আলো থেকে বঞ্চিত। প্রকৃত জাগরণ তখনই আসবে, যখন এই নেতৃত্ব আবারও সেই আলো আহরণ করবে। অতীতের সেই আত্মবিশ্বাস ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মন-মানসিকতা ও যোগ্যতা গড়ে তুলবে।


    عصر حاضر کے تقاضوں سے ہے لیکن یہ خوف

    ہو نہ جائے آشکارا شرعِ پیغمبر کہیں

    "আসরে হাজির কে তাকাজোঁ সে হ্যায় লেকিন ইয়ে খউফ

    হো না জায়ে আশকারা শার'য়ে পয়গাম্বর কাহীঁ"


    বর্তমান যুগের কঠিন ও নানাবিধ দাবি-প্রত্যাশা থেকেই কিন্তু আমার এই আশঙ্কা—পাছে কোথাও ঐ নবীজির শরিয়ত (জীবনব্যবস্থা) উন্মোচিত ও প্রতিভাত হয়ে না ওঠে!


    ইবলিস এখানে তাঁর গভীরতম ভয়ের কথা বলছে। আধুনিক যুগের জটিলতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অবিচার মানুষকে নতুন সমাধানের সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করছে। ইবলিস ভয় পাচ্ছে, এই সন্ধানেই মানুষ হয়তো আবারও রাসূলের শরিয়তের দিকে ফিরে তাকাবে। ‘আশকারা’ তথা যদি শরিয়ত একবার প্রকাশ্য হয়ে যায়, তবে তা পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্র সবকিছুর বিকল্প হয়ে দাঁড়াবে। ইবলিস জানে, ইসলামি শরিয়ত শুধু কিছু ধর্মীয় আইনকানুন নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার ও জীবনব্যবস্থা। যদি এই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা একবার উন্মোচিত হয়, তবে তা পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ—উভয়ের জন্যই মারাত্মক হুমকি।


    ইকবালের পুরো দর্শন হলো ‘ইজতিহাদ’—অর্থাৎ ইসলামি আইনকে আধুনিক যুক্তি ও বিজ্ঞানের সাথে পুনর্বিবেচনা ও পুনরুজ্জীবিত করা। এই শ্লোকে ইকবাল শয়তানের মুখ দিয়ে ইসলামের শাশ্বত প্রাসঙ্গিকতাকে স্বীকার করিয়ে নিচ্ছেন। অর্থাৎ, আধুনিক যুগ যত এগোবে, ইসলামের প্রয়োজনীয়তা তত স্পষ্ট হবে এবং ইবলিস তা টের পাচ্ছে। ফলত আমাদের কাজ হলো শরিয়তকে আধুনিক সমাজব্যবস্থায় প্রয়োগযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক করে তোলা। আধুনিক যুগের চাহিদা অনুযায়ী যেরকম খিদমাত, সংযোজন-বিয়োজন, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন এবং উপযোগিতা তৈরি করা লাগে, সেরকম করে দেওয়া। ইনসাফি সমাজ পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই আন্দোলনের কর্মীদের সেই যোগ্যতা হাসিলের বিকল্প নেই।


    ইসলামের বিপ্লবী চেতনা ইবলিসের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয়,

    الحذر آئین پیغمبر سے سو بار الحذر

    حافظ ناموس زن، مرد آزما، مرد آفریں

    "আল-হাযার আয়িনে পয়গাম্বর সে সো বার আল-হাযার

    হাফিজে নামূসে যন, মর্দে আজমা, মর্দে আফিরিঁ"


    সাবধান! রাসূলের আইন থেকে শতবার সাবধান! কারণ (এই আইন) নারীর মর্যাদার রক্ষক, পুরুষের পরীক্ষক এবং পুরুষের (চরিত্র ও সমাজ) গঠনকারী।


    পূর্ববর্তী লাইনে ইবলিস ভয় পাচ্ছিল, আধুনিক যুগের চাহিদা মানুষকে শরিয়তের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে। এই লাইনে সে আর দেরি না করে তার উপদেষ্টাদের সরাসরি সতর্কবার্তা দেয়: “এই শরিয়ত থেকে সাবধান! কারণ এটি শুধু আইন নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ বিপ্লবী জীবনব্যবস্থা।”  ইবলিস সাধারণত অহংকারী, কিন্তু এখানে বারবার ‘সাবধান’ বলছে। এটি তাঁর গভীর আতঙ্ক ও শক্তিহীনতার পরিচয়। সে জানে, শরিয়তকে কখনো প্রত্যক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। তাই সে তাঁর মিনিয়নদের (উপদেষ্টাদের) সতর্ক করে দিচ্ছে যেন তারা কোনোভাবেই এই ব্যবস্থাকে জনসমক্ষে প্রকাশ পেতে না দেয়। সে জানে, এই আইন ‘হাফিজে নামূসে যন’ (নারীর মর্যাদার রক্ষক)। এটি নারীকে শোষণ থেকে রক্ষা করে, যা পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী ব্যবস্থা করে না। ইসলাম নারীকে সম্পত্তি বা ভোগ্যপণ্য নয়, বরং সম্মানিত ও অধিকারসম্পন্ন সত্তা ঘোষণা করেছে। ইসলামি শরিয়তে নারীকে উত্তরাধিকার, শিক্ষা, কাজ, বিবাহে সম্মতি ও তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছে। ইবলিসের পুরো শোষণব্যবস্থা (পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, জাহিলিয়াত) দাঁড়িয়ে আছে নারীকে দুর্বল ও বস্তুতে পরিণত করার উপর। ইসলাম যদি নারীর ‘ইজ্জত’ রক্ষা করে, তবে ইবলিসের রাজত্বের ভিত্তি নড়ে যায়।


    ইসলাম পুরুষকে দায়িত্ব দেয়। পরিবারের দায়িত্ব, সমাজের দায়িত্ব, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব। এই পরীক্ষা তাকে সর্বদা সজাগ ও সংগ্রামী রাখে। তাকে সহজে বিশ্রামে বসে থাকতে দেয় না, তাকে জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলে। ইবলিস চায় মানুষ অলস, উদাসীন ও ভোগবাদী হোক। কিন্তু ইসলামি পরীক্ষা মানুষকে অলস হতে দেয় না। এটাই ইবলিসের জন্য চরম বিরক্তিকর।


    ‘মর্দে আফিরিঁ’ (পুরুষের সৃষ্টিকর্মী)—অর্থাৎ এটি মানুষকে নতুন করে গঠন করে, একটি সচেতন, ন্যায়পরায়ণ ও সংগ্রামী মানুষে রূপান্তরিত করে। এখানে ‘আফিরেঁ’ বলতে ‘নতুন মানুষ তৈরি করা’ বোঝানো হয়েছে। ইবলিস যেখানে ‘আদমকে’ (মানুষকে) বানাতে চেয়েছিল (নিজের দাস), ইসলাম তাকে ‘মোমিন’ (বিশ্বাসী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ) বানায়। এই মোমিন নিজের খুদি (আত্মসত্তা) চিনে, তার বিবেক জাগ্রত, এবং সে জালিমের সামনে মাথা নত করে না। ইবলিস এই ‘নতুন মানুষ’-কে ভয় পায়, কারণ এই মানুষটি তার ধোঁকাবাজি ও শোষণকে সহজে চিহ্নিত করতে পারে এবং প্রতিরোধ করতে পারে। ইবলিস জানে, এই তিনটি গুণ—নারীর মর্যাদা, পুরুষের কর্তব্যবোধ ও মানবিক গঠন—ইসলামকে অনন্য ও বিপজ্জনক করে তোলে শয়তানি সাম্রাজ্যের জন্য।


    موت کا پیغام ہر نوع غلامی کے لیے

    نے کوئی فغفور و خاقاں، نے فقیر رہ نشیں

    "মউত কা পায়গাম হার নও'য়ে গুলামি কে লিয়ে

    নে কোই ফাগফুর ও খাকাঁ, নে ফকিরে রাহ নশীঁ"


    ইসলামের এই আইন প্রতিটি গোলামি ও শোষণ-ব্যবস্থার জন্য ধ্বংসের ঘোষণা বহন করে। কেননা (ইসলামে) নেই কোনো বাদশাহ-সম্রাট, নেই কোনো সর্বস্বান্ত ফকির। সবাই আল্লাহর আইনে সমান।


    ইবলিস এখানে ইসলামের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি তুলে ধরছে। ইসলাম সব ধরনের গোলামির জন্য ‘মউত কা পায়গাম’ (মৃত্যুর বার্তা) নিয়ে আসে। ইসলাম রাজা-ফকিরের বৈষম্য মুছে ফেলে। এটি বলে,“তোমরা যদি দাস হও, তবে জেনে রেখো—এই ব্যবস্থা তোমাদের দাসত্বকে মৃত্যুদণ্ড দিতে এসেছে। আর তোমরা যদি কর্তা হও, তবে জেনে রেখো—তোমাদের কর্তৃত্বেরও এখানে কোনো স্থান নেই, যদি না তা ইনসাফের ওপর দাঁড়ায়।"


    ইবলিসের পুরো কৌশল হলো, শোষিতদেরকে ‘ভাগ্যবাদ’ ও ‘অসহাত্বে' ডুবিয়ে রাখা। সে চায়, ফকির যেন ভাবে “আমার তো কিছুই নেই, আমি তো ধুলোর মতো, আমার ভাগ্য তাই, আমি মাথা পেতে থাকি।” কিন্তু ইসলাম যদি ঐ ‘সর্বসান্ত ফকির’কে বলে,“তুমি ধুলো নও; তুমি আল্লাহর খলিফা। রাজাও যেমন তোমার মতোই আল্লাহর বান্দা। জুলুম করলে রাজাকেও জবাব দিতে হবে, আর তোমারও জবাব দাবি করার অধিকার আছে”। 


    তাহলে সেই ফকিরের ‘চোখ খুলে যায়’। সে তখন শোষকের দিকে তাকায়, আর ভয় পায় না। এই জাগ্রত ফকিরই ইবলিসের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কারণ ইবলিস জানে, “সর্বসান্ত” মানুষের আর হারানোর কিছু থাকে না। তারা সবচেয়ে সাহসী ও নির্ভীক হয়ে ওঠে। ইকবাল এই ‘সর্বসান্ত ফকির’-এর মধ্যেই ‘খুদি’ (আত্মসত্তা)-র বীজ দেখেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামের কাজ হলো এই ফকিরকে ‘মর্দে আফিরিঁ’ (নতুন মানুষ) হিসেবে গড়ে তোলা—যে তার দারিদ্র্যকে অস্ত্রে পরিণত করে, শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, এবং নিজের মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখে। এটাই সেই ‘মৃত্যুর বার্তা’ যা ইবলিসের তৈরি রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদী শ্রেণি-বৈষম্যকে ধ্বংস করে।


    ইকবাল দেখান, মানুষের দুর্ভোগ, শোষণ, নির্যাতন বৃদ্ধি পাবে বা অব্যাহত থাকবে এমন কোনো দর্শনের স্থান ইসলাম দেয় না। সবার আগে সে মানুষের কথা বলে, মানুষের নিরাপত্তা চায়। ফলত কোনো চিন্তা যদি, কারও লুটপাট ও জনদুর্ভোগের শাসনকে ন্যূনতম পর্যায়ে মেনে নেয়, তাও আবার দ্বীন রক্ষার দোহাই দিয়ে, তবে তা সর্বৈব ইসলামি দর্শনের বিপরীত। ইকবালের ভাষায় এমন চিন্তাকে কালামি বিতর্কের সেই ধর্মীয় আফিম বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইবলিসের প্রথম উপদেষ্টা স্পষ্ট বলেছিল,

    "طبع مشرق کے لیے موزوں یہی افیون تھی"

    (প্রাচ্যের স্বভাবের জন্য এই আফিমই উপযুক্ত ছিল।)


    ইসলামের কাজ হলো “প্রত্যেক গোলামির জন্য মৃত্যুর বার্তা"। লুটপাট, দুর্নীতি, জনগণের ওপর জুলুম—এগুলো সবই ‘গোলামি’র বিভিন্ন রূপ। ইসলাম এসবকে ‘সহ্য’ করতে বলে না; বরং এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বলে।


    এমন দ্বীন এবং তার দর্শন  ইবলিসের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। কারণ তাঁর পুরো ব্যবস্থাই দাঁড়িয়ে আছে শাসক ও শোষিতের দ্বৈততার ওপর। ইবলিস জানে, এই বার্তা যদি জনগণের কাছে পৌঁছে, তবে তার ‘শয়তানি সাম্রাজ্য’ ধ্বংস হয়ে যাবে। সেজন্যই সে বারবার ‘সাবধান’ বলে তার অনুচরদের সতর্ক করে। অর্থাৎ এটি সব ধরনের শোষণ ও পরাধীনতাকে ধ্বংস করে। আর তা ধ্বংস হলে আমাদের রাজত্ব শেষ।


    کرتا ہے دولت کو ہر آلودگی سے پاک و صاف

    منعموں کو مال و دولت کا بناتا ہے امیں

    "করতা হ্যায় দৌলত কো হার আলুদেগি সে পাক ও সাফ

    মুনয়া'মোঁ কো মাল ও দৌলত কা বানাতা হ্যায় আমিন"


    (ইসলাম) সম্পদকে সব কলুষতা থেকে পবিত্র করে;

    ধনীদেরকে সম্পদের আমানতদার বানায়।


    ইবলিস এখানে ইসলামের অর্থনৈতিক নীতির কথা বলছে, যা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র—উভয়ের থেকেই আলাদা। ইসলাম সম্পদকে ‘পাক ও সাফ’ (পবিত্র) করে। অর্থাৎ এটি সুদ, ঘুষ, প্রতারণা ও শোষণকে নিষিদ্ধ করে। এটি ধনীদেরকে ‘আমিন’ (আমানতদার) বানায়। তারা সম্পদের মালিক নন, বরং তার রক্ষক, এবং তারা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ। ইবলিস জানে, এই নীতি পুঁজিবাদের অমর্যাদাকর লোভ ও সমাজতন্ত্রের শ্রেণি-সংঘাত—উভয়কেই অতিক্রম করে।


    اس سے بڑھ کر اور کیا فکر و عمل کا انقلاب!

    بادشاہوں کی نہیں اللہ کی ہے یہ زمیں

    "ইস সে বাড়হ কর আউর কিয়া ফিকর ও আমল কা ইনকিলাব

    বাদশাহোঁ কি নেহি, আল্লাহ কি হ্যায় ইয়েহ যমীঁ"


    এর চেয়ে বড় চিন্তা ও কর্মের বিপ্লব আর কী!

    এই জমিন বাদশাহদের নয়, আল্লাহর।


    ইবলিস এখানে ইসলামের সবচেয়ে বড় বিপ্লবী ঘোষণার কথা বলছে। ‘বাদশাহোঁ কি নেহি আল্লাহ কি হ্যায় ইয়েহ যমীঁ’ (এই পৃথিবী বাদশাহদের নয়, আল্লাহর)। এটি রাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ—সবকিছুর ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। যদি জমিন আল্লাহর হয়, তবে কোনো বাদশাহ, কোনো পুঁজিপতি বা কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তা দাবি করতে পারে না। এটি ‘ফিকর ও আমল কা ইনকিলাব’ (চিন্তা ও কর্মের বিপ্লব)। যা ইবলিসের পুরো শয়তানি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।


     ইবলিসের চূড়ান্ত কৌশল তাই এই উম্মাহকে ঘুমিয়ে রাখা,

    چشمِ عالم سے رہے پوشیدہ یہ آئیں تو خوب

    یہ غنیمت ہے کہ خود مومن ہے محرومِ یقیں!

    "চশমে আ'লম সে রহে পোশিদা ইয়ে আয়েঁ তো খুব

    ইয়ে গনিমত হ্যায় কেহ খুদ মোমিন হ্যায় মাহরুমে ইয়াকিঁ!"


    যদি (ইসলামের) এই জীবনব্যবস্থা সারা বিশ্বের দৃষ্টির আড়ালে লুকানো থাকে, তবে তা ভালো। আর এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে যে, মুমিন নিজেই (এই ব্যবস্থার ওপর) পূর্ণ নিশ্চয়তা ও আস্থা হারিয়ে ফেলেছে!


    ইবলিস স্বস্তি পাচ্ছে, এই বিশ্বব্যবস্থা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আইন ও ইনসাফের বিধানকে গুরুত্ব দেয় না, বরং তা ‘গোপন’ বা ‘অপ্রাসঙ্গিক’ মনে করে। ইবলিস বলছে, “শুধু বিশ্বের চোখ থেকে আইন গোপন থাকলেই হয় না; সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো—মুমিন নিজেই এই আইনের ওপর ‘ইয়াকিন’ (পূর্ণ নিশ্চয়তা ও আস্থা) থেকে বঞ্চিত! মুসলিমরা নিজেরাও ইসলামকে শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজের জন্য ইসলামের যে আইন রয়েছে—এ নিয়ে মুসলিমদের অনুভূতিই যেনো মরে গেছে। তারা দ্বিধায় পড়ে যায় এবং পশ্চিমা বা সমাজের প্রথাগত ব্যবস্থার সামনে মাথা নত করে, আর শয়তানের রাজত্ব অটুট থাকে। ইবলিস জানে, যতদিন স্বয়ং মুসলিমরা নিজেদের এই শক্তি সম্পর্কে অন্ধকারে থাকবে, ধর্মের সার্বিক বিধান সম্পর্কে ‘মাহরুমে ইয়াকিন’ (বিশ্বাসহীন) থাকবে, ততদিন তারা জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না। বাস্তবেই আমরা দেখি, অনেকে ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত মনে করে, কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইসলামি অর্থনীতি, ইসলামি বিচার—এসব নিয়ে তারা সন্দিহান বা উদাসীন। ইবলিস এই দুর্বলতাকে ‘গনিমত’ (সুযোগ) হিসেবে ব্যবহার করছে। কারণ উম্মাহ নিজেই যদি নিজের দ্বীনের সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে, তবে তার শয়তানি সাম্রাজ্য চিরকাল নিরাপদ।


    এখানে ইবলিস স্বীকার করছে, মুসলিমদের নিজেদের দ্বীন সম্পর্কে ‘ইয়াকিন’ (নিশ্চয়তা) হারিয়ে ফেলাই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ইকবাল সতর্ক করছেন—যতদিন মুসলিমরা নিজেদের ধর্মের সার্বিকতা সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত থাকবে, ততদিন শয়তানের রাজত্ব অটুট থাকবে। তিনি মুসলিমদের অজ্ঞতা ও দ্বিধাকে শয়তানের প্রধান অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর এই দ্বিধা দূর করার জন্যই প্রয়োজন ‘খুদি’ জাগ্রত করা ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাকে বুঝে নেওয়া।


    ہے یہی بہتر الہیات میں الجھا رہے

    یہ کتاب اللہ کی تاویلات میں الجھا رہے

    "হ্যায় ইয়েহি বেহতর ইলাহিয়্যাত মেঁ উলঝা রহে

    ইয়েহ কিতাবুল্লাহ কি তাওয়িলাত মেঁ উলঝা রহে"


    এটাই ভালো যে, তারা (মুসলমানরা) ধর্মতত্ত্বের জটিল বিতর্কে লিপ্ত থাকুক। আর এই কুরআনের অর্থ-নির্ণয় ও ব্যাখ্যার চুলচেরা তর্কে জড়িয়ে থাকুক।


    ইবলিস এখন তাঁর চূড়ান্ত কৌশল ঘোষণা করছে। সে চায় মুসলিম সমাজ ‘ইলাহিয়াত’ (ধর্মতত্ত্ব)-এর জটিলতায়—যেমন সিফাত-জাত, কুরআনের সৃষ্টি-অসৃষ্টি, ঈসা আ.-এর মৃত্যু-জীবন, আকিদার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, উলামার বিতর্ক সাধারণে—এসব বিষয়ে জড়িয়ে থাকুক। বস্তুত, এই লাইন দু'টি হলো ইবলিসের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত নির্দেশনা। সে আগের লাইনে স্বস্তি পেয়েছিল যে, মুমিন ‘ইয়াকিন’ থেকে বঞ্চিত। এখন সে সেই বঞ্চনাকে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে, তার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তার উপদেষ্টাদের দিচ্ছে।


    ইবলিস চায় মুসলিম উম্মাহ ‘ইলাহিয়্যাত' বা ধর্মতত্ত্বের এসব জটিল প্রশ্নের কাদায় আটকে থাকুক। যাতে তারা অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচার ও সামাজিক ইনসাফের প্রশ্নগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে না পারে।


    সে চায় মুসলিমরা কুরআন হাদীসের ‘তাওয়িলাত’ (সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ) নিয়ে পড়ে থাকুক। মুফাসসিররা কুরআনের আয়াত নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে লিপ্ত থাকুক। কাউকে গোমরাহ, দলছুট বা কাফির বানানোর ফন্দি আঁটুক। ফিকহি মতপার্থক্য নিয়ে আলেমরা পরস্পর বিতর্কে জড়িয়ে থাকুক -যাতে কুরআনের সুস্পষ্ট (মুহকামাত) আয়াতগুলো—যা ইনসাফ, সাম্য, জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়—সেগুলো উপেক্ষিত থাকে।


    ইবলিস এই ধরনের মুসলিম সমাজকেই উত্তম মনে করে। কারণ, যদি মুসলিমরা সরাসরি জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে তার রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই সে তাদেরকে ‘গৌণ বিষয়ে ব্যস্ত’ রাখতে চায়। তারা যেন ভাবে—“আমরা তো গুরুত্বপূর্ণ ‘ইলম’ (জ্ঞান) অর্জন করছি”—অথচ বাস্তবে তারা অপ্রাসঙ্গিক বিতর্কে সময় নষ্ট করছে। এটি ইবলিসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, ‘অতিরিক্ত তাত্ত্বিকতা দিয়ে বাস্তব সংগ্রাম থেকে দূরে রাখা’।


    এখানে ইকবালের দার্শনিক বার্তা কী? ইকবাল তাঁর ‘খুদি’ দর্শনে মুসলিমদেরকে ‘আমল’ (কর্ম)-এর দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন—“তোমরা ধর্মতত্ত্বের জটিল তর্কে সময় নষ্ট করো না; বরং কুরআনের সেই আয়াতগুলোকে সামনে আনো, যা ইনসাফ, জিহাদ ও সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলে।” এই লাইনে ইকবাল (ইবলিসের মুখে) মুসলিমদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন, তারা কুরআনের অর্থ-ব্যাখ্যায় এতটাই লিপ্ত যে তারা কুরআনের মূল বার্তা—জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—থেকে দূরে সরে যায়।


    আজকের মুসলিম বিশ্বে আমরা দেখি, আলেমরা নানা মতবাদী বিতর্কে লিপ্ত। ছোট-বড় ফতোয়া দিয়ে কাকে ইসলামের বাহিরে পাঠাবেন সেই চিন্তায় বিভোর। আর সাধারণ মুসলমানরা তাদের হুজুরের অনুসরণে হুজুর থেকেও অধিক বিভক্ত। এর মধ্য দিয়ে মহানন্দে পরমানন্দে জুলুমবাজির আড্ডাখানা পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণ চলতে থাকে। এগুলো কারো চোখেই পড়ে না, বিহিত করার তাড়না দূর কী বাত! উল্টো সম্ভব হলে জুলুমের প্রতিবিধানের দায়িত্ব পালনের কষ্ট থেকে বাঁচতে এগুলোকে "ইবাদাতে গায়র মাক্বসুদাহ" (নামাজ-রোজার মতো মূখ্য ইবাদাত নয়) বলে হালকা করে দেওয়ার অভিলাষ রয়েছে প্রচুর। ইবলিস এই ফাঁদ দেখে খুবই খুশি হয়। ইকবালের দর্শন অনুযায়ী সে বলে, “আমাকে আর কিছু করতে হয় না; তারা নিজেরাই নিজেদের ধর্মতত্ত্ব ও কূটতর্কের জালে আবদ্ধ রাখছে!”


    সারকথা হলো,  ইবলিস মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের ‘তাওয়িল’ ও ‘ইলাহিয়াত’-এর জটিল বিতর্কে ডুবিয়ে রাখতে চায়। যাতে তারা কুরআনের স্পষ্ট ও বাস্তবমুখী নির্দেশাবলি—ইনসাফ, সাম্য, জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ভুলে যায়। ইকবাল এই ফাঁদকে ‘শয়তানের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ ইবলিস জানে, যখন মুসলমানরা এসব তাত্ত্বিক ও আনুষ্ঠানিক বিষয়ে ডুবে থাকে, তখন তারা সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতি সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ভুলে যায়। এগুলোকে তারা এক ফতোয়ায় (ইবাদাতে গায়র মাকসুদাহ বানিয়ে) পার্শ্বে ফেলে দেয়।

    এবার ইবলিস তার পূর্ববর্তী পরিকল্পনার (ধর্মতত্ত্বে জড়িয়ে রাখার) সফলতার কথা বলছে এবং একইসঙ্গে সেই সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে চাইছে, যখন কোনো মুমিন সেই জাদু-জাল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়।


    توڑ ڈالیں جس کی تکبریں طلسمِ شش جہات

    ہو نہ روشن اس خدا اندیش کی تاریک رات

    "তোড় ডালেঁ জিস কি তাকবিরেঁ ত্বিলিসমে শশ-জিহাত

    হো না রওশন উস খুদা-আন্দেশ কি তারিক রাত!"


    যার তাকবিরের আওয়াজ এই ষড়-দিকের (মহাবিশ্বের) মায়াজাল ভেঙে চুরমার করে দেয়, সেই খোদাভীরু মুমিনের অন্ধকার রাত যেন কখনোই আলোকিত (ভোর) না হয়!


    ইবলিসের আসল ভয় হলো একজন প্রকৃত ও জাগ্রত মুসলমান। শয়তান তার উপদেষ্টাদের সামনে স্বীকার করছে , একজন প্রকৃত মুমিন যখন অন্তরের গভীর থেকে "আল্লাহু আকবার" ধ্বনি দেয়, তখন সে দুনিয়ার কোনো শক্তি, শাসন বা সম্পদের মায়াজালে আবদ্ধ থাকে না। মুমিনের এই আধ্যাত্মিক শক্তি বস্তুগত জগতের সব বাধা ভেঙে ফেলে। তাই শয়তান তার অনুসারীদের নির্দেশ দিচ্ছে, মুসলমানদের বর্তমান যে পতন ও নিষ্ক্রিয়তার অন্ধকার রাত চলছে, তা যেন কখনোই শেষ না হয়। তারা যেন কখনো জেগে উঠতে না পারে। আর এরজন্য তাদের কী কী করতে হবে, সেগুলোর নির্দেশনাই সে উপরে দিয়ে এসেছে তার উপদেষ্টাদের।


    ابنِ مریم مر گیا یا زندۂ جاوید ہے؟

    ہیں صفاتِ ذاتِ حق, حق سے جدا یا عین ذات؟

    "ইবনে মারইয়াম মর গায়া ইয়া জিন্দায়ে জাওয়িদ হ্যায়?

    হ্যাঁয় সিফাতে জাতে হক, হক সে জুদা ইয়া আইনে জাত?"


    মরিয়ম-পুত্র (ঈসা আ.) কি মারা গেছেন, নাকি তিনি চিরঞ্জীব (আকাশে জীবিত)? আল্লাহর গুণাবলি কি তাঁর মূল সত্তা থেকে আলাদা, নাকি সত্তারই হুবহু অংশ?


    এই দুই চরণে আল্লামা ইকবাল শয়তানের সেই সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্তের কথা ফাঁস করেছেন, যার মাধ্যমে সে মুসলিম উম্মাহকে অকেজো করে রেখেছে। শয়তান তার চেলাদের বলছে, মুসলমানদের আসল কাজ (যেমন, সমাজ সংস্কার, জিহাদ, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা) থেকে দূরে রাখার সহজ উপায় হলো তাদের মাথায় কিছু ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ঢুকিয়ে দাও। ইতিপূর্বে যার আলোচনা গিয়েছে। এখানে সেইরকম তর্কের কিছু উপমা পেশ করছেন ইকবাল, ইবলিসের জবানে বসিয়ে।


    آنے والے سے مسیح ناصری مقصود ہے

    یا مجدد جس میں ہوں فرزند مریم کے صفات؟

    "আনে ওয়ালে সে মাসিহে নাসিরি মাকসুদ হ্যায়

    ইয়া মুজাদ্দিদ জিস মেঁ হোঁ ফারজান্দে মারইয়াম কে সিফাত?"


    ভবিষ্যতে মাসীহ ঈসা আ. বলে কি নাসারা তথা খ্রিস্টানদের কাছে যে মাসীহ আ. এসেছিলেন, স্বয়ং তাকেই বোঝানো হয়েছে, নাকি এমন কোনো মুজাদ্দিদ বা সমাজ-সংস্কারক আসবেন, যাঁর মধ্যে কেবল মরিয়ম-পুত্র ঈসার গুণাবলীর প্রতিফলন থাকবে?


    ইকবাল বুঝিয়েছেন, মুসলমানদের এই ধরনের থিওরিটিক্যাল বা তাত্ত্বিক বিতর্কে ডুবিয়ে রাখা স্বয়ং ইবলিসের এজেন্ডা। কারণ, মুসলমানরা যখন "কে আসবে, কীভাবে আসবে, তার লক্ষণ কী হবে"—এইসব তাত্ত্বিক বাহাসে মেতে থাকে, তখন তারা বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত হওয়ার এবং সমাজ পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব (সত্যের লড়াই ও কর্ম) ভুলে অলস বসে থাকে।


    আল্লামা ইকবাল মূলত মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, এই সমস্ত সূক্ষ্ম ধর্মীয় ও দার্শনিক বিতর্ক মূলত ‘ইলাহিয়্যাত কে তরাশে হুয়ে লাত ও মানাত’ (ধর্মতত্ত্বের তৈরি করা নতুন মূর্তি)। মুসলমানরা যতক্ষণ পর্যন্ত বাস্তব কর্ম জগত (World of Action) ছেড়ে কেবল তাত্ত্বিক তর্কে লিপ্ত থাকবে, ততক্ষণ তারা ইবলিসি ব্যবস্থার দাস হয়েই থাকবে এবং কখনো নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।  ইবলিস জানে, প্রকৃত সংস্কার ও পুনর্জাগরণ নির্ভর করে উম্মাহর নিজস্ব কর্মশক্তির ওপর, কোনো ব্যক্তির আগমনের ওপর নয়। এরকম বিতর্কে লিপ্ত থেকে তারা নিজেদের দায়িত্ব ভুলে যায়।


    ہیں کلام اللہ کے الفاظ حادث یا قدیم

    امتِ مرحوم کی ہے کس عقیدے میں نجات؟

    "হ্যাঁয় কালামুল্লাহ কে আলফাজ হাদিস ইয়া কাদিম

    উম্মতে মারহুম কি হ্যায় কিস আকিদে মেঁ নাজাত?


    (ইবলিস তার চ্যালাদের বোঝাচ্ছে মুসলমানরা কী নিয়ে মারামারি করবে) আল্লাহর কালামের (কোরআনের) শব্দগুলো কি সৃষ্ট (হাদিস) নাকি অনাদি (কাদীম)? আর এই মৃতপ্রায় মুসলিম উম্মাহর মুক্তি আসলে কোন আকিদা বা বিশ্বাসের মধ্যে নিহিত?


    এখানে ‘উম্মতে মরহূম’ শব্দটি ইকবাল অত্যন্ত সুক্ষ্ম ব্যঙ্গ বা আফসোসের সাথে ব্যবহার করেছেন। তিনি বোঝাচ্ছেন, "মৃত উম্মত" বা যে উম্মত তার গৌরব হারিয়ে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, যে জাতির নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা নেই, যারা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, তারা নিজেদের বাঁচানোর উপায় না খুঁজে "কোরআনের শব্দ পুরাতন না নতুন"—এই টাইপের অহেতুক নানা বিতর্ক ও তাত্ত্বিক বাহাস নিয়ে ব্যস্ত।


    ইবলিস শয়তান খুব ভালো করেই জানে, মুসলমানরা যতদিন কোরআনের আদেশ, নিষেধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বিপ্লবের মূল চেতনাকে ধারণ করবে, ততদিন তাদের পরাজিত করা অসম্ভব। তাই ইবলিসের প্রধান চাল হলো মুসলমানদের কোরআনের "আমল" (Action) থেকে দূরে সরিয়ে এর "শব্দ ও দর্শন" (Metaphysics) নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত রাখা। শয়তান চায় মুসলমানরা যুগে যুগে এমন সব কাল্পনিক আকিদাগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকুক, যা তাদের বাস্তব পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার শক্তিকে পঙ্গু করে দেয়।


    ইকবাল মুসলিম সমাজকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন, মুক্তির পথ (নাজাত) কোনো নিষ্ক্রিয় দার্শনিক আকিদা বা তাত্ত্বিক বিতর্কের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাঝে নেই। মুক্তি রয়েছে কোরআনের মূল বাণীকে জীবনে বাস্তবায়ন করার মাঝে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মাঝে। তাত্ত্বিক বিতর্ক হলো জাতির জীবনীশক্তি ধ্বংস করার জন্য শয়তানের তৈরি করা এক সুক্ষ্ম ফাঁদ।


    کیا مسلماں کے لیے کافی نہیں اس دور میں

    یہ الہیات کے ترشے ہوئے لات و منات؟

    "কিয়া মুসলমান কে লিয়ে কাফি নেহি ইস দৌর মেঁ

    ইয়ে ইলাহিয়্যাত কে তরাশে হুয়ে লাত ও মানাত?


    (ইবলিস তার চ্যালাদের আশ্বস্ত করে বলছে) এই আধুনিক যুগে মুসলমানদের (নিষ্ক্রিয় ও বিভ্রান্ত করে রাখার) জন্য ধর্মতত্ত্বের (Philosophy/Theology) সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ দিয়ে তৈরি করা এই 'লাত ও মানাত' নামক কাল্পনিক মূর্তিগুলোই কি যথেষ্ট নয়?


    ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কা'বা শরিফ থেকে ‘লাত’, ‘মানাত’ এবং ‘উযযা’-র মতো মাটির মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছিলেন। কিন্তু ইকবাল ইবলিসের জবানিতে বলছেন, মাটির মূর্তি ধ্বংস হলেও মুসলমানরা এখন ‘ইলাহিয়াত’ বা শুষ্ক ধর্মতত্ত্বের গোলকধাঁধায় পড়ে নতুন ধরনের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মূর্তি’ তৈরি করে নিয়েছে। এই মূর্তিগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এগুলো মানুষের চিন্তাশক্তি ও কর্মক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।


    ইবলিস তার উপদেষ্টাদের বলছে, মুসলমানদের নিয়ে তোমাদের এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ তারা এখন আর আসল ইসলামের বিপ্লবী চেতনা (কর্ম, ন্যায়বিচার, এবং জিহাদ) নিয়ে বাঁচে না। তারা এখন মেতে আছে সুক্ষ্ম সূক্ষ্ম দার্শনিক ও আকিদাগত চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে। ইবলিসের মতে, মুসলমানরা যতক্ষণ এই সমস্ত কাল্পনিক ও তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় বন্দি থাকবে, ততক্ষণ তারা জাগতিগত কোনো উন্নতি করতে পারবে না এবং শয়তানি শক্তির জন্য কোনো হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।


    ইবলিস এখানে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ করছে। মুসলমানদের এইসব ধর্মতত্ত্বের বিতর্কগুলো ‘লাত ও মানাত’ (জাহিলিয়াতের মূর্তি)-এর সাথে তুলনা করছে। ইবলিস বলছে, আজকের ‘ইলাহিয়্যাত’ (ধর্মতত্ত্ব) সেই মূর্তির মতোই—মানুষকে সত্য পথ থেকে বিভ্রান্ত করে এবং মুসলমানরা এই ‘তরাশে হুয়ে’ (টকানো, অর্থাৎ বাসি, অপ্রাসঙ্গিক) বিতর্কেই সন্তুষ্ট। যা মুসলমানদের আসল ময়দানের লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে; কিন্তু তারা ঠেরই পায় না। ভাবে দ্বীনের বিশাল খেদমত আঞ্জাম দিয়ে দিচ্ছে।


    ইকবাল মুসলিম উম্মাহকে এক বিরাট চপেটাঘাত করেছেন এই শ্লোকের মাধ্যমে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, যদি মুসলমানরা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে চায়, তবে তাদের এই সমস্ত তাত্ত্বিক ও আকিদাগত ঝগড়া-বিবাদ (যা মূলত শয়তানের এজেন্ডা) বন্ধ করতে হবে। ইসলামের মূল শক্তি কোনো নিষ্ক্রিয় দর্শনে নেই, বরং তা রয়েছে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে (Action/Amal) এবং কোরআনের বৈপ্লবিক চেতনাকে জীবনে ধারণ করার মাঝে।


    تم اسے بیگانہ رکھو عالمِ کردار سے

    تا بساطِ زندگی میں اس کے سب مہرے ہوں مات!

    "তুম উসে বেগানা রাখো আলমে কিরদার সে

    তা বিসাত্বে জিন্দেগি মেঁ উস কে সব মোহরে হোঁ মাত!"


    (ইবলিস তার চ্যালাদের চূড়ান্ত নির্দেশ দিচ্ছে) তোমরা এই মুসলমান জাতিকে বাস্তব কর্মের জগৎ থেকে দূরে ও বিচ্ছিন্ন করে রাখো; যেন জীবনের দাবার বোর্ডে তাদের প্রতিটি চালই পরাজিত হয় এবং তারা চিরকাল দাস হয়েই থাকে!


    এখানে ইবলিস সরাসরি তাঁর উপদেষ্টাদের—সব মুশিরকে চূড়ান্ত কৌশলগত নির্দেশ দিচ্ছে। তিনি চান মুসলমানদের ‘আলমে কিরদার’ (কর্মের জগত, অর্থাৎ বাস্তব রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক সংগ্রাম) থেকে ‘বেগানা’ (বিমুখ) রাখা হোক।


    আল্লামা ইকবালের মতে, ইসলামের মূল ভিত্তি হলো ‘আমাল’ বা কর্ম। কুরআনে বারবার ‘ঈমান’ (বিশ্বাস)-এর সাথে ‘আ'মাল-এর কথা বলা হয়েছে। ইবলিস খুব ভালো করে জানে, মুসলমান যতক্ষণ শুধু মুখে ঈমানের দাবি করবে কিন্তু বাস্তবে অলস ও কর্মহীন থাকবে, ততক্ষণ তারা কোনোদিন পৃথিবীর নেতৃত্বে ফিরতে পারবে না। তাই ইবলিস তার অনুসারীদের বলছে, মুসলমানদের সবসময় কিতাবী জ্ঞান, সুক্ষ্ম বিতর্ক এবং অহেতুক আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত রাখো, যেন তারা ‘আলমে কিরদার’ বা কর্মের ময়দানে নামার সময়ই না পায়। তাই তাদের মধ্যে পূর্বসূরিদের আমানত কিংবা অন্য কোনো পবিত্র ধ্যান দিয়ে বিতর্ক জিইয়ে রাখতে হবে। যাতে তারা ‘বিসাত্বে জিন্দেগি’ The Chessboard of Life বা জীবনের বোর্ডে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে থাকে। তবেই তাদের ‘সব মোহরে’ (সব ঘুঁটি) ‘মাত’ (পরাজিত) হবে।


    এখানে জীবনের বাস্তবতাকে একটি দাবার বোর্ডের (বিসাতে যিন্দেগীর) সাথে তুলনা করা হয়েছে। দাবার বোর্ডে জিততে হলে যেমন প্রতিটি ঘুঁটি বা চাল অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের সাথে চালতে হয়, তেমনি বাস্তব পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হয়। বুদ্ধির সাথে সতর্ক হয়ে পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু মুসলমানরা যখন কর্মের জগত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন বিশ্বরাজনীতি ও সভ্যতার খেলায় তারা কেবল অন্যের হাতের পুতুলে পরিণত হয় এবং তাদের প্রতিটি ঘুঁটি ‘মাত’ বা পরাজিত হয়।


    ইকবাল এখানে দেখিয়েছেন (Psychological Slavery), কীভাবে একটি জাতিকে শারীরিকভাবে গোলাম বানানোর আগে মানসিকভাবে পঙ্গু করা হয়। শয়তানি শক্তি বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সবসময় চায় মুসলিম উম্মাহ যেন কেবল তাদের অতীত গৌরব নিয়ে অহংকার করে অথবা পরকালের পুরস্কারের আশায় বর্তমানের অত্যাচারকে মুখ বুজে সহ্য করে। এই ধরনের 'ভুল আধ্যাত্মিকতা' বা 'নিষ্ক্রিয়তাবাদ' মূলত ইবলিসেরই তৈরি করা আফিম, যা মুসলমানদের ঘুম পাড়িয়ে রাখে।


    ইকবাল উম্মাহকে জাগিয়ে তোলার জন্য এই শ্লোকে ইবলিসের গোপন চক্রান্ত ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, মুসলমানদের একমাত্র বাঁচার উপায় হলো শুষ্ক তাত্ত্বিক বিতর্ক (Theology) ছেড়ে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে (Action) ঝাঁপিয়ে পড়া। চরিত্র গঠন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এবং সমাজ পরিবর্তনের বৈপ্লবিক কাজ ছাড়া জীবনের এই দাবার ছকে মুসলমারা যেভাবে  পরাজিত আছে সেভাবেই থাকবে।


    خیر اسی میں ہے قیامت تک رہے مومن غلام

    چھوڑ کر اوروں کی خاطر یہ جہانِ بے ثبات

    "খায়র ইসি মেঁ হ্যায় কিয়ামত তক রহে মুমিন গোলাম

    ছোড় কর অউরোঁ কি খাতির ইয়ে জাহানে বে-সাবাত"


    আমাদের (শয়তানি সাম্রাজ্যের) মঙ্গল ও কল্যাণ তো এরই মধ্যে নিহিত যে, মোমিন যেন কেয়ামত পর্যন্ত দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে; আর এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর শাসন, ক্ষমতা ও সম্পদ অন্য জাতিদের ভোগের জন্য ছেড়ে দেয়!


    ইবলিস এখানে তাঁর সবচেয়ে বাজে ও নিষ্ঠুর কামনা প্রকাশ করছে। সে চায় ‘কিয়ামত তক’ (কিয়ামত পর্যন্ত) মুমিনরা গোলাম থাকুক। আর তারা ‘অউরোঁ কি খাতির’ (অন্যদের জন্য) এই ‘জাহানে বে-সাবাত’ (অস্থির জগৎ) ছেড়ে দিক—অর্থাৎ তারা দুনিয়ার সম্পদ ও ক্ষমতা অন্যকে (পুঁজিপতি, সাম্রাজ্যবাদীদের) ছেড়ে দিক, আর নিজেরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং বিতর্কে সন্তুষ্ট থাকুক। ইবলিস জানে, যদি প্রকৃত মুসলিম দুনিয়ার দায়িত্ব থেকে সরে আসে, তবে শোষণ চিরস্থায়ী হয়।


    এই শ্লোকে তাই আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের একটি মস্ত বড় বিভ্রান্তিকে আঘাত করেছেন। একশ্রেণীর দরবারী আলেম ও ভুল সূফিবাদের প্রভাবে আমাদের মধ্যে এই বিশ্বাস বাসা বেঁধেছে যে, "পৃথিবী তো ক্ষণস্থায়ী ও ধোঁকার জায়গা (জাহানে বে-সুবাত); তাই এখানে ক্ষমতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা শাসনভার নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। এগুলো কাফের বা অন্যদের জন্য ছেড়ে দেওয়াই ভালো।" যেনো আল্লাহর এই মাখলুক পৃথিবী অগোছালো থাকুক আল্লাহ চান! এটাকে সাজানোর "খেদমতে খালক্ব"-এর অন্তর্গত দায়িত্ব বলে কিছুই যেনো নেই! ইকবাল দেখাচ্ছেন, মুসলমানের মনের ভেতর এই ‘ভুল বৈরাগ্যবাদ’ ও ‘নিষ্ক্রিয় পরকালবাদ’ মূলত ইবলিসের ঢুকিয়ে দেওয়া আফিম।


    ইসলাম ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীকে চিরস্থায়ী বাসস্থান বানাতে নিষেধ করেছে, কিন্তু এর নেতৃত্ব ও ইনসাফ কায়েমের দায়িত্ব ত্যাগ করতে বলেনি। নিজের অধিকার ছেড়ে দিতে বলেনি।  মুসলমানরা যখন এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর চাবিকাঠি অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল, তখন পুরো মানবজাতি ইবলিসি পুঁজিবাদ ও জুলুমের শিকার হলো। ইবলিস তার উপদেষ্টাদের বলছে, মুসলমানদের এই বৈরাগ্যবাদী মানসিকতা যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। তারা যেন পৃথিবীকে তুচ্ছ ভেবে দাসত্ব মেনেই খুশি থাকে।


    ইকবাল এই শ্লোকের মাধ্যমে মুসলমানদের আত্মমর্যাদাবোধে তীব্র ধাক্কা দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, তোমরা যাকে ‘দুনিয়া বিমুখতা’ বা ‘আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল’ মনে করছ, তা আসলে ইবলিসের তৈরি করা দাসত্বের ফাঁদ। একজন সত্যিকারের মোমিন ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে ভোগের বস্তু বানায় না, কিন্তু সে এর সহায়-সম্পত্তি, শিল্প-বাণিজ্য, শাসন ও ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে রেখে আল্লাহর জমিনে ইনসাফ কায়েম করে।


    ہے وہی شعر و تصوف اس کے حق میں خوب تر

    جو چھپا دے اس کی آنکھوں سے تماشائے حیات!

    "হ্যায় ওহি শের ও তাসাউউফ উস কে হক মেঁ খুব তর

    জো ছুপা দে উস কি আঁখোঁ সে তামাশায়ে হায়াত!"


    (ইবলিস তার চ্যালাদের কূটকৌশল শেখাতে গিয়ে বলছে—) সেই কবিতা, সাহিত্য ও সূফিবাদই এই মুসলমান জাতির জন্য সবচেয়ে উত্তম (যা আমাদের জন্য সুবিধাজনক), যা তাদের চোখ থেকে জীবনের বাস্তব কর্মচঞ্চলতা, সংগ্রাম ও গতিশীলতাকে আড়াল করে ঘুম পাড়িয়ে রাখবে।


    আল্লামা ইকবালের মতে, শিল্প ও সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে অনুপ্রাণিত করা, তার ‘খুদি’ বা আত্মাকে জাগ্রত করা এবং তাকে কর্মমুখী করে তোলা। কিন্তু পতন যুগে মুসলিম বিশ্বের কবিরা এমন সব কবিতা ও সাহিত্য রচনা করতে শুরু করেন, যা ছিল নিছক প্রেম-বিরহ, হতাশা, অলসতা এবং অবাস্তব কল্পনায় ঘেরা। ইবলিস বলছে, এই ধরনের মেলানকোলিক বা দুঃখবিলাসী কবিতা মুসলমানদের জন্য চমৎকার আফিম। কারণ এটি পড়লে তাদের ভেতর আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার বা সমাজ পরিবর্তনের স্পৃহা থাকে না।


    আসল তাসাউফ বা সুফিবাদ মানুষকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে বীর ও মুজাহিদ বানায় (যেমন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি, উসমান গাজী, ফাতিহ সুলতান বা ইখওয়ানদের যুগে দেখা গেছে)। কিন্তু পতন যুগের সূফিবাদ হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়, জগতবিমুখ এবং খাঁনকাহ-ভিত্তিক। পীর-মুরিদির একশ্রেণীর অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মুসলমানদের শেখানো হয়, "সবকিছু ভাগ্যের লিখন, চুপচাপ বসে জিকির করো, দুনিয়া নিয়ে মাথা ঘামিও না।" ইবলিস এই নিষ্ক্রিয় সূফিবাদকে স্বাগত জানাচ্ছে, কারণ এটি মুসলমানদের জিহাদ তথা সত্যের জন্য লড়াই) এবং তা বাস্তবায়নের প্রাসঙ্গিক অন্যান্য কর্মের চেতনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।


    ہر نفس ڈرتا ہوں اس امت کی بیداری سے میں

    ہے حقیقت جس کے دیں کی احتسابِ کائنات!


    "হর নফস ডরতা হুঁ ইস উম্মত কি বেদারি সে মেঁ

    হ্যায় হাক্বিক্বত জিস কে দ্বীন কি ইহতিসাবে কায়েনাত!"


    (ইবলিস তার মনের গভীরতম ভয়ের কথা স্বীকার করে উপদেষ্টাদের বলছে—) আমি প্রতি মুহূর্তে, প্রতি নিঃশ্বাসে এই মুসলিম উম্মাহর জেগে ওঠাকে ভয় পাই! কারণ, এই জাতির ধর্মের মূল সত্য ও বৈপ্লবিক চেতনাটাই হলো—পুরো বিশ্ব ব্যবস্থার হিসাব নেওয়া এবং একে ইনসাফের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা।



    এই শ্লোকই ছিলো আমাদের আলাপের গোড়ার কথা। ইবলিস এখানে তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়ের কথা স্বীকার করছে। পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, গণতন্ত্র-রাজতন্ত্র-একনায়কতন্ত্র এবং ফ্যাসিবাদের মতো বিভিন্ন শোষণমূলক ব্যবস্থা তৈরি করে সারা বিশ্বে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে। গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তার যত ভয় সব একজন প্রকৃত মুমিন এবং ইসলামের আসল চেতনা বহনকারীকে নিয়ে। সে তার চ্যালাদের স্পষ্ট বলছে, মুসলমানরা এখন ঘুমে আছে ঠিকই, কিন্তু তারা যদি কোনোদিন হঠাৎ জেগে ওঠে (বেদারি), তবে আমার এই পুরো শয়তানি সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কারণ এরা একে একে জুলুমবাজির আড্ডাখানা ভেঙে দেবে। সকল জালিমকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে হিসাব নেবে। এটাই যে তাদের দ্বীনের মূল চেতনা 'ইহতেসাবে কায়েনাত'।


    ‘ইহতেসাব’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হিসাব নেওয়া, জবাবদিহিতা বা অডিট (Audit) করা। আর ‘কায়েনাত’ মানে মহাবিশ্ব বা সৃষ্টিজগৎ। ইকবাল এখানে বুঝিয়েছেন, ইসলামের মূল কাজ কেবল মসজিদের চার দেয়ালে নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়। ইসলামের প্রকৃত রূপ হলো—বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতিতে কোথায় জুলুম হচ্ছে, কোথায় অন্যায় হচ্ছে, তার কঠোর হিসাব নেওয়া (Accountability) এবং খোদায়ী ইনসাফ কায়েমের মাধ্যমে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া।


    ইসলাম মানুষকে জালিমের সামনে মাথা নত করতে শেখায় না, বরং সমাজ থেকে সব ধরনের শোষণ দূর করার নির্দেশ দেয়। ইবলিস খুব ভালো করে জানে, ইসলাম যখন পূর্ণাঙ্গভাবে বিজয়ী হয়, তখন তা কোনো অত্যাচারী বাদশাহ, শোষক পুঁজিবাদী বা দুর্নীতিবাজ নেতাকে ছাড় দেয় না। ইসলাম পুরো পৃথিবীর শাসক ও ব্যবস্থার ‘ইহতেসাব’ বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।


    আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের তাদের আসল পরিচয় মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, হে মুসলমান! তোমরা নিজেদের দুর্বল ও অসহায় ভাবছ, কিন্তু স্বয়ং শয়তান তোমাদের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তোমাদের ধর্ম কোনো নিষ্ক্রিয় আফিম নয়, এটি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো একটি বৈপ্লবিক বিধান। তোমরা শুধু চোখ মেলে তোমাদের দ্বীনের এই ‘ইহতেসাবে কায়েনাত’-এর চেতনাকে বুকে ধারণ করলেই ইবলিসি ব্যবস্থার পতন অনিবার্য।


    এই শ্লোকের মাধ্যমে ইবলিস তার মূল ভয় প্রকাশ করে দিয়েছে। সে ‘হর নফস’ (প্রতি শ্বাসে) ভয় পায়—এই ভয় তাঁর নিত্যসঙ্গী। কারণ, ইবলিসের পুরো ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে গোপনীয়তা, বেইমানি, দুর্নীতি, শঠতা, কপটতা ও অস্বচ্ছতার ওপর। যদি উম্মাহ জাগ্রত হয় এবং বিশ্বের হিসাব নিতে শুরু করে, তবে তাঁর রাজত্ব 'চিড় কে রাখ দে গা' (টুকরো টুকরো করে দেবে)।


    مست رکھو ذکر و فکرِ صبحگاہی میں اسے

    پختہ تر کر دو مزاجِ خانقاہی میں اسے

    "মস্ত রাখো জিকর ও ফিকরে সুবেহগাহি মেঁ উসে

    পুখতা তর কর দো মিযাজে খানকাহি মেঁ উসে"


    (ইবলিস তার চ্যালাদের চূড়ান্ত গোপন অস্ত্র বা চক্রান্তের কথা জানাচ্ছে—) তোমরা এই মুসলমান জাতিকে কেবল ভোরবেলার জিকির-আজকার আর আধ্যাত্মিক ধ্যানের মধ্যেই বুঁদ করে রাখো; এবং (উসমানী আমলের নয় এমন) খানকাহ-ভিত্তিক (বাস্তবতাহীন, নিষ্ক্রিয়) মানসিকতার ভেতরে তাদের মগজকে এমনভাবে পাকাপোক্ত করে দাও যেন তারা দুনিয়ার খোঁজ রাখার সময়ই না পায়!


    ইবাদতের আড়ালে ইবলিসের চূড়ান্ত ফাঁদ হলো, কর্মহীন এবং বাস্তব দুনিয়া থেকে বেখবর আধ্যাত্মিকতা। ইবলিস কি মজলিসে শূরা’-তে ইবলিস তার উপদেষ্টাদেরকে যে চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়, তা শয়তানের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও ভয়ঙ্কর কৌশলকে উন্মোচন করে। ইবলিস তার চ্যালাদের বলে, তোমরা এই মুসলমান জাতিকে কেবল ভোরবেলার জিকির-আজকার আর আধ্যাত্মিক ধ্যানের মধ্যেই বুঁদ করে রাখো; এবং বাস্তবতা বিবর্জিত খানকাহ-ভিত্তিক (বাস্তবতাহীন, নিষ্ক্রিয়) মানসিকতার ভেতরে তাদের মগজকে এমনভাবে পাকাপোক্ত করে দাও যেন তারা দুনিয়ার খোঁজ রাখার সময়ই না পায়! ইবলিস জানে, আধ্যাত্মিকতা যদি কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা শোষণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। এই একটি নির্দেশের ভেতরেই ইবলিসের পুরো কৌশল নিহিত। সে যাদের তার তৈরি সাম্রাজ্যের দিকে টেনে নিতে পারবে না, তাদের সেই পাপের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টাও করছে না; বরং "ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমেই" ধোঁকা দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছে এবং বাস্তব দুনিয়ার সংগ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত এঁটেছে। কারণ সে জানে, কিছু মানুষকে গুনাহের কাজে ব্যস্ত রাখা কঠিন, কিন্তু তাকে ইবাদতের বাহনেই জাগতিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া তুলনামূলক সহজ। ইবলিস মুসলিম উম্মাহকে কর্মহীন ও নিষ্ক্রিয় ‘রহবানিয়াত’ (সন্ন্যাসবাদ)-এর মাঝে ডুবিয়ে রাখতে চায়, যাতে তারা ‘ময়দানে আমল’ (কর্মক্ষেত্র) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব থেকে সরে আসে।


    এই কৌশলটি এতটাই নিখুঁত যে, মানুষ মনে করে তারা দ্বীনের জন্যই কাজ করছে, অথচ তারা দ্বীনকে তার মূল লক্ষ্য—মানবতার মুক্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা—থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ইবলিস বুঝতে পেরেছে, মুসলমানদের শক্তির উৎস তাদের ধর্ম। তাই তাদের ধর্ম থেকে পুরোপুরি দূরে সরানো যাবে না। সে এক অভিনব চাল চালল, সে মুসলমানদেরকে ইসলামের ‘আমল ও জিহাদ’ (কর্ম ও সংগ্রাম)-এর অংশটুকু ভুলিয়ে দিয়ে কেবল আনুষ্ঠানিক কিছু ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতা’-এর মাঝে বন্দি করে দিল। ইবলিস চায় মুসলমানরা সারারাত জায়নামাজে কাঁদুক, সকালে উঠে তাসবিহ গুনুক, কিন্তু ঘরের বাইরে এসে যখন সমাজ ও রাষ্ট্রে জুলুম চলবে, তখন যেন তারা চুপ থাকে।


    এই ধোঁকার বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় "মসনবী শরিফের" বিখ্যাত গল্পে। একজন আবেদ ব্যক্তি প্রতিদিন জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। একদিন কোনো কারণে তার ঘুম ভাঙেনি এবং ফজরের নামাজ কাজা হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে যখন তিনি দেখলেন সূর্য উঠে গেছে, তখন আল্লাহর ভয়ে এবং নামাজ হারানোর বেদনায় তিনি এত তীব্রভাবে কাঁদতে ও অনুশোচনা করতে লাগলেন যে, তাঁর অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। পরদিন ফজরের ওয়াক্তে এক অদ্ভুত ব্যক্তি এসে তাকে খুব যত্ন সহকারে ডেকে তুলল, যাতে তার নামাজ আর কাজা না হয়। আবেদ ব্যক্তি একাকী থাকতেন। তাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে? আর আমাকে নামাজ পড়ার জন্য এত ভোরে কেন ডেকে তুললে?’ আগন্তুক উত্তর দিল, ‘আমি ইবলিস।’ আবেদ ব্যক্তি আরও অবাক হয়ে বললেন, ‘শয়তানের কাজ তো মানুষকে নামাজ থেকে দূরে রাখা, তুমি কেন আমাকে নামাজের জন্য জাগালে?’ তখন ইবলিস আসল রহস্য ফাঁস করে বলল, ‘গতকাল যখন তোমার ফজরের নামাজ ছুটে গিয়েছিল, তখন তুমি আল্লাহর দরবারে যে বুকফাটা আর্তনাদ ও অনুশোচনা করেছিলে, তার মর্যাদা তোমার জামাতে পড়া এক হাজার নামাজের চেয়েও বেশি ছিল। তোমার সেই কান্নায় আল্লাহ খুশি হয়ে তোমার পূর্বের বহু গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। আমি হিসাব করে দেখলাম, আজকেও যদি তোমার নামাজ ছুটে যায়, তবে তুমি আবার কাঁদবে এবং আল্লাহ তোমাকে আরও বড় মর্তবা দিয়ে দেবেন। তাই আমি তোমার জন্য বিশাল মর্যাদা অর্জনের চেয়ে ছোট মর্যাদাকেই পছন্দ করলাম। আজ তোমাকে নিজেই জাগিয়ে দিলাম, যাতে তুমি সাধারণ নামাজটুকু পড়ো এবং সেই গভীর অনুশোচনা করে বিশাল মর্যাদা ও আত্মশুদ্ধি হাসিল করতে না পারো।’


    এই গল্পটি ইবলিসের সেই কৌশলের নিখুঁত চিত্র, যা ইকবাল তার কবিতায় উন্মোচন করেছেন। ইবলিস জানে, মানুষের আত্মা যখন বড় কোনো বিপ্লবী কাজ বা গভীর আত্মশুদ্ধির দিকে এগোতে থাকে, তখন তাকে ছোট ছোট আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত রেখে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। সে এই সাধারণ ইবাদত দিয়ে তাকে "গভীর অনুশোচনা, আত্মশুদ্ধি ও অন্তরের বিপ্লব"—যা প্রকৃত দ্বীনি জাগরণের সূচনা—থেকে বঞ্চিত করে। এটি ইবলিসের সেই কৌশলেরই প্রয়োগ, যা ইকবাল তার কবিতায় ‘সকালের জিকিরে মাতাল রাখা’ ও ‘খানকাহি মেজাজে পোক্ত করে দেওয়া’ বলে বর্ণনা করেছেন।


    এই শ্লোকটি আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক মহাকাব্য ‘ইবলিস কি মজলিসে শূরা’-এর সেই ধারার চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ, যেখানে পূর্ববর্তী শ্লোকে ইবলিস স্বীকার করেছিল, সে মুসলমানদের জেগে ওঠাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তাই এই শ্লোকে সে তার উপদেষ্টাদের দেয় সেই চূড়ান্ত নির্দেশ দিচ্ছে, যা দিয়ে মুসলমানকে চিরকাল ঘুম পাড়িয়ে রাখা যাবে। ইবলিসের এই নির্দেশের গভীরতা বোঝার জন্য বুঝতে হবে—ইসলামের প্রকৃত জাগরণ তখনই আসে, যখন মুসলমানরা 'ইহতিসাবে কায়েনাত' 'বিশ্বব্যবস্থার জবাবদিহিতা'-এর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেয়। ইবলিস সেই দায়িত্ব থেকেই তাদের সরিয়ে রাখতে চায়।


    ইকবাল পতন যুগের খাঁনকাহ বা সুফি দরবারগুলোর নিষ্ক্রিয় চাদরকে আক্রমণ করেছেন। আসল সুফিবাদ মানুষকে জালিমের বিরুদ্ধে লড়তে শেখাত। কিন্তু ইবলিস যে ‘খানকাহি মিজাজ’ তৈরি করতে বলছে, তার অর্থ হলো—দুনিয়া বিবাগী হওয়া, বাস্তবতা থেকে পলায়ন করা, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে অন্যায় সহ্য করা এবং ভাববাদী ঘোরের মধ্যে থাকা। যখন কোনো জাতির মেজাজ বা স্বভাব এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখন স্বৈরাচারী ও শোষক শক্তির জন্য তাদের ওপর শাসন করা খুব সহজ হয়। ইকবাল বুঝিয়েছেন, আল্লাহর জিকির মানুষের অন্তরে শক্তি জোগায় ময়দানে লড়াই করার জন্য। কিন্তু সেই জিকিরকে যদি ময়দান থেকে পালিয়ে থাকার বাহানা বানানো হয়, তবে তা ইবলিসের তৈরি করা ‘আফিম’ ছাড়া আর কিছুই নয়।


    এই কৌশলটি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, বরং দ্বীনি চিন্তার বৃহত্তর পরিসরেও সমানভাবে কাজ করে।  ইতিপূর্বে তিনি দেখিয়েছেন, এই বিষয়ের মতো ইবলিসের একটি বড় ফাঁদ হলো, ধর্মতাত্ত্বিক ও ফিকহি (অনুপযোগী) বিতর্কগুলোও। কুরআনের সৃষ্টি-অসৃষ্টি, সিফাত-জাতের জটিল প্রশ্ন, ঈসার মৃত্যু-জীবন, ইমামত-খিলাফতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তর্ক, দারুল হারব-দারুল ইসলামের পরিচয়, আম্বিয়াদের ইসমত, সাহাবাদের আ'যমত—এসব নিয়ে যখন আলেম-উলামারা এতটাই লিপ্ত হয়ে পড়েন যে, তারা বাস্তব রাজনীতি, অর্থনৈতিক ইনসাফ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলো থেকে সরে আসেন, তখন তারা সেই সাহাবাদের পথ থেকেই বিচ্যুত হোন যাদের "সত্যের মাপকাঠি" সাব্যস্ত করতে এতো তোড়জোড়। কারণ, এটা মুখে স্বীকারের বিষয় নয়, কর্মে প্রমাণের বিষয়। অথচ কর্মে সাহাবা নাই যাদের, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করে সাহাবাদের নিয়ে। তাও সাহাবাদের পন্থানুসরণ করে নয়। অর্থাৎ, "সাহাবাকে আমাদের জীবনের পরশপাথর" বানানোর যে চেষ্টা এবং কর্মপন্থা, স্বয়ং সেটাই তাদের কর্মপন্থা অনুসরণ করে না। ফলত ধর্মতাত্ত্বিক এই বিতর্কগুলো ইবলিসেরই তৈরি আরেকটি ফাঁদে পরিণত হয়। ইবলিস চায়, মুসলিম উম্মাহ যেন কুরআনের সেই স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি—যা জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের কথা বলে—সেগুলো ভুলে যায়, এবং পরিবর্তে এমন সব তাত্ত্বিক প্রশ্নে জড়িয়ে থাকে যার কোনো বাস্তব সমাধান নেই। এই ফাঁদটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কারণ মানুষ মনে করে তারা দ্বীনের জন্যই কাজ করছে, অথচ তারা দ্বীনকে তার মূল লক্ষ্য—মানবতার মুক্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা—থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ইবলিসের এই কৌশলটি সফল হওয়ার কারণ হলো, এটি দ্বীনের নামেই দ্বীনকে খণ্ডিত করে। ‘ইলমে কালাম’ বা ধর্মতত্ত্ব যখন ‘কাওয়ালি’-র মতোই একটি আফিমে পরিণত হয়, তখন মানুষ বাস্তব সমস্যা থেকে পালানোর জন্য এটিকে ব্যবহার করে, এবং ইবলিসের রাজত্ব অটুট থাকে।


    এই শ্লোকটি ইবলিসের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নির্দেশনা, যা দিয়ে সে মুসলিম উম্মাহকে চিরকালের জন্য ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চায়। কিন্তু ইকবাল এই শ্লোকটি ইবলিসের মুখে উচ্চারণ করিয়ে, আসলে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করছেন—যেন তারা এই ফাঁদ চিনতে পারে। ইবলিসের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, সে মুসলমানদেরকে দ্বীনের নামে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। তাদের মাথায় ইবাদাতে মাকসুদাহ-এর তত্ত্ব ঢুকিয়ে ব্যস্ত রেখেছে আনুষ্ঠানিক কিছু ইবাদত ও অপ্রাসঙ্গিক বিতর্কে। যাতে তারা কখনো বড় দায়িত্বে—বিশ্বব্যবস্থার জবাবদিহিতায়—আরোহন করতে না পারে। কিন্তু এই ফাঁদ চিনতে পারলেই ইবলিসের পরাজয় নিশ্চিত। কারণ প্রকৃত মুমিন তখন বুঝতে পারে, ইসলাম শুধু জিকির-আজকার আর তাত্ত্বিক বিতর্কের নাম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। যা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নাম। ইবলিস যেমনটি স্বীকার করেছে, উম্মাহর প্রকৃত জাগরণই তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি—আর সেই জাগরণের শর্ত হলো, আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মতাত্ত্বিক জটিলতা পেরিয়ে কুরআনের সেই স্পষ্ট বার্তাকে আঁকড়ে ধরা, যা ইবলিসের সব ফাঁদকেই ধ্বংস করে দেয়।


    এতক্ষণে আমরা ইবলিসের পূর্ণাঙ্গ জবাব ও চূড়ান্ত কৌশল দেখলতে পেলাম। ইবলিস সমাজতন্ত্রকে তুচ্ছ করেছে। কারণ এটি বস্তুবাদী চিন্তারই একটি শাখা, যা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সে মার্ক্সবাদী সমালোচনার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে, মানব প্রকৃতির গভীর দুর্বলতা সমাজতন্ত্র দূর করতে পারে না। তার আসল ভয় মুসলিম উম্মাহর জাগরণ। সে জানে, উম্মাহর ভেতরে এখনো ‘আশার স্ফুলিঙ্গ’ জ্বলছে। তিনি বিশেষভাবে ভয় পান ঐ সচেতন মুসলমানদের, যারা জুলুমের বিরুদ্ধে সজাগ। ইবলিস ইসলামের বৈপ্লবিক চেতনাকে ভয় পায়। ইসলাম যে নারীর মর্যাদা রক্ষা করে, পুরুষকে পুরুষ হতে শেখায়, তার কর্তব্যবোধ জাগিয়ে তোলে, সম্পদকে পবিত্র করে, এবং ঘোষণা করে যে জমিন আল্লাহর—এসবই তাঁর রাজত্বের জন্য ধ্বংসাত্মক। তাই ইবলিসের চূড়ান্ত কৌশল হলো উম্মাহকে ঘুমিয়ে রাখা। সে চায় মুসলমানরা ধর্মতত্ত্বের জটিল বিতর্কে, কুরআনের শব্দের নানারকম ব্যাখ্যামূলক তর্কে, এবং বৈরাগ্যবাদী ও দুনিয়ার সমূহ সমস্যা থেকে গাফিল সূফিবাদে ডুবে থাকুক। সে চায় মুসলিমরা পৃথিবী সাজানোর কর্মক্ষেত্র থেকে বিমুখ থাকুক, যাতে তাঁরা জীবনের দাবাবোর্ডে পরাজিত হয়।


    জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট: ‘এপিস্টেমিক ক্লোজার’ ও দ্বৈতবাদ


    আল্লামা ইকবালের ‘ইবলিস কি মজলিসে শূরা’-তে শয়তান যে কৌশলগুলোর কথা বলেছে, মুসলমানদের ফিকহ, দুনিয়া সম্পর্কে গাফিল তাসাউউফ এবং আকিদার জটিল বিতর্কে জড়িয়ে রাখা, তাদের কর্মক্ষেত্র থেকে বিমুখ রাখা, ধর্মীয় নেতৃত্বকে রাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের দাস বানানো, এবং ইসলামের বিপ্লবী চেতনাকে নানা ব্যাখ্যায় পাশ কাটিয়ে যাওয়া—বর্তমান যুগের আলেম, সূফি ও সাধারণ মুসলিম সমাজের মধ্যে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। সমসাময়িক ইসলামি চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে এই সংকটের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


    আজকের আলেম সমাজ জ্ঞানকে যেভাবে ‘পবিত্র’ ও ‘অপবিত্র’ বা ‘দ্বীনি’ ও ‘দুনিয়াবি’—এই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছেন, ইসলামের ইতিহাসে তা অভূতপূর্ব। তারা মনে করেন, ওহীভিত্তিক জ্ঞানই একমাত্র প্রকৃত জ্ঞান; আর আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব বা অর্থনীতি—এগুলো ‘জাগতিক’ ও ‘অপবিত্র’। এর ফলে তারা একটি ‘এপিস্টেমিক ক্লোজার’ (Epistemic Closure)-এর মধ্যে বাস করছেন, যেখানে তাদের চিন্তার পরিধি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।


    ড. ত্বাহা জাবির আল-আলওয়ানি তাঁর The Epistemological Integration of Revealed Knowledge and Human Knowledge-গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগের আলেমদের প্রধান ত্রুটি হলো তারা ওহীর জ্ঞানকে মানবীয় ও সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে একীভূত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি একে ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা’ (Epistemological Isolation) বলে অভিহিত করেছেন (al-Alwani, The Epistemological Integration of Revealed Knowledge and Human Knowledge, p. 45)। এই বিচ্ছিন্নতার ফলেই আলেমরা (ব্যতিক্রমী কয়েকজন বাদে) যখন আধুনিক রাষ্ট্র বা সমাজ নিয়ে কথা বলেন, তখন তাদের সমাধানগুলো হয় ‘ইউটোপিয়ান’ বা কাল্পনিক। তারা বুঝতে পারেন না যে, আধুনিক রাষ্ট্র কোনো একক রাজার হুকুমত নয়; এটি একটি বিশাল আমলাতান্ত্রিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো (টমাস হবসের ভাষায় ‘লেভিয়াথান’)।


    ড. ফজলুর রহমান তাঁর Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition-তে লিখেছেন, ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা মধ্যযুগে এক জায়গায় স্থবির হয়ে গেছে। তারা ফিকহের পুরোনো বিধানগুলোকে চূড়ান্ত মনে করে, আর এর পেছনের দার্শনিক ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান যুগে কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে তাদের কোনো গভীর গবেষণা নেই (Rahman, Islam and Modernity, p. 87)।


    ইবলিসের পরিকল্পনার সাথে এর মিলটি অত্যন্ত স্পষ্ট। শয়তান চেয়েছিল মুসলমানরা ‘ইলাহিয়াত’ (ধর্মতত্ত্ব) ও ‘কিতাবুল্লাহর তাওয়িলাত’ (কুরআনের ব্যাখ্যা)-তে জড়িয়ে থাকুক—আর আজকের আলেমরা ঠিক তাই করছেন। তারা কুরআনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা থেকে সরে গিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ফিকহি ও কালামি বিতর্কে লিপ্ত, যা তাদের বাস্তব সমস্যা সমাধানের শক্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে।


    ইবলিস তার ভাষণে বলেছিলো, সে ধনীদের ‘সারমায়া দারি কা জুনূঁ’ (পুঁজিবাদের উন্মাদনা) দিয়েছে। আর বর্তমান যুগের মুসলিমরা কীভাবে এই পুঁজিবাদী উন্মাদনার সাথে আপস করছে, তা ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সের উদাহরণে স্পষ্ট।


    ড. আসাদ জামান তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বর্তমানের ‘ইসলামী ব্যাংকিং’ মূলত পশ্চিমা পুঁজিবাদের একটি মোড়ক মাত্র। এক ধরনের ‘এসিমিলিশন’ বা আত্মীকরণ। আলেমরা সামষ্টিক অর্থনৈতিক শোষণ (যেমন গ্লোবাল ফিয়াট কারেন্সি সিস্টেম এবং আইএমএফ-এর ঋণশৃঙ্খল) না বুঝে কেবল মুরাবাহা, মুশারাকা বা ইজারার মতো কিছু মাইক্রো-চুক্তিকে হালাল ঘোষণা করছেন, যা আসলে বড় পুঁজিবাদের স্বার্থকেই রক্ষা করছে (Zaman, “Islamic Economics: A Survey of the Literature,” Journal of Islamic Economics, Vol. 1, No. 1, p. 112)।


    অধ্যাপক ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity's Moral Predicament-এ আরও কঠোর যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেন, আধুনিক পুঁজিবাদ ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি ইসলামের শরীয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। আলেমরা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ভেতর থেকে শরীয়া বাস্তবায়ন করতে চান, যা তাত্ত্বিকভাবেই অসম্ভব (Hallaq, The Impossible State, p. 134)। কারণ পুঁজিবাদ ও ইসলাম—এদের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। একটি লাভ-ম্যাক্সিমাইজেশন ও ব্যক্তিস্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে, অন্যটি ন্যায়বণ্টন ও সামাজিক কল্যাণের ওপর।


    ইবলিস বলেছিলো, সে চায় ‘সূফি ও মোল্লা’ তার শাসনব্যবস্থার দাস হোক। আর আজকের আলেম ও সূফিরা আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে এমন এক নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় স্পেসে (Controlled Religious Space) বন্দী, যা তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিয়েছে।


    ড. সাবা মাহমুদ তাঁর Politics of Piety: The Islamic Revival and the Feminist Subject-এ দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্মকে কেবল ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠানে (Personal Piety)-তে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করে। আলেম ও সুফিধারা অবচেতনভাবেই এই সেক্যুলার এজেন্ডা মেনে নিয়েছেন। তাঁরা ভাবেন নামাজ-রোজা বা তসবীহ পড়তে পারছেন মানেই তাঁরা স্বাধীন; দ্বীন এটাই। কিন্তু রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি বা নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা যে সেক্যুলার ও পুঁজিবাদী এলিটদের হাতে, তা তারা বুঝতে পারছেন না (Mahmood, Politics of Piety, p. 78)।


    মিশেল ফুকো (Michel Foucault)-এর Discipline and Punish-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক রাষ্ট্র কোনো সমাজকে তরবারি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং প্রতিষ্ঠান—যেমন নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা ও মসজিদ—এর মাধ্যমে মানুষের চিন্তাকেই নিয়ন্ত্রণ করে (Foucault, Discipline and Punish, p. 210)। রাষ্ট্র আলেমদের বলছে, ‘তোমরা মসজিদ-মাদ্রাসায় বসে কিতাব পড়ো, জিকির করো, আমাদের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক, আইনি বা সামরিক কাঠামোতে হাত দিও না।’ আর আলেমরা এই ফাঁদে পা দিয়ে খুশি মনে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন।


    বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি, আলেমরা যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন তারা সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইন বা আধুনিক শাসনকৌশল বোঝেন না। ফলে তারা মূলধারার চতুর রাজনৈতিক দলগুলোর ‘দাবার ঘুঁটি’ বা ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহৃত হন। অন্যদিকে, অনেকে নিজেদের মাদরাসা বা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যেকোনো জালিম শাসকের সাথে আপস করে নেন, এবং সেই অন্যায়কে ফতোয়া দিয়ে বৈধতা দেন। ইবলিসের সেই ‘মুলুকিয়ত কে বন্দে হ্যায় তামাম,’ তার রাজত্বের দাস এরা।


    ইবলিস তাঁর শেষ নির্দেশে বলেছে, মুসলমানদের জন্য ‘শের ও তাসাউউফ’ (কবিতা ও সুফিবাদ) বেশি ভালো, যা তাদের চোখ থেকে ‘তামাশায়ে হায়াত’ (জীবনের বাস্তব সংগ্রাম) লুকিয়ে রাখে। আর আজকের ওয়াজ মাহফিল ও সুফি সম্মেলনগুলো ঠিক তাই করছে। তারা বাস্তব সমস্যা থেকে মানুষকে পালানোর একটি আধ্যাত্মিক ও আবেগঘন বিকল্প তৈরি করে দিয়েছে।


    উত্তর-আধুনিক দার্শনিক জঁ বদ্রিলার (Jean Baudrillard)-এর ‘সিমুলাক্রা অ্যান্ড সিমুলেশন’ (Simulacra and Simulation) তত্ত্বের আলোকে বর্তমান ওয়াজ সংস্কৃতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়। বদ্রিলার মতে, আধুনিক যুগে মূল বাস্তবতা হারিয়ে যায়, এবং তার জায়গায় দখল করে নেয় ‘হাইপাররিয়েলিটি’—অর্থাৎ বাস্তবতার নকল রূপ, যা বাস্তবতার চেয়েও বেশি বাস্তব বলে মনে হয় (Baudrillard, Simulacra and Simulation, p. 56)।


    আজকের ওয়াজ মাহফিলগুলো ঠিক এই হাইপাররিয়েলিটি তৈরি করছে। আলোকসজ্জা, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, ইউটিউবের ভিউ, থাম্বনেইল, বক্তাদের কণ্ঠের সুর ও আবেগ—সবকিছু মিলে এক অবাস্তব ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়। শ্রোতারা মাহফিলে গিয়ে কাঁদে, জিকির করে, আবেগে ভাসে, এবং বাড়ি ফিরে আবার সেই একই দুর্নীতি, ঘুষ ও সামাজিক অন্যায়ে লিপ্ত হয়। এই ওয়াজ সংস্কৃতি মানুষের বিবেককে জাগানোর বদলে এক ধরনের ‘অস্থায়ী মানসিক শান্তি’ (Catharsis) দেয়, যা মানুষকে নিজের বাস্তব অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দেয়—কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন আনে না।


    আবেগঘন ধর্মীয় বক্তৃতা বা 'ওয়াজ সংস্কৃতি' মানুষকে শুধু কিছুক্ষণের জন্য কাঁদিয়ে বা আবেগ দিয়ে শান্ত করে। যার ফলে মানুষ মনে করে সে তার অপরাধের জন্য 'শুদ্ধ' হয়ে গেছে। কিন্তু এটি তাকে তার ভুল আচরণ বা সমাজের অন্যায় পরিবর্তন করতে উদ্বুদ্ধ করে না; বরং তাকে স্থিতাবস্থায় (Status Quo) ফিরিয়ে দেয়। সে যেভাবে ছিলো সেভাবেই থেকে যায়। এটি আসলে ইবলিসের সেই কৌশলেরই অংশ, যা ইকবাল তাঁর কবিতায় 'আফিম' বলে চিহ্নিত করেছেন। কারণ এটি মানুষের বিবেককে ধর্মীয় মাতলামির জোরে কতক্ষণ ধার্মিক, বড় অনুতাপকারী বানায়, কিন্তু তার বিবেক জাগায় না। এরচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো, যারা ওয়াইজ তাদেরই বিবেক মৃত। এক মৃত আরেক মৃতকে কীভাবে জিন্দা করতে পারে?


    ‘বিবেক জাগানো’ মানে হলো—মানুষকে তার নিজের ভুল-ভ্রান্তি, সমাজের অন্যায় ও জুলুম সম্পর্কে সচেতন করা, এবং তাকে সেই অবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী চেতনা ও কর্মপ্রেরণা তৈরি করে। অন্যদিকে, ওয়াজ মাহফিল বা আবেগঘন বক্তৃতা শ্রোতার মনে একটি মুহূর্তের জন্য আবেগের জোয়ার সৃষ্টি করে। সে কাঁদে, আফসোস করে, আল্লাহর কাছে ফিরে আসার অঙ্গীকার করে। কিন্তু এই আবেগ ক্ষণস্থায়ী। বাসায় ফিরে সেই আবেগ শুকিয়ে যায়। এটিই হলো ‘ক্যাথারসিস’—মানসিক চাপের অস্থায়ী মুক্তি, যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। ইকবালের ভাষায়, এটি সেই ‘আফিম’, যা মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য বিভোর রাখে, কিন্তু তাকে ময়দানে নামায় না।


    এর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এই অস্থায়ী কান্না ও আবেগ মানুষকে নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিয়ে দেয়। একজন মানুষ মনে করে—‘আমি তো কেঁদেছি, আমি তো আল্লাহর কাছে ফিরেছি, তাই আমার সব মাফ হয়ে গেছে।’ ফলে তার মধ্যে প্রকৃত অনুশোচনা বা আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা থাকে না। ইবলিসের কৌশল হলো—তাকে অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিয়ে, তাকে শান্ত করে দেওয়া। কারণ অপরাধবোধ যদি প্রকৃত হয়, তবে তা মানুষকে বদলায়, তাকে জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য করে। কিন্তু ইবলিস চায়, মানুষ যেন সেই অপরাধবোধকে কান্নার মাধ্যমে নিষ্কাশন করে ফেলে এবং আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে যায়।


    এর পরিণতি হলো—মানুষ একই কাজ ফিরে ফিরে করে। রাতে ওয়াজে কাঁদে, সকালে আবার ঘুষ খায়, মিথ্যা বলে, চাঁদাবাজি করে বা অন্যায় সহ্য করে। কারণ তার কান্না কেবল ছিল আবেগের ‘আউটলেট’ (মুক্তিপথ), কিন্তু এটি তার মানসিকতা, তার জীবনাচরণ বা সমাজের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন ঘটায়নি। ইবলিস চায়, মুসলিম উম্মাহ যেন এই চক্রেই আবর্তিত হয়—আবেগপ্রবণ ইবাদত, অশ্রুপাত, আবার পুরোনো কর্মকাণ্ড। এতেই তার রাজত্ব অটুট থাকে।


    ইকবালের কবিতায় ইবলিস যে ‘মিজাযে খানকাহি’ তৈরি করতে বলেছে, তা কিছুটা এই ‘ওয়াজ সংস্কৃতি’র মধ্যে প্রতিফলিত হয়। ইবলিসের সেই খানকাহি মেজায মানুষকে বলে—‘তুমি শুধু নিজের আত্মা নিয়ে ব্যস্ত থাকো, সমাজের জুলুম তোমার দায়িত্ব নয়।’ আর এই ওয়াজ সংস্কৃতি তাকে বলে—‘তুমি কাঁদো, তোমার অপরাধবোধ দূর করো, কিন্তু রাজা-বাদশার লুটপাট, জালিমের অত্যাচার এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না।’ এই দুইয়ের মিল ইবলিসের ফাঁদকে আরও শক্তিশালী করে।


    এই ‘অস্থায়ী মানসিক শান্তি’ শুধু ওয়াজ মাহফিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কগুলোর ক্ষেত্রে আরও অধিক কাজ করে। আলেম-উলামারা যখন আকিদার জটিল তর্ক করেন, দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে মহান গ্যাঞ্জাম আঞ্জাম দেন এবং জটিল প্রশ্নে লিপ্ত থাকেন, তখন তারা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ‘ক্যাথারসিস’-এর মধ্যে পড়েন। সাময়িক মানসিক শান্তি অনুভব করেন। তারা মনে করেন, তারা দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, অথচ তারা বাস্তব রাজনীতি, অর্থনৈতিক ইনসাফ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলো থেকে অনেক দূরে পড়ে আছেন। জুলুমের নিত্যসঙ্গী হয়ে আছেন।  ইবলিসের ফাঁদও হলো এটাই, তাদের এমন সব তাত্ত্বিক প্রশ্নে ব্যস্ত রাখা, যার কোনো বাস্তব সমাধান নেই, যাতে তারা জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ময়দান থেকে দূরে থাকে।


    ইকবাল আমাদের দেখান ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে বদলানো, সমাজকে বদলানো, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইবলিস চায়, মানুষ যেন আবেগেই থেমে যায়, অশ্রুপাতেই শেষ হয়, কোনো কর্মে না নামে। এই ‘ওয়াজ সংস্কৃতি’ যা কান্না ও আবেগের মাধ্যমে অপরাধবোধ নিষ্কাশন করে, ইবলিসের সেই কৌশলেরই আধুনিক সংস্করণ, যা ইকবাল ‘আফিম’ বলে চিহ্নিত করেছেন। প্রকৃত জাগরণ তখনই আসে, যখন এই আবেগ কর্মে রূপান্তরিত হয়, যখন অশ্রু ইনসাফের লড়াইয়ে শক্তিতে পরিণত হয়।


    ড. আকবর এস. আহমেদ তাঁর Postmodernism and Islam-এ দেখিয়েছেন, উত্তর-আধুনিক যুগে মিডিয়া এবং ভোগবাদ (Consumerism) ধর্মকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করেছে। আলেম ও ধর্মতাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ আজ ‘সেলিব্রিটি কালচার’ (Celebrity Culture) এবং মিডিয়া বাণিজ্যের অংশীদার হয়ে গেছেন, যেখানে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার চেয়ে ‘রেটিং’ ও ‘ভিউ’ প্রধান হয়ে উঠেছে (Ahmed, Postmodernism and Islam, p. 92)। ইবলিসের সেই ‘হ্যায় ওহি শের ও তাসাউউফ উস কে হক মেঁ খুব তর’ আজ ইউটিউবের তামাশাপূর্ণ ওয়াজ ও ফেসবুকের স্ট্যাটাসে রূপ নিয়েছে—যা মানুষকে জীবনের গভীর সংকট থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।


    অস্তিত্ববাদী সংকট: তরুণ প্রজন্মের নিহিলিজম ও আলেমদের ব্যর্থতা


    ইবলিসের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল উম্মাহর ‘বেদারি’ (জাগরণ)। কিন্তু বর্তমান যুগের তরুণ প্রজন্ম এক চরম অস্তিত্ববাদী শূন্যতা বা ‘নিহিলিজম’ (Nihilism)-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা হতাশা, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এবং জীবনের অর্থহীনতায় ভুগছে। আর আলেমরা যখন এই তরুণদের কাছে যান, বা তারা আলেমদের শরণাপন্ন হয়, তখন তারা তাদের এই মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী সংকটের কোনো গভীর উত্তর পায় না।


    রেজা আসলান তাঁর বিভিন্ন লেখায় দেখিয়েছেন, আধুনিক তরুণ প্রজন্ম প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কাঠামোগত ও অনুশাসনমূলক ভাষা (Institutional Dogma) থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কারণ তারা জীবনের কোনো গভীর অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না (Aslan, No god but God, p. 215)। আলেমরা যখন এই সংকটকে কেবল ‘ঈমান কম’ বা ‘নামাজ না পড়ার শাস্তি’ কিংবা এরকম কিছু রিচুয়াল ইবাদাত না থাকার দায় বলে উড়িয়ে দেন, তখন তরুণরা আরও বেশি ‘নিহিলিজম’ বা নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।


    আলেমরা ফ্রয়েড, নিৎশে বা সার্ত্রের মতো পশ্চিমা চিন্তাবিদদের নাস্তিক্যবাদী দর্শনের ভেতরের সূক্ষ্ম ফাঁদগুলো ভেঙে কুরআনের যৌক্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারেন না। ফলে শিক্ষিত ও আধুনিক তরুণদের কাছে আলেমদের বক্তব্য দিন দিন প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। ইবলিস হয়তো খুশি হয়ে দেখছে—সে মুসলমানদের অপ্রয়োজনীয় ধর্মতত্ত্বের জটিলতায় আটকে রেখেছে, আর তরুণরা প্রয়োজনীয় ধর্মতত্ত্ব না পেয়ে নতুন রিদ্দায় ভুগছে এবং ধর্ম থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।


    ইকবালের আলাপ এইসব তাত্ত্বিক লেখকদের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, বর্তমান আলেম বা আধ্যাত্মিক রাহবারি সমাজ জ্ঞানতাত্ত্বিক অবরুদ্ধতা (Epistemic Closure), পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে আপস, এবং আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণের (Structural Control) শিকার। তারা একটি "সমান্তরাল অবাস্তব জগতে" কিংবা "তাঁদের কল্পনার জগতে" বাস করছেন। যেখানে তারা ভাবছেন তারা দ্বীনের খিদমত করছেন, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে তারা এই যুগের সবচেয়ে বড় শয়তানি ব্যবস্থার "অবচেতন সহযোগী" (Unconscious Accomplices) হিসেবে কাজ করছেন।


    ইবলিসের সেই শেষ নির্দেশ, ‘মস্ত রাখো জিকর ও ফিকরে সুবহগাহি মেঁ উসে / পুখতা তর কর দো মিযাজে খানকাহি মেঁ উসে’ আজ শতভাগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আলেমরা ফিকহ ও কালামের বিতর্কে, দুনিয়া বিমুখতার নামে বৈরাগ্যে, আর সাধারণ মুসলমানরা ভোগবাদী সংস্কৃতি ও আবেগঘন ওয়াজ-মাহফিলে—সবাই নিজ নিজ জগতে মগ্ন। কেউ জিজ্ঞেস করে না, পুঁজিবাদের এই ‘অদৃশ্য হাত’ কীভাবে আমাদের গলা টিপে ধরে আছে? কেন বিশ্বের সম্পদ কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত? কেন মুসলিম দেশগুলো ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে আছে? কেন শিক্ষা, বিচার ও শাসন ব্যবস্থা—সবকিছুই সেক্যুলার ও পুঁজিবাদী স্বার্থে চালিত হচ্ছে? এগুলোকে তারা দুনিয়াদারী ভেবে বসে আছে। যা ইবলিসের একান্ত কামিনা অনুযায়ী চলছে।


    ইকবালের এই দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যতক্ষণ না আলেম, সূফি এবং সাধারণ চিন্তাশীল সমাজ এই কাঠামোগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ঘুম থেকে জেগে উঠছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থার অদৃশ্য শয়তানি নিয়ন্ত্রণ ভাঙা অসম্ভব। ইকবাল তাঁর দর্শনে উম্মাহর তরুণ সমাজকে সেই ‘শাহীন’ বা ঈগল পাখির সাথে তুলনা করেছেন, যার কাজ অন্যের তৈরি করা বাসায় থাকা নয়, বরং ঝড়ের আকাশে ডানা মেলে নিজের সার্বভৌমত্বের নতুন নতুন দিগন্ত প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করা। তিনি তাঁর কবিতায় সেই নতুন জাগরণের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। জওয়াবে শিকওয়ায় ইকবাল বলেন,


    نغمہ بلبل کا ہو سکتا ہے دل آویز بھی

    نیند اڑ جائے گی سن کر، بیدار ہو جاؤ گے تم

    پھر وفا کا جوش ہوگا، دل میں اک ہلچل مچے

    جامِ دیرینہ پینے کو، پھر تڑپ جاؤ گے تم

    گرچہ ہے بزمِ عجم, لیکن ہے صہبا ارغوان

    نغمہ ہندی ہے تو کیا, لے تو حجازی ہے میری


    "নাগমা বুলবুল কা হো সাকতা হ্যায় দিল-আওয়িজ ভী,

    নিন্দ উড় জায়েগী সুন কর, বেদাঁর হো যাওগে তুম।

    ফির ওয়াফা কা জোশ হোগা, দিল মেঁ এক হালচাল মাচে,

    জামে দেরিনা পিনে কো, ফির তড়প যাওগে তুম।

    গরচেহ হ্যায় বাজমে আ'জম, লেকিন হ্যায় সাহবা আরঘাওয়ান,

    নাগমা হিন্দী হ্যায় তো ক্যায়া, লয় তো হিজাজী হ্যায় মেরি।"


    বুলবুলির এই কুহুতানে হয়তো হৃদয় দীর্ণ হবে,

    নিদ্রাতুর অলস পথিক জাগবে আবার ঘণ্টারবে।

    ওফাদারীর অনুরাগে প্রাণটি আবার উঠবে জেগে,

    পূর্ব-সুরা পান করতে মনটি আবার ব্যস্ত হবে।

    আজম দেশী পাত্র হলেও সুরা আমার আরব দেশী,

    গান যদিও হিন্দী আমার, সুরটি সেই হেজায দেশী। (মোস্তাক আহমাদ, 'আল্লামা ইকবালের খুদিতত্ত্ব ও ঐশীজ্ঞান রহস্য', পৃ. ৪৯)।


    এই বৈশ্বিক ভিশনই হলো ইকবালের চিন্তার পুনর্জাগরণের চূড়ান্ত গন্তব্য। আল্লামা ইকবালের দর্শন অতীতকে কেবল এক কান্নার বস্তু না বানিয়ে তাকে ভবিষ্যতের নতুন ইমারত গড়ার চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করে। প্রাথমিক গ্রিক-আরবি সংশ্লেষের মেথডলজিক্যাল ভুলগুলো সংশোধন করে তিনি আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি আধ্যাত্মিকতার এক অভূতপূর্ব জৈব সমন্বয়ের পথ দেখিয়েছেন (Muhammad Iqbal, The Reconstruction of Religious Thought in Islam, p. 98-103)। এই সমন্বিত জ্ঞানতত্ত্ব এবং বিশ্বজনীন উম্মাহর ধারণার মাধ্যমেই কেবল মুসলিম সমাজ তার হারানো বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব ফিরে পেতে পারে এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদের বস্তুগত সংকটের বিপরীতে এক নতুন নৈতিক ও ইনসাফভিত্তিক বিশ্বসভ্যতার বিকল্প রোডম্যাপ হাজির করতে পারে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment