Loading...

আরজ আলী মাতুব্বর-এর প্রশ্নের কারণ: মূলকথা

আরজ আলী মাতুব্বর-এর প্রশ্নের কারণ: মূলকথা
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents

     

    আরজ আলী মাতুব্বরের প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে ধর্মে মতানৈক্য, স্রষ্টার অস্তিত্ব ও সত্য নির্ণয়ের মাপকাঠি নিয়ে দার্শনিক আলোচনা।

    মূল কথা

    (প্রশ্নের কারণ)


    আওহাম এবং মুশির দুজন একই ভার্সিটির স্টুডেন্ট। উভয়ের ডিপার্টমেন্ট ভিন্ন হলেও আন্তরিকতার মধ্যে কোনো কমতি নেই। উভয়েই একে অন্যের বেস্ট ফ্রেন্ড। ইদানীং আওহামের চলাফেরা দেখে মুশির সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ে। আওহামের কথা-বার্তায় স্কেপ্টিকস স্কেপ্টিকস একটা ভাব সে লক্ষ্য করে। সেদিন তাকে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করে নিলো, কিরে আওহাম, তোর সমস্যা কী?

    : না তো, তেমন কিছু না। সামান্য ফ্লাকচুয়েশনে ভুগছি।

    : কী ফ্লাকচুয়েশন, জানতে পারি?

    : আচ্ছা মুশির বল তো, এ ধর্ম-টর্ম দিয়ে কী হবে? আর এত ধর্মের মধ্যে কোনটিকে তুই পূর্ণরূপে সঠিক, সত্যধর্ম বলে গণ্য করবি?

    : কেনো, একমাত্র ইসলামই সঠিক। এতে সন্দেহের কী আছে?

    : এই যে তুই বললি ইসলামই সঠিক, এটা তো আত্মপক্ষ সমর্থন করলি। তুই বলছিস তোর ধর্ম সঠিক। অন্যরা বলবে তাদের ধর্ম সঠিক। আসলে কী জানিস মুশির, ধর্মিষ্ঠরা মূলত একেকজন স্বার্থপর। কেবল নিজের নিজের করে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, মুক্ত মন নিয়ে, ওরা সবকিছু ভেবে দেখে না।

    মুশির বললো, আচ্ছা বুঝেছি। কাল তোকে নিয়ে একজনের কাছে যাবো। উনার কাছে গিয়ে তোর মনের যত প্রশ্ন আছে সব করবি। আশাকরি, মনোজ্ঞ উত্তর পেয়ে যাবি।

    পরদিন বিকেলবেলা মুশির তার অভীষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে, আওহামকে সাথে করে রওয়ানা দিলো। অবশ্য আওহাম এত সহজে রাজি হয়নি। মুশিরের চাপাচাপিতে একটি শর্তে রাজি হয়েছে, “যদি ওই ব্যক্তি আওহামের উত্তর দিতে না পারেন, তাহলে মুশিরকে মেনে নিতে হবে যে, আওহামই সঠিক।”

    মুশির বলেছে, তুমি চলো। যদি উত্তর না পাও, তবে তুমি এমনিতেই সঠিক সাব্যস্ত হয়ে যাবে। আর যদি উত্তর পেয়ে যাও, তবে……?

    মুশির দূর থেকে এক ব্যক্তির দিকে ইশারা করে আওহামকে বললো, ওই হলেন সেই ব্যক্তি, যার কথা তোমাকে বলেছি। আওহাম তাকিয়ে দেখলো, গালভর্তি দাড়ি বিশিষ্ট, গায়ে পাঞ্জাবি ও মাথায় পাগড়ী-বাঁধা শ্বেতকায় এক ব্যক্তি। তাচ্ছিল্যের স্বরে সে বললো, এই হুজুর তো কেবল খেজুর চিবানোর লায়েক। তিনি আমার প্রশ্নের কী উত্তর দিবেন! আমার এসব প্রশ্ন তো বেটা সাধারণ কারো বই থেকে চয়ন করা নয়। স্বশিক্ষিত দার্শনিক খ্যাত আরজ আলীর বই থেকে চয়ন করা।

    মুশির সান্ত্বনার স্বরে বললো, দেখা যাক কী হয়।

    ওই ব্যক্তির কাছে যেয়ে মুশির সালাম দিলো। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে, “মুশির ভাই যে” বলে তাকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করলেন এবং উভয়ে নবীজির শেখানো দোয়া “আল্লাহুম্মা যিদ মুহাব্বাতি লিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি” (হে আল্লাহ, আমাদের ভালোবাসাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য বাড়িয়ে দিন) পড়লেন।

    মুশির তাকে আওহামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, এ আমার বন্ধু আওহাম। আর আওহাম, উনি হলেন হাফেজ মাওলানা ইহতিজাজ।

    আওহামের সাথে মুসাফাহার জন্য ইহতিজাজ হাত বাড়িয়ে দিলে, আওহাম হাতে ধরে একটি ঝাঁকি দিয়ে জানান দিলো—আমি পুরো আধুনিক। আপনার ন্যায় মধ্যযুগীয় হুজুর নই যে, হ্যান্ডশেক আর কোলাকুলি করে দোয়া পড়বো।

    গতকাল রাতে মুশির ফোনে ইহতিজাজকে সব বলে দিয়েছে। সেজন্য এখানে আর নতুন করে কিছু বলতে হয়নি। ইহতিজাজ তাদের নিয়ে তার হোস্টেল রুমে চলে গেলো। কিছু নাস্তা-পানি অর্ডার দিয়ে পাশের দোকানে এক বন্ধুকে পাঠিয়ে দিলো। ইহতিজাজ এখানে হোস্টেলে থেকে দাওরায়ে হাদিস পরবর্তী উচ্চতর পড়াশোনা করছে। রুমে এসে আওহামের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর, ইহতিজাজ বুঝে নিলো আওহামের সমস্যাটা আসলে কোথায়।

    ইহতিজাজ বললো, আচ্ছা আওহাম দা, আমি আপনাকে দাদা বলে সম্বোধন করবো। আশাকরি আপনি মাইন্ড করবেন না।

    আওহাম হেসে-হেসে বললো, অবশ্যই ডাকবেন। মাইন্ড করবো কেনো! এটি একটি সুমধুর ডাক।

    ওকে দাদা, তাহলে আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করতে পারি। তো দাদা, আরজ আলী সাহেবের কোন প্রশ্নটি আপনার মনে তোলপাড় করছে, কোনটি থেকে শুরু করতে চাচ্ছেন, কাইন্ডলি যদি বলতেন!

    প্রশ্নের গভীরতা: ধর্মে মতানৈক্যের সমস্যা

    আওহাম বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, আপনারা যে এত ধর্ম-কর্ম করেন আর বলেন স্রষ্টার পক্ষ থেকে ধর্ম এসেছে, তাহলে ধর্ম এবং স্রষ্টা নিয়ে এত মতানৈক্য কেনো? সোজা কথায় আরজ আলী সাহেবের ভাষায় আমি জানতে চাই, “ধর্মজগতে মতানৈক্যের অন্ত নাই। যেখানে একই কালে দুটি মত সত্য হতে পারে না, সেখানে শতাধিক ধর্মে প্রচলিত শতাধিক মত সত্য হবে কিরূপে? যদি বলেন যে, সত্য হলো একটি। তাহলে প্রশ্ন উঠবে কোনটি এবং কেনো? অর্থাৎ সত্যতা বিচারের মাপকাঠি (Criterion of truth) কী? সত্যতা প্রমাণের উপায় (Test of truth) কী?”

    ইহতিজাজ বললো, আওহাম দা, এখানে ধর্ম নিয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপন করা হলো, নিশ্চয় তা স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন ধর্ম সম্পর্কে। কারণ আরজ আলী সাহেব বা ওনার অনুসারীদের যত মাথাব্যথা, তা হলো স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন ধর্ম নিয়ে। বিশেষত ইসলাম ধর্ম নিয়ে উনাদের মাথাব্যথার অন্ত নেই। ধর্ম নিয়ে উনার এবং উনার সমমনা অন্যদের এ ধরনের প্রশ্ন মূলত স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন ধর্মিষ্ঠদের প্রতি হওয়ার কথা। উনারা তো আর স্রষ্টাকে মানেন না—যেমনভাবে বৌদ্ধরা মানে না।

    অপরদিকে শাস্ত্রগতভাবে এটি একটি ধর্মের রূপ পেলেও, সেটি যেহেতু স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে না এবং নিজেদের ধর্মকে স্রষ্টা প্রদত্ত ধর্ম বলেও দাবি করে না। ফলে ওই ধর্ম স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসলো কি না? স্রষ্টার বাণী তাদের কাছে আছে কি না? সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করে তারা সঠিক কি না—তা দেখারও প্রশ্ন আসে না। যেহেতু তারা স্রষ্টার পক্ষ থেকে পাওয়া ধর্মের দাবিই করে না। বরং মানবগড়া ধর্ম তাদের, সেটা তারা মেনেই নিয়েছে। এমতাবস্থায় এটি ভুল-ভ্রান্ত প্রমাণের জন্য কোনো প্রশ্ন তোলারই দরকার নেই। অটোমেটিক সেটা বাতিল সাব্যস্ত হয়ে যায়।

    মানুষের গড়া ধর্ম ভুল-ভ্রান্তি এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকবেই। সেখানে গিয়ে এটি সঠিক নাকি বেঠিক ধর্ম তালাশ করা, আর অন্ধকারে হাতড়ে ফিরা সমান কথা। স্রষ্টা অস্বীকারের ক্ষেত্রে বৌদ্ধরা মূলত নাস্তিকদের মাসতুতো ভাই। তাই এখানে নাস্তিকতার ছোঁয়া পাওয়া যেতে পারে, বিশ্বাসের অস্তিত্ব নয়। সো উনার প্রশ্ন উনার এগেইনস্টে যারা আছে, স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ধর্মের দাবি করে, তাদের প্রতিই হবে—তাই তো?

    আওহামের স্বভাবসুলভ উত্তর—জি, তাই তো মনে হচ্ছে।

    তাহলে শোনেন আওহাম দা, এ প্রশ্নের উত্তর বোঝার পূর্বে ভূমিকা স্বরূপ আরো কিছু প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামনে রাখতে হবে। যেমন, “স্রষ্টা কি আছেন? থাকলে, ক’জন? এক না একাধিক? স্রষ্টার পক্ষ থেকে কোনো ধর্ম আসার প্রয়োজন রয়েছে কি? আসলে কোনটি? ইত্যাদি ইত্যাদি।”

    আমরা প্রথমে দেখবো, স্রষ্টা বলতে কেউ কি আছেন? দেখুন দাদা, যে বস্তু ধ্বংসশীল, সে বস্তু সৃষ্ট হওয়া অনিবার্য। যাকে গড়া যায়নি, তাকে ভাঙার প্রশ্নই আসে না। যেভাবে যাকে সৃষ্টি করা হয়নি, তা ধ্বংসশীল বা ক্ষয়িষ্ণু হতে পারে না। দেখার বিষয় হলো, এ পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য ধ্বংসশীল কি না।

    স্রষ্টার অস্তিত্ব: যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে

    বিশ্বের অন্যতম পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন বলেন, “রসায়ন শাস্ত্র এই তথ্য প্রকাশ করে যে, জড় পদার্থ ক্রমশ বিলুপ্ত হচ্ছে। কতক খুব ধীরে-ধীরে আবার কিছু অত্যন্ত তাড়াতাড়ি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। কাজেই বলা চলে পদার্থের অস্তিত্ব শাশ্বত নয়।”

    বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন “এন্টিম্যাটার তত্ত্ব” আবিষ্কার করার মাধ্যমেও আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, এই মহাবিশ্ব ক্রমে-ক্রমে ধ্বংসের দিকে প্রাগ্রসরমান। কেননা এ মহাবিশ্বের (Universe) মতো আরেকটি (Anti-Universe) প্রতি-মহাবিশ্বও রয়েছে। উভয়টি সম্প্রসারণশীল। যখনই একটি অপরটির সংস্পর্শে আসবে, তখনই ঘটে বিশ্বের সর্ব-অনন্য ঘটনা। বাকি থাকবে না কিছুই। সবকিছু হয়ে যাবে মিসমার।

    অপরদিকে বিগ ব্যাং থিওরি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, এ মহাবিশ্বের একসময় সূচনা হয়েছে। তাহলে অবশ্যই এর একজন সূচনাকারী রয়েছেন। তাহলে কী বুঝলেন আওহাম দা, এ মহাবিশ্ব চিরন্তন-শাশ্বত? কখনো না। তারমানে এ মহাবিশ্বকে একসময় সৃষ্টি করা হয়েছে। এ তো পেলাম আমরা, বিজ্ঞানের দেওয়া তথ্যমতে স্রষ্টার ধারণা। এবার দেখুন, বিজ্ঞানীরা স্রষ্টাকে অনুভবের ক্ষেত্রে কী তথ্য দিলেন।

    গড স্পট ইজ ফাউন্ড ইন দ্য ব্রেইন” শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর ভিলিয়ানুর রামচন্দ্র বলেছেন যে, স্রষ্টার বিশ্বাস মানুষের মনে প্রোথিত।

    “দ্য সানডে টাইমস, ২ নভেম্বর ১৯৯৭ ইংরেজি” তারিখে একটি বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়েছে যে, “বিজ্ঞানীদের দাবি, তারা মানুষের মস্তিষ্কে ‘গড মডিউল’ নামে একটি জায়গা আবিষ্কার করেছেন। যা মানুষের ধর্মে বিশ্বাস স্থাপনের পিছনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। স্নায়ুতান্ত্রিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রচুর আধ্যাত্মিক চর্চা করেন, তাদের মস্তিষ্কের সামনের অংশে কিছু স্নায়ুসংযোগ রয়েছে এবং যখন তারা স্রষ্টাকে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন, তখন এই স্নায়ুগুলো বৈদ্যুতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠে।”

    যদি এই গবেষণা সত্য হয় এবং “গড মডিউল” বলে সত্যিই কিছু থেকে থাকে, তাহলে প্রমাণিত হয় যে, নাস্তিকদের মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে আলাদা। বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হয়েছেন যে, স্রষ্টায় বিশ্বাস অবশ্যই একটি জন্মগত ব্যাপার। এটা শিখিয়ে দেওয়া কিছু নয়। স্রষ্টায় বিশ্বাস মানুষের সহজাত প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। এখন যদি কেউ স্রষ্টায় বিশ্বাস না করেন, তাহলে বুঝতে হবে সে বিকারগ্রস্ত।

    দেখুন আওহাম দা, আফিম-সেবী ব্যক্তিরা যথাসময়ে আফিম গ্রহণ না করলে তাদের জীবন বিপন্ন হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাই বলে আফিম খাওয়াকে তাদের প্রকৃতিগত অভ্যাস বলা যায় না। বরং আফিম খাওয়া তাদের একটি জঘন্য অভ্যাস—যা তারা কৃত্রিমভাবে গড়ে তুলেছে। যা হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক প্রকৃতির শত্রু। ঠিক সেভাবে স্রষ্টায় বিশ্বাস হলো মানুষের সহজাত বিষয়। যদি কেউ তা না করে, তবে বুঝতে হবে সে আর স্বাভাবিক মানুষ নেই। বরং বিকৃত দেহমন নিয়ে সে অস্বাভাবিক দানবে পরিণত হতে চলেছে। যা তাকে জুলুম-অত্যাচার, সামাজিক অনাচার, অবিচার-অজাচারের প্রান্তসীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে।

    যদি আপনি যুক্তির আলোকেও স্রষ্টাকে খোঁজেন, তাহলে এত-এত যুক্তি রয়েছে, যা বলে শেষ করার মতো নয়। সাধারণ একটি যুক্তি দেখুন, আপনি যে শার্টটি পরে আছেন, সেটা সম্পর্কে যদি আমি বলি—এর কোনো তৈরিকারী নেই। এটির সেলাই থেকে নিয়ে বোতাম ফিটিং সবকিছু এমনি এমনি হয়ে গেছে। মানবেন আপনি?

    : অ্যাবসুলেটলি নট।

    তাহলে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে বলুন তো দাদা, বিশাল এ মহাবিশ্ব এত নিপুণ ও সুবিন্যস্তভাবে কোনো স্রষ্টা ছাড়া কী করে অস্তিত্বে আসতে পারে? এত অগণিত গ্রহ-তারা সুশৃঙ্খলভাবে আপন-আপন কক্ষপথে কোনো নিয়ন্ত্রণকারী ছাড়া কীভাবে চলতে পারে? অথচ সামান্য একটি নৌকা চালাতে হলেও চালক লাগে। বুঝতে পারলেন আওহাম দা, স্রষ্টা কত অনিবার্য সত্য?

    মুশির আওহামের চোখের দিকে তাকিয়ে নীরব ভাষায় ইতিবাচকের একটি দ্যোতনা দেখতে পেলো।

    স্রষ্টা এক না একাধিক? যুক্তিগত বিশ্লেষণ

    ইহতিজাজ বললো, দাদা, এবার আমরা দেখবো স্রষ্টা এক নাকি একাধিক। আপনি দেখতে পাবেন, এ জগতে যেসব লোক স্রষ্টায় বিশ্বাসী, তারা দু’ভাগে বিভক্ত। হয় এক স্রষ্টায় (আল্লাহ্‌য়) বিশ্বাসী, নতুবা একাধিক স্রষ্টায় বিশ্বাসী। যারা বহু খোদায় বিশ্বাসী, তাদের প্রধান দার্শনিক যুক্তি হলো, “এ বিশ্বজগৎ বিভিন্ন ধরনের উপাদানে পরিপূর্ণ। এসব উপাদান স্বতন্ত্র এবং এক থেকে অন্যতে বিচ্ছিন্ন। পরিদৃশ্যমান জগত বৈচিত্র্যে ভরা এবং এ বৈচিত্র্যই প্রমাণ করে যে, পরিদৃশ্যমান এ জগতের পিছনে অসংখ্য সত্তা রয়েছেন।”

    আসুন দাদা, আমরা একটু যুক্তির আলোকে বিশ্লেষণ করে দেখি, একাধিক স্রষ্টা থাকা কি সম্ভব এবং বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসীদের যুক্তিটি কতটুকুই বা যথার্থ?

    এক. যদি স্রষ্টা একাধিক থাকেন, তাহলে তাদের মধ্যে ঐক্য থাকে কী করে? প্রত্যেকেই তো আপন প্রভুত্ব জাহির করতে চাইবেন। একজন বৃষ্টি দিতে বললে, অন্যজন রৌদ্রতাপ দেওয়ার ইচ্ছা করতে পারেন। একজন বন্যা দিতে চাইলে, অন্যজন চৈত্রের খরায় পৃথিবীকে চৌচির করতে চাইবেন। পরস্পরের মধ্যে কেবল ঝগড়া করতে থাকতেন। সৃষ্টির নাম-গন্ধও আসতো না। অতএব যারা একাধিক স্রষ্টায় বিশ্বাসী, তারা বহু স্রষ্টা এবং জগতের ঐক্য-শৃঙ্খলার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারেন না।

    দুই. এ বিশ্বজগতে বৈচিত্র্য থাকার কারণে স্রষ্টা যে একাধিক হতে হবে—এটা যুক্তিবহির্ভূত। আমরা একই মা-বাবার ঘরে বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন সন্তানকে জন্ম নিতে দেখি। সন্তানদের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকা কি প্রমাণ করে তাদের মা-বাবা একাধিক? অবশ্যই না। তাহলে সৃষ্টির বৈচিত্র্য কী করে প্রমাণ করে স্রষ্টা একাধিক?

    তিন. স্রষ্টা বলতে এক অসীম সত্তাকে বুঝায়। যারা বহু স্রষ্টায় বিশ্বাসী, তারাও স্রষ্টাকে অসীম এবং মোস্ট পাওয়ারফুল জ্ঞান করে থাকেন। কিন্তু দাদা আপনি কি এটা ভেবে দেখেছেন, একাধিক স্রষ্টায় বিশ্বাস স্রষ্টার অসীমতা এবং সর্বময় ক্ষমতাকে খর্ব করে। কেননা, একাধিক স্রষ্টা হলে, স্বভাবতই এক স্রষ্টার অস্তিত্ব শেষ হবার পর অন্য স্রষ্টার অস্তিত্ব শুরু হবে এবং প্রত্যেকে পৃথক পৃথকভাবে ক্ষমতাশীল সাব্যস্ত হবেন। এরকম হলে স্রষ্টার অসীমতা এবং সর্বময় ক্ষমতা থাকলো কোথায়?

    চার. একাধিক স্রষ্টায় বিশ্বাস মানুষের ভীতি থেকে এসেছে। প্রাচীনকালে কোনো নবীর তিরোধানের পরবর্তী সময়ে মানুষ যে বস্তুকে ভয় পেয়েছে, সে বস্তুকেই ঈশ্বর জ্ঞান করতে শুরু করেছিলো। এভাবে একাধিক ঈশ্বরের ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়। যা মূলত কোনো বিচারবুদ্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

    এবার বুঝতে পারলেন তো আওহাম দা, একাধিক স্রষ্টা নয়; বরং একজন স্রষ্টা থাকাই যুক্তিযুক্ত? মাত্র একজন স্রষ্টা হলেই তবে, তাঁর অসীমতাসহ সকল স্ববৈশিষ্ট্য বজায় থাকে। আওহাম কেবল একনাগাড়ে শুনে যাচ্ছে। গলার ঢোকটুকু পর্যন্ত গিলতে যেনো সে ভুলে গেছে।

    ইহতিজাজ বলে চলছে, দাদা, দার্শনিক ‘গ্যালোয়ে’ তাঁর “ফিলোসফি অফ রেলিজিয়ন” গ্রন্থে বলেছেন, “বাস্তব জগতের সসীম, সাপেক্ষ ও পরনির্ভরশীল বস্তু বা ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজন এক অসীম, স্বনির্ভর ও অনিবার্য সত্য। আর এ সত্যই হচ্ছেন ঈশ্বর বা খোদা।”

    এ দার্শনিকের কথাটির প্রতি একটু লক্ষ্য করুন দাদা, স্রষ্টা যদি একাধিক হতেন তবে তিনি স্বনির্ভরও হতে পারতেন না, আবার অসীমও হতে পারতেন না। অসীম কেনো হতে পারতেন না—সেটা তো আমরা ইতিপূর্বে বুঝে এসেছি যে, তখন একজন স্রষ্টার নির্ধারিত একটি বডি থাকা আবশ্যক হয়ে দাঁড়াতো। যা স্রষ্টার অসীমতাকে বিলুপ্ত করে দেয়।

    এখন আমরা দেখবো, একাধিক স্রষ্টা কেন স্বনির্ভর হতে পারতেন না। স্বনির্ভরতা এমন গুণ, যা কেবলমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ শাশ্বত সত্তার ক্ষেত্রে বর্তায়। যে গুণ থাকলে কখনো কোনোকিছুর মুখাপেক্ষী হতে হয় না। যদি স্রষ্টা একাধিক হতেন, তাহলে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট বডি থাকতো। ফলে তাদের প্রত্যেকের অধিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার প্রয়োজন দেখা দিতো এবং স্রষ্টারা আপন বাসস্থান ও জায়গা দখল নিয়ে সর্বক্ষণ ঝগড়ায় লিপ্ত থাকতেন।

    যখন কেউ বাসস্থানের জায়গার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়লো, তখন সে অবশ্যই মানুষের ন্যায় বসবাসকারী গণ্য হয়ে যাবে। আর মানুষের ন্যায় সাধারণ কোনো সত্তা স্বনির্ভর এবং মহাবিশ্বের স্রষ্টা কখনো হতে পারে না। অতএব এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা অনন্ত-অসীম একক সত্তা আল্লাহ তাআলা।

    বুঝতে পারলেন তো দাদা, স্রষ্টার স্বনির্ভরতাও তার এককতার দাবি জানাচ্ছে? এতক্ষণের আলোচনায় আমরা দুটি জিনিস পেলাম—

    এক. সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা আছেন।
    দুই. সেই স্রষ্টা একজন। একাধিক হওয়া অসম্ভব।

    আওহাম দা, এখানে কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন করে বসে—স্রষ্টার পূর্বে কী ছিল? অথবা তাঁকে কে সৃষ্টি করলো? কিন্তু তারা এটা বোঝে না, যাকে সৃষ্টি করা হয়, তিনি নিজেই সৃষ্ট। সৃষ্ট কোনোকিছু স্রষ্টা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। অতএব স্রষ্টা বলতেই বুঝা যাচ্ছে, তাঁকে সৃষ্টি করা হয়নি। তিনি স্বয়ম্ভু এবং সদা-সর্বদা আছেন। যেহেতু তিনি নিজে থেকেই সদা-সর্বদা আছেন, সেহেতু তাঁর পূর্বে কোন কিছু থাকার প্রশ্ন আসে কোন যুক্তিতে?

    আমরা দার্শনিক “গ্যালোয়ের” একটি কথার দিকে লক্ষ্য করতে পারি। তিনি বলেছেন, “জগতের প্রতিটি ঘটনাই কারণ শৃঙ্খলে বাঁধা বলে জগতের চূড়ান্ত পরিণতি বা কারণ হিসেবে ঈশ্বর বা স্রষ্টা অস্তিত্বশীল।”

    তিনি তার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই একক পরম সত্তাকে “চূড়ান্ত কারণ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আমরা বলবো, তিনি এমন এক সত্তা, যিনি সকল কারণেরও সৃষ্টিকর্তা এবং কারণের ধারা-পরম্পরা যার কাছে গিয়ে পরিসমাপ্তি পায়।

    এভাবে বলার হেতু হলো, জগতের মধ্যে নিহিত সকল কারণও সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। এমতাবস্থায় তাঁকেও “কারণ” বলে অভিহিত করলে, অনেকটা সৃষ্টিজগতের “কারণ”-এর সাথে তাঁকে ঘুলিয়ে ফেলা হয়। অথচ তিনি সেই “সকল কারণের”ও সৃষ্টিকর্তা। ফলে জগতের কারণগুলোর ধারা-বর্ণনার শেষ সীমায় চলে গিয়ে, যে চূড়ান্ত কারণের দেখা পাওয়া যায় এবং যার ব্যাখ্যা আর জগতের কোন কিছু দিয়ে চলে না—সেই বিষয়েরও ঊর্ধ্বের এবং অতিপ্রাকৃত এক পরম-সত্তা হলেন তিনি। যিনি মূলত মানুষের দেখা চূড়ান্ত কারণেরও সৃষ্টিকর্তা।

    আমি তাকে চূড়ান্ত কারণ বলতে চাচ্ছি না কেনো, সেটা বোঝার জন্য আপনার সামনে একটি উদাহরণ দিচ্ছি। দেখুন দাদা, আমাদের মধ্যে কোন কিছু স্মরণ রাখার বা আত্মস্থ করে রাখার একটা “স্মৃতিশক্তি” রয়েছে। যে স্মৃতিশক্তিটা আমাদের ব্রেইন বা মগজের মধ্যে লক্ষ-কোটি কোষের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করে দেওয়া হয়েছে। আমরা যখন কোনকিছু ভাবি বা কোনকিছু স্মরণ করতে চাই, তখন সেগুলো সচল ও চঞ্চল হয়ে উঠে। এর ফলে আমাদের স্মৃতি থেকে কারো সামনে কোনকিছু উপস্থাপন করতে পারি, বা আমাদের স্মৃতির মধ্যে কোনোকিছুকে সংরক্ষণ করে রাখতে পারি।

    আমরা দেখতেছি, আমাদের “স্মৃতিশক্তির” চূড়ান্ত কারণ হিসাবে এখানে রয়েছে কতগুলো কোষ। কিন্তু এই কোষগুলো এলো কোথা থেকে? যার কাছ থেকে এসেছে, তিনিও যদি এরকম “কারণ” হন, তাহলে ওই সৃষ্ট কোষগুলো এবং তার মধ্যে পার্থক্য কী?

    আসলে কথা হচ্ছে, সেই সত্তাকে আমরা বোঝার স্বার্থে দর্শনের ভাষায় “চূড়ান্ত কারণ (Absolute Cause)” বলে অভিহিত করে থাকি। বাস্তবে তিনি “কারণ এবং কার্যের”ও অধিক কিছু। পৃথিবীর কোন কিছুর অস্তিত্বের ধারা-পরম্পরা খুঁজতে-খুঁজতে, আমরা আমাদের জ্ঞানানুযায়ী সৃষ্টিজগতে নিহিত কারণগুলোর প্রান্তসীমায় পৌঁছার পর, সর্বশেষ “কারণ” হিসেবে যা চিহ্নিত করি—তিনি যখন সেটিরও অধিক এবং ঊর্ধ্বের কিছু; তখন “তাঁর পূর্বে কী ছিল” এমন জ্ঞানহীন প্রশ্ন-বাহুল্য অজ্ঞতা এবং নির্বুদ্ধিতা বৈ কী আখ্যায়িত হতে পারে!

    স্রষ্টার পূর্বে কোনকিছু থাকা যে সম্ভব নয়, আরো সহজভাবে সেটা বোঝার জন্য আরেকটি উদাহরণ আমরা দেখতে পারি, দাদা। আমি ১ থেকে ৫ পর্যন্ত কাউন্ট করলাম। এবার এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ৫ সংখ্যাটি কেনো ৫ হলো? এর পিছনে “কারণ” হিসেবে কে কাজ করছে? অবশ্যই ৪ নম্বর সংখ্যার কারণে ৫ নম্বর সংখ্যাটি ৫ হয়েছে। এমনিভাবে ৪ নম্বর সংখ্যা ৪ হলো কেনো? অবশ্যই ৩ নং সংখ্যার কারণে। এভাবে ৩ সংখ্যাটি ২ এর কারণে ৩ এবং ২ সংখ্যাটি ১ এর কারণে ২ হয়েছে। এবার প্রশ্ন হলো, ১ কিসের কারণে ১ হয়েছে? কোনো উত্তর আছে আওহাম দা?

    : আওহাম একেবারে নিশ্চুপ।

    : বুঝলেন তো দাদা, এর পূর্বে কারণ হিসেবে কিছু থাকতে পারে না। কারণ, এক-ই হলো সব সংখ্যার চূড়ান্ত স্টেপ। তেমনিভাবে স্রষ্টা হলেন এক ও একক। আমরা সকল “কার্যকারণ” ধারাক্রমের পরিসমাপ্তিতে গিয়ে পরম স্টেপ হিসেবে তাকেই পাই। সবকিছু তাঁর মধ্যেই বিলীন হয়েছিলো। তাঁর পূর্বে আর কিছুই নেই। যেভাবে ১ সংখ্যার পূর্বে কারণ হিসেবে কী রয়েছে, প্রশ্ন তোলা অবান্তর। সেভাবে এক স্রষ্টার পূর্বে কী রয়েছে—সেই প্রশ্নও অজ্ঞতাপ্রসূত-অবাস্তব।

    এবার আমরা দেখবো দাদা, এ স্রষ্টার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে ধর্মীয় বিধিবিধান আসার কোনো প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না? তারপর আপনার উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাবে চলে যাবো। তবে সংক্ষেপে একটি কথা বলে রাখি। যেহেতু প্রমাণিত হয়ে গেলো যে, আবশ্যিকভাবে স্রষ্টা আছেন এবং তিনি একজন। তখন বুঝতেই পারছেন, প্রচলিত শতাধিক ধর্মের মাঝে এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী যে ধর্ম রয়েছে, সেটিই সত্য হবে। যাইহোক, আমরা দেখে নিই স্রষ্টার পক্ষ থেকে কোনো ধর্ম আসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না?

    আওহাম দা, প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনার কারণ হলো, আরজ আলী সাহেবের কিছু অন্ধভক্ত ভাইয়েরা এই প্রশ্ন উত্থাপন করে বুঝাতে চান—সত্য ধর্ম বলতে কোনটিই নেই। তারা মনে করেন, ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার জন্য ধর্মের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। অবিশ্বাসের জগতের প্রত্যেক ব্যক্তি এরকম মনে করে থাকেন। কারণ হিসেবে তারা বলেন, ন্যায়-অন্যায়, সততা-অসততা ইত্যাদি বিচারের মাপকাঠি হিসেবে মানুষের বিবেকই যথেষ্ট।

    মানবতা বনাম প্রবৃত্তি: বিবেকের সীমা

    এখন যদি আমরা উপরের প্রশ্নটি বুঝে নিই, তাহলে সহজেই আপনি আরজ আলী সাহেবের প্রশ্ন “সত্যতা বিচারের মাপকাঠি কী”—এটির উত্তর পেয়ে যাবেন। তাহলে আমরা উপরের প্রশ্নটি বোঝার চেষ্টা করি। আপনার অবশ্যই জানা আছে দাদা, মানুষের শরীরে মৌলিক উপাদান কয়টি।

    : জি, মানুষের শরীরে “মৌলিক উপাদান” বলতে সাধারণত রাসায়নিক মৌল (elements) বোঝানো হয়—যেগুলো দিয়ে পুরো শরীর তৈরি।

    মানবদেহে মোট ৬০টিরও বেশি মৌল পাওয়া যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, হাইড্রোজেন (H), নাইট্রোজেন (N), অক্সিজেন (O), ক্যালসিয়াম (Ca), আয়রন, পটাশিয়াম ইত্যাদি। আরেকটি বিষয় আছে “মেটাবলিজম”। যেটাকে আমরা শরীরে আগুন আছে বলে প্রকাশ করি। এক্সাক্টলি এটা আগুন না। এটা একটা প্রক্রিয়া। শরীর কীভাবে খাবার থেকে এনার্জি নেয়, এর প্রক্রিয়া। যদিও এর মধ্যে তাপও আছে। এটাকে প্রাচীন দর্শন “শরীরে আগুন আছে” বলে অভিহিত করেছে।

    : রাইট দাদা।

    হাইড্রোজেন + অক্সিজেনের সমন্বয়ে আমরা এখানে পানি পাই। নাইট্রোজেন + অক্সিজেনের সমন্বয়ে পাই বাতাস। ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম ইত্যাদির কারণে পাই মাটি। মেটাবলিজমে পাই এনার্জি এবং হিট বা তাপ। কারণ শরীরে যখন Cellular Respiration হয়, তখন কিছু শক্তি যায় ATP (Adenosine Triphosphate) বা ব্যবহারযোগ্য এনার্জি হিসেবে। আর কিছু শক্তি তাপ (Heat) হিসেবে বের হয়। ফলত এগুলোর সমন্বয়ে আমরা এখানে পানি, বাতাস, মাটি ও এক ধরনের আগুনের অস্তিত্ব পাই।

    তো আমরা এগুলোর একটু বৈশিষ্ট্য দেখে নিই। অবশ্যই আপনি দেখে থাকবেন, যখন বাতাস কোনোদিকে ছুটে, তখন সব তোলপাড় করে নিয়ে যায়। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলা সম্পর্কে কে না জানে! বাতাস বহে তো বেপরোয়াভাবে বহে। তার কারণে কারো কোনো ক্ষতি হচ্ছে, নাকি লাভ হচ্ছে—সেটা সে দেখে না। রাইট দাদা?

    : জি, অবশ্যই।

    তাহলে দেখা গেলো, মানুষের মধ্যে বাতাস নামক একটি উপাদান রয়েছে। যেটি ভারসাম্যহীন, বেপরোয়া।

    এরপর দেখুন মানুষের শরীরে আগুন নামক আরেকটি উপাদান আছে। আচ্ছা দাদা, আগুন কোনো কিছুকে পোড়াতে শুরু করলে দয়া করে নাকি?

    : অবশ্যই না।

    : তারমানে আগুনও হলো ভারসাম্যহীন বেপরোয়া উপাদান। ঠিক আছে?

    : জি।

    মানুষের শরীরে আরেকটি উপাদান হলো পানি। বন্যার যখন ঢল নামে, পানি যখন কোনোদিকে প্রবাহিত হওয়া শুরু করে, তখন বুঝি ভারসাম্য বজায় রেখে ছুটে? পরিমাণ মতো ছুটে এসে থেমে যায়? অর্থাৎ সে খুব ইনসাফভিত্তিক ছুটে বেড়ায় নাকি?

    : অবশ্যই না।

    এবার তাকান মাটির দিকে। মাটির উপরে কোনোকিছু ফেলে রেখে কিছুদিন পর যদি যান, তাহলে সেটাকে যে অবস্থায় রেখে এসেছিলেন, সে অবস্থায় পাবেন না। দেখবেন, মাটির ভিতরে আস্তে-আস্তে দেবে যাচ্ছে। মাটি সেটাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সে এটা খেয়াল করছে না, এটি আমার জন্য গিলে ফেলা উচিত কি উচিত না। মাটির প্রকৃতিটাই হলো এমন। তার বুকে যা রাখা হয়, তা-ই সে গিলে ফেলে। কারো কোনো বস্তুতে পরোয়া করে না। সে বুঝে না এটা তার নিজের হক নাকি পরের হক। এসব ভাবার সময় তার নেই। সে বেপরোয়া।

    তাছাড়া এই মাটি তথা দেশীয় সীমানা বৃদ্ধির মোহে কত বীরের শির ধুলায় ধূসরিত হয়েছে—ইতিহাস এর সঠিক ইয়ত্তা রাখতে কি সক্ষম? পৃথিবীর অধিকাংশের চেয়ে বেশি যুদ্ধের পিছনে এই মাটিই রয়েছে। ক্ষমতার লড়াই হোক আর সামাজিক বৈষম্য উচ্ছেদের লড়াই হোক, সবগুলোই কোনো না কোনো ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে হয়েছে। তাই বলা যায়, মাটির সাথে ক্ষমতার অদম্য মোহের এক সম্পর্ক রয়েছে। আবার মাটি নিজেও বেপরোয়া। সেই মাটির তৈরি মানুষ বেপরোয়াভাবে নিজের ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেই এবং তাতে মানবতার লেশমাত্রও থাকবে না—এমনিই তো হবে।

    সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, মানুষের শরীরে বিদ্যমান মৌলিক উপাদানগুলো ভারসাম্যহীন-বেপরোয়া। আর এই অবস্থা দেখেই তো ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষ সৃষ্টির রহস্য জানতে চেয়েছিলেন। তারা বুঝেছিলেন, এই ধরনের উপাদান দ্বারা সৃষ্ট মানবজাতি জমিনের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ, লড়াই-সংগ্রাম এবং দ্বন্দ্বমুখর জীবনে অবতীর্ণ হবে।

    এবার বলুন তো দাদা, এসব ভারসাম্যহীন উপাদান থেকে ভারসাম্যপূর্ণ সঠিক বিবেক পাওয়ার আশা কখনো করা যায় ? ভারসাম্যপূর্ণ বিবেক পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি, দাদা? অবশ্য কোনো-কোনো ক্ষেত্রে দেখা যাবে বিবেক সঠিক নির্ণয় করতে পারছে। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে পারছে না। সঠিক নির্ণয় যেটুকু করতে পারে, সেটুকুও মূলত স্রষ্টার পক্ষ থেকে মানুষ হিসেবে তার মধ্যে রাখা মনুষ্যত্বের ফলমাত্র।

    কিন্তু সকল ক্ষেত্রে সঠিক-বেঠিক নির্ণয়ে মনুষ্যত্বই যথেষ্ট না। যখন কারো স্বার্থে আঘাত লাগে, তখন সে মনুষ্যত্ব তার ভিতর থেকে পালিয়ে যায়। পক্ষান্তরে তখন যদি স্রষ্টার পক্ষ থেকে আগত ধর্মীয় বিধান থাকে, তাহলে তার মনুষ্যত্ব কাজ না করলেও, বিধানের আলোকে তার সম্মুখে সঠিক এবং বেঠিক কী—সেটা ফুটে উঠবে।

    তাহলে দাদা, ভারসাম্যহীন বস্তু দ্বারা সৃষ্ট মানুষ থেকে যখন আমরা ভারসাম্যহীন বিবেক পেলাম, তখন বলুন তো, সেই বিবেক কি সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদি নির্ণয়ের মাপকাঠি হতে পারে?

    আওহাম একেবারে চুপটি মেরে বসে আছে এবং তন্ময় হয়ে কেবল শুনে যাচ্ছে।

    ইহতিজাজ বললো, আওহাম দা, ভারসাম্যহীন রেকলেস টাইপ উপাদান দ্বারা গঠিত মানুষ কীভাবে “ইনসানিয়াত” তথা মানবতাবাদে উত্তীর্ণ হতে পারবে?

    : আওহাম বললো, যখন তার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মনস্তত্ত্ব গঠন করে দেওয়া হবে, তখনই সেটা সম্ভব হবে।

    : একজ্যাক্টলি দাদা।

    এবার ভাবুন দাদা, এ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা কিসের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আসবে। আমরা তো দেখে এসেছি বিবেক দ্বারা সেটা সম্ভব নয়। কারণ, সে নিজেই ভারসাম্যহীন উপাদানের মধ্যে আবদ্ধ। যেগুলোর তাড়নায় সে পরিচালিত হয়। অতএব সেও ভারসাম্যহীন। সেও বুঝতে সক্ষম হবে না, কোনটি মানবতাপন্থী আর কোনটি মানবতাপরিপন্থী।

    আমার কথার সত্যতা নিশ্চিতে প্রকৃষ্ট প্রমাণ হিসেবে আপনার সামনে অধুনা সংঘটিত দুটি ঘটনা তুলে ধরতে চাই। ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইংরেজি তারিখে, লন্ডনের দুটি দৈনিক পত্রিকা লোমহর্ষক এ নিউজ দু’টি কভার করেছে।

    ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইংরেজি তারিখে লন্ডনের “দৈনিক মেট্টাড”-এর একটি হেডলাইন ছিলো এভাবে: “Father and his daughter get married and have a baby.” ঘটনাটি আধুনিক সভ্যতার উর্বর ভূমি (?) আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা অঞ্চলে ঘটেছে। ৪০ বছর বয়সী বাবা তার ১৮ বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ে করে। বিয়ের দুবছর পর গত সেপ্টেম্বরে ২০১৭ ইংরেজিতে তারা একটি সন্তানও লাভ করে।

    দ্বিতীয় ঘটনাটি ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইংরেজি তারিখে “ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড” পত্রিকার ইন্টারন্যাশনাল পাতার একটি নিউজ ছিলো এরূপ: “11-years-old his baby fathered by brother, 14.” ঘটনাটি হলো দক্ষিণ স্পেনের মুরসিয়া অঞ্চলের এক হাসপাতালে ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে একটি সন্তান প্রসব করেছে। পুলিশ অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছে, নবজাতক এই শিশুর পিতা আর কেউ নয়, এই মেয়েটিরই ১৪ বছর বয়সী আপন ভাই।

    বলুন তো দাদা, এমন জঘন্য কাজের সময় তাদের বিবেক তাদেরকে কী বলেছে? অবশ্যই তাদের বিবেক বলেছে, এটি আমাদের ব্যক্তিগত যৌন স্বাধীনতা। কিন্তু সভ্য সমাজ এবং আপনার বিবেক কী বলে?

    : আমাদের রক্ষণশীল সমাজ অবশ্য এটাকে অশ্লীলতা, নষ্টামির প্রান্তসীমা আখ্যায়িত করবে।

    : তাহলে দেখা যাচ্ছে দাদা, মানুষের বিবেক সবার সমান নয়। অতএব এ বিবেক সার্বজনীন মাপকাঠি হতে পারে না। এ তো গেলো পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত দুটি ঘটনা। এছাড়া বিকিনি পরে সাগরতীরে শুয়ে থাকা—পশ্চিমা বিশ্বের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তাদের বিবেকের কাছে এসব আধুনিক সভ্যতা। কিন্তু আপনার-আমার বিবেক বলছে এটা বর্বরতা। তেমনি চোরের বিবেকের কাছে চুরি করা, ডাকাতের বিবেকের কাছে ডাকাতি করা—কেবল একটি পেশা। অপরদিকে আপনার-আমার বিবেকের কাছে এগুলো পেশা নয়, পাশবিকতা। এককথায়, বিবেক চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে সক্ষম নয়। তাহলে মানুষের মধ্যে ইনসানিয়াত তথা মানবতা আসার পথ কী?

    ধর্মের প্রয়োজনীয়তা: কেন বিধান আসা জরুরি?

    আচ্ছা দাদা বলুন তো, যদি আপনি একটি মেশিন তৈরি করেন, তবে মেশিনটি থেকে কীভাবে সুষম পদ্ধতিতে উপকৃত হওয়া যাবে—সেটা আপনার চেয়ে ভালো কেউ জানতে পারে কি?

    : অবশ্যই না।

    যদি স্বয়ং আপনি এ মেশিন পরিচালনার পদ্ধতি বলে না দেন, তবে অন্যান্যরা এতে সমূহ সমস্যা সৃষ্টি করার সম্ভাবনা আছে কিনা?

    : অবশ্যই আছে।

    তাহলে যুক্তির দাবি কী? মেশিনটি চালানোর পদ্ধতি আপনি নিজেই বলে দিবেন, তাই না? যেহেতু এটাই নিরাপদ ব্যবস্থা।

    : জি, অবশ্যই।

    : একজ্যাক্টলি দাদা, আপনি বলে দিবেন। নতুবা মেশিনটি থেকে উপকার পাওয়া তো দূরের কথা, চালু হওয়ার আগেই অন্যরা সেটা নষ্ট করে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে।

    এবার আপনি একটু চিন্তা করুন তো, আপনার তৈরি এই মেশিনটি পরিচালনা করা বেশি কঠিন, নাকি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মানুষের পরিচালনার বিষয়টি অধিক স্পর্শকাতর? চিন্তা করলে দেখা যাবে, আবশ্যিকভাবে মানুষের পরিচালনা অধিক গুরুত্ববহ এবং কঠিন বিষয়। কারণ, কুল-কায়িনাতের ভারসাম্যতা তাদের আচরণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাই এ সৃষ্টিকুলের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা নির্মাণের জন্য, তারই স্রষ্টার পক্ষ থেকে কোনো বিধান আসা ছাড়া নিরাপদ অন্য কোন ব্যবস্থা আছে কি?

    আওহামের মুখে ‘রা’ও ফুটছে না। হাবভাবে ইতিবাচক ব্যঞ্জনা।

    শুনুন দাদা, বেপরোয়া উপাদানে গঠিত মানুষের পক্ষে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় উত্তীর্ণ হয়ে মানবতাবাদী হতে, স্রষ্টার পক্ষ থেকে ধর্মীয় বিধান আসা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তাই ধর্মই হলো, মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা দানকারী একমাত্র উপায়।

    মানুষ গঠনে ব্যবহৃত মৌলিক উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে আপনি কী বুঝলেন, দাদা? মানুষ নিজে থেকেই ইনসানিয়াত তথা মানবতার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ স্তরে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম? কখনো না। সো, আমরা বুঝতে পারলাম, মানুষকে প্রকৃতিস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ মনস্তত্ত্ব দিয়ে মানবতাবাদীদের কাতারে শামিল করতে গেলে, স্বয়ং তার স্রষ্টার পক্ষ থেকে কোনো রোল বা সংবিধান আসা ছাড়া উপায় নেই।

    যেভাবে আপনার তৈরি মেশিনকে ব্যবহার করার পদ্ধতি একমাত্র আপনিই ভালোভাবে বলে দিতে সক্ষম। কেননা এতে কী কী সমস্যা কী কী কারণে আসতে পারে, আপনি সবচেয়ে ভালো জানেন। ঠিক সেভাবে বরং তার চেয়ে শত শত গুণ উত্তমভাবে স্রষ্টাই জানেন কী কী বিষয়ের মধ্যে মানুষের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে, আর কী কী বিষয়ের মধ্যে রয়েছে অকল্যাণ। তাই মানুষ জাতিকে চলার নিয়ম-নীতি তাঁর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হবে—এটাই যৌক্তিক।

    একমাত্র তাঁর বলে দেওয়া নিয়ম-নীতি, পথ ও পন্থাই মানুষকে মানবতাবাদে উত্তীর্ণ করতে সক্ষম। দেখুন দাদা, মানুষকে এমন সব উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেগুলোকে বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। ঠিক তেমনিভাবে মানুষকেও বিশেষ নিয়ম-নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানবতাবাদে উত্তীর্ণ করা সম্ভব। তবে সেটা মানব-মস্তিষ্ক ও বিবেকপ্রসূত আইন দ্বারা যে সম্ভব নয়—আমরা ইতিপূর্বে তা যৌক্তিক আলোচনার ভিত্তিতে দেখে এসেছি। সেই রোলগুলো তাই স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসতে হবে।

    এ হিকমতের ভিত্তিতেই ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিধিমালা এসেছে। যুক্তির নিরিখে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যায়, বেপরোয়া অস্থিমজ্জার মানুষ জাতিকে সুপথে রাখতে এসব বিধান বিস্ময়করভাবে কাজ করবে।


    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment