Loading...

শেষকথা: জ্ঞান হারায় না, হারায় তার ধারকরা

শেষকথা: জ্ঞান হারায় না, হারায় তার ধারকরা
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    জ্ঞান হারায় না, হারায় তার ধারকরা, ইবনে খালদুন, ফুকো ও নতুন বায়তুল হিকমাহর ধারণা, seosazzadchy
    গ্রিস থেকে বাগদাদ, আন্দালুসিয়া ও ইউরোপ হয়ে আধুনিক জ্ঞান-সভ্যতা: জ্ঞানের ধারক বদলেছে, কিন্তু জ্ঞান হারায়নি

    Previous Part.......

    জ্ঞানের অবিনশ্বরতা এবং ‘ক্যাটাগরিক্যাল ট্রানজিশন’

    ইতিহাসের এক সুদূরপ্রসারী ও বিশ্বজনীন ক্যানভাসে তাকালে একটি ইউনিভার্সাল ট্রুথ মানুষের চেতনার সামনে অত্যন্ত প্রখরভাবে উন্মোচিত হয়। জ্ঞান বা ‘ইলম’ তার আদি ও আসল সত্তায় একটি চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং সার্বজনীন মেটাফিজিক্যাল বাস্তবতা। এটি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা, নির্দিষ্ট কোনো জাতি কিংবা কোনো বিশেষ শহরের চিরস্থায়ী বা একচেটিয়া ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। মানুষের তৈরি করা বিশাল সাম্রাজ্যের পতন হতে পারে। পৃথিবীর বুক থেকে প্রতাপশালী রাজবংশের নাম চিরতরে মুছে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের প্রজ্ঞার কখনো চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটে না। এথেন্সের দার্শনিক একাডেমি যখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন গ্রিক চিন্তার মৃত্যু ঘটেনি। আলেকজান্দ্রিয়ার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থাগার যখন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, তখন মানুষের অর্জিত জ্ঞান হাওয়ায় উড়ে যায়নি। বাগদাদের দজলা নদীতে যখন লক্ষ কিতাব ফেলে দেওয়া হয়েছিল কিংবা করডোবার রাজকীয় লাইব্রেরি যখন পুড়ে ছাই হয়েছিল, তখনো মানুষের সভ্যতার মূল আলোটি নিভে যায়নি। জ্ঞান মূলত একটি প্রবহমান নদীর মতো। যা সময়ের বাঁকে বাঁকে নিজের ভাষা, অবয়ব এবং ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করে। এক তীরের মাটি যখন অনুর্বর ও জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন প্রজ্ঞার সেই অবিনশ্বর স্রোত অন্য কোনো নতুন সভ্যতার উর্বর তীরে গিয়ে আছড়ে পড়ে। এই অমোঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে আমরা ‘ক্যাটাগরিক্যাল ট্রানজিশন’ বা জ্ঞানের শ্রেণীগত রূপান্তর ও পরিভ্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। যেখানে সত্য কখনো পরাজিত হয় না, বরং তার বাহক বা ধারকদের একদল ইতিহাসের মঞ্চ থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। অন্যদল এসে দায়িত্ব নেয়। জ্ঞানের হাতবদল হয়, বিলোপ নয়।

    এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিভ্রমণের ইতিহাস কোনো সরল বা একরৈখিক তীরচিহ্ন নয়। এটি মানুষের চেতনার এক গভীরতম আত্মিক ও সামাজিক সংগ্রাম। গ্রিসের Speculative Reason বা বিমূর্ত যুক্তিবিদ্যা যখন রোমান সাম্রাজ্যের যান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তখন সিরিয়াক ও সুরিয়ানি খ্রিস্টান পণ্ডিতদের অনুবাদের মাধ্যমে তা এক নতুন অবয়ব লাভ করেছিল। পরবর্তীতে আব্বাসীয় বাগদাদ যখন সেই সিরিয়াক ও ফারসি ঐতিহ্যকে নিজের বুকে ধারণ করে আরবি লোগোস্ফিয়ারে বা ভাষার জগতে প্রবেশ করিয়েছিল, তখন গ্রিক চিন্তা কেবল সংরক্ষিতই হয়নি, বরং তা এক সম্পূর্ণ নতুন চরিত্র লাভ করেছিল। প্রাচীন গ্রিসের অবরোহনমূলক দর্শন ইসলামি সভ্যতার তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক কঠোরতার মধ্য দিয়ে পরিমার্জিত হয়ে এক অভূতপূর্ব আরোহনমূলক বা পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানে (ইন্ডাক্টিভ সায়েন্সে) রূপান্তরিত হয়েছিল। জ্ঞান যখন এক সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতায় স্থানান্তরিত হয়, তখন তার ভেতরের ভাষা, মেথডোলজি বা পদ্ধতি এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। বাগদাদের সেই রূপান্তরিত জ্ঞান আবার আন্দালুসিয়া, সিলিসি এবং টলেডোর অনুবাদকদের হাত ধরে ল্যাটিন খ্রিস্টান জগতে প্রবেশ করে ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল। এই দীর্ঘ পরিভ্রমণ প্রমাণ করে, জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির বন্দি খাঁচা নয়। এটি একটি অবিরত মহাজাগতিক আমানত, যা যোগ্যতার শর্তে এক হাত থেকে অন্য হাতে স্থানান্তরিত হয়।

    যখন কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা সমাজ তার কাছে থাকা ইলম ও হিকমা'র প্রকৃত কদর করতে ভুলে যায়, যখন তারা সত্যের অনুসন্ধান ছেড়ে অলসতা, অন্ধ অনুকরণ ও মনস্তাত্ত্বিক স্থবিরতায় নিমজ্জিত হয়, তখন জ্ঞান অত্যন্ত নীরবে তার আদি ধারকদের পরিত্যাগ করে। জ্ঞান এক প্রকার জীবন্ত সত্তার মতো আচরণ করে। যা নিজের বিকাশের জন্য সবসময় একটি মুক্ত, সাহসী এবং জিজ্ঞাসু পরিবেশ দাবি করে। যদি কোনো সমাজ নিজের ভেতরের জিজ্ঞাসাকে ভয় পেতে শুরু করে, চিন্তার দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়ে কেবল পূর্বপুরুষদের কিতাব মুখস্থ করার অলস আত্মতৃপ্তিতে ভোগে, তবে প্রজ্ঞা সেই সমাজকে এক গভীরতম অন্ধকারের মধ্যে ফেলে রেখে অন্য কোনো নতুন জনগোষ্ঠীর বুকে নিজের আশ্রয় খুঁজে নেয়। ইউরোপ যখন অন্ধকার যুগে চার্চের ধর্মতাত্ত্বিক গোঁড়ামির নিচে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন মুসলিম বিশ্ব ছিল জ্ঞানের প্রধান আলোকবর্তিকা। আবার মুসলিম মন যখন ফিকহ ও আকিদার আক্ষরিক তর্কে বন্দি হয়ে বাস্তব পৃথিবীর চ্যালেঞ্জগুলো থেকে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল, তখন ইউরোপ সেই পুরোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে লুফে নিয়ে আধুনিক পৃথিবীর স্রষ্টা সেজে বসল। এই স্থানান্তর প্রমাণ করে, প্রকৃতির দরবারে কোনো জাতির জন্য চিরস্থায়ী কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক একচেটিয়া অধিকার বা মনোপলি লিখে দেওয়া হয়নি।

    জ্ঞানের এই অবিনশ্বর প্রগতি ও ক্যাটাগরিক্যাল ট্রানজিশনকে বুঝতে হলে আমাদের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ও স্বাধীনতার সূক্ষ্ম রেখাটি চিনতে হবে। মানুষের তৈরি করা রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তি সাময়িকভাবে কোনো জ্ঞানকেন্দ্রকে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের সত্য-অন্বেষণের আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করতে পারে না। মঙ্গোলরা বাগদাদের রাজনৈতিক কাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল বটে, কিন্তু তারা মানুষের জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান বা চিকিৎসার জ্ঞানকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। বরং ধ্বংসকারী শক্তির ভেতরের সন্তানরাই এক সময় সেই পরাজিত সভ্যতার দ্বীন ও জ্ঞানকে নিজেদের মাথায় তুলে নিয়েছিল। জ্ঞান তার ধারকদের বদলায় বটে, কিন্তু নিজের অবিনশ্বর যাত্রাকে কখনো থামিয়ে দেয় না। আজকের একবিংশ শতাব্দীর এই কর্পোরেট ও ডিজিটাল যুগেও মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক পতন ঘটছে কেবল তার নিজস্ব অলসতা ও মেথডোলজিক্যাল ভীরুতার কারণে। আমরা আজ প্রচুর তথ্য বা ইনফরমেশন সংগ্রহ করছি, কিন্তু হিকমাহ বা প্রজ্ঞার দিক থেকে এক চরম খরায় ভুগছি। আমাদের পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার আজ আমাদের জন্য কোনো প্রেরণার উৎস না হয়ে, বরং অলস নস্টালজিয়ার একটি জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি আবার সেই অবিনশ্বর জ্ঞানের যোগ্য ধারক হতে চাই, তবে আমাদের চিন্তার এই পক্ষাঘাতগ্রস্ত দশা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সত্যের অবিনশ্বর নিয়মকে মেনে নিয়ে কঠোর তাত্ত্বিক শ্রমে আত্মনিয়োগ করতে হবে।

    আমানতের খেয়ানত এবং ‘এপিস্টেমিক ডিসপ্লেসমেন্ট’

    মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সভ্যতাগত পতনের মূল কারণ কোনো বাহ্যিক সামরিক আক্রমণ, রাজনৈতিক ধস কিংবা বাগদাদের মতো মহান নগরীর বস্তুগত ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে নিহিত ছিল না। এই ঐতিহাসিক পতনটি ছিল মূলত একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় এবং মেধার আমানতকে রক্ষা করতে না পারার এক অনিবার্য প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক শাস্তি। ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগে জ্ঞানচর্চা যখন তার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল, তখন উম্মাহর কাছে ওহী ও আকলের মিলবন্ধন ছিল একটি পবিত্রতম ‘আমানত’। কিন্তু পরবর্তীকালের চিন্তাবিদ, আলেম এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ যখন সময়ের সৃজনশীল মেজাজ অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন, তখন তারা ইলমকে বা প্রকৃত প্রজ্ঞাকে একটি চলিষ্ণু ও গতিশীল নদীর পরিবর্তে এক বদ্ধ ও নিথর জলাশয়ে পরিণত করলেন। তাঁরা জ্ঞান উৎপাদনের পরিবর্তে জ্ঞান চর্বন করতে লাগলেন। এই পদ্ধতিগত স্থবিরতা মানুষের মননজগতে এক প্রকাণ্ড ফাটল তৈরি করেছিল। যাকে তাত্ত্বিকভাবে ‘এপিস্টেমিক ডিসপ্লেসমেন্ট’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক স্থানচ্যুতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এই স্থানচ্যুতির ফলে প্রজ্ঞার অবিনশ্বর আলোটি তার পুরোনো ধারকদের সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে অন্য এক জনগোষ্ঠীর তাত্ত্বিক ময়দানে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। যা উম্মাহকে এক চিরস্থায়ী হীনম্মন্যতা ও মানসিক দাসত্বের শেকলে বন্দি করে ফেলে।

    এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্থানচ্যুতি ও অবক্ষয়ের মনস্তাত্ত্বিক রূপটি বুঝতে হলে আমাদের ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘এপিস্টেম’ (Episteme) ও ‘এপিস্টেমিক ব্রেক’-এর তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কটির সাহায্য নিতে হবে। ফুকো তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য অর্ডার অব থিংস’ বা ‘বস্তুর শৃঙ্খলা’ নামক গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ইতিহাসের প্রতিটি নির্দিষ্ট যুগে জ্ঞান উৎপাদনের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট অবচেতন ডিসকার্সিভ স্ট্রাকচার (আলোচনামূলক কাঠামো) বা ‘এপিস্টেম’ কাজ করে। এই এপিস্টেমকে যদি সহজভাবে বুঝতে চাই আমরা, তাহলে এটাকে কোনো নির্দিষ্ট যুগের ‘চিন্তার অপারেটিং সিস্টেম’-এর সঙ্গে তুলনা করা। যেমন উইন্ডোজ ৯৫ থেকে অ্যান্ড্রয়েড, প্রতিটি সিস্টেমের নিজস্ব একটা ভাষা ও গঠন থাকে। অথবা আরও স্পষ্ট করে যদি বলি, ধরা যাক আপনার হাতে একটি কুকি-কাটার বা ছাঁচ আছে। আপনি যদি হাতির ছাঁচে ময়দা কাটেন, প্রতিটি কুকি দেখতে হাতির মতোই হবে, আপনি চাইলেও সেটাকে বিড়ালের আকার দিতে পারবেন না। ফুকো বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি যুগের মানুষের মাথার ভেতরেও ঠিক তেমনি একটি অদৃশ্য ছাঁচ কাজ করে, যার নামই এপিস্টেম। আপনি যখন কোনো কথা বলেন, বিজ্ঞান চর্চা করেন বা কোনো সত্যকে স্বীকার করেন, আসলে আপনি ওই ছাঁচ অনুযায়ীই চিন্তা করেন, কিন্তু আপনি তা টেরও পান না। যেমন মাছ সাঁতার কাটে কিন্তু ‘জল’ বলে একটা কিছু আছে সেটা মাছ জানে না, তেমনই আমরা ওই এপিস্টেমের ভেতরে বসে ভাবি, কিন্তু সেটাকে প্রত্যক্ষ করি না।

    এই অদৃশ্য ছাঁচ বা অপারেটিং সিস্টেমটিই নির্ধারণ করে দেয়, একটি নির্দিষ্ট সমাজে কোন কথাটি বৈধ জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং কোন কথাটিকে ধর্মদ্রোহিতা বা পাগলামি বলে বর্জন করা হবে। ফুকো ঠিক এই প্রস্তাবনায় বসেই দেখিয়েছেন কীভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে ‘প্রতিনিধিত্ব’ থেকে ‘ইতিহাস’ ও শেষে ‘মানুষ’-এর ধারণাটি বদলে গেছে। আর সেই বদলের সঙ্গে সঙ্গে কোন কোন কথাকে ‘অজ্ঞান’ বা ‘অস্বাভাবিক’ বলে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বুঝতে আরেকটি উপমা দেওয়া যাক। ধরুন, ইউরোপ যেতে গেলে পাসপোর্টে ভিসা লাগে। ভিসা অফিস ঠিক করে দেয় কোন ডকুমেন্ট ‘বৈধ’, আর কোনটা ‘অবৈধ’। ঠিক তেমনই এই এপিস্টেম নামক ছাঁচটি সমাজের জন্য ঠিক করে দেয়, কোন কথাটা ‘বৈধ জ্ঞান’ (বিজ্ঞান, যুক্তি, সত্য) হিসেবে মর্যাদা পাবে, আর কোনটা ‘অবৈধ’ (ধর্মদ্রোহিতা, পাগলামি, কুসংস্কার) বলে বর্জিত হবে। যেমন, মধ্যযুগে জ্যোতিষশাস্ত্র ছিল অত্যন্ত সম্মানিত বিদ্যা। কারণ তখন পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্ব দেখা হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে তা ছদ্মবিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। এখানে সত্য পাল্টায়নি, পাল্টেছে সত্যকে চেনার সেই অদৃশ্য ছাঁচটি।

    এখন এই ছাঁচটিও যে চিরস্থায়ী নয়, তা বুঝতে ফুকো ‘এপিস্টেমিক ব্রেক’-এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যদিও ফুকো নিজে ‘ব্রেক’ শব্দটির চেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন ‘ডিসকন্টিনিউটি’ বা ‘অবিচ্ছিন্নতা’ শব্দটি। কথাটির মর্ম একটাই—ইতিহাসে হঠাৎ করে এই অপারেটিং সিস্টেম বদলে যায়। এর একটি চমৎকার উপমা হলো, হঠাৎ অ্যাপ আপডেটের বিষয়টি। ধরা যাক, কেউ তার পুরোনো উইন্ডোজ ৯৫-এ একটি ফাইল সেভ করল। বিশ বছর পর সেই একই ফাইল উইন্ডোজ ১১-এ খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু খুলছে না। দেখায় ‘ফরম্যাট সাপোর্টেড নয়’। আসল ফাইলটির ভেতরের লেখা অক্ষরে অক্ষরে একই থাকলেও, নতুন সিস্টেম তা ‘অস্বীকৃত’ বলে দেখায়। ঠিক তেমনই কোনো যুগের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতের লেখাও পরবর্তী যুগে এসে ‘অর্থহীন’ বা ‘অদ্ভুত’ প্রতিভাত হয়। ষোড়শ শতকে কোপার্নিকাস যখন বললেন, “সূর্য স্থির, পৃথিবী ঘোরে”, তখন পুরোনো এপিস্টেমের চোখে এটি ছিল পাগলামি কিংবা ধর্মদ্রোহিতা। কিন্তু নতুন এপিস্টেমে তা বিজ্ঞানের ভিত্তি হয়ে গেল। এই বদল রাতারাতি ঘটেনি। ফুকোর মতে, এই দুই এপিস্টেমের মাঝে একটা গভীর ‘বিচ্ছিন্নতা’ কাজ করে। কারণ এক যুগের যুক্তি ও ভাষার গঠন যখন অন্য যুগে এসে দাঁড়ায়, তখন সেগুলো সরাসরি পরস্পরকে বোঝাতে পারে না।

    কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতার মানে কী? ধরুন, কোপার্নিকাস যখন প্রথম বললেন ‘সূর্য স্থির, পৃথিবী ঘোরে’, তখন সেদিনই মানুষ বলে ওঠেনি, “বাহ, কী সুন্দর কথা!” উল্টো তাঁকে বোকা বা পাগল ভাবা হয়েছিল। এই নতুন চিন্তাটিকে সমাজ বুঝতে, হজম করতে, মেনে নিতে লেগেছে কয়েক পুরুষ। অনেক বিতর্ক, অনেক নিন্দা-বিদ্রূপ। কিন্তু একসময় না একসময় সেটি চূড়ান্তভাবে মেনে নেওয়া হলো। তারপর যখন আমরা নতুন যুগে দাঁড়াই, তখন হঠাৎ করে মনে হয়—ইশ, আগের যুগের মানুষগুলো কী অন্ধকারে ছিল! কিন্তু ফুকো বলছেন, বিষয়টা সেভাবে ধীরে ধীরে মসৃণভাবে ঘটে না। বরং মনে হয় যেন একদিন আগের সব ‘পুরোনো’ আর পরের দিন সব ‘নতুন’ হয়ে গেল। যদিও সেটি আসলে রাতারাতি হয়নি, কিন্তু ফলাফলটা দাঁড়ায় হঠাৎ এক লাফের মতো।

    তাই এখানে বিচ্ছিন্নতা মানে একটানা ধারাবাহিকতা না থেকে বরং একটা ফাঁক বা গ্যাপ তৈরি হওয়া। এই গ্যাপটাকে ভাবুন দুটি দ্বীপের মতো। একটি দ্বীপে মানুষ কথা বলে বাংলায়, আরেকটিতে কথা বলে চীনা ভাষায়। তাদের মধ্যে যদি কোনো সেতু বা নৌকা না থাকে, তাহলে একদল আরেকদলকে বুঝতেই পারে না। ঠিক তেমনি পুরোনো যুগের ‘এপিস্টেম’ আর নতুন যুগের ‘এপিস্টেম’-এর মাঝেও কোনো মসৃণ সেতু থাকে না। ফুকো বলেন, এরা একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হাঁটে না; বরং এদের মাঝে একটা গভীর খাদ বা ফাটল তৈরি হয়।

    এটা বোঝার জন্য আরেকটি মজার উপমা দেখা যাক। ধরুন, আপনার হাতে একটা পুরোনো মিশরীয় প্যাপিরাস আছে। যেখানে বাংলা বা ইংরেজি অক্ষরে কিছু লেখা নেই। বরং আছে নানা রকম ছবি—পাখির ছবি, চোখের ছবি, সাপের ছবি (হায়ারোগ্লিফ)। ওগুলোই আসলে তাদের লিখিত ভাষা। এখন আপনি যদি ওই ছবিগুলোকে আমাদের মতো অক্ষর ভেবে পড়তে যান, তাহলে কিছুই বুঝবেন না। কারণ ওদের ভাষার নিয়মই আলাদা। তেমনই মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত অ্যাকুইনাস যদি আমাদের আধুনিক পদার্থবিদ্যার বই পড়েন, তিনি ভাববেন এগুলো জাদুবিদ্যা। কারণ তাঁর কাছে ‘বস্তু’, ‘গতি’, ‘কারণ’—এই শব্দগুলোর অর্থ ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম।

    ফুকো বলেন, দুই এপিস্টেম বা জ্ঞানতত্ত্বীয় ছাঁচে যে 'বিচ্ছিন্নতা' কাজ করে, সেখানে দুই সময়ের ‘যুক্তি ও ভাষাই হয় আলাদা’। আর এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন দাবা খেলা আর ফুটবল খেলার মধ্যে তুলনা করুন। দাবায় আপনি চাল দেন, আর ফুটবলে আপনি বল লাথি মেরে গোল দেন। দাবার ‘যুক্তি’ হলো পনেরোটি গুটি নিয়ে পরিকল্পনা করা। ফুটবলের ‘যুক্তি’ হলো এগারো জন মিলে টিমওয়ার্ক করা। এখন একজন দাবা খেলোয়াড় যদি ফুটবল মাঠে গিয়ে হাত দিয়ে বলে কিক দিতে চান বা ফুটবল খেলোয়াড় যদি দাবার বোর্ডে পা দিয়ে গুটি চালতে চান, তাহলে তাঁরা দুজনেই হাস্যকর হয়ে যাবেন। তেমনই প্রতিটি যুগের নিজস্ব ‘মানসিক খেলার নিয়ম’ আছে। ফুকো বলছেন, যখন সেই নিয়মগুলো এক যুগ থেকে অন্য যুগে বদলে যায়, তখন আগের যুগের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষটিও নতুন যুগের কাছে অদ্ভুত লাগে। কারণ তাঁর ‘যুক্তি’ আর ‘ভাষা’— দুটোই বদলে গেছে। তাই পুরোনো বইগুলো আমরা পড়তে পারি, কিন্তু সেই বইয়ের লেখকের মতো করে ‘অনুভব’ করতে পারি না। সেটাই ফুকোর ‘বিচ্ছিন্নতা’, এপিস্টেমিক ব্রেক বা জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাঙন (Michel Foucault, The Order of Things: An Archaeology of the Human Sciences, pp. xxi-xxiv)। ইসলামি চিন্তার ইতিহাসে এই এপিস্টেমিক ব্রেক বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বড় ধরনের ফাটলটি তৈরি হয়েছিল তখন, যখন মুসলিম উলামা ও চিন্তাবিদদের একটি বড় অংশ ইজতিহাদ বা স্বাধীন সৃষ্টিশীল গবেষণার দরজাটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, অতীতের ইমামদের তৈরি করা নির্দিষ্ট ফিকহী বা কালামী সিদ্ধান্তগুলোকে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় মনে করে অন্ধভাবে অনুকরণ করাই হয়তো দ্বীন রক্ষা করার একমাত্র পথ। ফুকোর এই সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদ আমাদের দেখায়, যখন কোনো সমাজ তার ভেতরের জ্ঞান উৎপাদনের স্বাধীন এজেন্সিকে রাষ্ট্র বা প্রথার অন্ধ আনুগত্যে সঁপে দেয়, তখন সেই সমাজে প্রকৃত প্রজ্ঞার অবসান ঘটে এবং জ্ঞান কেবল ক্ষমতার ও ঘরানার এক নিস্তেজ অলঙ্কারে পরিণত হয়।

    আসাবিয়াহ ও সভ্যতার চক্র : ইবনে খালদুনের দৃষ্টিতে উত্থান-পতনের অমোঘ নিয়ম

    এই প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক পতনের অমোঘ ঐতিহাসিক নিয়মটি প্রাচ্যের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের ‘আসাবিয়াহ’ (সমষ্টিগত সংহতি বা আমরা-বোধ) ও সভ্যতার জৈবিক বিবর্তনের তত্ত্বের মধ্য দিয়ে আরও বেশি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। ইতিহাসের গভীরে পরতে-পরতে হাঁটলে এর প্রতিটি বাঁকে নিত্যনতুন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটি সাম্রাজ্য, প্রতিটি সভ্যতারই একটি নির্দিষ্ট আয়ু আছে। জন্ম, বিকাশ, পরিণতি এবং শেষে পতন। এই চক্রটি যেন মানবসভ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চতুর্দশ শতাব্দীতে এই সত্যকে যিনি সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণের আওতায় এনেছিলেন, তিনি হলেন আরব বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তক ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রিস্টাব্দ)। একসময় রাজনীতির ক্লান্তিকর জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি ১৩৭৫ সালে ইবনে সালামার দুর্গে আশ্রয় নেন। দুর্গটি বর্তমান আলজেরিয়ার ফ্রেন্দা (Frenda) শহরের কাছে, তিয়ারেত (Tiaret) অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত ও সুরক্ষিত স্থানে অবস্থিত। সেখানেই তিনি প্রায় চার বছর (১৩৭৫-১৩৭৯) নিরিবিলি পরিবেশে কাটিয়ে তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমা’ রচনা করেন (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, অনুবাদ: গোলাম সামদানী কোকাহাশী, বাংলা একাডেমী, পৃ. ৩৪-৩৫)। ইবনে খালদুন তাঁর অমর গ্রন্থ ‘মুকাদ্দিমা’ বা ‘ইতিহাসের ভূমিকা’য় দেখিয়েছেন, প্রতিটি মানবীয় সমাজ বা সভ্যতার উত্থান ও পতন একটি সুনির্দিষ্ট জৈবিক চক্রের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়। কোনো জাতির উত্থান-পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সুস্পষ্ট জৈবিক ও সামাজিক নিয়মের অনুসরণ করে।

    ইবনে খালদুনের মতে, প্রতিটি সভ্যতার মূলে কাজ করে একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী শক্তি, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘আসাবিয়াহ’ (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫১)। এই আরবি শব্দটির অর্থ ‘সামাজিক সংহতি কিংবা সমষ্টিগত সংহতি’, ‘গোত্রপ্রীতি’ ‘সমষ্টিগত চেতনা’, 'আমরা-বোধ' বা 'আমরা-চেতনা'। কিন্তু ইবনে খালদুন এটিকে আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাছে আসাবিয়াহ হলো, মানুষের সমাজবদ্ধ জীবনের বিকাশ এবং একক মানুষ থেকে সমাজ বিকাশের প্রাথমিক স্তর (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫১)।

    সহজ ভাষায়, আসাবিয়াহ হচ্ছে সেই সমষ্টিগত প্রাণশক্তি, পারস্পরিক বিশ্বাস ও সংহতির বন্ধন, যা একটি দলকে একত্রিত করে এবং তাদেরকে অন্য দলের ওপর বিজয়ী হতে সাহায্য করে। এটি কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়; বরং একই লক্ষ্য, একই সংগ্রাম ও একই জীবনধারার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক ধরনের ‘আমরা’ বোধ। ইবনে খালদুনের ভাষায়, “এই গোত্রীয় সংহতিই মানুষের সমাজ বিকাশের প্রাথমিক স্তর” (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫১)।

    মরুভূমির নিষ্ঠুর পরিবেশ যখন পারস্পরিক দায়িত্ব ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সামাজিক কাঠামো দাবি করে, তখন যাযাবর জাতিগুলোর মধ্যে আসাবিয়াহ তার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপে দেখা দেয়। এই সংহতিই তাদেরকে ক্ষমতার দিকে চালিত করে এবং তাদেরকে নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। একটি জাতি যখন মরুভূমির কঠোর পরিশ্রম ও সমষ্টিগত সংহতি বা আসাবিয়াহর শক্তি নিয়ে বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তারা নতুন সাম্রাজ্য ও নতুন জ্ঞানভাষা তৈরি করে। ইবনে খালদুনের মতে, ধর্ম আসাবিয়াহকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। যখন গোত্রীয় সংহতি ধর্মীয় শক্তির সাথে মিলিত হয়, তখন তা একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠায় অনুঘটকের কাজ করে (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫২)।

    ইবনে খালদুন মানবসভ্যতাকে একটি জীবন্ত প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন একটি প্রাণীর জন্ম, যৌবন, বার্ধক্য ও মৃত্যু আছে, তেমনি প্রতিটি সভ্যতাও একটি নির্দিষ্ট চক্রের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। এই চক্রের দুটি প্রধান পর্যায় তিনি চিহ্নিত করেছেন, ‘বাদাওয়া’ (যাযাবর জীবন) ও ‘হাদারাহ’ (নাগরিক জীবন) (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫১)।

    প্রথম পর্যায়, বাদাওয়া বা যাযাবর জীবন—এটি সভ্যতার শৈশবকাল। এই সময় মানুষ মরুভূমি বা প্রান্তরের কঠোর পরিবেশে বাস করে। তাদের জীবন সরল, কষ্টসহিষ্ণু ও পরিশ্রমী। প্রয়োজনের তাগিদে তারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল, যা আসাবিয়াহকে শক্তিশালী করে তোলে। ইবনে খালদুনের মতে, এই কঠোর জীবনযাপনই তাদের দেহ ও মনকে শক্ত করে এবং তাদেরকে বিজয়ী জাতিতে পরিণত করে (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫১-৫২)। কষ্টই মানুষকে স্বস্তির জীবন গঠনের উপযুক্ত পরিশ্রমী ও প্রতিকূলতা সহিষ্ণু করে তোলে। ফলে তারা ঘাবড়ে না গিয়ে অকল্পনীয় লক্ষ্যভেদী অভিযাত্রায় পাল উড়াতে পারে। বিজয়ের দিগন্তে এবং নতুন সম্ভাবনা ও নয়া দুনিয়ার বন্দরে নোঙ্গর করতে পারে। কারণ, সে জাতি এই পথ অতিক্রমের সমূহ কষ্ট হজম করার শক্তি অর্জন করে নেয়। ফলে হাল ছাড়ে না, কারও নিরুৎসাহিত করার দ্বারা উৎসাহও হারায় না, রিস্ক নিতে ভয় পায় না। বিজয় অনিবার্য হয়ে তাদের পদচুম্বন করে।

    দ্বিতীয় পর্যায়, হাদারাহ বা নাগরিক জীবন। যখন যাযাবর জাতি বিজয় লাভ করে এবং সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, তখন তারা ধীরে ধীরে নগরে বসবাস শুরু করে। এখানে আসে বিলাসিতা, আরাম-আয়েস ও প্রাচুর্য। এই পর্যায়ে সভ্যতা তার যৌবন ও পরিণতি লাভ করে। গড়ে ওঠে বিশাল নগর। বিকাশ লাভ করে শিল্প-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান। নাগরিক সভ্যতাই যাযাবর জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৪)। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে পতনের বীজ।

    ইবনে খালদুনের সবচেয়ে গভীর ও প্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ হলো, কীভাবে একটি বিজয়ী জাতি ধীরে ধীরে তার মূল শক্তি হারায়। তাঁর মতে, পতনের সূচনা হয় যখন, তখন প্রতিটি সভ্যতার নেপথ্য কারণগুলো অত্যন্ত কমন ও সাধারণ।

    প্রথমত, পরবর্তী প্রজন্ম আর মরুভূমির কঠোর পরিশ্রমের অভিজ্ঞতা লাভ করে না। তারা রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা, অলসতা ও আয়েশ-আরামে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫১-৫২)। ইবনে খালদুন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যখন তাদের ওপর বিলাস-ব্যসনের প্রভাব পড়ে এবং বিভিন্ন জাতির লুণ্ঠিত দ্রব্য তাদের মধ্যে সঞ্চালিত হয়, তখন তারা জীবনের ভোগ-সম্ভোগ ও অবসর বিনোদনের প্রতি আকৃষ্ট হয়” (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ২য় খণ্ড, অনুবাদ: গোলাম সামদানী কোরায়শী, বাংলা একাডেমী, পৃ. ৯৩)।

    দ্বিতীয়ত, তারা পূর্ববর্তীদের সৃষ্টিশীলতা ও মৌলিকত্ব হারিয়ে ফেলে এবং কেবল ‘চর্বিতচর্বণের’ অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৯)। তাদের মধ্যে আর নতুন কিছু সৃষ্টির প্রাণশক্তি থাকে না।

    তৃতীয়ত, সমাজের মধ্যে বিভেদ ও স্বার্থপরতা দেখা দেয়। আসাবিয়াহ বা সমষ্টিগত সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তিস্বার্থই প্রধান হয়ে ওঠে। একসময় সেই সংহতি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়, যা ছিলো তাদের সুখময় দিনের এবং বিজয়ের মূল চাবিকাঠি (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫১)।

    ফলে, যে শক্তি একদিন তাদেরকে বিজয়ী করেছিল, সেই শক্তিই এখন তাদের দুর্বল করে দেয়। বিলাসিতা তাদেরকে "অলস" করে তোলে। বিভেদ তাদেরকে "দুর্বল" করে দেয়। আর অনুকরণ তাদেরকে "সৃজনশীলতাহীন" করে ফেলে। সময়ের ব্যবধানে সেই বিজয়ী জাতির পরবর্তী প্রজন্ম যখন রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা, অলসতা এবং চর্বিতচর্বনের অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের ভেতরের সেই মৌলিক সৃষ্টিশীল প্রাণশক্তি বা আসাবিয়াহ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর তখনই ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে নতুন এক যাযাবর জাতির, যাদের আসাবিয়াহ এখনও সতেজ ও অক্ষত (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫২)।

    ইবনে খালদুনের এই বিশ্লেষণ আমাদেরকে ইতিহাসের এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তিনি দেখান, “নাগরিক সভ্যতাই সভ্যতার শেষ পর্যায়। কারণ জীবন বিকাশের স্বাভাবিক আকর্ষণে মানুষের অগ্রগতি এখানেই এসে স্থিতি লাভ করে এবং পুনরায় সে তার পূর্বাবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে” (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৪)।

    অর্থাৎ, প্রতিটি সভ্যতাই একটি পূর্ণ চক্র অতিক্রম করে—জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। এই চক্র এড়ানোর কোনো উপায় নেই, কারণ এটি মানুষের স্বভাবের মধ্যেই নিহিত। ইবনে খালদুনের ভাষায়, “মানুষের জীবনের যেমন বিকাশ ও সমাপ্তি আছে, তেমনি তার সভ্যতারও বিকাশ ও সমাপ্তি বিদ্যমান” (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৪)। অন্যভাষায়, মৌসুমের বিবেচনায় এই অঞ্চল ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যে ধন্য হলেও, বস্তুত পুরো পৃথিবীর কাছে ঋতু চারটি—বসন্তকাল, গ্রীষ্মকাল, শরৎ-হেমন্তকাল এবং শীতকাল। মানুষের ব্যক্তিজীবন কিংবা একটি ঘর, একটি পরিবার, একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা যেকোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা—সবকিছুই আসলে এই চার অবস্থার অমোঘ চক্রের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে।

    আমাদের জীবনের চঞ্চল আর সম্ভাবনাময় শুরুটা যেন বসন্তকাল; এরপর যৌবনের তেজ ও কঠোর সংগ্রামের দিনগুলো নিয়ে আসে গ্রীষ্মকাল; জীবনের পরিপক্কতা, অভিজ্ঞতা আর ফল কাটার সময়টি হলো শরৎ-হেমন্তকাল; আর শক্তি কমে আসা, স্থবিরতা বা অবসানের শেষ অধ্যায়টি হলো শীতকাল। জীবনের প্রতিটি ঘটনা এবং উত্থানপতনেও গভীরভাবে তাকালে এই চক্রের আবর্তন দেখা যায়। এই চক্রের নিয়মেই "চিরকাল কাহারও সমান নাহি যায়; আজকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়"। এই জীবনচক্র আমাদের শেখায় বিপদে হাল না ছাড়তে। জীবনের রুক্ষতা দেখে ভয় না পেতে। কারণ, শীতের পাতাঝরা যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি দুঃখের রাতও অনন্তকাল থমকে থাকে না। এই দুঃখ জর্জরিত সময়টাই মূলত আমাদের সেই যাযাবর জীবন, যা প্রস্তুত করে মানুষকে হাড়ভাঙা খাটুনি খেঁটে সুখের দিনের নাগাল পেতে। প্রতিটি ঘন কালো মেঘের আড়ালেই যেমন সূর্য হাসে, তেমনি জীবনের চাকা আজ যেখানে নিচে নেমেছে, প্রকৃতির নিয়মে কাল তা আবার উপরে উঠবেই। ইবনে খালদুনের এই চিরায়ত নীতি আমাদের সামনে জীবনের সেই সত্যের দুয়ার খোলে দেয়।

    ইবনে খালদুন আরও দেখিয়েছেন, ধর্ম আসাবিয়াহকে শক্তিশালী করতে পারে। যখন গোত্রীয় সংহতি ধর্মীয় শক্তির সাথে মিলিত হয়, তখন তা একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠায় অনুঘটকের কাজ করে (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫২)। কিন্তু ধর্মও আসাবিয়াহকে চিরস্থায়ী করতে পারে না। কারণ নগরজীবনের বিলাসিতা শেষ পর্যন্ত সেই সংহতিকে ক্ষয় করে দেয়।

    ফুকো ও ইবনে খালদুনের সংশ্লেষ : বুদ্ধিবৃত্তিক পতনের নির্ণয়

    ফুকো বলেছেন, কোনো সমাজে কী 'সত্য' বা 'বৈধ জ্ঞান' হিসেবে গণ্য হবে, তা নির্ধারণ করে একটি অদৃশ্য 'এপিস্টেম' (অপারেটিং সিস্টেম/ছাঁচ)। এই এপিস্টেম কিন্তু নিরপেক্ষ নয়; এটি ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে জড়িত। যারা এপিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই জ্ঞানের সীমানা নির্ধারণ করে।

    ইবনে খালদুন বলেছেন, একটি জাতির উত্থান নির্ভর করে 'আসাবিয়াহ' (সমষ্টিগত সংহতি, প্রাণশক্তি, কঠোর পরিশ্রম) এর ওপর। যখন এই আসাবিয়াহ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় (বিলাসিতা, অলসতা, অন্ধ অনুকরণ ইত্যাদির কারণে), তখন সভ্যতার পতন ঘটে।

    আসাবিয়াহ-এর ক্ষয় শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক পতন আনে না; এটি "জ্ঞান উৎপাদনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকেও" ধ্বংস করে। যখন একটি সমাজ অলস ও অনুকরণপরায়ণ হয়ে পড়ে, তখন সে নিজের এপিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস হারায়। ফলে জ্ঞান স্থবির হয়ে যায়, 'ক্ষমতা' (রাজনৈতিক আধিপত্য) তার হাতছাড়া হয়, এবং অন্য একটি সতেজ আসাবিয়াহ-সম্পন্ন জাতি এসে নতুন এপিস্টেম ও নতুন ক্ষমতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ, জ্ঞান ও ক্ষমতা—উভয়ই আসাবিয়াহ-এর ওপর নির্ভরশীল। আসাবিয়াহ থাকলে জ্ঞান সৃজনশীল হয় এবং ক্ষমতা টিকে থাকে। আসাবিয়াহ না থাকলে জ্ঞান চর্বিতচর্বণে পরিণত হয় এবং ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায়।

    ফুকোর সেই ‘জ্ঞান ও ক্ষমতা’র নিখুঁত সংযোগ এবং ইবনে খালদুনের ‘আসাবিয়া'র ক্ষয়’-এর এই যৌথ তাত্ত্বিক সংশ্লেষ আমাদের সমকালীন উম্মাহর আসল মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতটি চিনিয়ে দেয়। ইবনে খালদুনের সমাজবৈজ্ঞানিক সূত্রটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, আমাদের পূর্বসূরিরা যখন ইলমকে বা জ্ঞানকে সময়ের প্রবহমান নদীর সাথে মেলাতে না পেরে তাকে কেবল পূর্বপুরুষদের মেধার এক অন্ধ ‘নকলনবিশে’ পরিণত করেছিলেন, তখনই জ্ঞান তার এই অযোগ্য ধারকদের পরিত্যাগ করেছিল। পরাজয়ের পর একজন ‘খলনায়ক’ বা ‘বাহ্যিক ষড়যন্ত্র’ খোঁজার যে অন্ধ প্রবণতা আমাদের সমাজে রয়েছে, তা মূলত আমাদের নিজস্ব কাঠামোগত দুর্বলতা ও আমানতের খেয়ানতকে আড়াল করার এক অলস মনস্তাত্ত্বিক কৌশল মাত্র। ষড়যন্ত্র হয়তো ইতিহাসে থাকে, কিন্তু ভেতরের বুদ্ধিবৃত্তিক ঘর নড়বড়ে না হলে বাইরের কোনো ঝড় বা হাওয়া তাকে সহজে উড়াতে পারে না। আমরা যখন নিজেদের অর্জিত হিকমা'র বা প্রজ্ঞার আমানতকে অবহেলা করে তাকে কেবল সংকীর্ণ অনুকরণের পাতায় বন্দি করে ফেললাম, তখন প্রকৃতি তার শাশ্বত নিয়মে আমাদের হাত থেকে বিশ্বসভ্যতার নেতৃত্বের লাগাম কেড়ে নিয়েছিল। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ধস ছিল না, এটি ছিল একটি প্রাজ্ঞ ও অপরাজেয় সভ্যতার ভেতরের ‘রূহ’ বা আত্মিক তেজ হারিয়ে ফেলার এক অনিবার্য পরিণতি। সমকালীন জরাগ্রস্ত ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত উম্মাহর দিকে তাকালে তা এক নির্মম সত্য হিসেবে স্পষ্ট প্রতিভাত হয়।

    শতাব্দী পরেও ইবনে খালদুনের এই বিশ্লেষণ আমাদের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যে কোনো শক্তিশালী জাতি, প্রতিষ্ঠান বা সমাজ যখন তার মৌলিক আদর্শ ও সংহতি হারিয়ে ফেলে, যখন কঠোর পরিশ্রমের পরিবর্তে বিলাসিতা প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তার পতন অনিবার্য। ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাই—রোম সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আব্বাসীয় খিলাফত, মোগল সাম্রাজ্য থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য—প্রত্যেকটি শক্তিই একসময় এই আসাবিয়াহ হারানোর কারণেই দুর্বল হয়েছে (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৭)।

    ইবনে খালদুন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, সভ্যতার স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার সেই মৌলিক প্রাণশক্তি টিকিয়ে রাখার ওপর, যা তাকে একসময় মহান করেছিল। আর এই প্রাণশক্তি টিকে থাকে কঠোর পরিশ্রম, সমষ্টিগত সংহতি ও সৃজনশীল চিন্তার মধ্য দিয়ে। বিলাসিতা ও চর্বিতচর্বণের অনুকরণে নয় (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৯; ২য় খণ্ড, পৃ. ৯৩)।

    ধারকদের পুনর্জন্ম—কান্নার নস্টালজিয়া থেকে শ্রমের ময়দানে

    একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক ও প্রযুক্তি-নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মুসলিম উম্মাহর তরুণ প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ হলো, অতীতকে নিয়ে কেবল অলস গৌরবগাথা গাওয়ার এক আত্মঘাতী মোহ থেকে নিজেদের মুক্ত করা। আমাদের সমকালীন সমাজ মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক অবশ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত নস্টালজিয়ায় ভুগছে। যেখানে ফেলে আসা সোনালি যুগের কিতাব বা লাইব্রেরির ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করাকেই একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কোনো জীবন্ত বা অপরাজেয় জাতি কেবল অতীতের জাদুঘর পাহারা দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে না। পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া মহান উত্তরাধিকার বা হেরিটেজের আসল অর্থ এই নয়, আমরা বর্তমানে হাত গুটিয়ে বসে কেবল তাদের নাম জপ করব। প্রকৃত উত্তরাধিকারী হওয়ার অর্থ হলো অতীতের সেই গতিশীল স্পিরিট বা প্রাজ্ঞ প্রাণশক্তিকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের নতুন জ্ঞান-ইমারত গড়ার প্রধান চালিকাশক্তি ও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা। জ্ঞান কোনো মৃত বা স্থির বস্তু নয় যে, একে শতাব্দীর স্তূপের নিচে বন্দি করে রাখা যাবে। এটি একটি অবিরত সংগ্রাম, যা কেবল তখনই নিজের পুনর্জন্ম ঘটায় যখন তার ধারকরা অলসতা ও মনস্তাত্ত্বিক ভীরুতা ভেঙে বাস্তব পৃথিবীর কঠোর তাত্ত্বিক শ্রমের ময়দানে আত্মনিয়োগ করে।

    ইবনে খালদুনের আসাবিয়াহ ও সভ্যতার চক্র, ফুকোর এপিস্টেম ও জ্ঞান-ক্ষমতার সম্পর্ক, এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণগুলি আমাদের সামনে এক গভীর সত্য উন্মোচিত করেছে। জ্ঞান তার ধারকদের বদলায়, কিন্তু নিজে কখনো বিলুপ্ত হয় না। তবে এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিভ্রমণ ও পুনর্জন্মের প্রক্রিয়াটি যে কেবল একটি বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা, তা নয়। এর একটি বাস্তব, কার্যকরী ও প্রায়োগিক দিকও রয়েছে। কীভাবে একটি সভ্যতা তার হারানো জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে ফিরে পেতে পারে? কীভাবে একটি জাতি আবার সেই অবিনশ্বর জ্ঞানের যোগ্য ধারক হয়ে উঠতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সামনে আসে সমকালীন ফরাসি দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ব্রুনো লাতুরের যুগান্তকারী তত্ত্ব।

    এই বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ ও মানুষের নিজস্ব এজেন্সির বা সামর্থ্যের গভীর মেকানিজমটি বুঝতে হলে আমাদের সমকালীন মরক্কো বংশোদ্ভূত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ব্রুনো লাতুরের বিখ্যাত ‘অ্যাক্টর-নেটওয়ার্ক থিওরি’ (Actor-Network Theory) বা এএনটি ফ্রেমওয়ার্কটির সাহায্য নিতে হবে। লাতুর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘উই হ্যাভ নেভার বিন মডার্ন’ বা ‘আমরা কখনো আধুনিক ছিলাম না’ নামক তাত্ত্বিক কাজে দেখিয়েছেন, এই মহাবিশ্বের কোনো বস্তুই বা কোনো জ্ঞানই বিচ্ছিন্ন কোনো শূন্যস্থানে একা টিকে থাকে না। সত্য বা জ্ঞান উৎপাদন মূলত মানুষ এবং মানুষের তৈরি করা বিভিন্ন বস্তুগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের এক জটিল যুগলবন্দীর ফল। যাকে তিনি ‘অ্যাসোসিয়েশন অব হিউম্যান অ্যান্ড নন-হিউম্যান অ্যাক্টরস’ (মানব ও মানবেতর অনুঘটকদের সংগঠন) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Bruno Latour, We Have Never Been Modern, pp. 10-15)।

    লাতুরের এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, কোনো কিছুই নিজে নিজে 'সত্য' বা 'জ্ঞান' হয়ে ওঠে না। একটি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত, একটি দার্শনিক ধারণা বা একটি সভ্যতার চিন্তাধারা—সবকিছুই তৈরি হয় মানুষের পারস্পরিক আলোচনা, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-কানুন, লিখিত দলিল, গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি, এমনকি প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতি, এই সবকিছুর মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। লাতুর এই সবকিছুকে 'অ্যাক্টর' বা 'অনুঘটক' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একজন বিজ্ঞানী যেমন একজন অ্যাক্টর, তেমনি তাঁর ব্যবহৃত মাইক্রোস্কোপও একজন অ্যাক্টর। একটি গ্রন্থাগার যেমন একজন অ্যাক্টর, তেমনি সেই গ্রন্থাগারের ক্যাটালগ বা শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতিও একজন অ্যাক্টর। এই সব অ্যাক্টররা একত্রে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে এবং এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই জ্ঞানের জন্ম হয়, জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে এবং জ্ঞান টিকে থাকে।

    ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বায়তুল হিকমাহ ছিল ঠিক এমন একটি নেটওয়ার্ক। যেখানে গ্রিক, ফারসি, সিরিয়াক ও ভারতীয় জ্ঞানের সমন্বয়ে এক নতুন জ্ঞান-ইমারত গড়ে উঠেছিল। সেখানে ছিলেন অনুবাদক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, গ্রন্থাগারিক, পৃষ্ঠপোষক খলিফা—সবাই একত্রে একটি গতিশীল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। কিন্তু যখন এই নেটওয়ার্কটি ধ্বংস হলো, যখন অনুবাদ বন্ধ হলো, গবেষণার বদলে মুখস্থীকরণ শুরু হলো, পৃষ্ঠপোষকতা স্থবির হয়ে গেল—তখন জ্ঞানও সেখান থেকে সরে গেল। লাতুরের ভাষায়, নেটওয়ার্ক ভেঙে গেলে জ্ঞানও ভেঙে যায়।

    আমরা যদি আবার জ্ঞানের যোগ্য ধারক হতে চাই, তবে আমাদের নতুন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। শুধু পুরোনো কিতাব পড়লেই হবে না; শুধু অতীতের গৌরবগাথা গাইলেই হবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি জীবন্ত, গতিশীল ও উন্মুক্ত জ্ঞান-নেটওয়ার্ক। যেখানে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, গ্রন্থাগার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, প্রকাশনা সংস্থা, এমনকি সমাজের সাধারণ মানুষ—সবাই একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি জ্ঞান-ইকোসিস্টেম তৈরি করবে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই আমরা আবার সেই অবিনশ্বর জ্ঞানের ধারক হতে পারব। এটি ফুকোর এপিস্টেমিক ব্রেককে অতিক্রম করার এবং ইবনে খালদুনের আসাবিয়াহকে পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকরী কাঠামো। লাতুর আমাদের দেখান, জ্ঞান কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়—এটি একটি বাস্তব নির্মাণ, যা সঠিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে।

    লাতুরের এই শক্তিশালী তত্ত্ব আমাদের আজ এক নতুন আলোর দিকে নিয়ে যায়। আমাদের নতুন বায়তুল হিকমা'র স্বপ্ন কেবল কোনো বায়বীয় বা রোমান্টিক ধারণা দিয়ে বাস্তবে রূপ লাভ করবে না। এর জন্য আমাদের এমন এক বাস্তবধর্মী নেটওয়ার্ক বা প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষের প্রাজ্ঞ মনন, ওহীর স্ফটিকস্বচ্ছ আলো, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রতিটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।

    লাতুর তাঁর অন্য এক যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘রিঅ্যাসেম্বলিং দ্য সোশ্যাল’ বা ‘সামাজিকতার পুনর্গঠন’ নামক তাত্ত্বিক কাজে আরও স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, কোনো সমাজ যখন তার নিজের ভেতরের এই নেটওয়ার্ক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগগুলো হারিয়ে ফেলে, তখন তার পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। একটি জীবন্ত সংস্কৃতির কাজ হলো অনবরত নতুন নতুন জ্ঞান উপাদান সংগ্রহ করা, তাকে নিজের ভাষায় অনুবাদ করা এবং সমকালীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের তাত্ত্বিক কাঠামোকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলা (Bruno Latour, Reassembling the Social: An Introduction to Actor-Network-Theory, pp. 43-52)। মুসলিম মনস্তত্ত্ব আজ ঠিক এই প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগটিই পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। একদল তরুণ ডিজিটাল নোটিফিকেশন আর কর্পোরেট পুঁজিবাদের চটকদার মায়াজালে বন্দি হয়ে নিজেদের সভ্যতার শিকড় কেটে ফেলার নাম দিয়েছে মুক্তচিন্তা। অন্যদল ধর্মীয় ভীরুতা ও সংকীর্ণতার কারণে তরুণদের যেকোনো জেনুইন জিজ্ঞাসা বা যৌক্তিক প্রশ্ন দেখলেই ফতোয়ার কামান নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যুগ-জিজ্ঞাসা এবং যুগের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে অনুকূল পরিবেশ গঠনের বিপরীতে, পশ্চাৎপদতার প্রতিকূলতাকে আলিঙ্গনের বিনাশী অভিলাষকে 'ইস্তেকামত' (দ্বীনের ওপর অটল-অবিচল থাকা) ভাবা হচ্ছে। এই দুই চরমপন্থার কারণে সমাজে এমন এক প্রকাণ্ড বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা তরুণদের মনকে এক স্থায়ী বৈশ্বিক অরাজকতা ও নাস্তিক্যবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই খাঁচা ভাঙার একমাত্র উপায় হলো লাতুরের সেই নেটওয়ার্কিং এজেন্সিকে জাগ্রত করে পুনরায় এক স্বাধীন ও বিকেন্দ্রীভূত জ্ঞান-অবকাঠামো গড়ে তোলা।

    এই তাত্ত্বিক রূপান্তরের শেষ গন্তব্য হলো উম্মাহর মনন থেকে ‘এপিস্টেমিক কলনিয়ালিজম’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক ঔপনিবেশিকতার অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি উপড়ে ফেলা। আমরা যখন পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়ার তৈরি করা ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুবাদী মানদণ্ডকে একমাত্র সার্বজনীন সত্য মনে করে নিজেদের ঐতিহ্যকে বিচার করতে যাই, তখন আমরা মূলত এক জঘন্য আত্ম-উপনিবেশিকতা বা সেলফ-কলোনাইজেশনের শিকার হই। আমাদের মনে রাখতে হবে, ওহীর স্ফটিকস্বচ্ছ আলোর সাথে আকলে সালিম বা বিশুদ্ধ বিচারবুদ্ধির যে মিলবন্ধন ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগে ছিল, তা কোনো রক্ষণশীল ভীরুতা বা অন্ধ অনুকরণের ফসল ছিল না। বায়তুল হিকমা'র মনীষীরা বাইরের জ্ঞানকে নিজের ভাষায় পরীক্ষা করার সাহস রাখতেন। কারণ তাদের অন্তরে ছিল ইশকের অপরাজেয় শক্তি এবং ওহীর নোঙ্গর। আজকের তরুণ প্রজন্মকে যদি আবার সেই অবিনশ্বর জ্ঞানের যোগ্য ধারক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে হয়, তবে তাদের এই ক্ষণস্থায়ী স্ক্রিন স্করোলিংয়ের অলস বিনোদন এবং দুই পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি পড়ে শতাব্দীর ঐতিহ্য বাতিল করার প্রবণতা চিরতরে বর্জন করতে হবে। তাদের ফিরে যেতে হবে পাণ্ডুলিপির নিবিড় ও কঠোর পাঠের টেবিলে, মেথডোলজিক্যাল শৃঙ্খলায় এবং ল্যাবরেটরির দীর্ঘ ও ক্লান্তিহীন গবেষণায়। জ্ঞান তার হারানো ধারকদের জন্য অপেক্ষা করছে বটে, কিন্তু সেই দরবারে অলস বা নস্টালজিক ক্রন্দনের কোনো মূল্য নেই। সেখানে কেবল তাদেরই ঠাঁই মেলে যারা নিজেদের রক্ত ও ঘাম দিয়ে হিকমা'র বা প্রজ্ঞার আমানত রক্ষা করার বজ্র-সংকল্প নিয়ে ময়দানে নেমে আসে। এই তাত্ত্বিক শ্রমের মধ্য দিয়েই কেবল আমাদের প্রদীপ্ত বিবেকের পুনর্জন্ম ঘটবে এবং উম্মাহ আবার বিশ্বমঞ্চে ইনসাফভিত্তিক ও নৈতিক বিকল্প সভ্যতা হিসেবে নিজের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।
    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment