Table of Contents
![]() |
| বায়তুল হিকমাহর জ্ঞানপরিসরে প্রশ্ন, মতভেদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ছিল ইসলামী সভ্যতার বিকাশের অন্যতম চালিকাশক্তি |
Previous Part.......
যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ খুব দ্রুত নিজের ভাষা হারায়। প্রথমে সে প্রশ্নকে সন্দেহ করে। তারপর প্রশ্নকারীকে। তারপর নিজের উত্তরগুলোকেও মুখস্থ বাক্যে নামিয়ে আনে। বাইরে থেকে দেখতে ধর্মীয় দৃঢ়তা মনে হয়, ভেতরে থাকে ভীরুতা। আবার যে সমাজ প্রশ্নকে লাগামহীন স্বাধীনতা দেয়, সেও বেশিদিন জ্ঞানের পথে থাকে না। প্রশ্ন তখন সত্যের সেবক থাকে না। নিজের অহংকারের ঘোড়া হয়ে যায়।
ইসলামী সভ্যতার সোনালি যুগ এই দুই বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রশ্ন ছিল। মতভেদ ছিল। তর্ক ছিল। কিন্তু প্রশ্নকে ঈমানের ওপরে বসানো হয়নি। মতভেদকে বিশৃঙ্খলা বানানো হয়নি। তর্ককে দলীয় পরিচয়ের লাঠি বানানোও তার মূল চরিত্র ছিল না। জ্ঞানচর্চা চলেছে মসজিদে, মজলিসে, দরসে, দরবারে, গ্রন্থাগারে, চিকিৎসালয়ে, অনুবাদ-কক্ষে, মুনাজরার আসরে। কোনো একটি ঘর নয়। এক বিস্তৃত সামাজিক পরিবেশ।
বায়তুল হিকমায় বই এসেছে, অনুবাদ হয়েছে, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, কালাম—এসব বেড়েছে। কিন্তু বই একা সভ্যতা বানায় না। বইয়ের চারপাশে পাঠক লাগে। পাঠকের পাশে শিক্ষক লাগে। শিক্ষকের সামনে প্রশ্নকারী লাগে। প্রশ্নের সামনে উত্তরদাতা লাগে। ভুল উত্তরকে ধরার মানুষ লাগে। অন্য মতকে শুনে জবাব দেওয়ার ধৈর্য লাগে। এই সামাজিক সঞ্চালন ছাড়া জ্ঞান পাণ্ডুলিপির তাকেই শুকিয়ে যায়।
মুসা আল হাফিজ কালামদর্শন-এর শুরুতে মুসলিম বিশ্বের আত্মপরিচয়, জ্ঞানতাত্ত্বিক অন্বেষণ ও কালামচর্চার প্রয়োজন নিয়ে যে পটভূমি এনেছেন, সেখানে একটি সংকট বারবার ফিরে আসে। একদিকে আত্মরক্ষামূলক মানসিকতা, অন্যদিকে অন্ধ অনুকরণ। একদিকে প্রশ্নের ভয়, অন্যদিকে বাইরে থেকে আসা ধারণাকে যাচাই ছাড়া গ্রহণ করার প্রবণতা। কালাম সেখানে শুধু একটি শাস্ত্রের নাম নয়; মুসলিম চিন্তার আত্মরক্ষার ভাষা। মুসা আল হাফিজ, কালামদর্শন, পৃ. ১৩–২০, ২৪–৩৯।
প্রশ্নের সাহস
ইসলামী জ্ঞানচর্চায় প্রশ্ন কোনো বিদেশি জিনিস ছিল না। কুরআনের ভাষা মানুষকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। কে সৃষ্টি করেছেন? মানুষ কোথা থেকে এলো? আকাশ-জমিনের নিদর্শন কী বলে? ইতিহাসের জাতিগুলো কেন ধ্বংস হলো? যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান? এই প্রশ্নগুলো শুধু বিশ্বাসের আবেগ জাগায় না; চিন্তাকেও কাজে নামায়।
তবে কুরআনিক প্রশ্ন আর আধুনিক সন্দেহবাদ এক জিনিস নয়। কুরআনিক প্রশ্নের পেছনে সত্যের অন্বেষণ আছে, আত্মপ্রদর্শন নয়। প্রশ্ন ঈমান ভাঙার খেলা নয়। প্রশ্ন মানুষকে তার অজ্ঞতার সামনে দাঁড় করায়। তাকে দেখা শেখায়। শোনা শেখায়। নিজের দাবি পরীক্ষা করতে শেখায়।
আব্বাসীয় যুগে এই প্রশ্ন আরও ঘন হয়ে ওঠে। খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব, মাজুসি দ্বৈতবাদ, গ্রিক দর্শন, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত—সব একসঙ্গে মুসলিম সমাজের সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন প্রশ্ন ব্যক্তিগত কৌতূহল থাকে না। তা জ্ঞানচর্চার সামাজিক প্রয়োজন হয়ে ওঠে। Josef van Ess প্রাথমিক ইসলামি ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় দেখিয়েছেন, qadar (তাকদির), divine attributes (ঐশী গুণাবলি), free will (ইচ্ছাস্বাধীনতা), ঈমান ও পাপের সম্পর্ক—এসব প্রশ্ন মুসলিম সমাজের ভেতর থেকেই তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছিল। Josef van Ess, The Flowering of Muslim Theology, pp. ২৬–৪৪।
এই জায়গায় প্রশ্নের আদব জরুরি। কেউ প্রশ্ন করলেই তাকে বিদ্রোহী ভাবা দুর্বলতা। আবার কেউ প্রশ্ন করতে শিখেই মনে করে, সে সত্যের সব দরজা খুলে ফেলেছে—এটাও শিশুসুলভ। প্রশ্নের সাহস লাগে, কিন্তু প্রশ্নের চরিত্রও লাগে। প্রশ্ন যদি বোঝার জন্য হয়, তা জ্ঞান জন্মায়। প্রশ্ন যদি অপমানের জন্য হয়, তা শব্দের ধুলো তোলে।
ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া রাহি. al-ʿAql wa-Faḍluh-এ আকলকে শুধু তর্কের শক্তি হিসেবে দেখাননি। আকল মানুষের আদব, জিহ্বার সংযম, ধৈর্য, আত্মহিসাব, অভিজ্ঞতা, সঙ্গ এবং চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত। আকল মানে শুধু কী বলব তা জানা নয়। কখন বলব, কাকে বলব, কীভাবে বলব, কোথায় থামব—এসবও জানা। Ibn Abī al-Dunyā, al-ʿAql wa-Faḍluh, pp. ১৫–২০।
প্রশ্নের সংস্কৃতি তাই শুধু বুদ্ধির ব্যাপার নয়। চরিত্রেরও ব্যাপার। জিহ্বা যদি চরিত্রহীন হয়, তর্ক দ্রুত জ্ঞান থেকে নেমে অপমানে পড়ে।
মতভেদ ছিল, কিন্তু অরাজকতা ছিল না
মতভেদ ইসলামী সভ্যতার দুর্বলতা নয়। বরং পরিণত জ্ঞানচর্চার একটি লক্ষণ। যে সমাজে কোনো মতভেদ নেই, সেখানে হয় প্রশ্ন মারা গেছে, না হয় ক্ষমতা প্রশ্নকে চেপে রেখেছে। মুসলিম সমাজ খুব শুরু থেকেই ইখতিলাফ চিনেছে। ফিকহে ইখতিলাফ, কিরাআতে ইখতিলাফ, হাদিসের গ্রহণ-বর্জনে ইখতিলাফ, কালামে ইখতিলাফ, ভাষাতত্ত্বে ইখতিলাফ। এসব মতভেদ সবসময় মধুর ছিল না। কখনো কঠিন হয়েছে। কখনো তিক্ত হয়েছে। কিন্তু তর্কের ভাষা তৈরি হয়েছিল।
George Makdisi মাদরাসা, পাঠচক্র, ijazah (ইজাজাহ/শিক্ষা-অনুমতি), munazara (মুনাজারা/বিতর্ক) ও scholastic method (পাণ্ডিত্যিক পদ্ধতি)-এর আলোচনায় দেখিয়েছেন, ইসলামী শিক্ষাজগতে বিতর্ক ও মতভেদ জ্ঞানচর্চার অঙ্গ ছিল। শিক্ষার্থী শুধু শোনে না; সে প্রশ্ন করে, আপত্তি তোলে, জবাব শুনে, আবার আপত্তির জবাব দেয়। George Makdisi, The Rise of Colleges, pp. ১০৭–১১১, ১২৮–১৩২।
এই পরিবেশে মতভেদ মানে ছিল না, সবাই নিজের ইচ্ছামতো সত্য বানাবে। আবার মতভেদ মানে ছিল না, একমাত্র আমার কথাই ইসলাম। দুটি রোগ আজও আছে। একদিকে relativism (আপেক্ষিকতাবাদ)—সব মতই সমান। অন্যদিকে factional absolutism (ঘরানাগত একচ্ছত্রতা)—আমার ঘরানার বাইরে সব সন্দেহজনক। ইসলামী শিক্ষাজগতের শ্রেষ্ঠ সময়ে এই দুইয়ের মাঝখানে একটি কঠিন পথ ছিল। সত্য আছে। কিন্তু মানুষ সত্য বুঝতে গিয়ে ভুল করতে পারে। প্রমাণ চাই। কিন্তু প্রমাণের ভাষা শাস্ত্র অনুযায়ী বদলাবে। মতভেদ থাকবে। কিন্তু মতভেদ আদব ছাড়বে না।
মতভেদকে শুধু বিভেদ হিসেবে দেখা অশিক্ষিত দৃষ্টি। মতভেদ কখনো জ্ঞানের ভেতরে বাতাস ঢোকায়। প্রশ্ন জমাট বাঁধলে চিন্তা পচে যায়। কিন্তু মতভেদ যদি চরিত্র হারায়, তখন একই বাতাস ঝড় হয়ে বইতে শুরু করে। ইসলামী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি এই দুটির পার্থক্য জানত।
কালামের আসর
এরকম প্রশ্নের আগুন থেকেই জন্ম নিয়েছে কালামশাস্ত্র। মুসলিম সমাজ বড় হয়েছে দ্রুত। আরবের বাইরে নতুন জাতি, নতুন ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, খ্রিস্টান ত্রিত্ববাদী তর্ক, মাজুসি দ্বৈতবাদ, গ্রিক metaphysics (অধিবিদ্যা), রাজনৈতিক সংঘাত—সব এসে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহর সিফাত কীভাবে বোঝা হবে। মানুষের কর্ম কে সৃষ্টি করে। পাপী মুসলিমের অবস্থান কী। ঈমান বাড়ে-কমে কি না। কুরআন মাখলুক কি না। এসব প্রশ্ন দরজায় শুধু কড়া নাড়ে নি; দরজা ঠেলে ঢুকেছে।
মুসা আল হাফিজ কালামদর্শন-এ “ইলমে কালাম কী”, “কেন এই শাস্ত্র”, “বিতর্কের ইতিহাস”, “ইলমে কালামের সমালোচনা”—এই শিরোনামগুলোর ভেতর দিয়ে কালামকে একটি প্রয়োজনজনিত শাস্ত্র হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। পাণ্ডিত্যিক বিলাসিতা নয়; প্রশ্নের চাপ থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিরক্ষামূলক ও ব্যাখ্যামূলক ভাষা। মুসা আল হাফিজ, কালামদর্শন, পৃ. ২৪–৩৯, ৪২–৬০।
Harry Wolfson, The Philosophy of the Kalam-এ কালামকে ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি ও দার্শনিক প্রমাণের এক শাস্ত্রীয় পরিসর হিসেবে পড়েছেন। তাঁর আলোচনায় কালাম কোনো সরল “ধর্ম বনাম যুক্তি” সংঘাত নয়। বরং ধর্মীয় দাবিকে যুক্তির ভাষায় দাঁড় করানোর এক দীর্ঘ চেষ্টা। Wolfson, The Philosophy of the Kalam, pp. ১–৫৯।
কিন্তু কালামকে ফুলের মালা পরিয়ে রাখলেই হবে না। কালামেরও বিপদ ছিল। শব্দের খেলা কখনো সত্যের ওপর উঠে বসেছে। সূক্ষ্ম তর্ক কখনো সাধারণ ঈমানকে বিভ্রান্ত করেছে। আবার কালামকে পুরোপুরি আগুনে ফেললেও বিপদ। কারণ প্রশ্ন থামে না। জবাবের ভাষা না থাকলে প্রশ্ন অজ্ঞ লোকের হাতে পড়ে। তখন ধর্মরক্ষা হয় না; অজ্ঞতার পাহারা হয়।
কালাম তাই দরকার ছিল। কিন্তু কালাম নিজেও বিচারহীন ছিল না। এই শাস্ত্রের ভেতরেই তার সমালোচনা এসেছে। কারো চোখে এটি জরুরি। কারো চোখে বিপজ্জনক। এই দ্বিধা ইসলামী চিন্তার দুর্বলতা নয়। বরং পরিণততা। যে শাস্ত্র নিজেকে নিয়েও প্রশ্ন করতে পারে, সে শাস্ত্র সহজে মৃত হয় না।
মুনাজারা ও জাদালের শৃঙ্খলা
Munazara (মুনাজারা/বিতর্ক) ইসলামী শিক্ষাজগতের একটি বড় অঙ্গ। আজ “বিতর্ক” শব্দ শুনলেই অনেকের মাথায় টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম, চেঁচামেচি, দলীয় জেতা-হারার ছবি আসে। মধ্যযুগীয় মুনাজারা সে অর্থে ছিল না। তার ভেতরে পদ্ধতি ছিল। claim (দাবি), dalil (দলিল/প্রমাণ), objection (আপত্তি), answer (জবাব), distinction (পার্থক্য নির্ণয়)—এসব ছিল।
Makdisi দেখিয়েছেন, ইসলামী শিক্ষাপ্রথায় disputation (মুনাজারা/বিতর্ক) ছিল প্রশিক্ষণের অংশ। একজন ছাত্র কেবল গ্রন্থ মুখস্থ করত না। সে গ্রন্থের দাবি বোঝে, আপত্তি শোনে, জবাব তৈরি করে, মতের ভেতর পার্থক্য ধরে। Makdisi, The Rise of Colleges, pp. ১২৮–১৩২।
এখানে জাদাল আসে। Jadal (জাদাল/তর্কপদ্ধতি) সবসময় খারাপ শব্দ নয়। খারাপ হয় তখন, যখন তা সত্যের বদলে জেতার কৌশল হয়ে যায়। শাস্ত্রীয় জাদাল দাবিকে পরীক্ষা করে। দুর্বলতা ধরতে সাহায্য করে। শব্দের অস্পষ্টতা সরায়। নিজেদের ভুল ও অসত্যের বিলাসিতা খুঁজে পেতে সাহায্য করে। নিজের যা-ই আছে সব সঠিক, অন্যের যা-ই আছে সব বেঠিক -এই মানসিকতা তার চরিত্র নয়। চরিত্রহীন জাদাল মানুষকে বিতর্কবাজ বানায়। তখন মানুষ সত্য চায় না; প্রতিপক্ষের ভুল চায়। নিজের অসততা, অজ্ঞতা, ভ্রান্তি, ভুল পদক্ষেপ, শঠতা-ধূর্ততা এবং অন্যায় আচরণ ও আইন-কানুন কিংবা নীতি-নৈতিকতা সঠিক ও সত্য প্রমাণ করে চাপিয়ে দিতে চায়। নিরপেক্ষভাবে সে জাদালে বসবেই না। শুরুতেই ধরে নেয় তার যা আছে সবই সঠিক। এমনকি ভুল দেখিয়ে দিলেও সেটাকে সঠিক প্রমাণিত করে উঠতে হবে।
এই পার্থক্য না বুঝলে ইসলামী বিতর্কের সংস্কৃতি বোঝা যায় না। একদিকে মুনাজারা ছিল জ্ঞানচর্চার দরকারি পদ্ধতি। অন্যদিকে আলেমরা জাদালের অপব্যবহার নিয়েও সতর্ক করেছেন। কারণ তর্কের মধ্যে নফস ঢুকতে সময় লাগে না। আজও লাগে না। একজন মানুষ সত্যের জন্য কথা শুরু করে, কিছুক্ষণ পর নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য কথা চালিয়ে যায়। তারপর সত্য পেছনে পড়ে থাকে, মুখ বাঁচানো সামনে চলে আসে।
ভিন্ন ধর্ম, এক জ্ঞানপরিসর
Bayt al-Hikmah-এর জ্ঞানপরিসরের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় বৈচিত্র্য। হুনাইন ছিলেন খ্রিস্টান। সাবিত ইবনে কুররা ছিলেন সাবিয়ান। বহু সিরিয়াক খ্রিস্টান অনুবাদক গ্রিক জ্ঞানকে আরবিতে এনেছেন। মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতা, খ্রিস্টান অনুবাদ-শ্রম, সাবিয়ান গণিত, আরবি ভাষা—সব মিলে জ্ঞানচর্চার একটি বিস্তৃত সামাজিক দেহ তৈরি করেছে।
এটি আধুনিক liberal pluralism (উদার বহুত্ববাদ)-এর নকল ছিল না। আবার সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত বন্ধও ছিল না। সত্যের কেন্দ্র ছিল ইসলাম। কিন্তু জ্ঞানী মানুষকে শুধু পরিচয় দেখে বাতিল করা হয়নি। ভাষা জানলে, গ্রন্থ বুঝলে, চিকিৎসা জানলে, গণিতে পারদর্শী হলে, অনুবাদে সততা থাকলে—তাকে কাজে লাগানো হয়েছে।
সাবিত ইবনে কুররাকে হাররানের বাজার থেকে বাগদাদে নিয়ে আসার গল্প এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। একজন money changer (মুদ্রা-বদলকারী) থেকে গণিতবিদ, অনুবাদক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে ওঠা শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভার গল্প নয়। এটি এমন এক জ্ঞানসমাজের গল্প, যে প্রতিভাকে চেনে। জন্মপরিচয় নয়, কাজের ক্ষমতা দেখে। আজকের ঘরানা-নির্ভর দৃষ্টিতে এমন ঘটনা অস্বস্তিকর। কারণ আজ অনেকে জ্ঞান দেখার আগে পরিচয় দেখে। যুক্তি শুনার আগে দল দেখে। বই পড়ার আগে লেখকের ঘরানা জিজ্ঞেস করে। এই মানসিকতা সভ্যতা বানায় না। সে শুধু গণ্ডি বানায়।
মতভেদ ও রাষ্ট্রক্ষমতার বিপদ
বিতর্কের সংস্কৃতি যতই পরিণত হোক, রাষ্ট্রক্ষমতা ঢুকে গেলে বিপদ তৈরি হয়। কারণ রাষ্ট্র জবাব চায় না; আনুগত্য চায়। রাষ্ট্রীয় শক্তি যখন কোনো সূক্ষ্ম ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নকে আনুগত্যের পরীক্ষা বানায়, তখন তর্কের আসর আদালত হয়ে যায়। আদালতও নয়, অনেক সময় কারাগার।
Mihna (মিহনা) এই বিপদের বড় উদাহরণ। কুরআন মাখলুক কি না—এই প্রশ্ন ছিল কালামি বিতর্কের প্রশ্ন। কিন্তু আব্বাসীয় রাষ্ট্র যখন নির্দিষ্ট মত চাপিয়ে দিতে শুরু করল, তখন প্রশ্ন আর প্রশ্ন থাকল না। তা হয়ে গেল religious inquisition (ধর্মীয় মত-পরীক্ষা/জবরদস্তি পরীক্ষা)। আলেমদের জেরা করা হলো। কারাবন্দি করা হলো। অপমান করা হলো। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. রাষ্ট্রীয় চাপের মুখে কুরআনকে মাখলুক বলতে অস্বীকার করলেন। তাঁর প্রতিরোধ শুধু একটি মতের জবাব ছিল না; রাষ্ট্রের হাতে আকিদা নির্ধারণের জবরদস্তির বিরুদ্ধেও ছিল।
Wolfson, created Quran (মাখলুক কুরআন) ও divine attributes (ঐশী গুণাবলি)-এর তর্কে ভাষা, যুক্তি, metaphysics (অধিবিদ্যা) ও কর্তৃত্বের জটিল সম্পর্ক দেখিয়েছেন। Wolfson, The Philosophy of the Kalam, pp. ২৪৪–২৬৫।
মিহনা দেখায়, চিন্তার ইতিহাসে বিপদ শুধু অজ্ঞতার দিক থেকে আসে না। কখনো বিপদ আসে যুক্তিবাদী আত্মবিশ্বাসের দিক থেকেও, যখন সে রাষ্ট্রক্ষমতার হাত ধরে মানুষের ঈমান পরীক্ষা করতে নামে। যুক্তি তখন আর প্রমাণ থাকে না। প্রশাসনিক লাঠি হয়ে যায়।
এই শিক্ষা আজও তাজা। কোনো মত সত্য হলেও রাষ্ট্রীয় জবরদস্তি তাকে নিরাপদ করে না। সত্যের পাশে শক্তি দরকার হতে পারে, কিন্তু সত্যকে পুলিশ বানালে জ্ঞানচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সামাজিক পরিবেশ
জ্ঞানচর্চা শুধু প্রতিভার ওপর দাঁড়ায় না। পরিবেশ লাগে। বই লাগে। শিক্ষক লাগে। বাজার লাগে। কাগজ লাগে। কপি-কারিগর লাগে। পৃষ্ঠপোষক লাগে। পাঠক লাগে। নিরাপত্তা লাগে। বিতর্কের জায়গা লাগে। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ লাগে।
আব্বাসীয় বাগদাদে এই পরিবেশ তৈরি হয়েছিল নানা কারণে। রাজনৈতিক রাজধানী। বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বহু ভাষার মিলন। দরবারি পৃষ্ঠপোষকতা। কাগজের প্রসার। গ্রন্থসংগ্রহ। চিকিৎসালয়। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। অনুবাদক-চক্র। মজলিস। মাদরাসা-পূর্ব ও মাদরাসা-পরবর্তী পাঠসংস্কৃতি। এইসব মিলিয়ে জ্ঞান শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভার ঘটনা থাকেনি। সামাজিক প্রবাহ হয়েছে।
George Saliba আরবি বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখিয়েছেন, মুসলিম জ্ঞানচর্চাকে শুধু গ্রিক জ্ঞানের অনুবাদ বলে পড়লে ভুল হয়। অনুবাদের পর পরীক্ষা, সংশোধন, নতুন সমস্যা, নতুন পর্যবেক্ষণ, নতুন গণনা এসেছে। George Saliba, Islamic Science and the Making of the European Renaissance, pp. ৩–২৭।
এই কথাটি বিতর্কের সংস্কৃতির সঙ্গেও মেলে। যদি সমাজে প্রশ্নের জায়গা না থাকে, তবে অনুবাদও জমে যায়। যদি ভুল ধরার মানুষ না থাকে, তবে গণিত এগোয় না। যদি মতভেদকে সহ্য করার শক্তি না থাকে, তবে দর্শন শুকিয়ে যায়। যদি শাস্ত্রীয় কর্তৃত্ব না থাকে, তবে চিন্তা ছড়িয়ে গিয়ে শব্দের মেলায় পরিণত হয়।
জ্ঞানচর্চার সামাজিক পরিবেশ তাই শুধু স্বাধীনতা নয়। শুধু নিয়ন্ত্রণও নয়। দরকার ছিল নিয়ম, আদব, পৃষ্ঠপোষকতা, পদ্ধতি, বিরোধ, সংশোধন, সংলাপ—সবকিছু।
হাল জামানার আয়না
আজকের মুসলিম সমাজে প্রশ্নের জায়গা সংকুচিত হয়েছে দুই দিক থেকে। একদিকে আছে secular hostility (ধর্মনিরপেক্ষ শত্রুভাবাপন্নতা)। তারা ধর্ম দেখলেই জ্ঞানকে বিপদে দেখে। তাদের কাছে আলেম মানে অন্ধতা, ফিকহ মানে পশ্চাৎপদতা, কালাম মানে মধ্যযুগীয় কুয়াশা। ইতিহাসের বই হাতে নিয়ে তারা রায় লিখে রাখে আগে, প্রমাণ খোঁজে পরে।
অন্যদিকে আছে ধর্মীয় ভীরুতা। প্রশ্ন করলেই সন্দেহ। দর্শন বললেই সন্দেহ। সমাজবিজ্ঞান বললেই সন্দেহ। আইনতত্ত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব—সবকিছু যেন ঈমানের শত্রু। এই ভীরুতা তাকওয়া নয়। অনেক সময় তা অজ্ঞতার আত্মরক্ষা।
তৃতীয় বিপদ আরও গভীর। ঘরানা-নির্ভর জ্ঞান। নিজের ঘরানার মানুষ হলে দুর্বল কথা মেনে নেওয়া যায়। অন্য ঘরানার মানুষ হলে শক্ত যুক্তিও সন্দেহজনক। কেউ বই দেখে না। কেউ প্রমাণ দেখে না। কেউ পদ্ধতি দেখে না। পরিচয়ই বিচার। এই মানসিকতা বায়তুল হিকমাহর সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে সাবিয়ান সাবিত জায়গা পান, খ্রিস্টান হুনাইন জায়গা পান, মুসলিম আল-কিন্দি জায়গা পান, গণিতবিদ, চিকিৎসক, অনুবাদক, কালামবিদ—সবাই কাজের মাপে দাঁড়ায়। আজ আমরা অনেক সময় নামের পাশে ঘরানা না দেখলে জ্ঞান শুনতেই রাজি নই। লাল কলম হাতে পড়ার লোক কম। স্লোগানের লোক বেশি।
আমাদের সময়ের বিতর্কের আরেক রোগ সামাজিক মাধ্যম। এখানে দ্রুত রায় দিতে হয়। ভুল ধরার আগে মানুষ শেয়ার করে। বই না পড়ে quote card দেখে মত গঠন করে। কারও একটি বাক্য কেটে নিয়ে পুরো চিন্তাকে দাফন করে। জটিল প্রশ্নের সামনে মানুষ দুই লাইনের উত্তর চায়। অথচ কালাম, দর্শন, ফিকহ, বিজ্ঞান, ইতিহাস—এসব দুই লাইনে শেষ হয় না। শেষ করা যায়, কিন্তু তাতে জ্ঞান থাকে না। থাকে পোস্টার।
বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার মাপ
বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা মানে সব প্রশ্ন বৈধ, সব ভাষা বৈধ, সব ফল বৈধ—এ কথা নয়। আবার বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা মানে শুধু অনুমোদিত বাক্য পুনরাবৃত্তি করাও নয়। ইসলামী দৃষ্টিতে চিন্তার স্বাধীনতা truth-oriented freedom (সত্যমুখী স্বাধীনতা)। এটি অহংকারের স্বাধীনতা নয়। অরাজকতার স্বাধীনতা নয়। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সত্যের দায় ছাড়া নয়। আপত্তি তোলার অধিকার আছে, কিন্তু আদব ছাড়া নয়। অনুসন্ধান আছে, কিন্তু শিকড় কেটে নয়।
এই মাপটি হারিয়ে গেলে দুই বিপদ। একদিকে অন্ধ অনুকরণ। অন্যদিকে অন্ধ বিদ্রোহ। একদিকে “আমাদের বড়রা বলেছেন, তাই শেষ।” অন্যদিকে “পুরোনো সব ভুল, নতুনই সত্য।” দুই পক্ষই ইতিহাসের প্রতি অশ্রদ্ধ। কারণ ইতিহাসে বড়রা প্রশ্ন করেছেন। আবার নতুন প্রশ্নও পুরোনো শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে টেকেনি।
ইসলামী বিতর্কের সংস্কৃতি এই কারণে জরুরি। এটি মানুষকে শুধু জবাব শেখায় না। শুনতে শেখায়। পার্থক্য করতে শেখায়। নিজের কথার সীমা বুঝতে শেখায়। কোন প্রশ্ন ফিকহের, কোন প্রশ্ন কালামের, কোন প্রশ্ন চিকিৎসার, কোন প্রশ্ন দর্শনের, কোন প্রশ্ন রাষ্ট্রনীতির—এসব আলাদা করতে শেখায়।
সব শাস্ত্রকে এক নামে “জ্ঞান” বলে এক ঝুড়িতে ফেললে বিচার নষ্ট হয়। গণিত যে ধরনের নিশ্চয়তা দেয়, চিকিৎসা তা দেয় না। চিকিৎসা যে অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়ায়, অধিবিদ্যা তার ওপর দাঁড়ায় না। ফিকহের প্রশ্ন আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রশ্ন এক নয়। তাই মতভেদ কোথায়, আপত্তি কোথায়, গ্রহণ কোথায়—এসব বুঝতে হলে আগে শাস্ত্রের স্তর আলাদা করতে হয়।
বিতর্কের সংস্কৃতি মানে ঝগড়ার সংস্কৃতি নয়। প্রশ্নের সংস্কৃতি মানে সন্দেহের বাজার নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা মানে শিকড়হীন স্বাধীনতা নয়। ইসলামী সভ্যতার সেরা সময়গুলোতে এই পার্থক্যগুলো জীবন্ত ছিল। তাই তারা অনুবাদ করেছে, কিন্তু কপি করেনি। প্রশ্ন করেছে, কিন্তু ওহীকে সরায়নি। যুক্তি ব্যবহার করেছে, কিন্তু আকলকে আল্লাহর আসনে বসায়নি। মতভেদ করেছে, কিন্তু মতভেদকে সবসময় ধর্মত্যাগ বানায়নি। কথায় কথায় কাউকে গোমরাহের সন্দেহে সন্দেহগ্রস্তও করেনি। ফতোয়ার কামান নিয়ে শিকারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকেনি। যাকে তাকে যখন তখন যা ইচ্ছা, কাফের, গোমরাহ, ফাসেক ইত্যাদি ফতোয়া দিয়ে কাত করে দেওয়ার দুরভিসন্ধিমূলক বাতিকগ্রস্ততা তাদের ছিলো না।
Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ)-এর পেছনে শুধু গ্রন্থাগার ছিল না। ছিল বিতর্কের সাহস। ছিল প্রশ্নের শৃঙ্খলা। ছিল ভিন্ন ভাষার মানুষকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা। ছিল পৃষ্ঠপোষকতা। ছিল জবাবদিহিতা। ছিল সংশোধনের ইচ্ছা। ছিল নিজের সত্যকেন্দ্র ধরে রেখে অন্যের জ্ঞানকে পরীক্ষা করার শক্তি।
আজ সেই সংস্কৃতি দরকার আগের চেয়ে বেশি। কারণ আমাদের হাতে তথ্য আছে, কিন্তু মন অস্থির। বই আছে, কিন্তু পাঠ কম। মত আছে, কিন্তু পদ্ধতি নেই। গলা আছে, কিন্তু আদব নেই। এমন সময়ে বিতর্কের সংস্কৃতি শুধু অতীতের গল্প নয়। ভবিষ্যতের প্রয়োজন।

Post a Comment