Table of Contents
![]() |
বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ থেকে আন্দালুস হয়ে ইউরোপে জ্ঞানের বিস্তার—অনুবাদ, গবেষণা ও সভ্যতার ধারাবাহিক যাত্রা |
Previous Part.......
জ্ঞান এক শহরে জন্ম নিতে পারে, কিন্তু এক শহরে বাঁচে না। সে ভাষা বদলায়, রাস্তা বদলায়, পাঠক বদলায়। কখনো রাজদরবারের পাণ্ডুলিপি থেকে বেরিয়ে চিকিৎসকের টেবিলে যায়। কখনো জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সারণি হয়ে আকাশের হিসাব বদলায়। কখনো গণিতবিদের হাতে অজানা রাশির ভাষা পায়। কখনো অনুবাদকের ডেস্কে বসে নতুন শব্দ খুঁজে। কখনো মসজিদের মজলিস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের lecture hall (পাঠকক্ষ)-এ ঢুকে পড়ে।
বাগদাদের জ্ঞানও এমনই ছিল। Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ)-এর আলোচনায় যদি আমরা শুধু বাগদাদের ভেতর থাকি, তাহলে গল্পের অর্ধেকই বলা হয়। গ্রিক, সিরিয়াক, ফারসি, ভারতীয় জ্ঞান আরবিতে এসে নতুন জীবন পেল। তারপর আরবি জ্ঞান নিজের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেল। সিরিয়া, মিশর, কায়রাওয়ান, আন্দালুস, সিসিলি, টলেডো, সালার্নো, প্যারিস, বলোনিয়া, অক্সফোর্ড—নানা পথ ধরে। বইগুলো চলল, কিন্তু বইয়ের সঙ্গে চলল ভাষা, পদ্ধতি, প্রশ্ন, সারণি, চিকিৎসা, দর্শন, সংখ্যার কৌশল এবং মানুষের কৌতূহল।
এই যাত্রাকে সস্তা গর্বে নষ্ট করা যাবে না। “মুসলিমরা সব বানিয়েছে, ইউরোপ শুধু নিয়েছে”—এ কথা ইতিহাস নয়। আবার “ইউরোপ নিজে নিজেই জেগেছে, আরবি-ইসলামী জ্ঞান শুধু পাশের ধুলো”—এ কথাও ইতিহাস নয়। দুটোই দুর্বল। গ্রিক জ্ঞান মুসলিমদের কাছে এসেছে। মুসলিমরা তাকে অনুবাদ করেছে, পরীক্ষা করেছে, কোথাও সংশোধন করেছে, কোথাও নতুন প্রশ্নে দাঁড় করিয়েছে। এরপর সেই আরবি জ্ঞান ইউরোপে ঢুকেছে। ইউরোপও শুধু কপি করেনি। গ্রহণ করেছে, সন্দেহ করেছে, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের সামনে বসিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নিয়েছে, কোথাও বদলেছে, কোথাও প্রতিরোধ করেছে।
জ্ঞান এমনই চলে। কেউ একা তার মালিক নয়। কিন্তু পথের ঋণ মুছে দিলে সত্য মরে যায়।
জ্ঞানের পথ: সরল রেখায় ছিল না
ইতিহাসে সরল তীরচিহ্ন আঁকা সহজ। এথেন্স থেকে আলেকজান্দ্রিয়া। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে বাগদাদ। বাগদাদ থেকে কুরতুবা। কুরতুবা থেকে টলেডো। টলেডো থেকে প্যারিস। রেখাটি সুন্দর। কিন্তু বাস্তবতা এত পরিষ্কার নয়। জ্ঞান নদীর মতো। তার মূলধারা থাকে, শাখা থাকে, কাদা থাকে, বাঁক থাকে, শুকনো পথ থাকে, আবার আকস্মিক বন্যাও থাকে।
বাগদাদ এই যাত্রার একটি বড় কেন্দ্র। কিন্তু একমাত্র উৎস নয়। সিরিয়াক খ্রিস্টান অনুবাদকদের পুরোনো গ্রন্থপরম্পরা ছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার স্মৃতি ছিল। জুন্দিশাপুরের চিকিৎসা-ঐতিহ্য ছিল। ভারতীয় সংখ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী গণনা ছিল। পারস্য প্রশাসনিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রভাব ছিল। মুসলিম সাম্রাজ্য এই ধারাগুলোকে আরবি ভাষায় এনে এক নতুন জ্ঞানভাষা তৈরি করল। Arabic (আরবি) তখন শুধু কুরআনের ভাষা নয়; চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাজনীতি, ভূগোল, ইতিহাস—এসবেরও ভাষা।
Dimitri Gutas আব্বাসীয় অনুবাদ আন্দোলনকে নিছক রোমান্টিক জ্ঞানপ্রেম দিয়ে ব্যাখ্যা করেন না। তাঁর আলোচনায় দেখা যায়, অনুবাদের পেছনে ছিল পৃষ্ঠপোষকতা, দরবারি প্রয়োজন, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রশাসনিক ব্যবহার, পণ্ডিতসমাজের প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক মর্যাদা। Gutas, Greek Thought, Arabic Culture, pp. 121–141, 153–157. এই দৃষ্টিটি জরুরি। কারণ সভ্যতার জ্ঞানচর্চা শুধু আবেগে হয় না। বই আনতে টাকা লাগে। অনুবাদক রাখতে পৃষ্ঠপোষক লাগে। পরিভাষা বানাতে পণ্ডিত লাগে। পাঠক তৈরি করতে সামাজিক চাহিদা লাগে।
বাগদাদে গ্রিক জ্ঞান আরবিতে এলো, কিন্তু আগের মতো রইল না। হুনাইন ইবনে ইসহাক Galen (জালিনুস)-এর চিকিৎসাগ্রন্থ নিয়ে যে কাজ করলেন, তা শুধু অনুবাদ নয়; পাণ্ডুলিপি-তুলনা, পাঠ-সংশোধন, ভাষাগত সততা। আল-কিন্দি গ্রিক philosophy (দর্শন)-কে মুসলিম বৌদ্ধিক ভাষায় বসালেন, কিন্তু ঘরের মালিকানা গ্রিকদের দিলেন না। আল-খাওয়ারিজমি Indian numerals (ভারতীয় সংখ্যা), algebra (বীজগণিত), জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি ও ভূগোলকে পদ্ধতিতে নামালেন। বানু মুসা জ্যামিতি ও mechanics (যন্ত্রবিদ্যা)-কে ফোয়ারা, চাপ, ভালভ ও যন্ত্রের দেহে বসালেন। সাবিত ইবনে কুররা গ্রিক গণিতকে আরবিতে এনে প্রমাণ, মাপ ও গতির কঠোরতায় দাঁড় করালেন।
এই কাজগুলো দেখায়, মুসলিমরা শুধু গ্রিক বই পাহারা দেয়নি। preservation (সংরক্ষণ) ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে transformation (রূপান্তর) ছিল। এই পার্থক্য না ধরলে পুরো ইতিহাস বিকৃত হয়। মুসলিম জ্ঞানসভ্যতাকে শুধু “গ্রিক জ্ঞানের গুদামঘর” বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি তাকে “শূন্য থেকে সবকিছুর নির্মাতা” বানানোও শিশুসুলভ। জ্ঞান উত্তরাধিকার নেয়, তারপর নিজের মাপে কাজ করে।
George Saliba আরবি-ইসলামী বিজ্ঞান নিয়ে এই historiography (ইতিহাসলেখন)-এর প্রশ্নে কঠোর। তাঁর আপত্তি সেই বয়ানের বিরুদ্ধে, যেখানে ইসলামী বিজ্ঞানকে শুধু অনুবাদী, ধারক, পরে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়া মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে দেখা হয়। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী মডেল, গণিতীয় সংশোধন, পর্যবেক্ষণ, পাণ্ডুলিপি-প্রবাহ এবং ইউরোপীয় Renaissance (রেনেসাঁ)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ককে নতুনভাবে পড়তে বলেন। Saliba, Islamic Science and the Making of the European Renaissance, pp. 3–27, 193–232.
বাগদাদ থেকে আন্দালুসে (স্পেন-এ) যে জ্ঞান গেল, তা কাঁচা মাল ছিল না। ততদিনে তার ভাষা বদলেছে। তার প্রশ্ন বদলেছে। তার ভেতরে মুসলিম চিকিৎসক, গণিতবিদ, দার্শনিক, অনুবাদক, জ্যোতির্বিজ্ঞানীর শ্রম ঢুকেছে। ইউরোপ যখন তা পেল, সে শুধু প্রাচীন গ্রিক জ্ঞান পেল না; পেল আরবি-ইসলামী বৌদ্ধিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে আসা জ্ঞান।
বাগদাদে জন্ম, আন্দালুসে নতুন ভূমি
আন্দালুসকে (স্পেনকে) তাই শুধু সেতু বলা ঠিক নয়। সেতু ছিল, কিন্তু শুধু সেতু নয়। কুরতুবা, সারাগোসা, সেভিয়া, গ্রানাডা, টলেডো—এই শহরগুলোতে শুধু পূর্ব থেকে আসা বইয়ের কপি বসে ছিল না। সেখানে পাঠ ছিল, ব্যাখ্যা ছিল, চিকিৎসা ছিল, দর্শন ছিল, জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল, ভাষা ছিল, রাজনীতি ছিল। পূর্বের জ্ঞান আন্দালুসে এসে নতুন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কুরতুবা ছিল শহুরে উচ্চ সংস্কৃতির কেন্দ্র। রাজনীতি, সাহিত্য, ফিকহ, ভাষা, দর্শন, চিকিৎসা—সব সেখানে প্রাণ পায়। আল-জাহরাবি surgery (শল্যচিকিৎসা)-কে গ্রন্থে সাজান। ইবনে হাজম ভাষা, ধর্মতত্ত্ব ও ফিকহে নিজস্ব কণ্ঠ তৈরি করেন। ইবনে বাজ্জা, ইবনে তুফাইল, ইবনে রুশদ দর্শনকে আন্দালুসের বৌদ্ধিক দেহে নিয়ে আসেন। আল-জারকালি আকাশের মাপে কাজ করেন। Toledan Tables (টলেডো সারণি)-এর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরম্পরা ল্যাটিন ইউরোপে যায়।
এইসব নামকে শুধু “ইউরোপে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার লোক” বলা তাদের প্রতি অন্যায়। তারা নিজেরাও জ্ঞান নির্মাণ করেছেন। তারা পূর্ব থেকে পাওয়া গ্রন্থ পড়েছেন, কিন্তু অন্ধভাবে নয়। কোথাও ব্যাখ্যা করেছেন। কোথাও সংশোধন করেছেন। কোথাও নিজের পরিবেশের প্রশ্নে বসিয়েছেন। আন্দালুস তাই বাগদাদের ছায়া নয়; বাগদাদের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেক জ্ঞানভূমি।
এখানে টলেডোর কথা আলাদা করে আসবে। ১০৮৫ সালে টলেডো খ্রিস্টান শাসনের অধীনে যায়, কিন্তু শহর সঙ্গে সঙ্গে আরবি-ইসলামী জ্ঞানস্মৃতি হারায় না। শহরে আরবি বই থাকে। Mozarab (আরবিভাষী খ্রিস্টান) থাকে। ইহুদি পণ্ডিত থাকে। আরবি ও স্থানীয় Romance language (রোমান্স ভাষা)-এর মধ্যস্থ মানুষ থাকে। খ্রিস্টান শাসক ও পণ্ডিতদের সামনে আরবি জ্ঞানভাণ্ডার উন্মুক্ত হয়। এই মিশ্র পরিবেশ ছাড়া Arabic-Latin translation (আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ) এমন শক্তি পেত না।
Charles Burnett টলেডোর অনুবাদ-পরিবেশ নিয়ে দেখিয়েছেন, শহরটির গুরুত্ব কেবল রোমান্টিক কল্পনার বিষয় নয়। সেখানে আরবি গ্রন্থের উপস্থিতি, ভাষাগত মধ্যস্থতা, মোজারবিক ও ইহুদি সহায়তা, খ্রিস্টান পৃষ্ঠপোষকতা, এবং ল্যাটিন জগতের জ্ঞান-ঘাটতি একসঙ্গে কাজ করেছে। Burnett, “The Coherence of the Arabic-Latin Translation Program in Toledo in the Twelfth Century,” Science in Context, 14.1–2, 2001, pp. 249–257.
“Toledo School of Translators” কথাটি জনপ্রিয়। কিন্তু এটাকে আধুনিক school (বিদ্যালয়)-এর মতো ভাবলে ভুল হয়। কোনো শ্রেণিকক্ষ, নির্দিষ্ট সিলেবাস, আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান—সেভাবে নয়। বরং ছিল একটি অনুবাদ-পরিবেশ। কেউ আরবি পড়েছে। কেউ রোমান্স ভাষায় ব্যাখ্যা করেছে। কেউ ল্যাটিনে লিখেছে। কেউ গ্রন্থ জোগাড় করেছে। কেউ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। কেউ পুরোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি খুঁজেছে। কেউ চিকিৎসাগ্রন্থ চেয়েছে। কেউ Aristotle (এরিস্টটল)-এর দর্শন বুঝতে চাইছে। এইসব মানুষের মিলিত শ্রমকে পরে “টলেডো স্কুল” নামে ডাকা হয়েছে। নামটি ব্যবহার করা যায়, কিন্তু সতর্কভাবে।
এই টলেডোতে Gerard of Cremona (জেরার্ড অব ক্রেমোনা) আসেন। তাঁর গল্প প্রায় প্রতীকী। তিনি Ptolemy (টলেমি)-এর Almagest খুঁজতে আসেন। কারণ ল্যাটিন জগতে তখন সেই গ্রন্থ সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তারপর তিনি শুধু Almagest নয়, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, natural philosophy (প্রাকৃতিক দর্শন)-এর বহু গ্রন্থ অনুবাদ করেন। Charles Burnett, Gerard-এর অনুবাদ-তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, তাঁর কাজ ছড়ানো-ছিটানো নয়; ল্যাটিন জগতের নির্দিষ্ট জ্ঞান-ঘাটতি পূরণের মতো এক ধরনের বোধ সেখানে কাজ করেছে। Burnett, pp. 255–269.
Gerard-এর পাশে আরেক ধারা আছে Dominicus Gundissalinus (ডমিনিকাস গুন্ডিসালিনাস )-এর। তিনি ডোমিঙ্গো গুন্ডিসালভি (Domingo Gundisalvi) নামেও পরিচিত। তাঁর কাজ বেশি philosophical (দার্শনিক) ও metaphysical (অধিবিদ্যাগত) দিকে যায়। আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, আল-গাজালি-সংলগ্ন চিন্তার নানা অংশ ল্যাটিনে ঢোকে। Burnett দেখিয়েছেন, Gerard ও Gundissalinus একই ধরনের কাজ করছিলেন না; তাদের অনুবাদক্ষেত্র আলাদা। Burnett, pp. 269–288. অর্থাৎ টলেডোর অনুবাদ কোনো এলোমেলো বই-ধরা ছিল না। সেখানে শাস্ত্রভিত্তিক আগ্রহ ছিল। চিকিৎসা আলাদা পথ নেয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান আলাদা। দর্শন আলাদা।
এইখানে বাগদাদ ও টলেডোর তুলনা সুন্দরভাবে দাঁড়ায়। বাগদাদে Greek to Arabic (গ্রিক থেকে আরবি) অনুবাদ জ্ঞানকে ইসলামী-আরবি ভাষায় এনে বসিয়েছে। টলেডোতে Arabic to Latin (আরবি থেকে ল্যাটিন) অনুবাদ সেই আরবি-গঠিত জ্ঞানকে Latin Christendom (ল্যাটিন খ্রিস্টীয় জগৎ)-এর পাঠ্যভূমিতে ঢুকিয়েছে। এক জায়গায় আরবি ভাষা জ্ঞানের নতুন ঘর তৈরি করেছে। অন্য জায়গায় ল্যাটিন ভাষা সেই জ্ঞানকে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেছে।
সিসিলির কথাও এখানে আসা দরকার। টলেডো একমাত্র দরজা নয়। Sicily (সিসিলি) ছিল গ্রিক, আরবি ও ল্যাটিন জগতের সংযোগস্থল। মুসলিম শাসনের স্মৃতি, নর্মান দরবার, গ্রিক ভাষিক ঐতিহ্য, আরবি প্রশাসনিক উত্তরাধিকার—সব মিলিয়ে সিসিলিতে multilingual court culture (বহুভাষিক দরবারি সংস্কৃতি) তৈরি হয়েছিল। Haskins and Lockwood সিসিলির অনুবাদকদের আলোচনায় দেখিয়েছেন, দক্ষিণ ইউরোপের এই দরবারি-বহুভাষিক পরিবেশ গ্রিক ও আরবি জ্ঞানের ল্যাটিন রূপান্তরে ভূমিকা রাখে। Haskins and Lockwood, “The Sicilian Translators of the Twelfth Century and the First Latin Version of Ptolemy’s Almagest,” pp. 75–78.
Salerno (সালার্নো)-র চিকিৎসা-পরিসরও দরকারি। Constantinus Africanus (কনস্টান্টাইন আফ্রিকানুস) উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ ইতালির জ্ঞানপথে আরবি চিকিৎসাগ্রন্থ ল্যাটিনে আনেন। চিকিৎসা ছিল জ্ঞানের এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে ধর্মীয় ও দার্শনিক ভয় তুলনামূলক কম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ জ্বর, ব্যথা, ক্ষত, পিত্ত, চোখের রোগ, শল্যচিকিৎসা—এসবের সামনে দ্রুত বাস্তববাদী হয়ে ওঠে। তাই চিকিৎসাগ্রন্থের যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
অনুবাদ হয়ে ইউরোপে যাত্রা
অনুবাদ মানে শুধু শব্দ বদল নয়। বিশেষ করে জ্ঞান-অনুবাদ। একটি শাস্ত্র যখন ভাষা বদলায়, তখন তার প্রশ্নও বদলায়, পাঠকও বদলায়, ব্যবহারের জায়গাও বদলায়। Arabic to Latin (আরবি থেকে ল্যাটিন) অনুবাদের ক্ষেত্রে এই বদল ছিল গভীর। আরবি গ্রন্থের ভেতরে ছিল গ্রিক উত্তরাধিকার, সিরিয়াক মধ্যস্থতা, মুসলিম ব্যাখ্যা, ইহুদি পাণ্ডিত্য, আন্দালুসীয় সংশোধন, স্থানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনের দীর্ঘ আলোচনার স্তর। ল্যাটিন অনুবাদক যখন বইটি ধরছেন, তিনি শুধু আরবি বাক্য ধরছেন না; তিনি এক জ্ঞানসভ্যতার স্তর খুলছেন।
এই অনুবাদ বহু সময় সরাসরি হয়নি। আরবি পড়তে পারে এমন ব্যক্তি স্থানীয় Romance (রোমান্স) ভাষায় ব্যাখ্যা করছেন, আর ল্যাটিন-জানা পণ্ডিত তা Latin (ল্যাটিন)-এ লিখছেন। এতে ভুল হয়েছে। পরিভাষা দুর্বল হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এই মধ্যস্থতাই কাজকে সম্ভব করেছে। ভাষা কখনো সরল সেতু নয়। ভাষা নিজেই নদী। পা পিছলে যায়, কিন্তু নদী পার না হলে অন্য তীরে যাওয়া যায় না।
অনুবাদের ক্ষেত্রগুলো আলাদা আলাদা ছিল। চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, optics (আলোকবিদ্যা), astrology (জ্যোতিষ), natural philosophy (প্রাকৃতিক দর্শন), logic (যুক্তিবিদ্যা)—প্রতিটি শাস্ত্র ল্যাটিন জগতে আলাদা প্রয়োজন পূরণ করেছে।
চিকিৎসা ছিল সবচেয়ে স্থায়ী প্রবাহগুলোর একটি। Ibn Sina (ইবনে সিনা)-র Canon of Medicine ল্যাটিনে Canon হয়ে বহু শতাব্দী বিশ্ববিদ্যালয়ী চিকিৎসা-পাঠে থাকে। Al-Razi (আল-রাজি)-র al-Hawi ল্যাটিনে Continens নামে পরিচিত হয়। Al-Majusi (আল-মাজুসি)-র চিকিৎসাগ্রন্থ ল্যাটিন চিকিৎসায় ঢোকে। Al-Zahrawi (আল-জাহরাবি)-র surgery (শল্যচিকিৎসা) ইউরোপীয় শল্যবিদ্যায় প্রভাব ফেলে। Gerard of Cremona-এর অনুবাদ-তালিকায় চিকিৎসাগ্রন্থের গুরুত্ব নিয়ে Burnett বিশেষভাবে কথা বলেছেন। Burnett, pp. 265–267.
এই চিকিৎসাধারার পেছনে হুনাইন ইবনে ইসহাকের পুরোনো কাজও ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। Galen (জালিনুস)-এর চিকিৎসাগ্রন্থ আরবিতে না এলে, আরবি চিকিৎসাশাস্ত্র এমন গ্রন্থভিত্তিক ভিত্তি পেত না। আরবি চিকিৎসকরা শুধু Galen কপি করেননি। তাঁরা সংকলন করেছেন, মন্তব্য করেছেন, রোগ পর্যবেক্ষণ করেছেন, ওষুধ নিয়ে লিখেছেন, শল্যচিকিৎসা সাজিয়েছেন। ইউরোপ যখন আরবি চিকিৎসা গ্রহণ করে, সে এই সম্পূর্ণ ধারার সঙ্গেই সম্পর্কিত হয়।
গণিতের পথ আরও নীরব, কিন্তু গভীর। Al-Khwarizmi (আল-খাওয়ারিজমি)-এর নাম থেকে algorithm (অ্যালগরিদম)-এর দূরবর্তী ঐতিহাসিক সূত্র তৈরি হয়। তাঁর Indian numerals (ভারতীয় সংখ্যা)-সংক্রান্ত কাজ ল্যাটিন জগতে algorism (গণনাপদ্ধতি)-এর পথ খুলে দেয়। Roman numerals (রোমান সংখ্যা)-এর ভারী কাঠামোর পাশে Hindu-Arabic numerals (হিন্দু-আরবি সংখ্যা) এবং place-value decimal system (দশমিক স্থানিক সংখ্যা-পদ্ধতি) হিসাবের নতুন দিগন্ত দেয়।
কিন্তু সংখ্যা বদলানো সহজ ছিল না। মানুষ শুধু সত্য দেখে পদ্ধতি বদলায় না। অভ্যাস, দলিলের নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক রীতি, পুরোনো যন্ত্র, সন্দেহ—এসব থাকে। Fibonacci (ফিবোনাচ্চি)-র Liber Abaci ১২০২ সালে বাণিজ্য, মুদ্রা, লাভক্ষতি, অংশীদারি, মাপ—এসব বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে নতুন গণনার শক্তি দেখায়। জ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন যায়, বাজারেও যায়। অনেক সময় বাজার নতুন পদ্ধতিকে তাড়াতাড়ি চিনে ফেলে, কারণ ভুল হিসাবের ক্ষতি নগদ।
Algebra (বীজগণিত)-এর যাত্রাও তেমন। আল-খাওয়ারিজমির al-Jabr wa-l-Muqabala অজানা রাশি, সমীকরণ, পুনরুদ্ধার ও ভারসাম্যের ভাষা তৈরি করে। ল্যাটিন জগতে এই ভাবনা ঢুকে বাণিজ্য, জরিপ, উত্তরাধিকার, শিক্ষাগত গণিত—এসবের কাজে লাগে। একটি সমীকরণ শুধু পাণ্ডিত্য নয়; জমি মাপে, সম্পত্তি ভাগ করে, হিসাব ঠিক করে।
Astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান)-এর প্রবাহ ছিল আরেক বড় স্রোত। জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি ভাষার চেয়ে সংখ্যায় বেশি কাজ করে। Toledan Tables (টলেডো সারণি), আল-জারকালির কাজ, পরে Alfonsine Tables (আলফনসাইন সারণি)—ইউরোপীয় আকাশপাঠে দীর্ঘ প্রভাব রাখে। Burnett টলেডোতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণির অনুবাদ ও ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছেন, বিশেষত আল-জারকালির সারণির ল্যাটিন প্রবাহের দিকটি। Burnett, pp. 250–253.
জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি শুধু তারকা দেখার কৌতূহল নয়। পঞ্জিকা, গ্রহের অবস্থান, সময়, ধর্মীয় তারিখ, জ্যোতিষচর্চা, নৌযাত্রা—সব জায়গায় তার দরকার ছিল। আজ আমরা astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান) ও astrology (জ্যোতিষ)-কে আলাদা করি। মধ্যযুগে এই সীমানা এত পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু সারণির গণিত, পর্যবেক্ষণ, সংশোধন—এসব ছিল বাস্তব জ্ঞানচর্চার অংশ।
Optics (আলোকবিদ্যা)-এর ক্ষেত্রেও আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ বড় কাজ করেছে। Ibn al-Haytham (ইবন আল-হাইসাম)-এর Kitab al-Manazir ল্যাটিনে প্রবেশ করে De aspectibus বা Perspectiva নামে পরিচিত হয়। আলো, দৃষ্টি, চোখ, প্রতিফলন, refraction (প্রতিসরণ), geometrical analysis (জ্যামিতিক বিশ্লেষণ), observation (পর্যবেক্ষণ)—এসব ইউরোপীয় দৃষ্টিতত্ত্বে নতুন শক্তি দেয়। David C. Lindberg ইবন আল-হাইসামের ল্যাটিন প্রভাব, বিশেষত Roger Bacon, Witelo ও John Pecham-এর optical tradition (আলোকবিদ্যা-ঐতিহ্য)-এ তাঁর ভূমিকা আলোচনা করেছেন। Lindberg, Theories of Vision from al-Kindi to Kepler, pp. 58–86, 104–125.
দর্শনের প্রবাহ ছিল সবচেয়ে বেশি আলোড়নময়। Ibn Sina (ইবনে সিনা) ল্যাটিনে Avicenna (আভিসেনা)। Ibn Rushd (ইবনে রুশদ) Averroes (আভেরোয়েস)। আল-ফারাবি, আল-কিন্দি, আল-গাজালি—নানা পথে ল্যাটিন বৌদ্ধিক পরিসরে প্রবেশ করেন। ইবনে সিনার metaphysics (অধিবিদ্যা), essence and existence (সত্তা ও অস্তিত্ব), soul (আত্মা), necessity and contingency (আবশ্যকতা ও সম্ভাব্যতা)-র আলোচনা ল্যাটিন দর্শনে গভীর ছাপ ফেলে। ইবনে রুশদের Aristotle-commentaries (এরিস্টটল-ব্যাখ্যা) ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় জগতে আগুন ধরায়।
এই আগুন শান্ত ছিল না। খ্রিস্টীয় theology (ধর্মতত্ত্ব)-এর সঙ্গে সংঘাত হয়েছে। জগত অনাদি কি না, বুদ্ধির প্রকৃতি কী, আত্মার ব্যক্তিগত অমরত্ব কীভাবে বোঝা হবে, ঈশ্বরের জ্ঞান কেমন—এসব প্রশ্নে ইবনে রুশদ কখনো শিক্ষক, কখনো বিপজ্জনক মানুষ। Thomas Aquinas (থমাস অ্যাকুইনাস) ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদ পড়েন, গ্রহণ করেন, সংশোধন করেন, কোথাও জবাব দেন। Paris condemnations (প্যারিসের নিন্দাদেশ) ১২৭০ ও ১২৭৭ সালে কিছু দার্শনিক অবস্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। জ্ঞান যখন এক সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতায় যায়, সে ফুলের মালা পরে যায় না। সে সঙ্গে নিয়ে যায় অস্বস্তি।
এই অস্বস্তি ভালো। কারণ জ্ঞান যদি কোনো প্রশ্ন না তোলে, তবে সে শুধু অলংকার।
ইউরোপে প্রবেশের পর গ্রহণ, প্রতিরোধ ও পুনর্গঠন
আরবি জ্ঞান ল্যাটিনে অনূদিত হলো মানেই ইউরোপ তা বিনা বিচারে গ্রহণ করল—এমন নয়। ইউরোপীয় পণ্ডিতরা খুঁজেছেন, অনুবাদ করেছেন, ব্যবহার করেছেন, আবার ভয়ও পেয়েছেন। চিকিৎসা দ্রুত জায়গা পেয়েছে, কারণ শরীরের দরকার স্পষ্ট। গণিত ধীরে ঢুকেছে, কারণ হিসাবের পদ্ধতি বদলাতে সময় লাগে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি কাজের কারণে ছড়িয়েছে। দর্শন সবচেয়ে বেশি তর্ক তুলেছে, কারণ সে ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রে গিয়ে দরজা ধাক্কায়।
David C. Lindberg মধ্যযুগীয় পশ্চিমা বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখিয়েছেন, আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ natural philosophy (প্রাকৃতিক দর্শন), medicine (চিকিৎসা), mathematics (গণিত), astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান), optics (আলোকবিদ্যা)-এর ইউরোপীয় বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Lindberg, The Beginnings of Western Science, 2nd ed., pp. 201–240.
এই জায়গায় twelfth-century renaissance (দ্বাদশ শতকের নবজাগরণ)-এর কথা আসে। Charles Homer Haskins ইউরোপের ১২শ শতকের বৌদ্ধিক পুনরুজ্জীবন নিয়ে যে বিখ্যাত আলোচনা করেছেন, সেখানে আইন, সাহিত্য, শিক্ষা, দর্শন ও বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই এক নতুন জাগরণের ছবি উঠে আসে। আরবি ও গ্রিক জ্ঞানের ল্যাটিনে প্রবেশ ছিল সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী ধারা। Haskins, The Renaissance of the Twelfth Century, pp. 278–304.
তবে “রেনেসাঁ” শব্দটি এখানে সতর্কভাবে ব্যবহার করতে হয়। এটি ১৫শ শতকের ইতালীয় Renaissance (রেনেসাঁ)-এর মতো নয়। ১২শ শতকের জাগরণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়-পূর্ব ও বিশ্ববিদ্যালয়-উদীয়মান ইউরোপে শিক্ষা, পাঠ, অনুবাদ, আইন, দর্শন, প্রাকৃতিক দর্শন, চিকিৎসা—এসবের বিস্তার। আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ এই জাগরণকে খাদ্য দিয়েছে। কিন্তু পুরো জাগরণ শুধু আরবি অনুবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। Roman law (রোমান আইন), cathedral schools (ক্যাথেড্রাল বিদ্যালয়), monastic reform (মঠসংস্কার), urban growth (নগরায়ণ)—এসবও কাজ করেছে।
এই তুলনামূলক জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী জগতে Greek thought (গ্রিক চিন্তা) আরবিতে এসেছিল মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক শক্তি, আরবি ভাষার উত্থান, অনুবাদক-চক্র, পৃষ্ঠপোষকতা, চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী চাহিদার মধ্যে। ল্যাটিন ইউরোপে Arabic learning (আরবি জ্ঞান) প্রবেশ করল cathedral schools (ক্যাথেড্রাল বিদ্যালয়), emerging universities (উদীয়মান বিশ্ববিদ্যালয়), church authority (গির্জার কর্তৃত্ব), Latin textual culture (ল্যাটিন পাঠসংস্কৃতি), এবং বৌদ্ধিক ঘাটতির পটভূমিতে। দুই সমাজ জ্ঞানকে একইভাবে নেয়নি। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই অনুবাদ জ্ঞানকে নতুন জীবন দিয়েছে।
বাগদাদে অনুবাদ ছিল আত্মীকরণ। টলেডোতে অনুবাদ ছিল পুনঃপ্রবেশ। Greek knowledge (গ্রিক জ্ঞান) আরবিতে এসে মুসলিম জ্ঞানসভ্যতায় বদলেছে। তারপর আরবি হয়ে ল্যাটিনে গিয়ে ইউরোপীয় শাস্ত্রীয় জগতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। একটি গ্রন্থ যখন তৃতীয় ভাষায় যায়, তখন তার শরীরে আগের দুই সভ্যতার হাতের ছাপ থাকে।
এই ছাপ না দেখলে ইউরোপীয় জ্ঞানজাগরণকে অসম্পূর্ণ পড়া হয়। আবার ইউরোপের নিজস্ব পরিশ্রম অস্বীকার করলেও ইতিহাস নষ্ট হয়। তারা আরবি বই অনুবাদ করেছে, কারণ তাদের দরকার ছিল। Almagest দরকার ছিল। Galen দরকার ছিল। Ibn Sina দরকার ছিল। Aristotle দরকার ছিল। Algebra দরকার ছিল। Toledan Tables দরকার ছিল। দরকার থেকে অনুবাদ। অনুবাদ থেকে পাঠ। পাঠ থেকে বিতর্ক। বিতর্ক থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান। এইভাবে জ্ঞান সমাজে ঢোকে।
প্রভাবের মাপ ও বর্তমানের পাঠ
বাগদাদ থেকে আন্দালুস, আন্দালুস থেকে টলেডো, টলেডো থেকে ল্যাটিন ইউরোপ—এই যাত্রা শুধু বইয়ের চলাচল নয়। এটি প্রভাবের মাপ। একটি জ্ঞান কত ভাষা বদলাল। কত প্রতিষ্ঠানে ঢুকল। কত শাস্ত্র বদলাল। কত বিতর্ক তুলল। কত শতাব্দী টিকে থাকল। এ দিয়ে বোঝা যায়, তার সভ্যতাগত ওজন কত।
আল-খাওয়ারিজমির নাম algorithm (অ্যালগরিদম)-এ বেঁচে থাকে। ইবনে সিনার চিকিৎসা ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে থাকে। ইবনে রুশদের ব্যাখ্যা scholastic debate (স্কলাস্টিক বিতর্ক)-এ আগুন তোলে। ইবন আল-হাইসামের optics (আলোকবিদ্যা) ইউরোপীয় দৃষ্টিতত্ত্বে প্রবেশ করে। আল-জারকালির সারণি আকাশের হিসাব বদলায়। আল-জাহরাবির surgery (শল্যচিকিৎসা) চিকিৎসার হাতকে নতুন যন্ত্র দেয়। এ সব কেবল মুসলিম গৌরবের গল্প নয়। এগুলো জ্ঞানের সামাজিক জীবন।
এই ইতিহাস পড়তে গেলে তিনটি ফাঁদ এড়াতে হবে।
প্রথম ফাঁদ triumphalism (বিজয়োল্লাস)। সবকিছু মুসলিমরা দিয়েছে—এই বাক্য শুনতে মিষ্টি, কিন্তু ইতিহাসের জন্য ক্ষতিকর। মুসলিমরা গ্রহণ করেছে, অনুবাদ করেছে, বদলেছে, তৈরি করেছে, দিয়েছে। কিন্তু তারা শূন্যে দাঁড়িয়ে কাজ করেনি। গ্রিক, ভারতীয়, সিরিয়াক, ফারসি উত্তরাধিকার ছিল। সেই উত্তরাধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে তারা নতুন কাজ করেছে।
দ্বিতীয় ফাঁদ denial (অস্বীকার)। ইউরোপ নিজে নিজেই সব করেছে—এ কথাও অজ্ঞতা। আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ, টলেডো, সিসিলি, সালার্নো, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, আল-খাওয়ারিজমি, ইবন আল-হাইসাম—এসব বাদ দিলে মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় জ্ঞানজাগরণ বোঝা যায় না।
তৃতীয় ফাঁদ pipeline theory (নল-তত্ত্ব)। যেন মুসলিমরা শুধু পাইপ। গ্রিক জ্ঞান ঢুকল, ইউরোপে বের হলো। এই ধারণা অপমানজনক এবং অশিক্ষিত। কারণ এই পথে জ্ঞান বদলেছে। আরবি ভাষা শুধু বাহন ছিল না; ছিল জ্ঞান নির্মাণের জায়গা। মুসলিম পণ্ডিতরা অনুবাদ করেছেন, আবার সংশোধন করেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন, প্রশ্ন করেছেন, নতুন যন্ত্র বানিয়েছেন, সারণি গড়েছেন, চিকিৎসা সাজিয়েছেন, আলোকবিদ্যা ও গণিতকে এগিয়েছেন। তাঁরা শিক্ষক ছিলেন, ইউরোপ ছাত্র ছিলো। তাঁরা জ্ঞান ছেঁকে দিয়েছেন, ইউরোপ বাধ্যগত শিষ্যের ন্যায় অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করতে ছিলো। ইউরোপ তখন শিখলো জ্ঞান কীভাবে গ্রহণ করতে হয়। অর্জিত জ্ঞান থেকে নিজস্ব জ্ঞান কীভাবে নির্মাণ করতে হয়। কীভাবে জাগরণ ঘটাতে হয় এবং সভ্যতা বিনির্মানের কাঁচামাল কাজে লাগাতে হয়।
এই তিন ফাঁদ এড়ালে ইতিহাসের মুখ পরিষ্কার হয়। মুসলিম সভ্যতা জ্ঞানের ইতিহাসে এক বড় মধ্যবর্তী সেতু নয়; এক সক্রিয় নির্মাতা। ইউরোপ এক নিষ্ক্রিয় গ্রহণকারী নয়; এক কঠিন পাঠক ও পুনর্গঠনকারী। আর জ্ঞান নিজে এক ভাষাহীন আলো নয়; সে ভাষা, প্রতিষ্ঠান, দরকার, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিতর্কের ভেতর দিয়ে চলে।
আজ এই ইতিহাসের দরকার কেন? শুধু গৌরবের জন্য নয়। গৌরব যদি কাজ না শেখায়, তা মাতাল স্মৃতি। বাগদাদ থেকে আন্দালুসের যাত্রা আমাদের কয়েকটি কঠিন শিক্ষা দেয়।
জ্ঞান এক ভাষায় বন্দি থাকলে শুকিয়ে যায়। মুসলিমরা গ্রিক জ্ঞানকে আরবিতে এনেছিল। ইউরোপ আরবি জ্ঞানকে ল্যাটিনে নিয়েছে। যে সভ্যতা অনুবাদ করে না, সে নিজের দেয়ালের ভেতর ঘোরে। আজ মুসলিম সমাজে অনুবাদ আছে, কিন্তু অনেক সময় পরিভাষা দুর্বল। গবেষণার শৃঙ্খলা কম। ভাষার ভেতরে জ্ঞান বসানোর ধৈর্য নেই। যে অনুবাদ জ্ঞান তৈরি করে না, সে শুধু শব্দ সরায়।
জ্ঞান গ্রহণ করতে আত্মবিশ্বাস লাগে। ভীরু সমাজ বাইরের জ্ঞানকে ভয় পায়। আত্মহীন সমাজ বাইরের জ্ঞানকে পূজা করে। মুসলিম সোনালি যুগের শক্তি ছিল—গ্রহণ করো, পরীক্ষা করো, নিজের সত্যকেন্দ্রে দাঁড় করাও। আজ আমরা অনেক সময় দুই বিপদে পড়ি। পশ্চিমা জ্ঞান শুনলেই কেউ সব বাতিল করে। আবার কেউ পশ্চিমা তত্ত্ব শুনলেই নিজের ঐতিহ্যকে শিশুসুলভ মনে করে। দুটোই দুর্বল।
জ্ঞানের প্রতিষ্ঠান লাগে। Bayt al-Hikmah ছিল এক জ্ঞানপরিসর। টলেডো ছিল ভাষাগত সেতু। সিসিলি ছিল দরবারি-বহুভাষিক পরিবেশ। ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনুবাদিত জ্ঞানকে পাঠ্যক্রমে বসিয়েছে। আজ আমাদের বক্তা আছে, পোস্ট আছে, বই আছে, আবেগ আছে। কিন্তু কতটা প্রতিষ্ঠান আছে? গবেষণা-অর্থ, পাণ্ডুলিপি-সম্পাদনা, অনুবাদক-প্রশিক্ষণ, পরিভাষা-নির্মাণ, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা—এসব ছাড়া সভ্যতা ফেরে না।
জ্ঞান তাদের দিকে যায়, যারা তাকে প্রয়োজন মনে করে। Gerard টলেডোতে Almagest খুঁজতে আসেন, কারণ প্রয়োজন ছিল। চিকিৎসাগ্রন্থ অনুবাদ হয়, কারণ শরীরের অসুখ অপেক্ষা করে না। গণিত ছড়ায়, কারণ বাজার হিসাব চায়। দর্শন ঢোকে, কারণ theology (ধর্মতত্ত্ব) প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। আজ আমরা কী প্রয়োজন মনে করি? দ্রুত বিতর্ক, ছোট ভিডিও, খ্যাতি ও পরিচিতি-যুদ্ধ, না দীর্ঘ অধ্যয়ন?
বাগদাদ থেকে আন্দালুসের যাত্রা তাই অতীতের রাস্তার গল্প নয়। এটি জ্ঞানের চরিত্রের গল্প। জ্ঞান চলে। ভাষা বদলায়। নতুন সমাজে ঢুকে নতুন প্রশ্ন তোলে। কখনো চিকিৎসা-পাঠ্য হয়। কখনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের curriculum (পাঠক্রম)। কখনো দর্শনের অস্বস্তি। কখনো বাজারের হিসাব। কখনো মানুষের চোখে আলো কীভাবে পড়ে—এই প্রশ্ন।
একদিন মুসলিম সভ্যতা এই যাত্রার কেন্দ্রে ছিল। পরে সেই জ্ঞান অন্যদের হাতেও কাজ করেছে। এতে লজ্জা নেই। লজ্জা তখন, যখন উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু উত্তরাধিকারী হওয়ার মতো শ্রম করি না।

Post a Comment