Loading...

ইসলাম কি চূড়ান্ত সত্যধর্ম—কিভাবে বুঝবো?

ইসলাম কি চূড়ান্ত সত্যধর্ম—কিভাবে বুঝবো?
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents

    Islam as the ultimate truth explained through experience and belief, highlighting faith, knowledge, and the trustworthiness of Prophet Muhammad PBUH

    পূর্বের অংশের পর থেকে আলোচনাটি অব্যাহত…

    সত্যতা বিচারের মাপকাঠি কী?

    বুঝলাম ভাইয়া, ইসলাম সত্যধর্ম। কিন্তু ইসলামই যে চূড়ান্ত সত্যধর্ম সেটা বুঝবো কী করে? অর্থাৎ এটি একটি অতীন্দ্রিয় বিষয়। এমতাবস্থায় এখানে উনার সেই প্রশ্নটি চলে আসবে যে, “সত্যতা বিচারের মাপকাঠি কী” বা “তা চেনার উপায় কী?”

    মুশির লক্ষ্য করলো, ইহতিজাজের প্রতি আওহামের মধ্যে এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ এসেছে। প্রথমে এসে হুজুর দেখে যে “ইগনোরি” মনোভাব এসেছিল, এখন আর সেটা নেই।

    ইহতিজাজ বললো, আচ্ছা আওহাম দা, আপনি তো সাইন্সের স্টুডেন্ট, তাই না?

    : জি।

    : তাহলে বলুন, পানি কিভাবে সৃষ্টি হয়?

    মুশির আওহামের প্রশ্ন আর ইহতিজাজের কথার মধ্যে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পেলো না। তবুও সে নীরব শ্রোতার ন্যায় শুনে যেতে থাকলো। কারণ সে বুঝতে পারছে, ইহতিজাজের এমন প্রশ্নে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে।

    : আওহাম বললো, কেনো! হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাস একটি বিশেষ অনুপাতে ও বিশেষ পদ্ধতিতে মিলিত হয়ে পানি উৎপন্ন করে।

    : রাইট, এবং ধন্যবাদ সংক্ষেপে সঠিক উত্তরটি প্রদানের জন্য! তবে এখন কথা হলো, পানি উৎপন্ন হওয়ার এ পদ্ধতি সম্পর্কে আপনার কাছে হয়তো প্রমাণিত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই বলা যায়, পানি সম্পর্কে এ ধারণা আপনার অভিজ্ঞতালব্ধ। যেহেতু আপনি সাইন্স নিয়ে পড়ছেন। কিন্তু পানি যে এভাবেই উৎপন্ন হয়, এটা আমি মানবো কী করে? আমার তো এ ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

    : আওহাম বললো, বিজ্ঞানীদের দেওয়া সুপ্রমাণিত তত্ত্বের উপর আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে।

    : একজ্যাক্টলি। তারমানে, পানি যে এভাবেই উৎপন্ন হয়—এটা আমার বিশ্বাসলব্ধ জ্ঞান। তাহলে দেখা যাচ্ছে, একটা জড়বস্তুর সত্যতা প্রমাণের দুটি পদ্ধতি রয়েছে—একটি অভিজ্ঞতা, অন্যটি বিশ্বাস।

    অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস: জ্ঞান লাভের দুই পথ

    কিন্তু আমি যদি পানি উৎপন্ন হওয়ার এ পদ্ধতির উপর বিশ্বাস না করি, তাহলে আপনি কী বলবেন? যেহেতু সেটা আমার কাছে প্রমাণিত নয়, সেহেতু আমি এটা বিশ্বাস নাও করতে পারি। এমতাবস্থায় আপনি আমাকে কী প্রস্তাব করবেন?

    : আমি বলবো, আপনি বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যের উপর বিশ্বাস করুন। আর যদি না করেন, তাহলে তাদের বাতলে দেওয়া পদ্ধতিতে পানির মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে দেখুন। তখন নিজেই বুঝতে পারবেন, পানি কিভাবে উৎপন্ন হয়।

    : কেউ যদি এ উভয় পদ্ধতির মধ্য থেকে কোনোটিই গ্রহণ করতে না চায়। অর্থাৎ বিজ্ঞানীদের কথাও মানছে না, নিজে পরীক্ষা চালিয়ে তাদের কথার সত্যতা নিরূপণেও রাজি হচ্ছে না—তখন কী বলবেন? জিজ্ঞেস করলো ইহতিজাজ।

    : এমন ব্যক্তিকে অজ্ঞ-মূর্খ, গোঁড়া আর জেদি ভাবা ছাড়া কী-ই বা করা যেতে পারে! আওহামের সোজাসাপ্টা উত্তর।

    : এবার বুঝুন দাদা, সামান্য জড়পদার্থ সম্পর্কে সবাই সম্যক এবং সরাসরি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে জ্ঞান অর্জন করতে, সে সম্পর্কে অবগত হতে, সক্ষম নয়। বরং সেগুলোর ব্যাপারে জ্ঞান লাভের দুটি উপায় রয়েছে—অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাস। তাই, কেউ এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের অধিকারী হবে। আর কাউকে অভিজ্ঞতাবাদীদের কথার ভিত্তিতে বিশ্বাস করতে হবে। যেখানে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জড়জগতের এই অবস্থা, সেখানে অতীন্দ্রিয় জগত থেকে আগত ধর্ম সম্পর্কে সরাসরি, সমানভাবে, সকলে অবগত হতে চাওয়ার মধ্যে কোনো যুক্তি রয়েছে কি? এরূপ দাবি মূলত মক্কার কাফিররা করতো। তারাও চাইতো জিবরাইল যেনো ওহী নিয়ে এসে সরাসরি তাদের সাক্ষাৎ দেন। অবিশ্বাসের এই দাবিটা নতুন কিছু নয়। যাইহোক, আমার প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রেও সত্যতা যাচাইয়ের উপায় হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বাসকে উপযোগী করে তোলা যায় না?

    বিজ্ঞান ও ধর্ম: যাচাইয়ের একই পদ্ধতি

    বিজ্ঞানের বিষয়াদি সম্পর্কে যেমন বিজ্ঞান জগতের লোকেরা সরাসরি জানেন, অন্যদের কেবল তাতে বিশ্বাস রাখতে হয়; ঠিক সেভাবে ধর্মজগতে নবীদের রয়েছে অভিজ্ঞতা তথা সরাসরি জ্ঞান। পক্ষান্তরে আমাদের করতে হবে বিশ্বাস। যদি তা না করি, তবে আপনার কথা অনুযায়ী—বিজ্ঞানের বিষয়াদিকে যেভাবে বিজ্ঞানীদের বলে দেওয়া পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে হবে—ঠিক সেভাবে নবীদের বলে দেওয়া পদ্ধতিতে ধর্মকেও যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে। কি, সত্য বলছি তো দাদা?

    : এমনি তো মনে হচ্ছে।

    দেখুন, বিজ্ঞানের বিষয়াদিকে বিজ্ঞানীদের বাতলানো পদ্ধতিতে যাচাই করে, এগুলোর সত্যতা প্রমাণিত করতে হয়। নতুবা এর উপর বিশ্বাস রাখতে হয়। তৃতীয় পথ অবলম্বন করে, কেউ যদি বিজ্ঞানীদের কথায় বিশ্বাস না করে অথবা তাদের বলে দেওয়া পদ্ধতিতে যাচাই না করে, তাদের আবিষ্কারকে অস্বীকার করে বসে—তাহলে ঐ ব্যক্তি যেরূপ মূর্খ-গোঁড়া, হঠকারি ইত্যাদি আখ্যা পায়; ঠিক সেভাবে যদি কেউ ধর্মের বেলায় এরূপ করে, তাহলে সে কী উপাধি পাওয়ার উপযুক্ত বলে আপনি মনে করেন, দাদা,,,,,?

    অতএব ইসলামের সত্যতা যাচাইয়ের উপায় হলো নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বাতলে দেওয়া পথ ও পন্থা। এর মাধ্যমে যেকেউ ট্রাই করে দেখতে পারে, “সত্য কী”।

    নবী (সা.)-এর বিশ্বস্ততা ও অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতা

    আপনি বলছেন দাদা, ইসলাম ধর্ম অতীন্দ্রিয় জ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত, তাই সেটা অনুধাবন করবো কিভাবে? আমি আপনার কাছে জানতে চাই। নিউটন, আইনস্টাইন, এডিসন, কার্ল মার্ক্স, রেনে দেকার্ত, ইমানুয়েল কান্ট—এদের কথাকে আপনি মিথ্যা-অহেতুক বলে উড়িয়ে দিবেন কি?

    : অবশ্যই না।

    : কেনো?

    : কারণ, তারা সাত্ত্বিকভাবেই বিশ্বস্ত ব্যক্তি। তাদের কথার একটি মূল্য আছে।

    : সুন্দর বলেছেন। আচ্ছা, তাদেরকে ছোটকাল থেকেই কেউ “আল-আমিন” বা “বিশ্বস্ত” বলে ডেকেছে? এমনটি আপনি শুনেছেন?

    : না তো, এরূপ শুনিনি।

    : দেখুন দাদা, যেখানে কেউ বড় হওয়ার পর বিশ্বস্ত হয়ে গেলে তাঁর কথাকে মিথ্যা কিংবা অগ্রহণযোগ্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, সেখানে ছোটকাল থেকে যদি কেউ “আল-আমিন” অভিধায় অভিহিত থাকে, তাহলে তার কথাকে আপনি কিভাবে, কোন যুক্তিতে অগ্রাহ্য করতে পারেন? আপনি জানেন, নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে মক্কার বর্বর কাফেররাও ছোটকাল থেকে “আল-আমিন” তথা “বিশ্বাসী” বলে ডাকতো!! এবার চিন্তা করুন, তিনি কত বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন! শুধু তাই নয়, তিনি নবী হওয়ার পরও মক্কার যেসব কাফের তাকে নবী বলে মেনে নেয়নি, তারাও তাকে পাগল, জাদুকর ইত্যাদি বলে বিমুখ থেকেছে। কিন্তু একজন কাফেরও তাকে “কাজ্জাব” বা মিথ্যুক বলেনি। কারণ তারা জানতো, মুহাম্মদ (সা.) মিথ্যা বলতে পারেন না। তবুও হঠকারিতাবশত তাদের অনেকে তাঁকে নবী বলে স্বীকার করেনি।

    মক্কার কাফেরদের নেতা আবু জাহলকে (যার আসল নাম হলো “আমর ইবনে হিশাম”) মুনাফিকদের নেতা আখনাস ইবনে শারিক প্রশ্ন করেছিলো, “মুহাম্মদ যে কথা বলে, তা সত্য নাকি মিথ্যা”? এটা কুরআন নাযিল হওয়ার পরের ঘটনা। আবু জাহল চিন্তা করলো, যদি বলি মুহাম্মাদ মিথ্যুক, তাহলে প্রশ্ন আসবে—“দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর তাঁকে ‘আল-আমিন’ বললে কেন”? আর যদি বলি, মুহাম্মাদ সত্য, তাহলে প্রশ্ন আসবে—“তাঁর কথা মেনে নিচ্ছো না কেনো”? এমন মহাসংকটে পড়ে আবু জাহল পাশ কাটিয়ে উত্তর দিলো—“যতদিন পর্যন্ত মুহাম্মাদ নিজে থেকে কথা বলেছিলেন, ততদিন পর্যন্ত সত্য ছিলেন। যেদিন থেকে তাঁর কাছে ওহী আসার কথা বলেন, সেদিন থেকে মিথ্যা হয়ে গেছেন”। অর্থাৎ আবু জাহল নবীজি (সা.)-কে মিথ্যুক সাব্যস্ত করতে পারেনি; করেছে আল্লাহর কালামকে যে, ওহী মিথ্যা। তাই আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাজিল করে বলে দিলেন, “হে রাসুল, মুশরিকদের যেসব কথায় আপনি আন্তরিকভাবে ব্যথিত হন, সেসব কথা আমি জানি। আপনার লক্ষ করার ব্যাপার হলো, মুশরিকরা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না; বরং আমার আয়াতকে মিথ্যা বলে।”

    আরেকটি ঘটনা শুনুন, যখন মক্কার কাফেরদের অকথ্য নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন, তখন আবু সুফিয়ান গুটিকয়েক লোক নিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনতে সে দেশের বাদশাহ নাজাশীর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হন। বলাবাহুল্য যে, আবু সুফিয়ান তখনো মুসলিম ছিলেন না। বাদশাহ নাজাশী তাকে মুহাম্মাদ (সা.)-এর অবস্থা, আচার-ব্যবহার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, তিনিও স্বীকার করতে বাধ্য হলেন—নবী মুহাম্মাদ সত্যনিষ্ঠ এবং ন্যায়ের মূর্তপ্রতীক। নবীজির গুণাবলিকে অস্বীকার করতে, অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তার বিবেকে বেধেছে। তাহলে কী বুঝলেন, দাদা! মক্কার কাফেররা নবীজিকে মিথ্যুক বলতো? কখনো না। বরং তারা কুরআনুল কারীম যে আল্লাহর বাণী, সেটা অস্বীকার করতো। মুহাম্মদ (সা.)-কে সত্য এবং ন্যায়বান বলতে কুণ্ঠাবোধ করতো না। সুতরাং এমন ব্যক্তির কথাকে কিভাবে, কোন যুক্তিতে অবাধে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা দেখানো যেতে পারে?

    আপনি জানেন দাদা, নিখিল ভারত থিওসফিক্যাল সোসাইটির নেত্রী বিখ্যাত ইংরেজ মহিলা অ্যানি বেসান্ত নবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন! তিনি বলেন, “শ্রেষ্ঠ নবীর (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) যে গুণটি আমার অন্তরে তাঁর প্রতি ভক্তির সঞ্চার করেছে, তা হলো তাঁর সেই অনন্য বিশেষণ, যা তাঁর স্বদেশবাসীকে তাকে ‘আল-আমিন’ (পরম বিশ্বস্ত) নামে অভিহিত করতে বাধ্য করেছিলো। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের কাছে এর চাইতে বেশি অনুসরণযোগ্য ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না। যার গোটা সত্তা সততা ও সত্যবাদিতার প্রতিমূর্তি, তিনি যে সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত—তাতে সন্দেহের অবকাশ কোথায়! সত্যের পয়গাম বাহক কেবল এমন ব্যক্তিই হতে পারেন।”

    মহানবী (সা.)-এর বিচারব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করে অমুসলিম মনীষী বার্ক লিখেছেন, “ইসলামি আইন—মুকুটধারী সম্রাট হতে সামান্যতম প্রজা পর্যন্ত সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এটা এমন এক আইন, যা জগতের সর্বোত্তম জ্ঞানানুমোদিত, পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং সর্বোৎকৃষ্ট আইনশাস্ত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”

    জর্জ বার্নার্ড শ’ তাঁর বই “দ্য জেনুইন ইসলাম”-এর মধ্যে লিখেন, “আমি সবসময় মুহাম্মাদের ধর্মকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছি—এর আশ্চর্য জীবনী শক্তির জন্য। এটিই একমাত্র ধর্ম, পরিবর্তনশীল দুনিয়ার সঙ্গে যার খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা আছে বলে আমার মনে হয়। সর্বযুগেই এ ধর্ম সমাদৃত হতে পারে। আমি এ বিস্ময়কর লোকটিকে বুঝতে চেষ্টা করেছি এবং আমার মতে, তিনি অ্যান্টি-ক্রাইস্ট তো ননই; বরং তাঁকে মানবজাতির ত্রাণকর্তা বলা উচিত। আমার বিশ্বাস, তাঁর মতো একজন মানুষ যদি বর্তমান বিশ্বের নায়ক হতেন, তাহলে তিনি এ সমস্যাগুলোর এমন সমাধান দিতে সক্ষম হতেন, যা পৃথিবীতে শান্তি ও সুখ এনে দিতো। মুহাম্মাদের ধর্মের ব্যাপারে আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে, এটি যেমন বর্তমান ইউরোপে গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করেছে, তেমনি আগামী দিনের ইউরোপেও তা গ্রহণযোগ্য হবে।”

    এমনিভাবে টমাস কার্লাইল, গুরুদত্ত সিং, পি. কে. হিট্টি, ক্যারেন আর্মস্ট্রং, এডওয়ার্ড গিবন, আলফ্রেড দ্য ল্যামার্টিন, গোস্তাভ উইল, ড. মার্কোস উড—সহ আরো অনেক অমুসলিম মনীষী নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সততা-সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মহানুভবতা এবং তাঁর দ্বীনের যথার্থতার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর কথাকে অগ্রাহ্য করে এড়িয়ে যেতে পারেননি। বাস্তবতা এবং বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান তাদেরকে এড়িয়ে যেতে দেয়নি।

    ভাবুন তো আওহাম দা, নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অমুসলিমরাও সত্যের বাহক হিসেবে কেনো অভিহিত করতে গেল? যদি না তারা ভালোভাবে বুঝতে পারতো যে, সত্যিই তিনি এক মহামানব।

    আপনি অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের কথা বলছেন! কিন্তু আপনি লক্ষ করে কি দেখেছেন, পৃথিবীতে যত যুগান্তকারী আবিষ্কার ও সৃষ্টিকর্মের সূচনা হয়েছে, সেগুলোর মূলে অতীন্দ্রিয় অনুভূতির সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে? নিউটনের “মধ্যাকর্ষণ শক্তি”, এডিসনের “বৈদ্যুতিক শক্তি”, আইনস্টাইনের “আপেক্ষিক তত্ত্ব”—ইত্যাদির পিছনে অতীন্দ্রিয় অনুভূতি ও ইশারার সরাসরি হাত রয়েছে। হঠাৎ নিউটনের মনে হলো, “আপেল নিচের দিকে পড়ে কেনো?” নিউটন অবশ্যই তার জীবনে বহুবার বৃন্তচ্যুত আপেল দেখে থাকবেন। তখন তাঁর মনে এ ধরনের প্রশ্ন জাগেনি। কিন্তু কেনো? হঠাৎ এ প্রশ্ন কোন জগত থেকে তাঁর মনে উদয় হলো? “মধ্যাকর্ষণ শক্তি” কি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য? আইনস্টাইনের “আপেক্ষিক তত্ত্ব” কখনো দেখেছেন? মার্কসের “উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব” কেউ কখনো ইন্দ্রিয় দিয়ে স্পর্শ করতে পেরেছে? পারেনি। তবুও তাদের মতবাদকে সম্মান জানানো হয়। বিশ্বাস করার প্রবণতা জাহির করা হয়। সুতরাং অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের অধিকারী হওয়ায় ইসলামের নবী এবং তার মতাদর্শকে এড়িয়ে যাওয়া—অবজ্ঞা করা, আর নিউটন, এডিসন প্রমুখ অতীন্দ্রিয় তত্ত্বের আবিষ্কারককে স্বাপ্নিক বা বিলাসী গল্পকার আখ্যা দেওয়ার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই।

    অতএব ইসলাম ধর্মকে অতীন্দ্রিয় বলে নাকচ করে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে, সেটাও তো অতীন্দ্রিয়। তাই বলে আমাদের জ্ঞানবানদের মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে, তা কি অস্তিত্বহীন? আসলে কি তাঁরা মূর্খ? সেই জ্ঞানের কি কোনো সত্যতা নেই? যদি এরূপ না হয়, তাহলে ইসলামের সত্যতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে কেনো?

    অতএব, অতীন্দ্রিয় ওহী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পরম সত্য হলো—ইসলাম। যদি কেউ সেটা মানতে না চায়—তাহলে পূর্বের যুক্তি অনুযায়ী—ওই ব্যক্তির জন্য ইসলামের নবীর বাতলে দেওয়া পদ্ধতিতে, তাঁর আনীত ধর্মকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে নেওয়া আবশ্যক।

    সত্যের রূপ কী?

    এরপর উনার প্রশ্ন হলো, "সত্যের রূপ কী?"

    সোজা কথায় দাদা, মিথ্যার বিপরীত হচ্ছে সত্য। আর এটাই তার আসল রূপ। যদি আপনাকে কেউ বলে, "আসমান আমাদের নিচে আর জমিন উপরে" মানবেন আপনি?

    : কখনো না।

    : কিন্তু কেনো?

    : কারণ, এটা সত্যের বিপরীত। চিরন্তন সত্য হলো, "আসমান উপরে আর জমিন নিচে" সুতরাং তার কথা মানাই যায় না।

    : তাহলে শোনেন, যখন প্রমাণিত হলো ইসলাম ধর্মই মানবতার ধর্ম। সত্যধর্ম। তখন আপনি ইসলামের কষ্টিপাথরে সত্যকে যাচাই করে নিতে পারেন। আপনার কাছে অটোমেটিকলি মিথ্যা ধরা পড়ে যাবে। সহজেই রিকোগনাইজ করে নিতে পারবেন, "সত্যের রূপ কী"

    এবার আসুন দাদা, আমার আলোচনাকে সামারাইজ করে আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত একটি উত্তর বের করে দেই। দেখুন, আমরা প্রথমেই পেয়েছি সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা আছেন এবং তিনি একজন। তারপর পেলাম, মানবতার খাতিরে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে তার নিকট থেকে ধর্ম আসার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা মানুষের বিবেক সুবিধাবাদী মতবাদ প্রবর্তন করে। যা সর্বজন-বিদিত হতে পারে না। আবার তা ভারসাম্যহীনও বটে। এরপর ধর্মগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক, সেটা খুঁজতে গিয়ে আমরা পেলাম -হিন্দু ধর্ম পুরুষ কর্তৃক নারীকে শোষণ  করার শিক্ষা দেয়। সর্বযুগে, সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য সর্ব-সাধারণের অধিকার সংরক্ষণে সচেতন কোনো ধর্ম নয়। সুতরাং এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে ভারসাম্যপূর্ণ, মানবতাবাদী ধর্ম হতেই পারে না।

    এরপর পেলাম, খ্রিস্ট-ধর্ম পাপের অবাধ স্বাধীনতার শিক্ষা দেয়। যা ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যই নয়। আবার তাদের ধর্মমতে, মানুষের রূপধরে চিরতরে লোকদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে যে ঈশ্বর (যীশুখ্রিস্ট) ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছিলেন, সেই যীশুখ্রিস্ট ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র। এজন্যই তো তিনিও ঈশ্বর -ঈশ্বরের পুত্র ঈশ্বর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে ঈশ্বর আপন সন্তানকে ফাঁসির শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারলেন না, সেই ঈশ্বর থেকে যদি আগতও হয় খ্রিস্ট-ধর্ম, তাহলে সেই ঈশ্বরের ধর্ম কিভাবে সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করবে? সেই ঈশ্বরই বা কতটুকু শক্তিশালী, যিনি নিজের পুত্রকে বাঁচাতে পারলেন নাকখনো এমন সত্তা ঈশ্বর হতে পারেন না। আর না তিনি সার্বজনীন কোনো ধর্ম পাঠাতে পারেন। সেই সাথে পেলাম ইহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্ম, তাদের ধর্মগ্রন্থ দ্বারাই প্রমাণিত নয়। সুতরাং এটি স্রষ্টা-প্রদত্ত ধর্ম হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

    জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি ইত্যাদি যেসব ধর্মের সমাহার রয়েছে, তা মানুষের বিবেক প্রসূত কাল্পনিক মতবাদ। যাতে রয়েছে ভারসাম্যহীন বিবেকের সুবিধাবাদী মন্ত্রণা। আবার এগুলোর কোনোটি অন্য ধর্মের সাথে বিদ্রোহ করে সৃষ্টি হয়েছে। মোদ্দা কথা, এগুলোও স্রষ্টা-প্রদত্ত ভারসাম্যপূর্ণ, সর্বজন-ব্যাপৃত কোনো ধর্ম নয়। বরং গোত্রীয় ধর্ম।

    অবশিষ্ট থাকলো শুধু "ইসলাম" ধর্ম এক স্রষ্টার কথা বলে এবং মানে। সমগ্র বিশ্বের জন্য সর্বজন-ব্যাপৃত ধর্ম বলে নিজেকে উদারভাবে  প্রকাশ করে। সকলের অধিকার সুষমভাবে সংরক্ষণ করত নিজেকে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ির মধ্যবর্তী তথা ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে -তাঁর সত্যতার ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করারও ওপেন চ্যালেঞ্জ জানায়। আর আমরা বুঝে এসেছি যে, মানুষের মধ্যে বেপরোয়াভাবও থাকবে না, আবার অতিরিক্ত শিথিলতাও থাকবে না; বরং একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করবে। তবেই সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবে যথার্থ মানবতা। ইসলামের মধ্যেই দেখা যায় রকমের সব গুণ রয়েছে। এবার আপনি নিজেই বলুন  আওহাম দা, এত ধর্মের মধ্যে কোনটি সঠিক? কোনটি মানবতার ধর্ম এবং কেনো?

    এরপর প্রশ্ন এসেছে, "সত্যতা প্রমাণের উপায় নিয়ে" এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, যদি ওহীর মাধ্যমে সরাসরি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নবীর কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তাহলে তাঁর বলে দেওয়া পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন -"সঠিক কী।"

    যেভাবে একজন বিজ্ঞানীর অতীন্দ্রিয় আবিষ্কারের উপর বিশ্বাস না করলে, তাঁর বলে দেওয়া পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। সেভাবে ধর্মের বেলায়ও আপনি নবী কারীম সা.-এর বলে দেওয়া পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এখানে সত্য যাচাইয়ের উপায় হল নবীজির পথ পন্থা। আপনি আরও জানতে চেয়েছেন, "সত্যের রূপ কী"?

    প্রতিটি মিথ্যার বিপরীত অবস্থা হলো, সত্যের রূপ। যেমন এখানে অন্যসব ধর্ম বাতিল এবং মিথ্যা সাব্যস্ত হয়েছে, তাই এখানে সত্যের রূপ হলো "ইসলাম"

    মুশির চেয়ে দেখলো, আওহামের মধ্যে স্কেপটিকস মনোভাবের সেই উৎফুল্লতা আর নেই। আওহামের চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে সে অবাক হলো। একি দেখছে সে! আওহাম আজ চায়ের কাপে একটুও চা রাখেনি। তাহলে কী সে পশ্চিমা সভ্যতা থেকে উঠে আসতে শুরু করেছে! আল্লা' ভাল জানেন!

    আওহাম ইহতিজাজের সাথে সালাম বিনিময় করে আজকের মত বিদায় নিলো। যাবার কালে বলে গেলো, ভাইয়া, আরজ আলী সাহেবের "সত্যের সন্ধান" আমাকে মিথ্যার বন্ধনে আবদ্ধ করে, ভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করতে চলছিলো। মনেহয়, যাত্রায় বেঁচে গেলাম। আল্লা' শুকরিয়া এবং আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ!! তবে হ্যাঁ, উনার প্রতিটি প্রশ্ন নিয়ে আমি আপনার কাছে সময়-সুযোগ করে আসবো এবং সেগুলোর সঠিক উত্তর বুঝার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।

    : ইনশাল্লাহ! আমিও যথাসাধ্য চেষ্টা করবো সত্যকে আপনার সামনে তোলে ধরার। ইহতিজাজের সরল উত্তর।

    মুশির এবং আওহাম মাগরিবের নামাজ পড়ে তাদের গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দিলো। ফেরার পথে আওহাম নিজ থেকে কথা বলা শুরু করলো। মুশিরকে লক্ষ করে বললো, ইহতিজাজ ভাই যে এরকম দার্শনিক টাইপের ব্যক্তি হবেন, আমি ভাবতেই পারিনি! তুই এই ব্যক্তিকে কোথা থেকে জোগাড় করলি।

    মুশির বললো, সে অনেক লম্বা কথা -আজ থাক। শুধু এতটুকু জেনে রাখ, তিনি হাফিজ এবং মাওলানা। এখন ভার্সিটিতে ইংরেজির ওপর অনার্স করছেন। আগেকার যুগে বলা হতো, "মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত" এখনকার যুগে " মোল্লার দৌড় আপাতত পিএইচডি ডিগ্রি পর্যন্ত"

    তাদের গাড়ি শো-শো শব্দ করে বেপরোয়া বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে লাগলো। মনে হচ্ছে গাড়ির গতির সাথে আওহামের জীবনের গতিও অন্য মোহনায় মোড় নিচ্ছে।

    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment