Table of Contents
![]() |
| আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের জ্ঞানচর্চা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, মিহনা, রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং ১২৫৮ সালের বাগদাদ পতনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ |
Previous Part.......
স্বর্ণযুগের ভেতরেই কি পতনের বীজ ছিল?
ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর কৌতুক হলো, একটি সভ্যতার পতনের বীজ তার সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্তেই বপন করা হয়ে যায় সবার অলক্ষ্যেই। আমরা যখন আব্বাসীয় বাগদাদের দিকে তাকাই, তখন হারুন আর-রশিদ এবং আল-মামুনের যুগকে বলি 'সোনালি অধ্যায়'। বাইতুল হিকমাহ, অনুবাদ আন্দোলন, গ্রিক জ্ঞানের আরবি ভাষান্তর, জ্যোতির্বিজ্ঞানের মানমন্দির, গণিতের নতুন দিগন্ত—সব মিলিয়ে এক চোখ ধাঁধানো আলো। কিন্তু আল্লামা শিবলী নোমানী তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ "আল-মামুন"-এ ইতিহাসের এই আলোর পেছনের ছায়াটিকে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আল-মামুনের যুগটি কেবল জ্ঞানের শিখর ছিল না; একই সঙ্গে তা ছিল আব্বাসীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গভীর ফাটলের সূচনা। যে জ্ঞানচর্চা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার কথা ছিল, তা কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করল, সেটি না বুঝলে বাগদাদের পতন বোঝা যাবে না। ১২৫৮ সালে হালাকু খানের ঘোড়া যখন বাগদাদে প্রবেশ করে, তখন আসলে ইট-পাথরের দেয়াল ভাঙেনি; ভেঙেছিল সেই রাষ্ট্র, যা অনেক আগেই ভেতর থেকে অসার হয়ে পড়েছিল। (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ১৮০–১৯৫)।
বুদ্ধিবৃত্তিক অতি-রাষ্ট্রবাদ: জ্ঞানের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ ও তার ফল
শিবলী নোমানী আল-মামুনকে কেবল একজন 'জ্ঞানপিপাসু শাসক' হিসেবে দেখেননি। তিনি তাঁকে দেখেছেন এমন এক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, যিনি জ্ঞানকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। এটি শুনতে চমৎকার, কিন্তু বাস্তবে এর ফলাফল ছিল দ্বিমুখী। আল-মামুন হয়তো চেয়েছিলেন অতি-বুদ্ধিবৃত্তিক রাষ্ট্রবাদের কারিগর হতে। জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে। এই উদ্দেশ্য থেকেই হয়তো তিনি জ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় এনেছিলেন। পণ্ডিতদের রাষ্ট্রের বেতনভুক বানিয়েছিলেন এবং জ্ঞানচর্চাকে দরবারের ছকে বাঁধতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র যখন জ্ঞানকে তার ছকে বেঁধে ফেলে, তখন জ্ঞান আর রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। জ্ঞান তখন হয়ে যায় রাষ্ট্রের দাস আর রাষ্ট্র হয়ে ওঠে জ্ঞানের নিয়ন্ত্রক। আল-মামুনের বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তাঁর এই কাজ জ্ঞানের জন্য হয়ে যায় রাষ্ট্রায়ত্তকরণ (State-sponsored knowledge) এবং অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। আল-মামুন চেয়েছিলেন একজন দার্শনিক রাজা (Philosopher King) হবেন, কিন্তু তাঁর রাষ্ট্র ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞানের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকারী। মামুনের আগে জ্ঞানচর্চা ছিল, মূলত সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক বা প্রাথমিক মুহাদ্দিসগণ রাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মচারী ছিলেন না। তাঁদের জ্ঞানচর্চা ছিল স্বাধীন, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত। কিন্তু আল-মামুন জ্ঞানকে 'রাষ্ট্রীয়করণ' করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, বাগদাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন খলিফার দরবারের ছকে চলবে।
শিবলী নোমানীর বর্ণনায় আল-মামুন কীভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক অতি-রাষ্ট্রবাদ গড়ে তুলেছিলেন এর বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। জ্ঞান-দর্শন এবং দার্শনিকদের কাজের খুঁটিনাটি বিষয়েও খোঁজ রাখতেন সার্বক্ষণিক। প্রায়শই তাদের নিয়ে আলাপ জমাতেন। ঘন্টার পর ঘন্টা চলতো সেই আলাপ। এটা সিরিফ প্রণোদনা বা উৎসাহের পর্যায়ে থাকলে ভালোই হতো। দরকারি কাজ হতো। কিন্তু এটা তার সীমা ছাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত চলে যায়। তিনি কীভাবে এই যাত্রা ও চর্চা, পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে রেখেছিলেন, তার একটি জীবন্ত উদাহরণ পাওয়া যায় হুনাইন ইবনে ইসহাক-এর ঘটনায়। একদিন আল-মামুন হুনাইনকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি জালিনুস-এর কয়টি গ্রন্থ অনুবাদ করেছ?” হুনাইন উত্তর দিলেন, “প্রায় ১০০টি।” আল-মামুন বললেন, “তোমার কাজ দেখে আমি মুগ্ধ। তুমি যা চাও, তা-ই পাবে।” আল-মামুন হুনাইনকে প্রচুর অর্থ দান করলেন এবং তাঁর অনুবাদগুলো সরাসরি পরীক্ষা করতে থাকলেন (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ১৩৯)। এখানেই স্পষ্ট—জ্ঞানচর্চা খলিফার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং তাঁর সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
শুধু বিজ্ঞানী ও অনুবাদকদেরই নয়, আল-মামুন দার্শনিক আলোচনায়ও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহ ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। একদিন তিনি দার্শনিক আল-কিন্দি-কে জিজ্ঞেস করলেন, “যুক্তি ও ধর্মের সম্পর্ক কী?” আল-কিন্দি উত্তর দিলেন, “যুক্তি ধর্মের সেবক। যুক্তি ধর্মীয় সত্যকে আরও স্পষ্ট করে।” আল-মামুন উত্তরে বললেন, “তোমার মতো দার্শনিক পাওয়া সত্যিই বিরল।” (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ১৪০-১৪১)। আল-কিন্দি ছিলেন আল-মামুনের ঘনিষ্ঠ দার্শনিক; তিনি প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দার্শনিক আলোচনা করতেন। এই আলোচনাটি দেখায়, আল-মামুন শুধু বিজ্ঞান ও প্রশাসনেই নয়; বরং দর্শনের গভীর প্রশ্নেও আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি যুক্তি ও ধর্মের সমন্বয়কে গুরুত্ব দিতেন।
শিবলী নোমানীর গভীর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যখনই জ্ঞান রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন তা আর 'জ্ঞান' থাকে না; তা হয়ে যায় 'রাষ্ট্রীয় মতবাদ'। বাইতুল হিকমার মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য যে বিপুল অর্থের জোগান লাগত, তা আসত রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে। ফলে পণ্ডিতরা ধীরে ধীরে জনগণের শিক্ষক না হয়ে দরবারের অলংকারে পরিণত হতে শুরু করেন। একজন বিজ্ঞানী বা দার্শনিক যখন জানেন যে, তাঁর জীবিকা খলিফার মর্জির ওপর নির্ভরশীল, তখন তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা একটি অদৃশ্য শেকলে আটকা পড়ে। আল-মামুনের এই 'প্যাট্রনেজ ইকোনমি' বা পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর অর্থনীতি বাগদাদে একদল 'এলিট বুদ্ধিজীবী' তৈরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু তা সাধারণ জনগণ ও আলেম সমাজের সঙ্গে জ্ঞানচর্চার এক বিশাল দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছিল (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ২১০–২১৫)।
মিহনা: যখন যুক্তি নিজেই অত্যাচারী হয়ে ওঠে
আল-মামুনের শাসনামলের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হলো 'মিহনা' বা 'জোরপূর্বক মতবাদ পরীক্ষা'। মুতাজিলা দর্শন—যা যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার কথা বলত—মামুনের হাতে পড়ে তা হয়ে উঠল এক ভয়ানক রাজনৈতিক অস্ত্র। শিবলী নোমানী এই ঘটনাকে আব্বাসীয় পতনের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি দেখান, যে 'আকল' বা যুক্তির কাজ ছিল মানুষকে স্বাধীন করা, সেই যুক্তি যখন রাষ্ট্রের তলোয়ার হাতে তুলে নিল, তখন তা অন্ধবিশ্বাসের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল।
খলিফা মামুন ঘোষণা করলেন, কুরআন মাখলুক (সৃষ্ট)—এই মতবাদ সবাইকে মানতে হবে। এটি কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার প্রদর্শনী। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহি-এর মতো জনপ্রিয় ও স্বাধীনচেতা আলেমকে যখন এই মত না মানার কারণে নির্যাতন করা হলো, তখন বাগদাদের সাধারণ মানুষ খলিফার 'জ্ঞানচর্চা'র প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলল। তারা দেখল, বাইতুল হিকমাহ-'র দর্শন তাদের ঈমানের ওপর আঘাত করছে। ফলে সমাজ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এক দিকে দরবার-আশ্রিত দার্শনিক ও বিজ্ঞানী, অন্য দিকে মসজিদ-কেন্দ্রীক গণমানুষ ও আলেম সমাজ।
শিবলী নোমানী অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, এই বিভাজন আব্বাসীয় রাষ্ট্রের সামাজিক ভিত্তি (Social Base) দুর্বল করে দিয়েছিল। জনগণ যখন মনে করে যে, রাষ্ট্র তাদের ধর্মের শত্রু, তখন সেই রাষ্ট্রের বিপদের দিনে তারা আর ঢাল হয়ে দাঁড়ায় না। ১২৫৮ সালে যখন মঙ্গোলরা বাগদাদ আক্রমণ করে, তখন বাগদাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে খিলাফত রক্ষার সেই আবেগ আর অবশিষ্ট ছিল না, যা প্রথম দিকের আব্বাসীয় যুগে ছিল। মিহনা দেখিয়েছিল, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া 'এনলাইটেনমেন্ট' বা জ্ঞানালোক শেষ পর্যন্ত অন্ধকারই ডেকে আনে। (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, অধ্যায়: মিহনা ও তার প্রভাব, পৃ. ২২৫–২৪০)।
তুর্কি নির্ভরতা ও রাজনৈতিক পঙ্গুত্ব
শিবলী নোমানী আল-মামুন-এ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা আল-মামুনের সময় শুরু হয়ে পরবর্তী খলিফাদের হাতে চূড়ান্ত রূপ নেয়। সেটি হলো, আরব ও পারসিকদের সরিয়ে তুর্কি সেনাদের ওপর নির্ভরতা। আল-মামুন তাঁর ভাই আল-আমিনের সঙ্গে গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন পারসিক ও খোরাসানি শক্তির সহায়তায় (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ৪৮-৫২, ৬১-৭২)। কিন্তু তিনি বা তাঁর পরবর্তী খলিফা আল-মু'তাসিম আরবদের ওপর আর বিশ্বাস রাখতে পারছিলেন না। তাঁরা মনে করেছিলেন, তুর্কিরা হবে অনুগত ও দক্ষ পাহারাদার (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ১১৭)।
কিন্তু ইতিহাস বলে, যে পাহারাদারের হাতে ঘরের চাবি তুলে দেওয়া হয়, সে-ই এক সময় ঘরের মালিক হয়ে বসে। মামুনের পর আল-মু'তাসিম এবং আল-ওয়াসিকের সময় তুর্কি সেনাপতিরা বাগদাদের আসল ক্ষমতাবান হয়ে উঠল। খলিফারা হয়ে গেলেন প্রাসাদের বন্দী পুতুল (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ১১৭-১১৮)। শিবলী নোমানী দেখান, আল-মামুন যে বিশাল সাম্রাজ্য ও জাঁকজমকপূর্ণ দরবার রেখে গিয়েছিলেন, তার ভেতরের রাজনৈতিক মেরুদণ্ডটি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। খলিফার নিজের কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, যা তাঁর হুকুমে প্রাণ দেবে। ছিল ভাড়াটে তুর্কি বাহিনী—যারা টাকার জন্য লড়ত, আবার টাকার জন্য খলিফাকে হত্যাও করত (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ১১৭-১১৮)।
এই 'মিলিটারি-পলিটিক্যাল কমপ্লেক্স' বা সামরিক-রাজনৈতিক জটিলতা বাগদাদের পতনের রাস্তা প্রশস্ত করেছিল। জ্ঞানচর্চার জন্য যে স্থিতিশীলতা দরকার, তা আর বাগদাদে ছিল না। ঘন ঘন খলিফা বদল, সেনাপতিদের ষড়যন্ত্র এবং রাজকোষের অর্থ দিয়ে সেনাদের তুষ্ট করার নীতি—সব মিলিয়ে বাগদাদ জ্ঞাননগরী থেকে ষড়যন্ত্রের নগরীতে পরিণত হয়েছিল (শিবলী নোমানী, আল-মামুন, পৃ. ১১৭-১১৮, ১৯৪-১৯৫)। শিবলী নোমানীর মতে, আল-মামুন যদি আরব ও পারসিকদের মধ্যে একটি সুস্থ রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারতেন এবং বিদেশি ভাড়াটে সেনাদের ওপর অতি-নির্ভর না হতেন, তবে আব্বাসীয় খিলাফত হয়তো আরও দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী হতো।
প্রতীকী খিলাফত ও বাস্তবতার অস্বীকার
আল-মামুনের মৃত্যুর পর আব্বাসীয় খিলাফত ধীরে ধীরে তার বাস্তব ক্ষমতা হারাতে থাকে, কিন্তু তার প্রতীকী মর্যাদা (Symbolic Authority) বেড়ে যায়। এটি এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক প্যারাডক্স। বাগদাদের খলিফার হুকুম বাগদাদের বাইরে খুব একটা চলত না, অথচ স্পেনের উমাইয়ারা ছাড়া মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব সুলতান খলিফার নাম খুতবায় পাঠ করতেন এবং তাঁর কাছ থেকে শাসন করার অনুমতি বা 'ম্যানডেট' নিতেন। শিবলী নোমানী এবং পরবর্তী ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন, এই প্রতীকী মর্যাদা বাগদাদের শাসকদের এক মিথ্যা নিরাপত্তা-বোধে (False Sense of Security-তে) ডুবিয়ে রেখেছিল। যেভাবে বর্তমান সময়ের অনেকে মুসলিম পণ্ডিতকে নানাজন নানাভাবে ইউজ করার জন্য প্রতীকী মর্যাদার "মিথ্যা সম্মানবোধে" ডুবিয়ে রাখে। এই সময়ের মুসলমানদের অনেক পণ্ডিত যেভাবে নিজেদের আল্লাহ তায়ালার অত্যন্ত প্রিয় ভাবেন, সেই সময় বাগদাদের অভিজাতরা ভাবতেন, খিলাফত একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান; আল্লাহ নিজে একে রক্ষা করবেন। তাদের এই ধারণা ছিল যে, মুসলিম বিশ্ব খলিফাকে ছাড়া চলতে পারবে না, তাই কেউ বাগদাদ ধ্বংস করার সাহস করবে না। এই 'আধ্যাত্মিক অহংকার' তাদের বাস্তব সামরিক প্রস্তুতি থেকে দূরে রেখেছিল। তারা ভুলে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্র দোয়ার জোরে টিকে থাকে না; টিকে থাকে ন্যায়বিচার, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর জোরে।
শিবলী নোমানীর লেখায় এই আক্ষেপ বারবার ফুটে ওঠে। আল-মামুন যে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল ওপরের কাঠামোর চাকচিক্য। কিন্তু সমাজের গভীরে ন্যায়বিচার, ইহসান এবং রাজনৈতিক সংহতির যে বুনন দরকার ছিল, তা মামুনের পরবর্তী সময়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল। বাইতুল হিকমার অনুবাদকরা যখন এরিস্টটলের 'পলিটিক্স' অনুবাদ করছিলেন, তখন বাগদাদের রাস্তায় তুর্কি সেনারা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করছিল। জ্ঞানের এই বিচ্ছিন্নতাই ছিল পতনের মূল কারণ। জ্ঞান যখন বইয়ের পাতায় থাকে, প্রতিষ্ঠানের পাঠে থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের আচরণে থাকে না, কিংবা এর অত্যাচারে জ্ঞানীরা সে দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না, তখন সেই জ্ঞান রাষ্ট্রকে বাঁচাতে পারে না। সেই জ্ঞান, রাষ্ট্র এবং জ্ঞানীরা অপাংক্তেয় গণ্য হতে শুরু করেন।
শিবলী নোমানী এমন অধঃপতনের মূলে আল-মামুনের দিকেই আঙুল তোলেন, তবে তা শ্রদ্ধার সঙ্গে। তিনি বলেন, আল-মামুন চেয়েছিলেন একটি 'ফিলোসফার কিং' বা দার্শনিক রাজার রাজত্ব কায়েম করতে। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, ইসলামি খিলাফত প্লেটোর 'রিপাবলিক' নয়। এটি একটি বাস্তব জনসমষ্টির রাষ্ট্র, যাদের আবেগ, বিশ্বাস ও সামাজিক চাহিদা আছে। যুক্তিকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে এবং রাষ্ট্রকে জনবিচ্ছিন্ন করে তিনি এমন এক পথে হেঁটেছিলেন, যা আপাতদৃষ্টিতে স্বর্ণযুগ মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল আব্বাসীয় পতনের প্রথম ধাপ। ১২৫৮ সালের পতন তাই আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সেই দীর্ঘ ভুলেরই অনিবার্য সমাপ্তি, যার সূচনা হয়েছিল বাগদাদের সবচেয়ে আলোকিত সময়েই।
রুহের পতন: নফসের দাসত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা
শারীরিক পতনের আগে রুহের মৃত্যু ঘটে, এটি ইতিহাসের এক অমোঘ সুন্নাতুল্লাহ (আল্লাহর রীতি)। ১২৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হালাকু খানের মঙ্গোল বাহিনী যখন বাগদাদের প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করছিল, তখন তা কোনো আকস্মিক সামরিক বিপর্যয় ছিল না। সেটি ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী, অলক্ষিত এবং অভ্যন্তরীণ পচনের চূড়ান্ত দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ। সমসাময়িক দুই প্রখ্যাত ইতিহাস-চিন্তক ড. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি এবং ড. রাগিব সারজানি বাগদাদের এই পতনকে কেবল ভূ-রাজনৈতিক বা সামরিক ফ্রেমওয়ার্ক থেকে দেখেননি। তাঁদের মতে, বাগদাদের বাহ্যিক অবয়বটি যখন হালাকু খানের তলোয়ারের সামনে চূর্ণ-বিচূর্ণ হচ্ছিল, তার বহু আগেই এই শহরের 'রুহ' বা আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ডটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। তাঁরা মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়া দুনিয়ার মোহ, মৃত্যুভীতি এবং নৈতিক অধঃপতনকে এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (আলী সাল্লাবি, আল-মাশরু‘উল মুঘুলি আওয়ামিলুল ইনতিশার ওয়া তাদা‘ইয়াতিল ইনকিসার, দারুল মা‘রিফা, বৈরুত, ২০০৯, পৃষ্ঠা ৪৯ ও ১৬১; রাগিব সারজানি, কিসসাতুত তাতার, পৃ. ৪২–৫৫)।
ড. রাগিব সারজানি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ কিসসাতুত তাতার-এ কুরআনের সেই চিরন্তন সামাজিক নিয়ম বা 'সুন্নাতুল্লাহ'-র দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যেখানে বলা হয়েছে—কোনো জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত বাহ্যিকভাবে ধ্বংস হয় না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভেতরের শক্তিকে ধ্বংস করে ফেলে। আব্বাসীয়দের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তাদের পতন তলোয়ারের আঘাতে হয়নি, হয়েছে 'ওয়াহন' বা নফসের দাসত্বের কারণে। বাগদাদের শেষ দিনগুলোতে শহরের অভিজাত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এমন এক 'মনস্তাত্ত্বিক পক্ষাঘাত'-এ ভুগছিল, যেখানে (বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনের মতো) অতীতের গৌরবগাথাই ছিল তাদের একমাত্র আশ্রয়। তারা এক মিথ্যা নিরাপত্তা-বোধের কুয়াশায় বাস করছিল। সারজানির ভাষায়, মঙ্গোলরা যে বাগদাদকে গ্রাস করেছিল, তা আসলে একটি জীবিত সমাজ ছিল না। সেটি ছিল বিলাসিতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পচে যাওয়া এক নিস্প্রাণ খোলস মাত্র, যার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক আগেই শূন্যে নেমে এসেছিল (রাগিব সারজানি, কিসসাতুত তাতার, পৃ. ৪২–৫৫)।
আত-তারাফ: বিলাসিতা যখন বুদ্ধিবৃত্তিক আফিম
ড. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি আব্বাসীয় রাষ্ট্রের পতনের কারণ খুঁজতে গিয়ে 'আল-তারাফ' বা সীমাহীন ভোগবিলাসের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। খিলাফতের প্রাথমিক ও মধ্যযুগে—বিশেষ করে হারুন আর-রশিদ কিংবা আল-মামুনের সময়ে—সাম্রাজ্যের যে বিপুল উদ্বৃত্ত সম্পদ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা (Patronage economy) হিসেবে অনুবাদ আন্দোলন, বিজ্ঞানচর্চা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান-উৎপাদনে ব্যবহৃত হতো, শেষ যুগে এসে তা কেবল দরবারি আমোদ-প্রমোদ এবং নফসের দাসত্বের জ্বালানি হিসেবে অপব্যয় হতে শুরু করে। (ড. আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী, উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগ এবং খারেজি মতবাদের উত্থান 'عصر الدولتين الأموية والعباسية وظهور فكر الخوارج, 'সাফাহাত মিন আত-তারীখিল ইসলামী ফিশ শিমালিল ইফরীকী' সিরিজের ২য় খণ্ড, দার আল-বায়ারিক, জর্ডান, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ৮৩-৮৬ ও ৯২-৯৪।)
সাল্লাবি দেখিয়েছেন, বাগদাদের রাজপ্রাসাদগুলোতে যখন স্বর্ণের ফোয়ারা আর রত্নখচিত ঝাড়বাতির জাঁকজমক বাড়ছিল, ঠিক তখনই খিলাফতের মূল সামরিক বাহিনী এবং সীমান্ত পাহারাদারদের নিয়মিত বেতন বকেয়া পড়ছিল। এই বিলাসিতা কেবল খলিফা বা রাজপরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা সংক্রামক ব্যাধির মতো গ্রাস করেছিল বাগদাদের এলিট বুদ্ধিজীবী ও আলেম সমাজের একটি বড় অংশকেও। জ্ঞানচর্চা তখন আর 'উম্মাহর পাহারাদার' তৈরির মাধ্যম ছিল না; তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দরবারি বিনোদন এবং অর্থ উপার্জন ও পদোন্নতি পাওয়ার হাতিয়ার। সাল্লাবির মতে, রাষ্ট্র যখন ইনসাফ বা সামাজিক ন্যায়বিচার খর্ব করে বিলাসিতাকে নিজের আদর্শ বানায়, তখন সমাজ থেকে আল্লাহর 'নুসরত' বা ঐশ্বরিক সাহায্য বিদায় নেয়। আর নুসরতবিহীন একটি সমাজ বাহ্যিকভাবে যতই জ্ঞান ও বিজ্ঞানীর নগরী মনে হোক না কেন, তা মাকড়সার জালের চেয়েও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বাগদাদের শেষ দিনগুলোতে জ্ঞানীরা কিতাবের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিলেন, কিন্তু তাদের চোখের সামনেই সমাজ ও রাষ্ট্র যে নৈতিক ও প্রশাসনিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগোচ্ছিল, তা রুখে দেওয়ার মতো 'ফিকহুল ওয়াকি' বা সমকালীন বাস্তবতার জ্ঞান তাদের ছিল না। জ্ঞান তখন চরিত্র ও কর্মের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এক নিস্প্রাণ 'একাডেমিক অহংকারে' রূপ নিয়েছিল।
গাদ্দারি ও অভ্যন্তরীণ ফাটল: ব্যক্তির অপরাধ বনাম ব্যবস্থার পচন
বাগদাদের পতনের ইতিহাসে উজির ইবনুল আ'লকামির 'বিশ্বাসঘাতকতা' একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত অধ্যায়। সাধারণ ঐতিহাসিকরা প্রায়শই সমস্ত পতনের দায় এই একজন ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের বিশ্লেষণ শেষ করেন। কিন্তু ড. রাগিব সারজানি এই সরলীকরণকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দেখান, পরাজয়ের পর সমাজ যখন নিজের গা বাঁচাতে একজন খলনায়ক খোঁজে, তখন তা আসলে গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে আড়াল করার একটি অলস চেষ্টা মাত্র।
ইবনুল আ'লকামি যদি মঙ্গোলদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করেও থাকেন, তবে প্রশ্ন জাগে —একটি বিশাল খিলাফতের গোয়েন্দা বিভাগ, সামরিক কমান্ড এবং অন্যান্য প্রশাসনিক স্তম্ভগুলো তখন কী করছিল? এখানেই আলী সাল্লাবি ও রাগিব সারজানির চিন্তার এক অভূতপূর্ব তাত্ত্বিক সমন্বয় ঘটে। তাঁরা বলছেন, বাগদাদে তখন সমষ্টিগত 'উম্মাহ'-র ধারণা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল এবং তার জায়গা দখল করেছিল সংকীর্ণ উপদলীয় ও গোষ্ঠীগত ঘৃণা (Factional absolutism)। সুন্নি-শিয়া রাজনৈতিক রেষারেষি, তুর্কি-আরব সামরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন ফিকহী ও কালামি ঘরানার মধ্যকার পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সমাজের এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ধ্বংস করার জন্য ঘরের ভিতরের ভাইয়ের চেয়ে বাইরের জল্লাদ হালাকু খানকে বেশি আপন মনে করতে শুরু করেছিল।
সারজানি এই ঘটনাকে 'আকিদাগত প্রতিরোধ ক্ষমতার ধ্বংস' (تحطيم المناعة العقدية) নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি সমাজের একটি অভ্যন্তরীণ 'অনাক্রম্যতা' থাকে। যা তাকে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর সাহস, আত্মবিশ্বাস ও নৈতিক শক্তি দেয়। এই অনাক্রম্যতার মূল উৎস হলো সময়ের সঠিক জ্ঞান ও আকিদা, সুসংহত উম্মাহ-চেতনা এবং পরস্পরের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা। কিন্তু বাগদাদে যখন শিয়া-সুন্নি বিভক্তি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, যখন তুর্কি সেনাপতিরা আব্বাসীয় খলিফার বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং যখন বিভিন্ন ফিকহি ঘরানার পণ্ডিতেরা নিজেদের মধ্যে মতান্ধতার বিতর্কে লিপ্ত থেকে উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থকে উপেক্ষা করতে শুরু করে —তখন এই 'আকিদাগত প্রতিরোধ ক্ষমতা' সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
সারজানি তাঁর 'কিসসাতুত তাতার' গ্রন্থে এই ধারণাটি প্রমাণের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর চিহ্নিত করেছেন।
প্রথম স্তর: ব্যক্তির পতন থেকে ব্যবস্থার পচন
তিনি দেখান, ইবনুল আ'লকামি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থই ছিল প্রধান চালিকা শক্তি। যখন কোনো উজির তার দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে মঙ্গোলদের কাছে দরজা খুলে দেন, তখন বোঝা যায় যে, প্রশাসনিক কাঠামোর নৈতিক ভিত্তি আগেই ক্ষয়ে গিয়েছিল। সারজানি জোর দিয়ে বলেন, ‘একটি ব্যবস্থা যখন তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের আনুগত্য হারায়, তখন সেই ব্যবস্থার পতন অনিবার্য।’
দ্বিতীয় স্তর: সামাজিক বিভাজন ও 'অপরিচিতকে আপন করা'-র মনস্তত্ত্ব
সারজানি দেখান, বাগদাদের সমাজ তখন এতটাই খণ্ডিত ছিল যে, এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে 'কাফির' বা 'গোমরাহ' ঘোষণা করতে শুরু করেছিল। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থায়, বহিরাগত মঙ্গোল শত্রুও ঐ 'ভ্রান্ত মুসলিম' অপেক্ষা কম ক্ষতিকর মনে হতে থাকে। ফলে, যখন মঙ্গোলরা শহর ঘেরাও করে, তখন অনেকেই তাদের 'মুক্তিদাতা' হিসেবে দেখতে শুরু করে। কারণ তাঁদের কাছে খিলাফতের কেন্দ্রীয় শাসন ও প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর চেয়ে মঙ্গোল শাসন অনেক বেশি সহনীয় বলে মনে হয়েছিল।
তৃতীয় স্তর: জ্ঞান-চর্চার সংকট ও দায়িত্বচ্যুতি
সারজানি বিশেষভাবে পণ্ডিত ও ফকিহদের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখান যে, বাগদাদের আলেমরা সেই সময় নিজেদের মধ্যে ফিকহি ও কালামি বিতর্কে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, তারা মঙ্গোল হুমকিকে গুরুত্ব দেননি। উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থের চেয়ে নিজেদের মতবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই জ্ঞানী ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের দায়িত্বচ্যুতিই বাগদাদের প্রতিরোধব্যবস্থার চূড়ান্ত পতন ত্বরান্বিত করেছিল।
সারজানি শেষ পর্যন্ত একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন, ঠিক যেমন একটি দেহ যখন তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারায়, তখন সামান্য ব্যাকটেরিয়াও তাকে মেরে ফেলতে পারে, তেমনি বাগদাদ যখন তার "সময় জ্ঞান, বাস্তব আকিদা, নৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ ক্ষমতা" হারিয়েছিল, তখন মঙ্গোলরা খুব সহজেই তা দখল করে নেয়। মঙ্গোলরা বাগদাদের প্রাচীর ভাঙার অনেক আগেই বাগদাদের ভিতরের সামাজিক ও রাজনৈতিক বুননটি এই গোষ্ঠীগত ঘৃণা ও নৈতিক পতনের কারণে সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল (ড. রাগিব সারজানি, কিসসাতুত তাতার মিনাল বিদায়া ইলা আইনি জালুত, ২০০৬। পৃষ্ঠা ৩৫১-৩৬২)।
জ্ঞানের পাহারাদারদের নীরবতা এবং 'গুসাউস সাইল'-এর মনস্তত্ত্ব
রাসূলুল্লাহ সা.-এর সেই বিখ্যাত হাদিস—"একসময় তোমরা সংখ্যায় অনেক হবে, কিন্তু তোমরা হবে বন্যার ফেনার মতো (গুসাউস সাইল) —এই উপমাটি বাগদাদের শেষ দিনগুলোর জন্য সবচেয়ে নিখুঁত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে হাজির হয়েছিল বলে মনে করেন রাগিব সারজানি। বাগদাদে তখন কিতাবের অভাব ছিল না, লাইব্রেরির তাকগুলো পাণ্ডুলিপিতে ঠাসা ছিল, মাদ্রাসার বারান্দাগুলো মুখস্থকারীদের আওয়াজে মুখরিত ছিল; কিন্তু সেই বিপুল জনসংখ্যার কোনো সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ওজন বা 'হায়বাত' (গাম্ভীর্য) ছিল না।
কেন এই বিপুল সংখ্যাও বন্যার ফেনার মতো গুরুত্বহীন হয়ে গেল? আলী সাল্লাবি এর উত্তর দিয়েছেন 'আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার' বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মতো মৌলিক সামাজিক দায়িত্বটির প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যুর মাধ্যমে। বাগদাদের শেষ যুগের আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ শাসকদের মুখের ওপর সত্য বলার নৈতিক সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন। তারা দরবারের ক্রোধ কিংবা সুযোগ হারানোর ভয়ে এক ধরনের 'সুবিধাবাদী নীরবতার সংস্কৃতি' বেছে নিয়েছিলেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহি. যে বাগদাদের রাজপথে চাবুকের আঘাত সহ্য করেও ওহী ও আকলের ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন, সেই বাগদাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম জালিম শাসকদের তোষামোদ করাকে দ্বীনি হিকমাহ বলে চালাতে চেয়েছিল; কিন্তু নিজেদের ঠিকই আকাবিরদের অনুসারী দাবি করতো। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিয়ী এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহি.-দের উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত করতে নিজেদের কম যেতো না।
সাল্লাবির তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জ্ঞান যখন কেবল কাগুজে তথ্যে রূপ নেয় এবং সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস না যোগায়, তখন সেই জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব ডেকে আনে। ১২৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মঙ্গোলরা যখন বাইতুল হিকমা'র বইগুলো দজলা নদীতে ফেলে দিচ্ছিল, তার বহু বছর আগেই আসলে সেই বইগুলোর ভেতরের 'প্রাণ' বা আমল পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল (আলী সাল্লাবি, ফিকহুন নাসর ওয়াত তামকিন, প্রাসঙ্গিক আলোচনা; রাগিব সারজানি, কিসসাতুত তাতার, পৃ. ৪২–৫৫)।
আমাদের সময়ের আয়নায় বাগদাদের পতন
সাল্লাবি ও সারজানির এই গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা আমাদের বর্তমান যুগের বৈশ্বিক মুসলিম সমাজের সামনে এক অত্যন্ত অস্বস্তিকর কিন্তু অনিবার্য আয়না এনে হাজির করে। তাঁরা আমাদের প্রমাণসহ দেখিয়েছেন, বাগদাদের পতন কোনো আকস্মিক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, দুনিয়াপ্রীতি, দায়িত্বহীনতা এবং সত্য থেকে বিচ্যুতির এক অবধারিত গাণিতিক ফলাফল।
তাঁদের এই যৌথ বিশ্লেষণ থেকে আমাদের জন্য তিনটি বড় বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষা অর্জিত হয়—
১. জ্ঞানের খোলস বনাম রুহ। জ্ঞান যদি কেবল কিতাবের পাতায়, মুখস্থ বিদ্যায় কিংবা একাডেমিক বাহাসে সীমাবদ্ধ থাকে কিন্তু সময়ের সঠিক উচ্চারণ, বাস্তববাদিতার তিক্ত মলাটে মোড়ানো, পপুলার বাজারের সস্তা কথাবার্তার প্রফুল্লতা ছেড়ে রূঢ় সত্যটি বলতে না পারে এবং মানুষের চরিত্র, আমল ও আত্মশুদ্ধি ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই জ্ঞান সমাজকে রক্ষা করতে পারে না।
২. ভোগবাদের আফিম। সীমাহীন বিলাসিতা এবং বস্তুগত আরাম-আয়েশের মোহ একটি জাতির লড়াই করার এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকে সম্পূর্ণ গলিয়ে দেয়।
৩. অভ্যন্তরীণ ঘৃণার মূল্য। ঘরের ভিতরে নিজেদের মধ্যে সামান্য বিষয় নিয়ে দলাদলি, কোন্দল, ঘরানা-নির্ভর অন্ধত্ব এবং পারস্পরিক সামাজিক ও ধর্মীয় বর্জন নীতি শত্রুর যেকোনো পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি দ্রুত একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে ফেলে।
১২৫৮ সালের বাগদাদ তাই কেবল ইতিহাসের ধুলো জমা কোনো দাফন করা অধ্যায় নয়; এটি প্রতিটি যুগের মুসলিম জনপদের জন্য এক জীবন্ত ঐশ্বরিক সতর্কবার্তা। যখনই কোনো সমাজ বাগদাদের মতো তার আত্মিক শক্তি (রুহ) হারিয়ে কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যের খোলস সর্বস্ব হয়ে উঠবে, তখনই ইতিহাসের কোনো না কোনো বাঁকে তার দরজায় (যুগের) হালাকু খানের মঙ্গোল বাহিনী এসে কড়া নাড়বে। এটাই ইতিহাসের নিয়ম, আর এটাই আল্লাহর অমোঘ সুন্নাতুল্লাহ (চিরন্তন নীতি) (রাগিব সারজানি, কিসসাতুত তাতার, পৃ. ৪২–৫৫; সাল্লাবি, 'আল-মাশরু‘উল মুঘুলি' , ২০০৯, পৃষ্ঠা ৪৯, ৬১-৬২, ১৬১, ১৯৬-১৯৮)।
ইজতিহাদের অকালমৃত্যু এবং অনুকরণপ্রিয়তার মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব
আব্বাসীয় খিলাফতের চূড়ান্ত পতনের কফিনে শেষ পেরেকটি কোনো মঙ্গোল তলোয়ার ঠোকেনি। সেই পেরেকটি ঠুকেছিল মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও আলেম সমাজের নিজস্ব চিন্তার স্থবিরতা। খিলাফতের শুরুর দিকে—বিশেষ করে বাইতুল হিকমাহর স্বর্ণযুগে, জ্ঞানচর্চার মূল চালিকাশক্তি ছিল knowledge production (জ্ঞান-উৎপাদন)। তখন গ্রিক, পারসিক কিংবা ভারতীয় পাণ্ডুলিপিগুলোকে কেবল অনুবাদ করা হয়নি, বরং সেগুলোকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন তত্ত্ব, নতুন সমীকরণ এবং নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্ম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ শতকগুলোতে এসে এই সক্রিয় ও সৃজনশীল চিন্তার ধারাটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। তার জায়গা দখল করে এক অন্ধ, যান্ত্রিক এবং অনুৎপাদনশীল imitation (অনুকরণপ্রিয়তা)।
ড. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি তাঁর ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন, যখনই মুসলিম মানস থেকে ইজতিহাদ তথা স্বাধীন ও মেথডলজিক্যাল চিন্তার অধিকার বিদায় নিল, তখনই খিলাফতের বুদ্ধিবৃত্তিক পতন ত্বরান্বিত হলো। আলেম ও গবেষক সমাজ নতুন যুগের জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন কোনো সমাধান খুঁজতে ভয় পেতে লাগলেন। তারা ধরে নিলেন, পূর্বসূরিরা যা কিছু লিখে গেছেন, তার বাইরে নতুন কিছু ভাবা মানেই গোমরাহী বা ধর্মচ্যুতি। এই চরম মনস্তাত্ত্বিক ভীরুতা জ্ঞানকে সচল ও বহতা নদী থেকে একটি বদ্ধ, পঙ্কিল জলাশয়ে পরিণত করল। জ্ঞানীরা তখন আর নতুন সত্যের সন্ধান করছিলেন না; তারা কেবল পূর্বতন কিতাবগুলোর ওপর commentary (ব্যাখ্যামূলক টীকা) এবং সেই টীকার ওপর আবার উপ-টীকা লেখার এক অন্তহীন যান্ত্রিক চক্রে নিজেদের বন্দী করে ফেলেছিলেন। (সাল্লাবি, ‘আল-মাশরু‘উল মুঘুলি’, ২০০৯, পৃষ্ঠা ১৮, ৬১-৬২, ১৬১-১৬২, ১৯৬-১৯৮; সাল্লাবি, ‘আ'সরুদ দাওলাতাইন আল-উমুওয়িইয়্যাহ ওয়াল আব্বাসিয়্যাহ ওয়া যুহুরু ফিকরিল খাওয়ারিজ, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ৯২, ৯৭, ১০৮)।
শাস্ত্রের স্তরভেদের বিলুপ্তি এবং অপজ্ঞান বা 'scientism'-এর রোগ
রাগিব সারজানি তাঁর কিসসাতুত তাতার-এ আরেকটি মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা বাগদাদের ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছিল। সেটি হলো, বিভিন্ন শাস্ত্রের নিজস্ব সীমা এবং ওজনের ধারণাগত বিলুপ্তি। স্বর্ণযুগের মনীষী যেমন আল-খাওয়ারিজমি কিংবা ইবনুল হাইসামরা খুব ভালো করে জানতেন গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো applied science (প্রয়োগযোগ্য বিজ্ঞান) কোন পদ্ধতিতে চলে, আর আকিদা বা কালামশাস্ত্রের মতো বিশ্বাসের জগৎ কোন ওজনে মাপা হয়।
কিন্তু শেষ যুগে এসে এই পরিপক্ব শাস্ত্রভেদ (Classification of knowledge) সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। একদল মানুষ দর্শনের সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ এবং জ্যামিতির নিশ্চয়তা দেখে মোহিত হয়ে গেলেন। তারা মনে করতে শুরু করলেন, ল্যাবরেটরি বা যুক্তির মাপকাঠি দিয়ে খোদ ওহী, আল্লাহর সিফাত এবং পরকালের অদৃশ্য সত্যকেও মাপা সম্ভব। এটি ছিল এক ধরনের আদিম scientism (বিজ্ঞানবাদ বা পদ্ধতিগত অহংকার), যা মানুষের সীমিত বুদ্ধিকে চূড়ান্ত বিচারক বানিয়ে দেয়। এর বিপরীতে আলেমদের আরেকটি অংশ এতটাই রক্ষণশীল হয়ে উঠলেন, তারা চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের মতো প্রয়োজনীয় জ্ঞানকেও সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলেন। তারা প্রশ্ন করা মাত্রই কাফের বা জিন্দিক ফতোয়া দেওয়ার এক বাতিকগ্রস্ততায় আক্রান্ত হলেন।
জ্ঞানের এই দুই চরম মেরুকরণ সমাজকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। একদিকে ওহীহীন বুদ্ধির অহংকার, অন্যদিকে আকলহীন ধর্মের জড়তা। এই দুই সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে ভারসাম্যপূর্ণ মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তি সভ্যতাকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তার চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটেছিল। ড. সারজানি দেখিয়েছেন, একটি সমাজ যখন নিজের শাস্ত্রের সীমানা ভুলে যায় এবং উপযুক্ত পদ্ধতিতে সত্য অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। (রাগিব সারজানি, ‘তাতারীদের ইতিহাস’ (বাংলা অনুবাদ), ২০১৬, পৃষ্ঠা ২৩, ৮১, ৯৩-৯৪, ১০৮, ১২২, ১৪০, ১৫২-১৫৩, ১৫৫-১৫৬, ১৭৫-১৭৭)।
১২৫৮ সালের ৬৫৬ হিজরির ফেব্রুয়ারি মাসের সেই অমাবস্যার রাতে দজলার দুই কূলে যা ঘটেছিল, তার চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি ঘটিয়েছিল মুসলিম মননের ভেতর। অন্তরের সেই নীরব আত্মসমর্পণ, যেখানে যুক্তি আর আত্মবিশ্বাসের শেষ প্রদীপটিও নিভে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক আতা মালিক জুওয়াইনি যখন মঙ্গোল কমান্ডারদের 'অবরোধ-যন্ত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব' আর 'সামরিক গোয়েন্দার নীরব জাল'—এই দুটি অস্ত্রের কথা লিখেছেন, তখন তিনি আসলে একটি বড় সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। প্রযুক্তি আর তথ্য যখন কোনো সভ্যতার হাতে থাকে না, তখন তার পতন অনিবার্য। কিন্তু তার চেয়েও গভীর সত্য হলো, কোনো সভ্যতা তখনই আত্মসমর্পণ করে, যখন তার চিন্তার জগৎ বাইরের জগতের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে। খলিফা আল-মুস্তা'সিমের দরবারে তখনো কালামের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিতর্ক, ফিকহি তর্ক আর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার জটিল জাল বোনা হচ্ছিল, অথচ বাইরে হালাকু খানের সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে সমগ্র খোরাসান ও ইরাকের ভূ-প্রকৃতি হাতের তালুর মতো চিনে ফেলেছিল। আজকের আমাদের এই ভূখণ্ডের চিত্রও যেন সেই পুরোনো ক্যানভাসের পুনরাবৃত্তি। যেখানে গণিত, প্রযুক্তি, অর্থনীতি বা আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাঠ নেই; আছে কেবল পুরোনো কিতাবের ওপর টীকা, আর টিকার ওপর উপ-টীকা লেখার এক অন্তহীন যান্ত্রিক চক্র। সময়ের দাবি মেটাতে মৌলিক কোনো কাজ নেই। এমনকি মৌলিক কিতাবাদির অনুবাদও নেই; বাজারের চাহিদার কিতাব ছাড়া।
নাসিরুদ্দিন তুসি যখন মঙ্গোলদের মারাগায় নতুন মানমন্দিরে আশ্রয় নিলেন, তখন তিনি শুধু একটি পর্যবেক্ষণাগার বেছে নেননি—তিনি বেছে নিয়েছিলেন সেই প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, যেখানে চিন্তা স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারে। আজ আমাদের সেরা মেধারাও ঠিক একই পথে হাঁটছেন। তারা দেশের মাটিতেই থাকতে চান, কিন্তু যেখানে নেই কোনো গবেষণা-অর্থায়ন, নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, নেই কোনো মেধাভিত্তিক ক্যারিয়ার-গঠন—সেখানে তারা শেষ পর্যন্ত পাড়ি জমান কেমব্রিজ, বার্লিন বা টরন্টোর ল্যাবে। আর যে ভূমি তাদের হারায়, সে ভূমি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় জ্ঞান উৎপাদনের শেষ সম্ভাবনাটিও—ঠিক যেমনটা হারিয়ে গিয়েছিল ১২৫৮ সালের সেই ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন দজলার স্রোত বইয়ের কালি আর শহীদের রক্তে কালো হয়ে গিয়েছিল।
আব্বাসীয়দের পতনের ইতিহাস আমাদের দেখায়, সক্রিয় নির্মাণ থেকে যান্ত্রিক অনুকরণের এই দীর্ঘ যাত্রাই ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের আসল বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মহত্যা। জ্ঞান যখন কেবল কিতাবের কঙ্কাল হয়ে থাকে কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর নীতি বা কর্মের জন্ম দিতে পারে না, তখন সেই জ্ঞান মৃত বস্তুর চেয়েও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বাগদাদ আমাদের শিখিয়েছে, একটি সভ্যতা কেবল বড় লাইব্রেরি বা মুখস্থ বিদ্যায় টিকে থাকে না। তাকে প্রতিনিয়ত সময়ের চ্যালেঞ্জ পড়তে জানতে হয়, নতুন উদ্ভাবনের সাহস রাখতে হয় এবং মেধার সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে হয়। এই ভারসাম্য যখনই নষ্ট হবে, তখনই ইতিহাস তার অমোঘ নিয়মে সেই সমাজকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে।

Post a Comment