Loading...

জ্ঞানের রাজধানীর ধ্বংস—বাগদাদে মঙ্গোল অবরোধ

জ্ঞানের রাজধানীর ধ্বংস—বাগদাদে মঙ্গোল অবরোধ
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ১২৫৮ সালে মঙ্গোল বাহিনীর বাগদাদ অবরোধের ঐতিহাসিক দৃশ্য, যেখানে আব্বাসীয় রাজধানী ধ্বংস হচ্ছে এবং জ্ঞানসভ্যতার পতনের প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
    ১২৫৮ সালে হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলদের বাগদাদ অবরোধ মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও জ্ঞানকেন্দ্রের পতনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত

    Previous Part.......

    বাগদাদের পতনকে শুধু একটি যুদ্ধের ঘটনা হিসেবে পড়লে ইতিহাসের আসল ক্ষত চোখে পড়ে না। ১২৫৮ সালে মঙ্গোল বাহিনী বাগদাদ অবরোধ করেছিল। শহর ভেঙেছিল। খলিফা নিহত হয়েছিলেন। মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রাসাদ, মসজিদ, বাজার, মহল্লা, গ্রন্থাগার—সব ভয়ংকর আঘাত পেয়েছিল। কিন্তু এর ভেতরে আরও গভীর এক ভাঙন আছে। এক জ্ঞাননগরীর পতন। এক রাজনৈতিক কল্পনার মৃত্যু। এক সভ্যতার কেন্দ্রচ্যুতি।

    বাগদাদ কেবল আব্বাসীয় রাজধানী ছিল না। এটি ছিল মুসলিম জ্ঞানসভ্যতার এক প্রধান প্রতীক। হারুনুর রশিদ, আল-মামুন, অনুবাদ আন্দোলন, বায়তুল হিকমাহ, চিকিৎসক, অনুবাদক, গণিতবিদ, দার্শনিক, কালামবিদ, কাগজের বাজার, বইয়ের দোকান, মজলিস, গ্রন্থাগার—এসব মিলিয়ে বাগদাদ মুসলিম ইতিহাসের এমন এক শহরে পরিণত হয়েছিল, যার নামের সঙ্গে ক্ষমতা, জ্ঞান, ভাষা, পাণ্ডিত্য ও সভ্যতার আত্মবিশ্বাস একসঙ্গে জড়িয়ে ছিল। সেই প্রতীকের পতন তাই কোনো রাজপ্রাসাদের পতনমাত্র নয়। এর সঙ্গে ভেঙে যায় এক যুগের মানসিক কেন্দ্র।

    মঙ্গোলরা বাগদাদে এসে শুধু শহর আক্রমণ করেনি। তারা এমন এক শহরে আঘাত করেছিল, যার শরীরে শতাব্দীর জ্ঞান, অহংকার, দুর্বলতা, অতীতগৌরব এবং বর্তমান অক্ষমতা একসঙ্গে জমে ছিল। জ্ঞাননগরী যদি নিজের রাজনৈতিক দেহ হারায়, তবে তার বইও নিরাপদ থাকে না। বাগদাদের পতনের আগে এই সত্য ধীরে ধীরে জমছিল। ১২৫৮ সেই জমাট ব্যর্থতার রক্তাক্ত দিন।

    যে শহর একদিন জ্ঞানের রাজধানী ছিল

    বাগদাদের নাম উচ্চারণ করলেই মুসলিম চেতনায় শুধু একটি শহর আসে না; আসে এক মানসিক মানচিত্র। দজলার তীরে দাঁড়ানো একটি নগর, যেখানে বাজার আছে, প্রাসাদ আছে, মসজিদ আছে, পাণ্ডুলিপি আছে, বই বিক্রেতা আছে, অনুবাদক আছে, চিকিৎসক আছে, জ্যোতির্বিজ্ঞানী আছে। এখানে রাজনীতি জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। জ্ঞান রাজনীতির মর্যাদা বাড়িয়েছে। খলিফার দরবার শুধু সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তির কেন্দ্র ছিল না; এক সময় তা ছিল পাণ্ডিত্য, অনুবাদ, বিতর্ক ও সংস্কৃতির আশ্রয়ও।

    বায়তুল হিকমাহ ছিল সেই দীর্ঘ বাগদাদি জ্ঞানজগতের একটি দীপ্ত নাম। এর রূপ নিয়ে ইতিহাসবিদদের আলোচনা আছে, কিন্তু বাগদাদের জ্ঞানী-পরিচয় এ আলোচনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। শহরটি বহু শতাব্দী ধরে অনুবাদ, গ্রন্থসংগ্রহ, চিকিৎসা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, প্রশাসনিক জ্ঞান, কাগজশিল্প, বই-বাজার ও পাণ্ডিত্যিক সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। এখানে গ্রিক, সিরিয়াক, ফারসি ও ভারতীয় জ্ঞান আরবি ভাষায় প্রবেশ করেছে; আরবি ভাষাও ধীরে ধীরে চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কালাম ও ফিকহের জ্ঞানভাষা হয়ে উঠেছে।

    এই শহরে একদিন হুনাইন ইবনে ইসহাকের মতো অনুবাদক পাণ্ডুলিপি তুলেছেন। আল-কিন্দি গ্রিক দর্শনকে আরবি-ইসলামী চিন্তার দরজায় বসিয়েছেন। আল-খাওয়ারিজমি সংখ্যাকে পদ্ধতিতে নামিয়েছেন। বানু মুসা জ্ঞানকে যন্ত্রে রূপ দিয়েছেন। সাবিত ইবনে কুররা জ্যামিতি, প্রমাণ, মাপ ও গতির ভাষাকে আরবিতে শাণিত করেছেন। তাদের প্রত্যেকের কাজ শহরের সঙ্গে সরাসরি এক জায়গায় বাঁধা না থাকলেও বাগদাদ ছিল সেই বৃহৎ পরিবেশের নাম, যেখানে এইসব কাজ মর্যাদা পেত, পৃষ্ঠপোষকতা পেত, পাঠক পেত, বিতর্ক পেত।

    বাগদাদের পতন তাই শুধু ইট-পাথরের ধ্বংস নয়। একটি জ্ঞান-পরিবেশের ওপর আঘাত। জ্ঞান-পরিবেশ মানে বইয়ের তাক নয়। মানুষ, ভাষা, অনুবাদ, পৃষ্ঠপোষকতা, শিক্ষক, ছাত্র, কাগজ, নকলনবিশ, বই-বাজার, নিরাপত্তা, দরবার, প্রশ্ন, বিতর্ক—সব মিলিয়ে যে সামাজিক দেহ, সেটিই জ্ঞান-পরিবেশ। শহর ভাঙলে এই দেহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

    লেস্ট্রেঞ্জ তাঁর Baghdad during the Abbasid Caliphate গ্রন্থে আব্বাসীয় বাগদাদের নগর-ইতিহাস, খাল, প্রাসাদ, বাজার, মসজিদ, পথ, এবং পরে ধ্বংসের সময়কার ভয়ংকর বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাগদাদের পতন-পর্বে তিনি শহরের লুট, হত্যাযজ্ঞ ও নগরজীবনের ভাঙনকে আব্বাসীয় ইতিহাসের শেষ গভীর আঘাত হিসেবে পড়েন। Le Strange, Baghdad during the Abbasid Caliphate, pp. 340–344.

    ফিলিপ হিট্টি History of the Arabs গ্রন্থে ১২৫৮ সালের ঘটনাকে আব্বাসীয় রাজনৈতিক ধারার বাগদাদি সমাপ্তি হিসেবে দেখান। তাঁর আলোচনায় খলিফা আল-মুস্তাসিমের দুর্বলতা, মঙ্গোল অগ্রযাত্রা, বাগদাদের আত্মসমর্পণ, হত্যাযজ্ঞ ও আব্বাসীয় কেন্দ্রের পতন একসঙ্গে এসেছে। Hitti, History of the Arabs, pp. 484–489.


    বাগদাদের মর্যাদা যত বড়, তার পতনের বর্ণনাও ততই শোক-ঘন। মৃতের সংখ্যা, বই নদীতে ফেলার গল্প, দজলার পানি কালো হওয়ার কথা—এসব ইতিহাসে আসে, মানুষের মনে আরও বড় হয়ে ওঠে। এগুলোকে বাদ দিলে মুসলিম চেতনার আঘাত বোঝা যায় না। এসব ছাড়া ইতিহাস অসতর্ক ইতিহাস।

    পতনের আগে শহরের ভেতর

    ১২৫৮ সালের আগে বাগদাদ একদিনে দুর্বল হয়নি। শহরের বাইরে মঙ্গোল বাহিনী আসার অনেক আগেই শহরের ভেতরে দুর্বলতার রেখা জমছিল। আব্বাসীয় খিলাফত তখনো নাম, মর্যাদা ও ঐতিহাসিক ওজনের দিক থেকে বিশাল। খলিফার নাম খুতবায় আছে, দরবার আছে, প্রাসাদ আছে, বাগদাদের অতীত আছে; কিন্তু সাম্রাজ্যের পুরোনো নিয়ন্ত্রণ অনেক আগেই ভেঙে গেছে। প্রদেশগুলো আলাদা শক্তির হাতে গেছে। সামরিক নেতৃত্ব বহুবার বদলেছে। তুর্কি সেনানায়ক, বুয়াইহি প্রভাব, সেলজুক কর্তৃত্ব, আঞ্চলিক আমিরদের উত্থান, খাওয়ারিজমি বিপর্যয়—সব মিলিয়ে আব্বাসীয় কেন্দ্রের বাস্তব শক্তি বহুদিন ধরে ক্ষয় হচ্ছিল।

    মর্যাদা কখনো কখনো শাসককে অন্ধ করে। বাগদাদেরও তা-ই হয়েছিল। শহর ভাবছিল, তার অতীতই যেন তার দেয়াল। খিলাফতের নাম যেন মঙ্গোলদের থামিয়ে দেবে। কিন্তু ইতিহাসে নামের সঙ্গে শক্তি না থাকলে নাম ক্রমে প্রতিধ্বনি হয়ে যায়। আল-মুস্তাসিমের দরবারে সেই প্রতিধ্বনি ছিল, বাস্তব প্রস্তুতি ছিল না।

    খলিফা আল-মুস্তাসিম বিপদের মাপ বুঝতে পারেননি—এ কথা বহু বর্ণনায় ফিরে আসে। তাঁর চারপাশে পরামর্শ ছিল, কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা ছিল না। সেনাবাহিনী যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। শহরের প্রতিরক্ষার পরিকল্পনা দুর্বল ছিল। মঙ্গোলদের সামরিক শক্তি, তাদের অবরোধ-কৌশল, তাদের ভয়কে অস্ত্র বানানোর পদ্ধতি—এসবকে যে গুরুত্ব দিয়ে পড়া দরকার ছিল, তা হয়নি। অতীতের গৌরব বর্তমানের সামরিক হিসাবকে ঢেকে ফেলেছিল।

    উজির ইবনুল আ’লকামির নাম এই জায়গায় বারবার আসে। অনেক মুসলিম বর্ণনায় তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি মঙ্গোলদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন, আব্বাসীয় সেনাবাহিনী দুর্বল করেছিলেন, খলিফাকে ভুল পথে নিয়েছিলেন। কিন্তু এই বয়ান ব্যবহার করতে সতর্কতা লাগে। পরাজয়ের পরে সমাজ প্রায়ই একজন বিশ্বাসঘাতক খোঁজে। কারণ তাতে বিশাল ভাঙনের দায় একজন মানুষের ঘাড়ে রাখা যায়। ইবনুল আ’লকামি সম্পূর্ণ নির্দোষ—এ কথা যেমন প্রমাণ ছাড়া বলা যায় না, তেমনি বাগদাদের পতন শুধু তাঁর বিশ্বাসঘাতকতায় ঘটেছে—এ কথাও ইতিহাসকে ছোট করে।

    একজন উজির শহর ধ্বংস করতে পারে তখনই, যখন শহরের রাজনৈতিক দেহ আগে থেকেই অসুস্থ। সেনা দুর্বল, প্রদেশ আলাদা, দরবার বিভ্রান্ত, শাসক বাস্তবতা-বোধ হারানো, অর্থনীতি ও প্রশাসন ক্লান্ত—এইসব না থাকলে এক ব্যক্তির ষড়যন্ত্র ইতিহাসের এত বড় দরজা খুলে দিতে পারে না। তাই ইবনুল আ’লকামির প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু অধ্যায়ের কেন্দ্র হবে না। কেন্দ্র হবে আব্বাসীয় বাগদাদের ভেতরের দীর্ঘ ক্ষয়।

    মুহাম্মদ আবদুল করিম বাগদাদের পতনকে শুধু অবরোধের ঘটনা হিসেবে দেখেন না। তিনি এর পেছনে মধ্য এশীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, খাওয়ারিজমি শক্তির উত্থান-পতন, মঙ্গোল সম্প্রসারণ, আব্বাসীয় দুর্বলতা এবং অঞ্চলগত ভাঙনের কথা আনেন। তাঁর আলোচনায় বাগদাদের পতনের পেছনে inner and outer causes (অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কারণ) দুটোই কাজ করে। Karim, “Baghdad’s Fall and Its Aftermath,” pp. 187–224.

    মঙ্গোলদের শক্তি বুঝতেও বাগদাদ ব্যর্থ হয়েছিল। মঙ্গোলরা শুধু আরেক যাযাবর বাহিনী ছিল না। তারা মধ্য এশিয়া, ইরান, খাওয়ারিজমি অঞ্চল ভেঙে এগিয়ে এসেছে। তাদের যুদ্ধপদ্ধতি দ্রুত, নির্মম, সংগঠিত। তারা ঘোড়সওয়ার বাহিনী, অবরোধ-কৌশল, ভীতি-রাজনীতি, সহায়ক প্রকৌশলী, গোয়েন্দা তথ্য, এবং ধ্বংসের খবর—সব ব্যবহার করে। একটি শহর তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে, না ভাঙবে—এই ছিল তাদের ভাষা। খলিফার মর্যাদা, আব্বাসীয় ঐতিহ্য, খিলাফতের নাম—এসব মঙ্গোল সামরিক বাস্তবতাকে থামাতে পারত না।

    ডেভিড মর্গান The Mongols গ্রন্থে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সামরিক গঠন, রাজনৈতিক কৌশল ও পশ্চিম এশিয়ার দিকে তাদের অগ্রযাত্রা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর আলোচনায় মঙ্গোল বিজয়কে কেবল নিষ্ঠুরতার গল্প হিসেবে নয়, সামরিক সংগঠন, কৌশল, প্রশাসনিক অভিযোজন ও রাজনৈতিক লক্ষ্যসহ পড়তে হয়।

    বাগদাদের ভাঙন তাই বাইরে থেকে আঘাত ও ভেতরের ক্ষয়ের মিলিত ফল। মঙ্গোলরা আঘাত করেছে। কিন্তু আঘাতের আগে শহর নিজেকে এমনভাবে রক্ষা করার শক্তি হারিয়েছিল, যা তার মর্যাদার সঙ্গে মানাত না। বাগদাদে জ্ঞান ছিল, কিন্তু জ্ঞানকে রক্ষা করার রাজনৈতিক কাঠামো ক্ষয়প্রাপ্ত ছিল। বই ছিল, কিন্তু বই রক্ষার মতো সিদ্ধান্ত ছিল না। খিলাফতের নাম ছিল, কিন্তু সেই নামের পেছনে সামরিক শক্তি ছিল না। শহরের অতীত ছিল, কিন্তু অতীত দেয়াল নয়। মঙ্গোলরা যখন এলো, তারা এক জীবন্ত জ্ঞাননগরী পেল বটে; কিন্তু সেই নগরীর রাজনৈতিক হাড় তখন অনেক আগেই দুর্বল হয়ে গেছে।

    ভেতরের ক্ষয়: আলেম, পণ্ডিত ও সামাজিক এলিটদের নির্লিপ্ততা

    ১২৫৮ সালের আগে বাগদাদের এই যে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়া, তা কেবল খলিফা আল-মুস্তাসিমের একার অদূরদর্শিতা কিংবা উজির ইবনুল আ’লকামির গোপন আঁতাতের গল্প নয়। একটি সভ্যতার পতন যখন আসন্ন হয়, তখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক নেতৃত্বও এক গভীর মরীচিকার মধ্যে বাস করে। তৎকালীন বাগদাদের আলেম সমাজ, ধর্মীয় পণ্ডিত এবং সামাজিক অভিজাতদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে এক বড় ধরনের শূন্যতা চোখে পড়ে।

    বাগদাদে তখন জ্ঞান ছিল, মাদরাসা ছিল, কিতাবের বিশাল সম্ভার ছিল; কিন্তু অভাব ছিল সমসাময়িক বাস্তবতাকে পড়ার মতো চোখ। তৎকালীন আলেম ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের একটি বড় অংশই ব্যস্ত ছিলেন সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক বিতর্ক, কালাম শাস্ত্রের জটিল মারপ্যাঁচ এবং নিজেদের মধ্যকার উপদলীয় কোন্দলে। তারা মনে করেছিলেন, খিলাফতের এই ধর্মীয় ও প্রতীকী মর্যাদাই বুঝি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অজেয় ঢাল। তারা দোয়া-কালাম এবং আধ্যাত্মিক সান্ত্বনাকে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন, সমসাময়িক মঙ্গোলদের রণকৌশল, সামরিক বিজ্ঞান এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বোঝার প্রতি ঠিক ততটাই উদাসীন ছিলেন। জ্ঞান যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার দেয়াল তৈরি করতে পারে না, তখন সেই জ্ঞান কেবল পুঁথির পাতায় বন্দি হয়ে পড়ে।

    ইতিহাসের নির্মম সত্য এই যে, মঙ্গোলদের ঘোড়ার খুরের আওয়াজ যখন বাগদাদের দোড়গোড়ায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তৎকালীন সমাজ তখন মগ্ন ছিল আত্মঘাতী গৃহবিবাদে। হাফেজ ইবনে কাছির তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’-র ত্রয়োদশ খণ্ডের ২০২-২০৩ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখিয়েছেন, ১২৫৬ থেকে ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দের সেই চরম সংকটের মুহূর্তেও বাগদাদের ভেতরে শিয়া ও সুন্নি উপদলগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা চলছিল। বাগদাদের সুন্নি অধ্যুষিত এলাকার কিছু মানুষ এবং খলিফার প্রধান সেনাপতি রুকনুদ্দিন দাওয়াতদারের সুন্নি সৈন্যরা শিয়া অধ্যুষিত ‘কারখ’ (Karkh) এলাকায় নির্বিচারে হামলা চালায়। তারা সেখানে শিয়া নারীদের বন্দি করে এবং পুরুষদের হত্যা করে। এই চরম অপমানের প্রতিশোধ নিতে খলিফার শিয়া উজির ইবনুল আলকামি গোপনে মঙ্গোল নেতা হালাকু খানকে বাগদাদ আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান এবং খিলাফতের সামরিক শক্তি ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেন। যখন ঘরের দরজায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘাতক বাহিনী দাঁড়িয়ে, তখনো তারা নিজেদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও প্রতিশোধস্পৃহাকে দেশের প্রতিরক্ষার চেয়ে বড় মনে করেছিলেন।

    মাদরাসার শ্রেণিকক্ষগুলো তখন শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ার রণকৌশল খোঁজার পরিবর্তে ব্যস্ত ছিল ব্যাকরণের মারপ্যাঁচ আর একে অপরকে ‘পথভ্রষ্ট’ ফতোয়া দেওয়ার অসার প্রতিযোগিতায়। কট্টর হাম্বলি এবং আশআরি আলেমদের মধ্যে তীব্র আকিদাগত কাদা ছোড়াছুড়ি চলত, যার ফলে এক দল অন্য দলের পেছনে নামাজ পড়তে পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানাত। এমনকি মঙ্গোলরা যখন বাগদাদ অবরোধ করে, তখনো আলেমদের একাংশ কিতাবি বাহাসে লিপ্ত ছিলেন যে— মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ‘ফরজে আইন’ নাকি ‘ফরজে কেফায়া’, এবং এই যুদ্ধে শিয়াদের সাথে জোট করা জায়েজ হবে কি না! কিতাবের জটিল ব্যাকরণ ও আল্লাহর গুণাবলি নিয়ে কালাম শাস্ত্রের অতি-সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং "জান্নাতিরা জান্নাতে কোন ভাষায় কথা বলবে— আরবি নাকি ফারসি?", কিংবা "যদি কোনো ব্যক্তি পাখির পিঠে চড়ে নামাজ পড়ে, তবে তার কেবলা কোন দিকে হবে?"— এই ধরনের কাল্পনিক ফিকহি মাসআলার সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক চুলচেরা বিশ্লেষণই ছিল তৎকালীন প্রধান জ্ঞানচর্চা।

    বাস্তবতার এই অন্ধত্ব শুধু আলেমদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা গ্রাস করেছিল খিলাফতের সর্বোচ্চ আসনকেও। হালাকু খান যখন বাগদাদ অবরোধের আগে খলিফা আল-মুসতাসিম বিল্লাহকে আত্মসমর্পণের চিঠি পাঠান, তখন খলিফা তাঁর প্রতীকী মর্যাদাই এক অজেয় ঢাল মনে করে উত্তর দিয়েছিলেন যে, বাগদাদ আক্রমণ করলে সমগ্র বিশ্ব আল্লাহর নির্দেশে জেগে উঠবে এবং আসমানি গজব নাজিল হবে। আলাউদ্দিন আতা মালিক জুওয়ায়নি তাঁর ‘তারিখ-ই-জাহানগুশায়’ গ্রন্থের ফার্সি মূল সংস্করণের তৃতীয় খণ্ডে (কিংবা ইংরেজি অনুবাদের ২য় খণ্ডের পরিশিষ্ট অংশে) খলিফার এই অন্ধ আত্মবিশ্বাসের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন, যেখানে নাসিরুদ্দিন তুসির বিবরণী অনুযায়ী খলিফা মঙ্গোলদের সামরিক শক্তিকে খাটো করে দেখেছিলেন। দরবারের কট্টর পণ্ডিত ও রাজজ্যোতিষী হুসামুদ্দিন খলিফাকে এই বলে আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন যে— আপনি যদি মঙ্গোলদের সাথে যুদ্ধ করেন, তবে সূর্য উঠবে না, মেঘ জমবে না এবং পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। বিপরীতে, হালাকু খানের দরবারে থাকা মুসলিম বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ নাসিরুদ্দিন তুসি আবার হালাকু খানকে হিসাব কষে দেখান যে, অতীতেও অনেক আব্বাসীয় খলিফা মারা গেছেন কিন্তু মহাবিশ্বের নিয়মের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে খলিফার দরবারের আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক সান্ত্বনার যুক্তিটি শেষ পর্যন্ত বুদবুদের মতো ভেসে যায়।

    অথচ এই অলীক বিশ্বাসের আড়ালে রাষ্ট্র তখন সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। ইতিহাসবিদ ইবনে তিঁকতাকা তাঁর ‘আল-ফখরি ফিল আদাবিস সুলতানিয়াহ’ কিতাবের ৩৪৩-৩৪৫ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, খলিফা রাজকোষের অর্থ বাঁচানোর অজুহাতে নিয়মিত সেনাবাহিনীর বাজেট ও সৈন্যসংখ্যা ১ লক্ষ থেকে কমিয়ে মাত্র ১০-২০ হাজারে নামিয়ে এনেছিলেন। ছাঁটাই হওয়া সৈন্যরা যখন বাগদাদের রাস্তায় ভিক্ষা করছিল, ঠিক তখনই মঙ্গোলরা চিনের উন্নত বারুদ (Gunpowder), অগ্নিবাণ (Fire arrows) এবং বিশালাকার ক্যাটাপল্ট বা মেঞ্জেনিক প্রযুক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছিল। বাগদাদের কিতাবি পণ্ডিতরা তখনো দোয়া এবং খতমের মাধ্যমে অলৌকিক বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন, কিন্তু সমসাময়িক সামরিক বিজ্ঞানকে বোঝার বিন্দুমাত্র তাগিদ অনুভব করেননি। ইবনে তিঁকতাকা আরও লিখেছেন, মঙ্গোলরা যখন বাগদাদের দেয়ালের বাইরে তোপ দাগছে, খলিফা তখন তাঁর প্রিয় দাসী-নর্তকী লাফাত-এর গান শুনতে এবং কিতাবের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি দেখতে ব্যস্ত ছিলেন। হুট করে একটি মঙ্গোল তীর এসে জানালা গলে তাঁর প্রিয় নর্তকীকে আঘাত করে মেরে ফেলে। খলিফা তখন চমকে উঠে আক্ষেপ করেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

    ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন বাগদাদের পতন ঘটল, তখন প্রমাণিত হলো যে বস্তুগত প্রস্তুতিহীন অলৌকিক সান্ত্বনা কেবলই এক মরীচিকা। মঙ্গোলরা যখন বিখ্যাত ‘বাইতুল হিকমাহ’ ও নিজামিয়া মাদরাসার লাখ লাখ অমূল্য কিতাব দজলা নদীতে ফেলে দিল, তখন কিতাবের কালিতে নদীর পানি কালো আর মানুষের রক্তে তা লাল হয়ে উঠেছিল। যে জ্ঞান সমাজকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার দেয়াল তৈরি করতে পারল না, তা শেষ পর্যন্ত নদীর পানিতে ভেসে গিয়ে পুঁথির পাতার অসারতাই প্রমাণ করল। সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তাঁর ‘কিতাবুল ই'বার’-এর পঞ্চম খণ্ডের ৫৮২ নম্বর পৃষ্ঠায় এই চরম সত্যটিই উচ্চারণ করেছেন যে, কোনো জাতি যখন তার বস্তুগত শক্তি ও সামরিক সক্ষমতা বা আসাবিয়্যাহ হারিয়ে ফেলে, তখন কেবল পুঁথিগত বিদ্যার স্তূপ তার পতনকে এক মুহূর্তের জন্যও বিলম্বিত করতে পারে না।

    সামাজিক ও রাজনৈতিক এলিটদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। তারা ক্ষমতার বলয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু সামষ্টিক সুরক্ষার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তাদের ছিল না। সামরিক নেতৃত্ব বারবার পরিবর্তনের ফলে সেনাদলের ভেতরে কোনো চেইন অব কমান্ড বা দেশপ্রেমের জায়গা ছিল না। ইবনে কাসির তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, মঙ্গোলরা যখন দজলার তীরে এসে গেছে, তখনও শহরের ভেতরে আমির ও ওমরাহদের মধ্যে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হয়নি। সংকটের দিনে যেখানে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, সেখানে প্রত্যেকে নিজের আখের গোছাতে এবং খলিফাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে ব্যস্ত ছিলেন। (হাফেজ ইবনে কাছির, ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’, Vol. 13, pp. 233–236)।

    কে কোথায় অবহেলা করল, তার একটা মানচিত্র তৈরি করলে দেখা যায়—শাসক অবহেলা করেছেন দূরদর্শিতায়, সেনাবাহিনী অবহেলা করেছে রণপ্রস্তুতিতে, আর পণ্ডিত সমাজ অবহেলা করেছে সময়ের দাবি মেটাতে। তারা সকলেই ভাবছিলেন, অতীত গৌরবই তাদের বর্তমানের সমস্ত দুর্বলতা ঢেকে দেবে।

    হালাকু খানের ছায়া দজলার দিকে নামে

    হালাকু খান বিচ্ছিন্ন কোনো আক্রমণকারী ছিলেন না। তিনি বৃহৎ মঙ্গোল সাম্রাজ্যিক প্রকল্পের অংশ। মোংকে খানের নির্দেশে পশ্চিম এশিয়ায় মঙ্গোল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভিযান এগোয়। এর আগে মঙ্গোলরা খাওয়ারিজমি শক্তিকে ভেঙেছে, ইরান ও মধ্য এশিয়ার বহু অঞ্চল ধ্বংস করেছে, শহর-রাষ্ট্র, দুর্গ ও সামরিক শক্তিকে ভয় দেখিয়ে বা ভেঙে আনুগত্যে এনেছে। হালাকুর অভিযানে মঙ্গোল সেনার সঙ্গে ছিল নানা জাতির সৈন্য, অবরোধ-প্রকৌশলী, পূর্ব ও মধ্য এশীয় সামরিক কৌশল, এবং আতঙ্ককে যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে পাঠানোর অভ্যাস।

    মঙ্গোল যুদ্ধপদ্ধতির এক বড় দিক ছিল ভয়ের ব্যবহার। একটি শহর প্রতিরোধ করলে তার পরিণতি অন্য শহরের সামনে প্রদর্শিত হতো। যারা আত্মসমর্পণ করত, তারা কখনো রক্ষা পেত, কখনো করদ রাজ্যে পরিণত হতো। যারা প্রতিরোধ করত, তারা প্রায়ই ধ্বংসের মুখে পড়ত। এই কৌশল শুধু নিষ্ঠুরতা নয়; রাজনৈতিক যোগাযোগও। তাদের বার্তা ছিল, আনুগত্য অথবা ধ্বংস।

    বাগদাদের দিকে হালাকুর অগ্রযাত্রা এই বৃহৎ সামরিক ভাষার অংশ। খলিফার কাছে আত্মসমর্পণের দাবি পাঠানো হয়। আল-মুস্তাসিম উত্তর দেন। তাঁর উত্তরে খিলাফতের মর্যাদার সুর ছিল, কিন্তু বাস্তব সামরিক প্রস্তুতির দৃঢ়তা ছিল না। ইতিহাসে এমন মুহূর্ত বারবার আসে—শাসক মনে করেন, তাঁর নামই তাঁকে রক্ষা করবে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে নামের সঙ্গে বাহিনী, অর্থ, মিত্র, পরিকল্পনা, নেতৃত্ব, গতি, খাদ্য, জল, প্রতিরক্ষা—সব লাগে।

    জুভাইনি The History of the World Conqueror গ্রন্থে বাগদাদ অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি মঙ্গোল প্রশাসনিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই তাঁর লেখা মঙ্গোল-নিকট দৃষ্টিভঙ্গির সূত্র। তাকে সরল নিরপেক্ষ ইতিহাস ভাবা যাবে না। তবে মঙ্গোল রাজনৈতিক যুক্তি, হালাকুর অভিযান, আত্মসমর্পণ দাবির ভাষা, এবং বিজয়ী পক্ষের মানসিকতা বোঝার জন্য তাঁর বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ। Juvayni, The History of the World Conqueror, trans. Boyle, Vol. II, pp. 421–435.

    মঙ্গোল বাহিনী বাগদাদ ঘিরে ফেলে। নদী, খাল, প্রবেশপথ, শহরের চারদিক—সব সামরিক হিসাবের মধ্যে পড়ে। শহরের বাহিনী দুর্বলভাবে প্রতিরোধ করে। বাগদাদের বাইরে সংঘর্ষে আব্বাসীয় বাহিনী ভেঙে পড়ে। শহর অবরুদ্ধ হয়। মঙ্গোল অবরোধ-কৌশল শুধু দেয়াল ভাঙে না; মনও ভাঙে। শহরের মানুষ বুঝতে পারে, পুরোনো বাগদাদ আর নেই। যে শহর একদিন জ্ঞানী, কবি, চিকিৎসক, অনুবাদক, কেরানি, ব্যবসায়ী, আলেম, দার্শনিকের কণ্ঠে ভরা ছিল, এখন সে ঘিরে আছে ঘোড়ার খুর, ধোঁয়া, ভীতি ও অনিশ্চয়তায়।

    এই সময়ের বর্ণনাগুলোতে আবেগ, শোক, আতঙ্ক, অতিরঞ্জন সব আছে। কিন্তু মূল দৃশ্য স্পষ্ট। হালাকুর সামনে বাগদাদ অপ্রস্তুত। খলিফার কাছে মর্যাদা আছে, কিন্তু প্রতিরক্ষা নেই। দরবার আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত দুর্বল। শহর আছে, কিন্তু শহরকে রক্ষার মতো রাজনৈতিক বাস্তবতা ক্ষয়প্রাপ্ত।

    অবরোধের দিনগুলো

    ১২৫৮ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি। বাগদাদ ঘেরাও হলো। বাহিরের প্রতিরোধ দ্রুত ভাঙল। শহরের ভেতরে ভয় বাড়ল। খলিফা আলোচনায় এলেন। আত্মসমর্পণ ঘটল। তারপর যা ঘটল, তা মুসলিম চেতনায় দগদগে ক্ষত হয়ে রইল।

    মানুষ হত্যা করা হলো। সৈন্য, সাধারণ লোক, প্রাসাদের মানুষ, শহরের বাসিন্দা—সবাই বিপর্যয়ের মুখে পড়ল। মহল্লা লুট হলো। ঘর ভাঙল। বাজার ধ্বংস হলো। প্রাসাদ আঘাত পেল। মসজিদ ও গ্রন্থভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হলো। বইয়ের কথা আসে। দজলার পানি কালি ও রক্তে কালো হয়ে যাওয়ার কথা আসে। এই দৃশ্যের প্রতিটি অংশ ইতিহাসের কঠোর নথি হিসেবে একই মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত নয়, কিন্তু তার বেদনাময় শক্তি অস্বীকার করা যায় না।

    মৃতের সংখ্যা নিয়ে উৎসভেদে ভিন্নতা আছে। কেউ দুই লক্ষ বলে, কেউ আরও বেশি বলে, কেউ অতিরঞ্জিত সংখ্যা দেয়। মধ্যযুগীয় বিপর্যয়-বর্ণনায় সংখ্যা অনেক সময় হিসাবের চেয়ে শোকের ভাষা হয়ে ওঠে। তাই সংখ্যা ব্যবহার করতে সতর্ক হতে হয়। তবে সংখ্যার বিতর্ক ধ্বংসের মাত্রা ছোট করে না। শহর ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জনজীবন ভেঙেছিল। খলিফা নিহত হয়েছিলেন। আব্বাসীয় বাগদাদের রাজনৈতিক ধারার শেষ ঘটে।

    ইবন কাসির আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বাগদাদের ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর বয়ানে মুসলিম শোকের ভাষা তীব্র। খলিফার মৃত্যু, মানুষের বিপর্যয়, শহরের ধ্বংস—এসব সেখানে এক মুসলিম ঐতিহাসিক চেতনার ভার নিয়ে আসে। Ibn Kathir, al-Bidayah wa al-Nihayah, Vol. 13, pp. 233–236.

    খলিফা আল-মুস্তাসিমের মৃত্যুর বর্ণনা নিয়েও নানা কথা আছে। জনপ্রিয় বয়ানে আসে, তাঁকে কার্পেটে মুড়ে পিষে মারা হয়, যেন রাজরক্ত মাটিতে না পড়ে। এই গল্প মঙ্গোলদের কিছু রক্ত-সংক্রান্ত ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে বলা হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে উৎসের ভিন্নতা আছে। এখানে অতিরিক্ত নাটকীয়তা না বাড়িয়ে বলা যথেষ্ট—আব্বাসীয় খলিফা নিহত হন, এবং বাগদাদে আব্বাসীয় রাজনৈতিক কেন্দ্রের সমাপ্তি ঘটে।

    খলিফার মৃত্যু মুসলিম জগতে শুধু একজন শাসকের মৃত্যু নয়। আব্বাসীয় নাম বহুদিন ধরে রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে বেশি ছিল প্রতীকী ধারাবাহিকতা। সেই ধারাবাহিকতা মাটিতে পড়ল। মুসলিম পূর্বাঞ্চলের মানুষ দেখল, যে নাম শতাব্দী ধরে খুতবায় উঠেছে, যে রাজধানী সাম্রাজ্য, জ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, তা মঙ্গোল বাহিনীর সামনে ভেঙে পড়েছে। এই মানসিক আঘাতের মাপ শুধু মৃতের সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না।

    জুভাইনি বিজয়ী পক্ষের বয়ান দেন। ইবন কাসির শোকাহত মুসলিম বয়ান দেন। লেস্ট্রেঞ্জ শহরের নগর-ইতিহাসের আলোকে ধ্বংসের কথা আনেন। হিট্টি আব্বাসীয় ইতিহাসের বৃহৎ রূপরেখায় ঘটনাটি বসান। এই সব সূত্র একসঙ্গে পড়লে দেখা যায়, বাগদাদের পতনকে কোনো একক বয়ান ধরে শেষ করা যায় না। বিজয়ীর ভাষা, পরাজিতের কান্না, শহর-ইতিহাসের হিসাব, আধুনিক বিশ্লেষণ—সব একসঙ্গে লাগে।

    বই পোড়ার চেয়ে বড় ক্ষতি

    বাগদাদের পতনের সবচেয়ে বিখ্যাত বিবরণ বইয়ের ধ্বংস। দজলা নদীতে বই ফেলার গল্প, পানির কালো হয়ে যাওয়া, কালি ও রক্তের মিশ্র কল্পনা—এসব এত প্রচলিত যে অনেকের কাছে বাগদাদের পতন মানেই গ্রন্থাগারের মৃত্যু। কিন্তু এখানে একটু থামতে হয়। বই ধ্বংস হয়েছে। গ্রন্থাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাণ্ডুলিপি হারিয়েছে। তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু জ্ঞানের কেন্দ্রের পতন বই পোড়ার চেয়েও বড় ঘটনা।

    বই একা জ্ঞান নয়। বই জ্ঞানের বাহন। জ্ঞান বাঁচে মানুষের মধ্যে, পাঠের মধ্যে, শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কের মধ্যে, পৃষ্ঠপোষকতায়, নকলনবিশে, বই-বাজারে, চিকিৎসালয়ে, জ্যোতির্বিজ্ঞানী পর্যবেক্ষণে, মজলিসে, বিতর্কে, গ্রন্থের টীকার মধ্যে, প্রশাসনিক দপ্তরে। শহর ভাঙলে এই পুরো জাল ছিঁড়ে যায়। বাগদাদের পতনে শুধু পাণ্ডুলিপি হারায়নি; হারিয়েছে একটি জ্ঞান-পরিবেশের নিরাপত্তা।

    এখানেই institutional collapse (প্রাতিষ্ঠানিক পতন)-এর প্রশ্ন আসে। একটি জ্ঞাননগরী দাঁড়ায় বহু স্তরে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। অর্থনৈতিক স্থিতি। কাগজের জোগান। গ্রন্থসংগ্রহ। শিক্ষিত শ্রেণি। আলেম ও পণ্ডিতের মর্যাদা। প্রশাসনিক ভাষা। অনুবাদ-সংস্কৃতি। চিকিৎসাশিক্ষা। মজলিস ও বিতর্ক। নিরাপত্তা। এগুলো একত্রে জ্ঞানকে সামাজিক দেহ দেয়। মঙ্গোল আঘাত সেই দেহে আঘাত করেছিল।

    বায়তুল হিকমাহ নিয়ে অতিরঞ্জিত কল্পনা না করেও বলা যায়, বাগদাদ ছিল জ্ঞান-ঐতিহ্যের শহর। তার পতন মানে আরবি-ইসলামী জ্ঞানপ্রবাহের একটি কেন্দ্রে গভীর ফাটল। বই নদীতে ফেলার গল্প যদি আক্ষরিকভাবে পুরো সত্য না-ও হয়, তার সভ্যতাগত অর্থ অস্বীকার করা যায় না। মুসলিম চেতনায় এই গল্পের অর্থ—আমাদের কালি, আমাদের জ্ঞান, আমাদের পাণ্ডুলিপি, আমাদের শিক্ষার ঘর পানিতে ডুবে গেল।

    তবে এখানেও সতর্কতা দরকার। ১২৫৮ সালে মুসলিম জ্ঞান শেষ হয়ে যায়নি। এই কথা বলা যেমন ভুল যে কিছুই হয়নি, তেমনি এটাও ভুল যে ওই দিনই মুসলিম জ্ঞানচর্চার মৃত্যু ঘটে। বাগদাদের পতন ছিল কেন্দ্রের পতন, সম্পূর্ণ জ্ঞানের মৃত্যু নয়। এই পার্থক্য না ধরলে ইতিহাস কাঁদে, কিন্তু বুঝতে পারে না।

    নাসিরুদ্দিন তুসির মারাগা মানমন্দির পরে উঠে আসে। মঙ্গোল-ইলখানি পৃষ্ঠপোষকতার ভেতরেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী কাজ নতুন কেন্দ্র পায়। তুসি, তাঁর সহকর্মী, সারণি, মডেল, পর্যবেক্ষণ—এসব দেখায়, বাগদাদের পতনের পরও জ্ঞান নতুন পথ খুঁজেছে। করিম প্রবন্ধে বাগদাদ-পরবর্তী সময়ে তুসি ও মারাগার আলোচনায় দেখিয়েছেন, ধ্বংসের পরও কিছু জ্ঞানধারা নতুন কেন্দ্রে সরে যায়। Karim, “Baghdad’s Fall and Its Aftermath,” pp. 187–224.

    এ ইতিহাসের তিক্ততা গভীর। যে মঙ্গোল শক্তি বাগদাদ ধ্বংস করল, তাদের উত্তরসূরি রাজনৈতিক পরিবেশেই পরে মুসলিম পণ্ডিতরা কাজ করলেন। ধ্বংসকারী শক্তির ভেতর থেকেই পৃষ্ঠপোষকতা এল। কেউ ইসলাম গ্রহণ করল। ইলখানি শাসন নতুন জ্ঞানকেন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা করল। ইতিহাস সাদা-কালো নৈতিক নাটক নয়। তবু এই ধারাবাহিকতা বাগদাদের ক্ষত মুছে দেয় না। বরং দেখায়, জ্ঞান কখনো কেন্দ্র হারিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও নতুন জমি পেলে আবার ওঠে। কিন্তু পুরোনো নগরের ছায়া আর ফিরে আসে না।

    বিচ্ছিন্নতা, কিন্তু সম্পূর্ণ মৃত্যু নয়

    বাগদাদের পতনকে civilizational rupture (সভ্যতাগত বিচ্ছেদ) বলা যায়। তবে rupture (বিচ্ছেদ) মানে মৃত্যু নয়। একটি কেন্দ্র ভেঙে অন্য কেন্দ্রে জ্ঞান ছড়িয়ে যাওয়া। আব্বাসীয় বাগদাদের রাজনৈতিক কেন্দ্র শেষ হলো। পরে কায়রোতে মামলুকদের অধীনে নামমাত্র আব্বাসীয় খিলাফতের ধারাবাহিকতা তৈরি হলো, কিন্তু তা বাগদাদের খিলাফত নয়। নাম বাঁচল। দেহ বদলাল।

    মুসলিম জগতের মানচিত্রও বদলে গেল। মিসরে মামলুক শক্তি উঠল। ১২৬০ সালে আইন জালুতে মঙ্গোল অগ্রযাত্রা থামল। কায়রো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মর্যাদার নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠল। ইরান ও ইরাক অঞ্চলে ইলখানাত গড়ে উঠল। পরে মঙ্গোল শাসকদের একাংশ ইসলাম গ্রহণ করল। তাবরিজ, মারাগা, সুলতানিয়া, সমরকন্দ, হেরাত—নতুন কেন্দ্র উঠল। জ্ঞানচর্চা চলল। কিন্তু বাগদাদের মতো একক আব্বাসীয় কেন্দ্র আর ফিরল না।

    এখানে মুসলিম জ্ঞান-ইতিহাসকে দুটি অতিরিক্ত বক্তব্য থেকে বাঁচাতে হয়। প্রথম বক্তব্য—মঙ্গোল আক্রমণে সব শেষ। দ্বিতীয় বক্তব্য—কিছুই হয়নি, জ্ঞান চলেছে। দুটোই অর্ধসত্য। সব শেষ হয়নি, কারণ মারাগা আছে, কায়রো আছে, দামেস্ক আছে, পরে সমরকন্দ আছে, উলুঘ বেগ আছে, তিমুরীয় পৃষ্ঠপোষকতা আছে, উসমানীয়, সাফাভি, মুঘল জ্ঞানজগত আছে। আবার কিছুই হয়নি—এ কথা বলা নিষ্ঠুরতা। বাগদাদ ভেঙেছে। খলিফা নিহত হয়েছেন। জ্ঞান-পরিবেশের একটি কেন্দ্র ধসে পড়েছে। মুসলিম মানসিক মানচিত্র বদলে গেছে।

    এই পতনের পরে তাসাউফ, ফিকহ, মাদরাসা, হাদিস, ইতিহাসচর্চা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা—এসব চলেছে। কিন্তু রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্র বদলেছে। আগের আব্বাসীয় মহিমার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সভ্যতা আর আগের মতো নিজের দিকে তাকাতে পারেনি। এটি শুধু জ্ঞানগত নয়, মানসিক ভাঙনও। পরাজয় কখনো শুধু সৈন্যকে মারে না। ভাষা, কল্পনা, ভবিষ্যৎ-চিন্তা—এসবেও ফাটল ধরায়।

    এই জায়গায় মঙ্গোলদের ইসলাম গ্রহণের ইতিহাসও আসে। বারকে খান আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ইলখানি পরিসরে পরে গাজান খান ইসলাম গ্রহণ করেন। রশিদুদ্দিন হামাদানি জামি‘ আল-তাওয়ারিখ নামের বিশ্বইতিহাসধর্মী গ্রন্থ রচনা করেন। মঙ্গোল উত্তরাধিকারীরা ইসলামি ইতিহাসের ভেতর ঢুকে যায়। ধ্বংসকারী শক্তির সন্তানরাই কখনো মুসলিম রাজনৈতিক ও জ্ঞান-পরিবেশের অংশ হয়ে যায়। ইতিহাসের এই উলটপালট না বুঝলে বাগদাদের পতনকে শুধু শেষ দৃশ্য মনে হবে।

    কিন্তু ওই শেষ দৃশ্যের অভিঘাত তবু থাকে। বাগদাদ ছিল মুসলিম জগতের এক ঐতিহাসিক রাজধানী। তার পতনের পর মুসলিম জ্ঞান বেঁচে থাকলেও, সে আর সেই পুরোনো শহুরে কেন্দ্রীয়তার ভেতর বাঁচেনি। ছড়িয়ে গেছে। নতুন শহর খুঁজেছে। নতুন পৃষ্ঠপোষক খুঁজেছে। কখনো মঙ্গোল দরবারে, কখনো মামলুক কায়রোতে, কখনো পারস্যে, কখনো আনাতোলিয়ায়, কখনো মধ্য এশিয়ায়। জ্ঞান বেঁচে গেছে, কিন্তু বাড়ি বদলেছে।

    ইতিহাসের দর্পণ: বর্তমান মুসলিম পণ্ডিত সমাজ ও এক চেনা ভূখণ্ড

    বাগদাদের এই পতনের গল্প আজ আর কেবল ইতিহাসের ধূসর পাতা নয়, বরং তা বর্তমান বৈশ্বিক মুসলিম সমাজ এবং বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভূখণ্ডের সামাজিক ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের জন্য এক জীবন্ত আয়না। সময়ের ব্যবধানে মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে প্রায় একই রকম।

    বর্তমান মুসলিম পণ্ডিত সমাজের দিকে তাকালে তৎকালীন বাগদাদের সেই ‘অতীত আঁকড়ে বাঁচার’ প্রবণতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। আজকেও সমাজ বা রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটে পণ্ডিতদের একটি বড় অংশ শুধু অতীত সোনালী যুগের গৌরবগাথা শুনিয়ে আত্মতৃপ্তি খোঁজেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আধুনিক অর্থনীতি কিংবা ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের মতো বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জনের চেয়ে তারা এখনো অনেক ক্ষেত্রে তত্ত্ব ও আচারসর্বস্ব বাহাসে মগ্ন। বাগদাদের আলেমদের মতো আজকেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর (Institutional framework) অভাব প্রকট। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মাদরাসা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও, রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সুরক্ষাকবচ তৈরি করার মতো কোনো সম্মিলিত প্রয়াস বর্তমান পণ্ডিত সমাজের মধ্যে দেখা যায় না।

    এর পাশাপাশি রয়েছে সেই পুরনো মনস্তত্ত্ব—‘পরাজয়ের পর একজন খলনায়ক খোঁজা’। বাগদাদ পতনের সব দায় যেমন ইবনুল আ’লকামির ওপর চাপিয়ে সমাজ নিজের গা বাঁচিয়েছিল, বর্তমান সমাজেও ঠিক তেমনি নিজেদের অযোগ্যতা, অলসতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা স্বীকার না করে সবকিছুর পেছনে ‘বাইরের ষড়যন্ত্র’ বা ‘কনস্পিরেসি থিওরি’ খোঁজার এক অন্ধ প্রবণতা রয়েছে। ষড়যন্ত্র হয়তো থাকে, কিন্তু ভেতরের ঘর নড়বড়ে না হলে বাইরের হাওয়া তা সহজে ওড়াতে পারে না—এই সহজ সত্যটি বর্তমান পণ্ডিত সমাজ প্রায়শই এড়িয়ে যান।

    নির্দিষ্টভাবে আমাদের ভূখণ্ডের প্রেক্ষাপটে এই মিলগুলো আরও বেশি বেদনাদায়কভাবে দৃশ্যমান। এই ভূখণ্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে এক ধরণের ‘দীর্ঘ ভেতরের ক্ষয়’ চলছে। এখানকার বুদ্ধিজীবী ও আলেম সমাজের মধ্যে এক ধরণের গভীর বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এক পক্ষ যখন আধুনিকতা ও প্রযুক্তির মোহে পড়ে নিজের শিকড় আর সংস্কৃতিকে অবহেলা করছে, অন্য পক্ষ তখন ঐতিহ্য ও ধর্মের নামে আধুনিক দুনিয়ার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো থেকে চোখ বন্ধ করে রাখছে।

    সবচেয়ে বড় মিলটি পাওয়া যায় ‘মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়ের’ সংকটে। আলাউদ্দিন আতা মালিক জুওয়ায়নি তাঁর The History of the World-Conqueror (অনুবাদক: জন এ. বয়েল, ২য় খণ্ড) গ্রন্থের পরিশিষ্টে মঙ্গোলদের সেই নির্মম প্রশাসনিক ও সামরিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেছেন, যা খলিফার আবেগসর্বস্ব সুরকে চূর্ণ করে দিয়েছিল (Juvayni, The History of the World-Conqueror, Vol. II, Appendix: The Death of the Last 'Abbasid Caliph, pp. 756–760)।


    খলিফা আল-মুস্তাসিম-এর বাস্তব কোনো রণপ্রস্তুতি, লজিস্টিকস বা কৌশলগত হিসাব ছিলো না। ছিলো কেবল অতীতের গৌরব আর ধর্মীয় আবেগের ফাঁকা বুলি। খলিফা লিখেছিলেন, "পুরো মুসলিম বিশ্ব আমার পক্ষে, তোমরা আমাদের ধ্বংস করতে পারবে না।" বাচ্চাসুলভ জাতিগত দোহাই আর অতীত গৌরবের আত্মশ্লাঘা। যা দিয়ে তিনি মঙ্গোলদের থামাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হালাকু খানের নিখুঁত সামরিক গণিত, উন্নত প্রকৌশলবিদ্যা এবং সুসংগঠিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের নির্মম বাস্তবতার সামনে সেই সুর মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে যায়। আজকেও সেই চেনা ভূখণ্ডে যখন কোনো যোগ্য পণ্ডিত, গবেষক বা বিজ্ঞানী তৈরি হন, তখন দেশীয় কাঠামোতে মূল্যায়ন ও নিরাপত্তার অভাবে তারা ভিন্ন কোনো উন্নত বা দূরবর্তী রাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয় নেন। যেখানে উপযুক্ত গবেষণাগার, কাজের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মেধার সঠিক কদরের মতো কোনো ‘প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো’ নেই, সেখানে দলাদলি আর আমলাতান্ত্রিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে মেধাবীদের দমবন্ধ হয়ে আসাই স্বাভাবিক। ফলে, বাগদাদ পতনের পর উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে মহাবিজ্ঞানী নাসিরুদ্দিন তুসিকে যেমন শেষ পর্যন্ত মঙ্গোলদের তৈরি করা প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়েই চলে যেতে হয়েছিল, তেমনি বর্তমানের এই ভূখণ্ডের সেরা চিন্তাবিদ ও গবেষকেরাও নিজেদের মেধা টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমা বিশ্বের বাস্তববাদী কাঠামোর দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন। 


    নাসিরুদ্দিন তুসি যেভাবে বাগদাদের পতনের পর মঙ্গোল ইলখানিদের আশ্রয়ে মারাগা মানমন্দির গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনি আজকেও এই ভূখণ্ডের সেরা মেধাবীরা মাতৃভূমির ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে বাঁচতে বিদেশের মাটিতে গিয়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। জ্ঞান তার সুরক্ষার জন্য নতুন জমি খুঁজে নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পেছনে ফেলে যাওয়া সেই চেনা নগরী বা ভূখণ্ডটি রয়ে যাচ্ছে এক স্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক খরায়, ঠিক যেমনটা হয়েছিল ১২৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সেই রক্তস্নাত বাগদাদে।

    বাগদাদ আমাদের কী শেখায়?

    বাগদাদের পতন নিয়ে কথা বললে আমাদের সময়ের জন্য কিছু কঠিন প্রশ্ন উঠে আসে। শুধু মঙ্গোলদের নিষ্ঠুরতা বললে কাজ শেষ হয় না। শুধু বই নদীতে ফেলার গল্প বললেও হয় না। শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করলেও নয়। প্রশ্ন হলো, একটি জ্ঞানসভ্যতা নিজেকে কীভাবে রক্ষা করে? জ্ঞান, প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি, সামরিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, নৈতিক প্রশাসন, দূরদৃষ্টি—এসবের সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়?

    আজ আমরা অনেক সময় জ্ঞানকে content (বিষয়বস্তু) ভাবি। বই আছে, পিডিএফ আছে, বক্তৃতা আছে, ভিডিও আছে—তাই জ্ঞান আছে। কিন্তু বাগদাদ শেখায়, জ্ঞান একটি ecology (পরিবেশ)। তার মধ্যে বই আছে, মানুষ আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, অর্থ আছে, ভাষা আছে, নিরাপত্তা আছে, পৃষ্ঠপোষকতা আছে, শহর আছে, আইন আছে, বাজার আছে, কাগজ আছে, বিতর্ক আছে, অনুবাদ আছে। এই পরিবেশ ভেঙে গেলে বই থাকলেও জ্ঞান দুর্বল হয়।

    জ্ঞান ও ক্ষমতা আলাদা দ্বীপে থাকলে সভ্যতা ঝুঁকিতে পড়ে। জ্ঞান যদি ক্ষমতাকে নৈতিক না করে, ক্ষমতা জ্ঞানকে অলংকার বানায়। ক্ষমতা যদি জ্ঞানের প্রয়োজন না বোঝে, জ্ঞান নিরাপত্তাহীন হয়। বাগদাদে জ্ঞান ছিল, কিন্তু সেই জ্ঞানের চারপাশের রাজনৈতিক দেহ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। শাসক বাস্তবতা চিনলেন না। সামরিক প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না। আঞ্চলিক ভাঙন ছিল। পণ্ডিত ও উলামা সমাজ অন্ধ এবং দায়সারা অবস্থায় ছিলেন। সময়ের পাঠ থেকে বিমুখতা প্রদর্শনীকে জ্ঞানের অহংকার এবং পাণ্ডিত্য ও হকের মানদণ্ড ভেবে বসেছিলেন। দরবারিরা বিভক্ত ও বিভ্রান্ত ছিলেন। শত্রুর শক্তি ভুল মাপা হয়েছিল।

    এই ভুল আজও সম্ভব। একটি সমাজ অতীতের জ্ঞান নিয়ে গর্ব করে, কিন্তু বর্তমানের প্রতিষ্ঠান বানায় না। বইয়ের নাম জানে, কিন্তু গবেষণার পদ্ধতি জানে না। ইতিহাস স্মরণ করে, কিন্তু সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রয়োজন বোঝে না। আলেমকে সম্মান করে, কিন্তু জ্ঞান-প্রতিষ্ঠান গড়ে না। বক্তৃতা করে, কিন্তু অনুবাদ, পাণ্ডুলিপি-সম্পাদনা, গবেষণা-অর্থ, গ্রন্থাগার, শিক্ষার স্বাধীনতা, বিতর্কের আদব—এসবকে দীর্ঘমেয়াদি কাজে পরিণত করে না।

    বাগদাদ আমাদের সামনে এই অস্বস্তিকর আয়না ধরে। যে সভ্যতা একদিন গ্রিক, সিরিয়াক, ফারসি ও ভারতীয় জ্ঞানকে আরবিতে এনে নতুন দেহ দিয়েছে, চিকিৎসা, গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আলোকবিদ্যা, কালাম ও ফিকহ দিয়ে জ্ঞানের মানচিত্র বদলেছে, সেই সভ্যতার কেন্দ্রও একদিন অরক্ষিত হয়ে পড়ে। অতীতের আলো বর্তমানের দায়িত্ব থেকে কাউকে মুক্তি দেয় না।

    বাগদাদের পতন শুধু অতীতের দুঃখ নয়। এটি সতর্কতা। শহর ভাঙার আগে প্রায়ই প্রতিষ্ঠান ভাঙে। প্রতিষ্ঠান ভাঙার আগে বাস্তবতা-বোধ ভাঙে। বাস্তবতা-বোধ ভাঙার আগে মানুষ নিজের গৌরবকে বর্তমান শক্তি মনে করতে শুরু করে। বাগদাদ সেই ভুলের ইতিহাসও।

    শেষ দৃশ্যে দজলার পানি কালো হয়েছিল কি না—এই প্রশ্ন ইতিহাসবিদের। কিন্তু মুসলিম চেতনায় দজলা কালো হয়ে আছে—এ প্রশ্ন সভ্যতার। কালি, রক্ত, বই, খলিফা, শহর, জ্ঞান, শোক—সব একসঙ্গে মিশে আছে সেখানে। এই ক্ষত শুধু কান্নার জন্য নয়। এটি জিজ্ঞেস করে, তোমরা কি আবার জ্ঞানকে শহর দিতে পারবে? প্রতিষ্ঠান দিতে পারবে? নিরাপত্তা দিতে পারবে? নাকি কেবল হারানো বাগদাদের গল্প বলবে?

    যে সভ্যতা নিজের বই রক্ষা করতে চায়, তাকে শুধু গ্রন্থাগার বানালেই হয় না। তাকে বিচারবোধ, ক্ষমতা, পৃষ্ঠপোষকতা, জ্ঞানী মানুষ, নিরাপত্তা, নৈতিক রাজনীতি—সব গড়তে হয়। বাগদাদের পতন এই কথাটি রক্তে লিখে গেছে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment