Loading...

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জাতীয়-সাংস্কৃতিক দেবতায় রূপান্তর এবং ইসলামি আধ্যাত্মিকতার বিকল্প হিসেবে ব্রাহ্ম-রাবীন্দ্রিক অধিবিদ্যার অনুপ্রবেশ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জাতীয়-সাংস্কৃতিক দেবতায় রূপান্তর এবং ইসলামি আধ্যাত্মিকতার বিকল্প হিসেবে ব্রাহ্ম-রাবীন্দ্রিক অধিবিদ্যার অনুপ্রবেশ
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রাহ্ম-রাবীন্দ্রিক চিন্তা এবং বাংলার লোকায়ত ও ইসলামি আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের আন্তঃসম্পর্কের প্রতীকী ঐতিহাসিক চিত্র।
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রাহ্মসমাজ, লালন-বাউল ঐতিহ্য ও ইসলামি আধ্যাত্মিকতার সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব

    Previous Part.......

    ৪:২

    রবীন্দ্রনাথ: কবি থেকে ‘সাংস্কৃতিক দেবতা’ হয়ে ওঠা

    উনিশ শতকের শেষভাগে ও বিশ শতকের শুরুতে ঠাকুরবাড়ির প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও কলকাতার ভদ্রলোক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একজন কবি বা সাহিত্যিকের সীমানা ছাড়িয়ে একটি ‘জাতীয়-সাংস্কৃতিক দেবতা’ বা অবিসংবাদিত কাল্ট আইকনে রূপান্তর করা হয়। উনিশ শতকের শেষার্ধে এসে সুবে বাংলার মনস্তাত্ত্বিক ও নান্দনিক পরিমণ্ডলে রবীন্দ্র-কাল্ট বা রবীন্দ্র-ধর্মের যে প্রকাণ্ড ও নিশ্ছিদ্র আধিপত্য গড়ে তোলা হয়েছিল, তার নেপথ্যে কোনো আকস্মিক দৈব ঘটনা বা নিছক নিরঙ্কুশ কাব্যিক প্রতিভার একক ভূমিকা ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যের আড়ালে উগ্র আর্য-হিন্দু জাতীয়তাবাদের যে আগ্রাসী রাজনৈতিক ও দার্শনিক ফ্রেমওয়ার্কের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গিয়েছিলেন, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কর্পোরেট ও জমিদারি বুনিয়াদ তাকে এক নতুন, পরিমার্জিত ও ছদ্ম-সেক্যুলার রূপ দেওয়ার নিখুঁত ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করতে শুরু করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৪)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেবল একজন প্রতিভাবান কবি, গীতিকার বা ঔপন্যাসিকের সাধারণ ভৌগোলিক সীমানার ভেতর আটকে না রেখে, কীভাবে সমকালীন কলকাতার সমগ্র ভদ্রলোক নেটওয়ার্ক ও ঔপনিবেশিক রাজত্বের যৌথ আনুকূল্যে এক অলঙ্ঘনীয় ‘জাতীয়-সাংস্কৃতিক দেবতা’ বা বিকল্প বিশ্বাসের প্রক্সি-কন্টেক্সটে রূপান্তর করা হলো, তার মেকানিক্সটি অত্যন্ত সুগভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক। এই কাল্ট নির্মাণের প্রথম ও প্রধান ভিত্তিটি রোপণ করেছিলেন স্বয়ং রাজা রামমোহন রায় এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। যারা হিন্দু সমাজের তীব্র অবক্ষয় ও সুফি-ইসলামের সাম্যবাদী বিস্তারের মুখে প্রাচীন বৈদিক উপনিষদীয় দর্শনকে পুনরুজ্জীবিত করে এক নতুন ‘ব্রাহ্মধর্মের’ জন্ম দিয়েছিলেন। দেবেন্দ্রনাথের হাত ধরে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে যে উপনিষদীয় ব্রহ্মজ্ঞানের একচেটিয়া আভিজাত্য তৈরি হয়েছিল, রবীন্দ্রমানস ও রবীন্দ্রসংস্কৃতি মূলত সেই ব্রাহ্ম-রাবীন্দ্রিক অধিবিদ্যার ওপর ভিত্তি করেই ডালপালা মেলেছিল। যা বাহ্যিকভাবে দেখতে উদার ও প্রগতিশীল শোনালেও অবচেতনে তা ছিল প্রাচীন আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিরই এক পরিশীলিত ও আধুনিক নান্দনিক সংস্করণ (সেন, প্রবোধচন্দ্র। রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস, পৃষ্ঠা ১২)।

    এই কাল্ট নির্মাণের মেকানিক্সটি কাজ করেছিল মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তরে —অর্থনৈতিক একচেটিয়া আধিপত্য, প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারযন্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক জালিয়াতি এবং কলকাতার ভদ্রলোক সমাজের জন্য এক নতুন ‘হাই-কালচারের’ নন্দনতত্ত্ব উৎপাদন। ঠাকুরবাড়ি কেবল কোনো বুদ্ধিজীবী পরিবার ছিল না, তারা ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দালালি ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রত্যক্ষ সুফলভোগী এক বিশাল ভূস্বামী ও জমিদারি শক্তির প্রতীক। যার অধীনে সুবে বাংলার ও বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরের হাজার হাজার প্রান্তিক মুসলমান প্রজারা করের জোয়ালে অবদমিত হয়ে প্রতিনিয়ত বিত্তের জোগান দিচ্ছিলেন (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৪)। এই শোষিত গ্রামীণ রায়তদের রক্তের বিনিময়ে কলকাতায় যে বিপুল বিত্তের পাহাড় গড়ে উঠেছিল, তার জোরেই জোড়াসাঁকো বাংলার সাহিত্য, শিল্প ও নান্দনিক পরিমণ্ডলের একমাত্র ঠিকাদার বা অধীশ্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাণ্ডুলিপিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর বিখ্যাত কাটাকুটি ও বিমূর্ত ড্রয়িং বা রূপান্তরের পেছনে যে তীব্র মগ্নচেতনা কাজ করত, কলকাতার ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা ও প্রগতিশীল প্রচার মাধ্যমগুলো তাকে এক প্রকার অলৌকিক ও পবিত্র রূপ দিয়ে সাধারণ মানুষের মনোজগতে একচ্ছত্রভাবে প্রচার করতে শুরু করে (সেন, পুলিনবিহারী। রবীন্দ্রায়ণ (দ্বিতীয় খণ্ড), পৃষ্ঠা ১৭)। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাল্টটি এমন এক চতুর মেকানিজমে কাজ করত যে, একজন মানুষের নৈতিকতা, সুরুচি, আধুনিকতা ও প্রগতির একমাত্র চূড়ান্ত মাপকাঠি বানিয়ে দেওয়া হলো রাবীন্দ্রিক মানদণ্ডকে।

    যে ব্যক্তি রবীন্দ্রসংগীত বা রাবীন্দ্রিক নন্দনতত্ত্বের উপাসক, সে-ই সমাজে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘সংস্কৃতিবান’; আর যার যাপিত জীবনের শব্দ ও ঐতিহ্যের শেকড় ভিন্ন, সে-ই রাতারাতি ‘খ্যাত’, ‘আদিম’ বা ‘সংস্কৃতিহীন’ বলে দাগী হয়ে যায় (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫২, ৯৬)। এই প্রাতিষ্ঠানিক দেবতা নির্মাণের সবচেয়ে মারাত্মক এবং সুদূরপ্রসারী চক্রান্তটি সম্পন্ন হয়েছিল পূর্ববঙ্গের প্রান্তিক মুসলমান সমাজকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও ইতিহাসচ্যুত করার মাধ্যমে। উনিশ শতকে যখন নব্য শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান সমাজ স্বাধীনতা আন্দোলনের পর থেকে নিজেদের আত্মপরিচয়, ভাষা ও শিক্ষার অধিকার নিয়ে এক তীব্র অভ্যন্তরীণ ভাবদ্বন্দ ও সংকটে ভুগছিল, তখন কলকাতার এই রাবীন্দ্রিক হেজেমনি তাদের অবচেতনে এক চরম হীনম্মন্যতার বিষ ইনজেক্ট করে দেয় (আহমদ, ডক্টর ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), পৃষ্ঠা ৫, ৯৬)। উচ্চবর্ণের আশরাফ মুসলিম সমাজ যখন বাংলা ভাষাকে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে উর্দু বা ফারসির মোহে নিজেদের মাটির শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করছিল, আর আতরাফ বা অন্ত্যজ মুসলমানরা যখন নিজেদের দৈনন্দিন যাপিত জীবন রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ অত্যন্ত সুকৌশলে রাবীন্দ্রিক নান্দনিকতাকে একচ্ছত্র ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র একমাত্র ছাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে (আহমদ, ডক্টর ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), পৃষ্ঠা ১-২, ১৩৩)। এই অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্য থেকে এমন মনস্তাত্ত্বিক অন্ধত্ব আজও ঘুচেনি। যেকোনো আসন্ন ও সমূহ সংকটের প্রবেশের পথ অনায়াসে উন্মুক্ত রেখে, শেষ মুহূর্তে তাৎক্ষণিক ও তড়িৎ প্রতিক্রিয়া দেখানোর চিরাচরিত প্রবণতাকেই এখানে স্থায়ী সমাধান মনে করা হয়। নিজেদের অদূরদর্শিতা দিয়ে প্রথমে এক মহাবিপদ ডেকে আনা হয়, এবং পরবর্তীতে সব হারিয়ে "কিছুই করার নেই" এমন অবস্থায় হুঁশ ফেরে। আর এভাবে লড়াইয়ের ময়দানে জাতিকে অন্তত শত বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়।

    এরই প্রেক্ষাপটে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এই বঙ্গে বাঙালি মুসলমানের একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হয়েছিল। এর বিপরীতে রবীন্দ্র-হেজেমনি বা রাবীন্দ্রিক নান্দনিকতা একক আধিপত্য বিস্তার করে। ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ভূখণ্ডে মুসলমানদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব ও কোণঠাসা হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কারণ ছিল। এমনকি রবীন্দ্রনাথের একচ্ছত্র সাংস্কৃতিক দেবতায়ন বা কাল্ট আইকন হয়ে ওঠার পেছনেও একই উপাদান কাজ করেছে। আর তা হলো, তৎকালীন মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীদের দূরদর্শিতার চরম অভাব এবং তাদের পদ্ধতিগত প্রতিক্রিয়াশীলতা (Reactive Psychology)। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল নিজ সমাজের প্রতিভাবান লেখক ও কবিদের কাছে টেনে নিতে না পারার এক মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব। স্বীয় ভাষার লেখকদের দ্বীন-ধর্ম, দেশ ও মিল্লাতের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার মতো উদারতা তখনও প্রদর্শিত হয়নি। কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ কিংবা আল মাহমুদের মতো যুগান্তকারী সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে ওঠা-বসা, সৌহার্দ্যপূর্ণ সংলাপ করা, তাঁদের হৃদয়ের কাছে জায়গা দেওয়া এবং সুস্থ মতবিনিময়ের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে না পারার যে যৌথ ব্যর্থতা—তা-ই মূলত এই সংকটকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিল। মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীদের সেই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যর্থতার চরম মাশুল আজ এতকাল পরেও এই জনপদকে ভোগাচ্ছে।

    মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীদের মনস্তত্ত্বে এক ধরণের অদ্ভুত আভিজাত্যের বিভ্রম কাজ করে। যেনো তারা এই দেশের মাটির অংশ নন, বরং ইরান, তুরান বা আরবের সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। এই কৃত্রিম আভিজাত্যবোধের কারণে তারা সাধারণ বাঙালি মুসলমানের মুখের ভাষা এবং লোকসংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করতেন। তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, সংস্কৃতির লড়াইয়ে বিজয়ী হতে হলে মাটির শেকড়কে আঁকড়ে ধরতে হয়। ফলে বাঙালি মুসলমানের একটি বড় অংশ যখন নিজেদের মুখের ভাষাকেই মন থেকে আপন করে নিতে পারেনি, তখন স্বভাবতই একটি বিশাল সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যস্থানে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এবং রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সাহিত্যিক আবেদন এসে আসন গেড়ে বসে, যা পরবর্তীতে একচেটিয়া আধিপত্যে রূপ নেয়।

    এই সংকটের দ্বিতীয় স্তরে কাজ করেছে, মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীদের মনস্তত্ত্বে সবসময় এক ধরণের ‘সংকটের অপেক্ষায় থাকা’র প্রবণতা। কোনো একটি ঐতিহাসিক রূপান্তর বা সাংস্কৃতিক শূন্যতা যখন তৈরি হতে থাকে, তখন আগাম দূরদর্শিতা দিয়ে নিজস্ব বিকল্প কাঠামো তৈরি না করে, সেই শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। উনিশ শতকে যখন ইংরেজি শিক্ষা, আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র, সংবাদপত্র এবং পরিশীলিত সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে একটি নতুন আধুনিক সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছিল, তখন মুসলিম সমাজকে সৃজনশীল বিনির্মাণে যুক্ত না করে কেবল ফতোয়া ও বর্জনের নীতিতে ব্যস্ত রেখেছিলেন ইসলামপন্থীরা। সংস্কৃতির এই সামগ্রিক বয়কট-নীতি এবং অনুদার ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মুসলমান সমাজের প্রচলিত ও পরিচিত ইসলামপন্থী বলয়ে নিজস্ব কোনো শক্তিশালী আধুনিক সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক ধারা গড়ে উঠতে পারেনি। একটি সমাজ কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান দিয়ে বাঁচে না। তার জন্য দরকার হয় গল্প, উপন্যাস, সঙ্গীত, কবিতা ও দর্শনের এক জীবন্ত জগৎ। ইসলামপন্থীরা যখন এই আধুনিক নান্দনিক জগৎ তৈরিতে ব্যর্থ হলেন বা একে দূরে ঠেলে দিলেন, তখন নব্য শিক্ষিত মুসলিম তরুণ ও তরুণীদের মনস্তাত্ত্বিক খোরাক মেটানোর জন্য রবীন্দ্র-সাহিত্যের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প রইল না। এই সৃজনশীল বন্ধ্যাত্ব এবং সংস্কৃতির ময়দান থেকে স্বেচ্ছায় পিছু হটে যাওয়া, রবীন্দ্রনাথকে এই জনপদে একচ্ছত্র সাংস্কৃতিক অভিভাবক বা দেবতায় রূপান্তরিত করার পথকে সুগম করেছিল।

    তৃতীয়ত, এই মনস্তত্ত্বের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া’। মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীরা দীর্ঘকাল যাবৎ নিজে থেকে কোনো অগ্রণী বা প্রগ্রেসিভ সাংস্কৃতিক এজেন্ডা তৈরি করতে পারেননি। তারা সবসময় অন্যের তৈরি করা এজেন্ডার বিপরীতে কেবল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। যখন হিন্দু সমাজ বা কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা বাংলা সাহিত্যকে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীকে রঞ্জিত করছিলেন, তখন মুসলিম নেতৃত্ব নিজস্ব মিথলজি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে আধুনিক রূপ দিয়ে পাল্টা নান্দনিক বয়ান তৈরি করতে পারলেন না। ইসলামপন্থীরা কেবলই একে ‘হিন্দুয়ানি’ বা ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে দূরে ঠেলে দিলেন। যার ফলে সংস্কৃতির মাঠটি প্রতিপক্ষের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে যখন দেখা গেল যে নিজেদের তরুণ প্রজন্ম সেই সংস্কৃতির প্রতিই ঝুঁকে পড়েছে এবং ঘরের অন্দরেও তা প্রবেশ করেছে, ঠিক তখনই কেবল মুসলিম নেতৃত্ব একে তাদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখতে শুরু করলেন। অর্থাৎ, সমস্যাকে অঙ্কুরেই সমাধান না করে, তাকে মহীরুহ হতে দেওয়া এবং পরে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এই মনস্তত্ত্বের অংশ ছিল। হঠাৎ করে ঘর বাঁচানোর জন্য তারা এক ধরণের আক্রমণাত্মক বা প্রতিরক্ষামূলক লড়াই শুরু করলেন। যা শূন্য হাতে কেবল ক্ষোভ বা আবেগ দিয়ে সেই বিশাল সাংস্কৃতিক ইমারতের সাথে লড়া, অসম ও কঠিন করে তুলেছিল।

    চতুর্থত, মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীদের পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থা ও মাদরাসাগুলোর পাঠ্যক্রমের সীমাবদ্ধতাও এর জন্য সমানভাবে দায়ী। এই শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক যুগের রূপান্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিশ্বসাহিত্য কিংবা মননশীলতার সমকালীন ধারার সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করাতে পারে না। তা মূলত এক ধরণের ঐতিহ্যমুখী ও রক্ষণশীল কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে, এই শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যারা উঠে আসেন, তারা সমসাময়িক আধুনিক রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বয়ানের মোকাবিলা করার মতো তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার তৈরি করতে পারেন না; যদি না ভাগ্যগুণে কোনোভাবে নিজে থেকে অথবা দৈবক্রমে কোনো মহান জ্ঞানবৃক্ষের ছোঁয়ায় সেটা শেখা হয়। ফলত, তারা যখন কলকাতার রাবীন্দ্রিক হেজেমোনি কিংবা বাবু সংস্কৃতির মুখোমুখি হন, তখন কেবলই একটি ধর্মীয় আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিতে হয়। কোনো বিকল্প ও গ্রহণযোগ্য আধুনিক বয়ান তৈরি করার উপায়-উপকরণ তাদের ঝুড়িতে থাকে না। এই বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার অক্ষমতা মুসলিম সমাজকে সাংস্কৃতিক রাজনীতির মাঠে ক্রমশ পরাজিত ও দেউলিয়া করে তুলতে শুরু করেছিলো এবং আজও অব্যাহত।

    বস্তুত, আমাদের সমাজ মনস্তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ বিমুখ। যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগ করা কিংবা গবেষণার মাধ্যমে নিজেদের একটি বিকল্প আধুনিক রূপরেখা তৈরি করার চেয়ে তাৎক্ষণিক হুজুগ, রাজনৈতিক স্লোগান বা আবেগীয় প্রতিরোধকে মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীরা বেশি পছন্দ করেন। সাহিত্য, দর্শন বা শিল্পকলা যে একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার সবচেয়ে বড় ঢাল, এই সত্যটি তারা বুঝতে চান না। তারা যখনই কোনো বিপদে পড়েন, তখন তাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে তার মোকাবিলা না করে, কেবলই এক ধরণের আবেগীয় প্রতিরোধের আশ্রয় নেন। এরই ধারাবাহিকতায় এই অঞ্চলের মুসলিম নেতৃত্ব ও ইসলামপন্থীরা নিজেদের অদূরদর্শিতা, সৃজনশীল বন্ধ্যাত্ব এবং সংস্কৃতির মাঠ থেকে স্বেচ্ছায় পিছু হটার মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের ঘরে অন্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রবেশপথ সুগম করে দিয়েছিলেন। পরে যখন ঘর উজাড় হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তখন তারা হুশ ফিরে পেয়ে এক অসম ও কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হয়েছেন। যা কোনো আকস্মিক নির্বুদ্ধিতা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের ঐতিহাসিক পরিণতি।

    এই ভুল তখন হিন্দু পণ্ডিত ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা বেঘোরেও করেননি। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্যে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, শ্বেতাশ্বতর ও কঠোপনিষদের শ্লোক ও আধ্যাত্মিক বাণীগুলো সরাসরি ব্যবহার বা পরিমার্জিত অনুবাদ করে পরিবেশন করতে শুরু করেন। আর তা এমন এক মোড়কে হাজির করা হলো, যা মুসলমানদের নিজস্ব সুফি-মরমি তাসাউফ, মিলাদ-শরিফ বা তাওহিদি চেতনার এক বিকল্প ছদ্ম-ধর্মীয় প্রক্সি-বিশ্বাস বা ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ হিসেবে কাজ করতে পারে (সেন, প্রবোধচন্দ্র। রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস, পৃষ্ঠা ১২, ৪৩৭)। এই প্রক্সি-ধর্মের মনস্তাত্ত্বিক জাল এতটাই সুনিপুণ ছিল যে, এটি একজন মুসলমানকে তার মাটির আদিম তাওহিদি ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমন এক ছদ্ম-সেক্যুলার কুয়াশার মধ্যে ফেলে দেয়, যেখানে সে নিজের অজান্তেই তার পূর্বপুরুষের ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বা ‘অনগ্রসর’ মনে করে বর্জন করতে শুরু করে এবং কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার চিরস্থায়ী গোলামে পরিণত হয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১৫, ২৩)।

    এই নান্দনিক উপনিবেশায়নের মূল লক্ষ্যই ছিল, পূর্ববঙ্গের তাওহিদি সংখ্যাগুরু জনসমষ্টি যেন কখনো তাদের নিজস্ব স্বকীয় সংস্কৃতির বুনিয়াদে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। চিরকাল কলকাতার নান্দনিক করদরাজ্য হিসেবে কলকাতার ভ্যালিডেশনের দিকে তাকিয়ে থাকে (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১২৫)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যে শারীরিক ও রাজনৈতিক ঘৃণার ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্র-কাল্ট তাকে এক পরিশীলিত, মিষ্টি ও আধ্যাত্মিক আবরণে ঢেকে, মুসলমানদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও পঙ্গু করে ফেলার এক নিখুঁত হাতিয়ারে রূপান্তর করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)। তারা প্রমাণ করতে চাইল, এই ভূখণ্ডে যা কিছু সুন্দর, প্রগতিশীল বা উচ্চাঙ্গের, তার একমাত্র একচেটিয়া অধিকার ও ঠিকাদারি কেবল কলকাতার বাবুদের ও শান্তিনিকেতনের প্রাতিষ্ঠানিক মন্দিরের কাছেই সংরক্ষিত। উনিশ শতকের কলকাতার সেই ছদ্ম-সেক্যুলার বেঙ্গল রেনেসাঁসের একটি স্পষ্ট ধারাবাহিকতা ছিল। এর পাশাপাশি ছিল বঙ্কিমের আক্রমণাত্মক ফ্রেমওয়ার্ক। ঠিক এর সমান্তরালেই রবীন্দ্র-ধর্মের এই অতি-প্রাকৃতিক কাল্ট আইকন নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম সফল করা হয়েছিল। এই পুরো প্রক্রিয়াই বাঙালি মুসলমানের মনোজগৎকে এক দীর্ঘমেয়াদী শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে। এর ফলে তার নিজস্ব মাটির সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সেই স্বাভাবিক বিকাশকে গলা টিপে হত্যা করতে এই মেকানিজম আজও বাংলাদেশে সমানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৮২)।

    ব্রাহ্ম-রাবীন্দ্রিক অধিবিদ্যা বনাম সুফি মরমিবাদ

    পূর্ববঙ্গের উর্বর পলল ভূমিতে জন-সাধারণের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল, তাদের অবচেতনে এর মূল চালিকাশক্তি প্রাতিষ্ঠানিক কিতাবী কোনো ধর্মতত্ত্ব ছিল না। বরং তা ছিল সুফি-সাধক ও মরমি দরবেশদের এক লোকায়ত ও কওম জীবন-রসায়ন। এই অঞ্চলের ব্রাত্য অনার্য জনগোষ্ঠী যখন উচ্চবর্ণের সনাতন স্মার্ত সমাজ ও কর্ণাটকের সেন রাজাদের চাপানো কঠোর বর্ণাশ্রম ও অস্পৃশ্যতার সামাজিক আপার্থাইড থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিল, তখন সুফিদের উদার মরমিবাদ ও ‘আখলাক’ বা মানবিক আচরণ তাদের সামনে এক পরম আশ্রয়ের দ্বার উন্মোচন করে। সুফিদের এই দলবদ্ধ জিকির, আধ্যাত্মিক সুফি তরিকা এবং পীর-মাশায়েখদের লোকায়ত সাম্যবাদ রাতারাতি সাধারণ মেহনতি মানুষের মনোজগৎ জয় করে নেয়। যা এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগুরু মানুষের প্রধান আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু উনিশ শতকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কৃত্রিম সুফলভোগী কলকাতার যে নব্য কায়স্থ ও হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী ব্রিটিশ রাজত্বের ছায়াতলে একচেটিয়া ক্ষমতার মালিক হয়ে বসেছিল, তারা এই আদিম সুফি-মরমি ঐতিহ্যকে ‘সংস্কৃতিহীন’, ‘অ-বাঙালি নব-আবিষ্কৃত বা বেদাত’ এবং ‘অনগ্রসর’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার এক সুসংগঠিত চক্রান্ত শুরু করে। এই মনস্তাত্ত্বিক শূন্যস্থানে তারা "লোকায়ত বাঙালি চরিত্র"-এর মোড়কে নতুন নন্দনতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক বিকল্প খাঁড়া করতে প্রয়াসী হয়। যা ইতিহাসে ‘ব্রাহ্ম-রাবীন্দ্রিক অধিবিদ্যা’ (Brahmo-Rabindrik Metaphysics) নামে এলিট প্রক্সি-ধর্ম বা বিকল্প বিশ্বাস ব্যবস্থা হিসেবে গ্রামীণ ও শহুরে মুসলিম মানসে জবরদস্তিমূলকভাবে ইনজেক্ট করা হয়েছিল।

    রাবীন্দ্রিক এই বিশ্বজনীন মরমিবাদ বা আধ্যাত্মিকতার মূল শেকড়টি লুকিয়ে ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আদি ব্রাহ্ম মতাদর্শের ভেতর। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে উপনিষদের যে পরিমার্জিত একেশ্বরবাদী রূপ তৈরি হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তাকেই তাঁর বিপুল সাহিত্যের মন্ত্রশক্তি দিয়ে এক সর্বব্যাপী নান্দনিক রূপ দান করেন। রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র সেনের ‘রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস’ গ্রন্থের অকাট্য দাপ্তরিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনে ও কাব্যে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, শ্বেতাশ্বতর ও কঠোপনিষদ থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ধম্মপদের শ্লোক ও মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত-শকুন্তলার আধ্যাত্মিক নির্যাস সরাসরি ব্যবহার ও রূপান্তর করেছিলেন। এই প্রাচীন আর্য-ব্রাহ্মণ্য উপাদানের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি এমন এক অতি-প্রাকৃতিক ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’-এর প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট তৈরি করেন, যা বাহ্যিকভাবে দেখতে ছদ্ম-সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ মনে হলেও অবচেতনে তা ছিল মূলত একটি কট্টর এলিট প্রক্সি-বিশ্বাস।

    এই প্রক্সি-বিশ্বাসের মূল লক্ষ্যই হল, পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের প্রাত্যহিক তাওহিদি চেতনা, মাওলীদ, শবে বরাত বা সুফি খানকাহর শাশ্বত লোকায়ত ঐতিহ্যগুলোকে সুকৌশলে শহুরে ও গ্রামীণ মধ্যবিত্তের মনোজগৎ থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া। যাতে এদেশের সংখ্যাগুরু সমাজ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির জমিতেই পরাধীন ও মানসিক পরাজয়ের শিকার হয়ে চিরকাল কলকাতার নান্দনিক করদরাজ্য হিসেবে জোড়াসাঁকোর ভ্যালিডেশনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাঙালি মুসলিম সমাজের এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ও তীব্র অভ্যন্তরীণ ভাবদ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক রূপরেখাটি নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে ডক্টর ওয়াকিল আহমদের ‘উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের পর নব্য শিক্ষিত মুসলিম সমাজ আধুনিক শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার নিয়ে তীব্র সংকটে ভুগছিল, তখন কলকাতার এই রাবীন্দ্রিক হেজিমনি তাদের অবচেতনে এক স্থায়ী হীনম্মন্যতার বীজ বুনে দেয়। উচ্চবর্ণের আশরাফ মুসলিম সমাজ যখন নিজেদের আরবী-ফারসি-উর্দুর আভিজাত্যের মোহে অবদমিত রেখে গ্রামীণ অনার্য মুসলমানদের প্রাকৃত জীবনধারাকে ‘অশুদ্ধ’ মনে করছিল, তখন কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ অত্যন্ত সুকৌশলে এই ভাষিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে রাবীন্দ্রিক নন্দনতত্ত্বকে একমাত্র ‘প্রগতিশীল বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। সাধারণ মানুষের মুখের জীবন্ত আরবি-ফারসি মিশ্রিত প্রাকৃত শব্দগুলোকে ‘ম্লেচ্ছ’ বা ‘অশুদ্ধ’ বলে সমাজ থেকে শেমিং এবং অপদস্থ করার কারণে শিক্ষিত মুসলমানরা রাতারাতি তাদের নিজেদের ঘরের ভাষা ‘পানি, আব্বা, আম্মা, গোসল’ ইত্যাদি বলতে তীব্র লজ্জা ও হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে। "রবীন্দ্রায়ণের দ্বিতীয় খণ্ডে" পুলিনবিহারী সেনের সংকলিত প্রবন্ধে কবিগুরুর পাণ্ডুলিপির যে বিখ্যাত কাটাকুটি ও বিমূর্ত রূপান্তরের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে সুশীল বুদ্ধিজীবীরা মুগ্ধ বিস্ময় প্রকাশ করতেন, তা আসলে ছিল পূর্ববঙ্গের ব্রাত্য মানুষের আদিম ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে একচেটিয়া উচ্চ-সাহিত্যের এলিট সম্পত্তিতে রূপান্তর করার এক প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম।

    এই মনস্তাত্ত্বিক আত্তীকরণ ও লুণ্ঠনের সবচেয়ে কুৎসিত রূপটি প্রকট হয় যখন বাংলার প্রাকৃত বাউল সম্পদ ও লালন শাহের লোকায়ত দর্শনকে তাদের মূল রাজনৈতিক-সামাজিক শেকড় থেকে পুরোপুরি উপড়ে নেওয়া হলো। ড. শশিভূষণ দাশগুপ্তের ‘Obscure Religious Cults’ গ্রন্থে পৌত্তলিক বাংলার নাথ ধর্ম, সহজিয়া উপাসনা ও নাথ যোগীদের হঠযোগের মাধ্যমে ‘কায়াসাধন’ ও ‘উল্টা-সাধন’ তত্ত্বের যে দীর্ঘমেয়াদী লোকায়ত মনস্তত্ত্ব বর্ণিত হয়েছে, তা মূলত পূর্ববঙ্গের অবদমিত অন্ত্যজ মানুষের এক প্রকার আদিম প্রাক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও আধ্যাত্মিক আশ্রয় ছিল। লালন ফকিরের গানের মূল বুনিয়াদ গড়ে উঠেছিল মানুষের জন্য সহজবোধ্য করার নিমিত্তে কওম নাথ-সহজিয়া ভাবাদর্শ এবং সুফি মরমিবাদের এক চমৎকার লোকায়ত রসায়নে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ও পতিসরের সুবিশাল জমিদারি দেখভাল করার সময় যখন এই লোকায়ত সম্পদের সন্ধান পান, তখন ঠাকুরবাড়ির প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও কলকাতার এলিট বুদ্ধিজীবী নেটওয়ার্ক খুব দ্রুত এই প্রাকৃত গানগুলোকে মেহনতি মানুষের গ্রামীণ পরিমণ্ডল থেকে উপড়ে নিয়ে আসেন। ড. মযহারুল ইসলামের ‘রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থের উপাত্তসমূহ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কীভাবে লালনের গানগুলোকে কলকাতার ড্রয়িংরুমের উপযোগী করে, ঘষে-মেজে, পরিমার্জিত ও ছাঁটাই করে একটি উচ্চ-সাংস্কৃতিক ব্রাহ্ম ছাঁচে আত্তীকরণ (Assimilation) করা হয়েছিল। যাতে এর ভেতরের আদিম লৌকিক বিদ্রোহ ও গণ-চরিত্রটি চিরতরে হারিয়ে যায়।

    এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লালনকে বাউল দর্শনের মূল ভূমি থেকে সরিয়ে এনে রাবীন্দ্রিক আন্তর্জাতিক মরমিবাদের এক নিরীহ অনুগামী হিসেবে হাজির করা হলো। অথচ এই লুণ্ঠিত বাউলদের মূল স্রষ্টা পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ মুসলমানদের কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক অধিকার কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ কোনোদিন দেয়নি। এই সুগভীর সাংস্কৃতিক জালিয়াতি ও নান্দনিক উপনিবেশায়নের মেকানিজমটি বুঝতে হলে আধ্যাত্মিক জগতের বিশ্বস্ত বুজুর্গদের ঐতিহ্যগত ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। দেওবন্দী আলেম হারুনুর রশীদ কাসেমি সংকলিত ‘গুলজারে দেওবন্দ’ গ্রন্থের ৫০-৫১ পৃষ্ঠায় "খুতুবাতে হাকীমুল ইসলাম"-এর সূত্রে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম প্রধান শিক্ষক, আরেফে কামেল মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী রাহি.-এর কাশফের ভিত্তিতে একটি গভীর সত্য উন্মোচন করা হয়েছে। মাওলানা নানুতবী রাহি. হিমালয় পর্বতের পাদদেশে গঙ্গার উৎসস্থলে টানা সাত দিন নামায, মোনাজাত এবং গভীর মোরাকাবা ও সাধনায় মগ্ন থাকার পর কাশফের (আধ্যাত্মিক উন্মোচন) মাধ্যমে গঙ্গার আসল হাকীকত বা রহস্য জানতে পারেন। তাঁর সেই আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে প্রকাশ পায়, যেখান থেকে মূলত গঙ্গা নদীর উৎপত্তি হয়েছে, সেখানে প্রাচীনকালে কোনো একজন পয়গাম্বর বা নবীর কবর অথবা বসার স্থান ছিল। সেই পয়গাম্বরের পবিত্র পদধূলির বরকতের কারণেই মূলত ওই ঝর্ণাধারাটি প্রবাহিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে তীব্র জাহালত বা মূর্খতার কারণে মানুষ সেই পানির অতি-তাজীম করতে করতে তাকে এক পরম পূজার বস্তুতে (গঙ্গা মা-তে) পরিণত করে ফেলে। ঠিক যেভাবে মক্কা মোকাররমার বুকে অবস্থিত পবিত্র জমজম কূপের সৃষ্টি হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার অপার করুণা যে, মুসলিমরা এর মর্যাদা, আজমত ও বরকতকে ইসলামের শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় তাওহিদের সীমানায় রেখে সম্মান করে। গঙ্গার ক্ষেত্রে তা না হয়ে জাহেলিয়াতের কারণে শেষ পর্যন্ত শিরক ও মূর্তিপূজার কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে।

    পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ সুফি-মারেফতি পরিমণ্ডলে লালন ফকিরের ধারাটির ক্ষেত্রেও ঠিক এই একই জালিয়াতি ঘটেছে। যদিও সহীহ সনদে লালনের কোনো সিলসিলা রাসুলুল্লাহ সা. পর্যন্ত ঐতিহাসিকভাবে পৌঁছানো যায় না, কিন্তু নির্ভরযোগ্য মরমী বুজুর্গ ও আধ্যাত্মিক ধারার আলোচনা অনুযায়ী, লালনের আদি উৎসে আল্লাহর একত্ববাদ, নবীর প্রেম ও মারেফতের গভীর উপাদান ছিল বলে পাওয়া যায়। যা তৎকালীন গ্রামীণ মুসলিম লোকমানসে প্রচলিত ছিল। কিন্তু কলকাতার চতুর ভদ্রলোক সমাজ ও বর্তমানের সুশীল শাহবাগী গোষ্ঠী লালনের সেই গ্রামীণ লোকায়ত মরমি উৎসকে সম্পূর্ণ হাইজ্যাক করে। গঙ্গার পবিত্র পয়গাম্বরী উৎসকে যেভাবে জাহেলিয়াত শিরকের কেন্দ্রে রূপান্তর করেছিল, ঠিক একইভাবে তারা লালনকে একটা ছদ্ম-সেক্যুলার, ইসলাম-বিদ্বেষী ও প্রথাবদ্ধ কুফরি বাউলাচারের প্রতীকে রূপান্তর করে মুসলমানদের তাওহিদি চেতনা ধ্বংস করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

    এই সুগভীর নান্দনিক উপনিবেশায়নের মূল ট্র্যাজেডি হল, এর ফলে সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ঘটে। আবুল মনসুর আহমদের ‘বাংলাদেশের কালচার’ গ্রন্থের বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদে স্পষ্ট দেখানো হয়েছে, কীভাবে এই রাবীন্দ্রিক হেজিমনি বাঙালি মুসলমানের অবচেতনে এক চিরস্থায়ী নান্দনিক দাসত্ব কায়েম করেছিল। এর ফলে একজন মুসলমান তার জীবনের আনন্দ, শোক বা উৎসবের মতন পরম পবিত্র মুহূর্তগুলোতেও নিজের মাটির আদিম তাওহিদি পরিচয়কে হারিয়ে কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার তৈরি ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্কের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। শাহবাগী বা কলকাতার সুশীল মনস্তত্ত্বে পূজা বা বড়দিনে অংশ নেওয়াকে ‘প্রগতিশীল’ বা আধুনিক মনে করা হলেও, নিজের ঘরের চিরন্তন শবে বরাত, ঈদ, আকিকা বা বিসমিল্লাহখানির মতো খাঁটি লোকায়ত ঐতিহ্যগুলোকে তারা ‘খ্যাত’ বা আদিম বলে হীনম্মন্যতায় বর্জন করতে শুরু করে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শারীরিক ও রাজনৈতিক ঘৃণার যে ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্র-ধর্মের এই মনস্তাত্ত্বিক জাল তাকে এক পরিশীলিত, মিষ্টি ও ছদ্ম-সেক্যুলার আবরণে ঢেকে দিয়ে মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও পঙ্গু করে ফেলার এক নিখুঁত হাতিয়ারে রূপান্তর করে। এইভাবেই, উনিশ শতকের কলকাতার সেই তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁসের প্রগতির আলোর আড়ালে সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মানুষের ইতিহাস লুণ্ঠন ও আত্মপরিচয় হরণের এক দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সম্পন্ন হয়েছিল। যা আধুনিক বাঙালি মুসলিম মানসকে নিজের ভাষার শব্দ ও পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে এক স্থায়ী ট্রমার মধ্যে ফেলে দেয়। যার সম্পূর্ণ নিরসন ছাড়া প্রকৃত ডিকলোনিয়াল মুক্তি অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

    লালন-বাউলদের লোকায়ত সম্পদ লুণ্ঠন ও রাবীন্দ্রিক আত্তীকরণ

    বাংলার প্রাকৃত মাটি ও পলল জনপদের বুক থেকে জন্ম নেওয়া লালন শাহ এবং ব্রাত্য বাউলদের মরমি ঐতিহ্যকে উনিশ শতকের কলকাতার কলোনিয়াল-ব্রাহ্মণ্যবাদী এলিট সমাজ যেভাবে গ্রাস ও লুণ্ঠন করেছিল, তা আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম নান্দনিক জালিয়াতি। লালন শাহের ভেতরে যে লৌকিক ও মরমি উপাদানগুলো ছিল, তা তৎকালীন গ্রামীণ মুসলিম মানসের এক ধরণের সহজ-সরল আধ্যাত্মিক আবেগ ছিল। কলকাতার এলিটরা সেই গ্রামীণ উপাদানগুলোকে হাইজ্যাক করে, কট্টর ইসলাম-বিরোধী ও ছদ্ম-সেক্যুলার রূপ দিয়েছে। এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়াটি কোনো সাধারণ সাহিত্যিক আদান-প্রদান বা লৌকিক সংস্কৃতির সরল সমাদর ছিল না। বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত। এর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ববঙ্গের মেহনতি ও অবদমিত নিম্নবর্ণের মানুষের নিজস্ব স্বাধিকারের গানকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে কলকাতার ড্রয়িংরুমের উপযোগী উচ্চ-রাবীন্দ্রিক এলিট সম্পত্তিতে রূপান্তর করা। এই সাংস্কৃতিক জালিয়াতির কঙ্কালটি উন্মোচনের জন্য ড. মযহারুল ইসলামের ‘রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থের উপাত্ত ও সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠাসমূহের দলিল নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

    লালন ফকিরের এই লোকায়ত ভাবাদর্শের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই অঞ্চলের শোষিত অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী। ড. শশিভূষণ দাশগুপ্তের ‘Obscure Religious Cults’ গ্রন্থে মধ্যযুগীয় বাংলার যে পৌত্তলিক নাথ ধর্ম, কায়াসাধন, সহজিয়া উপাসনা এবং বৌদ্ধ তান্ত্রিকতার ‘উল্টা-সাধন’ প্রক্রিয়ার দীর্ঘ বিবর্তন দেখানো হয়েছে, লালনের মরমি দর্শনের একটি বড় অংশ ছিল মূলত সেইসব লৌকিক ঐতিহ্যের ওপরও দাঁড়িয়ে (দাশগুপ্ত, ড. শশিভূষণ। Obscure Religious Cults, পৃষ্ঠা ৪)। এটি ছিল গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষের নিজস্ব মনোজগতের এক প্রাক-রাজনৈতিক প্রকাশ। যা কলকাতার উচ্চবর্ণের জমিদারদের সামাজিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এক প্রকার অলিখিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

    তবে এই গ্রামীণ লোকায়ত ঐতিহ্যের ভেতরে একটি গভীর মোড় তৈরি হয়েছিল যখন লালন কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে পরহেজগার মুসলিম কাপুড়িয়া মলম শাহ ও তাঁর স্ত্রী মতিজানের আশ্রয় লাভ করেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং খোন্দকার রিয়াজুল হকের মতো নির্ভরযোগ্য লোক-গবেষকদের ঐতিহাসিক বিবরণে দেখা যায়, এই মুসলিম পরিমণ্ডলে থাকার ফলেই লালন তৎকালীন গ্রামীণ মারেফতি ও সুফি ভাবধারার সংস্পর্শে আসেন। প্রথাগত কিতাবী শরিয়তের কঠোর অনুশাসন বা মাদ্রাসার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লালনের ছিলো না। তবে তাঁর দর্শনের ভিতরে যেভাবে পৌত্তলিকতা পাওয়া যায়, সেভাবে আল্লাহ-রাসুল এবং সুফিবাদের ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ বা একত্ববাদী দর্শনের গভীর প্রভাবও লক্ষ্যণীয়। তিনি তাঁর বিখ্যাত তৌহিদি গানগুলোতে (যেমন, আহাদ-আহমদ তত্ত্ব) আল্লাহর একত্ববাদ এবং রাসুল সা.-এর প্রতি গভীর প্রেমের যে লোকায়ত বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন, তা তৎকালীন গ্রামীণ মুসলমানদের সরল বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক আবেগকে স্পর্শ করেছিল। তাই বাউল বা লালন দর্শনকে গবেষকরা "সমন্বয়বাদী দর্শন" বলেন। এর অর্থ হলো, লালন বিভিন্ন ধর্মের ভেতরের ভালো ও আধ্যাত্মিক দিকগুলোকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছেন। যাকে 'ইন্টারফেইথ' (আন্তঃধর্মীয় সমন্বয়) বলা যেতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে যা স্পষ্ট কুফুরি। তবে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্যও চিহ্নিত করা উচিত। আজকের যুগে 'ইন্টারফেইথ' বলতে আমরা সাধারণত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আনুষ্ঠানিক মেলবন্ধন বা সংলাপকে বুঝি। কিন্তু লালন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আচার-সর্বস্বতার চেয়ে মানুষের ভেতরের আধ্যাত্মিক ও মরমী (Mystic) রূপটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

    কিন্তু কলকাতার চতুর ভদ্রলোক সমাজ ও বর্তমানের সুশীল শাহবাগী গোষ্ঠী লালনের সেই গ্রামীণ মুসলিম পরিমণ্ডলের সহজ-সরল মরমি আবেগ এবং লৌকিক বিদ্রোহের উপাদানগুলোকে সম্পূর্ণ হাইজ্যাক করে। তারা লালনের ভেতরের ইসলামি তাওহিদ ও রাসূলপ্রেমের সুনির্দিষ্ট গানগুলোকে সুকৌশলে ছাঁটাই ও বিমূর্ত করে তাকে এক শান্ত, নিরীহ, ছদ্ম-সেক্যুলার এবং ইসলাম-বিদ্বেষী কুফরি বাউলাচারের প্রতীকে রূপান্তর করে। অর্থাৎ, গ্রামীণ জনপদে লালনের যে সহজ তাওহিদি ও মরমি ভাবনার ইতিবাচক দিক ছিল, কলকাতা তাকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলমানদের তাওহিদি চেতনা ধ্বংস করার একটি ধারালো বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্রে পরিণত করে।

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরের সুবিশাল পৈত্রিক জমিদারি দেখভাল করতে এসে যখন এই প্রাকৃত লোকায়ত সম্পদের বিপুল ভাণ্ডার চাক্ষুষ করেন, তখন থেকেই এই মরমি ঐতিহ্যকে ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব ব্রাহ্ম ছাঁচে ঢালাই করার মনস্তাত্ত্বিক মেকানিজমটি সচল হয়। রবীন্দ্রনাথ বাউলদের খ্যাপাটে জীবনযাত্রা এবং তাদের দেহতত্ত্বের গানের গভীরতায় মুগ্ধ হলেও, কলকাতার ভদ্রলোক নেটওয়ার্ক ও শান্তিনিকেতনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এই গানগুলোকে বাউলদের নিজস্ব গ্রামীণ পরিমণ্ডল থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ড. মযহারুল ইসলামের ‘রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থে সংরক্ষিত শ্লোক ও চিঠিপত্রের নথি প্রমাণ করে, লালনের আদি ও অকৃত্রিম গানগুলোকে ঘষে-মেজে, তাদের ভেতরের দেশজ ও লৌকিক কৃষ্টিকে ছেঁটে ফেলে এক ধরনের উচ্চ-সাংস্কৃতিক পরিমার্জন দেওয়া হয়েছিল (ইসলাম, ড. মযহারুল। রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি, পৃষ্ঠা ৭৪)। লালনের গানের ভেতরের যে আদিম লৌকিক ক্ষোভ ও শ্রেণী-চরিত্র ছিল, তা কলোনিয়াল নন্দনতত্ত্বের লেদ মেশিনে কেটে এমন এক নিরীহ, আন্তর্জাতিক মরমিবাদে আত্তীকরণ (Assimilation) করা হলো, যেন এর একমাত্র সার্থক ও প্রাজ্ঞ ব্যাখ্যা কেবল কলকাতার উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকদের কাছেই সংরক্ষিত আছে (ইসলাম, ড. মযহারুল। রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি, পৃষ্ঠা ৮৫)।

    বাউলদের ছেঁড়া কাঁথা, একতারা আর ধুলোবালিমাখা দর্শনকে কলকাতার বাবুরা তাদের উচ্চ-সাহিত্যের বৈভবে রূপান্তর করে নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ ইমেজের ব্র্যান্ডিং সুনিশ্চিত করেছিল। অথচ এই লুণ্ঠিত বাউলদের মূল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশকে কলোনিয়াল বা সামন্ততান্ত্রিক শোষণ থেকে মুক্ত করার কোনো সদিচ্ছা ঠাকুরবাড়ির জমিদারির ভেতরে কখনো দেখা যায়নি। এই দীর্ঘমেয়াদী নান্দনিক উপনিবেশায়নের ফলে সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম সমাজ এবং নিম্নবর্ণের ব্রাত্য রায়তদের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ও লুণ্ঠন সম্পূর্ণ স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করে। আবুল মনসুর আহমদের ‘বাংলাদেশের কালচার’ গ্রন্থে স্পষ্ট দেখানো হয়েছে, কীভাবে এই রাবীন্দ্রিক হেজিমনি বাঙালি মুসলমানের অবচেতনে এক তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হীনম্মন্যতার বীজ বুনে দিয়েছিল (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৯৬)। পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের নিজের ঘরের বুকের সম্পদ সুকৌশলে লুণ্ঠিত হয়ে কলকাতার এলিট সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ার পরও, নব্য শিক্ষিত মুসলমান সমাজ নিজের ঘরের ঐতিহ্যকে ‘খ্যাত’ বা আদিম মনে করে বর্জন করতে শুরু করে। কলকাতার তৈরি করা এই ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্ককেই প্রগতির একমাত্র পরম ঈশ্বর বলে বরণ করে নেয় (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫২)।

    ডক্টর ওয়াকিল আহমদ ঐতিহাসিক সত্যের আলোতে দেখান, কীভাবে উনিশ শতকের শেষভাগে এসে মুসলিম সমাজকে ভাষিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে পঙ্গু করে ফেলার পর, রবীন্দ্র-ধর্মের এই প্রক্সি-বিশ্বাস তাদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে ফেলেছিল (আহমদ, ডক্টর ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), পৃষ্ঠা ১৩৩)। অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র সেনের ‘রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস’ গ্রন্থে দেখানো, রাবীন্দ্রিক উপনিষদীয় দর্শন ও ব্রাহ্ম মেটাফিজিক্সের সেই একচ্ছত্র জাল এদেশের মুসলমানদের নিজস্ব তৌহিদি চেতনা ও আধ্যাত্মিক বুনিয়াদকে চিরতরে আলগা করে দেয় (সেন, প্রবোধচন্দ্র। রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস, পৃষ্ঠা ১২)।

    বস্তুত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শারীরিক ও রাজনৈতিক ঘৃণার যে ফ্রেমওয়ার্ক (আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানী) তৈরি করে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্র-ধর্মের এই মনস্তাত্ত্বিক কাল্ট তাকে এক পরিশীলিত, মিষ্টি ও শান্তিনিকেতনি আবরণে ঢেকে দিয়ে, সংখ্যাগুরু মানুষের ঘরের সম্পদকে লুণ্ঠন করার প্রক্রিয়াটিকেই সবচেয়ে প্রগতিশীল কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)। এই জায়গায়, মুসলিম পদ্ধতিতে দাফনের সংস্কৃতি জানাজা এড়ানোর আধুনিক নাগরিক থিয়েটারের ক্ষেত্রভূমি এবং বাউল সম্পদ লুণ্ঠনের এই সুসংগঠিত চক্রান্ত মূলত একই আধিপত্যবাদী মুদ্রার দুই পিঠ হিসেবে কাজ করেছিল। যার কুৎসিত জের আজও বাংলাদেশের স্বাধীন মননশীলতার ডিকলোনিয়াল মুক্তিকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment