Loading...

কেবিনেট মিশন প্ল্যান স্যাবোটাজ, সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা চুক্তি এবং দেশভাগের নেপথ্য সত্য

কেবিনেট মিশন প্ল্যান স্যাবোটাজ, সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা চুক্তি এবং দেশভাগের নেপথ্য সত্য
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    কেবিনেট মিশন প্ল্যান স্যাবোটাজ, সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা চুক্তি ও ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
    ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন প্ল্যান, ১৯৪৭ সালের সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা উদ্যোগ এবং দেশভাগের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ

    Previous Part.......

    ৩:৫

    ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন প্ল্যান এবং জিন্নাহ-মুসলিম লীগের ফেডারেল সম্মতি

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের কেবিনেট মিশন প্ল্যান ছিল, অখণ্ড ভারতের কাঠামো রক্ষা করে সুবে বাংলার স্বাধিকার ও জনমিতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শেষ দাপ্তরিক সুযোগ। ১৯৪৫-৪৬ খ্রিস্টাব্দের তীব্র শীতকালীন সাধারণ নির্বাচনে সুবে বাংলাসহ সমগ্র উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও ডেমোগ্রাফিক মেরুর সৃষ্টি করেছিল, তা ব্রিটিশ রাজশক্তিকে এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় আইনসভার সমস্ত মুসলিম সংরক্ষিত আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদগুলোর মোট ৪৯৫টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৪৪৬টি আসনে একচ্ছত্র জয়লাভ করে নিজেদের ‘একমাত্র বৈধ মুখপাত্র’ হিসেবে প্রমাণ করেছিল (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ১)। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে মুসলিমদের জন্য মোট ৩০টি আসন সংরক্ষিত ছিল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ এই ৩০টি আসনের সবকটিতেই (১০০%) জয়লাভ করে। তারা মোট মুসলিম ভোটের প্রায় ৮৭% নিজেদের বাক্সে তুলতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, কংগ্রেস বা অন্যান্য দলের দাঁড় করানো ভারতপন্থী জাতীয়তাবাদী মুসলিম প্রার্থীরা প্রায় সব আসনেই জামানত হারান।

    কিন্তু নিখিল ভারত কংগ্রেস এই বিশাল এবং অকাট্য জনমিতিক রায়কে স্বীকার না করে একে ‘জটিল ও সাময়িক’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে সৃষ্ট অচলাবস্থা ভাঙতেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে মার্চ তিন সদস্যের এক বিশেষ রাজকীয় প্রতিনিধিদল ভারতে পাঠান (মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম, পৃষ্ঠা ১২৬; প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ২২, ৪২)। লর্ড প্যাথিক-লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং এ. ভি. আলেকজান্ডারের সমন্বয়ে গঠিত এই কেবিনেট মিশন দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের জরিপ ও আলোচনার পর ১৬ই মে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে যে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় গাইডলাইন ঘোষণা করে, তা ইতিহাসে ‘কেবিনেট মিশন প্ল্যান’ নামে সমধিক পরিচিত (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৯০; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ২)। এই প্ল্যানের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক ছিল, এর ত্রি-স্তরবিশিষ্ট (Three-tiered) ফেডারেল গ্রুপিং ব্যবস্থা। যেখানে আসামসহ গোটা সুবে বাংলাকে ‘গ্রুপ-সি’ বা মুসলিম সংখ্যাগুরু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করে মুসলমানদের জনসংখ্যাগত ও রাজনৈতিক স্বাধিকার রক্ষার অকাট্য আইনি গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল (প্রফেরর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৯০-১০৭; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৫-৬)। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ অখণ্ড ভারতের একতা মেনে নিয়ে কীভাবে ৬ই জুন ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এই ফেডারেল প্রস্তাবে সানন্দে সায় দিয়েছিলেন, তা তৎকালীন উপমহাদেশের জটিল রাজনীতি ও বাঙালি মুসলমানদের স্বাধিকার সংগ্রামের এক অনন্য বস্তুনিষ্ঠ অধ্যায়।

    এখানে ইতিহাসের আলোয় প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উন্মোচিত হওয়া দরকার তা হলো, কেন জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ তাঁদের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র ও অনমনীয় ‘স্বাধীন সার্বভৌম পাকিস্তান’-এর মূল দাবিকে সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে অখণ্ড ভারতের অধীনে এই ফেডারেল মিশন প্ল্যান মেনে নিতে রাজি হলেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কেবিনেট মিশনের প্রস্তাবিত ৬টি মূল নীতি এবং ‘বাধ্যতামূলক গ্রুপিং’ (Compulsory Grouping) ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ আইনি সুরক্ষাকবচের মধ্যে (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৯০-৯৭; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৫)। কেবিনেট মিশনের মূল স্কিমে কেন্দ্রীয় বা ইউনিয়ন সরকারের ক্ষমতাকে কঠোরভাবে তিনটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল— পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর বাইরে সমস্ত অবশিষ্ট ক্ষমতা (Residuary Powers) এবং স্বায়ত্তশাসন ন্যস্ত করা হয়েছিল প্রদেশগুলোর হাতে (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৫)। আর এই প্রদেশগুলোকে তিনটি নির্দিষ্ট গ্রুপ বা সেকশনে ভাগ করা হয়েছিল— সেকশন এ (হিন্দু প্রধান প্রদেশসমূহ), সেকশন বি (উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম প্রধান অঞ্চল যেমন পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশ) এবং সেকশন সি (উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামসহ গোটা সুবে বাংলা)। জিন্নাহ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন, এই সেকশন বি এবং সেকশন সি-এর অধীনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব কোণে দুটি প্রকাণ্ড মুসলিম স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বা ‘ভার্চুয়াল পাকিস্তান’ (De facto Pakistan) অর্গানিক উপায়েই তৈরি হয়ে যাচ্ছে। যেখানে কেন্দ্রের হিন্দু মহাসভা বা কংগ্রেসী হেজেমনি কোনো চাতুর্য খাটানোর আইনি সুযোগ পাবে না (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৭)। এই প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী হিসেবের ওপর দাঁড়িয়েই মুসলিম লীগ কাউন্সিল ৬ই জুন ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে কেবিনেট মিশন প্ল্যানকে স্বাগত জানায় এবং অখণ্ড ভারতের অধীনে ফেডারেল নির্বাচনে অংশ নিতে নিজেদের সম্মতির কথা দাপ্তরিকভাবে ঘোষণা করে (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ১৮৯-১৯২; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৭)।

    দ্বিতীয় যে জটিল প্রাতিষ্ঠানিক সত্যটি অনুধাবন করা প্রয়োজন তা হলো, কেবিনেট মিশনের এই গ্রুপ ব্যবস্থা সুবে বাংলার মুসলমানদের দীর্ঘদিনের ডেমোগ্রাফিক অবদমন ও ঔপনিবেশিক জালিয়াতির হাত থেকে কতখানি মুক্তি দিতে সক্ষম ছিল? প্রাক-কলোনিয়াল সালতানাত ও মুঘল সুবাহের পতনের পর ব্রিটিশরা ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং পরবর্তীতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ব্রিটিশ কম্যুনাল অ্যাওয়ার্ডের (Communal Award) মাধ্যমে সুবে বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও কৃত্রিম উপায়ে আইনসভায় তাদের আসন সংখ্যাকে সংকুচিত বা হ্রাস করে রেখেছিল (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৬; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৩)। কিন্তু ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের কেবিনেট মিশন প্ল্যানে এই ঔপনিবেশিক জালিয়াতিকে সম্পূর্ণ নুলিয়া বা রদ করে প্রতি ১০ লক্ষ নাগরিকের অনুপাতে ১টি করে আসন নির্ধারণ করা হয়। যার ফলে আসন বণ্টনে জনসংখ্যার খাঁটি অনুপাতটি সুপ্রতিষ্ঠিত হয় (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৫-৬)। এর ফলে গঠিত হতে যাওয়া গণপরিষদে সুবে বাংলা ও আসামের মোট আসনের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়ায় এক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। যা বঙ্কিমচন্দ্রীয় ও ফোর্ট উইলিয়ামীয় কারখানায় তৈরি হওয়া কলকাতার ‘ভদ্রলোক’ আমলা ও জমিদারদের একচেটিয়া ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৭)। ফলে যে দাবি করা হয়, জিন্নাহ ব্রিটিশদের প্ল্যান অনুযায়ী ভারত ভাগ করতে চেয়েছিলেন, তা নাকচ হয়ে যায়। এই দাবি মানার মাধ্যমে জিন্নাহ প্রমাণ করে গেলেন, মুসলিম স্বার্থই ছিলো তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

    মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর আত্মজীবনীতে স্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, এই প্ল্যানটি ছিল মূলত জিন্নাহর পাকিস্তান দাবির চেয়েও মুসলমানদের স্বাধিকার ও ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রগতিশীল এবং বাস্তবসম্মত সমাধান। যা তৎকালীন সমস্ত রাজনৈতিক দল শুরুতে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল (Maulana Abul Kalam Azad, India Wins Freedom, Page 149, 156-158)। কিন্তু এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সমঝোতা এবং অখণ্ড ভারতের অধীনে সুবে বাংলার মুসলমানদের স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন কতখানি দীর্ঘস্থায়ী হতে পেরেছিল এবং দিল্লির নব্য ব্রাহ্মণ্যবাদী নেতারা কেনই বা এই নিশ্ছিদ্র ফেডারেল চুক্তিকে অন্তরালে কলকাঠি নেড়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন, তার করুণ অধ্যায়টি শুরু হয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দলে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৮)। মাওলানা আজাদ যখন কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, তখন মহাত্মা গান্ধী, বল্লভভাই প্যাটেল এবং জওহরলাল নেহেরুর যৌথ সিন্ডিকেট কেন্দ্রের এককেন্দ্রিক (Unitary) ও অখণ্ড রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার তাগিদে ভেতরে ভেতরে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। কারণ গ্রুপ ব্যবস্থার অধীনে প্রদেশ ও মুসলমানদের হাতে সমস্ত ক্ষমতা চলে গেলে দিল্লির কেন্দ্রীয় একাধিপত্য চিরতরে খর্ব হতো (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৫, ৮)। জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের এই ফেডারেল সম্মতি তাই কোনো সাময়িক রণকৌশল ছিল না। বরং তা ছিল সুবে বাংলার মুসলমানদের নিজেদের ভূখণ্ডে মাথা উঁচু করে বাঁচার এক অকাট্য আইনি বুনিয়াদ। যা দিল্লির নেতারা জালিয়াতির মাধ্যমে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৭)। এই চুক্তির অবিকল দাপ্তরিক রেকর্ড ও জিন্নাহর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের আসল বিবরণ আজ ২০২৬ সালের সমসাময়িক অবস্থান থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত করে যে, দেশভাগের ট্র্যাজেডি কোনো মুসলিম একগুঁয়েমির ফল ছিল না। বরং তা ছিল দিল্লির নব্য বুর্জোয়াদের দ্বারা একটি নিশ্ছিদ্র ফেডারেল চুক্তিকে পাইকারি হারে স্যাবোটাজ করার এক নির্মম কলোনিয়াল-কংগ্রেসী কোরিওগ্রাফি (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ১০; ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৭-১৯)।

    মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীর কনফেডারেল রাষ্ট্রদর্শন: অখণ্ড ভারত রক্ষার বাস্তবসম্মত ঐতিহাসিক রূপরেখা

    ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন প্ল্যান-এ ভারত উপমহাদেশের রাজনৈতিক মোড় হঠাৎ এসে উপনীত হয়নি। এক দীর্ঘ যাত্রার মধ্য দিয়ে বাস্তবসম্মত এমন একটি প্ল্যানে আবর্তিত হয় তৎকালীন রাজনৈতিক সরগরম অবস্থা। মূলত, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের রাজনৈতিক আকাশ হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক সংকট নিয়ে চরমভাবে আলোড়িত হয়। তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির চিন্তাবিদ, দূরদর্শী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিপ্লবী নেতা মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি. প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও সুদূরপ্রসারী এক রাজনৈতিক সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে ভারতের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি, নিখিল ভারত কংগ্রেস এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, রাজনৈতিক প্রস্তাব উপস্থাপনার দিক থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত দু'টি মেরুতে অবস্থান করছিল। কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য ছিল, একটি শক্তিশালী কেন্দ্রভিত্তিক অখণ্ড শাসনব্যবস্থা। যেখানে ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর একটি একক ও নিরেট ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটবে (India Wins Freedom, Maulana Abul Kalam Azad, 1959, p. 142)। অন্যদিকে, মুসলিম লীগের একাংশ কালক্রমে এমন এক স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে অনড় হয়ে উঠছিল, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবিতে রূপ নেয় (Jinnah: India-Partition-Independence, Jaswant Singh, 2009, p. 215)। এই দুই পরস্পরবিরোধী এবং অনমনীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যখানে দাঁড়িয়ে মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি. অনুধাবন করেছিলেন, ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া এককেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ কিংবা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগ—কোনোটিই ভারতের নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভারত মূলত একটি নির্দিষ্ট একক জাতি নয়। এটি একটি বহুজাতিক, বহু সাংস্কৃতিক ও বহুভাষিক উপমহাদেশ। এই জটিল মনস্তত্ত্ব ও সমাজকাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে যদি ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে হয়, তবে প্রদেশ বা আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত জাতিসত্তাগুলোকে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব বা সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে এবং তাদের স্বেচ্ছামূলক চুক্তির ভিত্তিতে একটি শিথিল কনফেডারেশন গঠন করতে হবে। এই সুনির্দিষ্ট দর্শন থেকেই তিনি ১৯২৪ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে ‘মহাভারত সর্বরাজিয়া পার্টি (All India People's Republican Party)’ গঠন করে প্রকাশ করেছিলেন তাঁর কালজয়ী রাজনৈতিক দলিল, "দ্য কনস্টিটিউশন অব দ্য ফেডারেশন অব পিপলস রিপাবলিকস অব ইন্ডিয়া" (An Appraisal of Ubaidullah Sindhi's Political Legacy, Dr. Tanvir Anjum, 2013, p. 162)।

    উপমহাদেশের সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ ইতিহাসে মাত্র তিনবার একটি একক রাজনৈতিক কেন্দ্রের অধীনে অখণ্ড রূপ ধারণ করতে পেরেছিল। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা কোনো স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক ঐক্যের কারণে নয়, বরং চরম রাজকীয় সামরিক শক্তির জোরেই সম্ভব হয়েছিল। প্রথমবার খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের অধীনে, দ্বিতীয়বার সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে এবং তৃতীয়বার উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে তলোয়ার ও কামানের জোরে এই অখণ্ডতা অর্জিত হয় (The Discovery of India, Jawaharlal Nehru, 1946, p. 120)। কিন্তু এই ঐতিহাসিক অখণ্ডতাগুলোর নেপথ্যে কোনো স্থায়ী সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ভিত্তি ছিল না। যার কারণে যখনই কেন্দ্রীয় সামরিক শক্তি দুর্বল হয়েছে, তখনই সমগ্র উপমহাদেশ তার স্বাভাবিক বহুত্ববাদী ও আঞ্চলিক স্বকীয়তায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। উপমহাদেশের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা এটাই প্রমাণ করে, দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ কখনো দিল্লির চাপিয়ে দেওয়া আধিপত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। বিশেষ করে দিল্লির সাথে বাংলার ঐতিহাসিক টানাপোড়েন ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর।

    দিল্লি সব সময় বাংলাকে একটি করদ রাজ্য বা রাজস্ব আদায়ের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চেয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলা সব সময় দিল্লির কেন্দ্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সুলতানি আমলের ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ থেকে শুরু করে, বারো ভূঁইয়াদের যে সামগ্রিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তারই শীর্ষস্থানীয় প্রকাশ ঘটে তাঁদের প্রধান মসনদে আলা ঈশা খাঁ এবং তাঁর পুত্র মুসা খাঁর নেতৃত্বে। সোনারগাঁ ও ভাটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা মরণপণ সামরিক প্রতিরোধের মাধ্যমে (History of Bengal: Mughal Period, Abdul Karim, 1992, p. 45)। দিল্লির দূরবর্তী ও বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ এবং সুবাহদার শায়েস্তা খানের আমল পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক টানাপোড়েন বাংলার মানুষের অবচেতনে এক স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করে রেখেছিল। যা বিংশ শতাব্দীতে এসেও দিল্লির যেকোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধে তীব্র সন্দেহের জন্ম দেয়। এই একই মনস্তাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রতিরোধ ভারতের অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চলেও সমভাবে বিদ্যমান ছিল। বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত দাক্ষিণাত্য বা পেনিনসুলার অঞ্চলের দ্রাবিড় জাতিগোষ্ঠী, বিশেষ করে তামিল ও তেলুগু অঞ্চলের মানুষ, কখনোই আর্যাবর্ত বা উত্তর ভারতের শাসনকে মন থেকে মেনে নেয়নি। সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁর জীবনের শেষ পঁচিশ বছর দাক্ষিণাত্যের এই আঞ্চলিক প্রতিরোধ দমন করতে গিয়েই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিলেন (The Mughal Empire, John F. Richards, 1993, p. 230)। একইভাবে উত্তর-পশ্চিমের পাঞ্জাব, রাজপুতানা ও সিন্ধু অঞ্চল তাদের নিজস্ব যুদ্ধংদেহী মনস্তত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার কারণে দিল্লির যেকোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে চিরকাল খড়গহস্ত ছিল। অন্যদিকে, মারাঠারা দিল্লির মুঘল শক্তির সমান্তরালে নিজেদের সম্পূর্ণ পৃথক হিন্দুপদ পাদশাহী বা স্বরাজ্য গড়ে তুলেছিল (A New History of the Marathas, G. S. Sardesai, 1946, p. 115)। ফলে, পুরো উপমহাদেশের নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বই ছিল বিকেন্দ্রীকরণ ও আঞ্চলিক স্বাধীনতার পক্ষে, কেন্দ্রের একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে।

    মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি. তাঁর ১৯২৪ সালের ইস্তাম্বুল খসড়া সংবিধানে ভারতের বহুত্ববাদী সমাজকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বিন্যস্ত করেছিলেন। তিনি এই খসড়াটি এমনভাবে প্রণয়ন করেন, যাতে ভারতের প্রতিটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করতে পারে (Maulana Ubaidullah Sindhi: A Revolutionary Scholar, Prof. Dr. Anwar Harun, 2010, p. 88)। মাওলানা সিন্ধীর প্রস্তাবের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক ছিল ভারতের প্রশাসনিক সীমানা পুনর্নির্ধারণ। তিনি ব্রিটিশদের তৈরি করা কৃত্রিম প্রদেশগুলোর সীমানা ভেঙে ভাষাগত ও ভৌগোলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে একেকটি স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্র গঠনের প্রস্তাব করেন। যেমন, বাংলাভাষীদের জন্য বাঙালি প্রজাতন্ত্র, সিন্ধিদের জন্য সিন্ধি প্রজাতন্ত্র, পাঞ্জাবিদের জন্য পাঞ্জাবি প্রজাতন্ত্র ইত্যাদি (The Constitution of the Federated Republics of India, Ubaid-Allah Sindhi, 1924, p. 12)। তাঁর সংবিধানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল, প্রতিটি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে সেই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা। এর ফলে, কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষা পুরো উপমহাদেশের মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না (An Appraisal of Ubaidullah Sindhi's Political Legacy, Dr. Tanvir Anjum, 2013, p. 164)। একজন শীর্ষস্থানীয় ইসলামিক পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী ১৯২৪ সালে ইস্তাম্বুল থেকে প্রকাশিত তাঁর রাজনৈতিক দলিলে (Mahabharat Sarvrajia Party-র খসড়া সংবিধানে) কেন্দ্র ও ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক পৃথকীকরণের এক বাস্তবসম্মত রূপরেখা দিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক খসড়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রস্তাবিত স্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকারের কোনো রাষ্ট্রধর্ম থাকবে না এবং কেন্দ্র সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিটি নাগরিকের বিবেক, বিশ্বাস ও ধর্মীয় আচার পালনের চূড়ান্ত স্বাধীনতা রক্ষা করবে। তবে ফেডারেটিং ইউনিট বা প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন রক্ষার্থে তাদের নিজস্ব প্রাদেশিক রাষ্ট্রধর্ম নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে (An Appraisal of Ubaidullah Sindhi's Mahabharat Sarvrajia Party and its Constitution, Dr. Tanvir Anjum, Journal of Political Studies, Vol. 20, 2013, p. 160)। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, কোনো নাগরিকের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে রাষ্ট্র তাকে সরকারি চাকরি, রাজনৈতিক অধিকার বা অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না (An Appraisal of Ubaidullah Sindhi's Political Legacy, Dr. Tanvir Anjum, 2013, p. 165)।

    ইস্তাম্বুল খসড়ায় প্রতিটি প্রজাতন্ত্রের ভেতরে বসবাসকারী ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। সংবিধানে বলা হয়, প্রতিটি অঞ্চলের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা, লিপি এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি রক্ষার জন্য স্বাধীনভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ফোরাম স্থাপন ও পরিচালনা করতে পারবে এবং এই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র তাদের সমানুপাতিক হারে আর্থিক অনুদান প্রদান করবে (The Constitution of the Federated Republics of India, Ubaid-Allah Sindhi, 1924, p. 18)। মাওলানা সিন্ধীর রাজনৈতিক দর্শন কেবল উপরিভাগের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রতিটি অঞ্চলের খনিজ সম্পদ, ভূমি এবং শিল্পোৎপাদন প্রথমে সেই অঞ্চলের স্থানীয় কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করতেন। যাতে কেন্দ্রের অর্থনৈতিক শোষণ চিরতরে বন্ধ হয় (Maulana Ubaidullah Sindhi: A Revolutionary Scholar, Prof. Dr. Anwar Harun, 2010, p. 102)।

    ভারত উপমহাদেশের সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক গঠন পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এই জটিল ও সংবেদনশীল সমাজকাঠামোয় কেনো কেবল মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীর প্রস্তাবিত শিথিল কনফেডারেশন বা ক্ষমতার চরম বিকেন্দ্রীকরণই অখণ্ড ভারত রক্ষার একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল, তা উপমহাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্বের গভীরতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট ধরা পড়ে। ব্রিটিশরা আসার পূর্বে ভারত কখনো একটি একক পলিটিক্যাল কেন্দ্রের অধীনে দীর্ঘকাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাসিত হয়নি। ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের শাসন ও শোষণের সুবিধার্থে একটি কৃত্রিম সর্বভারতীয় প্রশাসনিক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় শাসন চাপিয়ে দিয়েছিল। কংগ্রেস যখন এই কৃত্রিম কাঠামোকেই অক্ষুণ্ণ রেখে ‘একক ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করতে চাইল, তখন উপমহাদেশের বহুত্ববাদী মনস্তত্ত্বে এক গভীর ভীতি ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো (India Wins Freedom, Maulana Abul Kalam Azad, 1959, p. 145)। একজন বাঙালি, একজন তামিল বা একজন সিন্ধি মানসিকভাবে প্রথমে তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে সংযুক্ত, তারপর সে ভারতীয়। মাওলানা সিন্ধী এই নৃতাত্ত্বিক সত্যটি অক্ষরে অক্ষরে উপলব্ধি করে একক জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ‘বহু-জাতীয়তাবাদ’ বা স্বাধীন প্রজাতন্ত্রসমূহের ঐচ্ছিক ফেডারেশনের প্রস্তাব করেছিলেন। সিন্ধীর নীতি বাস্তবায়িত হলে আজকের ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মিলে একটি বিশাল রাষ্ট্রসমবায় বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কনফেডারেশন গঠিত হতো। যেখানে বাংলা বা সিন্ধের মতো অঞ্চলগুলো প্রায় স্বাধীন দেশের মতোই স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত।

    ১৯৪০-এর দশকে এসে ভারতের সাম্প্রদায়িক সমস্যাটি আর কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি মূলত রূপ নিয়েছিল ক্ষমতার অংশীদারিত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চরম দ্বন্দ্বে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের মানুষের মনে এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয় জেঁকে বসেছিল যে, একটি শক্তিশালী কেন্দ্রশাসিত অখণ্ড ভারতে চিরদিনের জন্য হিন্দু সংখ্যাগুরুদের শাসন কায়েম হবে এবং তাদের স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত হয়ে যাবে (Jinnah: India-Partition-Independence, Jaswant Singh, 2009, p. 238)। মাওলানা সিন্ধীর তত্ত্ব এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের সবচেয়ে রিয়েলিস্টিক ও বাস্তবমুখী সমাধান দিয়েছিল। যেহেতু তাঁর মডেলে সমস্ত অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা, রাজস্ব আদায় এবং আইন প্রণয়নের অধিকার সম্পূর্ণভাবে প্রদেশ বা প্রজাতন্ত্রগুলোর হাতে ন্যস্ত ছিল। কেন্দ্রের হাতে ছিল কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রের মতো কয়েকটি সামষ্টিক বিষয়। সেহেতু কোনো অঞ্চলের মানুষের মনে অন্য অঞ্চলের দ্বারা শোষিত বা দমিত হওয়ার ভয় থাকত না (The Constitution of the Federated Republics of India, Ubaid-Allah Sindhi, 1924, p. 22)। মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলো আলাদা রাষ্ট্র না বানিয়েই নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা পেত। আবার অখণ্ড ভারতের মানচিত্রও অক্ষুণ্ণ থাকত। ইতিহাস প্রমাণ করে, এর বাইরে অন্য যেকোনো জোড়াতালির সমাধান যে ব্যর্থ হতে বাধ্য ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৪৭ সালের রক্তাক্ত দেশভাগ এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভেঙে যাওয়া (Jinnah: India-Partition-Independence, Jaswant Singh, 2009, p. 240)।

    মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি. ১৯৪৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর মাত্র দুই বছর পর, ১৯৪৬ সালের ২৩শে মার্চ ব্রিটিশ সরকারের তিন মন্ত্রী যে ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান নিয়ে ভারতে আসেন, তার মূল প্রশাসনিক দর্শন ছিল মাওলানা সিন্ধীর ১৯২৪ সালের ইস্তাম্বুল খসড়ার এক অবিকল প্রতিচ্ছবি (Maulana Ubaidullah Sindhi: A Revolutionary Scholar, Prof. Dr. Anwar Harun, 2010, p. 115)। ক্যাবিনেট মিশন ভারতকে একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে না দেখে সমগ্র অঞ্চলকে তিনটি স্বায়ত্তশাসিত গ্রুপে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়। যেখানে উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে শতভাগ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ এই প্ল্যানটি মেনে নিয়েছিলেন। কারণ এটি কোনো রক্তপাত বা দেশভাগ ছাড়াই মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিচ্ছিল। কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে মাওলানা আবুল কালাম আজাদও এটিকে অখণ্ড ভারত রক্ষা করার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ সুযোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিলেন (India Wins Freedom, Maulana Abul Kalam Azad, 1959, p. 151)। কিন্তু পরবর্তীকালে জওহরলাল নেহরু ও কংগ্রেসের অনমনীয়তা এবং বাধ্যতামূলক গ্রুপিং ব্যবস্থার বিরোধিতা করার ফলে এই পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। যার ফলশ্রুতিতে উপমহাদেশ এক চরম ও ট্র্যাজিক দেশভাগের দিকে ধাবিত হয় (India Wins Freedom, Maulana Abul Kalam Azad, 1959, p. 164)। এখান থেকেই বুঝা যায়, কংগ্রেস আসলে কী ধরনের অখণ্ড ভারত চেয়েছিলো আর মুসলিমদের অবস্থান সেখানে কী হতো।

    এই শাসনতান্ত্রিক দর্শনের আরেকটি সমান্তরাল ঐতিহাসিক সত্য লক্ষ্য করা যায় শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাবের ভাষাগত প্রয়োগে। যেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ মানচিত্রে কেন্দ্রের অধীন কোনো একক গোষ্ঠীর শাসন নাকচ করে স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোকে বহুবচনে 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ' বা 'Independent States' হিসেবে গড়ে তোলার দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। যা মূলত মাওলানা সিন্ধীর বহু-জাতীয়তাবাদ ও কনফেডারেল ভাবনারই একটি অনুরূপ রাজনৈতিক প্রতিফলন ছিল (Fazlul Huq: Life and Longing, A. S. M. Abdur Rab, 1966, p. 185)।

    মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি. আজ থেকে এক শতাব্দীরও আগে, অর্থাৎ ১৯২৪ সালে বসে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য যে পলিটিক্যাল ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঠিক সেই দর্শনকেই তাদের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। এটি কোনো কাল্পনিক সাদৃশ্য নয়, বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি সুনিশ্চিত প্রামাণিক সত্য (Maulana Ubaidullah Sindhi: A Revolutionary Scholar, Prof. Dr. Anwar Harun, 2010, p. 120)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান পলিটিক্যাল ও অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম। তাদের নিজস্ব আইনসভা ও অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা রয়েছে। ঠিক যেমনটি মাওলানা সিন্ধী তাঁর খসড়া সংবিধানে ভারতের প্রতিটি ভাষাগত প্রজাতন্ত্রের জন্য চেয়েছিলেন। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ এড়াতে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য একটি অভিন্ন বাজার এবং একটি শিথিল কেন্দ্রীয় পরিষদ গঠন করেছে। মাওলানা সিন্ধীও ভারতের জন্য এমন একটি কনফেডারেশন চেয়েছিলেন যেখানে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং সামষ্টিক যোগাযোগ থাকবে কেন্দ্রের হাতে, আর বাকি সব ক্ষমতা থাকবে স্বাধীন রাজ্যগুলোর কাছে। উপমহাদেশের সুদীর্ঘ নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারতো না। এমনকি ১৯৪৭ সালেও অসম এবং অবাস্তব পদ্ধতিতে দেশভাগের ফলে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সংঘাত অনিবার্য হয়েছিলো। এমনিভাবে গত কয়েক দশকের ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব এবং এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশারও কারণ হয়েছে এটি। এই বাস্তবতায়, মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি.-এর ১৯২৪ সালের ইস্তাম্বুল খসড়া সংবিধান কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিলই নয়, বরং এটি ছিল এই উপমহাদেশের সমাজ মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পলিটিক্যাল সমাধান। তাঁর প্রদর্শিত কনফেডারেল পথেই কেবল ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব ছিল। যেখানে প্রতিটি জাতিসত্তা তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পেত। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভাবনীয় সাফল্য মাওলানা সিন্ধীর সেই শতবর্ষ পুরোনো রাষ্ট্রদর্শনের সত্যতা ও কার্যকারিতাকেই বিশ্বমঞ্চে নতুন করে প্রমাণ করে। তাই বলা যায়, ইমামে ইনকিলাব উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি. তাঁর যুগ থেকেও অন্তত শত বছর এগিয়ে ছিলেন চিন্তা ও দর্শনে। কিন্তু সিন্ধী রাহি.-এর প্রস্তাবনার সাথে সংগতিপূর্ণ কেবিনেট মিশন প্ল্যান ভেস্তে যায় কংগ্রেস ও তার কতিপয় হিন্দু নেতার অন্তরে লুকিয়ে থাকা হিন্দুত্ববাদী হেজেমনিক লিপ্সার কারণে। তাদের অন্তরে লুকায়িত ছিলো হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তা ভারতজুড়ে প্রতিষ্ঠা করা; সুষম ও সম-অধিকারের অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা উদ্দেশ্য ছিল না। সেজন্যই এই সমতাবাদী এবং সর্বজনীন অধিকার ও জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার, প্রতিটি গোষ্ঠী-উপগোষ্ঠীর স্বকীয়তা রক্ষার প্ল্যান তারা মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি। কারণ এর ফলে হিন্দুত্ববাদী হেজেমনি প্রতিষ্ঠার কৌটিল্য আকাঙ্খা ভেস্তে যাচ্ছিলো।

    ১০ই জুলাইয়ের নেহেরু প্রেস কনফারেন্স এবং কেবিনেট মিশন স্যাবোটাজের গান্ধীবাদী চক্রান্ত

    ৬ই জুন ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে অখণ্ড ভারতের অধীনে কেবিনেট মিশনের ত্রি-স্তরবিশিষ্ট ফেডারেল গ্রুপিং কাঠামোতে মুসলিম লীগের আনুষ্ঠানিক সম্মতি উপমহাদেশের রাজনীতিতে যে ঐতিহাসিক স্থিতিশীলতার সুযোগ এনেছিল, তা মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় নিখিল ভারত কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের একতরফা ও আধিপত্যবাদী হঠকারিতায় (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী ও দক্ষিণারঞ্জন বোস, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ১০)। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কাছ থেকে কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর, ১০ই জুলাই ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে জওহরলাল নেহেরু এক একক ও দাম্ভিক প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেন। যা অখণ্ড ভারতবর্ষের বিভাজন ও সুবে বাংলার বলপূর্বক লাকড়িচেলা হওয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট (মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম, পৃষ্ঠা ১২৩; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৯)। নেহেরু সেই প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে ঘোষণা করেন যে, কংগ্রেস কোনো চুক্তি বা শর্তের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত অবস্থায় গণপরিষদে (Constituent Assembly) প্রবেশ করছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে (মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম, পৃষ্ঠা ১২৩-১২৪; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৯)। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবিত বাধ্যতামূলক প্রাদেশিক গ্রুপিং ব্যবস্থা (Compulsory Grouping) পরিবর্তন বা বাতিল করার পূর্ণ ক্ষমতা কংগ্রেস ধারণ করে। কারণ কেন্দ্রীয় আইনসভায় তাদের নিরেট সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৩১৪-৩২১)। নেহেরুর এই একক ও অনমনীয় প্রাবন্ধিক ইশতেহারের মূল লক্ষ্যই ছিল আসামসহ গোটা সুবে বাংলাকে নিয়ে গঠিত হতে যাওয়া ‘গ্রুপ-সি’-এর মুসলিম স্বায়ত্তশাসনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিল্লির অধীনে এক শক্তিশালী ও এককেন্দ্রিক (Unitary) ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। যার পেছনে সক্রিয় ছিল মহাত্মা গান্ধী ও বল্লভভাই প্যাটেলের সুসংগঠিত গান্ধীবাদী চক্রান্ত (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৫, ৯)।

    নেহেরুর এই হঠাৎ বিশ্বাসের চোরাবালি এবং একক প্রেস বিবৃতির নেপথ্য মেকানিজমটি ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত মত বা আকস্মিক ভুল ছিল না। বরং তা ছিল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের লালিত ‘রামরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার আদি ব্লুপ্রিন্ট (ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৫)। মহাত্মা গান্ধী শুরু থেকেই ক্যাবিনেট মিশনের এই বাধ্যতামূলক গ্রুপিং ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, আসাম ও সুবে বাংলা একীভূত হয়ে যদি ‘গ্রুপ-সি’ গঠিত হয়, তবে পূর্ব ভারতে কলকাতার তোষামোদকারী ভদ্রলোক হেজেমনি চিরতরে শেষ হয়ে যাবে এবং গ্রামীণ সংখ্যাগুরু মুসলিম প্রজাকুল ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করবে (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৩১২-৩১৪)। গান্ধী ও প্যাটেলের প্রত্যক্ষ প্ররোচনাতেই নেহেরু বোম্বাইয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেবিনেট মিশনের মূল দাপ্তরিক ভিত্তিটিকেই এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেন। মাওলানা আজাদ তাঁর গ্রন্থে অত্যন্ত কান্নাজড়ানো কণ্ঠে এবং তীব্র আক্ষেপের সাথে স্বীকার করেছেন, নেহেরুর এই একটিমাত্র একগুঁয়ে উক্তি ক্যাবিনেট মিশনের তৈরি করা অখণ্ড ভারতের শেষ ঐতিহাসিক সুযোগটিকে সমূলে স্যাবোটাজ করে দিয়েছিল। যা কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তকেও চরম অপদস্থ করে (Maulana Abul Kalam Azad, India Wins Freedom, Page 123-125)। আজাদ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিটিতে কড়া প্রস্তাব রাখলেও, নিজের সভাপতির মান বাঁচাতে কংগ্রেস হাই কমান্ড নেহেরুর সেই বিষাক্ত বক্তব্যকে অফিশিয়ালি ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ বা বাতিল ঘোষণা করেনি। যা জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের মনে কংগ্রেসের জালিয়াতিপূর্ণ চরিত্রকে শতভাগ নগ্নভাবে উন্মোচিত করে দেয়।

    নেহেরুর এই জালিয়াতিপূর্ণ ও একতরফা ঘোষণার প্রতিক্রিয়া সুবে বাংলার রাজনীতিতে যে মারাত্মক দাবানল সৃষ্টি করেছিল, তার রেকর্ড আমাদের ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক অধ্যায়। কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট দেখতে পেলেন, ব্রিটিশ রাজশক্তি বিদায় নেওয়ার পর গণপরিষদে কংগ্রেস যখন তাঁদের নিরেট সংখ্যাধিক্যের জোরে কেবিনেট মিশন চুক্তির বাধ্যতামূলক গ্রুপিং ধারাটি বাতিল করে দেবে, তখন মুসলমানদের নিজস্ব কৃষ্টি ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষার আর কোনো আইনি সুরক্ষাকবচ অবশিষ্ট থাকবে না। কংগ্রেসের এই প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতার পর, ২৯শে জুলাই ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে মুসলিম লীগ কাউন্সিল এক জরুরি সভায় মিলিত হয়ে কেবিনেট মিশন প্ল্যানে দেওয়া তাঁদের পূর্ববর্তী ফেডারেল সম্মতি আনুষ্ঠানিকভাবে ও চূড়ান্তভাবে প্রত্যাহার করে নেয় (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৩৫৩-৩৫৮; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৯)। জিন্নাহ তাঁর কালজয়ী ও ঐতিহাসিক ভাষণে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে ঘোষণা করেন, নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক আলোচনার দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে এবং এখন মুসলমানদের নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধিকার রক্ষায় ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের রাজপথে নামা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ কংগ্রেসের চক্রান্তকারীরা অবশিষ্ট রাখেনি (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ৩৬০-৩৬৩; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ৯)।

    নেহেরুর বোম্বাই প্রেস কনফারেন্সের ময়নাতদন্ত তাই প্রমাণ করে, ভারতবর্ষের বিভাজন এবং সুবে বাংলার মুসলমানদের পৈতৃক ভূখণ্ড দ্বিখণ্ডিত হওয়ার নেপথ্য কারিগর কোনো মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ ছিল না। জেনেরিক অর্থেই তা ছিল দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্বের এককেন্দ্রিক শোষণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও গান্ধীবাদী চক্রান্তের প্রত্যক্ষ ফসল (প্রফেসর এ. সি. ব্যানার্জী, দ্য কেবিনেট মিশন ইন ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা ১০; ইলহান নিয়াজ, দ্য কেবিনেট মিশন প্ল্যান: ইমপ্লিকেশনস ফর গভর্নেন্স, পৃষ্ঠা ১৩)। পাশের দায়ে এবং কলোনিয়াল চর্বিত চর্বণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে বাবু অধ্যাপকেরা আজীবন মুসলমানদের ওপর ‘দেশভাগের কলঙ্ক’ লেপন করার বানোয়াট ইতিহাস কারখানা সচল রেখেছেন, এই দাপ্তরিক নথিগুলো তাঁদের সেই উর্ণাজালকে এক লহমায় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেয়। ১০ই জুলাইয়ের এই শঠতাপূর্ণ স্যাবোটাজ থিয়েটার প্রমাণ করে, দিল্লির হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের ব্রাহ্মণ্যবাদী নেতারাই মূলত সুবে বাংলার প্রাকৃত মানুষের অর্গানিক স্বায়ত্তশাসন ও একতার টুটি চেপে ধরেছিলেন। যা এ দেশের মুসলমানদের এক অবরুদ্ধ ও কৃত্রিম কাঠামোর মধ্যে ঠেলে দেওয়ার চূড়ান্ত ঔপনিবেশিক কোরিওগ্রাফি বৈ আর কিছুই ছিল না (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৮-১৯; মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম, পৃষ্ঠা ১২৩-১২৭)।

    ২০শে মে ১৯৪৭-এর সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা চুক্তি এবং কলোনিয়াল মাউন্টব্যাটেন-গান্ধী কুঠারাঘাত

    ১০ই জুলাই ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নেহেরু প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে কেবিনেট মিশন প্ল্যানের ত্রি-স্তরবিশিষ্ট ফেডারেল গ্রুপিং কাঠামোটি যখন চূড়ান্তভাবে স্যাবোটাজ হয়ে গেল, তখন সুবে বাংলার বুনিয়াদ রক্ষা এবং এই ভূখণ্ডকে বলপূর্বক দ্বিখণ্ডিত করার চক্রান্ত রুখে দিতে এ দেশের প্রগতিশীল হিন্দু ও মুসলিম নেতৃত্ব এক অন্তিম ও ঐতিহাসিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল ও মে মাসের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সুবে বাংলার তৎকালীন অবিভক্ত প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মুসলিম লীগের প্রগতিশীল ধারার সম্পাদক আবুল হাশিম, কংগ্রেসের অবিসংবাদিত নেতা শরৎচন্দ্র বসু এবং কিরণ শংকর রায়ের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল এক অখণ্ড, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের দ্বিপাক্ষিক ইশতেহার। যা ইতিহাসে ‘সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা চুক্তি’ (United and Sovereign Bengal Pact) নামে পরিচিত (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২১)। ২০শে মে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ৩৫ নম্বর এলগিন রোডে শরৎ বসুর বাসভবনে আনুষ্ঠানিক রূপ পাওয়া এই চুক্তির মূল প্রতিপাদ্যই ছিল, সুবে বাংলা দিল্লির অখণ্ড রামরাজ্য কিংবা করাচির এককেন্দ্রিক পাকিস্তানের চোরাবালিতে বিলীন না হয়ে নিজের হাজার বছরের ভাষিক, ভৌগোলিক ও ডেমোগ্রাফিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬)। কিন্তু সুবে বাংলার সাধারণ হিন্দু ও মুসলমান জনসাধারণের এই অর্গানিক মিলন এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নকে দিল্লির কংগ্রেস হাই কমান্ড, হিন্দু মহাসভা এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কলোনিয়াল আমলাতন্ত্র যেভাবে সুপরিকল্পিত চক্রান্তের মাধ্যমে কুঠারাঘাত করে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিল, তা উপমহাদেশের ইতিহাসের এক পরম বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডি।

    সুবে বাংলার এই সার্বভৌম স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ২০শে মে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে যে ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার অভ্যন্তরীণ ৬টি মূল আইনি ধারা বিশ্লেষণ করলে এর অভূতপূর্ব গণমুখী ও প্রগতিশীল চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    চুক্তির প্রথম ও প্রধান শর্তই ছিল, সুবে বাংলা হবে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। যা ভারতের বাকি কোনো অংশ বা ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের সাথে নিজেদের সম্পর্ক কেমন হবে, তা সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারণ করবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২১, ৩৫)। দ্বিতীয় ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, স্বাধীন বাংলার নতুন সংবিধান রচনার জন্য যে আইনসভা গঠিত হবে, সেখানে কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িক পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি থাকবে না। বরং হিন্দু ও মুসলিম যৌথ নির্বাচন পদ্ধতির (Joint Electorate) ভিত্তিতে এবং জনসংখ্যার খাঁটি অনুপাত অনুসারে আসন বণ্টন নিশ্চিত করা হবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬)। চুক্তির তৃতীয় ধারায় উল্লেখ ছিল, ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণার সাথে সাথেই বাংলার বর্তমান মন্ত্রীসভা ভেঙে দিয়ে একটি সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া বাকি মন্ত্রীদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান সমান হারে প্রতিনিধিত্ব পাবে। চতুর্থ ধারার বৈপ্লবিক দিকটি ছিল, ক্ষমতার চিরস্থায়ী ব্যালেন্স বা সুরক্ষাকবচ। যেখানে ঘোষণা করা হয়েছিল যে সামরিক ও বেসামরিক চাকুরির সর্বস্তরে হিন্দু ও মুসলমানেরা সমানুপাতিক হারে (৫০:৫০) সুযোগ লাভ করবে। চুক্তির পঞ্চম ধারা অনুযায়ী, স্বাধীন বাংলার নতুন সংবিধান রচনার জন্য আইনসভার হিন্দু ও মুসলিম সদস্যদের দ্বারা আলাদাভাবে নির্বাচিত মোট ৩০ জন সদস্য নিয়ে (১৬ জন মুসলিম ও ১৪ জন হিন্দু) একটি গণপরিষদ গঠিত হবে। সর্বশেষ ষষ্ঠ ধারায় ক্ষমতার চূড়ান্ত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে নির্ধারণ করা হয়েছিল, স্বাধীন সুবে বাংলার প্রধানমন্ত্রী যদি একজন মুসলমান হন, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদটি বাধ্যতামূলকভাবে একজন হিন্দু নেতার হাতে ন্যস্ত থাকবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৩৬)। এই চুক্তিটি যখন সুবে বাংলার প্রাকৃত মানুষের মনে এক নতুন ইনকিলাব তৈরি করছিল, তখন কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দু মহাসভা এবং দিল্লির বল্লভভাই প্যাটেলের নব্য বুর্জোয়া সিন্ডিকেট এই স্বাধীন অখণ্ড বাংলার প্রস্তাবকে ‘হিন্দুদের জন্য এক আত্মঘাতী ফাঁদ’ বলে তীব্র ও কুৎসিত কুৎসা অভিযান শুরু করে। কারণ সুবে বাংলা অখণ্ড ও স্বাধীন থাকলে কলকাতার ওপর প্যাটেল-বিড়লা-টাটাদের বাণিজ্যিক লুণ্ঠন চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যেত (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২১-২২; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২১-২৭)।

    দিল্লির কংগ্রেস হাই কমান্ড এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেনের যৌথ চক্রান্ত কীভাবে সুবে বাংলার এই অখণ্ড চুক্তিটিকে গলা টিপে হত্যা করেছিল, তার খতিয়ান মাওলানা আবুল কালাম আজাদের দাপ্তরিক ময়নাতদন্তে সংরক্ষিত রয়েছে। মাউন্টব্যাটেন যখন ৩রা জুনের দেশভাগ প্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করছিলেন, তখন প্যাটেল ও নেহেরু তাঁকে সাফ জানিয়ে দেন, কলকাতা বন্দর ও সুবে বাংলার সম্পদকে যদি ভারতের সাথে যুক্ত করা না যায়, তবে আসাম ও পূর্ব ভারত দিল্লির ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের বাইরে চলে যাবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৩৭)। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য মহাত্মা গান্ধী ৮ই জুন ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে শরৎচন্দ্র বসুকে এক কড়া ও চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে রাজনৈতিক হুমকি পাঠান। যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শরৎ বসু যেন সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের সাথে স্বাধীন বাংলার এই চুক্তিতে সায় দেওয়া থেকে অবিলম্বে বিরত হন। অন্যথায় কংগ্রেস দল তাঁকে চিরতরে উচ্ছেদ করবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৩৭-৩৮)। গান্ধী তাঁর চিঠিতে অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই কুৎসিত যুক্তির অবতারণা করেন যে, সুবে বাংলার মুসলমানেরা আসলে জিন্নাহর সেই দ্বিজাতিতত্ত্বের বাইরের কেউ নয়। স্বাধীন বাংলার আড়ালে তারা মূলত এক ‘বৃহত্তর পাকিস্তান’ তৈরির চক্রান্ত করছে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৩৮)। নেহেরু ও প্যাটেলের অনমনীয় হুকুমে কলকাতার বাবু ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীরা রাতারাতি এই বানোয়াট ইতিহাস কারখানা সচল করলেন যে, সুবে বাংলা অখণ্ড থাকলে বাঙালি হিন্দুরা মুসলমানদের অধীনে ‘চিরদাসে’ পরিণত হবে (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২)। এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও রাজনৈতিক কুঠারাঘাতের ফলেই সুবে বাংলার সাধারণ হিন্দু সমাজ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং মাউন্টব্যাটেন-কংগ্রেসের যৌথ আঁতাতে ২০শে জুনের পরিষদ ভোটে সুবে বাংলাকে বলপূর্বক দ্বিখণ্ডিত করার চক্রান্ত প্রস্তাবটি পাস করা হয়। যার ফলে সুবে বাংলার প্রাকৃত মানুষের হাজার বছরের বহমান একতা ও ‘বাঙালি ভূখণ্ড’-কে লাকড়িচেলা করে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়।

    সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা চুক্তির এই নির্মম পতন এবং মাউন্টব্যাটেন-গান্ধী কুঠারাঘাতের সুদূরপ্রসারী সমাপনী রূপান্তরটি সুদীর্ঘ কালক্রম পার হয়ে আজকে ২০২৬ সালের সমসাময়িক বাংলাদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও হুবহু সক্রিয় ও বহাল তবিয়তে সচল রয়েছে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের সেই কলোনিয়াল দ্বিখণ্ডন নীতি এবং কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের তৈরি করা সেই বানোয়াট ইতিহাস বয়ান আজকে আধুনিক বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল সুশীল সমাজের মনস্তত্ত্বে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, তারা মাওলানা আজাদের সেই কান্নাজড়ানো আক্ষেপ এবং সুবে বাংলার মুসলমানদের রিক্ত ও শব্দহীন হওয়ার খাঁটি ইতিহাস চিরতরে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে (মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম, পৃষ্ঠা ২০৩)। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের আধুনিক প্রজন্ম যখন নিজেদের ইতিহাস পাঠ করতে গিয়ে কেবলই দিল্লির চশমা দিয়ে নিজেদের দেশভাগ ও সার্বভৌমত্বকে মূল্যায়ন করে এবং সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম বা শরৎ বসুর সেই বীরত্বপূর্ণ অখণ্ড লড়াইয়ের ধারাকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে এক চিরস্থায়ী হীনম্মন্যতায় ভোগে, তখন মূলত ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের সেই মাউন্টব্যাটেন-কংগ্রেসী জালিয়াতির কারখানার চাকাটিই অবিরত ঘুরে চলে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। ২০শে মে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের সেই সার্বভৌম স্বাধীন বাংলা চুক্তির ট্র্যাজিক বিলুপ্তি তাই কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল না। বরং তা ছিল সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের নিজস্ব রাজনৈতিক, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বকে দিল্লির কেন্দ্রের অধীনে স্থায়ীভাবে পঙ্গু ও পরাশ্রিত করে রাখার এক সুপ্রচ্ছন্ন ঔপনিবেশিক জেনোসাইড। যার বিষবাষ্প ও আত্মপরিচয়ের চরম সংকট আধুনিক বাঙালি মুসলমান আজ দুই শতাব্দী পরও প্রতিক্ষণ বহন করে চলছে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment