Loading...

‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ নামক প্রক্সি বিশ্বাসের প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট, ধর্মনিরপেক্ষ আচার এবং মৃত্যুর পর জানাজা এড়ানোর মনস্তাত্ত্বিক জাল

‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ নামক প্রক্সি বিশ্বাসের প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট, ধর্মনিরপেক্ষ আচার এবং মৃত্যুর পর জানাজা এড়ানোর মনস্তাত্ত্বিক জাল
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    রবীন্দ্রিক সাংস্কৃতিক প্রভাব, ধর্মনিরপেক্ষ আচার ও মুসলিম জানাজার প্রশ্নকে ঘিরে একটি প্রতীকী ঐতিহাসিক ইলাস্ট্রেশন।
    ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ প্রক্সি বিশ্বাস, রবীন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আচার ও জানাজা এড়ানোর মনস্তাত্ত্বিক জাল

    Previous Part.......

    ৪:৩

    ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ নামক প্রক্সি বিশ্বাসের প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট ও দৈনন্দিন নৈতিকতার হেজিমনি

    আধুনিক বাঙালি কালচারে কথিত সুশীল সমাজের একাংশের মধ্যে ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ নামক একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এটি আসলে একটি সমান্তরাল ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্সি-বিশ্বাস। তবে এটি কেবল সাহিত্য চর্চা বা কবিতার রস আস্বাদনের কোনো নিরীহ আয়োজন ছিল না। এর পেছনে একটি গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্যের আড়ালে একটি নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে গিয়েছিলেন। সেটি ছিল মূলত উগ্র আর্য-হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম-বিদ্বেষী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে।

    পরবর্তীতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এই ধারাকে নতুন রূপ দেয়। তাদের কর্পোরেট ও জমিদারি বিত্ত এই তত্ত্বকে অনেক বেশি পরিশীলিত ও মিষ্টি করে তোলে। ফলে এটি একটি ছদ্ম-সেক্যুলার রূপ লাভ করে। তারা বাঙালি সুশীলদের মগজে এই চেতনা স্থায়ীভাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম বা পদ্ধতি তৈরি করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)। এই কাল্ট নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল, এদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম ও ব্রাত্য অনার্য সমাজের হাজার বছরের লৌকিক ও তাওহিদি চেতনাকে সম্পূর্ণ ‘সংস্কৃতি-বহির্ভূত’ বা ‘অনগ্রসর’ বলে সমাজ থেকে শেমিং বা অপদস্থ করা। ফলে যে শূন্যস্থান তৈরি হবে, সেখানে রাবীন্দ্রিক নন্দনতত্ত্বকে আধুনিকতা ও সুরুচির একমাত্র অলঙ্ঘনীয় মানদণ্ড হিসেবে কায়েম করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব আকর গ্রন্থ ‘ধর্ম’ (১৩১৫ সংস্করণ) নিবিড়ভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, তাঁর এই মেটাফিজিক্স বা আধ্যাত্মিকতার মূল উৎস ছিল জোড়াসাঁকোর আদি ব্রাহ্মসমাজের উপনিষদীয় ব্রহ্মজ্ঞান। যা শান্তিনিকেতন আশ্রমের পৌষ-উৎসব বা মাঘোৎসবে পঠিত প্রবন্ধসমূহের মাধ্যমে একচ্ছত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছিল (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৪)। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ধর্মপ্রচার’ প্রবন্ধে স্পষ্ট লিখেছিলেন, ধর্মের এই আদর্শটি অত্যন্ত সরল ও নিত্য, যা মানুষের বুদ্ধির জটিলতা ও কৃত্রিম আয়োজনের ঊর্ধ্বে (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৪, ৩৬)। কিন্তু এই আপাত সরলতার মোড়কে কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ যে প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, তা একজন মানুষের প্রাত্যহিক নৈতিকতা ও রুচির মাপকাঠি নির্ধারণের একচ্ছত্র স্বৈরাচারী ক্ষমতার মালিক হয়ে বসে (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)।

    জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট নির্মাণের ভেতরের মেকানিক্স বা মনস্তত্ত্বটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন আমরা তাদের বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় ও বাস্তব আচরণের মধ্যকার বৈপরীত্য লক্ষ্য করি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার সামাজিকভাবে প্রকাশ্যে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হলেও, তাদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ঘোরতর ব্রাহ্মণ্যবাদী সনাতন সংস্কৃতির চর্চায় কোনো ঘাটতি ছিল না। উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতকের 'ব্রাহ্মধর্ম' ছিল মূর্তি পূজা ও জাতপ্রথাবিরোধী একটি প্রগতিশীল একেশ্বরবাদী আন্দোলন। অন্যদিকে, 'ব্রাহ্মণ্যবাদ' বলতে বোঝাত প্রচলিত সনাতন হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠান, দেব-দেবী ও শাস্ত্রীয় রীতিনীতির কঠোর অনুশাসন। ঠাকুর পরিবারের ক্ষেত্রে এই দুই বিপরীত ধারার এক অদ্ভুত সহাবস্থান দেখা যায়।

    দ্বারকানাথ ঠাকুর স্বয়ং রাজা রামমোহন রায়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ব্রাহ্মধর্মের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ বলছে, মূর্তি পূজা ও পৌত্তলিকতা বর্জনের এই সংস্কার প্রয়াস ছিল সম্পূর্ণ বাহ্যিক। এর প্রথম প্রমাণ মেলে তাদের পারিবারিক নামকরণে। ব্রাহ্মধর্মে সনাতন দেব-দেবীর অস্তিত্ব স্বীকার করা না হলেও, দ্বারকানাথ নিজের ছেলে ও নাতিদের নামের সঙ্গে হিন্দু দেবতা ‘ইন্দ্র’-এর নাম সংযুক্ত করেন এবং বংশের সব কন্যাসন্তানের নামের শেষে ‘দেবী’ উপাধি যুক্ত করেন। শুধু নামকরণের ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাদের এই রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্যবাদী রূপটি প্রকাশ পেয়েছিল। পরিবারটি নিজেদের ব্রাহ্ম হিসেবে দাবি করলেও, দ্বারকানাথ ঘরের মেয়েদের বিয়ে তৎকালীন প্রগতিশীল কোনো ব্রাহ্ম পাত্রের সঙ্গে না দিয়ে, সনাতন হিন্দু রীতিনীতি মেনে হিন্দু পাত্রদের সঙ্গেই দিয়েছিলেন (চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত কুমার। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতি, পৃষ্ঠা ৩৬)।

    দ্বারকানাথের উত্তরসূরি এবং রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনেও এই একই দ্বিমুখী আচরণের প্রতিফলন ঘটে। তিনি প্রকাশ্যে ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভ্যাসে ছিলেন প্রবলভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী রীতিনীতির অনুসারী। এর একটি বড় উদাহরণ হলো পারিবারিক দুর্গাপূজা। ব্রাহ্মমত অনুযায়ী মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ। ফলে পূজার কটা দিন তিনি নিজে সনাতন মূর্তিপূজার দায় এড়াতে অন্য কোথাও সরে পড়তেন ঠিকই, কিন্তু পূজার যাবতীয় আয়োজন ও আর্থিক ব্যয়ভারের ব্যবস্থা তিনি নিজেই সম্পন্ন করে দিয়ে যেতেন (চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত কুমার। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতি, পৃষ্ঠা ৩৬)। এছাড়া, দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম মতাদর্শের ধারক হওয়া সত্ত্বেও পিতা দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্য ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিলেন সম্পূর্ণ বৈদিক বা সনাতন হিন্দু ধর্মীয় বিধি মোতাবেক। এই আপসের সপক্ষে তিনি নিজেই যুক্তি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘মাতা, পিতা, স্ত্রী, পুত্রকে দুঃখ দিয়ে স্বজাতি হইতে পৃথক হওয়া কর্তব্য নহে’ (দেবেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথের পত্রাবলী, পৃষ্ঠা ৫০)। অর্থাৎ, সমাজ ও পরিবারচ্যুত হওয়ার ভয়ে তারা মুখে প্রগতিশীল ব্রাহ্মধর্মের বুলি আওড়ালেও, অবচেতনভাবে এবং আচরণগতভাবে সনাতন ব্রাহ্মণ্যবাদের গণ্ডি থেকেই বের হতে পারেননি।


    ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীদের পৈতে ত্যাগ করা জরুরি ছিল। দেবেন্দ্রনাথ নিজে পৈতে ত্যাগ করলেও পুত্র রবীন্দ্রনাথের যথারীতি উপনয়ন অনুষ্ঠান করে পৈতে দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন (বসু, রাজনারায়ণ। রাজনারায়ণ বসুর আত্মচরিত, পৃষ্ঠা ১৯৯)। ব্রাহ্মদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা নিষিদ্ধ ছিল; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠান থেকে রাজনারায়ণ বসুকে শূদ্র বলে অপমান করে বহিষ্কার করা হয়েছিল (বসু, রাজনারায়ণ। রাজনারায়ণ বসুর আত্মচরিত, পৃষ্ঠা ১৯৯)। রবীন্দ্রনাথ যখন পিতা হলেন তখন পুত্র রথীন্দ্রনাথের উপনয়নের ব্যবস্থা করা হয়। উপনয়নের সময় রথীন্দ্রনাথকে হিন্দু নিয়মে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ঘুরতে হয়েছিল এবং তিনদিন যাবত শূদ্র বা ছোটলোকের মুখদর্শন থেকে বিরত রাখার জন্য ঘরে আবদ্ধ রাখা হয়েছিল (আহমদ, সরকার শাহাবুদ্দীন। ইতিহাসের নিরিখে রবীন্দ্র-নজরুল চরিত, পৃষ্ঠা ১৩০)। বাংলা ১৩১১ সালে দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যু হলে, রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম থেকে ব্রাহ্মণে পরিবর্তিত হন এবং হিন্দু ধর্মের নিয়মে সযত্নে লালিত কেশ, দাড়ি, গোঁফ মুণ্ডন করেন (চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত কুমার। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতি, পৃষ্ঠা ১৬৭)। ব্রাহ্মধর্মের রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণ্যবাদের পক্ষে লেখেন, ‘ভারতবর্ষে যথার্থ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সমাজের অভাব হইয়াছে— দুর্গতিতে আক্রান্ত হইয়া আমরা সকলে মিলিয়াই শূদ্র হইয়াছি।’ আরও লেখেন, আমি ব্রাহ্মণ আদর্শকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিবার সংকল্প হৃদয়ে লইয়া যথাসাধ্য চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইয়াছি (প্রবাসী, এপ্রিল ১৯০২, পৃষ্ঠা ৬৫৭)। রবীন্দ্রনাথ সাধারণ কোনো ব্রাহ্ম ছিলেন না; তিনি ছিলেন আদি ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক। মুখে ব্রাহ্ম হলেও তিনি ছিলেন কর্মে ব্রাহ্মণ। তাই তিনি লিখলেন—‘বেদ, ব্রাহ্মণ, রাজা ছাড়া আর / কিছু নাই ভবে পূজা করিবার।’ (পূজারিনী)। এই দ্বৈততা ও স্ট্যান্টবাজীই ছিল রবীন্দ্র-ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট নির্মাণের ভিতরের আসল মেকানিজম। যা বাঙালি সুশীল সমাজকে একদিকে ব্রাহ্ম-একেশ্বরবাদের আধুনিকতার মোড়কে মুগ্ধ করেছিল, অন্যদিকে গোপন ব্রাহ্মণ্যবাদী আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের তাওহিদি-লৌকিক জনসমষ্টিকে সাংস্কৃতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলেছিল (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)।

    এই ব্রাহ্ম-ব্রাহ্মণ্য দ্বৈততার পিছনে আরও একটি গভীর ঐতিহাসিক কারণ ছিল। যা কট্টর সনাতন সমাজের চোখে ঠাকুর পরিবারকে চিরতরে ‘ব্রাত্য’ ও ‘অপবিত্র’ করে রেখেছিল। রবীন্দ্রনাথের আসল বংশীয় পদবি ছিল কুশারী। মধ্যযুগে যশোরের পিঠাভাবের (বর্তমানে রূপসা, খুলনা) কুশারী পরিবারের পূর্বপুরুষেরা মুসলিম শাসক খান জাহান আলীর কর্মচারী পীর আলী তাহেরের (যার অমুসলিম নাম ছিল, গোবিন্দলাল রায়) সংস্পর্শে আসেন। পীর আলীর আমন্ত্রণে একটি ভোজে হিন্দু ব্রাহ্মণরা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে গোমাংস রান্না হচ্ছিল। তৎকালীন শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, হিন্দুরা বিশ্বাস করত, নিষিদ্ধ খাদ্যের ঘ্রাণ নিলেও জাত যায় (“ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম”)। এই ঘটনার পর কট্টর সমাজপতিরা সেই কুশারী পরিবারকে ‘পিরালী ব্রাহ্মণ’ বা ‘পিরালী ম্লেচ্ছ’ বলে সমাজচ্যুত করে (মুখোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার। রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক (প্রথম খণ্ড); বসু, নগেন্দ্রনাথ। বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণ কাণ্ড, তৃতীয় ভাগ)। ঠাকুর পরিবার পরবর্তীকালে কলকাতায় চলে আসে এবং ব্রিটিশদের দেওয়ানি করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও কলকাতার কট্টরপন্থী সনাতন সমাজ তাদের আভিজাত্য মেনে নিলেও সামাজিক স্তরে সম্পূর্ণ একঘরে করে রেখেছিল। পিরালী অপবাদের কারণে মূলধারার কোনো রাঢ়ী বা বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ পরিবার, ঠাকুর পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করত না। এ কারণে রবীন্দ্রনাথের নিজের বিয়েও হয়েছিল এক দরিদ্র পিরালী পরিবারের কন্যা ভবতারিণী (বিয়ের পর মৃণালিনী দেবী)-র সাথে।

    রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই, ভারতের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও বিয়ের জন্য যশোরের পিরালী পরিবারের কন্যা (জ্ঞানদানন্দিনী দেবী) বেছে নিতে হয়েছিল। ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষেরা মুঘল দরবারে কাজ করায় ফারসি ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং তাঁদের পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসে মুঘল-ইসলামি প্রভাব ছিল। পরবর্তীকালে তাঁরা সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। এই সবকিছুর কারণে সনাতন সমাজের কট্টরপন্থীরা তাঁদের ‘যবন-ভাবাপন্ন’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ বলে গালি দিত। এই পিরালী অপবাদ ও সামাজিক বর্জনই ছিল সেই গোপন ক্ষত, যা ঠাকুর পরিবারকে ব্রাহ্ম-ব্রাহ্মণ্য দ্বৈততার দিকে ঠেলে দিয়েছিল এবং হিন্দুত্বের ভেতরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও আভিজাত্য প্রতিষ্ঠার তাগিদে শিবাজী-উৎসবের মতো প্রকল্পে অংশ নিতে প্ররোচিত করেছিল (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)।

    এই প্রাতিষ্ঠানিক কাল্টের সবচেয়ে মারাত্মক দিকটি ছিল, এটি কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দু ও ব্রিটিশ রাজত্বের যৌথ আনুকূল্যে এমন এক ‘হাই-কালচারের’ জন্ম দেয়, যার মূল কাজই ছিল পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগুরু মুসলিম জনসমষ্টিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে ফেলা। রাবীন্দ্রিক এই বিশ্বজনীন মরমিবাদ বা প্রক্সি-ধর্ম আসলে ছিল উপনিষদের একেশ্বরবাদের এক পরিমার্জিত নান্দনিক সংস্করণ। যা মানুষের প্রথাগত ধর্মীয় রীতিনীতির সমান্তরালে এক ধরনের ছদ্ম-ধর্মীয় মানসিকতা তৈরি করে। যাতে একজন মুসলমান নিজের ঘরের তাওহিদি পরিচয়কে ‘খ্যাত’ বা আদিম মনে করে বর্জন করতে শুরু করে এবং কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার চিরস্থায়ী গোলামে পরিণত হয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১৫, ২৩)।

    জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রভূত প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এবং পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, পতিসরের বিপুল জমিদারি বিত্তের জোরে কলকাতার বুদ্ধিজীবী নেটওয়ার্ক রবীন্দ্রমানসকে বাঙালি সংস্কৃতির একমাত্র পরম উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কর্মযজ্ঞ শুরু করে (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)। এই এলিট এস্থেটিক্সের মূল হাতিয়ার ছিল রবীন্দ্রনাথের নিজের সাহিত্যকর্ম। যেখানে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মুসলিম বিদ্বেষ ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তিকে চাঙ্গা করার জন্য অনেক গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতা রচনা করেন। তাঁর ‘রীতিমত নভেল’ নামক ছোটগল্পে মুসলিম চরিত্রকে হরণ করা হয়েছে এভাবে— “আল্লাহো আকবর শব্দে বনভূমি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে। একদিকে তিন লক্ষ যবন সেনা অন্য দিকে তিন সহস্র আর্য সৈন্য। ... পাঠক, বলিতে পার ... কাহার বজ্রমণ্ডিত ‘হর হর বোম বোম’ শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ কণ্ঠের ‘আল্লাহো আকবর’ ধ্বনি নিমগ্ন হয়ে গেলো। ইনিই সেই ললিতসিংহ। কাঞ্চীর সেনাপতি। ভারত-ইতিহাসের ধ্রুব নক্ষত্র।” শুধু ‘রীতিমত নভেল’ই নয়; রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সমস্যা’, ‘পুরান’, ‘দুরাশা’ ও ‘কাবুলীওয়ালা’ গল্পে মুসলমানদের জারজ, চোর, খুনি ও অবৈধ প্রণয় আকাঙ্ক্ষিণী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন (নাউজুবিল্লাহ)। বিশেষ করে ‘দুরাশা’ গল্পের কাহিনীটি আরও স্পর্শকাতর। এখানে দেখানো হয়েছে, একজন মুসলিম নারীর হিন্দু ধর্ম তথা ব্রাহ্মণদের প্রতি কি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং এই মুসলিম নারীর ব্রাহ্মণ হওয়ার প্রাণান্তকর কোশেশের চিত্র। ‘সমস্যাপুরণ’ গল্পে দেখানো হয়েছে, মুসলিম নারীর গর্ভে পিতা কৃষ্ণগোপালের ঔরসে জন্ম নেয়া ভাইয়ের পরিচয় পিতার মুখ থেকে শুনে ছেলে বিপিনচন্দ্র বিস্ময়ে উচ্চারণ করে ‘যবনীর গর্ভে?’ কৃষ্ণগোপাল বলে, ‘হ্যাঁ বাপু।’ (নাউজুবিল্লাহ)।

    রবীন্দ্রনাথের এই সাহিত্যকর্ম কেবল ব্যক্তিগত পক্ষপাত ছিল না; এটি ছিল তার সমকালীন হিন্দুদেরকে চরম মুসলিমবিদ্বেষী হতে উৎসাহিত করার এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম। ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকে তিনি লিখেছেন, প্রতাপাদিত্যের উক্তি, ‘খুন করাটা যেখানে ধর্ম সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।’ ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কণ্ঠরোধ’ প্রবন্ধে তিনি মুসলমানদের ‘ইতর শ্রেণীর অবিচেতন মুসলমান’ বলে অভিহিত করেন এবং তাদের ‘লোষ্ট্র হস্তে উপদ্রবের’ চিত্র এঁকে সমাজে ভয় ও ঘৃণা ছড়ান (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ভারতী, বৈশাখ ১৩০৫)। ‘জীবন স্মৃতি’তে তিনি পাজামাকে ‘বিজাতীয়’ বলে মুসলিম পোশাক-পরিচ্ছদকে হেয় করেন (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র রচনাবলী-১০, জীবন স্মৃতি, পৃষ্ঠা ৬৭)। ‘কালান্তরে’ তিনি লেখেন, ‘বাহির থেকে মুসলমান হিন্দুস্থানে এসে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকে বাহিরের দিকে প্রসারিত করেনি। তারা ঘরে এসে ঘর দখল করে বসল, বন্ধ করে দিল বাহিরের দিকের দরজা।’ (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৮)। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাজসিংহ’ ও ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে মুসলিম-বিদ্বেষের যে বিষবহ্নি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা ‘জাতীয় সাহিত্য’ আখ্যা দিয়ে সমর্থন করেছিলেন এবং মুসলমানদের আলাদা সাহিত্য সৃষ্টির কথা বলেছিলেন। এই প্রসঙ্গে আবুল আসাদ তাঁর ‘একশ’ বছরের রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, বঙ্কিমচন্দ্রের মুসলিম-বিদ্বেষপূর্ণ সাহিত্যের পক্ষে তিনি লিখেন, ‘মুসলমান বিদ্বেষ বলিয়া আমরা আমাদের জাতীয় সাহিত্য বিসর্জন দিতে পারি না। মুসলমানদের উচিত নিজেদের জাতীয় সাহিত্য নিজেরাই সৃষ্টি করা।’ (ভারতী পত্রিকা থেকে উদ্ধৃত, আবুল আসাদ, একশ’ বছরের রাজনীতি, পৃ. ২২)।

    ঐতিহাসিক নীরদ চৌধুরী তাই যথার্থই লিখেছেন, “রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছে একটি মাত্র সমন্বয় সাধনের, আর সে সমন্বয়টি হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার। ইসলামী ভাবধারা ও ট্রাডিশন তাঁদের চেতনাবৃত্তকে কখনও স্পর্শ করেনি” (চৌধুরী, নীরদ। Autobiography of an Unknown Indian, পৃষ্ঠা ১৯৬)। ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারও স্বীকার করেছেন, “হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনও এর উপস্থিতি স্বীকার করবে না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ভারতের রবীন্দ্রনাথ। যাঁর পৃথিবীখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কিছুতেই সুসংগত করা যায় না। তবুও বাস্তব সত্য এই যে, তার কবিতাসমূহ শুধুমাত্র শিখ, রাজপুত ও মারাঠাকুলের বীরবৃন্দের গৌরব ও মাহাত্ম্যেই অনুপ্রাণিত হয়েছে। কোনও মুসলিম বীরের মহিমা কীর্তনে তিনি কখনও একচ্ছত্রও লেখেননি। যদিও তাদের অসংখ্যই ভারতে আবির্ভূত হয়েছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায় ছিল” (মজুমদার, ড. রমেশচন্দ্র। History of Bengal, পৃষ্ঠা ২০৩)। আহমদ শরীফ আরও নির্দিষ্ট করে দেখিয়েছেন, “রবীন্দ্রনাথ বেদ, উপনিষদ, ত্রিপিটক, বাইবেল, বুদ্ধ, খৃস্ট, ব্রহ্ম, ব্রহ্মা, ব্রাহ্ম্য, কৃষ্ণচরিত ইত্যাদি সকল বিষয়ে লিখেছেন। গদ্য, কবিতায় উল্লেখ করেছেন। গান, নাটক লিখেছেন। গল্পে এসেছে চরিত্র, কখনো বিষয় হয়ে। কিন্তু সাড়ে সাতশ বছরের পুরনো দেশজ কিম্বা বিদেশাগত দরবেশ বা শাসক মুসলিমের কোনো ব্যক্তিগত কৃতি কিম্বা গুণ-মান-মাহাত্ম্য তাঁর কাব্য প্রেরণার উৎস হয়নি। এমনকি আকবর বাদশাহ কিম্বা মঈনউদ্দীন চিশতি, রাজিয়া আনারকলি নূরজাহানও নন। ছয়শ বছর ধরে প্রবল প্রতাপ এমন এক বিদ্যা ও বিত্তবান জ্ঞান-কৃতি-কীর্তি বহুল জাতির বা সম্প্রদায়ের কিছুই তাঁর (তাজমহলই ব্যতিক্রম) আবেগ উদ্রিক্ত করতে পারেনি। এতে মনে হয় বিদেশাগত এ শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর অন্তরের গভীরে প্রচণ্ড ঘৃণা-বিদ্বেষ বা স্থায়ী অশ্রদ্ধা ছিল” (শরীফ, আহমদ। রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন, ইদানীং আমরা, পৃষ্ঠা ১১২)। ফরহাদ মজহারও এই অভিযোগই কবিতায় তুলেছেন— “... তেনার কলমে / বহু ....মনীষীর নাম / হয়েছে স্মরণ কিন্তু ঘুণাক্ষরে নবী মুহম্মদ / আকারে ইঙ্গিতে ভাবে দিলে কিম্বা নিবের ডগায় / একবারও আসে নাই, তাঁকে তাই মাফ করি নাই” (মজহার, ফরহাদ। এবাদতনামা, কবিতা ২১)।

    মোতাহের হোসেন চৌধুরী শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার লেখায় ইসলাম ও বিশ্বনবী সম্পর্কে কোন লেখা নেই কেন? উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কুরআন পড়তে শুরু করেছিলুম, কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারিনি, আর তোমাদের রসুলের জীবন চরিতও ভাল লাগেনি (উল্লাহ, সৈয়দ মুজিব। বিতণ্ডা, পৃষ্ঠা ২২৯)। এই সমস্ত প্রামাণ্য উপাত্ত একসঙ্গে বিচার করলে স্পষ্ট হয়ে যায়, রবীন্দ্রনাথের তথাকথিত ‘বিশ্বজনীন মানবতাবাদ’ ছিল মূলত হিন্দু-ইউরোপীয় সমন্বয়ের এক নির্বাচিত এলিট এস্থেটিক্স। যার কেন্দ্রে ছিল ইসলাম ও মুসলিম-বর্জন। এই এস্থেটিক্সই পরবর্তীকালে কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ ও ছদ্ম-সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের হাতে এমন এক হাতিয়ারে পরিণত হয়, যা মুসলমানের দৈনন্দিন নৈতিকতা, শিল্প-সাহিত্য, এমনকি মৃত্যু-পরবর্তী আচার-অনুষ্ঠানকেও এক উচ্চবর্ণের ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রেমওয়ার্কের অধীনস্থ করে ফেলে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)।

    এই প্রাতিষ্ঠানিক কাল্টের আরও একটি গোপন অস্ত্র ছিল ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ অবস্থান। রবীন্দ্রনাথ যুগে এদেশ পরাধীন ছিল। তখন এদেশ অসংখ্য আন্দোলন-সংগ্রামে আলোড়িত হয়েছিল। স্বাধীনতার আন্দোলন, স্বরাজ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন ও বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। উক্ত আন্দোলনসমূহে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা কী ছিল তার নিরিখেই আমরা বিচার করব রবীন্দ্র রাজনীতির স্বরূপ আসলে কী ছিল? লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই বা কী ছিল? রবীন্দ্রনাথ স্বাধীনতা বা ফ্রীডমকে ভাল চোখে দেখেননি। পশ্চিমী রাষ্ট্রদর্শনে যাকে ফ্রীডম বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ তাকে চঞ্চল, ভীরু, স্পর্ধিত ও নিষ্ঠুর আখ্যা দিয়েছেন (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র রচনাবলী, ভারতবর্ষ ও স্বদেশ, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১০২৫)। ইংরেজ শাসনের পক্ষে তিনি লিখেছেন— “রাগ করিয়া যদি বলি, ‘না আমরা চাই না’ তবুও আমাদিগকে চাহিতেই হইবে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এক হইয়া মহাজাতি বাঁধিয়া উঠিতে না পারি ততক্ষণ পর্যন্ত ইংরেজ রাজত্বের যে প্রয়োজন তাহা কখনোই সম্পূর্ণ হইবে না” (পোদ্দার, ড. অরবিন্দ। রবীন্দ্রনাথ : রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পৃষ্ঠা ১৩৩)। তিনি আরও লিখেছেন, ইংরেজদের আহবান আমরা যে পর্যন্ত গ্রহণ না করিব, তাহাদের সঙ্গে মিলন যে পর্যন্ত না সার্থক হইবে, সে পর্যন্ত তাহাদিগকে বলপূর্বক বিদায় করিব, এমন শক্তি আমাদের নাই। যে ভারতবর্ষ অতীতে অঙ্কুরিত হইয়া ভবিষ্যতের অভিমুখে উদ্ভিন্নব হইয়া উঠিতেছে, ইংরেজ সেই ভারতের জন্য প্রেরিত হইয়া আসিয়াছে। সেই ভারতবর্ষ সমস্ত মানুষের ভারতবর্ষ আমরা সেই ভারতবর্ষ হইতে অসময়ে ইংরেজকে দূর করিব, আমাদের এমন কী অধিকার আছে, বৃহৎ ভারত বর্ষের আমরা কে? (পোদ্দার, ড. অরবিন্দ। রবীন্দ্রনাথ : রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পৃষ্ঠা ১৩৫)। ইংরেজদের বশংবদ ভৃত্য রবীন্দ্রনাথের এরূপ আরও বহু স্বাধীনতাবিরোধী মন্তব্য ও উক্তি রহিয়াছে। এই স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান ও ব্রাহ্মণ্যবাদী দ্বৈততা একসঙ্গে মিলেই রবীন্দ্র-ধর্মের প্রক্সি-বিশ্বাসকে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক কাল্টে পরিণত করেছিল, যা পূর্ববঙ্গের তাওহিদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টিকে কেবল ধর্মীয়ভাবেই নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে ফেলেছিল। রবীন্দ্রনাথ আরও স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর দু’টি সম্প্রদায় আছে অন্য সমস্ত ধর্মমতের সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধতা অতুগ্র, সে হচ্ছে খৃস্টান আর মুসলমান ধর্ম’ (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। হিন্দুমুসলমান, কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২০)। এই উক্তিই প্রমাণ করে, তাঁর প্রক্সি-ধর্মের ভিত্তি ছিল ইসলাম ও মুসলিম-বিরোধী এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর। যা বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাকে চিরতরে ক্ষুণ্ণ করার এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম হিসেবে কাজ করেছে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)।

    রবীন্দ্রায়ণের দ্বিতীয় খণ্ডে পুলিনবিহারী সেনের সংকলিত প্রবন্ধে শ্রীবিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও নন্দলাল বসুর তথ্যে বর্ণিত কবিগুরুর পাণ্ডুলিপির যে বিখ্যাত কাটাকুটি, বিমূর্ত রূপের জগত এবং রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যের ভেতরের ছন্দোবোধের কথা বলা হয়েছে, তা আসলে ছিল পূর্ববঙ্গের ব্রাত্য মানুষের আদিম ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে একচেটিয়া উচ্চ-সাহিত্যের এলিট সম্পত্তিতে রূপান্তর করার এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম (সেন, পুলিনবিহারী। রবীন্দ্রায়ণ (দ্বিতীয় খণ্ড), পৃষ্ঠা ১৭)। এই চতুর আত্তীকরণের ফলে সাধারণ গ্রামীণ মুসলমান চাষী ও অনার্যরা তাদের নিজেদের ঘরের মাটির গানের ওপরই অধিকার হারিয়ে ফেলে। কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ প্রমাণ করতে চাইল, এই ভূখণ্ডে যা কিছু সুন্দর বা নন্দনতাত্ত্বিক, তার একমাত্র ঠিকাদারি বা মালিকানা কেবল তাদেরই। এই মনস্তাত্ত্বিক আত্তীকরণ ও লুণ্ঠনের ফলে সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় সুনিশ্চিত হয়েছিল, যার কুৎসিত উত্তরাধিকার আজও আধুনিক বাংলাদেশের স্বাধীন মননশীলতাকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৮২)।

    রবীন্দ্র-ধর্মের এই প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট কেবল সাহিত্যের পাতার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি মানুষের জীবনের আনন্দ, শোক বা উৎসব থেকে শুরু করে শেষ বিদায়ের মুহূর্তটিকেও একটি নির্দিষ্ট উচ্চবর্ণের ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্কের অধীনস্থ করে ফেলে। যার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল পূর্ববঙ্গের তাওহিদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টি যেন কখনো তাদের নিজস্ব স্বকীয় সংস্কৃতির বুনিয়াদে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১২৫)। এই মনস্তাত্ত্বিক জালের ফাঁদ এতটাই সুগভীর ছিল যে, উনিশ শতক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলিম মানস নিজের অজান্তেই সংস্কৃতির এই জালিয়াতিকে প্রগতির একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বরণ করে নেয়। যার সম্পূর্ণ নিরসন ছাড়া প্রকৃত ডিকলোনিয়াল ও বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব নয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩১)।

    ছদ্ম-সেক্যুলার মোড়কে রাবীন্দ্রিক উৎসবকে ‘পবিত্র সামাজিক আচারে’ রূপান্তরের রাজনীতি

    আধুনিক বাঙালি সুশীল সমাজের প্রাত্যহিক যাপিত জীবনে ছদ্ম-সেক্যুলারিজম বা ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতার মোড়কে রাবীন্দ্রিক গান, শান্তিনিকেতনি উৎসব এবং ঋতুভিত্তিক বন্দনাগুলোকে যেভাবে এক ধরনের ‘পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় সামাজিক আচার’-এ রূপান্তর করা হয়েছে, তার রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মেকানিজমটি অত্যন্ত সুগভীর। এই উৎসবগুলো কেবল কোনো সাধারণ আনন্দ উদযাপন ছিল না। বরং এগুলোকে এমন এক চতুর নান্দনিক ছাচে ঢালাই করা হয়েছে, যা মানুষের চিরাচরিত ধর্মীয় রীতিনীতির সমান্তরালে এক সমান্তরাল ছদ্ম-ধর্মীয় মানসিকতা তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব আকর গ্রন্থ ‘ধর্ম’ (১৩১৫ সংস্করণ) নিবিড়ভাবে পাঠ করলে এই উৎসব-দর্শনের আদি রূপটি পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। এই গ্রন্থের ‘উৎসব’ এবং ‘উৎসবের দিন’ প্রবন্ধ দুটিতে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট লিখেছেন, সংসারে প্রতিদিন মানুষ যে সত্যকে স্বার্থের বিক্ষিপ্ততায় ভুলে থাকে, উৎসবের বিশেষ দিনে সেই অখণ্ড সত্যকে স্বীকার করতে হয় এবং এই অনুভূতিই হলো উৎসবের মূল আনন্দ (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৮)। তিনি আরও দাবি করেছেন, এই উৎসবের দিনে প্রতিদিনের কার্পণ্য পরিহার করে প্রাচুর্য, ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের অকাতর প্রকাশ ঘটাতে হবে। কারণ সৌন্দর্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং তা আবশ্যকের নয়, বরং আনন্দের বিকাশ ও প্রেমের ভাষা (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ১২, ১৩)। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্যের আড়ালে যে উগ্র আর্য-হিন্দু জাতীয়তাবাদী ফ্রেমওয়ার্ক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গিয়েছিলেন, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এই উৎসবের প্রাচুর্য ও সৌন্দর্যতত্ত্বকে সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম সমাজের তাওহিদি চেতনা ও লৌকিক কৃষ্টি উচ্ছেদের এক অন্যতম নন্দনতাত্ত্বিক হাতিয়ার বা ‘এলিট এস্থেটিক্স’ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৪; আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)।

    রাবীন্দ্রিক এই ছদ্ম-সেক্যুলার উৎসবগুলোর ভেতরের ধর্মতাত্ত্বিক উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শান্তিনিকেতন আশ্রমের ‘পৌষ-উৎসব’, ‘বর্ষশেষ’ বা ‘নববর্ষ’ উপলক্ষ্যে পঠিত প্রবন্ধসমূহের মূল নির্যাস গড়ে উঠেছিল প্রাচীন বৈদিক উপনিষদীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করে। রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র সেনের ‘রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস’ গ্রন্থের অকাট্য প্রামাণিক উপাত্তে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যে ও উৎসবের আচারে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, শ্বেতাশ্বতর ও কঠোপনিষদের শ্লোক ও মন্ত্রগুলোকে সরাসরি পরিমার্জিত অনুবাদ করে একচ্ছত্র একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম প্রক্সি-আচার হিসেবে ইনজেক্ট করেছিলেন (সেন, প্রবোধচন্দ্র। রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস, পৃষ্ঠা ১২, ৪৩৭)। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ধর্ম’ গ্রন্থের ‘প্রাচীন ভারতের একঃ’ এবং ‘শান্তং শিবমদ্বৈতম্’ প্রবন্ধে উপনিষদের সেই অখণ্ড ও অনন্য ব্রহ্মের ধারণাকেই বাঙালি সংস্কৃতির একমাত্র পরম উৎস হিসেবে হাজির করেছিলেন (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৪৪, ১২২)। এই বৈদিক উপাদানে পরিপুষ্ট রাবীন্দ্রিক উৎসবগুলো যখন বাঙালি সুশীল সমাজের ওপর প্রগতির একমাত্র ছাদ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলো, তখন তা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের দীর্ঘদিনের লৌকিক ও ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলোকে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বা কোণঠাসা করে ফেলে। ফাহমিদ-উর-রহমানের ‘রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশ, সাম্প্রদায়িকতা’ গ্রন্থের কঠোর তাত্ত্বিক ও কলোনিয়াল সমালোচনা সূত্রে দেখা যায়, কীভাবে এই ছদ্ম-সেক্যুলার উৎসবগুলোর মোড়কে প্রাক-মুসলিম ধর্মীয় প্রতীক ও ব্রাহ্ম মেটাফিজিক্সের সুপরিকল্পিত অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছিল। যা গ্রামীণ ইসলামের সুফি ঐতিহ্য, মিলাদ-শরিফ বা শবে বরাতের মতন গণমানুষের খাঁটি মাটির কৃষ্টিগুলোকে ‘অনগ্রসর’ বা ‘সংস্কৃতি-বহির্ভূত’ বলে দাগী করে দেয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশ, সাম্প্রদায়িকতা, পৃষ্ঠা ১৫)।

    এই ছদ্ম-সেক্যুলার উৎসব-রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ‘শিবাজী উৎসব’। মহারাষ্ট্রের ‘বালগঙ্গাধর তিলক’ ১৮৯৫ সালের ১৫ এপ্রিল ‘শিবাজী উৎসব’ প্রতিষ্ঠা করেছিল উগ্র হিন্দু জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রচার ও প্রসারের জন্য। শিবাজী উৎসব সম্পর্কে গিরিরাজা শঙ্কর রায় চৌধুরী লিখেছেন, “তিলক প্রবর্তিত শিবাজী উৎসবে কবিতা, গল্প-উপন্যাস, গান ও নাটকে সে চেতনারই নানা ভাবে প্রকাশ ঘটে। তরঙ্গ বাংলাদেশেও আসিয়া লাগিয়াছিল। সখারাম গণেশ দেউস্কর সম্ভবত ১৯০২ সালে মারাঠার এই বীরপুজা বাংলাদেশে প্রবর্তিত করে। তদবধি মহাসমারোহে কয়েকবার কলিকাতা ও মফস্বলে শিবাজী উৎসবের সাম্বাৎসরিক অধিবেশন হইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ, বিপিনচন্দ্র প্রভৃতি সকলেই এই উৎসবে যোগদান করিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথের শিবাজী উৎসব সম্বন্ধে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে অমর হইয়াছে” (রায় চৌধুরী, গিরিরাজা শঙ্কর। শ্রী অরবিন্দু ও বাংলার স্বদেশী যুগ, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃষ্ঠা ২৭৩)। রবীন্দ্রনাথ ‘সঞ্চয়িতা’ কাব্যগ্রন্থে ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতায় এই উৎসবের মূলবিষয় আকাঙ্ক্ষা করে বলেন— “এক ধর্ম কাব্য খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে দিব আমি ....... ........ ‘এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন করিব সম্বল।” ‘শিবাজী-উৎসব’ নামক কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছেন, শিবাজী চেয়েছে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারতজুড়ে এক ধর্ম রাজ্যের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাঙালিরা সেটা বোঝেনি। না বুঝে করেছে ভুল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতায় শিবাজীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন—

    “হে রাজ-তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা

    বিধর ভাণ্ডারে

    সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা

    পারে হরিবারে?

    তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ-লক্ষ্মীর পূজাঘরে

    সে সত্য সাধন,

    কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ-যুগান্তর ওরে

    ভারতের ধন” (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। সঞ্চয়িতা, শিবাজী উৎসব)।

    এই হল রবীন্দ্রনাথের ভক্তিবোধ। এই হল রবীন্দ্র মানস ও চেতনা! তবে এটি শুধু রবীন্দ্রনাথের একার চেতনাগত সমস্যা নয়, এটিই মূল সংকট ছিল হিন্দু রেনেসাঁর কর্ণধারদের। তিনি যাকে “হে রাজস্বী বীর” বলে মুগ্ধ মনে কবিতা লিখেছেন, তার প্রকৃত পরিচয় হলো— মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব রাহি. তাকে ব্যস্ত রেখেছিলেন মারাঠা অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত হামলার মধ্য দিয়ে। সম্মুখ সমরে আসার সামর্থ্য তার ছিল না। যুদ্ধে একবার পরাজিত ও বন্দী হওয়ার পর ফন্দি করে লুকিয়ে পালিয়েছিল। আরেকবার সম্রাট আওরঙ্গজেব রাহি. উনার সেনাপতি আফজাল খাঁর নেতৃত্বে ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনীকে তার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধের বদলে আলোচনায় ডেকে আফজাল খাঁকে সে হত্যা করে। সেটি ছিল কাপুরুষিত হত্যা। সে সময় আফজাল খাঁ তাকে ইসলামী উদারতায় আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সে মুহূর্তে শিবাজীর বাঁ হাতে লুকানো “বাঘের নখ” দিয়ে আফজাল খাঁর দেহ ছিন্ন করে। অথচ এ নিরেট কাপুরুষতা বীরতুল্য গণ্য হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাছে। যা নিয়ে বিশাল এক কবিতাও তিনি লিখেছেন। এ হল রবীন্দ্রনাথের বিবেচনা ও মানবতার মান!

    রবীন্দ্রনাথ বরং সে সব ঐতিহাসিকদেরও নিন্দা করেছেন যাদের দৃষ্টিতে শিবাজী ছিল, এক বর্বর দস্যু। তিনি তাঁদেরকে মিথ্যাময়ী বলেছেন, এবং তাঁদের বিদ্রুপ করে লিখেছেন—

    “বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলে করে পরিহাস

    অট্টহাস্য রবে

    তব পুণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিস্ফল প্রয়াস

    এই জানে সবে।

    অয়ি ইতিবৃত্ত কথা, ক্ষান্তু করো মুখর ভাষণ

    ওগো মিথ্যাময়ী,

    তোমার লিখন- ‘পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন

    হবে আজি জয়ী।

    যাহা মরিবার নহে তাহারে কেমনে চাপা দিবে

    তব ব্যঙ্গ বাণী

    যে তপস্যা সত্য তারে কেহ বাধা দিবে না ত্রিদিবে

    নিশ্চয় সে জানি।” (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। সঞ্চয়িতা, শিবাজী উৎসব)।

    ইতিপূর্বেই আমরা দেখেছি, ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনও এর উপস্থিতি স্বীকার করবে না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ভারতের রবীন্দ্রনাথ। যাঁর পৃথিবীখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কিছুতেই সুসংগত করা যায় না। তবুও বাস্তব সত্য এই যে, তার কবিতাসমূহ শুধুমাত্র শিখ, রাজপুত ও মারাঠাকুলের বীরবৃন্দের গৌরব ও মাহাত্ম্যেই অনুপ্রাণিত হয়েছে, কোনও মুসলিম বীরের মহিমা কীর্তনে তিনি কখনও একচ্ছত্রও লেখেননি। যদিও তাদের অসংখ্যই ভারতে আবির্ভূত হয়েছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায় ছিল” (মজুমদার, ড. রমেশচন্দ্র। History of Bengal, পৃষ্ঠা ২০৩)। এই শিবাজী উৎসবের নান্দনিক ছদ্ম-সেক্যুলার আবরণেই বাঙালি সুশীল সমাজ গরু-কোরবানির বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের সেই প্রাচীন আচারকে পুনরুজ্জীবিত করে। ব্রিটিশ সরকার সতিদাহ প্রথাকে আইন করে বিলুপ্ত করে; বিধবা হিন্দু রমনীদের বাঁচানো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কবিতা বা প্রবন্ধ না লিখলেও ম্লেচ্ছ, অস্পৃশ্য, যবন রবীন্দ্রনাথের নজর পড়ে তাদের গো-দেবতা বাঁচানোর দিকে। তখন তিনি গো-দেবতা বাঁচানোর মিশন নিয়ে ময়দানে নামেন, শিবাজীর অন্ধভক্ত মহারাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক নেতা ‘বালগঙ্গাধর তিলক’-এর সঙ্গে। তিলক ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “গোরক্ষিণী সভা”। গরু বাঁচাতে গিয়ে তখন ভারত জুড়ে শুরু হয় মুসলিম হত্যা। রবীন্দ্রনাথ তিলকের এ মিশনে একাত্ম হন এবং তার জমিদারী এলাকায় গরু কোরবানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই হল, হিন্দু বাঙালি রবীন্দ্রনাথের রেনেসাঁ চেতনা। ঐতিহাসিক নীরদ চৌধুরী তাই লিখেছেন, “রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছে একটি মাত্র সমন্বয় সাধনের, আর সে সমন্বয়টি হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার। ইসলামী ভাবধারা ও ট্রাডিশন তাঁদের চেতনাবৃত্তকে কখনও স্পর্শ করেনি” (চৌধুরী, নীরদ। Autobiography of an Unknown Indian, পৃষ্ঠা ১৯৬)। এইভাবেই শিবাজী উৎসবের ছদ্ম-সেক্যুলার নান্দনিকতার মোড়কে আসলে ছিল, হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক রাজনৈতিক প্রকল্প। যা মুসলমানদের লৌকিক উৎসব ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কোণঠাসা করার এক সুসংগঠিত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে (রহমান, ফাহমিদ-উর। রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশ, সাম্প্রদায়িকতা, পৃষ্ঠা ১৫)।

    আবুল মনসুর আহমদের ‘বাংলাদেশের কালচার’ গ্রন্থের বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদে স্পষ্ট দেখানো হয়েছে, কীভাবে এই রাবীন্দ্রিক হেজিমনি বাঙালি মুসলমানের অবচেতনে এক চিরস্থায়ী নান্দনিক দাসত্ব কায়েম করেছিল। এর ফলে একজন মুসলমান তার জীবনের আনন্দ, শোক বা উৎসবের মতন পরম পবিত্র মুহূর্তগুলোতেও নিজের মাটির আদিম তাওহিদি পরিচয়কে হারিয়ে কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার তৈরি ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্কের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। ঢাকার নাগরিক জীবনের আধুনিক পহেলা বৈশাখ বা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতন উৎসবগুলোতে যেভাবে আলপনা, উলুধ্বনি ও ভূত-প্রেতের মুখোশের মতো প্রাক-মুসলিম ধর্মীয় প্রতীকের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে, তা আসলে এই রাবীন্দ্রিক ছদ্ম-সেক্যুলার আচারেরই এক আধুনিক রূপান্তর। যা মুসলমানদের নিজস্ব লৌকিক ঐতিহ্য ও বিশ্বাসকে হীন চোখে দেখতে বাধ্য করে (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৪)। ডক্টর ওয়াকিল আহমদের ‘উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে বর্ণিত সেই ঐতিহাসিক সত্যের আলোকে দেখা যায়, কীভাবে উনিশ শতকের শেষভাগে এসে মুসলিম সমাজকে ভাষিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে পঙ্গু করে ফেলার পর, রবীন্দ্র-ধর্মের এই প্রক্সি-বিশ্বাস তাদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে ফেলেছিল।

    জানাজা এড়ানোর নাগরিক থিয়েটার এবং মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের চূড়ান্ত ইশতেহার

    বাঙালি মুসলমানের জীবন এবং মৃত্যুর পর তার জানাজার একটি নিজস্ব ধর্মীয় নিয়ম ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। এটি তাদের একান্তই নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়। কিন্তু আজকের আধুনিক শহরের তথাকথিত শিক্ষিত ও সুশীল মানুষ জানাজাকে কেন্দ্র করে এক ধরণের কৃত্রিম সাংস্কৃতিক নাটক বা থিয়েটার তৈরি করেছে। তারা মুসলমানের এই নিজস্ব ধর্মীয় নিয়মটিকে সাধারণ মানুষের মন থেকে হালকা করে দিতে চায়। এই ঘটনাটি আসলে আমাদের চিন্তাভাবনার ওপর পুরনো ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী এবং উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির একটি কুৎসিত মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।

    ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের মাধ্যমে কলকাতায় একদল নতুন জমিদার ও বাবু সমাজ গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো লেখকেরা তাঁদের সাহিত্যের মাধ্যমে মুসলমানদের আসল ইতিহাসকে আড়াল করে এক উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবধারা তৈরি করেন। এই ঘটনার ফলে মুসলমানদের ইতিহাসচ্যুত করে যে উগ্র ফ্রেমওয়ার্ক খাড়া করা হয়েছিল, রবীন্দ্র-ধর্মের অতি-প্রাকৃতিক কাল্ট তাকে এক পরিশীলিত ও ছদ্ম-সেক্যুলার মনস্তাত্ত্বিক জালে রূপান্তরিত করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)। এই জালের আসল ট্র্যাজেডি ও ময়নাতদন্ত লুকিয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের লেখা মূল আকর গ্রন্থ ‘ধর্ম’ (১৩১৫ বিশ্বভারতী সংস্করণ)-এর ভেতরের আধ্যাত্মিক দর্শনের মধ্যে।

    রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ধর্ম’ গ্রন্থের ‘দিন ও রাত্রি’ প্রবন্ধে আলো ও অন্ধকারের একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছিলেন। এই প্রবন্ধটি নিবিড়ভাবে পাঠ করলে শহরের আধুনিক সুশীল সমাজের মূল চালিকাশক্তিটি ধরা পড়ে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "দিনের আলো মানুষের বাহ্যিক সীমা, প্রভেদ, ও কাজের সংঘাতকে স্পষ্ট করে তোলে এবং নিজের স্বার্থসাধনচেষ্টায় মানুষের কর্তৃত্ব-অভিমানকে তৃপ্ত করে; কিন্তু রাত্রি বা অন্ধকার আসার সাথে সাথে মানুষের সেই বাহ্যিক প্রভেদ ও আত্যন্তিক অহংকার ওলটপালট হয়ে যায়" (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ১৮, ২০)। তিনি দাবি করছেন, অন্ধকার কেবলমাত্র অভাব বা শূন্যতা নয়, বরং তা হলো এক গভীর বিরাম। এটি হলো এক নিভৃত নির্ভরস্থান এবং মিলনের এক বিশাল মহাদেশ। যেখানে মানুষ বিশ্বজনীন অন্ধকারের মাতৃকক্ষে এসে নিজের সমস্ত সংগ্রাম ও কর্তৃত্বের অভিমান ভুলে এক অখণ্ড নিখিলজননীর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ১২-১৩, ২০-২১)।

    রবীন্দ্রনাথের বলা এই আত্মসমর্পণের দর্শনটি আসলে ব্রাহ্ম এবং উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী দ্বৈততারই আরেকটি রূপ। ব্রাহ্মণ্যবাদী আচার-অনুষ্ঠানেরই চূড়ান্ত রূপ ছিল—মানুষের মৃত্যুর পর শেষকৃত্যের আচারে হিন্দু পদ্ধতির প্রাধান্য দেওয়া। এই পদ্ধতিটি তৈরি করার ফলে তা পরোক্ষভাবে মুসলমানের জানাজা ও দাফনের ‘তাওহিদি’ বা একত্ববাদী ঐতিহ্যকে কোণঠাসা ও দুর্বল করে ফেলে। রবীন্দ্রনাথের নিজের তৈরি করা এই ‘অন্ধকারের মাতৃক্রোড়ে আত্মসমর্পণের’ সুগভীর দর্শনটিকে কলকাতার বাবু বা ভদ্রলোক সমাজ এবং পরবর্তীকালের ছদ্ম-সেক্যুলার সুশীল বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত চতুর উপায়ে একটি ভিন্ন কৌশলে রূপান্তর করেন। এই নতুন কৌশলটি সাধারণ মানুষের হাজার বছরের প্রথাগত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শেষকৃত্যের সমান্তরালে এক অলিখিত ‘প্রক্সি-ধর্ম’ বা ছদ্ম-ধর্ম হিসেবে কাজ করতে শুরু করে (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)।

    এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, রবীন্দ্রনাথের এই আধ্যাত্মিক কথার সাথে মুসলমানের জানাজার মিল কোথায়? মিলটি আসলে আক্ষরিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক। মুসলমানের জানাজা হলো দিনের আলোর মতো স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়। কিন্তু শহরের আধুনিক সুশীল সমাজ রবীন্দ্রনাথের ওই "অন্ধকারে সব এক হয়ে যাওয়ার" ধারণাকে একটি কৌশল হিসেবে ধার করে। তারা প্রচার করতে চায়, ধর্মীয় নিয়ম-কানুন বা জানাজার স্বাতন্ত্র্য বড় কথা নয়। মৃত্যুর পর তো সব মানুষই এক এবং সবাই এক অখণ্ড অন্ধকারে মিশে যাবে। এই ছদ্ম-উদারপন্থী ও সেক্যুলার চিন্তার আড়ালে তারা মূলত মুসলমানের জানাজার নিজস্ব ধর্মীয় গুরুত্বটিকে মুছে দিতে চায় এবং একে একটি নাগরিক ফ্যাশনে বা থিয়েটারে রূপান্তর করে। ফলে, মুসলমানরা প্রগতির নামে অজান্তেই তাদের নিজস্ব ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলছে। রবীন্দ্রনাথের এই দর্শনকে হাতিয়ার বানিয়ে মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে গ্রাস করার কথিত আধুনিক সুশীল আয়োজনই এখানে একটি ট্র্যাজেডি ও মনস্তাত্ত্বিক জাল।

    বাঙালি মুসলমানের হাজার বছরের এক শাশ্বত ও পরম পবিত্র ধর্মীয় ঐতিহ্য হলো, কোনো মানুষের মৃত্যুর পর অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে তার কাফন-দাফন সম্পন্ন করা। ইসলামের অমোঘ অনুশাসন মেনে তার মাগফেরাত ও পরকালীন মুক্তির জন্য তওবা-ইস্তিগফার সহকারে জানাজার সালাত আদায় করা। কিন্তু রবীন্দ্র-ধর্মের এই প্রাতিষ্ঠানিক কাল্টের গ্রাসে পড়া আধুনিক উচ্চশিক্ষিত কথিত সুশীল সমাজ এক অদ্ভুত আত্মবিস্মৃতি ও মানসিক পরাজয়ের শিকার হয়। তারা মৃত্যুর পর প্রথাগত ধর্মীয় জানাজা বা দাফনের সেই শাশ্বত তাওহিদি সান্ত্বনা ও পরপারের তাত্ত্বিক প্রস্তুতিকে এক প্রকার ‘অনগ্রসর’ বা ‘আনকালচার্ড’ মনে করতে শুরু করে। এর বদলে আধুনিক নাগরিক সমাজে এক নতুন থিয়েটার চালু হয়। যেখানে মৃত ব্যক্তির লাশের সামনে দাঁড়িয়ে জানাজার মূল সালাত বা ধর্মীয় মোনাজাতকে সুকৌশলে বাইপাস করে কেবল রাবীন্দ্রিক শোক-সঙ্গীত বা রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার মাধ্যমে এক কৃত্রিম, পবিত্র ও ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষ অবয়ব তৈরি করা হয়। এই নাগরিক থিয়েটার মূলত তৈরি করা হয়েছে মানুষের ভেতরের খাঁটি ধর্মীয় ও লৌকিক চেতনাকে সংস্কৃতির নামে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য। যাতে একজন মুসলমান তার শেষ বিদায়ের চূড়ান্ত মুহূর্তেও নিজের মাটির আদিম তাওহিদি পরিচয়কে হারিয়ে চিরকাল কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার এক চিরস্থায়ী গোলাম হিসেবে সমাহিত হয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১৫)।

    এই মনস্তাত্ত্বিক জালের ফাঁদ ও বাঙালি মুসলমানের অবচেতনের গভীরতম হীনম্মন্যতার ইতিহাসটি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ‘বাংলাদেশের কালচার’ গ্রন্থের অকাট্য সমাজতাত্ত্বিক ইশতেহারে। আবুল মনসুর আহমদ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে রবীন্দ্র-ধর্মের এই মনস্তাত্ত্বিক জাল একজন মুসলমানের জীবনের পরম পবিত্র উৎসব ও শেষ বিদায়ের মুহূর্তটিকেও একটি সুনির্দিষ্ট উচ্চবর্ণের ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্কের অধীনস্থ করে ফেলে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫২, ৯৬)। যখনই পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা তাদের নিজস্ব স্বকীয় সংস্কৃতির বুনিয়াদে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে চেয়েছে, তখনই এই ‘হাই-কালচারের’ ঠিকাদারেরা তাকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বা ‘খ্যাত’ তকমা দিয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে ফেলে। এই তীব্র হীনম্মন্যতার কারণেই কথিত সুশীল সমাজ নিজের ঘরের শবেবরাত, আকিকা বা বিসমিল্লাহখানির মতো খাঁটি মাটির প্রথাগুলোকে বর্জন করে কলকাতার ভ্যালিডেশনের দিকে তাকিয়ে থাকে। অথচ মৃত্যুর পর জানাজা এড়ানোর এই বর্ণচোরা নাগরিক থিয়েটারকে পরম ‘প্রগতিশীল’ বলে বরণ করে নেয় (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৮২)।

    এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের আরও একটি গভীর স্তর হলো ভাষিক ও সাংস্কৃতিক ট্রমা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবন স্মৃতি’তে পাজামাকে ‘বিজাতীয়’ বলে মুসলিম পোশাক-পরিচ্ছদকে হেয় করেন (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র রচনাবলী-১০, জীবন স্মৃতি, পৃষ্ঠা ৬৭)। ‘কালান্তরে’ তিনি লেখেন, ‘বাহির থেকে মুসলমান হিন্দুস্থানে এসে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকে বাহিরের দিকে প্রসারিত করেনি। তারা ঘরে এসে ঘর দখল করে বসল, বন্ধ করে দিল বাহিরের দিকের দরজা।’ (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৮)। এই ধরনের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক হেয় করার ফলেই একজন মুসলমান নিজের ভাষার শব্দ, নিজের পোশাক, নিজের নাম-পরিচয় নিয়েও হীনম্মন্যতায় ভোগে। ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কণ্ঠরোধ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মুসলমানদের ‘ইতর শ্রেণীর অবিচেতন মুসলমান’ বলে অভিহিত করেন এবং তাদের ‘লোষ্ট্র হস্তে উপদ্রবের’ চিত্র এঁকে সমাজে ভয় ও ঘৃণা ছড়ান (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ভারতী, বৈশাখ ১৩০৫)। এই প্রবন্ধেই তিনি লেখেন, ‘কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিচেতন মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লোষ্ট্র হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার মধ্যে বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজরারই প্রতি। তাহাদের শাস্তিও যথেষ্ট হইয়াছিল। প্রবাদ আছে ইটটি মারিলেই পাটকেলটি খাইতে হয়; কিন্তু মূঢ়গণ ইটটি মারিয়া পাটকেলের অপেক্ষা অনেক শক্ত শক্ত জিনিস খাইয়াছিল। অপরাধ করিল, দণ্ড পাইল; কিন্তু ব্যাপারটি কি আজ পর্যন্ত স্পষ্ট বুঝা গেল না। এই নিম্নশ্রেণীর মুসলমানগণ সংবাদপত্র পড়েও না, সংবাদপত্রে লেখেও না। .....কেহ বলিল, ইহা কংগ্রেসের সহিত যোগবদ্ধ রাষ্ট্র বিপ্লবের সূচনা; কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া পুড়াইয়া দেয়া যাক।’ (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ভারতী, বৈশাখ ১৩০৫)। এই ধরনের ভাষিক হেয়প্রকাশ ও সাংস্কৃতিক ট্রমার ফলে একজন মুসলমান তার নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। আর মৃত্যুর পর জানাজা এড়ানোর এই নাগরিক থিয়েটার সেই সন্দেহকে চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে দেয়।

    এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের চূড়ান্ত ঐতিহাসিক রূপরেখাটি আরও প্রচ্ছন্ন হয় যখন আমরা ভারততত্ত্ব-ভাস্কর শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত ‘বাংলা দেশের ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ)’ গ্রন্থের প্রামাণ্য দলিলের সাথে এর তুলনা করি। মধ্যযুগের সুবে বাংলায় সুফি-সাধক ও মরমি দরবেশদের হাত ধরে এদেশের অনার্য ও কৌম সমাজের মণ্ডলে ইসলামি সংস্কৃতির যে আদিম ও প্রকৃত জোয়ার এসেছিল, তা চিরাচরিত নাথ ধর্ম, সহজিয়া উপাসনা ও লৌকিক ঐতিহ্যের সাথে মিশে এক চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ লোকায়ত রূপ ধারণ করেছিল (মজুমদার, রমেশচন্দ্র। বাংলা দেশের ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ), পৃষ্ঠা ২৪২, ৩৫০)। কিন্তু আধুনিক যুগের এই ছদ্ম-সেক্যুলার নাগরিক থিয়েটার সুবে বাংলার সেই খাঁটি মাটির অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে এদেশের মানুষের মনোজগতে এক বর্ণচোরা জারজ সংস্কৃতির জন্ম দেয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১৬)। ডক্টর ওয়াকিল আহমদের ‘উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে বর্ণিত, আশরাফ-আতরাফ সামাজিক বৈষম্যের সেই সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক ক্ষতকে সুকৌশলে ব্যবহার করে কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে ফেলেছিল (আহমদ, ডক্টর ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), পৃষ্ঠা ৫, ১৩৩)। এই আশরাফ-আতরাফ বিভেদের কারণেই উচ্চবর্ণের মুসলিম সমাজ নিজেদের আরবী-ফারসি-উর্দুর আভিজাত্যের মোহে অবদমিত থাকত, আর নিম্নবর্ণের মুসলমান নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে লজ্জিত হতো। এই লজ্জাবোধই পরবর্তীকালে জানাজা এড়ানোর নাগরিক থিয়েটারে পরিণত হয়। যেখানে মৃতের আত্মীয়রা জানাজার সালাতের পরিবর্তে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ প্রমাণ করার ব্যাকুলতা প্রকাশ করে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৮২)।

    অতএব, জানাজা এড়ানোর এই আধুনিক নাগরিক থিয়েটার এবং রবীন্দ্র-ধর্মের এই প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট মূলত একই আধিপত্যবাদী নান্দনিক উপনিবেশায়নের চূড়ান্ত ইশতেহার হিসেবে কাজ করেছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ববঙ্গের তাওহিদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও পরকালীন বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। যাতে তারা কখনো নিজেদের স্বকীয় সাংস্কৃতিক বুনিয়াদে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি হলো, একজন মুসলমান তার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্তে—মৃত্যুর পরের জানাজায়—নিজের তাওহিদি পরিচয়কে হারিয়ে কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার তৈরি ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্কের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ও সাংস্কৃতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো রবীন্দ্র-ধর্মের এই প্রক্সি-বিশ্বাসের সম্পূর্ণ ব্যবচ্ছেদ ও বর্জন, এবং নিজের মাটির আদিম তাওহিদি ও লৌকিক ঐতিহ্যে ফিরে আসা (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২০, ২৬)।

    রবীন্দ্র-ধর্মের এই প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট কেবল সাহিত্যের পাতার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি মানুষের জীবনের আনন্দ, শোক বা উৎসব থেকে শুরু করে শেষ বিদায়ের মুহূর্তটিকেও একটি নির্দিষ্ট উচ্চবর্ণের ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্রেমওয়ার্কের অধীনস্থ করে ফেলে। যার একমাত্র লক্ষ্য হলো, পূর্ববঙ্গের তাওহিদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টি যেন কখনো তাদের নিজস্ব স্বকীয় সংস্কৃতির বুনিয়াদে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১২৫)। এই মনস্তাত্ত্বিক জালের ফাঁদ এতটাই সুগভীর যে, উনিশ শতক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলিম মানস নিজের অজান্তেই সংস্কৃতির এই জালিয়াতিকে প্রগতির একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বরণ করে নেয়। এমনকি আজও এই বঙ্গের অবচেতনে সেই মন ও মানস বহমান। যার সম্পূর্ণ নিরসন ছাড়া প্রকৃত ডিকলোনিয়াল ও বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment