Loading...

ছিয়াত্তরের কৃত্রিম মন্বন্তর, ডেমোগ্রাফিক জনসংহার এবং অবৈতনিক শিক্ষার বিলুপ্তি

ছিয়াত্তরের কৃত্রিম মন্বন্তর, ডেমোগ্রাফিক জনসংহার এবং অবৈতনিক শিক্ষার বিলুপ্তি
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ছিয়াত্তরের কৃত্রিম মন্বন্তর, ডেমোগ্রাফিক জনসংহার এবং অবৈতনিক শিক্ষার বিলুপ্তি
    ছিয়াত্তরের কৃত্রিম মন্বন্তর, ডেমোগ্রাফিক জনসংহার এবং অবৈতনিক শিক্ষার বিলুপ্তি


    ৩:৩

    ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং সুবে বাংলায় এক কোটি মানুষের কৃত্রিম গণহত্যা

    ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে। এর মাধ্যমে সুবে বাংলার স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হয়। তবে এটি কেবল এক শোষকের হাত থেকে অন্য শোষকের হাতে ক্ষমতার বদল ছিল না। এই ঘটনা বাংলার হাজার বছরের মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তিকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলে। এর ফলে দেশজুড়ে এক সর্বগ্রাসী শোষণের সূচনা হয়। এই ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়াটি একই সাথে ছিলো অর্থনৈতিক, কাঠামোগত এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক। মূলত, পলাশীর বিপর্যয় বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়। (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। এই রূপান্তরের সবচেয়ে কুৎসিত ও পৈশাচিক সামাজিক পরিণতি ছিল ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১১৭৬ সনে) নেমে আসা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। যা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসলের সাধারণ ঘাটতির কারণে ঘটেনি। বরং তা ছিল লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈত শাসন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষক সিন্ডিকেটের হাত ধরে সংঘটিত ইতিহাসের এক নির্মমতম কৃত্রিম গণহত্যা (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। কলোনিয়াল প্রশাসনের অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের বর্বর আইনি চাবুক এবং চালের বাজারের ওপর কোম্পানির উচ্চপদস্থ আমলাদের একচেটিয়া একাধিপত্য (Monopoly Trading) সুবে বাংলার ৭৫ লক্ষ মুসলমান এবং ২৫ লক্ষ শূদ্রসহ মোট ১ কোটি মানুষকে অন্নহীন করে তিল তিল করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এই সুপরিকল্পিত কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের মূল লক্ষ্যই ছিল সুবে বাংলার স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সমাজকাঠামোকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দিয়ে ঔপনিবেশিক মূলধনের অবাধ পাচারকে চিরস্থায়ী করা।

    ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের এই কৃত্রিম গণহত্যার নেপথ্য মেকানিজমটি বুঝতে হলে লর্ড ক্লাইভ কর্তৃক ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে শাহ আলমের কাছ থেকে সুবে বাংলার দেওয়ানি বা রাজকীয় রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ-উত্তর বাস্তব অর্থনৈতিক কোরিওগ্রাফিটি ব্যবচ্ছেদ করা জরুরি। প্রাক-কলোনিয়াল মুসলিম আমলে সুবে বাংলার রাজস্ব পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত নমনীয় এবং তা সরাসরি গ্রামীণ উৎপাদনের হারের সাথে ওঠানামা করত (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮, ৬৮)। খরা বা অনাবৃষ্টির কারণে ফসলহানি হলে মুসলিম শাসকেরা তাৎক্ষণিকভাবে খাজনা মওকুফ করতেন এবং রাজকোষ থেকে খাদ্যশস্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করতেন। কিন্তু কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর সুবে বাংলার সমস্ত গ্রামীণ অর্থনীতি এক নির্মম ‘দ্বৈত শাসন’ (Diarchy)-এর জাঁতাকলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪১)। লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর নিযুক্ত রেসিডেন্টরা ভালো করেই জানতেন, বিলেতে শেয়ারহোল্ডারদের সর্বোচ্চ লভ্যাংশ পাঠাতে হলে সুবে বাংলার গ্রামীণ সমাজকে নিংড়ে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আদায় করতে হবে। ১৭৬৮ ও ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে সুবে বাংলায় অনাবৃষ্টির কারণে ফসলের উৎপাদন কিছুটা কম হলেও তা কোনোভাবেই ১ কোটি মানুষের প্রাণ হরণের মতো মন্বন্তর ঘটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু কোম্পানির নিযুক্ত রেজা খান এবং ইংরেজ আমলারা খাদ্যশস্যের বাজারের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে।

    এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের পৈশাচিক চরিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় সমকালীন কোম্পানির দাপ্তরিক রাজস্ব আদায়ের গাণিতিক ডাটা বিশ্লেষণ করলে। ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে যখন সুবে বাংলায় খরার লক্ষণ স্পষ্ট এবং মানুষ অন্নের অভাবে হাহাকার করতে শুরু করেছে, তখন কোম্পানির মোট আদায়কৃত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৪ লক্ষ পাউন্ডের কাছাকাছি। কিন্তু ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে, যখন মন্বন্তর চরম আকার ধারণ করেছে এবং সুবে বাংলার সড়কে ও গলিতে প্রতিদিন হাজার হাজার কঙ্কালসার মানুষের দেহ লুটিয়ে পড়ছিল, ঠিক সেই বছরেও কোম্পানি তাদের পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় খাজনা আদায়ের পরিমাণ এক বিন্দুও কমায়নি। উল্টো জবরদস্তিমূলক আইনি চাবুক খাটিয়ে সেই মৃত ও জনমানবহীন গ্রামেও শতভাগ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করেছিল। কোম্পানির গভর্নর ও আমলারা দাপ্তরিক চিঠিতে গর্বের সাথে বিলেতে লিখে পাঠিয়েছিলেন, মহামারী ও অনাহারে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও রাজস্ব আদায়ের হার পূর্ববর্তী যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি ছিল। এই জবরদস্তিমূলক রাজস্ব নীতি প্রমাণ করে, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না। বরং তা ছিল কোম্পানির তৈরি করা এক সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ফ্যাসিবাদের আদি দলিল। এই কৃত্রিম গণহত্যার সবচেয়ে মারাত্মক সামাজিক ও ডেমোগ্রাফিক পরিণতি নেমে এসেছিল সুবে বাংলার গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক মুসলিম সমাজের ওপর (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)।

    মধ্যযুগীয় বাংলার স্বর্ণযুগ থেকে শুরু করে শাহ মুহম্মদ সগীর বা আলাওলের ধারায় সুবে বাংলার যে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ মুসলিম জোলা, তাঁতি এবং ক্ষুদ্র চাষী শ্রেণী গড়ে উঠেছিল, যাদের নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের জোরে বিশ্ববাজারে সুখ্যাত ছিল, তারা স্রেফ খাদ্যের অভাবে নিজেদের জমি-জিরাত ও বসতভিটা জলের দরে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। এককালের বিত্তশালী ও স্বাধীন মুসলিম গ্রামীণ সমাজকাঠামো এই কৃত্রিম মরণযজ্ঞের পর রাতারাতি নিজেদের জমি হারিয়ে প্রান্তিক কুলী ও ক্ষেত-মজুরে পরিণত হতে শুরু করে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। সুবে বাংলার জনপদের পর জনপদ রাতারাতি বিরান ও জনমানবহীন শ্মশানে রূপান্তরিত হয়েছিল। যার নিষ্ঠুর বিবরণ সমকালীন ইংরেজ আমলা উইলিয়াম হান্টারের রিপোর্টেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৬, ২৩)। ছিয়াত্তরের এই মন্বন্তর তাই সুবে বাংলার মুসলমানদের স্বাধীন অর্থনৈতিক অস্তিত্বকে চিরতরে সমাধিস্থ করে দিয়ে তাদের এক কৃত্রিম ও পরাধীন কাঠামোর মধ্যে বন্দি করার আদি কলোনিয়াল কোরিওগ্রাফি বৈ আর কিছুই ছিল না।

    ডেমোগ্রাফিক মানচিত্রের পরিবর্তন এবং মুসলমানদের কৃত্রিম সংখ্যালঘুকরণ

    অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে সুবে বাংলার জনমিতিক ও ডেমোগ্রাফিক কাঠামো কোনো স্বাভাবিক বা অর্গানিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে রূপান্তরিত হয়নি। বরং তা ছিল কলোনিয়াল রাষ্ট্র ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার দ্বারা সুপরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া একটি সুসংগঠিত কাঠামোগত জনসংহারের প্রত্যক্ষ ফল। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশী বিপর্যয়ের পূর্বে, এই সুবে বাংলার সামগ্রিক কৃষি, বয়নশিল্প ও কুটির শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি ছিল এ দেশের বিপুল পরিমাণ গ্রামীণ স্বাধীন মুসলিম সমাজ (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪১)। শত শত বছর ধরে সুবে বাংলার নিজস্ব ভূখণ্ডে এই স্বাধীন মুসলিম সমাজ একচ্ছত্র সংখ্যাগুরু হিসেবে নিজেদের স্বকীয় অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও উৎপাদন কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেছিল (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০)। কিন্তু কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর গ্রামীণ কৃষি-উদ্বৃত্তের ওপর জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ এবং শস্যের বাজারে উচ্চপদস্থ ইংরেজ আমলাদের একচেটিয়া কালোবাজারি সিন্ডিকেট, এ দেশের শতাব্দী প্রাচীন ডেমোগ্রাফিক ব্যালেন্সকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয় (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬)। যে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ব্রিটিশ শুরু করে দিয়ে গিয়েছে, তা আজও বিদ্যমান। এগুলো বাংলার লোকায়ত মানুষের সামাজিক প্রথা নয়। ব্রিটিশদের শঠতা থেকে আমদানি করা। বাংলার বহতা ধমনীর আদি ও আসল রূপ নয় যে, রক্তের সাথে মেশা; ঝেড়ে মুছে সাফ করা যাবে না।

    ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে কলোনিয়াল রাষ্ট্রের তৈরি করা এই তীব্র কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ও মহামারী সুবে বাংলার সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ মুসলিম জনসমষ্টিকে গণ-মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তাদের নিজেদেরই উৎপাদিত সুজলা-সুফলা বাংলায় কৃত্রিম উপায়ে সংখ্যালঘুকরণের এক সুদীর্ঘ রাজকীয় চক্রান্তের জাল বুনেছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। ছিয়াত্তরের এই মন্বন্তরের ফলে যে প্রকাণ্ড ভৌত জনসংহার ঘটেছিল, তার গাণিতিক খতিয়ান ও পরিসংখ্যান কলোনিয়াল নথিপত্রেই সংরক্ষিত রয়েছে। কোম্পানির লোলুপ শুল্ক নীতি ও কৃত্রিম মজুদদারির কারণে সুবে বাংলার বুকে যে এক কোটি মানুষের নির্মম প্রাণহানি ঘটেছিল, সমকালীন জনমিতিক সমীক্ষা অনুসারে তার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭৫ লক্ষ মানুষই ছিল গ্রামীণ ও প্রান্তিক মুসলিম সমাজের অংশ। বাকি ২৫ লক্ষ ছিল হিন্দু সমাজের অন্ত্যজ ও মেহনতি নিম্নবর্ণের সাধারণ মানুষ। এই তীব্র গণহত্যার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল বাংলার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও কৃষি ব্যবস্থার মূল কারিগর— গ্রামীণ স্বাধীন মুসলিম চাষী, তাঁতি এবং মক্তব-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত সমাজ কাঠামো (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩)। চালের মূল্য যখন রাতারাতি আট থেকে দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হলো, তখন ঐতিহাসিকভাবে সুসমৃদ্ধ ও মুসলিম প্রধান জেলাসমূহ— যেমন রাজশাহী, পূর্ণিয়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়া ও ঢাকার বিস্তূর্ণ গ্রামীণ অঞ্চল ডেমোগ্রাফিক্যালি সম্পূর্ণ ফাঁপা ও জনমানবহীন মরুভূমিতে পরিণত হয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৬, ২৩)। এই ব্যাপক ভৌত শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কলোনিয়াল রাষ্ট্র এ দেশের ল্যান্ড-টেনিওর বা ভূমি ব্যবস্থার ওপর এমন এক জবরদস্তিমূলক আইনি চাবুক চালাল। যার ফলে অনাহারে অবরুদ্ধ মুসলিম চাষী ও জোলা সম্প্রদায় নিজেদের বংশপরম্পরায় রক্ষিত জমি-জিরাত, লাখে রাজ ও ওয়াকফ তালুকদারি স্বত্ব কলকাতার ইংরেজ-তোষিত নব্য কায়স্থ ও মহাজন বুর্জোয়াদের হাতে নামমাত্র মূল্যে তুলে দিতে বাধ্য হয়। যা বাংলার ডেমোগ্রাফিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দেয়। এই কাঠামোগত প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ দিতে পরবর্তীকালে ফারসী ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে এবং এ দেশের প্রায় এক লক্ষ অবৈতনিক ঐতিহ্যবাহী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাকে অর্থাভাবে ধ্বংস করে এককালের বিশ্বসেরা সমৃদ্ধ ও শিক্ষিত জাতিকে নিরেট-নিরক্ষর কুলি-কামিনে পরিণত করার সর্বগ্রাসী ঔপনিবেশিক ব্লুপ্রিন্ট সম্পন্ন করা হয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-২২)।

    ড. এম. এ. রহিম বলেন, এই সুপরিকল্পিত জনমিতিক জনসংহারের সমান্তরালে সুবে বাংলার দীর্ঘকালের শাসন ক্ষমতা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড থেকে মুসলিম উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্ছেদ করার এক নির্মম ঔপনিবেশিক থিয়েটার মঞ্চস্থ হয়েছিল (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮, ৬৮)। প্রাক-পলাশী আমলে সুবে বাংলার সামরিক, বেসামরিক ও বিচার বিভাগের সর্বস্তরে যে দক্ষ মুসলিম রাজকর্মচারী, কাজি ও আমলারা সমাজ বুনিয়াদের মধ্যবর্তী সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করতেন, কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর তাদের দাপ্তরিক ক্ষমতা রাতারাতি কেড়ে নেওয়া হয় (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮)। নতুন কলোনিয়াল অর্থনীতিতে মুসলিম অভিজাতদের জমিদারি ও চিরস্থায়ী জায়গিরগুলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করে, কলকাতার ইজারাদার মহাজনদের হাতে তুলে দেওয়া হলো। যাদের সাথে গ্রামীণ সুবে বাংলার মুসলিম প্রজাকুলের কোনো সামাজিক বা অর্গানিক সম্পর্ক ছিল না (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। এই সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক অবদমন ও ভূমিচ্যুতির ফলে, এককালের বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত এবং সুসমৃদ্ধ ও সুসংস্কৃতির অধিকারী মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজকাঠামো মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে নিজেদেরই পৈতৃক ভূখণ্ডের আঙিনায় এক চরম অধিকারহীন, শব্দহীন ও ভূমিহীন মজুরের জাতিতে রূপান্তরিত হয়। যা উনিশ শতকের বাঙালি মুসলিম মানসে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতা ও দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডির বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-১০; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৮)।

    উপনিবেশের চাপিয়ে দেওয়া এই গভীর ক্ষত ও ট্রমা পরবর্তীকালে বাঙালি মুসলিমের ধর্মীয় মনস্তত্ত্বকে এক অদ্ভুত ও আত্মঘাতী পথে চালিত করে। সাম্প্রতিককালে এ দেশের চরম গরিবি বা হতদরিদ্র অবস্থাকে যেভাবে 'দ্বীনদারি', 'আধ্যাত্মিকতা', 'দুনিয়াবিমুখতা' কিংবা 'নিয়তি' ও 'সাহাবাওয়ালা জীবন' বলে মহিমান্বিত করার এক মনস্তাত্ত্বিক বুঝ দিতে চাওয়া হয়, তা সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক বিকৃতি এবং ঔপনিবেশিক শোষণের ফলে সৃষ্ট এক চরম মানসিক বিকার। অথচ, মধ্যযুগের সুলতানি কিংবা মোগল আমলের মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা মানুষদের চেয়ে, আমরা বর্তমান যুগের মুসলমানিত্বে বেশি দ্বীনদার, পরহেজগার আর আধ্যাত্মিক হয়ে যাইনি। বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা সরাসরি ইসলামি হুকুমাতের অধীনে বাস করতো। বর্তমান সময়ের মতো গুনাহের এতো উপায়-উপকরণও ছিলো না। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি দ্বীনদার হওয়া সত্ত্বেও, দৈন্যদশা আর দরিদ্র থাকাকে তারা দ্বীন সাব্যস্ত করেনি। মধ্যযুগের সুবে বাংলাকে বলা হতো 'জান্নাতুল বিলাদ' বা দুনিয়ার স্বর্গ। সমকালীন ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার শত-শত পর্যটক ও বণিকের বিবরণী সাক্ষ্য দেয়, দারিদ্র্য এবং অশিক্ষা—এই দুটি শব্দ তৎকালীন বাঙালি মুসলমানদের কাছে একেবারেই অজ্ঞাত ও অবাস্তব ছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮, ২৩)। সেই আমলের মানুষ ও সুফি-সাধকেরা দুনিয়াবিমুখতার নামে আলসেমি কিংবা সহায়-সম্বলহীন বৈরাগ্য বেছে নেননি। দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান বিচ্ছিন্ন আলাদা কোনো শিক্ষাব্যবস্থাও দাঁড় করাননি। দ্বীন-দুনিয়ার জ্ঞান একসাথে বহতা বাংলায় সমানতালে প্রবাহিত থাকা সত্ত্বেও আলেম-উলামা সৃষ্টি হতে সমস্যা হয়নি। প্রত্যেকেই তার শওক ও যওক, রুচি-অভিরুচি অনুযায়ী স্ব-স্ব বিষয় নিয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছে। গড়ে উঠেছে। তাঁদের লেখাপড়া, শিক্ষাদীক্ষা এবং আধ্যাত্মিকতা ছিল উৎপাদনমুখী। যা বাংলার কৃষিজমি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচলও রেখেছিল।

    এমনকি ইসলামের ইতিহাসের গোড়ার দিকে তাকালেও দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম দিন দিন গরিব হচ্ছিলেন না; বরং তাঁরা ছিলেন সমকালীন পৃথিবীর অন্যতম সফল, ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। রাসুলুল্লাহ সা. এবং সাহাবাদের সুনির্দিষ্ট যে জুহদ বা দুনিয়াবিমুখতার আদর্শ, এর হাকিকত কিংবা বাস্তবতা হলো, সম্পদের মোহে অন্ধ না হয়ে অন্তরের স্পিরিচুয়াল পবিত্রতা রক্ষা করা। অন্তরের মধ্যে দুনিয়া যাতে প্রবেশ না করে। ফলত, কিয়ামতের মাঠে প্রচুর সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অনেক ধনী সাব্যস্ত হবেন, দুনিয়া বিমুখ। আবার নিতান্ত সহায়সম্বলহীন হওয়া সত্ত্বেও অনেক গরিব হতে পারেন দুনিয়াপ্রেমী। সম্পর্ক অন্তরের মধ্যে দুনিয়ার মুহাব্বাত থাকা, না থাকার সাথে। গরিব থাকা আর সমাজ ও রাষ্ট্রকে দরিদ্র ও পরনির্ভরশীল করে রাখার সাথে নয়। বাহ্যিকভাবে যার প্রমাণ পাওয়া যাবে তার সম্পদ অর্জন ও ব্যবহারের মধ্যে। কিন্তু পলাশী-পরবর্তী নজিরবিহীন কাঠামোগত শোষণে যখন বাঙালি মুসলমান তার রাজনৈতিক ক্ষমতা, জমিদারিত্ব, লাখে রাজ ও ওয়াকফ তালুকদারি স্বত্ব এবং ফারসী ভাষার উচ্ছেদের মাধ্যমে শিক্ষার অধিকার হারিয়ে পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে পড়ল, তখন এই চরম লাঞ্ছনা ও অধিকারহীনতাকে ঢাকার জন্য সমাজে এক ধরণের রোমান্টিক বৈরাগ্যের জন্ম হলো। নিজেদের পরম নিঃস্ব ও পরাজিত অবস্থাকে জোর করে ধর্মীয় সান্ত্বনা দিয়ে 'সাহাবাওয়ালা জীবন' হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার যে মনস্তত্ত্ব আজ অবধি মুসলিম পণ্ডিতদের একাংশের বয়ানে ও আমজনতার মনস্তত্ত্বে গেঁথে আছে, তা মূলত শোষিত মানুষকে তার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখার এক অবচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁদ। মধ্যযুগের জান্নাতুল বিলাদের উৎপাদনমুখী ও সমৃদ্ধ মুসলমানিত্ব থেকে ছিটকে পড়ে আজকের সমাজ নিজেদের গরিবিকে আধ্যাত্মিকতার লেবাস পরাচ্ছে। যা আদতে ইসলামের কোনো মৌলিক আদর্শ নয়ই; বরং ঔপনিবেশিক দাসত্বের ফলে সৃষ্ট এক দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা। ব্রিটিশ উপনিবেশ ও কলকাতার বাবু সংস্কৃতির জমিদারদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক নির্মম উপহার, আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত জুহদ ও তাকওয়ার কোনো দুনিয়া বিমুখতা নয়।

    পরাজিত মানসিকতার এই সুদীর্ঘ ট্র্যাজেডি কেবল মনস্তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর ফলে বাংলার সামগ্রিক সমাজকাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যও চিরতরে ওলটপালট হয়ে যায়। কারণ, সুবে বাংলার এই প্রাচীন ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টির ডেমোগ্রাফিক অবক্ষয় মূলত কলোনিয়াল রাষ্ট্রের সেই সুদূরপ্রসারী কৃত্রিম সংখ্যালঘুকরণের আদি ব্লুপ্রিন্টকে সফলভাবে সম্পন্ন করেছিল। গ্রামীণ মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত ও উদ্বৃত্ত-উৎপাদন ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার কারণে নতুন ঔপনিবেশিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সর্বস্তরে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার আইনি ও কাঠামোগতভাবে রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ভূমি ব্যবস্থার এই আমূল রূপান্তর এবং গ্রামীণ বিত্তশালী মুসলিম সমাজের উচ্ছেদ সুবে বাংলায় এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক অসমতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের জন্ম দিয়েছিল। যা উনিশ শতকের সুদীর্ঘ কালক্রম পার হয়ে বিশ শতকের স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের নেপথ্য মনস্তাত্ত্বিক বুনিয়াদ তৈরি করেছিল (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৮-৩০)। পলাশী-উত্তর সুবে বাংলায় মুসলমানদের এই কৃত্রিম ও কাঠামোগত জনমিতিক অবদমন তাই কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না। সার্বিক অর্থেই তা ছিল, এ দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম জাতিসত্তার হাজার বছরের ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে পঙ্গু করে রাখার এক নিখুঁত ও প্রচ্ছন্ন কলোনিয়াল কোরিওগ্রাফি (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯; গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬-১৯)।

    উইলিয়াম অ্যাডামস রিপোর্ট এবং ১ লক্ষ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ধ্বংসের ইতিবৃত্ত

    সুবে বাংলার পলাশী-উত্তর কলোনিয়াল রূপান্তরের ইতিহাসে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী এবং কাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞটি সাধিত হয়েছিল এ দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। প্রাক-পলাশী আমলে, সুদীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম সালতানাত ও মুঘল সুবাদারদের প্রজাহিতৈষী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শাসনকাঠামোয় সুবে বাংলায় যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা কেবল কোনো রাষ্ট্রীয় অনুদান-নির্ভর আনুষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। তা ছিল, এ দেশের গ্রামীণ স্বাতন্ত্র্য, ল্যান্ড-টেনিওর বা ভূমিব্যবস্থা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের এক অর্গানিক ও অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩)। ১৮৩৫ থেকে ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ব্রিটিশ কলোনিয়াল সিভিলিয়ান উইলিয়াম অ্যাডামস কর্তৃক প্রণীত তিন খণ্ডের প্রামাণ্য দাপ্তরিক খতিয়ান, যা ইতিহাসে ‘উইলিওম অ্যাডামস রিপোর্ট’ (William Adam's Report) নামে সংরক্ষিত, তা সুবে বাংলার প্রাক-কলোনিয়াল শিক্ষা বুনিয়ারের এক অকাট্য, বস্তুনিষ্ঠ ও গাণিতিক মহাদলিল। অ্যাডামস তাঁর সুদীর্ঘ তিন বছরের নিবিড় মাঠপর্যায়ের জরিপ শেষে কলোনিয়াল সরকারের কাছে যে গাণিতিক ডাটা পেশ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, তা আজ দুই শতক পর এসেও অ্যাকাডেমিক মহলকে স্তম্ভিত করে দেয়। তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, প্রাক-কলোনিয়াল সুবে বাংলায় প্রতি চারশো জন নাগরিকের জন্য গড়ে একটি করে মোট ১ লক্ষ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, মক্তব ও মাদ্রাসা সক্রিয় ছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২২)। এই প্রকাণ্ড ও সর্বজনীন শিক্ষা বুনিয়াদ কোনো কেন্দ্রীয় বাজেট বা কলোনিয়াল ফান্ডের তোয়াক্কা না করে, সুবে বাংলার মুসলিম সমাজের নিজস্ব ল্যান্ডেড প্রপার্টি, ওয়াকফ এবং লাখে রাজ (Tax-free land) তালুকদারি অর্থায়নে সম্পূর্ণ অবৈতনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হতো (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯, ২২)। কিন্তু পলাশী-উত্তর কলোনিয়াল লুণ্ঠন ও নতুন ভূমি আইন, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই এক লক্ষ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সমূলে উপড়ে ফেলা হলো। এককালের বিশ্বের অন্যতম শিক্ষিত একটি জনসমষ্টিকে রাতারাতি নিরেট-নিরক্ষর কুলী-কামিনের জাতিতে রূপান্তরিত করা হলো। উইলিয়াম অ্যাডামস রিপোর্টের গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও গাণিতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে এসেও সুবে বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার সমকালীন ইউরোপ, বিশেষ করে কলোনিয়াল মাদার-কান্ট্রি ইংল্যান্ডের চেয়েও বহুগুণে উন্নত, প্রগতিশীল ও সর্বব্যাপী ছিল (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩-২২৪)। প্রাক-কলোনিয়াল সুবে বাংলায় শিক্ষা ছিল মূলত একটি বিকেন্দ্রীভূত ও গণমুখী প্রক্রিয়া। মুসলিম রাজন্যবর্গ, সুবাদার, দিউয়ান এবং স্থানীয় মুসলিম ভূস্বামীরা ধর্মীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিপুল পরিমাণ উর্বর কৃষিভূমিকে ‘লাখে রাজ’ বা নিষ্কর ভূমি এবং ‘ওয়াকফ’ সম্পত্তি হিসেবে মক্তব, মাদ্রাসা ও টোলের নামে চিরস্থায়ীভাবে উৎসর্গ করে দিতেন। এই নিষ্কর ভূমিতে উৎপাদিত শস্য ও অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত সরাসরি স্থানীয় শিক্ষক, মৌলভী ও পণ্ডিতদের জীবনধারণ এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন ও অবৈতনিক শিক্ষার ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হতো (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩-২২৪)। অ্যাডামস তাঁর রিপোর্টে বিস্ময়ের সাথে উল্লেখ করেছেন, বাংলার এমন কোনো গ্রাম বা জনপদ অবশিষ্ট ছিল না, যেখানে ন্যূনতম একটি মক্তব বা পাঠশালা ছিল না। এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এখানে দরিদ্র বা প্রান্তিক চাষীর সন্তানকে শিক্ষার জন্য কোনো আর্থিক ফি বা কর দিতে হতো না। যার ফলে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শতভাগ মানুষের শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মেহনতি মানুষও লিখন, পঠন ও গাণিতিক গণনায় অভূতপূর্ব পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিল (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩; ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২২)।

    ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) এবং পরবর্তীতে ১৮১৯ থেকে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কলোনিয়াল আমলাতন্ত্র কর্তৃক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর হওয়া নিষ্কর ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ আইন (Resumption Acts), সুবে বাংলার এই শত বছরের অর্গানিক শিক্ষা বুনিয়াদের ওপর সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আঘাতটি হানে। কলোনিয়াল রাষ্ট্র তার শোষণের পরিধি সর্বোচ্চ করার জন্য সুবে বাংলার লক্ষ লক্ষ একর ‘লাখে রাজ’ বা নিষ্কর ভূমি এবং ‘ওয়াকফ’ তালুকদারির বৈধতাকে রাতারাতি আইনি নোটিশের মাধ্যমে অস্বীকার করে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২২)। কলোনিয়াল বিচার বিভাগ ও দেওয়ানি আমলারা দাবি করেন, মুঘল বা নবাবী আমলের দাপ্তরিক সিলমোহরযুক্ত যেসব দলিলের ভিত্তিতে এই নিষ্কর বিদ্যালয়গুলো শত শত বছর ধরে পরিচালিত হয়ে আসছিল, সেগুলোর সিংহভাগই ‘অবৈধ’ বা ‘নথিপত্রহীন’। এই আইনি কৌশলের চোরাবালিতে ফেলে কোম্পানি সরকার সুবে বাংলার প্রতিটি মসজিদ, খানকাহ, মাদ্রাসা ও পাঠশালার নিজস্ব সম্পত্তি পাইকারি হারে বাজেয়াপ্ত (Confiscate) করে তা কলোনিয়াল ল্যান্ড রেভিনিউ বা খাস খাজনার আওতাভুক্ত করে নেয়। এর ফলে, যে এক লক্ষ অবৈতনিক বিদ্যালয় নিজস্ব ভূমি-উদ্বৃত্তের জোরে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে চলছিল, রাতারাতি তা সম্পূর্ণ অর্থাভাব ও চরম অর্থনৈতিক অনটনের মুখে পতিত হয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২১-২২)। শিক্ষক ও মৌলভীরা নিজেদের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব হারিয়ে গ্রামীণ সমাজে চরম কুলী ও দিনমজুরে পরিণত হন এবং সুবে বাংলার মুসলমানদের শতাব্দী প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কারখানাগুলো এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে।

    এই প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন ও অবৈতনিক শিক্ষার বিলুপ্তি সুবে বাংলার লোকজীবনে যে মারাত্মক ডেমোগ্রাফিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, তার সমাজতাত্ত্বিক গভীরতা আজ ২০২৬ সালের সমসাময়িক লেন্স থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত হয়। প্রাক-কলোনিয়াল বাংলার মুসলমানদের কৃষ্টি, নন্দনতত্ত্ব ও আত্মপরিচয় পুরোপুরি আবর্তিত হতো আরবী-ফারসি পরিভাষা এবং নিজস্ব জ্ঞানকাণ্ডের ধারাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে যখন এই এক লক্ষ অবৈতনিক বিদ্যালয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল, তখন কলোনিয়াল রাষ্ট্র ও তাদের তোষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক হেজেমনি (Epistemological Hegemony) প্রবর্তন করে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দের ‘অ্যাক্ট ২৯’ পাসের মাধ্যমে ফারসি ভাষার রাষ্ট্রীয় উচ্ছেদের পর যে নতুন ইংরেজি ও সংস্কৃতায়িত শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা সাধারণ প্রাকৃত মুসলিম তরুণের আর্থিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতার বাইরে ছিল। নতুন পাঠ্যপুস্তক ও মিশনারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার শর্ত হিসেবে এমন সব ফি ও কর ধার্য করা হলো, যা কেবল কলকাতার ইংরেজ-তোষিত জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর সন্তানদের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব ছিল। এর ফলে, এককালের সারা বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে শিক্ষিত ও বিত্তশালী একটি জনসমষ্টি মাত্র দুই-তিন প্রজন্মের ব্যবধানে এক চরম নিরেট-নিরক্ষর ও অজ্ঞ কুলী-কামিনের জাতিতে রূপান্তরিত হয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-২২)। এই পদ্ধতিগত নিরক্ষরকরণ সুবে বাংলার মুসলমানদের কেবল তাদের হাজার বছরের সাহিত্যিক জবান ও ধর্মীয় গৌরব থেকেই বিচ্যুত করেনি, বরং কলোনিয়াল রাষ্ট্র ও ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার মধ্যবর্তী সেই নগ্ন আঁতাতকে ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-১০; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩০)। উইলিয়াম অ্যাডামস রিপোর্ট প্রমাণ করে, সুবে বাংলার অবৈতনিক শিক্ষার বিলুপ্তি কোনো আকস্মিক ঐতিহাসিক রূপান্তর ছিল না। বরং তা ছিল বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার এক সর্বগ্রাসী জ্ঞানতাত্ত্বিক জেনোসাইড। কলোনিয়াল রাজশক্তি খুব ভালো করেই জানত, বাংলার প্রাকৃত মানুষের হাজার বছরের বহমান যে অর্গানিক শিক্ষা বুনিয়াদ রয়েছে, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতি ও নিষ্কর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা অক্ষুণ্ণ থাকলে এ দেশের সমাজকে দীর্ঘকাল পরাধীন ও স্তব্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। তাই তারা আইনের চতুর চাবুক খাটিয়ে প্রথমে নিষ্কর ভূমি কেড়ে নেয় এবং পরবর্তীতে অ্যাডামস রিপোর্টের গাণিতিক সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে বানোয়াট ইতিহাসের নতুন কারখানা সচল করে। যেখানে ক্ষমতাচ্যুত মুসলিম সমাজকে ঢালাওভাবে ‘অশিক্ষিত’, ‘গোঁড়া’ ও ‘অনগ্রসর’ বলে বিজ্ঞাপিত করার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক মগজধোলাই থিয়েটার প্রতিনিয়ত মঞ্চস্থ করা হয়েছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-১০; গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬-১৯)। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সেই ডেমোগ্রাফিক জনসংহার এবং অ্যাডামস রিপোর্টের এই প্রামাণিক দলিল তাই সুবে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসে নেমে আসা সবচেয়ে সুপ্রচ্ছন্ন ও দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডি। যা বাঙালি মুসলিম জনসমষ্টিকে তাদের নিজেদেরই ভূখণ্ডের আঙিনায় এক চরম শব্দহীন ও পঙ্গু জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করার আদি বুনিয়াদ তৈরি করেছিল।
    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment