Loading...

বানোয়াট ইতিহাস লিখন, বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের বয়ান এবং ‘ভদ্রলোক’ হেজেমনি

বানোয়াট ইতিহাস লিখন, বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের বয়ান এবং ‘ভদ্রলোক’ হেজেমনি
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার প্রভাবে বাঙালি মুসলিম আত্মপরিচয় সংকটের প্রতীকী চিত্র
    ঔপনিবেশিক শিক্ষা, ইতিহাসচর্চা এবং উনিশ শতকের ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবী সমাজকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলিম আত্মপরিচয় নির্মাণের বিতর্ক

    ৩:৪

    ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিদ্যাসাগরীয় পাঠ্যপুস্তক এবং ইতিহাস জালিয়াতির প্রথম কারখানা

    ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশী বিপর্যয়ের পর কলোনিয়াল রাষ্ট্র কেবল এ দেশের রাজকোষ লুণ্ঠন বা গ্রামীণ ডেমোগ্রাফির ওপর মন্বন্তর চাপিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারচেয়েও সুদূরপ্রসারী এবং দীর্ঘস্থায়ী জেনোসাইডটি সম্পন্ন করেছিল এ দেশের ঐতিহাসিক জ্ঞানকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক আত্মপরিচয়ের ওপর। একটি পরাজিত ও ক্ষমতাচ্যুত জাতিকে স্থায়ীভাবে গোলামিতে আবদ্ধ রাখার প্রধান শর্তই হলো তাদের নিজস্ব গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে কলোনিয়াল রাজশক্তির তৈরি করা বানোয়াট ইতিহাস তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া। সুবে বাংলায় এই প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস জালিয়াতির প্রথম ও প্রধান কারখানাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সচল হয়েছিল ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক প্রথম বিকৃত ‘বাঙালার ইতিহাস’ রচনার মধ্য দিয়ে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে কলোনিয়াল সরকারি চাকুরির জন্য ইংরেজি ও কলোনিয়াল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান বাধ্যতামূলক করার পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে যে নব্য ‘ভদ্রলোক’ বুদ্ধিজীবী শ্রেণী তৈরি হচ্ছিল, পণ্ডিত বিদ্যাসাগর ছিলেন তাদেরই অগ্রপথিক (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১)। ব্রিটিশ রাজশক্তির ‘সিনিয়র পার্টনার’ ইংরেজ বেসামরিক কর্মকর্তা ও ওরিয়েন্টালিস্ট জন মার্শম্যানের লেখা ‘হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ নামক একপেশে সাফাই নথির ছিলো ভিত্তিপ্রস্তর। এর পাটাতনে বিদ্যাসাগর মহাশয় তৈরি করলেন নতুন বয়ান। যা সুবে বাংলার সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম শাসনকে এক লহমায় ‘অন্ধকার যুগ’, ‘লুটেরা’ ও ‘অত্যাচারী পরদেশী’ হিসেবে দাগিয়ে দিল (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪)। কৃত্রিমভাবে তৈরি এমন পাঠ্যপুস্তক কেবল কোনো নিরেট অ্যাকাডেমিক জালিয়াতি ছিল না; বরং তা ছিল ক্ষমতাচ্যুত মুসলিম সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে স্তব্ধ করার এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত। যার গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিলো।

    সঙ্গত কারণেই প্রথম যে মৌলিক প্রশ্নটি আসে তা হলো, লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের লুণ্ঠন ও গণহত্যার রক্তে ভেজা কলোনিয়াল রাষ্ট্র কেন হঠাৎ করে এ দেশের জন্য একটি নতুন ‘ইতিহাস’ লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল? আর বিদ্যাসাগরের মতো পণ্ডিতেরা কেনই বা সেই এজেন্ডার অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে এলেন? এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর লুকিয়ে আছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা’ (Psychological Legitimacy) সংকটের নেপথ্য থিয়েটারে (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬)। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে সুবে বাংলার এক কোটি মানুষকে অনাহারে মেরে ফেলার পর বিলেতের পার্লামেন্টে এবং খোদ ভারতের জনমানসে কোম্পানি সরকারের বিরুদ্ধে যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা ঢাকতে তাদের একটি ‘তাত্ত্বিক উর্ণাজাল’ বা সাফাই বয়ানের দরকার ছিল। তারা দেখাতে চেয়েছিল, ব্রিটিশরা আসার পূর্বে এই সুবে বাংলা ছিল মুসলমানদের দ্বারা শাসিত এক অন্ধকার, বর্বর ও ম্লেচ্ছদের আখড়া। কোম্পানি সরকার এসে যেখান থেকে এ দেশের মানুষকে ‘উদ্ধার’ করেছে। জন মার্শম্যান এবং উইলিয়াম হান্টারের মতো সাম্রাজ্যবাদী লেখকেরা যে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র মহাশয়গণ তার কোনো স্বাধীন বা নিরপেক্ষ পরীক্ষা না করেই, হুবহু অনুবাদ ও পরিমার্জন করে এ দেশের প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪)।

    প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী বিনয় ঘোষ তাঁর ‘ভারতজনের ইতিহাস’-এর ভূমিকায় স্পষ্ট স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, "পাঠ্য বই মাত্রেরই কতকগুলো কলোনিয়াল ও রাষ্ট্রীয় বাঁধা-ধরা নিয়ম মেনে চলতে হতো। যেখানে লেখক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে খাঁটি সত্য লিখতে পারতেন না। বরং সরকারের আদেশ মতো তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই মুসলমানদের ইতিহাসকে বিকৃত করতে হতো" (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪)। ঈশ্বরচন্দ্রের ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস জালিয়াতির প্রথম ও সবচেয়ে কুৎসিত অসত্য কৌশলটি ছিল, সুবে বাংলার মুসলমানদের ‘পরদেশী লুটেরা’ এবং হিন্দু সমাজকে তাদের ‘চিরশত্রু’ হিসেবে সমান্তরালভাবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৭)। অথচ ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে আল-বিরুনীর ‘তাহকীক-ই-হিন্দ বা ভারততত্ত্ব’ এবং জিয়াউদ্দীন বারণীর ‘তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী’র মতো ধ্রুপদী আকর গ্রন্থসমূহ সাক্ষ্য দেয়, সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম সুলতান ও সুবাদারেরা সুবে বাংলাকে কখনোই কোনো কলোনি বা লুণ্ঠনের ক্ষেত্র মনে করেননি। তাঁরা বরং এ দেশের মাটি ও মানুষকে আপন করে নিয়ে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন এবং বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচুর্যময় ‘ট্রেজারি’ বা রাজকোষে পরিণত করেছিলেন (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯, ৩৫)। কিন্তু বিদ্যাসাগরীয় পাঠ্যসূচিতে চতুর্থ শ্রেণীর পাঠ্য ‘বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থে অত্যন্ত চতুরতার সাথে মগজধোলাইয়ের লাইন যুক্ত করা হলো— “মোহাম্মদ মুসলমান ধর্মের সংস্থাপক। একমাত্র ঈশ্বরের উপাসনা বল দ্বারা প্রচার করাও বিধেয়, এইরূপ উপদেশ দিয়া তিনি স্বদেশীয়দিগকে ধর্মমদে উন্মত্ত করেছিলেন” (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২)। এই একটিমাত্র জালিয়াতিপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে কলোনিয়াল রাষ্ট্র এ দেশের লক্ষ লক্ষ কোমলমতি হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষার্থীর মনে এই বিষ ঢুকিয়ে দিল যে, ইসলাম মানেই হলো বলপ্রয়োগ ও তলোয়ারের ধর্ম এবং সুবে বাংলার মুসলিম শাসকেরা ছিলেন সেই ‘ধর্মমদে উন্মত্ত’ বর্বর শক্তিরই ধারাবাহিকতা (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২)।

    এখানে অবধারিতভাবে যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, এই পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে সুবে বাংলার মুসলমানদের ওপর যে ‘আভিধানিক আপার্থাইড’ বা সামাজিক অবদমন চাপিয়ে দেওয়া হলো, তার সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল কী ছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কলোনিয়াল ভদ্রলোক হেজেমনি বা নব্য কায়স্থ বুর্জোয়াদের উত্থানের ইতিহাসের সাথে। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর সুবে বাংলার গ্রামীণ বিত্তশালী মুসলিম সমাজ যখন তাদের লাখেরাজ ও ওয়াকফ তালুকদারি হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়ছিল, তখন কলকাতার নব্য জমিদার ও আমলারা কোম্পানির ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কারখানায় বসে নতুন ইংরেজি ও সংস্কৃতায়িত ‘সাধুভাষা’ এবং কলোনিয়াল ইতিহাস রপ্ত করছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯; ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২)। বিদ্যাসাগরের বানোয়াট ইতিহাস পাঠ করে নব্য আমলারা যখন সরকারি অফিস, আদালত ও পুলিশ বিভাগের সর্বস্তরে জেঁকে বসল, তখন তারা সরকারি গেজেটের মাধ্যমে মুসলমানদের চাকরি পাওয়ার সমস্ত দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিল (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৯-১০)। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে কলকাতার তৎকালীন ফারসি পত্রিকা ‘দূরবীন’-এ প্রকাশিত সরকারি চাকুরির সেই বর্ণবাদী বিজ্ঞাপন— “শূন্য পদগুলিতে কেবল মাত্র হিন্দুদের নিয়োগ করা হবে”—ছিল বিদ্যাসাগরের তৈরি করা সেই ইতিহাস জালিয়াতিরই চূড়ান্ত বিচারবিভাগীয় রেকর্ড বা জুডিশিয়াল ডিক্রি।

    বিদ্যাসাগরীয় এই জালিয়াতির কারখানার সমাপনী ও সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তরটি আজ সুদীর্ঘ কালক্রম পার হয়ে আধুনিক ২০২৬ সালের সমসাময়িক বাংলাদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া পরিমণ্ডলেও হুবহু সক্রিয় রয়েছে। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের সেই বানোয়াট পাঠ্যপুস্তক উনিশ শতকের তরুণ মুসলিম মানসে যে তীব্র ‘হীনম্মন্যতা’ (Inferiority Complex) ও আত্মপরিচয়ের সংকট উৎপাদন করেছিল, তার ফলে বাঙালি মুসলমান নিজের হাজার বছরের সাহিত্যিক ও ইসলামিক পরিভাষাকে ব্রাত্য, ক্ষ্যাত বা অনগ্রসর মনে করতে শুরু করে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১০; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সে, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী তাঁর ‘বাংলার মাতৃভাষা শিক্ষা’ শীর্ষক ঐতিহাসিক প্রবন্ধে ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন, কলোনিয়াল স্কুলগুলোর এই বানোয়াট পাঠ্যপুস্তক আমাদের মুসলিম ছাত্রদের মন থেকে স্বজাত্যের প্রতি শ্রদ্ধা কেড়ে নিচ্ছে এবং হিন্দু ছাত্রদের মনে মুসলমানদের প্রতি চিরস্থায়ী ঘৃণা ও অবজ্ঞার জন্ম দিচ্ছে (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১-৪২)। আজ ২০২৬ সালের বাংলাদেশের আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং টকশোর টেবিলে যখন কোনো মুসলিম তরুণ বা বুদ্ধিজীবী নিজের অজান্তেই ‘পানি’ বনাম ‘জল’, ‘আব্বা’ বনাম ‘বাবা’ কিংবা ‘ইনশাআল্লাহ/আসসালামু আলাইকুম’-এর মতো নিজস্ব অর্গানিক ভাষিক পরিচয় ও ধর্মীয় পরিভাষাকে সাম্প্রদায়িক বা অনগ্রসর বলে অবজ্ঞা করে, তখন মূলত ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগরের ফোর্ট উইলিয়ামীয় ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া সেই বানোয়াট ইতিহাসের মগজধোলাই কারখানার চাকাটিই অবিরত ঘুরে চলে। বিদ্যাসাগরের সেই ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ তাই কেবল কোনো সাধারণ বই ছিল না, বরং তা ছিল সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেওয়ার জন্য কলোনিয়াল রাজশক্তির নিখুঁত ও দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞানতাত্ত্বিক জেনোসাইডের প্রথম অফিশিয়াল ইশতেহার।

    বঙ্কিমচন্দ্রের প্রাবন্ধিক ইশতেহার এবং দেশপ্রেমিক সংগ্রামীদের ‘তস্কর-লুটেরা’ বানানোর তত্ত্ব

    ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিদ্যাসাগরীয় জালিয়াতির প্রাতিষ্ঠানিক কারখানা সুবে বাংলার মুসলিম সমাজকাঠামোর ওপর যে জ্ঞানতাত্ত্বিক আঘাত হেনেছিল, উনিশ শতকের শেষভাগে এসে তা এক নতুন নন্দনতাত্ত্বিক ও প্রাবন্ধিক ফ্যাসিবাদের রূপ লাভ করে। হিন্দু পুনর্জাগরণের পুরোধা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখনীর মাধ্যমে। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই বিখ্যাত প্রাতিষ্ঠানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ডাক— “বাঙালার কোন ইতিহাস নাই... আমরা সকলে মিলিয়া লিখিব”—ছিল মূলত সুবে বাংলার সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম শাসনের উজ্জ্বল ঐতিহাসিক সত্যকে সমূলে উপড়ে ফেলে এক নয়া কলোনিয়াল-ব্রাহ্মণ্যবাদী হেজেমনি প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ইশতেহার (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর তোষিত কলকাতার নব্য কায়স্থ বুদ্ধিজীবী শ্রেণী খুব ভালো করেই জানতেন, ব্রিটিশ রাজশক্তির অনুগ্রহপুষ্ট হয়ে সুবে বাংলার মুসলমানদের বুকের ওপর যে ‘ভদ্রলোক’ বুর্জোয়া কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে, তাকে চিরস্থায়ী করতে হলে এ দেশের আদি ও বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর গায়ে পাইকারি হারে ‘তস্কর, ডাকাত ও লুটেরা’র তকমা লেপন করতে হবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-১০)। এই জালিয়াতিপূর্ণ বয়ানের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছিল, পলাশী-উত্তর বাংলায় প্রথম দীর্ঘস্থায়ী ও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা দেশপ্রেমিক ফকির-সন্ন্যাসী মুজাহিদেরা।

    ওয়ারেন হেস্টিংসের কলোনিয়াল দাপ্তরিক নথির অন্ধ অনুকরণে বঙ্কিমচন্দ্র এবং পরবর্তী বাবু ঐতিহাসিকেরা যেভাবে মজনু শাহ, চিরাগ আলী বা মুসা শাহের মতো বীর সংগ্রামীদের ‘বেদুইন ডাকাত’ ও ‘শান্তিভঙ্গকারী দস্যু’ হিসেবে চিত্রিত করলেন, তা ছিল মূলত সুবে বাংলার মুসলমানদের গ্রামীণ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করার এক সুসংগঠিত সাহিত্যিক ষড়যন্ত্র। অথচ আজ আমরা জানি তারা ছিলেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী। কিন্তু ইংরেজি তোষিত বাবু ঐতিহাসিকদের কলম চলেছে গোলামীর পক্ষে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬-১৯)।

    কলোনি-স্থাপক ইংরেজদের লুপের আইন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর সুবে বাংলার গ্রামীণ সমাজে যে তীব্র দুর্ভিক্ষ ও ডেমোগ্রাফিক জনসংহার নেমে এসেছিল, তার প্রথম সশস্ত্র রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ফকির আন্দোলনের মাধ্যমে (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১, ১৬; বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯৩)। মজনু শাহের নেতৃত্বাধীন ফকীর সমাজ কোনো উশৃঙ্খল দস্যু দল ছিল না। তাঁরা ছিলেন সুবে বাংলার সুপ্রাচীন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতি এবং নিষ্কর ‘আইমা’ (ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রদত্ত অনুদান) ও ‘লাখেরাজ’ (নিষ্কর) জমিদারি ব্যবস্থার দ্বারা লালিত এক একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন সত্তা। যাঁরা কোম্পানি সরকারের মাত্রাতিরিক্ত খাজনা আদায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ চাষীদের সাথে নিয়ে এক নিশ্ছিদ্র রাজনৈতিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছিলেন (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, আব্বাস আলী খাঁন, পৃষ্ঠা ১৯৪)। কিন্তু লুণ্ঠনকারী ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তি ভালো করেই জানত, মজনু শাহের এই সশস্ত্র প্রতিরোধকে যদি একটি বৈধ ‘জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং ভারতের সাধারণ মানুষের মনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘আইনি ও নৈতিক’ ভিত্তি সম্পূর্ণ ধসে পড়বে (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬)। ঠিক এই কারণেই ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর দাপ্তরিক চিঠিপত্রে মজনু শাহের বাহিনীকে ‘বেদুইন ডাকাত’ (Bedouin Dacoits) বলে আখ্যায়িত করেন এবং সমান্তরালভাবে কলকাতার হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের মগজে ঢুকিয়ে দেন, মজনু শাহের জয় মানেই হলো সুবে বাংলায় পুনরায় ‘মুসলিম শাসনের বর্বরতা’(?) ফিরে আসা। যার ফলে কায়স্থ জমিদারদের নতুন লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য চিরতরে ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬-১৭; বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯৪-১৯৫) ।

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর "আনন্দমঠ" ও "দেবী চৌধুরাণী" উপন্যাস এবং বিবিধ প্রবন্ধে কলোনিয়াল রাজশক্তির তৈরি করা, একপেশে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘সাফাই’ নথিকেই এ দেশের সাহিত্যের মূল বুনিয়াদ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি যখন দাবি করলেন, মুসলমানদের দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শত বছরের শাসনে বাংলায় কোনো খাঁটি ইতিহাস রচিত হয়নি এবং এখন হিন্দুদের নিজেদের লাঠি ও মসী হাতে নিয়ে সেই নতুন ইতিহাস লিখতে হবে, তখন তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল পলাশী-উত্তর বাংলার মুসলিম দেশপ্রেমিকদের বীরত্বকে সুকৌশলে আড়াল করে এক নতুন সাম্প্রদায়িক ‘ভদ্রলোক হেজেমনি’র জন্ম দেওয়া (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-১০, ১৮১)। এই জালিয়াতির সবচেয়ে কদর্য দিকটি উন্মোচিত হয় তখন, যখন দেখা যায় মজনু শাহের ভাই মায়মুন শাহ, রাজবংশীয় তোতা শাহ এবং টিপু পাগলের মতো বীরেরা সুবে বাংলার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে (বিশেষ করে ময়মনসিংহ, বগুড়া ও রাজশাহীতে) কোম্পানির ইজারাদার কৃষ্ণদেব রায় বা দেবনাথ রায়ের মতো অত্যাচারী জমিদারদের কাচারি লুণ্ঠন করে লুণ্ঠিত অর্থ অনাহারী চাষীদের মধ্যে বিতরণ করছিলেন, বঙ্কিমীয় ইতিহাস বয়ান তখন তাঁদের ঢালাওভাবে ‘ম্লেচ্ছ তস্কর’ ও ‘লুটেরা’ হিসেবে দাগিয়ে দিচ্ছিল (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৯৫, ১৯৮)। অথচ সমকালীন সত্য হলো, ফকির মুজাহিদেরা ছিলেন মূলত গ্রামীণ জনসাধারণের নিজস্ব স্বাধিকার রক্ষার শেষ প্রাচীর। যাঁদের ওপর ভরসা করে সুবে বাংলার শোষিত হিন্দু ও মুসলিম চাষীরা যৌথভাবে কোম্পানির কর-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।

    এই ইতিহাস বিকৃতির পেছনে কাজ করা গভীর প্রাতিষ্ঠানিক কূটকৌশলটি আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে যখন আমরা উনিশ শতকের শেষভাগের বিদ্যালয়সমূহের পাঠ্যক্রম ও বাবু ঐতিহাসিকদের রচনার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করি। রামগতি ন্যায়রত্ন, ক্ষীরোদচন্দ্র রায়চৌধুরী এবং রমেশচন্দ্র দত্তের মতো প্রখ্যাত বাবু ঐতিহাসিকেরা যে সমস্ত ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তার সিংহভাগই ছিল কলোনিয়াল ফান্ডের জোরে বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে চালুকৃত (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১)। এই বইগুলোতে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তরুণ শিক্ষার্থীদের মগজে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, সুবে বাংলার মুসলিম শাসনামল ছিল কেবলই এক লুণ্ঠন ও ধর্ষণের কদর্য থিয়েটার। যেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের মতোই মুসলিম চরিত্রগুলো ছিল চরিত্রহীন, মদ্যপ এবং অপদার্থ (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬)। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী তাঁর ‘বাংলার মাতৃভাষা শিক্ষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জালিয়াতির মুখোশ উন্মোচন করে দেখিয়েছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে হরিশচন্দ্র রক্ষিত বা নবীনচন্দ্র সেনের ‘পলাশীর যুদ্ধ’ কাব্যগ্রন্থে যেভাবে সিরাজউদ্দৌলা বা মজনু শাহের বীরত্বকে বিকৃত করা হয়েছে, তা অবিকলভাবে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে মুসলিম তরুণদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক গভীর হীনম্মন্যতার চোরাবালিতে নিমজ্জিত করা হচ্ছে (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১-৪২)।

    বঙ্কিমচন্দ্রীয় এই প্রাবন্ধিক ইশতেহার ও ইতিহাস জালিয়াতির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও রুদ্ধশ্বাস সমাপনী রূপান্তরটি আজ সুদীর্ঘ কালক্রম পার হয়ে আধুনিক ২০২৬ সালের সমসাময়িক বাংলাদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তিক, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও হুবহু সচল রয়েছে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই সুপরিকল্পিত ভাষিক ও সাহিত্যিক কারখানার বীজ আজ এমনভাবে মগজধোলাই সম্পন্ন করেছে যে, আধুনিক বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা যখন এ দেশের প্রাকৃত মানুষের শত বছরের ইসলামিক কৃষ্টি, সুফিবাদ ও তিতুমীর-মজনু শাহের ধারার সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘ধর্মান্ধতা’ বা ‘অনগ্রসরতা’ বলে দাগিয়ে দেন এবং সমান্তরালভাবে কলকাতার তৈরি করা সেই বিকৃত ও সংস্কৃতায়িত ইতিহাসকেই ‘শুদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে পূজা করেন, তখন মূলত বঙ্কিমচন্দ্রের সেই প্রাবন্ধিক ফাঁদটিই চূড়ান্ত জয় লাভ করে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক আব্দুল মওদুদ তাঁর ‘মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ : সংস্কৃতির রূপান্তর (১৯৬৯)’ গ্রন্থের ৩৭১ পৃষ্ঠায় অত্যন্ত ক্ষোভ ও লজ্জার সাথে উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মনীষী-কবিরাও বঙ্কিমচন্দ্রের তৈরি করা এই একপেশে সাম্প্রদায়িক আবর্ত থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারেননি। বইটির ৩৩৯ পৃষ্ঠায় আব্দুল মওদুদ বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করে লিখেছেন, “বঙ্কিম রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ মনের প্রতিভূ হিসাবে এবং হিন্দু জাতীয়তা মন্ত্রের উদগাতা ঋষি হিসাবে বাংলার সাহিত্যাকাশে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ...উপমহাদেশের মুসলমানদের অস্তিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র অস্বীকার করে তাদের বিতাড়িত করে সদাশয় বৃটিশ জাতির আবাহনে ও প্রতিষ্ঠায় বার বার মুখর হয়ে উঠেছিলেন।” একই অধ্যায়ে, প্রায় ৩৩৯ থেকে ৩৪০ পৃষ্ঠার মধ্যে, লেখক দেখিয়েছেন, বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে যে ধারা তৈরি করেছিলেন, পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো লেখকরাও সবসময় তা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং বঙ্কিমের এই সাহিত্যধারাকে ‘জাতীয় সাহিত্য’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং মুসলমানদের সমালোচনার জবাবে বলেছিলেন, “মুসলমান বিদ্বেষ বলিয়া আমরা আমাদের জাতীয় সাহিত্য বিসর্জন দিতে পারি না।” আব্দুল মওদুদ তাঁর বইয়ে তৎকালীন শিক্ষিত সমাজ ও সাহিত্যের সমালোচনা করে আরও লিখেছেন, "কিন্তু শুভচিন্তার কালে সাম্প্রদায়িকতার যে অশুভ চিন্তায় মত্ত হয়েছিলেন তৎকালীন শিক্ষিত হিন্দু সমাজ এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যে কদর্য ও গ্লানিকর পঙ্কের আবর্ত সৃষ্টি করেছিলেন, সেটাই ছিল সবচেয়ে বেদনার দিক। উনিশ শতকের শেষের দিকে বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ চিন্তাবিদরা এই কদর্য ঘূর্ণাবর্তের স্রষ্টা এবং আজাদি-উত্তরকাল পর্যন্ত ছিল তার মলিনতা-আবিলতার প্রাধান্য” [মওদুদ, আবদুল (১৯৬৯)। মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ : সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃষ্ঠা: ৩৩৯-৩৭১]।

    রবীন্দ্রনাথের ‘দুরাশা’ গল্প বা ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতার মতো সৃষ্টিগুলো যখন ব্রিটিশ কোপানল থেকে বাঁচতে ‘ব্রিটিশ’ শব্দের জায়গায় ‘মুঘল’ বা ‘মুসলিম’ শব্দ বসিয়ে মুসলমানদের ইতিহাসকে হীন করে দেখায়, তখন তা সুবে বাংলার মুসলমানদের অন্তরে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে, তার রাজনৈতিক পরিণতিই আজ ২০২৬ সালের আত্মপরিচয়ের চরম সংকট হয়ে দেখা দেয় (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১; ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭)। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই বুদ্ধিবৃত্তিক ইশতেহার তাই কেবল কোনো নিরেট সাহিত্যিক প্রয়াস ছিল না, বরং তা ছিল সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর শতাব্দী প্রাচীন দেশপ্রেম ও বীরত্বের ইতিহাসকে চিরতরে ‘তস্কর ও লুটেরা’র তালিকায় বন্দি করে তাদের নিজেদেরই ভূখণ্ডের আঙিনায় এক চিরস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক গোলামে রূপান্তরিত করার এক সর্বগ্রাসী কলোনিয়াল-ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্র।

    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উর্ণাজাল এবং বাঙালি মুসলিম মানসে হীনম্মন্যতা উৎপাদন

    ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিদ্যাসাগরীয় পাঠ্যপুস্তকের প্রাথমিক বুনিয়াদ এবং উনিশ শতকের শেষভাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাবন্ধিক ইশতেহার সুবে বাংলার মুসলমানদের আত্মপরিচয়ের ওপর যে তীব্র আঘাত হেনেছিল, বিংশ শতকের প্রথমার্ধে এসে তা এক অভূতপূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে; কলকাতা ও নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে। ১৯২০ থেকে ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সাহিত্য বিভাগে কর্মরত বাবু অধ্যাপকদের সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক সিন্ডিকেট বা কার্টেল এ দেশের ক্ষমতাচ্যুত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে বিকৃত ও ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এক সুক্ষ্ম ও সর্বগ্রাসী ‘উর্ণাজাল’ বা প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক বুনেছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-১০)। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকগণ (যেমন জেমস মিল বা এলফিনস্টোন) এবং তাঁদের অনুসারী উনিশ শতকের দেশীয় বাবু বুদ্ধিজীবীরা বাংলার সাড়ে পাঁচ শত বছরের প্রজাহিতৈষী মুসলিম সুবাদার ও সুলতানদের সুদীর্ঘ স্বর্ণযুগকে পাঠ্যসূচি থেকে পাইকারি হারে ছেঁটে ফেলেন। সব ক্ষেত্রে একচেটিয়া অন্ধকার, লুণ্ঠন ও ‘ম্লেচ্ছদের শাসন’ বলে উপস্থাপন করার রাজকীয় ধারা তৈরি করা হয়। যা আজ দুই শতক পর এসেও অ্যাকাডেমিক গবেষণার প্রধান অন্তরায় (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬-১৭)। পলাশী বিপর্যয়ের পর আজ প্রায় পৌনে তিনশ বছর পার হতে চললেও, ঔপনিবেশিক ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি সেই ইতিহাসের উপাদানগুলো আজও আমাদের অ্যাকাডেমিক সিলেবাস ও সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে গভীরভাবে প্রোথিত। যদিও ড. মুহম্মদ আবদুর রহীম, ড. আব্দুল করীম বা ড. মোহর আলীর মতো গবেষকেরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রকৃত সত্য পুনরুদ্ধার করেছেন, তবুও প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যসূচিতে আজও সেই ঔপনিবেশিক বিকৃতির প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। যা আধুনিক নিরপেক্ষ গবেষণার জন্য একটি বড় অন্তরায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস জালিয়াতির সবচেয়ে মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি ছিল বাঙালি মুসলিম তরুণ মানসে এক গভীর ‘হীনম্মন্যতা’ এবং আত্মপরিচয়ের চরম অবদমন উৎপাদন করা। যা পরীক্ষায় পাশ করার দায় থেকে এবং কলোনিয়াল চাকুরির মোহে মুসলিম শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করতে বাধ্য হতো (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩০-৩১)।

    প্রাতিষ্ঠানিক এই কূটকৌশলটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর ডাবল-স্ট্যান্ডার্ড বা জালিয়াতির চরিত্রটি উম্মোচন করতে হলে উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে কলোনিয়াল রাষ্ট্র এবং কলকাতার ‘ভদ্রলোক’ এলিটদের যৌথ স্বার্থের রসায়নটি বুঝতে হবে। লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সুবে বাংলার গ্রামীণ মুসলিম জোলা, তাঁতি ও লাখেরাজ সম্পত্তি ভোগকারী স্বাধীন শ্রেণী যখন সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল, তখন কলোনিয়াল ফান্ডের জোরে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একচেটিয়াভাবে বর্ণহিন্দু কায়স্থ ও নব্য জমিদারদের সাংস্কৃতায়ন ও মগজধোলাইয়ের প্রধান আখড়ায় পরিণত হয় (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২, ১৬)। এই নব্য শিক্ষিত এলিট শ্রেণী খুব ভালো করেই জানত, যদি সুবে বাংলার গ্রামীণ মেহনতি মুসলমানদের সামনে তাদের সাড়ে পাঁচ শত বছরের স্বাধীন ও সমৃদ্ধ উৎপাদন কাঠামোর অর্গানিক সত্য উন্মোচিত হয়ে যায়, তবে কলোনিয়াল রাজশক্তি এবং কলকাতার তোষিত ‘ভদ্রলোক’দের কৃত্রিম জমিদারি ও চাকরিগত হেজেমনি এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এই অর্থনৈতিক ভীতি থেকেই বাবু ঐতিহাসিকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেস্কে বসে এমন সব ইতিহাস আখ্যান ও সন্দর্ভ তৈরি করতে শুরু করলেন, যা মুসলমানদের অবচেতন মনে এই ধারণা স্থায়ীভাবে গেঁথে দিল যে, মুসলমানেরা এ দেশের প্রাকৃত সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং তারা মূলত এক নিরক্ষর, অসভ্য ও জবরদখলকারী সম্প্রদায় (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩০-৩১)।

    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বুদ্ধিবৃত্তিক কারখানার উর্ণাজালটি সাধারণ মুসলিম শিক্ষার্থীদের মনোজগতে কীভাবে প্রবেশ করত এবং তাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও ধর্মীয় বুনিয়াদকে কীভাবে ধ্বংস করত, তার জ্যান্ত দাপ্তরিক খতিয়ান সংরক্ষিত রয়েছে নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন এবং সমকালীন পত্র-পত্রিকার পাতায়। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত ‘বাঙলা সাহিত্যে মুসলমান বিদ্বেষ’ ইশতেহারে স্পষ্ট তথ্য দিয়ে দেখিয়েছিলেন, বিদ্যালয় ও কলেজের জন্য অনুমোদিত ইতিহাস বইগুলো পুরোপুরি ইসলাম-দ্বেষী খ্রিস্টান ও ওরিয়েন্টালিস্টদের সূক্ষ্ম বিভ্রান্তি ও একপেশে সাফাই নথির ওপর ভিত্তি করে রচিত। যেখানে মুসলমানদের গালিবাচক শব্দ ‘নেড়ে’ বা ‘যবন’ বলে চিহ্নিত করা হতো এবং তাদের শাসনকালকে কেবলই এক লুণ্ঠন ও ধর্ষণের কদর্য ক্যানভাস হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হতো (ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯, ৪১-৪২)। একজন মুসলিম ছাত্র যখন কেবল পরীক্ষায় পাস করা এবং কলোনিয়াল সিভিল সার্ভিসে বা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিজের নাম লেখানোর জন্য এই বিকৃত ইতিহাস দিন-রাত মুখস্থ করতে বাধ্য হতো, তখন তাঁর নিজের মনের অজান্তেই স্বজাতির অতীত ও কৃষ্টির প্রতি এক গভীর অবজ্ঞা ও বিতৃষ্ণা জন্ম নিত (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪)। এই ধারা থেকেই মুসলিম বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠায় এবং এখনো সেই কাঠামো অব্যাহত থাকায়, অবিকল মনস্তত্ত্ব ঘুচে যায়নি। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় গড়ে ওঠা জজ-ব্যারিস্টার, উকিল-মোক্তার, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নানা ব্যক্তির মধ্যে প্রায়শই এই উপসর্গের সাক্ষাৎ মিলে। যেখানে স্বজাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব সম্পর্কে এক অখণ্ড অজ্ঞতা, অবজ্ঞা এবং বিতৃষ্ণা বাসা বেঁধে আছে।

    ব্রিটিশদের তৈরি করা এই মনস্তাত্ত্বিক জেনোসাইডের ফলেই মুসলিম তরুণ সমাজ নিজেদের হাজার বছরের আরবী-ফারসি সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ জবান ও ‘দোভাষী পুথিঁ’র ঐতিহ্যকে রাতারাতি ‘ব্রাত্য বা ক্ষ্যাত’ মনে করে বঙ্কিমচন্দ্রীয় ও ফোর্ট উইলিয়ামীয় কৃত্রিম ‘সাধুভাষা’ এবং তাদের তৈরি করা বিকৃত ইতিহাসকেই ‘আভিজাত্যের পরম মানদণ্ড’ হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩৫, ৪০-৪৫)। ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর কালজয়ী আত্মজীবনীতে এই শিক্ষাব্যবস্থার বন্ধ্যাত্ব ও কৃত্রিমতা নিয়ে গভীর আলোকপাত করেছেন। আজাদ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, কলোনিয়াল ভারতের এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদর্শন এ দেশের প্রাকৃত মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব তৈরি করত। যা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত করে এক অদ্ভুত কলোনিয়াল ছাঁচে বন্দি করে ফেলত (Maulana Abul Kalam Azad, India Wins Freedom, Page 10)। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তৈরি করা এই কৃত্রিম ইতিহাস বয়ান ও ডেমোগ্রাফিক জালিয়াতি সুবে বাংলার মুসলমানদের কতখানি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করেছিল, তা বিশ শতকের প্রথমার্ধের চরম সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাওলানা আজাদ তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সুবে বাংলায় মুসলমানেরা মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি বা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও, কলোনিয়াল রাষ্ট্র ও ভদ্রলোক হেজেমোনির পরিকল্পিত বৈষম্যের কারণে সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে তাদের হার ছিল ৩০ শতাংশেরও কম (Maulana Abul Kalam Azad, India Wins Freedom, Page 24)। এই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ঐতিহাসিক অনগ্রসরতা দূর করতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস যখন এক ঐতিহাসিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ (Bengal Pact) ঘোষণা করলেন, সুবে বাংলার মুসলমানদের জন্য সরকারি চাকুরিতে ৬০ শতাংশ এবং ক্যালকাটা কর্পোরেশনে ৮০ শতাংশ নতুন পদ সংরক্ষণের বাস্তবসম্মত আইনি অঙ্গীকার করলেন, তখন কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভদ্রলোক ঐতিহাসিক ও কংগ্রেস নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে এক নগ্ন ও তীব্র কুৎসা অভিযান শুরু করেন (Maulana Abul Kalam Azad, India Wins Freedom, Page 24)। মাওলানা আজাদ গভীর আক্ষেপের সাথে দলিল দিয়ে প্রমাণ করেছেন, চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর তাঁরই তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ অনুসারীরা এই প্রগতিশীল চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান ও রদ করে দেয়। যার ফলে সুবে বাংলার মুসলমানেরা কংগ্রেসের এই তীব্র সংকীর্ণ ও কলোনিয়াল রূপ দেখে চিরতরে দূরে সরে যায় এবং এই ভূখণ্ডে দেশভাগের ও দেশমাতৃকাকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রথম বিভাজন ও বিদ্বেষের বীজটি রোপিত হয় (Maulana Abul Kalam Azad, India Wins Freedom, Page 24)।

    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকাণ্ড ও সর্বগ্রাসী উর্ণাজালের সমাপনী এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক ট্র্যাজেডি হলো, প্রাতিষ্ঠানিক মগজধোলাইয়ের এই বিষাক্ত বীজ সুদীর্ঘ কালক্রম পার হয়ে আজকের ২০২৬ সালের সমসাময়িক বাংলাদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও হুবহু সক্রিয় ও বহাল তবিয়তে সচল রয়েছে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। উনিশ শতকের সেই প্রাতিষ্ঠানিক হীনম্মন্যতা উৎপাদন কারখানা আজকে আধুনিক বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত এলিট ও সুশীল সমাজের মনস্তত্ত্বে এমন গভীর শিকড় গেড়েছে যে, এ দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা যখন গণমাধ্যমে বা সেমিনারের টেবিলে বসেন, তখন তাঁরা এ দেশের ৯২% মানুষের নিজস্ব ধর্মীয় পরিভাষা, ইসলামিক কৃষ্টি বা তিতুমীর ও হাজী শরীয়তুল্লাহর ধারার কলোনিয়াল-বিরোধী গ্রামীণ প্রতিরোধ আন্দোলনকে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বা ‘মৌলবাদ’ বলে দাগিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেন না (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। সমান্তরালভাবে, কলকাতার বাবু ঐতিহাসিকদের তৈরি করা সেই বিকৃত, মুসলিম-বিদ্বেষী ও সংস্কৃতায়িত ইতিহাস এবং ‘পানি’র বদলে ‘জল’ কিংবা ‘আব্বা-আম্মা’র বদলে ‘বাবা-মা’ বলাকেই ‘শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির একমাত্র পরিচয়’ বলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। যা মূলত ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হওয়া কলোনিয়াল-ব্রাহ্মণ্যবাদী ল্যাবরেটরির মগজধোলাই এজেন্ডারই এক নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)।

    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই বুদ্ধিবৃত্তিক উর্ণাজাল এবং কলোনিয়াল শিক্ষাব্যবস্থা প্রমাণ করে, বাঙালি মুসলিম মানসে এই হীনম্মন্যতা উৎপাদন কোনো আকস্মিক ঐতিহাসিক বিবর্তন ছিল না; বরং তা ছিল এ দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, জ্ঞানকাণ্ড ও সার্বভৌম অস্তিত্বকে চিরতরে পঙ্গু ও শব্দহীন করে রাখার এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক জেনোসাইড (Epistemic Genocide) (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। কলোনিয়াল রাজশক্তি ও তাদের পার্টনার কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ ভালো করেই জানতেন, সুবে বাংলার প্রাকৃত মানুষের মন থেকে যদি তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বীরত্বের স্মৃতি সমূলে উপড়ে ফেলা না যায়, তবে তাদের এই মিলিত শোষণ ও লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য কখনোই দীর্ঘস্থায়ী রূপ লাভ করতে পারবে না (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৬-১৯; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩০)। এই চতুর লক্ষ্য পূরণের জন্যই তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চতর গবেষণার ডেস্কে বসে ইতিহাসের এই জটিল জাল বুনেছিলেন। যা বাঙালি মুসলিম জনসমষ্টিকে তাদের নিজেদেরই ভূখণ্ডের আঙিনায় এক চরম দিকভ্রান্ত, শিকড়হীন এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে অবরুদ্ধ প্রজায় রূপান্তরিত করার স্থায়ী বুনিয়াদ সম্পন্ন করেছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯-১০; গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৫২)।
    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment