Loading...

চতুর্থ অধ্যায়: রবীন্দ্র-ধর্মের উদ্ভাবন, নান্দনিক উপনিবেশায়ন এবং ভূমি ও বিচারব্যবস্থার কালচারাল থিয়েটার

চতুর্থ অধ্যায়: রবীন্দ্র-ধর্মের উদ্ভাবন, নান্দনিক উপনিবেশায়ন এবং ভূমি ও বিচারব্যবস্থার কালচারাল থিয়েটার
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents

    রবীন্দ্র-ধর্ম, নান্দনিক উপনিবেশায়ন এবং বাংলার ভূমি ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতীকী চিত্র
    রবীন্দ্র-ধর্মের উদ্ভাবন, নান্দনিক উপনিবেশায়ন এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক ইতিহাস


    ৪:১

    কথিত বেঙ্গল রেনেসাঁসের ছদ্ম-সেক্যুলার চরিত্র এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মুসলিম-বিদ্বেষী মতাদর্শিক ফ্রেমওয়ার্ক 

    উনিশ শতকের কলকাতার বুকে যে ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’ বা তথাকথিত বাঙালি পুনর্জাগরণের গল্পটি আমাদের মগজে শৈশব থেকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, কলোনিয়াল নন্দনতত্ত্বের মোড়কটি ছিঁড়ে ফেললে তার ভেতর থেকে মূলত এক কুৎসিত অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও শ্রেণীগত শোষণের আখ্যান বেরিয়ে আসে। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের আধুনিক বয়ানটিকে এমন এক চতুর কায়দায় সাজানো হয়েছে, যেন মনে হয় উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতার গঙ্গাপাড়ের কিছু বাবু বুদ্ধিজীবীর হাত ধরেই এদেশের মাটিতে প্রথম প্রগতি, সংস্কৃতি আর আলোকায়নের এক স্বর্গীয় ফলন ঘটেছিল। কিন্তু এই কৃত্রিম আলোকায়নের পেছনের আসল সামন্ততান্ত্রিক লুণ্ঠনের চরিত্রটি ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, এটি কোনো সার্বজনীন বা গণ-জাগরণ ছিল না। এটি ছিল বাংলার প্রান্তিক মেহনতি মুসলিম এবং গ্রামীণ অনার্য অন্ত্যজ নিম্নবর্ণের কোটি কোটি মানুষকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ও নিঃস্ব করে দেওয়া। যা ব্রিটিশ রাজত্বের প্রত্যক্ষ ছায়াতলে এক অতি-সংকীর্ণ এলিট এক্সক্লুসিভ ক্লাব গড়ে ওঠার অভিপ্রায়ে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫২)। কথিত এই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের জন্ম কোনো গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক বা সামাজিক বিপ্লবের উর্বর মাটি থেকে হয়নি। এর মূল ভিত্তিটি সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং সূর্যাস্ত আইনের চতুর ও নির্মম চাবুকের মাধ্যমে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল সুবে বাংলার সুপ্রাচীন প্রাক-কলোনিয়াল বনেদী মুসলিম ভূম্যধিকারীদের জমিজমা, ওয়াকফ সম্পত্তি এবং চিরকালীন অধিকার রাতারাতি লুণ্ঠন করার এক চূড়ান্ত কলোনিয়াল আইনি হাতিয়ার। কোম্পানি আমলের এই জবরদস্তিমূলক ভূমি সংস্কারের ফলে বাংলার হাজার বছরের গ্রামীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। লর্ড কর্নওয়ালিস এদেশের চিরাচরিত প্রজাস্বত্ব এবং কৌম ভূমি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেন। এই আইনের মাধ্যমে তিনি জমির পরম মালিকানা তুলে দেন সুচতুর দেওয়ান, বেনিয়ান ও মুৎসুদ্দিদের হাতে। যারা মূলত ফোর্ট উইলিয়ামের ইংরেজ সাহেবদের দালালি ও দস্তুরি করে কলকাতায় বসে লুণ্ঠিত বিত্তের পাহাড় গড়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৪)।

    এই সুসংগঠিত অর্থনৈতিক জালিয়াতির সবচেয়ে বড় এবং প্রথম শিকার হয়েছিল সুবে বাংলার চিরকালীন মুসলিম সমাজ এবং আদিম অনার্য কৃষক-কুল। প্রাক-কলোনিয়াল যুগে বাংলার মুসলমানদের যে বিপুল পরিমাণ ‘আইমা’ বা করমুক্ত লাখেরাজ জমি এবং ‘ওয়াকফ’ সম্পত্তি ছিল, যার আয় থেকে গ্রামীণ বাংলার হাজার হাজার অবৈতনিক মাদরাসা, টোল ও সাধারণ মানুষের প্রাথমিক শিক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার নির্বাহ হতো, কলোনিয়াল প্রশাসন এক সুগভীর চক্রান্তের মাধ্যমে সেই সব লাখেরাজ সম্পত্তিকে রাতারাতি বেআইনি ঘোষণা করে বাজেয়াপ্ত করে নেয় (খান, মোশাররফ হোসেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৭)। সূর্যাস্ত আইনের নির্মম ও যান্ত্রিক প্রয়োগের ফলে বংশানুক্রমিক মুসলিম জমিদার ও তালুকদারেরা নিমিষের মধ্যে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়ে যান। ঠিক এই লুণ্ঠিত এবং শূন্যস্থানে রাতারাতি আগাছার মতো জন্ম নেয় কলকাতার নব্য কায়েস্থ ও উচ্চবর্ণের হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী। যারা ব্রিটিশের খাঁটি দাসত্ব ও আনুগত্যের পারিশ্রমিক হিসেবে সুবে বাংলার নতুন ভূস্বামী বা জমিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই নব্য শোষক জমিদার শ্রেণী গ্রামীণ বাংলার উর্বর মাটির সাথে বা সাধারণ রায়তদের সাথে কোনো আত্মিক বা জৈবিক টান অনুভব করত না। তারা প্রজাদের ওপর বেআইনি কর ও আবওয়াবের বোঝা দ্বিগুণ চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা কলকাতায় বসে বাবু সংস্কৃতির বিলাসিতা ও প্রমোদ-উৎসবে মেতে উঠেছিল। কলকাতার বাবুদের পকেটে যে লুণ্ঠিত অর্থের জোগান আসছিল, তার ওপর ভিত্তি করে যে সাহিত্য, শিল্প ও চিন্তা চর্চার জন্ম হয়, তাকেই পরবর্তীকালের কলোনিয়াল বুদ্ধিজীবীরা ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’ বলে এক পবিত্র ও দৈব রূপ দেন। কিন্তু আসলে এটি ছিল একটি কৃত্রিম কর্পোরেট কাল্ট। যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ব্রিটিশ প্রভুদের সন্তুষ্ট রেখে নিজেদের শ্রেণী-স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখা এবং বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসমষ্টির ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫৬)।

    এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক দিকটি হলো, এই হেজিমনিক বুদ্ধিজীবীরা এমনভাবে ইতিহাসের গল্পটি নতুন করে সাজাতে শুরু করেন, যেন বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের আগে এই ভূখণ্ডের মানুষের শোষণের বা প্রতিরোধের কোনো ইতিহাসই ছিল না। তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এ ভূখণ্ডের মানুষের প্রথম ও আদি লড়াই—চাষের জমি ও ফসলের ওপর তার অধিকারের লড়াইকে সম্পূর্ণ আড়াল করে দেয় (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৮২)। আড়াল করা হয় উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদারদের দ্বারা হওয়া নৃশংস নিপীড়নের বিষয়গুলো। মুসলমানদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া দাড়ি রাখার কুখ্যাত দাড়ি-কর বা গো-হত্যার ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো জঘন্য ধর্মীয় ও সামাজিক আগ্রাসনের ঘটনাগুলো (আহমদ, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ৭৩)। কৃষক প্রজাদের ফরায়েজী আন্দোলন বা তিতুমীরের তরীকা-ই-মুহাম্মদীয়ার মতো অসামান্য গণ-বিদ্রোহগুলোকে অত্যন্ত লঘু ও অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলার চেষ্টা চলে। সম্ভবত এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, গ্রামীণ সুবে বাংলার শত-শত বছরের শোষণ ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাসকে মনোজগৎ থেকে চিরতরে মুছে ফেলা। আর এমন একটা সাধারণ পারসেপশন তৈরি করা, যেন এদেশের মানুষের সকল অত্যাচারের ইতিহাস শুধু পাকিস্তানি পর্বের সাথেই জড়িত। কারণ এই কৃত্রিম ভাবের ওপর ভিত্তি করেই এদেশের ছদ্ম-সেক্যুলার রাজনীতির ঠিকাদারি দাঁড়িয়ে আছে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৮৫)। আমরা পাকিস্তানি আমলের বৈষম্য ও স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস যেমন স্মরণে রাখব, তেমনি কলোনিয়াল ও হিন্দু জমিদারদের ডাবল কলোনির সেই রক্তাক্ত ইতিহাসও মনে রাখা জরুরি। কিন্তু কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানাটি সবসময়ই এই আদি ইতিহাসকে ভুলিয়ে রাখতে চেয়েছে। যাতে তাদের তৈরি ছদ্ম-সেক্যুলার হেজিমনি বা আধিপত্যের ইমেজে বিন্দুমাত্র আঁচ না লাগে (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৬)।

    নবজাগ্রত বাঙালি হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা একই সাথে ব্রিটিশদের সুগভীর ইন্ধনে প্রাত্যহিক যাপিত জীবন ও ভাষার স্তর থেকে শুরু করে সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বর্ণবাদের জন্ম দেন। তারা কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের টেবিল থেকে উৎপাদিত কৃত্রিম, তৎসম শব্দবহুল ও সংস্কৃতায়িত ঢাকাই ভদ্রলোকী বাংলাকে একমাত্র ‘শুদ্ধ’ ভাষা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। পূর্ববঙ্গের গণমানুষের মুখের জীবন্ত আরবি-ফারসি মিশ্রিত প্রাকৃত বাংলাকে ‘অশুদ্ধ’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ বলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে তীব্র শেইমিং বা অপদস্থ করতে শুরু করেন (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২১)। একই বাংলা ভাষার ভেতর এভাবে সুপরিকল্পিতভাবে দুটি রূপ তৈরি করা হয়, একটি হিন্দুয়ানি, অপরটি মুসলমানি (কবীরের উক্তি, রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩২)। এই ভাষিক ও সাংস্কৃতিক ভাগাভাগির ফলে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মুসলমান ও অনার্য নিম্নবর্ণের মানুষেরা নিজেদের চিরকালীন ঘরের বুনিয়াদেই রাতারাতি সংস্কৃতিহীন ও ভাষাভোলা এক প্রান্তিক জনসমষ্টিতে পরিণত হয়। রাম-লক্ষণ, সীতা-সাবিত্রী বা রাধাকৃষ্ণের যে পৌরাণিক স্মৃতি ও ঐতিহ্য বাঙালি হিন্দুর অবচেতনে স্বাভাবিক রস সৃষ্টি করত, তা জোরপূর্বক এদেশের মুসলমান কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নান্দনিক চক্রান্ত শুরু হয়। অথচ মুসলমানদের নিজস্ব আলী-হামজা, হাসান-হোসেন বা মক্কা-মদিনার চিরন্তন ঐতিহ্যকে সাহিত্যের জগত থেকে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বা নির্বাসিত করা হয় (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৯৬)।

    কলকাতার এই হেজিমনি-ভক্ত বুদ্ধিজীবীরা এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বা পরবর্তী সময়ের ইতিহাস থেকেও মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মতো আপসহীন গণ-নেতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়ে থাকেন। কারণ ভাসানী সবসময়ই কলকাতার এই ভদ্রলোকী থিয়েটারকে অস্বীকার করে এদেশের শোষিত কৃষকের মাটির ঘরের স্বাধিকারের কথা বলতেন (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৫)। একইভাবে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলেছে জিয়ার তৈরি করা ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো অত্যন্ত ইমপ্যাক্টফুল লোকায়ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে। ‘কালচারালি আনকুল’ বা প্রতিক্রিয়াশীল ট্যাগ দিয়ে (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৫)। এই কৃত্রিম ‘প্রগতি’ আর ‘প্রতিক্রিয়া’র পারসেপশনই সমাজে 'হাই কালচার' আর 'লো কালচার'-এর এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য তৈরি করে দেয়। যা একজনকে অন্যজনের চোখে প্রায় ‘সাব-হিউম্যান’ বা উপ-মানব বানিয়ে ফেলে। এই সুগভীর নন্দনতাত্ত্বিক উপনিবেশায়নের ফাঁদে পড়ে, এদেশের মধ্যবিত্ত মনোজগৎ ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির জালিয়াতিকে প্রগতির একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বরণ করে নেয়। যার ফলে নিজের ভাষার শব্দ, নিজের লৌকিক পোশাক লুঙ্গি বা নিজের ঘরের শবে বরাত-বিসমিল্লাহখানির মতো খাঁটি মাটির ঐতিহ্যগুলোকে তারা ‘খ্যাত’ বা আদিম বলে হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৭)। এইভাবেই, উনিশ শতকের কলকাতার সেই ছদ্ম-সেক্যুলার বেঙ্গল রেনেসাঁসের প্রগতির আলোর আড়ালে, সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মানুষের ইতিহাস লুণ্ঠন ও আত্মপরিচয় হরণের এক দীর্ঘমেয়াদী অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ প্রতিষ্ঠার প্রজেক্ট সফল করা হয়েছিল। যার শিকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত প্রকৃত সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব নয় (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪১)।

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ এবং ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসের রাজনৈতিক দর্শন

    কীভাবে সাহিত্যের আড়ালে মুসলিম শাসনকে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং অত্যাচারী হিসেবে চিত্রিত করে একটি আক্রমণাত্মক, ছদ্ম-সেক্যুলার ও মুসলিম-বিদ্বেষী জাতীয়তাবাদী ফ্রেমওয়ার্ক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলো—তার বাস্তব রাজনীতির সাহিত্য রচনা হয়েছে কলকাতার বাবু সংস্কৃতির নানা বুদ্ধিজীবীর কলমে। তন্মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' এবং 'দেবী চৌধুরানী' উপন্যাস দুটি বিশেষভাবে বিশ্লেষণযোগ্য। এগুলোকে নিছক সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব বা উপন্যাসের শিল্পোৎকর্ষের মলাটে বিচার করলে, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সুগভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অপরাধের আসল রূপটি চেনা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র কেবল কাল্পনিক কাহিনীর জাল বোনেননি। তিনি ছিলেন মূলত আধুনিক ভারতের সর্বপ্রথম হিন্দু রাষ্ট্রবেত্তা। যার সমগ্র মননশীলতা, কল্পনাশক্তি এবং সাহিত্যিক প্রতিভা নিয়োজিত ছিল একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মতান্ত্রিক হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এই হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তার বীজটি চারিয়ে তোলার জন্য তিনি সাহিত্যকে একটি অভিনব রাজনৈতিক কৌশল বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। যা ইউরোপের বুকে ভোলতেয়ার বা রুশোর মতো ফরাসি এনসাইক্লোপিডিক আন্দোলনের বুদ্ধিজীবীরা বহু পূর্বে অনুসরণ করে আসছিলেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৭)। বঙ্কিমের সাহিত্যিক ফ্রেমওয়ার্কের মূল ভিত্তিটি গড়ে উঠেছিল পূর্ববর্তী মুসলিম শাসনকালকে একটি পরম ‘অন্ধকার যুগ’ এবং মুসলমানদের পরজাতীয়, অত্যাচারী, লুণ্ঠনকারী ও প্রজাপীড়ক তস্কর হিসেবে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এক সুসংগঠিত ঘৃণার ওপর (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪৩)। এই ঘৃণাবোধই ছিল তাঁর অবচেতনের মূল চালিকাশক্তি। যা উনিশ শতকের ইংরেজি শিক্ষিত, ইংরেজদের ডেপুটিবাবু বঙ্কিমকে তাঁর পরাধীনতার মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি ও চাকুরি জীবনের অবদমিত ক্ষোভ থেকে মুক্তি পেতে এক অলীক আর্য গৌরবের দিকে ধাবিত করেছিল (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩৯-৪০)। তিনি মনে মনে একটি স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র চাইলেও ঔপনিবেশিক শাসনের কঠোর বাস্তবতায় ইংরেজদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া অসম্ভব জেনে তাঁর সেই স্বপ্নের চেহারাটিকে একটি সুনির্দিষ্ট হিন্দু রাষ্ট্রের মোড়কে প্রকাশ করেছিলেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৮)।

    বঙ্কিমের এই রাজনৈতিক দর্শনের প্রধান দুই স্তম্ভ হলো ‘দেবী চৌধুরানী’ এবং ‘আনন্দমঠ’। যা মূলত একটি আরেকটির অবিচ্ছেদ্য পরিপূরক গ্রন্থ (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২১)। দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের বাস্তব পটভূমিটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ রাজত্বের সূচনা পর্বে এবং নবাবী শাসনের অবসানে, বাংলার বুকে যখন নিদারুণ দুর্ভিক্ষ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, তখন প্রাকৃত সন্ন্যাসী এবং মুসলিম ফকিরেরা মিলিতভাবে ইংরেজদের শোষণের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ফকিরদের অবিসংবাদিত নেতা মজনু শাহ এবং তাঁর পালক পুত্র চেরাগ আলী সন্ন্যাসীদের সাথে চমৎকার বোঝাপড়ার মাধ্যমে কোম্পানি ও তাদের দালাল জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। যার ভুরি ভুরি লিখিত ও ঐতিহাসিক প্রমাণ সমকালীন জুডিশিয়াল রেকর্ডে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসের স্বার্থে এই বাস্তব ঐতিহাসিক সত্যকে অত্যন্ত সচেতনভাবে খুন করেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২)। তিনি যৌথ সংগ্রামের সেই গৌরবময় ইতিহাস থেকে মুসলমানদের ও ফকিরদের বীরত্বের ভূমিকা সম্পূর্ণরূপে ছেঁটে বাদ দিয়ে একে একক ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠনের প্রয়াস বলে চিহ্নিত করেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৪)। দেবী চৌধুরানীর সেই ঐতিহাসিক ভবানী পাঠকই আনন্দমঠে এসে ‘সত্যানন্দ’ নাম ধারণ করে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। যেখানে সত্যানন্দকে বীরের পরম গৌরব দেওয়া হলেও দেশপ্রেমিক মজনু শাহের নামটি উল্লেখ করার ন্যূনতম উদারতা বঙ্কিম দেখাতে পারেননি।

    আনন্দমঠ উপন্যাসের মূল লক্ষ্যই ছিল এই বিকলাঙ্গ ইতিহাসের খাতের ওপর দাঁড়িয়ে হিন্দু যুবকদের হৃদয়ে এক বিধ্বংসী রাজনৈতিক উন্মাদনার আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া। উপন্যাসের উপক্রমণিকায় নিবিড় অরণ্যের সূচীভেদ্য অন্ধকারে যে দৈববাণী অনুরণিত হয়—পণ হিসেবে "ভক্তি" দিতে হবে, তা মূলত দেশমাতার উদ্ধারকল্পে সর্বস্বার্থ ত্যাগ করার এক কঠোর সামরিক দীক্ষা। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে সনাতন বৈষ্ণবধর্মের চিরকালীন অহিংস রূপটিকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেমময় বিষ্ণুকে এক ভয়ঙ্কর, অসুরনাশিনী চণ্ডীর মতো ছদ্মবেশী পুরুষরূপে রূপান্তরিত করেন (মিত্র, সুমন কুমার। আনন্দমঠ: জাতীয়তাবাদের এক আলেখ্য, পৃষ্ঠা ১২)। সত্যানন্দের সন্তান দলের উপাস্য বিষ্ণু কোনো প্রেমময় সত্তা নয়। তিনি হলেন মধুকৈটভ, কংস বা শিশুপাল বধকারী এক চূড়ান্ত দণ্ডধারী শক্তির দেবতা। যার বলে বলীয়ান হয়ে সন্তানেরা বাহুবলে ম্লেচ্ছ বা শত্রুদের বিনাশ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে এক নতুন ধর্মের সূচনা করেছিলেন। যা ছিল মূলত সমষ্টিগত শক্তি সাধনা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের এক নব্য ব্রাহ্মণ্য ভাবাদর্শ (মিত্র, সুমন কুমার। আনন্দমঠ: জাতীয়তাবাদের এক আলেখ্য, পৃষ্ঠা ৯-১২)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের জাতীয়তাবাদী দর্শনের মূল নির্যাস হলো, দেশকে কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড, মাটি বা নদী হিসেবে না দেখে তাকে একজন জীবন্ত মা বা দেবীর রূপ দেওয়া। এই ভাবাদর্শের গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষক সুমন কুমার মিত্র লিখেছেন, তিনি জন্মভূমিকে নিছক জড় মাটি বা ভূখণ্ড হিসেবে না দেখে তাকে সরাসরি দশপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী (মাটির তৈরি প্রতিমা) ও সুবর্ণময়ী (সমৃদ্ধ ও জ্যোতির্ময়) জীবন্ত মূর্তির সাথে একীভূত করে এক নতুন রাজনৈতিক পৌত্তলিকতার জন্ম দেন—‘দেশ-দেশমাতা’ (মিত্র, সুমন কুমার। আনন্দমঠ: জাতীয়তাবাদের এক আলেখ্য, পৃষ্ঠা ৮, ১৫)। উপন্যাসের সন্তান ভবানন্দ, মহেন্দ্রকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন—"আমরা অন্য মা মানি না—জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী" (মিত্র, সুমন কুমার। আনন্দমঠ: জাতীয়তাবাদের এক আলেখ্য, পৃষ্ঠা ৯)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে যখন মহেন্দ্র সিংহের সাথে সন্তানদলের ভবানন্দের দেখা হয়, তখন ভবানন্দ গভীর আবেগে 'বন্দে মাতরম্' গানটি গাইছিলেন। মহেন্দ্র গানটির অর্থ ও তাৎপর্য বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলে, ভবানন্দ তাঁকে দেশমাতৃকার আসল রূপটি বুঝিয়ে দেন। সেই কথোপকথনের এক পর্যায়ে ভবানন্দ মহেন্দ্রকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, তাঁদের কাছে দেশই একমাত্র উপাস্য দেবী। তাঁরা অন্য কোনো মা মানেন না। কারণ জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ।

    স্বদেশের এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদে এক নতুন আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত হয়। দেব-দেবীর মূর্তি পূজা করার প্রথার মতোই দেশের মানচিত্র বা ভূখণ্ডকে একটি জীবন্ত দেবী মূর্তির অবয়ব দিয়ে জনগণের মনে দেশপ্রেম জাগ্রত করার এই কৌশলকে গবেষকরা 'রাজনৈতিক পৌত্তলিকতা' বা 'দেশ-দেশমাতা' ধারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি এটা করতে পেরেছেন হিন্দু মনস্তত্ত্বের জন্য। কারণ এই মনস্তত্ত্ব সহজেই যেকোনো কিছুকে মহান ও পবিত্র জ্ঞান করে খোদার বা উপাসকের আসনে বসিয়ে দিতে পারে। তাই দেশপ্রেমের আড়ালে মৃন্ময়ী দেশকে পূজনীয় উপাসকের আসনে বসিয়ে, রাজনৈতিক পৌত্তলিকতার জন্ম দিতে পেরেছেন। এর মূল কথাই হলো, দেশই আমাদের পরম জননী, এবং এই দেশমাতার বন্ধনমুক্তি ও সেবাই হলো সবচেয়ে বড় ধর্ম। মাতৃবন্দনার এই নতুন রাজনৈতিক রূপটি পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৎকালীন সাধারণ হিন্দুদের মনে তীব্র আবেগ, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং এক অপরাজেয় শক্তির জোগান দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অবাস্তব এবং অলীক স্বপ্নের বাগডোর তাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তিনি তার বিশ্বাসের সাথে গাদ্দারিও করেছেন। পূত-পবিত্র এবং দেবী জ্ঞান করা তার দেশ-দেশমাতাকে খণ্ডিত করতে অবদান রেখেছিলো সেই রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার অলীক খোয়াব। নিজের দেবী জ্ঞান করা এই দেশমাতৃকাকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে তার ভাব-শিষ্যরা; তারই শেখানো উগ্র হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার অবাস্তব ও অবান্তর স্বপ্ন থেকে।

    এই ‘দেশ-ঈশ্বর’ ধারণার ফাঁদে ফেলে তিনি সাধারণ মানুষের চিরাচরিত ধর্মীয় অনুভূতিকে সুকৌশলে একটি উগ্র রাজনৈতিক লক্ষ্যের অধীনস্থ করেন, যার মূল ধ্বনি ছিল ‘বন্দে মাতরম্’ (মিত্র, সুমন কুমার। আনন্দমঠ: জাতীয়তাবাদের এক আলেখ্য, পৃষ্ঠা ৯)।এই ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠ উপন্যাস লেখার প্রায় তিন বছর আগে স্বতন্ত্রভাবে রচনা করেছিলেন। পরে কাহিনীর সাথে জুড়ে দিয়ে একে এক অমোঘ রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত করেন। এই গানটি ছিল মূলত স্বদেশাত্মার এক কালজয়ী বাণীমূর্তি। যা হিন্দু সমাজের স্বাধীনতা প্রয়াসী তরুণদের মাঝে মৃত্যুভয়হীন এক উদ্দীপনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৮-১৯)। কিন্তু এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্রেমওয়ার্কের সবচেয়ে বিষাক্ত দিকটি হলো, বঙ্কিমচন্দ্র একটি সেক্যুলার বা সর্বজনীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি না করে এমন এক ধর্মতান্ত্রিক হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন আঁকেন, যেখানে মুসলমানদের ইতিহাস ও অস্তিত্বের কোনো বৈধ স্থান রাখা হয়নি। তিনি যৌথ সংগ্রামের পটভূমি মন্থন করে যে উজ্জ্বল চিত্রপট নির্মাণ করলেন, তা এমন এক মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল তুলে দিল, যাতে মুসলমান সমাজ বঙ্কিমের এই কাল্পনিক স্বপ্নমূর্তিকে কোনোভাবেই নিজের বলে গ্রহণ করতে না পারে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২০)। বঙ্কিমের এই একপেশে হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্নের বিষাক্ত সাজ বা বীজটি ইতিহাসের অগ্রযাত্রার সমস্ত প্রক্রিয়ার মধ্যেই এক পরম বৈষম্যের স্রোত বইয়ে দিয়েছিল। যার কুৎসিত অভিঘাত পরবর্তীকালে ভারতের মুসলমানদের এক দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও স্বতন্ত্র পাকিস্তান আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছিল (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২০, ২৪)। বঙ্কিমচন্দ্রের এই মারাত্মক ঐতিহাসিক জালিয়াতি ও বিকলাঙ্গ ইতিহাসের খাতের কারণেই ভারতের জাতীয় ইতিহাস আজ অবধি কোনো স্বাভাবিক ও সর্বজনীন পথের সন্ধান খুঁজে পায়নি। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে সোনার বাংলা দ্বিখণ্ডিত হতে হয়েছিল এবং যার একক মনস্তাত্ত্বিক রূপকার ছিলেন খোদ 'রাজনৈতিক পৌত্তলিক সাহিত্যের রূপকার' বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৯, ২৬)।

    বঙ্কিমীয় সাহিত্যের দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক প্রান্তিকীকরণ

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে মুসলমানদের যে খণ্ডিত ও নিষ্ঠুর চিত্র আঁকা হয়েছিল, তা কেবল উনিশ শতকের কলোনিয়াল কালখণ্ডের একটি সাময়িক সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। এই নির্দিষ্ট চিন্তাকাঠামোটি খুব দ্রুত কলকাতার নব্য শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের মগজে ও মনস্তত্ত্বে এক স্থায়ী ঔপনিবেশিক সিলমোহর হিসেবে বসে যায়। কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ বঙ্কিমের এই বয়ানকে প্রগতির একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার ফলে গ্রামীণ পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগুরু মুসলিম ও অনার্য লোকায়ত জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের এক সুগভীর সাংস্কৃতিক ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে ইতিহাসকে যেভাবে নিজের শ্রেণী-স্বার্থ অনুযায়ী নতুন করে ঢালাই করেছিলেন, তার প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কুফল হলো, পরবর্তী প্রজন্মের হিন্দু লেখকদের অবচেতনে এক প্রবল আর্য-শ্রেষ্ঠত্ববাদের অহংকার ঢুকে গেলো (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ১২)। উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিশ শতকের শুরুতে এই ধারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, বাংলা সাহিত্যের প্রায় আশি ভাগ সৃজনশীল রচনার মূল বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় দূরবর্তী রাজপুতানার চারণ কবিদের অলীক বীরত্বগাথা (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩৫)। ব্রিটিশ সেনা অফিসার জেমস টডের সংকলন গ্রন্থ থেকে প্লট ধার করে রমেশচন্দ্র দত্ত, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বা স্বর্ণকুমারী দেবীর মতো লেখকেরা যে সাহিত্যিক উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন, তার মূল লক্ষ্যই ছিল মুসলমানদের চিরকাল ‘ম্লেচ্ছ’ বা বহিরাগত আক্রমণকারী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া এবং রাজপুতদের আর্য শক্তির পরম প্রতীক হিসেবে খাড়া করা (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬)। অথচ ঐতিহাসিক সত্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নৃতাত্ত্বিকভাবে রাজপুতদের সাথে আর্যদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। তারা ছিল মূলত হুন জনজাতির বংশধর। যারা একসময় ভারতে এসে তীব্র ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। কিন্তু কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ কোনো ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ছাড়াই মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেকোনো শক্তিকেই আর্য শিরোপা দেওয়া পরম পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করত (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭)।

    এই সুসংগঠিত সাহিত্যিক ও নান্দনিক আগ্রাসনের কারণে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মুসলমানরা তাদের নিজস্ব যাপিত জীবনের পরিমণ্ডলে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়। কলকাতার বাবু সংস্কৃতির কারখানা থেকে যে তৎসম শব্দবহুল ও কৃত্রিম ‘শুদ্ধ বাংলা’ উৎপাদিত হতো, তা পূর্ববঙ্গের মানুষের মুখের প্রাত্যহিক জ্যান্ত প্রাকৃত শব্দগুলোকে ‘অসভ্য’ ও ‘আদিম’ বলে সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তর থেকে উচ্ছেদ করতে শুরু করে (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২১)। এর ফলে গ্রামীণ চাষী, তাঁতি বা জোলা মুসলমানরা তাদের নিজেদের ঘরের বুনিয়াদেই রাতারাতি এক ভাষাভোলা ও সংস্কৃতিহীন জাতিতে পরিণত হয়। এই ভাষা ও রক্তের প্রাচীন শেকড় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্পষ্ট দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষার আদি ও প্রকৃত অবয়বটি আর্য সংস্কৃতির সংস্কৃত গর্ভ থেকে আসেনি, বরং এদেশের মূল অনার্য, কৌম ও গৌড়ী-মাগধী অপভ্রংশের প্রাকৃত স্তর থেকে এর স্বাভাবিক বিবর্তন ঘটেছে (আহমদ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ৩৯)। অথচ বঙ্কিমীয় ধারা এই মাটির প্রাকৃত শেকড়কে অস্বীকার করে বাংলা ভাষাকে কট্টর ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অনুবর্তী করার এক সুগভীর মনোগত অভিপ্রায় জারি রেখেছিল (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ১০২)। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘ধর্মতত্ত্ব’ ও ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণকে মহাভারতের লৌকিক কামনার দেবমূর্তি থেকে বের করে এনে এক সুনির্দিষ্ট সাম্রাজ্যবাদী, একচ্ছত্র কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনস্থ ও আর্য রাষ্ট্রগুরু হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৭, ৩০)। বঙ্কিমের এই আর্য-হিন্দু রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ডাস ক্যাপিটাল, পূর্ববঙ্গের মুসলিম মানসে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ও ভয়ের জন্ম দেয়, যার ফলে তারা কলকাতার এই বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজেদের আত্মপরিচয় রক্ষার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয় (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২০, ২৪)। কার্ল মার্ক্সের বিখ্যাত 'ডাস ক্যাপিটাল' গ্রন্থটি যেভাবে বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি বা প্রধান আদর্শিক ইশতেহার হিসেবে গণ্য হয়, ঠিক তেমনি উনিশ শতকের বাংলায় বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য ও দর্শন তৎকালীন হিন্দু বুদ্ধিজীবী মহলে আর্য-হেজিমনিক রাষ্ট্রভাবনার প্রধান তাত্ত্বিক গাইডবুক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। বঙ্কিমীয় এই অনমনীয় তাত্ত্বিক অবস্থান ও কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মুসলিম মানসে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল এবং তীব্র অস্তিত্ব সংকটের ভীতি তৈরি করে। আর্য-কেন্দ্রিক এই জাতীয়তাবাদী জোয়ারে নিজেদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ কলকাতার এই সাংস্কৃতিক বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হয়। ফলস্বরূপ, নিজেদের আত্মপরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার্থে তারা কলকাতার বিকল্প হিসেবে নিজস্ব ধারার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পথ অনুসন্ধান করতে শুরু করে। যা পরবর্তীকালে ঢাকা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, মুসলিম লীগ গঠন এবং স্বতন্ত্র সাহিত্য আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।

    যখন এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ প্রখর হয়ে উঠতে শুরু করে, তখনই তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশ শতকের শুরুতে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো লেখকেরা বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র দাঁতভাঙা জবাব দিতে ‘রায়নন্দিনী’র মতো সম্পূর্ণ আবেগসর্বস্ব ও প্রতিবাদের সাহিত্য রচনা করতে প্রবৃত্ত হন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৫)। এটি ছিল মূলত এক প্রজন্মের অবদমিত মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভের দ্বারা অপর প্রজন্মের উগ্র আর্য-হেজিমনিকে কাউন্টার করার এক মরিয়া চেষ্টা। কলকাতার এই কৃত্রিম রেনেসাঁসের প্রবক্তারা একই সাথে প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সভ্যতার বিপুল ইতিহাসকেও সুপরিকল্পিতভাবে ইতিহাস থেকে ব্ল্যাকআউট বা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র নিজে নিরীশ্বরবাদী নাস্তিক বুদ্ধের নাম পর্যন্ত সহ্য করতে পারতেন না। অথচ অবলীলায় অজন্তা বা ইলোরার মতো সমস্ত বৌদ্ধ পুরাকীর্তিকে হিন্দু তথা আর্য গৌরবের স্মারক হিসেবে নিজের তত্ত্বের প্রয়োজনে গ্রাস করতে তাঁর মোটেও বাঁধেনি। প্রাচীন বাংলায় সেন ও ব্রাহ্মণ্য রাজাদের আমলে যে তীব্র বৌদ্ধ নিধন যজ্ঞ চলেছিল, তাদের উপাসনালয় ও বিহারগুলো যেভাবে ধ্বংস করে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তর করা হয়েছিল, বঙ্কিম বা তাঁর সমসাময়িক কলকাতার সুশীল সমাজ তাকে ইতিহাসের অংশ বলে স্বীকার করতেই প্রস্তুত ছিল না (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪৩)। এই ঐতিহাসিক জালিয়াতি ও সত্য গোপন করার প্রক্রিয়াটি মধ্যযুগীয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের কুখ্যাত মিথটির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ঔপনিবেশিক ও হিন্দু ঐতিহাসিকেরা দীর্ঘকাল ধরে প্রচার করে আসছিলেন যে, বখতিয়ার খলজী নালন্দা মহাবিহার সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে ধ্বংস করেছেন। অথচ বিখ্যাত তিব্বতি বৌদ্ধ পণ্ডিত লামা তারানাথের আদি ঐতিহাসিক ও দাপ্তরিক নথির উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খলজীর আক্রমণের বহু পূর্বেই কট্টরপন্থী আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী তীর্থিকেরা যজ্ঞের আগুন দিয়ে নালন্দার অমূল্য রত্নোদধি লাইব্রেরিটি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল (মর্তুজা, গোলাম। বাজেয়াপ্ত ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৫৪)। বঙ্কিমীয় ধারা এই আদি সত্যকে আড়াল করে সুবে বাংলার ইতিহাসের সমস্ত অনাচার ও গ্লানির জন্য এককভাবে কেবল মুসলিমদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। যেন মুসলিম আমলের আগে আর্যাবর্তে কেবল দেবতারা নেমে এসে মধুর ধারা বর্ষণ করতেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪৩)।

    বঙ্কিম আর্যাবর্তের ভৌগোলিক সীমানা বলতে পঞ্জাব, সিন্ধু বা আফগানিস্তানের (গান্ধার) যে অঞ্চলগুলোকে হিন্দুত্বের আদি ভূমি বলে গৌরব করতেন, সেখানে একটি মস্ত বড় ঐতিহাসিক সত্যকে উপেক্ষা করে যেতেন। তিনি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন যে, তাঁর জন্মের বহু শত বছর আগেই সেই আর্যাবর্তের অধিবাসীদের এক বিরাট অংশ স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪২)। ফলে আর্য ঐতিহ্যের দাবিদার কেবল ভারতের হিন্দুরাই হতে পারে না, আর্যাবর্তের মুসলিম প্রধান প্রদেশের মানুষেরাও একই রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪২)। কারণ, বঙ্কিম মূলত যে অঞ্চলকে খাঁটি 'আর্য-হিন্দু ভূমি' হিসেবে কল্পনা করে তাঁর তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি দাঁড় করিয়েছিলেন, বাস্তবে সেই অঞ্চলের জনমিতি ও মনস্তত্ত্ব ততদিনে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে একটি কাল্পনিক আর্য-অতীতের ওপর ভিত্তি করে যখন রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির তত্ত্ব নির্মাণ করা হয়, তখন তা প্রগতিশীল না হয়ে এক ধরনের আধিপত্যকামী রূপ ধারণ করে। কিন্তু বঙ্কিমের এই একপেশে ও স্বকপোলকল্পিত ইতিহাস বিচার পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজকে চিরকাল ‘বহিরাগত’ ও ‘পরজাতীয়’ বলে এক স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই জালিয়াতিপূর্ণ ইতিহাস চিন্তার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, তিনি নিজে একজন অত্যন্ত প্রাজ্ঞ, ইতিহাসসচেতন ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর উগ্র আর্য-হিন্দু রাষ্ট্রের ফ্রেমওয়ার্কের কাছে নিজের সমস্ত নিরপেক্ষ মননশীলতাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪৪)। ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব)’ গ্রন্থে প্রামাণ্য দলিলের সাহায্যে দেখানো হয়েছে, প্রাচীন বাংলার বর্ণাশ্রম ও কট্টর কৌলীন্য প্রথা কীভাবে এদেশের ব্রাত্য ও অন্ত্যজ সাধারণ মানুষকে যুগের পর যুগ সামাজিক আপার্থাইড বা বর্ণবৈষম্যের জাঁতাকলে পিষে মেরেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৪)। বঙ্কিম নিজে তাঁর জীবনের এক অনন্য সৃষ্টি ‘সাম্য’ এবং ‘বাঙ্গালার কৃষক’ প্রবন্ধে এই শোষিত গ্রামীণ রায়ত ও কৃষকদের অধিকারের কথা অত্যন্ত দরদের সাথে লিখেছিলেন, যদিও শেষ বয়সে এসে তিনি সেই রচনা দুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করেন (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪১, ৪৬)। কারণ মেহনতি কৃষকের সাম্যের অধিকার স্বীকার করতে গেলে তাঁর নিজের শ্রেণী-স্বার্থ এবং জমিদারি শোষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত আর্য-হিন্দু রাষ্ট্রের সেই অলীক সমান্তরাল কাঠামোটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হতো (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪১)।

    এই ঔপনিবেশিক পরাধীনতা, ব্রিটিশের অধীনে সামান্য ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে অযোগ্য সাহেবদের নিত্যদিন সেলাম ঠোকার অবদমিত ক্ষোভ এবং গুণ থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না পাওয়ার যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি, তা বঙ্কিমকে শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ মুসলিম-বিদ্বেষী ও উগ্র চিন্তার দিকে ঠেলে দেয় (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৮)। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের শেষভাগে যখন পাকিস্তান আন্দোলনের পালে তীব্র বাতাস লাগে, তখন জিন্নাহর নেতৃত্বে লড়াকু মুসলিম লীগের কর্মীরা মাওলানা আকরাম খানের মতো নেতাদের উপস্থিতিতে কলকাতার রাজপথে বঙ্কিমের 'আনন্দমঠ’ বইটির যে প্রকাশ্য বহ্ন্যুৎসব বা পুড়িয়ে ফেলার উৎসব করেছিলেন, তা ছিল মূলত বঙ্কিম প্রবর্তিত এই উগ্র ধর্মতান্ত্রিক হিন্দু রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কের বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজের অবদমিত আক্রোশেরই এক চূড়ান্ত নন্দনতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পাল্টা-আঘাত (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৫)। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে যে বিষাক্ত স্বপ্নের বীজ সুবে বাংলার মাটিতে চারিয়ে দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের স্বাভাবিক প্রবহমানতাকে চিরতরে খুন করে এক খণ্ডিত ও বিকলাঙ্গ মনস্তত্ত্বের জন্ম দেয়। যা আখেরে সমগ্র বঙ্গভূমিকে দুই টুকরো করার এক অলঙ্ঘনীয় ও অনিবার্য দেয়াল খাড়া করে দিয়েছিল।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment