Table of Contents
![]() |
| বৈষ্ণব নন্দনতত্ত্ব, সুফি ঐতিহ্য এবং বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে একটি সমালোচনামূলক পাঠ |
Previous Part.......
২:৩
নাম-সংকীর্তনের আড়ালে ভাষিক ফ্যাসিবাদের আদি জেনোটাইপ এবং সুফি ‘জবান’ কাড়ার মনস্তাত্ত্বিক মেকানিজম
একটি জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করার চেয়েও তার মুখের প্রাকৃত জবানকে আত্মসাৎ করা অনেক বেশি বিপজ্জনক সাম্রাজ্যবাদী কৌশল। মধ্যযুগীয় বাংলায়, বিশেষ করে পঞ্চদশ শতকের ক্রান্তিলগ্নে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের স্বাধীন সুলতানি আমলের ছায়াতলে যখন পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত সুফি-সাধকদের মানবিক কৃষ্টি এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক জাগরণ তৈরি করছিল, তখন বদ্বীপের শোষিত ও নিম্নবর্ণের অনার্য মেহনতি মানুষ এক পরম আশ্রয়ের সন্ধান পায়। সুফিরা যখন সাধারণ ডোম, চণ্ডাল, কৈবর্ত ও নমশূদ্র সমাজকে আর্যাবর্তের ক্লিষ্ট ও বজ্রআঁটুনি সংস্কৃত মন্ত্রের লোহার খাঁচা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ নিজস্ব মাতৃভাষায় ‘আল্লাহ’, ‘রসুল’, ‘মারেফাত’ বা ‘তৌহিদ’-এর মতো উচ্চতর জ্ঞানকাণ্ডের সহজ ও সমতাবাদী বাণী শোনাচ্ছিলেন, তখন তা মানুষের মনে এক প্রকাণ্ড আত্মমর্যাদার জন্ম দিয়েছিল। এই ভাষিক ও মনস্তাত্ত্বিক মহা পরিবর্তন রুখে দিতে নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় ল্যাবরেটরিতে বসে শ্রী চৈতন্য প্রবর্তন করলেন ‘তারকব্রহ্ম নাম’ ও বৈষ্ণব পদাবলীর এক অভূতপূর্ব নন্দনতাত্ত্বিক জাল। আপাতদৃষ্টিতে বাইরে প্রেমের গান মনে হলেও, এর আসল মেকানিজম ছিল সুফিদের সেই তৌহিদবাদী ‘জবান’ বা ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যকে সাধারণ মানুষের অবচেতনের গভীরে সুকৌশলে বিকৃত করে দেওয়া। ১৬ শতকীয় ভাষিক উচ্ছেদ ও নন্দনতাত্ত্বিক একচেটিয়া আধিপত্যই ছিল আসলে ৪০০ বছর পর কলকাতার ভদ্রলোকি কলোনিয়াল কালচার এবং রবীন্দ্র-বিশ্বভারতীর সেই পরিশীলিত বর্জনমূলক সংস্কৃতির আদি জেনোটাইপ বা মূল বুনিয়াদ (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৫-২৭)।
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ছকের ভেতরের আসল মনস্তাত্ত্বিক মেকানিজমটি বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে সুফিদের হালকা-ই-জিকিরের সেই প্রাণবন্ত শব্দকাঠামোর বিপরীতে বৈষ্ণবীয় ‘নাম-মাহাত্ম্য’ প্রতিস্থাপনের চতুর নকশাটি ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। সুফি-সাধকেরা তাদের আধ্যাত্মিক আচারে জিকিরের সুরকে গণমানুষের যাপিত জীবনের শব্দভাণ্ডারের সাথে একাত্ম করে এক অদ্ভুত মরমি আকর্ষণ তৈরি করেছিলেন, যার ফলে শত শত বছর ধরে অপমানিত নিম্নবর্ণের মানুষেরা পরম মায়ায় ইসলাম গ্রহণ করছিল। চৈতন্য খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন, শুধু আইনি বাধা বা ভয় দেখিয়ে মানুষের মুখের এই প্রাকৃত জবানকে কেড়ে নেওয়া যাবে না। যেরকম এখন মুসলিমদের জন্য করা হয়, ইসলামের আইনি নিগড়ে বন্দী করে জোরে ইসলাম গিলিয়ে দিতে। হিন্দুরাও তখন এটাই চাইছিলো, হিতে বিপরীত হয়েছে। এ মাটিতে ইসলামের আদি আকাবিররা আমাদের বর্তমানের মতো ইসলাম জোর করে গিলিয়ে দেবার মনস্তত্ত্বের হতেন এবং ইসলামের মাইন্ডও যদি এরকম হতো তাহলে তাঁরা অবশ্যই এরকম হতেন, তাহলে হিন্দুরা দলে দলে ইসলামমুখী কেনো হতো? কারণ তারা দেখতো হিন্দু ধর্ম যা ইসলামও তা; উভয়টিই গলায় ফাঁস লাগাতে চায়। ফলত বুঝা গেলো ইসলামের শেকড়ের ব্যক্তিরা এখানে ইসলামকে শুষ্ক-রুক্ষ আর কাটখোট্টাভাবে জোর করে গিলিয়ে দেবার চাননি। ইসলামের স্বভাবগত উদার পদ্ধতিতেই এর সামগ্রিক দিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। কেবল আইনি নিগড়ে আবদ্ধ করাকে ইসলাম ভাবেননি। চৈতন্য এমন ইসলামের বিপরীতে হিন্দু পণ্ডিতদের তৈরি আইনি বজ্রআঁটুনির প্রমাদ গুনলেন। তিনি বুঝলেন, মুসলিমদের মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সমতাবাদী সংস্কৃতি। আর তাই দরকার এমন এক ভাষিক কোরিওগ্রাফি বা নামজপের বৃত্তাকার ছক, যা সুফি জিকিরের সেই সম্মিলিত স্পিরিটটিকে হুবহু হাইজ্যাক করে বৈষ্ণবীয় খোলসে পুরে দেবে। এই উদ্দেশ্যে বৈষ্ণব কবিরা সুফিদের ‘জিকরে জলি’ বা উচ্চকণ্ঠের জিকিরকে রূপান্তর করলেন বৈষ্ণবদের ‘উচ্চ সঙ্কীর্তনে’ এবং সুফিদের অন্তর্মুখী ‘জিকরে খফি’-কে হুবহু কপি করে নাম দিলেন বৈষ্ণবীয় ‘মানস জপ’। সুফিদের এই সুগভীর মরমী সম্পদকে বৈষ্ণবীয় শব্দ ও পুরাণের ছাঁচে ঢেলে দেওয়ার ফলে সাধারণ নিরক্ষর ব্রাত্য সমাজ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল, সুফিদের আল্লাহর নামের জিকিরের মাহফিলে যে সাম্য এবং এর ভেতরে যে আত্মহারা প্রেমের আনন্দ আছে, নদীয়ার রাজপথে খোল-করতালের ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ নাম-মাহাত্ম্যের ভেতরেও তো ঠিক সেই একই সুর আরও সহজ ও রসাত্মক রূপে বর্তমান (বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, রমাকান্ত চক্রবর্তী, পৃষ্ঠা ২৬-২৮)।
শব্দ কীভাবে একটি শৃঙ্খলিত জনগোষ্ঠীর অবচেতনের কলোনিয়াল খাঁচা তৈরি করে, বৈষ্ণবদের এই নাম-মাহাত্ম্যের মনস্তাত্ত্বিক জালই তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ। সুফিরা যখন এ দেশের মানুষকে ইসলামের নিশ্ছিদ্র তাওহিদ বা আল্লাহর পরম সার্বভৌমত্বের তত্ত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আর্যাবর্তের পৌরাণিক অবতারবাদের কুসংস্কার থেকে মনকে মুক্ত করছিলেন, ঠিক তখনই প্রবর্তিত হরিনামের ষোলো নাম ও বত্রিশ অক্ষরের বৃত্তাকার উচ্চারণপদ্ধতি সাধারণ মানুষের চেতনার ওপর এক মোহময় আফিমের মাদকতা ছড়িয়ে দিল। এই নামজপের মাদকতায় বুঁদ হয়ে সাধারণ অনার্য মানুষ তাদের নিজেদের দীর্ঘকালের শোষণের বাস্তব ইতিহাস, জমিদারের লুণ্ঠন এবং পলিটিক্যাল প্রতিরোধের জবানকে হারিয়ে ফেলল। বৈষ্ণব কবিরা সুফিদের ‘আশেক-মাশুক’ বা স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির যে মরমি বিরহ-প্রেমের দর্শন ছিল, তাকে আভিধানিক স্তরে রূপ দিলেন রাধা-কৃষ্ণের মর্ত্যলীলায়। এই চতুর শব্দ প্রতিস্থাপনের ফলে বাংলার মানুষের হৃদয়ের অর্গানিক ভাষার স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়ে গেল এবং তাদের সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বিক ঠিকাদারী সম্পূর্ণভাবে চলে গেল নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় পণ্ডিতদের নিয়ন্ত্রণে। যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বাঙালি মুসলিম মানসকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ অন্তঃসারশূন্য ও আত্মবিস্মৃত করে তোলার প্রথম সুসংগঠিত কারখানা হিসেবে কাজ করেছিল।
এই যে ১৬ শতকের নদীয়ার কারখানায় বসে সুফিদের মরমী জবানকে কেড়ে নিয়ে সমগ্র বাংলা ভাষার সাহিত্যিক ও নান্দনিক স্পেসটি একাগ্রভাবে দখল করে নেওয়ার আদি জেনোটাইপ, এটিই প্রায় ৪০০ বছর পর উনবিংশ ও বিংশ শতকের কলকাতার ভদ্রলোকি কলোনিয়াল কালচারের মূল বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করেছিলো। যেভাবে একটি ক্ষুদ্র বীজ থেকে এক বিশাল বটবৃক্ষ হওয়ার মেকানিজমটি ঘটে, আমাদেরও ঠিক সেই সহজ ক্যানভাসে দেখতে হবে কীভাবে নদীয়ার এই বৈষ্ণব পদাবলীর জোয়ার রবীন্দ্র-বিশ্বভারতীর সেই একচেটিয়া বর্জনমূলক নন্দনতত্ত্বের জন্ম দিয়েছিল। বৈষ্ণব কবিরা সুফিদের জিকিরের সুর হাইজ্যাক করে যেভাবে সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে রাধা-কৃষ্ণের পুরাণের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়ে ইসলামের তাওহীদি আকিদাকে ব্ল্যাকআউট করেছিলেন, ঠিক সেই একই নান্দনিক কায়দায় ৪০০ বছর পর কলকাতার বাবু সমাজ এবং বিশ্বভারতী এক পরিশীলিত ভদ্রলোকি দেওয়াল খাড়া করল। যার উদ্দেশ্য, বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব কৃষ্টি, পোশাক, এবং যাপিত জীবনের জবানকে ‘আনকালচার্ড’ বা আঞ্চলিক বলে চিরতরে ব্রাত্য করে রাখা। আবুল মনসুর আহমদ দেখিয়েছেন, বিশ্বভারতীর সেই রাবীন্দ্রিক নন্দনতত্ত্বের আকাশে শারদীয় পূজার 'আনন্দময়ী মা' কতবার এসেছে-গেয়েছে, কিন্তু সেখানে সমতার একটি দিনের তরেও মুসলমানদের ‘ঈদের চাঁদ’ ওঠেনি (বাংলাদেশের কালচার, আবুল মনসুর আহমদ, প্রবন্ধ: বিশ্ব-কভি বনাম জাতীয় কবি, পৃষ্ঠা ৩৯)। এই ভাষিক উচ্ছেদের সমান্তরালে বৈষ্ণব নন্দনতত্ত্বের ল্যাবরেটরি থেকে নির্গত সবচেয়ে মারাত্মক এবং সুদূরপ্রসারী মারণাস্ত্রটি লুকিয়ে ছিল তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক টেক্সট বা চরিতকাব্যগুলির পাতার গভীরে।
বৈষ্ণব চরিতকাব্যে ‘যবন-ম্লেচ্ছ’ ছকের মনস্তাত্ত্বিক অপার্থাইড এবং সমকালীন সুলতানি প্রশাসনের ভেতরের গোপন সমীকরণ
চরিতকাব্যগুলোর পাতার গভীরে লুকিয়ে থাকা এই ভাষিক ও আভিধানিক বর্জনের সূত্র ধরেই মূলত বদ্বীপের প্রথম সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক অপার্থাইডের বুনন তৈরি হয়েছিল। শ্রী চৈতন্য প্রবর্তিত ভক্তি আন্দোলন নদীয়ার রাজপথে খোল-করতালের কোলাহল দিয়ে সুফিদের জিকিরের সুর আত্তীকরণ করার পাশাপাশি সাহিত্যিক ও লৈখিক স্তরে মুসলিম সমাজকে চিরতরে এক ‘অপবিত্র অপর’ (The Untouchable Other) হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার ছক তৈরি করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে বৈষ্ণববাদকে সর্বজনীন প্রেমের বন্যা বলে প্রচার করা হলেও, সমকালীন বৈষ্ণবীয় মূল বুনিয়াদি দলিলসমূহ, যেমন কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত কিংবা বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের শ্রীচৈতন্য-ভাগবত—এর প্রামাণ্য পৃষ্ঠা ওল্টালে দেখা যায়, মুসলিম শাসন, সমাজ ও সুলতানি প্রশাসনকে সেখানে প্রতিনিয়ত ‘যবন’, ‘ম্লেচ্ছ’ ও ‘পাপিষ্ঠ’ কাল্ট হিসেবে অবলীলায় চিত্রিত করা হয়েছে। এই আভিধানিক বর্জনের সমান্তরালে কাজ করছিল আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলাতন্ত্রের শীর্ষে ‘দবীর খাস’ (ব্যক্তিগত সচিব) ও ‘সাকর মল্লিক’ (রাজস্ব প্রধান) পদে আসীন রূপ ও সনাতন গোস্বামীর মতো সুশিক্ষিত উচ্চবর্ণীয় এলিটদের জটিল সামাজিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান। সমকালীন রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্য সমাজ যেখানে এই আমলাদের ‘যবনসংসর্গকারী’ বলে বর্জন করেছিল, সেখানে বৈষ্ণবীয় টেক্সটের এই কঠোর ভাষিক শ্রেণিবিভাগ একাধারে তৎকালীন সুলতানি প্রশাসনের সমতাবাদী ভাবমূর্তিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে মোকাবিলা করার এবং নিজস্ব এলিট অবস্থান ও কৃষ্টি অক্ষুণ্ণ রাখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কোরিওগ্রাফি হিসেবে কাজ করেছে (কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী, শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, আদি লীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ; এবং রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা: ১৮, ২৬, ৫২)।
এই মনস্তাত্ত্বিক আপার্থাইডের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের চরিতকাব্যগুলোর আক্ষরিক শব্দচয়ন এবং সমকালীন লিঙ্গুইস্টিক বয়ানের মেকানিজমটি ভেঙেচুরে দেখতে হবে। বৈষ্ণব পণ্ডিতেরা যেখানে সংস্কৃতির পরিশীলিত রূপায়ণে নিজেদের ভাবমূর্তিকে সাব্যস্ত করতেন, সেখানে লৈখিক স্তরে সমকালীন অ-বৈষ্ণব ও শাসনক্ষমতায় থাকা মুসলিম সমাজকে ‘যবন-ম্লেচ্ছ’ সংস্কৃতির অনুষঙ্গে সংজ্ঞায়িত করা হতো। শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-এর প্রামাণ্য বয়ান ও শ্লোকসমূহ সাক্ষ্য দেয়, বৈষ্ণব পণ্ডিতেরা মুসলিম সমাজকে আভিধানিক স্তরে এক প্রকার হীনম্মন্যতায় ফেলার জন্য এক পরিশীলিত শব্দগত বর্ণবাদের সিলমোহর মেরেছিলেন। সেখানে লৈখিক স্তরে স্বয়ং মুসলিম চরিত্রের মুখ দিয়েই বলানো হতো—
“ম্লেচ্ছ-জাতি পাপিষ্ঠ মোরা, আমাদের ছুঁইলে পাপ হয়।
তোমা-সবার দর্শনে মোদের পাপ ক্ষয় ॥”
এবং তৎকালীন মুসলিম প্রশাসনিক প্রধান বা কাজীর আভিধানিক স্তর বিন্যাস করা হতো এভাবে—
“কাজী কহে,—তোমার হিন্দু, আমি ত’ ‘যবন’।
আমারে তোমার ঘরে কিবা প্রয়োজন ॥”
এই সূক্ষ্ম মেকানিজমের সবচেয়ে মারাত্মক দিকটি লুকিয়ে ছিল এই স্ব-স্বীকৃত নিকৃষ্টতার (Self-Incrimination) লৈখিক চাতুর্যের ভেতরে। বৈষ্ণব পণ্ডিতেরা নিজেরা সরাসরি শাসনক্ষমতাকে আক্রমণ না করে নন্দনতত্ত্বের ল্যাবরেটরিতে এমন একটি বয়ান তৈরি করছিলেন, যেখানে মুসলিম চরিত্রগুলো নিজেরাই নিজেদের ‘ম্লেচ্ছ’, ‘পাপিষ্ঠ’ এবং ‘অপবিত্র’ বলে স্বীকার করছে। শ্লোকের আক্ষরিক পাঠেই স্পষ্ট, মুসলিমদের নিজস্ব শারীরিক ও সামাজিক অস্তিত্বকে লৈখিক স্তরে এমনভাবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল যে, তাদের স্পর্শ করলেই ‘পাপ হয়’ এবং এই গ্লানি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো বৈষ্ণবদের ‘দর্শন’ লাভ করা। একইভাবে কাজীর মুখ দিয়ে ‘আমি ত যবন’ বলিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বৈষ্ণব পণ্ডিতেরা সুকৌশলে সমকালীন শাসকশ্রেণীকে জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে পুরোপুরি একঘরে ও অস্পৃশ্য করে রাখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল খাড়া করেছিলেন। ফলত, আপাতদৃষ্টিতে বৈষ্ণববাদকে সর্বজনীন প্রেমের বন্যা বলে প্রচার করা হলেও, সমকালীন বৈষ্ণবীয় মূল বুনিয়াদি দলিলসমূহের প্রামাণ্য পৃষ্ঠা ওল্টালে দেখা যায়, মুসলিম শাসন ও সমাজকে আভিধানিক স্তরে চিরতরে এক ‘নিকৃষ্ট কলোনি’ বা ‘অপবিত্র অপর’ (The Untouchable Other) হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার ছক তৈরি করা হয়েছিল (কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী, শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, আদি লীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ ও মধ্য লীলা)।
বাহ্যিকভাবে হরিদাসের মতো চরিত্রকে ‘যবন হরিদাস’ উপাধি দিয়ে কাফেলায় রাখার যে দৃশ্যপট তৈরি করা হতো, তার আসল উদ্দেশ্য ছিল মেহনতি মুসলিম ও নিম্নবর্ণের অন্ত্যজদের মনে এই ধারণা স্থায়ী করা যে, তোমাদের নিজস্ব মুসলিম পরিচয়টি আদতে একটি ‘নিকৃষ্ট কলোনি’। আর এই গ্লানি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো বৈষ্ণবীয় গুরুবাদের সামনে সাষ্টাঙ্গে মাথা নত করা। এই এথনিক শেইমিং (Ethnic Shaming) ও শব্দগত বর্ণবাদ এত বেশি নিখুঁত ছিল যে, নব-দীক্ষিত সাধারণ মুসলমানেরা তাদের নিজেদের অজান্তেই আভিধানিক স্তরে হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে এবং নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল সুফি ঐতিহ্য ও জবানকে ত্যাগ করে বৈষ্ণবদের তৈরি করা নান্দনিক ছাঁচে নিজেদের সঁপে দেয় (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা: ৪৬)। এই লিঙ্গুইস্টিক ফ্যাসিবাদের সমান্তরালে সমকালীন হোসেন শাহী সালতানাতের ভেতরের গোপন রাজনৈতিক সমীকরণটি ছিল এক প্রকাণ্ড ভূ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংঘাতের ইতিহাস, যা মেইনস্ট্রিম ঐতিহাসিকেরা সুপরিকল্পিতভাবে চেপে যান। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ যখন উড়িষ্যা ও কামরূপের উগ্র রাজাদের বিরুদ্ধে সীমান্তে মরণপণ লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন তাঁর রাজকীয় প্রশাসনের মূল কেন্দ্র তথা প্রধান সচিব ‘দবীর খাস’ (সনাতন গোস্বামী) এবং অর্থ ও রাজস্ব মন্ত্রী ‘সাকর মল্লিক’ (রূপ গোস্বামী) সুলতানের রাজকীয় ক্ষমতার সমান্তরালে নদীয়ার এই বৈষ্ণব ল্যাবরেটরি এবং বৃন্দাবনকে বৈষ্ণবদের এক সমান্তরাল ‘আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলার সমস্ত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছিলেন। তারা সুলতানের উচ্চপদস্থ ও বিশ্বস্ত পাত্রের মুখোশ পরে একদিকে মুসলিম সালতানাতের প্রশাসনিক মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে ফাঁপা করছিলেন, আর অন্যদিকে স্বকীয় ক্ষমতার বলয় তৈরি করছিলেন।
শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-এর মধ্যলীলার উনবিংশ ও বিংশ পরিচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট দলিল প্রমাণ করে, রূপ ও সনাতন গোস্বামী যখন গোপনে রাজচাকরি ত্যাগ করে চৈতন্যের কাফেলায় যোগ দিতে বৃন্দাবনে রওনা হন, তখন তারা সুলতানের সাথে সরাসরি প্রশাসনিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। বিশেষ করে সনাতন গোস্বামী যখন অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে রাজকার্য বর্জন করে ঘরে বসে বৈদান্তিক আলোচনা ও বৈষ্ণবীয় কোরিওগ্রাফি করছিলেন, তখন সুলতান হোসেন শাহ স্বয়ং তাঁর বাড়ীতে এসে এই প্রশাসনিক অবাধ্যতার প্রমাদ গোনেন। চরিতামৃতের মধ্যলীলার বিংশ পরিচ্ছেদের আসল পাঠে সুলতানের সেই ক্ষুব্ধ আক্ষেপ ও ভাষিক সংঘাত এভাবে নথিবদ্ধ হয়ে আছে—
“রাজা কহে—তোমার বড় ভাই করে দস্যু ব্যবহার ॥
জীব পশু মারি কৈল চাক্কা সব নাশ।
এথা তুমি কৈলে মোর সর্ব্বকার্য্য নাশ ॥”
এখানে সুলতানের এই জবানিতেই স্পষ্ট, রূপ ও সনাতন গোস্বামী তাঁদের প্রশাসনিক সিলমোহর ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সালতানাতের সর্বকার্য নাশ এবং কাজীর আইনি সার্বভৌমত্বকে চূড়ান্তভাবে পঙ্গু করে দিয়ে গিয়েছিলেন (কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী, শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য লীলা, বিংশ পরিচ্ছেদ, শ্লোক: ২৬-২৭)। এটি নিছক কোনো ভক্তির বন্যা ছিল না; এটি ছিল হোসেন শাহের মুসলিম সালতানাতকে গোড়া থেকে দুর্বল করে এ দেশে পুনরায় আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এক প্রকাণ্ড আমলাতান্ত্রিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্টলাইন। এই সর্বগ্রাসী ও দমবন্ধ করা আভিধানিক আপার্থাইডের তীব্র আঘাতে বদ্বীপের মুসলমানেরা যখন নিজেদের অজান্তেই নিজেদের মাটিতে এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক পরবাসী হয়ে পড়েছিল, তখন নদীয়ার এই বৈষ্ণবীয় বীজটি দীর্ঘ চারশ বছর ধরে ইতিহাসের গভীরে নীরবে ডালপালা মেলে একচেটিয়া নান্দনিক খাঁচার প্রাচীর খাড়া করছিল।
নন্দনতাত্ত্বিক একচেটিয়া খাঁচার আদি ভিত্তিভূমি এবং নজরুলের ‘ঈদের চাঁদ’ বনাম বিশ্বভারতীর শারদীয় আকাশ
একচেটিয়া নান্দনিক খাঁচার প্রাচীর খাড়া করার এই সুদীর্ঘ অবচেতনের প্রক্রিয়াই মূলত চারশ বছরের কালক্রম পার হয়ে বিংশ শতকের কলোনিয়াল কলকাতার ভদ্রলোকি কালচার এবং রবীন্দ্র-বিশ্বভারতীর পরিশীলিত বর্জনমূলক নন্দনতত্ত্বের মূল গর্ভগৃহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ষোড়শ শতকের সেই সুলতানি আমলের নির্দিষ্ট বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আভিধানিক ও আমলাতান্ত্রিক স্তরে মুসলমানদের ‘যবন-ম্লেচ্ছ’ কলোনি হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার যে আদি জেনোটাইপ নদীয়ার ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে বাংলা সাহিত্যের পুরো স্পেসটিকে একতরফাভাবে গ্রাস করে নেয় এবং ব্রিটিশ ভারতের হিন্দু মনস্তত্ত্ব এমনভাবে পাল্টে দেয় যে, একদেশ-একদেহ হয়ে থাকার কোনো স্পেসই অবশিষ্ট থাকেনি। বৈষ্ণব কবিরা সুফিদের জিকিরের সাম্যবাদী সুর চুরি করে যেভাবে সমগ্র বাংলা ভাষার অবয়বকে রাধা-কৃষ্ণের পুরাণের জোয়ারে বেঁধে ফেলেছিলেন, ঠিক সেই একই মেকানিজমকে পুঁজি করে বিংশ শতকের শুরুতে কলকাতার এলিট বাবু সমাজ এবং শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী এক নিশ্ছিদ্র সাংস্কৃতিক বৃত্ত তৈরি করে। এই বৃত্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল, মেহনতি ও প্রাকৃত বাঙালি মুসলমানদের বহিরাগত সাব্যস্ত করে তাদের নিজস্ব অর্গানিক কৃষ্টি, ঐতিহ্য, পোশাক এবং যাপিত জীবনের জবানকে ‘সংস্কৃতি-বহির্ভূত’ বা ব্রাত্য বলে চিরতরে সাহিত্যের মূল আঙিনা থেকে আড়াল করে রাখা। আবুল মনসুর আহমদের অত্যন্ত প্রামাণ্য ও বিখ্যাত আক্ষেপের সূত্রটি স্মরণ করে বলতে হয়, বিশ্বভারতীর সেই রাবীন্দ্রিক নন্দনতত্ত্বের আকাশে শারদীয় পূজার ‘আনন্দময়ী মা’ কতবার এসেছে-গেয়েছে, কিন্তু সেখানে সামাজিক সমতার একটি দিনের তরেও মুসলমানদের ‘ঈদের চাঁদ’ ওঠেনি।
এই পরিশীলিত নান্দনিক খাঁচা ও মনস্তাত্ত্বিক বর্জনের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন তীব্র আকার ধারণ করে, ঠিক তখনই বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণে এক নতুন মহাপ্রতিরোধের মহড়া শুরু হয়। যার নাম বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নিজস্ব অর্গানিক ভাষার প্রতিরোধ। নজরুল খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, বিশ্বভারতীর আকাশে ঈদের চাঁদ না ওঠার রাজনৈতিক অর্থ হলো, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুখের ভাষা ও ঐতিহ্যকে ভদ্রলোকি সাহিত্যের সীমানা থেকে সুপরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে। এই একচেটিয়া নান্দনিক খাঁচাকে চূর্ণ করতে নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ বা ‘ওঠরে চাষী’র মতো প্রগাঢ় কাব্যে আর্যাবর্তের কৃত্রিম শব্দ স্কেল অতিক্রম করে এ দেশের পলিমাটির অর্গানিক ও মুসলমানী ঢং-এর জবানকে সগৌরবে সংস্কৃতির মূল মঞ্চে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন।
পাশাপাশি ফররুখ আহমদের কলমেও রচিত হলো সেই পরিশীলিত ঔপনিবেশিক ভদ্রলোকি দেয়াল ভাঙার গল্প। ফররুখের ‘সাত সাগরের মাঝি’র মতো রূপকধর্মী ও প্রগাঢ় ঐতিহ্যের কাব্যভাষায় রাধা-কৃষ্ণের পুরাণের জোয়ারে ভেসে যাওয়া বাংলা সাহিত্য এক নতুন তাওহীদি মরমী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিকচিহ্ন খুঁজে পায়। তিনি আরবি-ফারসি শব্দ ও মুসলিম কৃষ্টির এমন এক শক্তিশালী আভিধানিক বুনন তৈরি করলেন, যা কলকাতার বাবু সমাজের কৃত্রিম নান্দনিক খাঁচাকে ভেতর থেকে আঘাত করে। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদের এই জাদুকরী আবির্ভাব মূলত মুসলিম জনসমাবেশে এতদিন ধরে থাকা লৈখিক ও সাংস্কৃতিক ঘেরাটোপের কুয়াশা কাটার এক দীপ্ত ‘সুবেহ-সাদেক’ বা নবদিগন্তের সূচনা।
নজরুল কিংবা ফররুখের এই যে কালজয়ী প্রতিরোধ, তা বিংশ শতকের কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর ঐতিহাসিক সূত্রপাত ঘটেছিল মূলত ১৬ শতকের নদীয়ার সেই বৈষ্ণবীয় সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে, যেখানে সুফিদের লৌকিক জবান ও সুর আত্তীকরণের এক সুনিপুণ মেকানিজম কাজ করেছিল। ১৬ শতকে বৈষ্ণব কবিরা যেভাবে সুফিদের ভাষা ও সুরকে নিজেদের ছাঁচে আত্তীকরণ করে বাংলা সাহিত্য থেকে মুসলিম ভাবধারাকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছিলেন, সেই ঘটনাটিই ছিল মূলত বাঙালি মুসলমানের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক কোণঠাসা অবস্থার আসল শুরু। বৈষ্ণব সাহিত্যের সেই একচেটিয়া আভিধানিক আধিপত্যই পরবর্তীকালে বাঙালি মুসলমানের মনস্তাত্ত্বিক ও লৈখিক প্রান্তিকতার আদি উৎস হিসেবে কাজ করে। আর এই চারশত বছরের পুঞ্জীভূত বঞ্চনা ও আভিধানিক অবহেলার চূড়ান্ত নান্দনিক ও ভাষিক জবাবই আমরা দেখতে পাই বিংশ শতকে নজরুল ও ফররুখের এই প্রতিরোধী সাহিত্যধারার মাঝে (আবুল মনসুর আহমদ, বাংলাদেশের কালচার, প্রবন্ধ: সুবেহ-সাদেক, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৪ এবং ৩৯-৪০)।

Post a Comment