Table of Contents
![]() |
| সেন আমলে বাংলার সামাজিক কাঠামো, কুলীন প্রথা ও বর্ণভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের একটি প্রতীকী ঐতিহাসিক উপস্থাপন |
Previous Part.......
১:৩
দক্ষিণাত্যের বহিরাগত আক্রমণ ও পাল বংশের লোকায়ত সাম্রাজ্যের পতন
বাংলার ইতিহাসে বহিরাগত শক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক জবরদখলের যে সুদীর্ঘ কৃষ্ণপক্ষ, তার এক অত্যন্ত ট্রাজিক এবং চূড়ান্ত মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একাদশ শতকের শেষভাগে কর্ণাটক থেকে আসা সেন রাজবংশের আগ্রাসন। সেন রাজারা এ দেশের মাটির কোনো সন্তান ছিলেন না। তাদের আদি পুরুষেরা ছিলেন দূর দক্ষিণাত্যের মহীশূর বা কর্ণাটকের চন্দনাবতী অঞ্চলের পশুপালক, যাযাবর বা সামরিক ভাড়াটে যোদ্ধা গোষ্ঠী। বাংলার লোকায়ত পাল রাজাদের শাসন যখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছিল, তখন সেই সুযোগে এক আগ্রাসী সামরিক শক্তির ছক নিয়ে এ দেশের সিংহাসন দখল করেন সামন্ত সেন এবং তাঁর উত্তরসূরি বিজয় সেন। পাল বংশের দীর্ঘ চারশ বছরের ইতিহাস যদি আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাই, তাঁরা ছিলেন এ দেশেরই সন্তান এবং ধর্মীয়ভাবে বৌদ্ধ হওয়ার কারণে তাঁদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল অনেকটাই গণমুখী, সহনশীল এবং লোকায়ত উৎপাদন-সংস্কৃতির সাথে সংলগ্ন (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩১, ২৩৮ ও ৩৯৯-৪০০)। পালেরা এ দেশের প্রাচীন অনার্য ম্লেচ্ছ ও বৌদ্ধ সমাজকে কখনো কোনো কৃত্রিম জাতপাতের খাঁচায় বন্দি করতে চাননি। বরং তাঁদের আমলে গ্রামীণ পঞ্চায়েত এবং কৃষি-ভিত্তিক যৌথ সমাজকাঠামো এক চমৎকার স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য উপভোগ করত (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, পৃষ্ঠা ২৩১-২৩৪)। কিন্তু কর্ণাটকের এই সেন শাসকেরা যখন এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের কুক্ষিগত করলেন, তখন তারা প্রথম দিন থেকেই বাংলার মানুষের ওপর এক তীব্র রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কলোনিয়ালিজম বা ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দেওয়ার ছক আঁকলেন (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, পৃষ্ঠা ১৬ [গৌড়চন্দ্রিকা] এবং পৃষ্ঠা ৯৯-১০৬ )।
সেন রাজবংশের এই জবরদখল কেবল একটি রাজবংশকে সরিয়ে আরেকটি রাজবংশের সিংহাসনে বসার সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মূলত বাংলার আদিম সমতাবাদী লোকসমাজের ওপর উত্তর ভারতীয় আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির এক চূড়ান্ত কাঠামোগত পাল্টা-আক্রমণ (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, পৃষ্ঠা ২৩৫-২৩৮ ও ৪১৭-৪১৮)। বিজয় সেন এবং তাঁর পরবর্তী শাসক বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেন খুব ভালো করেই জানতেন, এ দেশের বৃহৎ অনার্য ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে যদি চিরতরে নিজেদের পদানত করে রাখতে হয়, তবে তাদের মুখের ভাষা বা গায়ের শক্তিকে দমন করাই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের সামগ্রিক কৃষ্টি, সমাজ এবং বিশ্বাসের অভ্যন্তরীণ মেরুদণ্ডটিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে পুরোপুরি ভেঙে দিতে হবে। পাল রাজাদের উদার ও গণমুখী সমাজ ব্যবস্থার কারণে এ দেশের সাধারণ চাষী, কৈবর্ত, কামার, কুমার এবং ব্রাত্য মানুষেরা যে সামাজিক মর্যাদা ও স্বাধীনতা ভোগ করছিলেন—সেন শাসকেরা তাকে আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের লেন্স দিয়ে অত্যন্ত নিচু চোখে দেখলেন (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, পৃষ্ঠা ১৬ [গৌড়চন্দ্রিকা] এবং ২৮-২৯ ও ৯৯-১০৬)। তারা পাল আমলের সেই গৌরবময় লোকায়ত ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বা আড়াল করে দিয়ে এ মাটির ওপর এমন এক অদ্ভুত ও রক্তচোষা রাজতান্ত্রিক শাসন কায়েম করলেন, যা এ দেশের মানুষকে নিজের ভূমিতেই এক প্রকার অস্পৃশ্য এবং অধিকারহীন ব্রাত্য জীবে পরিণত করেছিল (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, পৃষ্ঠা ৯৯)।
কনৌজ থেকে ব্রাহ্মণ আমদানি এবং কৃত্রিম আর্য-শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ
সেন রাজবংশের সবচেয়ে ভয়ানক এবং দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক জালিয়াতি বা কালচারাল ফোর্জারির ল্যাবরেটরি তৈরি হয়েছিল তখন, যখন রাজা বল্লাল সেন এ দেশের সমাজকে আর্যাবর্তের কট্টর স্মার্ত অনুশাসনের ছাঁচে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করলেন। সেনেরা দেখতে পেলেন, বাংলার আদিম অনার্য অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় লোকায়ত সমাজের মানুষেরা প্রকৃতি পূজক, বৌদ্ধ বা লোকধর্মে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে আর্যদের বৈদিক যজ্ঞ বা জটিল স্মার্ত বিধি-বিধানের তোয়াক্কাই করত না। এ দেশের সমাজকে আধ্যাত্মিক ও সামাজিকভাবে দাসত্বে বাঁধার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল একদল কট্টরপন্থী, অনুগত ও ধূর্ত পুরোহিত শ্রেণী। কিন্তু বাংলার তৎকালীন প্রাকৃত সমাজে তেমন কোনো আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিত ছিলেন না, যারা রাজার এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করতে পারেন। ফলে, সেন রাজারা এ দেশের হাজার বছরের ইতিহাসকে লুণ্ঠন করার জন্য এক অভূতপূর্ব চক্রান্তের আশ্রয় নিলেন। তারা উত্তর ভারতের কনৌজ অঞ্চল থেকে বৈদিক যজ্ঞকর্মে পারদর্শী পাঁচজন কট্টর আর্য ব্রাহ্মণ এবং তাদের অনুগত পাঁচজন কায়স্থকে বিপুল ধনসম্পদ ও ভূমির লোভ দেখিয়ে বাংলায় আমদানি করলেন (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ৯৯-১০৬)।
কনৌজ থেকে এই বহিরাগত ব্রাহ্মণদের আমদানি করার মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল, এ দেশের মাটির সন্তানদের অবচেতনে এক গভীর নান্দনিক ও সামাজিক হীনম্মন্যতার বীজ বুনে দেওয়া। এই আমদানিকৃত আর্য পুরোহিতেরা এ মাটিতে পা রেখেই রাজার প্রত্যক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় এক কাল্পনিক মেটা-ন্যারেটিভ বা ছদ্ম-ইতিহাস প্রচার করতে শুরু করলেন। তারা ঘোষণা করলেন, উত্তর ভারতের আর্য ধারার বাইরে এ দেশের মানুষের নিজস্ব কোনো সভ্যতা, কৃষ্টি বা আধ্যাত্মিক মেধা নেই। যা কিছু লোকায়ত বা প্রাকৃত—তার সবকিছুই হলো ‘অসভ্য’ এবং ‘নিকৃষ্ট’ (শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ৯-১৩; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩৫-২৪২, ২৪৭; ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ৪-৬)। তারা এ দেশের প্রাচীন সমতাবাদী সমাজকে আর্যাবর্তের কচ্ছপ-গতির স্থবির বর্ণাশ্রমের খাঁচায় বন্দি করার জন্য স্মৃতিশাস্ত্র ও নব্য-ন্যায়ের নিগড় তৈরি করলেন। কনৌজের এই বহিরাগত এলিটরা এ দেশের মানুষের মুখের প্রাকৃত ভাষাকে নিষিদ্ধ করার প্রথম যে প্রাতিষ্ঠানিক খসড়া তৈরি করেছিলেন, তার মূল লক্ষ্যই ছিল সাধারণ মেহনতি মানুষকে শিক্ষার অধিকার এবং সামাজিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করা। যাতে রাজার রাজনৈতিক ক্ষমতা একচ্ছত্র ও চিরস্থায়ী বুনিয়াদ লাভ করতে পারে (শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ৯৪-১০০; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩৫-২৪২, ৩৩৮)।
কুলীন প্রথা: বাংলার প্রথম সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘আপার্থাইড’
কনৌজের সেই বহিরাগত ব্রাহ্মণদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরামর্শে রাজা বল্লাল সেন বাংলার সমাজে যে কুখ্যাত সামাজিক ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জারি করেছিলেন, ইতিহাসের পাতায় তা ‘কৌলীন্য প্রথা’ বা কুলীন প্রথা নামে পরিচিত। এই কুলীন প্রথা কোনো সাধারণ সমাজ সংস্কার ছিল না। এটি ছিল মূলত এ দেশের বৃহৎ লোকায়ত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর্য এলিটদের চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের প্রথম ও নির্মমতম প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী আপার্থাইড (Institutional Caste Apartheid)। বল্লাল সেন সুনির্দিষ্ট কিছু কৃত্রিম গুণের দোহাই দিয়ে সমাজকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘কুলীন’, ‘শ্রোত্রিয়’ এবং ‘বংশজ’ বা গৌণ কুলীন—এমন অসংখ্য উঁচু-নিচু জাতের টুকরো টুকরো শৃঙ্খলে খণ্ডিত করে দিলেন (শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ৮৮-৯০; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২১১-২১৩, ২৩০-২৩১)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কনৌজ থেকে আসা বহিরাগত ব্রাহ্মণ এবং তাদের অনুগত এলিট শ্রেণী নিজেদের সমাজের সর্বোচ্চ ঈশ্বরতুল্য ‘কুলীন’ বা পবিত্রতম আসনে আসীন করলেন। আর এ দেশের মাটির আসল সন্তান, যারা হাজার বছর ধরে কর্ষণ করে এই বদ্বীপকে সুজলা-সুফলা বানিয়েছিল—তাদেরকে সমাজের সবচেয়ে নিচু, অস্পৃশ্য এবং অপবিত্র অন্ত্যজ বা ‘অধম-সংকর’ শ্রেণীতে ঠেলে দিলেন।
এই কুলীন আপার্থাইডের মূল মনস্তাত্ত্বিক কারসাজিটি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তা মানুষের ঘরের ভেতরের আত্মীয়তা, বিয়ে এবং রক্তের সম্পর্কের ওপর এক কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কোনো নিম্নবর্ণের অনার্য বা ব্রাত্য মানুষ যেন কোনোদিনও শিক্ষা বা মেধার জোরে এই উচ্চবর্ণের এলিটদের প্রিভিলেজ বা একচেটিয়া সুযোগ-সুবিধার আঙিনায় প্রবেশ করতে না পারে, এর জন্য তারা বিয়ের সম্পর্কের ওপরও কঠোর কৌলীন্য প্রথার লোহার প্রাচীর তুলে দিল। এর ফলে উচ্চবর্ণের সমাজে বহুগামিতার মতো এক জঘন্য ও কুৎসিত সামাজিক ব্যাধির জন্ম হয়েছিল। যেখানে একজন বৃদ্ধ কুলীন ব্রাহ্মণ কেবল নিজের জাত ও সামাজিক মর্যাদা ব্যবসার নামে শত শত অল্পবয়সী কিশোরী মেয়েকে রমণ করত। এই কৌলীন্য প্রথার মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল, বাংলার মানুষের ভেতরের জন্মগত ভাষিক ও সামাজিক ঐক্যকে চিরতরে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া। তারা সমাজকে এমনভাবে খণ্ডিত করে দিয়েছিলেন, যেন মেহনতি মানুষেরা কোনোদিনও একজোট হয়ে এই বহিরাগত সেন রাজন্যবর্গ এবং তাদের আমদানিকৃত আর্য পুরোহিতদের শোষণের বিরুদ্ধে কোনো সম্মিলিত লৌকিক প্রতিরোধ বা বিদ্রোহ গড়ে তুলতে না পারে (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩৪-২৩৫, ২৪০-২৪২; ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ১৮০-১৮৫)।
এথনিক শেইমিং এবং প্রান্তিক সমাজ-শ্রমিকদের ক্ষমতা উচ্ছেদ
সেন রাজাদের এই বর্ণবাদী আপার্থাইড কেবল মানুষের সামাজিক মর্যাদা কেড়েই ক্ষান্ত হয়নি; এ দেশের প্রান্তিক সমাজ-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের পেশা ও উৎপাদন-প্রক্রিয়াকে সুপরিকল্পিতভাবে শাস্ত্রীয় অনুশাসনে ‘অপবিত্র’ ও নিচু বলে দাগিয়ে দিয়ে এক তীব্র এথনিক শেইমিং (Ethnic Shaming)-এর জন্ম দিয়েছিল। আর্য পুরোহিতেরা তাদের রচিত বিভিন্ন স্মৃতি-সংহিতা এবং তান্ত্রিক স্মৃতিশাস্ত্রে স্পষ্ট বিধান জারি করলেন, যারা হাত দিয়ে শ্রম দেয়, যারা লাঙল চালায়, যারা জাল ফেলে মাছ ধরে, কিংবা যারা মাটির পাত্র তৈরি করে—তারা সবাই হলো ‘অধম’ এবং তাদের ছোঁয়া জল বা খাদ্য গ্রহণ করলে উচ্চবর্ণের আর্যদের পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাবে (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২২৯-২৩১; শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৮১)। এই প্রক্রিয়াই হলো এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা ঔপনিবেশিক নান্দনিকতার সেই আদিমতম রূপ। যেখানে এ দেশের শোষিত সমাজ-শ্রমিকদের মন ও মগজকে এমনভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল, যেন তারা নিজেদের দৈনন্দিন উৎপাদন-মেধাকেই ‘পাপ’ বা নিকৃষ্ট বলে অবচেতনে তীব্র লজ্জা বোধ করতে শুরু করে (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫১-২৫৩, ৭১০-৭১১; শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ১৮৬-১৯০)।
তারা শুধু মানুষের জমি, ফসল বা শ্রমের উদ্বৃত্ত অংশ লুণ্ঠন করেনি; তারা প্রথম ও দীর্ঘমেয়াদী আঘাতটি হেনেছিল মানুষের আত্মপরিচয়ের ওপর। যাতে অনার্য লোকায়ত সমাজ নিজেদের গৌরবময় স্বাধীন অতীত ভুলে গিয়ে আর্যদের এই ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্রেষ্ঠত্বকে দৈব ও চিরন্তন বলে মেনে নেয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক নিগড়ের ফলেই বাংলার বৌদ্ধ এবং অনার্য সমাজের মানুষেরা সেন আমলে এক চরম দমবন্ধ করা সামাজিক খাঁচায় আটকা পড়েছিলেন। যেখানে মানুষের জীবনের চেয়ে শাস্ত্রের কৃত্রিম নিয়মের মূল্য ছিল অনেক বেশি। এই যে মেহনতি মানুষের ক্ষমতা উচ্ছেদ এবং তাদের সংস্কৃতির ওপর আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণীয় অহমিকার সর্বগ্রাসী চেপে বসা—এটিই ছিল এই মাটির প্রাচীনতম ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপ’-এর এক নির্মম ঐতিহাসিক বুনিয়াদ। এই চতুর মনস্তাত্ত্বিক খাঁচাকে আড়াল করার জন্যই পরবর্তীকালের কলকাতার ভদ্রলোকি ইতিহাসবিদেরা সেন আমলকে ‘বাঙালি সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ’ বলে মেটা-ন্যারেটিভ প্রচার করেছেন। যা আসলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের অর্গানিক ইতিহাসকে চিরতরে সমাহিত করার এক প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তিক চক্রান্ত বৈ কিছু নয় (Partha Chatterjee, The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories, Princeton University Press, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৯)।
সামাজিক গতিশীলতা স্তব্ধকরণ এবং স্মার্ত অনুশাসনের লৌহপ্রাচীর
দক্ষিণাত্যের বহিরাগত সেন রাজারা এ দেশের ক্ষমতা দখল করার পর যে শাসনযন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন, তার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটি ছিল মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক গতিশীলতাকে (Social Mobility) আইনি ও ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। বলা যায়, বর্তমান আলেম-উলামা ও ইসলামপন্থীদের সাথে শাসনযন্ত্রের দমনপীড়ন সেই নিষ্ঠুরতম সমাজ ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করণ। পাল বংশের দীর্ঘ চারশ বছরের শাসনামলে বাংলার সমাজ কিন্তু কোনো অচল বা জমাটবদ্ধ বরফখণ্ড ছিল না। সে আমলে একজন সাধারণ কৃষক বা কৈবর্ত মৎস্যজীবীও নিজের মেধা, শ্রম এবং যোগ্যতার জোরে সমাজের উপরের স্তরে উঠে আসতে পারতেন। এমনকি শাসনকাজেও বড় ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু কর্ণাটকের সেন শাসকেরা এ মাটিতে এসে মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পথটিকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলেন। তারা সমাজকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এমন কিছু অলঙ্ঘনীয় ও কঠোর আইনের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেললেন, যার ফলে মানুষের মেধা বা যোগ্যতার কোনো মূল্য রইল না। একজন মানুষ সমাজে কতটা সম্মান পাবেন বা কী ধরনের কাজ করবেন, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হলো তার জন্মের পরিচয় দিয়ে। এই অনড় সামাজিক স্থবিরতা এ দেশের লোকায়ত সমাজকে ভেতর থেকে পঙ্গু করার এক সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক কলোনিয়ালিজম ছিল। যা সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্নকে গোড়াতেই চূর্ণ করে দেয় (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২২৫-২২৮, ৩৯৪-৩৯৬, ৬৯৮-৭০০, ৭১০-৭১১; শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ৮৮-৯০)।
এই সামাজিক খাঁচাটিকে আইনি বুনিয়াদ দেওয়ার জন্য তারা আর্যাবর্তের কট্টর স্মার্ত আইনকানুন এবং স্মৃতিশাস্ত্রের অনুশাসনকে বাংলার ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিলেন। সেন রাজাদের রাজদরবারে বসে আমদানিকৃত আর্য পণ্ডিতেরা এমন সব সামাজিক নিয়মকানুন তৈরি করতে শুরু করলেন, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রাত্যহিক যাপিত জীবনকে এক গভীর দমবন্ধ করা সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, বল্লাল সেনের তৈরি করা নতুন সামাজিক বিধানে ঘোষণা করা হলো, নিম্নবর্ণের কোনো মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় মর্যাদা বলতে কিছু থাকবে না। উচ্চবর্ণের এলিটদের সামনে তাদের সাষ্টাঙ্গে অবনত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। উচ্চবর্ণের মানুষেরা যে পুকুর বা জলাশয়ের জল ব্যবহার করবেন, এ দেশের মূল অধিবাসী তথা ব্রাত্য জনসমষ্টির জন্য সেই জলের অধিকার সম্পূর্ণ ‘জল-অচল’ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। শুধু তাই নয়, তারা কোনো ধাতব পাত্র ব্যবহার করতে পারবে না, গ্রামের বাইরে ভাঙা কুটিরে থাকবে এবং নারীরা কেবল লোহার অলঙ্কার পরতে বাধ্য থাকবে। এই অনড় সামাজিক স্থবিরতা এ দেশের লোকায়ত সমাজকে ভেতর থেকে পঙ্গু করার এক সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক কলোনিয়ালিজম ছিল, যা সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার কেড়ে নেয় (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩৫-২৩৮, ৭১০-৭১১; Sukumar Dutt, Problem of Caste and Identity: The Namasudras of Colonial India, IJSR, পৃষ্ঠা ৫-৬; Partha Chatterjee, The Nation and Its Fragments, Princeton University Press, পৃষ্ঠা ১৭৩-১৭৬)। এই যে জীবনকে প্রতি পদে পদে অপমান এবং শৃঙ্খলের মধ্যে বন্দি করার রাজতান্ত্রিক কৌশল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল এ দেশের আদি বাসিন্দাদের অবচেতনে এই স্থায়ী ধারণা গেঁথে দেওয়া যে, তারা জন্মগতভাবেই স্বাধীন শাসনের অনুপযুক্ত এবং উচ্চবর্ণের সেবা করার জন্যই তাদের এই পৃথিবীতে জন্ম হয়েছে।
স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দনের নব্য-স্মৃতি এবং ‘বজ্রবন্ধন’ জালিয়াতির ব্যবচ্ছেদ
সেন রাজবংশের সূচিত এই মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবরদখলকে পরবর্তীকালে যে পণ্ডিতেরা সবচেয়ে নিখুঁত ও তাত্ত্বিকভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে নবদ্বীপের স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দনের তৈরি করা ‘নব্য-স্মৃতি’ (Navya-Smriti) এবং নতুন স্মৃতিশাস্ত্রের অনুশাসন ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। রঘুনন্দন এমন এক সূক্ষ্ম ও অপ্রাকৃতিক জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতির (Epistemic Forgery) ফাঁদ পাতেন, যা বাংলার লোকায়ত সমাজকে এক নিশ্ছিদ্র ‘বজ্রবন্ধনে’ আবদ্ধ করে ফেলেছিল। তিনি পুণ্যফল, পরকালের চিরস্থায়ী সুখ, এবং ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের এক কাল্পনিক ও লোভনীয় মেটা-ন্যারেটিভ তৈরি করলেন। এই পরকালীন লোভের সমান্তরালে তিনি সাধারণ মানুষের ওপর অজস্র সামাজিক বিধিনিষেধ, ব্রত, এবং প্রায়শ্চিত্তের কঠোর নিয়ম আরোপ করে মানবজীবনকে অনুষ্ঠান-ক্লিষ্ট এবং চরম আড়ষ্ট করে তুললেন।
রঘুনন্দনের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতি কোনো বায়বীয় তত্ত্ব ছিল না; একে চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত স্মার্ত সংহতি। যা ইতিহাসে ‘অষ্টবিংশতিতত্ত্ব’ (২৮টি সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম) নামে পরিচিত। এই ২৮টি তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তের যাপিত জীবনকে—যার মধ্যে উৎসব ও রক্তের সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত—কট্টর বর্ণবাদী বিধিনিষেধের নিগড়ে বেঁধে ফেলেছিলেন এবং আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণীয় প্রিভিলেজ রক্ষা করার এক সর্বগ্রাসী ও দমনমূলক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ, মলমাসতত্ত্ব বিধান। রঘুনন্দন তাঁর ‘স্মৃতিতত্ত্ব’ গ্রন্থের শুরুতেই ‘মলমাসতত্ত্ব’ বিধানের মাধ্যমে বাংলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও লৌকিক যাপিত জীবনের ওপর এক করাল আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্জিকার চান্দ্র ও সৌর মাসের হিসেব মিলিয়ে যে ‘অধিক মাস’ বা মলমাস আসত, সেটিকে তিনি ধর্মীয়ভাবে ‘অপবিত্র’ বলে ঘোষণা করেন। তৎকালীন সমাজের প্রাকৃত ও লোকায়ত মেহনতি মানুষের সমস্ত ঐতিহ্যবাহী উৎসব, কৃষিভিত্তিক ব্রত, এবং সামাজিক মেলামেশাকে ওই সুনির্দিষ্ট মাসে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ’ ও নিষিদ্ধ করে দেন। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ বা সামাজিক মেলবন্ধন কখন ঘটবে, তা ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে সম্পূর্ণভাবে স্মার্ত ব্রাহ্মণদের গাণিতিক পঞ্জিকার কঠোর ‘টাইম-টেবিল’-এর অধীনে বন্দি করা হলো।
এরই সমান্তরালে, মানুষের আত্মমর্যাদাকে অবচেতনে চূর্ণ করার জন্য তিনি জারি করলেন তাঁর সবচেয়ে নির্মম সামাজিক আপারথাইডের অস্ত্র ‘শুদ্ধিতত্ত্ব’। এই বিধানে জন্ম, মৃত্যু এবং ছোঁয়াছুঁয়ির পর ‘শুদ্ধ’ বা পবিত্র হওয়ার এমন এক বৈষম্যমূলক নিয়ম তৈরি করলেন, যেখানে স্পষ্ট ঘোষণা করা হলো—‘কলিতে মাত্র দুটি বর্ণ; ব্রাহ্মণ ও শূদ্র’। এর মাধ্যমে বাংলার সমস্ত দেশজ উৎপাদনকারী মেহনতি ও প্রাকৃত শ্রেণীকে এক লহমায় ‘শূদ্র’ ঘোষণা করা হলো। আর এই ঘোষণার সঙ্গেই এল অশৌচকালের চরম বৈষম্য। যদি কোনো উচ্চবর্ণের (ব্রাহ্মণ) মানুষের মৃত্যু হয় বা সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তবে তাঁর ‘অপবিত্রতা’ কাটাতে সময় লাগত মাত্র ১০ দিন। কিন্তু একই ঘটনায় শূদ্র ঘোষিত এই মেহনতি মানুষগুলোর জন্য নির্ধারিত সময় দেওয়া হলো ৩০ দিন। অর্থাৎ, একই সামাজিক ঘটনার জন্য নিম্নবর্ণের মানুষকে উচ্চবর্ণের তুলনায় তিনগুণ বেশি সময় ‘অপবিত্র’ বা ‘জল-অচল’ (যেমন—নিজের ঘরের কাজ, রান্না, বা সমাজের অন্য সবার সাথে মেলামেশা থেকে বিচ্ছিন্ন) থাকতে হতো। এই তীব্র এথনিক শেইমিং (Ethnic Shaming) মেহনতি মানুষের মনে নিজেদের পেশা ও অস্তিত্বের প্রতি এক গভীর অবচেতন গ্লানি বুনে দিয়েছিল।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিলো উদ্বাহতত্ত্ব ও নারী নির্যাতন আইন। মানুষের ঘরের ভেতরের রক্তের সম্পর্ক এবং নারীর শরীরকে আজীবন পঙ্গু করে রাখার স্মার্ত খাঁচা হিসেবে কাজ করেছিল তাঁর ‘উদ্বাহতত্ত্ব’। এই বিধানে কন্যার ঋতুদর্শনের আগেই, মাত্র আট বছর বয়সে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে বিয়ে দেওয়ার ‘গৌরীদান’ নিয়ম জারি করা হয়। যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল নারীদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা বা মেধা বিকাশের সুযোগ গোড়াতেই চূর্ণ করে দেওয়া। কোনো কন্যা যদি সেই নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিবাহ বসতে না পারত, তবে তার পুরো পরিবারকে ‘জাতিচ্যুত’ বা সমাজচ্যুত করার এক সর্বগ্রাসী আইনি খড়গ ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। যা তৎকালীন গ্রামীণ পরিবারগুলোকে এক সামাজিক আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দেয়। এই জাতিচ্যুতির ভয় এতটাই ভয়ানক ছিল যে, মানুষ নিজেদের সামাজিক মর্যাদা ও ঘরের সম্মান রক্ষা করার জন্য আর্যদের এই কৃত্রিম ও নিষ্ঠুর অনুশাসনের সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হতো। একই সাথে তিনি বিয়ের সম্পর্কের ওপর এমন কঠোর ‘সগোত্র বর্জন’ ও কুলীন প্রথার লৌহপ্রাচীর তুলে দেন, যাতে নিম্নবর্ণের কোনো ব্রাত্য মানুষ কোনোদিনও উচ্চবর্ণের রক্তের সাথে মিশে তাদের একচেটিয়া সামাজিক ক্ষমতার অংশীদার হতে না পারে। এই উদ্বাহতত্ত্বের কঠোর সংকীর্ণতাই পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণের সমাজে ‘বহুগামিতা’ এবং ‘প্যাডোফাইল’-এর মতো জঘন্য ও কুৎসিত সামাজিক ব্যাধির জন্ম দিয়েছিল। যেখানে একজন বৃদ্ধ কুলীন কেবল সামাজিক মর্যাদা ব্যবসার নামে শত শত কিশোরী মেয়েকে রমণ করত।
রঘুনন্দনের এই স্মৃতিশাস্ত্রের নিষ্ঠুরতম কুফলটি চূড়ান্তরূপে প্রকাশ পেয়েছিল বাংলার নারীদের যাপিত জীবনের ওপর। তিনি হিন্দু সমাজকে আড়ষ্ট রাখার উদ্দেশ্যে সতীদাহ প্রথাকে এক পরম পবিত্র পুণ্যকর্ম হিসেবে শাস্ত্রের মোড়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর জ্বলন্ত চিতায় জীবন্ত স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার এই জঘন্য প্রথাকে আর্য পণ্ডিতেরা এমন এক নান্দনিক ও স্বর্গীয় মহিমায় রাঙিয়ে দিলেন যে, সাধারণ মানুষের অবচেতনে এটি এক পরকালীন মুক্তি ও পুণ্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় রূপ নিল। রঘুনন্দনের এই ‘অষ্টবিংশতিতত্ত্ব’ আসলে কোনো ধর্মানুশীলন ছিল না; এটি ছিল পাল আমলের সহনশীল লোকায়ত ও বৌদ্ধ সমাজকাঠামোর শেষ অবশেষকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়ে আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণীয় এলিটদের প্রতি মেহনতি মানুষকে নিঃশর্তভাবে অনুগত করার এক সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক চক্রান্ত। রঘুনন্দনের এই অনুষ্ঠান-ক্লিষ্ট বজ্রবন্ধন বাংলার মানুষের চিন্তা ও মেধার স্বাধীনতাকে শত শত বছর ধরে এমন এক অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রেখেছিল, যা এ দেশের মানুষকে নিজের ভূমিতেই এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক দাসে পরিণত করে। এই কৌলীন্য প্রথা এবং স্মার্ত অনুশাসনের অমোঘ পরিণতিতেই পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণের সমাজে বহুগামিতা, কচিগামিতা এবং সতীদাহের মতো জঘন্য ব্যাধিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বুনিয়াদ লাভ করে। সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্নকে গোড়াতেই চূর্ণ করে দেয় (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ৯৯-১০৬; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩৫-২৩৮, ৬১৪-৬১৬; Partha Chatterjee, The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories, Princeton University Press, পৃষ্ঠা ১৭৩-১৭৬)। ১৯ শতকের হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের জাগরণ বা তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁস থেকে ওঠে আসা জনসমাজ এবং বাবু সংস্কৃতির কলকাতার ভদ্রলোক ও তাদের সমমনা এ দেশের কথিত সুশীল সমাজ যে আর্যাবর্তের স্বপ্ন দেখেন, যে রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইউটোপিয়া যুগযুগ ধরে তাদের বুকে, এই হলো সেই রাজ্যের আইনি কাঠামোর কিছু নমুনা।
দেবদাসী ও কুলীন প্রথা: রঘুনন্দন-পরবর্তী বর্ণাশ্রমের করুণ উপাখ্যান
রঘুনন্দনের তৈরি কঠোর বর্ণাশ্রম ও স্মার্ত অনুশাসনের অমোঘ পরিণতির একটি অন্ধকার দিক ছিল—দেবদাসী প্রথার মতো প্রাতিষ্ঠানিক যৌন দাসত্ব এবং বাংলায় কুলীন ব্রাহ্মণদের বহুবিবাহের চূড়ান্ত বিকৃতি। যদিও রঘুনন্দনের সংহিতায় সরাসরি দেবদাসী প্রথার বিধান ছিল না, তবু তাঁর কঠোর জাতিভেদ ব্যবস্থা নিম্নবর্ণের মানুষকে এতটাই ক্ষমতাহীন ও অস্পৃশ্য করে দিয়েছিল যে, উচ্চবর্ণের পুরুষরা ধর্মীয় আবরণে নারীদের ওপর যেকোনো অত্যাচার চালাতে পারতেন (Partha Chatterjee, The Nation and Its Fragments, Princeton University Press, ১৯৯৩, অধ্যায় ৬ ও ৯, পৃষ্ঠা ১১৬-১৩৪ ও ১৭৩-১৮১)। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকদের গবেষণায় প্রমাণিত যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে ধর্মের নামে নারীদের যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও চুক্তিহীন ভোগের সামগ্রী করা হয়েছিল, তার সমতুল্য উদাহরণ ইতিহাসে বিরল (Tameshnie Deane, The Devadasi System: An Exploitation of Women and Children in the Name of God, Journal of International Women's Studies, Bridgewater State University, Vol 24, ২০২২, পৃষ্ঠা ২-১০)।
বিয়ে ছাড়াই ঈশ্বরের নামে হাজার হাজার নারী ভোগের সুবর্ণ সুযোগ ছিলো দেবদাসী প্রথা। এ প্রথার মূল দর্শনই ছিল এমন—যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক বিয়ে, দাম্পত্য অধিকার বা স্ত্রীর মর্যাদা ছাড়াই হাজার হাজার নারীকে আজীবন উচ্চবর্ণের পুরুষদের লালসা মেটানোর জন্য মন্দিরে বন্দি রাখা হতো (Deane, ২০২২, পৃষ্ঠা ৩-৪)। মাত্র ৪ থেকে ৫ বছর বয়সী অবুঝ বালিকাদের ‘পত্তুকাট্টু’ (Pottukattu) নামক ছদ্ম-বিবাহের মাধ্যমে দেবতার সাথে ‘বিয়ে’ দিয়ে মন্দিরে উৎসর্গ করা হতো। বিশ্বাস করানো হতো যে, তারা চিরকাল কুমারী থাকবে এবং দেবতার সেবা করবে, আর এর বিনিময়ে তাদের পরিবার পুণ্য লাভ করবে (Manu Sharma, “Divine Shadows: Indian Devadasis between Religious Beliefs and Sexual Exploitation”, in Ruspini, Bonifacio & Corradi (eds.), Women and Religion, Policy Press, ২০১৮, পৃষ্ঠা ৭৯-৮৩)।
ঐতিহাসিক এম. সি. টরির (Torri, ২০০৯) গবেষণা অনুযায়ী, "একজন দেবদাসী নির্দিষ্ট কোনো স্বামীর একক সম্পত্তি নন, বরং তিনি মন্দিরের সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত হন"। বাস্তব ক্ষেত্রে এর অর্থ ছিল মন্দিরের প্রধান পুরোহিত (ঠাকুর), পাণ্ডা এবং স্থানীয় উচ্চবর্ণের সামন্তপ্রভুরা পুণ্য অর্জনের অজুহাতে এই মেয়েদের নির্বিচারে ভোগ করত (M. C. Torri, “Abuse of Lower Castes in South India: The Institution of Devadasi”, Journal of International Women's Studies, Vol 11(2), ২০০৯, পৃষ্ঠা ৩১-৪৮)। সমাজবিজ্ঞানী শঙ্কর (Shankar, ১৯৯৪) এবং হার্টম্যানের (Hartmann, ২০১৯) গবেষণায় দেখা যায়, ভারতের কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে এই প্রথার মাধ্যমে প্রায় ২,৫০,০০০ মেয়েকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ভয় দেখিয়ে সেবাদাসী ও যৌন দাসী বানিয়ে রাখা হয়েছিল। এটা অতীতের কোনো হিসেব নয়। আধুনিক ভারতের পরিসংখ্যান ও চিত্র এটি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৮২ সাল—এই ৩৫ বছরের মধ্যে কর্ণাটক ও দক্ষিণ মহারাষ্ট্রের মন্দিরগুলোতে প্রায় আড়াই লাখ মেয়েকে দেবদাসী হিসেবে উৎসর্গ করা হয়েছিল। এই সময়সীমাটি পরবর্তী গবেষকরা (যেমন Hartmann, ২০১৯) তাদের লেখায় উল্লেখ করেছেন (Shankar, Devadasi Cult: A Sociological Analysis, Ashish Publishing House, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ২১-৩০; Hartmann, The Devadasi: Female Slaves in Modern India, HART UK, ২০১৯)। দেবদাসীদের মানুষের সাথে বিয়ে হওয়া আইনত নিষিদ্ধ। ফলে তারা আজীবন অবিবাহিত থাকেন এবং পুরুষদের কাছ থেকে কোনো স্ত্রীর আইনি বা সামাজিক অধিকারও পান না। তাদের সন্তানদের কোনো পিতৃপরিচয় থাকে না, যা তাদের সমাজচ্যুত করে রাখে (Deane, ২০২২, পৃষ্ঠা ৮-১০)। অথচ এই নারকীয় প্রথাকে কথিত প্রগতিশীল সমাজ কখনোই ‘বহুগামিতা’ বা ‘যৌন দাসত্ব’ বলতে চায় না, বরং একে ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে আড়াল করতে পছন্দ করে। আধুনিক ইতিহাসচর্চায় প্রায়শই দেবদাসীদের কেবল ‘মন্দিরের নৃত্যশিল্পী’ বা ভারতনাট্যমের আদি ধারক-বাহক হিসেবে মহিমান্বিত করে তাদের মূল যৌন দাসত্বকে উপেক্ষা করা হয় (Sage Journals, “From Devadasis to Prostitutes: Institutionalized Slavery Discourse”, ২০২৫)।
রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের নব্যস্মৃতি যখন বাংলায় ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব চরম সীমায় নিয়ে যায়, তার পরবর্তী সময়ে (১৮ ও ১৯ শতকে) বাংলায় ‘কুলীন প্রথা’, গৌণ-কুলীন ও নিম্নবর্ণের অসহায় নারীদের রমণে এক বিভীষিকাময় রূপ নেয়। কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের মর্যাদা বজায় রাখার জন্য নিম্ন-স্তরের ব্রাহ্মণরা বিপুল পরিমাণ অর্থ (পণ) দিয়ে কুলীন পাত্রের সাথে মেয়েদের বিয়ে দিত। এর ফলে বিয়ে একটি উপার্জনের ব্যবসায় পরিণত হয়। ১০ থেকে ১২ বছরের এক একজন কুলীন কিশোর ২০ বছর পার হওয়ার আগেই ৫০ থেকে ১০০টি বিয়ে করে ফেলত (Gender, Caste and Marriage: Kulinism in Nineteenth Century Bengal, Academia.edu)। ১৮৭১ সালে ঢাকার ডেপুটি কালেক্টরের এক সরকারি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়—বিক্রমপুরের এক কুলীন ব্রাহ্মণের ১০০ জনেরও বেশি স্ত্রী ছিল, এবং তার তিন ছেলের যথাক্রমে ৫০, ৩৫ এবং ৩০ জন করে স্ত্রী ছিল (ঐতিহাসিক দলিল, ১৮৭১ সালের ডেপুটি কালেক্টর রিপোর্ট, ঢাকা)। এই হাজার হাজার স্ত্রীদের কখনোই স্বামীর ঘরে আনা হতো না। তারা বাপের বাড়িতেই পড়ে থাকত। স্বামীরা বছরে একবার বা দুইবার শ্বশুরবাড়িতে আসত কেবল টাকা বা উপহার আদায় করতে; অনেক সময় স্ত্রীর মুখও মনে রাখতে পারত না (Shankar, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ৪৫-৫০)।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৭১)-এ কুলীনদের এই নারকীয় বহুবিবাহের বিস্তারিত পরিসংখ্যান ও নামধামসহ তালিকা তুলে ধরেছিলেন (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না, ১৮৭১; পুনঃপ্রকাশিত, সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার)। বিদ্যাসাগর দেখিয়েছিলেন, বিবাহবিচ্ছেদের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এবং এই তথাকথিত ‘সাত জন্মের অলঙ্ঘনীয় বন্ধন’-এর মারপ্যাঁচে পড়ে হাজার হাজার কুলীন নারী বাধ্য হয়ে আত্মহনন অথবা জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তির অন্ধকার পথ বেছে নিতে বাধ্য হতেন। কারণ স্বামী মারা গেলে তাদের হয় সতীদাহের নামে আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো, অথবা আজীবন বিধবা বানিয়ে মানসিকভাবে হত্যা করা হতো (Chatterjee, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৩২-১৩৪)।
বর্তমান যুগের একশ্রেণীর প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী এবং হিন্দু ধর্মের অনেকেই যখন ইসলামের বহুবিবাহ (সর্বোচ্চ ৪ জন) এবং তালাক (ডিভোর্স) প্রথা নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন, তখন তারা ইতিহাসের এই বিশাল কালো অধ্যায়কে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। তারা এটা দেখেন না, তাদের ধর্ম (কারও ইউটোপিয়া রাজ্যের ধর্ম) বিয়ে ছাড়াই, আইনি বৈধতা ও দায়িত্ব গ্রহণের তোয়াক্কা না করেই শতশত নারী রমণের অনুমোদন দিচ্ছে। যে ধর্মে বিয়ে ছাড়া দেবদাসী, বা অন্য ধর্মের নারীকে হিজাবি দাসী বানিয়ে হাজার হাজার নারী ভোগের সুযোগ আছে, যেখানে বিয়েই নেই, সেখানে তালাক বা বহুবিবাহের প্রশ্ন আসবে কেন?
ইসলামে একাধিক বিয়ে (সর্বোচ্চ ৪টি) করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত কঠোর শর্তে, যেখানে প্রত্যেক স্ত্রীর সমান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শারীরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হয় (সুরা নিসা ৩:৩)। এটি একটি আইনি চুক্তি, যেখানে সন্তানরা বৈধ উত্তরাধিকার পায়। অথচ দেবদাসী প্রথা বা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় উচ্চবর্ণের পুরুষদের জন্য ২, ৩ বা ৪ জন নয়, বরং হাজার হাজার নারীকে কোনো সামাজিক দায়িত্ব বা বিয়ে ছাড়াই ভোগ করার ধর্মীয় ছাড়পত্র আছে। যেহেতু সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক "বিয়ে" নাই, তাই পুরুষদের ওপর কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক দায়ও চাপে না (Torri, ২০০৯, পৃষ্ঠা ৩৫-৪০)।
কিন্তু ইসলামের বৈবাহিক সম্পর্ক এরকম নয়। একসাথে থাকার, একে অন্যের দায়িত্ব আদায়ের অনেক বিষয় আছে। হতে পারে এই যাত্রা পথে কোনো দাম্পত্য জীবন নরকতুল্য হয়ে যাবে, একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারবে না, জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতার অন্তর্ভুক্ত এমন ঘটা। তাই ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়কেই আইনি উপায়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার (তালাক বা খোলা) অধিকার দিয়েছে। যাতে তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে। কিন্তু সনাতন হিন্দু আইনে (১৯৫৫ সালের হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্টের আগে) বিবাহবিচ্ছেদের কোনো ধারণাই ছিল না। বিয়েকে মনে করা হতো ‘সাত জন্মের অলঙ্ঘনীয় বন্ধন’। এর কারণ ছিলো পুরুষের স্বেচ্ছাচারী ভোগবাদ চালিয়ে যাওয়ার রাস্তা নিষ্কণ্টক রাখা। যার ফলে কুলীন ব্রাহ্মণের ১০০ জন স্ত্রীর একজন যদি স্বামীর অবহেলা বা শোষণে মারাও যেত, তার তালাক নেওয়ার কোনো পথ ছিল না। কিন্তু কুলীন ব্রাহ্মণ—ছেলে হোক বা যুবক হোক, পৌড় হোক বা বৃদ্ধ হোক—যত্রতত্র, যখন তখন অবলীলায় যাকে ইচ্ছে বিয়ের নামে ভোগ করে যেতে পারতো। তালাকের আইন নাই, তাই অন্য পুরুষ ওই নারীকে বিয়েরও সুযোগ ছিলো না। তাকে নির্দিষ্ট পুরুষের স্ত্রী পরিচয় নিয়েই বাঁচতে হতো, যার সে রিজার্ভ দাসী। ব্রাহ্মণের এরকম শতশত রিজার্ভ দাসীতে পাড়ামহল্লা গিজগিজ করতো। পুরো দেশ যেনো একজন ব্রাহ্মণ বা কুলীন পুরুষের উন্মুক্ত যৌনালয়, ব্যক্তিগত হেরেম বা খাস মহল। যেখানে তালাক না থাকার সুফল ভোগ করতো পুরুষ, নির্যাতনের শিকার হতো নারী। এটাই তাদের সেই রামরাজ্য গড়ার ইউটোপিয়া, যেখানে উন্মুক্ত দাসীপ্রথা আর ধর্মীয় অনুশাসনের নামে চলবে প্রাতিষ্ঠানিক বেশ্যাবৃত্তি। পবিত্রতার ভণ্ড মুখোশ পরে আজীবন বাসরহীন ঘরে কুমারী কিংবা বিধবার মতো বেঁচে থাকাই হবে নারীদের নিয়তি। আর পুরুষতান্ত্রিক এই নরককুণ্ডকে টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি হবে বিবাহবিচ্ছেদহীন সেই নিষ্ঠুর শাস্ত্রীয় আইন, যা নারীকে আজীবন এক অদৃশ্য শিকলে বেঁধে রাখতে পারে (Sharma, ২০১৮, পৃষ্ঠা ৮৫-৮৮)। আধুনিক সমালোচকরা ইসলামের ৪ বিয়ের আইনি কাঠামো দেখেন, কিন্তু ধর্মের নামে চুক্তিহীন এই গণ-যৌনশোষণকে প্রথা বা সংস্কৃতি বলে এড়িয়ে যান।
মূল ভন্ডামি এখানেই—যেখানে ইসলাম নারীকে একটি আইনি ও চুক্তিভিত্তিক মর্যাদা দেয়, আর যেখানে চুক্তি আছে সেখানে চুক্তি ভঙ্গের (তালাক) নিয়ম থাকাটাই স্বাভাবিক; অথচ হিন্দু সমাজে রঘুনন্দনের পরবর্তী যুগে এবং দেবদাসী প্রথার মাধ্যমে বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটিকে পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি অবদমন ও শোষণ করা হয়েছে। সেখানে পুরুষদের হাজার নারীকে ভোগ করতে কোনো বিয়ের প্রয়োজনই পড়েনি, তাই তাদের সমাজ ব্যবস্থায় তালাক বা আইনি বহুবিবাহের মারপ্যাঁচ নিয়ে মাথা ঘামাতেও হয়নি (Chatterjee, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৭০)। অধিকারহীনভাবে নারীকে আজীবন দাসী বানিয়ে রাখার চেয়ে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে অধিকার দেওয়া যে হাজার গুণ শ্রেয়, তা এই দ্বিমুখী চিন্তার অধিকারীরা স্বীকার করতে চান না।
ঐতিহাসিক সত্য এটাই, ধর্মের দোহাই দিয়ে পুণ্য ও আশীর্বাদের লোভ দেখিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবলা নারীদের শরীরকে উচ্চবর্ণের ঠাকুর ও জমিদারদের ভোগের বিষয় বানানো হয়েছে। এখনো ভারতের নানা জায়গায়, নানা মন্দিরে এসব প্রচলিত আছে। আসলে যারা ইসলামের সুরক্ষামূলক আইনি কাঠামো (বিয়ে, মোহরানা, ভরণপোষণ, তালাক) নিয়ে কুৎসা রটান, তারা নিজেদের ইতিহাসের এই প্রাতিষ্ঠানিক নারী নির্যাতনের চরম অরাজকতা ও বিয়েহীন স্বেচ্ছাচারিতাকে আড়াল করতেই এই ধরণের দ্বিমুখী নীতি বা ভন্ডামির আশ্রয় নেন।
‘উত্তম, মধ্যম ও অধম-সংকর’—কৃত্রিম সমাজ বিভাজনের কুৎসিত ছক
বাংলার আদিম সমতাবাদী ও লৌকিক কৌম সমাজকে চিরতরে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার জন্য সেন শাসকেরা রক্ত ও জিনের বিশুদ্ধতার এক অদ্ভুত ও অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সমাজকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছিলেন—‘উত্তম-সংকর’, ‘মধ্যম-সংকর’ এবং ‘অধম-সংকর’। এই কৃত্রিম সমাজ বিভাজনের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল—সংখ্যাগরিষ্ঠ অনার্য জনসমষ্টির ভেতরের জন্মগত একতা ও ভাষিক সৌহার্দ্যকে চিরতরে লুণ্ঠন করা। বল্লাল সেনের রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী, কনৌজ থেকে আসা আর্য ব্রাহ্মণ এবং তাদের অনুগত কায়স্থ এলিটদের রাখা হলো সমাজের ‘উত্তম’ বা পবিত্রতম আসনে। আর এ দেশের প্রাক-আর্য মূল ধারার বিভিন্ন কারিগর, শ্রমজীবী এবং পেশাজীবী সমাজকে—যেমন তাঁতি, কামার, কুমার, তিলী এবং ধোপা—তাদেরকে রাখা হলো ‘মধ্যম’ ও ‘অধম’ সংকর জাতির নিকৃষ্ট খাঁচায়। আর্য পণ্ডিতেরা এমন এক চতুর ছক তৈরি করলেন, যার ফলে এক পেশার মানুষ অন্য পেশার মানুষকে নিজের চেয়ে নিচু বা অপবিত্র মনে করতে শুরু করে (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ৯৯-১০৬; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২২৯-২৩১, ২৪৫-২৪৭; শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ৮৮-৯০)।
আর্যদের তৈরি করা কৃত্রিম জাতিভেদের জাঁতাকলে পড়ে এ দেশের মেহনতি মানুষ—যারা নিজেদের হাত দিয়ে শ্রমে-ঘামে এই মাটির সভ্যতাকে সচল রেখেছিল—তারা অবচেতনে নিজেদের পেশা ও সামাজিক পরিচয় নিয়ে তীব্র লজ্জা ও হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে। একজন কৈবর্ত বা চণ্ডাল মেহনতি মানুষ সমাজের উপরের স্তরের এলিটদের সামনে নিজের নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পেতেন। কারণ তাদের পরিচয়কে শাস্ত্রের পাতায় ‘অপবিত্র ও অস্পৃশ্য’ বলে চিরতরে সিলমোহর মেরে দেওয়া হয়েছিল। এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক আপার্থাইড সমাজে এমন এক অসংবেদনশীল ও পাথর মনস্তত্ত্বের জন্ম দেয়, যার ফলে নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর হওয়া যেকোনো রাজকীয় নির্যাতন বা অর্থনৈতিক লুণ্ঠন উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকি সমাজের চোখে সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রাকৃতিক মনে হতো। যেমন আজকের সমাজে মাদ্রাসাওয়ালা ও ইসলামপন্থীদের ওপর নির্যাতন, আর্যদের মানস সন্তান তথাকথিত সুশীল সমাজের কাছে স্বাদ ও আহ্লাদের বিষয়। যেনো প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম এটি; অতি ন্যাচারাল। ভাবসাব এরকম যে, তাদের সাথে অমন করাই মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণা। যা আসলে নিষ্ঠুর সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকারী আর্যদের মানস জাত উত্তরপুরুষদের মনস্তত্ত্ব। তৎকালীন সমাজের এই অমানবিক কাঠামোগত টর্চার সেলই ছিল এই মাটির প্রাচীনতম ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপ’। যা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অর্গানিক ইতিহাস ও মেধাকে চিরতরে আড়াল করে আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণীয় আধিপত্যকে রক্ষা করার তাত্ত্বিক দেয়াল হিসেবে কাজ করেছিল।
বৌদ্ধ নিধন, সঙ্ঘারাম ধ্বংস এবং লৌকিক সংস্কৃতির আত্মগোপন
কর্ণাটকের সেন রাজাদের এই সর্বগ্রাসী সামাজিক ও ধর্মীয় জবরদখল কেবল আইনি ফতোয়া বা বিয়ের নিয়মকানুনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর একটি মারাত্মক ও রক্তাক্ত রাজনৈতিক দিকও ছিল। যার মাধ্যমে এ দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে চূড়ান্ত নিধনের খড়গ নেমে আসা। পাল রাজাদের দীর্ঘ চারশ বছরের সুবর্ণ শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম, সাহিত্য ও নন্দনকলা এই মাটিতে এক স্বাধীন ও চমৎকার আশ্রয় লাভ করেছিল। এ দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ যারা আর্যদের বৈদিক বা স্মার্ত ধর্মের জটিল যজ্ঞ ও বর্ণভেদ পছন্দ করতেন না, তারা অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও তার সমতাবাদী দর্শনের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু কট্টর আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা লালনকারী সেন শাসকেরা সিংহাসনে বসেই বৌদ্ধদের এই স্বাধীন অস্তিত্বকে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করলেন (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ৯৯-১০২; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩৩-২৩৫, ৪১৭-৪১৯; শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, পৃষ্ঠা ৮৮-৯০)। তারা রাজশক্তি ব্যবহার করে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ বিহার, সঙ্ঘারাম এবং শিক্ষার প্রাচীন কেন্দ্রগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস বা জনশূন্য করতে শুরু করলেন। রাজশক্তি ব্যবহার করে সেন রাজারা পাল আমলের দেওয়া সমস্ত জমি, আর্থিক অনুদান এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সুপরিকল্পিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন। রাজকীয় রসদ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সোমপুর বা জগদ্দলের মতো বিশাল সঙ্ঘারাম এবং শিক্ষার প্রাচীন কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পরিত্যক্ত ও জনশূন্য হতে শুরু করে। একই সাথে, স্মার্ত পণ্ডিতেরা সমতাবাদী বৌদ্ধ দর্শনকে কোণঠাসা করতে তাদের দেবদেবী ও উপাসনালয়গুলোকে পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য কাঠামোর ভেতর আত্মীকরণ করার এক সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক কৌশল নেন। এই পরোক্ষ রাষ্ট্রীয় অবদমন ও প্রচ্ছন্ন নিগ্রহের ফলেই বাংলার মূল ধারার সমতাবাদী বৌদ্ধ সমাজ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বুনিয়াদ হারিয়ে ফেলে এবং এ দেশের মানুষের হাজার বছরের অর্গানিক কৃষ্টি এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে।
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও পণ্ডিতেরা যখন দেখলেন, বহিরাগত সেন রাজাদের এবং তাদের আমদানিকৃত আর্য পুরোহিতদের রাজকীয় নিপীড়নের মুখে এই মাটিতে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা অসম্ভব, তখন তারা নিজেদের জ্ঞান ও অমূল্য পাণ্ডুলিপিগুলো রক্ষা করার জন্য এক অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা নিজেদের আদিম কৃষ্টি ও লৌকিক দর্শনকে আর্যদের চোখ থেকে বাঁচানোর জন্য গভীর অরণ্য, পাহাড় কিংবা একেবারে প্রান্তিক লোকসমাজে আত্মগোপন করালেন। এ দেশের মূল ধারার বৌদ্ধ ও অনার্য মানুষেরা প্রকাশ্যে আর্যদের বাহ্যিক সামাজিক নিয়মকানুন ও বর্ণাশ্রম মেনে চললেও, ঘরের ভেতরের গোপন অবচেতনে তারা তাদের নিজস্ব দেহ-তত্ত্ব, কায়ার সাধনা এবং প্রকৃতি পূজার লোকায়ত ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখলেন। আর্যদের এই নিশ্ছিদ্র বজ্রবন্ধনের ভেতরেই তারা গোপনে চর্চা করতে লাগলেন সহজযান, নাথধর্ম ও কায়াসাধনার মরমী দর্শন। যা পরবর্তীতে বাঙালির লৌকিক সংস্কৃতির এক অবিনশ্বর বুনিয়াদ তৈরি করে (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ৫২৮-৫৩০, ৫৩৮-৫৪২, ৭১২-৭১৫; Partha Chatterjee, The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories, Princeton University Press, পৃষ্ঠা ১৭৩-১৭৬)। এই আত্মগোপনকারী লোকসংস্কৃতিই পরবর্তীতে এই মাটির মানুষের মনস্তত্ত্বে এমন এক গভীর ও অলিখিত প্রতিরোধ ক্ষমতা (Epistemic Resistance) তৈরি করেছিল, যা আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের কোনো কৃত্রিম শাসনযন্ত্র কোনোদিনও পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে পারেনি।
'বর্ণাশ্রম' ও সামাজিক মনস্তত্ত্বে চিরস্থায়ী দাসত্বের খাঁচা
সেন রাজবংশের এই প্রাতিষ্ঠানিক আপার্থাইডের সবচেয়ে কুৎসিত ও সুদূরপ্রসারী ফসল ছিল এ দেশের সাধারণ মানুষের মগজে ও অবচেতনে এক চিরস্থায়ী সামাজিক দাসত্বের খাঁচা (Psychological Cage of Subjugation) গেঁথে দেওয়া। আর্য পুরোহিতেরা তাদের রচিত নতুন স্মৃতিশাস্ত্রের পাতায় পাতায় এমন এক অদ্ভুত ও অবৈজ্ঞানিক মেটা-ন্যারেটিভ বা বৃহৎ বয়ান তৈরি করলেন, যেখানে বলা হলো, ব্রাহ্মণদের সেবা করাই হলো এই পৃথিবীর নিম্নবর্ণের ব্রাত্য মানুষদের একমাত্র পরম ধর্মীয় কর্তব্য। তারা ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে সাধারণ সরল মেহনতি মানুষকে এই বিশ্বাস গেলাতে চাইলেন যে, সমাজে তাদের এই চরম অবদমিত ও অস্পৃশ্য দশা কোনো মানুষের তৈরি শোষণ নয়; বরং এটি তাদের পূর্বজন্মের পাপের ফল এবং ঈশ্বরেরই এক অলঙ্ঘনীয় বিধান। ধর্মের মোড়কে আসলে এক পরম জঘন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছিল (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৩৫-২৩৮, ২৫১-২৫৩)।
এই মনস্তাত্ত্বিক জালিয়াতি এ দেশের প্রাত্যহিক সমাজ-মানসে এক তীব্র ও গভীর নৈতিক অবক্ষয়ের জন্ম দিয়েছিল। মানুষ যখন নিজের চোখ দিয়ে দেখছিল, মেধা, জ্ঞান বা ভালো চরিত্রের কোনো মূল্য নেই। কেবল একটি নির্দিষ্ট জাত বা কুলে জন্ম নেওয়ার কারণেই একজন মানুষ সমস্ত সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও সম্মানের একচেটিয়া মালিক হয়ে বসে আছে। তখন পুরো লোকসমাজের ভেতরে এক পরম হীনম্মন্যতা ও হতাশার চাষ হতে শুরু করে। একজন সাধারণ কর্মঠ ও সৎ সমাজ-শ্রমিক সমাজে বুক ফুলিয়ে নিজের পরিচয় দেওয়ার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেললেন। কারণ তার মুখের ভাষা থেকে শুরু করে তার গায়ের রঙ ও পেশা—সবকিছুকে আর্যদের নান্দনিকতার কৃত্রিম স্কেলে 'নিকৃষ্ট' ও 'অপবিত্র' বলে প্রতিনিয়ত সোশাল শেইমিং করা হতো। এই যে নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে অবচেতন মনে অনবরত লজ্জা পাওয়ার এক সর্বগ্রাসী সংস্কৃতি, তার বুনিয়াদ কিন্তু উনিশ শতকের কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ নতুন করে তৈরি করার অনেক আগেই কর্ণাটকের সেন রাজারা এ মাটির বুকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গেঁথে দিয়েছিলেন। ১৯ শতকের কলকাতার ভদ্রসমাজ ছিলো এর নতুন অভিযোজিত রূপ।
সেন আমলের এই নিশ্ছিদ্র ও কঠোর বর্ণবাদী আপার্থাইড ব্যবস্থার সামগ্রিক চরিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটিই ছিল মূলত এই বদ্বীপের ইতিহাসে প্রাচীনতম 'সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপ'। তারা কেবল এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক স্বাধীনতাই হরণ করেননি; তারা মানুষের মন, মগজ, ভাষা এবং তাদের চিরকালীন যাপিত জীবনকে এক কৃত্রিম আর্য উপনিবেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। যখন একটি সমাজে মুষ্টিমেয় কিছু বহিরাগত এলিট ও পুরোহিত শ্রেণী রাজশক্তির জোরে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মেধা ও শ্রমকে 'সাব-হিউম্যান' বা পশুসুলভ বলে দাগিয়ে দেয় এবং তাদের সমস্ত মানবতা ও অধিকার কেড়ে নিয়ে এক স্থবির অচলায়তন তৈরি করে, তখনই সেই সমাজে এক পরম ফ্যাসিবাদের বুনিয়াদ রচিত হয়। এই সর্বগ্রাসী লুণ্ঠন ও সামাজিক নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই এ দেশের অবদমিত অনার্য সমাজ মনে মনে এক বিরাট পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছিল।
কলকাতার তথাকথিত 'ভদ্রলোকি' ইতিহাসবিদেরা যখন তাদের রচিত ছদ্ম-সেক্যুলার ইতিহাসে সেন রাজাদের আমলকে কেবল কিছু রাজকীয় জয়গাথা ও কাব্যের সুবর্ণ যুগ হিসেবে মহিমান্বিত করতে চান, তখন তারা মূলত এ দেশের বৃহৎ অনার্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের সেই মর্মন্তুদ বেদনা ও কান্নার ইতিহাসকে সুপরিকল্পিতভাবে আড়াল করে রাখেন। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস কোনোদিনও কোনো রাজপ্রাসাদের সুবিধাভোগী পণ্ডিতদের বানোয়াট বয়ানে বন্দি থাকে না। তা বেঁচে থাকে এ দেশের মাটির প্রতিটি বালুকণায়, মানুষের ধমনীর রক্তে এবং লৌকিক প্রতিরোধের অবিনশ্বর ঐতিহ্যে।

Post a Comment