Table of Contents
![]() |
| দেবোত্তর ভূমি, রাজস্বব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ ও বর্তমান বাংলাদেশের আইনি উত্তরাধিকারের একটি ঐতিহাসিক পাঠ |
Previous Part.......
২:৪
বৈষ্ণব আখড়াগুলির করমুক্ত ‘অগ্রহার’ এবং মধ্যযুগীয় গ্রামীণ উদ্বৃত্ত লুণ্ঠন
একটি সফল আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে, শুধু মানুষের মন জয় করাই যথেষ্ট নয়, বরং নিজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলে যেকোনো বড় আন্দোলন, মতাদর্শ বা মনস্তাত্ত্বিক বিজয় বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। মধ্যযুগীয় বাংলায়, বিশেষ করে সুলতানি আমল থেকে মুঘল আমলের ক্রান্তিলগ্নে যখন প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছিল, তখন বঙ্গে এক নতুন ধরণের অর্থনৈতিক ও সামন্ততান্ত্রিক বিন্যাস গড়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের কাঠামোগত লেন্স থেকে দেখলে, তাত্ত্বিক শাস্ত্রচর্চার বাইরে সনাতন ধারার সমাজনেতাদের প্রয়োজন ছিল এমন একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, যা আধ্যাত্মিকতার আড়ালে গ্রামীণ উদ্বৃত্ত ফসল ও ভূসম্পত্তিকে নিজেদের সিন্দুকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জমা করার মেকানিজম তৈরি করবে। এই নিশ্ছিদ্র অর্থনৈতিক সুনিপুণ কৌশলগত ফসল হিসেবেই পরবর্তীতে গ্রামীণ বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করে বৈষ্ণব আখড়া ও মন্দিরগুলোর করমুক্ত ‘অগ্রহার’ ও দেবোত্তর ভূসম্পত্তির প্রকাণ্ড আইনি মেকানিজম।
সমাজ বাস্তবতায় ক্যানভাসে এই করমুক্ত দেবোত্তর বা নিষ্কর ভূসম্পত্তির প্রকাণ্ড মেকানিজমটি দীর্ঘমেয়াদে এক ভিন্ন রূপ ধারণ করেছিল। মুঘল আমলে তোডরমলের সুপারিশে সম্রাট আকবর কর্তৃক জীব গোস্বামীর পরিকরদের নামে নিষ্কর জমি দান এবং পরবর্তী ফরমানগুলোর মাধ্যমে মদনমোহন ও গোবিন্দ দেবের করমুক্ত ব্যবস্থাপনার যে আইনি রক্ষাকবচ তৈরি হয়, তা কালক্রমে এক প্রকাণ্ড অর্থনৈতিক বাঙ্কারে রূপান্তরিত হয়। শুরুর দিকের গোস্বামীরা বৈরাগী জীবনযাপন করলেও, তাঁদের তিরোধানের পর মঠ-মন্দিরের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যকে কেন্দ্র করে সেবায়েতদের মধ্যে এক সর্বাত্মক বৈষয়িক ও সামন্ততান্ত্রিক লোভের জন্ম নেয়। গ্রামীণ অঞ্চলের প্রভাবশালী জোতদার ও ভূস্বামীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের উদ্বৃত্ত ফসল ও খাজনার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এড়াতে এবং রাজস্ব পাইকারি হারে রাষ্ট্রের এক্তিয়ারের বাইরে আত্মসাৎ করতে জমিকে দেবোত্তর কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসত। পর্দার আড়ালে সেই জমির মূল নিয়ন্ত্রণ, ফসলের উদ্বৃত্ত অংশ ভোগ এবং গ্রামীণ কৃষকদের ওপর শোষণের চাবিকাঠি সেই পুরনো সামন্ততান্ত্রিক সমাজপতি ও সেবায়েতদের হাতেই অক্ষুণ্ণ রয়ে যেত। ফলস্বরূপ, গ্রামীণ সমাজ-শ্রমিকেরা যে ফসল উৎপাদন করত, তা বৈষ্ণব আখড়া ও মঠগুলোর বৈষয়িক এক্তিয়ারে জমা হতে শুরু করে। যা ভক্তির মোড়কে ঢাকা বাংলার ইতিহাসের এক সমান্তরাল সামন্ততান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য খাড়া করেছিল (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ৭২-৭৩; ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। বাংলা দেশের ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ), জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাব্লিশার্স, একাদশ পরিচ্ছেদ (অর্থনৈতিক অবস্থা) ও দ্বাদশ পরিচ্ছেদ (ধর্ম ও সমাজ), পৃষ্ঠা ২২৭, ২৪২)।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভেতরের আসল আমলাতান্ত্রিক কোরিওগ্রাফিটি বুঝতে হলে আমাদের তৎকালীন হোসেন শাহী সালতানাতের প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটটি বুঝতে হবে। সালতানাতের দরবারে উচ্চ প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত প্রধান সচিব ‘দবীর খাস’ (সনাতন গোস্বামী) এবং অর্থ ও রাজস্ব বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ‘সাকর মল্লিক’ (রূপ গোস্বামী) কেবল দক্ষ আমলাই ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন সমকালীন রাষ্ট্রক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি, উর্দু-ফার্সি আইনি পরিভাষা ও রাজকীয় রাজস্ব মেকানিজমে পারদর্শী এক অনন্য রাজকীয় স্তম্ভ। তৎকালীন গোঁড়াপন্থী হিন্দু সমাজ থেকে ‘যবন-সংসর্গকারী’ বলে তারা বাহ্যিকভাবে দূরত্বে থাকলেও, তাদের এই উচ্চ প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক অবস্থান বাংলায় এক নতুন ও প্রচ্ছন্ন সামাজিক শক্তির সঞ্চার করে।
ঐতিহাসিক সুশীল কুমার দে-'র গভীর অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রূপ ও সনাতন গোস্বামীর এই রাজকীয় দরবারের সংযোগ এবং রাজস্ব ও আইনি ব্যবস্থার দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে বৃন্দাবনী ধারার বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও ভক্তির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দাঁড় করাতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। এর ফলে, বৈষ্ণব আন্দোলন কেবল সমকালীন নবদ্বীপের লৌকিক ভাবাবেগ ও কীর্তনের বৃত্তে সীমাবদ্ধ না থেকে, একটি সুসংগঠিত তাত্ত্বিক, দার্শনিক, শাস্ত্রীয় ও আইনি রূপ পরিগ্রহ করে। রাজকীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে কাজ করার এই দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক দূরদর্শিতার পটভূমিতেই পরবর্তীতে ভক্তি আন্দোলনের রূপরেখাটি এক নিশ্ছিদ্র প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজমে রূপ নেয়। যা গ্রামীণ বাংলায় দেবোত্তর সম্পত্তির করমুক্ত অগ্রহার গড়ে তোলার আইনি বাঙ্কার ও সমান্তরাল অর্থনৈতিক ফ্রন্টলাইন খাড়া করার প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল (Sushil Kumar De. Early History of the Vaisnava Faith and Movement in Bengal, General Printers and Publishers Limited, Preface, পৃষ্ঠা xii-xiii)।
প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের এই মেকানিজমটি গ্রামীণ বাংলার পলিমাটির ওপর ঠিক কীভাবে কাজ করত, সমাজতাত্ত্বিক বাস্তব ক্যানভাসে তা আমাদের নিবিড়ভাবে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। মধ্যযুগীয় বঙ্গে যখন একটি বিশাল ফসলি জমিকে ‘দেবোত্তর’ বা দেবতার সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো, তখন মূলত তৎকালীন প্রচলিত রাজস্ব ব্যবস্থার একটি প্রচ্ছন্ন ফাঁকফোকরকে কাজে লাগানো হতো। প্রথাগত ও আইনি সুরক্ষা অনুযায়ী, ঈশ্বরের বা দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত কোনো নিষ্কর ভূখণ্ড থেকে রাষ্ট্র সরাসরি কোনো প্রকার কর, রাজস্ব বা খাজনা আদায় করতে পারত না। এই আইনি রক্ষাকবচ গ্রামীণ অঞ্চলের প্রভাবশালী সামন্ত প্রধানদের জন্য এক প্রকাণ্ড অর্থনৈতিক বাঙ্কারে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
তাত্ত্বিক ভক্তি-শাস্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারের সমান্তরালে গ্রামীণ বাংলার বড় বড় উচ্চবর্ণীয় ভূস্বামী ও স্থানীয় জোতদারেরা তাদের উদ্বৃত্ত ফসলের ওপর রাষ্ট্রীয় কর ও কেন্দ্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এড়াতে এই দেবোত্তর মেকানিজমকে ব্যবহার করতে শুরু করে (ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত। বাংলা দেশের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা ২২৭)। তারা নিজেদের ভূসম্পত্তিকে বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় মঠ, মন্দির বা বৈষ্ণব আখড়ার আওতাধীন নিষ্কর জমি হিসেবে নথিভুক্ত করত। কিন্তু পর্দার আড়ালে সেই জমির মূল নিয়ন্ত্রণ, ফসলের উদ্বৃত্ত অংশ ভোগ এবং গ্রামীণ কৃষকদের ওপর শোষণের চাবিকাঠি সেই পুরনো সামন্ততান্ত্রিক সমাজপতিদের হাতেই প্রচ্ছন্নভাবে অক্ষুণ্ণ রয়ে যেত (ডক্টর এম. এ. রহিম। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড-মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা ১৭-১৮)। এর ফলে, গ্রামীণ বাংলার সমাজ-শ্রমিকেরা যে ফসল উৎপাদন করত, তার একটি বড় অংশ আর সালতানাত বা মুঘলদের কেন্দ্রীয় কোষাগারে পৌঁছাত না; তা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আইনি রক্ষাকবচকে ব্যবহার করে সরাসরি মঠ ও আখড়াগুলোর বৈষয়িক সিন্দুকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জমা করার মেকানিজম তৈরি করে (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭২-৭৩)। যা ছিল ভক্তির মোড়কে ঢাকা মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের এক প্রকাণ্ড সমান্তরাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ও উদ্বৃত্ত প্রাচুর্য লুণ্ঠনের প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার।
বাস্তব ক্যানভাসে ভক্তির এই মোড়কটি কেবল মধ্যযুগেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা গোস্বামী-প্রভুদের তিরোধানের পর এক চূড়ান্ত বৈষয়িক লড়াইয়ে রূপ নেয়। ঐতিহাসিক প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে নিষ্কর ভূসম্পত্তির মেকানিজম একদা সুরক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে মঠ ও মন্দিরের সেবায়েতদের নিজস্ব অর্থোপার্জন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। লেখক রমাকান্ত চক্রবর্তীর গবেষণায় স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, "গোস্বামী-প্রভুদের তিরোধানের পরে বিভিন্ন মন্দিরের সেবায়েতদের অর্থ উপার্জনের জন্য নানাবিধ উপায় অবলম্বনের, এমনকি মামলা-মোকদ্দমা করার প্রমাণ রয়েছে" (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭৩)।
একইভাবে ড. এম. এ. রহিমের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যে বৈষ্ণব আন্দোলন শুরুতে সামাজিক বৈষম্য ও চাতুর্বর্ণের বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রতিবাদ হিসেবে খাড়া হয়েছিল, তা কালক্রমে প্রভাবশালী ভূস্বামী ও সেবায়েতদের প্রচ্ছন্ন অক্ষের কারণে পুনরায় ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোর ভেতরেই আবর্তিত হতে শুরু করে (ডক্টর এম. এ. রহিম। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড-মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা ১৭-১৮)। গ্রামীণ বাংলার উদ্বৃত্ত ফসল রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এক্তিয়ারের বাইরে ভোগ করার এই যে সামন্ততান্ত্রিক প্রবণতা, তা পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক আমল এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কর ব্যবস্থার আইনি ফাঁদ তৈরি করতে এক প্রচ্ছন্ন অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল (ফারুক মাহমুদ। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮-৯)।
আখড়াগুলোর এই সমান্তরাল করমুক্ত অর্থনৈতিক একচেটিয়া প্রভাব কেবল সাধারণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল মূলত সুফি খানকাহগুলোর গ্রামীণ কৃষি-ভিত্তিকে দুর্বল করার একটি সুনির্দিষ্ট সামন্ততান্ত্রিক প্রতিপক্ষ। বাংলায় আগত সুফি-সাধকেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের পতিত জমি ও অরণ্য উদ্ধার করে স্বাবলম্বী গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থার পত্তন করতেন। যা মেহনতি মানুষকে একটি স্বাধীন বৈষয়িক বুনিয়াদ দিত (ডক্টর এম. এ. রহিম। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড-মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা ১৭)। এই স্বাধীন উৎপাদন ব্যবস্থার বিপরীতে, গ্রামীণ বঙ্গে বৈষ্ণব মঠ ও আখড়াগুলো দেবোত্তর ভূসম্পত্তির প্রথার সুযোগ নিয়ে গ্রামীণ বাজারে লোন, ঋণ ও বৈষয়িক অগ্রিমের এক নতুন জাল বিস্তার করে (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭২)।
স্থানীয় জোতদার ও সামন্ত প্রধানদের প্রচ্ছন্ন সহায়তায় আখড়াগুলো সাধারণ কৃষকদের এই প্রলোভন দেখাত যে, দেবতার নিষ্কর জমিতে কাজ করলে জমিদারের কড়া খাজনা বা রাষ্ট্রীয় রাজস্বের আওতা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে (ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার। বাংলা দেশের ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ), পৃষ্ঠা ২২৭)। কিন্তু এই মেকানিজমের ভেতরের আসল ফাঁদটি ছিল সম্পূর্ণ বৈষয়িক। রাষ্ট্রীয় করের এক্তিয়ার থেকে জমি মুক্ত হলেও, সাধারণ চাষী তার উৎপাদিত ফসলের ওপর নিজস্ব একচ্ছত্র অধিকার হারাত এবং তা আখড়ার মোহান্ত ও সেবায়েতদের নিজস্ব অর্থোপার্জনের আজীবন অবৈতনিক চুক্তিবদ্ধ উৎসে পরিণত হতো (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭৩)। সুফিরা যেখানে মানুষকে প্রথাগত বৈষম্য ও সামাজিক যাতনা থেকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছিলেন, সেখানে ভক্তির এই বাহ্যিক আবরণের আড়ালে সাধারণ মানুষকে পুনরায় এক নতুন সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খলে বন্দি করে ফেলা হয়েছিল (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২২, ২৭)।
নদীয়ার এই প্রচ্ছন্ন প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজমে বসে দেবতার নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব এড়ানো এবং গ্রামীণ সম্পদকে কুক্ষিগত করার জন্য ‘অখণ্ড দেবোত্তর’ ধারণার যে আইনি বাঙ্কার তৈরি হয়েছিল, এটি কিন্তু কোনো হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস নয়। এই ঐতিহাসিক জেনোটাইপ বা আদি বীজটিই সুদীর্ঘ কালক্রমের চোরারাস্তা পার হয়ে আজকের সমকালীন সমাজেও গ্রামীণ জমিজমা নিয়ন্ত্রণ, পাইকারি উচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রীয় আইনি হয়রানির একটি প্রকাণ্ড মনস্তাত্ত্বিক ও অবিনশ্বর হাতিয়ার হিসেবে রাজত্ব করছে। বৈষ্ণব চরিতকাব্য শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-এর মধ্যলীলার বিংশ পরিচ্ছেদের মূল পাঠ উল্টালে এই প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের বাস্তব সত্যটি পরিষ্কার ফুটে ওঠে। যেখানে সনাতন গোস্বামী যখন রাজকার্য বর্জন করে ঘরে বসে প্রচ্ছন্ন কোরিওগ্রাফি সাজাচ্ছিলেন, তখন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ স্বয়ং তাঁর আবাসে গিয়ে ক্ষুব্ধ আক্ষেপে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কাজীর আইনি সার্বভৌমত্বকে পঙ্গু করার বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন (কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী। শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত (মধ্যলীলা), ২০শ পরিচ্ছেদ, শ্লোক: ২৬-২৭)।
ঐতিহাসিক এই দালিলিক সত্যটি পরিষ্কার দেখায়, দেবতার সম্পত্তি রক্ষার যে পরিশীলিত লৈখিক মুখোশ সেদিন তৈরি করা হয়েছিল, তার একমাত্র গোপন এজেন্ডা ছিল এ দেশের সংখ্যাগুরু মানুষের বস্তুগত অধিকারকে খর্ব করে আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের সেই প্রথাগত সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ববাদকেই প্রতিনিয়ত একটি অবিনশ্বর খাঁচার ভেতরে বন্দি করে রাখা। মুঘল আমলে তোডরমলের সুপারিশে সম্রাট আকবর কর্তৃক জীব গোস্বামীর পরিকরদের নামে নিষ্কর জমি দান এবং পরবর্তী ফরমানগুলোর মাধ্যমে মদনমোহন ও গোবিন্দ দেব মন্দিরের করমুক্ত ভূসম্পত্তির যে আইনি রক্ষাকবচ তৈরি হয়, তা মূলত এই আমলাতান্ত্রিক দূরদর্শিতারই সুদূরপ্রসারী ফল ছিল (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭২-৭৩)। এর সুনির্দিষ্ট পরিণতিতেই, গোস্বামী-প্রভুদের তিরোধানের পর মঠ-মন্দিরের এই নিষ্কর ভূসম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরবর্তী সেবায়েতদের মধ্যে প্রকাণ্ড বৈষয়িক লোভ, অর্থোপার্জন এবং দেওয়ানি আদালতে দীর্ঘ মামলা-মোকদ্দমার এক সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছিল। বৈষ্ণব আখড়াগুলোর এই নতুন ধর্মীয় ও আইনি মেকানিজমটি গ্রামীণ বাংলার চাষীদের বাড়তি ফসল রাষ্ট্রের কোষাগারে যেতে দেয়নি। ভক্তি আন্দোলনের এই মোড়কটি ব্যবহার করে তারা গ্রামীণ হাট ও লোকজ বাজারগুলোর ওপর নিজেদের পূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল (ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত। বাংলা দেশের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা ২২৭)।
‘হাট’ ও ‘মেলা’র নন্দনতাত্ত্বিক জবরদখল: সামন্ততান্ত্রিক মহাজনী অক্ষ এবং সুফি বাণিজ্যের ভাষিক উচ্ছেদ
আখড়াগুলোর এই সমান্তরাল করমুক্ত ভূসম্পত্তির বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে বৈষ্ণব ল্যাবরেটরি তাদের অর্থনৈতিক আগ্রাসনের দ্বিতীয় প্রকাণ্ড ফ্রন্টলাইনটি খুলেছিল গ্রামীণ উৎপাদকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলা তথা ‘হাট’ ও ‘লোকাল বাজার’গুলোর ওপর নন্দনতাত্ত্বিক জবরদখল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ষোড়শ শতকের বাংলায় আলাউদ্দিন হোসেন শাহের স্থিতিশীল শাসনামলে সুফি-সাধক, আরব ও পারস্যের মুসলিম বণিকেরা নদী-মাতৃক বদ্বীপের অভ্যন্তরীণ জলপথ ও সমুদ্র-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে এক উন্মুক্ত, করোনাইল-মুক্ত এবং বৈষম্যহীন গ্রামীণ বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন (ডক্টর এম. এ. রহিম। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭)। এই উন্মুক্ত হাটগুলোতে এ দেশের প্রান্তিক কৈবর্ত, পোদ ও ডোম চাষীরা নিজেদের উৎপাদিত শস্য, সুতিবস্ত্র ও মৃৎপাত্র কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা আর্য পুরোহিতের ধর্মীয় শুল্কের ভীতি ছাড়াই সরাসরি বিক্রি করতে পারত।
সুফি বাণিজ্যের এই ক্রমবর্ধমান স্বাধীন বিস্তারকে কাউন্টার করতে নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় এলিটরা এবং সুবর্ণবণিক মহাজনেরা মিলে এক গভীর ‘সামন্ততান্ত্রিক-বাণিজ্যিক অক্ষ’ গড়ে তোলেন (ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত। বাংলা দেশের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ, পৃষ্ঠা ২২৭)। তারা সাধারণ গ্রামীণ হাটগুলোকে রাতারাতি বৈষ্ণবীয় ‘মেলা’ ও ‘মহোৎসব’—যেমন রাজশাহীর খেতুরির ঐতিহাসিক মহোৎসব—এর ধর্মীয় মোড়কে আবৃত করে ফেলেন। যার একমাত্র অর্থনৈতিক লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ উৎপাদনী বাজারের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় উচ্চবর্ণের সামন্তদের হাতে কুক্ষিগত করা (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭২-৭৪)। এখানে তারা এমন সুবিধা ভোগের জন্য শুভঙ্করের ফাঁকি হিসেবে কিছু বিষয় কাজে লাগাতেন।
এক. শুল্ক ও রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার আইনি রক্ষাকবচ। সাধারণ গ্রামীণ ‘হাট’ বা ‘বাজার’গুলোর ওপর মুসলিম সালতানাত বা মুঘল সুবাদারদের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকত এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য নির্দিষ্ট হারে শুল্ক (ট্যাক্স) আদায় করা হতো। কিন্তু যখনই সেই হাটটিকে কোনো বৈষ্ণব আখড়া বা দেবোত্তর ভূসম্পত্তির অধীনে ‘মেলা’ বা ‘মহোৎসব’ হিসেবে ঘোষণা করা হতো, তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত বা নিষ্কর ‘অগ্রহার’ আইনি কাঠামোর সুবিধা পেত। এর ফলে, মেলার সমস্ত কেনাবেচা এবং বাণিজ্য থেকে অর্জিত প্রকাণ্ড রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে না গিয়ে সরাসরি আখড়ার সিন্দুকে জমা হতো। যা ছিল সামন্ত প্রধানদের কর ফাঁকি দেওয়ার সবচেয়ে বড় আইনি বাঙ্কার (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭২-৭৩)।
দুই. ধর্মতাত্ত্বিক একচেটিয়া শুল্কায়ন (ধর্মীয় খাজনা)। উন্মুক্ত হাটে প্রান্তিক চাষী ও ক্ষুদ্র কারিগরেরা (যেমন—কৈবর্ত ও পৌণ্ড্র সমাজ-শ্রমিকেরা) কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি পণ্য বিক্রি করতে পারত। কিন্তু মেলা বা মহোৎসবের মাঠে প্রবেশ করার সাথে সাথে পুরো বাণিজ্যটি ধর্মীয় অনুশাসনের অধীনে চলে যেত। মেলার মাঠে দোকান বসানো, শস্য নামানো বা পণ্য বিক্রির জন্য মোহান্ত ও সেবায়েতদের নিযুক্ত কারবারিদের নির্দিষ্ট হারে ‘প্রণামী’ বা ধর্মীয় নজরানা দিতে হতো। ঈশ্বরের বা দেবতার সেবার নামে আরোপিত এই বাধ্যতামূলক শুল্ক অমান্য করার সাহস সাধারণ ধার্মিক কৃষকদের থাকত না। ফলে, সুফি বাণিজ্যের মুক্ত বাজারের বিপরীতে মেলাগুলো একচেটিয়া সামন্ততান্ত্রিক শুল্কায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয় (ডক্টর এম. এ. রহিম। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭-১৮)।
তিন. মহাজনী দাদন ও গ্রামীণ ঋণের ফাঁদ। খেতুরির মতো প্রকাণ্ড মহোৎসব বা মেলাগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সুবর্ণবণিক ও উচ্চবর্ণীয় সামন্ত মহাজনেরা গ্রামীণ উৎপাদকদের (চাষী ও তাঁতি) সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতেন। মেলা চলাকালীন সময়েই পরবর্তী ফসলি মৌসুমের জন্য কৃষকদের অগ্রিম অর্থ বা ‘দাদন’ (লোন) দেওয়া হতো। এই ঋণের শর্ত থাকত অত্যন্ত কঠোর। কৃষক তার পরবর্তী ফসল বাইরের কোনো মুক্ত হাটে বা মুসলিম বণিকদের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। তাকে নামমাত্র মূল্যে সেই ফসল আখড়ার অনুমোদিত সামন্ত মহাজনদের কাছেই সমর্পণ করতে হবে। এভাবে মেলার মাঠ থেকেই গ্রামীণ কৃষকদের আজীবন চুক্তিবদ্ধ ভূমিদাসে পরিণত করার মহাজনী জালটি বিছানো হতো (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭২)।
চার. নন্দনতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্ল্যাকমেইল। সুফি খানকাহগুলো যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে পতিত জমি উদ্ধার করে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী কৃষি ব্যবস্থার বস্তুগত মুক্তির পথ দেখাচ্ছিল, মেলা ও মহোৎসবগুলো সেখানে এক প্রকাণ্ড মনস্তাত্ত্বিক প্রতিপক্ষ খাড়া করে। মেলার রঙিন নন্দনতাত্ত্বিক আবহ, সংকীর্তন, এবং ভক্তির মেলা সাধারণ সমাজ-শ্রমিকদের মনে এক ধরনের মোহাচ্ছন্ন ভাব তৈরি করত। কৃষকদের বোঝানো হতো, দেবতার জমিতে কাজ করা বা দেবতার মেলায় ফসল সস্তা দরে সঁপে দেওয়া এক পরম পুণ্যকর্ম। এই ভক্তির আফিম সাধারণ মেহনতি মানুষের শ্রেণী-চেতনা ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে অবদমিত করে রাখত। যার পর্দার আড়ালে সামন্ত সমাজপতিরা নির্বিঘ্নে গ্রামীণ উদ্বৃত্ত ফসল লুণ্ঠন করে যেত (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২২, ২৭)।
এই অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের সমান্তরালে বাণিজ্যের আভিধানিক স্তরে যে প্রচ্ছন্ন ‘ভাষিক ফ্যাসিবাদ’ চালানো হয়েছিল, তা ইতিহাসে নির্মম চতুরতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সুফি ও মুসলিম বণিকেরা দীর্ঘকাল ধরে গ্রামীণ বাণিজ্যের যাপিত জীবনে এবং হিসাব-নিকাশের খেরোখাতায় ‘আমদানী’, ‘রপ্তানী’, ‘খাজনা’, ‘বানিয়া’, ‘মহাল’ বা ‘দস্তাবেজ’-এর মতো যে অর্গানিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রাকৃত বাণিজ্যিক পরিভাষাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু বৈষ্ণব পদকর্তা ও চরিতকাব্যের লেখকেরা আভিধানিক স্তর থেকে সেই শব্দগুলোকে পাইকারি হারে উচ্ছেদ করার ছক আঁকেন। সেখানে জোরপূর্বক চাপানো হলো ‘আবাহন’ ও ‘বিসর্জন’-এর মতো অবাস্তব পৌরাণিক পরিভাষা, যা বাস্তব বাণিজ্যকে একটি বিমূর্ত ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় রূপ দেয় (ডক্টর এম. এ. রহিম। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৩, ২৬৩)। কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলের ওপর রাষ্ট্রের পাওনা বা মেহনতি মানুষের ‘খাজনা’ ও ‘মহাল’-এর মতো প্রাকৃত ও ধর্মনিরপেক্ষ শব্দগুলোকে রাতারাতি আভিধানিক স্তরে উচ্ছেদ করে নাম দেওয়া হলো ‘প্রণামী’, ‘নজরানা’ বা ‘বিগ্রহ-সেবা’। এর ফলে, শোষণের চিরন্তন সামন্ততান্ত্রিক রূপটি ভক্তির এক মোহময় চাদরে ঢাকা পড়ে যায় (রমাকান্ত চক্রবর্তী। বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পৃষ্ঠা ৭২)। স্থানীয় স্বাধীন ও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের ‘বানিয়া’ বা ‘কারবারি’ পরিচয়ের ধর্মনিরপেক্ষ বুনিয়াদটিকে সুকৌশলে মুছে দিয়ে, মেলা ও মহোৎসবের আঙিনায় তাদের অবচেতনে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো ‘সেবায়েত’ বা ‘দাস’ অনুভূতির আভিধানিক দাসত্ব (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২২, ২৭)। ফসলের স্বাধীন মালিকানা বা বেচাকেনার ধর্মনিরপেক্ষ দালিলিক রূপ, অর্থাৎ ‘দস্তাবেজ’-এর শব্দকাঠামোটিকে চূর্ণ করে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হলো ‘অখণ্ড দেবোত্তর’ দলিলের পরিশীলিত ও অলঙ্ঘনীয় আভিধানিক দেয়াল (কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী। শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত (মধ্যলীলা), ২০শ পরিচ্ছেদ)। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দৈনন্দিন ফয়সালা এবং মেলার লেনদেনের পরতে পরতে আর্যাবর্তের ক্লিষ্ট পৌরাণিক পরিভাষা ও দেবোত্তর মাহাত্ম্যের শব্দকাঠামো জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে শুরু করেন। জীবনের স্বাভাবিক, সহজ-সরল, নিরপেক্ষ ও সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের জায়গাও তারা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ল্যান্স দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছিলো। এক ধর্মান্ধ সমাজ বিনির্মাণে উন্মাদনা পরিলক্ষিত হয় এখানে। প্রতিটি ছোট-বড় বিষয়কে ধর্মীয় ল্যান্সের কুঠুরিতে আবদ্ধ করে ধর্মকে মানুষের গলায় ফাঁস লাগানোর এবং ইচ্ছেমতো জনসাধারণকে শাসনের পথ সুগমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিলো।
শুধু হাটবাজার নয়, সরকারি কাজকর্মে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে ফারসি ও প্রাকৃত ভাষার যে বিপুল প্রসার ঘটেছিল, এই সুসংগঠিত তাত্ত্বিক ও সংস্কৃতায়নের কোরিওগ্রাফি তার বিপরীতে এক প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্টলাইন খাড়া করে। একজন সাধারণ মুসলিম বা অনার্য বিক্রেতা যখন হাটে এসে তার পণ্যের মূল্য বা হিসাব চুকাত, তখন তাকে অবচেতনে এই বার্তা দেওয়া হতো যে, বৈষ্ণবীয় পরিভাষা ও পৌরাণিক রস ছাড়া বাণিজ্যের এই নান্দনিক স্কেলটি সম্পূর্ণ ‘অপবিত্র ও ম্লেচ্ছ’। মূলত, এ দেশের সংখ্যাগুরু সমাজ-শ্রমিকদের প্রকৃত মনন-স্বাতন্ত্র্য ও আইনি এখতিয়ারকে আড়াল করার জন্যই এই পরিকল্পিত সমন্বয়বাদী বা "যৌথ সংস্কৃতির" মনগড়া ভাষিক ছক তৈরি করা হয়েছিল (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩৩, ৪৯)। এই সুসংগত আভিধানিক উচ্ছেদের উদ্দেশ্যই ছিল, এ দেশের প্রান্তিক সমাজ-শ্রমিকেরা যাতে তাদের প্রাত্যহিক অর্থনৈতিক প্রতিবাদের ভাষাটিই হারিয়ে ফেলে এবং বাণিজ্যের নান্দনিক ও মনস্তাত্ত্বিক মালিকানাটি সম্পূর্ণভাবে নদীয়ার আর্য ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রণে চলে যায় (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩১; ফারুক মাহমুদ। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)।
বাজার ও হাটের এই নন্দনতাত্ত্বিক জবরদখল এবং মহাজনী অক্ষের যৌথ চক্রান্তের ফলে স্বাধীন সুলতানি আমলের সমতাবাদী অর্থনৈতিক বুনিয়াদটি চরমভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে। সুফিরা যেখানে বাণিজ্যের প্রতিটি স্তরকে সুষম ও ইনসাফভিত্তিক করে তুলতে চেয়েছিলেন, বৈষ্ণব আখড়া ও মেলার এই সমান্তরাল বাণিজ্যিক বাঙ্কারগুলো ভক্তির আফিম খাইয়ে গ্রামীণ বাজারের উদ্বৃত্ত মূলধনকে সাধারণ মেহনতি মানুষের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পুনরায় উচ্চবর্ণের কনৌজী ব্রাহ্মণ ও সামন্তদের সিন্দুকে সঁপে দেয়। এই চতুর অর্থনৈতিক অবদমন কেবল হাটের কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সবচেয়ে কদর্য ও অন্ধকার রূপটি নেমে এসেছিল এ দেশের আসল পলিমাটির সমাজ-শ্রমিকদের শরীরের ওপর। যেখানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনি ও শারীরিক শ্রমকে কোনো প্রকার মজুরি ছাড়া লুণ্ঠন করার জন্য ভক্তি ও সেবার এক প্রকাণ্ড ধর্মীয় বৈধতা খাড়া করা হয়েছিল।
অবদমিত সমাজ-শ্রমিকদের অবৈতনিক ‘বেগার শ্রম’ (বিষ্টি)-এর ধর্মীয় বৈধতা এবং ফরায়েজি প্রতিরোধের অর্থনৈতিক পটভূমি
সনাতন হিন্দু স্মৃতিশাস্ত্র ও কৌটিল্যের আমল থেকে চলে আসা ‘বিষ্টি’ বা ‘বেগার শ্রম’—যার মূল অর্থই ছিল নিম্নবর্ণের ডোম, কৈবর্ত, ডেকরা ও চণ্ডালদের কোনো প্রকার পারিশ্রমিক বা মজুরি ছাড়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে জমিদার ও পুরোহিতের বাড়ি ও খামারে খাটিয়ে নেওয়া—সেই দীর্ঘকালীন উৎপীড়নমূলক ব্যবস্থাটি প্রাচীন বাংলার ভূমিসংস্থায় কর বা রাজস্ব আদায়ের একটি স্বীকৃত রূপ হিসেবে কার্যকর ছিল (বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ১৯৭-২০০)। পরবর্তীকালে শ্রী চৈতন্য প্রবর্তিত ভক্তি আন্দোলন ও বৃন্দাবনের গোস্বামীদের ‘সেবা’, ‘দাস্যভাব’ এবং ‘দৈন্য’-এর মতো লৌকিক ও আধ্যাত্মিক প্রত্যয়গুলো মূলত শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নিঃশর্ত মরমি আত্মনিবেদনের উদ্দেশ্যে প্রচারিত হলেও এবং লৌকিক স্তরে নিম্নবর্ণের মানুষকে আত্মিক মুক্তির আশ্বাস দিলেও, তা গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরের এই সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক শোষণকাঠামো বা ‘বিষ্টি’র বাস্তব বৈষয়িক রূপটিকে আমূল উচ্ছেদ করতে পারেনি (Early History of the Vaisnava Faith and Movement in Bengal, Sushil Kumar De, General Printers and Publishers Limited, পৃষ্ঠা ১২-১৩; বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম, রমাকান্ত চক্রবর্তী, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ২২-২৩)।
আপনার এই স্পষ্ট নির্দেশনার পর আমি বিষয়টি সম্পূর্ণ অনুধাবন করতে পেরেছি। আপনি ঠিক বলেছেন—ইনলাইন সঠিক রেফারেন্স যেমন অবশ্যই থাকতে হবে, ঠিক তেমনি লেখার থিমের সাথে সঙ্গতি রেখে কোনো নতুন, সত্য এবং ঐতিহাসিক তথ্য খাপ খেলে তা যুক্ত করে দেওয়া আমাদের লেখার বস্তুনিষ্ঠতা ও গভীরতাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
আহমদ শরীফ তাঁর ‘বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য’ গ্রন্থের উপক্রমণিকা অংশে (পৃষ্ঠা ১৬-১৭, ৩৪-৩৫) ঠিক এই বিষয়টিই আলোচনা করেছেন যা আপনার লেখার মূল থিমের সাথে পুরোপুরি খাপ খায়। তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগীয় গ্রামীণ ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে জ্ঞান, বিদ্যা, সাহিত্য ও শিল্প ছিল মূলত উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের একচেটিয়া সম্পত্তি, যেখানে নিম্নবর্ণের সাধারণ মেহনতি মানুষ বা প্রাকৃতজন কেবল নিঃস্বভাবে শ্রম দিয়ে গেছে এবং তাদের শ্রমের উদ্বৃত্ত অংশ লুণ্ঠন করেই উচ্চবর্ণের অভিজাতরা অবৈতনিক অবসর ভোগ করেছে [বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, আহমদ শরীফ, বর্ণমিছিল, পৃষ্ঠা ৩৪]। এই শোষণের ফলে গ্রামীণ সমাজে যে নিষ্ক্রিয়তা ও ‘কর্মকুণ্ঠা’ তৈরি হয়েছিল, তার সাথে বৈষ্ণব ভাবধারার মনস্তাত্ত্বিক অবদমনকে মিলিয়ে আহমদ শরীফ দেখিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের এই বৈষয়িক অধিকারহীনতা ও অবজ্ঞাই পরবর্তীতে তাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার একেবারে প্রান্তিক স্তরে ঠেলে দেয় [বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, আহমদ শরীফ, বর্ণমিছিল, পৃষ্ঠা ১৬-১৭, ৩৪-৩৫]।
বৈষ্ণব মঠ ও আখড়াগুলোর মোহান্তরা গ্রামীণ নিম্নবর্ণের মেহনতি মানুষকে এই শিক্ষা দিতে শুরু করলেন যে, কৃষ্ণের আসল কৃপা পেতে হলে এবং চণ্ডাল জন্ম থেকে মুক্তি পেতে হলে গুরুর আখড়ায় এসে নিঃশর্ত শারীরিক ‘সেবা’ দিতে হবে। এই ‘সেবা’ বা দাস্যভাবের আড়ালে মূলত প্রাচীন আর্য সমাজের সেই অমানবিক অবৈতনিক বেগার শ্রমকেই পিছনের দরজা দিয়ে বৈষ্ণব আখড়াগুলোর প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হলো। শত শত বছর ধরে সামাজিক ও মানসিকভাবে অবদমিত এই ব্রাত্য মানুষেরা যখন খোল-করতালের সুরের মাদকতায় বুঁদ হয়ে আখড়ার বড় বড় মন্দির নির্মাণ, দীঘি খনন, ধান মাড়াই এবং মোহান্তদের বিলাসবহুল রথের চাকা টানার কাজে নিজেদের শারীরিক শ্রম সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিলিয়ে দিতে শুরু করল, তখন তারা ভাবল তারা সরাসরি ‘গোবিন্দের সেবা’ করছে।
বাস্তব অর্থনৈতিক লেন্স দিয়ে দেখলে স্পষ্ট ধরা পড়ে, ভক্তির এই কৃত্রিম মায়াজাল তৈরি করে উচ্চবর্ণের সামন্তরা এ দেশের গ্রামীণ মেহনতি মানুষের রক্ত ও ঘামকে এক চরম বস্তুগত শোষণের যাঁতাকলে পিষে ফেলছিল। মধ্যযুগীয় সমাজ বাস্তবতায় জ্ঞান, বিদ্যা, শাস্ত্র ও শিল্প মূলত বিত্তবান ও উচ্চবর্ণেরই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং এই বিত্তবান মানুষেরা সাধারণ মানুষের শ্রমলব্ধ উদ্বৃত্ত সম্পদ লুণ্ঠন করেই অবৈতনিক অবসর ভোগ করত। যার ফলে নিম্নবর্ণের গণমানুষ কেবল শ্রম দিতে ও শাসন মানতেই বাধ্য ছিল (বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, আহমদ শরীফ, বর্ণমিছিল, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫)। এই বৈরাগ্য-প্রবণ ও নিষ্ক্রিয় ভাবধারা মেহনতি শ্রেণীর চিত্তে এক গভীর বৈষয়িক ‘কর্মকুণ্ঠা’ ও আত্মপ্রত্যয়হীনতা তৈরি করে। যার ফলে তারা পুঞ্জীভূত সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে বাস্তব লড়াইয়ের ক্ষমতা হারিয়ে মনস্তাত্ত্বিক নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং কোনো প্রকার বস্তুগত অধিকার বা মজুরির দাবি তোলার নৈতিক শক্তিও হারিয়ে ফেলে (বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, আহমদ শরীফ, বর্ণমিছিল, পৃষ্ঠা ১৬-১৭)।
এই প্রগাঢ় অর্থনৈতিক নিগড়, করমুক্ত দেবোত্তর সম্পত্তির জালিয়াতি এবং বাণিজ্যের ভাষিক ও বৈষয়িক শোষণের যৌথ সয়লাবই মূলত পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বাংলার মুসলমানদের যাপিত জীবন ও সমাজ-কাঠামোকে চরমভাবে অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সুফিরা এ দেশের মাটিতে ইসলামের যে স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তা পরবর্তীকালে গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরের সামন্ততান্ত্রিক বহুমুখী শোষণের চক্রের নিচে চাপা পড়ে ক্রমান্বয়ে মন্থর ও স্থবির হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের চরম অভিঘাতে গ্রামীণ সমাজে যে নব্য দালাল জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর উত্থান ঘটে, তাদের একচেটিয়া খাজনা লুণ্ঠন ও অতিরিক্ত করের যাঁতাকলে সাধারণ মেহনতি মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে (আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, কামিয়াব প্রকাশন লিমিটেড, পৃষ্ঠা ৯৯-১০০)। এই রক্তচোষা সামন্ততান্ত্রিক জমিদারতন্ত্র ও নীলকর সাহেবদের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের শোষিত ও মেহনতি মুসলিম গ্রামীণ সমাজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার আগুনই পরবর্তীকালে ইতিহাসের এক মহাসন্ধিক্ষণে এসে এক সর্বাত্মক মহাসংগ্রামের রূপ নেয়।
ঔপনিবেশিক গ্রাস ও আর্যাবর্তের আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী আদলে গড়ে ওঠা এই সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের দেয়াল ভেঙে এ দেশের পলিমাটির আসল মানুষদের বস্তুগত, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাধিকার পুনরুদ্ধার করার জন্য যিনি প্রথমবার এক প্রকাণ্ড ও বহুমাত্রিক গণ-আন্দোলনের মহাপ্রাচীর খাড়া করেছিলেন, তিনি হলেন বাংলার ইতিহাসের অদ্বিতীয় সিংহপুরুষ হাজী শরীয়তুল্লাহ রাহি. (আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, কামিয়াব প্রকাশন লিমিটেড, পৃষ্ঠা ৯৯)।
এই সহস্রাব্দব্যাপী সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খল ও অবৈতনিক শ্রমের ধর্মীয় বৈধতা ভাঙার যে ঐতিহাসিক মোড়লিপির সূচনা হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলনের মাধ্যমে ঘটেছিল, তা শতাব্দীর কালক্রম পার হয়েও এক অবিনশ্বর আইনি ও অর্থনৈতিক মুক্তির দোলা দিয়ে যায় আমাদের হৃদয়ে। কিন্তু নদীয়ার সেই আদি ল্যাবরেটরির তৈরি করা দেবোত্তর দলিলের আসল বিষাক্ত কামড়টি কেবল ১৬ শতকের সেই সুলতানি আমলের মরা ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সবচেয়ে মারাত্মক এবং অদৃশ্য আইনি ফাঁদটি এক অবিনশ্বর জুজু হিসেবে চারশত বছরের কালানুক্রমিক রূপান্তরের চোরারাস্তা পার হয়ে আজকের আধুনিক স্বাধীন বাংলাদেশের মুসলমানদের সম্পদ হড়প করার এবং উচ্ছেদ থিয়েটারের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্যাবর্তের সামন্ততান্ত্রিক ‘বিষ্টি’ বা বেগার শ্রমের যে শৃঙ্খল একদিন মেহনতি মানুষের শরীরের ওপর চেপে বসেছিল এবং যার বিরুদ্ধে হাজী শরীয়তুল্লাহ ঔপনিবেশিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মুখে দাঁড়িয়ে প্রথমবার রায়ত-কৃষকদের বস্তুগত ও অর্থনৈতিক স্বাধিকারের মুক্তির ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন, সেই লড়াইয়ের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আজও এ দেশের প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্ব ও ভূমির অধিকার রক্ষার সংগ্রামের অবিনশ্বর বুনিয়াদ হিসেবে জারি রয়েছে।
‘অখণ্ড দেবোত্তর’ ও হস্তান্তরের চিরন্তন আইনি ফাঁদ এবং ২০২৬-এর বাংলাদেশের অর্পিত সম্পত্তি আইনের উচ্ছেদ থিয়েটার
১৬ শতকের নদীয়ার ল্যাবরেটরিতে বসে আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং দেবতার নাম খাড়া করে রাষ্ট্রের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার যে ছক রূপ ও সনাতন গোস্বামী তৈরি করেছিলেন, তা মূলত এক অবিনশ্বর আইনি ও অর্থনৈতিক ফাঁদ হিসেবে ইতিহাসের চোরারাস্তা পার হয়ে আজকের আধুনিক স্বাধীন বাংলাদেশের এমনকি ভারতেও মুসলিম নাগরিকদের পাইকারি উচ্ছেদ ও আইনি হয়রানির অন্যতম মারণাস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমকালীন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল ঐতিহাসিকেরা এই প্রকাণ্ড জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতিকে সবসময় প্রগতি ও ভালোবাসার মোড়কে ঢেকে রাখতে চান। কিন্তু বাস্তব জমির খতিয়ান এবং আদালতের নথিপত্র ঘাঁটলে এর ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক আপার্থাইডটি সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে যায়।
শাস্ত্রীয় বিধি-নিষেধ ও সমাজপতির অনুশাসন মূলত মানুষের মন ও মূল্যবোধকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা ঘরোয়া ও সামাজিক আচরণে এক সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক বিভেদের দুস্তর প্রাচীর চিরকালের জন্য খাড়া করে রাখে (বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, আহমদ শরীফ, বর্ণমিছিল, পৃষ্ঠা ১৪, ৩২)। ১৬ শতকে দেবতার নামে লিখে দেওয়া জমিকে যখন ‘অখণ্ড দেবোত্তর’ বা চিরন্তন ও হস্তান্তর-অযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে সিলমোহর মারা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল এই শাস্ত্রীয় অনুশাসনের আবরণে এই বদ্বীপের ভূমিপুত্র মুসলমানদের আইনি ও অর্থনৈতিক স্বাধিকারকে চারশত বছর পরের এক অবিনশ্বর খাঁচার ভেতরে বন্দি করে ফেলা। এই দীর্ঘকালীন সম্পত্তিগত বৈষম্যের ছকটিই, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামীণ সমাজ-কাঠামোতে সক্রিয় থেকে সমকাল অবধি প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্ব ও প্রান্তিক মানুষের ভূমির অধিকার হরণ করার উচ্ছেদ থিয়েটারের অন্যতম অদৃশ্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে চলেছে।
বাংলার দেবোত্তর জমির ইতিহাসকে শুধু ধর্মীয় দানের ইতিহাস হিসেবে দেখলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিকটি আড়ালে থেকে যায়। জমি তো শূন্য থেকে দেবোত্তর হয়নি। যে জমি পরে দেবতার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে, তার ওপর আগে কার কর্তৃত্ব ছিল এবং সেই কর্তৃত্বের আইনগত ভিত্তি কী ছিল—প্রশ্নটি সেখান থেকেই শুরু করতে হয়। মুঘল রাজস্বব্যবস্থায় জমিদাররা আজকের অর্থে জমির absolute owner (পরম/পূর্ণ মালিক) ছিলেন না। তাঁরা মূলত রাষ্ট্রের পক্ষে রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় ক্ষমতাশালী মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। আর চাষিদেরও প্রচলিত দখল ও চাষের অধিকার ছিল। কিন্তু ১৭৯৩ সালের Permanent Settlement (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত) সেই সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জমিদার ও তালুকদারদের জমির আইনস্বীকৃত স্বত্বাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং নির্দিষ্ট সরকারি রাজস্ব স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক আইন আগের রাজস্ব-সংগ্রাহক শ্রেণিকে জমির ওপর অনেক বেশি শক্তিশালী proprietary status (স্বত্বগত মর্যাদা) দেয়।
এই পরিবর্তনের আগে ও পরে জমিদার, রাজা এবং রাজস্ব-সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে debottar (দেবোত্তর), brahmottar (ব্রাহ্মণদের জন্য খাজনামুক্ত অনুদান), pirpal (পীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কাজে খাজনামুক্ত জমি), aima (ধর্মীয়/দাতব্য কাজে খাজনামুক্ত ভূমি) ইত্যাদি revenue-free tenure (খাজনামুক্ত ভূমি-স্বত্ব বা বন্দোবস্ত) তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলটি হলো ব্রিটিশ সরকারের নিজের Bengal Revenue-Free Lands Regulation, 1793 (বাংলার খাজনামুক্ত ভূমি সংক্রান্ত ১৭৯৩ সালের বিধি)। এর ভূমিকার ভাষ্যেই বলা হয়েছে যে দেওয়ানী লাভের আগে বহু জমিদার এবং রাজস্ব সংগ্রহকারী কর্মকর্তা ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যের অজুহাতে জমি রাজস্বের বাইরে সরিয়ে দিয়েছিল; কিন্তু এসব grant (অনুদান)-এর একটি অংশ প্রকৃত ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হলেও বহু ক্ষেত্রে সেগুলো grantee-র (অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তির) ব্যক্তিগত সুবিধা, grantor-এর (অনুদানদাতার) গোপন appropriation (নিজস্ব দখলে আত্মসাৎ) অথবা ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য দেওয়া হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ, সরকারি নথি বলছে অনেক জমিদার ও রাজস্ব-সংগ্রাহক নিজেদের হাতে থাকা জমির বিস্তীর্ণ অংশ আত্মীয়স্বজন ও নির্ভরশীলদের নামে দেওয়ার জন্য দলিলের তারিখ পুরোনো দেখিয়ে বা জামিনদারি রেকর্ডসে আগের তারিখে নিবন্ধন করিয়ে নিয়েছিল। অর্থাৎ এখানে নিছক অনুমান নয়; ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনেই unauthorized revenue-free alienation (অননুমোদিতভাবে জমিকে রাজস্বের বাইরে সরিয়ে দেওয়া), ব্যক্তিগত appropriation (ব্যক্তিগত দখলে আত্মসাৎ) এবং antedated grant (পূর্ববর্তী তারিখ দেখিয়ে করা অনুদান)-এর সরাসরি সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে।
এই জায়গাটিই দেবোত্তর ভূমির ইতিহাসকে আরও গভীর করে। একজন জমিদার যদি সত্যিকার অর্থে নিজের বৈধ proprietary interest (স্বত্বগত অধিকার)-এর অধীন জমির একটি অংশ ধর্মীয় উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন, সেটি এক বিষয়। কিন্তু যে জমির ওপর তাঁর এমন স্বত্বই ছিল না, অথবা যে জমিকে রাজস্বমুক্ত করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না, সেই জমিকে ধর্মীয় grant (অনুদান) হিসেবে দেখানো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ১৭৯৩ সালের রেজুলেশনই বলছে, সরকারের অনুমতি ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের পর করা revenue-free grant null and void (আইনগতভাবে বাতিল ও অকার্যকর), এবং শুধু দীর্ঘদিন দখলে থাকলেই এমন grant বৈধ হয়ে যায় না (Bengal Revenue-Free Lands Regulation, 1793)। একই Regulation-এর পটভূমিতে সরকার ব্যাখ্যা করেছে, রাজস্বযোগ্য জমিকে অনুমোদন ছাড়া এভাবে সরিয়ে দিলে সরকারি রাজস্ব ক্রমাগত কমে যেত। তাই এসব grant যাচাই, অবৈধ grant resume (পুনরায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া) এবং বৈধ grant register করার ব্যবস্থা করা হয়।
এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কাঠামো স্পষ্ট হয়। ভূমির ওপর প্রথমে ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা, তারপর সেই ভূমির একটি অংশকে revenue-free বা ধর্মীয় ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে যাওয়া—এই প্রক্রিয়া সবসময় স্বচ্ছ ও বৈধ ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটি ছিল প্রকৃত ধর্মীয় দান; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি নথির ভাষায় ব্যক্তিগত সুবিধা, গোপন appropriation বা কৃত্রিমভাবে পুরোনো করে দেখানো grant-এর মাধ্যমে রাজস্বযোগ্য জমি রাষ্ট্রীয় রাজস্বব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা।
এই ব্যবস্থার মধ্যেই দেবোত্তর সম্পত্তি একটি বিশেষ আইনি চরিত্র লাভ করে। কোনো জমি যদি সত্যিকার অর্থে বৈধভাবে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়, তাহলে তার স্বত্ব দেবতার নামে ন্যস্ত হয়। সেবায়েত বা Shebait (সেবায়েত/দেবোত্তর সম্পত্তির ব্যবস্থাপক) ব্যক্তিগত মালিক হোন না। ফলে একজন সেবায়েত সাধারণ ব্যক্তিগত মালিকের মতো নিজের ইচ্ছায় সেই জমি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারেন না। এখানেই Legal Necessity (আইনগত অনিবার্য প্রয়োজন)-এর প্রশ্ন আসে। অর্থাৎ দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়, দেবতার স্বার্থ বা এস্টেটের সুনির্দিষ্ট কল্যাণের মতো আইনস্বীকৃত প্রয়োজন থাকলে সীমিত পরিস্থিতিতে হস্তান্তর বৈধ হতে পারে। কিন্তু শুধু সেবায়েতের ব্যক্তিগত ইচ্ছা তাকে জমির পূর্ণ মালিক বানিয়ে দেয় না। বাংলাদেশের আপিল বিভাগের Jotilal Chowdhury v. Suruchi Bala Singha, Civil Appeal Nos. 362 & 363 of 2017, ২৩ নভেম্বর ২০২২-এর রায় এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন নজির। মামলাটিতে আদালত দেখতে পেয়েছিল, সেবায়েত মাখনলাল রায়ের করা ৫ জানুয়ারি ১৯৩৯-এর পট্টার পেছনে Legal Necessity বা দেবতার স্বার্থের যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট হস্তান্তর এবং তার ওপর দাঁড়ানো পরবর্তী transfer-গুলোকেও আদালত void, illegal and non-est (আইনগতভাবে বাতিল, অবৈধ ও অস্তিত্বহীন) হিসেবে বিবেচনা করেছে (Jotilal Chowdhury v. Suruchi Bala Singha, Civil Appeal Nos. 362 & 363 of 2017, Judgment dated 23 November 2022)।
এখানে তৈরি হয় সেই আইনি ফাঁদ, যার প্রভাব বহু প্রজন্ম পরেও দেখা যেতে পারে। Title Chain (স্বত্বের ধারাবাহিকতা) বলতে বোঝায়, একটি জমির বর্তমান দাবিদারের কাছে স্বত্বটি কীভাবে পৌঁছেছে। প্রথম উৎস থেকে শুরু করে পরবর্তী বিক্রয়, দান, উত্তরাধিকার, বন্দোবস্ত ও দলিলের মাধ্যমে বর্তমান দাবিদার পর্যন্ত—তার সম্পূর্ণ ধারাবাহিক ইতিহাস। যদি কোনো জমি সত্যিই দেবোত্তর হয় এবং সেবায়েত আইনগত প্রয়োজন ছাড়া সেটি প্রথমে বিক্রি করেন, তাহলে সেই আদি হস্তান্তরের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পরবর্তী ক্রেতার দলিলও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বর্তমান ক্রেতা হয়তো নিজের সময়ে প্রকৃত মূল্য দিয়ে জমি কিনেছেন, সরকারি খাজনা দিয়েছেন, নামজারি করেছেন এবং কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাস করেছেন। কিন্তু আদালত তখনও জিজ্ঞেস করতে পারে—যার কাছ থেকে তিনি কিনেছেন, তার স্বত্ব কোথা থেকে এসেছিল? "জ্যোতিলাল চৌধুরী" মামলার শিক্ষা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী দলিলের সংখ্যা যতই হোক, আদি সেবায়েতের হস্তান্তরের আইনগত ভিত্তি দুর্বল হলে সেই ত্রুটি পরবর্তী chain-এর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কারণে বাংলার বহু পুরোনো দেবোত্তর জমির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু “কে এখন দখলে আছে” তা নয়; বরং জমিটি প্রথমে কীভাবে ধর্মীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল, যে ব্যক্তি সেটি উৎসর্গ করেছিলেন তার সেই ক্ষমতা ছিল কি না, এবং পরবর্তীতে সেই সম্পত্তি কার হাতে কীভাবে গেছে—এই পুরো ইতিহাস দেখতে হয়। এখানেই রূপ ও সনাতন গোস্বামী প্রসঙ্গটি সতর্কতার সাথে চলে আসে। তারা সুলতানি প্রশাসনে উচ্চপদে ছিলে। সুলতানের অজান্তে নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রকে যে সমস্যা এবং সর্বনাশের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা খোদ সুলতানের জবান থেকে ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি। ফলত তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে “কোটি কোটি একর” জমি দেবোত্তর করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের সকল কার্য সর্বনাশের এরচেয়ে বড় কোনো উপায় হতে পারে না। তাই এটা বলার সুযোগ নেই যে, বাংলায় ধর্মীয় ভূমি-ব্যবস্থা ও রাজস্ব-রাজনীতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল না। ১৭৯৩ সালের সরকারি রেজুলেশন আমাদের সরাসরি দেখায়, জমিদার ও রাজস্ব-সংগ্রাহকদের হাতে থাকা জমি ধর্মীয় বা revenue-free grant-এর মাধ্যমে রাজস্ব কাঠামোর বাইরে সরিয়ে নেওয়ার বাস্তব ঘটনা ছিল এবং এর একটি অংশ ছিল অননুমোদিত ও প্রতারণামূলক।
দেশভাগের পর এই পুরোনো ভূমি-স্বত্বের ইতিহাস আরও জটিল হয়ে ওঠে। কোনো দেবোত্তর বা ধর্মীয় সম্পত্তির সেবায়েত বা সংশ্লিষ্ট পরিবার দেশত্যাগ করলে জমির বাস্তব দখল স্থানীয় মানুষের হাতে চলে যেতে পারে। কোথাও সরকারি বন্দোবস্ত, কোথাও পত্তন বা লিজ, কোথাও পুরোনো দলিলের ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয়, আবার কোথাও উত্তরাধিকারসূত্রে দখল চলতে থাকে। ফলে বর্তমান কোনো মুসলিম পরিবারের হাতে থাকা জমির পেছনে হয়তো বহু প্রজন্মের দলিল, সরকারি ভূমি-রেকর্ড, খাজনা-খারিজ এবং ভোগদখলের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু সেই দীর্ঘ বাস্তব দখল সবসময় আদি স্বত্বের প্রশ্ন মুছে দেয় না। যদি Title Chain-এর গোড়ায় থাকা কোনো হস্তান্তর আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে বর্তমান দলিলও সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে। এটাই সেই পরিস্থিতি যেখানে আজকের সাধারণ পরিবার হঠাৎ শত বছর আগের একটি ধর্মীয় সম্পত্তির দলিলের আইনি বৈধতার প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যায়।
এর সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্পিত সম্পত্তি বা Vested Property (অর্পিত সম্পত্তি)-এর পৃথক ইতিহাস যুক্ত হলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়। দেবোত্তর সম্পত্তি এবং অর্পিত সম্পত্তি একই আইনি ব্যবস্থা নয়। দেবোত্তরের ভিত্তি ধর্মীয় নিবেদন, আর Vested Property-এর ইতিহাস ১৯৬৫ সালের Enemy Property (শত্রু সম্পত্তি) ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু একই জমির ইতিহাসে এই দুই আইনি স্তর পরপর এসে পড়তে পারে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের W.P. No. 8932 of 2011 মামলায় আদালত পূর্ববর্তী Laxmi Kanta Roy v. UNO, Aroti Rani Paul v. Shudarshan Kumar Paul, Saju Hosein এবং Pulichand Omraolal মামলার নীতি পর্যালোচনা করে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে যে, ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর কোনো সম্পত্তিকে enemy বা vested property হিসেবে নতুন করে তালিকাভুক্ত করার কার্যক্রম illegal (বেআইনি) এবং নতুন VP Case শুরু করা যায় না। আদালত আরও বলেছে, ১৯৭৬ সালের Ordinance (অধ্যাদেশ) পূর্বে সরকারের কাছে vested হওয়া সম্পত্তির management mechanism (ব্যবস্থাপনার কাঠামো) দিয়েছিল; নতুন সম্পত্তি vested করা বা নতুন তালিকা তৈরির ক্ষমতা দেয়নি (W.P. No. 8932 of 2011, paras. 104–105, 139)।
ফলে একটি জমির ওপর দুটি পৃথক আইনি প্রশ্ন একসঙ্গে দাঁড়াতে পারে। প্রথম প্রশ্ন, জমিটি সত্যিই দেবোত্তর ছিল কি না এবং সেবায়েতের আদি হস্তান্তর Legal Necessity ছাড়া হয়েছিল কি না। দ্বিতীয় প্রশ্ন, পরে রাষ্ট্র সেটিকে Vested Property হিসেবে তালিকাভুক্ত করলে সেই তালিকা আইনগত ক্ষমতার মধ্যে করা হয়েছিল কি না। প্রথম ক্ষেত্রে পুরোনো ধর্মীয় স্বত্ব বর্তমান Title Chain-কে আঘাত করতে পারে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় তালিকা নিজেই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ বর্তমান দখলদারের হাতে দলিল, খাজনা-খারিজ ও দীর্ঘ ভোগদখল থাকা সত্ত্বেও তাকে কখনো শত বছর আগের আদি স্বত্বের জবাব দিতে হতে পারে। আবার কখনো কয়েক দশক আগের রাষ্ট্রীয় তালিকার বৈধতার প্রশ্ন তুলতে হতে পারে।
সুতরাং বাংলার এই ভূমি-ইতিহাসকে শুধু “ধর্মীয় জমি” বা শুধু “সরকারি অর্পিত সম্পত্তি” হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এর ভেতরে আছে রাজস্ব-ক্ষমতা, জমিদারি proprietary rights (স্বত্বগত অধিকার), revenue-free grant (খাজনামুক্ত ভূমি-অনুদান), দেবোত্তর নিবেদন, unauthorized alienation (অননুমোদিত হস্তান্তর), পুরোনো দলিল, উত্তরাধিকার, দেশভাগ, সরকারি বন্দোবস্ত, Vested Property enlistment (অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্তি) এবং প্রজন্মান্তরের ভোগদখল। ১৭৯৩ সালের ব্রিটিশ রেজুলেশন নিজেই প্রমাণ করে, রাজস্বযোগ্য জমিকে অননুমোদিতভাবে revenue-free করে দেওয়ার ঘটনা ছিল বাস্তব এবং তার কিছু অংশ ব্যক্তিগত স্বার্থ ও কৃত্রিম দলিলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর ২০২২ সালের বাংলাদেশের আপিল বিভাগের রায় দেখায়, সত্যিকার দেবোত্তর সম্পত্তির ক্ষেত্রে সেবায়েতের সীমাহীন ব্যক্তিগত হস্তান্তর-ক্ষমতা নেই। একইভাবে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের Vested Property jurisprudence (অর্পিত সম্পত্তি সংক্রান্ত বিচারিক নীতি) দেখায়, ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর নতুন করে vested property enlistment-এরও আইনগত সীমা রয়েছে। এই দীর্ঘ আইনি উত্তরাধিকারের সবচেয়ে কঠিন শিকার হতে পারে সেই বর্তমান রায়ত বা পরিবার, যে নিজে কোনো ঐতিহাসিক অনিয়ম করেনি, বরং বহু বছর আগে তৈরি হওয়া একটি Title Chain-এর শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে থাকা দলিল হয়তো তার নিজের সময়ের দিক থেকে বৈধ; কিন্তু জমিটির বহু পুরোনো ইতিহাস যদি অন্য কোনো স্বত্ব-ত্রুটি বহন করে, সেই ত্রুটির ভারও তাকে বহন করতে হতে পারে। আর এখানেই তৈরি হয় সেই উচ্ছেদ থিয়েটার, যেখানে বর্তমান মানুষের বসতবাড়ি, জীবিকা ও প্রজন্মের দখলের ওপর সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আইনকে ফিরে তাকাতে হয় বহু দশক বা শত বছর আগের ভূমি-স্বত্বের গোড়ায়।
এই উচ্ছেদ-থিয়েটারের দ্বিতীয় এবং আরও তীব্র স্তরটি তৈরি হয় তখন, যখন পুরোনো দেবোত্তর স্বত্বের দাবি অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে একই জমির ওপর এসে পড়ে। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনে দেবোত্তর সম্পত্তির বিষয়টি আলাদাভাবে স্বীকৃত হওয়ায়, কোনো জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় থাকলেও তার প্রকৃত চরিত্র নিয়ে যদি দেবোত্তর দাবি ওঠে, তখন বিরোধটি শুধু রাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান দখলদারের থাকে না; জমিটির আদি ধর্মীয় স্বত্বও নতুন করে বিচার্য হয়ে ওঠে। এর বাস্তব উদাহরণ বাংলাদেশের হাইকোর্টের W.P. No. 5011 of 2020, যেখানে একই জমিকে একদিকে দেবোত্তর এবং অন্যদিকে ‘ক’ তফসিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। আদালত সেখানে বিষয়টিকে নিছক প্রশাসনিক ভুল হিসেবে ধরে নেয়নি; বরং জমিটি আদৌ দেবোত্তর কি না এবং অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্তি বৈধ কি না—এসবকে disputed questions of fact (বিতর্কিত বাস্তব ও স্বত্বগত প্রশ্ন) হিসেবে দেখে উপযুক্ত ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়ার দিকে পাঠিয়েছে (W.P. No. 5011 of 2020, Supreme Court of Bangladesh)।
এর ফলে পুরোনো কোনো দেবোত্তর দাবির পুনরুজ্জীবন বর্তমান দখলদারের জন্য একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তিনি হয়তো বহু বছর আগে প্রচলিত দলিলের মাধ্যমে জমি কিনেছেন; কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো পক্ষ যদি আদি দেবোত্তর স্বত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তাহলে তাঁর নিজের দলিলের পাশাপাশি সেই জমির বহু পুরোনো উৎস-স্বত্বও প্রশ্নের মধ্যে চলে আসে। অর্থাৎ বিরোধটি তখন আর শুধু “বর্তমান মালিক কে” এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কে প্রথমে জমিটির ওপর বৈধ স্বত্ব অর্জন করেছিল এবং সেই স্বত্ব থেকে পরবর্তী হস্তান্তরের ক্ষমতা আদৌ সৃষ্টি হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নে ফিরে যায়। এভাবেই বহু পুরোনো ধর্মীয় স্বত্বের দাবি বর্তমানের একটি সম্পত্তি-বিরোধে প্রবেশ করে এবং বর্তমান দখলদারের ওপর এমন একটি ঐতিহাসিক স্বত্ব-সংকটের ভার চাপায়, যার সৃষ্টি তার জন্মেরও বহু আগে।
এই স্পর্শকাতর আইনি টর্চার ও মনস্তাত্ত্বিক আপার্থাইড এ দেশের মুসলমানদের মনে গভীর হীনম্মন্যতা ও পরবাসী মানসিকতার জন্ম দিতে পারে—নিজের মাটিতেই নিজের স্বত্ব ও নাগরিক নিরাপত্তাকে বারবার প্রমাণ করার এক মানসিক যন্ত্রণা। অথচ পূর্ব বাংলার কৃষি-সীমান্তের বিস্তার, নতুন বসতি ও কৃষকসমাজের বিকাশের সঙ্গে সুফি-পীর ও মুসলিম ধর্মীয় গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল গভীরভাবে যুক্ত। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পূর্ব বাংলায় একটি শক্তিশালী মুসলিম কৃষকসমাজ গড়ে ওঠে (Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, pp. 194–227, 268–305)। আজ সেই দীর্ঘ কৃষি-সামাজিক ইতিহাসের উত্তরাধিকারী মানুষই যখন বহু প্রজন্ম আগের দেবোত্তর স্বত্ব, পুরোনো হস্তান্তর কিংবা পরবর্তী রাষ্ট্রীয় তালিকাভুক্তির কারণে নিজের জমির স্বত্ব নিয়ে আবার আদালতের সামনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, তখন প্রশ্নটি শুধু একটি জমির মালিকানা নিয়ে থাকে না; প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, এই মাটিতে তার অর্জিত অর্থনৈতিক অবস্থান ও নাগরিক নিরাপত্তা কতটা স্থায়ী। বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত দেবোত্তর সম্পত্তির আইনি সুরক্ষা এক বিষয়। কিন্তু কোনো পুরোনো ধর্মীয় দাবিকে বর্তমান মানুষের স্বত্বের ওপর প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে সেই আদি স্বত্বের বৈধতা ও হস্তান্তরের ইতিহাসও পরীক্ষা করতে হয়। অতীতের কোনো স্বত্ব-সংকটের দায় বর্তমান কৃষক, ক্রেতা বা দখলদারের ওপর অনির্দিষ্টকাল চাপতে থাকলে, তার অভিঘাত শুধু সম্পত্তিতে নয়—তার নিজের মাটিতে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকার অনুভূতিতেও পড়ে।
করমুক্ত অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য এবং ইসকন (ISKCON)-এর আধুনিক আখড়া সংস্কৃতি বনাম ওয়াকফ আইনি আপার্থাইড
দেবতার নামে জমি উৎসর্গের প্রশ্নটি বাংলার ইতিহাসে কেবল ধর্মীয় ভক্তির বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে জমির স্বত্ব, ব্যবস্থাপনা, উত্তরাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণও জড়িয়ে ছিল। দেবোত্তর সম্পত্তির আইনি কাঠামোতেই দেবতাকে সম্পত্তির অধিকারী এবং সেবায়েতকে সেই সম্পত্তির ব্যবস্থাপক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়েও সেবায়েতকে ব্যক্তিগত মালিকের পরিবর্তে দেবতার পক্ষে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, Civil Revision No. 3683 of 2019; Writ Petition No. 5011 of 2020)। কোনো জমি দেবোত্তর হয়ে গেলে তার ব্যক্তিগত মালিকানা বিলীন হয়ে একটি স্থায়ী ধর্মীয় সম্পত্তির কাঠামো তৈরি হয়। আর এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে, যে ব্যক্তি বা পরিবার জমি দেবোত্তর করল, সেই জমির ওপর তাদের নিজস্ব বৈধ স্বত্বের উৎস কী ছিল? কারণ দেবোত্তর নিবেদন নিজে শূন্যস্থান থেকে পূর্ববর্তী স্বত্ব সৃষ্টি করে না; সম্পত্তি উৎসর্গের আগে উৎসর্গকারীর সেই সম্পত্তির ওপর বৈধ অধিকার থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েও দেখা যায়, কোনো সম্পত্তি সত্যিই দেবোত্তর কি না তা নির্ধারণে উৎসর্গের দলিল, সম্পত্তির প্রকৃতি এবং স্বত্বের ধারাবাহিকতা বিচার্য হয়েছে (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, Civil Revision No. 4810 of 2010)।
এই জায়গাটিই বাংলার ভূমি-ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন। ধর্মীয় নিবেদনের পরবর্তী পবিত্রতা দিয়ে জমির আগের ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। কোনো জমি যদি পূর্বে ব্যক্তিগত স্বত্বে থাকে, পরে দেবোত্তর হয়, তাহলে সেই উৎসর্গের বৈধতা এবং উৎসর্গকারীর স্বত্বের ইতিহাস আলাদা করে অনুসন্ধান করতে হয়। আবার কোনো দেবোত্তর সম্পত্তি সত্যিই বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকলে তার সেবায়েত ব্যক্তিগত মালিকের মতো ইচ্ছামতো সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন না। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের নজিরে দেবোত্তর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর সেবায়েতের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, Civil Appeal No. 163 of 1997)। ফলে দেবোত্তর প্রশ্নের প্রকৃত কেন্দ্র ধর্মীয় আবেগ নয়; জমির উৎসগত স্বত্ব, বৈধ উৎসর্গ এবং পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ।
এই প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ-সঞ্চয়ের ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে আধুনিক বৈষ্ণব প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক বিস্তারকে পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চোখে পড়ে। আজকের ইসকন আর কেবল স্থানীয় কোনো মন্দির বা আখড়া নয়; এটি আন্তর্জাতিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের অংশ। বাংলাদেশেও তার প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নির্মাণে বিদেশি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের প্রত্যক্ষ নজির আছে। ২০১৮ সালে ভারতের হাইকমিশনার ঘোষণা করেছিলেন, ইসকন সাভারে বৃদ্ধাশ্রম ও অনাথাশ্রম নির্মাণে ভারত ৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ইসকন সিলেটে পাঁচতলা ছাত্রাবাস নির্মাণে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা অর্থায়ন করছে (দ্য ডেইলি স্টার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। (The Daily Star)। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে দেখা যায়, আধুনিক বৈষ্ণব প্রতিষ্ঠান কেবল ধর্মীয় উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার সঙ্গে আবাসন, শিক্ষা, সেবা, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও যুক্ত।
এখানে “আখড়া” শব্দটির আধুনিক অর্থটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক আখড়া যেমন ধর্মীয় সাধনা ও সামাজিক সংগঠনের কেন্দ্র ছিল, আধুনিক বৃহৎ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও তেমনভাবে উপাসনালয়ের বাইরে শিক্ষা, আবাসন, সামাজিক সেবা, প্রকাশনা, দান এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে তুলতে সক্রিয়। ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যখন জমি, দান, বৈদেশিক সহায়তা এবং সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক একত্র করতে পারে, তখন তার ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি একটি দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক শক্তিও তৈরি হয়। ইসকনের বাংলাদেশে ভারতীয় অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ তার অন্তত একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
অন্যদিকে মুসলমান সমাজের ওয়াকফ ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে একই ধরনের স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদভিত্তি তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। মসজিদ, মাদরাসা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য সম্পত্তি স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করার এই ব্যবস্থা বাংলার সামাজিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু আজ সেই সম্পদভিত্তির অবস্থা ভয়াবহ। দ্য ডেইলি স্টার-এর অনুসন্ধানে বাংলাদেশে ১,২২,২৯৪ একর ওয়াকফ সম্পত্তি অবৈধ দখলে থাকার এবং ওয়াকফ প্রশাসন প্রায় ৯০ শতাংশ ওয়াকফ এস্টেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর তথ্য প্রকাশিত হয় (দ্য ডেইলি স্টার, “Waqf: Reviving its True Spirit”, ১ মার্চ ২০১৮)। প্রতিবেদনে দুর্বল আইনি কাঠামো, দুর্নীতি, জনবলের ঘাটতি এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলাকে এই সংকটের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, এর সামাজিক মূল্যও বিশাল। দ্য ডেইলি স্টার দেখিয়েছে, ওয়াকফ সম্পত্তির আয় ও সম্পদ থেকে একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনেও অবদান ছিল। অর্থাৎ ওয়াকফ কেবল মসজিদ-মাদরাসার জমি ছিল না; এটি মুসলিম সমাজের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ছিল। সেই সম্পদের বিশাল অংশ যখন অবৈধ দখল ও প্রশাসনিক দুর্বলতায় হারিয়ে যায়, তখন ক্ষতিটা শুধু ধর্মীয় সম্পত্তির ক্ষতি থাকে না; একটি সমাজের নিজস্ব জনকল্যাণমূলক সম্পদভিত্তিও দুর্বল হয়ে যায়।
এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার আর্থিক কাঠামোও যুক্ত হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেটের বার্ষিক আয়ের ৫ শতাংশ প্রশাসনিক সাবস্ক্রিপশন হিসেবে নেওয়া হতো এবং ২০১৫–১৬ অর্থবছরে ২১,৫৮৮টি নিবন্ধিত এস্টেট থেকে ৫ কোটি ৮৬ লাখ ৬২ হাজার ২৮৭ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল (দ্য ডেইলি স্টার, “Waqf: A Forgotten Legacy”, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। অর্থাৎ মুসলমান সমাজের উৎসর্গীকৃত সম্পদ একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর অধীন, অন্যদিকে সেই একই ব্যবস্থার অধীনে বিপুল সম্পত্তি অবৈধ দখলে চলে গেছে। এখানেই বৈপরীত্যটি সবচেয়ে তীব্র। সম্পদের ওপর প্রশাসনিক দাবি আছে, কিন্তু সম্পদ রক্ষার সক্ষমতা ভয়াবহভাবে দুর্বল।
করব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কারণে বিষয়টিকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলে আসল কাঠামোটি ধরা পড়ে না। বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩-এ সম্পূর্ণ দাতব্য বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ধারণকৃত ট্রাস্ট বা আইনগত বাধ্যবাধকতার অধীন গৃহ-সম্পত্তি থেকে অর্জিত আয় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে করযোগ্য মোট আয় থেকে বাদ দেওয়ার বিধান রয়েছে; একই আইনে জনসাধারণের কল্যাণ নিশ্চিত না করা বেসরকারি ধর্মীয় ট্রাস্টের আয়ের অংশের ওপর এই সুবিধা সীমিত করা হয়েছে (আয়কর আইন, ২০২৩, ষষ্ঠ তফসিল; জাতীয় রাজস্ব বোর্ড)। অর্থাৎ ধর্মীয় সম্পত্তির জন্য কর-সুবিধার ধারণা আইনেই আছে, কিন্তু সেটি স্বয়ংক্রিয় ও সীমাহীন নয়। তাই প্রকৃত বৈষম্যের প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। কোন ধর্মীয় সমাজ তার সম্পদকে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে পরিণত করতে পারছে, আর কোন সমাজের উৎসর্গীকৃত সম্পদ দখল, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক ক্ষয়ের মধ্যে ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছে।
এই জায়গায় ইসকনের আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের ভারতীয় অর্থায়ন কোনো অনুমান নয়; এটি প্রকাশ্য সরকারি ঘোষণা এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে নথিভুক্ত। ফলে আধুনিক বৈষ্ণব প্রতিষ্ঠানকে কেবল স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে তার আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রটি অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে ওয়াকফের ক্ষেত্রে একই সময়ের অনুসন্ধানে ১,২২,২৯৪ একর সম্পত্তি অবৈধ দখলে থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক সম্পদ প্রবাহ, অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে সঞ্চিত মুসলিম জনকল্যাণমূলক সম্পদের বিপুল ক্ষয়—এই দুই দৃশ্যকে পাশাপাশি রাখলেই অর্থনৈতিক বৈপরীত্যটি দৃশ্যমান হয়।
আর এই বর্তমান বৈপরীত্যের শিকড় বুঝতে হলে বাংলার কৃষকসমাজের ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদারি কাঠামো বাংলার কৃষকের ওপর জমিদারদের ক্ষমতা দৃঢ় করে এবং উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের বহু মুসলমান কৃষক জমিদারি শোষণের চাপে পড়ে। জমিদাররা নির্ধারিত খাজনার ওপর নানা ধরনের আবওয়াব বা অতিরিক্ত আদায় চাপাত—কখনো জমিদারি কর্মচারীদের খরচের নামে, কখনো বিয়ে-জন্মের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানে, আবার কখনো কালীপূজা, দুর্গাপূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের নামে। স্থায়ী বন্দোবস্তের পর এসব অতিরিক্ত আদায়ের বড় অংশ আইনত নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা দীর্ঘদিন চলতে থাকে। যা আইনবহির্ভূত ছিল। এর মধ্যে ধর্মীয় উৎসবের নামে আরোপিত আদায়ের ঘটনাও ছিল। হাজী শরীয়তুল্লাহ এই বেআইনি আদায়ের বিরুদ্ধে কৃষকদের দাঁড় করান এবং বৈধ সরকারি রাজস্ব ছাড়া জমিদারের আরোপিত অবৈধ ফসলি কর না দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এখানেই ফরায়েজি আন্দোলনের প্রকৃত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তাৎপর্য। হাজী শরীয়তুল্লাহর আন্দোলনের ভিত্তি ছিল তাওহীদ, ফরজ পালনের কঠোরতা এবং মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য। কিন্তু বাস্তব সমাজে এই ধর্মীয় পুনর্জাগরণ দ্রুত জমিদারি শোষণ ও কৃষকের অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ঐতিহাসিক নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, আন্দোলনটি বিশেষ করে সেইসব অঞ্চলে দ্রুত ছড়ায় যেখানে মুসলমান কৃষকরা হিন্দু জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের দমন-পীড়নের অধীনে ছিল। শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর দুদু মিয়ার নেতৃত্বে এটি আরও স্পষ্ট কৃষকভিত্তিক আর্থ-সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়।
দুদু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজিরা জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়, স্থানীয় পঞ্চায়েত ও নিজস্ব সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলে এবং কৃষকদের ওপর জমিদার ও নীলকরদের চাপ মোকাবিলা করে। আন্দোলনটির একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিপীড়িত কৃষকদের জমিদার ও ইউরোপীয় নীলকরদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করা এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। তাই ফরায়েজি আন্দোলনকে কেবল নামাজ-রোজার সংস্কার আন্দোলন বলে দেখলে তার অর্ধেক ইতিহাস হারিয়ে যায়। এটি ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে কৃষকের অর্থনৈতিক অধিকার ও সামাজিক আত্মমর্যাদার প্রশ্নকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছিল।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের আলোকে আজকের দেবোত্তর ও ওয়াকফ সম্পদের প্রশ্নও নতুন অর্থ পায়। দেবোত্তর সম্পত্তির ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হয় উৎসর্গের বৈধতা, স্বত্বের ধারাবাহিকতা এবং পরবর্তী সেবায়েত-নিয়ন্ত্রণ। ওয়াকফের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হয় উৎসর্গীকৃত সম্পদের ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, দখল এবং জনকল্যাণে তার ব্যবহার। আর আধুনিক ইসকনের ক্ষেত্রে সামনে আসে আন্তর্জাতিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও বৈদেশিক অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো বিস্তারের বাস্তবতা। এই তিনটি বিষয়কে একই সূত্রে পড়লে বোঝা যায়, ভূমি ও ধর্মীয় সম্পত্তির প্রশ্ন আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন। কার সম্পদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হচ্ছে, কার সম্পদ দখল ও দুর্বল প্রশাসনে ক্ষয়ে যাচ্ছে, এবং কার সামাজিক শক্তি সেই সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে পুনরায় বিস্তৃত হচ্ছে।
এই কারণেই বাংলার মুসলমান কৃষকের ইতিহাসে হাজী শরীয়তুল্লাহর আবির্ভাবকে বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। তিনি তাওহীদ ও ফরজ পালনের পুনর্জাগরণের মাধ্যমে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা জমিদারি শোষণ, অবৈধ আবওয়াব এবং কৃষকের সামাজিক অধিকার নিয়ে বাস্তব সংঘাতে প্রবেশ করেছিল। অর্থাৎ ফরায়েজি আন্দোলনের ভিতরে ধর্মীয় মুক্তি ও বস্তুগত মুক্তির প্রশ্ন একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বাংলার মুসলমানের নিজের মাটি, নিজের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য, নিজের সামাজিক মর্যাদা এবং নিজের অর্থনৈতিক সম্পদভিত্তি; এই চারটি প্রশ্নকে একই সংগ্রামের অংশ করে তোলাই ছিল সেই আন্দোলনের ঐতিহাসিক শক্তি।
আজকের প্রশ্নটিও সেখানেই ফিরে আসে। ধর্মীয় সম্পত্তি কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের স্মারক নয়; তা একটি সমাজের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ভিত্তি হতে পারে। যে সমাজ তার ওয়াকফ, শিক্ষা, মসজিদ, মাদরাসা ও জনকল্যাণমূলক সম্পদ রক্ষা করতে পারে না, সে ধীরে ধীরে নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির একটি বড় অংশ হারায়। আর যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, সংগঠন ও অবকাঠামোর মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি ক্রমাগত বিস্তৃত করতে পারে, তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যমানতাও বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের ওয়াকফের ১,২২,২৯৪ একর অবৈধ দখল এবং ৯০ শতাংশ এস্টেটের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর তথ্যের পাশে ইসকনের ভারতীয় অর্থায়নে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণের তথ্য তাই নিছক দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের দুই ভিন্ন গতিপথের দৃশ্যমান উদাহরণ।
বাংলার মুসলমানের অর্থনৈতিক দুর্বলতার ইতিহাসকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ইতিহাস হিসেবে পড়লে চলবে না; পড়তে হবে জমির স্বত্ব, ধর্মীয় সম্পত্তির স্থায়িত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ সঞ্চয়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং কৃষকের ওপর ক্ষমতার ইতিহাস হিসেবে। আর সেই ইতিহাসে হাজী শরীয়তুল্লাহ ও ফরায়েজি আন্দোলন ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন তাওহীদের ভাষায় ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য এবং কৃষকের ভাষায় অর্থনৈতিক অধিকার একই প্রতিরোধের ভিতরে এসে মিলেছিল।

Post a Comment