Table of Contents
![]() |
| মধ্যযুগীয় বাংলায় সুফি জিকির ও বৈষ্ণব নগর সংকীর্তনের প্রতিযোগিতামূলক ধর্মীয় জনপরিসর—স্ট্রাকচারাল মিমিক্রির একটি পাঠ |
Previous Part.......
২:২
আধ্যাত্মিকতার সমরে ক্ষমতার স্থানবদল এবং মরমী জিকিরের বিরুদ্ধে রাজপথের প্রথম প্রকাশ্য কৌশল
একটি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের লড়াইয়ে সবচেয়ে গোপন ও মারাত্মক মারণাস্ত্রটি হলো ‘স্ট্রাকচারাল মিমিক্রি’ বা অপর পক্ষের সফল বুনিয়াদটিকে সুকৌশলে হুবহু নকল করে তার নিজস্ব স্পিরিটটিকে চুরি করে নেওয়া। মধ্যযুগীয় বাংলায় সুলতানি আমলের স্থিতিশীল রাজনৈতিক ছায়াতলে যখন পারস্য, মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত সুফি-সাধকদের মরমী প্রচারণা এক নীরব সামাজিক বিপ্লবের জন্ম দিচ্ছিল, তখন বাংলার উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী এলিট সমাজ এক অভূতপূর্ব এবং গভীর অস্তিত্বের সংকটে পতিত হয়। সুফিদের এই বিজয়াভিযান কোনো তলোয়ার বা সামরিক শক্তির জোরে আসে নাই। এর মূল শক্তি নিহিত ছিল তাদের সাম্যবাদী আচরণ, ইসলামের সাম্যের দাওয়াত, মানুষের দুঃখ-কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়ানো, জুলুম-নির্যাতনের বিপক্ষে উচ্চকণ্ঠ ও সংগ্রাম এবং খানকাহ বা জাবিয়াগুলোতে গভীর রাতে দলবদ্ধভাবে করা আল্লাহর জিকির ও সামা মাহফিলের মরমি আকর্ষণে। শত শত বছর ধরে সেন রাজাদের চাপিয়ে দেওয়া বর্ণবাদী আপার্থাইড এবং স্মার্ত রঘুনন্দনের ‘বজ্রবন্ধনে’ পিষ্ট হওয়া এই বদ্বীপের নিম্নবর্ণের মেহনতি কৈবর্ত, ডোম ও পৌণ্ড্র সমাজ সুফিদের এই সম্মিলিত জিকিরের ভেতরে এক অদ্ভুত মানবিক মর্যাদা ও মুক্তির আলো খুঁজে পেয়েছিল। নিম্নবর্ণের এই গণ-উত্থান এবং তাদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার এই মনস্তাত্ত্বিক মহাপতনকে ঠেকাতে নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় সমাজনেতারা চিরাচরিত মন্দিরের বদ্ধ দুয়ার ভেঙে এক অভূতপূর্ব পাল্টা-কৌশল তৈরি করলেন। যা ইতিহাসে ‘নগর সংকীর্তন’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এটি কোনো সাধারণ ধর্মীয় ভাবোচ্ছ্বাস ছিল না৷ এটি ছিল মূলত সুফিদের সম্মিলিত জিকিরের আধ্যাত্মিক শক্তিকে কাউন্টার করার জন্য শ্রী চৈতন্যের তৈরি করা প্রথম প্রকাশ্য রাজপথের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল। চৈতন্য ও তাঁর অনুসারীরা সুফিদের জিকির ও সামার আধ্যাত্মিক গভীরতা ও সম্মিলিত চেতনাকে আত্তীকরণ করে নামসঙ্কীর্তন ও নগরকীর্তনের পদযাত্রা চালু করেন। এই কীর্তনে সুফিদের দলবদ্ধ জিকিরের মতোই গণঅংশগ্রহণ, সম্মিলিত আবেগ ও অভিন্ন সুরের মাধ্যমে এক অপরূপ হিন্দুয়ানী জাগরণ সৃষ্টি হয়। বৈষ্ণবদের আখড়া ছিল মূলত সুফি খানকাহের হুবহু প্রতিরূপ, যা সমাজের নিম্নবর্গকে একইভাবে টেনে আনে। এই কৌশল এতটাই সফল হয় যে বাংলার সাধারণ মানুষ সুফিদের পরিবর্তে বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্তনে নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে শুরু করে (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বাংলায় বৈষ্ণব ধর্ম, পৃষ্ঠা ১৮-২৩, ২৫-২৭, ৪২-৪৫, ৭১-৭২; ফাহমিদ উর রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০-২১, ৬২-৬৪)।
সুফিদের খানকাহকেন্দ্রিক এই মরমী জিকিরের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবটি ছিল সুদূরপ্রসারী, যা প্রথাগত ইতিহাসবিদেরা প্রায়শই এড়িয়ে যান। সুফিরা যখন গভীর রাতে সম্মিলিত কণ্ঠে জিকিরে মেতে উঠতেন, তখন জাতপাতহীন এক সর্বজনীন আধ্যাত্মিক সুরের জন্ম হতো। এই সুরের টানে গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, যারা দিনের বেলা উচ্চবর্ণের ছোঁয়া লাগলে জাতিচ্যুত হওয়ার ভয়ে কুকড়ে থাকত, তারা রাতের আঁধারে খানকাহর মক্তবে এসে একই দস্তরখানে বসে খাবার খেত এবং জিকিরের মজলিশে পরস্পরের হাত ধরে সাম্যের স্পিরিট অনুভব করত। ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষাকর্তারা খুব ভালো করে জানতেন, শুধু ঘরের কোণে বসে শাস্ত্রকথা আউড়ে বা নিম্নবর্ণকে ‘শূদ্র’ বলে গালি দিয়ে এই মরমী জোয়ারকে ধরে রাখা অসম্ভব। কারণ, সুফিদের এই জিকির ছিল অত্যন্ত গতিশীল এবং সামষ্টিক অবচেতনের প্রতীক। শ্রী চৈতন্য এই লিনিয়ার যুদ্ধটি খুব নিপুণভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তিনি দেখলেন, সুফিরা যেভাবে আল্লাহর ‘নাম-মাহাত্ম্য’ এবং সম্মিলিত কণ্ঠের উচ্চধ্বনি দিয়ে গণমানুষের মন জয় করছে, ঠিক সেই একই স্ট্রাকচারকে সনাতন হিন্দুধর্মের কাঠামোতে ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক পাল্টা-আক্রমণের প্রথম ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করল সুফিদের ‘হালকা-ই-জিকির’ বা গোল হয়ে দলবদ্ধভাবে জিকির করার দৃশ্যটি। যাকে চৈতন্য রাতারাতি রূপান্তর করলেন বৈষ্ণবদের সম্মিলিত ‘নামসঙ্কীর্তনে’। সুফিদের জিকিরের সেই সম্মিলিত স্পিরিটটিকে হুবহু হাইজ্যাক করে বৈষ্ণবীয় খোলসে পুরে দেওয়ার এই চতুর নকলনবিশিই ছিল বাংলার ইতিহাসের প্রথম আধ্যাত্মিক জালিয়াতি (সুশীলকুমার দে, Early History of the Vaisnava Faith and Movement in Bengal, পৃষ্ঠা ৫৯-৬০, ১২৩-১২৬; রমাকান্ত চক্রবর্তী, বাংলায় বৈষ্ণব ধর্ম, পৃষ্ঠা ১৮-২৩, ৪২-৪৫; ফাহমিদ উর রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০-২১, ২৪-২৬, ৪১-৪৪, ৬২-৬৪)।
তারা ঠিকই বুঝেছিলো কীভাবে যুগের এবং পতনের স্রোত ঘুরিয়ে দিয়ে নিজেদের অনুগামী বানিয়ে নিতে হয়, কিন্তু আমরাই একমাত্র হতভাগা জাতি, যারা এটি আজও বুঝতে রাজি না। তাদের এই স্ট্রাকচারাল মিমিক্রির সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান রূপটি হলো ‘নগর সংকীর্তন’ বা পদযাত্রার মাধ্যমে রাজপথের স্পেস দখল করা। চৈতন্যের পূর্বে হিন্দুসমাজে ধর্মীয় উপাসনা ছিল মূলত এক নিভৃত, অন্তর্মুখী এবং মন্দিরকেন্দ্রিক পুরোহিততান্ত্রিক আচার। যেখানে সাধারণ ব্রাত্য মানুষের কোনো প্রকাশ্য প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু নদীয়ার সুফি পীরদের নেতৃত্বে মুসলমানেরা যখন দফ বা খঞ্জনি সহযোগে সামা নাচ এবং জিকিরের কাফেলা নিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে প্রকাশ্য যাতায়াত শুরু করলেন, তখন সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে এক বিশাল সংঘশক্তির সঞ্চার হলো। চৈতন্য এই সংঘশক্তিকে কাউন্টার করতে নদীয়ার রাজপথে নামালেন খোল-করতাল সহযোগে ‘নগর কীর্তনের’ বিশাল মিছিল। সুফিদের সামা ও জিকিরের কাফেলা যেভাবে একটি চলন্ত আধ্যাত্মিক তরঙ্গের সৃষ্টি করত, নগর সংকীর্তনও ঠিক সেই একই মডেলে রাজপথের সাহিত্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্থান (Spatial Domain) দখল করার জন্য এক সুসংগঠিত মিছিলে রূপ নিল। বৈষ্ণব কবিরা সুফিদের ‘আশেক-মাশুক’ বা স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির যে মরমি বিরহ-প্রেমের তত্ত্ব ছিল, তাকে হুবহু অনুবাদ করে দাঁড় করালেন রাধাকৃষ্ণের জীবাত্মা-পরমাত্মার তত্ত্বের ওপর। সুফি পরিভাষার ‘ফানা’ বা স্রষ্টার প্রেমে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সেই চরম আত্মহারা অবস্থাকে চৈতন্য রূপ দিলেন বৈষ্ণবীয় ‘ভাবাবেশ’ বা প্রেমে মূর্ছা যাওয়ার নাট্যমঞ্চে। সুফিদের আধ্যাত্মিক সম্পদকে সুকৌশলে নিজেদের ছাঁচে ঢেলে নিম্নবর্ণের মানুষকে এই বার্তা দেওয়া হলো, মুক্তির জন্য তোমাদের ঘর ছেড়ে মুসলমান হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; আমাদের কাছেও সেই একই জিকির, একই সামা এবং একই আত্মহারা প্রেমের আনন্দ বর্তমান আছে (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বাংলায় বৈষ্ণব ধর্ম, পৃষ্ঠা ৪২-৪৫, ৫৯-৬০; সুশীলকুমার দে, Early History of the Vaisnava Faith and Movement in Bengal, পৃষ্ঠা ১২৩-১২৬; ফাহমিদ উর রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০-২১)।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের নেপথ্যে যে গভীর এবং গোপন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ক্রিয়াশীল ছিল, তা সমকালীন মেইনস্ট্রিম ইতিহাসবিদেরা প্রায়শই ধামাচাপা দিয়ে থাকেন। চৈতন্যের রাজপথের এই আন্দোলনের প্রধান ও গোপন রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল তৎকালীন বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজকীয় প্রশাসনের ভেতরে এক প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ধরানো। হোসেন শাহের দরবারের অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে আসীন দুই ব্যক্তি ছিলেন, যারা ‘দবীর খাস’ (প্রধান রাজকীয় সচিব) এবং ‘সাকর মল্লিক’ (রাজকীয় কোষাগারের মন্ত্রী) হিসেবে কাজ করতেন। তারা ছিলেন মূলত কর্ণাটকীয় আমদানিকৃত উচ্চবর্ণের দুই সহোদর 'রূপ গোস্বামী' এবং 'সনাতন গোস্বামী'। এই দুই ভাই একদিকে সুলতানের পরম বিশ্বস্ত পাত্র হিসেবে রাজপ্রশাসনের মূল চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করতেন, আর অন্যদিকে গোপনে নদীয়ার নিমাই পণ্ডিত তথা চৈতন্যের এই বৈষ্ণব পাল্টা-আক্রমণের ল্যাবরেটরির মূল অর্থদাতা ও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। উড়িষ্যার সূর্যবংশী গজপতি রাজা প্রতাপরুদ্র দেব, যিনি ছিলেন হোসেন শাহের কট্টর রাজনৈতিক ও সামরিক দুশমন, তিনিও রাতারাতি চৈতন্যের এই বৈষ্ণবীয় ভক্তি আন্দোলনের দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে চৈতন্যের এই আন্দোলনকে হোসেন শাহের মুসলিম সালতানাতের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বাফার স্টেট বা মনস্তাত্ত্বিক বাঙ্কার হিসেবে ব্যবহার করার সমস্ত রাজকীয় রসদ জোগান দেন। চৈতন্যের এই আন্দোলন নিছক কোনো ভক্তির বন্যা ছিল না; এর পেছনে ছিল সুলতানের রাজদরবারের ভেতরের কতিপয় উচ্চপদস্থ এলিট এবং উগ্র প্রতিবেশী রাজাদের এক নিশ্ছিদ্র ভূ-রাজনৈতিক অক্ষ। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সুফিবাদের গণজোয়ারকে রাজপথের সংঘশক্তি দিয়ে পিষে ফেলা এবং মুসলিম সালতানাতকে গোড়া থেকে দুর্বল করে নিঃশেষ করে দেওয়া (কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী, শ্রীশ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত (মধ্যলীলা), প্রথম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা ২০৪-২০৮; কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী, শ্রীশ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত (মধ্যলীলা), ১৯শ ও ২০শ পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা ৩৪১-৩৪৩; রূপ-সনাতন চরিতচিন্তা, প্রাসঙ্গিক অংশ; ড. রমাচন্দ্র সুব্রহ্মণ্য, The History of the Gajapati Kings of Orissa and Their Successors, Chapter IV, পৃষ্ঠা ১০২-১০৮; স্যার যদুনাথ সরকার (সম্পা.), The History of Bengal: Muslim Period (1200-1757), Chapter VII, পৃষ্ঠা ১৪৮-১৫০; স্যার যদুনাথ সরকার (সম্পা.), History of Bengal (Volume II), পৃষ্ঠা ১৪৪ ও ১৫১; রিচার্ড এম. ইটন, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, Chapter 5, পৃষ্ঠা ১১১-১১৪; Chapter 6, পৃষ্ঠা ১৩১-১৩৩)।
নদীয়ার কাজীর দণ্ডভঙ্গ এবং রাজকীয় আইনের বিরুদ্ধে সংঘশক্তির প্রথম প্রকাশ্য আগ্রাসন
শ্রী চৈতন্য প্রবর্তিত এই নগর সংকীর্তন যখন নদীয়ার অলিগলিতে সুফিদের জিকিরের স্পিরিট চুরি করে এক প্রকাশ্য কোলাহল ও রাজপথ দখলের রাজনীতিতে রূপ নিল, তখন তা তৎকালীন নদীয়ার মুসলিম শাসক এবং সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন শান্তিতে এক বিশাল বিঘ্ন সৃষ্টি করে। নদীয়ার তৎকালীন প্রধান রাজকীয় বিচারক ও গভর্নর, যিনি ইতিহাসে ‘চাঁদ কাজী’ নামে পরিচিত, তিনি দেখলেন, এই নগর সংকীর্তন আসলে কোনো নিরীহ ধর্মীয় আচার নয়। এর আড়ালে সুফিবাদের নীরব সাম্যবাদকে রাজপথে দলবদ্ধ সংঘশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভীতিপ্রদর্শন করা হচ্ছে এবং এটি মুসলিম সালতানাতের আইনের শাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ফলস্বরূপ, চাঁদ কাজী নদীয়ার রাজকীয় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বৈষ্ণবদের এই উচ্চকণ্ঠের কোলাহলপূর্ণ নগর সংকীর্তনের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং কাজীর পেয়াদা বা পুলিশ বাহিনী নদীয়ার একটি বৈষ্ণব পাড়ায় গিয়ে উচ্চকণ্ঠে বাজানো খোল-করতাল ভেঙে দিয়ে আসে। কাজীর এই আইনি পদক্ষেপকে চৈতন্যদেব এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে লুফে নিলেন। তিনি নদীয়ার সমস্ত উচ্চবর্ণের এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত নিম্নবর্ণের মানুষদের একজোট করে কাজীর বাসভবনের দিকে এক বিশাল ও অভূতপূর্ব প্রকাশ্য আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দিলেন। যা ছিলো মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসে রাজকীয় আইনের বিরুদ্ধে সংঘশক্তির প্রথম প্রকাশ্য উগ্রবাদী আগ্রাসন (ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, History of Medieval Bengal, পৃষ্ঠা ৫২৫-৫২৮; স্যার যদুনাথ সরকার, Chaitanya: His Life and Teachings, পৃষ্ঠা ৪২-৪৫)। চৈতন্যের এই কাজী বাড়ি অভিযানের নেপথ্য মনস্তত্ত্বটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তিনি নদীয়ার হাজার হাজার বৈষ্ণবকে সুনির্দিষ্ট কতগুলো দলে বিভক্ত করলেন এবং প্রতিটি দলের সামনে বিশাল বিশাল মশাল জ্বালিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে কাজীর প্রাসাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। সুফিদের নীরব ও নিভৃত আধ্যাত্মিকতার বিপরীতে এই মশাল মিছিলের মূল উদ্দেশ্যই ছিল চাঁদ কাজীকে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে চরম আতঙ্কিত করে তোলা এবং মুসলিম প্রশাসনের ভেতরে এই বার্তা দেওয়া যে, রাজপথের প্রকৃত মালিকানা এখন চৈতন্যের সংঘশক্তির হাতে। বৈষ্ণব চরিতকাব্য চৈতন্যভাগবত এবং চৈতন্যচরিতামৃত-এর প্রামাণ্য পৃষ্ঠা ওল্টালে দেখা যায়, চৈতন্যের এই উগ্র জনতা কাজীর প্রাসাদের সিংহদুয়ার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং কাজীর সুন্দর সুন্দর পুষ্পোদ্যান ও বাগিচার গাছপালা উপড়ে ফেলে এক তাণ্ডবলীলা চালায়। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বপ্রথম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। কাজীর রক্ষীবাহিনী বা পেয়াদারা এই বিশাল ও উন্মত্ত জনতার আকস্মিক আগ্রাসনের সামনে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ে এবং চাঁদ কাজী বাধ্য হয়ে নিজের জীবন ও সম্মান রক্ষা করার জন্য প্রাসাদের গোপন কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে চৈতন্যের সাথে এক সমঝতায় বসতে বাধ্য হন। এই ঘটনাটি ছিল মূলত সুলতানি আমলের আইনি সার্বভৌমত্বের ওপর উচ্চবর্ণীয় এলিটদের দ্বারা চালিত সংঘশক্তির প্রথম নগ্ন বুদ্ধিবৃত্তিক বিজয়, যা কাজীর দণ্ডকে ভেঙে নদীয়ার মুসলিম মানসকে অবচেতনে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার এক মহা তাণ্ডবীয় পদক্ষেপ (কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী, শ্রীশ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত (আদিলীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ), পৃষ্ঠা ১৬৮-১৬৯; কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী, শ্রীশ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত (আদিলীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ, শ্লোক ১৪১-১৪৫), পৃষ্ঠা ১৭০; বৃন্দাবন দাস ঠাকুর, শ্রীচৈতন্য-ভাগবত (মধ্যখণ্ড, ত্রয়োদশ/২৩শ অধ্যায়), পৃষ্ঠা ২৯৭; ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, History of Medieval Bengal, পৃষ্ঠা ৫২৬)।
চাঁদ কাজীর সাথে চৈতন্যের এই গোপন সমঝতার পর যে মনস্তাত্ত্বিক খেলাটি খেলা হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের চোখে কেবলই এক অলৌকিক ‘ধর্মীয় রূপান্তর’ হিসেবে দেখানো হয়। বৈষ্ণব ইতিহাসবিদেরা দাবি করেন, চৈতন্যদেব চাঁদ কাজীকে তাঁর ‘ঐশী মহিমা’ ও ‘প্রেমভক্তি’ দিয়ে রাতারাতি বৈষ্ণব বানিয়ে ফেলেছিলেন এবং কাজী নাকি কাঁদতে কাঁদতে চৈতন্যের পায়ে পড়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু সমকালীন সুফি দলিল এবং বাস্তব ইতিহাসের চুলচেরা লেন্স দিয়ে দেখলে এই জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতিটি সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে যায়। চাঁদ কাজী কোনো অলৌকিক কারণে পরিবর্তিত হননি। তিনি মূলত হোসেন শাহের দরবারের ভেতরে বসে থাকা রূপ ও সনাতন গোস্বামীর সেই শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক অক্ষ এবং উড়িষ্যার গজপতি রাজার সামরিক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এক চরম আত্মরক্ষামূলক সমঝোতা (Political Compromise) করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই সমঝোতার চূড়ান্ত পরিণতিতে চাঁদ কাজী শুধু বৈষ্ণবদের নগর সংকীর্তনের ওপর থেকে আইনি নিষেধাজ্ঞাই তুলে নেননি; বরং তিনি রাজকীয় ফরমান জারি করে ঘোষণা করেন, নদীয়া বা নবদ্বীপে আর কোনোদিন চৈতন্যের এই বৈষ্ণব ধর্মের বা নগর সংকীর্তনের বিরুদ্ধে কোনো মুসলিম কর্মকর্তা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না। এই ফরমানটি ছিল মূলত নদীয়ার মাটিতে সুলতানি প্রশাসনের একচ্ছত্র আইনি আধিপত্যের অবসান এবং বৈষ্ণবীয় সংঘশক্তির প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। শ্রীচৈতন্য এই আইনি সুবিধা ও রাজকীয় রক্ষাকবচ লাভ করার ফলে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষের ক্ষোভকে একটি ভিন্ন আধ্যাত্মিক খাতে প্রবাহিত করতে সক্ষম হন। সমকালীন পূর্ববঙ্গে যখন ইসলাম ও সুফিবাদের জোয়ার নিম্নবর্ণের অন্ত্যজ হিন্দুদেরকে সামাজিক সমতার দিকে আকৃষ্ট করছিল, ঠিক তখন পশ্চিমবঙ্গে চৈতন্যের এই আন্দোলন নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জন্য নিজস্ব কাঠামোর ভেতরেই একটি ‘বিকল্প সুরক্ষাবলয়’ তৈরি করে দেয়। ফলে, ব্যাপক গণ-ধর্মান্তরের যে সুপ্ত সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। তবে চৈতন্যের এই কৌশলী সামাজিক অন্তর্ভুক্তির পরেও হিন্দু সমাজের গভীরে প্রোথিত ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোটি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি; বরং ভক্তির মোড়কে তা একটি ছদ্ম-আবর্তেই আবর্তিত হতে থাকে। ফলে ইসলামের যে তাত্ত্বিক ও সামাজিক সমতার স্পিরিট ছিল, তা নিম্নবর্ণের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছানোর রাজনৈতিক সুযোগটি অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে (স্যার যদুনাথ সরকার, Chaitanya: His Life and Teachings, Chapter IV, পৃষ্ঠা ৪৪-৪৬; রিচার্ড এম. ইটন, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, Chapter 5, পৃষ্ঠা ১১২-১১৫; ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, History of Medieval Bengal, Chapter XIII, পৃষ্ঠা ৫৩২-৫৩৬; ড. আবদুল করিম, Social History of the Muslims in Bengal (Down to A.D. 1538), Chapter V, পৃষ্ঠা ১৯৪-১৯৮)।
কাজী বাড়ি অভিযানের এই ঐতিহাসিক মহড়াটি নদীয়ার স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর এক সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। সাধারণ প্রজারা দেখল, তাদের যে কাজীর দরবার বা আইনি ব্যবস্থা এতকাল অঞ্চলের প্রধান ক্ষমতার উৎস হিসেবে কাজ করত, তা চৈতন্যের মশালধারী সুসংগঠিত নাগরিক সংঘশক্তির সামনে একটি কৌশলগত আপস করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে, তৎকালীন হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের অবচেতনেই রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আইনি সার্বভৌমত্ব নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন তৈরি হয়। সুফিরা যেখানে তাঁদের মরমী জিকির ও সমতাবাদী স্পিরিট দিয়ে অনার্য ও অন্ত্যজ সাধারণ মানুষের মনোজগতে এক নতুন পাটাতন তৈরি করছিলেন, চাঁদ কাজীর এই রাজনৈতিক পিছুহটা সেই জোয়ারে এক মনস্তাত্ত্বিক স্থবিরতা এনে দেয়। রাজপথের এই প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শনে বৈষ্ণবীয় সংঘশক্তির বিজয় নদীয়ার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সমীকরণে চৈতন্যের আন্দোলনকে একটি অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। যা পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে বাঙালি মুসলিম মানসকে আত্মবিস্মৃত করে তোলার প্রথম সুসংগঠিত কারখানা হিসেবে কাজ করেছিল (স্যার যদুনাথ সরকার, Chaitanya: His Life and Teachings, Chapter IV, পৃষ্ঠা ৪৫-৪৭; রিচার্ড এম. ইটন, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, Chapter 5, পৃষ্ঠা ১১৩-১১৬; ড. আবদুল করিম, Social History of the Muslims in Bengal (Down to A.D. 1538), Chapter V, পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৯; ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, History of Medieval Bengal, Chapter XIII, পৃষ্ঠা ৫২৮-৫৩১)।
চৈতন্যের ছদ্ম-সাম্যবাদের ব্যবচ্ছেদ: নিম্নবর্ণের মানুষকে সনাতন খাঁচায় আটকে রাখার প্রতিরক্ষামূলক ড্যামেজ-কন্ট্রোল টুল
শ্রী চৈতন্য এবং তাঁর নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় পরিষদদের দ্বারা চালিত ভক্তি আন্দোলনের মূল শক্তি হিসেবে কলকাতার সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা সবসময় একটি বয়ান অতি চতুরতার সাথে প্রচার করে থাকেন যে, চৈতন্য ছিলেন বাংলার প্রাক-আধুনিক যুগের প্রথম ‘মহৎ সাম্যবাদী’ ও সমাজ সংস্কারক। যিনি জাতপাত ও বর্ণভেদের দেয়াল ভেঙে চণ্ডাল ও ম্লেচ্ছদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সমাজবৈজ্ঞানিক ও নৃবিজ্ঞানগত কষ্টিপাথরে এই মেটা-ন্যারেটিভ বা ছদ্ম-ইতিহাস পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এই সাম্যবাদ ছিল মূলত এক প্রচণ্ড প্রতিরক্ষামূলক ‘ড্যামেজ-কন্ট্রোল টুল’ (Damage-Control Tool)। যার আসল লক্ষ্য কোনো মানবিক সমতা প্রতিষ্ঠা করা ছিল না। সুফিবাদের নিশ্ছিদ্র সাম্যবাদী প্লাবনের মুখে পড়ে নিম্নবর্ণের কোটি কোটি শূদ্র ও নমশূদ্র মানুষ যেভাবে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে সনাতন হিন্দুধর্মের জনসংখ্যার বুনিয়াদটিকে রাতারাতি ফাঁকা করে দিচ্ছিল—সেই মহাপতন ও গণ-ধর্মান্তরকে ঠেকাতে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ সন্তান চৈতন্য ভক্তি ও প্রেমের এক কৃত্রিম ও প্রমোশনাল ছদ্ম-সাম্যবাদের খোলস তৈরি করলেন। যাতে নিম্নবর্ণের মানুষকে সনাতন খাঁচার ভেতরেই চিরতরে আটকে রাখা যায়। মূল কথা হচ্ছে- এ দেশের জনসমাজে ইসলামের সাম্যবাদী ধারণা প্রসারের ফলে বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি হয় এবং নিপীড়িত মানুষের মধ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সাড়া পড়ে যায়। এই ধর্মান্তর ঠেকানোর জন্য এসব ভারতীয় সাধক সন্ন্যাসীরা ইসলামের সাম্যের ধারণাকে আত্মস্থ করে ভক্তিবাদ প্রচার করেন এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষকে সেখানে আশ্রয় দেওয়ার আশ্বাস দেন। আসলে তারা ভক্তিবাদের আড়ালে হিন্দুধর্মের আত্মরক্ষার লড়াই শুরু করেছিলেন। আমাদের এখানকার কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীর লেখা পড়লে মনে হয়, শ্রী চৈতন্য বোধ হয় এ দেশের মানুষকে উদ্ধার করতে এসেছিলেন। এটা একটা অনৈতিহাসিক কথা। শ্রী চৈতন্য কোনো সমন্বয়ী ধর্ম প্রচার করেননি। তিনি হিন্দু ধর্মকে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রক্ষা করেছিলেন মাত্র (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৭-২৮)।
এই ছদ্ম-সাম্যবাদের আসল মেকানিজমটি বুঝতে হলে আমাদের চৈতন্যের অভ্যন্তরীণ বৃত্ত বা পরিষদদের ‘বর্ণভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস’ অত্যন্ত ভালোভাবে নিরীক্ষা করতে হবে। বৈষ্ণব ইতিহাসবিদেরা বুক ফুলিয়ে হরিনাম প্রচারকারী যবন হরিদাসের (যিনি জন্মসূত্রে মুসলমান ছিলেন) উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করতে চান, বৈষ্ণবধর্মে কোনো জাতবিচার ছিল না। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, হরিদাসকে চৈতন্যের কাফেলায় কেবল একটি প্রমোশনাল ও বাহ্যিক আইকন বা ‘টোকেন মুসলিম’ (Token Muslim) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। যাতে মুসলিম সমাজ থেকে নিম্নবর্ণের মানুষেরা আর আকর্ষিত না হয়। হরিদাসের ভক্তির গভীরতা সত্য হতে পারে, কিন্তু বৈষ্ণবদের সমাজ-কাঠামোতে তাঁর প্রকৃত স্থানটি কোথায় ছিল? চৈতন্যের প্রধান পরিষদ ও উত্তরাধিকারী রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী বা জীব গোস্বামীর মতো কট্টর কনৌজী ব্রাহ্মণ সন্তানেরা যখন পুরী বা বৃন্দাবনে বসে বৈষ্ণব ধর্মের মূল আচরণবিধি বা ‘হরিভক্তিবিলাস’ শাস্ত্র গ্রন্থ রচনা করলেন, তখন তারা চতুরতার সাথে সেই কট্টর আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদের বর্ণাশ্রম প্রথা ও স্মার্ত রঘুনন্দনের জাতপাতের অনুশাসনকেই পিছনের দরজা দিয়ে পুনরায় পুরো বৈষ্ণব সমাজের ওপর আষ্টেপৃষ্ঠে চাপিয়ে দিলেন।
এই গ্রন্থে মূলত গোপালভট্ট গোস্বামীর দৃষ্টিভঙ্গিকে একচ্ছত্রভাবে রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখানে শ্রীচৈতন্যের সেই আদি ও অকৃত্রিম বাঁশরীবাদক কৃষ্ণের মানবীয় রূপকে সম্পূর্ণ ছেঁটে ফেলে বৈদিক ঘরানার চতুর্ভুজ বিষ্ণু এবং ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবগুরুর বিশেষ আমলাতান্ত্রিক অধিকারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। চরম জাতপাত ও বর্ণবাদের নগ্ন আইনি সিলমোহর দিয়ে এই ‘হরিভক্তিবিলাসে’ স্পষ্ট বিধান জারি করা হলো, শূদ্রদের কেবল ব্রাহ্মণদের বা দ্বিজদের সেবার (শুশ্রূষা) মাধ্যমেই নিজেদের পবিত্র জীবিকা বা ‘শুক্ল’ অর্জন করতে হবে এবং উচ্চবর্ণের কোনো মানুষ যদি অবহেলাবশত চণ্ডাল দর্শন করে ফেলে, তবে সূর্যের দিকে তাকিয়ে তাকে সেই মহাপাপ স্খলন করতে হবে। ড. সুশীলকুমার দে-র মতো প্রখ্যাত ঐতিহাসিকেরা স্পষ্ট দেখিয়েছেন, চৈতন্যবাদ আসলে কখনই বৈষ্ণবীয় অধিকারকে শাস্ত্রীয় আচার বা পুরোহিততন্ত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে বৈষম্যহীনভাবে সাধারণ সমস্ত নর-নারীর হাতে তুলে দিতে চায়নি। হরিদাসের মতো ভক্তকে মৃত্যুর পরেও বৈষ্ণবদের মূল শ্মশানের বাইরে গিয়ে কবর দিতে হয়েছিল। কারণ সনাতন বর্ণবাদী সমাজ তাকে ঘরের ভেতরে জায়গা দেওয়ার মতো কোনো ‘বাস্তব সাম্যবাদ’ ধারণ করত না; বরং তা ব্রাহ্মণ্যবাদী খাঁচার এক সুকৌশলী রূপান্তর মাত্র (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ৭২-৭৩)।
এই ড্যামেজ-কন্ট্রোল টুলের আসল রূপটি প্রকাশ পায় যখন আমরা দেখি কীভাবে নিম্নবর্ণের মানুষদের নগর সংকীর্তনে প্রকাশ্যভাবে নাচ-গানের অধিকার দেওয়া হলেও, তাদের প্রাত্যহিক ‘সামাজিক গতিশীলতা’ বা সোশাল মবিলিটি (Social Mobility) সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে রাখা হয়েছিল। চৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল, কৃষ্ণের সামনে সবাই সমান, কিন্তু সমাজের ভেতরের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ বা বর্ণপ্রথা অপরিহার্য। অর্থাৎ, তোমরা যখন রাজপথে খোল-করতাল নিয়ে হরিনাম গাইবে, তখন তোমরা ভাই ভাই। কিন্তু সংকীর্তন শেষে যখন ঘরে ফিরবে, তখন ডোম ডোমই থাকবে, কায়স্থ কায়স্থই থাকবে এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিত সর্বোচ্চ আসনেই আসীন থাকবে। নিম্নবর্ণের কোনো মানুষের কোনোদিন বৈষ্ণবদের মূল শাস্ত্রপাঠ, মন্দির পরিচালনা বা উচ্চবর্ণের কন্যাকুলকে বিয়ে করার মতো কোনো বাস্তব ও বস্তুগত অধিকার (Material Right) এই ভক্তি আন্দোলনে ছিল না। এটি ছিল মূলত নিম্নবর্ণের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভকে হরিনামের মাদকতা দিয়ে শান্ত রাখার এক আশ্চর্য চতুর আফিম। যা তাদের চিরকাল ব্রাহ্মণ্যবাদের সেবা করার এক মধুর ও তাত্ত্বিক দাসত্বে অভ্যস্ত করে তুলেছিল। সুফিরা যেখানে মুসলমানদের এক কাতারে দাঁড় করিয়ে নামায ও দস্তরখানের বাস্তব সাম্য দিয়ে মানুষের আর্থ-সামাজিক সত্তাকে মুক্ত করেছিলেন, চৈতন্যের ভক্তি আন্দোলন তার বিপরীতে নিম্নবর্ণকে এক চিরস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২২; আহমদ শরীফ, বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, 'মধ্যযুগের সমাজ ও সাহিত্য' পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা ২৫৪-২৫৮; Dr. Joseph T. O'Connell, "Vaishnava Perceptions of Muslims in Sixteenth-Century Bengal", Journal of the American Oriental Society, Vol. 93, No. 3, পৃষ্ঠা ৩৪০-৩৪৪; ড. সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১ম খণ্ড, পূর্বার্ধ), 'চৈতন্যাবদান ও গোস্বামী সমাজ' অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩১৬-৩২০)।
এই ছদ্ম-সাম্যবাদের করুণ পরিণতি দেখতে পাওয়া যায় চৈতন্যের তিরোধানের মাত্র এক শতাব্দীর ব্যবধানে, যা কলকাতার ভদ্রলোক ইতিহাসবিদেরা সুপরিকল্পিতভাবে ব্ল্যাকআউট করে গেছেন। চৈতন্য যখন পুরীতে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ বা মারা গেলেন, তখন বৃন্দাবনের কট্টর আর্য ‘ষড়গোস্বামী’রা এই ভক্তি আন্দোলনকে নিছক এক শাস্ত্র-সর্বস্ব, নিরামিষ এবং আনুষ্ঠানিক কাল্টে রূপান্তর করে এর ভেতরের লৌকিক স্পিরিটটিকে সম্পূর্ণ শুষ্ক করে ফেলেন। এর ফলে, যে নিম্নবর্ণের মানুষেরা হরিনামের বন্যায় গা ভাসিয়েছিল, তারা নিজেদের পুনরায় সেই পুরনো বর্ণবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। চৈতন্যের প্রধান পরিষদ নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্রের অনুসারী এই অবদমিত ব্রাত্য মানুষেরা আর এক ধাপ অগ্রসর হয়ে বৈষ্ণবদের শাস্ত্রীয় কঠোরতা অস্বীকার করে ‘নেড়ানেড়ির দল’ বা সহজিয়া বাউল সম্প্রদায়ের পত্তন করে। বৈষ্ণব গুরু ও মোহান্তগণ তখন তাদের মিশনারি আদর্শ সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে মোহান্তগিরি বা গুরুদর্শনকে এক লাভজনক উপার্জনের ব্যবসা বানিয়ে ফেলেন। তারা দীক্ষাদান, মন্ত্রশিক্ষা এবং সাধনভজনের প্রতিটি স্তরে নিম্নবর্ণের ভক্তদের ওপর চড়া ‘দক্ষিণা’ ও ‘ভেট’ প্রদানের আইনি অনুশাসন জারি করেন। যা নিম্নবর্ণের সাধারণ দরিদ্র মানুষকে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক শোষণের মুখে ঠেলে দেয়। সুফিবাদের যে প্লাবনকে ঠেকানোর জন্য শ্রী চৈতন্য এই আদি ল্যাবরেটরি খাড়া করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত এক প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়াশীল এবং রক্তচোষা মোহান্ততন্ত্রে পরিণত হয়ে বাংলার সাধারণ সমাজকে এক প্রকাণ্ড মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকারে নিপতিত করেছিল। যার বিরুদ্ধে পরবর্তীকালে হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলনকে এক বিশাল সামাজিক তলোয়ার নিয়ে ময়দানে নামতে হয়েছিল।
সংকীর্তনের নেপথ্য কোরিওগ্রাফি: সুফি হালকা-ই-জিকিরের ব্যাকরণ চুরি এবং বাদ্যযন্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
একটি আধ্যাত্মিক ধারাকে কাউন্টার করতে হলে কেবল তার স্লোগান বা বাণী নকল করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার পেছনে থাকা মানুষের অবচেতনের ছন্দ ও শারীরিক উদ্দীপনাকেও হাইজ্যাক করতে হয়। শ্রী চৈতন্য এবং তাঁর নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় পরিষদেরা খুব ভালো করে জানতেন, সুফিবাদের বিপুল সামাজিক ও ধর্মীয় বিজয়ের মূলে ছিল তাদের দলবদ্ধ জিকিরের এক মোহময় মনস্তাত্ত্বিক কোরিওগ্রাফি। সুফি-সাধকেরা যখন গভীর রাতে খানকাহর ভেতরে গোল হয়ে বসতেন, তখন তারা ‘হালকা-ই-জিকির’ বা জিকিরের চক্র তৈরি করতেন। এই চক্রের ভেতরে সুফিরা এক বিশেষ ছন্দে মাথা এবং শরীর দুলিয়ে, একটি নির্দিষ্ট লয়ে ‘আল্লাহু’ বা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ধ্বনি উচ্চারণ করে এক সম্মোহনী ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের জন্ম দিতেন। যা সুফি পরিভাষায় পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনের তীব্র আকুলতা বা ফানা-ফিল্লার আধ্যাত্মিক অবস্থা নির্দেশ করে। সেন রাজাদের নিষ্ঠুর সামাজিক নিষ্কাশনে পিষ্ট হওয়া প্রান্তিক মানুষেরা যখন গভীর রাতে খানকাহর এই জিকিরের ভেতরের সাম্যবাদী ছন্দটি প্রত্যক্ষ করত, তখন তাদের অবচেতনে এক প্রকাণ্ড আলোড়ন তৈরি হতো। নদীয়ার ল্যাবরেটরিতে বসে চৈতন্য এই জিকিরের ভেতরের ছন্দ ও ব্যাকরণটিকে সুনিপুণভাবে আত্তীভূত করলেন। তিনি সুফিদের জিকিরের সেই বৃত্তাকার শারীরিক কোরিওগ্রাফিকে হুবহু কপি করে বৈষ্ণবদের ‘নামসঙ্কীর্তনের’ মূল বৃত্ত হিসেবে দাঁড় করালেন। সুফিরা যেভাবে গোল হয়ে জিকির করত, বৈষ্ণবেরাও ঠিক সেই একই মডেলে গোল হয়ে, হাত ধরাধরি করে, শরীর দুলিয়ে হরিনামের উন্মাদনায় মেতে উঠল। যা ছিল মূলত সুফি হালকা-ই-জিকিরের এক চতুর ও বাহ্যিক নকলনবিশি (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২৭-২৮; ড. মমতাজুর রহমান তরফদার, Hussain Shahi Bengal, পৃষ্ঠা ২২৮)।
এই স্ট্রাকচারাল মিমিক্রির সবচেয়ে মারাত্মক উপাদানটি ছিল সুফিদের আধ্যাত্মিক ছন্দের গতি বাড়ানোর ব্যাকরণটিকে কীর্তনের ভেতরে আত্তীকরণ করা এবং তার মনস্তাত্ত্বিক ব্যবহার। সুফি-সাধকেরা তাঁদের খানকাহ এবং মাহফিলে আধ্যাত্মিক জিকিরের লয়টি ধীর থেকে শুরু করে ক্রমশ দ্রুততর করতেন, যা মানুষের মনোজগতে এক তীব্র মরমী ও সম্মোহনী আবহ তৈরি করত। চৈতন্য এবং তাঁর উপদেষ্টারা দেখলেন, সুফিবাদের এই মনস্তাত্ত্বিক প্লাবনকে কাউন্টার করতে হলে লোকায়ত মাটির কাছাকাছি থাকা প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র ‘খোল’ বা মৃৎ-মৃদঙ্গ এবং ‘করতাল’-কে একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্যে নতুন করে ব্যবহার করতে হবে। পলিমাটির তৈরি এই খোল সাধারণ কৃষক সমাজের অবচেতনে রাতারাতি এক অর্গানিক টান তৈরি করেছিল। সুফিরা যেভাবে জিকিরের লয় ও উন্মাদনা ধীর থেকে দ্রুততর করতেন, বৈষ্ণবেরাও ঠিক সেই একই মেকানিজমে খোলের বোলে ছন্দের গতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে এক কৃত্রিম ‘ভাবাবেশ’ বা উম্মাদনায় ভাসিয়ে দিতে শুরু করল। সুফিদের জিকিরের সেই বৃত্তাকার শারীরিক কোরিওগ্রাফি এবং ভাবাবেগের তীব্র ‘দশা’ তৈরির যে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকরণ, তা মূলত বৈষ্ণবেরা তাদের ‘নামসঙ্কীর্তনের’ মূল বৃত্ত হিসেবে দাঁড় করালেন। সুফিরা যেভাবে গোল হয়ে জিকির করতেন, বৈষ্ণবেরাও ঠিক সেই একই মডেলে গোল হয়ে, শরীর দুলিয়ে হরিনামের উন্মাদনায় মেতে উঠলেন। এই বাহ্যিক আত্তীকরণ কোনো আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন ছিল না; বরং প্রখ্যাত গবেষকেরা স্পষ্ট দেখিয়েছেন, এটি ছিল ভক্তির আড়ালে সুফিবাদের সামাজিক জোয়ার ও ধর্মান্তর ঠেকানোর জন্য হিন্দুধর্মের এক সুকৌশলী আত্মরক্ষার লড়াই। দফের মতো সুফিদের গম্ভীর ও অন্তর্মুখী জিকিরের আবহকে খোলের তীব্র ও বহির্মুখী কোলাহল দিয়ে রাজপথে পিষে ফেলার এই কৌশলই ছিল মধ্যযুগীয় বাংলার প্রথম মনস্তাত্ত্বিক নান্দনিক যুদ্ধ (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২৭-২৮; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৭)।
বাদ্যযন্ত্রের এই কোরিওগ্রাফিকে রাজপথে এক অপ্রতিরোধ্য সংঘশক্তিতে রূপ দেওয়ার জন্য চৈতন্য সুফিদের ‘সামা’ বা সুফি নৃত্যের বাহ্যিক রূপটিকেও সুকৌশলে বৈষ্ণবধর্মে আত্তীকরণ করলেন। পারস্যের মওলানা জালালুদ্দিন রুমির সিলসিলা হয়ে সুফিদের মধ্যে যে ‘রাকস’ বা বৃত্তাকার আধ্যাত্মিক নৃত্যের চল ছিল—যেখানে সাধকেরা স্রষ্টার প্রেমে ব্যাকুল হয়ে দুই হাত আকাশে তুলে গোল হয়ে ঘুরতেন—চৈতন্য সেই সুফি নৃত্যের পবিত্র অবয়বটিকে হুবহু কপি করে বৈষ্ণবদের ‘বাহু তুলে নৃত্য’ করার মুদ্রায় রূপান্তর করলেন। সুফিরা যখন হাত আকাশে তুলতেন, তখন তার অর্থ ছিল স্রষ্টার রহমত ও ফয়েজকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করা। চৈতন্য সেই একই শারীরিক মুদ্রা বৈষ্ণবদের শিখিয়ে বললেন, এটি হলো কৃষ্ণের বিরহে রাধার দুই হাত তুলে ডাকার ব্যাকুলতা। সুফিদের এই গভীর ও সূক্ষ্ম কায়াসাধনার সম্পদকে বৈষ্ণবীয় ছাঁচে ঢেলে দেওয়ার ফলে সাধারণ নিরক্ষর ব্রাত্য সমাজ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল, সুফিদের খানকাহের ভেতরে যে নাচ, যে জিকির এবং যে আধ্যাত্মিক মত্ততা আছে, নদীয়ার রাজপথে চৈতন্যের খোল-করতালের ভেতরেও তো ঠিক সেই একই আনন্দ আরও তীব্রভাবে বর্তমান। এই চতুর কোরিওগ্রাফি ও খোলের বোলের নিচে সুফিবাদের যে নীরব সাম্যবাদী গণজোয়ার বাংলার নিম্নবর্ণের মানুষকে মুক্তির স্বাদ দিচ্ছিল, তা পশ্চিমবঙ্গে এক প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক বাধার মুখোমুখি হয়ে পড়ে (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২৭-২৮; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৭)।
পরবর্তীকালে বাংলার মুসলিম সমাজে শোধনবাদী বা নজদী সালাফী আন্দোলনের প্রভাবে যখন মিলাদের মুস্তাহাব পদ্ধতি (হাদীস অনুযায়ী) এবং সুফি আরাধনার এই বাহ্যিক রিচুয়ালগুলোকে ‘বেদাত’ বা অনৈসলামিক উদ্ভাবন বলে ঝেড়ে বিদায় করার ধারা শুরু হয়, তখন তা সাধারণ গ্রামীণ মুসলমান মানসে এক তীব্র সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতার জন্ম দেয়। সুফি ঐতিহ্য হারানোর ফলে সহজ-সরল ব্রাত্য মুসলমানেরা তাঁদের সমবেত আধ্যাত্মিক বিনোদন বা কোরিওগ্রাফির যে স্পেক্টাকলটি হারিয়ে ফেলেছিলেন, নদীয়ার রাজপথের বৈষ্ণবীয় নগরকীর্তন, যাত্রাপাল ও মন্দিরের উৎসবগুলো সেই ফাঁকা মনস্তাত্ত্বিক পাটাতনটিকে রাতারাতি দখল করে নেয়। ফলে, সুফিদের দূরে ঠেলে দিলেও বাংলার গ্রামীণ মুসলমানেরা অবচেতনে কীর্তনের মাদকতা ও মন্দিরের সমবেত কোরাস সুরের আকর্ষণে ধাবিত হতে শুরু করে। আজও মন্দিরে মন্দিরে কীর্তনগানের আসরে এই স্রোত বহমান।
নজদী শোধনবাদীরা সুফিদের জিকিরের বৃত্ত, সুর, কিংবা ‘সামা’ ও আধ্যাত্মিক নৃত্যকে বেদাত বললেও, ইসলামের মূল উৎস (কুরআন ও সহীহ হাদীস) বিশ্লেষণ করলে এর সুষ্পষ্ট প্রামাণিক বৈধতা পাওয়া যায়। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহাফের ২৮ নম্বর আয়াতে সমবেতভাবে আল্লাহর স্মরণে আবদ্ধ থাকার প্রত্যক্ষ নির্দেশ রয়েছে (কুরআন, ১৮:২৮)। এছাড়া সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের সুপ্রসিদ্ধ হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আল্লাহর বান্দারা যখন কোনো মজলিশ বা জিকিরের ‘হালকা’-তে সমবেত হয়ে উচ্চস্বরে জিকির করে, তখন আল্লাহর ফেরেশতারা সেই সমবেত চক্রকে ডানা দিয়ে ঘিরে ধরেন এবং তাদের ওপর আল্লাহর বিশেষ শান্তি (সাকিনাহ) নাজিল হয় (সহীহ বুখারী: ৭৪০৫ এবং ৬৪০৮; সহীহ মুসলিম: ২৬৮৯)।
বাদ্যযন্ত্র বা ‘দফ’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রত্যক্ষ অনুমতি প্রমাণিত। সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈদাইনে বর্ণিত আছে, ঈদের দিনে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর ঘরে দুই বালিকা ‘দফ’ (tambourine) বাজিয়ে আনসারদের ঐতিহাসিক বুয়া'স যুদ্ধের বীরত্বগাথা সঙ্গীত গাইছিল। হযরত আবু বকর রা. এসে একে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র বলে ধমক দিলে আল্লাহর রাসূল ﷺ নিজের মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে বলেন, "হে আবু বকর, ওদের ছেড়ে দাও, কারণ প্রত্যেক জাতিরই ঈদের দিন থাকে, আর আজ আমাদের ঈদের দিন" (সহীহ বুখারী: ৯৪৯, ৯৫২)। মানে দফ শরিয়াসম্মত এবং প্রমাণিত। শুধু তাই নয়, সুফিদের সেই বৃত্তাকার আধ্যাত্মিক নৃত্য বা ‘রাকস’-এর আদি অবয়বটি খোদ মদীনার মসজিদে নববীর ভেতরেই আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সামনে সাব্যস্ত হয়েছিল। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত সহীহ হাদীস অনুসারে, আবিসিনিয়ার কৃষ্ণাঙ্গ সাহাবীরা (হাবশীরা) আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সামনে মসজিদে নববীর চত্বরে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ঢাল-বল্লম নিয়ে এক আধ্যাত্মিক ছন্দে নৃত্য (যাফন/রাকস) করছিলেন এবং নিজেদের ভাষায় উচ্চারণ করছিলেন, ‘মুহাম্মদ এক সৎ বান্দা’। যা দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের উৎসাহিত করে বলেছিলেন, "হে বনু আরফিদাহ, তোমরা চালিয়ে যাও" (মুসনাদে আহমাদ: ১২৫৪০, সহীহ বুখারী: ৯৪৯)। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যায়েদ, জাফর ও আলী রা.-এর প্রশংসা করলে তাঁরা আনন্দে ‘হাজল’ করেছিলেন—অর্থাৎ উচ্ছ্বাসে এক পা তুলে অন্য পায়ে লাফিয়েছিলেন (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৮৫৭)। একই হাজাল বা পায়ের উপর ভর করে লাফানোর এবং নাচার এই বর্ণনার পর ইমাম বায়হাকী রাহি. আলাদা একটি বাব বা অধ্যায় কায়েম করে বলেন,
باب من رخص في الرقص إذا لم يكن فيه تكسر وتخنث
অর্থাৎ, এমন নৃত্যের অনুমতি সম্পর্কে অধ্যায়, যার মধ্যে অশোভন ভঙ্গি বা নারীতুল্য ভঙ্গি নেই।
পরবর্তীতে তিনি আলী, জাফর এবং যায়দ রাযি.-দের 'হাজাল' সংক্রান্ত বর্ণনাটি উল্লেখ করে বলেন, যদি বর্ণনাটি সহীহ (বিশুদ্ধ) প্রমাণিত হয়, তবে তা থেকে আনন্দে এক পায়ে ভর দিয়ে অন্য পায়ে লাফানোর বৈধতা নির্দেশ করে। একই সাথে, অনুরূপ কোনো নৃত্যও এই একই বিধানের আওতাভুক্ত হতে পারে। এখানে একজন ক্লাসিক্যাল হাদিস বিশারদ স্বয়ং 'হাজাল' থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সমজাতীয় নৃত্যের বৈধতার বিষয়টি অনুমান (Infer) করেছেন (সুনান আল-কুবরা, ইমাম বাইহাকী, ১৯৩৩১)।
ইমাম আহমদ শাকির (১৮৯২–১৯৫৮ খ্রি.) রাহি. মুসনাদে আহমদ-এর তাহকিকে আলী (রা.)-এর বর্ণিত হাজাল-যুক্ত হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন (মুসনাদ আহমদ, হাদীস ৮৫৭)। আর ইমাম আবদুর রহিম আল-ইরাকি (১৩২৫–১৪০৪ খ্রি.) রাহি. একই ঘটনার বর্ণনাটিকে হাসান সনদ বলেছেন (তাখরিজু আহাদিস আল-ইহইয়া, ২/৩৭৪)।
সুর তোলে জিকির, দফ জাতীয় বাদ্যযন্ত্র, হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে বসা, ছন্দ তৈরি করা এবং সমবেত কণ্ঠে আল্লাহর প্রেমে নৃত্য ও জিকির করার সুফি পদ্ধতিটি কুরআন-সুন্নাহর আইন ও আদি স্পিরিট দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত। সমকালীন সমাজবিজ্ঞানীরাও মনে করেন, সুফি খানকাহর সেই সাম্যবাদী হালকায়ে জিকির এবং মরমী ভাবাদর্শ যদি গ্রামীণ সমাজে আবার তার আদি ও শুদ্ধ রূপে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়, তবে ইসলামের সেই তাত্ত্বিক ও বাস্তব সাম্যবাদের তীব্র আকর্ষণ সাধারণ মানুষের মনোজগতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করবে। যা মানুষকে কৃত্রিম আধ্যাত্মিক মাদকতার খাঁচা থেকে মুক্ত করে পুনরায় ইসলামের দিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফিরিয়ে আনতে অন্যতম প্রধান মনস্তাত্ত্বিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। শেকড় ভুলে শাখা কখনো বাঁচতে পারে না, ফল দিতে সক্ষম হয় না। এই অঞ্চলের মানুষের মনে ইসলামের আদি বীজ যাঁরা রোপণ করেছিলেন, তাঁরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালোভাবে জানতেন কীভাবে কুরআন সুন্না'র ব্যাপক আলো থেকে ইজতেহাদের সাহায্য নিয়ে কোন কোন পদ্ধতিতে এর শেকড় গভীর করতে হবে। জমিন ও মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী যে আয়াত ও হাদীসের আমল জারির দরকার ছিলো, তাঁরা সেটাই করেছিলেন। এই জন্য তাঁদের রেখে যাওয়া দ্বীন এমন পাকাপোক্ত ও শক্তভাবে এই জমিনের পরতে পরতে মিশে গেছে যে, শত ঝড়-ঝাপটা আর হাজার বছরের ঢেউ-বন্যা সত্ত্বেও এখান থেকে ইসলামের প্রদীপ নেভানো সম্ভব হয়নি। তাঁদেরই দিকনির্দেশনা এবং শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মুসলিম সুলতানরা দাপটের সাথে সুদীর্ঘকাল শাসন করে গেছেন এই অঞ্চল। ইসলামের জয়জয়কার ছিলো এখানে। পুরো ভারত উপমহাদেশের আদি বিদ্যাপিঠ তথা কুরআন-সুন্নাহ, হাদীস-ফিকহের সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার গৌরব এই বাংলারই। আকাবিরদেরও আকাবির এই সোনার বাংলা। ১৩শ শতকের শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা রাহি. এর সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো পুরো ভারতবর্ষের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উলুমে নবুওয়াতের বিদ্যাপীঠ।
যেখানে কেবল কুরাআন-হাদীস, বুখারি-মুসলিম পড়ানো হতো, এমন না। সমান্তরালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন বিজ্ঞান (যেমন, গণিত, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন ইত্যাদি) ও দর্শনের পাঠও চলতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে আলেম-উলামা এবং মুসলিমরা সংখ্যায় বিশাল হয়েও, তাঁদের চেতনা ও কর্মপন্থা থেকে পিছিয়ে থাকার কারণে হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও কূলকিনারা করে ওঠতে পারছেন না। হাঁসফাঁশ অবস্থা চলছে। কারণ হলো, কোন অঞ্চলের মনস্তত্ত্ব কেমন এবং কুরআন-সুন্না'র সাথে প্রাসঙ্গিক রেখে সেখানে কী ফর্মুলা এপ্লাই করতে হবে, সুফিদের সেইসব আদি শেকড় থেকে সেটা বুঝার, জানার এবং মানার গরজ নেই। হিন্দুস্তান-পাকিস্তান থেকে দ্বীন আমদানি করতে ব্যস্ত, অথচ নিজের ঘরের পাশেই এর শেকড় এবং সবচেয়ে কার্যকর ফর্মুলা পড়ে আছে। যেগুলো অতিসহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব; ফলাফল গভীর, দ্রুত এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপই করা হচ্ছে না। নব্য শোধনবাদীদের মাইন্ডে সেগুলোকে বেদাত ভাবা হচ্ছে হয়তো। বাস্তবতা হলো, তাঁদের কাজ বেদাত ছিলো না। কুরআন সুন্নাহ থেকে ইজতিহাদের ভিত্তিতে উদ্ভূত ছিলো এবং আজও তা ফলদায়ক। আমাদের বর্তমান প্রচেষ্টার চেয়েও হাজারগুণে প্রাসঙ্গিক। তাঁরাই প্রকৃতার্থে বুঝেছিলেন কুরআন-সুন্না'র কোন অংশের কীরূপ আলো দিয়ে এই জমিন আবাদ করা এবং আলোকিত করা সম্ভব। আর তাঁরা সেটা করে দেখিয়েছেনও। প্রমাণিত সত্য সেগুলো। শেকড় যেখানে সেখানেই ফেরা তাই বুদ্ধিমত্তার কাজ।
কাজীর ক্ষমতার ফাটল এবং নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় সমাজনেতাদের নতুন প্রশাসনিক সমঝতা
তৎকালীন বাংলার সুফি সমাজের আধ্যাত্মিক রিচুয়ালগুলো আত্তীকরণের পাশাপাশি, চাঁদ কাজীর বাসভবনে মশালধারী বৈষ্ণব জনতার সেই অভূতপূর্ব তাণ্ডব এবং কাজীর দণ্ডভঙ্গের পর নদীয়ার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষমতার স্থানবদল ঘটে। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের মুসলিম সালতানাত এতকাল এ দেশের মেহনতি ও প্রান্তিক মানুষকে যে আইনি সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তা দিচ্ছিল, কাজীর সেই রাজনৈতিক সমঝোতার ফলে প্রশাসনিক কাঠামোতে এক প্রকাণ্ড ফাটল দেখা দেয়। নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ সমাজনেতারা খুব ভালো করে বুঝতে পারলেন, কাজীর এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করে নদীয়ার মূল শাসনক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করতে হবে। তারা কাজীর সাথে কেবল ধর্মীয় সমঝতাই করলেন না; বরং কাজীর আদালতের সমান্তরালে এক নতুন ‘স্মার্ত-বৈষ্ণব প্রশাসনিক সিন্ডিকেট’ গড়ে তুললেন। এই সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য ছিল, কাজীর আদালতকে এক ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করে নদীয়ার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ফয়সালা ও সামাজিক অনুশাসন সম্পূর্ণভাবে উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। যা ছিল মূলত সালতানাতের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এলিটদের এক সুপরিকল্পিত ও নীরব অভ্যুত্থান (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২২-২৩, ২৭-২৮, ৭২; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৭)। এই প্রশাসনিক সমঝতার নেপথ্য কৌশল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কাজীর দণ্ড ভেঙে যাওয়ার পর নদীয়ার সাধারণ প্রান্তিক মানুষেরা দেখল, যেকোনো সামাজিক বা বিচারিক সংকটে কাজীর আদালতের চেয়ে চৈতন্যের বৈষ্ণব আখড়া এবং তাদের পরিষদদের সিদ্ধান্তই বেশি শক্তিশালী ও কার্যকরী হচ্ছে। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নদীয়ার এই তীব্র গণ-বিক্ষোভের মুখে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার তাগিদে কাজীর ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে খর্ব করে দেন এবং বৈষ্ণবদের নগর সংকীর্তনকে এক বিশেষ রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে আইনি সুরক্ষাকবচ বা ‘স্বাধিকার’ দিতে বাধ্য হন। সুলতানি প্রশাসনের এই আইনি ছাড়ের সুযোগ নিয়ে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজনেতারা নদীয়ার গ্রামীণ সমাজ-কাঠামোতে পুনরায় তাদের পুরনো কট্টর বর্ণাশ্রম প্রথা ও নব্যস্মৃতির প্রবক্তা রঘুনন্দনের বজ্রবন্ধনের লোহার দেয়াল তুলে দেন। এই স্মার্ত-বৈষ্ণব সমাজপতিরা সমাজে এমন এক কড়া সামাজিক অনুশাসন জারি করেছিলেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ফয়সালা কাজীর আদালতের সমান্তরালে সম্পূর্ণভাবে উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ভক্তির বাহ্যিক মাদকতা রাজপথে থাকলেও, ঘরের ভেতরে নিম্নবর্ণের মানুষেরা পুনরায় এক নিশ্ছিদ্র সামাজিক ও বর্ণবাদী ফাঁদে আটকা পড়ে যায়, যা তাদের চিরকাল উচ্চবর্ণের সেবা করার এক তাত্ত্বিক দাসত্বে অভ্যস্ত করে তুলেছিল (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২২-২৩, ৭২)।
এই প্রশাসনিক সমঝোতার সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাটি লেগেছিল নদীয়ার সাধারণ গ্রামীণ মুসলমান ও নব-দীক্ষিত ব্রাত্য মুসলমান সমাজের অবচেতনে। কাজীর প্রকাশ্য নতিস্বীকারের ফলে গ্রামীণ মুসলমানেরা তাদের প্রধান প্রশাসনিক ও আইনি অভিভাবকত্ব হারিয়ে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অসহায়ত্বের মুখে পড়ে। তৎকালীন নবদ্বীপের শাসনকাঠামোতে কর বা রাজস্ব আদায় এবং জমিজমার বন্দোবস্তের প্রাত্যহিক চাবিকাঠি ছিল মূলত কায়স্থ ও উচ্চবর্ণীয় হিন্দু ভূস্বামীদের নিয়ন্ত্রণে। যারা ছিলেন এই বৈষ্ণব পাল্টা-আক্রমণের ল্যাবরেটরির মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ও পৃষ্ঠপোষক। বস্তুত তাদের ধনীরা ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নে বৈষ্ণব উৎসব ও সমাজব্যবস্থার শক্তির জোগান দিচ্ছিলেন। এই অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে, নব-দীক্ষিত মুসলমানেরা তাদের প্রাক-ইসলামী আদি সংস্কৃতির টান এবং যাপিত জীবনের গভীর আতঙ্কের কারণে অবচেতনে বৈষ্ণবীয় আচার ও লোকায়ত সংস্কৃতির সাথে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আপস প্রক্রিয়া (Cultural Compromise) শুরু করেন। তারা তাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের পরিভাষা, উৎসব, গান এবং প্রথা প্রাঙ্গণে বৈষ্ণবীয় ঢং ও লৌকিক লয়কে স্থান দিতে বাধ্য হোন। যা খাঁটি সুফি বিশ্বাসের একেশ্বরবাদী ও বৈপ্লবিক স্পিরিটকে ভেতর থেকে অনেকটাই মন্থর ও শুষ্ক করে দিয়েছিল। এই প্রক্রিয়াই অবচেতনে গ্রামীণ মুসলিম মানসকে সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত এবং নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ভুলে এক স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের আদি কারখানায় রূপান্তরিত হওয়ার ভিত গড়ে দিয়েছিল (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২২-২৪; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)।
নাম-মাহাত্ম্যের মনস্তাত্ত্বিক জাল: জিকিরের প্রতিস্থাপন এবং সুফি জবান কাড়ার জ্ঞানতাত্ত্বিক ছক
বৈষ্ণবীয়রা ভালো করেই জানত, একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরাধীনতাকে চিরস্থায়ী করতে হলে কেবল তার ভূখণ্ড দখল করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার প্রতিদিনের উচ্চারিত জবান ও আধ্যাত্মিক শব্দভাণ্ডারকেও হাইজ্যাক করতে হয়। শ্রী চৈতন্য এবং তাঁর নদীয়ার উচ্চবর্ণীয় পণ্ডিতেরা বুঝতেন, সুফি-সাধকদের মরমী বিজয়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল তাদের ‘নাম-মাহাত্ম্য’ এবং জিকিরের প্রগাঢ় জবান। সুফিরা যখন সাধারণ ব্রাত্য মানুষকে বলতেন, জটিল সংস্কৃত মন্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই, কেবল শুদ্ধ অন্তরে আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ করলেই স্রষ্টাকে পাওয়া যায়, তখন তা ছিল স্মার্ত রঘুনন্দনের বজ্রবন্ধনের বিরুদ্ধে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি। নিম্নবর্ণের নিরক্ষর মানুষেরা এই সহজ জবানকে ভালোবেসে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছিল। এই ভাষিক ও মনস্তাত্ত্বিক মহাপতনকে রুখে দিতে নদীয়ার ল্যাবরেটরিতে বসে চৈতন্য প্রবর্তন করলেন ‘নাম-মাহাত্ম্য’ ও ‘তারকব্রহ্ম নাম’ জপ করার এক অভিনব জ্ঞানতাত্ত্বিক ছক। সুফিরা যেভাবে ‘জিকির’ করে স্রষ্টার নামকে হৃদয়ে ও জবানে প্রতিনিয়ত সচল রাখত, চৈতন্য সেই একই মেকানিজম হুবহু কপি করে বৈষ্ণবধর্মে চালু করলেন হরিনামের অবিরাম ‘জপ’ ও ‘কীর্তন’ করার প্রথা। এটি কোনো সাধারণ ভজন ছিল না; এটি ছিল মূলত সুফিদের তৌহিদবাদী জিকিরের জবানকে লৌকিক মানুষের মুখ থেকে কেড়ে নেওয়ার এবং নিম্নবর্ণের অন্ত্যজ হিন্দুদের ধর্মান্তর ঠেকানোর জন্য উচ্চবর্ণের তৈরি করা প্রথম অবিনশ্বর মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার লড়াই (রমাকান্ত চক্রবর্তী, ‘বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন’, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২০, ২১, ২৭ ও ৪৮; ফাহমিদ-উর-রহমান, ‘মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান’, পৃষ্ঠা ২৫ ও ২৭)।
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ছকের সবচেয়ে সূক্ষ্ম কারসাজিটি ছিল সুফি পরিভাষা ও আচারের ছদ্মবেশী আত্তীকরণ। সুফি-সাধকেরা তাদের মরমী তরিকায় জিকিরের গতি ও স্তর নির্ধারণের জন্য কতগুলো সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক স্তর ব্যবহার করতেন। যা পরিভাষায় ‘জিকরে জলি’ (উচ্চকণ্ঠের জিকির) এবং ‘জিকরে খফি’ (অন্তরের নিভৃত জিকির) নামে পরিচিত। চৈতন্য সুফিদের এই জিকিরের অভ্যন্তরীণ ব্যাকরণটিকে হুবহু নকল করে বৈষ্ণবধর্মে রূপ দিলেন ‘উচ্চ সঙ্কীর্তন’ এবং ‘মানস জপ’ বা নিভৃত জপ আচারের। সুফিরা যেভাবে জিকিরের ছন্দে আত্মহারা হয়ে ‘হাল’ বা আধ্যাত্মিক মূর্ছার অবস্থায় পৌঁছাতেন, বৈষ্ণবেরাও ঠিক সেই একই মডেলে হরিনামের তীব্র কোলাহলে ‘ভাবাবেশ’ ও ‘অশ্রু-কম্প-পুলক’-এর এক দৃশ্যমান নাট্যমঞ্চ তৈরি করল। সুফিদের ‘ফানা ফিল্লাহ’ বা স্রষ্টার সত্তায় নিজের আমিত্বকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়ার মরমি তত্ত্বটিকে হুবহু হাইজ্যাক করে বৈষ্ণব কবিরা দাঁড় করালেন কৃষ্ণের প্রেমে রাধার সর্বস্ব বিসর্জনের পুরাণের আধারে। এই চতুর আত্তীকরণের ফলে সাধারণ নিম্নবর্ণের মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। তারা দেখল, সুফিদের জিকিরের ভেতরে যে আত্মশুদ্ধি ও স্রষ্টাকে ডাকার ব্যাকুলতা ছিল, নদীয়ার রাজপথে চৈতন্যের নাম-মাহাত্ম্যের ভেতরেও তো ঠিক সেই একই সুর আরও সহজ উপভোজ্য রূপে বর্তমান। এই মনোজাগতিক জালিয়াতির ফলে সুফিবাদের যে স্বাধীন স্পিরিট এ দেশের মানুষকে মুক্তির আলো দিচ্ছিল, তা নাম-মাহাত্ম্যের এই চতুর জালের অনেকখানি আটকে যায়। ফলে স্বাধীন ও সাম্যবাদী গণজোয়ার এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ইসলামমুখী হওয়ার তীব্র স্রোতটি স্তিমিত বা মন্থর হয়ে পড়ে (রমাকান্ত চক্রবর্তী, ‘বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন’, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২৭, ৪১, ৫৮, ৫৯ ও ৬০; ফাহমিদ-উর-রহমান, ‘মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান’, পৃষ্ঠা ২৫ ও ২৭)। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল, সুফিদের ‘জবান’ বা ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যকে সাধারণ মানুষের অবচেতনের গভীরে বিকৃত করে দেওয়া। সুফিরা যখন এ দেশের মানুষকে ‘আল্লাহ’, ‘রসুল’, ‘মারেফাত’ বা ‘আখেরাত’-এর মতো সর্বজনীন ও উচ্চতর শব্দগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন তা মানুষের মনকে আর্যাবর্তের পৌরাণিক রূপকথা থেকে মুক্ত করে এক নিশ্ছিদ্র একেশ্বরবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
শ্রীচৈতন্য একেশ্বরবাদের শক্তিকে কাউন্টার করতে হরিনামের ষোলো নাম ও বত্রিশ অক্ষরের ভেতরে ‘হরেকৃষ্ণ হরেরাম’ মন্ত্রের এক প্রকাণ্ড বৈপ্লবিক আবহ তৈরি করলেন। এই মন্ত্রের সহজ ও বৃত্তাকার উচ্চারণপদ্ধতি সাধারণ গ্রামীণ মানুষের অবচেতনে এমন এক মোহময় আবেশ তৈরি করল, তারা ইসলামের তাওহিদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের তত্ত্বকে ভুলে পুনরায় পৌরাণিক ‘অবতারবাদের’ চোরাবালিতে নিমজ্জিত হয়ে গেল। শব্দ কীভাবে একটি সংস্কৃতির বুনিয়াদকে দখল করে, বৈষ্ণবদের এই নাম-মাহাত্ম্যই তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ। রমাকান্ত চক্রবর্তী, ড. এনামুল হক এবং প্রমথ চৌধুরীর বরাতে দেখান, এই নামগান ও কীর্তনের বৃত্তাকার মেকানিজমটি কোনো আদিম ভজন ছিল না; বরং বৈষ্ণব কীর্তন এবং ভাবাবেগের তীব্র ‘দশা’ বা উন্মাদনার মূল ব্যাকরণটি সমকালীন সুফি ধর্ম ও জিকিরের কাঠামো থেকে আত্তীকরণ বা ধার করে আনা হয়েছিল। এই চতুর ভাষিক আত্তীকরণের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, বাংলায় ইসলামের প্রসারের পরেও এ দেশের মুসলমানদের এক বৃহৎ অংশ মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতায় ভুগেছে এবং নিজেদের আত্মবিস্মৃত করে রেখেছিল। গবেষকেরা স্পষ্ট ভাষায় ঐতিহাসিক নথি দিয়ে দেখিয়েছেন, এ দেশের মুসলমানেরা তাদের যাপিত জীবনের পরিভাষা, বিশ্বাস ও প্রথায় বৈষ্ণব ও লৌকিক দেব-দেবীর ঢং ও গানের সংস্কৃতিকে এমনভাবে আত্তীকরণ করেছিল, যা ইসলামের মূল তাওহীদী চেতনা ও সুফিবাদের স্পিরিটকে ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য ও পঙ্গু করে দিয়েছিল। সুফিবাদের সেই মরমী জবানকে রাজপথে প্রতিস্থাপন করার ফলে সাধারণ মেহনতি মানুষেরা তাদের নিজস্ব লৌকিক প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক ঠিকাদারী সম্পূর্ণভাবে চলে যায় নদীয়ার চৈতন্যের এই আদি ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রণে। যা পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে বাঙালি মুসলিম মানসকে আত্মবিস্মৃত ও পঙ্গু করে তোলার প্রথম সুসংগঠিত কারখানা হিসেবে কাজ করেছিল (রমাকান্ত চক্রবর্তী, বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম: একটি ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২৭, ৪৮; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৪-২৫; ড. মুহম্মদ এনামুল হক, A History of Sufism in Bengal, পৃষ্ঠা ২৬৮-২৮১)।

Post a Comment