Table of Contents
![]() |
| চর্যাপদ ও প্রাকৃত-অপভ্রংশের ভাষিক ঐতিহ্য, সেন শাসন এবং নেপালে পাণ্ডুলিপির নির্বাসনের ঐতিহাসিক আখ্যান |
Previous Part.......
১:৫
আর্য-সংস্কৃতায়নের আইনি বজ্রবন্ধন এবং লৌকিক ভাষার অবদমন
দক্ষিণাত্যের বহিরাগত সেন রাজারা এবং তাদের আমদানিকৃত কনৌজের আর্য পুরোহিতেরা এ দেশের মানুষের মুখের প্রাকৃত জবানকে স্তব্ধ করার জন্য যে ‘রৌরব নরকের’ ধর্মীয় ফতোয়া জারি করেছিলেন, তা ছিল এই বদ্বীপের ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভাষিক ফ্যাসিবাদ বা লিঙ্গুইস্টিক ফ্যাসিজম। আর্যরা তাদের রচিত বিভিন্ন স্মার্ত সংহিতায় এবং আইনি বিধানে স্পষ্ট আদেশ জারি করেছিলেন, যারা সাধারণ মানুষের মুখের লোকভাষায় বা বাংলায় রামায়ণ-মহাভারত অনুবাদ করবে কিংবা জ্ঞানচর্চা করবে, তাদের স্থান হবে রৌরব নামক মহাশাস্তির নরককুণ্ডে। এই ফতোয়াটি কেবল কোনো নিরীহ অন্ধবিশ্বাস ছিল না; এর মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক চালটি ছিল অত্যন্ত গভীর। তা হলো এ দেশের মেহনতি সমাজ-শ্রমিকদের মুখের প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষাকে চিরতরে ‘জল-অচল’ বা অপবিত্র ঘোষণা করে সংস্কৃতির কেন্দ্র থেকে ঝেঁটে ফেলে দেওয়া (বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, দীনেশচন্দ্র সেন, পৃষ্ঠা ২৮৯)।
আর্যরা খুব ভালো করেই জানতেন, একটি ভূখণ্ডকে চিরতরে নিজেদের কলোনি বা উপনিবেশ বানিয়ে রাখতে হলে সেখানকার মানুষের মুখের ভাষাগত ঐক্য এবং তাদের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতাকে গোড়াতেই ধ্বংস করে দিতে হবে। তারা রাজকীয় ফরমান জারি করে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও আইনি দলিল কেবল আর্যাবর্তের সংস্কৃত ভাষায় লিখন বাধ্যতামূলক করলেন, যা ছিল সাধারণ মেহনতি মানুষের নাগালের বাইরে এক অনড় ও স্থবির আমলাতান্ত্রিক আবরণ। এই কৃত্রিম ‘হাই কালচার’ (High Culture) বা উচ্চ সংস্কৃতির পারসেপশন সমাজে এমন এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অপার্থাইডের জন্ম দিয়েছিল, যার ফলে একজন সাধারণ কর্মঠ চাষী, কৈবর্ত বা কারিগর মানুষ নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে গিয়েও অবচেতনে চরম লজ্জা ও হীনম্মন্যতায় ভুগতেন (শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড: প্রাচীন যুগ), জেনারেল প্রিণ্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিঃ, ষোড়শ পরিচ্ছেদ (ভাষা ও সাহিত্য), পৃষ্ঠা ১২৩–১৪২; ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, (বাঙ্গালা ভাষার উৎপত্তি), পৃষ্ঠা ২৭–৩১; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), ১ম খণ্ড, ১৮শ পরিচ্ছেদ (সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের সমাজ ও সংস্কৃতি), পৃষ্ঠা ৪১৭–৪১৯)।
চর্যাপদের আবির্ভাব: আর্য অনুশাসনের বিরুদ্ধে ‘সন্ধ্যা ভাষা’র প্রথম সাহিত্যিক গেরিলা যুদ্ধ
কিন্তু আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের পণ্ডিতেরা সমাজকে দমানোর জন্য যত বড় লোহার প্রাচীরই তৈরি করুক না কেন, এ দেশের মাটির আদিম মেধা ও তাদের লৌকিক ভাষিক স্বাতন্ত্র্য সেই সর্বগ্রাসী ফ্যাসিবাদের সামনে নিঃশর্তভাবে মাথা নত করেনি। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে, বিশেষ করে পাল রাজাদের সহনশীল ও উদার শাসনের শেষভাগে এবং সেনদের কঠোর দমনের শুরুর মুখে—এ দেশের অবদমিত সমাজ-মানস থেকে জন্ম নিয়েছিল এক অনন্য সাধারণ ভাষিক ও সাহিত্যিক বিদ্রোহ। যা আজ বিশ্ব ইতিহাসে ‘চর্যাপদ’ বা চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় নামে পরিচিত (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ২৮-৩১; দীনেশচন্দ্র সেন, ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’: পৃষ্ঠা ৪৮-৫২, ২৮৯)। বৌদ্ধ সহজযান ও নাথপন্থার সিদ্ধাচার্যরা আর্যদের চাপিয়ে দেওয়া দুর্বোধ্য সংস্কৃত ব্যাকরণের বজ্রবন্ধনকে সরাসরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, সাধারণ মানুষের মুখের জ্যান্ত প্রাকৃত ও ‘গৌড়ীয় অপভ্রংশ’ ভাষার মিশ্রণে এই অবিনশ্বর পদগুলো রচনা করতে শুরু করলেন (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ৩১)।
যদি কেউ চর্যাপদের ভেতরের আসল রূপটি একটু সহজ করে লক্ষ্য করে, তবে খুব সহজেই বুঝতে পারবে—এটি কেবল কিছু ধর্মীয় গান ছিল না। এটি ছিল মূলত আর্যাবর্তের ভাষিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এ দেশের মাটির সন্তানদের পরিচালিত প্রথম সাহিত্যিক গেরিলা যুদ্ধ। চর্যাপদের কবিরা (যেমন লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা) খুব ভালো করেই জানতেন যে, আর্য রাজশক্তি ও তাদের পুরোহিত আমলারা প্রকাশ্যে লৌকিক ভাষায় জ্ঞানচর্চাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাবে। এই কারণে তারা তাদের কাব্যের ভাষা হিসেবে বেছে নিলেন এক অদ্ভুত ও রহস্যময় মাধ্যম। যাকে ইতিহাসের পাতায় ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা আলো-আঁধারির ভাষা বলে অভিহিত করা হয় (ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’, পৃষ্ঠা ১৬-১৭ ও ৪১-৪৩)। এই সন্ধ্যা ভাষার মূল কারুকাজটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার। এর বাহ্যিক বা সাধারণ অর্থ শুনলে মনে হতো এটি একটি সাধারণ রূপক গান। কিন্তু এর ভেতরের গূঢ় অর্থটি ছিল সম্পূর্ণ আর্য-বিরোধী, দেহতাত্ত্বিক এবং পরম সমতাবাদী এক লৌকিক ইশতেহার। যা আর্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে লোকসমাজে নীরব বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল (মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৭, ২০, ২৫-২৬); (শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ১৬, ৪১); (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭)।
সাহিত্যের স্পেস পুনরুদ্ধার এবং আর্য নান্দনিকতার কৃত্রিম স্কেল চূর্ণকরণ
চর্যাপদের এই ভাষিক বিদ্রোহ এ দেশের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে এক পরম ক্রান্তিলগ্ন তৈরি করেছিল। কারণ এর মাধ্যমে এ দেশের ব্রাত্য জনসমষ্টি আর্যাবর্তের তৈরি করা নান্দনিকতার কৃত্রিম স্কেলটিকে তাত্ত্বিকভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। আর্য পুরোহিতেরা তাদের স্মৃতিশাস্ত্রে বিধান জারি করেছিলেন যে, প্রাকৃত লোকভাষা হলো ‘পশুসুলভ ও তুচ্ছ’। কিন্তু চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যরা তাদের অকাট্য সাহিত্যিক মেধার জোরে প্রমাণ করে দিলেন, যে ভাষাকে আর্যরা গালাগাল দিচ্ছে, সেই প্রাকৃত ভাষার সরল অবয়বের ভেতরেই মানুষের জীবনের পরম আধ্যাত্মিক গভীরতা, তাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবন, এবং সাম্যের দর্শনকে সর্বোচ্চ নান্দনিকতায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
চর্যাপদের প্রতিটি পদের ভেতরে আর্যদের বানানো সেই স্থবির রাজপ্রাসাদের চাটুকারিতার কোনো স্থান ছিল না। সেখানে স্থান পেয়েছিল এ দেশের নদী, নৌকা, তুলা ধোনার কারিগর, চণ্ডাল নারীর কুঁড়েঘর এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক শ্রমের জীবন্ত আখ্যান। এই সাহিত্যের স্পেস পুনরুদ্ধার বাংলার মানুষকে অবচেতনের কলোনিয়ালিজম থেকে মুক্ত করার প্রথম স্বাধীন ইশতেহার হিসেবে কাজ করেছিল (মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৩, ২৫-২৬; শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ১৮, ১৫৪-১৫৫; সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭; রহমান, ফাহমিদ উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০-২১, ৮১)। কলকাতার তথাকথিত ছদ্ম-সেক্যুলার ভদ্রলোক ইতিহাসবিদেরা উনিশ শতক থেকে যে মেটা-ন্যারেটিভ বা বানোয়াট ইতিহাস তৈরি করেছেন, তার মূল লক্ষ্যই ছিল চর্যাপদের এই বৈপ্লবিক ও আর্য-বিরোধী প্রতিরোধ্য চরিত্রটিকে সম্পূর্ণ আড়াল করে দিয়ে, একে কেবল সংস্কৃতির এক বিকৃত ছায়া হিসেবে উপস্থাপন করা। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, চর্যাপদের এই লৌকিক ভাষিক অবাধ্যতাই এ দেশের মানুষের মন ও মগজকে আর্যদের সেই দমবন্ধ করা খাঁচায় চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিল এবং এই বদ্বীপের বুকে এক অপরাজেয় সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রথম মজবুত বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিল।
পাণ্ডুলিপির মহানিষ্ক্রমণ: তিব্বত ও নেপালের রাজগ্রন্থাগারে চর্যাপদের নির্বাসিত হওয়ার কাহিনী
কর্ণাটক থেকে আসা সেন রাজবংশ বাংলায় তাদের রাজনৈতিক ও সামন্ততান্ত্রিক শাসনকে নিশ্ছিদ্র করার জন্য যে কট্টর আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ চাপিয়ে দিয়েছিল, তা এ দেশের প্রাক-আর্য অনার্য ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। বিশেষ করে বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেনের আমলে রাজশক্তি যখন পুরোপুরি স্মার্ত অনুশাসন এবং স্মৃতিশাস্ত্রের বজ্রবন্ধনে বন্দি হলো, তখন এ দেশের আদিম তান্ত্রিক সহজযান ও নাথপন্থার অনুসারীদের ওপর এক অভূতপূর্ব ও নৃশংস প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়ন নেমে আসে। আর্য পুরোহিতেরা রাজকীয় তাম্রশাসনের মাধ্যমে এমন সব কঠোর ধর্মীয় বিধান জারি করলেন, যার ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, ভিক্ষু এবং লোকায়ত কায়াসাধকেরা এক লহমায় সমাজের সবচেয়ে ‘নিকৃষ্ট ও অস্পৃশ্য’ ম্লেচ্ছ শ্রেণীতে পরিণত হলেন।
সেন রাজারা বৌদ্ধদের সমস্ত প্রাচীন বিহার, সঙ্ঘারাম এবং শিক্ষার লৌকিক কেন্দ্রগুলোকে দেওয়া রাজকীয় জমি ও আর্থিক অনুদান সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে প্রত্যাহার করে নেন। রাজকীয় রসদ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সোমপুর বা জগদ্দলের মতো বিশাল বিশাল বৌদ্ধ সঙ্ঘারামগুলো ধীরে ধীরে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পরিত্যক্ত ও জনশূন্য হতে শুরু করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক নিগ্রহ কেবল অর্থনৈতিক লুণ্ঠনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; আর্য পণ্ডিতেরা লোকায়ত তান্ত্রিক দর্শনকে চিরতরে স্তব্ধ করার জন্য সিদ্ধাচার্যদের মুখের প্রাকৃত ভাষাকে ‘অপবিত্র ও পশুসুলভ’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাদের সমস্ত স্বাধীন সাহিত্যচর্চাকেও সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করেন (মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৩-২৫; সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ৪৬-৪৮; শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫; রহমান, ফাহমিদ উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০-২১)। এই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এ দেশের আদিম অনার্য মানুষের হাজার বছরের অর্গানিক কৃষ্টি ও তাদের প্রথম স্বাধীন সাহিত্যিক আন্দোলনকে এক চরম অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
সেন রাজাদের এবং তাদের আমদানিকৃত আর্য পুরোহিতদের এই করাল ও বর্বরোচিত নিগ্রহের মুখে যখন এই বদ্বীপের মাটিতে প্রাকৃত ভাষায় স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ল, তখন এ দেশের লৌকিক সিদ্ধাচার্য ও বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা নিজেদের জ্ঞান, ঐতিহ্য এবং অমূল্য সাহিত্যিক সম্পদকে রক্ষা করার জন্য এক পরম দুঃসাহসিক ও ঐতিহাসিক পথ বেছে নিলেন। তারা আর্যদের জলন্ত যজ্ঞের আগুন, সতীদাহের বর্বরতা এবং স্মৃতিশাস্ত্রের বজ্রবন্ধন থেকে নিজেদের বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা তালপাতার পাণ্ডুলিপিগুলোকে বাঁচানোর জন্য এক মহানিষ্ক্রমণ বা ক্যাকটিক্যাল ইভ্যাকুয়েশনের সিদ্ধান্ত নেন। বাংলার লুইপা, কাহ্নপা ও ভুসুকুপার মতো সিদ্ধাচার্যরা আর্যদের কঠোর নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা চোখ ফাঁকি দিয়ে, রাতের অন্ধকারে বুক পকেটে লুকিয়ে তাদের মুখের জ্যান্ত প্রাকৃত ভাষায় লেখা চর্যাপদের মূল পাণ্ডুলিপিগুলো নিয়ে উত্তর ও পূর্বের দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে হিমালয়ের কোলে অবস্থিত নেপাল, তিব্বত ও ভুটানের দিকে পাড়ি জমান (মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৩-২৫; সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ৪৬-৪৮; শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫; রহমান, ফাহমিদ উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০-২১)।
এই মহানিষ্ক্রমণ কোনো সাধারণ কাপুরুষোচিত পলায়ন ছিল না; এটি ছিল মূলত আর্যাবর্তের আরোপিত সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রাকৃত অপভ্রংশের এক পরম অহিংস ও দীর্ঘমেয়াদী জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিরোধ। সিদ্ধাচার্যরা খুব ভালো করেই জানতেন, সেনদের রাজদরবারে থাকলে তাদের এই সমতাবাদী ও আর্য-বিরোধী দেহতত্ত্বের গানগুলোকে আর্য পণ্ডিতেরা পুড়িয়ে ছাই করে ফেলবে (মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৩-২৫, ৪০-৪৫)। ফলে তারা নিজেদের মাতৃভাষার প্রথম স্বাধীন সাহিত্যিক ফসলটিকে হিমালয়ের দুর্গম নেপালের রাজগ্রন্থাগার (Royal Library of Nepal) এবং তিব্বতের গোপন মঠগুলোর নিভৃত অন্ধকার কুঠুরিতে নির্বাসিত করে এক অবিনশ্বর অলিখিত দেয়াল গড়ে তুললেন (শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা, উপক্রমণিকা, পৃষ্ঠা ৯-৪৭)। এই নির্বাসনের ফলেই বাংলার আদিম অনার্য মানুষের এই অমূল্য মেধা সেনদের করাল থাবা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। যা শত শত বছর ধরে নেপালের রাজকীয় সিন্দুকে এক পরম সত্যের অবিনশ্বর দলিল হিসেবে ঘুমিয়ে ছিল।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আবিষ্কার এবং কলকাতার ‘ভদ্রলোকি’ মেটা-ন্যারেটিভের পতন
সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে হিমালয়ের নেপালের রাজগ্রন্থাগারের ধুলোবালি ও অন্ধকারের নিচে ঢাকা পড়ে থাকার পর, ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল দরবারের সেই রাজকীয় লাইব্রেরি থেকে চর্যাপদের এই হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন তালপাতার পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে যখন এই পাণ্ডুলিপিটি ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো, তখন তা উনিশ শতকের কলকাতার উচ্চবর্ণের ভদ্রলোক সমাজ এবং তাদের পূর্বসূরি আর্য কলোনিয়ালিজমের তৈরি করা সামগ্রিক সাংস্কৃতিক মেটা-ন্যারেটিভ বা বানোয়াট ইতিহাসের ওপর এক পরম বজ্রাঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। কলকাতার বাবু বুদ্ধিজীবী শ্রেণী এতদিন ধরে যে প্রোপাগান্ডা বা বয়ান তৈরি করেছিলেন, বাংলা ভাষা মূলত আর্যাবর্তের সংস্কৃতের ‘দুহিতা’ বা গর্ভজাত কন্যা এবং উচ্চবর্ণের আর্যদের করুণা ছাড়া এ মাটির মানুষের কোনো নিজস্ব সাহিত্যিক মেধা ছিল না, চর্যাপদের এই আদিম প্রাকৃত অবয়ব সেই জালিয়াতিকে তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল (শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ৪১, ১৫৪-১৫৫; সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২৭-২৮, ৪৬-৪৮; মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৩, ৪০-৪৫)।
চর্যাপদের এই অমোঘ আবিষ্কার প্রমাণ করে দিল, বাংলা ভাষা কোনোদিনও সংস্কৃতির কোনো কৃত্রিম কারখানা থেকে জন্ম নেয়নি; বরং তা আর্যরা আসার বহু শতাব্দী আগেই এ দেশের মেহনতি মেধার ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত’ এবং লৌকিক অপভ্রংশ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অবয়বে গড়ে উঠেছিল। এই সাহিত্যের স্পেস পুনরুদ্ধার ছিল মূলত এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রাত্য মানুষের অর্গানিক ইতিহাসের প্রথম মহান বিজয়। আর্যরা এবং তাদের উত্তরসূরি ভদ্রলোকি ইতিহাসবিদেরা চর্যাপদের এই বৈপ্লবিক ও আর্য-বিরোধী চরিত্রটিকে আড়াল করার জন্য একে কেবল এক প্রকার ‘রহস্যময় প্রাচীন কুসংস্কার’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব ঐতিহাসিক সত্য হলো, চর্যাপদের এই সাহসী ও বিদ্রোহী লৌকিক ভাষার টানের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আর্যাবর্তের আরোপিত সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক চিরায়ত মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ। যা প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ নিজেদের ভাষাকে মায়ের মমতায় নির্বাসনে গিয়েও রক্ষা করেছিল এবং এই বদ্বীপের বুকে এক অপরাজেয় অবিনশ্বর আত্মপরিচয়ের প্রথম মজবুত বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিল।
চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি যখন নেপালের রাজগ্রন্থাগারে নির্বাসিত হয়ে বাংলার মাটি থেকে হারিয়ে গেল, তখন আর্য-ব্রাহ্মণ্য সেন শাসনের লৌহশৃঙ্খল এ দেশের লৌকিক ভাষার স্বাভাবিক গতিকে প্রায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনায় বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটে—মুসলিম শাসনের আবির্ভাব। যেখানে সেন-আর্য শাসকেরা প্রাকৃত-অপভ্রংশকে ‘পশুসুলভ’ বলে ঘৃণা করতেন এবং লৌকিক ভাষায় সাহিত্যচর্চাকে রৌরব নরকের শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে মুসলিম শাসকেরা খোলা মনে বাংলা ভাষাকে রাজসভায় স্থান দেন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় অভূতপূর্ব পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন। এই ইতিহাস তাই নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্যিক আখ্যান। যেখানে আর্যাবর্তের আধিপত্যের অবসানের পর বাংলার লৌকিক ভাষা রাজপৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্যের স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে।
চর্যাপদের ভাষা-কাঠামো ও লৌকিক প্রতিরোধের অবিনশ্বর ইশতেহার
আর্যাবর্তের কট্টর আর্য পণ্ডিতদের জারি করা ‘রৌরব নরক’ ফতোয়ার বিপরীতে চর্যাপদের মূল ভাষা-কাঠামোটি ছিল এ দেশের মানুষের হাজার বছরের সঞ্চিত মনস্তাত্ত্বিক অবাধ্যতার এক পরম নান্দনিক ফসল। সেন রাজাদের রাজদরবারে বসে যখন আর্য আমলারা সংস্কৃতির এক অনমনীয় ও বজ্রআঁটুনি ব্যাকরণ দিয়ে সমাজকে শৃঙ্খলিত করার চূড়ান্ত ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছিলেন, তখন চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যেরা এই মাটির প্রাকৃত ব্যাকরণিক সরলীকরণকে ব্যবহার করে সেই দাম্ভিক আর্য অলংকারশাস্ত্রকে সম্পূর্ণ চূর্ণ করছিলেন। সংস্কৃত ভাষা যেখানে লিঙ্গভেদ, কৃত্রিম বিভক্তি এবং দ্বিবচনের মতো অত্যন্ত জটিল ও মার্জিত নিয়মের নিগড়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল, এ দেশের মানুষের মুখের গৌড়ীয় প্রাকৃত ও অপভ্রংশ থেকে জন্ম নেওয়া আদি বাংলা ভাষা সেই কৃত্রিম বন্ধন ছিঁড়ে নিজেকে সম্পূর্ণ লিঙ্গনিরপেক্ষ, স্বাভাবিক ও সর্বজনীন করে তুলেছিল (শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ১৮, ৮৯-৯০, ১৪৯-১৫০; সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২৭-২৮; মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৩-২৫)।
এই ভাষাতাত্ত্বিক সরলীকরণ কোনো সাধারণ অসচেতনতা ছিল না; এটি ছিল মূলত আর্যাবর্তের আরোপিত আইনি ও ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে লোকভাষার এক সাহসী ও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বিদ্রোহ। চর্যাপদের কবিরা সংস্কৃতির সেই অনমনীয় ও কৃত্রিম কোড বা বিধি-বিধানকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে এমন এক কাব্যিক ভাষা তৈরি করলেন, যার মূল শক্তি নিহিত ছিল মাটির কর্ষণ, নদীর জোয়ার-ভাটা এবং প্রান্তিক সমাজ-শ্রমিকদের প্রতিদিনের প্রাত্যহিক শ্রম-প্রক্রিয়ার ভেতরে। আর্য পুরোহিতেরা যে সমস্ত লৌকিক শব্দকে ‘ম্লেচ্ছ’ বা তুচ্ছ বলে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য থেকে উচ্ছেদ করার ফাঁদ ফেঁদেছিলেন, চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যেরা তাদের গভীর মরমী দর্শনের চাবিকাঠি হিসেবে সেই জ্যান্ত শব্দগুলোকেই পরম আদরে আলিঙ্গন করলেন। এই লৌকিক স্বকীয়তাই আর্যাবর্তের সর্বগ্রাসী আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই বদ্বীপের মানুষের মন ও মগজের ভেতর এক অলিখিত এবং দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘এপিস্টেমিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করেছিল। যা কোনো রাজতান্ত্রিক তরবারি কোনোদিনও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি (সেন, সুকুমার। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ড। পৃষ্ঠা ৭৮-৮২, ৯২-৯৩; রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব। পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬, ৬৮-৭০)।
আর্য মেটা-ন্যারেটিভের পতন এবং লৌকিক সংস্কৃতির আত্মগোপনকারী অবয়ব
একাদশ-দ্বাদশ শতকের সেন ও বর্মণ যুগের সেই দমবন্ধ করা তান্ত্রিক স্মৃতি-শাসনের মুখে পড়ে এ দেশের স্বাধীনচেতা অনার্য ও বৌদ্ধ সমাজ যখন তাদের প্রাচীন বিহার, সঙ্ঘারাম এবং প্রাতিষ্ঠানিক বুনিয়াদ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল, তখন চর্যাপদের এই বিদ্রোহী মেধা এক অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেছিল। সিদ্ধাচার্যেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজশক্তির সরাসরি মোকাবিলা করে এই মাটিতে তালপাতার পাণ্ডুলিপি বুকে নিয়ে প্রকাশ্যে বেঁচে থাকা অসম্ভব। ফলে চর্যাপদের মূল মেধা এবং এ দেশের আদিম দেহতত্ত্ব, কায়াসাধনা ও নাথপন্থার সমতাবাদী দর্শনটি আর্যদের নজর থেকে বাঁচার জন্য গভীর অরণ্য, পাহাড় কিংবা একেবারে প্রান্তিক ব্রাত্য লোকসমাজের নিম্নতম স্তরে গিয়ে নিভৃতে আত্মগোপন করল (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস : আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ৫৪২-৫৪৫; শশিভূষণ দাশগুপ্ত, বাংলা সাহিত্যের পটভূমিতে প্রচ্ছন্ন বা লোকায়ত ধর্মসম্প্রদায়সমূহ (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৪৬, পৃষ্ঠা ১৩১-১৩৯ ও ১৮৩-১৮৭)। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষ প্রকাশ্যে আর্যদের বাহ্যিক সামাজিক নিয়মকানুন, জাতপাতের আপার্থাইড এবং স্মার্ত অনুশাসন মেনে চলার ভান করলেও, ঘরের ভেতরের গোপন অবচেতনে তারা তাদের নিজস্ব মুক্ত ও মূর্তিশূন্য আধ্যাত্মিক ধারাটিকে পরম মমতায় বাঁচিয়ে রাখলেন।
আত্মগোপনকারী লোকসংস্কৃতির ভেতরেই আর্যদের নিশ্ছিদ্র বজ্রবন্ধনের সমান্তরালে গোপনে গোপনে চর্চা হতে লাগল সহজয়ান, কায়াসাধনা এবং সর্বপ্রাণবাদের অনার্য মরমী বিশ্ববীক্ষা। এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি খাঁচার ভেতরে বন্দি হয়ে বাংলার মানুষ নিজের ভূমিতেই এক প্রকার পরবাসী ও ক্রীতদাসের মতো দিনাতিপাত করছিলেন। যেখানে কড়ি-অর্থনীতি তাদের হাত থেকে পুঁজি কেড়ে নিয়েছিল, মনুস্মৃতি তাদের কণ্ঠরোধ করেছিল, সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়ন ও শ্রেণিবৈষম্যের জাঁতাকলে তাদের জীবন ওষ্ঠাগত এবং কলকাতার পরবর্তীকালের ভদ্রলোকি ইতিহাস-বয়ান এই অঞ্চলের সামগ্রিক ইতিহাস-চেতনাকে লুণ্ঠন করেছিল। কিন্তু এই শতাব্দীব্যাপী অন্ধকার অচলায়তন ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের লোহার খাঁচাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য এ দেশের অবদমিত অনার্য সমাজ মনস্তাত্ত্বিক স্তরে এক বিরাট ও আমূল পরিবর্তনের জন্য তীব্র প্রতীক্ষায় দিন গুনছিল।
এই দমবন্ধ করা সর্বগ্রাসী সামাজিক ও আত্মিক অবদমনের চূড়ান্ত সীমায় দাঁড়িয়ে, আর্যাবর্তের আরোপিত উচ্চবর্ণীয় হেজিমনি ও সাংস্কৃতিক জালিয়াতির সেই প্রাচীন লৌহপ্রাচীরে প্রথম ও সবচেয়ে বড় ফাটলটি ধরিয়ে দিয়েছিল এ বদ্বীপের ইতিহাসের এক পরম রাজনৈতিক ও সামাজিক মোড়বদল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্রাহ্মণ্য সমাজ ‘অপবিত্র’ শূদ্র ও প্রাকৃতভাষীদের মুখ বুজিয়ে রেখেছিল, স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী তাদেরকে ‘পশুসুলভ’ বলে দাগিয়ে দিয়ে। এই অবমাননার বিরুদ্ধে লুইপা, কাহ্নপা ও ভুসুকুপার মতো সিদ্ধাচার্যরা প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। প্রমাণ করে দেন, প্রাকৃত ভাষার সরল অবয়বের ভেতরেই মানবজীবনের পরম আধ্যাত্মিক গভীরতা ও সাম্যের দর্শনকে সর্বোচ্চ নান্দনিকতায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু সম্পূর্ণ মুক্তি ও শেকল ভাঙ্গার সমগ্র শক্তি ও জৌলুশ আসে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে। এই বঙ্গে যখন ইসলামি সুফিবাদের বিপুল জোয়ার প্রবেশ করতে শুরু করল, তখন আর্যদের এই কৃত্রিম ‘জল-অচল’ ও অস্পৃশ্যতার খাঁচায় বন্দি নিপীড়িত, নির্যাতিত, শ্রেণিবৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট ব্রাত্য মানুষ এক অভূতপূর্ব মুক্তির দিশা খুঁজে পেল। পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত সুফি-সাধকদের সাথে ছিল কুরআনের সেই ঘোষণা, ‘মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঐ ব্যক্তি যে সর্বাধিক পরহেজগার’। তাঁরা যখন আর্যদের কট্টর সামাজিক আপার্থাইডের দেওয়ালে প্রথম আঘাতটি হানলেন, তখন এ দেশের মানুষের ঘরের ভেতরের গোপন ও আত্মগোপনের ‘সহজ’ আধ্যাত্মিক ধারাটি সুফি-মারেফতি ও তাওহিদের পরম উদার সাম্যনীতির ইশতেহারের সাথে একাকার হয়ে যাওয়ার জন্য এক পরম উর্বর ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করে দিল। বাস্তবিকপক্ষে, সুফি-সাধনার এই অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাময় ভাষাই ইতিহাসের সেই পরম মোড়বদলকে সম্ভব করে তুলেছিল, যা বাংলার নিপীড়িত জনসমাজকে হাজার বছরের জালিয়াতি থেকে মুক্তির প্রথম পথ দেখিয়েছিল (মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৩-২৫; সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ৪৬-৪৮; রহমান, ফাহমিদ উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২০-২১, ৮৮-৮৯; শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫; রহিম, ড. এম. এ. বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪৬-৪৮)।
ঐতিহাসিক ড. এম. এ. রহিম তাঁর ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস’-এ এই সুফি প্রভাবের গভীরতা সম্পর্কে লিখেছেন, "ইসলাম প্রসারের ফলে হিন্দুদের লোকজ দেবদেবীর প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মুসলিম সুফিদের চরিত্রের মাহাত্ম্য, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক শক্তি মানুষের কল্পনাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। জনসাধারণের কল্পনা ও মানসকে সুফি দরবেশদের আধ্যাত্মিক জীবন প্রভাবিত করে এবং এর ফলে লৌকিক ধর্মের উদ্ভব হয়। স্থানীয় দেবদেবী ধারণার সাথে সংমিশ্রিত হয়েছে পীর-ফকিরদের প্রতি শ্রদ্ধার নবতর আদর্শ (এখনো এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এইরকম পৌত্তলিক টাইপ ভক্তি কাজ করে। পীর-ফকির আর হুজুরদের প্রতি এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সেই আদিম প্রতিমা ভক্তির স্বরূপ পাওয়া যায়)। অবশ্য এই লৌকিক ধর্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে একেশ্বরবাদ। বাংলার মাঝিদের গানে এই মিশ্র ভাবধারার প্রকাশ দেখা যায়। যেমন,
আমরা আছি পোলাপান
গাজী গঙ্গা নিগাবান
শিরে গঙ্গা দরিয়া
পাঁচ পীর বদর বদর (ড. এম. এ. রহিম, পৃ. ৪৭-৪৮)।
এই মিশ্রণই বাংলার মাটিতে আর্য-ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জ্ঞানতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। আর্যাবর্তের আরোপিত আর্য-ব্রাহ্মণ্য ভূমি-নীতি ও সেনদের রক্তচোষা অগ্রহার সামন্তবাদের লোহার শৃঙ্খল ভেঙে, এ দেশের লৌকিক অনার্য মনস্তত্ত্ব কীভাবে সেই ইসলামি সুফিবাদের উদারনৈতিক শক্তিগুলিকে নিজেদের অবচেতনে আত্তীকরণ করে নিয়েছিল, তা এক পরম বিস্ময় (ড. এম. এ. রহিম। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৪)।
এই আত্তীকরণের ধারাবাহিক পরিণতিই পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার রাজপৃষ্ঠপোষকতার পথ তৈরি করে। পণ্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন এই সময়কেই বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, "মুসলমান বিজয় বাংলা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল এবং বঙ্গ-সাহিত্যকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না"। তিনি আরও লিখেছেন, "বাঙ্গলার ইতিহাসে যে নতুন যুগের সূচনা হয়, তাহার প্রধান কারণ মুসলমান রাজারাই। মুসলমান সম্রাটেরা বাংলার লোকধর্ম ও সাহিত্য সম্পর্কে কৌতূহলী হয়েছিলেন। 'চারিদিকে হিন্দু প্রজা, চারিদিকে শঙ্খ ঘন্টার রোল, আরতির ধ্বনি—মুসলমান সম্রাট স্বভাবতই জানিতে চাহিলেন, এগুলি কী? পণ্ডিতেরা যখন বললেন, এগুলো জানতে হলে দ্বাদশ বর্ষ ব্যাকরণ পড়তে হবে, তখন মুসলিম শাসকেরা সেই জটিল পথ না বেছে সরাসরি বাংলা ভাষায় অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেন। এই কৌতূহল ও উদার মনোভাব-ই বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিল" (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২৭, ১১৪-১১৫)।
দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থে আরও বলেন, ব্রাহ্মণগণ প্রথমতঃ ভাষা-গ্রন্থ প্রচারের বিরোধী ছিলেন। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে তাঁরা ‘সর্বনেশে’ উপাধি দেন এবং অষ্টাদশ পুরাণ-অনুবাদকদের জন্য রৌরব নরকের স্থান নির্দিষ্ট করেন। অন্যদিকে গৌড়েশ্বরদের সভায় সংস্কৃত পুরাণ ও “ললিতলবঙ্গলতাপরিশীলনকোমলমলয়সমীরে। মধুকরনিকরকরন্বিতকোকিলকূজিতকুঞ্জকুটীরে"–এর ন্যায় পদাবলী প্রতিধ্বনিত হতো। সেখানে ‘তৈলাধার পাত্র’ বা ‘পাত্রাধার তৈল’ –এ জাতীয় কুট মীমাংসা চলত। নৈষধাদি কাব্যের অলঙ্কার-রহস্য ও দর্শনের সূক্ষ্মগ্রন্থি মোচনে বুদ্ধিজীবীরা তৎপর থাকতেন। এই সমৃদ্ধ সভাগৃহে বাংলা ভাষা কীভাবে প্রবেশ লাভ করল? ব্রাহ্মণগণ ইহাকে ঘৃণার চোখে দেখলেও "আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। মুসলমানরা ইরান, তুরান যেখান থেকেই আসুন, এদেশে এসে সম্পূর্ণরূপে বাঙ্গালী হয়ে পড়েন। মসজিদের পাশে দেবমন্দিরের ঘণ্টা বাজতে লাগল; মহরম, ঈদ, শবে-রাতের পাশে দুর্গোৎসব, রাস, দোলোৎসব চলতে লাগল। রামায়ণ ও মহাভারতের অপূর্ব প্রভাব মুসলমান সম্রাটগণ লক্ষ্য করলেন এবং দীর্ঘকাল এদেশে বাস-নিবন্ধনে বাংলা তাঁদের একরূপ মাতৃভাষা হয়ে পড়িল"। গৌড়েশ্বর নসির খাঁ-এর মতো সম্রাটগণের প্রবর্তনায় হিন্দুশাস্ত্রগ্রন্থের অনুবাদ আরম্ভ হলো। তিনি দেখিয়েছেন, সুলতান হোসেন শাহ ‘মালাধর বসু’কে ‘গুণরাজ খাঁ’ উপাধি দেন এবং তাঁর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-এর পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ‘পরাগল খাঁ’-এর আদেশে ‘কবীন্দ্র পরমেশ্বর’ ‘মহাভারত’ এবং ‘ছুটি খাঁ’-এর আদেশে শ্রীকর নন্দী ‘অশ্বমেধ পর্ব’ অনুবাদ করেন। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ রচিত হয় আরাকানের কোরেশী মাগন ঠাকুরের আদেশে। রামেশ্বরের ‘শিবসংকীর্তন’—“যশোমন্ত, সবগুণবস্তু, তথ্য পোষ্য রামেশ্বর, তদাশ্রয়ে করি ঘর, বিরচিল শিবসংকীর্তন”—ও জগদানন্দের ‘চণ্ডীমঙ্গল’—“অমৃত লগহী ছন্দ, পুণ্য ভাবের বন্ধ, কুবের চরিত পেল প্রবেশ”—এবং অনন্তরামের ‘ক্রিয়ায়োগসার’-এর “বিশারদ পদে সেই রেণু অভিপ্রায়, পদবন্ধে রচিলেক প্রথম অধ্যায়”–এর মতো অসংখ্য কাব্য মুসলিম সভাসদদের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলার মঙ্গলকাব্য—মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল—সবই এই সময়ে মুসলিম শাসক ও স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধ হয়। চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির বৈষ্ণব পদাবলীও এই ‘গৌড়ীয় যুগে’ মুসলিম শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় চরম উৎকর্ষ লাভ করে। বাংলার লোকগাথা—ময়নামতীর গান, গোরক্ষ-বিজয়, ভাসান গান, বাউলের গান—সবই এই সময়ে মুসলমানদের হাতে সৃষ্ট ও লালিত হয়। দীনেশচন্দ্রের মতে, এই সব সাহিত্যই প্রমাণ করে যে মুসলিম শাসন বাংলা ভাষাকে অন্যের ভাষা থেকে ‘গর্ভজাত কন্যা’ নয়, বরং একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছিল। তিনি আরও বলেছেন, “মুসলমান বিজয় বাঙ্গলা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল” এবং “বঙ্গ-সাহিত্যকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না।” (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২৭, ১১৫-১১৭, ১৬২-১৬৫, ২৬০-২৭৫)।
ড. এম. এ. রহিম আরও দেখিয়েছেন, এই ধারার পরবর্তী পর্যায়ে মুঘল আমলে ফারসি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও সমৃদ্ধ হয় এবং মুঘল সুবাদার ও নবাবগণ বাংলা ভাষায় সাহিত্য ও প্রশাসনিক কাজে উৎসাহ দান করেন। বাংলার মুসলিম শাসকগণ 'প্রজাসাধারণের অভিভাবক' হিসেবে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলকে শিক্ষা-সংস্কৃতির সমান সুযোগ দান করেছিলেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এনেছিলেন এবং বাংলা ভাষায় লিপি ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। বহিরাগত ইরানি, তুরানি, আফগান ও আরমেনীয় জনগোষ্ঠীর আগমন বাংলার সংস্কৃতি ও সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল। নবাবদের উদার নীতির ফলেই হিন্দু কর্মচারী ও জমিদাররা উচ্চ পদ ও সম্মান লাভ করেন এবং হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় (রহিম, ড. এম. এ. বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৩-১৫, ২০-২১, ৪৭-৪৮, ১৩২-১৩৩)। এই সব ঘটনাই প্রমাণ করে, আর্য-ব্রাহ্মণ্যের কৃত্রিম ভাষিক বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে বাংলার লৌকিক ভাষা ও সংস্কৃতি মুসলিম শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় পূর্ণ বিকাশ লাভ করে।
কিন্তু এই সুফিবাদের বিপুল বিস্তারের ফলে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ অনার্য মানুষ পরম আত্মমর্যাদা ফিরে পেয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করল, তখন এ দেশের উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী এলিট সমাজ নিজেদের হাজার বছরের একচেটিয়া প্রিভিলেজ ও অস্তিত্ব চিরতরে হারিয়ে ফেলার এক তীব্র ‘অস্তিত্বের সংকটে’ (Existential Panic) আক্রান্ত হলো। এই তীব্র সংকট থেকে বাঁচতে এবং নিম্নবর্ণের মানুষকে পুনরায় সনাতন খাঁচায় আটকে রাখার প্রতিরক্ষামূলক ড্যামেজ-কন্ট্রোল টুল হিসেবে পরবর্তীতে শ্রী চৈতন্য বৈষ্ণব আন্দোলনের এক ছদ্ম-সাম্যবাদী ল্যাবরেটরি ও ‘সাংস্কৃতিক পাল্টা-আক্রমণ’ (Cultural Counter-Offensive) তৈরি করেছিলেন। ব্রাত্য মানুষের প্রাকৃত-সুফি আত্তীকরণের জোয়ারকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য আর্য-ব্রাহ্মণ্য সমাজ চৈতন্যের মধ্যে এক অপূর্ব মধ্যস্থতাকারীর সন্ধান পায়। যিনি একদিকে যেমন ‘সহজিয়া’ ও ‘বাউল’ ধারার গূঢ় সমতাবাদকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনি তার মাধ্যমেই বৈষ্ণব আন্দোলনকে সংস্কৃত-স্মৃতিশাস্ত্রীয় কর্তৃত্বের অধীনস্থ একটি ‘নিরাপদ’ ও ‘শাস্ত্রসম্মত’ পথে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য পথ দেখলো আর্য ব্রাহ্মণ্য সমাজ। কিন্তু এই অপার কৌশলী চৈতন্য-পর্বের অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব—যেখানে একই ব্যক্তি হিন্দু সমাজের মধ্যকার বৈষ্ণব-শাক্ত ও ব্রাহ্মণ্য-সহজিয়া ধারার দ্বন্দ্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন—আমাদের সামনে উন্মোচিত করে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক পরম রহস্যাবৃত ও বহুমাত্রিক চরিত্র। যার প্রভাব আজও হিন্দু সমাজের বিভিন্ন ধারাকে প্রভাবিত করে। এমনকি মুসলিমরাও এই পরিশীলিত হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হতে পারেননি। ধোঁকা খেয়ে গেছেন।

Post a Comment