Table of Contents
![]() |
| আর্যাবর্তের উপনিবেশবাদ ও বাংলার অনার্য প্রতিরোধ |
Previous Part.......
১:৪
দক্ষিণাত্যের মুদ্রা-সংকট এবং অনার্য ম্লেচ্ছদের ‘কড়ি-অর্থনীতি’র মনস্তাত্ত্বিক লুণ্ঠন
একটি স্বাধীন জনপদের মানুষকে চিরতরে শৃঙ্খলিত করার জন্য কেবল তার মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া বা তার সমাজকে জাতপাতের খাঁচায় বন্দি করাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনে সবচেয়ে বড় ও ক্রূর আঘাতটি হানতে হয় তার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডের ওপর। বাংলার লোকায়ত ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা এক অদ্ভুত ও মর্মান্তিক জালিয়াতির মুখোমুখি হই। যা একাদশ শতকে কর্ণাটক থেকে আসা সেন রাজবংশের জবরদখলের পর এ দেশের মাটির সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেন রাজাদের আগমনের পূর্বে, দীর্ঘ চারশ বছর ধরে বাংলায় যে পাল রাজবংশের শাসন ছিল, সে আমলে এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত গতিশীল, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে সরাসরি সংলগ্ন। পাল আমলে মগধ ও পূর্ব-বঙ্গের বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রে ‘হরিকেল’ ও ‘গৌড়ীয়’ রৌপ্য মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন ছিল। যা সাধারণ চাষী, কামার, কুমার এবং ব্রাত্য মৎস্যজীবীদের হাতের মুঠোয় সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা এনে দিয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ১১২, ১৬০-১৬৫)। পাল শাসকেরা বৌদ্ধ ও লোকধর্মে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে এ দেশের মাটির মেহনতি মানুষদের কোনো কৃত্রিম শোষণের নিগড়ে বাঁধেননি। ফলে সাধারণ মানুষ নিজেদের উৎপাদিত ফসলের বিনিময়ে সরাসরি রৌপ্য মুদ্রা অর্জন করতে পারতেন এবং সেই মুদ্রার জোরেই সমাজে নিজেদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু দক্ষিণাত্যের মহীশূর বা কর্ণাটক থেকে আসা কট্টর আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসকেরা যখন এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখল করলেন, তখন তারা প্রথম দিন থেকেই এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক ফ্যাসিবাদের ছক আঁকলেন। বিজয় সেন এবং তাঁর উত্তরসূরি বল্লাল সেনের আমলে বাংলায় আকস্মিকভাবে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার নিয়মিত প্রচলন সম্পূর্ণ বন্ধ বা সংকুচিত করে দেওয়া হলো। যাকে আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদেরা ‘কারেন্সি ক্রাইসিস’ বা মুদ্রা-সংকট বলে অভিহিত করেন। সেন রাজারা এ দেশের রাজকোষের সমস্ত সোনা ও রূপা উত্তর ভারতের কান্যকুব্জ বা কনৌজ থেকে আসা তাদের অনুগত আর্য ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থ এলিটদের মধ্যে ‘অগ্রহার’ বা অবৈতনিক ভূমিদানের নামে উপহার হিসেবে বিলিয়ে দিতে শুরু করলেন (ড. অতুল সুর। বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ৯৯-১০২, ১০৭)। এর ফলে বাংলার সাধারণ মানুষের হাত থেকে ধাতব মুদ্রার একচ্ছত্র মালিকানা রাতারাতি কেড়ে নেওয়া হলো। মুদ্রা-সংকোচনের এই চক্রান্ত কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক মন্দা ছিল না; এটি ছিল মূলত এ দেশের অনার্য ও লোকায়ত মেহনতি মানুষের হাত থেকে বিনিময় ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের চিরতরে উচ্চবর্ণের এলিটদের দয়ায় বেঁচে থাকা এক নিস্ব মজুরে পরিণত করার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ব্লুপ্রিন্ট। ধাতব মুদ্রার এই সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক উচ্ছেদের পর, সেন শাসকেরা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনার্য ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রাত্যহিক লেনদেনের জন্য ‘কড়ি’র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দিলেন। মালদ্বীপের সমুদ্র সৈকত থেকে আমদানি করা এই ক্ষুদ্র সামুদ্রিক শামুকের খোলস বা কড়িই হয়ে উঠল বাংলার সাধারণ মানুষের একমাত্র বুনিয়াদি মুদ্রা, যা ইতিহাসে ‘কড়ি-অর্থনীতি’ (Cowrie Economy) নামে পরিচিত (মজুমদার, রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, জেনারেল প্রিন্টার্স, পৃষ্ঠা ১৯৯)। উচ্চবর্ণের আর্য ব্রাহ্মণ ও রাজন্যবর্গেরা নিজেদের লেনদেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কর আদায়ের জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা নিজেদের সিন্দুকে বন্দি করে রাখতেন, আর এ দেশের মাটির সন্তানদের প্রাত্যহিক শ্রমের মূল্য চুকাতেন জুড়ি জুড়ি কড়ি দিয়ে (ড. অতুল সুর। বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ১২, ১০৭)। এই কড়ি-অর্থনীতির মোড়কে আসলে এক পরম জঘন্য মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক আপার্থাইড (Apartheid) বাংলায় কায়েম করা হয়েছিল। আর্য পুরোহিতেরা তাদের নতুন তৈরি করা স্মৃতিশাস্ত্রে ধর্মীয় বিধান জারি করলেন, সোনা ও রূপা হলো দেবতাদের পবিত্র ধাতু, যা স্পর্শ করার বা সঞ্চয় করার অধিকার কেবল সমাজের ‘উত্তম’ বা কুলীন শ্রেণীর এলিটদেরই রয়েছে (মজুমদার, রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, জেনারেল প্রিন্টার্স, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৭৮)। পক্ষান্তরে, শূদ্র ও ম্লেচ্ছ ঘোষিত এ দেশের মেহনতি কারিগর ও কৃষকদের জন্য ধাতব মুদ্রা সঞ্চয় করা বা উচ্চবর্ণের সমকক্ষ হওয়া এক পরম শাস্ত্রীয় অপরাধ, যার শাস্তি হলো সমাজচ্যুতি বা জাতিচ্যুতি। সমসাময়িক স্মৃতিশাস্ত্রের এই কঠোর অনুশাসন সমাজকে চরম জাতপাতের খাঁচায় বন্দি করে ফেলেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২২৯-২৩১)। এর ফলে এ দেশের সাধারণ মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাঠে ফসল ফলালেও, তার বিনিময়ে তারা কেবল কড়িই পেতেন। যা দিয়ে কোনোদিনও বড় কোনো পুঁজি বা স্বাধীন অর্থনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। এই কড়ি-অর্থনীতি বাংলার গ্রামীণ সমাজকে এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের খাঁচায় বন্দি করে দেয়। যেখানে একজন কর্মঠ মানুষ নিজের দিনান্তের শ্রমের পর কেবল এক মুঠো ভাত আর এক বস্তা শামুকের খোলস নিয়ে ঘরে ফিরতেন। যা তার অবচেতনে এই স্থায়ী গ্লানি ও হীনম্মন্যতার জন্ম দিত যে, সে জন্ম থেকেই এক নিকৃষ্ট ও অস্পৃশ্য জীব। কড়ি-অর্থনীতির এই লোহার খাঁচাকে আরও শক্তিশালী ও রক্তচোষা রূপ দিতে সেন রাজারা বাংলার চিরকালীন মুক্ত গ্রামীণ কৌম সমাজকে ধ্বংস করে দেন। এর পরিবর্তে তাঁরা এ দেশের বুকে এক নতুন ‘অগ্রহার’ বা ধর্মীয় সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেন। ফলস্বরূপ, লৌকিক কৌম সমাজের অবসান ঘটে এবং ‘অগ্রহার’ ব্যবস্থার হাত ধরে শুরু হয় তীব্র সামন্তবাদী শোষণ। পাল আমলে বাংলার গ্রামীণ সমাজ পরিচালিত হতো লোকায়ত পঞ্চায়েত এবং যৌথ মালিকানার অর্থনৈতিক দর্শনে। যেখানে মেহনতি মানুষেরা নিজেদের জমির ফসল সরাসরি নিজেরা ভোগ করতেন এবং রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট কর দিতেন (মজুমদার, রমেশচন্দ্র। বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, জেনারেল প্রিন্টার্স, পৃষ্ঠা ১১৭-১২০)। কিন্তু সেন রাজারা উত্তর ভারত থেকে আসা আর্য ব্রাহ্মণদের বাংলায় স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়ার জন্য এ দেশের উর্বর চাষের জমিগুলো তাদের নামে ‘অগ্রহার’ বা করমুক্ত সম্পত্তি হিসেবে দলিল করে দিলেন এবং রাজকীয় সমাজ বিন্যাসে অনুগত কায়স্থ ও বৈদ্য এলিটদের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করলেন (সুর, অতুল। বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ১০৫)। আর্যাবর্তের বৈদিক-পুরোহিত শ্রেণি যেমন ‘অগ্রহার’ ও ‘বর্ণাশ্রম’-ভিত্তিক ভূমি-ব্যবস্থার মাধ্যমে পূর্ব ভারতের লৌকিক কৌম সমাজকে দাসায়িত করেছিল, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ তারই আধুনিক সংস্করণ। ঔপনিবেশিক রাজস্ব প্রশাসন ও বঙ্কিমীয় হিন্দু জমিদারি, উৎপাদন ও ভূমি-অধিকার থেকে সাধারণ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় (ড. এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৪-১২৮ ও ১৫৯-১৬৩)। মোগল ও নবাবি আমলের রাজস্ব সংস্কার যেমন হিন্দু জমিদার ও মহাজনশ্রেণির উত্থান ঘটায়, ব্রিটিশরা সেই কাঠামোকেই আরও সুসংহত করে। জগৎশেঠ, উমিচাঁদের মতো মহাজনরা বাংলার অর্থনীতি ও ভূমি ব্যবস্থার চাবিকাঠি হয়ে ওঠেন (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৪০-১৪৪)। পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাস-লিখন কীভাবে এই ভূমি-শোষণকে ‘আধুনিকীকরণ’ ও ‘শৃঙ্খলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে—যা পূর্ববর্তী আর্য ভৌগোলিক আপার্থাইডের মতোই কাঠামোগত হিংস্রতা বহন করছিল, কিন্তু তাকে ‘প্রগতি’র নামে ঢেকে দিয়েছিল (পার্থ চট্টোপাধ্যায়, The Nation and Its Fragments, পৃষ্ঠা ১৫৮-১৬৪)।
এই সহস্রাব্দব্যাপী ভূমি-বন্দি অবস্থার অবসান ঘটে ১৯৪৭-এর পর, যখন পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৫১ সালের জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি আইন, যা ভারতের ভূমি সংস্কারের বহু আগে কার্যকর হয়, বাংলার মুসলিম ও নিম্নবর্ণের কৃষকদের প্রথমবারের মতো ভূমির মালিক ও পূর্ণ নাগরিকের মর্যাদা দেয় (ড. এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯২-১৯৪; ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৪০-১৪৪)। পাকিস্তান না হলে এই ভূমি-অধিকার ও নাগরিকত্ব আজও অধরা থেকে যেত। কারণ দেশভাগ হওয়ায় ভারতীয় ইউনিয়নে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয় ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে, এবং সেখানেও তা অনেকাংশে কার্যকর হয়নি। ঐতিহাসিক সত্য হলো, আর্যাবর্তের বৈদিক-ব্রাহ্মণ্য ভূমি-নীতি থেকে শুরু করে সেন-ব্রিটিশ-বঙ্কিমীয় হিন্দু জমিদারি—এই ধারাবাহিক শোষণের অন্তিম পরিণতি ঘটে পাকিস্তানের ভূমি-সংস্কারের মাধ্যমে। যা বাংলার কৃষকসমাজকে শতাব্দীপ্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেয়। পাকিস্তান না হলে এই ভূমি-অধিকার ও নাগরিকত্বের স্বীকৃতি আমরা পেতাম কি না, তা ইতিহাসের স্পষ্ট সাক্ষ্য দ্বারাই মীমাংসিত।
সেন আমলের এই 'অগ্রহার'-এর ফলে হাজার বছর ধরে যে জমিতে এ দেশের অনার্য আদিবাসীরা স্বাধীনভাবে চাষ করে আসছিলেন, তারা রাতারাতি নিজেদের জমিতেই বহিরাগত আর্য জমিদারদের অধীনস্থ এক একজন ভূমিদাসে (Serf) পরিণত হলেন। এই অগ্রহার ব্যবস্থার ভেতরের আসল টর্চার সেলটি ছিল আর্য জমিদারদের একচেটিয়া আমলাতান্ত্রিক ও আইনি ক্ষমতা। যা রাজকীয় তাম্রশাসনের মাধ্যমে বৈধতা পেত। এই আমদানিকৃত পুরোহিত ও ধর্মীয় সামন্তপ্রভুর দল এ দেশের ভূমিপুত্র কৃষকদের ওপর ‘বেগার শ্রম’ বা ‘বিষ্টি’র (বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শ্রমের) কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দিলেন (মজুমদার, রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, জেনারেল প্রিন্টার্স, পৃষ্ঠা ১১৯-১২১)। একজন সাধারণ কৃষককে নিজের খেতের ধান কাটার আগে ধর্মীয় সামন্তবাদীর অনুশাসন মেনে চলতে হতো এবং এই অর্থহীন শ্রমের বিনিময়ে সে কোনো রৌপ্য মুদ্রা বা ন্যায্য মজুরি পেত না। পেত কেবল উচ্চবর্ণের আধিপত্যের অবমাননা আর কিছু তুচ্ছ কড়ি, যা গ্রামীণ সমাজকে এক চরম দাসত্বের লোহার খাঁচায় বন্দি করে ফেলেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫১-২৫৫)। ওরিয়েন্টালিজম টাইপ ও ‘হাই কালচার’-এর প্রাচীন এই মুখোশে উচ্চবর্ণের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আক্রমণের মূল লক্ষ্যই ছিল নান্দনিকতার এক কৃত্রিম স্কেল বা মাপকাঠি তৈরি করা। যার মাধ্যমে মেহনতি মানুষের সামগ্রিক উৎপাদন-মেধাকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া প্রমাণ করা যায়। আর্য পণ্ডিতেরা তাদের রচিত স্মৃতি-সংহিতায় স্পষ্ট নিয়ম করে দিলেন, কড়ি দিয়ে যারা লেনদেন করে তারা সমাজ-কাঠামোর সবচেয়ে নিচু ও ‘অধম-সংকর’ ভুক্ত প্রাণী। আর যারা সোনা-রূপা দিয়ে যজ্ঞ করে তারা হলো উচ্চ সংস্কৃতির একমাত্র প্রতীক (নীহাররঞ্জন রায়। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), পৃষ্ঠা ২২৯-২৩১, ৫৭১-৫৭৫)। এই মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনই উত্তরকালে এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (Orientalism) তত্ত্বের এক জীবন্ত প্রাচীন রূপ হিসেবে বাংলায় মঞ্চস্থ হয়েছিল। যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করার জন্য তাদের পোশাক, তাদের কৃষ্টি এবং তাদের প্রাত্যহিক অর্থনীতিকে ‘অসভ্য ও নিকৃষ্ট’ বলে প্রাতিষ্ঠানিক স্কেলের ভেতরেই তীব্র শেইমিং করা হতো। কলকাতার তথাকথিত ছদ্ম-সেক্যুলার ভদ্রলোক ইতিহাসবিদেরা উনিশ শতক থেকে যে মেটা-ন্যারেটিভ বা বৃহৎ বয়ান তৈরি করেছেন, তার মূল লক্ষ্যই ছিল সেন আমলের এই মুদ্রা-সংকট ও কড়ি-অর্থনীতির কুৎসিত লুণ্ঠনের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বা আড়াল করে দেওয়া (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পৃষ্ঠা ২১-২৩, ১১২-১১৬; Chatterjee, Partha. The Nation and Its Fragments, Princeton University Press, pp. 5-7, 35-39)। তারা ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন যেন দাক্ষিণাত্যের এই বহিরাগত সেন রাজাদের আগমনই এই অনগ্রসর বদ্বীপে আলোর প্রথম রশ্মি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এই কড়ি-অর্থনীতির নিগড় এ দেশের মানুষের চিন্তা ও মেধার স্বাধীনতাকে শত শত বছর ধরে এমন এক অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রেখেছিল, যা এ দেশের মানুষকে নিজের ভূমিতেই এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক দাসে পরিণত করে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ২১-২৩)। এই গভীর ভাবসংকট ও শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের লুণ্ঠিত পরিচয় ও পরম আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হলে, আমাদের এই কৃত্রিম আর্য ও ভদ্রলোকি কারখানার তৈরি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জালিয়াতিকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে এবং এই মাটির প্রকৃত সমতাবাদী অনার্য প্রতিরোধ-চেতনার ওপরই দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। যা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির আধিপত্যকে রুখে দিয়ে মেহনতি মানুষের আত্মপরিচয় ও বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করে (Khan, Rakibul Hasan. "Language, cultural identity, and nationalism...", National Identities, pp. 4-5; Dutt, R. C. Cultural Heritage of Bengal, pp. 1-3).
পাল আমলের রৌপ্য-প্রাচুর্য বনাম সেন রাজাদের স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রা উচ্ছেদের রাজনৈতিক চক্রান্ত
পাল আমলের অর্থনৈতিক ইতিহাসের দিকে গভীর মনোযোগ দিলে দেখা যায়, সে আমলে মগধ থেকে শুরু করে সমতট ও পূর্ব-বঙ্গের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে ‘হরিকেল’ এবং ‘গৌড়ীয়’ নামক উচ্চমানের রৌপ্য মুদ্রার ব্যাপক ও অবিচ্ছিন্ন প্রচলন ছিল। পাল শাসকেরা ধর্মীয়ভাবে বৌদ্ধ ও লোকায়ত মরমী দর্শনের অনুসারী হওয়ার কারণে এ দেশের মেহনতি সমাজ-শ্রমিকদের ওপর আর্যাবর্তের কোনো কৃত্রিম শোষণের নিগড় চাপিয়ে দেননি। ফলে, সাধারণ স্বাধীন চাষী, কামার, কুমার, তাঁতি এবং ব্রাত্য মৎস্যজীবী মানুষেরা নিজেদের উৎপাদিত কৃষিফসল ও কুটিরশিল্পের পণ্যের বিনিময়ে সরাসরি এই খাঁটি রৌপ্য মুদ্রা অর্জন করতে পারতেন (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫১-২৫৫; আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ২২-২৩)।
সেন শাসকেরা এ দেশের অর্গানিক মাটির মানুষের শ্রমের ফসল লুণ্ঠন করে রাজকোষে জমা হওয়া সমস্ত সোনা ও রূপা উত্তর ভারতের কান্যকুব্জ বা কনৌজ থেকে আমদানি করা তাদের পরম অনুগত আর্য বৈদিক পুরোহিত ও কায়স্থ এলিটদের মধ্যে ‘অগ্রহার’ বা করমুক্ত ভূমির সাথে উপহার হিসেবে পাইকারি হারে বিলিয়ে দিতে শুরু করলেন। এই মুদ্রা উচ্ছেদের নেপথ্য নকশাটি কিন্তু কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক মন্দা বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবক্ষয়ের ফল ছিল না। এটি ছিল মূলত এ দেশের অনার্য ও লোকায়ত মেহনতি মানুষের হাত থেকে বিনিময় ক্ষমতা ও পুঁজি গঠনের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার এক চূড়ান্ত পলিটিক্যাল চক্রান্ত। সেন রাজারা এবং তাদের আমদানিকৃত আর্য পণ্ডিতেরা খুব ভালো করেই জানতেন, একটি মেহনতি সমাজকে যদি চিরতরে নিজেদের পদানত করে রাখতে হয়, তবে তাদের হাতের মুঠোয় থাকা ধাতব মুদ্রার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া সবার আগে জরুরি। যেভাবে বর্তমান বিশ্ব কাগজের কিছু পাতা আমাদের ধরিয়ে দিয়ে, সোনা-রূপার মূল ধাতব মুদ্রা তাদের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে এবং বন্দি করে ফেলেছে আমাদের জীবনকে তাদের কৃত্রিম অর্থনৈতিক খাঁচায় (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, ওয়েসিস বুকস, পৃষ্ঠা ৮-৯)।
একজন মানুষের হাতে যদি সোনা বা রূপার মুদ্রা থাকে, তবে সে যেকোনো সময় রাজশক্তির কৃত্রিম সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস পায়। এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তারা এ দেশের বাজার থেকে ধাতব মুদ্রাকে সম্পূর্ণ গায়েব করে দিলেন। যা ছিল এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রাত্য ও অনার্য মানুষের আত্মপরিচয় লুণ্ঠন করার ইতিহাসে প্রথম ও সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ফ্যাসিবাদের আদিমতম আঁতুড়ঘর (Dutt, R. C. Cultural Heritage of Bengal, Punthi Pustak, pp. 22-23; Chatterjee, Partha. The Nation and Its Fragments, pp. 10-11)।
কড়ির রাজনীতি: অনার্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক ও সামাজিক আপার্থাইড কায়েম
উচ্চবর্ণের আর্য রাজন্যবর্গ এবং কনৌজের আমদানিকৃত পুরোহিত এলিটরা নিজেদের মধ্যকার বড় বড় জমি কেনাবেচা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাজকীয় রাজস্বের উদ্বৃত্ত অংশ ভাগাভাগি করার জন্য সোনা ও রূপার বার বা খণ্ড নিজেদের সুরক্ষিত সিন্দুকে বন্দি করে রাখতেন। আর এ দেশের মাটির মেহনতি সন্তানদের দিনান্তের প্রাত্যহিক শ্রমের মূল্য চুকাতেন বস্তা বস্তা কড়ি দিয়ে। কড়ির কোনো সুনির্দিষ্ট বা বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বিনিময় মূল্য ছিল না এবং তা বিপুল পরিমাণে সঞ্চয় করতে গেলেও বিশাল জায়গার প্রয়োজন হতো। এর ফলে একজন সাধারণ স্বাধীন চাষী বা কারিগর নিজের মেধা ও হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে মাঠে অঢেল ফসল ফলালেও, তার বিনিময়ে সে কেবল এমন এক হাতুড়ে মুদ্রা পেত, যা দিয়ে কোনোদিনও নিজের একটি স্বাধীন ব্যবসায়িক পুঁজি বা অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না (Bandyopadhyay, Caste, Protest and Identity in Colonial India, pp. 20-26; Chatterjee, The Nation and Its Fragments, pp. 158-164)।
একজন মানুষ নিজের রক্ত পানি করে মাটির বুক চিরে সম্পদ উৎপাদন করলেও, আর্যদের তৈরি করা এই কৃত্রিম জাতিভেদের জাঁতাকলে পড়ে সে অবচেতনে নিজেকে এক নিকৃষ্ট ও অস্পৃশ্য জীব হিসেবে ভাবত, যে কেবল কড়ির ক্ষুদ্র শামুকের খোলসটুকু ছোঁয়ারই যোগ্য। এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক আপার্থাইড সমাজে এমন এক অসংবেদনশীল ও পাথর মনস্তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিল, যার ফলে নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর হওয়া যেকোনো রাজকীয় অর্থনৈতিক লুণ্ঠন উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকি সমাজের চোখে পরম স্বাভাবিক ও প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম বলে মনে হতো। এটিই ছিল এই মাটির প্রাচীনতম ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপ’, যা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অর্গানিক ইতিহাস ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে চিরতরে আড়াল করে আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণীয় আধিপত্যকে রক্ষা করার তাত্ত্বিক দেয়াল হিসেবে কাজ করেছিল।
পাল আমলের সহজযান, আর্য-পুরাণে লোকদেবতার রূপান্তর ও বাউল দর্শনে প্রাক-আর্য পৌত্তলিকতার শিকড়
শুধু ভূমি ও অর্থ নয়, এ অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসীদের ধর্মতত্ত্বের মনভূমিতেও আর্যগণ আগ্রাসন চালায়। তবে এই আগ্রাসন তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক পাঠে ছিল না, ছিল জালিয়াতির আশ্রয়ে। যদি তা ধর্মতত্ত্বের জ্ঞানতাত্ত্বিক পাঠ হতো, তবে এপিস্টেমোলজির নীতিগত বৈধতা পাওয়া যেত। কিন্তু অন্যের ধর্মকে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা না করে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া মূলত এক চরম ধর্মীয় আগ্রাসন এবং বিকৃতির করালগ্রাস বৈ কিছু নয়। বাংলার অববাহিকায় আর্যদের বৈদিক ও যাগযজ্ঞ-সর্বস্ব ধর্মপ্রচারের বহু শতাব্দী আগে থেকেই এ দেশের অনার্য অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় লোকসমাজের ভেতরের আধ্যাত্মিক ভাবজগৎ গড়ে উঠেছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন কায়াদর্শনের ভিত্তিতে। আর্যাবর্তের আর্যরা যেখানে দেবতাকে আকাশের কোনো অলৌকিক সত্তা মনে করে তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য হাজার হাজার পশু বলি দিত এবং কৃত্রিম যজ্ঞের আগুন জ্বালাত, সেখানে বাংলার আদিম মেধার মূল সুরটি ছিল ‘দেহ-তত্ত্ব’ বা কায়াসাধনা। এ দেশের প্রাচীন মানুষেরা বিশ্বাস করতেন, এই দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের বাইরে আলাদা কোনো স্বর্গ বা নরক নেই; যা কিছু সত্য, তার সবকিছুই মানুষের এই জীবন্ত শরীরের (কায়ার) ভেতরেই ক্ষুদ্র মহাবিশ্ব হিসেবে বিদ্যমান (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ১০৩-১০৮)।
পাশ্চাত্য ও সেমিটিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘পৌত্তলিকতা’ (Paganism) বলতে বোঝায়, আব্রাহামিক বা একেশ্বরবাদী ধর্মের বাইরের প্রকৃতি-পূজা, বহুদেববাদ কিংবা সৃষ্টিকে স্রষ্টা মনে করার আদিম লোকায়ত বিশ্বাসকে। বাংলার আদিম অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় সমাজে এই পৌত্তলিকতার রূপটি জড়-পাথর বা মূর্তিপূজার চেয়েও বেশি ছিল প্রকৃতির উর্বরতা শক্তি (Fertility Cult) এবং মানবদেহের উপাসনা কেন্দ্রিক (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ৫৮-৬০)। আহমদ শরীফের 'বাউলতত্ত্ব' গ্রন্থে উল্লিখিত আদিম জনগোষ্ঠীর কৃষি-উর্বরতা আচার থেকেই এই চিন্তার উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে শস্যের উৎপাদনকে নারীর সন্তানধারণের অনুরূপ প্রক্রিয়া বলে কল্পনা করা হতো এবং সেইসূত্রে মৈথুন-উপাসনা ছিল ফসল ফলানোর একটি অনুষ্ঠানিক অঙ্গ (ড. আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব; পৃষ্ঠা ৮-১২)। জেমস ফ্রেজারের মতানুযায়ী, আদিম কৃষিজীবী সমাজের এই ‘সহমর্মিতা-জাদু’ থেকেই পরবর্তীকালে কামাচার ও কামবর্জন—উভয় প্রকার সাধনপদ্ধতিরই উৎপত্তি (ড. আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব; পৃষ্ঠা ১২)। বাংলার প্রাচীন এই অনার্য কায়াদর্শনই ছিল মূলত এক প্রকার পৌত্তলিকতার উন্নত রূপ, যেখানে প্রকৃতি ও মানবদেহের মধ্যকার গভীর সম্পর্ককে আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি হিসেবে দেখা হতো।
পাল রাজাদের উত্থানের আগে গুপ্ত ও সেন আমল থেকেই বাংলায় প্রাকৃতধর্ম বা অনার্য আচার-অনুষ্ঠানের প্রভাব-প্রতিপত্তি সুস্পষ্ট ছিল। পাল শাসনে বৌদ্ধধর্ম রাজধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে এই অনার্য ধারাটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে (ড. আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব; পৃষ্ঠা ১৩)। পাল রাজাদের চারশ বছরের সহনশীল শাসনের ছায়াতলে (৮ম-১২শ শতক) এই আদিম দেহতত্ত্বই বৌদ্ধ ধর্মমতের সঙ্গে মিশে ‘তান্ত্রিক সহজযান’ ও ‘বজ্রযান’ নামক এক অনন্য লোকায়ত অধ্যাত্মবাদের রূপ নিয়েছিল (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ১০৩-১০৮)। ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বৌদ্ধ সহজিয়ারা বুদ্ধত্ব বা নির্বাণকে স্বর্গের কোনো ধারণা না ভেবে মানুষের শুক্র বা বিন্দুর রক্ষার মধ্য দিয়ে দেহের ভেতরেই ‘মহাসুখ’ অর্জনের সাধনা হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ৫৮-৭০)। 'বাউলতত্ত্ব' গ্রন্থের বৌদ্ধতন্ত্র-সংক্রান্ত অংশটি এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। সেখানে বৌদ্ধতন্ত্রের চার কায়া তত্ত্বের বর্ণনা রয়েছে, নির্মাণকায় (নাভীর নিচে), ধর্মকায় (হৃদয়দেশে), সম্ভোগকায় (কণ্ঠদেশে) ও সহজকায় (ব্রহ্মতালুতে বা মস্তকে)। এই সহজকায় বা মহাসুখচক্রেই সাধক বিন্দুধারণ ও উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ‘মহাসুখ’ বা ‘সহজানন্দ’-এর অবস্থা সৃষ্টি করতে চাইতেন। বৌদ্ধতন্ত্রের এই সাধনায় হঠযোগের গুরুত্ব অত্যাধিক ছিল, কেননা বিন্দুধারণ ও তার উৎক্ষেপণই ছিল এই পদ্ধতির প্রধান লক্ষ্য। এই ‘বিন্দু’ কিন্তু কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়—এটি পুরুষের শুক্র বা বীর্য। যা তান্ত্রিক পরিভাষায় ‘অমৃত’ ও ‘সৃজনের মূলশক্তি’ নামে অভিহিত।
বিন্দুধারণ মানে হলো যৌন উত্তেজনার সময় শুক্রকে বীর্যপাতের মাধ্যমে বাইরে নির্গত না করে তাকে দেহাভ্যন্তরে ধরে রাখা; আর উৎক্ষেপণ মানে হলো সেই ধৃত শুক্রকে মেরুদণ্ড বেয়ে উপরের দিকে (মূলাধার থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত) উত্তোলন করা। স্বাভাবিক যৌনপ্রক্রিয়ায় এই শক্তি নিচের দিকে প্রবাহিত হয় এবং বীর্যপাতের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, কিন্তু তান্ত্রিক কায়াসাধনায় সাধক হঠযোগ ও প্রাণায়ামের সাহায্যে এই যৌনশক্তির গতিপথকে উল্টে দেন। বৌদ্ধ সহজিয়া ও পরবর্তী বাউল সাধনায় এই প্রক্রিয়াটি শুধু একাকী আসন-প্রাণায়ামে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর চরম রূপ ছিল ‘যুগলসাধনা’ বা নর-নারী মিলনের মাধ্যমে সাধনা। যেখানে যৌনমিলনের উত্তেজনাকে ব্যবহার করে বিন্দু নির্গত না করে তাকে দেহের ভেতরে সঞ্চালিত করা হয়। অর্থাৎ, এখানে নারী-পুরুষের অবৈধ যৌনতা কোনো পাপ বা লজ্জার বিষয় নয়—এটি একটি ‘জৈব-শক্তি’, যা থেকে সাধক তাঁর সাধনার অমৃত আহরণ করেন। এই কারণেই বাউল দর্শন ও বৌদ্ধ সহজিয়াকে কখনো নিঃসঙ্গ ধ্যান-পদ্ধতি বলা যায় না। এর মূল সুর বরং শরীরী-যৌন-চেতনার রূপান্তরের সুর। যা প্রাক-আর্য অনার্য পৌত্তলিক কায়াদর্শনেরই অবিরাম ধারাবাহিকতা (বাউলতত্ত্ব, পৃষ্ঠা ৩০-৩৩; বাউল-ফকির-কথা: সুধীর চক্রবর্তী, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২ ও ১৫৯-১৬০)। চর্যাপদের কবিরা (যেমন লুইপা, কাহ্নপা) বাহ্যিক দেব-দেবী বা মূর্তিপূজার রূপক ব্যবহার করলেও মূলত দেহের ভেতরের এই চক্রগুলোকেই পূজা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ‘স্বদেহ-পূজা’ বা দেহকে উপাসনার মূল ক্ষেত্র বানানোই ছিল অনার্য পৌত্তলিক দর্শনের চরম রূপ (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ১০৩-১০৮; Baultottyo.pdf: ৩০-৩৩)।
এই প্রসঙ্গে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের অভিমত অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ভারতীয় সভ্যতার অধিকাংশ আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান—যেমন কর্ম ও পুনর্জন্মের ধারণা, যোগসাধনা, শিব, দেবী ও বিষ্ণুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধর্মীয়-দার্শনিক চিন্তা, বৈদিক হোমের পরিবর্তে পূজার রীতি—এই সবকিছুর উৎস অনার্য এবং এগুলি আমাদের প্রাক-আর্য পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে আগত ঐতিহ্য (ড. আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব; পৃষ্ঠা ১৮)। এই বক্তব্য প্রমাণ করে, বাউল-সহজিয়া-নাথপন্থার মূলসূত্র বৈদিক বা ধ্রুপদী ব্রাহ্মণ্য চিন্তায় নয়, বরং বাংলার মাটির সেই আদিম অনার্য পৌত্তলিক চিন্তাধারাতেই নিহিত।
এখন সেই সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক সেতুবন্ধনের প্রশ্নটি আসে, যা বৌদ্ধ সহজিয়াকে বাউল-ফকির সাধনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সহজিয়া ও নাথপন্থীদের পৌত্তলিক সাধনপদ্ধতি—যা ছিল সম্পূর্ণ দেহকেন্দ্রিক, গুরুনির্দেশিত এবং যৌন-যোগিক—ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় তুর্কি বিজয়ের পর এক চরম সংকটের মুখে পড়ে। তারা বুঝতে পারে, তাদের খোলাখুলি কায়াসাধনা এখন আর নিরাপদ নয়। এই পরিস্থিতিতে তারা তাদের হাজার বছরের পুরনো দেহতাত্ত্বিক সাধনপদ্ধতিকে রক্ষা করার জন্য এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে। তারা তাদের অনার্য কায়াচিন্তাকে পরবর্তীকালে আগত ধর্মীয় পরিভাষার একটি আবরণে মণ্ডিত করে ফেলে (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ১৩১-১৩৯ ও ১৯১-১৯৫)।
এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষার যে রূপান্তর ঘটে, তা অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। বৌদ্ধ সহজযানের গভীরতম দার্শনিক ধারণা ছিল ‘শূন্যতা’ বা পরম আনন্দের ‘সহজ’ অবস্থা। যাকে সাধক নিজের দেহের ভেতরেই উপলব্ধি করত। সেই ‘সহজ মানুষ’ বা ‘মনের মানুষ’-এর ধারণাটিই পরবর্তীকালে তাদের দর্শনে ব্যবহৃত পরিভাষায় ‘আদম’ বা ‘নূর’ হিসেবে আখ্যায়িত হতে থাকে। বৌদ্ধ সহজযানের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন ‘গুরু’ বা ‘সিদ্ধাচার্য’। যিনি শিষ্যকে দেহের কুণ্ডলিনী ও বিন্দুচালনার গূঢ় কৌশল শিক্ষা দিতেন। সেই গুরুর স্থানেই বসে পরবর্তী ধর্মীয় ভাষায় বাউল দর্শনের ‘মুর্শিদ’ বা ‘পীর’-এর পদবী। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তান্ত্রিক ‘বিন্দুরক্ষা’ বা শুক্র সাধনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা যৌগিক প্রক্রিয়াটি পরবর্তী পরিভাষায় ‘দম সাধনা’ বা ‘মারেফাত’-এর ছদ্মবেশ ধারণ করে (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, পৃ. ১৯১-১৯৫)।
সুধীর চক্রবর্তী এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার কথা স্পষ্ট করেছেন যখন তিনি বলেন, ‘বাঙলায় পাল আমলের তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের একটি শাখাই মধ্যযুগে পরবর্তী ধর্মীয় পরিভাষার প্রভাবে বৈষ্ণব সহজিয়া ও বাউলমতরূপ প্রসার লাভ করে’ (বাউল-ফকির-কথা: সুধীর চক্রবর্তী, পৃ. ২৭)। অর্থাৎ, বিজয়ী রাজধর্মের সামাজিক চাপে পড়ে এই অনার্য কায়াসাধক সম্প্রদায়গুলো তাদের মূল দেহতত্ত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে কেবলমাত্র পরিভাষার বাহ্যিক আবরণ বদলে ফেলে। ড. আহমদ শরীফ তাঁর ‘বাউলতত্ত্ব’ গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই পরিবর্তনকে ‘পরিভাষার ছদ্মবেশ’ আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, বাউলরা আসলে কোনো নতুন ধর্মের প্রবক্তা নয়, বরং পরবর্তীকালে আগত ধর্মের পরিভাষাগুলোকে তারা কেবল তাদের পুরনো সহজিয়া ও তান্ত্রিক কায়াসাধনাকে আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে (বাউলতত্ত্ব: আহমদ শরীফ, পৃ. ২৭-৩২)। অর্থাৎ, বৌদ্ধ সহজিয়া থেকে বাউল দর্শনের মূল কাঠামোতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি; পরিবর্তন এসেছে কেবল শব্দ ও পরিভাষায়, আর তা এসেছে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে।
ধ্রুপদী আব্রাহামিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ‘তাওহিদ’ বা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন। স্রষ্টা অদ্বিতীয়, এবং কোনো সৃষ্টি কখনো স্রষ্টার সমকক্ষ বা অংশ হতে পারে না। কিন্তু বাউল দর্শনে স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে একাকার করে ফেলা হয়েছে। লালন শাহের গানে যখন বলা হয়—"মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি" কিংবা "হক নাম জপলে রে মন মানুষ হবি"—তখন তা মূলত প্রাক-ইসলামিক অনার্য সর্বপ্রাণবাদ (Animism) এবং সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism)-এরই বহিঃপ্রকাশ, যা দর্শনের পরিভাষায় ‘পৌত্তলিক’ বিশ্ববীক্ষার অংশ (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, পৃ. ১৯৯-২১৩)। বাউলরা কোনো বহিঃস্থ তীর্থে না গিয়ে মানবদেহকেই কাবা ও মদিনা বলে মনে করেন, আর পাথরের হজরে আসওয়াদ চুম্বনের বদলে খোঁজেন মানুষের ভেতরের ‘অচিন পাখি’ বা ‘মনের মানুষ’-কে (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, পৃ. ১৮৩-১৮৭)।
সুধীর চক্রবর্তী তাঁর পর্যবেক্ষণে এই পৌত্তলিক দেহতত্ত্বের টিকে থাকার অকাট্য প্রমাণ পেয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “বাউলরা স্বভাবত নিঃস্বাধি এবং জাতিবিদ্বেষের বিপরীত পথের পদাতিক... বাউলরা বরাবর নিজেদের মধ্যে সুখেই থেকে কায়াসাধনা ও গান গেয়ে এসেছে। বাসাহারা পাখির মতো বন্ধনহীন তাদের জীবনে পথ চলতেই সমধিক আনন্দ” (বাউল-ফকির-কথা: সুধীর চক্রবর্তী, পৃ. ৯৭)। বাউল গানের দেহতত্ত্বের এই ভিত্তিটিই অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তাদের দর্শনের মূল সূত্র হলো—"শুক্র ধাতু ভববৎ পিতা, রজ ধাতু ভববৎ মাতা, শূন্য ধাতু ভববৎ প্রাণঃ" (বাউল-ফকির-কথা: সুধীর চক্রবর্তী, পৃ. ১৩১)। অর্থাৎ, পিতৃবস্তু (বীজ) ও মাতৃবস্তু (রজ)-এর মিলনেই দেহের সৃষ্টি, এবং এই দেহের ভিতরেই প্রাণের উৎস। এই ধারণা থেকেই বাউলদের ‘যুগলসাধনা’ বা নর-নারী মিলনের মাধ্যমে কাম থেকে প্রেমানন্দে উত্তরণের পদ্ধতির উদ্ভব (বাউল-ফকির-কথা: সুধীর চক্রবর্তী, পৃ. ১৩০-১৩২)। বাউল গানে পিতৃবস্তু বা বীজের সন্ধান বারবার ফিরে আসে, যেমন—"বলো আমার বাবা কোথায় গেল?"—এই প্রশ্নটি আসলে দেহের ভেতরের সেই অমৃত-বীজের সন্ধান। যা বৌদ্ধ সহজিয়ার বিন্দুরক্ষার সাধনা থেকে মধ্যযুগের বাউল গানে এসে পৌঁছেছে (বাউল-ফকির-কথা: সুধীর চক্রবর্তী, পৃ. ১৫৯-১৬০)।
ঐতিহাসিক সত্য হলো, বাউল দর্শনের পরিভাষা ও গানগুলো শুনলে মনে হতে পারে তা কোনো লৌকিক ধর্মশাখা। কিন্তু এর নিউক্লিয়াস বা সাধনার মূল পদ্ধতিটি শতভাগ প্রাক-আর্য অনার্য দেহতত্ত্ব এবং বৌদ্ধ তান্ত্রিকতার গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া এক লোকায়ত পৌত্তলিক ধারা। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনে এই ধারাটি কেবলমাত্র পরিভাষার আবরণ বদলিয়েছে; তার মূল কায়াসাধনা অপরিবর্তিত থেকেছে বাংলার মাটির গভীরে, বাউল-ফকিরদের গান ও সাধনায় (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature: শশিভূষণ দাশগুপ্ত, পৃ. ১৯১-১৯৫; বাউলতত্ত্ব: আহমদ শরীফ, পৃ. ২৭-৩১; বাউল-ফকির-কথা: সুধীর চক্রবর্তী, পৃ. ২১-২৫)।
পাল রাজাদের চারশ বছরের সহনশীল শাসনের ছায়াতলে এই আদিম দেহতত্ত্বই বৌদ্ধ ধর্মমতের সাথে মিশে ‘তান্ত্রিক সহজযান’ ও ‘বজ্রযান’ নামক এক অনন্য লোকায়ত অধ্যাত্মবাদের রূপ নিয়েছিল (ড. অতুল সুর, বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন, সাহিত্যলোক, পৃষ্ঠা ১৫২-১৫৫)। সাধারণ মানুষের মেধা থেকে জন্ম নেওয়া এই সহজযান ছিল জাতপাতহীন, পুরোহিততন্ত্র-বিরোধী এবং চরম সমতাবাদী। যা এ দেশের ব্রাত্য মানুষদের এক পরম মানসিক ও সামাজিক মুক্তি দিয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণাত্যের বহিরাগত সেন শাসকেরা এবং তাদের আমদানিকৃত কনৌজের আর্য পুরোহিতেরা এ দেশের ক্ষমতা দখল করার পর দেখলেন, মেহনতি মানুষের এই মুক্ত ও স্বাধীন কায়াসাধনার ঐতিহ্য তাদের আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক বিরাট বড় আপদ। কারণ, যে সমাজের মানুষ নিজের শরীরকেই পরম পবিত্র মন্দির মনে করে, সে সমাজ কোনোদিনও উচ্চবর্ণের আর্য পুরোহিতদের কৃত্রিম দেবালয় বা যজ্ঞশালার সামনে মাথা নত করবে না। ফলে, আর্য সমাজনেতারা এ দেশের মানুষের এই স্বাধীন ভাবজগৎ ও আত্মপরিচয়কে লুণ্ঠন করার জন্য এক সুনিপুণ ও চতুর জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতারণার (Cultural Forgery) ফাঁদ পেতে বসলেন। তারা রাজশক্তির জোরে এ দেশের আদিম তান্ত্রিক সহজযান, নাথধর্ম এবং লৌকিক সিদ্ধাচার্যদের মরমী দর্শনকে পাইকারিভাবে ‘অসভ্য ও অপবিত্র ম্লেচ্ছাচার’ বলে দাগিয়ে দিতে শুরু করলেন। যাতে সাধারণ মানুষের অবচেতনে নিজেদের চিরকালীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য নিয়ে এক গভীর লজ্জা ও হীনম্মন্যতার স্থায়ী আসন গেড়ে দেওয়া যায় (রহমান, ফাহমিদ উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩২-৩৪)। এই সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে চতুর কৌশলটি ছিল, এ দেশের মাটির সন্তানদের আদিম ও লৌকিক দেব-দেবীগুলোকে আর্যদের পৌরাণিক কাঠামোর ভেতর জোরপূর্বক আত্তীকরণ বা হাইজ্যাক করে নেওয়া। বাংলার লোকায়ত অনার্য সমাজে হাজার বছর ধরে মনসা, চণ্ডী, ধর্মঠাকুর ও শীতলার মতো অসংখ্য লৌকিক শক্তির পূজা প্রচলিত ছিল, যা আর কোনো আর্যাবর্তের বৈদিক বা সংস্কৃত পুরাণে ছিল না (বাংলার অনার্য দেবতাদের যেমন শিব, দুর্গা/চণ্ডী ইত্যাদি আর্যপুরাণে অন্তর্ভুক্তির ইতিহাস ও পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখুন: প্রবোধচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ, পৃ. ১৯৮-১৯৯ ও ২২৩, বিশ্বভারতী, ১৯৬২। সুজয় কুমার মণ্ডল, লোকসংস্কৃতির ত্রিবলয়, পৃ. ৩৫-৩৬ ও ৪৫-৪৬, 'সেতুবন্ধন' প্রকাশনা, কলকাতা, ১৯৯৯)।
আর্য পণ্ডিতেরা যখন দেখলেন, সাধারণ মানুষের মন থেকে এই লৌকিক দেবতাদের উপড়ে ফেলা অসম্ভব, তখন তারা এক অদ্ভুত দুরভিসন্ধিমূলক কৌশলের আশ্রয় নিলেন। তারা এ দেশের আদিম অনার্য দেবতাদের চরিত্র রাতারাতি বদলে দিয়ে তাদেরকে আর্যদের পৌরাণিক শিব, রুদ্র বা দুর্গার দাসী বা খোলসে বন্দি করে ফেললেন (কীভাবে অনার্য দেবতা শিব, যিনি মূলত অনার্য জনসমাজের দেবতা ধীরে ধীরে আর্যসমাজভুক্ত হন, এবং কীভাবে দক্ষযজ্ঞ কাহিনী, নীলকণ্ঠ ও কালী/চণ্ডীর কল্পনার মাধ্যমে তাদেরকে পৌরাণিক কাঠামোয় বন্দি করা হয়, তার বিশদ বিবরণ দেখুন: প্রবোধচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ, পৃ. ১৯৮-১৯৯ ও ২২৩-২২৬, বিশ্বভারতী, ১৯৬২)। উদাহরণস্বরূপ, বাংলার আদিম আদিবাসীদের ‘ধর্মঠাকুর’, যিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মূর্তিশূন্য, জাতপাতহীন এবং ব্রাত্য মানুষের সমতার প্রতীক—তাকে আর্য পণ্ডিতেরা চতুরতার সাথে যমরাজ বা শিবের এক নিকৃষ্ট অবতার বানিয়ে দিলেন। বাংলার তৎকালীন সমাজের মেহনতি নারীদের আত্মমর্যাদার প্রতীক বন্য ও লোকায়ত ‘চণ্ডী’কে তারা সংস্কৃত পুরাণের উচ্চবর্ণীয় শিবের সুসভ্য স্ত্রী ‘পার্বতী’ বা দুর্গার খোলসে বন্দি করে ফেললেন (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, পৃষ্ঠা ১০২-১০৫; প্রবোধচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ, পৃ. ১৯৮-১৯৯ ও ২২৩-২২৬, বিশ্বভারতী, ১৯৬২)।
এই সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে চতুর কৌশলটি ছিল, এ দেশের মাটির সন্তানদের আদিম ও লৌকিক দেব-দেবীগুলোকে আর্যদের পৌরাণিক কাঠামোর ভেতর জোরপূর্বক আত্তীকরণ বা হাইজ্যাক করে নেওয়া। বাংলার লোকায়ত অনার্য সমাজে হাজার বছর ধরে মনসা, চণ্ডী, ধর্মঠাকুর ও শীতলার মতো অসংখ্য লৌকিক শক্তির পূজা প্রচলিত ছিল, যা আর কোনো আর্যাবর্তের বৈদিক বা সংস্কৃত পুরাণে ছিল না (প্রবোধচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ, পৃ. ১৯৮-১৯৯, বিশ্বভারতী, ১৯৬২)।
এই রূপান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এ দেশের দেব-দেবীগুলোর ভেতরে যে আদিম সমতাবাদী ও সেই সমাজের মানসিক চরিত্র, তাকে চিরতরে মেরে ফেলা। আর্যরা এই দেবতাদের এমনভাবে মার্জিত বা ‘সংস্কৃতায়ন’ করলেন, যার ফলে সাধারণ মেহনতি মানুষ অবচেতনে ভাবতে শুরু করল, তাদের নিজেদের দেবতারাও আসলে উত্তর ভারতের আর্য সংস্কৃতিরই করদ দাস। ফলে আর্যদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেওয়াই তাদের একমাত্র পরম ধর্ম (প্রবোধচন্দ্র সেন, পৃ. ১৯৯-২০০)।
এই লোকায়ত দেব-দেবীর হাইজ্যাক এবং আর্য-সংস্কৃতায়নের এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বাংলার সাহিত্যিক আঙিনায় একচ্ছত্র রূপ দেওয়ার জন্য তারা এক বিশাল ছদ্মবেশী মেটা-ন্যারেটিভ বা বৃহৎ বয়ানের জন্ম দিয়েছিলেন। যা পরবর্তীতে ‘মঙ্গলকাব্য’ (যেমন মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল) নামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই মঙ্গলকাব্যগুলোর কাহিনী-কাঠামোকে যদি সুক্ষ্ম বিশ্লেষণের নিরিখে দেখা যায়, তাহলে একটি নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্ত ধারা চোখে পড়ে। যা প্রতি পদে পদে এ দেশের অনার্য লৌকিক সংস্কৃতির ওপর আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের দেবতাদের এক চরম আগ্রাসী ও বলপ্রয়োগের কাহিনীকে স্পষ্ট করে তোলে
প্রথম পর্যায়ে—প্রতিটি মঙ্গলকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র হোন বাংলার কোনো স্বাধীনচেতা অনার্য রাজা বা ধনী বণিক। যিনি প্রথমে আর্যদের শিব, দুর্গা বা মনসার শ্রেষ্ঠত্ব মানতে অস্বীকার করেন। তিনি তাঁর নিজস্ব লৌকিক দেবতা বা বিশ্বাসেই আস্থাশীল থাকেন। যেমন—মনসামঙ্গলের চাঁদ সদাগর। চাঁদ সদাগর কোনো অসুর নন; তিনি বাংলার স্বাধীনচেতা অনার্য বণিক-জমিদার শ্রেণির প্রতীক। প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি ছিল নদীপথ ও বাণিজ্যভিত্তিক। এই বণিক শ্রেণি (যেমন, সদাগর সম্প্রদায়) তাদের নিজস্ব পৃষ্ঠপোষক দেবতা (যেমন, স্থানীয় শিব বা লোকায়ত সর্পদেবতার) পূজো করতেন। মঙ্গলকাব্যগুলোতে তাঁদেরকে ‘অবিদ্বান’, ‘অভিমানী’ ও ‘পাষণ্ড’ বলে চিত্রিত করা হয়েছে। যা মূলত ব্রাহ্মণ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিরোধকেই ইঙ্গিত করে [প্রবোধচন্দ্র সেন, পৃ. ১৯৯-২০০; দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য পৃ. ১০২-১০৫]।
দ্বিতীয় পর্যায়ে—এই 'অবজ্ঞার' শাস্তিস্বরূপ আর্য পুরাণের উচ্চবর্ণের দেবতা (শিব, দুর্গা) কিংবা আত্তীকৃত লৌকিক দেবী (মনসা) তাঁর ওপর চরম প্রতিশোধ নেন। মনসামঙ্গলে দেখা যায়, দেবী মনসা একের পর এক ভয়াবহ সাপ প্রেরণ করেন। যা চাঁদ সদাগরের সাত পুত্রকে ডেকে কামড়ে হত্যা করে। অন্যদিকে চণ্ডীমঙ্গলে দেখা যায়, আর্য দুর্গা বাংলার অনার্য অসুরদের বিনাশ করেন। এই অসুররা আসলে কারা? তারা বাংলার প্রাক-আর্য (অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও দ্রাবিড়) অধিবাসী জনগোষ্ঠী বা ভূমিপুত্রদের প্রতীক। যেমন সাঁওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ, কোচ, পাহাড়িয়া প্রভৃতি উপজাতি। আর্যাবর্তের বৈদিক পুরাণে ‘অসুর’ শব্দটি মূলত ‘দেব’ (আর্য) ও ‘অসুর’ (অনার্য)-এর দ্বৈত সংগ্রামের ইঙ্গিত দেয়। বাংলার মঙ্গলকাব্যগুলোতে এই অসুররা আরও স্থানীয়, বাস্তব ও ভৌগোলিক রূপ পায়। তারা বাংলার লোকালয়ের চিরায়ত অধিবাসী। যারা আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনকে প্রতিহত করেছিল। এই পর্যায়ে কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো রাজ্য, অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়ে।
এছাড়া মঙ্গলকাব্যে অন্য যে ‘দানব’, ‘দৈত্য’ বা ‘রাক্ষস’ দেখা যায়—যেমন হিরণ্যকশিপু, ত্রিপুরাসুর—তারা আসলে বাংলার ঐসব জনগোষ্ঠী, যারা কৃষি-ভিত্তিক সমাজে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বা আর্য সমাজের ‘বহির্জাত’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এদেরকে ধর্মীয় কাঠামোয় ‘অধর্ম’-এর প্রতীক বানিয়ে, দেবতার হাতে এদের বিনাশকে ‘ধর্মরক্ষা’ বলে প্রচার করা হলো। ফলে প্রাক-আর্য মূল অনার্য অধিবাসীরা নিজেদের ‘অবহেলিত’ ও ‘পাপী’ ভাবতে বাধ্য হলো [প্রবোধচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ, পৃ. ১৯৮]।
তৃতীয় পর্যায়ে—প্রতিরোধী চরিত্র (যেমন, চাঁদ সদাগর) তাঁর পরিবার, সম্পদ ও প্রজাদের হারিয়ে চরম যন্ত্রণায় পড়েন। সমাজের অন্যান্য মানুষজনও এই দৈব শাস্তির ভয়ে আর্যদেবতার বশ্যতা স্বীকার করতে থাকে। এই পর্যায়ে অনার্য চরিত্রের একাকিত্ব ও অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। যা পাঠকের মনে সহানুভূতি জাগালেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে হার মানতেই হয়।
চতুর্থ পর্যায়ে—শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে, সেই অনার্য বণিক বা রাজা আর্য দেবতার সামনে মাথা নত করেন। চোখের জল ফেলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দেবতার পূজা করার প্রতিশ্রুতি দেন। যেমন, চাঁদ সদাগর শেষ পর্যন্ত মনসার পূজা করতে বাধ্য হন। এই বশ্যতা স্বীকারের মাধ্যমেই মূলত অনার্য দেবতা (মনসা) আর্য পুরাণের 'দেবী' হিসেবে স্বীকৃতি পান। তবে শর্ত হলো, তিনি আর্য দেবতা শিব বা দুর্গার অনুগামী ও অধীনস্থ হিসেবেই থাকবেন। লক্ষণীয়, মনসা ছিলেন অনার্য অধিবাসীদের সর্পপূজার দেবী—মূর্তিহীন, জাতপাতহীন ও প্রকৃতিনির্ভর। আর্য পুরাণে তাঁকে ‘শিবের কন্যা’ বা ‘বিষ্ণুর অনুচরী’ বানিয়ে আত্তীকরণ করা হয়। ফলে মূল অধিবাসী সর্পোপাসকরা অবচেতনে নিজেদের ধর্মকে আর্য ধর্মের ‘অংশ’ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হলো [দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃ. ১০২-১০৫; সুজয় কুমার মণ্ডল, লোকসংস্কৃতির ত্রিবলয় পৃ. ৪৫-৪৬]।
পঞ্চম ও শেষ পর্যায়ে—এই কাহিনী-কাঠামোর মধ্য দিয়ে বাংলার আদিম লৌকিক সমাজের যে সমতাবাদী, জাতপাতহীন ও মূর্তিহীন ধর্মীয় চেতনা ছিল, তাকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করা হয়। ধর্মঠাকুর ও শীতলার মতো সাধারণ লৌকিক দেবতারাও ছিলেন বাংলার নির্যাতিত, নিম্নবর্ণ ও ব্রাত্য মানুষের আত্মমর্যাদা ও সমতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ধর্মঠাকুর ছিলেন জাতপাতহীন, মূর্তিহীন ও উচ্চবর্ণবিরোধী—তাঁকে পরবর্তীকালে যম বা শিবের অবতার বানানো হয়। শীতলাও ছিলেন আদিমা মাতৃদেবী—যিনি আর্য পুরাণে ‘দুর্গার অন্যরূপ’ বা ‘শিবের প্রিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত হন। তাদের স্বাতন্ত্র্যকে মুছে দিয়ে, তাদেরকে বৃহত্তর পৌরাণিক গল্পের ‘খোলসে’ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করতে থাকে, তারা আদিকাল থেকেই আর্য দেবতাদেরই ছোট ভাই বা দাসী। পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি নতুন ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস। যেখানে উত্তর ভারতের আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ সর্বোচ্চ ও চিরন্তন সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ মানুষ অবচেতনে এই বার্তাটি গ্রহণ করে যে, তাদের নিজস্ব দেবতা ও বিশ্বাস আসলে নিকৃষ্ট, এবং আর্য দেবতাদের করদাসত্বই একমাত্র মুক্তির পথ [সুজয় কুমার মণ্ডল, লোকসংস্কৃতির ত্রিবলয়, পৃ. ৪৫-৪৬; প্রবোধচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ, পৃ. ২২৩-২২৬]।
মঙ্গলকাব্যগুলো কেবল ধর্মীয় কাহিনি নয়, বরং এক বিশাল সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ন্যারেটিভ ইঞ্জিন। যেখানে প্রতি পদে পদে বাংলার নিজস্ব লোকায়ত চেতনার ওপর আর্য উচ্চসংস্কৃতির এক চরম আগ্রাসনের ইতিহাস সুচতুরভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই কাব্যগুলো পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যরূপে গৃহীত হওয়ার ফলে আত্তীকরণের এই প্রক্রিয়াটি চিরস্থায়ী ও বৈধ বলে বিবেচিত হতে থাকে। বাস্তবে প্রতিটি মঙ্গলকাব্যই একটি সাংস্কৃতিক দমন-আত্তীকরণের দলিল, যেখানে অনার্য স্বাধীনতাকে দৈবশক্তি দিয়ে পদদলিত করে আর্য শ্রেষ্ঠত্বকে চিরস্থায়ী করা হয়েছে। প্রতিটি মঙ্গলকাব্যের মূল থিমই ছিল বাংলার কোনো স্বাধীনচেতা অনার্য রাজা বা ধনী বণিক প্রথমে আর্যদের শিব বা দুর্গার শ্রেষ্ঠত্ব মানতে অস্বীকার করছেন। আর তার শাস্তিস্বরূপ আর্য দেবতারা তার রাজ্য ধ্বংস করছে, তার সন্তানদের হত্যা করছে এবং তাকে চরম যন্ত্রণার মধ্যে ফেলছে; এবং শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে সেই অনার্য বণিক উচ্চবর্ণের দেবতার সামনে হাঁটু গেড়ে চোখের জল ফেলে ক্ষমা চাচ্ছেন ও বশ্যতা স্বীকার করছেন। এই সাহিত্যের স্পেস লুণ্ঠন কোনো নিরীহ শিল্পচর্চা না। এটি ছিল মূলত এ দেশের মানুষের স্বাধীন মনস্তত্ত্বকে চিরতরে অবদমিত করার এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অস্ত্র। তারা সাহিত্যের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের মনে এই গভীর ভয় ও হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে, আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের কৃষ্টি বা দেবতাকে অমান্য করলে এই বদ্বীপের মানুষের জীবনে কেবল চরম ধ্বংস ও বিপর্যয়ই নেমে আসবে। এই যে নিজের মাটির অর্গানিক ঐতিহ্যকে ছোট মনে করা এবং বহিরাগত আর্য ধারার কাছে নিজের মন ও মগজকে সম্পূর্ণ সঁপে দেওয়া, এটিই ছিল এই মাটির প্রাচীনতম ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপ’। এই চতুর মনস্তাত্ত্বিক খাঁচাকে আড়াল করার জন্যই পরবর্তীকালের কলকাতার ভদ্রলোকি ইতিহাসবিদেরা মঙ্গলকাব্যের এই রক্তচোষা ও জালিয়াতিপূর্ণ কালকে ‘বাঙালি সংস্কৃতির আদিম মেধার বিকাশ’ বলে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছেন। যা আসলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের লুণ্ঠিত ইতিহাসকে চিরতরে মাটিচাপা দেওয়ার এক নিখুঁত বুদ্ধিবৃত্তিক লুটতরাজ বৈ কিছু নয় (Partha Chatterjee. The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories, Princeton University Press, page 35-39; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস : আদি পর্ব, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ৩৮২-৩৮৩ ও ৪৭৭-৫৬৫)।
পাল আমলের তান্ত্রিক সহজযান, কায়াসাধনা ও নাথধর্মের সমতাবাদী দর্শন বনাম আর্যাবর্তের যাগযজ্ঞ-সর্বস্ব কট্টর পুরোহিততন্ত্রের আদিম জ্ঞানতাত্ত্বিক যুদ্ধ
বিজয় সেন এবং বল্লাল সেনের দরবারে বসা কনৌজের আমদানিকৃত আর্য পণ্ডিতেরা খুব সূক্ষ্মভাবে দেখতে পেলেন, এ দেশের সাধারণ সমাজ-শ্রমিকেরা তাদের এই লৌকিক কায়াসাধনা ও সহজযানের কারণে আর্যাবর্তের কোনো কৃত্রিম রাজতান্ত্রিক বা ধর্মীয় আধিপত্যকে পাত্তাই দিতে চায় না। যে সমাজের মানুষ নিজের শরীর ও মানবাত্মাকেই পরম পবিত্র মন্দির মনে করে, সে সমাজ কোনোদিনও উচ্চবর্ণের আর্য পুরোহিতদের বানানো কৃত্রিম দেবালয় বা যজ্ঞশালার সামনে জোড়হাতে বশ্যতা স্বীকার করবে না। এই কারণে আর্য সমাজনেতারা এ দেশের মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও কৃষ্টিকে চিরতরে উপড়ে ফেলার জন্য তারা রাজশক্তির প্রত্যক্ষ জোরে এ দেশের আদিম তান্ত্রিক সহজযান, নাথপন্থা এবং লৌকিক সিদ্ধাচার্যদের মরমী দর্শনকে পাইকারি হারে ‘অসভ্য, অপবিত্র ও পাপিষ্ঠ ম্লেচ্ছাচার’ বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে দাগিয়ে দিতে শুরু করলেন। লক্ষ্য হলো, সাধারণ মানুষের মনে এই অবচেতন গ্লানি ও হীনম্মন্যতা স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়া যে, আর্যদের শ্রেষ্ঠত্ব না মেনে, তাদের নিজেদের ঘরের যে আধ্যাত্মিক মেধা বা কৃষ্টি, তা আসলে এক পরম অভিশাপ ও নরকবাসের কারণ। আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের এই সর্বগ্রাসী ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক কলোনিয়ালিজম এ দেশের মানুষের চিন্তার মেরুদণ্ডকে এমনভাবে ভেঙে দিতে চেয়েছিল, যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি লোকসমাজ নিজেদেরকে আর্য এলিটদের তুলনায় জন্মগতভাবেই নিকৃষ্ট ও দাসসুলভ জীব বলে মনে করতে শুরু করে। আর্য পুরোহিতেরা যখন মনুস্মৃতি ও স্মার্ত সংহিতার বজ্রবন্ধনে বাংলার সমাজকে এক নিশ্চিদ্র শৃঙ্খলে বন্দি করার জন্য চারদিকে আইনি বেড়া তুলছিলেন, তখন এ দেশের ব্রাত্য জনগণ কিন্তু তাদের এই সর্বগ্রাসী আধিপত্যের সামনে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেনি। বরং এ দেশের অনার্য প্রাকৃত ভাষা ও লৌকিক মরমী দর্শন এক পরম অলিখিত ও গভীর ‘ভাষাতাত্ত্বিক অবাধ্যতা’ বা লিঙ্গুইস্টিক ডিসওবিডিয়েন্সের জন্ম দিয়েছিল। যা আর্যদের কৃত্রিম শাসনযন্ত্রকে প্রতিনিয়ত ভেংচি কাটত।
আর্য পণ্ডিতেরা যখন সংস্কৃতে তাদের আইনি ফতোয়া লিখে রাজদরবার থেকে মেহনতি মানুষের ক্ষমতা উচ্ছেদ করার খেলায় মেতেছিলেন, তখন এ দেশের সহজযান ও নাথপন্থার সিদ্ধাচার্যরা সাধারণ মানুষের মুখের চলিত ভাষায় নিজেদের গান, দোহা এবং মরমী চর্যাপদ রচনা করে আর্যদের সেই কৃত্রিম স্কেলকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ২৮; নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস : আদি পর্ব, পৃষ্ঠা ৩৮২-৩৮৩ ও ৫২০-৫৩৮)। এই ভাষিক লড়াইটি কেবল শব্দের লড়াই ছিল না; এটি ছিল মূলত এ দেশের মানুষের গ্রামীণ উৎপাদন-সংস্কৃতি এবং তাদের সমতাবাদী মনস্তত্ত্বকে বাঁচিয়ে রাখার এক অবিনশ্বর লৌকিক প্রতিরোধ। আর্যরা যতই তাদের দেবভাষার কৃত্রিম আভিজাত্য দিয়ে প্রাকৃত শব্দগুলোকে ‘তুচ্ছ ও ম্লেচ্ছ’ বলে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য থেকে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র করুক না কেন, সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন শ্রমের ভেতরে সেই জ্যান্ত লোকশব্দগুলোকেই পরম আদরে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই যে নিজের ঘরের প্রাকৃত ভাষার ওপর ভর করে আর্যাবর্তের আরোপিত সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নীরব ও দীর্ঘমেয়াদী লড়াই চালানো—এটিই ছিল এই মাটির আদিমতম ও অর্গানিক মুক্তির সংগ্রাম।
‘ঐতরেয় আরণ্যক’ থেকে আর্যাবর্তের কৃত্রিম সীমান্ত নির্ধারণ—পূর্ব ভারতকে ‘ম্লেচ্ছ ভূমি’ ঘোষণা ও বাংলার মানুষকে ‘পাখি-ভাষী’ বলার জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতারণা
আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের বৈদিক ও স্মার্ত সমাজনেতারা কেবল বাংলা ভাষাকে ‘রৌরব নরক’ বলে ফতোয়া দিয়েই ক্ষান্ত হননি; তারা আইনি ও শাস্ত্রীয় সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে সমগ্র পূর্ব-বঙ্গকে এক পরম অপবিত্র ও অস্পৃশ্য জনপদ হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাচীন বৈদিক ঋষিদের রচিত ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের মনুস্মৃতি ও বৌধায়ন ধর্মসূত্রের মতো কট্টর আর্য আইনি সংহিতাগুলো যদি আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করি তবে দেখব, সেখানে আর্যাবর্ত বা ‘পবিত্র আর্য ভূমির’ এক অতি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক মানচিত্র তৈরি করা হয়েছিল। তারা উত্তর ভারতের হিমালয় থেকে বিন্ধ্য পর্বত এবং সরস্বতী নদী থেকে প্রয়াগ (আধুনিক এলাহাবাদ) পর্যন্ত অঞ্চলকে ঘোষণা করেছিলেন পরম পবিত্র ‘আর্যাবর্ত’ হিসেবে। যেখানে কেবল সদাচারী উচ্চবর্ণের আর্যদের বসবাসের ঐশ্বরিক অধিকার রয়েছে। এই কৃত্রিম ভৌগোলিক সীমানার বাইরে যে বিস্তীর্ণ পূর্ব ভারত—বিশেষ করে পুণ্ড্র, বঙ্গ, রাঢ় এবং সমতট নামক এই পলিস্নাত বদ্বীপ—তাকে আর্য সমাজপতিরা সরাসরি ‘ম্লেচ্ছ ভূমি’ বা অস্পৃশ্য অসুরদের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস : আদি পর্ব, পৃষ্ঠা ৪৫-৪৬ ও ৫৫-৫৬; শশিভূষণ দাশগুপ্ত, বাংলা সাহিত্যের পটভূমিতে প্রচ্ছন্ন বা লোকায়ত ধর্মসম্প্রদায়সমূহ Obscure Religious Cults, পৃষ্ঠা ৫৮-৭০)। আর্যরা খুব ভালো করেই জানত, এ দেশের স্বাধীনচেতা অনার্য অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় কৌম সমাজ তাদের যাগযজ্ঞ-সর্বস্ব কট্টর রাজতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোকে পাত্তা দেয় না। ফলে, এ দেশের উর্বর জমি ও লৌকিক স্বাতন্ত্র্যকে গ্রাস করার জন্য তারা প্রথম মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল আইনি ও ধর্মীয় অবজ্ঞা। তারা আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের মানুষদের জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন যে, পূর্ব ভারতের এই অপবিত্র নদীমাতৃক জনপদে পা রাখা মানেই নিজের আর্যত্ব ও রক্তের পবিত্রতা চিরতরে হারিয়ে ফেলা।
আর্যাবর্তের পুরোহিতেরা যখন দেখতে পেলেন, পূর্ব ভারতের এই বিস্তীর্ণ বদ্বীপের অনার্য অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় মানুষেরা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আর্যদের যাগযজ্ঞ-সর্বস্ব কট্টর রাজতান্ত্রিক সমাজের সামনে নত হচ্ছে না, তখন তারা এই সমাজকে আধ্যাত্মিকভাবে অবদমিত করার জন্য তাদের ভাষার ওপর সরাসরি আক্রমণ চালালেন। ঐতরেয় আরণ্যকে বাংলার আদিবাসীদের সরাসরি ‘দস্যু’ বলে গালাগাল করার পাশাপাশি, তাদের মুখের প্রাকৃত ও লৌকিক জবানকে মানুষের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করা হলো। আর্য পণ্ডিতেরা উপহাস করে বাংলায় কথা বলা মেহনতি মানুষদের বললেন ‘পাখি-ভাষী’ বা ‘বয়ানসি’ (Vayansi)। যার সহজ অর্থ হলো, এই পূর্ব অঞ্চলের মানুষেরা যে ভাষায় নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করে, তা কোনো সভ্য মানুষের ভাষা নয়, বরং তা বনের পশুপাখির কিচিরমিচির শব্দের সমতুল্য এক পরম নিকৃষ্ট আওয়াজ (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ২৭; শশিভূষণ দাশগুপ্ত। বাংলা সাহিত্যের পটভূমিতে প্রচ্ছন্ন বা লোকায়ত ধর্মসম্প্রদায়সমূহ "Obscure Religious Cults As Background Of Bengali Literature", কলকাতা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৪৬, পৃষ্ঠা ৩৬)।
আর্যরা খুব ভালো করেই জানত, একটি জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে যদি ‘অসভ্য ও পশুসুলভ’ বলে প্রতিনিয়ত সোশাল শেইমিং (Social Shaming) করা যায়, তবে সেই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা অবচেতনে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি নিয়ে চরম লজ্জা বোধ করতে শুরু করবে। মানুষ যখন নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে লজ্জা পায়, তখন সে অনায়াসে বিজয়ী বা বহিরাগত শাসক শ্রেণীর কৃত্রিম দেবভাষাকে পরম পবিত্র ও উচ্চ সংস্কৃতির প্রতীক বলে নিজের মাথায় তুলে নেয়। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বৈরাচারের ফলেই কর্ণাটক থেকে আসা সেন শাসকেরা এ দেশের বুকে পা রেখেই সাধারণ মানুষের মুখের প্রাকৃত ভাষাকে নিষিদ্ধ করে সংস্কৃতির এক কৃত্রিম লোহার খাঁচা তৈরি করতে পেরেছিলেন। যার মূল ভিত্তিটি তারা পেয়েছিলেন আর্যাবর্তের এই প্রাচীন ভৌগোলিক ও ভাষিক আপার্থাইডের ফতোয়াগুলোর ভেতর থেকেই।
আর্যদের এই ভৌগোলিক বর্ণবাদ কেবল ধর্মগ্রন্থের পাতার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা এ দেশের স্বাধীন গ্রামীণ কৌম উৎপাদন-সংস্কৃতিকে সামাজিকভাবে অবদমিত ও লুণ্ঠন করার এক সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাল আমল পর্যন্ত বাংলার গ্রামীণ সমাজ যে যৌথ মালিকানা, লৌকিক স্বায়ত্তশাসন এবং পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক জীবন যাপন করত। কিন্তু আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের পণ্ডিতেরা তাকে সম্পূর্ণ ‘অসভ্য ও ম্লেচ্ছাচার’ বলে দাগিয়ে দিয়ে প্রচার করতে লাগলেন, আর্যাবর্তের পবিত্র যজ্ঞের ধোঁয়া যে মাটির আকাশকে স্পর্শ করে না, সেই মাটির উৎপাদিত অন্ন, সেই মাটির জল এবং সেই মাটির মানুষ—সবকিছুই জন্মগতভাবে অপবিত্র ও বর্জনীয় (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস : আদি পর্ব, পৃষ্ঠা ৪৫-৪৬ ও ৫৫-৫৬; শশিভূষণ দাশগুপ্ত, বাংলা সাহিত্যের পটভূমিতে প্রচ্ছন্ন বা লোকায়ত ধর্মসম্প্রদায়সমূহ (Obscure Religious Cults as Background of Bengali Literature), পৃষ্ঠা ৫৮-৭০; ড. এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭-১৯ ও ৪৯-৫৩)। এই সর্বগ্রাসী অপপ্রচারের মূল ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল, এ দেশের মেহনতি কারিগর, চাষী ও ব্রাত্য মানুষদের মন থেকে সমস্ত আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের ক্ষমতা চিরতরে কেড়ে নেওয়া। আর্যরা এই মাটিকে ‘ম্লেচ্ছ ভূমি’ ঘোষণা করে এই মনস্তাত্ত্বিক জাল তৈরি করেছিল যে, আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের বৈদিক অনুশাসন ও রাজতান্ত্রিক কাঠামোকে মেনে না নিলে এই পূর্ব বদ্বীপের মানুষের সমাজে কোনোদিনও ‘সভ্যতা’র আলো প্রবেশ করতে পারবে না।
একটি প্রাচীন বিজয়ী বা বহিরাগত শাসক গোষ্ঠী যখন কোনো স্বাধীন জনপদকে চিরতরে নিজের অধীনস্থ করতে চায়, তখন তারা কেবল সেই অঞ্চলের মানুষের হাত থেকে সোনা-রূপার মুদ্রা কেড়ে নিয়ে বা তাদের সমাজকে জাতপাতের কৃত্রিম নিগড়ে বন্দি করেই ক্ষান্ত হয় না। তাদের সবচেয়ে বড় ও অদৃশ্য মারণাস্ত্রটি হলো ‘ভৌগোলিক বর্ণবাদ’ বা টেরিটোরিয়াল রেসিজম। যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সম্পূর্ণ ভূমি, নদী, জলবায়ু এবং মানুষকে আধ্যাত্মিক ও আইনি উপায়ে চিরতরে ‘অপবিত্র ও নিকৃষ্ট’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের সমাজনেতারা আজ থেকে হাজার বছর আগেই তাদের বিভিন্ন আদিম ধর্মগ্রন্থে ও সংহিতায় এক সুনির্দিষ্ট ও কৃত্রিম ভৌগোলিক মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। যার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল পূর্ব ভারতের এই সুজলা-সুফলা ও পলিস্নাত বদ্বীপের স্বাধীনচেতা মানুষকে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে চিরতরে দেউলিয়া করে দেওয়া।
তাদের শাস্ত্রের পাতায় লিখে দেওয়া হলো, কেবল তাদের সুনির্দিষ্ট পবিত্র ভূমিতেই যাগযজ্ঞ করার, বেদ পাঠ করার এবং উচ্চবর্ণের সদাচারী মানুষের বসবাসের ঐশ্বরিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই আর্যাবর্তের কৃত্রিম সীমান্তের বাইরে যে বিস্তীর্ণ পূর্ব ভারত—বিশেষ করে পুণ্ড্র, বঙ্গ, রাঢ়, মগধ এবং সমতট নামক এই নদীমাতৃক অববাহিকাকে আর্য সমাজপতিরা সরাসরি ‘ম্লেচ্ছ ভূমি’ বা দস্যুদের অপবিত্র দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এ দেশের মাটিকে আর্যাবর্তের উচ্চ সংস্কৃতির বাইরে এক নিকৃষ্ট ‘অপর’ (Other) হিসেবে দাঁড় করানোর এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াই ছিল, বদ্বীপের ইতিহাসের অন্যতম জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতারণার শিকার হওয়ার সুপ্রাচীন মূহুর্ত।
প্রাচীন বৈদিক ঋষিদের তৈরি করা এই ভৌগোলিক মানচিত্রের দিকে তাকালে এর ভেতরের আসল চতুর ভূ-রাজনীতিটি ধরে পড়ে। আর্যদের নির্মিত এই ভৌগোলিক মানচিত্র নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের দলিল নয়; এটি ছিল এক গভীর ও সুনিপুণ ভূরাজনৈতিক কৌশল। যা প্রধানত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। প্রথম স্তম্ভ ‘পবিত্র ও অপবিত্রের ভূরাজনীতি’-র মাধ্যমে আর্যাবর্তকে ‘পবিত্র’ ও তার বাহিরের এলাকা ‘অপবিত্র’ বলে চিহ্নিত করে তারা পূর্ব ভারতের সমৃদ্ধ সম্পদ ও কৃষি-উৎপাদন অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের বৈধতা উৎপাদন করলেন। সেখানকার উৎপাদিত শস্য, পণ্য ও জনশক্তি ‘ব্রাহ্মণ্য আইনের বাইরে’ পড়ে। যা ছিল এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের এক চতুর কৌশল। দ্বিতীয় স্তম্ভ ‘কৃত্রিম সীমানা, প্রকৃত শাসন’-এর মাধ্যমে এই ভৌগোলিক সীমানাকে ধর্মীয় ভাষায় আবৃত এক রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়। আর্যাবর্তের মধ্যে পড়া অঞ্চলগুলিতে ব্রাহ্মণ্য সামাজিক আইন (বর্ণাশ্রম, সংস্কার, দণ্ডবিধি) প্রযোজ্য রাখা হলেও বাইরের অঞ্চলগুলিতে যেকোনো ধরনের আইনি স্বীকৃতি অস্বীকার করা হয়। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্য শাসন ব্যবস্থা যেখানে পৌঁছায়নি, সেখানের অস্তিত্বই মুছে ফেলা বৈধ হয়ে যায়। তৃতীয় স্তম্ভ ‘নিষ্কাশনের নীতি’ প্রয়োগ করে ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ-পুণ্ড্র-বগধকে (মগধকে) ‘দস্যু’ ও ‘ত্রি জাতি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। যার সরাসরি অর্থ ছিল, এই অঞ্চলের মানুষ ‘আর্য সমাজের যোগ্য নয়’। এর মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষ্কাশনকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া হয়। আর চতুর্থ স্তম্ভ ‘পূর্ব ভারতকে শূন্য ঘোষণা’-র আওতায় নিয়ে আসা। আর্যাবর্তের বাইরে পড়া পূর্ব ভারতকে ‘ম্লেচ্ছ ভূমি’ বা অসভ্যদের আবাসস্থল বলে চিহ্নিত করা হলো। ফলে সেখানে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিস্তারকে ‘সভ্যতার অভিযান’ বলে প্রচার করা সহজ হয়ে যায়। যদিও প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ ও শ্রমশক্তি আয়ত্ত করা।
এই কৌশলগুলোর মাধ্যমে আর্যাবর্তের পুরোহিত-রাজন্যরা পূর্ব ভারতের বিপুল কৃষি-সম্পদ, নদীবাণিজ্য ও সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতিকে ‘আর্য’ সমাজের প্রতি কোনো আইনি বা নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত করে একটি ‘খোলা শিকার’ অঞ্চলে পরিণত করেছিলেন। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় বললে, এটি ছিল ‘অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতার’ (Internal Colonialism) একটি আদিরূপ। এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে যেমন দেখিয়েছেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো কীভাবে প্রাচ্যকে ‘অসভ্য, জ্ঞানহীন, অযৌক্তিক, স্বৈরাচারী ও নৈতিকভাবে পতিত’ চিহ্নিত করে নিজেদের ‘সভ্যতার অভিযান’কে ন্যায্যতা দিত। প্রাচীন আর্য ঋষিরাও ঠিক একই কৌশল অনুসরণ করে বঙ্গ, পুণ্ড্র ও সমতটের মানুষদের ‘ম্লেচ্ছ’ ও ‘অসভ্য’ বলে আখ্যায়িত করে এই ভূখণ্ডকে আর্য আইনের বাইরে রেখেছিলেন। যাতে এখানকার উৎপাদিত অন্ন, জল ও জনশক্তি সবকিছুই ‘জন্মগতভাবে বর্জনীয়’ এবং অসভ্য বলে চিহ্নিত হয়; আর তাদের আক্রমণ বৈধ হয়ে যায়। আধুনিককালে ব্রিটিশ ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’ পণ্ডিতেরা যখন প্রাচ্যের ‘অবরুদ্ধ মানসিকতা’ ও ‘স্বৈরাচারী শাসনের’ তত্ত্ব তৈরি করছিলেন, তখন তাঁরা নিঃসন্দেহে এই প্রাচীন বৈদিক কাঠামোর ঋণী ছিলেন। পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতা কেবলমাত্র এই আদি ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদী’ কাঠামোকেই একটি আন্তর্জাতিক ও বৈজ্ঞানিক আখ্যা দিয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। নীতিগতভাবে বলতে গেলে, আর্যাবর্তের এই কৃত্রিম সীমানা আর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ‘সভ্য-অসভ্য’ দ্বৈততার মধ্যে পার্থক্য কেবল সময়ের এবং সেই কৌশল প্রয়োগের ভাষায়। কারণ উভয়ের ভূরাজনীতির মূলকথা একটাই, "যা জয় করা যায়নি, তাকে অপবিত্র-অসভ্য ঘোষণা কর। আর যাকে অপবিত্র-অসভ্য ঘোষণা করা যায়, তাকে লুণ্ঠন করা বৈধ"।
এই ভৌগোলিক বর্ণবাদকে একটি নিশ্ছিদ্র আইনি খাঁচায় বন্দি করার জন্য আর্য পণ্ডিতেরা তাদের ‘বৌধায়ন ধর্মসূত্র’ নামক প্রাচীন আইনগ্রন্থে এক অত্যন্ত চরমপন্থী ও অমানবিক সামাজিক বিধান জারি করেছিলেন। সেই বিধানে স্পষ্ট অক্ষরে লিখে দেওয়া হলো, যদি আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের মানুষ কোনো বিশেষ জরুরি তীর্থযাত্রা ছাড়া পুণ্ড্র, বঙ্গ, কলিঙ্গ বা মগধের মাটিতে পা রাখেন, তবে তিনি তৎক্ষণাৎ সামাজিকভাবে ‘পতিত’ বা অপবিত্র বলে গণ্য হবেন (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ৪২-৪৩। )। নিজের এই গুরুতর ধর্মীয় ও আইনি অপরাধ কাটানোর জন্য এবং আর্য সমাজে পুনরায় ফিরে যাওয়ার জন্য তাকে ‘পুনস্তোম’ বা ‘সর্বপৃষ্ঠা’ নামক অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং শরীর-পীড়নকারী এক তান্ত্রিক বৈদিক যজ্ঞের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। যেখানে পুরোহিতদের বিপুল সোনা ও রৌপ্য মুদ্রা দক্ষিণা দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক (Buhler, Georg (tr.). The Sacred Laws of the Āryas, Part II: Vāsiṣṭha and Baudhāyana. Sacred Books of the East, Vol. 14. Oxford University Press, 1882. (বৌধায়ন ধর্মসূত্র, ১.১.১৪-১৫)। এই প্রায়শ্চিত্তের আইনি চক্রান্তটি আসলে কোনো সাধারণ অন্ধবিশ্বাস বা ধর্মীয় অনুশাসন ছিল না; এটি ছিল মূলত এ দেশের মানুষের স্বাধীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্যকে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে পঙ্গু করার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট। আর্য রাজন্যবর্গ ও পুরোহিতেরা এই আইনের মাধ্যমে আর্যাবর্তের সাধারণ মানুষের সাথে পূর্ব-বঙ্গের অনার্য সমাজ-শ্রমিকদের সমস্ত স্বাভাবিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ, জ্ঞান ও সংস্কৃতির লেনদেন চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার ভূরাজনৈতিক চাল চালেন।
এই ভৌগোলিক ও আইনি নিষ্পেষণ চূড়ান্ত সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছিল যখন সমাজ-কাঠামোতে ‘মনুস্মৃতি’ বা মানব ধর্মশাস্ত্রের কট্টর বর্ণবাদী ধারাগুলো রাজশক্তির জোরে এই পলিস্নাত বদ্বীপের মানুষের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মনুস্মৃতির মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনটি ছিল সম্পূর্ণভাবে মেহনতি মানুষের শ্রম ও আত্মমর্যাদাকে চূর্ণ করে একচ্ছত্র ‘ব্রাহ্মণ-প্রিভিলেজ’ বা উচ্চবর্ণের ঐশ্বরিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। মনু তাঁর আইনগ্রন্থে স্পষ্ট ঘোষণা করলেন, একজন উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ যদি কোনো নিম্নবর্ণের মানুষকে হত্যা বা বর্বরোচিত নির্যাতনও করেন, তবে রাজার আইনে তাঁর কোনোদিনও মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর কারাদণ্ড হবে না। বড়জোর তাকে কিছু তুচ্ছ কড়ি জরিমানা বা নামমাত্র প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেওয়া হবে। অথবা তাকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে মাথা মুণ্ডন করা হবে, যা তার জন্য ‘মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে গণ্য। কারণ ব্রাহ্মণ হত্যা পঞ্চমহাপাতকের (ব্রাহ্মণ হত্যা করা, মদ্যপান করা, ব্রাহ্মণের সম্পত্তি চুরি করা গুরু বা পিতৃতুল্য ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা এবং উপরোক্ত পাপে লিপ্ত ব্যক্তির সংসর্গ গ্রহণের) অন্তর্ভুক্ত। এর বিপরীতে, যদি কোনো নিম্নবর্ণের অনার্য মানুষ উচ্চবর্ণের কারো বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করারও চেষ্টা করেন, তবে তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়া হবে। অথবা তাকে জ্বলন্ত তেলের কড়াইয়ে পুড়িয়ে মারা হবে। এমনকি শূদ্র যদি কোনো দ্বিজাতিকে (উচ্চবর্ণের কাউকে) গালিগালাজ করে, তবে তার জিহ্বা কেটে ফেলা হবে। কারণ সে নীচজাতির। অন্যদিকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য-কে গালিগালাজ করলে যথাক্রমে ৫০ ও ২৫ পণা জরিমানা, এবং শূদ্র-কে গালিগালাজ করলে ১২ পণা জরিমানা। এমন নিষ্ঠুরতম বিধানকে ‘ঐশ্বরিক আইন’ বলে সংহিতায় প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়া হলো [মনুস্মৃতি (Manusmṛti), অধ্যায় ৮, শ্লোক ৩৭৯-৩৮০ (8.379-380) – ব্রাহ্মণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে মুণ্ডনের বিধান, মনুস্মৃতি (Manusmṛti), অধ্যায় ৮, শ্লোক ২৭০ (8.270), মনুস্মৃতি (Manusmṛti), অধ্যায় ৮, শ্লোক ২৬৭-২৬৮ (8.267-268)]।
মনুস্মৃতির রাজকীয় অনুপ্রবেশের ফলে বাংলার আদিম কৌম সমাজের নিজস্ব, প্রাকৃত এবং সম্পূর্ণ সমতাবাদী যে লোকায়ত আইন ও বিচার ব্যবস্থা ছিল, তাকে সুপরিকল্পিতভাবে লুণ্ঠন ও ধ্বংস করা হলো। পাল আমল পর্যন্ত এ দেশের গ্রামীণ সমাজ যে যৌথ মালিকানা এবং সামাজিক সাম্যের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-মীমাংসা করত, তাকে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ ও ম্লেচ্ছাচার’ ঘোষণা করে আর্য আমলাদের একচেটিয়া আদালত কায়েম করা হলো। এই কৃত্রিম আইনি জালিয়াতির ফলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি সমাজ-শ্রমিকেরা নিজেদের জন্মভূমি ও চাষের জমির ওপর থেকে সমস্ত আইনি অধিকার হারিয়ে এক একজন রাষ্ট্রহীন ব্রাত্য ক্রীতদাসে পরিণত হলেন। এই যে একটি বৃহৎ জনপদের মানুষকে আইনি ও ভৌগোলিক ফতোয়া দিয়ে নিজের ঘরেই পরবাসী বানিয়ে দেওয়ার সর্বগ্রাসী আগ্রাসন, এটিই ছিল এই বদ্বীপের ইতিহাসে কলোনিয়াল ফ্যাসিবাদের আদিমতম আঁতুড়ঘর।
ওরিয়েন্টালিজমের প্রাচীন রূপ, ছদ্ম-সেক্যুলার ভদ্রলোকি ইতিহাসের মেটা-ন্যারেটিভ এবং ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ আদিম কাঠামো
আর্য পণ্ডিতেরা নান্দনিকতার কৃত্রিম স্কেল তৈরি করে মেহনতি মেধাকে দেউলিয়া প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। যেখানে কড়ি দিয়ে লেনদেন করা ‘অধম-সংকর’ ও সোনা-রূপা দিয়ে যজ্ঞ করা ‘উচ্চ সংস্কৃতি’র প্রতীক হয়ে উঠলো। এই মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনই উত্তরকালে এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (Orientalism) তত্ত্বের এক জীবন্ত প্রাচীন রূপ হিসেবে বাংলায় মঞ্চস্থ হয়েছিল। যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করার জন্য তাদের পোশাক, কৃষ্টি ও প্রাত্যহিক অর্থনীতিকে ‘অসভ্য ও নিকৃষ্ট’ বলে প্রাতিষ্ঠানিক স্কেলের ভেতরেই তীব্র শেইমিং করা হতো। আর্যাবর্তের পুরোহিত-রাজন্যবর্গ যেভাবে বাংলার প্রাকৃত ভাষাকে ‘পাখি-বাচাল’, কড়ি-অর্থনীতিকে ‘অধম-সংকরের বাণিজ্য’ এবং লোকায়ত দেহতত্ত্বকে ‘ম্লেচ্ছাচার’ বলে দাগিয়েছিলেন, তা ছিল ঔপনিবেশিক ওরিয়েন্টালিজমের হুবহু প্রতিরূপ। যেখানে ‘প্রাচ্য’কে অপর (Other) করে ফেলে পাশ্চাত্য/আর্য ‘স্ব’-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের খেলা চালানো হয়।
কলকাতার তথাকথিত ছদ্ম-সেক্যুলার ভদ্রলোক ইতিহাসবিদেরা উনিশ শতক থেকে যে মেটা-ন্যারেটিভ বা বৃহৎ বয়ান তৈরি করেছেন, তার মূল লক্ষ্যই ছিল সেন আমলের এই মুদ্রা-সংকট, কড়ি-অর্থনীতির লুণ্ঠন, লোকায়ত দেব-দেবীর হাইজ্যাক এবং ভৌগোলিক-আইনি আপার্থাইডের কুৎসিত ইতিহাসকে গ্লোরিফাই করা। তারা ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন যেন দক্ষিণাত্যের এই বহিরাগত সেন রাজাদের আগমনই এই অনগ্রসর বদ্বীপে আলোর প্রথম রশ্মি নিয়ে এসেছিল। যেন পাল আমলের রৌপ্য-প্রাচুর্য ছিল অরাজকতা, আর সেন আমলের কড়ি-অর্থনীতি ও মনুস্মৃতির ব্রাহ্মণ-প্রিভিলেজ ছিল ‘শৃঙ্খলা ও সভ্যতা’র সূচনা। তাঁরা মঙ্গলকাব্যের সেই রক্তচোষা ও জালিয়াতিপূর্ণ কালকে ‘বাঙালি সংস্কৃতির আদিম মেধার সুবর্ণ বিকাশ’ বলে অভিহিত করেছেন, এবং ভৌগোলিক বর্ণবাদী ঐতরেয় আরণ্যকের ফতোয়াগুলোকে নেহাতই ‘প্রাচীন কুসংস্কার’ আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক চক্রান্তের মাধ্যমে তারা আসলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রাত্য ও অনার্য মানুষের স্বাধীন অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড, আধ্যাত্মিক সমতাবাদ এবং আইনি আত্মমর্যাদার ইতিহাসকে চিরতরে সমাহিত করতে চেয়েছিলেন। আর্যরা এই মাটিকে ‘ম্লেচ্ছ ভূমি’ ঘোষণা করে এই মনস্তাত্ত্বিক জাল তৈরি করেছিল যে, আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের বৈদিক অনুশাসন ও রাজতান্ত্রিক কাঠামোকে মেনে না নিলে এই পূর্ব বদ্বীপের মানুষের সমাজে কোনোদিনও ‘সভ্যতা’র আলো প্রবেশ করতে পারবে না (আহমদ, আবুল মনসুর, বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ২১-২৪, ৪৬-৪৮; ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ২০-২৮; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩২-৩৪, ৪৫-৪৮, ৫৫-৫৬)। আর্যাবর্তের পুরোহিততন্ত্র যেমন কায়াসাধনা ও সহজযানকে ‘অপবিত্র’ বলে দমিয়েছিল, তেমনি আধুনিক ভদ্রলোকি ইতিহাসও এই প্রতিরোধের গল্পগুলোকে ‘আঞ্চলিক উগ্রবাদ’ বা ‘অতি-জাতীয়তাবাদ’ বলে খারিজ করে দেয়।
মঙ্গলকাব্যের মাধ্যমে তারা সাহিত্যের স্পেস লুণ্ঠন করে এ দেশের মানুষের মনে এই গভীর ভয় ও হীনম্মন্যতা চিরস্থায়ীভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে, আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের কৃষ্টি, তাদের ভাষা বা তাদের দেবতাকে অমান্য করলে এই বদ্বীপের মানুষের জীবনে কেবল চরম ধ্বংস, লাঞ্ছনা ও বিপর্যয়ই নেমে আসবে। এই কৃত্রিম জ্ঞানতাত্ত্বিক খাঁচার ভেতরেই বাংলার সাধারণ মানুষ নিজেদের ভূমি ও ভাষায় এক প্রকার পরবাসী হয়ে পড়েছিলেন। কড়ি-অর্থনীতি যেমন তাদের হাত থেকে পুঁজি কেড়ে নিয়েছিল, মনুস্মৃতি যেমন তাদের কণ্ঠরোধ করেছিল, তেমনি এই ভদ্রলোকি ইতিহাস-বয়ান তাদের ইতিহাস-চেতনাকে লুঠ করেছিল। কিন্তু এই লুঠের ইতিহাসকে যদি আমরা তাত্ত্বিক চোখে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখব—এই ‘মেটা-ন্যারেটিভ’ আসলে আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্রেণির স্বার্থকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। এটি কোনো নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ছিল না, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মপরিচয় দখলের একটি দীর্ঘমেয়াদী কলোনিয়াল প্রকল্প।
বাস্তব সত্য হলো, কড়ি-অর্থনীতির নিগড়, ধর্মীয় জালিয়াতি এবং ভৌগোলিক-আইনি আপার্থাইড—এই তিনটি স্তরের যৌথ আঘাত এ দেশের মানুষের চিন্তা ও মেধার স্বাধীনতাকে শত শত বছর ধরে অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রেখেছিল। সেসময়ের এ দেশীয় অধিবাসীদের নিজের ভূমিতেই মনস্তাত্ত্বিক দাসে পরিণত করেছিল। আর্যাবর্তের উচ্চবর্ণের এই সর্বগ্রাসী ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও আইনি কলোনিয়ালিজম এ দেশের মানুষের চিন্তার মেরুদণ্ডকে এমনভাবে ভেঙে দিতে চেয়েছিল, যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি লোকসমাজ নিজেদেরকে আর্য এলিটদের তুলনায় জন্মগতভাবেই নিকৃষ্ট ও দাসসুলভ জীব বলে মনে করতে শুরু করে।
১৯ শতকের ‘বাঙালি সংস্কৃতির’ মেটা-ন্যারেটিভ বা ছদ্ম-ইতিহাস প্রচারও সেই একই উদ্দেশ্য থেকে। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের অর্গানিক ইতিহাসকে চিরতরে সমাহিত করার প্রাতিষ্ঠানিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আর্য সিলসিলা। এই গভীর ভাবসংকট ও শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের লুণ্ঠিত পরিচয় ও পরম আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হলে, আমাদের এই কৃত্রিম আর্য ও ভদ্রলোকি কারখানার তৈরি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি জালিয়াতিকে তাত্ত্বিকভাবে ডিকোড করতেই হবে। এই মাটির প্রকৃত সমতাবাদী প্রতিরোধ-চেতনার ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতেই হবে।

Post a Comment