Loading...

প্রথম অধ্যায়: ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি—ভাষা ও ভূমির বাস্তুচ্যুতি

 প্রথম অধ্যায়: ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি—ভাষা ও ভূমির বাস্তুচ্যুতি
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি: বাংলার প্রাক-আর্য সমাজ, ভাষা ও আর্য আগমনের প্রতীকী চিত্র ,,,,,, seosazzadchy

    বাংলার প্রাক-আর্য সমাজ, ভাষা ও উৎপাদন-সংস্কৃতির সঙ্গে বহিরাগত আর্য সংস্কৃতির সংঘাতের একটি প্রতীকী উপস্থাপন

    Previous Part.......

    ১:১

    আর্যদের বহিরাগমন এবং প্রাক-আর্য অনার্য আদিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতা: ইউরেশীয় প্রব্রজন এবং অনার্য মাটির আদিম নৃতত্ত্ব

    একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরাধীনতার শেকড় সবসময় প্রোথিত থাকে তার আদিমতম নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের বিকৃতির ভেতরে। এই ভূখণ্ডের, বিশেষ করে বৃহত্তর বাংলার স্বাধীন অস্তিত্বকে চূর্ণ করার যে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র, তার প্রথম এবং প্রধান আঘাতটি এসেছিল আজ থেকে হাজার বছর আগে—বহিরাগত আর্যদের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে। আধুনিক তথাকথিত ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রবক্তারা সবসময় একটি বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চান, বাংলার সভ্যতা এবং সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি এসেছে উত্তর ভারতের আর্য ধারা থেকে। কিন্তু সমকালীন নৃতাত্ত্বিক উপাত্ত, জিনতাত্ত্বিক গবেষণা এবং প্রামাণ্য ইতিহাস এই আর্যবাদী উচ্চবর্ণীয় অহমিকাকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়া, কাস্পিয়ান সাগরের অববাহিকা এবং ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চল থেকে একদল যাযাবর, পশুপালক গোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়েছিল। ইতিহাসে যারা ‘আর্য’ নামে পরিচিত। তারা যখন সিন্ধু ও গাঙ্গেয় উপত্যকায় এসে পৌঁছায়, তখন এই মাটির নিজস্ব, প্রাকৃত এবং অর্গানিক সভ্যতাগুলোর সাথে তাদের প্রথম সংঘাত বাঁধে। এই বহিরাগত যাযাবর গোষ্ঠীটি কোনো উন্নততর মানবিক দর্শনের ধারক ছিল না। তারা ছিল এক আগ্রাসী সামরিক সংস্কৃতির প্রতিনিধি। যাদের মূল লক্ষ্যই ছিল স্থানীয় ভূমি এবং মানুষের আত্মপরিচয়কে জবরদখল করা। (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) , প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় অধ্যায়: "ইতিহাসের গোড়ার কথা", পৃষ্ঠা ২৩–৫৯)।

    কিন্তু এই আগ্রাসনের কাহিনী এবং ‘আর্য’ শব্দটির চারপাশে বোনা জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতিটি বোঝার জন্য প্রথমেই আমাদের ‘আর্য’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও ইতিহাস জানতে হবে। ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা তাঁর ‘আর্যেদর অনুসন্ধান’ গ্রন্থে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছেন, ‘আর্য’ শব্দটি কোনো জাতিগত বা বর্ণগত পরিচয়বাচক শব্দ ছিল না। বরং এটি ছিল একটি সামাজিক মর্যাদাবাচক বিশেষণ। ঋগ্বেদে ‘আর্য’ বলতে বোঝাত সম্মানিত, পশুসম্পদের মালিক, উচ্চকুল-সন্তান বা সদাচারী ব্যক্তিকে। আবেস্তায় ‘আর্য’ শব্দের অর্থ ছিল ‘আত্মীয়’ বা ‘বন্ধু’। এমনকি ফিনিশ ভাষায় ‘ওরজো’ শব্দের অর্থ ‘দাস’। যা থেকে বোঝা যায়, এই শব্দটি বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এটি কখনোই একটি নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্রকে নির্দেশ করেনি। (শর্মা, রামশরণ। আর্যেদর অনুসন্ধান। প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১০-১২)। অষ্টাদশ শতকে যখন উইলিয়াম জোন্স (১৭৪৬-১৭৯৪ খ্রি.) সংস্কৃত, গ্রীক ও ল্যাটিনের সাদৃশ্য আবিষ্কার করেন, তখন থেকেই ‘আর্য’ ধারণাটি একটি জাতিগত তত্ত্বে রূপান্তরিত হতে থাকে। উনিশ শতকে নাৎসি জার্মানি এই তত্ত্বকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে জার্মানদের ‘বিশুদ্ধ আর্য’ হিসেবে প্রচার করে। আর ঔপনিবেশিক ভারতে এই তত্ত্ব হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ও উচ্চবর্ণীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতির ফলেই আজও অনেকেই ভাবেন, ‘আর্য’ বলতে একটি পৃথক জাতি বা রক্তধারাকে বোঝায়। (Jones, William. (1788). "The Third Anniversary Discourse: On the Hindus". Asiatick Researches, Vol. 1, p. 422,  Thapar, Romila. (2019). "Which of Us Are Aryans?". In Which of Us Are Aryans?: Rethinking the Concept of Our Origins, New Delhi: Aleph Book Company, pp. 1–35, Thapar, Romila. (2000). "The Aryan: Recasting Mythology". In Cultural Pasts: Essays in Early Indian History, New Delhi: Oxford University Press, pp. 963–987)।

    উত্তর ভারতে আর্যদের এই আধিপত্য বিস্তারের সমান্তরালে, পূর্ব ভারতের এই বিস্তীর্ণ বদ্বীপ তথা পুণ্ড্র, বঙ্গ, রাঢ় এবং সমতট অঞ্চলের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নৃতাত্ত্বিক সত্য এই যে, বাংলার আদি এবং মূল অধিবাসীরা আর্য রক্তের বা সংস্কৃতির কেউ ছিলেন না। তারা ছিলেন অনার্য। যাদের মূল রক্তধারা গঠিত হয়েছিল অস্ট্রিক (ভেড্ডিড বা প্রোটো-অস্ট্রালয়েড), দ্রাবিড় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মঙ্গোলয়েড জাতিগোষ্ঠীর এক চমৎকার প্রাকৃতিক মিশ্রণে। এই অনার্য আদিবাসীরা ছিলেন এই মাটির প্রকৃত সন্তান। যারা সিন্ধু বা বৈদিক সভ্যতার অনেক আগেই কৃষিকাজ, নৌচাষ এবং গ্রাম-ভিত্তিক এক সাম্যবাদী ও লোকায়ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এরা প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে বাস করতেন এবং তাদের কোনো কৃত্রিম বর্ণভেদ বা জাতপাতের অপার্থাইড ছিল না। কিন্তু উত্তর ভারতের আর্য এলিটরা যখন এই পূর্ব ভারতের সমৃদ্ধি এবং স্বাধীন সত্ত্বাকে গ্রাস করতে চাইল, তখন তারা প্রথম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল ‘সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বর্ণবাদ’। তৎকালীন আর্যদের আদিমতম গ্রন্থগুলোতে বাংলার এই স্বাধীনচেতা, অনার্য মানুষকে অত্যন্ত নিচু চোখে দেখা হয়েছে। ঋগ্বেদ এবং ঐতরেয় আরণ্যকের মতো বৈদিক গ্রন্থগুলোতে বাংলার আদিবাসীদের সরাসরি ‘দস্যু’ (Dasyu) বলে অভিহিত করা হয়েছে। এমনকি, তাদের ভাষাকে মানুষের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে উপহাস করে বলা হয়েছে ‘পাখি-ভাষী’ (Vayansi)। অর্থাৎ, আর্য মনস্তত্ত্বে বাংলার অনার্য মানুষ জন্ম থেকেই ছিল অবদমিত এবং তাদের ভাষা ছিল পরিত্যাজ্য। (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), ১৯৪৯, ২য় অধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৩-৫৭; ৩য় অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১০৮-১২৪; ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃষ্ঠা ২০৯-২১৬; ১০ম অধ্যায়, উপ-পরিচ্ছেদ: ‘পুরাণ-কথা’ ও ‘আর্য যোগাযোগ’, পৃষ্ঠা ৩৪৯-৩৫৪))।

    এই আদিম নৃতাত্ত্বিক সংঘাতটি কেবল রক্তের বা ভূখণ্ডের লড়াই ছিল না, এটি ছিল আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদী জ্ঞানতাত্ত্বিক যুদ্ধ (Epistemic Warfare)। আর্যরা খুব ভালো করেই জানত, একটি ভূখণ্ডকে চিরতরে নিজেদের দখলে রাখতে হলে সেখানকার আদি বাসিন্দাদের অবচেতনে এক গভীর হীনম্মন্যতার বীজ বুনে দিতে হবে। বাংলার মাটি এবং মানুষকে আর্য সংস্কৃতির বাইরে একটি ‘অন্য’ বা নিকৃষ্ট ‘অপর’ (Other) হিসেবে চিহ্নিত করার এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াই হলো এই মাটির প্রথম ‘সাংস্কৃতিক জালিয়াতি’। তারা এই অঞ্চলের লোকায়ত দেব-দেবী, প্রকৃতিপূজা এবং সাম্যবাদী সমাজ কাঠামোকে ‘অসভ্য’ এবং ‘ম্লেচ্ছ’ বলে দাগিয়ে দিতে শুরু করে। উচ্চবর্ণের এই আদিম ঔপনিবেশিক আগ্রাসনই পরবর্তীকালে সেন রাজবংশ এবং উনিশ শতকের কলকাতার ভদ্রলোক সমাজের জন্য একটি উর্বর তাত্ত্বিক জমি তৈরি করে দিয়েছিল, যা ব্যবহার করে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের অর্গানিক ইতিহাসকে চিরতরে সমাহিত করতে চেয়েছিল (বাঙালির অনার্য নৃতাত্ত্বিক গঠন এবং আর্যীকরণ প্রক্রিয়ার মূল আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), ২য় অধ্যায়: ‘ইতিহাসের গোড়ার কথা’, পৃষ্ঠা ২৩-৫৭ এবং ১০ম অধ্যায়: ‘রাজবৃত্ত’, পৃষ্ঠা ৩৫০-৩৫৩))।

    ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান এবং আর্য-সংস্কৃতায়নের প্রাক-মুহূর্ত

    ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চল থেকে প্রব্রজনকারী যাযাবর আর্যদের সামরিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যখন ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল পার হয়ে ধীরে ধীরে গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন পূর্ব ভারতের এই সুজলা-সুফলা বদ্বীপের সমাজ কাঠামো ছিল সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আর্য-বেদীয় সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আর্যরা যখন এই মাটিতে তাদের বর্ণবাদী ও যাগযজ্ঞ-সর্বস্ব আধিপত্য চাপানোর প্রথম সুপরিকল্পিত ছক আঁকছিল, তখন এই অঞ্চলের প্রাক-আর্য অনার্য আদিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক শেকড় এতটাই গভীরে প্রোথিত ছিল যে, তাকে সামরিক শক্তি দিয়ে রাতারাতি উপড়ে ফেলা অসম্ভব ছিল। এই ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণাদি এবং আর্যদের আগমনের প্রাক-মুহূর্তে বাংলার মূল প্রাকৃত ভাষার যে বৈপ্লবিক ও অর্গানিক অবয়ব ছিল, তা বুঝতে হলে আমাদের এই মাটির মূল ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসের গভীরতম পরতে প্রবেশ করতে হবে।

    ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো, আর্যদের আগমনের বহু শতাব্দী আগেই বাংলার মাটির মানুষেরা নিজেদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং লোকায়ত লৈখিক ও মৌখিক ভাষার কাঠামো তৈরি করেছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক উপাত্ত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, বাংলা ভাষার আদিমতম এবং মৌলিক উপাদানগুলোর সিংহভাগই এসেছে অনার্য উৎস—তথা অস্ট্রো-এশীয় (Austro-Asiatic) বা অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড় (Dravidian) ভাষার মূল ধারা থেকে। দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে মৌলিক শব্দগুলো, বিশেষ করে কৃষিকাজ, ফলমূল, তরিতরকারি, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং ভূপ্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত শব্দসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর সাথে আর্যদের বৈদিক বা সংস্কৃত ভাষার দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। উদাহরণস্বরূপ— লাঙল, কুড়াল, জোয়াল, ঢেঁকি, কুলা, খড়, মাঠ, বিল, খাল, ডোবা, ঝোল, কলা, নারিকেল, সুপারি, লেবু, বেগুন, চিংড়ি, মুড়ি, কুঁড়েঘর, ডাব এবং চালের মতো প্রাত্যহিক জীবনের চিরকালীন শব্দগুলো সরাসরি অস্ট্রিক ও প্রাক-আর্য লোকভাষা থেকে অবিকৃতভাবে টিকে রয়েছে। আর্যরা যখন এই মাটিতে পা রাখেনি, তখন এই মাটির অনার্য মানুষেরা এই শব্দগুলোর মাধ্যমে তাদের উৎপাদন-সংস্কৃতি এবং সাম্যবাদী সমাজকে সচল রেখেছিলেন। আর্য-সংস্কৃতায়নের আগ্রাসী প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে এই জীবন্ত লোকশব্দগুলোকে ‘ম্লেচ্ছ’ বা ‘তুচ্ছ’ বলে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য থেকে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, ৮ম মুদ্রণ, ২০১৪, উপক্রমণিকা: পৃষ্ঠা ১৯-২০ এবং ৫ম পরিচ্ছেদ: ‘বাঙ্গালা ভাষায় অনার্য প্রভাব’, পৃষ্ঠা ৪৯-৫৮)।

    আর্য-অনার্য বিভাজনের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও এই সত্যকে আরও শক্তিশালী করে। রামশরণ শর্মার ‘আর্যেদর অনুসন্ধান’ গ্রন্থে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-এর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে গৃহপালিত অশ্বের কোনো নির্ভরযোগ্য নমুনা পাওয়া যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার শত শত খননস্থলে মহিষ, বাঘ, হাতি, গণ্ডারের মূর্তি ও সীলমোহর পাওয়া গেলেও অশ্ব প্রায় অনুপস্থিত। (শর্মা, রামশরণ। আর্যেদর অনুসন্ধান। প্রোগ্রেসিভ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১৬-১৮)। অথচ ঋগ্বেদ ও আবেস্তায় অশ্বের বিপুল উল্লেখ রয়েছে। যা প্রমাণ করে অশ্ব ছিল বহিরাগত আর্য সংস্কৃতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অশ্বের আদি বাসভূমি ছিল নীপার ও ভলগা নদীর মধ্যবর্তী দক্ষিণ রাশিয়ার স্তেপ অঞ্চল। সেখান থেকে এটি ধীরে ধীরে মধ্য এশিয়া, ইরান ও আফগানিস্তানের মাধ্যমে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-এর পর ভারতে প্রবেশ করে। (শর্মা, রামশরণ। আর্যেদর অনুসন্ধান। প্রোগ্রেসিভ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১৮-২০, ৪৬-৪৭)। আর্যরা যেমন অশ্ব এনেছিল, তেমনি তারা এনেছিল অরযুক্ত চক্র ও রথ। যার ব্যবহার সিন্ধু সভ্যতার কোনো স্তরে পাওয়া যায়নি। সিন্ধু সভ্যতায় নিরেট চাকা (solid wheel) ছিল, কিন্তু অরযুক্ত চক্র (spoked wheel) এসেছে মধ্য এশিয়া থেকে, যা আর্য সংস্কৃতিরই একটি বিশেষ উপাদান। (শর্মা, রামশরণ। আর্যেদর অনুসন্ধান। প্রোগ্রেসিভ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১৯-২০)।

    নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক এই সত্যটি উচ্চবর্ণের আর্য ঐতিহাসিকেরা সবসময় সুপরিকল্পিতভাবে চেপে যেতে চেয়েছেন। তারা একটি কাল্পনিক মেটা-ন্যারেটিভ বা ছদ্ম-ইতিহাস তৈরি করেছেন যে, বাংলা ভাষা মূলত সংস্কৃতের ‘দুহিতা’ বা কন্যা এবং সংস্কৃত ব্যাকরণের গর্ভ থেকেই এই ভাষার জন্ম। কিন্তু ড. শহীদুল্লাহর নৃতাত্ত্বিক উপাত্ত এই জালিয়াতিকে তাত্ত্বিকভাবে চূর্ণ করে দেখায় যে, বাংলা কোনোভাবেই সংস্কৃতের সরাসরি সন্তান নয়; বরং বাংলা গড়ে উঠেছে এই মাটির আদিম অনার্য ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত’ এবং লোকায়ত ভাষার দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে। আর্যরা যখন এই পূর্ব ভূখণ্ডের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইল, তখন তারা দেখল যে এখানকার মানুষের ভাষাগত ঐক্য অত্যন্ত শক্তিশালী। এই ঐক্যকে না ভাঙলে ভূমি ও মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদী শাসন জারি করা অসম্ভব। ফলে তারা ফতোয়া ও শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধের মাধ্যমে স্থানীয় প্রাকৃত ভাষাকে অবদমিত করার এক সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়া শুরু করে, যা এই মাটির মানুষের মনস্তত্ত্বকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার প্রথম ঐতিহাসিক নকশা ছিল। (বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দুহিতা নয়, বরং গৌড়ীয় প্রাকৃত ও গৌড় অপভ্রংশ থেকে এর উৎপত্তির ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণের জন্য দ্রষ্টব্য: শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৪, ২য় পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা ২৭-৩১)।

    আর্যদের এই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আক্রমণের মূল লক্ষ্যই ছিল নান্দনিকতার একটি কৃত্রিম স্কেল তৈরি করা। যেখানে আর্যদের বৈদিক ভাষাকে ‘দেবভাষা’ এবং উচ্চবর্ণের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে, আর বাংলার অনার্য মানুষের লোকায়ত প্রাকৃত ধারাকে ‘অসভ্য’ এবং ‘পশুসুলভ’ বলে শেইমিং করা হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক অপার্থাইড বা বর্ণবাদের প্রথম শিকার হয়েছিল বাংলার আদিম ভূমি-সংলগ্ন মানুষেরা। আর্য সমাজনেতারা তাদের রচিত মনুস্মৃতি ও অন্যান্য শাস্ত্রীয় সংহিতায় স্পষ্ট বিধান জারি করলেন, যারা এই পূর্ব অঞ্চলের ভাষা ও আচারের সাথে যুক্ত হবে, তারা পতিত এবং অপবিত্র বলে গণ্য হবে। এই প্রক্রিয়াই হলো এই মাটির প্রাচীনতম ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপ’-এর আদিম ল্যাবরেটরি। তারা শুধু মানুষের জমি বা ফসল দখল করেনি; তারা প্রথম আঘাতটি হেনেছিল মানুষের মুখের ভাষার ওপর। যাতে অনার্য জনগোষ্ঠী নিজেদের ইতিহাস ও পরিচয় ভুলে গিয়ে আর্যদের ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্রেষ্ঠত্বকে দৈব ও চিরন্তন বলে মেনে নেয় (প্রাচীন বৈদিক ও পৌরাণিক স্মৃতি-শাসনে বাংলার অনার্যদের পতিত ঘোষণা এবং আর্যীকরণের এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মূল আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), ৬ষ্ঠ অধ্যায়: ‘বর্ণ বিন্যাস’ এবং ১০ম অধ্যায়: ‘রাজবৃত্ত’, পৃষ্ঠা ৩৫০-৩৫৩)।

    অনার্য উৎপাদন-সংস্কৃতি, লৌকিক প্রতিরোধ এবং আদিম আধ্যাত্মিকতার সংঘাত

    ইউরেশীয় যাযাবর আর্যদের বর্ণবাদী মনস্তত্ত্ব, যাগযজ্ঞ এবং স্বৈরতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর সমান্তরালে প্রাক-আর্য বাংলার অনার্য আদিবাসীদের যাপিত জীবন কেবল একটি আদিম মানবগোষ্ঠীর টিকে থাকার লড়াই ছিল না; তা ছিল এক সুসংগঠিত ভূ-প্রাকৃতিক সাম্যবাদ ও যৌথ উৎপাদন-সংস্কৃতির জীবন্ত ইশতেহার। আর্যরা যখন সিন্ধু অববাহিকা জয় করে গাঙ্গেয় উপত্যকা হয়ে পূর্ব ভারতের এই বিস্তীর্ণ বদ্বীপের দিকে তাদের আগ্রাসী নজর ফেলেছিল, তখন বাংলার এই অস্ট্রিক, দ্রাবিড় এবং মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠীর মানুষেরা মাটির সাথে এক প্রগাঢ়, আত্মিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এই অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতাই ছিল বহিরাগত আর্য উপনিবেশের বিরুদ্ধে অনার্যদের প্রথম প্রাকৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ দেওয়াল। আর্যদের বৈদিক সমাজ যখন মূলত পশুপালন এবং যুদ্ধ-নির্ভর গোত্রতান্ত্রিকতায় আচ্ছন্ন, বাংলার অনার্য সমাজ তখন লাঙল-জোয়াল এবং কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার আদিমতম রূপ আবিষ্কার করে এই কর্দমাক্ত পলিমাটিতে ধান চাষের এক বৈপ্লবিক কৃষি-সংস্কৃতির সূচনা করেছিল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত উপাত্ত অত্যন্ত অকাট্যভাবে প্রমাণ করে, বাংলার আদিম ‘ধান’, ‘চাল’ এবং ‘কৃষি-প্রযুক্তি’র প্রতিটি স্তরের মৌলিক উপাদানই অনার্য মেধার ফসল। যা পরবর্তীকালে আর্যরা এ মাটিতে এসে নিজেদের নামে আত্মসাৎ করে (বাংলা ভাষায় প্রাক-আর্য অস্ট্রিক ও অনার্য শব্দের এই মৌলিক কাঠামোর বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য দ্রষ্টব্য: শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৪, উপক্রমণিকা: পৃষ্ঠা ১৯-২০ এবং ৫ম পরিচ্ছেদ: ‘বাঙ্গালা ভাষায় অনার্য প্রভাব’, পৃষ্ঠা ৪৯-৫৮)।

    এই অনার্য উৎপাদন-সংস্কৃতির মাটির সাথে মানুষের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, বাংলা শব্দটির উৎপত্তিতেও তার প্রমাণ মেলে। ইতিহাসবিদ ফারুক মাহমুদ তাঁর ‘ইতিহাসের অন্তরালে’ গ্রন্থে প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, ‘বাংলা’ নামটি কোনো আর্য বা ব্রাহ্মণ্যবাদী সৃষ্টি নয়; বরং এই নামটি দিয়েছিলেন মুসলমানেরাই। তেরো শতকে ‘বেংচো-লা’ নামক একটি স্বাধীন রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, পর্তুগিজরা তা ‘বেংগালা’ উচ্চারণ করত, আর ইংরেজরা ‘বেংগালা’ থেকেই ‘বেংগল’ নামটি গ্রহণ করে। বাংলা শব্দের প্রথম অভিধান ‘ভোকাবুলারিও বেংগালা’ – এই নামকরণের পুরো ধারায় আর্য বা বৈদিক কোনো উৎস নেই, বরং তা এই ভূখণ্ডের ভাষা ও মানুষের সাথে বহিরাগতদের যোগাযোগেরই ফল। (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে। ওয়েসিস বুকস, পৃষ্ঠা ৮২)।

    প্রাচীন বাংলার অনার্য সমাজ ও উৎপাদন-সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি ছিল তাদের গ্রামকেন্দ্রিক যৌথ জীবনব্যবস্থা এবং লোকায়ত অর্থনৈতিক দর্শন। উত্তর ভারতের আর্যদের মতো কোনো কৃত্রিম বর্ণভেদ বা কঠোর জাতপাতের অনুশাসন এই আদিম সমাজে ছিল না; বরং নারী ও পুরুষের যৌথ শ্রমের ভিত্তিতেই এখানকার কৃষি ও বাস্তব সভ্যতা পরিচালিত হতো। যখন উত্তর ভারতের আর্য এলিট ও শাসকশ্রেণী এই পূর্ব অঞ্চলের সমৃদ্ধ ও স্বাধীন বদ্বীপকে তাদের রাজতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনস্থ করতে চাইল, তখন এই মাটির মানুষেরা তাদের নিজস্ব সমাজকেন্দ্রিক জীবনচর্যা ও লোকায়ত প্রতিরোধের মাধ্যমে সেই আগ্রাসনকে প্রতিহত করে। বৈদিক ও পৌরাণিক স্মৃতি-শাসনে এই অঞ্চলকে ‘ম্লেচ্ছ ভূমি’ বলে যে শাস্ত্রীয় অনুশাসন জারি করা হয়েছিল এবং এখানকার মানুষকে ‘পতিত’ বা ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে দেখানোর প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস শুরু হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল এই অনার্যদের স্বাধীন সমাজ ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যকে সহজে ভাঙতে না পারা। আর্যরা যখন দেখল, প্রথাগত রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে অনার্যদের এই গ্রামীণ উৎপাদন-সংস্কৃতিকে করতলগত করা যাচ্ছে না, তখন তারা প্রথম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল ‘সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বর্ণবাদ’। তারা অনার্যদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং লোকায়ত জীবনচর্চাকে ‘অসভ্য’ ও ‘দস্যুসুলভ’ বলে অবজ্ঞা করতে শুরু করে, যাতে এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজেদের মৌলিক ইতিহাস ও পরিচয় ভুলে গিয়ে আর্যদের ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বকে চিরন্তন বলে মেনে নেয় (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), দে’জ পাবলিশিং, ১ম অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১০, ৩৮; ২য় অধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৩-২৬; ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃষ্ঠা ২১৬-২১৯; ১০ম অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৩৫০-৩৫৩)।

    বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এই জ্ঞানতাত্ত্বিক আক্রমণের সবচেয়ে নৃশংস ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপটি দেখা যায় ‘রৌরব নরক’ নামক ফতোয়ায়। সেন রাজাদের আমলে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা এক ধর্মীয় আদেশ জারি করেছিলেন, ‘অষ্টাদশ পুরাণ রামায়ণ চ শ্রুত্বা, ভাষায়াং মানবং শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ’ – অর্থাৎ অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ শ্রবণ করলে যেমন পুণ্য, বাংলায় তা শুনলে রৌরব নরক। এই ফতোয়ার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে ‘অপবিত্র’ ও ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করা হয় এবং স্থানীয় ভাষায় কথা বলা ও শোনাকে ধর্মীয় অপরাধে পরিণত করা হয়। এটি ছিল বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র, যা পরবর্তীকালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষা-হত্যা এবং রবীন্দ্র-ধর্মের মনস্তাত্ত্বিক জাল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে (ঢাকা: ওয়েসিস বুকস, ১৯৮৯), পৃষ্ঠা ১১৯)।

    আর্যদের এই আগ্রাসন ও ভাষা-দমনের বিরুদ্ধে প্রথম সাহিত্যিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল চর্যাপদের মাধ্যমে। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন চর্যাপদ (খ্রিস্টীয় ৮ম-১২শ শতক) রচিত হয়েছিল প্রাক-আর্য ‘সন্ধ্যা ভাষা’য়। যা সংস্কৃতের বিপরীতে এক বিদ্রোহী সাহিত্যিক ভাষা। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত এই গানগুলো বাংলার অনার্য মানুষের মুখের ভাষায় লেখা হয়েছিল, এবং এর ‘সন্ধ্যা ভাষা’ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়ন থেকে বাঁচার একটি কৌশল। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে এই পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। যা প্রমাণ করে, বাংলার মানুষ তাদের ভাষাকে নির্বাসনে গিয়েও রক্ষা করেছে (শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা। কলকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯১৬।)।

    এই আদিম নৃতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের সমান্তরালে আরেকটি গভীর যুদ্ধ চলছিল আধ্যাত্মিকতা ও দর্শনের স্তরে। আর্যদের বৈদিক ধর্ম ছিল মূলত প্রকৃতিকে ভয় পেয়ে তাকে তুষ্ট করার জন্য যজ্ঞ-সর্বস্ব এবং পুরোহিত-তান্ত্রিক এক ব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না। পক্ষান্তরে, বাংলার অনার্যদের লোকায়ত দর্শন ছিল সাম্যবাদী এবং দেহকেন্দ্রিক; যেখানে দেহের মাঝেই মহাবিশ্বকে খোঁজার এক আদিম অবয়ব বিদ্যমান ছিল। এই লৌকিক কায়াসাধনা ও সাম্যবাদী মনস্তত্ত্বই পরবর্তীকালে চর্যাপদের সহজযান এবং লোকায়ত বাউল দর্শনের আদি উৎস হিসেবে কাজ করেছে। পরবর্তীতে পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত ইসলামের উদার সুফিবাদ যখন এই বঙ্গে প্রবেশ করে, তখন এখানকার অনার্য মানুষের এই ‘সহজ’ ও ‘অন্তর্মুখী’ আধ্যাত্মিক ধারা সুফি-মারেফতি তত্ত্বের জন্য এক উর্বর ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করে। আর্য উপনিবেশবাদীরা এই মুক্ত ও সাম্যবাদী আধ্যাত্মিকতাকে সহ্য করতে পারেনি। কারণ এটি তাদের বর্ণবাদী সমাজ কাঠামোর জন্য ছিল এক বিরাট হুমকি। গোলাম আহমাদ মোর্তজার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ অনুসারে, আর্যরা বাংলায় এসে এখানকার আদিম অনার্য দেবতাকে তাদের পৌরাণিক শিব বা রুদ্রের খোলসে বন্দি করে এবং লোকায়ত উৎসবগুলোকে উচ্চবর্ণের আচারের মোড়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে। যা ছিল এই মাটির ইতিহাসের প্রথম সুপরিকল্পিত ‘সাংস্কৃতিক জালিয়াতি’ (Cultural Forgery)। কিন্তু অনার্য মনস্তত্ত্ব এই আগ্রাসনের সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেনি। তারা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের আচার, ভাষার টান এবং লৌকিক উৎসবগুলোর আড়ালে নিজেদের আদিম প্রতিরোধ-চেতনার মাধ্যমে এই সুফি-বাউল সমন্বিত বাঙালি মানসকে বাঁচিয়ে রেখেছিল (মোর্তজা, গোলাম আহমাদ। ইতিহাসের ইতিহাস, প্রাক-মুসলিম ভারত পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা ৯৫-১০৫)। 

    এই সুদীর্ঘ অনার্য প্রতিরোধ-চেতনাই হলো বাংলার প্রকৃত এবং আদিমতম মুক্তি-সংগ্রামের অবিনশ্বর দলিল। উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকি ইতিহাসবিদেরা উনিশ শতক থেকে যে ছদ্ম-সেক্যুলার হেজিমনি তৈরি করেছেন, তার মূল লক্ষ্যই ছিল এই আদিম অনার্য প্রতিরোধ এবং তাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ উৎপাদন-সংস্কৃতির ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বা আড়াল করে দেওয়া। তারা ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল যেন আর্যদের আগমনই এই অন্ধকার বদ্বীপে আলোর প্রথম রশ্মি নিয়ে এসেছিল। বাস্তবতা হলো, বাংলার বুনিয়াদি পরিচয়, তার ভাষার সরলতা, তার ভূ-প্রাকৃতিক সাম্যবাদ এবং তার অনমনীয় রাজনৈতিক চরিত্র কোনো বহিরাগত আর্য বা উচ্চবর্ণের দান নয়; বরং তা এই মাটির প্রকৃত সন্তান—প্রাক-আর্য অনার্যদের রক্ত, ঘাম, লৌকিক দর্শন এবং আদিম প্রতিরোধ-চেতনারই এক অপরাজেয় ইশতেহার।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment