Loading...

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত উপাত্ত এবং অনার্য শেকড়

 ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত উপাত্ত এবং অনার্য শেকড়
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং বাংলা ভাষার অনার্য শেকড় নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ,,, seosazzadchy
    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে বাংলা ভাষার উৎস ও অনার্য প্রভাবের অনুসন্ধান

    Previous Part.......

    ১:২

    বাংলার মাটিকে আর্যাবর্তের সাংস্কৃতিক উপনিবেশে পরিণত করার জন্য উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিতেরা সুসুদীর্ঘকাল ধরে যে মনস্তাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক মেটা-ন্যারেটিভটি সবচেয়ে বেশি লালন ও প্রচার করেছেন, তা হলো বাংলা ভাষা মূলত সংস্কৃত ভাষার সরাসরি গর্ভজাত কন্যা বা ‘দুহিতা’। এই ছদ্ম-ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক বয়ানের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু কোনো ভাষাতাত্ত্বিক সত্য অন্বেষণ ছিল না। এর নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনার্য, লোকায়ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মন ও মগজে অবচেতনে এক গভীর হীনম্মন্যতার বীজ বুনে দেওয়ার সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নকশা। তারা সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা চিরস্থায়ীভাবে গেঁথে দিতে চেয়েছিল যে, তাদের দৈনন্দিন মুখের ভাষা, চিন্তার গভীরতা, এবং নান্দনিক প্রকাশের যা কিছু, তার সবকিছুই আসলে উত্তর ভারতের আর্য সংস্কৃতির কাছে ঋণী এবং উচ্চবর্ণের করুণার ফসল। কিন্তু বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক, বহুমাত্রিক নৃবিজ্ঞানী এবং প্রাচ্যবিদ্যার কিংবদন্তি গবেষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর আজীবন জ্ঞানতাত্ত্বিক সাধনা, নির্মোহ বস্তুনিষ্ঠতা এবং অকাট্য বৈজ্ঞানিক উপাত্ত দিয়ে এই কৃত্রিম আর্য হেজিমনি ও ভাষাগত বর্ণবাদকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যবচ্ছেদ দিয়েছেন। তিনি সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদিসহ দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষার ধমনীতে এবং তার মৌলিক অবয়বে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তা কোনোভাবেই সংস্কৃতের তথাকথিত ‘বিশুদ্ধ ও পবিত্র’ আর্য ধারা থেকে আসেনি। বরং তা এই মাটির আদিম, অবদমিত অনার্য ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত’ এবং লোকভাষার এক সুদীর্ঘ, অনমনীয় ও অপরাজেয় বিবর্তনের ফসল। আর্যরা যখন এই মাটিতে পা রাখেনি, তার বহু শতাব্দী পূর্বেই এই বদ্বীপের আদি বাসিন্দারা একটি স্বাধীন ব্যাকরণিক, উচ্চারণগত এবং ধ্বনিতাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা উত্তর ভারতের আর্যদের বৈদিক বা স্মার্ত সংস্কৃত ভাষা থেকে কেবল ভিন্নই ছিল না, যা ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন এক অনন্য ধারা। (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ১৮-২০, ২৭-২৮)। 

    ড. শহীদুল্লাহর এই ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক উপাত্তের মূল ভিত্তিটি দাঁড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের মাটি, মানুষের জৈবিক নৃতত্ত্ব এবং তাদের প্রাত্যহিক উৎপাদন-সংস্কৃতির অর্গানিক রূপান্তরের ওপর। তিনি তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণায় অত্যন্ত শক্তভাবে প্রমাণ করেছেন, সংস্কৃত ভাষা আসলে কোনোদিনও কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখের স্বাভাবিক বা সচল ভাষা (Living Language) ছিল না। ইংরেজি ‘কালচার’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে যে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটাকে বাংলায় উনিশ শতকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং যাকে রবীন্দ্রনাথের সমর্থনে বাংলা ভাষায় প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত একটি কৃত্রিম, মার্জিত এবং কৃত্রিমভাবে সংস্কার করা একটি শাস্ত্রীয় ভাষা (Artificial Liturgical Language) মাত্র। (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৯-১০)। পক্ষান্তরে, বাংলার সাধারণ মানুষ, যাদের আর্য আগ্রাসনকারীরা তাদের আদিম ধর্মগ্রন্থে ‘ম্লেচ্ছ’, ‘দস্যু’ ও ‘অস্পৃশ্য’ বলে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে দাগিয়ে দিয়েছিল—তাদের মুখের প্রাকৃত ভাষাটি ছিল অত্যন্ত গতিশীল, প্রাণবন্ত এবং মাটির উৎপাদন-প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সংলগ্ন। আর্যরা যখন এই পূর্ব ভূখণ্ডের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইল, তখন তারা দেখতে পেল যে এখানকার মানুষের ভাষাগত ঐক্য এবং প্রাকৃত চেতনার শেকড় সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে ও প্রাত্যহিক যাপিত জীবনে অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। ফলে তারা প্রথম কৌশল হিসেবে এই ভাষার মূল শব্দভাণ্ডারকে লুণ্ঠন করতে শুরু করে এবং প্রাকৃতের ওপর সংস্কৃত ব্যাকরণের কঠোর, অপ্রাকৃতিক নিয়ম ও লিঙ্গভেদ চাপিয়ে দিয়ে একে একটি ‘ভদ্রলোকি’ ও উচ্চবর্ণীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। ড. শহীদুল্লাহ তাঁর সূক্ষ্ম ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষার শব্দগঠন, ক্রিয়াপদের মৌলিক রূপান্তর এবং আদিমতম ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলোর মূল ধারাটি কোনোভাবেই উচ্চবর্ণের সংস্কৃত ব্যাকরণের ছাঁচে তৈরি হয়নি; বরং তা নিহিত রয়েছে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের লোকায়ত অবয়বে। যেমন, সংস্কৃতের তিন উষ্মবর্ণ (শ, ষ, স) এবং ‘ণ’ ও ‘ন’-এর কৃত্রিম ও জটিল ভেদাভেদ আদিম প্রাকৃত ও অপভ্রংশ স্তরে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। শহীদুল্লাহ তাঁর গবেষণায় স্পষ্ট করেছেন, আর্য সংস্কৃতির সমান্তরালে এই মাটির আদিম অনার্য ‘কোল’ বা অস্ট্রিক ভাষার গভীর সংযোগ বাংলার শব্দভাণ্ডার (যেমন, চাউল, ডোঙ্গা, কুড়ি, মোটা) এবং অনুশব্দ গঠনের (যেমন, গোলমাল, ধূমধাম) ব্যাকরণিক স্বভাবকে এক অনন্য লৈখিক ও বাচনিক স্বকীয়তা দিয়েছে। এই লোকায়ত বিবর্তনই বাংলাকে সংস্কৃতের কৃত্রিম অনুশাসন থেকে মুক্ত করে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র লোকভাষার অভিমুখ দিয়েছে (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ১৯-২০, ২৮-৩০)। যা প্রমাণ করে যে আর্যরা আসার আগেই বাংলার অনার্য সমাজ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পূর্ণাঙ্গ ভাষাগত সভ্যতার অধিকারী ছিল। 

    এই ভাষাতাত্ত্বিক সত্যটিকে যখন আমরা নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিক লেন্স দিয়ে বিশ্লেষণ করি, তখন উনিশ শতকের কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ এবং তাদের পূর্বসূরি আর্য উপনিবেশবাদীদের তৈরি করা সামগ্রিক সাংস্কৃতিক মেটা-ন্যারেটিভ বা ঐতিহাসিক জালিয়াতির কুৎসিত অবয়বটি পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। ড. শহীদুল্লাহর সংগৃহীত নৃতাত্ত্বিক ডাটা এবং আধুনিক অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল উপাত্ত অনুসারে, বাংলার আদি অধিবাসীদের মস্তক-গঠন, রক্তের গ্রুপ এবং অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো উত্তর ভারতের আর্য বা বৈদিক জনগোষ্ঠীর সাথে কোনোভাবেই মেলে না। বরং তা প্রাক-আর্য অনার্য অস্ট্রিক, দ্রাবিড় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মঙ্গোলয়েড জাতিগোষ্ঠীর নিখুঁত ও অবিচ্ছিন্ন জৈবিক ধারাবাহিকতা বহন করে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিক জি. এস. ঘুর্যে তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ 'Caste and Race in India'-তে এই নৃতাত্ত্বিক সত্যটিকে আরও জোরালো করে তুলেছেন। তিনি রিজলের পরিমাপকৃত উপাত্তের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, উত্তর ভারতের ইন্দো-আর্য নমুনার দীর্ঘমুণ্ড (Dolichocephalic) কাঠামোর বিপরীতে বঙ্গের মানুষের মস্তক-সূচক (Cephalic Index) এবং নাসিকা-সূচক (Nasal Index) মূলত অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় লোকায়ত ধারার এক অনন্য মিশ্রণ এবং তা উত্তর ভারতের তথাকথিত বিশুদ্ধ আর্য ধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ঘুর্যে রিজেলের নিজস্ব পরিমাপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই দেখান, বাংলার উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মানুষের মাথার গড়ন (Cephalic Index) উত্তর ভারতের তথাকথিত আর্যদের মতো দীর্ঘ নয়; বরং তা গোল বা মধ্যম অবয়বের। যা প্রমাণ করে বাঙালি জাতি মূলত আর্য-অনার্য-অস্ট্রিক ও মঙ্গোলয়েড রক্তের এক জটিল মিশ্রণ (Ghurye, G. S. Caste and Race in India, 1932, pp. 101-123, 142-145)।

    বিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের সাধারণ নিয়ম হলো, একটি জনগোষ্ঠীর শারীরিক নৃতত্ত্ব যদি অনার্য হয়, তবে তার প্রাত্যহিক অবচেতনের ভাষা এবং তার চিন্তার আদিমতম ধারাটিও অনার্য প্রাকৃত ও লোকভাষা থেকেই বিবর্তিত হবে, এটাই স্বাভাবিক এবং বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু আর্য সংস্কৃতির আধিপত্য এবং পরবর্তীকালে তাদের তৈরি করা রাষ্ট্র ও রাজকাহিনী-কেন্দ্রিক সংকীর্ণ ইতিহাসচর্চা এই সামাজিক সত্যকে সুপরিকল্পিতভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে আড়াল করে রাখতে চেয়েছিল। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলার ইতিহাসকে শুধু উচ্চবর্ণের সমাজ-সংবাদ এবং রাজকীয় জয়-পরাজয়ের বৃত্তে বন্দী রাখা হয়েছিল। যাতে সাধারণ মানুষ তাদের নিজস্ব লোকায়ত, অনার্য ও স্বাধীন আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে এই উচ্চবর্ণীয় সাংস্কৃতিক অনুশাসনকে চিরন্তন সত্য বলে মেনে নেয়। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন রাজকাহিনী নয়। তা হলো, সংখ্যাগুরু প্রাক-আর্য অনার্য অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় লোকায়ত জনগোষ্ঠীর ধমনী ও শ্রমের বিবর্তন।

    আর্যদের এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য কেবল অলিখিত প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তীকালে তা রাজশক্তি ও আইনি অনুশাসনের মাধ্যমে কঠোরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। বিশেষ করে পরবর্তী সেন ও বর্মন যুগে এই মাটিতে আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী অনুশাসন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। যা মুক্ত ও উদার কৌম সমাজব্যবস্থার ওপর তান্ত্রিক স্মৃতি-শাসনের নামে এক অভূতপূর্ব সামাজিক নিষ্পেষণ চাপিয়ে দেয়। এই যুগে এসে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সমাজকে 'উত্তম-সংকর', 'মধ্যম-সংকর' ও 'অধম-সংকর' বা অন্ত্যজ—এমন অসংখ্য কৃত্রিম জাতিভেদ ও বর্ণাশ্রমের জটিল শৃঙ্খলে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। এর মূল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলার বিশাল লোকায়ত ও প্রান্তিক অনার্য জনগোষ্ঠীকে সামাজিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করা। বৌদ্ধধর্ম ও সংঘের প্রতি এই শাসনতন্ত্রের বৈরী আচরণ এবং স্মৃতিশাস্ত্রের কঠোর অনুশাসন আসলে ছিল এ দেশের প্রান্তিক সমাজ-শ্রমিকদের মন ও মগজকে সম্পূর্ণ দাসত্বে বেঁধে ফেলার এক সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক নকশা। যা বাংলার নিজস্ব স্বাধীন লোকায়ত স্বকীয়তাকে চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ৩-১০, ২৩-২৬, ২৩৫-২৪৫, ৪১৭-৪১৯)। 

    আর্যদের এই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আক্রমণের মূল লক্ষ্যই ছিল নান্দনিকতার একটি কৃত্রিম স্কেল বা মাপকাঠি তৈরি করা। এই স্কেলের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল, আর্যদের বৈদিক বা সংস্কৃত ভাষা হলো ‘দেবভাষা’ এবং উচ্চ সংস্কৃতির একমাত্র প্রতীক, আর বাংলার অনার্য মানুষের লোকায়ত প্রাকৃত ধারা এবং তাদের মুখের চিরকালীন শব্দগুলো হলো, ‘অসভ্য’, ‘তুচ্ছ’ এবং ‘পশুসুলভ’। এই মনস্তাত্ত্বিক অপার্থাইড বা শব্দগত বর্ণবাদের প্রথম শিকার হয়েছিল বাংলার আদিম ভূমি-সংলগ্ন মানুষেরা। আর্য সমাজনেতারা তাদের বিভিন্ন স্মার্ত সংহিতায় স্পষ্ট বিধান জারি করলেন, যারা এই পূর্ব অঞ্চলের ভাষা ও আচারের সাথে যুক্ত হবে, তারা পতিত এবং অপবিত্র বলে গণ্য হবে। আসলে এটি কেবল জমি দখল নয়, বরং এটা ছিল 'এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স'-এর সেই আদিম রূপ, যা পরবর্তী কালে এডওয়ার্ড সাঈদের 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর তাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। যেখানে ভাষা দখল ও স্থানীয়দের হীন প্রতিপন্ন করাই উপনিবেশের প্রধান হাতিয়ার।

    ড. শহীদুল্লাহ তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় আরও একটি যুগান্তকারী সত্য উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলার প্রাকৃত ভাষা বা অপভ্রংশগুলো যখন আর্যদের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ গড়ে তুলছিল, তখন এই ভাষার অভ্যন্তরীণ ব্যাকরণিক কাঠামোটি নিজেকে সংস্কৃতের জটিল ও কৃত্রিম নিয়ম থেকে মুক্ত রাখার জন্য অনবরত লড়াই করে গেছে। বাংলা ভাষার যে ব্যাকরণিক সরলীকরণ ও তার ভেতরের লৈঙ্গিক রূপান্তর, তা মূলত আর্যাবর্তের কৃত্রিম অনুশাসনের বিরুদ্ধে লোকভাষার এক সাহসী স্বকীয়তা। সংস্কৃতির জটিল ও বজ্রআঁটুনি ব্যাকরণিক বন্ধন বাংলায় এসে ভেঙে পড়ে। যেখানে সংস্কৃতির জটিল ‘দ্বিবচন’ লোপ পেয়ে বচন মাত্র দুইটিতে (একবচন ও বহুবচন) সংকুচিত হয় এবং কৃত্রিম বিভক্তির স্থান নেয় সাধারণ মানুষের মুখের অনুসর্গসমূহ। এই সরলীকরণ এবং অনার্য মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতির সংযোগের ধারাটি মূলত ড. শহীদুল্লাহর গ্রন্থের 'বাঙ্গালা ভাষায় অনার্য প্রভাব' শীর্ষক পঞ্চম পরিচ্ছেদে এবং 'কারক-বিভক্তির ইতিহাস' ও ক্রিয়াপদের বিবর্তনে নিপুণভাবে উন্মোচিত হয়েছে (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৪৯-৫৮, ৮৯-৯৯)।

    উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকি ইতিহাসবিদেরা যখন বলেন, বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে ‘তৎসম’, ‘তদ্ভব’, ‘দেশী’ ও ‘বিদেশী’—এই চার ভাগে ভাগ করা যায়, তখন তারা মূলত আর্যাবর্তের ভাষাগত আধিপত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। তারা ‘দেশী’ শব্দ নামক একটি সংকীর্ণ ক্যাটাগরি তৈরি করে বাংলা ভাষার আসল অনার্য ও প্রাকৃত মালিকানাকে একটি ক্ষুদ্র কোণায় ঠেলে দিতে চান। ড. শহীদুল্লাহ এই তত্ত্বের মূলে আঘাত করে দেখিয়েছেন, সংস্কৃতের সমান্তরালে বা তারও পূর্বে বিদ্যমান আদিম প্রাকৃতের বহু শব্দ উল্টো সংস্কৃতের অভিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। যেমন প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার ‘অশ্ব’ শব্দের চেয়ে আদিম প্রাকৃতের ‘ঘোটক’ শব্দটির ধারা বেয়েই বাংলায় ‘ঘোড়া’ শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ, যে ভাষাকে সংস্কৃতের দুহিতা বলা হচ্ছে, তার মূল উপাদানগুলোর একটি বড় অংশ আসলে এই মাটির প্রাকৃত ভাষার স্বভাব থেকেই সংস্কৃতে সঞ্চারিত হয়েছিল।

    এই গভীর সত্যটি যদি আমরা আমাদের অবচেতনে ধারণ করতে পারি, তবে উচ্চবর্ণের তৈরি করা ছদ্ম-সেক্যুলার হেজিমনি এবং শব্দগত বর্ণবাদের পুরো প্রাসাদটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মূল ভিত্তিটি আর্যদের চাপিয়ে দেওয়া কোনো কৃত্রিম সংস্কৃত কারখানা থেকে আসেনি; বরং তা এই মাটির প্রকৃত সন্তান—অনমনীয় অনার্য প্রাকৃতের এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে টিকে রয়েছে। শহীদুল্লাহর এই ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক ডাটাবেজের বাস্তব তাত্ত্বিক প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বাংলার লৌকিক বাউল ও সুফি সাহিত্যে। যেখানে ‘শরীর-মন’ ও ‘দেহ-তত্ত্ব’-এর যে লৈখিক ও বাচনিক স্বকীয়তা, তা মূলত আর্যাবর্তের কৃত্রিম অনুশাসনের বিরুদ্ধে অনার্য প্রাকৃতেরই এক নীরব ও দীর্ঘমেয়াদী সাহিত্যিক প্রতিরোধ। ড. শহীদুল্লাহর গ্রন্থে প্রাকৃত ভাষার এই বিজয়ী স্বকীয়তার কথা বিস্তারিত উন্মোচিত হয়েছে (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ২৮-৩০, ৪৯-৫৮)।

    লৌকিক ভাষার অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও ব্যাকরণিক নিগড়ভঙ্গ

    আর্য-সংস্কৃতায়নের সর্বগ্রাসী জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসনের সমান্তরালে, বাংলার অনার্য প্রাকৃত ভাষার অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘লিঙ্গুইস্টিক রেজিস্ট্যান্স’ এতটাই তীব্র ছিল, যা উচ্চবর্ণের ব্যাকরণিক নিগড়কে প্রতিনিয়ত অস্বীকার করেছে। উচ্চবর্ণের স্মার্ত পণ্ডিতেরা রাজদরবারের আইনি ও ধর্মীয় আশ্রয়ে যে সংস্কৃত ভাষাকে ‘দেবভাষা’ হিসেবে জারি করেছিলেন, তা ছিল মূলত একটি অনড়, স্থবির এবং কৃত্রিমভাবে নির্মিত শাসনযন্ত্র। অন্যদিকে, অনার্য জনগণের মুখের ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত’ ছিল মাটির কর্ষণ, নদীর জোয়ার-ভাটা এবং দৈনন্দিন শ্রম-প্রক্রিয়া থেকে জন্ম নেওয়া এক জীবন্ত সত্তা। এই জীবন্ত সত্তাকে অবদমিত করতে আর্যরা যখন সংস্কৃত ব্যাকরণের কৃত্রিম লিঙ্গভেদ, জটিল সন্ধি এবং কৃত্রিম বিভক্তির শৃঙ্খল চাপাতে চাইল, তখন লোকায়ত প্রাকৃত তার নিজের সরলতা ও সমতাবাদী অবয়ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

    এই ভাষাতাত্ত্বিক বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় প্রমাণ নিহিত রয়েছে বাংলা ভাষার রূপমূল এবং বাক্যতাত্ত্বিক কাঠামোর সরলীকরণের মধ্যে। সংস্কৃত ভাষা যেখানে অত্যন্ত জটিল ব্যাকরণিক লিঙ্গভেদ ও ক্রিয়ারূপের বজ্রবন্ধনে আবদ্ধ, সেখানে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে বিকশিত বাংলা ভাষা সেই কৃত্রিম অনুশাসন ভেঙে নিজেকে করেছে লৈঙ্গিকভাবে অনেক বেশি নিরপেক্ষ, স্বাভাবিক ও সর্বজনীন। বাংলা ভাষার ক্রিয়াপদের বিবর্তন, অনুসর্গের ব্যবহার এবং এর মৌলিক ধ্বনিবৈশিষ্ট্যগুলো সংস্কৃতের কৃত্রিম সূত্র ভেঙে প্রাকৃতের লোকায়ত সমতার নীতিকে ধারণ করেছে। যা প্রমাণ করে বাংলা সংস্কৃতের সরাসরি গর্ভজাত দুহিতা নয়, বরং দূরসম্পর্কীয়া এক আত্মীয়া মাত্র (শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ২৩, ২৭-২৯, ৩১)।

    আর্য পুরোহিতেরা যখন মনুস্মৃতি কিংবা রৌরব নরকের মতো ধর্মীয় ফতোয়া দিয়ে প্রাকৃত ভাষাকে ‘অপবিত্র ও পশুসুলভ’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন তারা এই মাটির মানুষের ভাষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক আত্মপরিচয়কে লুণ্ঠন করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া সফল হতে পারেনি। কারণ সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের উৎপাদন-সম্পর্ক এবং তাদের সামাজিক বন্ধন আর্যদের এই কৃত্রিম ‘কোড’ বা শাসনকাঠামোকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই ভূখণ্ডের ভাষিক ও নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনকে যখন আমরা আরও ব্যাপক ঐতিহাসিক ক্যানভাসে পর্যবেক্ষণ করি তখন স্পষ্ট হয়, আর্য আগ্রাসনের মূল অস্ত্রটি ছিল আসলে ‘মিথ’ এবং ‘মনস্তাত্ত্বিক অপার্থাইড’।

    উত্তর ভারতের আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এই পূর্ব অঞ্চলের প্রাক-আর্য অনার্য মানুষকে ‘পাখি-ভাষী দস্যু’ বা অন্ত্যজ বলে কেবল সামাজিক বর্জনই করেনি, বরং তাদের আদিম ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নকশা তৈরি করেছিল। কিন্তু অনার্য উৎপাদন-সংস্কৃতির মাটির সাথে মানুষের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, তা আর্যদের চাপিয়ে দেওয়া কোনো দেবভাষার কৃত্রিম নান্দনিকতার কাছে মাথা নত করেনি। নদী, অরণ্য ও কৃষিনির্ভর এই বদ্বীপের আদিম জনপ্রবাহের প্রাত্যহিক শ্রম-প্রক্রিয়া এবং সামষ্টিক অবচেতনে যে অনমনীয় স্বকীয়তা ছিল, তা আর্যাবর্তের আরোপিত আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘এপিস্টেমিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করেছিল। উচ্চবর্ণের স্মার্ত অনুশাসন যেখানে সমাজকে খণ্ডিত ও স্থবির করতে চেয়েছিল, লোকায়ত উৎপাদন-সংস্কৃতির এই অপরাজেয় ধারাটি সমাজকে ভেতর থেকে সচল ও প্রাণবন্ত রেখে আর্যদের সামগ্রিক হেজিমনিকে প্রতি পদে পরাস্ত করেছে। (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ৩-১০, ২৩-২৬)।

    আর্য মিথের বিনির্মাণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক অসারতা

    এই লৌকিক প্রতিরোধের সমান্তরালে আর্যদের বহিরাগমনের প্রত্নতাত্ত্বিক ও জিনতাত্ত্বিক বাস্তবতাটি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। যা আর্যবাদী শ্রেষ্ঠত্ববাদের পুরো তাত্ত্বিক প্রাসাদটিকে চূর্ণ করে দেয়। ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা এবং সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক ডিএনএ গবেষণার যৌথ উপাত্ত দেখিয়েছে যে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-এর আগে ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো প্রাক-আর্য বা সিন্ধু সভ্যতার খননস্থলে গৃহপালিত ঘোড়া বা ‘অশ্ব’-এর কোনো নির্ভরযোগ্য নমুনা পাওয়া যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার শত শত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে মহিষ, বাঘ, হাতি এবং গণ্ডারের মূর্তি ও সীলমোহর প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেলেও ঘোড়া ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অথচ ইউরেশীয় স্তেপের সিনতাশতা (Sintashta) সংস্কৃতিতে (খ্রি.পূ. ২১০০-১৮০০) অরযুক্ত চাকার রথ এবং গৃহপালিত অশ্বের অকাট্য নমুনা পাওয়া গেছে। যা থেকে স্পষ্ট যে, এই সামরিক প্রযুক্তি আদতে বৈদিক নয়, বরং মধ্য এশীয় যাযাবর ঐতিহ্য। যার বিস্তৃত বিশ্লেষণ রামশরণ শর্মার গ্রন্থে রয়েছে। আর্যরা যখন এই বহিরাগত সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে পূর্ব ভারতের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন পুণ্ড্র ও বঙ্গ অঞ্চলের আদিবাসীরা তাদের কোনো নিরেট সামরিক শক্তির দ্বারা নয়, বরং তাদের গ্রামীণ যৌথ উৎপাদন-কাঠামো এবং ভূ-প্রাকৃতিক সাম্যবাদের দ্বারা সেই আগ্রাসনকে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে প্রতিহত করেছিল। (শর্মা, রামশরণ। আর্যেদর অনুসন্ধান, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৯)। 

    এই নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্যকে আধুনিক ইতিহাসবিদেরা আরও নিখুঁতভাবে ডি-কনস্ট্রাক্ট করেছেন। থমাস ট্রটম্যান (Thomas Trautmann) তাঁর 'Aryans and British India' গ্রন্থে যে ঐতিহাসিক ডিকনস্ট্রাকশন তুলে ধরেছেন, তা থেকে স্পষ্ট হয়, ‘আর্য’ কোনোদিনও কোনো নির্দিষ্ট রক্তধারা বা বায়োলজিক্যাল ‘রেস’ ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি সামাজিক ও ভাষাগত মর্যাদাবাচক বিশেষণ। যাকে উনিশ শতকে এসে ব্রিটিশ অ্যানথ্রোপোলজিস্টরা এবং ‘রেস সায়েন্স’-এর প্রবক্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কৃত্রিম জাতিগত মেটা-ন্যারেটিভ বা 'রেসিয়াল থিওরি'-তে রূপান্তর করে ফেলেন।

    ঔপনিবেশিক ভারতের এই বর্ণবাদী মনস্তাত্ত্বিক ছকটি ছিল মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা 'ভাগ করো, শাসন করো' নীতির একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক হাতিয়ার। ট্রটম্যান তাঁর গভীর ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে দেখিয়েছেন, ভাষার বৈজ্ঞানিক আত্মীয়তাকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে গায়ের রঙের ভিত্তিতে মানবসমাজকে উঁচু ও নীচু স্তরে বিন্যস্ত করার জন্য এই আর্য মিথটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল (Trautmann, Thomas R. Aryans and British India, University of California Press, pp. 52-55)।

    উনিশ শতকে কলকাতার বাবু বুদ্ধিজীবীরা যখন এই আর্য তত্ত্বকে লুফে নিয়ে নিজেদের উত্তর ভারতের উচ্চবর্ণের আর্যদের বংশধর হিসেবে প্রচার করতে শুরু করলেন, তখন তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল এ দেশের বৃহৎ অনার্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘কালচারালি আনকুল’ বা বহিরাগত ম্লেচ্ছ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া। তারা ইতিহাস লুণ্ঠনের এমন এক উর্ণাজাল বুনেছিলেন, যেখানে বাংলার প্রকৃত লোকায়ত ঐতিহ্য ও উৎপাদন-সংলগ্ন আদিবাসীদের সম্পূর্ণ আড়াল করে আর্য সভ্যতাকে এ মাটির একমাত্র আদিম মেধা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতির উদ্দেশ্য ছিলো, সাধারণ মানুষের মনে এমন এক গভীর আত্ম-বিমুখতা তৈরি করা, যার ফলে নিজের পরিধেয় পোশাক, নিজের মুখের ভাষা এবং নিজের চিরকালীন ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে বাঙালি অবচেতন মন প্রতিনিয়ত লজ্জা বোধ করে।

    সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং ভৌগোলিক নামকরণের রাজনীতি

    এই মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশায়নের বিরুদ্ধে এবং এ দেশের জনমানুষের প্রাত্যহিক যাপিত জীবনের স্বাতন্ত্র্য বুঝতে হলে আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির সেই বাস্তবতায় প্রবেশ করতে হবে, যা ফাহমিদ-উর-রহমান তাঁর সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সংস্কৃতি ও ধর্ম কোনো বিচ্ছিন্ন উপাদান নয়; বরং ধর্ম নিজেই একটি সংস্কৃতির মূল স্রষ্টা ও জীবনীশক্তি (Culture Forming Potency)। ইসলাম যখন এ দেশে এসেছে, তখন তা এ ভূখণ্ডের প্রাক-ইসলামিক অনার্য প্রাকৃতের জীবন্ত রূপটিকে ধ্বংস করেনি, বরং তাকে রাজকীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দিয়ে উচ্চবর্ণের সংস্কৃতায়নের হাত থেকে মুক্ত করেছে। পক্ষান্তরে, কলকাতার সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজ সবসময় চেষ্টা করেছে এই অঞ্চলের মানুষের ইসলাম-উদ্ভুত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে ‘বিদেশি’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা দিয়ে হীনম্মন্যতায় ফেলতে। তারা প্রচার করতে চায়, ভাষা এক হলেই একটি জনপদের সংস্কৃতি অভিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের অকাট্য নিয়ম হলো—সংস্কৃতিতে মিল বা সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো কখনো সত্তার পরিচয় বহন করে না, বরং ‘পার্থক্য’ বা গরমিলটাই হলো একটি জনগোষ্ঠীর আসল আত্মপরিচয়। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান একই বাংলা ভাষায় কথা বললেও তাদের জীবনদর্শন, শব্দচয়ন, আত্মীয়তার বন্ধন এবং প্রাত্যহিক আচার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। যা প্রমাণ করে, ভাষা এক হলেই কখনো একক জাতি বা অভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয় না (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা: ৯-১১, ৩২-৩৪, এবং ৪৬-৪৭)। 

    এই স্বাতন্ত্র্যবাদের এক অকাট্য ঐতিহাসিক দলিল উন্মোচন করেছেন গবেষক ফারুক মাহমুদ তাঁর ‘ইতিহাসের অন্তরালে’ গ্রন্থে। তিনি প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, ‘বাংলা’ বা ‘বাংলাদেশ’ নামটির উৎপত্তি ও ভৌগোলিক একীকরণ কোনো আর্য বা ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজন্যবর্গের দ্বারা ঘটেনি; বরং এই ভূখণ্ডকে একটি একক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মানচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন মুসলিম সুলতানেরা। তেরো শতকে বখতিয়ার খলজীর আগমনের পূর্বে এই অঞ্চল পুণ্ড্র, বঙ্গ, রাঢ় ও সমতট নামে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ড-বিখণ্ড ছিল, এবং উচ্চবর্ণের শাসকেরা এখানকার সাধারণ মানুষকে করদ রাজ্যের নিগড়ে পিষ্ট করত। মুসলিম শাসকেরা এ মাটিতে এসে বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘সুবে বাংলা’ বা ‘বাঙ্গালাহ’ নামের এক অনন্য ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিচয় দান করেন। আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরী'-তে প্রদত্ত সুবে বাংলার সীমান্ত, নদীপথ ও রাজস্ব বিভাগের বিস্তারিত বর্ণনা (যেমন ভাটি, বারিভূমি ও বরেন্দ্রভূমির পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল) প্রমাণ করে, এটি শুধু নামকরণ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ভৌ-প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সুতরাং, যে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র দোহাই দিয়ে আজ সংখ্যাগরিষ্ঠের ইসলামি আত্মপরিচয়কে মুছে দেওয়ার চতুর রাষ্ট্রীয় ও মিডিয়া প্রোপাগান্ডা চালানো হয়, সেই বাংলার ভৌগোলিক ও ভাষিক অস্তিত্বই মূলত মুসলিম ইতিহাসের খাস অবদান। এই পরম সত্যকে আড়াল করার জন্যই উনিশ শতক থেকে ইংরেজ ও হিন্দু ঐতিহাসিকেরা যৌথভাবে এক বানোয়াট ইতিহাস রচনা করেছেন, যেখানে মুসলিম আমলকে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং মুসলমানদের ‘চরিত্রহীন অপদার্থ’ হিসেবে কলঙ্কলেপন করা হয়েছে (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮২-৯২)। 

    শব্দগত বর্ণবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘শেইমিং’-এর নেপথ্য যুদ্ধ

    উচ্চবর্ণের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে কুৎসিত রূপটি প্রকাশ পায় যখন তারা সাধারণ মানুষের চিরকালীন শব্দভাণ্ডার—যেমন ‘পানি, আব্বা, আম্মা, গোসল’—কে ‘আঞ্চলিক’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। এই শব্দগত বর্ণবাদ বা লিঙ্গুইস্টিক রেসিজমের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মুসলমানের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে শৃঙ্খলিত করা, যাতে সে নিজের ঐতিহ্যবাহী পরিচয় প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করে। তারা মিডিয়া, সিনেমা এবং সাহিত্যের মাধ্যমে এমন একটি ‘হাই কালচার’ বা উচ্চ সংস্কৃতির পারসেপশন তৈরি করেছে, যেখানে পূজা বা বড়দিনে যাওয়াকে ‘প্রগ্রেসিভ’ বা আধুনিক মনে করা হলেও ঈদ, শবে-বরাত কিংবা আকিকার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠের লৌকিক উৎসবকে ‘খ্যাত’ বা আদিম বলে তাচ্ছিল্য করা হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনই সমাজে এমন এক হেজিমনি তৈরি করে, যা একজন দাড়ি-টুপি পরিহিত কর্মী বা সাধারণ মানুষকে মধ্যবিত্ত প্রগতিশীলদের চোখে ‘সাব-হিউম্যান’ বা নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করে। যার ফলে তাদের ওপর হওয়া রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনে এই তথাকথিত ‘কালচার্ড’ মন বিন্দুমাত্র আলোড়িত হয় না। এই গভীর ভাবসংকট ও আত্মপরিচয়ের খাঁচাকে ভাঙ্গার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে আমাদের মাটির সেই অর্গানিক শেকড়ে, যা কোনো বহিরাগত আর্য বা কলকাতার ভদ্রলোকি কারখানার তৈরি কৃত্রিম ছাঁচে নির্মিত হয়নি (ফাহমিদ-উর-রহমান। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা: ৩২-৩৪, ২৬, এবং ৪৪-৪৫)। 

    এই ডিকলোনিয়াল ইশতেহার বা চিন্তার মুক্তির জন্য আমাদের অবচেতনের ডিকলোনাইজেশন অত্যন্ত জরুরি। গত হাজার বছরেও ভাষা দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের ধর্মোর্ধ্ব তৃতীয় কোনো কৃত্রিম ‘বাঙালি সত্তা’ বা বাঙালিত্ব এ মাটিতে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। কারণ ঐতিহ্য কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিবর্তিত হয় না। এটি একটি সমাজজাত গভীর ঐতিহাসিক সত্য। আবুল মনসুর আহমদের সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যায়, যেখানে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের নকল করে বাংলার মুসলমান কখনো বড় হতে পারবে না, তাকে বড় হতে হবে তার নিজস্ব কৃষ্টি ও স্বকীয়তার ওপর দাঁড়িয়ে। বিশ্বভারতীর আকাশে কতবার শারদীয় পূজার আনন্দময়ী মা এসেছে-গিয়েছে, কিন্তু সেখানে একদিনের তরেও ঈদের চাঁদ ওঠেনি। সেই চাঁদ ওঠানোর দায়িত্ব ছিল বিদ্রোহী কবি নজরুলের ওপর। এই যে নিজস্ব ‘মুসলমানী ঢং’ বা স্বাতন্ত্র্য, এটিই হলো আমাদের আসল নান্দনিক পরিচয়। বাংলা ভাষা ও ভূমির এই বুনিয়াদি অধিকারটি কোনো বহিরাগত আর্য জালিয়াতি বা উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকি করুণার ফসল নয়; বরং তা হাজার বছরের প্রাচীন অনার্য ম্লেচ্ছ প্রাকৃতের এবং মুসলিম আমলের গৌরবোজ্জ্বল লড়াইয়ের এক অপরাজেয় অবিনশ্বর দলিল।

    জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বৈরাচার বনাম লোকায়ত ভাষাতাত্ত্বিক অবাধ্যতা

    উচ্চবর্ণের আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী তত্ত্বের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তারা ভাষাকে একটি স্থির এবং অপরিবর্তনশীল স্বর্গীয় উপাদান হিসেবে কল্পনা করে, যা সাধারণ মানুষের উৎপাদন-সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। স্মার্ত পণ্ডিতদের বজ্রবন্ধনে আবদ্ধ সংস্কৃত ভাষা যখন এই বদ্বীপের ওপর তার ব্যাকরণিক আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল, তখন লোকায়ত ‘গৌড়ী প্রাকৃত’ এবং তার বিভিন্ন অপভ্রংশ ধারাগুলো কেবল নীরব প্রতিরোধই গড়ে তোলেনি, বরং এক গভীর ভাষাতাত্ত্বিক অবাধ্যতার (Linguistic Disobedience) জন্ম দিয়েছিল। মধ্যযুগীয় বাংলার কাব্য সাহিত্যে, বিশেষ করে শাহ মুহম্মদ সগীরের 'ইউসুফ-জুলেখা' কিংবা পরবর্তীকালের দৌলত উজির বাহরাম খানের 'লায়লী-মজনু' ও আলাওলের 'পদ্মাবতী'-তে প্রাকৃত-অপভ্রংশ জাত যে স্বাধীন ও অর্গানিক শব্দবিন্যাস এবং মানবিক কাঠামো ব্যবহৃত হয়েছে তা প্রমাণ করে, সংস্কৃতের কৃত্রিম ছন্দ ও আর্য অলংকারশাস্ত্রের বাইরেও বাংলার নিজস্ব একটি পরিণত ও সম্পূর্ণ স্বাধীন সাহিত্যিক ধারা বিদ্যমান ছিল। যা এই ভূখণ্ডের প্রাক-আর্য ও অনার্য মানুষের প্রাকৃত ভাষিক ধারাবাহিকতাকে আরও জোরালো করে (এই লোকায়ত ভাষার ব্যাকরণিক উৎস ও বিবর্তনের তাত্ত্বিক কাঠামোর জন্য দ্রষ্টব্য: শহীদুল্লাহ, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা: ১৪-১৫ এবং ২৭-৩১; এবং মধ্যযুগের রোমান্টিক ও মানবিক প্রণয়োপাখ্যান ধারার মুসলিম কবিদের এই ঐতিহাসিক ভাষিক ভূমিকার বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: শহীদুল্লাহ, বাংলা সাহিত্যের কথা—২য় খণ্ড: মধ্যযুগ এবং তাঁরই সম্পাদিত আলাওলের পদ্মাবতী গ্রন্থ)।

    আর্যরা যখন এ মাটিতে পা রেখে স্থানীয় মানুষের মুখের ভাষাকে ‘রৌরব নরক’ বা পশুতুল্য বলে ঘোষণা করল, তখন তা আসলে ছিল একটি চরম রাজনৈতিক দেউলিয়া সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ, যা এ দেশের মানুষের উৎপাদন-ক্ষমতাকে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে পঙ্গু করার প্রথম ঐতিহাসিক ব্লুপ্রিন্ট ছিল। এর বিপরীতে এখানের চিরায়ত স্থানীয়দের এই ভাষাতাত্ত্বিক অবাধ্যতা কেবল প্রাচীন যুগের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান ঐতিহাসিক ধারা। যা মুসলিম আমলের সুলতানদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এসে তার চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক অবমুক্তি লাভ করে। উচ্চবর্ণের হিন্দু রাজারা এবং তাদের স্মার্ত পণ্ডিতেরা যখন বাংলা ভাষাকে রাজদরবার এবং মন্দিরের বাইরে ব্রাত্য ও অস্পৃশ্যদের ভাষা হিসেবে কোণঠাসা করে রেখেছিলেন, তখন মুসলমান সুলতান ও আমলারা এসে এই ভাষাকে গণমানুষের সাহিত্যিক ভাষার মর্যাদায় উন্নীত করেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সংগৃহীত ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা অনুসারে, মুসলিম সুলতানদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বাংলা ভাষা তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়নের মুখে অবলুপ্ত হয়ে যেত। ফলে, আজ যে তথাকথিত ছদ্ম-সেক্যুলার ‘বাঙালিত্ব’ এবং ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র মেটা-ন্যারেটিভ বা বৃহৎ বয়ান চাপানোর চেষ্টা চলে, তার মূল ভাষিক ভিত্তিভূমিটি কোনো আর্য জালিয়াতি বা কলকাতার ভদ্রলোক সমাজের দান নয়, বরং তা এই মাটির অনার্য শেকড় এবং মুসলিম রাজন্যবর্গের যৌথ ঐতিহাসিক সৃষ্টিরই এক অপরাজেয় ইশতেহার।

    আর্যবাদী রক্ত-বিশুদ্ধতার মিথ ও জিনতাত্ত্বিক সত্যের ব্যবচ্ছেদ

    এই ভাষাগত প্রতিরোধের সমান্তরালে, আর্যদের তথাকথিত রক্তের বিশুদ্ধতা এবং ‘আর্য রেস’ (Race)-এর যে সামাজিক ও political মিথ এ দেশে তৈরি করা হয়েছে, তা আধুনিক নৃতাত্ত্বিক ও জিনতাত্ত্বিক গবেষণার কষ্টিপাথরে সম্পূর্ণ অসার প্রমাণিত হয়। আধুনিক জিনতাত্ত্বিক গবেষক ডেভিড রিচ তাঁর 'হু উই আর অ্যান্ড হাউ উই গট হেয়ার' গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের জিনগত স্তরবিন্যাসে মূল দুটি প্রাচীন ধারা—'অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ান' (ANI) এবং 'অ্যানসেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান' (ASI)—বিদ্যমান ছিল। যা পরবর্তীকালে প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব বাস্তবতায় মিশ্রিত হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জিনগত উপাদানে বৈদিক আর্য বা স্তেপ (Steppe) অঞ্চলের পশুপালকদের জিনগত অনুপ্রবেশের বহু আগে থেকেই একটি গভীর ও আদিম প্রাক-আর্য ভিত্তি সক্রিয় ছিল। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষের নমুনায় আদিম 'আউট অব আফ্রিকা' পরবর্তী শিকারী-সংগ্রাহক (AASI) এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক (যেমন কোল, মুণ্ডা বা সাঁওতাল সংশ্লিষ্ট) জিনগত উপাদানের যে প্রবল ও স্বতন্ত্র সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়, তা উত্তর ভারতের তথাকথিত উচ্চবর্ণের ইন্দো-আর্য জিনগত কাঠামোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক আত্মপরিচয়কে নিশ্চিত করে (Reich, David. Who We Are and How We Got Here, Chapter 6: "The Collision That Formed India", pp. ১৩৬-১৪৪; বঙ্গীয় ও অস্ট্রো-এশিয়াটিক কোল-মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর প্রাক-আর্য লোকায়ত ভাষিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রভাবের জন্য আরও দ্রষ্টব্য: শহীদুল্লাহ, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা: ১৯)। 

    ঋগ্বেদের প্রাচীনতম স্তরগুলোতে আর্য বলতে সদাচারী, উচ্চকুল বা সম্পদশালী ব্যক্তি বোঝাত। যা উত্তর ভারতের আর্য এলিটরা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নবর্ণের অনার্য জনগোষ্ঠীকে দাস (Dasa) বা দস্যু (Dasyu) হিসেবে শৃঙ্খলিত করার জন্য একটি বর্ণবাদী অপার্থাইডে রূপান্তর করে। এই কৃত্রিম জাতিগত তত্ত্বটি উনিশ শতকে এসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিক এবং কলকাতার উচ্চবর্ণের ভদ্রলোক সমাজের জন্য এক চমৎকার শোষণের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়। যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ‘উচ্চবর্ণের আর্য’ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ও লোকায়ত জনগোষ্ঠীকে ‘অনগ্রসর ও নিকৃষ্ট’ হিসেবে শেইমিং করার প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স পেয়ে যায়।

    আধুনিক নৃতাত্ত্বিক ডাটা এবং ড. শহীদুল্লাহর নৃতাত্ত্বিক উপাত্ত অনুসারে, বাংলার মানুষের দৈহিক গঠন—বিশেষ করে মস্তক-সূচক (Cephalic Index), রক্তের গ্রুপ এবং জিনতাত্ত্বিক বিন্যাস—উত্তর ভারতের আর্য বা বৈদিক ধারার সাথে কোনোভাবেই মেলে না। বাংলার মানুষ মূলত প্রাক-আর্য অনার্য অস্ট্রিক, দ্রাবিড় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠীর এক চমৎকার প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সংমিশ্রণ। একটি জনগোষ্ঠীর নৃতত্ত্ব ও রক্তের জৈবিক শেকড় যদি অনার্য হয়, তবে তার চিন্তা, তার নান্দনিকতা এবং তার প্রাত্যহিক অবচেতনের মূল সুরটিও যে অনার্য প্রাকৃত থেকেই জন্ম নেবে—এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু কলকাতার হেজিমোনিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণী দীর্ঘকাল ধরে সাহিত্য, সিনেমা এবং পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে ইতিহাস লুণ্ঠনের এমন এক সুপরিকল্পিত জাল বুনেছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে এই কৃত্রিম ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আর্যদের আগমনই বোধহয় এ বদ্বীপে সভ্যতার আলো নিয়ে এসেছিল। এই গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতি বা ‘এপিস্টেমিক ফোর্জারি’ বাংলার মানুষের অবচেতনে এমন এক দাসত্বের বীজ বুনে দিয়েছে। যার ফলে সে নিজের মাটির প্রকৃত ইতিহাস ও পরিচয় ভুলে গিয়ে প্রতিনিয়ত কোলকাতা বা দিল্লির ভ্যালিডেশনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment