Loading...

সংযোজিত অধ্যায় এক: অনার্য আদিমত্ব ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আত্তীকরণের ইতিহাস

 সংযোজিত অধ্যায় এক: অনার্য আদিমত্ব ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আত্তীকরণের ইতিহাস
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    প্রাক-আর্য বাংলার অনার্য ভূমিপুত্র, প্রকৃতিনির্ভর লোকজ সংস্কৃতি এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী আত্তীকরণের ঐতিহাসিক রূপান্তরের প্রতীকী শিল্পচিত্র।

    প্রাক-আর্য বাংলার আদিম ভূমিপুত্র সমাজ, লোকজ সংস্কৃতি এবং পরবর্তী ব্রাহ্মণ্যবাদী আত্তীকরণের ইতিহাসভিত্তিক প্রতীকী চিত্র


    Previous Part.......

    প্রাক-আর্য অনার্য ভূমিপুত্র: জন্মসূত্রে তাঁরা সনাতন বা হিন্দু ধর্মের নন

    বাংলার প্রাক-আর্য যুগের নৃতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক খতিয়ান যখন কোনো প্রকার সমসাময়িক রাজনৈতিক দলীয় পক্ষপাত ছাড়া বস্তুনিষ্ঠভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তখন এই ধ্রুব এবং অলঙ্ঘনীয় সত্যটি উন্মোচিত হয় যে—আজ আমরা হিন্দু সমাজের অবদমিত স্তরে যাদের ‘নমঃশূদ্র’, ‘তফসিলি’ বা ‘নিম্নবর্ণের হিন্দু’ সম্প্রদায় বলে জানি, তারা আদিম ও জন্মগতভাবে কোনো বৈদিক সনাতন বা উচ্চবর্ণের হিন্দু ধর্মের অংশ ছিলেন না। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে মধ্য এশিয়া, কাস্পিয়ান সাগরের কূল ও ইরানের স্তেপ অঞ্চল থেকে যাযাবর আর্যরা যখন উত্তর-পশ্চিম ভারতের গিরিপথ পার হয়ে এই উপমহাদেশে প্রথম প্রবেশ করে, তার হাজার হাজার বছর আগে থেকেই বাংলার আব-হাওয়া ও পলিমাটির উর্বর জনপদে এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ, শান্তিকামী এবং উৎপাদনমুখী আদিম মানবগোষ্ঠী বাস করত, যাদের নৃবিজ্ঞানের পরিভাষায় অস্ট্রিক, দ্রাবিড়ীয় বা প্রাক-আর্য কিংবা অনার্য ভূমিপুত্র বলা হয় (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পরিচ্ছেদ: ‘নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’, পৃষ্ঠা ৭৪)। আর্য যাযাবরেরা যখন উত্তর ভারতের নদী অববাহিকায় প্রথম বসতি স্থাপন করছিল, তখনো বাংলার এই ভূখণ্ড ছিল আর্য সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বাইরে এক স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাক-আর্য অনার্যদের খাসমহল।

    এই অনার্য ভূমিপুত্রদের নিজস্ব কোনো লিখিত বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ-মহাভারত, মন্দির, মূর্তি কিংবা উচ্চবর্ণের তৈরি করা চাতুর্বর্ণ বা বর্ণপ্রথা (Caste System) ছিল না। তাঁদের সামগ্রিক যাপিত জীবন এবং দার্শনিক বিশ্বাস ছিল সম্পূর্ণ প্রকৃতি-কেন্দ্রিক এবং লৌকিক, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যানিমিজম’ (Animism) বা সর্বপ্রাণবাদ বলা হয়। তাঁরা বটবৃক্ষ, বহমান নদী, প্রাক-মেঘের আকাশ, পাথর, নাগ বা সর্প এবং ফসলের উর্বরতার প্রতীক হিসেবে ‘ধরিত্রীরূপী’ আদিম লোকজ শক্তির আরাধনা করতেন। বর্তমান আধুনিক হিন্দু ধর্মে ব্যবহৃত অনেক লৌকিক ও প্রধান মাঙ্গলিক উপাদান—যেমন পূজার মণ্ডপে ডাব, কাঁচা কলাগাছ, সিঁদুর, চালের গুঁড়োর আলপনা, ধান-দুর্বা, কলার ভেলা, পান-সুপারি, শঙ্খের উলুধ্বনি এবং তুলসী গাছের ব্যবহার—এগুলো কোনো বৈদিক আর্যদের আকাশচারী যজ্ঞ-সংস্কৃতি থেকে আসেনি। এগুলো ছিল এই পললভূমির আদিম অনার্য ভূমিপুত্রদের নিজস্ব হাজার বছরের কৃষিভিত্তিক লোকজ কৃষ্টি।

    আর্যরা পরবর্তীকালে যখন এই পূর্ব ভারতে নিজেদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে, তখন তারা স্থানীয় অনার্যদের এই শক্তিশালী সংস্কৃতি ও লোকবিশ্বাসকে সমূলে ধ্বংস করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তারা এক চতুর সামাজিক ও ধর্মীয় ‘আত্তীকরণ’ (Assimilation)-এর আশ্রয় নেয় এবং মনুস্মৃতির কঠোর আইনের মোড়কে এই মাটির অনার্য সন্তানদের জোরপূর্বক বৈদিক সনাতন বা হিন্দু ধর্মের কাঠামোর সবচেয়ে নিচের স্তরে অন্তর্ভুক্ত করে এক অলিখিত মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব চাপিয়ে দেয় (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), পৃষ্ঠা ২৪৪)।

    বর্তমান সনাতন সমাজের অনার্য গোত্র ও ধারা সমূহের সুনির্দিষ্ট নৃবৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

    বাংলার বর্তমান সনাতন বা হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ স্তর বিন্যাস লক্ষ করলে কোন কোন নির্দিষ্ট গোত্র, উপাধি এবং সামাজিক ধারা মূলত সেই প্রাচীন প্রাক-আর্য অনার্য ভূমিপুত্রদের সরাসরি রক্তজ ও বংশগত উত্তরসূরি, তা ইতিহাসের পাতা থেকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি:

    ১. ‘দাস’ পদবিধারী অনার্য ভূমিপুত্র বনাম আর্যীকৃত ‘দাশ’: বাঙালি হিন্দু সমাজে ‘দাস’ বা ‘দাশ’ পদবিটি এক নজিরবিহীন সামাজিক জালিয়াতি ও আর্যীকরণের মেকানিজমকে ধারণ করে। আর্যরা এ দেশে এসে এই মাটির আদিম অনার্য ভূমিপুত্রদের—যেমন ধীবর, কৈবর্ত, পৌণ্ড্র বা নমঃশূদ্রদের—পরাস্ত করে নিজেদের ‘গোলাম’ বা ‘সেবক’ বোঝাতে নামের শেষে ‘দন্ত্য-স’ যুক্ত দাস পদবিটি জোরপূর্বক জুড়ে দিয়েছিল। সুতরাং, আজ আমরা সনাতন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ যে নমঃশূদ্র দাস, হালিক কৈবর্ত দাস, রাজবংশী দাস কিংবা অন্ত্যজ মৎস্যজীবী ‘দাস’দের দেখি, তাঁরা মূলত আর্যদের দ্বারা অবদমিত হওয়া এই মাটির শতভাগ খাঁটি অনার্য সন্তান। পক্ষান্তরে, উচ্চবর্ণের যে বৈদ্য (যেমন: দাশগুপ্ত) বা কায়স্থ সমাজের মানুষেরা আর্য সংস্কৃতির সাথে বৈবাহিক ও রাজনৈতিক আত্মীকরণ ঘটিয়ে উচ্চবর্ণের আভিজাত্য লাভ করেছিলেন, তাঁরা নিজেদের এই অনার্য ভূমিপুত্রদের থেকে আলাদা করতে বানানে ‘তালব্য-শ’ (দাশ) ব্যবহার শুরু করেন এবং বঙ্কিমীয় ইউটোপিয়া রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী শ্রেণীতে রূপান্তরিত হন (মজুমদার, ড. রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), জেনারেল প্রিন্টার্স, পৃষ্ঠা ১১২)।

    ২. নমঃশূদ্র ও চণ্ডাল ধারা: এরা হলেন বাংলার আদিমতম ভূমিপুত্রদের অন্যতম প্রধান এবং বৃহৎ চালিকাশক্তি। আর্যদের বর্ণবাদী মনুসংহিতায় এবং পরবর্তীকালের স্মার্ত ব্রাহ্মণদের ফতোয়ায় এদের ‘অন্ত্যজ’ বা অস্পৃশ্য চণ্ডাল হিসেবে সমাজ ও লোকালয়ের বাইরে রাখা হয়েছিল। মূলত নদীকেন্দ্রিক মৎস্যজীবী, জালিয় ও নিবিড় কৃষিজীবী এই বিশাল মানবগোষ্ঠীটি সম্পূর্ণ অনার্য রক্তের আদিম ধারক। যারা আর্যদের বৈদিক যজ্ঞের বিপরীতে নিজেদের আদিম লোকজ কৃষ্টি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন (মজুমদার, ড. রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), পৃষ্ঠা ১১৪)।

    ৩. কৈবর্ত ও রাজবংশী গোত্র: উত্তর ও পূর্ব বাংলার নদী ও বিল অঞ্চলে গড়ে ওঠা কৈবর্ত (যে চাষী ও জেলে সম্প্রদায় পরবর্তীকালে ধীবর ও হালিক কৈবর্ত নামে বিভক্ত হয়) এবং কোচ-মেচ উপজাতির সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া রাজবংশী সম্প্রদায় সম্পূর্ণ প্রাক-আর্য অনার্য ধারার জীবন্ত অংশ। এরা আর্যদের সামাজিক আগ্রাসন ও কঠোর ধর্মীয় বর্ণভেদকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের লৌকিক ও স্বাধীন জীবনযাত্রার মাধ্যমে প্রতিরোধ করেছিল।

    ৪. ডোম, চর্মকার (ঋষি/মুচি), বাগদি ও হাড়ি গোত্র: এরা হলেন বাংলার আদিম কায়িক শ্রমজীবী ও নগর-পরিশোধক সমাজ। আর্যরা এ দেশে এসে নিজেদের উচ্চবর্ণের ইউটোপিয়া টিকিয়ে রাখতে এদের সমাজ ও গ্রামের সীমানার বাইরে জঙ্গল ও শ্মশানে বাস করতে বাধ্য করেছিল এবং এদের ছায়া মাড়ালেও উচ্চবর্ণের আর্য শরীর ‘অপবিত্র’ বা কলুষিত হতো বলে কঠোর ফতোয়া জারি করেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৭)।

    আধুনিক পপুলেশন জেনেটিক্স বা ডিএনএ ম্যাপিং (যেমন—বিশ্বখ্যাত Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) জার্নালে প্রকাশিত বিজ্ঞানী Basu ও Majumder-এর ঐতিহাসিক জিনগত গবেষণা) অকাট্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছে যে—এই নমঃশূদ্র, চণ্ডাল, কৈবর্ত বা দলিত হিন্দুদের ডিএনএ প্রোফাইল এবং বাংলার কোটি কোটি সাধারণ মুসলমানের ডিএনএ প্রোফাইল হুবহু এক এবং অভিন্ন (Basu, A., Sarkar-Roy, N., & Majumder, P. P. "Genomic reconstruction of South Asian populations." PNAS, 2016)। প্রিন্সিপাল কম্পোনেন্ট অ্যানালিসিসের (PCA Plot) এই বৈজ্ঞানিক ম্যাপিং স্পষ্ট করে দেয় যে, রক্তের গভীরতম স্তরে উভয় সম্প্রদায়ের শরীরে বহিরাগত আর্য বা মধ্যপ্রাচ্যীয় রক্তের উপাদান ১ থেকে ২ শতাংশের বেশি নয়। এর ঐতিহাসিক কারণটি পরম সত্য—আর্য ও পরবর্তীকালের দক্ষিণ ভারতীয় বল্লাল সেনের 'কৌলিন্য প্রথার' চরম অমানবিক লাঞ্ছনা ও অস্পৃশ্যতার শৃঙ্খল মেনে নিয়ে যারা সনাতন ধর্মের ভেতরেই থেকে গেলেন, তারা হলেন আজকের ‘নিম্নবর্ণের হিন্দু’। আর যারা এই সামাজিক শৃঙ্খল ও মানুষের মর্যাদাহীনতাকে লাথি মেরে তেরো শতকে মুসলিম সুফি-সুলতানদের হাত ধরে বৈপ্লবিক সামাজিক ও ধর্মীয় বিদ্রোহ করলেন, তারা হলেন আজকের ‘বাঙালি মুসলমান’। ইসলামের সাম্যবাদী আদর্শ বাঙালি মুসলমানকে দিয়েছিল 'মানুষ' হিসেবে বেঁচে থাকার আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি। সুফিদের আত্মিক উদারতা আর সুলতানদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তারা রাতারাতি অস্পৃশ্যতার গ্লানি মুছে এক আত্মমর্যাদাশীল ও শাসক শ্রেণিতে রূপান্তরিত হন, লাভ করেন এক পরম সম্মানের জীবন। পক্ষান্তরে, বর্ণবাদের নির্মম শেকল ভাঙার সাহস যারা করতে পারেননি, সনাতন ধর্মের কঠোর মনুসংহিতার বেড়াজালে তারা আজও সেই অধিকারবঞ্চিত ‘নিম্নবর্ণের’ তকমাতেই বন্দি রয়ে গেলেন।

    আর্যীকরণের মেকানিজম: যেভাবে অনার্যদের ‘হিন্দু’ তকমা দিয়ে দাস বানানো হলো

    আর্যরা যখন বাংলায় প্রবেশ করে, তখন তারা স্লেচ্ছ ও অনার্য জনপদকে বশ করতে দুটি সমান্তরাল কৌশল ব্যবহার করেছিল—একটি হলো অস্ত্রের জোর, আর অন্যটি হলো ‘সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ’ (Linguistic Imperialism)। তারা দেখল যে, বাংলার অনার্যদের সরাসরি যুদ্ধ করে পরাস্ত করা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। তাই তারা স্থানীয় অনার্য রাজাদের ও প্রভাবশালী গোত্রগুলোকে ছদ্ম-ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের টোপ দিতে শুরু করে। আর্য রাজপুরোহিত ও স্মার্ত ব্রাহ্মণরা অনার্যদের প্রাচীন প্রাকৃতিক টোটেম বা চিহ্নগুলোকে বৈদিক দেব-দেবীর রূপান্তর দিতে শুরু করে। অনার্যদের লোকজ ‘পশুপতি’ বা বন্য শক্তির আরাধনাকে তারা নিজেদের বৈদিক রুদ্র বা শিবের সাথে আত্তীকরণ করে নেয়, অনার্যদের লৌকিক ধরিত্রী পূজাকে ‘চণ্ডী’ বা ‘দুর্গা’র পৌরাণিক কাঠামোয় রূপ দেয়।

    এই চতুর আত্তীকরণের পরেই শুরু হয় আসল সামাজিক চক্রান্ত। আর্যরা যখন অনার্যদের এই মিশ্র বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন ‘হিন্দু’ ধর্মীয় আবহ তৈরি করে ফেলল, তখনই তারা মনুস্মৃতি এবং পরাশর সংহিতার মতন কঠোর বর্ণবাদী আইন প্রয়োগ করে এই অনার্যদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দেয় (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), পৃষ্ঠা ২৪৬)। তারা অনার্যদের বোঝাতে শুরু করল যে, তারা জন্মসূত্রে ‘শূদ্র’ বা ‘মলিন’ এবং উচ্চবর্ণের সেবা করাই তাদের একমাত্র ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তির উপায়। এই সুপরিকল্পিত আর্যীকরণের ফলেই বাংলার আদি ভূমিপুত্ররা নিজেদের স্বাধীন আত্মপরিচয় ও লোকজ শক্তি হারিয়ে এক কৃত্রিম ধর্মীয় পরিচয়ের জালে আটকা পড়েন, যার প্রধান ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে সেন আমলে এক ভয়ঙ্কর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছিল।

    সেন রাজবংশের রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ এবং ‘কৌলিন্য প্রথার’ নিধনযজ্ঞ

    খ্রিষ্টীয় একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা বহিরাগত উগ্র বৈদিকপন্থী সেন রাজারা (বিশেষ করে সামন্ত সেন, বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেন) যখন বাংলার শাসনদণ্ড জবরদখল করে, তখন প্রাক-আর্য অনার্য ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসে এক নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক জেনোসাইড। পাল রাজাদের দীর্ঘ চারশত বছরের সমতাভিত্তিক, অহিংস এবং জাত-পাতহীন বৌদ্ধ শাসনের আমলে বাংলার অনার্য ভূমিপুত্ররা সমাজে এক অনন্য মর্যাদা ও সাহিত্যিক স্বাধীনতা (যেমন চর্যাপদের যুগ) লাভ করেছিলেন। কিন্তু সেনরা ক্ষমতা লাভ করার পরপরই পাল আমলের সেই অনার্য ও বৌদ্ধ গৌরবকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবর্তন করে নিষ্ঠুর ‘কৌলিন্য প্রথার’ (Kulinism)।

    বল্লাল সেনের এই কৌলিন্য প্রথা কোনো সাধারণ সামাজিক নিয়ম ছিল না; এটি ছিল মূলত বাংলার আদি অনার্য ও বৌদ্ধদের চিরতরে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় নীলনকশা। সেন রাজারা উত্তর ভারত থেকে কানাকুব্জের গোঁড়া বৈদিক ব্রাহ্মণদের ডেকে এনে তাদের বিশাল বিশাল নিষ্কর ভূমি বা জমিদারি দান করে এবং তাদের সমাজের ‘সর্বোচ্চ পবিত্র কুলীন’ হিসেবে ঘোষণা করে। পক্ষান্তরে, এই মাটির আদি অধিবাসী নমঃশূদ্র, কৈবর্ত, ডোম, এবং যোগী সম্প্রদায়কে (যারা বৌদ্ধ ধর্ম আঁকড়ে ধরে আর্যদের বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল) রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অস্পৃশ্য অন্ত্যজ শূদ্র’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ ঘোষণা করা হয় (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), পরিচ্ছেদ: ‘জাতিবিন্যাস’, পৃষ্ঠা ২৬৪)। তাদের শিক্ষা গ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, সম্পত্তি রাখার অধিকার নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের সামাজিক মেলামেশাকে আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই তীব্র রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিধনযজ্ঞের মুখে পড়ে অনার্যদের একটি বড় অংশ আর্যদের শৃঙ্খল মুখ বুজে সহ্য করে হিন্দু সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরের দলিত হিসেবে অবহেলিত থেকে যান। আর অন্য অংশটি এই মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক দাসত্বকে চিরতরে লাথি মেরে মুক্ত হতে চাইলেন, যার চূড়ান্ত সুযোগ তৈরি হয়েছিল তেরো শতকে বখতিয়ার খলজীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment