Loading...

বাঙালি কালচারের রাজনীতি: ছদ্ম-সেক্যুলার হেজিমনি ও সাংস্কৃতিক জালিয়াতি

 বাঙালি কালচারের রাজনীতি: ছদ্ম-সেক্যুলার হেজিমনি ও সাংস্কৃতিক জালিয়াতি
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    বাঙালি কালচারের রাজনীতি, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, ভাষা, ইতিহাস ও বাঙালি মুসলিম পরিচয়ের প্রতীকী চিত্র,,,,, seosazzadchy
    বাংলার ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয় নির্মাণের রাজনীতি নিয়ে একটি সমালোচনামূলক উপস্থাপন

    বাঙালি জাতীয়তার রাজনীতি

    ভূমিকা

    সংস্কৃতির উপনিবেশ ও আধিপত্যের ত্রিমাত্রিক আক্রমণ

    যেকোনো স্বাধীন জনসমষ্টিকে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বে শৃঙ্খলিত করার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো তার নিজস্ব ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে বিকৃত করা। এই ভূখণ্ডে তথা বৃহত্তর বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে যে তথাকথিত ‘আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতি’র জয়গান গাওয়া হচ্ছে, তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বা অর্গানিক বিবর্তনের ফসল নয়; বরং তা উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক এবং উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী এলিটদের এক সুপরিকল্পিত কৃত্রিম নির্মাণ। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের টেবিল থেকে শুরু করে কলকাতার বাবুদের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাংস্কৃতিক কারখানাটির মূল লক্ষ্যই ছিল এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাস, ভাষা এবং ভূমি-সংলগ্ন লড়াইকে সম্পূর্ণ আড়াল করে একটি ছদ্ম-সেক্যুলার হেজিমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই আধিপত্য বিস্তারের মূল হাতিয়ার ছিল ভাষা, ভূমি এবং নান্দনিকতার এক সূক্ষ্ম ত্রিমাত্রিক আক্রমণ। যা বাংলার সাধারণ মানুষকে তাদের নিজস্ব শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক গভীর হীনম্মন্যতার অতলে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান গ্রন্থটির মূল উদ্দেশ্য হলো এই প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক জালিয়াতির কুৎসিত অবয়বকে নিখুঁত ও নির্মম ঐতিহাসিক প্রামাণিকতায় ব্যবচ্ছেদ করা এবং অবদমিত সংখ্যাগরিষ্ঠের লুণ্ঠিত পরিচয়কে পুনরুত্থাপন করা।

    সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপটি বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই আদিম মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে, যেখানে বাংলার মাটিকে আর্য আধিপত্যবাদীরা ‘রৌরব নরক’ বলে ফতোয়া দিয়েছিল এবং এখানকার আদিবাসীদের ‘পাখি-ভাষী দস্যু’ বলে উপহাস করেছিল। এই মাটির মানুষের ভাষা ও পরিচয়কে প্রথম থেকেই একটি অপর বা ‘আদার’ (Other) হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা, তা ব্রিটিশ আমলে এসে এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে। কলকাতার উচ্চবর্ণের ভদ্রলোক সমাজ ব্রিটিশ তোষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এমন একটি কৃত্রিম ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ উৎপাদন করল, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এই ভূখণ্ডের অর্গানিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসমাজকে সাংস্কৃতিক বলয় থেকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া ও প্রান্তিক করে দেওয়া। তারা ইতিহাসকে এমনভাবে পুনর্লিখন করল, যাতে মনে হয় এই মাটির সমস্ত প্রগতি, মেধা এবং নান্দনিকতা কেবল তাদেরই একচেটিয়া সম্পত্তি। আর এর বাইরের বৃহৎ লোকায়ত জনগোষ্ঠী স্রেফ ‘কালচারালি আনকুল’ বা প্রতিক্রিয়াশীল। এই গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতি বা ‘এপিস্টেমিক ফোর্জারি’ সাধারণ মানুষের মনে এমন এক গভীর আত্ম-বিমুখতা তৈরি করেছে, যার ফলে আজ একজন বাঙালি নিজের পোশাক, নিজের ভাষা এবং নিজের ধর্মপরিচয় নিয়ে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য হীনম্মন্যতায় ভোগে।

    লোকায়ত জীবনের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের অন্দরমহল

    বাংলার সামাজিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও সূক্ষ্ম অধ্যায়টি লুকিয়ে আছে এ দেশের জনমানুষের প্রাত্যহিক মনস্তত্ত্ব এবং লৌকিক আচারের ভেতরে। ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক যুগে সুফী-সাধকদের হাত ধরে এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্ণের অনার্য মানুষ যখন দলে দলে সাম্যের ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছিলেন, তখন তাদের কেবল বিশ্বাসের একটি আমূল রূপান্তর (Shift of Faith) ঘটেছিল। কিন্তু হাজার বছরের যাপিত জীবনের ভূ-প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসগুলো রাতারাতি মুছে ফেলা সম্ভব ছিল না। আর এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁকটিকেই পরবর্তীতে অত্যন্ত চতুরভাবে ব্যবহার করেছিল উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি। যার সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত কাউন্টার-অফেনসিভ বা পাল্টা আক্রমণী রূপ ছিল ষোড়শ শতকের শ্রী চৈতন্য দেব প্রবর্তিত বৈষ্ণব আন্দোলন। যখন তলোয়ার বা শাসনক্ষমতা দিয়ে এই অঞ্চলের উদীয়মান মুসলিম জনমিতিকে ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ল, তখন শুরু হলো এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক এবং নান্দনিক যুদ্ধ। এই কালচারাল আক্রমণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ইসলামের মৌলিক তাওহীদি ও সমতাবাদী চেতনাকে লোকায়ত আচারের মোড়কে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলা, যাতে বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটলেও প্রাত্যহিক অভ্যাসে তারা বৈষ্ণবীয় বা ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির দাসত্ব থেকে বের হতে না পারে।

    এই অঞ্চলের ইসলাম প্রচারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুফী দরবেশগণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে প্রাত্যহিক আচারের খুঁটিনাটি 'হাতে-কলমে' সংস্কার করার সুযোগ পাননি। তারা ইসলামের মূল সাম্যবাদী দর্শন ও বিশ্বাসের বীজটি বুনে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সুযোগে লোকায়ত সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করানো হয় বৈষ্ণব আন্দোলনের সেই সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক মিমিক্রি বা নকলনবিশি। আজ মুসলিম সমাজে যে 'পায়ে ধরে সালাম' বা কদমবুসির রেওয়াজ দেখা যায়, তা মূলত বৈষ্ণবীয় ‘গুরুবাদ’ এবং চণ্ডাল-উচ্চবর্ণ নির্বিশেষে পা ছুঁয়ে ভক্তি প্রকাশের সেই থিয়েটার বা রাজপথের রাজনীতির অবশেষ। একইভাবে, বিয়ের উৎসবে ‘গায়ে হলুদ’ কিংবা ‘বরপক্ষের ভোজন’-এর মতো চরম অপচয়মূলক ও সামাজিকভাবে পীড়াদায়ক প্রথাগুলো আসলে শ্রী চৈতন্যের সমকালীন বৈষ্ণবীয় উৎসব এবং স্মার্ত হিন্দু সমাজের বিয়ের আচারের হুবহু অনুকরণ। যা মুসলিম সমাজে আভিজাত্য ও সংস্কৃতির মুখোশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফসল বেশি পাওয়ার আশায় ‘ঘরে ধান বা আলু ঝুলিয়ে রাখা’ কিংবা যেকোনো অমঙ্গল বা সংকটে ‘অলক্ষ্মী’র দোহাই দেওয়া মূলত সেই প্রাচীন অনার্য ও পরবর্তীকালের লৌকিক হিন্দু ধর্মের প্রকৃতিপূজা ও দেবতাবাদেরই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। যা বৈষ্ণব আন্দোলনের ভাববাদী জোয়ারে আরও বেশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। 

    এই কালচারাল ওয়ার বা সাংস্কৃতিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই যে, তারা মুসলিম সমাজকে সামরিক বা রাজনৈতিকভাবে পরাজিত না করেও তাদের প্রাত্যহিক অবচেতনে এমন কিছু চিহ্ন (Semiotics) গেঁথে দিতে পেরেছে, যা আজ সাধারণ মুসলমান নিজের অজান্তেই ‘ইসলামিক’ বা ‘বাঙালি ঐতিহ্য’ বলে রক্ষা করে চলেছে। হিন্দু উচ্চবর্ণের এলিট সমাজ যখন দেখল, ইসলামের সুফী ভাবধারা নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধদের আকর্ষণ করছে, তখন তারা শ্রী চৈতন্যকে সামনে রেখে একটি ‘সাংস্কৃতিক ল্যাবরেটরি’ তৈরি করে। সেই ল্যাবরেটরির উৎপাদিত উপাদানগুলোই, যার মধ্যে লোকায়ত উৎসবের হিন্দুয়ানি রূপান্তর, শব্দের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক জালিয়াতি এবং প্রাত্যহিক জীবনের আচারগুলো অন্যতম—পরবর্তীতে বাংলার মুসলিম মনস্তত্ত্বকে গ্রাস করে এক গভীর হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। আমাদের সাথে সরাসরি রাজনৈতিক বা সামরিক ময়দানে না পেরে, এই সূক্ষ্ম সাংস্কৃতিক আক্রমণটি চালানো হয়েছিল এবং দুঃখজনকভাবে তারা এতে সাময়িকভাবে সফলও হয়েছে। বর্তমান গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা যখন শ্রী চৈতন্যের এই ‘স্ট্রাকচারাল মিমিক্রি’ এবং বৈষ্ণব পদাবলীর মাধ্যমে সাহিত্যিক স্পেস দখলের রাজনীতিকে ব্যবচ্ছেদ করব, তখন এই লৌকিক আচারের ছদ্মবেশী জালিয়াতির কুৎসিত রূপটি পাঠকের সামনে শতভাগ স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

    সাংস্কৃতিক জালিয়াতি ও মনস্তাত্ত্বিক অপার্থাইডের এই বিষাক্ত বৃত্ত থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমে প্রয়োজন অবচেতনের ডিকলোনাইজেশন বা চিন্তার স্বাধীনতা। যখন একটি জাতির প্রাত্যহিক ভাষা, পরিধেয় পোশাক, খাদ্যাভ্যাস এবং মৌলিক সামাজিক আচারগুলোকে ‘অনগ্রসর’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে দেগে দেওয়া হয়, তখন সেই জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতাও আসলে এক প্রকার ফাঁপা খোলসে পরিণত হয়। বিগত দশকগুলোতে বাংলায় যে ছদ্ম-সেক্যুলার ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার আমরা দেখেছি, তার রাজপথ তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল এই একপেশে সাংস্কৃতিক বয়ান (Hegemonic Cultural Narrative)। যে ব্যবস্থার কারণে মধ্যবিত্ত ‘কালচার্ড’ মন নিজের অজান্তেই একটি বিশেষ রাজনৈতিক কাল্ট বা চিন্তাকে ‘প্রগতিশীল’ ভাবত এবং এর বাইরের বৃহৎ গণমানুষকে ‘সাব-হিউম্যান’, 'সাব-অল্টার্ন' বা নিকৃষ্ট মনে করত। সেই মনস্তাত্ত্বিক খাঁচাকে ভেঙে চুরমার করার এখনই উপযুক্ত সময়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়; এটি আসলে বাংলার শোষিত ও অবদমিত জনমানুষের এক যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থানও বটে।

    এই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বর্তমান গ্রন্থটি কেবল ইতিহাসের কিছু ধূলিমলিন দলিলের খতিয়ান নয়, বরং এটি একটি ‘এপিস্টেমিক রেবেলিয়ন’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিদ্রোহের ইশতেহার। গ্লোবাল নেটওয়ার্কের মুক্ত দুনিয়ায় এবং ডিজিটাল মাধ্যমে বাঙালির নিজস্ব আত্মপরিচয় ও অর্গানিক ইতিহাসের যে পুনরুত্থান ঘটছে, তার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও তাত্ত্বিক গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়। ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশে অত্র অঞ্চলে উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির কারখানাটি কীভাবে ধাপে ধাপে নির্মিত হয়েছিল এবং কীভাবে তার শিকড় আমাদের দৈনন্দিন প্রাত্যহিকতায় বিষ ছড়াচ্ছে, তা পাঠককে একটি সুনির্দিষ্ট বিন্যাসের মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে সচেতন করবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই পুরো গ্রন্থের মূল শরীরকে পরবর্তী পাঁচটি গভীর ও সুনিশ্চিত অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

    প্রথম অধ্যায়, ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি: ভাষা ও ভূমির বাস্তুচ্যুতির কারখানা নিয়ে। এই অধ্যায়ে প্রাক-আর্য অনার্য আদিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক সত্য, বহিরাগত আর্য ও কর্ণাটকের সেন রাজবংশের আগ্রাসন, কুতসিত কুলীন প্রথার জন্ম এবং স্থানীয় মানুষের মুখের ভাষাকে ‘রৌরব নরক’ বলার সেই প্রাচীন ইডিক্ট বা ফতোয়ার রাজনীতি উন্মোচিত হবে। একই সাথে চর্যাপদের ভাষাগত বিদ্রোহ এবং এর নেপালে নির্বাসিত হওয়ার সত্যকে আমরা অনুসন্ধান করব।।

    দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্রী চৈতন্য এবং সাংস্কৃতিক পাল্টা-আক্রমণের আদি ল্যাবরেটরি নিয়ে বিশ্লেষণ। সুফীবাদের বিপুল বিস্তারের বিপরীতে উচ্চবর্ণের অস্তিত্বের সংকট থেকে তৈরি হওয়া বৈষ্ণব আন্দোলনের সেই ‘স্ট্রাকচারাল মিমিক্রি’ বা নকলনবিশির রাজনীতি নিয়ে হবে এই গভীর ব্যবচ্ছেদ। সুফীদের জিকিরকে কাউন্টার করতে ‘নগর সংকীর্তন’-এর ব্যবহার, চৈতন্যের ছদ্ম-সাম্যবাদ এবং বৈষ্ণব পদাবলীর মাধ্যমে সাহিত্যিক স্পেস দখলের ছদ্মবেশী জালিয়াতির কুৎসিত রূপটি এখানে উন্মোচিত হবে।

    তৃতীয় অধ্যায়, পলাশী-উত্তর বাংলা এবং ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার আলাপ নিয়ে। ১৭৫৭ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের টেবিল থেকে জীবন্ত লোকায়ত বাংলাকে ছেঁটে ফেলে কীভাবে একটি কৃত্রিম, সংস্কৃতায়িত ‘ভদ্রলোকি বাংলা’ তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা হলো, তা নথিপত্রসহ দেখানো হবে।

    চতুর্থ অধ্যায়, রবীন্দ্র-ধর্মের উদ্ভাবন এবং নান্দনিক উপনিবেশায়নের মনস্তত্ত্বকে ডিকোড করা নিয়ে। উনিশ শতকের তথাকথিত রেনেসাঁসের ছদ্ম-সেক্যুলার চরিত্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের মতাদর্শিক ধারাবাহিকতায় কীভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটি জাতীয়-সাংস্কৃতিক দেবতায় রূপান্তর করে ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ নামক একটি প্রক্সি বিশ্বাসের জাল তৈরি করা হলো, তার মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ থাকবে এখানে। এর সমান্তরালে, মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বাংলা ভাষার অবলুপ্তির ঐতিহাসিক সত্য এবং বাংলার নিজস্ব আদিম শিক্ষার মাইলফলক ‘বিসমিল্লাহখানি’ উৎসবের আলাপ দেখবো আমরা। 

    পঞ্চম অধ্যায়, আধুনিক দৈনন্দিন জীবনে পোশাক, খাদ্য ও ভাষার অপার্থাইড বা সাংস্কৃতিক বর্ণবাদের কুৎসিত চেহারার উন্মোচন নিয়ে। যেখানে দেখবো, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাদের সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং অন্য সংস্কৃতির মানুষদের পদ্ধতিগতভাবে অবমূল্যায়ন, পৃথক বা কোণঠাসা করে রাখে। লুঙ্গি-পিরহানকে ‘আনকালচার্ড’ তকমা দিয়ে ধুতি-শাড়ির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা, গরুর মাংস ভক্ষণকে সাহিত্য ও মিডিয়ায় হীন চোখে দেখা, দাড়ি-টুপি, পাঞ্জাবিকে কালো তালিকাভুক্তকরণ এবং ‘পানি, আব্বা, আম্মা, গোসল’-এর মতো গণমানুষের চিরকালীন শব্দগুলোকে সামাজিক লিঙ্গুইস্টিক রেসিজমের মাধ্যমে শেইমিং করার নেপথ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে এখানে চ্যালেঞ্জ করা হবে। পরিশেষে, মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো মূর্তিপূজক প্রতীককে ছদ্ম-সেক্যুলার মুখোশে চাপিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় জালিয়াতির বিপরীতে শবে-বরাত, আকিকা ও মিলাদ-শিরনির মতো লোকায়ত সামাজিক বন্ধনগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্ল্যাকআউট থেকে মুক্ত করার জন্য এক চূড়ান্ত ডিকলোনিয়াল ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে এই গ্রন্থের পরিসমাপ্তি ঘটবে।


    Home

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment