Loading...

উনিশ শতকের ছদ্ম-সেক্যুলার নবজাগরণ এবং কলকাতার বাবু সংস্কৃতির রাজনীতি

উনিশ শতকের ছদ্ম-সেক্যুলার নবজাগরণ এবং কলকাতার বাবু সংস্কৃতির রাজনীতি
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    উনিশ শতকের ছদ্ম-সেক্যুলার নবজাগরণ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, কলকাতার বাবু সংস্কৃতি ও বেঙ্গল রেনেসাঁসের প্রতীকী চিত্র।

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, কলকাতার বাবু সমাজ, বেঙ্গল রেনেসাঁস এবং উনিশ শতকের সাংস্কৃতিক রাজনীতির প্রতীকী উপস্থাপনা

    ৪:৩

    Previous Part.......

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষাগত ল্যাবরেটরিতে যে কৃত্রিম, সংস্কৃতঘেঁষা ‘ভদ্রলোকি বাংলা’র জন্ম দেওয়া হয়েছিল, তাকে প্রধান হাতিয়ার করেই উনিশ শতকে কলকাতার বুকে আত্মপ্রকাশ করে তথাকথিত ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’ বা কলকাতা-কেন্দ্রিক নবজাগরণ। আধুনিক ছদ্ম-সেক্যুলার ঐতিহাসিকেরা এই কালখণ্ডকে বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এক অনন্য প্রগতিশীল সুবর্ণ যুগ হিসেবে অবিরাম প্রোপাগান্ডা করে থাকেন। কিন্তু ইতিহাসের ভেতরের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণগুলো যখন কোনো দলীয় পক্ষপাত ছাড়া ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তখন এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই নবজাগরণ কোনো সর্বজনীন বা প্রগতিশীল গণজাগরণ ছিল না। এটি ছিল মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির পরম আনুকূল্যে এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের টাকায় গড়ে ওঠা কলকাতার মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার, মুৎসুদ্দি ও বাবুদের একচেটিয়া শ্রেণী-স্বার্থ রক্ষার একটি কৃত্রিম বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘সংস্কৃতির রূপান্তর ও সংকট’, পৃষ্ঠা ৮২)।

    এই রেনেসাঁসের মূল চরিত্রটি ছিল চরম মাত্রায় গণবিচ্ছিন্ন এবং একপেশে। যে সাধারণ মানুষ ও চাষী সমাজ গ্রামীণ বাংলায় করের নিষ্ঠুর বোঝায় পিষ্ট হচ্ছিলেন, যাদের ফসলের টাকায় কলকাতার বাবুরা আলিশান রাজপ্রাসাদ, বাঈজি নাচ আর বিলাসী জীবনযাত্রার পত্তন করেছিলেন—সেই সংখ্যাগুরু নিম্নবর্ণের ভূমিপুত্র ও মুসলিমদের জন্য এই রেনেসাঁসের দরজা ছিল সম্পূর্ণ রুদ্ধ। কলকাতার এই নব্য-বুদ্ধিজীবীরা (যেমন—রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর) সমাজ সংস্কারের নামে বিপুল আলোড়ন তৈরি করলেও, তাদের সমগ্র চিন্তা ও দর্শনের পরিধি ছিল কেবল উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থী সমাজের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের কোথাও বাংলার বিশাল মুসলমান জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক লাঞ্ছনা কিংবা তাদের ঐতিহ্যকে একটুও স্থান দেওয়া হয়নি। উল্টো, ব্রিটিশদের দেওয়া পাশ্চাত্য শিক্ষার সুযোগ নিয়ে এই বাবু সমাজ এমন এক ছদ্ম-সেক্যুলার আভিজাত্যবাদের বয়ান তৈরি করে, যার একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল এই মাটির আসল দাবিদারদেরকে সামাজিকভাবে সংস্কৃতিহীন ও বর্বর হিসেবে সাব্যস্ত করা।

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং কালচারাল ফ্যাসিবাদের বিষবৃক্ষ রোপণ

    ফোর্ট উইলিয়ামের তৈরি করা সেই কৃত্রিম ও গণবিচ্ছিন্ন ভাষাকে সাহিত্যিক স্তরে চরম উগ্র ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রথম সবচেয়ে নগ্নভাবে ব্যবহার করেন উনিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী হিন্দু সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্র কেবল একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মূলত আধুনিক ছদ্ম-সেক্যুলার (ব্রিটিশদের গড়া কৃত্রিম) বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে একটি উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজ কায়েমের প্রধান তাত্ত্বিক রূপকার। তিনি তাঁর কালজয়ী হিসেবে প্রচারিত উপন্যাসসমূহ—বিশেষ করে আনন্দমঠ (১৮৮২), দেবী চৌধুরানী, এবং সীতারাম-এর পাতায় পাতায় এমন এক কালচারাল ফ্যাসিবাদের বিষবৃক্ষ রোপণ করেন, যা বাংলার সমাজদেহে হিন্দু-মুসলিম বিভেদের এক স্থায়ী ও গভীর ক্ষত তৈরি করে দেয় (Sarkar, Sumit. The Swadeshi Movement in Bengal: 1903-1908, People's Publishing House, Chapter: ‘Trends in Bengal Nationalist Thought’, pp. 405-412)।

    বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যে মুসলিমদেরকে এই ভূখণ্ডের কেউ হিসেবে স্বীকার করতে চাননি; বরং তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে মুসলমানদের ‘বহিরাগত শত্রু’, ‘যবন’, ‘ম্লেচ্ছ’ এবং ‘অত্যাচারী বর্বর’ হিসেবে চিত্রিত করার এক সুপরিকল্পিত বয়ান তৈরি করেন। "আনন্দমঠ" উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে তিনি সন্তান দলের মুখে ‘বন্দে মাতরম্’ স্লোগান বসিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র এবং সহিংস ধর্মীয় যুদ্ধের উন্মাদনা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বঙ্কিমীয় সাহিত্যের মূল দর্শনই ছিল—মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পতনকে সেলিব্রেট করা এবং ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনকে মুসলমানদের হাত থেকে হিন্দুদের ‘মুক্তির দূত’ হিসেবে স্বাগত জানানো।

    তিনি মুসলমানদের মুখের স্বাভাবিক শব্দগুলোকে তাঁর উপন্যাসে অত্যন্ত কুৎসিতভাবে উপহাস করে এক ভাষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক বর্ণবাদের চর্চা শুরু করেন। বঙ্কিমের এই উগ্র ও সাম্প্রদায়িক সাহিত্যিক কাঠামোই পরবর্তীকালে কলকাতার সমগ্র ‘ভদ্রলোক’ সমাজের মনস্তত্ত্বকে চিরতরে বিষাক্ত করে তোলে। এর ফলে, তারা সাধারণ মুসলিমদেরকে কোনো সমমর্যাদার নাগরিক হিসেবে ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং নিজেদেরকে এই বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির একমাত্র ‘পবিত্র ঠিকাদার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক এজেন্ডা হাতে নেয়, যা মুসলিমদেরকে তাদের নিজেদের ভূমিতেই চিরতরে পরবাসী বানানোর এক প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত ছিল।

    সাহিত্যের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজাতীয় প্রমাণের সুগভীর নীল-নকশা

    বঙ্কিমচন্দ্রের এই সহিংস বয়ানের ধারাবাহিকতা উনিশ শতকের শেষার্ধ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার প্রায় প্রতিটি বড় বড় উচ্চবর্ণের হিন্দু সাহিত্যিকের লেখায় এক অলিখিত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তারা সাহিত্য, নাটক, ইতিহাস এবং কবিতার বিশাল ক্যানভাসকে এমনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন, যেন তা মুসলমানদের এই মাটির ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ‘অপরাধবোধ’ (Guilt Complex) এর মধ্যে ফেলে দিতে পারে। তারা এমন এক সুগভীর নীল-নকশা তৈরি করেছিলেন, যেখানে— বাংলার হাজার বছরের মধ্যযুগীয় মুসলিম সালতানাতের গৌরবময় ইতিহাসকে ‘অন্ধকার যুগ’ বা ‘বিদেশী শাসনের যুগ’ হিসেবে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে দেদারসে প্রচার করা শুরু হয়। অপরদিকে, দক্ষিণ ভারত থেকে আসা বহিরাগত সেন রাজাদের গোঁড়া ও বর্ণবাদী শাসনকে ‘বাঙালির নিজস্ব স্বর্ণযুগ’ হিসেবে কাল্পনিকভাবে মহিমান্বিত করা হয়।

    কলকাতার এই সাহিত্যিক কারখানায় মুসলমানদের সবসময় ডাকাত, লম্পট, অশিক্ষিত, এবং সংস্কৃতিহীন ‘চরিত্র’ হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হতো, যাদের কোনো উন্নত নৈতিকতা বা নান্দনিক জ্ঞান নেই। পক্ষান্তরে, উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থী চরিত্রগুলোকে বীরত্ব, জ্ঞান, প্রগতি এবং পরিশীলিত আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হতো। এই পদ্ধতিগত মনস্তাত্ত্বিক অবদমনের মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলমান জনসমষ্টিকে তাদের নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। তারা মুসলমানদের বোঝাতে চেয়েছিল যে, যদি তাদের ‘বাঙালি’ পরিচয় ধারণ করতে হয়, তবে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় চেতনা, ঐতিহ্য এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র্যকে চিরতরে বিসর্জন দিয়ে কলকাতার বাবুদের তৈরি করা ছদ্ম-সেক্যুলার ও ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির দাসত্ব করতে হবে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পৃষ্ঠা ৮৪)।

    এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এ দেশের মুসলিমদের আত্মপরিচয়ের ভিতকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে, তারা প্রকাশ্য সমাজে নিজেদের লৌকিক ঐতিহ্যগুলো উচ্চারণ করতেও এক ধরনের হীনম্মন্যতা বোধ করতে শুরু করেন। কিন্তু ইতিহাসের এই সুপরিকল্পিত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দেয়ালটি কীভাবে ভেঙে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, এবং কীভাবে এই মাটির সন্তানেরা তাদের নিজস্ব প্রাচীন কৃষ্টির দলিল নিয়ে এই একচেটিয়া আধিপত্যের মুখে চুনকালি দিয়েছিল—তা আমরা স্ফটিকস্বচ্ছ খতিয়ান ধরে ধরে, অভেদ্য দলিলের আলোয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উন্মোচন করব।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment