Loading...

অনার্য মনস্তত্ত্বের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং আর্যীয় জালের ভাঙন

অনার্য মনস্তত্ত্বের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং আর্যীয় জালের ভাঙন
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    আর্যীয় বর্ণব্যবস্থার মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খল, বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং সামাজিক মুক্তির প্রতীকী ঐতিহাসিক ইলাস্ট্রেশন।
    আর্যীয় বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের দীর্ঘদিনের নীরব প্রতিরোধ, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং সামাজিক মুক্তির প্রতীকী চিত্র

    ১:৫


    শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক জেনোসাইড এবং ‘রৌরব নরক’-এর ভাষিক ফতোয়া বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের সমাজমানসে এক গভীর, স্তরীভূত এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। আর্যদের তৈরি করা চাতুর্বর্ণের কৃত্রিম জালটি ওপর থেকে দেখতে যতই দুর্ভেদ্য মনে হোক না কেন, ভেতরের দিক থেকে তা ছিল চরম ভঙ্গুর। কারণ, একটি বদ্বীপ অঞ্চলের বিশাল আমজনতাকে কেবল গায়ের জোর আর পরকালের ভীতি দেখিয়ে চিরকাল দাস বানিয়ে রাখা যায় না। বাংলার অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী ও শ্রমজীবী সমাজ আর্যদের তৈরি করা এই মনস্তাত্ত্বিক দেওয়ালটি ভাঙার জন্য একটি চরম মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় দিন গুনছিল।

    এই মনস্তাত্ত্বিক ফতোয়া ও সামাজিক অবদমনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভেতরে যে গোপন প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার নিখুঁত সমাজতাত্ত্বিক বিবরণ পাওয়া যায় গবেষক ও ভাষাবিদ ড. দীনেশচন্দ্র সেন-এর গবেষণায়। তিনি দেখিয়েছেন যে, উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা সাধারণ মানুষের মুখের প্রাকৃত বা আদি-বাংলাকে যত বেশি ‘ম্লেচ্ছ’ ও ‘অপবিত্র’ বলে দূরে ঠেলে দিয়েছে, সাধারণ মানুষের ভেতরের ক্ষোভ তত বেশি রাজকীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংহত হয়েছে (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, প্রথম ভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, পৃষ্ঠা ৪৮)। আর্যরা তাদের শাস্ত্রীয় ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে বুঝতে পারেনি যে, তারা আসলে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে। বাংলার আদি ভূমিপুত্ররা আর্যদের দেবভাষা সংস্কৃত বা তাদের আরোপিত দেব-দেবীর কৃত্রিম আধিপত্যকে মনের গভীর থেকে কোনোদিন মেনে নেয়নি। তারা কেবল রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির অভাবে এক ধরনের মৌন বাধ্যতা প্রদর্শন করছিল, যা ছিল এক সুগভীর ঝড়ের পূর্বাভাস।

    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: আর্য আধিপত্যের পতনোন্মুখ দশা

    আর্যদের এই বর্ণবাদী ও ভাষাগত আধিপত্যের পতনোন্মুখ দশাটি কীভাবে ঘনিয়ে আসছিল, তার এক অকাট্য ঐতিহাসিক ও শব্দতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজাদের চরম গোঁড়ামির যুগেও বাংলার গ্রামীণ জনপদগুলোতে লৌকিক ছড়া, ধাঁধা, ডাক ও খনার বচনের মতো আদি-বাংলার মৌখিক রূপগুলো এক সমান্তরাল শক্তি হিসেবে টিকে ছিল। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যখন শহরের রাজদরবারে বসে সংস্কৃত কাব্যের চর্চা করত, তখন বাংলার মাঠে-ঘাটে প্রাক-আর্য ভূমিপুত্ররা তাদের নিজেদের প্রাকৃত ও অপভ্রংশ মিশ্রিত ভাষায় নিজেদের সুখ-দুঃখের গান বাঁধত (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৪৮)।

    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট করে লিখেছেন যে, সেন আমলের শেষ দিকে এসে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সামাজিক ও ভাষিক স্বৈরাচার এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর চূড়ায় পৌঁছেছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। আর্যদের এই কৃত্রিম ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোটি এতটাই গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল যে, তা আর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কোনো নৈতিক বা সামাজিক ভিত্তি ধরে রাখতে পারছিল না (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৫০)। ড. শহীদুল্লাহ্‌র এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, আর্যরা বাইরে থেকে এসে বাংলার ভূমি ও ভাষার ওপর যে কাল্পনিক মালিকানা কায়েম করতে চেয়েছিল, তা ভেঙে পড়ার জন্য কেবল একটি বাহ্যিক রাজনৈতিক ধাক্কার প্রয়োজন ছিল। বাংলার মাটি ও মানুষের মনস্তত্ত্ব ইতিমধ্যেই আর্যীয় জালের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল।

    এ পর্যন্ত আলোচনার সামগ্রিক তাত্ত্বিক উপসংহার

    বইয়ের এই প্রথম অধ্যায়ের (১:১ থেকে ১:৫ পর্যন্ত) সামগ্রিক নৃতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও সামাজিক খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি ধ্রুব এবং অকাট্য ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।

    ১. আর্যদের বহিরাগত পরিচয়: ভাষার দাবি বা গৌরব, রক্তের শুদ্ধি কিংবা ভূমির প্রাচীনত্বের দোহাই দিয়ে আজ যারা এই বাংলায় নিজেদের ‘আদি বাঙালি’ বা ভূমির আসল মালিক দাবি করে, তাদের আর্য পূর্বপুরুষেরা নৃতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় ছিলেন ইরান ও ইউরেশীয় অঞ্চল থেকে আসা যাযাবর জবরদখলকারী। তারা এই মাটির সন্তান নয়। যে ভাষার আড়ালে নিজেদের বাঙালি জাতি দাবি করতে চায় তারা, এই ভাষাও তাদের মূল ভাষা নয়। তারা বরং এই ভাষা হত্যা করতে চেয়েছিলো। মুসলিমরা এসে এর গোড়ায় পানি সিঞ্চন করেন।

    ২. ভূমিপুত্রের অধিকার হরণ: আর্যরা বাংলায় আসার হাজার বছর আগে থেকে এখানে বসবাসকারী অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর শান্তিকামী মানুষকে তারা চাতুর্বর্ণের বিষবৃক্ষ দিয়ে ‘শূদ্র’ ও ‘অস্পৃশ্য চণ্ডাল’ বানিয়ে তাদের সমস্ত মানবিক ও সামাজিক অধিকার হরণ করেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৭)।

    ৩. ভাষিক জেনোসাইড ও ফতোয়া: বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের মুখের কথ্য প্রাকৃত বা আদি-বাংলা ভাষাকে আর্য-ব্রাহ্মণরা ‘ম্লেচ্ছভাষা’ তকমা দিয়ে এবং ‘রৌরব নরকে যাওয়ার কারণ’ হিসেবে কঠোর ফতোয়া জারি করে একে চিরতরে কবর দিতে চেয়েছিল (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, প্রথম ভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, পৃষ্ঠা ৪৫)।

    ৪. চর্যাপদের অবরুদ্ধ ইতিহাস: বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ ছিল এই ব্রাহ্মণ্যবাদী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের এক মহিমান্বিত ভাষিক বিদ্রোহ, যা সেন রাজাদের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞের কারণে প্রাণভয়ে নেপালের রাজদরবারে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৮)।

    সুতরাং, তাত্ত্বিক, ভাষিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিচারে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, সনাতনপন্থী সমাজ কোনোভাবেই এই বাংলার আদিম বা স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী নয়। না ভূমির বিবেচনায় আর না ভাষার বিবেচনায়। তারা ছিল এই ভূমি ও ভাষার ওপর এক ঐতিহাসিক ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিভূ। এই অবরুদ্ধ ও অত্যাচারিত সমাজকাঠামো এবং মৃতপ্রায় আদি-বাংলা ভাষার ক্রান্তিলগ্নেই বাংলার রাজনৈতিক আকাশে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে, যা বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের এবং তাদের ভাষাকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এক নতুন মহিমান্বিত জীবনের দুয়ার খুলে দেয়।
    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment