Loading...

ব্রাহ্মণ্যবাদী ফতোয়া এবং ‘রৌরব নরক’-এর মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর

ব্রাহ্মণ্যবাদী ফতোয়া এবং ‘রৌরব নরক’-এর মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ব্রাহ্মণ্যবাদী ফতোয়া, রৌরব নরকের ভয়, বাংলা ভাষার ওপর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা এবং জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতার প্রতীকী ঐতিহাসিক ইলাস্ট্রেশন।
    ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা, ভাষাগত বৈষম্য এবং বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের প্রতীকী ঐতিহাসিক চিত্র

    ১:৪

    Previous Part.......

    আর্য ও তাদের উত্তরসূরি উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থী সমাজ বাংলায় এসে কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতাই কুক্ষিগত করেনি, বরং তাদের তৈরি করা আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাকৃত বা আদি-বাংলা ভাষার চারপাশে এক দুর্ভেদ্য মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় প্রাচীর খাড়া করেছিল। এই প্রাচীর নির্মাণের মূল হাতিয়ার ছিল তাদের শাস্ত্রীয় ‘ফতোয়া’ বা কঠোর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা। আর্য পণ্ডিত ও স্মার্ত ব্রাহ্মণরা খুব ভালো করেই জানত যে, যদি বাংলার আদি ভূমিপুত্ররা তাদের নিজেদের ভাষায় জ্ঞানচর্চা বা ধর্মীয় আচার পালনের স্বাধীনতা পেয়ে যায়, তবে আর্যদের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃত ভাষার আভিজাত্য এবং তাদের তৈরি করা চাতুর্বর্ণের শোষণ টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই কারণে তারা প্রাকৃত বা আদি-বাংলাকে কেবল ‘অপবিত্র’ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এই ভাষায় যেকোনো ধরনের শাস্ত্রীয় বা আধ্যাত্মিক চর্চাকে সরাসরি অনন্তকাল নরকবাসের কারণ হিসেবে ফতোয়া জারি করে।

    মধ্যযুগীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী ফতোয়া ও বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

    মধ্যযুগে সাধারণ মানুষের মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তৎকালীন উচ্চবর্ণের রক্ষণশীল সমাজ কতটা বৈরী ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এর ধর্মীয় ফতোয়া ও সামাজিক অবদমন। তৎকালীন উচ্চবর্ণের এই ভাষাগত স্বৈরাচারের সবচেয়ে অকাট্য ও নগ্ন দলিল আমরা পাই মধ্যযুগের হিন্দু পণ্ডিত ও কবিদের নিজেদের লেখাতেই। বিখ্যাত গবেষক ও ভাষাবিদ ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ "বঙ্গভাষা ও সাহিত্য"-এ উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের এই চরম বিদ্বেষমূলক ফতোয়ার কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিভুক্ত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে তৎকালীন সনাতনপন্থী সমাজ একটি সুনির্দিষ্ট শ্লোক তৈরি করে তা সাধারণ মানুষের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল—যারা এই দেশের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা অর্থাৎ প্রাকৃত বা বাংলায় অষ্টাদশ পুরাণ বা রামায়ণ-মহাভারতের মতো ধর্মকথা শুনবে বা চর্চা করবে, তারা সরাসরি ‘রৌরব’ নামক ভয়াবহ নরকে পতিত হবে (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, প্রথম ভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, পৃষ্ঠা ৪৫)।

    শ্লোকটি ছিল এইরকম:

    "অষ্টাদশপুরাণানি রামস্য চরিতানি চ।

    ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ॥"

    অর্থাৎ, আঠারোটি পুরাণ এবং শ্রীরামচন্দ্রের চরিত্র (রামায়ণ)-এর কথা যদি কোনো মানুষ লোকভাষায় (লৌকিক বাংলা বা প্রাকৃত ভাষায়) শ্রবণ করে, তবে সে 'রৌরব' নামক ভয়াবহ নরকে গমন করবে।

    এই মনস্তাত্ত্বিক ফতোয়ার মাধ্যমে আর্য-ব্রাহ্মণরা বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের মুখের ভাষাকে এক ধরনের ধর্মীয় অভিশাপ হিসেবে চিত্রিত করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—সাধারণ মানুষকে বোঝানো যে, তাদের নিজেদের মাতৃভাষা এতটাই নিকৃষ্ট ও অপবিত্র যে, এই ভাষায় ঈশ্বরের নাম নিলেও তা পাপ। এর ফলে, বাংলার মানুষ তাদের নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে বা কোনো লিখিত সাহিত্য সৃষ্টি করতে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও ভয়ের মধ্যে দিনাতিপাত করত। ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করার এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও ধর্মীয় চক্রান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল, যা উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই এই বাংলার মাটিতে প্রথম কায়েম করেছিল (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, প্রথম ভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, পৃষ্ঠা ৪৫)।

    ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্রাহ্মণ্যবাদী ফতোয়া ও চরম সামাজিক বাধার মুখে দাঁড়িয়ে বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের বিকাশ কিন্তু থমকে যায়নি। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন বাংলার মুসলিম সুলতান ও শাসকেরা। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইলিয়াস শাহী এবং পরবর্তীকালে হুসেন শাহী বংশের সুলতানরা বাংলা ভাষাকে রাজদরবারে স্থান দেন। সুলতান রুকনউদ্দিন বারবক শাহ কবি মালাধর বসুকে দিয়ে শ্রীমদ্ভাগবতের বাংলা অনুবাদ 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' রচনা করান এবং তাঁকে 'গুণরাজ খান' উপাধিতে ভূষিত করেন। একইভাবে চট্টগ্রামের লস্কর (সেনাপতি) পরাগল খাঁ এবং তাঁর পুত্র 'ছুটি খাঁ'র নির্দেশে কবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দী বাংলায় মহাভারতের প্রাচীনতম অনুবাদগুলো সম্পন্ন করেন। মুসলিম শাসকেরা হিন্দু সমাজের এই অভ্যন্তরীণ জাতিভেদ ও ধর্মীয় ভাষা-প্রাচীর ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন (সেন, সুকুমার। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ২১৪)।

    রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুসলিমদের হাতে থাকায় ব্রাহ্মণদের পক্ষে এই অনুবাদক কবিদের ওপর কোনো শারীরিক শাস্তি (যেমন মৃত্যুদণ্ড বা অঙ্গচ্ছেদ) চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু ক্ষমতার এই অভাবকে তারা পুষিয়ে নিয়েছিল চরম সামাজিক ব্যাশিং, ট্যাগিং এবং একপেশে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা সমাজে আরেকটি নিন্দাসূচক ছড়া অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে 

    "কৃত্তিবেসে, কাশীদেসে, আর বামুন-ঘেঁষে।

    এই তিন সর্ব্বনেশে॥"

    অর্থাৎ, কৃত্তিবাস ওঝা এবং কাশীরাম দাস—এই দুজন মূল সংস্কৃত গ্রন্থকে বাংলায় রূপান্তর করে হিন্দু ধর্মের শুদ্ধতা নষ্ট করেছেন এবং জাত মেরেছেন। আর 'বামুন-ঘেঁষে' বলতে বোঝানো হয়েছে যে সাধারণ মানুষ ব্রাহ্মণদের অতি নিকটে গেলে বা তাদের শাস্ত্রীয় তর্কে লিপ্ত হলে সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনবে (সেন, সুকুমার। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ২১৫)।

    অনুবাদকেরা যেহেতু মুসলিম সুলতানদের অর্থ ও আশ্রয়ে লিখতেন, তাই উচ্চবর্ণের সমাজ তাঁদের একপ্রকার 'দালাল' বা 'ধর্মের শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিক বয়কট বা জাতচ্যুতির (একঘরে করা) ব্যবস্থা করেছিল। এই একপেশে মনোভাবের মূল লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় জ্ঞানের ওপর উচ্চবর্ণের একচেটিয়া বাণিজ্যিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।

    তৎকালীন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সমাজ বনাম অধুনা রক্ষণশীল মুসলিম পণ্ডিত সমাজ

    ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি দেখা যায় যখন মধ্যযুগীয় হিন্দু সমাজের সেই ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রতিক্রিয়াকে আধুনিক যুগের মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে রক্ষণশীল মুসলিম পণ্ডিত সমাজের একাংশের আচরণের সাথে তুলনা করা হয়। ক্ষমতার হাতবদল এবং ধর্মের পরিবর্তন ঘটলেও "ভাষার পবিত্রতা রক্ষা", "জ্ঞানের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ" এবং "সংস্কারের বিরোধিতা" করার মনস্তত্ত্বটি হুবহু একই রয়ে গেছে।

    যখনই ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, প্রেক্ষাপটের সাথে সাযুজ্য ফিকাহ বা আইনশাস্ত্রের সংস্কার কিংবা যুগের চাহিদাকল্পে ধর্মীয় জ্ঞানের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা ও সিলেবাস প্রণয়ন, রাজনৈতিক পরিমার্জন কিংবা সংস্কারের কথা বলা হয়—তখনই রক্ষণশীল মুসলিম পণ্ডিত সমাজ মধ্যযুগীয় ব্রাহ্মণদের মতোই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে অনেকগুলো ট্যাগিং নিয়ে হাজির হোন। অতীতে কারা এগুলো করেছে? এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? যারা তৎকালীন সমাজকে পিছিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। মানব সভ্যতার জন্য বোঝা ছিলো, জ্ঞানান্ধ সেই ব্রাহ্মণ বা হিন্দু পণ্ডিত সমাজ।

    প্রতি যুগের পিছিয়ে পড়া এবং বিজিত জাতির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এমন দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে থাকে। বিশেষ করে দীর্ঘকালীন কলোনিয়াল বা উপনিবেশবাদী শাসনের ফলে বিজিত জাতির মন-মগজে এক ধরণের স্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব তৈরি হয়। উত্তর-কলোনি বাস্তবতায় এই দাসত্বপ্রবণ মাইন্ডসেট বা মনস্তত্ত্বই তাদেরকে যেকোনো প্রগতিশীল সংস্কারের বিরুদ্ধে অন্ধ ও রক্ষণশীল করে তোলে। তারা নতুন কোনো সংস্কার বা চিন্তাকে গ্রহণ করতে ভয় পায় এবং পরিবর্তনের পথরোধ করে দাঁড়ায় নানা বাহানা ও ছলচাতুরী দেখিয়ে।

    বিজিত ও কলোনিয়াল দাসত্বে আচ্ছন্ন জাতির এই মনস্তত্ত্বকে নির্দেশ করেই বিখ্যাত বিপ্লবী চিন্তাবিদ, ইমামে ইনক্বিলাব মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহি. বলেছিলেন, "কিসি কওম মে আগর গোলামি রাছিখ হো যায়ে তো উনকো জবরান আযাদি দিলানা পড়তি হ্যায়"। অর্থাৎ কোনো জাতির মধ্যে যখন দাসত্ব মজ্জাগত ও স্থায়ী রূপ নেয়, তখন তাদেরকে জোরপূর্বক স্বাধীনতা এনে দিতে হয়। এই ধরণের অসাড় মানসিকতাসম্পন্ন সমাজ নিজে থেকে কখনো মুক্তবুদ্ধি বা সংস্কারের পথে হাঁটবে না; এক প্রকার জবরদস্তি বা বৈপ্লবিক ধাক্কা দিয়েই তাদের এই মানসিক জড়তা ভাঙতে হয়।

    ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, বিজিত ও স্থবির সমাজের অবচেতন মনস্তত্ত্ব সব যুগেই এক ও অভিন্ন। ইতিহাসের এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি অতীতে যেমন ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। বর্তমান যুগে আমাদের প্রথাগত মুসলিম পণ্ডিত সমাজ ঠিক কী ধরণের লেবেলিং ও বাক্যবাণের মাধ্যমে প্রগতিশীল সংস্কারের প্রতিটি দাবিকে নস্যাৎ করতে চান, এবার তা খতিয়ে দেখা যাক।

    ক. 'দ্বীন বিকৃতি' ও 'মডার্নিস্ট' ট্যাগিং

    যুগোপযোগী হওয়া বা সংস্কারের কথা বললেই প্রথাগত মুসলিম পণ্ডিত সমাজ একে "ধর্মের মূল ভিত্তি ধ্বংস করার পশ্চিমা চক্রান্ত" হিসেবে গণ্য করেন। যারা প্রথাগত মাদরাসা স্ট্রাকচার-এর বাইরে থেকে সাধারণ মানুষের ভাষায়, আধুনিক যুক্তি ও বিজ্ঞানের (বাস্তবসম্মত বিশেষায়িত বিদ্যায়তনিক পদ্ধতির) আলোতে ইসলামের জ্ঞান ব্যবস্থা গড়তে যান, পাঠ্যপুস্তক সাজাতে চান, মুসলিম পণ্ডিত সমাজের একাংশ তাদের সরাসরি 'গোমরাহ' (পথভ্রষ্ট), 'নব্য মুতাজিলা' বা 'ইহুদি-খ্রিস্টানদের দালাল' বলে ট্যাগিং করেন। মধ্যযুগে কৃত্তিবাসকে যেভাবে 'সর্বনাশে' বলা হয়েছিল, ঠিক তেমনি আধুনিক সংস্কারকদের 'ঈমান চোর' বা 'ধর্মের শত্রু' হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

    খ. ফতোয়াবাজি ও সামাজিক বয়কট (ক্যানসেল কালচার)

    রাষ্ট্রীয় আইন ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানের এরকম মুসলিম পণ্ডিত সমাজও মধ্যযুগীয় ব্রাহ্মণদের মতোই শারীরিক শাস্তির বদলে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বয়কটের পথ বেছে নেয়। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গেলেই জুমার খুতবা, ওয়াজ মাহফিল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে 'কাফের' বা 'মুরতাদ' ফতোয়া জারি করা হয়। আকাবির ও আসলাফের পথ ও উসুল থেকে বিচ্যুত, বেয়াদব, অভদ্র, আনকোরা - হেন কোনো ফতোয়া ও অপদস্ততার শব্দ নেই, যা তার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় না।  ইউটিউব ও ফেসবুকে লক্ষাধিক ফলোয়ার সমৃদ্ধ রক্ষণশীল বক্তারা সংঘবদ্ধভাবে সংস্কারপন্থী চিন্তাবিদদের চরিত্রহনন (Character Assassination) করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়, যা মধ্যযুগের "রৌরব নরকের ভয়" দেখানোর আধুনিক রূপ।

    গ. ক্ষমতার উৎস ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়

    উভয় যুগের রক্ষণশীলদের মূল ভয়টি আসলে আধ্যাত্মিক নয়, বরং জাগতিক। ব্রাহ্মণদের ভয় ছিল সাধারণ মানুষ সরাসরি বাংলায় রামায়ণ-মহাভারত পড়ে ফেললে পুরোহিতদের মধ্যস্থতা ও ধর্মীয় বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানের মুসলিম পণ্ডিত সমাজের একাংশও ভয় পায় যে, বর্তমান ছাত্রসমাজ আধুনিক দুনিয়ার বাস্তবতা, বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান-ব্যবস্থা, সময় ও যুগোপযোগী পরিশীলিত রাজনীতি এবং বিদ্যায়তনিক পদ্ধতিতে সবকিছু বুঝে ফেলে, সে মতো করে ইসলামি আইন (ফিকাহ) সাজায় ও শাস্ত্র বুঝতে শুরু করে, তবে অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতি ভেঙে পড়বে। মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন হলে এবং সাধারণ ছাত্ররা সেই পাঠগুলো পেলে, যেগুলো তাঁরা পাননি, তথাকথিত ধর্মীয় গুরুদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক একচেটিয়া কর্তৃত্ব খর্ব হবে—এই ভয়টিই তাদের সংস্কারের বিরুদ্ধে মারমুখী করে তোলে। আর এই মারমুখী মনোভাবকে জাস্টিফাই করতে বা টিকিয়ে রাখতে তারা তখন এমন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ভাষাগত দেয়াল তৈরি করেন, যা সাধারণ মানুষকে সবসময় হীনম্মন্যতায় ভুগিয়ে রাখে। কর্তৃত্ব রক্ষার এই প্রাচীন কৌশলের প্রথম ও প্রধান অস্ত্রটিই হলো, নিজেদের বুঝ-ধারণা, জ্ঞান ও ভাষার পবিত্রতার আড়ালে বিভাজন তৈরি করা। যার চমৎকার মিল পাওয়া যায় ইতিহাসের সেই আর্য ব্রাহ্মণদের মনস্তত্ত্বে। অথচ হাদীসে বলা হয়েছে, ইহুদি-নাসারা তথা অমুসলিমদের বিপরীত মনস্তত্ত্বের হতে। (সহিহ বুখারী: হাদিস নম্বর ৩৪৬২ ও ৫৮৫৯, সহিহ মুসলিম: হাদিস নম্বর ২১০৩)।

    ভাষাগত শুচিতাবাদ এবং ‘ম্লেচ্ছ’ তকমা

    আর্যদের এই ভাষা-বিদ্বেষের আরেকটি মারাত্মক দিক ছিল তাদের চরম ‘ভাষাগত শুচিতাবাদ’ (Linguistic Puritanism)। তারা সংস্কৃতকে বলত ‘দেবভাষা’ বা দেবতাদের নিজস্ব ভাষা, যা কেবল উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের মুখে উচ্চারিত হওয়ার অধিকার রাখে। অপরদিকে, বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের মুখের প্রাকৃত বা আদি-বাংলা রূপকে তারা বলত ‘ম্লেচ্ছভাষা’ বা পাপিষ্ঠ ও অপবিত্রদের ভাষা। আর্যদের তৈরি করা বিভিন্ন আইন ও স্মৃতিশাস্ত্রে এই বিধান দেওয়া হয়েছিল যে, কোনো উচ্চবর্ণের মানুষ যদি ভুল করেও কোনো ম্লেচ্ছ বা অনার্যের ভাষা শোনে, তবে তার কান অপবিত্র হয়ে যায় এবং তাকে তৎক্ষণাৎ গঙ্গাজল দিয়ে বা বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে কান পবিত্র করতে হবে (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫২)।

    এই চরম ভাষিক বর্ণবাদের কারণে বাংলার আদি ভূমিপুত্ররা তাদের নিজস্ব মাতৃভাষাকে এক ধরনের সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখতে বাধ্য হচ্ছিল। আর্যরা এই প্রচারণাকে এমন এক স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যে, রাজদরবারে বা কোনো সামাজিক বিচারসভায় প্রাকৃত ভাষায় কথা বলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। ড. নীহাররঞ্জন রায় দেখিয়েছেন কীভাবে আর্যীকরণের এই জোয়ারে বাংলার স্থানীয় লৌকিক ভাষাগুলোকে সমাজিক স্তরের একেবারে তলানিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে আদি-বাংলা ভাষাটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজকীয় রূপ পাওয়ার সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয় (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫৪)। এই ভাষাগত শুচিতাবাদ আসলে কোনো নির্দোষ ব্যাকরণগত নিয়ম ছিল না, তা ছিল বাংলার আদি বাসিন্দাদের ওপর আর্যদের সাংস্কৃতিক জেনোসাইড বা ভাষিক নিধনযজ্ঞের এক সুপরিকল্পিত নীলনকশা।

    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র শব্দতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: ফতোয়া ভাঙার গোপন প্রতিরোধ

    উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের এই কঠোর ‘রৌরব নরক’-এর ফতোয়া এবং ম্লেচ্ছ তকমার পরেও কীভাবে বাংলা ভাষাটি টিকে রইল, তার এক চমৎকার শব্দতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি দেখিয়েছেন যে, আর্যরা উপর থেকে যতই ফতোয়া আর শাস্তির ভয় দেখাক না কেন, বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের ঘরের ভেতরের কথ্য ভাষাকে তারা পুরোপুরি স্তব্ধ করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন হাট-বাজার, চাষাবাদ, মাছ ধরা এবং ঘরোয়া আড্ডায় আর্যদের দেবভাষা সংস্কৃতকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাদের নিজস্ব প্রাকৃত ও অনার্য শব্দভাণ্ডারই ব্যবহার করে গেছে (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৪২)।

    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র মতে, এই ফতোয়ার কারণেই বাংলার আদি সাহিত্যিক প্রচেষ্টাগুলো ঘরের কোণে বা গোপন সাধন-সঙ্গীতের (যেমন চর্যাপদ) ছদ্মবেশে লুকিয়ে করতে হতো। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আর্যদের এই তীব্র ভাষা-বিদ্বেষের ফলেই প্রাচীন বাংলায় কোনো উন্মুক্ত বা সাধারণ গণমুখী বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটতে পারেনি। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যদি আরও কয়েক শতাব্দী বাংলায় একচ্ছত্র সামাজিক ও ধর্মীয় স্বৈরাচার চালাতে পারত, তবে তাদের এই ‘রৌরব নরকের’ ফতোয়া ও আইনি নিপীড়নের চাপে বাংলা ভাষাটি হয়তো লোকমুখের উপভাষা হিসেবেই চিরতরে হারিয়ে যেত বা সংস্কৃতের পেটে লীন হয়ে যেত (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৪৫)। সাধারণ মানুষের এই অবদমিত ক্ষোভ এবং ভাষার ভেতরের এই বন্দিদশাই পরবর্তীতে বাংলায় এক বিশাল রাজনৈতিক ও ভাষিক বিপ্লবের বারুদ তৈরি করছিল, যা উচ্চবর্ণের আর্য-ব্রাহ্মণদের পায়ের তলার মাটি একনিমেষেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

    সেন আমলের চূড়ান্ত অন্ধকার ও প্রাকৃতের অবরুদ্ধ দশা

    একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা বহিরাগত সেন রাজবংশের (বল্লাল সেন, লক্ষণ সেন) আমলে বাংলা ভাষার ওপর এই অবরুদ্ধ দশা চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে অন্ধকার রূপ ধারণ করে। সেন শাসকেরা ছিলেন চরম মাত্রায় গোঁড়া স্মার্ত সনাতনপন্থী। তারা বাংলায় এসেই পাল আমলের সমস্ত উদার ও লৌকিক সংস্কৃতির দুয়ার বন্ধ করে দেন। রাজদরবারে কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’ বা ধোয়ীর ‘পবনদূত’-এর মতো উচ্চাঙ্গের সংস্কৃত কাব্যের বন্দনা চলত, যা ছিল সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার সম্পূর্ণ বাইরে। অপরদিকে, এই মাটির আমজনতার ভাষাকে রাজপ্রাসাদের সীমানায় প্রবেশ করাও ছিল কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৫)।

    ড. নীহাররঞ্জন রায় এই যুগের ভাষিক ও সামাজিক অন্ধকারকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়েছেন যে, সেন রাজারা কেবল জাত-পাতের কঠোর নিয়মই তৈরি করেননি, তারা জ্ঞানচর্চা ও ভাষার ক্ষেত্রেও এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা’ বা কার্ফিউ জারি করেছিলেন (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৭)। নিম্নবর্ণের অস্পৃশ্য ভূমিপুত্রদের মুখের আদি-বাংলা ভাষা তখন কেবল কুঁড়েঘরের ভেতরে, অত্যন্ত গোপনে বেঁচে ছিল। কোনো হিন্দু রাজা বা পণ্ডিত এই ভাষাকে একটুও রাজকীয় দয়া বা জ্ঞানগত কিংবা সাহিত্যিক স্বীকৃতি দেননি। এই অবরুদ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, আজ যারা বাংলা ভাষার একচ্ছত্র ঐতিহ্য দাবি করেন, তাদেরই আদর্শিক পূর্বপুরুষেরা একসময় এই ভাষার টুঁটি চেপে ধরে একে চিরতরে কবর দিতে চেয়েছিলেন। এই অন্ধকার থেকে মুক্তির কোনো পথই বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের সামনে খোলা ছিল না, যতদিন না এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক দিগন্তে এক সম্পূর্ণ নতুন শক্তির উদয় ঘটেছিল।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment