Table of Contents
![]() |
আধুনিক জিনতত্ত্ব, ১৮৭২ সালের আদমশুমারি এবং ঐতিহাসিক দলিলের আলোকে বাঙালি মুসলমানের জাতিগত পরিচয়ের প্রতীকী উপস্থাপনা |
৪:৪
Previous Part.......
উনিশ শতকের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কেন্দ্রিক ভাষাগত চক্রান্ত এবং পরবর্তীকালে বেঙ্গল রেনেসাঁসের প্রবক্তাদের তৈরি করা মূলধারার সাহিত্যের প্রধানতম এজেন্ডাই ছিল বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলমান জনসমষ্টিকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ‘অপরাধবোধ’ বা হীনমন্যতার শৃঙ্খলে আটকে রাখা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তৎকালীন উচ্চবর্ণের হিন্দু এলিট সমাজ তাদের প্রোপাগান্ডা বয়ানে অবিরত এই প্রচার চালিয়েছিল যে, বাংলার মুসলমানেরা হলো এই মাটির বাইরের এক ‘বিজাতীয় ম্লেচ্ছ’ বা ‘বহিরাগত যবন’। এই কৃত্রিম আভিজাত্যবাদী বয়ানের ওপর দাঁড়িয়েই তারা মূলত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির একচেটিয়া ঠিকাদারি কুক্ষিগত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এবং আধুনিক বিজ্ঞানের অকাট্য সিদ্ধান্ত উনিশ শতকের কলকাতার বাবুদের এই সুপরিকল্পিত জালিয়াতিকে সমূলে উপড়ে ফেলে এক বৈপ্লবিক সত্য উন্মোচন করেছে।
সত্যটি হলো—ধর্ম বা বিশ্বাস পরিবর্তন করলেই কোনো মানুষের ধমনীর রক্ত, হাড়-মাংস কিংবা বংশগত পরিচয় বদলে যায় না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বা উচ্চবর্ণের যে বয়ানটি বাঙালি মুসলমানকে 'ধর্মান্তরিত নিকৃষ্ট' বা 'বহিরাগত' বলে গালি দিতে চায়, তারা আসলে বিজ্ঞান ও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধ্রুব সত্যটিকে আড়াল করতে চায়। আধুনিক জিনবিজ্ঞান বা পপুলেশন জেনেটিক্স (Population Genetics) এই মনগড়া বয়ানকে চিরতরে কবর দিয়ে দিয়েছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী PNAS-এ প্রকাশিত ভারতীয় জিনতত্ত্ববিদদের এক ঐতিহাসিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাঙালি মুসলিম এবং বাঙালি হিন্দুদের ডিএনএ প্রোফাইল (DNA Profile) ও জিনগত কাঠামো মূলত এক এবং অভিন্ন। অর্থাৎ, ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও তারা একই প্রাচীন আদিম পূর্বপুরুষদের মিশ্রণ থেকে এসেছেন এবং তাদের বংশগত ধারা অবিচ্ছিন্ন। (রেফারেন্স: Basu, A., Sarkar-Roy, N., & Majumder, P. P. "Genomic reconstruction of the history of extant populations of India reveals five distinct ancestral components and a complex structure." Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS), 2016)। একইভাবে, ২০০৯ সালে বিশ্বখ্যাত Nature জার্নালে প্রকাশিত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং ভারতের 'সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি' (CCMB)-র বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাতেও প্রমাণিত হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের জাতি ও ধর্মের কৃত্রিম দেয়ালগুলোর আড়ালে মানুষের মূল জিনগত উৎস আসলে অভিন্ন। ধর্ম পরিবর্তনের ইতিহাস মাত্র কয়েকশ বছরের পুরোনো হওয়ায়, তা হাজার হাজার বছরের জিনগত কাঠামোকে বদলে দেয়নি। ( Reich, D., Thangaraj, K., Patterson, N., Price, A. L., & Singh, L. "Reconstructing Indian population history." Nature, 2009).
জিনগত এই বৈজ্ঞানিক ম্যাপিং (PCA Plot) স্পষ্ট করে দেয় যে, রক্তের গভীরতম স্তরে কোনো মধ্যপ্রাচ্যীয়, আরব বা তুর্কি জিনের মিশ্রণ সাধারণ বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে নেই বললেই চলে, যা সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ শতাংশের নিচে। তারা সুদূর আরবের মরুভূমি বা সেন্ট্রাল এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে হেঁটে এ দেশে আসেনি; তারা হাজার বছর ধরে এই পলি মাটিতে চাষাবাদ করা, নদী ভাঙা এই ভূমির আদি পুত্রদেরই সরাসরি রক্তজ সন্তান।
১৮৭২ সালের আদমশুমারি: কলকাতার বাবুদের চক্রান্তে প্রথম ব্রিটিশ চপেটাঘাত
কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ যখন নিজেদের সাহিত্যের কারখানায় বসে মুসলমানদের ‘সংস্কৃতিহীন যাযাবর’ হিসেবে দেদারসে প্রোপাগান্ডা করছিল, ঠিক তখনই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের নিজস্ব একটি পরিসংখ্যানগত দলিল তাদের তৈরি করা কাল্পনিক তাসের ঘরকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ আমলে বাংলার প্রথম অফিশিয়াল আদমশুমারি (The First Census of Bengal) অনুষ্ঠিত হয়। এই আদমশুমারির প্রধান কমিশনার এইচ. বেভারলি (H. Beverley) তাঁর চূড়ান্ত ও সরকারি প্রতিবেদনে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় এবং দালিলিকভাবে নথিবদ্ধ করে যান যে, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের বিশাল অংশ কোনোভাবেই কোনো বিদেশী আক্রমণকারী বা শাসকের বংশোদ্ভূত নয়; বরং তারা এই মাটিরই প্রাচীন ভূমিপুত্র ও আদিম জনগোষ্ঠীর অংশ। (Beverley, H. Report on the Census of Bengal, 1872, Calcutta: Bengal Secretariat Press, 1872)।
কমিশনার বেভারলি তাঁর রিপোর্টে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলমানদের শারীরিক গঠন, গায়ের রঙ, চোখের মণি, মাথার আকৃতি এবং তাদের দৈনন্দিন সামাজিক আচার-আচরণ হুবহু স্থানীয় অনার্য ভূমিপুত্র ও আদিবাসীদের মতন। তারা মূলত মাছ ধরা, কৃষিকাজ, তাঁত বোনা এবং কায়িক শ্রমের মতন উৎপাদনমুখী পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন—যা কোনো আরব, ইরানি বা তুর্কিদের আদি পেশা ছিল না। এই পেশাগুলো ছিল হাজার বছর ধরে বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের নিজস্ব ঐতিহ্য। মুসলমান হওয়ার পরেও তারা তাদের পূর্বপুরুষের পেশা এবং এই পলিমাটি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। ১৮৭২ সালের এই অফিশিয়াল সেন্সাস রেকর্ড এবং পরবর্তীকালে খন্দকার ফজলে রব্বী কর্তৃক ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত ঐতিহাসিক খণ্ডন দলিল The Origin of the Musalmans of Bengal যৌথভাবে এটি প্রমাণ করে যে, বাংলার ৯৮% মুসলমান এই মাটিরই খাঁটি সন্তান (Sons of the Soil), কোনো বিদেশী শাসক বা অভিজাত শ্রেণীর কৃত্রিম বংশধর নন।
আসল বহিরাগত কারা? আর্য-সেন আগ্রাসন বনাম আদিম ভূমিপুত্রের প্রতিরোধ
এই বৈজ্ঞানিক ও পরিসংখ্যানগত অকাট্য প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্কিমচন্দ্রদের তৈরি করা উগ্র বয়ানের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক কাউন্টার-আর্গুমেন্ট (Counter-Argument) বা প্রতি-যুক্তি খাড়া করা আজ সময়ের দাবি। যে উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থী সমাজ মুসলমানদের ‘বহিরাগত’ বলে গালি দিতে চায়, ইতিহাসের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালে দেখা যায় তারা নিজেরাই আসলে এই ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় বহিরাগত দখলদার। বাংলার প্রকৃত ও আদিম ইতিহাস বলে—আর্যরা এসেছিল উত্তর ভারত ও পারস্যের সীমান্ত থেকে, আর বৈদিক সংস্কৃতির ধারক সেন রাজারা এসেছিল সুদূর দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে। তারা ছিল এই পললভূমির আসল জবরদখলকারী সামরিক শক্তি, যারা ক্ষমতার জোরে বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের (যারা তখন বৌদ্ধ বা প্রকৃতির পূজারী ছিলেন) ‘ম্লেচ্ছ’ বা অস্পৃশ্য চণ্ডাল ঘোষণা করে নিজেদের ভূমিতেই ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল। বাঙালি মুসলমানদের শরীরে মূলত তিনটি আদিম উপাদানের মিশ্রণ রয়েছে—যার মধ্যে আদি-অস্ট্রালয়েড (Austroasiatic/Dravidian) তথা কোল, ভিল, সাঁওতাল, পোদ্দার, কৈবর্ত, রাজবংশী ও মুণ্ডা জাতির জিনগত উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট ও প্রবল। সুতরাং, নৃবিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের আলোয় এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী চরম নির্যাতনের শৃঙ্খল থেকে নিজেদের আত্মপরিচয় ও সামাজিক মুক্তি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই এই শোষিত আদি ভূমিপুত্ররা সুফি-পীরদের হাত ধরে এক মহিমান্বিত ‘সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিপ্লব’ হিসেবে ইসলামকে বেছে নিয়েছিল। তারা বিশ্বাস ও সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটিয়েছিল, কিন্তু তাদের হাড়, মাংস, রক্ত আর ধমনীর উত্তরাধিকার এই বাংলার আদিম মাটির নিজস্ব উপাদান। অতএব, বাঙালি মুসলমানেরা কোনো বহিরাগত বা প্রান্তিক কেউ নয়; বরং এই বদ্বীপের ভূমি, ভাষা এবং সংস্কৃতির ওপর তাদের অধিকার সম্পূর্ণ বংশগত, আদিবাসীত্বমূলক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে শতভাগ বুলেটপ্রুফ।

Post a Comment