Table of Contents
![]() |
| বাগদাদ, আন্দালুস ও মুসলিম পণ্ডিতদের জ্ঞানচর্চা ইউরোপীয় রেনেসাঁর বৌদ্ধিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল |
Previous Part.......
ইউরোপীয় Renaissance (রেনেসাঁ)-এর কথা উঠলেই সাধারণত আমাদের চোখে যে ছবি ভেসে ওঠে, সেটি ইতালির ছবি। ফ্লোরেন্সের গির্জা, ভেনিসের বাণিজ্য, রোমের শিল্প, Leonardo, Michelangelo, humanism (মানববাদ), printing press (মুদ্রণযন্ত্র), classical revival (প্রাচীন জ্ঞানের পুনর্জাগরণ), মানুষ ও প্রকৃতিকে নতুন চোখে দেখার সাহস। এই ছবির ভেতরে আলো আছে, সৌন্দর্য আছে, সত্যও আছে। কিন্তু ছবিটি সম্পূর্ণ নয়। এর পেছনে আরেক দীর্ঘ রাস্তা আছে, যেটি অনেক সময় ইতিহাসের বইয়ে ছোট করে লেখা হয়, কখনো ফুটনোটে চলে যায়, কখনো একেবারে আড়াল হয়ে থাকে। সেই রাস্তা বাগদাদের অনুবাদ-কক্ষ থেকে শুরু হয়ে আন্দালুসের শহর, টলেডোর অনুবাদক, সিসিলির বহুভাষিক দরবার, সালার্নোর চিকিৎসাপাঠ, প্যারিস ও বলোনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
ইউরোপ জেগেছিল, কিন্তু শূন্যে জেগে ওঠেনি। Renaissance (রেনেসাঁ)-এর বৌদ্ধিক শরীরে মুসলিম-আরবি জ্ঞানের রক্ত বহু আগেই প্রবাহিত হয়েছিল। চিকিৎসায় ইবনে সিনা। দর্শনে ইবনে রুশদ। সংখ্যার ভাষায় আল-খাওয়ারিজমি। আলোকবিদ্যায় ইবন আল-হাইসাম। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আরবি সারণি ও মডেল। শল্যবিদ্যায় আল-জাহরাবি। চিকিৎসা-সংকলনে আল-রাজি। Aristotle (এরিস্টটল)-এর পুনর্পাঠে আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ। আর এসব ইউরোপে ঢুকেছে কল্পনার দরজা দিয়ে নয়, বাস্তব শহর, বাস্তব অনুবাদক, বাস্তব পাণ্ডুলিপি, বাস্তব বিশ্ববিদ্যালয়, বাস্তব পাঠ্যক্রমের ভেতর দিয়ে।
এই ঋণকে বোঝার জন্য স্লোগান দরকার নেই। দরকার পথের মানচিত্র। কোন জ্ঞান কোথা থেকে এলো। কোন ভাষায় রূপ নিল। কোন শহরে অনুবাদ হলো। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হলো। কোন শাস্ত্রে ঢুকে নতুন প্রশ্ন তুলল। কোন গ্রন্থ শতাব্দীর পর শতাব্দী পাঠ্য রইল। Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ইতিহাসে মুসলিম অবদান কোনো রোমান্টিক দাবি নয়। এটি চিকিৎসা-পাঠ্য, জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি, দর্শন-ব্যাখ্যা, গণিত-পদ্ধতি, optics (আলোকবিদ্যা)-এর গ্রন্থ, অনুবাদ-তালিকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ী বিতর্কের ইতিহাস।
এখানে “কপি” শব্দ ব্যবহার করলে ইতিহাসের সূক্ষ্মতা হারায়। কপি মানে হুবহু নকল। ইউরোপ হুবহু মুসলিম সভ্যতা নকল করেনি। সে নিয়েছে, অনুবাদ করেছে, নিজের খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের সামনে বসিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছে, কোথাও গ্রহণ করেছে, কোথাও ভেঙেছে, কোথাও নিষেধ করেছে, কোথাও নতুন করে বানিয়েছে। কিন্তু তার আগে নেওয়ার মতো জ্ঞান ছিল কোথায়? বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো, কুরতুবা, টলেডো, সিসিলি, সালার্নো—এই আরবি-ইসলামী ও ভূমধ্যসাগরীয় জ্ঞানভূমি ছাড়া ইউরোপীয় বৌদ্ধিক জাগরণের ভিত এত দ্রুত, এত প্রশস্ত, এত গভীর হতো না। Renaissance (রেনেসাঁ)-এর আলো বুঝতে হলে এই মুসলিম আলো-পরম্পরা আড়াল করা যায় না।
বাগদাদে জ্ঞানের রূপান্তর
বাগদাদে যে কাজটি হলো, সেটিকে শুধু preservation (সংরক্ষণ) বললে অন্যায় হয়। সংরক্ষণ ছিল, কিন্তু সংরক্ষণ ছিল শুরু। তার পর ছিল translation (অনুবাদ), correction (সংশোধন), commentary (ব্যাখ্যা), calculation (গণনা), classification (শ্রেণিবিন্যাস), observation (পর্যবেক্ষণ), application (প্রয়োগ), এবং theological testing (ধর্মতাত্ত্বিক পরীক্ষা)। গ্রিক জ্ঞান মুসলিমদের হাতে এসে আলমারিতে রাখা পুরোনো সম্পদ থাকেনি। তা নড়েছে, প্রশ্ন তুলেছে, উত্তর পেয়েছে, কোথাও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কোথাও নতুন শাস্ত্রের ভাষা দিয়েছে।
Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ)-এর নাম এলে শুধু গ্রন্থাগারের ছবি মাথায় আনা সহজ। কিন্তু গ্রন্থাগার একা সভ্যতা বানায় না। বই থাকে, কেউ পড়ে না। পাণ্ডুলিপি থাকে, কেউ তুলনা করে না। ভাষা থাকে, কিন্তু পরিভাষা তৈরি হয় না। জ্ঞান থাকে, কিন্তু ব্যবহার নেই। বাগদাদে এই মৃত অবস্থা হয়নি। সেখানে গ্রন্থের চারপাশে মানুষ ছিল। অনুবাদক ছিল। চিকিৎসক ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিল। গণিতবিদ ছিল। দার্শনিক ছিল। কালামবিদ ছিল। পৃষ্ঠপোষক ছিল। দরবার ছিল। সামাজিক মর্যাদা ছিল। জ্ঞানের বাজার ছিল।
Dimitri Gutas আব্বাসীয় অনুবাদ আন্দোলনকে নিছক গ্রিক জ্ঞানপ্রেমের গল্প বানান না। তাঁর আলোচনায় অনুবাদের পেছনে দাঁড়ায় পৃষ্ঠপোষকতা, দরবারি প্রয়োজন, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রশাসনিক ব্যবহার, পণ্ডিতসমাজের প্রতিযোগিতা এবং সাম্রাজ্যিক মর্যাদার প্রশ্ন। Gutas, Greek Thought, Arabic Culture, pp. 121–141, 153–157. এই দৃষ্টিটি কাজে লাগে, কারণ সভ্যতা জ্ঞানে বিনিয়োগ করে তখনই, যখন জ্ঞানকে প্রয়োজন মনে করে। জ্ঞান শুধু ভালোবাসলে হয় না। তাকে ভাষা দিতে হয়, অর্থ দিতে হয়, মানুষ দিতে হয়, প্রতিষ্ঠান দিতে হয়।
Greek to Syriac to Arabic (গ্রিক থেকে সিরিয়াক হয়ে আরবি)-এর যে পথ, তা ছিল বহুস্তরীয়। সিরিয়াক খ্রিস্টান পণ্ডিতরা গ্রিক চিকিৎসা, দর্শন, যুক্তি, ধর্মতত্ত্বের পুরোনো ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুসলিম শাসনের ভেতরে এসে তাঁদের ভাষাজ্ঞান নতুন কাজ পেল। হুনাইন ইবনে ইসহাক এর সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ। তিনি Galen (জালিনুস)-এর চিকিৎসাগ্রন্থ নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁর কাজ শুধু ভাষা বদল নয়। পাণ্ডুলিপি খোঁজা, দুর্বল পাঠ চিহ্নিত করা, গ্রিক মূলের সঙ্গে সিরিয়াক ও আরবি পাঠ তুলনা করা, চিকিৎসাগত অর্থ ঠিক রাখা—এসব ছিল তাঁর অনুবাদ-শৃঙ্খলার অংশ। আরবি চিকিৎসা যদি পরে ল্যাটিন ইউরোপে গিয়ে বড় প্রভাব ফেলে, তার পেছনে হুনাইনের এই নিখুঁত পাঠশ্রম আছে।
আল-কিন্দি গ্রিক philosophy (দর্শন)-কে আরবি-ইসলামী চিন্তার ঘরে এনেছেন। কিন্তু তিনি গ্রিক দর্শনের অনুগত কর্মচারী নন। তিনি আরবি ভাষায় philosophy (দর্শন)-এর প্রথম বড় মুসলিম নির্মাতা। তাঁর কাছে দর্শন সত্যের অনুসন্ধান, কিন্তু নবুওয়াত সত্যের উচ্চতর উৎস। Peter Adamson আল-কিন্দির প্রসঙ্গে দেখিয়েছেন, তিনি Greek philosophy (গ্রিক দর্শন)-কে গ্রহণ করলেও prophecy (নবুওয়াত) ও philosophical knowledge (দার্শনিক জ্ঞান)-এর ভিন্ন মর্যাদা ধরেছেন। Adamson, “Al-Kindī and the Reception of Greek Philosophy,” in The Cambridge Companion to Arabic Philosophy, pp. 32–51. এখানে ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আরবি দর্শন শুধু Aristotle (এরিস্টটল)-এর অনুবাদ নয়। তা ঈশ্বর, জগত, আত্মা, জ্ঞান, কারণত্ব, নবুওয়াত—এসব প্রশ্নে ইসলামী বৌদ্ধিক পরিসরের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। পরে ল্যাটিন ইউরোপে যখন এই গ্রন্থপ্রবাহ ঢোকে, তা খালি গ্রিক নয়, আরবি-ইসলামীভাবে পরীক্ষিত দর্শন।
আল-খাওয়ারিজমি সংখ্যাকে পদ্ধতিতে নামালেন। তাঁর al-Jabr wa-l-Muqabala শুধু abstract algebra (বিমূর্ত বীজগণিত) নয়। উত্তরাধিকার, বাণিজ্য, জমির মাপ, হিসাব—এসব বাস্তব জীবনের সমস্যা নিয়ে সে কাজ করে। অজানা রাশি, সমীকরণ, পুনরুদ্ধার, ভারসাম্য—এসবকে গণনার ভাষায় আনে। তাঁর Indian numerals (ভারতীয় সংখ্যা)-সংক্রান্ত কাজও পরবর্তী ল্যাটিন জগতে algorism (গণনাপদ্ধতি)-এর পথ খুলে দেয়। Carl Boyer আল-খাওয়ারিজমির al-Jabr-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, algebra (বীজগণিত)-এর ইতিহাসে তাঁকে কেন্দ্রীয় স্থানে রাখা যথার্থ। Boyer, A History of Mathematics, pp. 228–229, 252.
বানু মুসা দেখালেন, জ্ঞান হাতেও নামতে পারে। geometry (জ্যামিতি), mechanics (যন্ত্রবিদ্যা), pressure (চাপ), valves (ভালভ), fountains (ফোয়ারা), automatic control (স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ)—এসব শুধু বিনোদনের যন্ত্র নয়। এগুলো প্রকৃতি, মাপ, জলচাপ, কৌশল, গতি ও নিয়ন্ত্রণের বোধকে যান্ত্রিক রূপ দেয়। Donald Hill তাঁদের Book of Ingenious Devices (যন্ত্রকৌশলের বই)-এর অনুবাদে দেখিয়েছেন, এই কাজগুলোতে প্রযুক্তিগত কল্পনা ও বাস্তব প্রকৌশলচিন্তা একসঙ্গে আছে। Donald R. Hill, The Book of Ingenious Devices, Introduction and device analyses.
সাবিত ইবনে কুররা আরেক ধারা। হাররানের সাবিয়ান পটভূমি থেকে বাগদাদে এসে তিনি গ্রিক গণিত, Euclid (ইউক্লিড), Archimedes (আর্কিমিডিস), Apollonius (অ্যাপোলোনিয়াস), Ptolemy (টলেমি)-এর জগৎ আরবি আলোচনায় আনেন। তিনি অনুবাদ করেন, সংশোধন করেন, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে কাজ করেন, statics (স্থিতিবিদ্যা) ও mechanics (যন্ত্রবিদ্যা)-এ আলোচনা করেন। Mohammed Abattouy আরবি mechanics (যন্ত্রবিদ্যা)-এর প্রেক্ষাপটে সাবিতকে গ্রিক যন্ত্রবিদ্যার আরবি রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করে পড়েছেন। Abattouy, “Greek Mechanics in Arabic Context,” Science in Context, 14.1–2, 2001, pp. 179–247.
ইবন আল-হাইসাম optics (আলোকবিদ্যা)-কে চোখ, আলো ও জ্যামিতির কঠোর শাস্ত্রে রূপ দিলেন। তাঁর আগে দৃষ্টি নিয়ে গ্রিকদের মধ্যে নানা মত ছিল। চোখ থেকে আলো বের হয়, না বাইরে থেকে আলো এসে চোখে পড়ে—এই প্রশ্ন শুধু তাত্ত্বিক ছিল না। দৃষ্টি কীভাবে হয়, আলো কীভাবে চলে, প্রতিফলন ও প্রতিসরণ কীভাবে কাজ করে—এসবের সঙ্গে জ্যামিতি, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা যুক্ত হলো। Lindberg দেখিয়েছেন, ইবন আল-হাইসামের optical theory (আলোকতত্ত্ব) ল্যাটিন পশ্চিমে Roger Bacon, Witelo, John Pecham-দের আলোচনায় গভীরভাবে প্রবেশ করে। Lindberg, Theories of Vision from Al-Kindi to Kepler, pp. 58–86, 104–125.
ইবনে সিনা চিকিৎসাকে এক বিশ্বকোষীয় দেহ দিলেন। তাঁর Canon of Medicine শুধু চিকিৎসা-গ্রন্থ নয়। রোগতত্ত্ব, শরীরতত্ত্ব, ওষুধ, diagnosis (রোগনির্ণয়), regimen (জীবনযাপন-পদ্ধতি), চিকিৎসা-পদ্ধতি—সব একত্রে। পরে ল্যাটিন ইউরোপে এই গ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয়ী চিকিৎসাশিক্ষার অংশ হয়ে বহু শতাব্দী বেঁচে থাকে। Nancy Siraisi Renaissance Italy-তে Avicenna (ইবনে সিনা)-র চিকিৎসাগত প্রভাব নিয়ে দেখিয়েছেন, ইবনে সিনা কেবল মধ্যযুগীয় স্মৃতি নন; Renaissance (রেনেসাঁ)-এর চিকিৎসা-পাঠেও তাঁর উপস্থিতি গভীর। Siraisi, Avicenna in Renaissance Italy, relevant chapters; Siraisi, Medieval and Early Renaissance Medicine, pp. 43–80, 97–130.
এইসব একত্রে ধরলে বোঝা যায়, ইউরোপ যে জ্ঞান পরে ল্যাটিনে পেল, তা শুধু গ্রিকদের পুনরুদ্ধার নয়। গ্রিক ছিল, কিন্তু আরবি ভাষায় সে বদলেছে। ভারতীয় সংখ্যা ছিল, কিন্তু আল-খাওয়ারিজমির হাতে পদ্ধতি পেয়েছে। গ্যালেন ছিল, কিন্তু হুনাইন ও আরবি চিকিৎসকদের হাতে নতুন পাঠ পেয়েছে। Aristotle ছিল, কিন্তু আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদের হাতে অন্য বৌদ্ধিক ঘনত্ব পেয়েছে। Ptolemy ছিল, কিন্তু আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি, পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনের মধ্যে নতুন জীবন পেয়েছে।
George Saliba এই কারণেই Islamic science (ইসলামী বিজ্ঞান)-কে কেবল Greek preservation (গ্রিক জ্ঞান সংরক্ষণ)-এর গল্প হিসেবে পড়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তাঁর আলোচনায় আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞান, মডেল-সমালোচনা, পাণ্ডুলিপি-প্রবাহ এবং European Renaissance (ইউরোপীয় রেনেসাঁ)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নতুন আলো পায়। Saliba, Islamic Science and the Making of the European Renaissance, pp. 3–27, 193–232.
আন্দালুস, টলেডো, সিসিলি ও সালার্নোর দরজা
বাগদাদ ছিল উৎসের এক বড় কেন্দ্র। কিন্তু জ্ঞান এক জায়গায় থামে না। সাম্রাজ্যের সীমানা, বাণিজ্যপথ, পাণ্ডুলিপির ভ্রমণ, পণ্ডিতের যাত্রা, যুদ্ধ, দখল, দরবারি পৃষ্ঠপোষকতা, চিকিৎসার প্রয়োজন—এসবের ভেতর দিয়ে জ্ঞান পশ্চিমের দিকে গিয়েছে। আন্দালুস এই যাত্রায় শুধু সেতু নয়। সে নিজেই জ্ঞানভূমি।
কুরতুবা ছিল রাজনৈতিক রাজধানীর চেয়েও বেশি কিছু। সেখানে ছিল গ্রন্থসংগ্রহ, চিকিৎসা, ফিকহ, সাহিত্য, ভাষা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান। আল-জাহরাবি surgery (শল্যচিকিৎসা)-কে গ্রন্থ, যন্ত্র ও পদ্ধতিতে সাজান। ইবনে হাজম ফিকহ, ভাষা ও ধর্মতত্ত্বে তীক্ষ্ণ চিন্তা গড়ে তোলেন। ইবনে বাজ্জা, ইবনে তুফাইল, ইবনে রুশদ দর্শনের আন্দালুসীয় রেখা টানেন। আল-জারকালি আকাশের মাপ, সারণি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী যন্ত্রে কাজ করেন। আন্দালুসে পূর্বের জ্ঞান এসে কেবল পাণ্ডুলিপি হয়ে বসে থাকেনি। তা স্থানীয় প্রশ্নে ঢুকেছে।
টলেডোর কথা আলাদা করে বলতে হয়। ১০৮৫ সালে টলেডো খ্রিস্টান শাসনের অধীনে যায়। কিন্তু শহরটির আরবি স্মৃতি সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায় না। আরবি বই থাকে। Mozarab (আরবিভাষী খ্রিস্টান) থাকে। Jewish scholars (ইহুদি পণ্ডিত) থাকে। স্থানীয় Romance language (রোমান্স ভাষা)-এর ভাষাভাষী মানুষ থাকে। Latin clerics (ল্যাটিন ধর্মযাজক) ও পণ্ডিতদের সামনে হঠাৎ এমন এক গ্রন্থভাণ্ডার খুলে যায়, যার সামনে দাঁড়িয়ে তারা বুঝতে পারে, তাদের দরকার আছে। চিকিৎসা দরকার। জ্যোতির্বিজ্ঞান দরকার। Aristotle দরকার। Ptolemy দরকার। গণিত দরকার। দর্শন দরকার।
Charles Burnett টলেডোর Arabic-Latin translation (আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ)-পরিবেশকে একটি coherence (সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মধারা)-এর ভেতর পড়েছেন। তাঁর মতে, ১২শ শতকের টলেডোতে অনুবাদ এলোমেলো ছিল না। Gerard of Cremona ও Dominicus Gundissalinus ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানক্ষেত্রে কাজ করেন। চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, natural philosophy (প্রাকৃতিক দর্শন), metaphysics (অধিবিদ্যা), psychology (মনস্তত্ত্ব)—এসব ল্যাটিনে প্রবেশের পেছনে এক ধরনের জ্ঞান-ক্ষুধা ও পাণ্ডিত্যিক প্রয়োজন কাজ করে। Burnett, “The Coherence of the Arabic-Latin Translation Program in Toledo in the Twelfth Century,” Science in Context, 14.1–2, 2001, pp. 249–288.
“Toledo School of Translators” কথাটি জনপ্রিয়। কিন্তু এটি আধুনিক school (বিদ্যালয়)-এর মতো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছিল না। এখানে ছিল multilingual translation environment (বহুভাষিক অনুবাদ-পরিবেশ)। কেউ আরবি পড়ত। কেউ রোমান্স ভাষায় ব্যাখ্যা করত। কেউ ল্যাটিনে লিখত। অনেক সময় Arabic to Romance to Latin (আরবি থেকে রোমান্স হয়ে ল্যাটিন) পদ্ধতি কাজ করত। অনুবাদ ছিল একধরনের সামাজিক শ্রম। একা কোনো genius (প্রতিভা)-এর মাথা থেকে সব বের হয়নি। বই, ভাষা, পৃষ্ঠপোষকতা, কেরানি, পাঠক, প্রয়োজন—সব মিলেছে।
Gerard of Cremona এই ইতিহাসের এক বড় নাম। তিনি Ptolemy (টলেমি)-এর Almagest খুঁজতে টলেডোতে আসেন। ল্যাটিন জগতে তখন এই গ্রন্থের ঘাটতি। টলেডোতে এসে তিনি শুধু Almagest নয়, চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, natural philosophy (প্রাকৃতিক দর্শন)-এর বিপুল গ্রন্থ অনুবাদ করেন। Burnett Gerard-এর অনুবাদ-তালিকায় যে শাস্ত্রীয় বিস্তার দেখিয়েছেন, তা প্রমাণ করে ল্যাটিন ইউরোপ সচেতনভাবে আরবি জ্ঞানের ভাণ্ডারে হাত দিচ্ছিল। Burnett, pp. 255–269.
Dominicus Gundissalinus-এর ভূমিকা বিশেষভাবে দর্শন, metaphysics (অধিবিদ্যা), psychology (মনস্তত্ত্ব)-এর দিকে। আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, আল-গাজালি-সংলগ্ন ধারণাগুলো ল্যাটিনে প্রবেশ করে। Burnett Gerard ও Gundissalinus-এর অনুবাদক্ষেত্র আলাদা করে দেখান। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা দেখায় টলেডোতে অনুবাদ শুধু “যা পাওয়া যায়” তার অনুবাদ নয়। চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন—প্রতিটি শাস্ত্র আলাদা চাহিদা তৈরি করছে। Burnett, pp. 269–288.
টলেডো একমাত্র দরজা ছিল না। সিসিলিও ছিল শক্তিশালী দরজা। Sicily (সিসিলি) ছিল গ্রিক, আরবি ও ল্যাটিন জগতের সংযোগস্থল। মুসলিম শাসনের স্মৃতি, Norman court (নর্মান দরবার), গ্রিক ভাষিক ঐতিহ্য, আরবি প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার—সব মিলিয়ে সেখানে multilingual court culture (বহুভাষিক দরবারি সংস্কৃতি) তৈরি হয়েছিল। Haskins and Lockwood সিসিলীয় অনুবাদকদের আলোচনায় দেখিয়েছেন, দক্ষিণ ইউরোপে গ্রিক ও আরবি জ্ঞান ল্যাটিনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সিসিলির দরবারি-বহুভাষিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। Haskins and Lockwood, “The Sicilian Translators of the Twelfth Century and the First Latin Version of Ptolemy’s Almagest,” pp. 75–78.
Salerno (সালার্নো)-র চিকিৎসা-পরিসরও এই মানচিত্রে দরকারি। Constantinus Africanus উত্তর আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ ইতালিতে আরবি চিকিৎসাজ্ঞান নিয়ে আসেন। সালার্নোর চিকিৎসাপাঠে আরবি চিকিৎসা প্রবেশ করে। চিকিৎসা এমন শাস্ত্র, যা দ্রুত সীমান্ত পেরোয়। শরীরের ব্যথা ভাষা জিজ্ঞেস করে না। এক সভ্যতার চিকিৎসা অন্য সভ্যতার দরজায় ঠকঠক করে খুব দ্রুত ঢুকে পড়ে, যদি তা কাজের প্রমাণ দেয়।
এই চার দরজা—আন্দালুস, টলেডো, সিসিলি, সালার্নো—দেখায়, মুসলিম জ্ঞান ইউরোপে এক পথে যায়নি। নানা রাস্তায় গেছে। কেউ বই নিয়ে গেছে। কেউ বই খুঁজতে এসেছে। কেউ অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য গ্রন্থ অনুবাদ করেছে। কেউ আকাশের হিসাবের জন্য সারণি নিয়েছে। কেউ Aristotle বুঝতে ইবনে রুশদের পাশে বসেছে। কেউ চিকিৎসা শেখার জন্য ইবনে সিনা খুলেছে।
চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আলোকবিদ্যা ও দর্শনের ইউরোপযাত্রা
চিকিৎসা দিয়ে শুরু করা উচিত। কারণ চিকিৎসা ছিল আরবি জ্ঞানের সবচেয়ে স্থায়ী ইউরোপীয় প্রবাহগুলোর একটি। ইবনে সিনার Canon of Medicine ল্যাটিনে Canon হয়ে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। বহু শতাব্দী ধরে তা চিকিৎসাপাঠের কেন্দ্রে থাকে। শুধু নাম নয়, কার্যকর পাঠ্য। আল-রাজির al-Hawi ল্যাটিনে Continens নামে পরিচিত হয়। আল-মাজুসির চিকিৎসাগ্রন্থও ব্যবহৃত হয়। আল-জাহরাবির surgery (শল্যচিকিৎসা) ইউরোপীয় শল্যবিদ্যায় যন্ত্র, কৌশল, রোগ-চিকিৎসা ও অপারেশনের ভাষা দেয়।
Nancy Siraisi, medieval and Renaissance medicine (মধ্যযুগীয় ও রেনেসাঁ চিকিৎসা)-এর আলোচনায় দেখিয়েছেন, university medicine (বিশ্ববিদ্যালয়ী চিকিৎসা)-এর ভেতরে Galenism (জালিনুসীয় চিকিৎসা), Avicenna (ইবনে সিনা), আরবি চিকিৎসা-সংকলন, মন্তব্য ও পাঠ দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছে। Siraisi, Medieval and Early Renaissance Medicine, pp. 43–80, 97–130. তাঁর Avicenna in Renaissance Italy আরও স্পষ্ট করে দেখায়, Renaissance Italy (রেনেসাঁ ইতালি)-তেও ইবনে সিনা কেবল অতীতের নাম নন; তিনি পাঠ্য, বিতর্ক, ব্যাখ্যা, সমালোচনা ও চিকিৎসাশিক্ষার অংশ।
ইবনে সিনার প্রভাব বোঝার জন্য একটি কথা মনে রাখা দরকার। চিকিৎসা-গ্রন্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে থাকে শুধু নামের জোরে নয়। ছাত্র পড়ে, শিক্ষক ব্যাখ্যা করে, চিকিৎসক ব্যবহার করে, সমালোচক মন্তব্য করে, নতুন সংস্করণ বের হয়। Canon এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে গেছে। এটি ইউরোপীয় চিকিৎসা-শিক্ষার মজ্জায় ঢুকেছিল। ইউরোপের শরীর-সংক্রান্ত জ্ঞান, রোগ, ওষুধ, খাদ্য, জীবনযাপন, diagnosis (রোগনির্ণয়)—এসব আলোচনায় আরবি চিকিৎসা উপস্থিত ছিল।
Burnett, Gerard of Cremona-র অনুবাদ-তালিকায় চিকিৎসাগ্রন্থের গুরুত্ব দেখিয়েছেন। Galen থেকে আরবি চিকিৎসা-সংকলন পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রন্থ ল্যাটিনে আনার মধ্যে ছিল চিকিৎসা-জ্ঞান পূরণের কাজ। Burnett, pp. 265–269. এটি শুধু টলেডোর অনুবাদ ইতিহাস নয়। ইউরোপীয় চিকিৎসা ইতিহাসেরও অংশ।
গণিতের পথ তুলনামূলকভাবে নীরব, কিন্তু তার ফল গভীর। আল-খাওয়ারিজমির নাম থেকে algorithm (অ্যালগরিদম)-এর ঐতিহাসিক সূত্র তৈরি হয়। তাঁর Indian numerals (ভারতীয় সংখ্যা)-সংক্রান্ত কাজ Latin algorism (ল্যাটিন গণনাপদ্ধতি)-এর পথ খুলে দেয়। Hindu-Arabic numerals (হিন্দু-আরবি সংখ্যা) ও decimal place-value system (দশমিক স্থানিক সংখ্যা-পদ্ধতি) ইউরোপীয় হিসাবের দুনিয়ায় বিপ্লবী সম্ভাবনা তৈরি করে। Roman numerals (রোমান সংখ্যা)-এর ভারী কাঠামোয় বড় হিসাব কঠিন ছিল। নতুন সংখ্যা-পদ্ধতি বাণিজ্য, ব্যাংকিং, মুদ্রা, সুদ, লাভক্ষতি, অংশীদারি, মাপজোক—সবকিছুকে সহজ করার ভাষা দেয়।
Fibonacci (ফিবোনাচ্চি)-র Liber Abaci ১২০২ সালে এই সংখ্যার ব্যবহারিক শক্তি দেখায়। ফিবোনাচ্চি উত্তর আফ্রিকায় গণনা শিখেছিলেন। তাঁর বইতে বাণিজ্যিক উদাহরণ, মুদ্রা-বিনিময়, অংশীদারি, লাভক্ষতি—এসবের মাধ্যমে নতুন সংখ্যার ক্ষমতা ইউরোপীয় বণিকসমাজের সামনে আসে। Renaissance (রেনেসাঁ)-এর শহরগুলোর অর্থনীতি, বাণিজ্য, হিসাব, ব্যাংকিং—এসবের পেছনে সংখ্যা-পদ্ধতির বদল ছোট ঘটনা নয়। শিল্পী, বণিক, স্থপতি, ব্যাংকার, নাবিক—সবাই মাপ, হিসাব, অনুপাত, সময়, দূরত্ব, অর্থের ওপর দাঁড়ায়।
Algebra (বীজগণিত)-এর ক্ষেত্রেও আল-খাওয়ারিজমির ঋণ গভীর। al-Jabr wa-l-Muqabala অজানা রাশি নিয়ে কাজ করার ভাষা দেয়। সমীকরণকে ভারসাম্যে আনে। উত্তরাধিকার, জমি, বাণিজ্য, মাপ—এসব বাস্তব সমস্যাকে গণিতের কাঠামোয় আনে। Boyer আল-খাওয়ারিজমির algebra (বীজগণিত)-কে মৌলিক ঐতিহাসিক পর্যায়ে স্থাপন করেছেন। Boyer, A History of Mathematics, pp. 228–229, 252. ইউরোপীয় গণিত পরে অনেক দূর যাবে। কিন্তু যে অজানা রাশির ভাষা, যে হিসাবের পদ্ধতি, যে স্থানিক সংখ্যার শক্তি তার পথ খুলেছে, তার পেছনে মুসলিম গণিত স্পষ্টভাবে বসে আছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল আরেক বিশাল ক্ষেত্র। এখানে পাণ্ডিত্য ও ব্যবহার একত্রে কাজ করে। ক্যালেন্ডার, ধর্মীয় তারিখ, পঞ্জিকা, গ্রহের অবস্থান, নৌযাত্রা, জ্যোতিষচর্চা—সব জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাগদাদে আল-খাওয়ারিজমির জিজ আল-সিন্ধ (এতে ৩৭টি অধ্যায় এবং ১শ ১৬টি গাণিতিক সারণি রয়েছে। এর মাধ্যমে সূর্য, চন্দ্র এবং পাঁচটি গ্রহের গতিবিধি নির্ণয় করা হতো ), আল-বাত্তানি, সাবিত ইবনে কুররা, পরে আন্দালুসে আল-জারকালি, Toledan Tables (টলেডো সারণি), Alfonsine Tables (আলফনসাইন সারণি)—এই ধারাগুলো ইউরোপীয় astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান)-কে প্রভাবিত করেছে।
টলেডো সারণি শুধু আকাশের সংখ্যা নয়। এটি টলেডোর জ্ঞানপরিবেশের প্রতীক। Arabic astronomical tables (আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি) ল্যাটিনে গেলে তা শিক্ষিত ইউরোপের হাতে ব্যবহারযোগ্য আকাশমাপ দেয়। Burnett টলেডোতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি ও আল-জারকালির কাজের ল্যাটিন প্রবাহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। Burnett, pp. 250–253. Saliba, Islamic astronomy (ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞান)-এর গাণিতিক মডেল, পাণ্ডুলিপি-প্রবাহ, এবং Copernican astronomy (কোপার্নিকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক গবেষণা করেন। Saliba, pp. 193–232.
কোপার্নিকাসের প্রশ্নে ভাষা সাবধানে রাখতে হয়। সরল দাবি করলে গবেষণা দুর্বল হয়। কিন্তু আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ঐতিহ্যকে ইউরোপীয় astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান)-এর বাইরে রেখে Copernican revolution (কোপার্নিকীয় বিপ্লব) বোঝাও অন্ধতা। প্রশ্ন হলো, কোন model (মডেল), কোন mathematical device (গাণিতিক উপায়), কোন পাণ্ডুলিপি, কোন পর্যবেক্ষণ, কোন সূত্র, কোন শিক্ষাপথ দিয়ে প্রভাব গেছে। Saliba এই প্রশ্নগুলোকে স্লোগানের বাইরে এনে পাণ্ডুলিপি ও গাণিতিক মডেলের ভেতরে পড়তে বলেন।
Optics (আলোকবিদ্যা)-এর ইতিহাসে ইবন আল-হাইসামকে বাদ দিলে ইউরোপীয় দৃষ্টিতত্ত্বের শরীর ছিদ্র হয়ে যায়। তাঁর Kitab al-Manazir ল্যাটিনে De aspectibus বা Perspectiva নামে প্রবেশ করে। আলো চোখ থেকে বের হয়, না বাইরে থেকে চোখে আসে—এই প্রশ্নকে তিনি নতুনভাবে সাজান। দৃষ্টি, চোখ, আলো, প্রতিফলন, প্রতিসরণ, জ্যামিতি, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা—এসব একত্রে কাজ করে। তাঁর পদ্ধতি পরবর্তী ল্যাটিন optical tradition (আলোকবিদ্যাগত ঐতিহ্য)-কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
Lindberg দেখিয়েছেন, Roger Bacon, Witelo, John Pecham-এর মতো ল্যাটিন চিন্তকদের optics (আলোকবিদ্যা)-চর্চায় ইবন আল-হাইসামের প্রভাব প্রবল। Lindberg, Theories of Vision from Al-Kindi to Kepler, pp. 58–86, 104–125. Renaissance (রেনেসাঁ)-এর visual culture (দৃষ্টিসংস্কৃতি), perspective (দৃষ্টিকোণ), চিত্রকলার জ্যামিতি, চোখের বিজ্ঞান—এসবের দীর্ঘ পটভূমিতে আরবি আলোকবিদ্যা বসে আছে। Renaissance-এর শিল্পী আলো ও দৃষ্টিকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু আলো ও দৃষ্টির জ্যামিতিক ও বৈজ্ঞানিক ভাষা তৈরিতে ইবন আল-হাইসাম এবং তাঁর ল্যাটিন পাঠের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না।
দর্শনের প্রবাহ ছিল সবচেয়ে আলোড়নময়। Ibn Sina (ইবনে সিনা) ল্যাটিনে Avicenna। Ibn Rushd (ইবনে রুশদ) Averroes। Al-Farabi (আল-ফারাবি) আলফারাবিয়াস বা ‘আভেননাসার’ , Al-Kindi (আল-কিন্দি), Al-Ghazali (আল-গাজালি)—নানা পথে ইউরোপীয় চিন্তায় প্রবেশ করেন। ইবনে সিনার metaphysics (অধিবিদ্যা), essence and existence (সত্তা ও অস্তিত্ব), necessary being (অবশ্যসত্তা), soul theory (আত্মাতত্ত্ব), knowledge (জ্ঞান), causality (কারণত্ব)—এসব ল্যাটিন scholasticism (স্কলাস্টিক চিন্তা)-এ গভীর আলোচনা তৈরি করে। Dag Nikolaus Hasse ইবনে সিনার De Anima (আত্মা-সংক্রান্ত আলোচনা)-র Latin West (ল্যাটিন পশ্চিম)-এ প্রভাব নিয়ে দেখিয়েছেন, Avicennian psychology (ইবনে সিনাবাদী মনস্তত্ত্ব) ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ী চিন্তায় বড় উপস্থিতি রাখে।
ইবনে রুশদ আরও বিস্ফোরক। ল্যাটিন ইউরোপে তিনি The Commentator (ভাষ্যকার/ব্যাখ্যাকার)। Aristotle (এরিস্টটল)-কে বুঝতে তাঁর ব্যাখ্যা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তাঁর দীর্ঘ, মধ্যম ও সংক্ষিপ্ত commentary (ব্যাখ্যা)-গুলোর মাধ্যমে Aristotle ল্যাটিন জগতে নতুনভাবে পড়া হয়। কিন্তু ইবনে রুশদের প্রভাব শান্ত ছিল না। intellect (বুদ্ধি), eternity of the world (জগতের অনাদি হওয়া), soul (আত্মা), God’s knowledge (ঈশ্বরের জ্ঞান), philosophy (দর্শন) ও theology (ধর্মতত্ত্ব)-এর সীমা—এসব প্রশ্নে তীব্র সংঘাত হয়। Paris condemnations (প্যারিসের নিন্দাদেশ) ১২৭০ ও ১২৭৭ সালে কিছু দার্শনিক অবস্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। Thomas Aquinas (থমাস অ্যাকুইনাস) ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদ পড়েন, গ্রহণ করেন, সংশোধন করেন, জবাব দেন।
জ্ঞানের আলো ছড়ানো ‘সেকেন্ড মাস্টার’ আল-ফারাবি গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের অত্যন্ত জটিল যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনকে মুসলিম বিশ্ব ও ইউরোপের কাছে সহজ ভাষায় পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তাঁর এই অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমগ্র পণ্ডিত সমাজ তাঁকে একনামে ‘মুয়াল্লিমুস সানি’ বা ‘সেকেন্ড মাস্টার’ (দ্বিতীয় শিক্ষক) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মধ্যযুগীয় ইউরোপের শীর্ষ দার্শনিক সেন্ট থমাস অ্যাকুইনাস থেকে শুরু করে অক্সফোর্ড-প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এরিস্টটলের দর্শন বুঝতে তাঁর লেখার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। ল্যাটিন বিশ্বে ‘আলফারাবিয়াস’ (Alpharabius) নামে পরিচিত এই চিন্তাবিদ কেবল দর্শনই নয়, বরং সঙ্গীত ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও এমন এক মজবুত ভিত্তি গড়েছিলেন, যা পরবর্তী যুগের ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের মতো মহান মনীষীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
ইবনে রুশদ ইউরোপকে শুধু Aristotle ফেরত দেননি। তিনি Aristotle পড়ার এক শক্তিশালী ব্যাখ্যামূলক পদ্ধতি দিয়েছেন। তাঁর এই অসাধারণ ও অতুলনীয় ব্যাখ্যার কারণে মধ্যযুগীয় ইউরোপের পণ্ডিতরা তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে "The Commentator" (ভাষ্যকার) উপাধিতে ভূষিত করেন। পশ্চিমা জগতে তিনি নিজের মূল নামের ল্যাটিন রূপ "Averroes" (আভেরোস) নামে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন। যুক্তি ও দর্শনের প্রসারে তাঁর অনন্য ভূমিকার জন্য তাঁকে পশ্চিমা দর্শনে "Father of Rationalism" (যুক্তিবাদ বা মুক্তচিন্তার জনক) বলেও ডাকা হয়।
সে যুগে ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চায় তাঁর প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, কোনো বইয়ে নাম উল্লেখ না করে কেবল ‘দার্শনিক’ (The Philosopher) বললে যেমন এরিস্টটলকে বোঝাত, তেমনি কেবল ‘ভাষ্যকার’ (The Commentator) বললে সবাই একনামে আভেরোস বা ইবনে রুশদকেই বুঝত। তাঁর এই বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থিতি ইউরোপীয় ধর্মতত্ত্বকে নিজের যুক্তির কাঠামো আরও ধারালো করতে বাধ্য করেছে। যে জ্ঞান প্রতিপক্ষকেও বদলাতে বাধ্য করে, তার প্রভাব সত্যিই গভীর।
বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যক্রম ও Renaissance-এর বৌদ্ধিক ভিত
Renaissance (রেনেসাঁ)-কে ১৫শ শতকের ইতালীয় শিল্প-সাহিত্য দিয়ে শুরু করলে তার পেছনের বৌদ্ধিক জমি অদৃশ্য হয়ে যায়। ইউরোপে তার আগে ১২শ শতকে এক বড় জ্ঞান-উদ্বোধন ঘটেছিল। গ্রিক ও আরবি গ্রন্থ অনুবাদ হলো। Aristotle ঢুকল। আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ ঢুকলেন। চিকিৎসা, natural philosophy (প্রাকৃতিক দর্শন), astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান), mathematics (গণিত), optics (আলোকবিদ্যা)-এর গ্রন্থ ল্যাটিনে এল। বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠল। Scholasticism (স্কলাস্টিক চিন্তা) যুক্তি, আপত্তি, জবাব, পাঠ, authority (কর্তৃত্ব)-এর জটিল পদ্ধতি তৈরি করল।
Charles Homer Haskins ১২শ শতকের ইউরোপীয় জাগরণকে Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ভাষায় পড়েছিলেন। তাঁর The Renaissance of the Twelfth Century-এ translators from Greek and Arabic (গ্রিক ও আরবি থেকে অনুবাদক), revival of science (বিজ্ঞানের পুনর্জাগরণ), revival of philosophy (দর্শনের পুনর্জাগরণ), beginnings of universities (বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা)—এসব এক ধারায় আসে। Haskins, The Renaissance of the Twelfth Century, pp. 278–304, 341–368. এই ধারাটি Renaissance-এর মুসলিম ঋণ বোঝার জন্য দরকারি। কারণ ১৫শ শতকের আগেই ইউরোপের পাঠ্যভূমি আরবি-ল্যাটিন জ্ঞানে ভরে উঠছিল।
David Lindberg, The Beginnings of Western Science-এ দেখিয়েছেন, পশ্চিমা বিজ্ঞানের মধ্যযুগীয় গঠন Greek, Arabic, Latin ধারার মধ্যে দিয়ে হয়েছে। Arabic-Latin translation (আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ) natural philosophy (প্রাকৃতিক দর্শন), medicine (চিকিৎসা), mathematics (গণিত), astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান), optics (আলোকবিদ্যা)-এর ইউরোপীয় বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। Lindberg, The Beginnings of Western Science, 2nd ed., pp. 201–240.
এইখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দেয়াল নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে পাঠ্যক্রম। শিক্ষক। ছাত্র। বিতর্ক। বই। নকল। মন্তব্য। কর্তৃত্বের তালিকা। কোন গ্রন্থ পড়ানো হবে, কোনটি নিষিদ্ধ হবে, কোনটিতে gloss (ব্যাখ্যামূলক টীকা) লেখা হবে, কোনটিতে হবে না—এসবের মধ্যে দিয়ে জ্ঞান সামাজিক শক্তি পায়। ইবনে সিনার Canon চিকিৎসায় ঢুকেছে। ইবনে রুশদের commentary দর্শনে ঢুকেছে। ইবন আল-হাইসামের optics দৃষ্টিতত্ত্বে ঢুকেছে। আল-খাওয়ারিজমির গণনা-পদ্ধতি গণিতের ঐতিহ্যে ঢুকেছে। আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি আকাশপাঠে ঢুকেছে।
Renaissance (রেনেসাঁ)-এর সঙ্গে এই ধারার সম্পর্ক বুঝতে হলে “হঠাৎ পুনর্জাগরণ” ধারণা ছাড়তে হয়। ইউরোপে জ্ঞানের মাটি আগে থেকেই প্রস্তুত হচ্ছিল। Translation movement (অনুবাদ আন্দোলন) ল্যাটিন ভাষায় নতুন গ্রন্থ এনে দিল। Cathedral schools (ক্যাথেড্রাল বিদ্যালয়) ও emerging universities (উদীয়মান বিশ্ববিদ্যালয়) সেই গ্রন্থকে পাঠ্য করল। Scholastic method (স্কলাস্টিক পদ্ধতি) তর্কের কাঠামো দিল। চিকিৎসা ও আইন বিশ্ববিদ্যালয়ী মর্যাদা পেল। শহর, বাণিজ্য, কাগজ, পরে মুদ্রণ—এসব জ্ঞানের বিস্তারে কাজ করল। মুসলিম-আরবি জ্ঞান এই জমির ভেতরে আগে থেকেই সার হয়ে ছিল।
ইউরোপীয় humanism (মানববাদ)-এর পরে classical texts (প্রাচীন গ্রন্থ)-এর নতুন পাঠ আসে। কিন্তু তার আগেই ইউরোপ Aristotle, Galen, Ptolemy, Euclid, Avicenna, Averroes, Alhazen—এইসব নামের সঙ্গে বসে পড়েছে। কোনো গ্রন্থ সরাসরি গ্রিক থেকে এসেছে, কোনোটি আরবি মধ্যস্থতায়, কোনোটি আরবি ব্যাখ্যাসহ। Renaissance-এর মানববাদী পণ্ডিতেরা কখনো আরবি মধ্যস্থতা এড়িয়ে গ্রিক মূলের দিকে ফিরতে চেয়েছেন। তবুও তার আগে যে কয়েক শতাব্দী ইউরোপ আরবি-ল্যাটিন জ্ঞানে পড়েছে, তা মুছে যায় না।
এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ইউরোপ অনেক সময় নিজের উৎসকে নতুন করে সাজিয়েছে। গ্রিক-রোমান উত্তরাধিকারকে সামনে এনেছে। আরবি-মুসলিম মধ্যস্থতাকে কখনো ছোট করেছে। কখনো প্রয়োজন শেষে মধ্যস্থতাকারীর নাম মুছে দিয়েছে। এই প্রবণতা ইতিহাসে অস্বাভাবিক নয়। যে সভ্যতা নিজের আত্মপরিচয় গড়ছে, সে উৎস বেছে নেয়। কিন্তু ইতিহাসের কাজ স্মৃতির সাজসজ্জা নয়। পথের হিসাব রাখা।
ইবনে সিনা ছাড়া ইউরোপীয় চিকিৎসা-পাঠ বোঝা যায় না। ইবনে রুশদ ছাড়া Aristotle-গ্রহণের ঝড় বোঝা যায় না। ইবন আল-হাইসাম ছাড়া optical tradition (আলোকবিদ্যা ঐতিহ্য) বোঝা যায় না। আল-খাওয়ারিজমি ছাড়া algorithm (অ্যালগরিদম), algorism (গণনাপদ্ধতি), algebra (বীজগণিত)-এর ইউরোপযাত্রা বোঝা যায় না। টলেডো ছাড়া Arabic-Latin translation (আরবি-ল্যাটিন অনুবাদ)-এর প্রধান পথ বোঝা যায় না। সিসিলি ও সালার্নো বাদ দিলে দক্ষিণ ইউরোপের জ্ঞানদরজা বন্ধ হয়ে যায়।
Renaissance-এর বৌদ্ধিক ভিতের মধ্যে মুসলিম জ্ঞানের উপস্থিতি তাই প্রান্তিক নয়। তা কেবল “প্রভাব” শব্দে সেরে দেওয়া যায় না। প্রভাব কখনো হালকা শব্দ হয়ে যায়। এখানে আছে পাঠ, পাঠ্যক্রম, ব্যবহার, তর্ক, চিকিৎসা-প্রশিক্ষণ, দার্শনিক সংঘাত, গাণিতিক পদ্ধতি, দৃষ্টিবিদ্যা, আকাশমাপ। একটি সভ্যতা অন্য সভ্যতার জ্ঞান নিয়ে নিজের ভিত বানাচ্ছে—এই দৃশ্যই দেখা দরকার।
ঋণ, উত্তরাধিকার ও বর্তমানের আয়না
ঋণ মানে পরাজয় নয়। ইউরোপ মুসলিমদের কাছে ঋণী। তার আগে মুসলিমরা গ্রিক, সিরিয়াক, ভারতীয়, ফারসি জ্ঞান থেকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু কেবল গ্রহণ করলেই ঋণ তৈরি হয় না। ঋণ তৈরি হয় তখন, যখন গ্রহণ করা জ্ঞান নতুন সভ্যতার ভিত গড়ে। ইউরোপের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। আরবি-ইসলামী জ্ঞান ল্যাটিনে গিয়ে কাগজে পড়ে থাকেনি। চিকিৎসাশাস্ত্রে ঢুকেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছে। গণিতে ঢুকেছে। astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান)-এ ঢুকেছে। optics (আলোকবিদ্যা)-এ ঢুকেছে। philosophy (দর্শন)-এ ঢুকেছে। theological debate (ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক)-এ ঢুকেছে। বাজারের হিসাবেও ঢুকেছে।
এখানে ঋণের মানচিত্রটা স্পষ্ট। বাগদাদে অনুবাদ ও রূপান্তর। আন্দালুসে নতুন পাঠ ও জ্ঞানভূমি। টলেডোতে Arabic to Latin (আরবি থেকে ল্যাটিন) অনুবাদ। সিসিলিতে গ্রিক-আরবি-ল্যাটিন সংযোগ। সালার্নোতে চিকিৎসা। প্যারিসে দর্শন। বলোনিয়া ও পাদুয়ায় চিকিৎসা ও আইন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, Aristotle, Galen, আলহাজেন। বাজারে সংখ্যা। আকাশে সারণি। চোখে optics (আলোকবিদ্যা)।
এই ঋণকে আড়াল করার দুটি পদ্ধতি আছে। এক পদ্ধতি সরাসরি অস্বীকার। বলা হয়, ইউরোপ নিজেই জেগেছে। আরবি-ইসলামী জ্ঞান ছিল সামান্য মধ্যবর্তী ঘটনা। এই কথা টলেডো, সিসিলি, সালার্নো, Gerard, Gundissalinus, Avicenna, Averroes, Alhazen, Al-Khwarizmi, Toledan Tables—সবকিছুকে ছোট করে। আরেক পদ্ধতি আরও সূক্ষ্ম। বলা হয়, মুসলিমরা শুধু Greek knowledge (গ্রিক জ্ঞান) সংরক্ষণ করেছে। যেন তারা কেবল পাহারাদার। যেন জ্ঞান তাদের হাতে বদলায়নি। এই কথাও সত্যের সঙ্গে অন্যায়। মুসলিম পণ্ডিতরা অনুবাদক ছিলেন, কিন্তু শুধু অনুবাদক নন। তাঁরা চিকিৎসক, গণিতবিদ, দার্শনিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যন্ত্রচিন্তক, সমালোচক, ব্যাখ্যাকার।
George Saliba-এর historiographical critique (ইতিহাসলেখন-সমালোচনা) এখানে আবার মনে আসে। Islamic science (ইসলামী বিজ্ঞান)-কে যদি শুধু প্রাচীন জ্ঞান সংরক্ষণের বিরতি হিসেবে দেখা হয়, তবে ইউরোপীয় Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ইতিহাসও দুর্বল হয়ে যায়। কারণ Renaissance-এর আগে যে বৈজ্ঞানিক ও বৌদ্ধিক খাদ্য ইউরোপ গ্রহণ করেছে, তার অনেকটা আরবি-ইসলামী জ্ঞানভূমির ভেতর দিয়ে এসেছে। Saliba, pp. 3–27.
এই ইতিহাস বর্তমান মুসলিম সমাজকে শুধু গর্ব দেয় না। অস্বস্তিও দেয়। আমরা অতীত নিয়ে কথা বলি, কিন্তু অতীতের মতো জ্ঞান-সংগঠন করি কি? অনুবাদ করি, কিন্তু পরিভাষা তৈরি করি কি? পশ্চিমা জ্ঞান নিয়ে কথা বলি, কিন্তু শাস্ত্রীয়ভাবে পড়ি কি? ইসলামী ঐতিহ্য নিয়ে লিখি, কিন্তু primary source (প্রাথমিক উৎস) দেখি কি? গবেষণা-প্রতিষ্ঠান বানাই? পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করি? অনুবাদক তৈরি করি? দীর্ঘমেয়াদি scholarly project (পাণ্ডিত্যিক প্রকল্প) হাতে নিই কি?
মুসলিম সোনালি যুগের এ শিক্ষা-পদ্ধতি ছিল না যে, বাইরে থেকে কিছুই নিও না। আবার এ শিক্ষা-পদ্ধতিও ছিল না, বাইরের সবকিছু মাথায় তুলে নাও। পদ্ধতি ছিল—গ্রহণ করো, পরীক্ষা করো, নিজের ভাষা দাও, নিজের সত্যকেন্দ্রে দাঁড় করাও, তারপর নতুন করে তৈরি করো। বাগদাদ এই কাজ করেছে। আন্দালুস করেছে। টলেডোর মাধ্যমে ইউরোপও করেছে। যে সমাজ জ্ঞানকে প্রয়োজন মনে করে, জ্ঞান তার দিকে যায়। যে সমাজ জ্ঞানকে শুধু গৌরবের পোস্টার বানায়, তার হাতে বই থাকে; সভ্যতা তৈরি হয় না।
Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ইতিহাসে মুসলিম ঋণ নিয়ে কথা বলা তাই শুধু অতীতের দাবি নয়। এটি বর্তমানের প্রশ্ন। একসময় মুসলিমরা এমন এক জ্ঞানভূমি বানিয়েছিল, যেখান থেকে ইউরোপ শিখেছে। আজ আমরা কি এমন কোনো জ্ঞানভূমি বানাচ্ছি, যেখান থেকে অন্যরা শিখবে? একসময় আরবি ভাষা চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান), optics (আলোকবিদ্যা)-এর ভাষা ছিল। আজ আমাদের ভাষাগুলো কতটা জ্ঞান বহন করছে? একসময় মুসলিম পণ্ডিতরা গ্রিক, সিরিয়াক, ভারতীয়, ফারসি জ্ঞানকে ভয় পায়নি। আজ আমরা পশ্চিমা জ্ঞান শুনলেই ভয় পাই, অথবা পূজা করি। দুই অবস্থাই দরিদ্র।
ইউরোপীয় Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ঋণ মুসলিম জ্ঞানের কাছে গভীর। এই ঋণ মানতে ইউরোপ ছোট হয় না। বরং ইতিহাস বড় হয়। কারণ ইতিহাস তখন দেখায়, সভ্যতা একে অন্যের কাছ থেকে নেয়। কিন্তু সব গ্রহণ সমান নয়। কেউ নিয়ে কপি করে। কেউ নিয়ে বদলায়। কেউ নিয়ে নতুন জ্ঞানভূমি বানায়। মুসলিমরা নিয়েছিল, আরবি ভাষায় নতুন দেহ দিয়েছিল। ইউরোপ নিয়েছিল, ল্যাটিনে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ও Renaissance (রেনেসাঁ)-এর দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল। এই পথের মাঝখানে মুসলিম জ্ঞানের উপস্থিতি প্রান্তিক নয়। ভিতরে। গভীরে। পাঠ্য, পদ্ধতি, সারণি, সংখ্যা, আলো, শরীর, আত্মা, দর্শন—সব জায়গায়।
Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ইতিহাসে ফ্লোরেন্স থাকবে, ভেনিস থাকবে, রোম থাকবে, humanism (মানববাদ) থাকবে, printing press (মুদ্রণযন্ত্র) থাকবে। কিন্তু তার পেছনে বাগদাদ, কুরতুবা, টলেডো, সিসিলি, সালার্নোও থাকবে। ইবনে সিনা থাকবেন। ইবনে রুশদ থাকবেন। আল-খাওয়ারিজমি থাকবেন। ইবন আল-হাইসাম থাকবেন। আল-জাহরাবি থাকবেন। আল-রাজি থাকবেন। হুনাইন থাকবেন। আল-কিন্দি থাকবেন। আল-ফারাবি থাকবেন। এদের বাদ দিয়ে Renaissance (রেনেসাঁ)-এর আলো লেখা যায়, কিন্তু সে আলোতে ইতিহাসের মুখ অন্ধকারে থাকবে।
Renaissance (রেনেসাঁ)-এর ইতিহাসে মুসলিম ঋণ মানে শুধুমাত্র অতীতের গৌরবের মুকুট নয়; এটা এক ধরনের জিজ্ঞাসা। একসময় মুসলিম সভ্যতা জ্ঞানের মধ্যবর্তী রাস্তা নয়, প্রধান নির্মাণশালা ছিল। বাগদাদে, কায়রোতে, কুরতুবায়, টলেডোর আরবি পাণ্ডুলিপিতে, সিসিলির দরবারে, সালার্নোর চিকিৎসাপাঠে সেই নির্মাণের ছাপ আছে। ইউরোপ সে নির্মাণের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের জাগরণের ভাষা তৈরি করেছে। ঋণ এখানে কল্পনা নয়। পাণ্ডুলিপির পথ, অনুবাদের তালিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য, চিকিৎসকের হাত, গণিতের পদ্ধতি, দৃষ্টিতত্ত্বের আলো, আকাশের সারণি—সব মিলিয়ে সে ঋণ দৃশ্যমান।
এ ইতিহাস আড়াল করলে শুধু Renaissance (রেনেসাঁ) ছোট হয় না; ইতিহাসই অন্ধ হয়ে যায়। আর ইতিহাস অন্ধ হলে বর্তমানও নিজের রাস্তা হারায়।

Post a Comment