Loading...

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ল্যাবরেটরি এবং বাংলা ভাষা থেকে আরবী-ফারসি শব্দ উচ্ছেদের লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইড

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ল্যাবরেটরি এবং বাংলা ভাষা থেকে আরবী-ফারসি শব্দ উচ্ছেদের লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইড
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও বাংলা ভাষার আরবি-ফারসি শব্দ উচ্ছেদের ইতিহাস
    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, ঔপনিবেশিক ভাষা-পরিকল্পনা এবং বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভাষিক রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক পাঠ

    Previous Part.......

    ৩:২

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা এবং জন গিলক্রাইস্ট-পণ্ডিতদের কৃত্রিম ভাষার কারখানা

    ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা মে সুবে বাংলার বুক চিরে কলকাতার বুকে লর্ড ওয়েলেসলি কর্তৃক প্রখ্যাত কলোনিয়াল প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ (Fort William College) প্রতিষ্ঠার নেপথ্য এজেন্ডাটি কেবল ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কোনো সাধারণ অ্যাকাডেমিক প্রয়াস ছিল না, বরং তা ছিল এ দেশের সংখ্যাগুরু প্রাকৃত মানুষের হাজার বছরের ভাষিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দেওয়ার এক সুসংগঠিত জ্ঞানতাত্ত্বিক ল্যাবরেটরি (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১২০)। কলোনিয়াল রাজশক্তি ভালো করেই জানত, সুবে বাংলার সর্বস্তরে বহমান যে লোকভাষা রয়েছে, যা আরবী-ফারসি-প্রাকৃত শব্দের এক চমৎকার ও অর্গানিক মেলবন্ধনে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে, তা অক্ষুণ্ণ থাকলে এ দেশের মূল সমাজকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ও ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ পরাধীন করা সম্ভব নয় (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩৫)। এই উদ্দেশ্যে কলেজের হিন্দুস্তানি বিভাগের প্রধান জন বার্থউইক গিলক্রাইস্ট (John Borthwick Gilchrist)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে রাজকীয় কলোনিয়াল অফিসারদের এ দেশ শাসন ও শোষণের ব্যাকরণ শেখানোর তাগিদে এক সম্পূর্ণ কৃত্রিম, ক্লিষ্ট ও সাম্প্রদায়িক ‘সাধুভাষা’ তৈরির এক চতুর কারখানা সচল করা হয়। এই কৃত্রিম ভাষার কারখানাটি সুবে বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আত্মপরিচয় ও ভাষিক অধিকারকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার এক সর্বগ্রাসী কদর্য লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইডের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। জন গিলক্রাইস্ট ও উইলিয়াম কেরির অধীনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এই ভাষিক ল্যাবরেটরিতে এ দেশের তৎকালীন কট্টর তোষামোদকারী পণ্ডিতেরা যেভাবে একত্রিত হয়েছিলেন, তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ মানুষের মুখের জবানকে একটি কৃত্রিম খাঁচায় বন্দি করা (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১২১)। কলেজের প্রধান পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পূর্বসূরী ফোর্ট উইলিয়ামীয় গবেষকেরা কলোনিয়াল প্রভুদের তুষ্ট করার জন্য বাংলা গদ্যের এক নয়া ও অদ্ভুত কাঠামো নির্মাণে লিপ্ত হন। তারা প্রাকৃত বাঙালির শত শত বছরের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত কথ্য ভাষা থেকে আরবী, ফারসি ও লোকায়ত শব্দগুলোকে সুপরিকল্পিত আভিধানিক ফিল্টারিং-এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে সেখানে তৎসম ও সংস্কৃত শব্দের এক ক্লিষ্ট পাহাড় দাঁড় করিয়ে দেন (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩৬)। এই কৃত্রিম ব্যাকরণ ও গদ্যের জন্ম দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সুবে বাংলার মুসলমানদের নিজস্ব সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ধারাকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অচল করে দেওয়া, যার ফলে এ দেশের সাধারণ মুসলমানরা নিজেদেরই ভাষার আঙিনায় রাতারাতি সম্পূর্ণ ‘অশিক্ষিত’ এবং ‘ব্রাত্য’ বলে চিহ্নিত হতে শুরু করে।

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এই ভাষিক ইঞ্জিনিয়ারিং সুবে বাংলার লোকজীবনে এবং সাহিত্যিক নন্দনতত্ত্বে এক অভাবনীয় ও কৃত্রিম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রাচীর খাড়া করেছিল। মধ্যযুগীয় বাংলার যে সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার, যা শাহ মুহম্মদ সগীর, আলাওল বা দোভাষী ও পুঁথি সাহিত্য বাংলার বিশেষত মুসলিম জনসমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ও ভাষিক ঐতিহ্যকে ধারণ করেছিল। ফোর্ট উইলিয়ামীয় পণ্ডিতেরা সেগুলোকে ‘যবন বা ম্লেচ্ছ’ ভাষা আখ্যা দিয়ে পাইকারি হারে ডিলিট করার এক কুৎসিত প্রক্রিয়া সচল করেন (আহমদ শরীফ, বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২৫৪-২৫৫)। জন গিলক্রাইস্ট এবং তাঁর তোষিত পণ্ডিতদের তৈরি করা এই কৃত্রিম গদ্যের কাঠামোটি পরবর্তীতে কলকাতার নব্য জমিদার ও কায়স্থ বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। যা সুবে বাংলার প্রকৃত গণমানুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লৈখিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১২৪; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩৭)। এই সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক কারখানার ফলেই আধুনিক বাংলা গদ্যের যে রূপটি আমরা দেখি, তা সুবে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় ও মনস্তাত্ত্বিক বুনিয়াদকে ভিত্তিমূল থেকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। জন গিলক্রাইস্ট-পণ্ডিতদের এই কৃত্রিম ভাষার কারখানা তাই কোনো আকস্মিক ব্যাকরণিক প্রয়াস ছিল না, বরং তা ছিল সুবে বাংলার মুসলমানদের জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে ও ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ পরাধীন ও স্তব্ধ করে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদী ঔপনিবেশিক মহাপরিকল্পনা।

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এই ল্যাবরেটরিতে বসে যে ভাষিক ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা সুবে বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত ও সাধারণ সমাজকে কেবল তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের ভাষা থেকেই বিচ্যুত করেনি, বরং কলোনিয়াল রাষ্ট্র ও ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার মধ্যবর্তী সেই নগ্ন ও অশুভ আঁতাতকে ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১২৫; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩৮)। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ মূলত ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের রাজকার্য পরিচালনার উপযোগী করে বাংলা শেখানোর জন্য ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করেছিল। এই ল্যাবরেটরিতে তৎকালীন সংস্কৃত পণ্ডিতদের সহায়তায় বাংলা ভাষা থেকে আরবি, ফারসি এবং লোকজ শব্দগুলোকে জোরপূর্বক ছেঁটে ফেলা হয়। তৈরি করা হয় এক কৃত্রিম ও সংস্কৃতঘেঁষা 'সাধু ভাষা', যা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাষার একটি এলিট বা ভদ্রলোকি রূপ তৈরি করা, যার মাধ্যমে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা যায়।

    এই ভাষিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে সুবে বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত ও সাধারণ গ্রামীণ সমাজের ওপর। তারা শত শত বছর ধরে পুঁথি সাহিত্য, দেহাতি গান এবং প্রাত্যহিক জীবনে যে মিশ্র বা দোভাষী বাংলা ব্যবহার করে আসছিল, তা রাতারাতি 'অশুদ্ধ' ও 'নিম্নমানের' বলে গণ্য হতে শুরু করে। ফলে, এক বিশাল জনগোষ্ঠী কেবল তাদের হাজার বছরের ভাষিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকেই বিচ্যুত হয়নি, বরং নিজেদেরই মাতৃভাষার জমিনে তারা পরবাসী ও প্রান্তিক হয়ে পড়ে।

    ভাষাকে এভাবে কুক্ষিগত করার পেছনে কাজ করেছিল কলোনিয়াল রাষ্ট্র এবং নব্য কলকাতার 'ভদ্রলোক' সংস্কৃতির এক অশুভ আঁতাত। ব্রিটিশদের প্রয়োজন ছিল শাসনযন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য একটি অনুগত মধ্যস্থতাকারী শ্রেণী, আর ভদ্রলোক সমাজের প্রয়োজন ছিল সমাজে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করা। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেই কৃত্রিম ভাষা উৎপাদন প্রক্রিয়া এই দুই স্বার্থকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়। যা সুবে বাংলার সাধারণ ও মুসলিম সমাজকে বাদ দিয়ে কলোনিয়াল রাষ্ট্র ও ভদ্রলোক সংস্কৃতির এই নগ্ন আঁতাতকে ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছে।

    ‘আরবী-ফারসি পরিভাষা’ উচ্ছেদের লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইড এবং প্রাকৃত বাঙালির মুখ কাড়ার কোরিওগ্রাফি

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কৃত্রিম ল্যাবরেটরিতে যে ভাষিক ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয়েছিল, তার সবচেয়ে কুৎসিত কুঠারাঘাতটি সরাসরি নেমে এসেছিল সুবে বাংলার প্রাকৃত মেহনতি মানুষের শত শত বছরের জীবন্ত ও অর্গানিক ভাষার ওপর (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১২০-১২১)। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ থেকে শুরু করে শাহ মুহম্মদ সগীর, সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজসভার কবিগণ, মহাকবি আলাওল কিংবা কালজয়ী দোভাষী পুঁথির ধারায় এ দেশের হিন্দু-মুসলিম জনসাধারণের মুখের প্রাত্যহিক ভাষায় লক্ষ লক্ষ আরবী, ফারসি এবং স্থানিক প্রাকৃত শব্দ প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে মিশে গিয়েছিল (আহমদ শরীফ, বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২৫৪)। কিন্তু উনিশ শতকের শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা কলোনিয়াল প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী এক সুসংগঠিত আভিধানিক ফিল্টারিং (Lexical Filtering) বা ছাঁটাইকরণ প্রক্রিয়া চালু করেন। যেখানে এই জীবন্ত ও ঐতিহাসিকভাবে সঞ্চিত আরবী-ফারসি পরিভাষাগুলোকে ‘ম্লেচ্ছ বা যবন’ শব্দ আখ্যা দিয়ে পাইকারি হারে ডিলিট করার এক সুপরিকল্পিত লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইড কার্যকর করা হয় (আহমদ শরীফ, বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২৫৫; ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৮)। এই সুসংগঠিত ভাষিক নিধনযজ্ঞের একমাত্র সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য ছিল সুবে বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক ও নন্দনতাত্ত্বিক মুখ কেড়ে নিয়ে তাদের এক কৃত্রিম ও পরাধীন কাঠামোর মধ্যে বন্দি করা। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এই আভিধানিক উচ্ছেদের কোরিওগ্রাফিটি ছিল চরম মাত্রায় মনস্তাত্ত্বিক ও সুপরিকল্পিত। পণ্ডিতেরা ভালো করেই জানতেন, সুবে বাংলার প্রাকৃত সমাজ শতাব্দী ধরে যে ভাষায় তাদের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, বিচার-আচার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের দাপ্তরিক নথিপত্র লিপিবদ্ধ করে আসছিল, সেই ভাষার অর্গানিক অভিধানকে যদি পুরোপুরি বদলে না দেওয়া যায়, তবে ফোর্ট উইলিয়ামের ‘ভদ্রলোক’ হেজেমনি কোনোদিনও চিরস্থায়ী রূপ লাভ করতে পারবে না। এই লক্ষ্যেই তারা প্রাকৃত বাঙালির মুখের স্বাভাবিক ‘কাগজ’, ‘কলম’, ‘আদালত’, ‘আইন’, ‘খাজনা’, ‘দুনিয়া’ কিংবা ‘ইনসাফ’-এর মতো শত শত বহমান ও জীবন্ত প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক শব্দগুলোকে আভিধানিক চক্রান্তের মাধ্যমে অবাঙালি, ব্রাত্য ও অচ্ছুৎ ঘোষণা করেন এবং তার পরিবর্তে ক্লিষ্ট, অপ্রচলিত ও কৃত্রিম সংস্কৃত শব্দাবলির এক দানবীয় জঙ্গল সাধারণ মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেন (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯২-১১৫)।

    ঊনবিংশ শতকে বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন এবং ভাষার “শুদ্ধতা” নিয়ে যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে শব্দের উৎসের ভিত্তিতে মর্যাদার পার্থক্য তৈরি হয়েছিল। তৎসম শব্দকে অধিকতর মার্জিত, সাহিত্যোপযোগী বা শুদ্ধ মনে করার প্রবণতা ছিল, আর আরবি-ফারসি উৎসের শব্দকে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নতর বা কম মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে দেখা হতো।বাংলা ভাষার স্বাভাবিক ও দীর্ঘকালীন ব্যবহারে আরবি-ফারসি উৎসের অসংখ্য শব্দ সম্পূর্ণভাবে আত্মীকৃত হয়ে গেলেও, ঊনবিংশ শতকের সংস্কৃতায়িত উচ্চগদ্য নির্মাণের প্রক্রিয়ায় শব্দের উৎসকে কেন্দ্র করে একটি ভাষিক মর্যাদাক্রম তৈরি হয়। বহু আরবি-ফারসি শব্দ বাংলাভাষীদের মুখে বহমান থাকা সত্ত্বেও সংস্কৃতনির্ভর সাহিত্যিক রুচির কাছে সেগুলো একই মর্যাদা লাভ করেনি। ফলে ‘বাংলা শব্দ’ হিসেবে প্রচলিত থাকা এবং ‘আদর্শ সাহিত্যিক বাংলা’র অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এক বিষয় ছিল না। এর ফলে, মুসলিম আমলের বিখ্যাত কবি ও পুঁথিকারদের হাজার বছরের সঞ্চিত ঐতিহ্যের ভাষা রাতারাতি সম্পূর্ণ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘অশুদ্ধ’ বলে বিজ্ঞাপিত হতে শুরু করে এবং সুবে বাংলার শিক্ষিত মুসলিম মানস এক নজিরবিহীন নন্দনতাত্ত্বিক খাঁচায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইডের সবচেয়ে মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী সামাজিক পরিণতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে সুবে বাংলার মুসলমানদের কেবল তাদের সাহিত্যিক জবান থেকেই বিচ্যুত করা হয়নি, বরং তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকেও সম্পূর্ণ শিকড়হীন করে ফেলা হয়েছিল (ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৮)। প্রাকৃত বাঙালি মুসলমানদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার এই প্রাতিষ্ঠানিক থিয়েটারটি কলকাতার ইংরেজ-তোষিত নব্য জমিদার ও বর্ণহিন্দু বুর্জোয়াদের জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয় এনে দিয়েছিল। কারণ এই কৃত্রিম ‘শুদ্ধি’র আড়ালে তারা সুবে বাংলার মুসলিম সমাজকে চিরকালের জন্য একচেটিয়া সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১২৪; ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩৭)। এই সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত আভিধানিক ফিল্টারিং-এর নিষ্ঠুর কোরিওগ্রাফিই ছিল, সুবে বাংলার ইতিহাসে নেমে আসা সবচেয়ে সুপ্রচ্ছন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি। যা বাঙালি মুসলিম জনসমষ্টিকে তাদের নিজেদেরই উৎপাদিত ভাষার আঙিনায় এক চরম অধিকারহীন ও শব্দহীন কুলী-কামিনের জাতিতে রূপান্তরিত করার আদি বীজ বপন করেছিল।

    নব্য ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর ভাষিক ফ্যাসিবাদের চিরস্থায়ী রূপান্তর এবং ২০২৬-এর বাংলাদেশের মগজধোলাই

    ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ল্যাবরেটরিতে জন গিলক্রাইস্ট এবং তাঁর তোষিত পণ্ডিতদের হাত ধরে যে আভিধানিক ফিল্টারিং ও কৃত্রিম ভাষার কারখানা সচল হয়েছিল, তা কেবল উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক প্রেষণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং তা কলকাতার নব্য শোষক ‘ভদ্রলোক’ ও কায়স্থ বুর্জোয়াদের একচেটিয়া সাংস্কৃতিক মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত হয়ে চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করে। কলোনিয়াল প্রশাসনের তৈরি করে দেওয়া এই ক্লিষ্ট ও কৃত্রিম ‘সাধুভাষা’ এবং আরবী-ফারসি শব্দহীন আভিধানিক কাঠামোটি উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতক পার হয়ে এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কালক্রম অতিক্রম করেছে।

    বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে এই কৃত্রিম ভাষারূপটা ছিল একরকম সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। তাঁরা দেখতে পেলেন, স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে ইসলামী ঐতিহ্য বা মুসলিম চরিত্রের কোনো জায়গা নেই; বরং হিন্দু দেবদেবীর কাহিনি, হিন্দু আচার-আচরণ আর মূল্যবোধই সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর ‘মুসলমানের বাঙ্গলা শিক্ষা’ (১৩১০) গ্রন্থের বিজ্ঞাপনে সেই সময়ের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তিনি লেখেন, “বঙ্গে ভাষা শিক্ষা করিবার পুস্তক যথানিয়মে প্রচলিত থাকা সত্ত্বেও আমি এই ১ম শিক্ষা পুস্তক প্রকাশ করিতেছি, অবশ্যই ইহার কোন কারণ আছে” (মীর মশাররফ হোসেন, ‘মুসলমানের বাঙ্গলা শিক্ষা’, ১৩১০, বিজ্ঞাপন)। পরে তাঁর ‘আমার জীবনী’তে (১৯০৮) সেই কারণটি স্পষ্ট হয়। তিনি সেখানে বলেন, “আমরা দুই ভাই কুষ্টিয়া স্কুলে ভর্তি হইলাম, ইংরেজি আর বাঙ্গলা পড়িতে হয়। এতদিন পড়িলাম—আল্লাহ-রসুলের নাম কোন স্থানে পাইলাম না। যিনি গুরু তাহার মুখেও না, বরং ইংরেজি কেতাবের মধ্যে কয়েক জায়গায় শুকরের নাম পাইলাম। পাক-সাফ পবিত্রতার নামগন্ধ পাইলাম না। আল্লাহ-রসুলের নাম কেতাবে নাই কিন্তু বাম শ্যাম হরি কালী দুর্গা শিব, কুকুর, শৃগালের নাম অনেক স্থানে পাইলাম” (মীর মশাররফ হোসেন, ‘আমার জীবনী’, পৃ: ১৭৮-৮০)। এই শৈশবকালের বেদনাদায়ক স্মৃতি থেকেই তিনি পরবর্তী সময়ে ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে মুসলমান ছাত্রদের জন্য পাঠোপযোগী গ্রন্থ রচনা করেন।

    শুধু মীর মশাররফ নন, রেয়াজউদ্দীন আহমদও আধুনিক শিক্ষা-প্রণালীর সমালোচনা করে বলেছেন, “মুসলমান বালক ও যুবকের পক্ষে বিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রণালী নিরাপদ নহে। এই শিক্ষার ফলে ইংরেজি শিক্ষিত মুসলমানদিগের মধ্যে অনেক গুরুতর দোষ প্রবেশ করিয়াছে। প্রধান দোষ ধর্মাচারবিহীনতা ও নীতিজ্ঞানপরিশূন্যতা। ধর্মবিশ্বাসেও অনেকের ক্রটি আছে। অনেকের ধর্মমত নাস্তিকের কাছাকাছি” (ওয়াকিল আহমদ, ‘উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিস্তা-চেতনার ধারা’, পৃ: ১২৯)। রেয়াজউদ্দীন আহমেদ পাঠ্যপুস্তকের ক্রটির কথা তুলে ধরে আরও লিখেছেন, “শিক্ষণ ব্যবস্থার ক্রটিতে আমাদিগকে ধর্মগন্ধবিহীন বাঙ্গালা ইংরেজি ও সংস্কৃতির বকুনি শিখিতে হইয়াছে। যাঁহারা আপনাদিগের শিক্ষা বিধানের জন্য নিযুক্ত—তাঁহারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বলিয়া মুসলমান শাস্ত্রানুমোদিত পাঠ্য নির্দেশ না করিয়া, হিন্দু ও খ্রীষ্টিয়ান নীতি অনুমোদিত পাঠ্যে আমাদিগকে বাধিত করিয়াছেন” (ওয়াকিল আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ: ১২৯)।

    এই পরিস্থিতিতে বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পারলেন, এই কৃত্রিম ও সংস্কৃতায়িত ‘সাধুভাষা’ তাঁদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তাঁরা বাংলাকেই মাতৃভাষা হিসেবে মেনে নিলেন, কিন্তু সেটার মধ্যে আরবী-ফারসি শব্দ ও ইসলামী ভাবধারা যোগ করে একটি স্বতন্ত্র ‘মুসলমানী বাংলা’ গড়ে তোলার কথা ভাবলেন। ইসলাম-প্রচারকের সম্পাদক মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ ১৯০০ সালে স্পষ্ট করে বললেন, “যেদিন আমরা এই মাতৃভাষা বাঙ্গালায় জাতি ভাষা আরবী, ফারসী, উর্দূ প্রভৃতি হইতে জাতীয় বহুল শব্দ, জাতীয় ভাব, জাতীয় তেজ, জাতীয় ধর্মপ্রাণতা আনয়ন করিতে পারিব, সেইদিন এই মাতৃভাষা দ্বারা আমরা যথোচিত ফল লাভ করিতে সমর্থ হইব” (ইসলাম-প্রচারক, জানুয়ারি ১৯০০; ওয়াকিল আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ: ১৪৭)।

    এই সংগ্রাম শুধু ভাষার লড়াই ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্য, সামাজিক ন্যায়বিচার আর নিজস্ব ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। ফারুক মাহমুদ তাঁর ‘ইতিহাসের অন্তরালে’ বইয়ে ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই দেখিয়েছেন যে, উনিশ শতকের গোড়ায় বর্ণহিন্দু বাবুদের জন্য ‘সোনার বাংলা’ ছিল স্বর্গীয় লীলাভূমি। তাদের রচিত কবিতা, প্রহসন, গল্প, উপন্যাসের সর্বত্রই বাবুদের জীবনে কেবল আহার, নিদ্রা ও মৈথুনের ছড়াছড়ি। এইজন্যই তারা "আমার সোনার বাংলা....." গান লিখছিলেন। কারণ জমিদারির এই বাংলা তাদের জন্য সত্যিই সোনার ছিলো এবং সোনার চামচ মুখে দিয়ে তারা জন্মও নিতো। অন্যদিকে মুসলমান ও শূদ্র সমাজ তখন কৃষক ও খাতক সম্মেলন, সমাবেশ ও বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ‘কৃষক সমিতি’, ‘প্রজা সমিতি’ ও কৃষক প্রজা সমিতির নেতৃত্বে মরণপণ লড়াইয়ে লিপ্ত। মুসলিমদের জন্য তখন এই বাংলা, সোনার বাংলা ছিলো না। দাসের বাংলা কিংবা জমিদারের নির্যাতনে অতিষ্ঠ ক্লিষ্ট বাংলা ছিলো (ফারুক মাহমুদ, ‘ইতিহাসের অন্তরালে’, পৃ: ৮৪-৮৫)। এই বৈষম্যের মূলে ছিল ভাষা ও শিক্ষার সেই কাঠামো, যা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তৈরি করা হয়েছিল এবং যা পরবর্তী শতাব্দীজুড়ে বাংলার মুসলমানদের প্রান্তিক করে রেখেছিল।

    এই সুসংগঠিত ভাষিক ফ্যাসিবাদের সুগভীর বিষাক্ত বীজ আজ ২০২৬ সালের আধুনিক স্বাধীন বাংলাদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যানভাস, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্পোরেট মিডিয়া পরিমণ্ডলেও হুবহু সচল রয়েছে। যেখানে সুবে বাংলার মুসলমানদের শত শত বছরের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ইসলামি পরিভাষাকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে ‘ব্রাত্য’, ‘ক্ষ্যাত’ কিংবা ‘সাম্প্রদায়িক’ দাগ দিয়ে অবজ্ঞা করার এক সর্বগ্রাসী ও রুদ্ধশ্বাস মগজধোলাই থিয়েটার প্রতিনিয়ত মঞ্চস্থ করা হচ্ছে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪০-৪৫)। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেই প্রাতিষ্ঠানিক কারখানায় উৎপাদিত ভাষিক হেজেমনি (Linguistic Hegemony) কীভাবে আধুনিক বাঙালি মুসলিম তরুণের মনস্তত্ত্বকে অবদমিত করে রেখেছে, তা ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের দিকে তাকালে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এ দেশের মেহনতি মানুষের মুখের ও সাহিত্যের হাজার বছরের স্বাভাবিক ও অর্গানিক পরিভাষা— যেমন ‘পানি’ বনাম ‘জল’, ‘আব্বা-আম্মা’ বনাম ‘বাবা-মা’, কিংবা প্রাত্যহিক জীবনের সহজাত ইসলামি সম্ভাষণ ‘আসসালামু আলাইকুম’ ও ‘ইনশাআল্লাহ’ শব্দগুলোকে আধুনিক সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা এক অদৃশ্য ফিল্টারিং-এর মাধ্যমে মূলধারার সংস্কৃতি থেকে ছিটকে দেওয়ার লড়াই জারি রেখেছে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১-৪২)। কোনো মুসলিম তরুণ বা সাধারণ নাগরিক যখন তার ঐতিহ্যের এই শব্দগুলো উচ্চারণ করে, তখন তাকে কলকাতার সেই কলোনিয়াল ‘ভদ্রলোক’ চশমায় ‘অনগ্রসর’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। যা মূলত দুই শতক আগে শুরু হওয়া আরবী-ফারসি পরিভাষা উচ্ছেদের সেই কুখ্যাত লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইডেরই এক নিরবচ্ছিন্ন ও আধুনিক কর্পোরেট ধারাবাহিকতা (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৩১-১৩২)।

    এই সুপরিকল্পিত মগজধোলাইয়ের বিরুদ্ধে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এবং পাকিস্তান আমলের শেষভাগে এ দেশের খাঁটি জ্ঞানতাপস ও আলেম সমাজ প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিকভাবে যে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা সমকালীন ইতিহাসের এক অনন্য প্রতিরক্ষামূলক দলিল (জুলফিকার আহমদ কিসমতী, বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা পীর-মাশায়েখ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৮-৭৯)। বাংলার মাটিতে যখন ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম সাংস্কৃতিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন হাজী শরীয়তুল্লাহ, পীর বাদশাহ মিঞা, মুনশী মেহেরুল্লাহ প্রমুখ ওলামা-পীর-মাশায়েখগণ বাংলা ভাষাকেই তাদের প্রচারের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে জনগণের মাঝে ইসলামী চেতনা ও স্বজাতীয় বোধ জাগ্রত করেন। পীর বাদশাহ মিঞা (আবা খালেদ রশীদ উদ্দিন আহমদ), মুনশী মেহেরুল্লাহ কিংবা মওলানা আকরাম খাঁ-এর মতো ব্যক্তিরা কেবল ধর্মীয় প্রচারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁরা বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতা, বক্তৃতা ও পুস্তক রচনার মাধ্যমে জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন (কিসমতী, ‘বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা পীর-মাশায়েখ’, ২য় খণ্ড, পৃ: ৭৮-৭৯, ৮১-৮৪)। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, ভাষাই জাতীয় চেতনার মূল ভিত্তি। যে জাতি নিজের ভাষায় চিন্তা করতে পারে না, সে কখনো সাংস্কৃতিকভাবে স্বাধীন হতে পারে না।

    ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সরকারি শিক্ষা কমিশনের দুরভিসন্ধিমূলক সেই রিপোর্ট, যা এ দেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি ও ভাষিক বুনিয়াদকে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে এক সেক্যুলার কলোনিয়াল ছাঁচে নতুন প্রজন্ম তৈরির রূপরেখা দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে জ্ঞানতাপস মাওলানা নূর মুহাম্মদ আজমীর (যাকে বলা হতো, ‘প্রাচ্যের জীবন্ত বিশ্বকোষ’) ক্ষুরধার ও ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক প্রত্যুত্তর, সুবে বাংলার মুসলমানদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার লড়াইকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল (জুলফিকার আহমদ কিসমতী, বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা পীর-মাশায়েখ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৮-৭৯)। মাওলানা আজমী শুধু মাদ্রাসা শিক্ষার সমর্থনেই থেমে যাননি; তিনি ভাষিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন। বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি প্রমাণ করেন, মাতৃভাষায় চিন্তা ও শিক্ষা না হলে কোনো জাতি সত্যিকার অর্থে মুক্ত হতে পারে না। তিনি “এদারাতুল মাআরিফ” প্রতিষ্ঠা করে বাংলা ভাষায় ইসলামী গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেন (কিসমতী, ‘বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা পীর-মাশায়েখ’, ২য় খণ্ড, পৃ: ১৫৭-১৫৮)।

    কিন্তু সেই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ ও হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও, স্বাধীন বাংলাদেশের আধুনিক শিক্ষা কমিশন ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কলোনিয়াল কলকাতার সেই পুরোনো আভিধানিক ফ্যাসিবাদের চোরাবালিতেই নতুন প্রজন্মকে নিমজ্জিত করে রেখেছে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪৪-৪৫)। নব্য ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর এই ভাষিক ফ্যাসিবাদের চিরস্থায়ী রূপান্তর তাই কোনো বিচ্ছিন্ন নন্দনতাত্ত্বিক বিবর্তন নয়, বরং তা হলো সুবে বাংলার মুসলমানদের জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে শিকড়হীন ও পঙ্গু করে রাখার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক কোরিওগ্রাফি। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে যে সূক্ষ্ম মগজধোলাই সচল রয়েছে, তা সাধারণ মুসলমানদের নিজেদের হাজার বছরের ধর্মীয় ও ভাষিক গৌরব থেকে লজ্জিত ও বিচ্যুত করে এক কৃত্রিম নন্দনতাত্ত্বিক খাঁচায় বন্দি করতে চায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেই পুরোনো ল্যাবরেটরি এবং আধুনিক বাংলাদেশের কর্পোরেট মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যবর্তী এই প্রচ্ছন্ন ফ্যাসিবাদের কুৎসিত আঁতাতকে ইতিহাসের লেন্স দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করা তাই আজ বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তার টিকে থাকার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিজ্ঞা।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment