Loading...

তৃতীয় অধ্যায়: পলাশী-উত্তর রাজনৈতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন এবং লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইড

তৃতীয় অধ্যায়: পলাশী-উত্তর রাজনৈতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন এবং লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইড
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    পলাশীর পর বাংলার অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, রাজনৈতিক পতন এবং ফারসি ভাষার রাষ্ট্রীয় উচ্ছেদের প্রতীকী চিত্র
    পলাশীর পর ঔপনিবেশিক ক্ষমতা বাংলার অর্থনীতি, প্রশাসন ও ভাষাগত কাঠামোকে গভীরভাবে পুনর্গঠন করে

    Previous Part.......

    ৩:১

    পলাশীর বিপর্যয়-উত্তর বাংলার রাজকোষ লুণ্ঠন এবং ফারসি ভাষার রাষ্ট্রীয় উচ্ছেদ 

    ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুনের পলাশী বিপর্যয় সুবে বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার বুকে এক পৈশাচিক ও নজিরবিহীন লুণ্ঠন অর্থনীতির (Plunder Economy-এর) প্রাতিষ্ঠানিক পত্তন ঘটায়। মীর জাফরের চরম চক্রান্ত এবং ক্লাইভের লোলুপ সিন্ডিকেটের গোপন কোরিওগ্রাফি সুবে বাংলার প্রাচীন স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যকে রাতারাতি এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। স্বাধীন মুসলিম শাসনের এই পতন গ্রামীণ মুসলিম চাষী ও শহুরে সুনিপুণ কারিগরদের রাতারাতি কীভাবে চরম দেউলিয়া ও লুণ্ঠনের শিকারে পরিণত করেছিল, তার চুলচেরা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ কলোনিয়াল ইতিহাসের এক নির্মমতম দলিল (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪১-২৪৩)। ১৭৫৭ সালের সেই রক্তক্ষয়ী সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হওয়া কলোনিয়াল মূলধনের জবরদস্তিমূলক নিষ্কাশন (Capital Drain) সুবে বাংলার কঙ্কালসার অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডির প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

    নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর লর্ড ক্লাইভ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষক চক্র যেভাবে সুবে বাংলার রাজকোষ (Treasury) ফাঁপা করে সামগ্রিক সম্পদ ব্রিটেনে পাচার করেছিল, তার বাস্তব উপাত্ত প্রমাণের জন্য সমকালীন ইংরেজ ঐতিহাসিক ও কর্মকর্তাদের নথিপত্রই সবচেয়ে বড় সাক্ষী। পলাশীর যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই কোম্পানির রাজকীয় অংশীদারেরা মুর্শিদাবাদের পুঞ্জীভূত সোনা, রূপা এবং জহরত হস্তগত করার জন্য এক পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠে। মীর জাফরকে পুতুল নবাবের গদিতে বসানোর পর লর্ড ক্লাইভ এবং কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত ‘উপহার’ এবং কোম্পানির ‘ক্ষতিপূরণ’ বাবদ সুবে বাংলার রাজকোষ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিষ্কাশন করে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৪৭-১৫২)। সমকালীন ইংরেজ কর্মকর্তা লুক স্ক্রাফটন (Luke Scrafton) এবং হ্যারি ভেরেলস্ট (Harry Verelst)-এর হিসাবের বরাত দিয়ে দেখা যায়, লর্ড ক্লাইভ ব্যক্তিগতভাবে ২ লক্ষ ৩৪ হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ অর্থ নগদ গ্রহণ করেছিলেন এবং ওয়াটস, কিলপ্যাট্রিক ও অন্যান্য কোম্পানির কর্মকর্তাদের পকেটে গিয়েছিল আরও ৫ লক্ষ পাউন্ডের বেশি মূল্যের সোনা-রূপা (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৪৮-১৪৯)। এর বাইরে কোম্পানির মোট দাবি মেটাতে সুবে বাংলার রাজকোষ থেকে ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা এক লহমায় বের করে নেওয়া হয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৪৯)। এই জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক নিষ্কাশনের তীব্রতা এতই ভয়াবহ ছিল যে, মুর্শিদাবাদের রাজকীয় কোষাগারের সোনা-রূপার সিন্দুকগুলো খালি করার জন্য কোম্পানিকে একশটি বড় বড় নৌকার এক বিশাল বহর ব্যবহার করতে হয়েছিল এবং রাজকোষের সমস্ত লুণ্ঠিত সোনা-রূপা কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে পাচার করা হয়েছিল (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৫০-১৫১)। এই ঐতিহাসিক লুণ্ঠন সুবে বাংলার মুদ্রা সংবহন ও সঞ্চয়ের প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।

    স্বাধীন মুসলিম শাসনের এই আকস্মিক পতন সুবে বাংলার চিরকালীন উৎপাদন কাঠামো এবং গ্রামীণ সমাজের ওপর এক প্রলয়ঙ্কারী আঘাত হেনেছিল। মুসলিম আমলে সুবে বাংলার ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল মূলত নমনীয় এবং ফসল বা উৎপাদনের অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৮)। কিন্তু কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর থেকেই এই মানবিক ও প্রজাহিতৈষী অর্থনৈতিক নিয়মগুলোকে সম্পূর্ণ হটিয়ে দিয়ে লুণ্ঠনভিত্তিক ইজারাদারী ব্যবস্থার প্রবর্তন করে (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫৩)। গ্রামীণ মুসলিম চাষী, যারা বংশপরম্পরায় নিজেদের জমির স্বত্ব ও ফসল ভোগের অধিকার ভোগ করে আসছিল, তারা রাতারাতি কলোনিয়াল পুঁজিপতি ও তাদের তোষণকারী নব্য গজিয়ে ওঠা উচ্চবর্ণের মহাজন-জমিদারদের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে শুরু করে। কোম্পানির এই নতুন রাজস্ব নীতিতে শস্যের পরিবর্তে বাধ্যতামূলক ক্যাশ কারেন্সি বা নগদ মুদ্রার মাধ্যমে খাজনা পরিশোধের কড়াকড়ি নিয়ম জারি করা হয় (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৮)। ফলে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে মুদ্রা সঙ্কটের সৃষ্টি হয় এবং দরিদ্র চাষীরা নিজেদের উৎপাদিত ফসল জলের দরে নব্য মহাজনদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ঠিক একইভাবে, সুবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুতি ও রেশম শিল্পের কারিগরেরা, যারা বিশ্ববাজারে নিজেদের অসাধারণ সুখ্যাতি ধরে রেখেছিল, তারা কোম্পানির ‘দাদন’ ও একচেটিয়া বাণিজ্য একাধিপত্যের শিকার হয়ে নিজেদের স্বাধীন জীবিকা হারায় (ডক্টর এম. এ. রহিম, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬০-২৬৩)। তাঁতি ও মুসলিম জোলা সম্প্রদায়কে নামমাত্র মূল্যে কোম্পানির জন্য পণ্য উৎপাদন করতে বাধ্য করা হয়, যার ব্যতিক্রম হলে তাদের ওপর চলত অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২২)। এই দীর্ঘস্থায়ী শোষণ সুবে বাংলার এককালের বিত্তশালী সমাজকে নিরেট কঙ্কালসার দিনমজুর ও কুলি-কামিনের জাতিতে রূপান্তরিত করে দেয়।

    এই সামগ্রিক ট্র্যাজেডির পেছনে সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি ছিল সুবে বাংলার অভ্যন্তরীণ অবাঙালী ও উচ্চবর্ণের রাজন্যবর্গের সুগভীর চক্রান্ত। মোঘল আমলের শেষভাগ থেকেই সুরা ও নারীর জোগানদার হিসেবে এবং হেরেমের প্রভাব খাটিয়ে সুবে বাংলায় একদল অবাঙালী রাজপুত, মাড়োয়ারী এবং হিন্দুস্তানী তথাকথিত কুলীন বর্ণহিন্দুর দল প্রশাসনের সর্বস্তরে জেঁকে বসতে শুরু করে। মুর্শিদকুলী খানের আমল থেকে শুরু করে আলীবর্দী খানের সময়কাল নাগাদ এই নব্য বণিক ও আমলা গোষ্ঠী সুবে বাংলার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮)। আঠারো শতকের প্রথমার্ধে যখন সমগ্র দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশ জুড়ে মারাঠা, জাঠ ও শিখ শক্তির নেতৃত্বে মুসলিম রাজনৈতিক অস্তিত্ব উচ্ছেদের এক অলিখিত মহাপরিকল্পনা কাজ করছিল, সুবে বাংলার এই অবাঙালী অমাত্যেরাও তখন মুর্শিদাবাদের স্বাধীন নবাবের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকেন। জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ এবং মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ নিজেদের সাম্প্রদায়িক ও বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষার তাগিদে বিদেশি সাতসমুদ্র পারের ইংরেজ বণিকদের সাথে হাত মেলান। তারা ভালো করেই জানতেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলার মতো একজন স্বাধীনচেতা ও দেশপ্রেমিক শাসককে গদিচ্যুত করতে না পারলে সুবে বাংলার একচেটিয়া অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে আসবে না (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৬১-১৬৩)। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে সুবে বাংলার বুক জুড়ে যে গভীর চক্রান্তের জাল বোনা হচ্ছিল, তার মূলে ছিল এক চরম আত্মঘাতী আঁতাত। সাড়ে পাঁচ শত বছর ধরে এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সমাজ পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন কিছু অবাঙালী হিন্দু রাজা-মহারাজা এবং রাজস্থানী মাড়োয়ারী বণিক গোষ্ঠী—যেমন জগৎশেঠ, উমিচাঁদ ও রায়দুর্লভরা—তৎকালীন মুসলিম শাসক ও অভিজাতদের প্রতি তীব্র ঈর্ষা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে ওঠেন। স্বাধীনচেতা তরুণ নবাবকে গদিচ্যুত করে বাংলার একচেটিয়া অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতের মুঠোয় নেওয়াই ছিল তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য। নিজেদের এই সংকীর্ণ বাণিজ্যিক ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থরক্ষার তাগিদে তারা ঘরের প্রতিবেশী মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করতে বিদেশি ইংরেজ বণিকদের 'সিনিয়র পার্টনার' হিসেবে ডেকে আনে। এই কুৎসিত আঁতাতেরই চূড়ান্ত ফসল ছিল ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুনের পলাশীর সেই সাজানো নাটকের মঞ্চায়ন। যেখানে প্রতিবেশীর প্রতি তীব্র হিংসা আর ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে স্বদেশের অগণিত বিত্ত, ঐশ্বর্য ও স্বাধীনতা চিরশত্রু বিদেশি কলোনিয়াল শক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮-৯)। পলাশী নাটকের চূড়ান্ত অংকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর, যৌথ ষড়যন্ত্রের হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে ইংরেজরা এই সাম্রাজ্যের ‘সিনিয়র পার্টনার’ বা মূল ভাগ্যবিধাতা হিসেবে ক্ষমতার মসনদে গিয়ে বসে। অন্যদিকে, ক্ষমতার মোহে অন্ধ কোলকাতায়ী বাবু, দেওয়ান ও নবাবের বিশ্বাসঘাতক অমাত্যেরা পরিণত হয় কেবলই ‘জুনিয়র পার্টনারে’। নিজেদের বাণিজ্যিক ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থকে চিরস্থায়ী করতে তারা ইংরেজ প্রভুদের তুষ্ট করার এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

    এই নতুন ক্ষমতার সমীকরণে শুরু হয় বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজকে সর্বস্বান্ত করার এক পরিকল্পিত খেলা। দেশীয় দোসরদের সক্রিয় সহযোগিতায় কলোনিয়াল শক্তি চিরতরে পঙ্গু করে দেয় মুসলমানদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড এবং কেড়ে নেয় শত শত বছরের রাজনৈতিক অধিকার ও জমি-জিরাত। এককালের বিত্তশালী, স্বাধীনচেতা ও শাসক জাতিকে রাতারাতি পরিণত করা হয় কপর্দকহীন ক্ষেতমজুর, কুলি আর নিরেট নিরক্ষর এক দাসে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। একটি জাতির সংস্কৃতি কোনো বিমূর্ত বিলাস নয়। জাতির সামগ্রিক জীবনপ্রক্রিয়া ও বেঁচে থাকার প্রাত্যহিক অনুশীলন তার আসল সংস্কৃতি। মানুষ কীভাবে সম্পদ উৎপাদন করে (অর্থনীতি) এবং সেই সমাজকে কীভাবে শাসন ও রক্ষা করে (রাজনীতি)—এই দুইয়ের জাতিগত ঐতিহ্যবাহী চর্চা বা প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়েই তার সমষ্টিগত মনস্তত্ত্ব, আত্মমর্যাদা ও জীবনধারা গড়ে ওঠে। দর্শন ও সমাজতত্ত্বের গভীর আলোয়, অর্থনীতি হলো সংস্কৃতির বস্তুগত ভিত্তি বা শিকড়, আর রাজনীতি হলো সেই সংস্কৃতির রক্ষাকবচ ও আত্মপ্রকাশের প্রধান বাহন। যখন একটি জাতির নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্র্যাকটিস স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়, তখন তার সংস্কৃতিতে শৌর্য, বীরত্ব ও সৃষ্টিশীলতার জন্ম হয়। কিন্তু যখনই এই দুই চালিকাশক্তির পতন ঘটে, তখন সংস্কৃতির অবদমন ও একটি স্বাধীন জাতির দাসত্বে রূপান্তর অনিবার্য হয়ে পড়ে।

    পলাশী-পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক প্র্যাকটিস ছিল প্রাচুর্য, স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও বিত্তের সংস্কৃতি। কিন্তু পলাশী বিপর্যয়ের পর বৃটিশ ও বর্ণহিন্দুর যৌথ লুণ্ঠন এবং 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের' মতো ঔপনিবেশিক হিংস্রতায় মুসলমানদের চিরদিনের জমি-জিরাত ও ভূ-সম্পত্তি এক ঝটকায় কেড়ে নেওয়া হয়। তাত্ত্বিক পরিভাষায় এটি ছিল 'উৎপাদন সংস্কৃতির হরণ'। যে বিত্তশালী জাতি সুবে বাংলার অর্থনৈতিক প্র্যাকটিসের মূল চালক ছিল, সম্পদ ও অধিকার হারিয়ে রাতারাতি তাদের পরিণত করা হলো কুলি-কামিন আর ক্ষেত-মজুরে। এর ফলে তাদের আত্মমর্যাদাপূর্ণ বস্তুগত সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটে এবং এক চরম পরনির্ভরশীল ও কঙ্কালসার দাসত্বের সংস্কৃতির জন্ম হয়।  অপরদিকে, রাজনীতি হলো সংস্কৃতির আত্মরক্ষার বর্ম। সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনামলে যে শাসন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা এ অঞ্চলের মানুষকে দিয়েছিল রাষ্ট্রিক সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তার প্র্যাকটিস। কিন্তু ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুনের পলাশীর সেই সাজানো নাটকের মাধ্যমে যখন মুসলমানদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পতন ঘটানো হলো, তখন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা তাদের সমস্ত ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব ও শাসন করার গৌরব এক নিমেষে শূন্যতায় পর্যবসিত হলো। রাজদণ্ড হাতছাড়া হওয়ার সাথে সাথে মুসলমানেরা স্বদেশে পরবাসী হয়ে পড়লো। তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের এই অবদমন কেবল ক্ষমতার বদল ছিল না, বরং তা ছিল একটি শাসক জাতির মনস্তত্ত্ব থেকে সার্বভৌমত্বের সংস্কৃতিকে নির্মমভাবে উপড়ে ফেলে তাদের চূড়ান্তভাবে কোণঠাসা ও পঙ্গু করে দেওয়া।

    সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান ও দর্শনের তাত্ত্বিক পরিভাষায়, সংস্কৃতি কেবল সঙ্গীত, উৎসব, পোশাক বা নান্দনিক বিলাস নয়। সংস্কৃতির প্রকৃত সংজ্ঞা হলো, একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর সমগ্র জীবনধারা (Entire way of life)। মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে, কীভাবে সমাজকে সংগঠিত করে এবং কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে তার জীবনধারণের ব্যবস্থাগুলো টিকিয়ে রাখে—তার সামগ্রিক রূপই হলো সংস্কৃতি। অর্থনীতি হলো একটি জাতির সংস্কৃতির বস্তুগত ভিত্তি। এটি এমন এক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে একটি সমাজ সম্পদ উৎপাদন করে, তা বণ্টন করে এবং জীবিকা নির্বাহ করে। কোনো একটি জাতির শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক প্র্যাকটিস—যেমন তাদের কৃষিব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন, ভূমি ব্যবস্থাপনা বা সম্পদ ভাগাভাগির সংস্কৃতি—তাদের সামষ্টিক মূল্যবোধ ও মনস্তত্ত্বকে রূপদান করে। একটি সমাজের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা সরাসরি নির্ধারণ করে যে, তারা শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যের কতটা বিকাশ ঘটাতে পারবে। তাত্ত্বিক দর্শনে অর্থনীতিকে সংস্কৃতির বস্তুগত ভিত্তি বা শিকড় বলা হয়। কোনো জাতি যখন শতাব্দীকাল ধরে স্বনির্ভরতা, বিত্ত ও সমৃদ্ধ বাণিজ্য চর্চা করে, তখন তাদের সংস্কৃতির মনস্তত্ত্বে আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার জন্ম হয়।

    অন্যদিকে, রাজনীতি হলো সংস্কৃতির উপরি-কাঠামো (Super-structure) বা ঢাল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব একটি জাতিকে তার ভাষা, ঐতিহ্য, সমাজব্যবস্থা ও ধর্মীয় রীতিনীতিকে বহিরাগত আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর আইনি ও সামরিক শক্তি দেয়। কোনো জাতির শাসন সংস্কৃতির ইতিহাস যত দীর্ঘ হয়, তার সাংস্কৃতিক পরিচয় তত বেশি সার্বভৌমত্ব, বীরত্ব ও বীরগাথায় সমৃদ্ধ হয়। যেহেতু রাজনীতি ও অর্থনীতি একটি জাতির সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ, তাই এই দুটি ব্যবস্থার সুপরিকল্পিত ধ্বংস বা পতন সরাসরি সেই সংস্কৃতির ওপর এক মরণঘাতী আঘাত। যখন কোনো কলোনিয়াল শক্তি বা বিজয়ী গোষ্ঠী একটি স্বাধীন জাতির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব (তার বর্ম) কেড়ে নেয় এবং তার অর্থনৈতিক সম্পদ (তার শিকড়) লুণ্ঠিন করে, তখন সেই জাতির শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী প্র্যাকটিসগুলো এক নিমেষে ধুলোয় মিশে যায়। বিত্ত ও ক্ষমতা হারিয়ে একটি স্বাধীন শাসক জাতি রাতারাতি চরম দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক পরনির্ভরশীলতায় নিমজ্জিত হয়। এর ফলে, তাদের সংস্কৃতির ভেতরের সেই রাজকীয় অহংকার, মেধার চর্চা ও আত্মমর্যাদা সুপরিকল্পিতভাবে অবদমিত হয় এবং তার জায়গায় স্থান করে নেয় হীনমন্যতা, মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ও নিরক্ষরতার এক পঙ্গু সংস্কৃতি। বাংলার ভাগ্যাকাশে সেই দুর্ভাগ্যের ঘনঘটা নিয়ে আসে যুগপৎ ব্রিটিশ উপনিবেশ ও কতিপয় বর্ণহিন্দু।

    পলাশী-উত্তর সুবে বাংলার এই ভয়াবহ চিত্রটির কথা পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক ও তাদের অনুগত তোষামোদকারী ঐতিহাসিকেরা সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে গেছেন। বিদেশি লেখকদের রচিত বানোয়াট ইতিহাসে ক্ষমতাচ্যুত মুসলিম শাসকদের কেবল ‘ভোগ-বিলাসী’, ‘চরিত্রহীন’ এবং ‘অপদার্থ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যাতে কলোনিয়াল লুণ্ঠন ও তাদের দোসরদের বিশ্বাসঘাতকতাকে নৈতিকভাবে বৈধতা দেওয়া যায় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৬)। অন্যদিকে, দেশপ্রেমিক মুসলিম বিদ্রোহী ও সাব-অল্টার্ন সংগ্রামীদের দেখানো হয়েছে ‘তস্কর’ বা ‘লুটেরা’ হিসেবে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৭)। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পলাশীর আগের সুবে বাংলা ছিল সমগ্র বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক পরম স্বর্গভূমি। যেখানে দারিদ্র্য বা অশিক্ষা বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব সাধারণ মানুষের জানা ছিল না (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮, ২২)। ইউরোপীয়, আফ্রিকান ও এশীয় শত শত পর্যটক ও পরিব্রাজকদের ডায়েরি এবং লেনদেনের হিসাবপত্র পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে, আঠারো শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সুবে বাংলার প্রতিটি মুসলিম পরিবার ছিল সচ্ছল, বিত্তশালী এবং শিক্ষিত (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮)। কিন্তু পলাশীর আম্রকাননে সেই যে সর্বনাশা ঝড়ের সূচনা হয়েছিল, তা সুবে বাংলার প্রাচীন সমাজকাঠামোকে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে এক শতাব্দীর মধ্যে বাঙালি মুসলমানকে এক নিরেট নিরক্ষর, অধিকারহীন ও ভূমিচ্যুত মজুরের জাতিতে পরিণত করে দেয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮-৯)। লুণ্ঠন অর্থনীতির এই সুনির্দিষ্ট কোরিওগ্রাফিই ছিল সুবে বাংলার ইতিহাসে নেমে আসা সবচেয়ে অন্ধকার এবং দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক ট্র্যাজেডির মূল উৎস।

    ফারসি ভাষার রাষ্ট্রীয় উচ্ছেদ এবং মুসলমানদের প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু করার আইনি থিয়েটার

    ১৭৫৭ সালের পলাশী বিপর্যয়ের পর লুণ্ঠন অর্থনীতির সমান্তরালে কলোনিয়াল রাষ্ট্র যে গভীরতম সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক মারণাস্ত্রটি সুবে বাংলার মুসলিম সমাজের ওপর নিক্ষেপ করেছিল, তা ছিল ‘লিঙ্গুইস্টিক জেনোসাইড’ বা ভাষিক নিধনযজ্ঞ (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল কর্তৃক প্রবর্তিত কুৎসিত কলোনিয়াল অ্যাক্ট— ‘অ্যাক্ট ২৯ অব ১৮৩৭’ (Act XXIX of 1837) পাসের মাধ্যমে সুবে বাংলায় দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শত বছর ধরে সুপ্রতিষ্ঠিত, বহমান ও রাজকীয় মর্যাদাশীল ফারসি ভাষাকে সরকারি ও আদালতের ভাষা থেকে রাতারাতি আইনিভাবে উচ্ছেদ করা হয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২১)। এই ভাষিক ও আইনি থিয়েটারটি কেবল একটি ভাষার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল সুবে বাংলার শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা মুসলিম শিক্ষিত অভিজাত, মধ্যবিত্ত, বিচারক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রাতারাতি সম্পূর্ণ কর্মহীন, নিঃস্ব এবং সমাজ থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়ার এক সুগভীর ঔপনিবেশিক চক্রান্ত (ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)। কলোনিয়াল রাষ্ট্রের এই একক আইনি কুঠারাঘাত সুবে বাংলার মুসলিম সমাজকে এক নিদারুণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ‘অভিধানিক আপার্থাইড’ বা ভাষিক বর্ণবাদের (Linguistic Apartheid) খিলানে বন্দি করে ফেলে (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩০)।

    সুবে বাংলায় ফারসি ভাষার রাজকীয় ও প্রশাসনিক ভিত্তি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং ১৩ শতকের প্রথমার্ধে ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ বিজয়ের পর থেকেই ফারসি এ দেশের রাষ্ট্রীয় শাসন, কর আদায় ও বিচারিক ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অর্গানিক উপায়ে বিকশিত হয়েছিল (ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৮)। মধ্যযুগীয় স্বাধীন সুলতান এবং পরবর্তীকালের মোঘল সুবাদারদের সুদীর্ঘ পাঁচ শত বছরের শাসনামলে ফারসি ভাষা ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে এ দেশের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শিক্ষিত ও রাজকীয় আমলাদের ভাবপ্রকাশের একমাত্র আভিজাত্যশীল মাধ্যম হয়ে উঠেছিল (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৫-২৬)। কিন্তু ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে কলোনিয়াল প্রশাসন যখন এই চলন্ত ও উজ্জ্বল ঐতিহ্যবাহী ধারাটিকে চিরতরে অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সুবে বাংলার ১ লক্ষ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাজার হাজার উচ্চ মাদ্রাসার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা কাঠামো এক লহমায় অপ্রাসঙ্গিক ও মূল্যহীন হয়ে পড়ে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২১-২২)। কলোনিয়াল লর্ডরা খুব ভালো করেই জানত, ফারসি ভাষাকে আদালতের মঞ্চ থেকে উচ্ছেদ না করতে পারলে এ দেশের প্রাচীন মুসলিম সমাজকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ও ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ পরাধীন করা সম্ভব নয়। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দের এই কালো আইন পাসের পর সুবে বাংলার জেলা ও সদর আদালতগুলো এক বিভীষিকাময় রূপ পরিগ্রহ করে (ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৪)।

    শত শত বছর ধরে যে মুসলিম কাজি, মুফতি, সেরেস্তাদার এবং উকিলেরা ফারসি ভাষার আইনি পরিভাষা ও শরীয়তি বিধির চুলচেরা বিশ্লেষণে পারদর্শিতা দেখিয়ে আসছিলেন, তারা রাতারাতি নিজেদেরই আদালতে সম্পূর্ণ ‘অশিক্ষিত’ এবং ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত হন (ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)। কলোনিয়াল আইনসভার এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে যে নতুন ইংরেজি এবং লৌকিক ভাষার মিশ্রণ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা ছিল মুসলিম শিক্ষিত সমাজের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। অন্যপক্ষে, কলোনিয়াল শাসকদের কৃপা ও পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বহু আগে থেকেই ইংরেজি ভাষা রপ্ত করতে শুরু করায় তারা দ্রুত আদালতের সমস্ত পদ এবং কর আদায়ের সেরেস্তাগুলো কব্জা করে ফেলে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। এর ফলে, সুবে বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজ কেবল তাদের জীবিকাই হারায়নি, বরং নিজেদের ঘরের দলিল, ওয়াকফনামা এবং জমি-জিরাতের আইনি স্বত্ব প্রমাণের ভাষিক ক্ষমতাটুকুও চিরতরে হারিয়ে ফেলে। প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার এই সুপরিকল্পিত রূপান্তর সুবে বাংলার মুসলিম মননে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। ফারসি ভাষা উঠে যাওয়ার পর থেকে মুসলিম জনসমষ্টির কাছে কলোনিয়াল আইন আদালতগুলো হয়ে ওঠে এক মস্তবড় ফাঁদ ও লুণ্ঠনের আখড়া (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩০)। যার প্রভাব বাংলার কর্পোরেট জগতে আজও বিদ্যমান। এ দেশের সাধারণ মুসলমানরা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, বিদেশি ফিরিঙ্গি রাজশক্তির এই আইনি কোরিওগ্রাফি মূলত তাদের জাতীয় ও ধর্মীয় পরিচয়কে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার এক সর্বগ্রাসী কদর্য চক্রান্ত। সুদীর্ঘ সাড়ে পাঁচশত বছরের ঐতিহ্যবাহী সরকারী জবানকে বিসর্জন দেওয়ার এই ঔপনিবেশিক ট্র্যাজেডি বাঙালি মুসলিম মানসকে এতটাই স্তম্ভিত ও কোণঠাসা করে ফেলেছিল যে, পুরো উনিশ শতক জুড়ে তাদের সৃষ্টিশীলতার ধারাটি অত্যন্ত ক্ষীণস্রোতা হয়ে পড়ে এবং তারা কেবল বিদ্রোহ ও আত্মরক্ষার লড়াইয়ে নিজেদের জানমাল উৎসর্গ করতে বাধ্য হয় (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। এখনো আমরা সিস্টেম পরিবর্তনের মূলে কৌশলগত পদক্ষেপ ও বাস্তব কাঠামো গড়ার বদলে নিজেদের জান-মাল উৎসর্গ করাকেই সমাধান ভাবছি৷ যেটা মূলত ঔপনিবেশিক মন ও তৎকালীন চক্রান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে জন্মেছে। ঠাণ্ডা মাথায় বাস্তব সমাধানের পথ এখতিয়ারে আমাদের অনীহা আজও টেকসই সমাধান খোঁজার পথে অন্তরায়।

    ব্রিটিশরাজ কর্তৃক ফারসি ভাষার এই রাষ্ট্রীয় উচ্ছেদ সুবে বাংলার মুসলমানদের কেবল প্রশাসনিকভাবে পঙ্গুই করেনি, বরং তাদের প্রাচীন শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মর্যাদার সৌধটিকেও ভিত্তিমূল থেকে উপড়ে ফেলেছিল (ফাহমিদ-উর-রহমান, মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৩০-৩১)।

    কলকাতার ‘দূরবীন’ পত্রিকার কুৎসিত বিজ্ঞাপন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের জুডিশিয়াল রেকর্ড

    ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ‘অ্যাক্ট ২৯’ পাসের মাধ্যমে ফারসি ভাষার দাপ্তরিক বিলুপ্তি ঘটিয়ে কলোনিয়াল রাষ্ট্র সুবে বাংলার মুসলমানদের প্রশাসনিক মেরুদণ্ডটি যেভাবে ভেঙে দিয়েছিল, উনিশ শতকের শেষার্ধে এসে সেই প্রাতিষ্ঠানিক অবদমন ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ এক কুৎসিত এবং নগ্নতম রূপ পরিগ্রহ করে (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৯; ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৪)। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে কলকাতার বুক থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত ফারসি সাময়িকী ‘দূরবীন’ পত্রিকায় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অত্যন্ত উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার দাপ্তরিক সিলমোহরসহ একটি সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। যা কলোনিয়াল জুডিশিয়াল রেকর্ডের ইতিহাসে চিরকালের জন্য এক অকাট্য ও বর্ণবাদী কালো দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। সুন্দরবন কমিশনারের কার্যালয়ের তৎকালীন অফিসার কর্তৃক প্রেরিত এবং সরকারি গেজেটে বিজ্ঞাপিত সেই চরম বৈষম্যপূর্ণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ্য রাজকীয় ঘোষণায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, “শূন্য পদগুলিতে কেবলমাত্র হিন্দুদের নিয়োগ করা হবে” (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৯)। এই অসম এবং বিভৎস বিজ্ঞাপনটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল পলাশী-উত্তর সুবে বাংলায় ব্রিটিশ ও উচ্চবর্ণের তোষণকারী হিন্দু বুদ্ধিজীবী সিন্ডিকেটের যৌথ ব্যবস্থাপনায় সুপ্রতিষ্ঠিত এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও জুডিশিয়াল আপার্থাইডের অকাট্য রাষ্ট্রীয় প্রমাণ (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১০; গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৫২)।

    ১৮৬৯ সালের এই বর্ণবাদী বিজ্ঞাপনের গভীরতা ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উনিশ শতকের মধ্যভাগ নাগাদ সুবে বাংলার সরকারি অফিস, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং নবগঠিত পুলিশ বিভাগের প্রতিটি উচ্চ ও নিম্ন স্তরের পদ থেকে মুসলমানদের পদ্ধতিগতভাবে হটিয়ে দেওয়ার কলোনিয়াল ফ্যাসিবাদ চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৯-১০)। ‘দূরবীন’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মূল পাঠটি তীব্র হীনম্মন্যতা ও রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞার শিকার বাঙালি মুসলিম তরুণদের মানসভূমিকে সম্পূর্ণ চূর্ণ করে দিয়েছিল। যেখানে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মীয় ও ভাষিক স্বাতন্ত্র্যের কারণে একটি প্রকাণ্ড সমাজকে রাষ্ট্রীয় চাকরি থেকে আইনি নোটিশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ‘অপাক্তেয়’ ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কলোনিয়াল গেজেটের এই প্রচ্ছন্ন ঔপনিবেশিক নীতি সুবে বাংলার এককালের শাসক ও মধ্যবিত্ত সমাজকে কতটা চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তা সমকালীন ব্রিটিশ সিভিলিয়ান উইলিয়াম হান্টারের দাপ্তরিক নথিতেও অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যেখানে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন, বাংলায় মুসলমানদের জন্য এমন কোনো সরকারি পদ আর অবশিষ্ট রাখা হয়নি, যা তাদের আভিজাত্য বা ন্যূনতম জীবন ধারণের নিশ্চয়তা দিতে পারে (ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ২২; গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪)।

    এই প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন ও বৈষম্যের চাকাটি সচল রাখার জন্য কলোনিয়াল বিচার বিভাগ ও ঔপনিবেশিক আমলারা যে গভীরতম ‘জুডিশিয়াল রেকর্ড’ তৈরি করেছিলেন, তার মূলে ছিল সুবে বাংলার মুসলমানদের চিরতরে প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু করে রাখার এক রাজকীয় জিঘাংসা (ড. মুঈন উদ-দীন আহমদ খান, বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৪)। অফিস, আদালত ও পুলিশ বিভাগে মুসলমানদের নিয়োগের আবেদনপত্রগুলো জমা নেওয়ার আগেই সরকারি আমলারা সেগুলোকে সরাসরি আবর্জনার ঝুড়িতে নিক্ষেপ করতেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার শর্তাবলীতে এমন সব কড়াকড়ি নিয়ম যুক্ত করা হতো, যা কেবল ইংরেজি ও সংস্কৃতায়িত নব্য বাংলা ভাষায় পারদর্শী কলকাতার বাবু ও কায়স্থ বুর্জোয়াদের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব ছিল (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৯; ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১০)। এই সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক বর্জনের ফলে সুবে বাংলার প্রতিটি পুলিশ থানা, সেরেস্তা ও কালেক্টরেট অফিসগুলো একচেটিয়াভাবে মুসলিম-বিদ্বেষী তোষামোদকারী আমলাদের কারখানায় পরিণত হয় (মোশাররফ হোসেন খান, হাজী শরীয়তুল্লাহ, পৃষ্ঠা ১০)। এর অনিবার্য পরিণতিতে, গ্রামীণ ও শহুরে মুসলিম সমাজ কেবল তাদের রুটি-রুজির শেষ আশ্রয়টুকুই হারায়নি, বরং কলোনিয়াল রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ আইনি ও পুলিশি সুরক্ষাহীন এক নিদারুণ ব্রাত্য জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়।

    ‘দূরবীন’ পত্রিকার এই কুখ্যাত বিজ্ঞাপনটি বাঙালি মুসলিম সমাজকে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে তারা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, ব্রিটিশ তোষণকারী নব্য ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের নিচে তাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিপন্ন। সরকারি গেজেটের মাধ্যমে মুসলমানদের চাকরি পাওয়ার সমস্ত আইনি পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার এই প্রচ্ছন্ন ঔপনিবেশিক ফ্যাসিবাদ সুবে বাংলার লোকজীবনে এক গভীর ক্ষোভ ও তীব্র হীনম্মন্যতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। যা পরবর্তীতে বিভিন্ন মুক্তিকামী আন্দোলন ও গণ-বিস্ফোরণের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল (গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ইতিহাসের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৫২; ফারুক মাহমুদ, ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৯)। ১৮৬৯ সালের এই কুখ্যাত বিজ্ঞাপনের জুডিশিয়াল রেকর্ড তাই সুবে বাংলার মুসলমানদের কেবল অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংসই করেনি, বরং কলোনিয়াল রাষ্ট্র ও ভদ্রলোক সংস্কৃতির কারখানার মধ্যবর্তী সেই নগ্ন ও অশুভ আঁতাতকে ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য উন্মোচিত করে দিয়ে গেছে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment