Loading...

‘বিসমিল্লাহখানি’ উৎসবের পুনরুদ্ধার এবং মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার অস্তিত্ব গঠন

‘বিসমিল্লাহখানি’ উৎসবের পুনরুদ্ধার এবং মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার অস্তিত্ব গঠন
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    বিসমিল্লাহখানি উৎসব, গৌড়ের মুসলিম সুলতানদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতীকী ঐতিহাসিক দৃশ্য
    প্রতীকী ঐতিহাসিক ইলাস্ট্রেশন: বিসমিল্লাহখানি শিক্ষাচর্চা, সুলতানি আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ঔপনিবেশিক যুগের শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর

    Previous Part.......

    ৪:৫

    ‘বিসমিল্লাহখানি’ উৎসবের সামাজিক কৃষ্টি এবং কলোনিয়াল শিক্ষানীতির মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক অবদমন

    উনিশ শতকের কলোনিয়াল নান্দনিক উপনিবেশায়ন সুবে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে ধ্বংস করেনি, বরং তা গ্রামীণ জনপদের হাজার বছরের মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক ও লৌকিক কৃষ্টির ওপর এক গভীর আঘাত হেনেছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও রাবীন্দ্রিক উচ্চ-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একচেটিয়া প্রচারযন্ত্রের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া বাংলার মাটির আসল, দেশজ এবং ঐতিহাসিক প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় মাইলফলকটি ছিল ‘বিসমিল্লাহখানি’ উৎসব। এই লোকায়ত ঐতিহ্যটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং তা ছিল বাংলার পলল ভূমিতে বেড়ে ওঠা প্রতিটি মুসলিম শিশুর সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে প্রবেশের প্রথম মহত্তম উৎসব। যখন একটি শিশুর বয়স চার বছর, চার মাস, চার দিন পূর্ণ হতো, তখন অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অক্ষরের দুনিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো। এই নির্দিষ্ট দিনে পরিবারের প্রবীণ সদস্য, স্থানীয় পীর-মাশায়েখ কিংবা মক্তবের উস্তাদরা পবিত্র কুরআনের আদি আয়াত ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক’ অথবা ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বাক্যটি উচ্চারণের মাধ্যমে শিশুর বিদ্যাশিক্ষার সূচনা ঘটাতেন।

    এই উৎসবের সামাজিক কৃষ্টি ও মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি গ্রামীণ বাংলার সমাজকে এক অভূতপূর্ব আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করত। বিসমিল্লাহখানির এই পবিত্র দিনে ধনী-দরিদ্রের বাহ্যিক ভেদাভেদ ভুলে পাড়া-প্রতিবেশী ও কওম সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একত্রে মিলিত হতো। শিশুর জন্য কল্যাণ কামনা করত। এটি ছিল সুবে বাংলার মুসলমানদের এক স্বাধীন ও স্বকীয় প্রাথমিক শিক্ষাকাঠামোতে প্রবেশের ধাপ। যা কোনো রাষ্ট্রীয় বা ঔপনিবেশিক অনুদান ছাড়াই গ্রামীণ অবৈতনিক মক্তব ও মাদরাসাগুলোর মাধ্যমে শতাব্দী ধরে টিকে ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন শাসননীতি এবং তাদের সুপরিকল্পিত কলোনিয়াল শিক্ষানীতি এই দেশজ কৃষ্টির ওপর এক সর্বগ্রাসী অবদমন প্রক্রিয়া শুরু করে। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এবং লর্ড মেকলের ১৮৩৫ সালের ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির (The Educational Resolution of 1835) মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল, বাংলার মাটি ও মানুষের চিরাচরিত অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সমূলে উপড়ে ফেলা। কলোনিয়াল প্রশাসন এক সুগভীর আইনি চক্রান্তের মাধ্যমে সুপ্রাচীনকাল থেকে চলে আসা মুসলমানদের নিষ্কর লাখেরাজ ভূমি ও রাষ্ট্রীয় ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো রাতারাতি বাজেয়াপ্ত বা রেজাম্পশন (Resumption Proceedings) করতে শুরু করে। যার আয়ের ওপর ভর করে বাংলার হাজার হাজার গ্রামীণ মক্তব ও মাদরাসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সাধারণ মানুষের মাঝে বিসমিল্লাহখানির এই কৃষ্টি টিকিয়ে রাখত (Ali, Muhammad Mohar. History of the Muslims of Bengal, Vol. 2A, p. 113, 161)। এই আইনি শোষণের ফলে গ্রামীণ অবৈতনিক শিক্ষার মূল অর্থনৈতিক উৎসটি রাতারাতি ধসে পড়ে। যার ফলে বিসমিল্লাহখানির মতো দেশজ প্রাথমিক শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটি চিরতরে লুপ্ত ও কোণঠাসা হয়ে যায়।

    কোম্পানি সরকারের এই শিক্ষানীতির আরেকটি মারাত্মক বৈষম্যমূলক রূপ প্রকট হয়েছিল হুগলির দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসীনের ওয়াকফ ট্রাস্টের বিপুল অর্থ সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাৎ করার মাধ্যমে। ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর গ্রন্থের অকাট্য দাপ্তরিক বিবরণী থেকে জানা যায়, মুসলিম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও অবৈতনিক মাদরাসা পরিচালনার জন্য উৎসর্গীকৃত মহসীন ফান্ডের বিপুল পরিমাণ অর্থ কলোনিয়াল শিক্ষাকর্তারা সুকৌশলে ডাইভার্ট করে কলকাতার ‘হিন্দু কলেজ’ ও ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে ও হিন্দু ছাত্রদের স্কলারশিপ প্রদানে ব্যয় করতে শুরু করে (Ali, Muhammad Mohar. History of the Muslims of Bengal, Vol. 2A, p. 168)। এই চতুর প্রাতিষ্ঠানিক ডাইভারশনের ফলে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মুসলমানরা তাদের নিজেদের ঘরের ধর্মীয় ট্রাস্টের টাকা থেকে বঞ্চিত হয়। যা তাদের প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার পথকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়। ডক্টর ওয়াকিল আহমদের ‘উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের "শিক্ষা ও ছাত্রাবাস আন্দোলন" অধ্যায়ের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানে (পৃষ্ঠা ৯৬) স্পষ্ট দেখানো হয়েছে, কীভাবে কলোনিয়াল সরকারের এই বৈষম্যমূলক নতুন শিক্ষানীতি এবং হিন্দু কলেজের একচেটিয়া পৃষ্ঠপোষকতার কারণে উনিশ শতকের শেষভাগে এসে মুসলিম শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক হার মাত্র এক থেকে দুই শতাংশে নেমে এসেছিল।

    কলকাতার এই অগ্রসর ভদ্রলোক সমাজ যখন কলোনিয়াল রাজত্বের প্রত্যক্ষ ছায়াতলে একচেটিয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার মালিক হয়ে বসল, তখন তারা এই আদিম সুফি-মরমি ও বিসমিিল্লাহখানির ঐতিহ্যকে ‘সংস্কৃতিহীন’ বা ‘ব্যাকওয়ার্ড’ বলে সমাজ থেকে তীব্র অপদস্থ করতে শুরু করে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫২)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ধর্ম’ গ্রন্থের ‘উৎসব’ এবং ‘মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে মিলনের যে বিশ্বজনীন তত্ত্ব হাজির করেছিলেন এবং মানুষের স্বার্থের স্বাতন্ত্র্যকে অতিক্রম করে এক অখণ্ড সত্যকে স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তা পূর্ববঙ্গের এই অবদমিত মুসলমান সমাজের ক্ষেত্রে এক চরম ঐতিহাসিক বৈপরীত্য তৈরি করেছিল (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৮, ২১)। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ধর্মপ্রচার’ প্রবন্ধে দাবি করেছিলেন, ধর্মের সরল আদর্শ ঈশ্বরের এক অকৃপণ দান। যা কোনো কৃত্রিম কল-কারখানা বা মতবাদের অপেক্ষা রাখে না (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৩৬, ৭৩)। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ও শান্তিনিকেতনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারযন্ত্র এই সৌন্দর্য ও উৎসবতত্ত্বকে এমন এক ছদ্ম-সেক্যুলার ‘এলিট এস্থেটিক্স’ বা উচ্চ-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রূপান্তর করেছিল, যা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের প্রাত্যহিক যাপিত জীবনের ভাষা ‘পানি, আব্বা, আম্মা, গোসল’ এবং তাদের ঘরের চিরন্তন বিসমিল্লাহখানির মতো খাঁটি মাটির ঐতিহ্যগুলোকে ‘খ্যাত’ বা আদিম বলে বর্জন করার এক সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক জাল বুনে দিয়েছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২১; আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার এন্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)। এইভাবেই, একদিকে কোম্পানির আইনি রেজাম্পশন প্রোসিডিংসের মাধ্যমে বিসমিল্লাহখানির প্রাতিষ্ঠানিক উৎসকে ধসে দেওয়া হলো, অন্যদিকে রাবীন্দ্রিক নান্দনিকতার মিষ্টি আবরণে সংখ্যাগুরু মানুষের ঘরের আসল প্রাথমিক শিক্ষার কৃষ্টিকে সুশীল মনোজগৎ থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করে এক দীর্ঘমেয়াদী হীনম্মন্যতার জন্ম দেওয়া হলো। যার শেকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২৬)।

    বাংলায় মুসলিম বিজয় ও গৌড়ের মুসলিম সুলতানদের বাংলা ভাষাকে রাজকীয় আশ্রয়

    ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর নদীয়া বিজয়ের পর সুবে বাংলার রাজনৈতিক পটভূমি মন্থন করে যে সুলতানী আমল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা এদেশের মানুষের প্রাকৃত ঐতিহ্য ও মুখের ভাষাকে কেবল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং তাকে রাজকীয় উর্বর পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থের আদি ও গভীরতম তাত্ত্বিক অধ্যায়সমূহ বিশ্লেষণ করলে এই ঐতিহাসিক মহাসত্যের অকাট্য প্রামাণিক রূপটি উন্মোচিত হয়। দীনেশচন্দ্র সেন প্রামাণ্য দলিলের সাহায্যে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, যদি গৌড়ের মুসলিম সুলতানরা রাজকীয় অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে কৃত্তিবাসী রামায়ণ বা মহাভারত বাংলায় অনুবাদ করার নির্দেশ না দিতেন, তবে উচ্চবর্ণের সংস্কৃতপন্থী হিন্দুদের সেই ‘রৌরব নরক’ ফতোয়ার নির্মম চাবুকের নিচে চাপা পড়ে বাংলা ভাষা উনিশ শতকের বহু আগেই চিরতরে বিলুপ্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ১০২)। মুসলিম সুলতানেরা এদেশের প্রাকৃত ও কওম সমাজকে আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি তাদের মুখের ভাষাকে রাজদরবারের প্রধান ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাদের স্বাধীন কৃষ্টি ও আচার পালনের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এই রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার চরিত্রটি নিছক কোনো দরবারী সাহিত্য বিলাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদ। মধ্যযুগের মুসলিম সুলতানেরা এদেশের দেশজ শিক্ষা ও বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারের জন্য সুনির্দিষ্ট লাখেরাজ বা করমুক্ত ভূমি এবং রাষ্ট্রীয় ওয়াকফ অনুদান মঞ্জুর করেছিলেন (মজুমদার, রমেশচন্দ্র। বাংলা দেশের ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড: মধ্যযুগ), পৃষ্ঠা ২৪২)। রাজদরবারের বাইরেও গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের মাঝে বাংলা ভাষার সাহিত্যিক রূপকে বিকশিত করার জন্য সুলতানদের এই প্রত্যক্ষ আর্থিক অনুদানই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।

    ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখার বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, সুবে বাংলার মুসলিম সুলতান ও আমলাদের এই উদার নীতি এদেশের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কবিদের এক স্বাধীন ও নিরাপদ সৃষ্টির জগত উপহার দিয়েছিল। যার ফলে মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য ও অনুবাদ সাহিত্যের এক অভূতপূর্ব স্বর্ণযুগ তৈরি হয় (Ali, Muhammad Mohar. History of the Muslims of Bengal, Vol. 2A, p. 39)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ধর্ম’ গ্রন্থের ‘প্রাচীন ভারতের একঃ’ এবং ‘ধর্মের সরল আদর্শ’ প্রবন্ধে যে অখণ্ড সত্য, ভূমা ও ঈশ্বরের আপনাকে দান করার সরলতা নিয়ে সুগভীর আধ্যাত্মিক আলোচনা করেছেন। উনিশ শতকের কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ সেই দর্শনের আড়ালে সুকৌশলে এক নতুন নান্দনিক উপনিবেশায়নের জাল বুনেছিল (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৪৪, ২৮)। একই গ্রন্থের ‘উৎসব’ প্রবন্ধে দাবি করেছিলেন, সত্যের পরিপূর্ণতাই প্রকাশ এবং সত্য প্রেমরূপে অন্তঃকরণে আবির্ভূত হলেই মানুষের দৈন্য দূর হয় (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৮-১৩)।

    কিন্তু বাস্তব ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, রবীন্দ্রদর্শনের এই মরমী আধ্যাত্মিকতা ও বিমূর্ত সত্য-প্রেমের বয়ান আসলে কলকাতার নব্য শিক্ষিত ভদ্রলোক তথা শোষক জমিদার শ্রেণীর এক আদর্শিক আড়াল। যার সমান্তরালে তারা ইংরেজ প্রভুদের দালালি করার নন্দনতত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন। পাশাপাশি ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের চতুর আইনি চাবুক ব্যবহার করে সুবে বাংলার হাজার বছরের সুলতানী লাখেরাজ ভূমি ও ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো রাতারাতি বাজেয়াপ্ত বা রেজাম্পশন (Resumption Proceedings) করতে শুরু করেছিলেন (Ali, Muhammad Mohar. History of the Muslims of Bengal, Vol. 2A, p. 113)। ফলে, রবীন্দ্রভাবনার এই তথাকথিত উদার দর্শন আদতে শোষক শ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থকেই সুরক্ষা দেয়। যেখানে একদিকে আধ্যাত্মিক বাণীর আফিমে সাধারণ মানুষের বাস্তব ও অর্থনৈতিক দৈন্যকে আড়াল করার চেষ্টা চলে। আর অন্যদিকে আইনি শোষণের নির্মম বাস্তবতায় বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেওয়া হয় চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে। এর ফলে এদেশের প্রাকৃত মানুষের আসল প্রাথমিক শিক্ষার মাইলফলক বিস্মিল্লাহখানি ও বাংলা ভাষার টিকে থাকার যে প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদ মধ্যযুগ থেকে চলে আসছিল, তা উনিশ শতকে এসে সম্পূর্ণ ধসে পড়ে এবং বাঙালি মুসলমানের মনোজগৎকে এক চিরস্থায়ী হীনম্মন্যতা ও নান্দনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলা হয় (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫২; রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১৫)।

    কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও মহাভারত অনুবাদে সুলতানি অবদান এবং কলকাতার বাবুদের ঐতিহাসিক চুরি

    সুবে বাংলার মধ্যযুগীয় সাহিত্যের প্রকৃত ইতিহাস এবং তার অভ্যন্তরীণ বিকাশধারাটি পর্যালোচনা করলে যে সত্যটি সবচেয়ে জাজ্বল্যমান হয়ে ওঠে, তা হলো এ দেশের কওম ও প্রাকৃত ভাষার প্রধান রক্ষাকর্তা এবং পৃষ্ঠপোষক ছিলেন গৌড়ের মুসলিম সুলতান ও রাজন্যবর্গ। আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী স্মার্ত সমাজের চাপানো কট্টর ‘রৌরব নরক’ ফতোয়ার জাঁতাকল থেকে বাংলা ভাষাকে মুক্ত করে রাজদরবারে সম্মানের আসনে বসানোর যে বৈপ্লবিক প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল, তা মূলত সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের আমল থেকে শুরু করে আলাউদ্দীন হুসেন শাহের বংশীয় শাসনকাল পর্যন্ত এক প্রগাঢ় রাজনৈতিক ও নান্দনিক ঔজ্জ্বল্যের বুনিয়াদ লাভ করে। রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ ও প্রাচীন সাহিত্যের গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থের আদি ও গভীরতম তাত্ত্বিক পরিচ্ছেদসমূহে অকাট্য প্রামাণিক দলিলের সাহায্যে এই মহাসত্যের রূপটি উন্মোচন করেছেন। দীনেশচন্দ্র সেন স্পষ্ট ভাষায় নথিবদ্ধ করেছেন যে, হিন্দু রাজাদের কট্টর সংস্কৃতপ্রীতির বিপরীতে এ দেশের মাটির প্রাকৃত বাংলা ভাষাকে রাজকীয় মর্যাদা দিয়ে প্রথম বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন বাংলার মুসলিম শাসকেরা (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ১০২)। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ‘বাংলা সাহিত্যের কথা (২য় খণ্ড: মুসলিম যুগ)’ গ্রন্থের সুনির্দিষ্ট কালানুক্রমিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গৌড়ের স্বাধীন সুলতানদের প্রত্যক্ষ রাজকীয় ফরমান এবং সুনির্দিষ্ট আর্থিক অনুদান ছাড়া মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদ সাহিত্যসমূহ, বিশেষ করে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয় এবং পরাগল খানের মহাভারত অনুবাদ সম্পন্ন হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না (আহমদ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা সাহিত্যের কথা (২য় খণ্ড: মুসলিম যুগ), পৃষ্ঠা ৪২)।

    গৌড়ের প্রজাহিতৈষী সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজদরবারে কবি শাহ মুহাম্মদ সগীরকে যেভাবে রাজকীয় আশ্রয় দিয়ে ‘ইউসুফ-জুলেখা’র মতো কালজয়ী মানবিক আখ্যান রচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। পরবর্তীকালে সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহ এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র নসরৎ শাহের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর এবং শ্রীকর নন্দী মহাভারতের যে আদি অনুবাদসমূহ সম্পন্ন করেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। যার ফলে এ দেশের সাধারণ মানুষের মনোজগতে মাতৃভাষার প্রতি এক বিপুল আত্মিক জাগরণের জন্ম হয় (আহমদ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা সাহিত্যের কথা (২য় খণ্ড: মুসলিম যুগ), পৃষ্ঠা ৫৮)। লৌকিক কৃষ্টির এই বিকাশধারাটি রাজদরবারের উচ্চ মহলের বাইরেও গ্রামীণ সুবে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই রাজকীয় উর্বর পৃষ্ঠপোষকতাই ছিল মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত চালিকাশক্তি, যা আর্যাবর্তের প্রাচীন সামাজিক ও বৈষম্যমূলক আপার্থাইড থেকে এ দেশের মানুষের মুখের ভাষাকে স্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করেছিল।

    কিন্তু উনিশ শতকের শুরুতে এসে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রত্যক্ষ ছায়াতলে এবং কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রক্তভেজা বিত্তের ওপর দাঁড়িয়ে, কলকাতার যে নব্য কায়স্থ ও হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী গড়ে উঠেছিল, তারা এক সুসংগঠিত ঐতিহাসিক ও নান্দনিক চুরির চতুর মেকানিজম তৈরি করে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, পৃষ্ঠা ৫৬)। এই নব্য শোষক জমিদার শ্রেণী ইংরেজ প্রভুদের দালালি করে এবং কোম্পানির ‘রেজাম্পশন প্রোসিডিংস’ বা লাখেরাজ ভূমি বাজেয়াপ্তকরণের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি চাবুক ব্যবহার করে মধ্যযুগ থেকে চলে আসা মুসলমানদের সেই সব করমুক্ত ভূমি ও রাষ্ট্রীয় ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো রাতারাতি কেড়ে নেয়, যার ওপর ভর করে এ দেশের মূল ধারার মুসলিম শিক্ষা, বিসমিল্লাহখানি উৎসব এবং দেশজ ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন টিকে ছিল (Ali, Muhammad Mohar. History of the Muslims of Bengal, Vol. 2A, p. 113, 161)। এই বিপুল অর্থনৈতিক লুণ্ঠন সম্পন্ন করার পর, কলকাতার ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা সাহিত্য, ভাষা ও কৃষ্টির প্রতিপালন নিয়ে ইতিহাসের এক নতুন গল্প সাজাতে শুরু করেন। যার মূখ্য বয়ান ছিলো, মধ্যযুগের মুসলিম শাসনকাল ছিল এক নিদারুণ ‘অন্ধকার যুগ’ এবং বাংলা ভাষার আদি ও প্রকৃত বিকাশ ঘটেছে কেবল উনিশ শতকের কলকাতার গঙ্গাপাড়ের কিছু বাবুদের তথাকথিত ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’-এর হাত ধরে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)। তারা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের এবং মুসলিম সুলতানদের এই অসামান্য ও অবিসংবাদিত অবদানের প্রামাণ্য ইতিহাসকে সুপরিকল্পিতভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বা ছেঁটে ফেলে দিয়ে পুরো ক্রেডিট নিজেদের রেনেসাঁসের খাতায় ঢুকিয়ে নেয় (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ১০৫)।

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ধর্ম’ গ্রন্থের ‘উৎসবের দিন’ এবং ‘মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে যে সত্যের অখণ্ডতা, মিলনের প্রাচুর্য এবং অন্তরাত্মার চিরন্তন ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন, তা কলকাতার ভদ্রলোক সমাজের এই ঐতিহাসিক চুরির বাস্তব রূপটির সামনে এক চরম ঐতিহাসিক পরিহাস হিসেবে হাজির হয় (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৮, ১২, ২১)। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ধর্মপ্রচার’ প্রবন্ধে দাবি করেছিলেন, অহংকার, তর্ক ও বিরোধের স্থানে ব্রহ্মের বিশ্বযজ্ঞোৎসবের আহ্বান উপহসিত হয়ে ফিরে আসে এবং পুণ্যকর্ম যেখানে অভ্যস্ত আচারমাত্রে পর্যবসিত হয়, সেখানে সমস্ত আলোকলিপি রুদ্ধ হয়ে পড়ে (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৭৩)। কিন্তু বাস্তব ইতিহাসের সত্য হলো, কলকাতার এই হেজিমনিক শ্রেণীটি রাবীন্দ্রিক নান্দনিকতার মিষ্টি ও ছদ্ম-সেক্যুলার অবয়বকে এক প্রক্সি-ধর্ম বা বিকল্প বিশ্বাসের প্রাতিষ্ঠানিক কাল্ট হিসেবে ব্যবহার করে পূর্ববঙ্গের তাওহিদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টির মনোজগৎকে সম্পূর্ণ পঙ্গু ও নিরস্ত্র করে ফেলেছিল (আহমদ, খন্দকার আশরাফ। দ্য বেঙ্গলি মাইন্ড: এসেস অন কালচার অ্যান্ড লিটারেচার, পৃষ্ঠা ১১২)। তারা সাহিত্যের জগত থেকে এ দেশের মানুষের আসল ত্রাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের খাটো করে একদল ছদ্ম-সেক্যুলার দেবতাকে সিংহাসনে বসায়। যার ফলে একজন মুসলমান নিজের ঘরের তাওহিদি পরিচয়, লুঙ্গি বা শবে বরাতের মতন খাঁটি মাটির ঐতিহ্যগুলোকে ‘খ্যাত’ বা আদিম বলে হীনম্মন্যতায় বর্জন করতে শুরু করে (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৫, ৭)।

    কলকাতার ‘রেনেসাঁস’ বাবুদের ঐতিহাসিক চুরি, নান্দনিক উপনিবেশায়নের চূড়ান্ত সমাপনী ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির ইশতেহার

    উনিশ শতকের কলকাতার তথাকথিত ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’-এর মায়াবী আবরণের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক নান্দনিক উপনিবেশায়নের কংক্রিট বাস্তবতা। যার চূড়ান্ত সমাপনী টানতে গেলে যে ঐতিহাসিক সত্যটি সবচেয়ে বেশি উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন, তা হলো সুবে বাংলার মৌলিক ভাষিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের সুপরিকল্পিত জালিয়াতি। কোম্পানি আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং সূর্যাস্ত আইনের নিগড়ে রাতারাতি গজিয়ে ওঠা কলকাতার নব্য কায়স্থ ও হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী কেবল এদেশের প্রাক-কলোনিয়াল মুসলিম জমিদারদের ভূ-সম্পত্তিই লুণ্ঠন করেনি, বরং তারা এদেশের সংখ্যাগুরু মানুষের সামগ্রিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৪)। মধ্যযুগে আর্য ও সেন রাজাদের প্রবর্তিত ‘রৌরব নরক’ ফতোয়ার বর্ণবাদী শাসন থেকে বাংলা ভাষাকে মুক্ত করে, মুসলিম সুলতানেরা দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে রাজকীয় আশ্রয় ও লাখেরাজ (নিষ্কর) ভূমির অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু উনিশ শতকের কলকাতার বাবু বুদ্ধিজীবীরা সেই অসামান্য অবদানের প্রামাণ্য ইতিহাসকে সুনিপুণভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেয় (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ১০২)। ইতিপূর্বে জেনেছি, লর্ড কর্নওয়ালিসের এই নব্য শোষক শ্রেণীটি এদেশের প্রাকৃত মানুষের আসল প্রাথমিক শিক্ষার মাইলফলক ‘বিসমিল্লাহখানি’ ও দেশজ শিক্ষার সমস্ত অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে চিরতরে ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। এই বিপুল ঐতিহাসিক চুরির পর কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, সঙ্গীত ও উপনিষদীয় ব্রহ্মজ্ঞানকে কেন্দ্র করে ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ (Rabindra-Religion) নামক  একটি সমান্তরাল প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্সি-বিশ্বাস ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব আকর গ্রন্থ ‘ধর্ম’ (১৩১৫ বিশ্বভারতী সংস্করণ)-এর গভীরতম পাতাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর ‘ধর্মপ্রচার’, ‘মনুষ্যত্ব’ এবং ‘ধর্মের সরল আদর্শ’ প্রবন্ধে যে ভূমা, অখণ্ড সত্য ও ঈশ্বরের আপনাকে দান করার সহজ সরলতাকে বাঙালি সংস্কৃতির একমাত্র পরম উৎস হিসেবে হাজির করা হয়েছিল, তা কথিত সুশীল সমাজের কাছে এক অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র আচারে পরিণত হয় (ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ধর্ম, পৃষ্ঠা ৪, ২১, ২৮)। কিন্তু বাস্তব ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, এই ছদ্ম-সেক্যুলার ‘এলিট এস্থেটিক্স’ বা উচ্চ-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটি পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের মুখের জীবন্ত আরবি-ফারসি মিশ্রিত প্রাকৃত শব্দগুলোকে ‘ম্লেচ্ছ’ বা ‘অশুদ্ধ’ বলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে তীব্র অপদস্থ করতে শুরু করে। যার ফলে একজন মুসলমান নিজের ঘরের তাওহিদি পরিচয়, লৌকিক পোশাক লুঙ্গি বা নিজের ঘরের শবে বরাত-বিসমিল্লাহখানির মতো মাটির খাঁটি ঐতিহ্যগুলোকে ‘খ্যাত’ বা আদিম বলে এক গভীর হীনম্মন্যতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।

    বাঙালি মুসলিম সমাজের এই দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের নিখুঁত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে আবুল মনসুর আহমদের ‘বাংলাদেশের কালচার’ এবং ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থের অকাট্য সমাজতাত্ত্বিক ইশতেহারে। আবুল মনসুর আহমদ প্রমাণ করেছেন, কলকাতার এই অগ্রসর ভদ্রলোক শ্রেণীটি পূর্ববঙ্গের এই বিশাল জনসমষ্টিকে কখনো প্রকৃত ‘বাঙালি’ বলে বা নিজেদের সমকক্ষ বলে মেনে নিতে পারেনি। তারা চেয়েছিল মুসলমানরা তাদের নিজস্ব তাওহিদি স্বাতন্ত্র্য ও কৃষ্টি বিসর্জন দিয়ে আর্য-মহাভারতের সাগরতীরে সম্পূর্ণ লীন হয়ে যাক (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১৫৮)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শারীরিক ও রাজনৈতিক ঘৃণার ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্র-ধর্মের এই মনস্তাত্ত্বিক কাল্ট তাকে এক পরিশীলিত ও শান্তিনিকেতনি আবরণে ঢেকে দিয়ে মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে ফেলার এক নিখুঁত হাতিয়ারে রূপান্তর করে (ছফা, আহমদ। শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ২২, ৪১)। ডক্টর ওয়াকিল আহমদের ‘উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের শেষাংশের (পৃষ্ঠা ১৩৩) গভীর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট দেখানো হয়েছে, কীভাবে কলোনিয়াল রাজত্বের ছায়াতলে মুসলিম সমাজকে পদ্ধতিগতভাবে আধুনিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের মনোজগৎকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল।

    বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের শেষভাগে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের যুগান্তকারী ঋণ সালিশী বোর্ড এবং গোপন ‘রোল নম্বর পদ্ধতি’ চালুর মতো আইনি সংস্কারগুলো কলকাতার ভদ্রলোক সংস্কৃতির সেই জালিয়াতিপূর্ণ একচেটিয়া অধিকারের গোড়া ঘেঁষে আইনি প্রতিবিধানের এক দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ঋণ সালিশী বোর্ড গঠনের মাধ্যমে বাংলার দরিদ্র কৃষকদের মহাজনদের শোষণ থেকে রক্ষা করেন। অন্যদিকে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও শিক্ষাক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব দূর করতে তিনি গোপন রোল নম্বর পদ্ধতি (যাতে পরীক্ষার্থীর নাম বা পরিচয় দেখে বৈষম্য না করা যায়) চালু করেন। এই সংস্কারগুলো তৎকালীন কলকাতার উচ্চবর্ণের ও প্রভাবশালী 'ভদ্রলোক' শ্রেণীর একচেটিয়া সুবিধাবাদী ব্যবস্থাকে সরাসরি আঘাত করেছিল।  (দাস, কালীপদ। ছোটদের ফজলুল হক, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫)। কিন্তু মেধার ওপর এই কাঠামোগত নিপীড়নের মনস্তাত্ত্বিক ছকটি আজও শেষ হয়ে যায়নি। সমসাময়িক চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফল জালিয়াতির ঘটনা এর বড় প্রমাণ। নিজের সন্তানকে জিপিএ-৫ পাইয়ে দিতে ক্ষমতার জোরে পরীক্ষার খাতার নম্বর পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে এই জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। এক শতাব্দী পরেও ঘটে যাওয়া এই প্রাতিষ্ঠানিক কেলেঙ্কারি একটি রূঢ় সত্যকে সামনে আনে। তা হলো, সময় ও ব্যবস্থার রূপ বদলালেও, সাধারণের মেধাকে পদদলিত করার সেই শতাব্দীপ্রাচীন জালিয়াতির মনস্তত্ত্ব আজও সমানভাবে সক্রিয়।

    কাজেই, বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন এক গভীর ও সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তর।

    প্রথমত, আমাদের ওপর চেপে বসা নান্দনিক উপনিবেশায়ন ও ঐতিহাসিক চুরির ধারাটিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে খণ্ডন করতে হবে। একই সাথে দূর করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জালিয়াতির এই অনৈতিক চর্চাকে।

    দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক ও মহাজনী শোষণের এই আধুনিক রূপান্তরকে সুনির্দিষ্ট আইনি সংস্কার ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পুরোপুরি নিরসন করা প্রয়োজন। এই কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া স্বাধীন ও উপনিবেশ-মুক্ত মননশীলতার প্রকৃত বিকাশ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment