Table of Contents
![]() |
| সুলতানি শাসনামলে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের প্রতীকী উপস্থাপনা |
Previous Part.......
৩:২
তুর্কি বিজয়ের পর বাংলায় যে স্বাধীন সুলতানি আমলের (বিশেষ করে ইলিয়াস শাহী এবং হোসেন শাহী রাজবংশ) সূচনা হয়, তা মৃতপ্রায় বাংলা ভাষার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক মোড় এনে দেয়। বহিরাগত আর্য ও কর্ণাটকীয় সেন রাজাদের দরবারে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রাকৃত বা আদি-বাংলা রূপকে ‘ম্লেচ্ছদের অপভাষা’ বলে সমাজবহির্ভূত রাখা হয়েছিল, মুসলিম সুলতানরা এসে সেই অবরুদ্ধ ভাষার টুঁটি চেপে ধরা শৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে ফেলেন। সুলতানরা নিজেরা পারস্য বা মধ্য এশীয় বংশোদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও, এই অঞ্চলের মাটির সুর ও আমজনতার ভাষাকে রাজকীয় দরবারে প্রধান সাহিত্যিক মর্যাদা দান করেন।
মুসলিম শাসকদের এই উদারতা এবং দূরদর্শী পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো কুঁড়েঘরের অবদমিত দশা থেকে মুক্ত হয়ে রাজপ্রাসাদের ছায়াতলে এসে আভিজাত্য লাভ করে। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ যখন সমগ্র বাংলাকে রাজনৈতিকভাবে একত্রিত করে নিজেকে ‘শাহ-ই-বাঙাল’ (বাঙালিদের সুলতান) হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন থেকেই মূলত ভৌগোলিক পরিচয়ের পাশাপাশি ভাষাগত পরিচয়েরও এক রাষ্ট্রীয় একীকরণ ঘটে। এই রাষ্ট্রীয় আশ্রয়ের ফলে কবি-পণ্ডিতেরা কোনো প্রকার সামাজিক বা ধর্মীয় ফতোয়ার ভয় ছাড়া, বুক ফুলিয়ে বাংলা ভাষায় কাব্য ও সাহিত্য চর্চার এক অবারিত স্বাধীনতা লাভ করেন, যা এই বদ্বীপের ইতিহাসে এর আগে কোনোদিন ঘটেনি।
দীনেশচন্দ্র সেনের অকাট্য খতিয়ান: ‘মুসলমান বিজয় বাঙ্গালা ভাষার শুভদিন’
উচ্চবর্ণের হিন্দুদের তীব্র অবজ্ঞা এবং তাদের জারি করা ‘রৌরব নরকের’ ফতোয়া থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করার পেছনে মুসলিম সুলতানদের অবদান কতটা বিশাল ছিল, তা কোনো মনগড়া রাজনৈতিক বয়ান নয়। খোদ সনাতনপন্থী প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর প্রামাণ্য গ্রন্থে এই চরম সত্যটি পরম শ্রদ্ধা ও অকপটচিত্তে নথিবদ্ধ করে গেছেন। তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, মুসলিমদের রাজনৈতিক বিজয়ই ছিল মূলত বাংলা ভাষার জন্য সেই বহুল প্রতীক্ষিত এবং পরম কাঙ্ক্ষিত মুক্তির শুভক্ষণ।
দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছেন যে, "মুসলমান আগমনের আগে বঙ্গভাষা কোনো কৃষক রমণীর ন্যায় দীনহীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতেছিল। হীরা যেমন কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া জহুরির আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভেতর মুক্তা লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুবুরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা তেমনই কোনো শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মুসলমান বিজয় বাঙ্গালা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল। গৌড়দেশ মুসলমানগণের অধিকৃত হইয়া গেলো। তাঁহারা ইরান-তুরান যে দেশ হইতেই আসুন না কেন, বঙ্গদেশ বিজয় করিয়া বাঙালী সাজিলেন" (সেন, দীনেশচন্দ্র। ‘বঙ্গ-ভাষার ওপর মুসলমানের প্রভাব, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম অবদান’, পৃষ্ঠা ১৮)।
এই অকাট্য দালিলিক সিদ্ধান্ত এটাই প্রমাণ করে যে, আর্য-ব্রাহ্মণরা যে ভাষাকে আবর্জনার মতো ফেলে রেখেছিল, বহিরাগত মুসলিম শাসকেরা এই দেশে এসে সেই ভাষাকে কয়লার খনি থেকে মুক্তার মতো তুলে নিয়ে রাজমুকুটের মণি বানিয়েছিলেন। তারা ইরান বা তুরান থেকে এলেও এ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে পাচার করেননি, বরং এই মাটির ভাষাকে ভালোবেসে নিজেরাই ‘বাঙালী সাজিয়াছিলেন’। সেন রাজবংশের উচ্চবর্ণের রাজারা যদি আরও কয়েক শতাব্দী বাংলায় রাজত্ব করতে পারতেন, তবে ব্রাহ্মণ্যবাদী পণ্ডিতদের ফতোয়া ও অবজ্ঞার চাপে বাংলা ভাষা নামক এই মুক্তাটি কয়লার খনিতেই চিরতরে পচে লোপ পেয়ে যেত (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, পরিচ্ছেদ: ‘গৌড়ীয় যুগ’, পৃষ্ঠা ৬৩)।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সাহিত্যিক বিশ্লেষণ: সংস্কৃতের শৃঙ্খল মুক্তি ও অনুবাদ সাহিত্য
মুসলিম সুলতানদের এই রাজকীয় আশ্রয়ের ফলে বাংলা সাহিত্যের ক্যানভাসে কীরকম এক অভাবনীয় জোয়ার এসেছিল, তার এক গভীর সাহিত্যিক ও শব্দতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি দেখিয়েছেন, সুলতানদের সরাসরি অর্থসাহায্য এবং আদেশে তৎকালীন হিন্দু কবিরা উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের ‘নরকের ফতোয়া’কে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রথমবারের মতো পবিত্র মহাকাব্যগুলো সংস্কৃত থেকে সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার সাহস পান (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা সাহিত্যের কথা (২য় খণ্ড: মুসলিম যুগ), রেনেসাঁস প্রিন্টার্স, পরিচ্ছেদ: ‘সুলতানী আমল’, পৃষ্ঠা ৩৪)।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র খতিয়ান অনুযায়ী, সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এবং বিশেষ করে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও তাঁর পুত্র নসরত শাহের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের সুবর্ণ যুগের সূচনা হয়। গুণরাজ খান উপাধিধারী মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’, কৃত্তিবাস ওঝার ‘রামায়ণ’ এবং কবীন্দ্র পরমেশ্বরের ‘মহাভারত’ (যা পরাগলী মহাভারত নামে পরিচিত) মূলত মুসলিম সুলতান এবং তাদের লস্কর-সেনাপতিদের রাজকীয় আদেশ ও বিপুল অর্থায়নেই আলো দেখেছিল (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা সাহিত্যের কথা (২য় খণ্ড: মুসলিম যুগ), রেনেসাঁস প্রিন্টার্স, পৃষ্ঠা ৩৮)।
উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা যখন এই অনুবাদকদের ‘জাতীয় শত্রু’ বা পাপিষ্ঠ মনে করত, মুসলিম শাসকেরা তখন তাদের রাজদরবারে ‘গুনরাজ খান’ বা ‘কবীন্দ্র’ উপাধিতে ভূষিত করে পুরস্কৃত করতেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাই বাংলা ভাষাকে লোকমুখের সাধারণ উপভাষা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্যের বাহন হিসেবে হৃষ্টপুষ্ট করে তোলে।
স্বাধীন সালতানাতের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর
এই যুগান্তকারী পৃষ্ঠপোষকতার ফলে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার এবং তার ভেতরের নান্দনিক চরিত্র সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হতে শুরু করে। সংস্কৃতের কঠিন, কৃত্রিম ও গণবিচ্ছিন্ন ব্যাকরণের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলা ভাষা এক চমৎকার গতিশীলতা লাভ করে। মুসলিম সুফি, সাধক, দরবেশ এবং তুর্কি-আফগান প্রশাসকদের দীর্ঘ বসবাসের ফলে দৈনন্দিন ভাষার মূল অঙ্গে হাজার হাজার জীবন্ত এবং প্রয়োজনীয় আরবি, ফারসি ও তুর্কি শব্দ (যেমন—কলম, কাগজ, দোয়াত, আইন, আদালত, জিন্দাবাদ) মিশে যেতে শুরু করে। এই মিশ্রণ ভাষাকে কোনো ‘দূষিত’ করেনি, বরং একে আরও বেশি শক্তিশালী, ব্যবহারিক এবং আমজনতার মনের ভাব প্রকাশের জন্য গণমুখী করে তোলে।
এই স্বাধীন সুলতানি আমলের ভাষিক রূপান্তরের ফলেই বাংলার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে এক অলিখিত সাংস্কৃতিক ঐক্যের জন্ম হয়। মুসলিম শাসকেরা রাজপ্রাসাদের অহংকার ভেঙে এই মাটির ভাষাকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিলেন বলেই, বাংলার প্রতিটি গ্রামীণ জনপদে লৌকিক সাহিত্যের এক নতুন বসন্তের আগমন ঘটেছিল। ইতিহাসের এই সুবর্ণ খতিয়ান স্পষ্ট করে দেয় যে, আধুনিক কালে এসে যারা এই ভাষাকে একক কোনো ধর্মীয় বা জাতীয় পরিচয় ও সম্পত্তি দাবি করতে চায়, তারা মূলত মধ্যযুগের মুসলিম সুলতানদের এই অসীম ও কালজয়ী অবদানকেই সুপরিকল্পিতভাবে অস্বীকার করতে চায়। অথচ এই ভাষার প্রাণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এবং এর বিকাশে ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল তাঁদেরই। ফলত, ভাষার ক্ষেত্রে যদি কোনো উত্তরাধিকারী বা মালিকানার রাজনৈতিক দাবি তুলতেই হয়, তবে সেই মালিকানা এই ভূমির মুসলিমদের হওয়াই অধিক নিকটবর্তী।
যদিও প্রকৃতপক্ষে, ভাষাকে নির্দিষ্ট কোনো জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম বা জাতীয়তার সংকীর্ণ ভৌগোলিক ঘেরাটোপে বন্দি করার কোনো যৌক্তিকতাই থাকা উচিত নয়। ভাষা অবাধ, গতিশীল এবং নদীর মতো বহমান—যা সকল ধর্ম, বর্ণ ও জাতির ঊর্ধ্বে ভাব প্রকাশের এক শাশ্বত মাধ্যম। ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের এবং চিন্তার স্বাধীনতার এমন এক উন্মুক্ত আঙিনা, যেখানে কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা একচেটিয়া গোষ্ঠীগত অধিকার চাপিয়ে দেওয়া মানুষের মৌলিক বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। যার মুখে তা উচ্চারিত হয়, সে-ই তার একমাত্র এবং প্রকৃত মালিক; ভাষা একান্তই তার, ভাষা সবার, ভাষা সকলের। সে এক মুক্ত-স্বাধীন এবং নিরন্তর প্রবহমান স্রোত।
ভাষাতত্ত্বের আধুনিক দর্শনও এই সত্যকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। বিখ্যাত মার্কিন ভাষাবিদ নোম চমস্কি তাঁর 'ইউনিভার্সাল গ্রামার' (Universal Grammar) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, ভাষা কোনো কৃত্রিম বা চাপিয়ে দেওয়া জাতীয়তাবাদী কাঠামো নয়, বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের এক জৈবিক ও সহজাত প্রবৃত্তি (Chomsky, N. (1965). Aspects of the Theory of Syntax, MIT Press, p. 25)। চমস্কির রাজনৈতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক দর্শন স্পষ্ট করে যে, কোনো শাসকগোষ্ঠী বা জাতীয়তাবাদী বয়ান যখন ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ বা সংকীর্ণ ছাঁচে ফেলতে চায়, তখন তা মানুষের চিন্তার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার ওপর এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ফ্যাসিবাদ হিসেবে কাজ করে (Chomsky, N. (1973). "Language and Freedom", For Reasons of State, Pantheon Books, pp. 387-388)।
একইভাবে, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'ট্র্যাক্টাটাস লজিকো-ফিলোসফিকাস'-এ মানুষের অস্তিত্বের সাথে ভাষার সম্পর্ক নির্ধারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, "The limits of my language mean the limits of my world" বা "আমার ভাষার সীমাই আমার জগতের সীমা" (Wittgenstein, L. (1922). Tractatus Logico-Philosophicus, Proposition 5.6, p. 74)। অর্থাৎ, যে ভাষা মানুষের জগতকে চেনার, ভাবার এবং নিজেকে প্রকাশ করার একমাত্র স্বাধীন মাধ্যম, তাকে কোনো নির্দিষ্ট কৃত্রিম সীমানায় বন্দি করে সেই অঞ্চলের বা অন্য অঞ্চলের মানুষের জন্য ‘পর’ করে দেওয়ার কোনো অধিকার কারো নেই।
এই ভাষাকে মাধ্যম করে যারা আজ নতুন করে জাত-পাত বা বিভেদের দেয়াল তৈরি করতে চায়, একে সংকীর্ণ করতে চায়, তারা মূলত মধ্যযুগের কর্ণাটক থেকে আসা বহিরাগত সেন শাসকদের সেই কুখ্যাত সামাজিক বৈষম্য ও বর্ণবাদের ‘মাইন্ডসেট’ (Mindset) বা মানসিকতা থেকেই বের হয়ে আসতে পারেনি। মানুষকে বর্ণ ও জাতের ভিত্তিতে বিভক্ত করে সামাজিক দেয়াল তৈরি করে রাখার এই মজ্জাগত স্বভাব আসলে তাদের সেই আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী পূর্বপুরুষদেরই পরম্পরাগত ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার।

Post a Comment