Table of Contents
![]() |
| বখতিয়ার খলজীর আগমন, সেন শাসনের অবসান এবং বাংলার সামাজিক ও ভাষাগত রূপান্তরের প্রতীকী উপস্থাপনা |
৩:১
বখতিয়ার খলজীর আগমন এবং গৌড় বিজয়ের ঐতিহাসিক পটভূমি
তেরো শতকের শুরুতে, ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয় এই বদ্বীপের ইতিহাসে কোনো সাধারণ রাজবংশীয় পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল মূলত এক সুগভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহাবিপ্লব। সমসাময়িক ঔপনিবেশিক ও বাঙ্ময় ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহাসিকেরা এই বিজয়কে একটি ‘আকস্মিক বিদেশী আক্রমণ’ বা ‘লুণ্ঠনযজ্ঞ’ হিসেবে চিত্রিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসের আদিমতম উৎস ও দালিলিক প্রমাণাদি ঘাঁটলে দেখা যায়, বখতিয়ার খলজীর আগমন কোনো জবরদখলকারী আগ্রাসন ছিল না, বরং তা ছিল সেন রাজাদের কঠোর জাত-পাত ও বর্ণবাদী শাসনে পিষ্ট বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক অমোঘ ঐতিহাসিক পরিণতি।
বখতিয়ার খলজীর গৌড় বিজয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সমসাময়িক প্রধান উৎস হলো মিনহাজ-ই-সিরাজ রচিত ফারসি প্রামাণ্যগ্রন্থ তবকাত-ই-নাসিরী। মিনহাজ, খলজী বিজয়ের মাত্র কয়েক দশক পর বাংলায় এসে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই ইতিহাস লিখেছিলেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, বখতিয়ার খলজী যখন মাত্র সতেরো জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে সেন রাজাদের রাজধানী নদীয়া বা নবদ্বীপে প্রবেশ করেন, তখন রাজা লক্ষণ সেন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। বখতিয়ারের আকস্মিক আগমনের খবর পেয়ে রাজা লক্ষণ সেন প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে সপরিবারে প্রাণভয়ে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে পালিয়ে যান (মিনহাজ-ই-সিরাজ। তবকাত-ই-নাসিরী, বাংলা একাডেমী সংস্করণ, পরিচ্ছেদ: ‘লখনৌতির খলজী রাজত্ব’, পৃষ্ঠা ৪২-৪৫)।
এখানে একটি বিশাল ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সত্য উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি। লক্ষণ সেনের মতো একজন প্রতিষ্ঠিত রাজার বিশাল সেনাবাহিনী এবং দুর্গ থাকা সত্ত্বেও, মাত্র সতেরো জন অশ্বারোহীর সামনে তিনি কেন বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ না গড়ে পালিয়ে গেলেন? এবং কেনইবা বাংলার বিশাল সাধারণ জনগোষ্ঠী বা ভূমিপুত্ররা তাদের ‘স্বদেশী’(?) রাজাকে বাঁচাতে তলোয়ার ধরল না? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সেন আমলের সেই অভ্যন্তরীণ সামাজিক দেউলিয়াগ্রস্ততার মধ্যে, যা আগের অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বাংলার আমজনতা সেন রাজাদের নিজেদের শাসক মনে করত না, বরং তাদের মনে করত এক বহিরাগত অত্যাচারী শৃঙ্খল।
অপবাদ রদ: নালন্দা ও ওদন্তপুরী ধ্বংসের কাল্পনিক বয়ানের ব্যবচ্ছেদ
১. ওদন্তপুরী বিহার ও ‘তবকাত-ই-নাসিরী’র প্রকৃত বিবরণ
"তিনি সেই দুর্গের সিংহদুয়ার জয় করেন এবং প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। সেখানকার অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিলেন ‘মণ্ডনকৃত’ (মুণ্ডিতমস্তক) পণ্ডিত বা বৌদ্ধ ভিক্ষু। বখতিয়ার খলজী যখনই জানতে পারেন এটি সামরিক দুর্গ নয়, বরং এটি একটি ‘মাদ্রাসা’ বা জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, তখনই তিনি সেখানে হত্যাকাণ্ড বন্ধের কঠোর নির্দেশ দেন এবং বেঁচে যাওয়া পণ্ডিতদের কাছ থেকে বইগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করেন।"
— মিনহাজ-ই-সিরাজ, তবকাত-ই-নাসিরী, প্রথম খণ্ড (বাংলা একাডেমি সংস্করণ), পৃষ্ঠা ৩৮-৩৯
২. নালন্দা ধ্বংসের অভ্যন্তরীণ তান্ত্রিক কোন্দল: লামা তারানাথের সাক্ষ্য
— Taranatha, Lama. History of Buddhism in India, Motilal Banarsidass Publishers, Delhi, Chapter: ‘The Period of King Changal-raja’, pp. 313-315।
৩. ‘তারিখ-ই-ফেরেস্তা’ এবং খলজী সুলতানদের লোকরক্ষণ নীতি
"লখনৌতির খলজী সুলতানেরা জবরদস্তিমূলক নীতি পরিহার করে স্থানীয় মানুষের প্রথা ও তাঁদের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর পূর্ণ সুরক্ষা দিয়েছিলেন।"
— ফেরেস্তা, মুহাম্মদ কাসিম, তারিখ-ই-ফেরেস্তা, প্রথম খণ্ড, পরিচ্ছেদ: ‘লখনৌতির সুলতানগণ’, পৃষ্ঠা ১৮২।
ভূমিপুত্রদের আহ্বান: মুসলিমদেরই কেন আপন করে নিল বাংলার মানুষ?
বখতিয়ার খলজী যদি অন্য সব বহিরাগত বিজেতাদের মতোই কোনো সাধারণ জবরদখলকারী হতেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় জনমানুষের কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ বা গণআন্দোলন গড়ে না ওঠার ঐতিহাসিক রহস্যটি উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি। কেন বাংলার শোষিত ও নির্যাতিত ভূমিপুত্ররা তুর্কি বাহিনীকে স্বাগত জানাল, তার উত্তর লুকিয়ে আছে তৎকালীন সামাজিক মনস্তত্ত্বের গভীরে। সেন রাজাদের কৌলিন্য প্রথার অত্যাচারে বাংলার আদি ভূমিপুত্ররা (তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার, ডোম, চণ্ডাল) সমাজে পশুর চেয়েও অধম জীবনযাপন করছিলেন। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা তাদের ছায়া মাড়ালেও পাপ হতো, তাদের কানে বেদমন্ত্র ঢুকলে গলানো সিসা ঢেলে দেওয়া হতো।
এই চরম মানবতাবিরোধী পরিস্থিতিতে বাংলার নির্যাতিত বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের ভূমিপুত্ররা মুসলিমদেরকে কোনো ‘বিদেশী শত্রু’ হিসেবে দেখেনি, বরং তাদের দেখেছিল এক পরম মুক্তিদাতা (Liberator) হিসেবে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. রিচার্ড ইটন তাঁর কালজয়ীগ্রন্থ The Rise of Islam and the Bengal Frontier—এ এই সামাজিক রূপান্তরের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, বখতিয়ার খলজীর বিজয়ের বহু পূর্ব থেকেই বাংলার পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের আমজনতা ইসলামের সাম্য, সমতা এবং জাত-পাতহীন ভ্রাতৃত্বের বাণীতে আকৃষ্ট হয়ে মুসলিম সুফি-সাধকদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন (Eaton, Richard M. The Rise of Islam and the Bengal Frontier, University of California Press, পরিচ্ছেদ: ‘The Muslim Conquest’, পৃষ্ঠা ১১৫)।
মধ্যযুগের বিখ্যাত নাথপন্থী বা লৌকিক হিন্দু সাহিত্য শূন্যপুরাণ (রামাই পণ্ডিত রচিত) গ্রন্থে ‘নিরঞ্জনের রুষ্মা’ নামক একটি বিখ্যাত অধ্যায় রয়েছে, যা এই সত্যের সবচেয়ে বড় দেশীয় প্রমাণ। সেখানে রামাই পণ্ডিত পরিষ্কার লিখেছেন যে, বৈদিক ব্রাহ্মণরা যখন নিম্নবর্ণের সদ্ধর্মী বা বৌদ্ধদের ওপর চরম অত্যাচার শুরু করল, তখন ঈশ্বর স্বয়ং ‘খোদাই’ বা ‘রহমান’ রূপ ধারণ করে, মাথায় টুপি ও হাতে ধনুর্বাণ নিয়ে ‘যবন’ বা মুসলিমের বেশে বাংলায় এলেন এই শোষিত ভূমিপুত্রদের রক্ষা করার জন্য। নিম্নবর্ণের মানুষরা মুসলিমদের নিজেদের ঘরের লোক ভাবত বলেই বখতিয়ার খলজীর নদীয়া প্রবেশের সময় স্থানীয় কোনো সাধারণ মানুষ বা সৈন্য লক্ষণ সেনের পাশে দাঁড়ায়নি; বরং তারা বখতিয়ারের এই তুর্কি বাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিল নিজেদের সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার উৎসব হিসেবে।
জবরদখলকারী নয়, এই মাটির খাঁটি ভূমিপুত্র হয়ে ওঠা
বখতিয়ার খলজী এবং তাঁর পরবর্তী মুসলিম শাসকেরা বাংলায় এসে কোনো ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করেননি। তারা যদি সাধারণ জবরদখলকারী হতেন, তবে তারা বাংলার ধন-সম্পদ লুঠ করে গজনি, ঘোর বা দিল্লিতে পাচার করে দিতেন। কিন্তু বখতিয়ার খলজী গৌড় বিজয়ের পর লখনৌতিকে তাঁর স্থায়ী রাজধানী বানান এবং এখানেই এক স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ সালতানাতের পত্তন করেন। তিনি ও তাঁর পরবর্তী খলজী ও ইলিয়াস শাহী শাসকেরা এই দেশের মানুষের সাথে বৈবাহিক ও সামাজিকভাবে এমনভাবে মিশে যান যে, তারা নিজেরাই এই মাটির খাঁটি ভূমিপুত্রে রূপান্তরিত হন।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র তাঁর গ্রন্থে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, মুসলিমরা বাংলায় এসে এই দেশের সম্পদ বাইরে পাচার করেনি, বরং তারা এই দেশের মাটিকে নিজেদের মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিল (মজুমদার, ড. রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্য যুগ), জেনারেল প্রিন্টার্স, পরিচ্ছেদ: ‘মুসলিম শাসনের সূচনা’, পৃষ্ঠা ৬৮)। তারা বাংলায় এসে মসজিদ, মাদ্রাসা ও সরাইখানার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য বড় বড় দিঘি ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই মুসলিম শাসকেরা আসার পরেই উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা অবরুদ্ধ ও নির্যাতিত বাংলা ভাষাটি রাজকীয় সিংহাসনে বসার সুযোগ পায়। মুসলিমদের এই পরম আত্মিক ও মানবিক সম্পর্কের কারণেই বাংলার মানুষ তাদের চিরতরে আপন করে নিয়েছিল এবং এই ভূখণ্ডে ইসলামের এক স্থায়ী ও শক্তিশালী বিজয়নিরীক্ষ গড়ে উঠেছিল।

Post a Comment