Loading...

ন্যায়ভিত্তিক বিচারকাঠামো এবং সেন আমলের প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমের অবসান

ন্যায়ভিত্তিক বিচারকাঠামো এবং সেন আমলের প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমের অবসান
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    সুলতানি বাংলার ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সমতা এবং সেন আমলের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের অবসানের প্রতীকী চিত্র।
    সুলতানি বাংলার ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সমতা এবং সেন আমলের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের অবসানের প্রতীকী চিত্র

    ৩:৩

    তেরো শতকের শুরুতে বাংলায় মুসলিম শাসন তথা স্বাধীন সুলতানি সালতানাত প্রতিষ্ঠার পর যে যুগান্তকারী প্রশাসনিক রূপান্তর ঘটেছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল একটি নিখুঁত এবং বৈষম্যহীন নতুন বিচারব্যবস্থার প্রবর্তন। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা বহিরাগত সেন রাজবংশের আমলে বাংলার সমাজ ও সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হতো কঠোর মনুস্মৃতি এবং উচ্চবর্ণের স্মার্ত ব্রাহ্মণদের তৈরি করা শাস্ত্রীয় অনুশাসনের ওপর ভিত্তি করে (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৩)।

    সেই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় ন্যায়বিচার কোনো সার্বজনীন নাগরিক অধিকার ছিল না; বরং তা ছিল জন্মপরিচয় এবং জাত-পাতের ওপর নির্ভর করে তৈরি হওয়া এক নিষ্ঠুর প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমের হাতিয়ার। নিম্নবর্ণের প্রাক-আর্য ভূমিপুত্র এবং সদ্ধর্মী বৌদ্ধদের জন্য সেই আইনি কাঠামোয় মানুষের ন্যূনতম মর্যাদা বা জানমালের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ছিল না।

    মুসলিম সুলতানরা বাংলায় এসে এই প্রাচীন ও জরাজীর্ণ বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে সমূলে উপড়ে ফেলে এক সম্পূর্ণ নতুন ও সর্বজনীন আইনি কাঠামো প্রবর্তন করেন, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল ইসলামের কেন্দ্রীয় শাসনতান্ত্রিক নীতি তথা ন্যায়ভিত্তিক ইনসাফ ও সমতা। এই নতুন দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারকাঠামোর সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিকটি ছিল—এটি মানুষের জন্মগত পরিচয়, বংশ বা জাতের ভিত্তিতে কোনো আইনের ভিন্নতা নির্ধারণ করত না। আইনের চোখে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ শাসক থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া ডোম, চণ্ডাল, চাষী বা জেলেদের সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা হয়। এই শাসনতান্ত্রিক ইনসাফের কারণে বাংলার সমাজদেহে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে চলতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও জন্মগত লাঞ্ছনার স্থায়ী অবসান ঘটে, যা বাংলার আপামর আমজনতার জীবনে এক নজিরবিহীন মানসিক ও সামাজিক মুক্তির দুয়ার খুলে দিয়েছিল (করিম, আবদুল। Social History of the Muslims in Bengal, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৩৪)।

    সর্বজনীন নাগরিক আইনি সুরক্ষা ও অমুসলিম প্রজাদের জানমালের রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি

    এই নতুন ন্যায়ভিত্তিক বিচারকাঠামোর একটি অন্যতম প্রধান এবং অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য ছিল অমুসলিম নাগরিকদের জন্য ‘সুরক্ষিত ও চুক্তিবদ্ধ নাগরিক’ নীতির রাষ্ট্রীয় বাস্তবায়ন। ঔপনিবেশিক ও আধুনিক হিন্দুত্ববাদী ঐতিহাসিকেরা এই বাৎসরিক প্রতিরক্ষামূলক কর ও চুক্তিবদ্ধ নাগরিক নীতিকে এক ধরনের ‘বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে প্রোপাগান্ডা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে থাকেন। কিন্তু মধ্যযুগের মূল নথিপত্র এবং সমসাময়িক সমাজবাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নীতিটি ছিল মূলত তৎকালীন অমুসলিম প্রজাদের জীবন, সম্পত্তি এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি বা সর্বজনীন আইনি সুরক্ষা কবচ (Eaton, Richard M. The Rise of Islam and the Bengal Frontier, University of California Press, পরিচ্ছেদ: ‘The Muslim Conquest’, পৃষ্ঠা ১১৮)।

    এই শাসনতান্ত্রিক ধারা অনুযায়ী, অমুসলিম প্রজারা রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট বাৎসরিক কর প্রদানের বিনিময়ে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বাধ্যতামূলক ঝুঁকি ও দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি লাভ করত এবং রাষ্ট্র তাদের জানমাল ও ইজ্জতের পূর্ণ সুরক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিত। পক্ষান্তরে মুসলিম সৈন্যদের জানমাল দিয়ে দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা দিতে হতো। সুলতানি আমলের কেন্দ্রীয় বিচারালয় বা কাজীর দরবারে কোনো উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী সামন্তপ্রভু বা আমলা যদি কোনো সাধারণ অমুসলিম প্রজার ওপর বিন্দুমাত্র অন্যায় বা জুলুম করত, তবে ঐশী ইনসাফের বিধান অনুযায়ী তাকে কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। এই সুসংহত নাগরিক নিরাপত্তার কারণে সেন আমলের সামন্ততান্ত্রিক অত্যাচার এবং ডাকাতদের লুণ্ঠন থেকে বাংলার গ্রামীণ জনপদগুলো স্থায়ীভাবে রক্ষা পায়। সাধারণ মানুষ তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আচার, পূজা-পার্বণ এবং সামাজিক উৎসবগুলো কোনো ভয়ভীতি বা উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের ফতোয়া ছাড়াই স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার লাভ করে। জানমালের এই অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাই বাংলার সাধারণ মানুষকে মুসলিম শাসনের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী অনুগত ও কৃতজ্ঞ করে তুলেছিল।

    ড. রিচার্ড ইটনের খতিয়ান: আইনি ইনসাফ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সুবর্ণ সময়

    মুসলিম সুলতানদের এই সর্বজনীন আইনি ইনসাফ এবং বিচারিক ব্যবস্থা কীভাবে বাংলার সমাজদেহে এক দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা এনেছিল, তার এক চমৎকার ও নিরপেক্ষ খতিয়ান তুলে ধরেছেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন ঐতিহাসিক ড. রিচার্ড ইটন। তিনি মধ্যযুগের বাংলার অর্থনৈতিক ও বিচারিক নথিপত্রগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বাংলায় মুসলিম শাসনের দীর্ঘ সাড়ে পাঁচশো বছরে সর্বসাধারণের জীবনযাত্রায় যে অভূতপূর্ব স্থিতিশীলতা এসেছিল, তার প্রধান কারণ ছিল রাজশক্তির সাথে আমজনতার এক গভীর আত্মিক ও আইনি মেলবন্ধন (Eaton, Richard M. The Rise of Islam and the Bengal Frontier, University of California Press, পৃষ্ঠা ১২২)।

    ড. রিচার্ড ইটন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সেন রাজাদের আমলে বাংলার গ্রামীণ সমাজ যেখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, কৈবর্ত বিদ্রোহ এবং উচ্চবর্ণের শোষণে প্রতিনিয়ত জর্জরিত ও ছিন্নভিন্ন হচ্ছিল, মুসলিম সুলতানদের সুসংহত আইনি কাঠামো সেখানে এক জাদুকরী শান্তি ফিরিয়ে আনে। কাজী বা স্থানীয় প্রধান বিচারকদের দরবারগুলো সরাসরি সুলতানের কেন্দ্রীয় নজরদারিতে থাকার কারণে দুর্নীতি ও সামন্তপ্রভুদের ক্ষমতার দাপট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ছিল। এই শাসনতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ফলেই বাংলার কৃষি, শিল্প এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ড. ইটন দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘ সাড়ে পাঁচশো বছরের মুসলিম শাসনামলে বাংলার বিশাল সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে মুসলিম সুলতান বা তাদের প্রবর্তিত এই ইনসাফভিত্তিক বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো একটিও বড় ধরনের গণবিক্ষোভ বা অসন্তোষের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলার মানুষ এই আইনি ব্যবস্থাকে কোনো ‘বিদেশী চাপিয়ে দেওয়া শৃঙ্খল’ মনে করেনি, বরং একে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ও স্বস্তির সুবর্ণ সময় হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বরণ করে নিয়েছিল।

    মদিনা সনদের শাসনতান্ত্রিক নীতি বনাম সমকালীন বৈশ্বিক সংকট

    মধ্যযুগের বাংলার এই আইনি শান্তি, সামাজিক ভারসাম্য ও সুলতানি বিচারব্যবস্থার মূল উৎসটি কিন্তু কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল না; এর আদি উৎস ছিল আজ থেকে চৌদ্দশো বছর আগে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রণীত পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’-এর শাসনতান্ত্রিক দর্শনের মধ্যে। মদিনা সনদের মূল দার্শনিক ভিত্তিই ছিল—একটি বহু-ধর্মীয়, বহু-সাংস্কৃতিক এবং বহু-নৃতাত্ত্বিক সমাজে প্রতিটি নাগরিকের জানমালকে সমান পবিত্র ঘোষণা করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অধীনে প্রত্যেকের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাধীনতার পূর্ণ আইনি গ্যারান্টি দেওয়া। মধ্যযুগের বাংলার মুসলিম সুলতানরা মদিনার সেই পবিত্র বহুত্ববাদী আদর্শ ও ঐশী আইনভিত্তিক বিচারকাঠামোকে এই পলিমাটির দেশে অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন বলেই, এ দেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক অভূতপূর্ব স্থিতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। এই মডেলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর ‘অ-হেজেমনিক’ চরিত্র—অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট প্রভাবশালী জাতি বা উচ্চবর্ণের সংস্কৃতিকে জোরপূর্বক অন্য কোনো দুর্বল বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দিত না, যা পূর্ববর্তী সেন রাজত্বের কর্ণাটকীয় স্বৈরাচারে প্রকট ছিল।

    বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক-শাসনতান্ত্রিক সংকটের দিকে তাকালে মদিনা সনদের এই কালজয়ী দর্শন এবং ইসলামের ইনসাফভিত্তিক আইনি কাঠামো এক বৈপ্লবিক বিকল্প ও সমাধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমান বিশ্বে তথাকথিত আধুনিক পশ্চিমা গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামোগুলো চরমভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র যে কৃত্রিম মোড়ক আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৈরি করেছিল, তা আজ অধিকাংশ বহুত্ববাদী সমাজে সংখ্যাগুরুবাদের (Majoritarianism) কুৎসিত রূপ ধারণ করেছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমরা দেখতে পাই আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে শুরু করে উন্নত পশ্চিমা বিশ্বে। যেখানে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান থাকা সত্ত্বেও, কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সংখ্যাধিক্যের জোরে সংখ্যালঘুদের জানমাল, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্মীয় পরিচয়কে আইনি ও সামাজিকভাবে নির্মমভাবে পিষে ফেলা হচ্ছে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো আজ ‘আইনি স্বৈরাচার’ (Constitutional Tyranny) কায়েম করেছে, যেখানে আইনের দোহাই দিয়েই প্রান্তিক মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।

    ঠিক এই সংকটকালেই মদিনা সনদের শাসনতান্ত্রিক নীতি আমাদের দেখায় কীভাবে একটি রাষ্ট্র কোনো একক কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে না দিয়েও একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারে। থমাস হবস বা জঁ-জাক রুশোর বহু পরে ইউরোপ যে ‘সামাজিক চুক্তি’ বা ‘Social Contract Theory’র ধারণা দিয়েছিল, মদিনা সনদ তার এক হাজার বছর আগেই তা বাস্তবে রূপদান করেছিল। মদিনা সনদে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, যুদ্ধের সময় বা রাষ্ট্রের সুরক্ষায় মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকেরা সমানভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রত্যেকে নিজেদের ধর্মীয় দেওয়ানি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এটি ছিল এক ধরনের ‘বহু-আইনি বহুত্ববাদ’ (Legal Pluralism), যা আধুনিক পশ্চিমা বিশ্ব আজ পর্যন্ত কল্পনাও করতে পারেনি। মধ্যযুগের বাংলায় সুলতানরা যখন বৈদিক হিন্দুদের তাদের নিজস্ব দণ্ডবিধি ও মনুস্মৃতির দেওয়ানি অধিকার দিয়ে রেখেছিলেন, অথচ ফৌজদারি ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন ও নিরপেক্ষ ইনসাফ কায়েম করেছিলেন, তখন মূলত মদিনা সনদের এই লিগ্যাল প্লুরালিজমই কাজ করছিল।

    একবিংশ শতাব্দীর আরেকটি বড় সংকট হলো ‘সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ফ্যাসিবাদের সমসাময়িক রূপ’ বা ‘Linguistic Imperialism’। আধুনিক বহু রাষ্ট্র আজ নিজেদের তথাকথিত একচেটিয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিচ্ছে, যার মাধ্যমে ছদ্ম-সেক্যুলার হেজিমনি তৈরি করা হয়। অথচ, মদিনা সনদের অন্তর্নিহিত স্পিরিটের আলোয় মধ্যযুগের বাংলায় মুসলিম সুলতানরা স্থানীয় অমুসলিমদের ও প্রাক-আর্য ভূমিপুত্রদের নিজস্ব কথ্য ভাষাকে কেবল রাজকীয় আশ্রয়ই দেননি, বরং তাকে রাষ্ট্রীয় সাহিত্যের আসনে বসিয়েছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেখানে বহুত্ববাদ বা প্লুরালিজমকে মেলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জাতিগত দাঙ্গা, গৃহযুদ্ধ ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিচ্ছে, ইসলামের এই ঐশী ইনসাফভিত্তিক বিচারকাঠামো সেখানে সমস্ত নাগরিককে একটি নিরাপদ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Security Net) প্রদান করে।

    ইতিহাসের নিরেট খতিয়ান এবং আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের নিরপেক্ষ তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ একথাই প্রমাণ করে যে, যদি ইসলামের মূল চেতনা—অর্থাৎ সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যহীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ সুরক্ষা এবং নাগরিক জানমালের একচেটিয়া গ্যারান্টির সঠিক ও ইনসাফপূর্ণ প্রয়োগ করা যায়, তবে বর্তমান এই আধুনিক যুগের জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি শতভাগ শান্তিময়, শোষণমুক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব। মধ্যযুগের বাংলা যেমন উচ্চবর্ণের হিন্দুদের তৈরি করা বর্ণবাদের অন্ধকার ও নরকের ফতোয়া থেকে এই ঐশী ইনসাফের মাধ্যমে রক্ষা পেয়েছিল, বর্তমান পৃথিবীর আধুনিক গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনতান্ত্রিক দেউলিয়াত্ব থেকেও মুক্তির একমাত্র পথ লুকিয়ে আছে মদিনা সনদের এই সার্বজনীন মানবিক, শাসনতান্ত্রিক ও আইনি দর্শনের সঠিক পুনরুজ্জীবনের মধ্যে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment