Loading...

আর্যীকরণ প্রক্রিয়ার হিংস্র রূপ ও মনস্তাত্ত্বিক অবদমন

আর্যীকরণ প্রক্রিয়ার হিংস্র রূপ ও মনস্তাত্ত্বিক অবদমন
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    প্রাচীন বাংলায় আর্যীকরণ প্রক্রিয়া, সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং ভূমিপুত্র জনগোষ্ঠীর ওপর সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যের ঐতিহাসিক পুনর্গঠনের ইলাস্ট্রেশন।
    আর্যীকরণ প্রক্রিয়ার হিংস্র রূপ ও মনস্তাত্ত্বিক অবদমন

    Previous Part.......

    ১:২

    বাংলা ভূখণ্ডে আর্যদের এই অনুপ্রবেশ কোনো শান্তিপূর্ণ বা নিয়মতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ছিল না; এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদী এবং আগ্রাসী আধিপত্যবাদ। আর্যরা যখন প্রথম বাংলায় আসতে শুরু করে, তখন তারা এখানকার উন্নত, শান্তিপ্রিয় এবং নদীকেন্দ্রিক প্রাক-আর্য সমাজকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। আর্য মনস্তত্ত্বে কাজ করত এক তীব্র সামরিক এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ, যা তাদের নিজেদের বাইরের সমস্ত মানুষকে পশুর সমতুল্য বা অসভ্য মনে করতে শেখাত। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে—বিশেষ করে ঋগ্বেদ ও ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে—বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের মানুষের কাতারেই গণ্য করা হয়নি। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আর্যরা এতটাই ঘৃণা করত যে, ঋগ্বেদের বিভিন্ন শ্লোকে বাংলার মানুষকে ‘দস্যু’ (ডাকাত), ‘ম্লেচ্ছ’ (অপবিত্র) এবং ‘পাখি’ (যাদের ভাষা পশুর কিচিরমিচিরের মতো) বলে চরম উপহাস ও তাচ্ছিল্য করা হয়েছে (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫১)।

    এই চরম জাতিগত বিদ্বেষ কেবল কিছু সাহিত্যিক গাথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আর্যরা যখন সংখ্যায় ও শক্তিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন তারা এই বাংলার মাটিতে শুরু করে এক হিংস্র ‘আর্যীকরণ’ বা জোরপূর্বক নিজেদের সংস্কৃতি চাপানোর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলার আদি অনার্য ভূমিপুত্রদের নিজস্ব আত্মপরিচয়, ভাষা এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনবোধকে চিরতরে মুছে দেওয়া। তারা বাংলার পবিত্র পানি ও মাটিকে ‘অপবিত্র’ ঘোষণা করে এই আইন জারি করেছিল যে, কোনো উচ্চবর্ণের আর্য যদি তীর্থযাত্রা ছাড়া এই বাংলায় পা রাখে, তবে সে পতিত হবে এবং তাকে ফিরে গিয়ে ‘পুনস্তোম’ ('শুদ্ধিকরণ আচার' বা বৈদিক ইষ্টি-যজ্ঞ) বা বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত করে পুনরায় পবিত্র হতে হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক অবদমনের মাধ্যমে তারা বাংলার মানুষকে শুরুতেই এক ধরনের হীনমন্যতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে চেয়েছিল, যেন এই মাটির সন্তানেরা আর্যদের দেবতার সমতুল্য মনে করে তাদের দাসত্ব মেনে নেয় (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫৩)।

    চাতুর্বর্ণের বিষবৃক্ষ এবং সামাজিক বর্ণবাদ কায়েম

    আর্যদের এই সাংস্কৃতিক ও সামরিক আগ্রাসনের সবচেয়ে মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিষবৃক্ষ ছিল তাদের ‘চাতুর্বর্ণ প্রথা’ বা কঠোর জাত-পাত ব্যবস্থা। আর্যরা তাদের বৈদিক ধর্মীয় আইনের দোহাই দিয়ে বাংলার সামগ্রিক সমাজকাঠামোকে সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে চার ভাগে বিভক্ত করে—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এই বিভাজন কোনো পেশাভিত্তিক সাধারণ শ্রেণীবিভাগ ছিল না, এটি ছিল রক্তের বিশুদ্ধতার নামে মানুষের ওপর মানুষের চিরস্থায়ী দাসত্ব চাপানোর এক নিপুণ প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত।

    বহিরাগত আর্যরা নিজেরা সমাজের সর্বোচ্চ এবং সমস্ত সুযোগ-সুবিধাভোগী আসন—অর্থাৎ ‘ব্রাহ্মণ’ (ধর্মীয় যাজক) ও ‘ক্ষত্রিয়’ (শাসক ও যোদ্ধা) আসন দখল করে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে যায়।

    অপরদিকে, এই মাটির আদি সন্তান বা ভূমিপুত্রদের (যারা আর্যদের সামরিক শক্তির কাছে পরাজিত ও তাদের শাসন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল) তারা সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তর ‘শূদ্র’ এবং ‘অস্পৃশ্য’ চণ্ডাল বা অন্ত্যজ শ্রেণীতে পরিণত করে।

    এই বর্ণবাদী সামাজিক কাঠামোর নিষ্ঠুর রূপটি বিশ্লেষণ করে ভাষাতাত্ত্বিক ও পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দেখিয়েছেন যে, আর্যরা এই চাতুর্বর্ণ প্রথার মাধ্যমে বাংলার আদিম অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়দের কেবল অর্থনৈতিকভাবেই পঙ্গু করেনি, বরং তাদের সমস্ত মানবিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। আর্যদের তৈরি করা মনুস্মৃতি ও অন্যান্য স্মৃতিশাস্ত্রে বিধান দেওয়া হয়েছিল যে, শূদ্র বা নিচু জাতের মানুষেরা কোনোদিন বিদ্যাচর্চা করতে পারবে না; যদি কোনো শূদ্র ভুল করেও বেদমন্ত্র শোনে, তবে তার কানে গলানো সিসা ঢেলে দেওয়া হবে (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৩৯)। এই চরম বর্ণবাদী আইনের মাধ্যমে বাংলার প্রকৃত ভূমিপুত্রদের নিজস্ব ভূমিতেই পশুর চেয়েও অধম জীবে পরিণত করা হয়েছিল, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলার সমাজজীবনকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্ষতবিক্ষত করেছে।

    অনার্য সংস্কৃতির গ্রাস ও ইতিহাসের জালিয়াতি

    আর্যরা যখন দেখল যে কেবল গায়ের জোরে বা কঠোর আইন দিয়ে বাংলার ভূমিপুত্রদের প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না, তখন তারা শুরু করল এক চতুর সাংস্কৃতিক জালিয়াতি ও আত্তীকরণ নীতি। বাংলার আদিম ভূমিপুত্রদের নদী, গাছপালা, পাথর এবং প্রকৃতির পূজার যে প্রাচীন ঐতিহ্য ছিল, আর্যরা সেগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে সুকৌশলে নিজেদের বৈদিক দেব-দেবীর কাঠামোর মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলার প্রাক-আর্য সমাজের উর্বরতার প্রতীক দেবী, বনদেবী বা সর্পদেবীকে তারা সংস্কৃত রূপ দিয়ে ‘মনসা’, ‘চণ্ডী’ বা ‘দুর্গা’ নামে নিজেদের পুরাণে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

    এই জালিয়াতির মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চাইল যে, বাংলার এই আদিম সংস্কৃতি আসলে তাদেরই সৃষ্টি। কিন্তু প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর গবেষণায় এই জালিয়াতির মুখোশ উন্মোচন করে দেখিয়েছেন যে, আর্যরা বাইরে থেকে এসে বাংলার অনার্য সংস্কৃতির ওপর নিজেদের ব্যাকরণ ও নাম চাপিয়ে দিলেও, ভেতরের মূল চেতনাটি কিন্তু অনার্য ভূমিপুত্রদেরই রয়ে গিয়েছিল (চ্যাটার্জী, সুনীতিকুমার। The Origin and Development of the Bengali Language, প্রথম খণ্ড, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পৃষ্ঠা ২৭)।

    আর্যরা এই অঞ্চলের মানুষের আদিম কৃষিপদ্ধতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জ্ঞান চুরি করে সেগুলোকে ‘আর্য শাস্ত্র’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। অথচ এই জ্ঞানের প্রকৃত স্রষ্টা ছিল এই মাটির সেই শোষিত ভূমিপুত্ররা, যাদের আর্যরা সমাজে ‘অস্পৃশ্য’ করে রেখেছিল।

    ড. নীহাররঞ্জন রায়ের দৃষ্টিতে ভূমিপুত্রদের চূড়ান্ত দাসত্ব

    একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে বাংলায় যখন দক্ষিণ ভারত থেকে আসা চরম অর্থোডক্স ও গোঁড়া বৈদিক সংস্কৃতির বাহক ‘সেন রাজবংশ’ কায়েম হয়, তখন এই আর্যীয় বর্ণবাদের বিষবৃক্ষটি তার সবচেয়ে হিংস্র ও চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। সেন শাসকেরা বাংলায় এসে এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় স্বৈরাচার কায়েম করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করা। ড. নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) গ্রন্থে এই যুগের সামাজিক চিত্র অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সেন আমলে রাজশক্তি ও ধর্মশাস্ত্রের যৌথ জোট বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের ওপর চূড়ান্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব নামিয়ে এনেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৫)।

    সেন আমলে সমাজকে ‘সৎ শূদ্র’ এবং ‘অসৎ শূদ্র’ বা অন্ত্যজ—এই দুই কঠোর ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। বাংলার আদিম পেশাজীবী সমাজ—যেমন জেলে, কুমার, কামার, তাঁতি, ধোপা, এবং ডোম ও চণ্ডালদের—একেবারে সমাজবহির্ভূত এবং অস্পৃশ্য ঘোষণা করা হয়। উচ্চবর্ণের কোনো হিন্দু বা ব্রাহ্মণ এদের ছায়া মাড়ালেও তাকে স্নান করে পবিত্র হতে হতো। ড. রায় স্পষ্ট করে লিখেছেন যে, এই শোষণের ফলে বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের মানুষের ন্যূনতম আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার পথও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৭)।

    এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী নির্যাতনের ফলেই বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের মনে এক তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। তারা এই তথাকথিত ‘উচ্চবর্ণের শাসন’ থেকে মুক্তির জন্য এক মহাবিপ্লবের অপেক্ষা করছিল, যা পরবর্তীতে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের মোড় সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment