Loading...

সেন আমলের সামাজিক দেউলিয়াগ্রস্ততা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষয়

সেন আমলের সামাজিক দেউলিয়াগ্রস্ততা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষয়
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    সেন আমলের সামাজিক দেউলিয়াগ্রস্ততা, জাত-পাতভিত্তিক বৈষম্য, নিপীড়িত সাধারণ মানুষ এবং বিলাসী রাজদরবারের প্রতীকী চিত্র

    সেন আমলের সামাজিক বৈষম্য, কৌলিন্য প্রথা এবং অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়ের প্রতীকী উপস্থাপনা

    ২:৫

    Previous Part.......

    একটি রাষ্ট্র যখন সম্পূর্ণভাবে বহিরাগত শক্তির ইশারায় এবং আমজনতার স্বার্থকে উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়, তখন তার অভ্যন্তরীণ সামাজিক দেউলিয়াগ্রস্ততা অনিবার্য হয়ে পড়ে। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা সেন রাজবংশ বাংলায় যে শাসনকাঠামো কায়েম করেছিল, তা দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে এক গভীর নৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ায়। একদিকে রাজসভার উচ্চবর্ণের কবিরা দেবভাষা সংস্কৃতে বিলাসিতা ও স্তুতিবাক্য রচনা করছিলেন, অন্যদিকে এই মাটির আসল ভূমিপুত্ররা ক্ষুধার জ্বালায় এবং করের নিষ্ঠুর বোঝায় পিষ্ট হচ্ছিলেন। এই বৈপরীত্য বাংলার সমাজদেহে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ফাটল তৈরি করেছিল।

    এই যুগের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের চূড়ান্ত রূপটি বিশ্লেষণ করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. নীহাররঞ্জন রায়। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সেন আমলের শেষ দিকে সামন্তবাদী শোষণের মাত্রা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, গ্রামীণ অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। স্বাধীন কৃষিজীবী ও কারিগর সমাজকে ‘অধম শূদ্র’ ও ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করার কারণে উৎপাদক শ্রেণীর মানুষেরা রাষ্ট্রের প্রতি চরম উদাসীন ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পরিচ্ছেদ: ‘অর্থনৈতিক অবস্থা’, পৃষ্ঠা ৩১২)। রাষ্ট্র যখন কেবল মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের কুলীনদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি কোনো আনুগত্য অবশিষ্ট থাকে না। সেন রাজাদের এই অভ্যন্তরীণ সামাজিক দেউলিয়াগ্রস্ততাই ছিল তাদের আসন্ন রাজনৈতিক পতনের প্রধান কারণ।

    ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: সামরিক ও রাজনৈতিক পতনোন্মুখ দশা

    সেন রাজবংশের এই গণবিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক বৈষম্যের নীতি কীভাবে তাদের সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল, তার এক অকাট্য ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক খতিয়ান তুলে ধরেছেন ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সেন রাজারা তলোয়ারের জোরে রাজত্ব করলেও, বাংলার বিশাল অনার্য ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সমর্থন না থাকায় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেতরে ভেতরে চরম দুর্বল হয়ে পড়েছিল (মজুমদার, ড. রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), জেনারেল প্রিন্টার্স, পরিচ্ছেদ: ‘সেন রাজবংশের পতন’, পৃষ্ঠা ১৪৫)।

    যখন কোনো বিদেশী বা অভ্যন্তরীণ আক্রমণ রাষ্ট্রকে আঘাত করে, তখন রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকেরা যদি রাজাকে বাঁচাতে এগিয়ে না আসে, তবে সেই রাজবংশের পতন কেউ ঠেকাতে পারে না। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, সেন রাজাদের কঠোর জাত-পাত ও বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার কারণে বাংলার আপামর আমজনতা রাষ্ট্রকে নিজেদের ভাবতেই পারেনি। ফলে, রাজকীয় ক্ষমতার জাঁকজমক বাইরে থেকে যতই সুসংহত মনে হোক না কেন, তা ছিল আসলে একটি তাসের ঘর। যে ভাষাকে তারা শৃঙ্খলিত করেছিল এবং যে মানুষকে তারা অস্পৃশ্য বানিয়েছিল, সেই অবহেলিত জনতার নীরব নীরবতাই সেন রাজত্বের চূড়ান্ত পতন সুনিশ্চিত করে তুলেছিল।

    এ পর্যন্ত আলোচনার সামগ্রিক ও তাত্ত্বিক উপসংহার

    আলোচনার এ পর্যায়ে প্রতিটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত ধ্রুব সত্যসমূহ হিন্দুত্ববাদী বাঙালি জাতীয়তার হেজমনিকে চূর্ণ করার জন্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়:

    ১. বহিরাগত শাসন ও জবরদখল: সেন রাজবংশ কোনোভাবেই বাংলার লৌকিক সংস্কৃতির অংশ ছিল না। তারা ছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা এক আগ্রাসী সামরিক শক্তি, যারা ক্ষমতার জোরে বাংলার সিংহাসন দখল করেছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৪)।

    ২. কৌলিন্য প্রথার সামাজিক জেনোসাইড: রাজা বল্লাল সেনের প্রবর্তিত ‘কৌলিন্য প্রথা’ ছিল বাংলার আদি ভূমিপুত্র ও পেশাজীবী সমাজকে (তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার, ডোম, চণ্ডাল) রাষ্ট্রীয়ভাবে পঙ্গু ও অস্পৃশ্য বানানোর একটি নিষ্ঠুর আইনি কোড (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৩)।

    ৩. ভাষিক কার্ফিউ ও অবদমন: রাজদরবার থেকে প্রাকৃত বা আদি-বাংলাকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করে এবং সংস্কৃতির আড়ালে কার্ফিউ জারি করে বাংলা ভাষাকে একটি অবরুদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিহীন উপভাষায় পরিণত করা হয়েছিল (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, পৃষ্ঠা ৪৫)।

    ৪. চর্যাপদের বলপ্রয়োগমূলক নির্বাসন: বৌদ্ধদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞ চালানোর ফলে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যরা নিজেদের জীবন ও সাহিত্যকে বাঁচাতে প্রাণভয়ে সুদূর নেপালে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন (শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ভূমিকা, পৃষ্ঠা ৯)।

    সুতরাং, এসব অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণাদি এ কথাই সাক্ষ্য দেয় যে, উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থী ও সেন শাসকেরা বাংলা ভাষাকে আপন করা তো দূরের কথা, একে সমূলে বিনাশ করার সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। এই শ্বাসরুদ্ধকর সামাজিক ও ভাষিক অন্ধকারের চরম লগ্নেই বাংলার ইতিহাসে এক নতুন ভোরের উদয় হয়। তেরো শতকের শুরুতে মুসলিমদের আগমন কেবল এই শোষিত ভূমিপুত্রদের সামাজিক শৃঙ্খলই ভাঙেনি, বরং অবরুদ্ধ বাংলা ভাষাকে রাজকীয় সিংহাসনে বসিয়ে এক নতুন জীবন দান করেছিল।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment