Table of Contents
![]() |
|
২:৪
Previous Part.......
দক্ষিণ ভারত থেকে আসা সেন রাজবংশ বাংলায় কেবল একচ্ছত্র রাজনৈতিক ক্ষমতাই কায়েম করেনি, বরং তারা এই মাটির প্রাচীনতম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য এক পদ্ধতিগত রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞের সূচনা করেছিল। সেনদের আগমনের পূর্বে বাংলায় দীর্ঘ চার শতাব্দী ধরে পাল রাজাদের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিদ্ধাচার্য ও সাধারণ ভূমিপুত্ররা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতেন। কিন্তু সেন রাজারা সিংহাসনে আরোহণ করেই বৈদিক হিন্দু ধর্মের চরমপন্থী অনুশাসনগুলোকে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে ঘোষণা করেন। তাদের এই উগ্র ধর্মীয় রূপান্তরের প্রথম এবং প্রধানতম শিকার হয়েছিল বাংলার সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সমাজ, যারা বর্ণভেদহীন এক সমতাভিত্তিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল।লক্ষণ সেন ও বল্লাল সেনের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধদের ওপর যে সামাজিক ও শারীরিক নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তার অকাট্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় বিখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকর গ্রন্থে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সেন শাসকেরা উত্তর ও পূর্ব বাংলার সুপ্রাচীন বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ এবং শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে একের পর এক অবরুদ্ধ করে ফেলেছিলেন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও অনুদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিলেন (বন্দ্যোপাধ্যায়, রাখালদাস। বাঙালার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পরিচ্ছেদ: ‘সেন রাজবংশ’, পৃষ্ঠা ২৯৪-২৯৫)।
ওদন্তপুরী, বিক্রমশীলা ও নালন্দার মতো মহাবিহারগুলোর ওপর যে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা ছিল এক সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক জেনোসাইড। এই ধ্বংসযজ্ঞের পদ্ধতি ছিল বহুমুখী। প্রথমত, ঐতিহাসিক বিনয়তোষ ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছেন যে, সেন রাজাদের তাম্রশাসনগুলোতে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদের জমিদান ও অগ্রহারের উল্লেখ রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ বৌদ্ধ বিহারের বদলে ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রতিষ্ঠানের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে এই বিহারগুলোর বিশাল বিশাল লাইব্রেরি ও আবাসিক ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল (Bhattacharyya, B., Introduction to Buddhist Esoterism, 1932, pp. 176-178)।
দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ফরমান অনুযায়ী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ‘পাপিষ্ঠ’ ও ‘সমাজবহির্ভূত’ ঘোষণা করা হয়, যার ফলে তারা জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন (Majumdar, R.C., History of Ancient Bengal, 1971, pp. 580-582)। তৃতীয়ত, বিহারের ভূমি দখল করে সেখানে ব্রাহ্মণদের মন্দির ও বসতি স্থাপন করা হয়েছিল, যা ছিল সাংস্কৃতিক মুছে ফেলার এক প্রশাসনিক কৌশল (বন্দ্যোপাধ্যায়, রাখালদাস, বাঙালার ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৯৪-২৯৫)। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় যথাযথই বলেছেন, সেন রাজারা বাংলার বৌদ্ধ-সংস্কৃতির ওপর এমন এক শাসনতান্ত্রিক রূপ চাপিয়ে দিয়েছিলেন, যা বৌদ্ধ দর্শন ও মৈত্রীধর্মের মূল ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, সংস্করণ ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ৪৬২-৪৬৫)।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সামাজিক মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে গ্রামবাংলার সাধারণ বৌদ্ধ সমাজ যারা কৃষিকাজ বা ছোটখাটো পেশার সাথে যুক্ত ছিল, তারা বর্ণবাদী সমাজে কোনো স্থান পায়নি। তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ফলে হাজার বছরের বৌদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
সেনদের এই ঐতিহাসিক আগ্রাসন কেবল ইট-পাথরের বিহারের ওপর সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক নির্মূল প্রক্রিয়া। বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে জড়িত লোকায়ত দর্শন ও কায়িক শ্রমের মহিমাকে তারা অবজ্ঞা করত। সেন রাজসভায় আর্যীকরণের যে ধারা প্রবল ছিল, তা বৌদ্ধদের অদ্বয় জ্ঞানতত্ত্ব ও মৈত্রীধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিশাল অংশ ব্যয় হতো আর্য সংস্কৃতির প্রচার এবং ব্রাহ্মণদের ভূমিদান ও বিশেষ সুবিধার জন্য, যা বৌদ্ধদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
চর্যাপদের নির্বাসন এবং নেপালের রাজদরবারের সত্য
এই রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিপীড়নের সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসে পড়েছিল বাংলা ভাষার আদিমতম লিখিত নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এর ওপর। চর্যাপদ কেবল কিছু ধর্মীয় গান ছিল না; তা ছিল আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের এক মহিমান্বিত ভাষিক প্রতিরোধ। সেনদের রাজকীয় স্বৈরাচার যখন চরমে পৌঁছায়, তখন তারা এই আদি-বাংলা ভাষায় রচিত পুঁথিগুলোকে ‘ম্লেচ্ছদের অপবিত্র দলিল’ হিসেবে চিহ্নিত করে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের হাত থেকে নিজেদের জীবন এবং তাদের পরম পবিত্র সাধন-সংগীতের এই তালপাতার পুঁথিগুলোকে রক্ষা করার জন্য বৌদ্ধ সাধকেরা এক চরম ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
এই নির্বাসনের করুণ পটভূমি ও সত্যটি উন্মোচন করেছেন স্বয়ং চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণার ভূমিকায় স্পষ্ট করে লিখেছেন যে, সেন আমলের রাজকীয় ও সামাজিক অত্যাচারের তীব্রতা যখন সহ্যসীমা পার হয়ে যায়, তখন বাংলার আদি ভূমিপুত্র তথা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা—যেমন লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা—তাঁদের এই অমূল্য সাহিত্যিক সম্পদগুলো বগলে চেপে প্রাণভয়ে হিমালয় পার হয়ে সুদূর নেপাল, তিব্বত ও ভুটানের পাহাড়ি অঞ্চলে পালিয়ে যান (শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ভূমিকা অংশ, পৃষ্ঠা ৯-১২)।
নেপালের আবহাওয়া শুষ্ক এবং সেখানে বৌদ্ধ রাজাদের নিরাপদ আশ্রয় থাকায় এই পুঁথিগুলো শত শত বছর ধরে টিকে ছিল, যা ১৯০৭ সালে উদ্ধার করা হয়। এই নির্বাসনই প্রমাণ করে যে, আজ যারা বাংলা ভাষার একচ্ছত্র উত্তরাধিকারী সাজতে চায়, তাদেরই রাজনৈতিক পূর্বসূরিরা এই ভাষার আদিমতম দেউটিটিকে এই বাংলার মাটি থেকে চিরতরে নির্বাসিত করেছিল।
পণ্ডিতদের মতে, এই পুঁথিগুলোর নেপাল গমন কেবল পলায়ন ছিল না, এটি ছিল একটি ঐতিহ্যের ধারকত্ব রক্ষা। যে মুহূর্তে বাংলার মাটিতে বৌদ্ধধর্মীয় জ্ঞানচর্চা নিষিদ্ধ করা হলো, তখনই এই পুঁথিগুলো হয়ে উঠল প্রতিরোধের প্রতীক। সেন রাজারা বাংলা ভাষাকে কেবল অবজ্ঞাই করেননি, বরং তারা মনে করতেন এই ভাষায় ঈশ্বর বা দেবতার স্তুতি সম্ভব নয়। ফলে বাংলা ভাষা হয়ে পড়েছিল রাজসভার বাইরের এক বহিষ্কৃত অস্তিত্ব।
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের ব্যবচ্ছেদ: সেনদের গণবিচ্ছিন্নতা ও ধর্মীয় স্বৈরাচার
বহিরাগত সেন রাজাদের এই ধর্মীয় স্বৈরাচার এবং বৌদ্ধদের ওপর চালানো অত্যাচারের ফলে বাংলার অভ্যন্তরীণ সামাজিক কাঠামো কতটা ভঙ্গুর ও গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তার এক চমৎকার ব্যবচ্ছেদ করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। তিনি প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের উপাদানগুলো খতিয়ান ধরে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, সেন রাজারা বাংলায় কোনো সুসংহত বা জনপ্রিয় রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেননি; বরং তাদের পুরো শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়ে ছিল একচেটিয়া সামরিক দমনপীড়ন এবং উচ্চবর্ণের মুষ্টিমেয় ব্রাহ্মণদের সন্তুষ্টির ওপর (মজুমদার, ড. রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), জেনারেল প্রিন্টার্স, পরিচ্ছেদ: ‘সেন রাজাদের রাজত্বকাল’, পৃষ্ঠা ১৩২)।
মজুমদার আরও দেখিয়েছেন, সেন রাজাদের এই সমাজকাঠামো ছিল অত্যন্ত অনমনীয়। পাল আমলে সমাজ ছিল অপেক্ষাকৃত নমনীয়, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেনরা তাদের আগমনে এই সহাবস্থানের সংস্কৃতিতে আঘাত হানে। বিশেষ করে বল্লাল সেনের প্রবর্তিত 'কৌলীন্য প্রথা' উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের মর্যাদা বাড়ানোর নামে সমাজকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে ফেলে। এতে একদিকে যেমন বৌদ্ধদের কোণঠাসা করা হয়েছিল, অন্যদিকে নিম্নবর্গের হিন্দুদের ওপরেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল চরম সামাজিক বৈষম্য।
এই গণবিচ্ছিন্নতার কারণেই বাংলার সংখ্যাগুরু অনার্য ভূমিপুত্র ও বৌদ্ধ সমাজ সেন রাজাদের নিজেদের ‘আপন রাজা’ বলে কোনোদিন মেনে নিতে পারেনি। সেনদের এই চরম অভ্যন্তরীণ বিভাজনের নীতি এবং দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চালানো নিধনযজ্ঞের ফলেই বাংলার সমাজদেহে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। যে সাধারণ মানুষকে তারা ‘অস্পৃশ্য’ বানিয়েছিল, যে ভাষাকে তারা ‘নরকের পথ’ বলেছিল এবং যে চর্যাপদকে তারা দেশছাড়া করেছিল—সেই শোষিত আমজনতার পুঞ্জীভূত দীর্ঘশ্বাসই সেন রাজবংশের পতনের ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছিল।
সেন আমলের এই শেষদিকে বাংলার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্রাহ্মণকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। রাজকর্মচারী থেকে শুরু করে গ্রাম্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা—সব ক্ষেত্রেই দখলদার বাহিনীর স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট ছিল একদল সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। ফলে রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে বাংলা ভাষার কোনো স্থান ছিল না। সরকারি সকল আদেশ ও দলিলপত্র লেখা হতো সংস্কৃত ভাষায়, যা ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই ভাষাগত আধিপত্য কেবল একটি প্রতীকী বিষয় ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতার এক শক্তিশালী অস্ত্র। সাধারণ মানুষ যখন দেখত যে তাদের প্রিয় ভাষাটি রাষ্ট্রীয় কাজ থেকে নির্বাসিত, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই সেন শাসনকে বিদেশি শাসন হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে।
এই অবরুদ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির চূড়ান্ত বিস্ফোরণ কীভাবে ঘটেছিল, তা বোঝার জন্য আমাদের সেই ঐতিহাসিক মোড়ের দিকে তাকাতে হবে। যেখানে দেখা যাবে, যখন বাংলার মানুষ তাদের সামাজিক ও ভাষিক মুক্তির স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক সেই সময়েই এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। যে রাজনৈতিক শক্তিটি বাংলায় প্রবেশ করেছিল, তারা কেবল সীমানা জয় করেনি, বরং তারা নিয়ে এসেছিল এক নতুন ধরনের সামাজিক সমতা এবং ভাষার প্রতি নতুন এক শ্রদ্ধাবোধ। সেনদের আরোপিত সেই কৃত্রিম আভিজাত্য ও ভাষিক নিপীড়নের দেয়াল ভেঙে বাংলার সাধারণ মানুষ কীভাবে তাদের আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধার করল, সেই গল্পটিই আমাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।

Post a Comment