Table of Contents
![]() |
| বল্লাল সেনের কৌলিন্য প্রথার মাধ্যমে বাংলার সমাজে জাত-পাতভিত্তিক রাষ্ট্রীয় বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতীকী ঐতিহাসিক চিত্র |
Previous Part.......
২:২
বহিরাগত সেন রাজবংশের রাজনৈতিক আধিপত্য যখন বাংলায় স্থায়ী রূপ লাভ করে, তখন তাদের শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজদেহে এক চরম বিভাজনের নীতি প্রয়োগ করা হয়। তলোয়ারের শক্তি দিয়ে যে ক্ষমতার সূচনা হয়েছিল, তাকে আইনি ও ধর্মীয় বৈধতা দিতে এক কুখ্যাত সামাজিক প্রকৌশল বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশ্রয় নেন এই বংশের অন্যতম শাসক রাজা বল্লাল সেন। ইতিহাসে এই রাজকীয় আইনটি ‘কৌলিন্য প্রথা’ বা কুলীন ব্যবস্থা নামে পরিচিত। এটি কোনো সাধারণ ধর্মীয় অনুশাসন ছিল না; এটি ছিল মূলত বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের চিরতরে মেরুদণ্ডহীন ও দাস বানিয়ে রাখার জন্য একটি রাষ্ট্রীয় আইনি কোড (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৩)।
বল্লাল সেন তাঁর রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে বাংলার সমাজকে সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে স্তরীভূত করেন। তিনি বাইরে থেকে আসা বৈদিক ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থদের মধ্যে যারা রাজার প্রতি অনুগত ছিল, তাদের ‘কুলীন’ বা সর্বোচ্চ আভিজাত্যের মর্যাদা দেন। এই কুলীনদের দেওয়া হয়েছিল অসীম সামাজিক ক্ষমতা এবং রাজকীয় কর মওকুফের সুবিধা। অপরদিকে, এই মাটির যারা আদি বাসিন্দা ও বংশানুক্রমিক কারিগর—যারা কৃষিকাজ করত, কাপড় বুনত বা নদী থেকে মাছ ধরে অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখত—তাদের ওপর চাপানো হয়েছিল চরম অসম্মান ও অবমাননার এক সামাজিক বিধি। এই আইনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সমাজকে এমনভাবে টুকরো টুকরো করে দেওয়া, যেন এই শোষিত ভূমিপুত্ররা কোনোদিন একতাবদ্ধ হয়ে বহিরাগত কর্ণাটকীয় রাজশাসনের বিরুদ্ধে কোনো গণবিদ্রোহ গড়ে তুলতে না পারে (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৫)।
নিম্নবর্ণের মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় অস্পৃশ্যতা কায়েম
বল্লাল সেনের এই কৌলিন্য প্রথার সবচেয়ে হিংস্র ও অমানবিক দিকটি ছিল বাংলার মূল পেশাজীবী সমাজকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অস্পৃশ্য’ এবং ‘অধম শূদ্র’ ঘোষণা করা। সেন রাজত্বের পূর্বে বাংলায় পেশাভিত্তিক যে বৈচিত্র্য ছিল, তা ছিল পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু সেন আমলে ধর্মশাস্ত্র এবং রাজশক্তির যৌথ জোটের মাধ্যমে এক নজিরবিহীন সামাজিক বর্ণবাদ কায়েম করা হয়। বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের বিভিন্ন পেশা অনুযায়ী সমাজকে ‘সৎ শূদ্র’ এবং ‘অসৎ শূদ্র’ বা অন্ত্যজ—এই দুই কঠোর ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। কাজের মধ্যে ছোটলোকি, বড়লোকি কোটা তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে মানুষের সামাজিক স্তর ও মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়। যা ছিলো বৈষম্যের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট পদ্ধতি।
এই রাজকীয় নিপীড়নের ফলে বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবী সমাজ—যেমন তাঁতি (যুগী), জেলে (কৈবর্ত), কামার, কুমার, ধোপা, স্বর্ণকার, সুবর্ণবণিক এবং ডোম ও চণ্ডালদের—একেবারে সমাজবহির্ভূত এবং অস্পৃশ্য ঘোষণা করা হয়। উচ্চবর্ণের কোনো হিন্দু বা ব্রাহ্মণ যদি এই আদি ভূমিপুত্রদের ছায়া মাড়াত, তবে তাকে অপবিত্র মনে করা হতো এবং স্নান করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। এই কঠোর আইনি শৃঙ্খলের কারণে এই মাটির সন্তানদের সম্পত্তি রাখার, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের বা সামাজিক সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৪৭)। এটি ছিল এক পদ্ধতিগত এবং কাঠামোগত নিধনযজ্ঞ, যা বাংলার আদি বাসিন্দাদের নিজস্ব ভূমিতেই ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র রূপরেখা: কৌলিন্য প্রথার মনস্তাত্ত্বিক অবদমন
বল্লাল সেনের এই কৌলিন্য প্রথা এবং এর ফলে সৃষ্ট সামাজিক বর্ণবাদ কীভাবে বাংলার সমাজমানস এবং মানুষের মুখের আদি ভাষাকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল, তার এক ক্ষুরধার তাত্ত্বিক রূপরেখা প্রদান করেছেন ভাষাবিদ ও পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সেনদের এই কৌলিন্য প্রথা ছিল মূলত বাংলার আদি অনার্য ভূমিপুত্রদের আত্মপরিচয়কে চিরতরে ধ্বংস করার একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। ড. শহীদুল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করেছেন যে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলার সাধারণ মানুষকে এমন এক হীনমন্যতার স্তরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তারা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ‘পাপের কারণ’ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৩৯)।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সমাজতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই কৌলিন্য প্রথার কারণেই সমাজ ও ভাষার মধ্যে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি হয়েছিল। উচ্চবর্ণের কুলীনরা নিজেদের আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য সংস্কৃতকে কুক্ষিগত করে রাখে এবং এই অস্পৃশ্য ঘোষিত ভূমিপুত্রদের ভাষা ‘প্রাকৃত’ বা আদি-বাংলাকে পশুর ভাষা বলে তাচ্ছিল্য করে। তিনি তাঁর গ্রন্থে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বল্লাল সেনের এই আইনি কোড কেবল মানুষের জাত কেড়ে নেয়নি, বরং বাংলার আদি লৌকিক সংস্কৃতির বিকাশকে অন্তত দুই শতাব্দীর জন্য সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৪২)।
কাঠামোগত শোষণের শিকার দেশীয় অর্থনীতি ও সমাজ
সেন আমলের এই কৌলিন্য প্রথা কেবল একটি সামাজিক বা ধর্মীয় নিয়ম ছিল না, এর পেছনে ছিল গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত শোষণের নীলনকশা। যে সুবর্ণবণিক বা ধনিক ব্যবসায়ী শ্রেণী পাল আমলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিল, সেন আমলে তাদের ‘অস্পৃশ্য শূদ্র’ ঘোষণা করে তাদের সমস্ত ধন-সম্পত্তি রাজকোষে বাজেয়াপ্ত করার আইনি পথ তৈরি করা হয়। এর ফলে, বাংলার স্বাধীন ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে একচেটিয়া সামন্তবাদী ও ভূস্বামীনির্ভর হয়ে পড়ে।
কাগজে-কলমে এই ধর্মীয় অনুশাসনগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যেন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে এই জন্মগত ভেদাভেদ ঈশ্বরের তৈরি নিয়ম। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা সেন আমলের বিভিন্ন শিলালিপি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এটি ছিল সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন এক বহিরাগত রাজবংশের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা। এই দমবন্ধ করা আইনি নিপীড়ন এবং জন্মগত লাঞ্ছনার ফলেই বাংলার সংখ্যাগুরু আমজনতা তথা প্রাক-আর্য ভূমিপুত্রদের মনে উচ্চবর্ণের এই ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে এক গভীর ও তীব্র ক্ষোভের বারুদ জমা হতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে এই বদ্বীপের ইতিহাসে এক বিশাল সামাজিক ও রাজনৈতিক বিস্ফোরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।

Post a Comment