Table of Contents
![]() |
সেন আমলে রাজদরবারে সংস্কৃতের একচেটিয়া প্রাধান্য এবং বাংলার লৌকিক ভাষাকে প্রান্তিক করে দেওয়ার প্রতীকী ঐতিহাসিক চিত্র |
Previous Part.......
২:৩
কোনো বহিরাগত বিজয়ী শক্তি যখন কোনো অঞ্চলের ক্ষমতা দখল করে, তখন তাদের প্রথম কাজই হয় স্থানীয় মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমটিকে পঙ্গু করে দেওয়া। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা সেন রাজারা খুব ভালো করেই জানত যে, যদি বাংলার সংখ্যাগুরু আমজনতার মুখের প্রাকৃত রূপটি প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজকীয় শক্তি পেয়ে যায়, তবে রাজপ্রাসাদের ভেতরের এলিটদের আধিপত্য বজায় রাখা অসম্ভব হবে। এই কারণেই সেন আমলে রাজদরবারের সমস্ত দরজা সাধারণ মানুষের ভাষা ‘বাংলা’ বা প্রাকৃতের জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। রাজকীয় ফরমান, কর আদায়ের খতিয়ান, বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি উচ্চস্তরে দেবভাষা সংস্কৃতকে বাধ্যতামূলক করা হয়। শুধু ধর্মচর্চায় বাংলা নিষিদ্ধ ছিলো, এমন নয়। জীবনের প্রতিটি অঙ্গন থেকে এই ভাষাকে বিতাড়িত ও ধ্বংস করার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন হিন্দু রাজারা।
এটি ছিল এক ধরনের অলিখিত সাংস্কৃতিক কার্ফিউ। বাংলার আদি ভূমিপুত্ররা যে ভাষায় তাদের মাঠ-ঘাটে কথা বলত, সেই ভাষাকে রাজপ্রাসাদের সীমানায় উচ্চারণ করাও ছিল কঠোর অপরাধের শামিল। সেন শাসকেরা এমন এক ভাষার দেয়াল খাড়া করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কোনো সাধারণ চাষী বা জেলে যখন নিজের ভাষায় রাজদরবারে বিচার চাইতে আসত, তখন উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ আমলারা তার ভাষাকে ‘ম্লেচ্ছ বা কুকুরের ডাক’ বলে উপহাস করত। এই নীতিগত নির্বাসনের ফলে আদি-বাংলা ভাষাটি তার নিজস্ব জন্মভূমিতেই এক প্রকার অবরুদ্ধ ও অস্পৃশ্য রূপ ধারণ করে, যা কেবল প্রান্তিক মানুষের কুঁড়েঘরের ভেতরেই কোনোরকমে বেঁচে ছিল।
গীতগোবিন্দমের আড়ালে আধিপত্যবাদের রূপরেখা
সেন রাজাদের এই তীব্র ভাষা-বিদ্বেষ এবং সংস্কৃতপ্রীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাওয়া যায় দ্বাদশ শতকের শেষভাগে রাজা লক্ষণ সেনের রাজসভার সাহিত্যিক বিন্যাসে। লক্ষণ সেনের দরবারে ‘পঞ্চরত্ন’ নামে পাঁচজন প্রধান সংস্কৃত কবি বা পণ্ডিতের সমাবেশ ছিল—জয়দেব, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য, শরণ এবং উমাপতিধর। এদের মধ্যে কবি জয়দেব ও ধোয়ী ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জয়দেবের বিখ্যাত কাব্য ‘গীতগোবিন্দম্’ কিংবা ধোয়ীর ‘পবনদূত’-এর মতো উচ্চাঙ্গের সংস্কৃত ছন্দ আজও সনাতনপন্থী পণ্ডিতদের কাছে চরম আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু এই সাহিত্যের ভেতরের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি ছিল অত্যন্ত গভীর। লক্ষণ সেনের দরবারে আশ্রিত এই পঞ্চরত্নের কাব্যগুলো রচিত হয়েছিল এমন এক ভাষায়, যা তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের—অর্থাৎ নিরানব্বই শতাংশ মানুষের কাছেই ছিল সম্পূর্ণ অবোধ্য এবং বিচ্ছিন্ন।
রাজকীয় অর্থায়নে উৎপাদিত এই উচ্চাঙ্গের সংস্কৃত সাহিত্য আসলে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে অবদমিত করার এক চমৎকার হাতিয়ার ছিল। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বোঝানো হতো যে, জ্ঞান, ধর্ম এবং আভিজাত্য কেবল রাজসভার উচ্চবর্ণের মানুষেরই সম্পত্তি। এই যুগে যখন লৌকিক জীবনের হাজারো সংকট, করের বোঝা এবং জাত-পাতের অত্যাচারে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত ছিল, তখন রাজদরবারে বসে বহিরাগত রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কবিরা কেবল রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা আর রাজার স্তুতিমূলক সংস্কৃত শ্লোক রচনা করছিলেন (রায়, নীহাররঞ্জন (১৪১২ ব.), বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, চতুর্দশ পরিচ্ছেদ: ‘সংস্কৃতি ও সাহিত্য’, পৃষ্ঠা: ৫৯৮-৬০২)। এটি ছিল মূল ভূখণ্ডের বাস্তবতার সাথে এক চরম প্রতারণা এবং প্রাকৃত সংস্কৃতির টুঁটি চেপে ধরার এক সুপরিকল্পিত রাজকীয় আয়োজন।
ফতোয়া থেকে কার্ফিউ: সামাজিক স্তরে ভাষার অবদমন
এই ভাষাগত নিষেধাজ্ঞা কেবল রাজপ্রাসাদের দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা নেমে এসেছিল বাংলার প্রতিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনেও। সেন আমলে গড়ে ওঠা নব্য স্মার্ত ব্রাহ্মণ সমাজ গ্রামে গ্রামে ঘুরে এই প্রচার চালাতে শুরু করে যে, প্রাকৃত ভাষা বা কথ্য বাংলা হলো পাপের আকর। যদি কোনো নিম্নবর্ণের মানুষ বা শূদ্র কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ নিজের ভাষায় অনুবাদ করে বা শোনে, তবে তার ইহকাল ও পরকাল দুই-ই ধ্বংস হবে। এই কঠোর ধর্মীয় বিধিগুলোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ মানুষের মুখে ভাষার শৃঙ্খল পরিয়ে দেওয়া (সেন, দীনেশচন্দ্র (১৮৯৬), বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১ম খণ্ড), হেমচন্দ্র সেন পাবলিশার্স, কলকাতা, দ্বিতীয় অধ্যায়: ‘প্রাক-চৈতন্য যুগ’, পৃষ্ঠা: ৫২-৫৬)।
উচ্চবর্ণের এই চক্রান্তের ফলে বাংলার লৌকিক সাহিত্য, ছড়া, খনার বচন কিংবা আদিম লোকগাথাগুলোর লিখিত রূপ দেওয়া আইনত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কারণ কোনো লেখক বা কবি যদি বাংলায় কিছু লেখার সাহস দেখাতেন, তবে তাকে সমাজচ্যুত করা হতো এবং রাজকীয় শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। ফলে, আদি-বাংলা ভাষাটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা ব্যাকরণগত রূপ পাওয়ার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়। এই অবরুদ্ধ দশা বাংলার আদি বাসিন্দাদের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, যা তাদের নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের ভীতি ও হীনম্মন্যতা তৈরি করতে বাধ্য করে। যে ভাষাকে তারা বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, তাকেই তারা প্রকাশ্য সমাজে উচ্চারণ করতে ভয় পেত, যা ছিল এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক অন্ধকার যুগ।

Post a Comment