Loading...

রাজকীয় সংস্কৃতের আগ্রাসন বনাম আদি প্রাকৃতের অস্তিত্বের লড়াই

রাজকীয় সংস্কৃতের আগ্রাসন বনাম আদি প্রাকৃতের অস্তিত্বের লড়াই
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    রাজকীয় সংস্কৃত ভাষার আধিপত্য এবং আদি প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার বিকাশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা গবেষণাধর্মী সম্পাদকীয় ইলাস্ট্রেশন।

    রাজকীয় সংস্কৃতের আগ্রাসন বনাম আদি প্রাকৃতের অস্তিত্বের লড়াই

    Previous Part.......

    ১:৩

    আর্যদের এই রাজনৈতিক ও সামরিক জবরদখল কেবল বাংলার ভূমিপুত্রদের দেহের ওপর দাসত্বের শৃঙ্খল পরায়নি, বরং তাদের মুখের ভাষার ওপরও এক নজিরবিহীন ঔপনিবেশিক আগ্রাসন চালিয়েছিল। আর্যরা যখন উত্তর-ভারত হয়ে এই বদ্বীপে তাদের বর্ণবাদী শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে, তখন তাদের প্রধানতম মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ছিল তাদের দেবভাষা সংস্কৃত। আর্য মনস্তত্ত্বে ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম ছিল না, তা ছিল আভিজাত্য, ক্ষমতা এবং আধিপত্য বজায় রাখার এক পরম আধ্যাত্মিক দণ্ড। উচ্চবর্ণের আর্য ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় শাসকেরা রাজদরবার, ধর্মীয় আচার এবং জ্ঞানচর্চার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে সংস্কৃতকে বাধ্যতামূলক করে তোলে। অপরদিকে, এই মাটির আদি অনার্য ও প্রাক-আর্য ভূমিপুত্রদের মুখের প্রাচীন কথ্য ভাষাকে তারা ‘অপভাষা’ বা পশুর কুজনের মতো অপবিত্র মনে করত।

    এই ভাষাগত ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের নিজস্ব কথ্য ভাষা—যা মূলত অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়ীয় শব্দভাণ্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছিল—তা এক অলিখিত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আর্যদের তীব্র চাপ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ তাদের মুখের প্রাচীন কথ্য রূপ বা ‘আদি প্রাকৃত’ বা প্রোটো-প্রাকৃত ত্যাগ করেনি। প্রখ্যাত ভাষাবিদ চ্যাটার্জী, ড. সুনীতিকুমার তাঁর আকর গ্রন্থ The Origin and Development of the Bengali Language (ODBL)-এ এই ভাষাগত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের রূপটি পরিষ্কার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, বহিরাগত আর্যরা এই অঞ্চলে তাদের সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ ও আভিজাত্য চাপিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, বাংলার মাটি ও মানুষের মুখের আদিম সুরকে তারা পুরোপুরি আর্যীকরণ করতে পারেনি (চ্যাটার্জী, সুনীতিকুমার। The Origin and Development of the Bengali Language, প্রথম খণ্ড, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পৃষ্ঠা ৩)। রাজকীয় ক্ষমতার দাপটে সংস্কৃত ভাষার আগ্রাসন যত তীব্র হয়েছে, সাধারণ মানুষের ঘরের ভেতরের প্রাকৃত রূপটি তত বেশি প্রতিরোধমুখী হয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে গেছে।

    অপভ্রংশ ও প্রত্ন-বাংলার জন্ম-বেদনা

    সময়ের অমোঘ নিয়মে বিজয়ী আর্যদের বৈদিক সংস্কৃতি এবং বিজিত অনার্য ভূমিপুত্রদের আদি লোকভাষার দীর্ঘ পারস্পরিক সংঘাত, মিলন ও বিবর্তনের পথ ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাতাত্ত্বিক মানচিত্রে এক মহাবিপ্লব ঘটে যায়। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা যে ‘সংস্কৃত’ ভাষাকে ঈশ্বরের বাণী, ‘অপরিবর্তনীয়’ বা পবিত্র মনে করে ব্যাকরণের কঠিন শৃঙ্খলে বন্দি করেছিলেন, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার বেগবান স্রোত সেই শৃঙ্খল ভেঙে দিতে সময় নেয়নি। ধ্রুপদী সংস্কৃত যখন রাজদরবার আর পণ্ডিতদের যজ্ঞশালায় স্থবির হয়ে পড়ে, তখন আমজনতার মুখে মুখে সমান্তরালভাবে প্রবহমান ‘প্রোটো-প্রাকৃত’ বা আদি লোকভাষা রূপান্তরকামী চরিত্র ধারণ করে। এই বিবর্তিত ও সহজীকৃত লোকভাষাকেই ভাষাতাত্ত্বিকেরা বলেন ‘প্রাকৃত’। লোকমুখের এই প্রাকৃত ভাষা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরও পরিবর্তিত, রূপান্তরিত এবং প্রথাবদ্ধ ব্যাকরণ থেকে চ্যুত হয়ে একসময় ‘অপভ্রংশ’ (যার আক্ষরিক অর্থ চ্যুত বা ক্ষয়প্রাপ্ত রূপ) স্তরে উপনীত হয়। রক্ষণশীল সমাজ একে ‘বিকৃত ভাষা’ বলে অবহেলা করলেও, মূলত এই গতিশীল ও প্রাণবন্ত অপভ্রংশের জঠর থেকেই জন্ম নেয় আমাদের আদি-বাংলা বা প্রত্ন-বাংলা ভাষার ভ্রূণ।

    বাংলা ভাষার এই অনন্য জন্ম-বেদনা এবং এর বিবর্তনের নিখুঁত ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক ছক তুলে ধরেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ও বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি তাঁর কালজয়ী গবেষণা গ্রন্থ ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’-এ প্রথাগত পণ্ডিতদের অন্ধবিশ্বাস ভেঙে প্রমাণ করেছেন যে, বাংলা কোনো অলৌকিক উপায়ে বা আর্যদের সংস্কৃতির কৃপায় সরাসরি সংস্কৃত থেকে জন্ম নেয়নি। তবে বাংলা ভাষার আদি উৎস নিয়ে সমকালীন ভাষাবিদদের সাথে তাঁর তাত্ত্বিক পার্থক্য ছিল। যেখানে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো পণ্ডিতেরা মনে করতেন বাংলা এসেছে উত্তর ভারতের ‘মাগধী প্রাকৃত’ থেকে, সেখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে, বাংলা ভাষার আদি উৎস হলো প্রাচীন বাংলার নিজস্ব জনপদ ‘গৌড়’ অঞ্চলে প্রচলিত ‘গৌড়ী প্রাকৃত’ এবং তার পরবর্তী বিবর্তিত রূপ ‘গৌড়ী অপভ্রংশ’ (শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ২৯-৩০)।

    ড. শহীদুল্লাহর এই ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আনুমানিক খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর (৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি) দিকে এই গৌড়ী অপভ্রংশ থেকে একটি স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা হিসেবে ‘বঙ্গ-কামরূপী’ শাখার মাধ্যমে আদি-বাংলা রূপটি সাধারণ মানুষের মুখে প্রথম ফুটে উঠতে শুরু করে। আর্যদের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতের কৃত্রিম আভিজাত্যের বিরুদ্ধে এটি ছিল এই মাটির সাধারণ খেটে খাওয়া অনার্য মানুষের এক বিরাট ভাষাতাত্ত্বিক প্রতিরোধ। অনার্য ভূমিপুত্রদের হাজার বছরের নিজস্ব শব্দভাণ্ডার, উচ্চারণরীতি ও লোকায়ত সুর যখন বৈদিক ভাষার লোকমুখের রূপের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়, তখনই মূলত বাংলা ভাষার আদি রূপটি পৃথিবীর আলো দেখে। শাসকের রাজকীয় ভাষার দম্ভকে পরাস্ত করে আমজনতার মুখের এই ভাষার আত্মপ্রকাশ ছিল আর্যদের ওপর অনার্যদের এক নীরব অথচ দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক বিজয়, যা উচ্চবর্ণের সমাজ সহজে মেনে নিতে পারেনি।

    চর্যাপদ: বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ভাষিক বিদ্রোহের দলিল

    এই আদি-বাংলা বা প্রত্ন-বাংলা ভাষার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্ত লিখিত দলিল হলো ‘চর্যাপদ’। চর্যাপদ কেবল বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন নয়, এটি ছিল তৎকালীন আর্য-ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় ও ভাষাগত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক ভাষিক বিদ্রোহের দলিল। খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে, যখন বাংলায় আদি ভূমিপুত্রদের রক্তধারা বহনকারী পাল রাজবংশের শাসন চলছিল, তখন বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের সাধক বা ‘সিদ্ধাচার্যগণ’ সাধারণ মানুষের এই নতুন কথ্য ভাষায় তাদের সাধন-সংগীতগুলো রচনা করেন।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চর্যাপদের কবিদের (যেমন—লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা) তালিকায় একজনও উচ্চবর্ণের হিন্দু বা আর্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের নাম পাওয়া যায় না। এর কারণ, চর্যাপদের রচয়িতারা ছিলেন এই মাটির খাঁটি সন্তান—যারা আর্যদের তৈরি করা চাতুর্বর্ণ প্রথার নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং সমাজে তাঁতি, জেলে, হরিণ শিকারী বা ডোমের মতো প্রান্তিক পেশার মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করতেন। এই সিদ্ধাচার্যরা তাদের গোপন আধ্যাত্মিক তত্ত্ব প্রচারের জন্য আর্যদের দেবভাষা সংস্কৃতকে সম্পূর্ণ বর্জন করেন এবং সাধারণ মানুষের মুখের আদি-বাংলা ভাষাকে সাহিত্যের বাহন হিসেবে বেছে নেন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থে চর্যাপদের ভাষারূপকে ‘আদি-বাংলা’ হিসেবে ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সিলমোহর দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন কীভাবে এই ভাষার প্রতিটি ছত্রে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক প্রচ্ছন্ন প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের সুর লুকিয়ে ছিল (চ্যাটার্জী, সুনীতিকুমার। The Origin and Development of the Bengali Language, প্রথম খণ্ড, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পৃষ্ঠা ১০৪)।

    হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আবিষ্কার এবং নেপালের রাজদরবারের করুণ সত্য

    চর্যাপদের মতো বাংলা ভাষার এই আদি মহিমান্বিত দলিলটি কেন নিজের জন্মভূমি বাংলায় না পেয়ে সুদূর হিমালয়ের কোলে নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থগারে পাওয়া গেল, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক করুণ এবং রূঢ় রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে এই অমূল্য পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের এই নেপালে চলে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলায় বহিরাগত সেন রাজবংশের আগমন এবং তাদের রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়ন।

    দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা সেন শাসকেরা (বল্লাল সেন, লক্ষণ সেন) বাংলায় ক্ষমতা দখল করেই পাল আমলের উদার ও বৌদ্ধ-বান্ধব পরিবেশকে ধ্বংস করে দেন। তারা পুনরায় কঠোর বৈদিক ধর্ম এবং চাতুর্বর্ণের বিষবৃক্ষ রোপণ করে বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের মানুষদের ওপর চূড়ান্ত সামাজিক ও ধর্মীয় নির্যাতন শুরু করেন (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৪)।

    সেন আমলে বৌদ্ধদের সমস্ত বিহার ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাদের ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করা হয়। এই রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় জেনোসাইড বা নিপীড়নের হাত থেকে নিজেদের জীবন এবং তাদের পরম পবিত্র সাধন-সংগীতের এই পুঁথিগুলোকে রক্ষা করার জন্য বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও সন্ন্যাসীরা প্রাণভয়ে হিমালয় পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে নেপাল ও তিব্বতের পাহাড়ি অঞ্চলে পালিয়ে যান। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর এই আবিষ্কার মূলত এটাই প্রমাণ করে যে, উচ্চবর্ণের হিন্দু শাসকেরা বাংলার এই আদি ভূমিপুত্রদের এবং তাদের প্রথম লিখিত সাহিত্য ‘চর্যাপদ’কে এই মাটির বুক থেকে চিরতরে নির্মূল করে দিতে চেয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৮)।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment