Table of Contents
![]() |
| কর্ণাটক থেকে আগত সেন রাজবংশের বাংলায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা, পাল যুগের অবসান এবং নতুন শাসনব্যবস্থার সূচনার প্রতীকী ঐতিহাসিক চিত্র |
Previous Part.......
২:১
দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে সেনদের আগমন: এক বহিরাগত আগ্রাসনের খতিয়ান
প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এই পললভূমির শাসনক্ষমতায় এক সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছিল। দীর্ঘকাল ধরে বাংলায় শাসনরত পাল রাজবংশের পতনোন্মুখ দশার সুযোগ নিয়ে এক সম্পূর্ণ বহিরাগত ও বিজাতীয় শক্তি এ দেশের শাসনদণ্ড কুক্ষিগত করে। এই নব্য শাসকগোষ্ঠীই ইতিহাসে ‘সেন রাজবংশ’ নামে পরিচিত। আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারা প্রায়শই সেন আমলকে বাংলার এক ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালান, যেন তারা এই মাটিরই আপন সন্তান ছিলেন। অথচ, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক খতিয়ান স্পষ্টাক্ষরে সাক্ষ্য দেয় যে, সেন শাসকেরা এই বাংলার মাটি, মানুষ কিংবা সংস্কৃতির কেউ ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন সুদূর দক্ষিণ ভারত থেকে আসা এক জবরদখলকারী সামরিক শক্তি।
সেনদের আদি বাসস্থান এবং তাদের বাংলায় আগমনের নিখুঁত ভৌগোলিক রুটটি চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। সেন রাজাদের নিজেদের খোদাই করা শিলালিপি এবং তাম্রশাসন—যেমন বিজয় সেনের ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’ এবং লক্ষ্মণ সেনের ‘মাধাইনগর তাম্রশাসন’—থেকে এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, তারা ছিলেন দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক অঞ্চলের অধিবাসী (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৪)। শিলালিপিতে তারা নিজেদের ‘কর্ণাট-ক্ষত্রিয়’ বা ‘ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়’ হিসেবে গৌরবভরে উল্লেখ করেছেন। তারা দক্ষিণ ভারতের চালুক্য রাজবংশের রাজাদের অধীনে সামরিক সেনাপতি বা সামন্ত হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন। একাদশ শতাব্দীতে চালুক্য রাজাদের উত্তর-ভারত ও বাংলা অভিযানের সময় এই কর্ণাটকীয় সৈন্যরা বাংলায় প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে রাঢ় অঞ্চলে (বর্তমান বর্ধমান ও বীরভূম জেলা) স্থায়ীভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসে। সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা সামন্ত সেন এবং তাঁর পুত্র হেমন্ত সেন ছিলেন মূলত বহিরাগত সামরিক ভাগ্যান্বেষী, যারা বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে এই ভূখণ্ডের প্রকৃত ভূমিপুত্রদের ওপর নিজেদের শাসন চাপিয়ে দিয়েছিলেন (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৬)।
পাল আমলের উদারতা বনাম সেনদের রাজকীয় স্বৈরাচার
কর্ণাটকীয় সেনদের এই রাজনৈতিক জবরদখল কেবল একটি রাজবংশের পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল বাংলার প্রাচীন সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর এক চরম কাঠামোগত আঘাত। সেনদের পূর্ববর্তী শাসক পাল রাজারা (অষ্টম থেকে একাদশ শতক) ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং তাদের ক্ষমতার মূল ভিত্তি ছিল এই মাটির আদি অনার্য ও প্রাক-আর্য ভূমিপুত্রদের সমর্থন। পাল শাসকেরা ছিলেন এই বাংলারই সন্তান এবং তাদের আমলে সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উদার ও গণমুখী। তারা সাধারণ মানুষের মুখের কথ্য প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষাকে অবজ্ঞা করেননি, যার ফলে তাদের আমলেই বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা বাংলা ভাষার আদি রূপ ‘চর্যাপদ’ রচনা করার সাহস পেয়েছিলেন। পাল আমলের এই উদার সামাজিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতেই বাংলায় সেন রাজবংশের রাজকীয় স্বৈরাচার আত্মপ্রকাশ করে।
দক্ষিণ ভারত থেকে আসা বিজয় সেন যখন সমগ্র বাংলায় সেন শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেন, তখন তাঁর মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলার এই স্থানীয় লৌকিক ও প্রাক-আর্য সংস্কৃতিকে সমূলে উপড়ে ফেলা। সেন শাসকেরা নিয়ে এসেছিলেন দক্ষিণ ভারতের চরম অর্থোডক্স ও গোঁড়া স্মার্ত সনাতনপন্থী ভাবধারা। তারা বাংলায় এসে এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচার কায়েম করেন, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল উচ্চবর্ণের বৈদিক ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করা। ড. নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) গ্রন্থে এই যুগের রাজনৈতিক পরিবর্তনের চরিত্রটি নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বহিরাগত সেন রাজারা স্থানীয় ভূমিপুত্রদের সংস্কৃতিকে দমন করার জন্য রাজশক্তি এবং বৈদিক ধর্মশাস্ত্রের এক অভূতপূর্ব অনৈতিক জোট তৈরি করেছিলেন (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৬৮)। এই জোটের প্রথম এবং প্রধানতম শিকার হয়েছিল বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া আমজনতা এবং তাদের মুখের আদি-বাংলা ভাষা, যা রাজপ্রাসাদের সীমানা থেকে চিরতরে নির্বাসিত হয়েছিল।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ভাষ্য: সেনদের আগমন ও দেশীয় সংস্কৃতির অবরুদ্ধ দশা
বহিরাগত সেন রাজবংশের এই আগমন বাংলার সমাজ ও ভাষার ওপর কীরকম কালান্তক অন্ধকার নামিয়ে এনেছিল, তার এক সুগভীর ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক রূপরেখা প্রদান করেছেন ভাষাবিদ ও পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সেনদের এই কর্ণাটকীয় শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলার দেশীয় লৌকিক সংস্কৃতি এক চরম অবরুদ্ধ দশার মধ্যে পতিত হয়েছিল। ড. শহীদুল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করেছেন যে, সেন রাজারা যেহেতু নিজেরা বহিরাগত ছিলেন এবং বাংলার আপামর জনসাধারণের সাথে তাদের রক্তের কিংবা সংস্কৃতির কোনো আত্মিক সম্পর্ক ছিল না, তাই তারা তাদের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য এক কৃত্রিম আভিজাত্যবাদ এবং ভাষাগত স্বৈরাচার চাপিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৫২)।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র শব্দতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেন আমলে রাজভাষা হিসেবে একমাত্র সংস্কৃত ভাষাকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের মুখের ভাষাকে ‘ম্লেচ্ছদের উপভাষা’ হিসেবে গণ্য করে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবদমন করা হয়েছিল। তিনি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সেন রাজাদের এই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এতটাই তীব্র ছিল যে, তা বাংলার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক বিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পৃষ্ঠা ৫৪)। ড. শহীদুল্লাহ্র এই অকাট্য পর্যবেক্ষণই প্রমাণ করে যে, সেনরা বাংলায় কোনো সাংস্কৃতিক প্রগতি আনেনি, বরং তারা ছিল এক ঐতিহাসিক শৃঙ্খল—যা এই মাটির আসল সন্তানদের নিজস্ব ভূমিতেই পরবাসী এবং তাদের ভাষাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।
রাজনৈতিক জবরদখলের সামাজিক প্রেক্ষাপট
সেনদের এই রাজনৈতিক জবরদখল কীভাবে বাংলার সমাজজীবনকে গ্রাস করেছিল, তা বুঝতে হলে তাদের শাসনকাঠামোর ভেতরের চালগুলো বোঝা প্রয়োজন। বহিরাগত এই শাসকেরা ভালো করেই জানত যে, সংখ্যাগুরু অনার্য ভূমিপুত্রদের ওপর কেবল তলোয়ারের জোরে দীর্ঘকাল রাজত্ব করা যাবে না। তাই তারা সমাজকে ভেতর থেকে পঙ্গু করার জন্য এক সুগভীর চক্রান্তের আশ্রয় নেয়। তারা স্থানীয় সামন্ত প্রভু ও উচ্চবর্ণের কিছু মানুষকে বিপুল পরিমাণ ভূমি ও রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজেদের দলে টানে, যা বাংলায় এক নতুন ‘শোষক এলিট শ্রেণী’র জন্ম দেয়।
এই এলিট শ্রেণীর মূল দায়িত্বই ছিল রাজার শাসনকে টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে স্তিমিত করা। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকেরা দেখিয়েছেন যে, সেন আমলের এই শাসনকাঠামো ছিল সম্পূর্ণ গণবিচ্ছিন্ন এবং একচেটিয়া স্বৈরাচারী। বাংলার সাধারণ মানুষ—যারা কর দিত, ফসল ফলাত এবং বদ্বীপের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখত—রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তাদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। এই জবরদখলকারী শাসনের ফলেই বাংলার প্রাচীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং রাজকীয় ফরমানের নামে মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার ওপর নেমে আসে চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা। এই রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটটিই পরবর্তীকালে সেন রাজাদের সেই কুখ্যাত ‘কৌলিন্য প্রথা’ বা আইনি জাত-পাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ সুগম করেছিল, যা বাংলার সমাজকে চিরতরে টুকরো টুকরো করে দেয়।

Post a Comment