Table of Contents
![]() |
সুলতানি বাংলায় লৌকিক ঐতিহ্য, কৃষিজীবী সংস্কৃতি এবং প্রাক-আর্য লোকউৎসবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রতীকী উপস্থাপন |
৩:৪
বাংলা ভূখণ্ডে স্বাধীন সুলতানি সালতানাতের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পর, তার সরাসরি এবং ইতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়েছিল এই মাটির আদি বাসিন্দাদের হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির ওপর। বহিরাগত আর্য এবং কর্ণাটকীয় সেন রাজাদের আমলে প্রাক-আর্য অনার্য ভূমিপুত্রদের নিজস্ব লৌকিক উৎসব, লোকগাথা, এবং মাটির সুরগুলোকে ‘ম্লেচ্ছদের অপবিত্র কৃষ্টি’ বলে সামাজিক স্তরের একেবারে তলানিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), প্রথম খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা ২৫২)। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা এমন এক সাংস্কৃতিক কার্ফিউ জারি করেছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের লোকজ বিশ্বাসগুলোকে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বা অবদমিত করে রাখা হতো। কিন্তু তেরো শতকে মুসলিমদের আগমনের পর, এই দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে এবং বাংলার লোকসংস্কৃতি তার নিজস্ব জন্মভূমিতে এক নতুন ও স্বাধীন জীবন লাভ করে।
মুসলিম সুলতানরা এ দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করার পর, রাজকীয় অহংকার ও আভিজাত্যের প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি চলে আসেন। এর ফলে, বাংলার গ্রামীণ জনপদগুলোতে কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী সমাজের মাঝে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত থাকা আদিম অনার্য লোকউৎসবগুলো—যেমন নবান্ন, ফসলের উৎসব, এবং নদীকেন্দ্রিক নৌকাবাইচ—রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে পালিত হতে শুরু করে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও গবেষক ড. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তাঁর প্রামাণ্যগ্রন্থে এই যুগের সাংস্কৃতিক মুক্তির রূপটি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, মুসলিম শাসনে এ দেশের সাধারণ মানুষ কেবল তাদের জানমালের নিরাপত্তাই পায়নি, বরং তারা তাদের নিজস্ব লৌকিক সংস্কৃতি ও প্রাক-আর্য ঐতিহ্যগুলোকে কোনো ভয়ভীতি বা উচ্চবর্ণের ফতোয়া ছাড়াই প্রকাশ্য সমাজে উদ্যাপন করার পূর্ণ সামাজিক স্বাধীনতা লাভ করেছিল (করিম, আবদুল। Social History of the Muslims in Bengal, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, পরিচ্ছেদ: ‘সামাজিক জীবন ও লোকসংস্কৃতি’, পৃষ্ঠা ১৮২)। এই সাংস্কৃতিক উদারতাই বাংলার গণসংস্কৃতির শেকড়কে আরও বেশি গভীর ও সুদৃঢ় করে তুলেছিল।
আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের পুঁথি আবিষ্কার এবং কলকাতার ‘একচেটিয়া আভিজাত্যবাদ’ চূর্ণকরণ
উনিশ ও বিশ শতকে কলকাতার নব্য-হিন্দু এলিট সমাজ এবং তাদের ছদ্ম-সেক্যুলার অনুসারীরা বইয়ের পাতায় এবং ইন্টারনেটে এমন একটি অসত্য বয়ান বা ডেটা হেজমোনি প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মূল আদি মালিক ও ধারক-বাহক কেবল উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থীরাই ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের এই সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও একচেটিয়া সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ববাদের অহংকারকে এক নিমেষেই চূর্ণ করে দেয় বিংশ শতকের শুরুতে বাংলার প্রথিতযশা প্রাচীন পুঁথি গবেষক ও পণ্ডিত সাহিত্যবিশারদ, আব্দুল করিম-এর এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। তিনি নিজের জীবন এবং অর্থ বাজি রেখে অবিভক্ত বাংলার গ্রাম-গঞ্জের প্রত্যন্ত কোণ থেকে হাজার হাজার অবহেলিত ও বিস্মৃতপ্রায় প্রাচীন বাংলা ‘পুঁথি’ এবং সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেন।
আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ তাঁর উদ্ধারকৃত পুঁথিগুলোর বিবরণ দিতে গিয়ে এক অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচন করেন, যা কলকাতার বাবুদের সাজানো ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয়। তিনি দালিলিকভাবে প্রমাণ করেন যে, মধ্যযুগে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যখন বাংলা ভাষাকে ‘রৌরব নরকের ভাষা’ বলে চরম ঘৃণা ও অবজ্ঞা করছিল, তখন এই মাটির মুসলমান কবি ও সাধকেরাই শত শত বছর ধরে বাংলা ভাষায় মহাকাব্য, প্রেমোপাখ্যান ও ধর্মীয় আখ্যান রচনা করে এই ভাষাকে জিন্দা রেখেছিলেন (সাহিত্যবিশারদ, আব্দুল করিম। বাঙালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ, ১ম খণ্ড, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্করণ, পরিচ্ছেদ: ‘পুঁথির ভূমিকা’, পৃষ্ঠা ৪২-৫০)। সাহিত্যবিশারদ এবং তাঁর সহযোগী ড. এনামুল হক তাঁদের যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে মধ্যযুগের মুসলিম শাসিত আরাকান রাজসভার কবিরা—যেমন দৌলত কাজী ও আলাওল—সংস্কৃতের কঠিন শৃঙ্খল ভেঙে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক এবং গণমুখী রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে আভিজাত্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন (সাহিত্যবিশারদ, আব্দুল করিম ও এনামুল হক, ড.। আরাকান রাজসভায় বাঙালা সাহিত্য, রূপম প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৮-২৫)। এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করে যে, বাংলা সাহিত্যের মূল ভিত্তি এবং এর হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠার পেছনের আসল কারিগর ছিলেন বাংলার সাধারণ মানুষ ও মুসলিম কবিরা, যাদের সাহিত্যকে উনিশ শতকের কলকাতার ভদ্রলোকেরা সুকৌশলে ইতিহাস থেকে ছেঁটে ফেলতে চেয়েছিল।
নিম্নবর্ণের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ইসলামের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ
সুলতানি আমলে বাংলার সমাজদেহে যে বড় ধরনের ধর্মীয় রূপান্তর ঘটেছিল, তা কোনো তরবারির শক্তি বা গায়ের জোরে হয়নি; বরং তা হয়েছিল ইসলামের ইনসাফভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং নিম্নবর্ণের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার এক চমৎকার মেলবন্ধনের ফলে। সেন রাজাদের কৌলিন্য প্রথার অত্যাচারে বাংলার আদি ভূমিপুত্ররা যখন সমাজে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ও অস্পৃশ্য জীবনযাপন করছিলেন, তখন ইসলামের বর্ণভেদহীন ও জাত-পাতহীন ভ্রাতৃত্বের বাণী তাদের সামনে এক নতুন আশার আলো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মুসলিম শাসকেরা এ দেশে জোরপূর্বক কোনো ধর্ম চাপিয়ে দেননি, বরং তারা প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম ও লোকবিশ্বাস চর্চার পূর্ণ স্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন।
এই ধর্মীয় স্বাধীনতার উদার পরিবেশের কারণেই বাংলার অস্পৃশ্য ও নির্যাতিত ভূমিপুত্ররা ইসলামের প্রতি এক গভীর ও স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ অনুভব করেন। প্রখ্যাত মার্কিন ঐতিহাসিক ড. রিচার্ড তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বাংলায় ইসলামের প্রসার কোনো বিদেশী বিজয়ের জোয়ারে ভেসে আসেনি; বরং তা ছিল এই মাটির শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব সামাজিক মুক্তির এক ঐতিহাসিক অধিকার অন্বেষণ (Eaton, Richard M. The Rise of Islam and the Bengal Frontier, University of California Press, পৃষ্ঠা ১২৫)।
বাংলার গ্রামীণ জনপদগুলোতে যখন সূফী-সাধক ও দরবেশরা এসে কোনো জাত-পাত ছাড়া সাধারণ মানুষের সাথে একই দস্তরখানে বসে খাবার খেতেন, তাদের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন, তখন সাধারণ মানুষেরা এই সূফীদের মাঝে নিজেদের প্রকৃত অভিভাবক খুঁজে পেতেন। এই স্বতঃস্ফূর্ত আত্মিক পরিবর্তনের ফলেই বাংলার পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের বিশাল আমজনতা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এই ভূখণ্ডের বৃহত্তম এবং মূল জনসমষ্টিতে পরিণত হন। এটি ছিল মূলত আর্যদের চাপিয়ে দেওয়া বর্ণবাদী সামাজিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে বাংলার আদি ভূমিপুত্রদের এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় মহাবিপ্লব, যা এই অঞ্চলের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: লৌকিক বিশ্বাসের ইসলামিক রূপান্তর
মুসলিম শাসনের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় বাংলার প্রাক-আর্য লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতির সাথে ইসলামের এক চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ মিথস্ক্রিয়া ঘটেছিল, যার ওপর গভীর আলোকপাত করেছেন বহুভাষাবিদ ও পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বাংলার সাধারণ মানুষ যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তখন তারা তাদের হাজার বছরের লোকজ অভ্যাস বা গ্রামীণ জীবনধারাকে একবারে ফেলে দেননি; বরং ইসলামের উদার চেতনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের সেই লৌকিক বিশ্বাসগুলোর এক চমৎকার ‘ইসলামিক রূপান্তর’ ঘটিয়েছিলেন (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, মাওলা ব্রাদার্স, পরিচ্ছেদ: ‘ভাষা ও সমাজ’, পৃষ্ঠা ৩৯)।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র শব্দতাত্ত্বিক ও লোকতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই যুগের মুসলিম কবিরা সাধারণ মানুষের ঘরের চেনা উপমা, গ্রামীণ ছড়া এবং লোকগাথাগুলোকে ইসলামের আধ্যাত্মিক ভাবধারার সাথে মিলিয়ে ‘নবী বংশ’ বা ‘রসুল বিজয়’-এর মতো সম্পূর্ণ নতুন ঘরানার লোকসাহিত্য তৈরি করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মুসলিম রাজাদের এই অকৃপণ পৃষ্ঠপোষকতা ও উদারতার কারণেই বাংলার নিম্নবর্ণের মানুষেরা তাদের নিজস্ব লোকসংস্কৃতিকে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, যা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আমলে ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও কল্পনাতীত (আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলা সাহিত্যের কথা (২য় খণ্ড: মুসলিম যুগ), রেনেসাঁস প্রিন্টার্স, পৃষ্ঠা ৩৫)। এই ঐতিহাসিক রূপান্তরই এ কথাকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগের মুসলিম শাসনামল বাংলায় কোনো সাংস্কৃতিক নিধনযজ্ঞ চালায়নি; বরং তা ছিল এই মাটির আদি লোকসংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের নিজস্ব জীবনবোধকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে বসানোর এক সোনালী ও গৌরবময় অধ্যায়।

Post a Comment