Table of Contents
![]() |
| নিসবত হলো আল্লাহর সঙ্গে হৃদয়ের এমন সম্পর্ক, যা মানুষকে ঈমান, তাকওয়া ও ইস্তিকামাতের দিকে পরিচালিত করে |
Previous Part.......
এই নিসবত (আত্মিক সম্পর্ক)-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর অনুসরণ এবং তাঁর পূর্ণাঙ্গ শরিয়তের আনুগত্যে পরিপূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তর অর্জন করা। তাসাওউফ (আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সাধনা) ও সুলূক (আত্মিক পথপরিক্রমা)-এর পরিভাষায় একে আল-গায়াত (চূড়ান্ত লক্ষ্য) বলা হয়। অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণে পরিপূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হওয়াই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য।
এই নিসবতের প্রথম স্তর অর্জিত হলে, ঈমান ও ইসলামের সত্যতা তার কাছে একাকার হয়ে যায়। তার অন্তরে ঈমানের নূর শক্তিশালী হয়ে সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সঞ্চারিত হয়। ফলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সৎকর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং নেক আমলের প্রতি তার আগ্রহ ও অনুরাগ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
ইবাদতের এমন প্রবল আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয় যে, তার হৃদয়ের গভীরে ঈমানের নূর এবং সৎকর্মের নূর মিলিত হয়ে একাকার হয়ে যায়। তখন তার ভেতরে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয়, যেখানে ঈমান যেন সৎকর্মেরই রূপ ধারণ করে। এ অবস্থায় তার নিকট لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ-এর অর্থ ও তাৎপর্য আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। কারণ, হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর পূর্ণাঙ্গ শরিয়তের প্রতি তার অনুরাগ ও সম্পর্ক তখন কেবল আকীদা-বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ইবাদত-বন্দেগি, আখলাক-চরিত্র, লেনদেন ও সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক জীবনের সংস্কার, ব্যক্তি ও সমাজ-সংস্কারের সঙ্গে এবং সামগ্রিক মানবজীবনের সংশোধন ও কল্যাণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে যায়। এভাবে لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ-এর পূর্ণ তাৎপর্য তার জীবনে প্রতিফলিত হতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ
“আল্লাহ একটি পবিত্র বাণীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, যা একটি উত্তম বৃক্ষের মতো; তার মূল সুদৃঢ় এবং তার শাখা-প্রশাখা আকাশমুখী।”
— সূরা ইবরাহীম, ১৪:২৪
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لِلْإِيمَانِ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً، أَعْلَاهَا كَلِمَةُ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ
“ঈমানের সত্তরের কম কয়েকটি শাখা রয়েছে। তার সর্বোচ্চ শাখা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বনিম্ন শাখা পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।”
— সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং ৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৫
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন—
مَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هٰذَا الْجِدَارِ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ
“এই দেয়ালের ওপারে যার সঙ্গেই তোমার সাক্ষাৎ হবে, যদি সে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসসহ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাক্ষ্য দেয়, তবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩১
এসব আয়াত, কুরআন ও নবীজির ﷺ হাদীসসমূহ থেকে এ নিসবতের প্রকৃত তাৎপর্য হৃদয়ের ওপর উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। শরিয়তের পরিভাষায় একে শারহে সদর (বক্ষ উন্মুক্ততা), নূরে রব্বানী (প্রভুপ্রদত্ত আলোক), সাকীনা (প্রশান্তি ও স্থিরতা) এবং রাবিতাতুল-ক্বলব বিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ) ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে প্রকৃত ঈমান, পরিপূর্ণ তাকওয়া এবং বিশেষ আকর্ষণ ও আল্লাহমুখিতা জন্ম নেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَىٰ نُورٍ مِنْ رَبِّهِ
“যার বক্ষ আল্লাহ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, ফলে সে তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত আলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত— (সে কি অন্যদের সমান হতে পারে?)”
— সূরা আয-যুমার, ৩৯:২২
আরও বলেন—
هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَعَ إِيمَانِهِمْ
“তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়।”
— সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:৪
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ فِيمَا بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ
“কোনো সম্প্রদায় যখন আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো এক ঘরে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পর তা অধ্যয়ন করে, তখন তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল হয়, রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে এবং ফেরেশতারা তাদের পরিবেষ্টন করে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى وَرَبَطْنَا عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ
“তারা ছিল কতিপয় যুবক, যারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল। আর আমি তাদের হিদায়াত আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম এবং তাদের হৃদয়কে সুদৃঢ় করে দিয়েছিলাম।”
— সূরা আল-কাহফ, ১৮:১৩–১৪
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
“জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। তারা হলো সেইসব লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।”
— সূরা ইউনুস, ১০:৬২–৬৩
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمٰنُ وُدًّا
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, পরম করুণাময় তাদের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন।”
— সূরা মারইয়াম, ১৯:৯৬।
নিসবতের হাকীকত ও সুলূকের সূচনা
হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহ. বলেন, মাশায়িখদের সমস্ত তরিকার পরিণতি ও চূড়ান্ত ফল এই যে, এর মাধ্যমে এমন এক নিসবত (আত্মিক সম্পর্ক) অর্জিত হয়, যা এক বিশেষ নফসানী কাইফিয়্যাত (অন্তর্গত আত্মিক অবস্থা)-এর নাম।
যাদুত তাক্বওয়া-এ এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, আল্লাহ—যিনি একমাত্র সত্য উপাস্য—তাঁর পবিত্র সত্তার পরিচয় ও নির্দেশনার জন্য এই বরকতময় “আল্লাহ” নামটি নির্ধারিত। সুতরাং এ নামের অর্থ ও তাৎপর্য সেই পবিত্র সত্তাই, যিনি সর্বপ্রকার অংশ, সীমাবদ্ধতা, পরিবেষ্টন ও সাদৃশ্য থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র এবং অতুলনীয়।
অতঃপর যখন সেই পবিত্র সত্তার দিকে সর্বদা মনোনিবেশ করে থাকার যোগ্যতা নফসে নাতিকাহ (বিবেকসম্পন্ন আত্মা) অর্থাৎ ক্বলব (হৃদয়) অর্জন করে এবং আল্লাহ عزوجل-এর সঙ্গে এক বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, আর এ সম্পর্ক হৃদয়ের একটি স্থায়ী গুণে পরিণত হয়, এমনকি তা হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া আর সম্ভব হয় না, তখন সেই সুপ্রতিষ্ঠিত অবস্থাকেই নিসবত বলা হয়।
এই গুণ হৃদয়ের মধ্যে অর্জিত হয় এবং সেখানে এমনভাবে স্থায়ী হয়ে যায়, যেমন দেখা, শোনা এবং এ ধরনের অন্যান্য গুণাবলি মানুষের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত থাকে।
তিনি অন্য এক স্থানে লিখেছেন, আল্লাহ عزوجل-এর পবিত্র সত্তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি তাঁর স্মরণকারীর প্রতি নুযূল (বিশেষ অনুগ্রহের অবতরণ) করেন, দুনূ (বিশেষ নৈকট্য দান) করেন এবং তাদাল্লী (বিশেষ সান্নিধ্য প্রদান) করেন। অর্থাৎ তিনি তার প্রতি অত্যন্ত নিকটবর্তী হন এবং তার হৃদয়কে এমনভাবে পূর্ণ করে দেন যে, সেখানে অন্য কিছুর জন্য আর কোনো স্থান অবশিষ্ট থাকে না। অর্থাৎ তার অন্তর্জগতে আল্লাহর নূর এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তার দৃষ্টিতে সর্বত্র আল্লাহরই স্মরণ জাগ্রত থাকে এবং তার চোখে আল্লাহই আল্লাহ প্রতিভাত হতে থাকে।
এই তাদাল্লী (বিশেষ সান্নিধ্য প্রদান)-এর কারণেই আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মার ওপর এমন প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, যেন তিনি তার আত্মারও আত্মা হয়ে ওঠেন।
আরেক স্থানে তিনি লিখেছেন, মুশাহাদা (দর্শন-উপলব্ধি) হলো সুলূক (আত্মিক পথপরিক্রমা)-এর প্রথম লক্ষ্য; অর্থাৎ সাইর ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে যাত্রা)-এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য। আর এখান থেকেই সাইর ফিল্লাহ (আল্লাহমুখী আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা) শুরু হয়, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ অর্জন করা।
সতর্কীকরণ
নুযূল, দুনূ এবং তাদাল্লী বলতে আমাদের নেমে আসা, নিকটবর্তী হওয়া বা অগ্রসর হওয়ার মতো কোনো বিষয় বোঝানো হয়নি। বরং এগুলো আল্লাহ তাআলার শানের উপযোগী অর্থেই গ্রহণ করতে হবে।
آمَنْتُ بِاللّٰهِ كَمَا هُوَ بِأَسْمَائِهِ وَصِفَاتِهِ
“আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি, যেমন তিনি তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলিসহ আছেন।”
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই; আর তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
— সূরা আশ-শূরা, ৪২:১১।
অনুষঙ্গসমূহের আলোচনা
একজন তালিবে সাদিক (সত্যসন্ধানী সাধক)-এর উচিত সুলুক (আত্মিক পথচলা), মারিফত (আল্লাহ-পরিচয়) এবং তরিকত (আধ্যাত্মিক সাধনার পথ)-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ভালোভাবে বুঝে নেওয়া, যাতে সে লক্ষ্য ও অলক্ষ্যের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করতে পারে এবং কখনো অলক্ষ্য কোনো বিষয়কে লক্ষ্য মনে করে তার প্রতি মনোযোগ না দেয়। কেননা এটি জাহলে মুরাক্কাব (আত্মপ্রবঞ্চনামূলক অজ্ঞতা); আর এটাই বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের অন্যতম বড় কারণ।
প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে ইতোমধ্যে বিস্তারিত আলোচনা অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন সংক্ষেপে এটুকু জেনে রাখা প্রয়োজন যে, পূর্বে উল্লিখিত সেই লক্ষ্য ব্যতীত সাধকের ওপর যে অবস্থাই আপতিত হোক না কেন, তা লক্ষ্য নয় এবং মনোযোগেরও যোগ্য নয়।
হ্যাঁ, যদি সেসব বিষয়ের মাধ্যমে প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য ও শক্তি সঞ্চারিত হয়, তবে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করবে। কিন্তু লক্ষ্যকে ছেড়ে সেদিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করবে না। কারণ এমনটি করা পথভ্রষ্টতা এবং অভীষ্ট গন্তব্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ।
উদাহরণস্বরূপ— চমৎকার ও বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখা, তাকউইনী উমূর (সৃষ্টিজগতের গুপ্ত বিষয়াবলি) সম্পর্কে উন্মোচন লাভ করা, ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য ঘটনার সংবাদ জানা, ফেরেশতাদের দর্শন লাভ করা, কবরের অবস্থা উন্মোচিত হওয়া, দোয়া কবুল হয়ে যাওয়া, কিংবা কারামাত (অলৌকিক অনুগ্রহ) প্রকাশ পাওয়া ইত্যাদি।
কারণ, এসবের কোনো কিছুই প্রকৃত লক্ষ্য নয়; যদিও সামগ্রিকভাবে এগুলো আল্লাহ তাআলার বিরাট নিয়ামত। অতএব এগুলো অর্জিত হলে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করবে, কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। নিজের মনোযোগ কখনোই, কখনোই সেদিকে নিবদ্ধ করবে না।
একজন তালিবে সাদিক (সত্যসন্ধানী সাধক) যদি এসব অর্জন করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে, অথবা এগুলো অর্জিত না হওয়ায় বিরক্ত ও অস্থির হয়ে ওঠে, তাহলে নিশ্চিতভাবে সে তার প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বহু দূরে সরে যাবে।
বরং তার এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকা উচিত যে, যদি আমার মধ্যে পূর্বোল্লিখিত নিসবত (আল্লাহমুখী হৃদ্যতা) অর্জিত হয়ে যায়— যাকে কোনো কোনো সুফি ইয়াদ-দাশ্ত (নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ) নামে অভিহিত করেছেন— এবং এর ফলস্বরূপ ঈমানে তাহকীকি (উপলব্ধিনির্ভর ঈমান), মাকামে তাওবা (তাওবার পরিপক্ব স্তর), তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা), ইখলাস (নিষ্কলুষ আন্তরিকতা), রিদা (আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি), তাওহিদ (একত্ববোধ), উনস (অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য), মাহাব্বাত (ঐশী প্রেম) এবং উবুদিয়্যাত (পরিপূর্ণ বান্দাত্ব)-এ আমি পূর্ণতা লাভ করি, আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন ﷺ-এর অনুসরণ ও আনুগত্যে পরিপূর্ণতার স্তরে উপনীত হই, তবে এটাই আমার জন্য আল্লাহ তাআলার সর্ববৃহৎ নিয়ামত, সর্বোচ্চ অনুগ্রহ এবং শ্রেষ্ঠ সম্মান।
হাফিজ ইবনু তাইমিয়্যা রহ. এবং অন্যান্য আকাবিরে উম্মত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, একজন তালিবে সাদিক (সত্যসন্ধানী সাধক)-এর জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত এবং সবচেয়ে বড় কারামাত (অলৌকিক অনুগ্রহ) হলো ইস্তিকামাত (অবিচল নিষ্ঠা)।
অতএব যদি এই ইস্তিকামাত (অবিচল নিষ্ঠা) অর্জিত হয়ে যায়, অথচ সে সকল প্রকার কারামাত থেকে বঞ্চিত থাকে, তবুও তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে।
আর যদি এই ইস্তিকামাত (অবিচল নিষ্ঠা) অর্জিত না হয়, অথচ সকল প্রকার কারামাত তার হাতে প্রকাশ পায়, তবে সে ব্যর্থ হয়েছে এবং তার প্রকৃত লক্ষ্য থেকেও বঞ্চিত রয়ে গেছে।
আল-ইতহাফ, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৩-এ বলা হয়েছে—
والمراد بالاستقامة عندهم الوفاء بالعهود ولزوم الصراط المستقيم برعاية خط الاستواء في كل أمر ديني ودنيوي
“তাঁদের নিকট ইস্তিকামাত বলতে বোঝায়— অঙ্গীকারসমূহ যথাযথভাবে পালন করা, সরল-সঠিক পথকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং দ্বীনি ও দুনিয়াবি প্রতিটি বিষয়ে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা রক্ষা করা।”

Post a Comment