Loading...

জ্ঞান বনাম ধর্ম—সংঘাত নাকি সহাবস্থান?

জ্ঞান বনাম ধর্ম—সংঘাত নাকি সহাবস্থান?
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান, যুক্তি, ওহী ও ধর্মের সম্পর্ককে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা একটি চিত্র

    ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান ও ধর্মকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শৃঙ্খলিত সংলাপ ও সহাবস্থানের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে

    Previous Part.......

    “জ্ঞান বনাম ধর্ম” কথাটার ভেতরেই একটি বিপদ লুকিয়ে আছে। কথাটি শুনলেই অনেকে ধরে নেয়, ধর্ম এক পাশে, জ্ঞান আরেক পাশে। একদিকে ওহী, অন্যদিকে আকল। একদিকে বিশ্বাস, অন্যদিকে যুক্তি। যেন মানুষকে প্রথমেই দল বেছে নিতে হবে। ধর্মে থাকলে প্রশ্ন করা যাবে না। প্রশ্ন করলে ধর্মের বাইরে যেতে হবে। ইসলামী ইতিহাসকে এভাবে পড়া যায় না। এভাবে পড়লে শুরুতেই ভুল দরজায় ঢোকা হয়।

    ইউরোপের চার্চ, গ্যালিলিও, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, Enlightenment (জ্ঞানদীপ্তি), শিল্পবিপ্লব—এই দীর্ঘ ইতিহাসের ভেতর “religion versus science” (ধর্ম বনাম বিজ্ঞান)-এর একটি বাস্তব পটভূমি আছে। কিন্তু ইউরোপের ক্ষতকে ইসলামের গায়ে বসিয়ে দিলে ইতিহাস বোঝা যায় না। ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানচর্চা ইউরোপীয় চার্চের অনুবাদ নয়। এখানে ওহী আছে। আকল আছে। কালাম আছে। ফালসাফা আছে। ফিকহ আছে। মুনাজারা আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান আছে। চিকিৎসা আছে। গণিত আছে। অনুবাদ আছে। মতভেদ আছে। সংঘাতও আছে। কিন্তু ছবিটা সোজা যুদ্ধের নয়। ছবিটা অনেক বেশি কঠিন এবং পরিণত।

    ইসলামী সভ্যতায় জ্ঞান ও ধর্ম মূলত শত্রু হয়ে দাঁড়ায়নি। আবার সহাবস্থান মানে সীমাহীন স্বাধীনতাও ছিল না। কালাম, দর্শন, যুক্তি, বিতর্ক—এসব চলেছে ওহীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে। কোথাও গ্রহণ হয়েছে। কোথাও সংশোধন হয়েছে। কোথাও প্রত্যাখ্যান হয়েছে। কোথাও রাষ্ট্রীয় জবরদস্তি এসে জ্ঞানচর্চাকে আহত করেছে। কোথাও দার্শনিক অহংকারকে ধর্মতত্ত্ব থামিয়েছে। কোথাও ধর্মীয় ভীরুতা জিজ্ঞাসাকে সন্দেহ করেছে। সোনালি যুগের শক্তি ছিল এই বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা। না অন্ধ যুক্তিবাদ। না অন্ধ অনুকরণ।

    চিন্তার দরজা বন্ধ ছিল না

    ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগকে বুঝতে হলে প্রথমেই একটি কথা পরিষ্কার করতে হবে। চিন্তার স্বাধীনতা বলতে আধুনিক liberal freedom (উদার স্বাধীনতা)-এর নকল বোঝানো হচ্ছে না। আবার চিন্তার ওপর তালা ঝুলিয়ে রাখা ইসলামী ঐতিহ্যের মূল চরিত্র—এ কথাও মিথ্যা।

    চিন্তার স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু তা শিকড়হীন ছিল না। প্রশ্ন ছিল। কিন্তু প্রশ্নকে ঈমানের ওপরে বসানো হয়নি। মুনাজারা ছিল। কিন্তু মুনাজারা সবসময় ফেসবুকের ঝগড়ার মতো ছিল না। মতভেদ ছিল। কিন্তু মতভেদকে সত্যের বদলে পরিচয়ের বাজার বানানো হয়নি।

    মুসা আল হাফিজ কালামদর্শন-এর শুরুতে মুসলিম বিশ্বে আত্মপরিচয়, বৌদ্ধিক সংকট ও কালামচর্চার প্রয়োজন নিয়ে যে কথা বলেছেন, সেখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসলিম মানসিকতা যখন আত্মরক্ষামূলক হয়ে পড়ে, তখন সে প্রশ্নকেও ভয় পায়। আবার যখন বাইরের জ্ঞানকে অন্ধভাবে গ্রহণ করে, তখন নিজের ভিত হারায়। এই দুইয়ের মাঝখানে কালাম ও যুক্তিচর্চার প্রয়োজন দাঁড়ায়। (মুসা আল হাফিজ, কালামদর্শন, পৃ. ১৩–২০)।

    এই জায়গাটি জাস্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়— অনিবার্য। কারণ ধর্মীয় সমাজে প্রশ্ন সবসময় বাইরে থেকে আসে না। ভেতর থেকেও আসে। মানুষ আল্লাহর সিফাত নিয়ে প্রশ্ন করে। তাকদির নিয়ে ভাবে। অন্যায় ও ন্যায়ের সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করে। নবুওয়াত কেন দরকার, সে প্রশ্নও ওঠে। কুরআনের কালাম কীভাবে বুঝতে হবে, সেটাও আলোচনার বিষয় হয়। বড়দের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তীদের প্রশ্নের উদ্রেক হয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, প্রচলিত তাবৎ নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে সময়ের সন্তানেরা। জ্ঞানীয় প্রশ্ন ধারালো ফলার মতো মনের গহীন থেকে উঠে আসে। ইবনুল আইয়্যামদের স্বভাব এটা। নতুবা পৃথিবী পতিত ভাগাড় হয়ে যেতো। প্রাচীন পৃথিবীতে যেভাবে তা ছিলো, বর্তমানে আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। বালির ঢিবিতে মুখ ডুবিয়ে যতই বৃষ্টি হচ্ছে না বলা হোক, তাতে কিছুই হবে না। বৃষ্টি হয়ে, ঝড়-তুফান ঠিকই বয়ে যাবে। প্রশ্নের ভিতর দিয়েই পূর্ববর্তীদের কাজ মূল্যায়িত হয়। এগুলোকে শুধু “ফিতনা” বলে ঠেলে দিলে প্রশ্ন মরে না। প্রশ্ন তখন অজ্ঞ মানুষের হাতে পড়ে। ফলে ফিতনা চারা থেকে মহীরুহ হয়।

    ইসলামী সভ্যতার বড়ত্ব ছিল এখানেই। সে প্রশ্নকে একেবারে নিষিদ্ধ করেনি। আবার প্রশ্নকে সিংহাসনেও বসায়নি। সে প্রশ্নকে শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে এনেছে। ভাষা দিয়েছে। তর্ক দিয়েছে। প্রমাণ দিয়েছে। ওহীর স্ফটিকস্বচ্ছ আলোর উদ্ভাসে সীমা দিয়েছে।

    ইলমের সভ্যতা

    ইসলামে জ্ঞান কোনো বিদেশি অতিথি নয়। ʿIlm (ইলম/জ্ঞান) ইসলামের নিজের শব্দ। কুরআন মানুষকে শুধু মানতে বলেনি। দেখতেও বলেছে। ভাবতেও বলেছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতেও বলেছে। আকাশ-জমিনের আয়াতও পড়তে বলেছে। যারা জানে আর যারা জানে না—তাদের সমান বলা যায় কি না, সে প্রশ্নও তুলেছে। এ ধর্মের ভিতরেই জ্ঞান মর্যাদা পেয়েছে।

    Franz Rosenthal, Knowledge Triumphant-এ দেখিয়েছেন, ʿilm (ইলম/জ্ঞান) ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রে থাকা এক বিশাল ধারণা। এটি শুধু শিক্ষিত মানুষের ব্যক্তিগত গুণ নয়। ধর্মীয় মর্যাদা, সামাজিক সম্মান, আদব, শিক্ষাব্যবস্থা, চিন্তার কাঠামো—সবকিছুর ভেতরে ইলম কাজ করেছে। Rosenthal, Knowledge Triumphant, pp. 1–4, 19–22.

    এ কথা বুঝলে অনুবাদ আন্দোলনও পরিষ্কার হয়। মুসলিমরা গ্রিক, সিরিয়াক, ফারসি, ভারতীয় জ্ঞান অনুবাদ করেছে বলে হঠাৎ জ্ঞানী হয়ে ওঠেনি। তারা এমন এক ধর্মীয় ভাষা নিয়ে ইতিহাসে প্রবেশ করেছিল, যেখানে জ্ঞান আগেই সম্মানের শব্দ। বাইরের জ্ঞানও এসে সেই ভিতের ওপর বসেছে। তাই Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ) ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো গোপন বিদ্রোহ ছিল না। এটি ছিল একটি ধর্মীয় সভ্যতার জ্ঞানকে নিজের ভাষায় আনার চেষ্টা।

    কিন্তু এটাও ঠিক, সব জ্ঞান একই রকম নয়। চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, metaphysics (অধিবিদ্যা), ধর্মতত্ত্ব—সবকিছুর প্রশ্ন এক নয়। ইউক্লিডের জ্যামিতি গ্রহণ করা আর জগত অনাদি—এই অধিবিদ্যাগত দাবি গ্রহণ করা একই ঘটনা নয়। Galen (জালিনুস)-এর চিকিৎসা অনুবাদ করা আর আল্লাহর জ্ঞান নিয়ে দার্শনিক অনুমান মেনে নেওয়া এক জিনিস নয়। ইসলামী সভ্যতার পরিণত বোধ ছিল এখানেই। সে আলাদা আলাদা দাবিকে আলাদা আলাদা  ওজনে মেপেছে।

    কালাম জন্ম নেয় প্রশ্নের আগুন থেকে

    কালামকে অনেকে অপছন্দ করেন। কেউ বলেন, কালাম বিভ্রান্তির দরজা। কেউ বলেন, কালাম ছাড়া আকিদা বোঝাই যায় না। দুই কথার ভেতরই অতিরঞ্জন আছে।

    Kalam (কালাম) জন্ম নিয়েছে প্রশ্নের আগুন থেকে। মুসলিম সমাজ দ্রুত বড় হয়েছে। নতুন জাতি, নতুন ভাষা, নতুন ধর্মীয় বিতর্ক, খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব, মাজুসি দ্বৈতবাদ, দার্শনিক প্রশ্ন, রাজনৈতিক সংঘাত—সব একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে। কেবল মুখস্থ ভাষায় সব প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্ভব ছিল না। Qadar (তাকদির), free will (ইচ্ছাস্বাধীনতা), divine attributes (ঐশী গুণাবলি), created Quran (কুরআন মাখলুক কিনা), justice (ন্যায়), evil (অমঙ্গল)—এসব প্রশ্ন জোর করে উঠে এসেছে।

    মুসা আল হাফিজ কালামদর্শন-এ কালামশাস্ত্রের পরিচয়, প্রয়োজন, প্রাথমিক বিতর্ক ও সমালোচনার যে ধারাগুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলো এই ইতিহাসের একটি সমকালীন বাংলা পাঠ দেয়। বিশেষ করে “ইলমে কালাম কী”, “কেন এই শাস্ত্র”, “বিতর্কের ইতিহাস”, “ইলমে কালামের সমালোচনা”—এই অংশগুলো দেখায়, কালাম কেবল দার্শনিক বিলাসিতা ছিল না। মুসলিম সমাজের ভেতরে ও বাইরে ওঠা প্রশ্নের চাপ তাকে তৈরি করেছে। (মুসা আল হাফিজ, কালামদর্শন, পৃ. ২৪–৩৯, ৪২–৬০)।

    Harry Wolfson, The Philosophy of the Kalam-এ কালামকে ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি ও দার্শনিক প্রমাণের এক শাস্ত্রীয় পরিসর হিসেবে পড়েছেন। তাঁর আলোচনায় কালাম কোনো সরল “ধর্ম বনাম যুক্তি” যুদ্ধ নয়। বরং ধর্মীয় দাবিকে যুক্তির ভাষায় দাঁড় করানোর চেষ্টা। Wolfson, The Philosophy of the Kalam, pp. 1–59.

    এখানে একটি কথা ঠান্ডা মাথায় বলতে হয়। কালাম সবসময় নিরাপদ ছিল না। শব্দের খেলা কখনো সত্যের ওপর চড়ে বসেছে। অনেকে যুক্তির নামে অতিরিক্ত দূরে গেছে। আবার কালামকে একেবারে বাতিল করলে মুসলিম চিন্তার একটি বড় আত্মরক্ষামূলক শক্তি হারিয়ে যায়। জবাব দিতে হলে ভাষা লাগে। ভাষা না থাকলে সত্যও অনেক সময় অসহায় দেখায়।

    ধর্মীয় সত্য শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু মানুষের মুখে তা দুর্বলভাবে হাজির হলে দুর্বলই শোনায়। কালাম সেই দুর্বলতা পূরণের চেষ্টা করেছে।

    মুতাজিলা, আশআরি ও মাতুরিদির বিতর্ক

    Mu‘tazila (মুতাজিলা)-কে শুধু “ভ্রষ্ট যুক্তিবাদী” বলে শেষ করলে ইতিহাস বোঝা হয় না। আবার তাদের “মুক্তচিন্তার নায়ক” বানালেও ভুল হয়। তারা আল্লাহর ন্যায়, মানুষের স্বাধীনতা, তাওহিদ, divine attributes (ঐশী গুণাবলি)-এর প্রশ্নে শক্ত যুক্তিবাদী অবস্থান নিয়েছিল। তাদের অনেক প্রশ্ন জোরালো ছিল। কিন্তু যুক্তির ওপর অতিরিক্ত ভরসা তাদের এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে ওহীর ভাষাকে মানুষের নির্মিত মাপকাঠির অধীনে নামিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হয়।

    Ash‘ariyya (আশআরি) ঐতিহ্য সেই অতিরিক্ত যুক্তিবাদের জবাব দেয়, কিন্তু যুক্তি ফেলে দেয় না। আল-আশআরি মুতাজিলা থেকে বেরিয়ে এসে একেবারে অন্ধ বর্ণনাবাদে যাননি। তিনি যুক্তিকে ব্যবহার করেছেন, তবে ওহীর অধীনে। Maturidiyyah (মাতুরিদি) ধারা আরেকভাবে আকল, ঈমান, নৈতিকতা, আল্লাহর জ্ঞান ও মানুষের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছে। এই তিন ধারার তর্ক দেখায়, ইসলামী সভ্যতায় চিন্তার স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু তা ছিল শাস্ত্রীয় দায়বদ্ধতার ভিতরে।

    মুসা আল হাফিজ কালামদর্শন-এর সূচিতে মুতাজিলা, আশআরি ও মাতুরিদি ধারাকে আলাদা আলোচ্য করেছেন। এই বিন্যাস নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। ইসলামী চিন্তার ইতিহাস একরেখা নয়। এটি বহু বিতর্ক, সংশোধন, প্রতিতর্ক ও পুনর্গঠনের ইতিহাস। (মুসা আল হাফিজ, কালামদর্শন, সূচিপত্র, পৃ. ৪–৬)।

    এখানে ধর্মীয় বিতর্ক জ্ঞানচর্চাকে ঠেকায়নি। বরং অনেক সময় জ্ঞানচর্চাকে ধার দিয়েছে। যে সমাজে প্রশ্ন নেই, সেখানে উত্তরও গভীর হয় না। মুতাজিলা প্রশ্নকে ধারালো করেছে। আশআরি সীমা দেখিয়েছে। মাতুরিদি আকল ও ওহীর সম্পর্ককে আরেক ভারসাম্যে ধরেছে। এই তর্কগুলো ছাড়া মুসলিম ধর্মতত্ত্বের পরিণত রূপ কল্পনা করা কঠিন।

    দর্শন এলো, দরজা খোলা হলো, ঘর বিক্রি হলো না

    গ্রিক দর্শন আরবি ভাষায় এলে মুসলিম সমাজের সামনে নতুন পরীক্ষা দাঁড়াল। Aristotle (এরিস্টটল), Plato (প্লেটো), Plotinus (প্লোটিনাস), Galen (জালিনুস), Ptolemy (টলেমি), Euclid (ইউক্লিড)—এই জগত শুধু বই নিয়ে আসেনি। নিয়ে এসেছে পদ্ধতি, যুক্তি, অধিবিদ্যা, প্রকৃতিচিন্তা, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যামিতি।

    মুসলিমরা এই জ্ঞান দেখে পালায়নি। আবার দরজা খুলে ঘরের মালিকানাও ছেড়ে দেয়নি।

    Dimitri Gutas দেখিয়েছেন, আব্বাসীয় অনুবাদ আন্দোলন সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক চাহিদার সঙ্গে যুক্ত ছিল। দরবারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক প্রয়োজন, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্ঞানীসমাজের প্রতিযোগিতা—এসব মিলেই Greek thought (গ্রিক চিন্তা) Arabic culture (আরবি সংস্কৃতি)-এর ভেতরে প্রবেশ করে। Gutas, Greek Thought, Arabic Culture, pp. 121–141, 153–157.

    এখানে ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো গোপন ষড়যন্ত্র নেই। মুসলিম শাসক, মুসলিম সমাজ, খ্রিস্টান অনুবাদক, সাবিয়ান পণ্ডিত, মুসলিম দার্শনিক—সবাই এক জ্ঞানপরিসরে কাজ করছে। জ্ঞানকে ব্যবহার করতে হচ্ছে। চিকিৎসায়, সারণিতে, ক্যালেন্ডারে, বিতর্কে, যুক্তিতে, ভাষায়।

    Al-Kindi (আল-কিন্দি) এই দরজার প্রথম বড় মুসলিম দার্শনিক কণ্ঠ। তিনি গ্রিক দর্শন কপি করেননি। তিনি তাকে আরবি-ইসলামী চিন্তার ভাষায় নতুনভাবে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর কাছে philosophy (দর্শন) truth-seeking discipline (সত্য-অন্বেষী শাস্ত্র), কিন্তু নবুওয়াতের জ্ঞান তার চেয়ে উচ্চতর। দার্শনিক চিন্তা করে, শেখে, প্রমাণ খোঁজে। নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য লাভ করেন। Peter Adamson, “Al-Kindī and the Reception of Greek Philosophy,” in The Cambridge Companion to Arabic Philosophy, pp. 32–34, 46–47.

    এই জায়গায় ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রটি পরিষ্কার। বাইরের জ্ঞানকে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু নিজের সত্যকেন্দ্র ছেড়ে নয়। দার্শনিক ভাষা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাওহিদকে বন্ধক রেখে নয়।

    আকল দরকার, কিন্তু আকলই প্রভু নয়

    আকল ছাড়া ধর্ম অন্ধ অনুকরণে শুকিয়ে যায়। আকলকে প্রভু বানালে ধর্ম মানুষের সীমিত বুদ্ধির বন্দি হয়ে যায়। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব এই দুই বিপদের মাঝখানে দাঁড়ায়।

    Ibn Abi al-Dunya al-ʿAql wa-Faḍluh-এ আকলকে শুধু abstract reason (বিমূর্ত যুক্তি) হিসেবে নেননি। আকল মানুষের আদব, ভাষা, আত্মহিসাব, জিহ্বার সংযম, ধৈর্য, অভিজ্ঞতা, সঙ্গ, সামাজিক আচরণ ও চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত। আকল মানে শুধু তর্কে জেতা নয়। কখন থামতে হয়, সেটাও জানা। Ibn Abī al-Dunyā, al-ʿAql wa-Faḍluh, pp. 15–20.

    Rosenthal আকল ও ইলমের সম্পর্কে একটি তীক্ষ্ণ সতর্কতা তুলে ধরেছেন। মানুষের জ্ঞান যদি তার আকলের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, সেই জ্ঞান তার ক্ষতির কারণ হতে পারে। Rosenthal, Knowledge Triumphant, p. 276.

    কথাটা আজ আরও সত্য। তথ্যের যুগে মানুষ অনেক জানে, কিন্তু বোঝে কম। উদ্ধৃতি মুখস্থ করে, কিন্তু বিচার করে না। ফতোয়া শোনে, কিন্তু প্রেক্ষিত বোঝে না। বিজ্ঞানের নাম নেয়, কিন্তু বিজ্ঞানদর্শন বোঝে না। ধর্মের নামে কথা বলে, কিন্তু আদব নেই। এটাই আকলহীন জ্ঞানের বিপদ।

    ইসলামী সভ্যতায় আকলকে দরকারি বলা হয়েছে, কারণ মানুষকে বুঝতে হবে। ওহীকে দরকারি বলা হয়েছে, কারণ মানুষ নিজেই চূড়ান্ত সত্যের উৎস নয়। এই ভারসাম্য হারালে দুই বিপদ। একদিকে প্রশ্নহীন ধর্মীয় জড়তা। অন্যদিকে ওহীহীন যুক্তির অহংকার।

    ধর্মীয় বিতর্ক জ্ঞানচর্চার শত্রু ছিল না

    ধর্মীয় বিতর্ককে অনেকে কেবল বিভাজন মনে করে। কিন্তু সব বিতর্ক বিভাজন নয়। কিছু বিতর্ক জ্ঞানকে ধার দেয়। প্রশ্নকে পরিষ্কার করে। শব্দের অর্থ নির্ধারণ করে। দাবি পরীক্ষা করে। ভুল পথ বন্ধ করে।

    ইসলামী ইতিহাসে ধর্মীয় বিতর্ক শুধু মসজিদের ঝগড়া ছিল না। তা গ্রন্থে ঢুকেছে, দরসে ঢুকেছে, মুনাজরায় ঢুকেছে, বিচারতত্ত্বে ঢুকেছে, ফিকহে ঢুকেছে, ভাষাতত্ত্বে ঢুকেছে। Divine attributes (ঐশী গুণাবলি)-এর বিতর্ক ভাষাকে শাণিত করেছে। Qadar (তাকদির)-এর বিতর্ক মানবকর্মের প্রশ্নকে গভীর করেছে। Created Quran (কুরআন মাখলুক কিনা)-এর বিতর্ক কালাম, রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্ক খুলে দিয়েছে।

    Wolfson খালকে কুরআন ও ঐশী গুণাবলির তর্ককে কেবল আকিদার লড়াই হিসেবে পড়েন না। সেখানে ভাষা, যুক্তি, metaphysics (অধিবিদ্যা), ধর্মীয় কর্তৃত্ব—সব একসঙ্গে কাজ করছে। Wolfson, The Philosophy of the Kalam, pp. 244–265.

    তবে সব বিতর্ক সুস্থ ছিল না। Mihna (মিহনা) দেখিয়েছে, রাষ্ট্র যখন একটি ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থানকে জবরদস্তি চাপায়, তখন জ্ঞানচর্চা আহত হয়। যুক্তি তখন প্রমাণ থাকে না, প্রশাসনিক লাঠি হয়ে যায়। মুতাজিলা যুক্তির কথা বলেছিল, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে যুক্তি বসলে যুক্তিও অত্যাচারী হতে পারে। এখানেই ইতিহাসের শিক্ষা।

    ধর্মীয় বিতর্ক জ্ঞানচর্চার শত্রু নয়। কিন্তু ক্ষমতালিপ্সু বিতর্ক জ্ঞানচর্চার শত্রু। অযোগ্য মানুষের হাতে সূক্ষ্ম তর্কও অস্ত্র হয়ে যায়।

    গাজালি বিজ্ঞানবিরোধী ছিলেন না

    Al-Ghazali (আল-গাজালি)-কে নিয়ে আধুনিক গল্পগুলো প্রায়ই অলস। কেউ তাঁকে মুসলিম বিজ্ঞানধ্বংসের নায়ক বানায়। কেউ তাঁকে সব দর্শনের বন্ধু বানায়। দুটোই কাঁচা কথা। ইতিহাসকে এত সস্তা করলে গাজালিও বোঝা যায় না, মুসলিম জ্ঞানচর্চাও বোঝা যায় না।

    গাজালি দর্শনের গলায় ছুরি চালাননি। তিনি দর্শনের অহংকারে ছুরি চালিয়েছেন। তিনি গণিতের বিরুদ্ধে ছিলেন না। চিকিৎসার বিরুদ্ধে ছিলেন না। যুক্তির প্রয়োজন অস্বীকার করেননি। তাঁর আপত্তি ছিল সেই metaphysics (অধিবিদ্যা)-এর বিরুদ্ধে, যা প্রমাণের সীমা ছেড়ে ঈমানের কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছিল।

    Tahāfut al-Falāsifah বা The Incoherence of the Philosophers-এ গাজালি দার্শনিকদের বক্তব্য আগে সাজিয়ে আনেন। তারপর তাদের proof (প্রমাণ)-এর ভিত পরীক্ষা করেন। তাঁর আঘাত এলোমেলো নয়। তিনি বিশেষভাবে তিনটি দাবিকে বিপজ্জনক মনে করেন। জগত অনাদি। আল্লাহ কেবল universal (সামগ্রিক) জানেন, particulars (বিশেষ ঘটনা) জানেন না। দেহগত পুনরুত্থান রূপক। এই তিন প্রশ্নে তিনি দার্শনিকদের কুফর পর্যন্ত বলেন। Michael Marmura, trans., The Incoherence of the Philosophers, Introduction, Discussions 1–3, 17–20.

    এখানে বিষয়টি ভালোভাবে ধরতে হবে। গাজালি যদি সত্যিই বিজ্ঞানবিরোধী হতেন, তবে তিনি গণিতকে আলাদা করে নিরাপদ বলতেন না। তিনি দার্শনিকদের সব শাস্ত্র একসঙ্গে বাতিল করতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তাঁর রাগ ছিল এমন এক দার্শনিক প্রবণতার বিরুদ্ধে, যেখানে গণিতের নিশ্চয়তা দেখে মানুষ metaphysics (অধিবিদ্যা)-এর অনিশ্চিত দাবিকেও নিশ্চয়তার আসনে বসিয়ে দেয়।

    একজন মানুষ জ্যামিতিতে দক্ষ। তাই বলে ঈশ্বরতত্ত্বে তার সিদ্ধান্তও অব্যর্থ হবে—এ কথা কে বলল? একজন চিকিৎসক দেহ বোঝেন। তাই বলে আত্মা, পুনরুত্থান, সৃষ্টির শুরু, আল্লাহর জ্ঞান—এসব বিষয়ে তাঁর অনুমান শেষ কথা হয়ে যায় না। শাস্ত্রের সীমা আছে। পদ্ধতির সীমা আছে। প্রমাণের ক্ষেত্র আছে। গাজালি এই সীমা মনে করিয়ে দেন।

    Frank Griffel গাজালির চিন্তাকে সরল philosophy-hater (দর্শনবিদ্বেষী)-এর খোপে রাখেন না। তাঁর আলোচনায় গাজালি falsafa (ফালসাফা), Ash‘ari kalam (আশআরি কালাম), causality (কারণত্ব), cosmology (বিশ্বতত্ত্ব) ও Sufism (তাসাউফ)-এর জটিল সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন। Griffel, Al-Ghazali’s Philosophical Theology, pp. 95–140. Richard M. Frank-ও গাজালি ও Ash‘ari school (আশআরি ধারা)-এর সম্পর্ককে সরল আনুগত্যের সম্পর্ক হিসেবে দেখেন না। সেখানে আছে গ্রহণ, সংশোধন, নিজস্ব নির্মাণ। Frank, Al-Ghazālī and the Ash‘arite School, pp. 1–30, 80–130.

    গাজালির causality (কারণত্ব)-সংক্রান্ত আলোচনা আজও ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়। অনেকে বলেন, তিনি কারণ-কার্য সম্পর্ক অস্বীকার করে মুসলিম বিজ্ঞানকে নষ্ট করেছেন। কথাটি যত জনপ্রিয়, ততই অসতর্ক। গাজালি প্রকৃতির নিয়মিততা দেখেছেন। আগুন তুলার কাছে গেলে তুলা পুড়ে যায়—এই অভিজ্ঞতা তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর আপত্তি ছিল এই দাবিতে যে, আগুন নিজে স্বাধীনভাবে পোড়ায়, আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে। তিনি প্রকৃতির নিয়মিত ঘটনার ভাষা বদলাতে চাননি; তিনি তার ontological independence (অস্তিত্বগত স্বাধীনতা)-এর দাবি ভাঙতে চেয়েছেন।

    এখানে গাজালি আধুনিক বিজ্ঞানের শত্রু নন। বরং আধুনিক scientism (বিজ্ঞানবাদ)-এর বিরুদ্ধে একটি পুরোনো সতর্কতা। Science (বিজ্ঞান) যখন নিজের ক্ষেত্রের মধ্যে থাকে, তখন তা জ্ঞান। কিন্তু science (বিজ্ঞান) যখন নিজেকে metaphysics (অধিবিদ্যা), ethics (নৈতিকতা), religion (ধর্ম), meaning (অর্থ), purpose (উদ্দেশ্য)-এর সর্বশেষ বিচারক বানাতে চায়, তখন তা বিজ্ঞান থাকে না। মতবাদে পরিণত হয়।

    হাল জামানায় এই ভুল প্রতিদিন দেখা যায়। একজন পদার্থবিজ্ঞানী মহাবিশ্ব নিয়ে কাজ করেন। তারপর তিনি বলে বসেন, জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই। একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি দেখেন। তারপর তিনি ঘোষণা দেন, স্বাধীন ইচ্ছা কল্পনা। একজন জীববিজ্ঞানী evolution (বিবর্তন) ব্যাখ্যা করেন। তারপর নৈতিকতা, পরিবার, ধর্ম, সমাজ—সবকিছুর ওপর রায় দিতে শুরু করেন। ল্যাবরেটরি থেকে মিম্বার বানানো হয়। এটাই গাজালির ভাষায় প্রমাণের সীমা ছাড়ানো।

    তাই গাজালিকে “বিজ্ঞানবিরোধী” বলা শুধু ইতিহাসের ভুল নয়। এটি বর্তমানেরও অলসতা। তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা আজও দরকার। কোন শাস্ত্র কোন প্রশ্নে কথা বলবে। কোন পদ্ধতির প্রমাণ কোন সীমা পর্যন্ত যায়। মানুষের যুক্তি কখন সত্যের সেবক, আর কখন নিজের সীমা ভুলে প্রভু সেজে বসে। শাস্ত্রের সীমা আছে। পদ্ধতির সীমা আছে। প্রমাণের ক্ষেত্র আছে। গাজালি এই সীমা মনে করিয়ে দেন।

    ইবনে রুশদ দরজা বন্ধ করেননি

    Ibn Rushd (ইবনে রুশদ) অন্য দরজা খুলে দেন। কিন্তু তাঁকেও আধুনিক স্লোগানে বন্দি করা যায় না। তিনি “ধর্মের বিরুদ্ধে যুক্তির নায়ক” নন। তিনি এমন এক মুসলিম দার্শনিক-ফকিহ, যিনি দেখাতে চেয়েছেন, শরিয়াহ ও philosophy (দর্শন)-এর সম্পর্ক শত্রুতার নয়। তবে এই সম্পর্কের জন্য যোগ্যতা দরকার। পদ্ধতি দরকার। ভাষার স্তর দরকার।

    তাঁর Faṣl al-Maqāl বা Decisive Treatise-এর প্রশ্নটি সরাসরি। শরিয়াহ কি philosophy (দর্শন)-কে নিষিদ্ধ করে, অনুমতি দেয়, না দাবি করে? ইবনে রুশদের উত্তর সাহসী। যারা যোগ্য, যারা demonstration (বুরহান/প্রমাণ)-এর পথে চিন্তা করতে পারে, তাদের জন্য দার্শনিক বিচার শুধু বৈধ নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। Ibn Rushd, The Decisive Treatise, trans. Charles Butterworth, pp. 1–10.

    ইবনে রুশদ কুরআনের সেই আয়াতগুলোকে সামনে আনেন, যেখানে আকাশ-জমিনের দিকে তাকাতে বলা হয়েছে, সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে বলা হয়েছে, নিদর্শন বিচার করতে বলা হয়েছে। তাঁর কাছে philosophy (দর্শন) মানে ধর্ম থেকে পালানো নয়। বরং সৃষ্টির ওপর চিন্তা করে স্রষ্টার দিকে যাওয়ার এক শাস্ত্রীয় পথ। তবে পথ সবার জন্য এক নয়।

    তিনি demonstration (বুরহান/প্রমাণ), dialectic (জাদাল/তর্ক), rhetoric (খিতাবা/বক্তৃতামূলক ভাষা)-এর পার্থক্য করেন। সব মানুষ একই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে সত্য গ্রহণ করে না। কেউ প্রমাণের ভাষা বোঝে। কেউ তর্কের ভাষা বোঝে। কেউ নৈতিক উপদেশ, কাহিনি ও খিতাবার ভাষায় প্রভাবিত হয়। এই স্তরবোধ ছাড়া গভীর জ্ঞান মানুষের হাতে বিপজ্জনক হতে পারে। ইবনে রুশদ দরজা খুলেছেন। কিন্তু দরজায় দারোয়ানও রেখেছেন।

    তিনি বলেননি, যে যার মতো দর্শন করবে। তিনি বলেননি, ধর্মীয় সমাজে সূক্ষ্ম metaphysical (অধিবিদ্যাগত) তর্ক বাজারে ছুড়ে দিতে হবে। তাই ইসমতে আম্বিয়া, আদালতে সাহাবা, সূক্ষ্ম ফিকহি ইখতিলাফ, আল্লাহতত্ত্বের নিগূঢ় বাতচিত, তাঁর আরশ, কুরসি, ইস্তেওয়া আলাল-আরশ ইত্যাদি বিষয় পাইকারি হারে বাজারজাতকরণের পরিণাম ভয়াবহ হওয়ারই ছিলো, হয়েছেও। উলামার তর্ক সাধারণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উম্মাহ বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে। নানা মুনির নানা ব্যাখ্যায় সাধারণের ঈমান-আমল আজ বিভ্রান্ত। অথচ তারা এটার মুকাল্লাফ (শরয়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত) ছিল না। ইবনে রুশদ এসব ব্যাপারে ভুল ব্যাখ্যার বিপদ দেখেছেন। অযোগ্য মানুষের হাতে গভীর দর্শনের ক্ষতি বুঝেছেন। তাঁর কাছে জ্ঞান স্বাধীন, কিন্তু দায়িত্বহীন নয়। চিন্তা বৈধ, কিন্তু শিকড়হীন নয়।

    গাজালি ও ইবনে রুশদকে “ধর্ম বনাম যুক্তি” খেলায় নামানো শিশুসুলভ। গাজালি সীমা দেখান। ইবনে রুশদ বৈধতা দেখান। একজন দার্শনিক অহংকারের বিচার করেন। অন্যজন দার্শনিক অনুসন্ধানের অধিকার রক্ষা করেন। একজন বলেন, প্রমাণের সীমা ছাড়িও না। অন্যজন বলেন, প্রমাণের পথ অপ্রমাণ দিয়ে বন্ধ করো না। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের জন্য দুজনই দরকার।

    আজকের সময়েও এই দুই কণ্ঠ প্রয়োজন। একদিকে এমন ধর্মীয় ভীরুতা আছে, যা philosophy (দর্শন), kalam (কালাম), logic (যুক্তিবিদ্যা), history (ইতিহাস), social science (সমাজবিজ্ঞান)—সবকিছুকে সন্দেহ করে। অন্যদিকে এমন বুদ্ধিজীবী অহংকার আছে, যা ধর্মীয় জ্ঞানকে শিশুসুলভ মনে করে, অথচ নিজের ধারণাগত দুর্বলতা দেখে না। গাজালি প্রথম অহংকারে ছুরি চালান। ইবনে রুশদ দ্বিতীয় ভীরুতাকে ধাক্কা দেন। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়েই পরিণত মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তি গড়ে উঠতে পারে।

    সংঘাত কোথায় ছিল?

    ইসলামী ইতিহাসে সংঘাত ছিল না বললে, লেখা সস্তা আত্মপক্ষসমর্থন হয়ে যায়। Mihna (মিহনা) ছিল। দার্শনিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। bid‘ah (বিদআত) ও zandaqa (যিন্দিক)-এর অভিযোগ কখনো শাস্ত্রীয় সতর্কতা ছিল, কখনো রাজনৈতিক অস্ত্র। কিছু জায়গায় জ্ঞানচর্চা সংকুচিত হয়েছে। কিছু জায়গায় শাস্ত্রীয় ভয় চিন্তার দরজা ছোট করেছে। মানুষ ছিল, ক্ষমতা ছিল, দল ছিল, ভয় ছিল। ইতিহাসে ফেরেশতা বাস করে না।

    কিন্তু এই সবকিছুকে “জ্ঞান বনাম ধর্ম” বলা অসতর্ক দাবি। সংঘাত ছিল authority (কর্তৃত্ব) নিয়ে। কোন দাবির সীমা কোথায়। কোন শাস্ত্র কোন বিষয়ে কথা বলবে। ওহীর ভাষা কীভাবে বোঝা হবে। যুক্তির ভূমিকা কতদূর। রাষ্ট্র ধর্মতত্ত্ব চাপাতে পারে কি না। দার্শনিক metaphysics (অধিবিদ্যা) আকিদার কেন্দ্রে ঢুকবে কি না। সাধারণ মানুষের সামনে কোন তর্ক কী ভাষায় যাবে।

    Created Quran (কুরআন মাখলুক কিনা)-এর বিতর্ক এই জটিলতার বড় উদাহরণ। Mihna (মিহনা) ছিল আব্বাসীয় আমলের এক ধরনের religious inquisition (ধর্মীয় মত-পরীক্ষা/জবরদস্তি পরীক্ষা)। খলিফা আল-মামুনের সময় থেকে রাষ্ট্র আলেমদের ওপর একটি নির্দিষ্ট কালামি মত চাপিয়ে দিতে শুরু করে। সেই মত ছিল, কুরআন মাখলুক। অর্থাৎ কুরআন আল্লাহর সৃষ্ট বস্তু। যারা এই মত মানতেন না, তাঁদের জেরা, অপমান, কারাবন্দি ও নির্যাতনের মুখে পড়তে হতো।

    ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহি. এই মিহনার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিরোধী আলেম। তিনি রাষ্ট্রীয় চাপের মুখে কুরআনকে মাখলুক বলতে অস্বীকার করেন। তাঁর প্রতিরোধ শুধু একটি মতের বিরোধিতা ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের হাতে আকিদা নির্ধারণের জবরদস্তির বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো। ধর্মীয় বিতর্ক নিজে জ্ঞানচর্চার শত্রু নয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন একটি কালামি মতকে পরীক্ষার যন্ত্র বানায়, তখন যুক্তি আর প্রমাণ থাকে না। তা প্রশাসনিক লাঠিতে পরিণত হয়।

    মুতাজিলা যুক্তির কথা বলেছিল, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে যুক্তি বসলে যুক্তিও অত্যাচারী হতে পারে। এই জায়গায় মিহনা শুধু একটি আকিদাগত বিতর্কের ঘটনা নয়। এটি দেখায়, চিন্তার ইতিহাসে বিপদ শুধু অজ্ঞতার দিক থেকে আসে না। কখনো বিপদ আসে যুক্তিবাদী আত্মবিশ্বাসের দিক থেকেও, যখন সে রাষ্ট্রক্ষমতার হাত ধরে মানুষের ঈমান পরীক্ষা করতে নামে। Wolfson divine attributes (ঐশী গুণাবলি) ও created Quran (মাখলুক কুরআন)-এর তর্ককে ভাষা, যুক্তি, metaphysics (অধিবিদ্যা) ও কর্তৃত্বের জটিল সম্পর্ক হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। Wolfson, The Philosophy of the Kalam, pp. 244–265.

    একজন চিকিৎসক Galen (জালিনুস) পড়লে ধর্ম বিপন্ন হয় না। একজন গণিতবিদ Euclid (ইউক্লিড) পড়লে ঈমান নষ্ট হয় না। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণি তৈরি করলে শরিয়াহ ভেঙে পড়ে না। কিন্তু একজন দার্শনিক যদি বলে জগত অনাদি, আল্লাহ particulars (বিশেষ ঘটনা) জানেন না, দেহগত পুনরুত্থান রূপক—তখন ধর্মতাত্ত্বিক আপত্তি আসবেই। এই দুই ঘটনাকে এক দাঁড়িপাল্লায় মাপা ইতিহাসের ওপর অবিচার।

    এখানে শাস্ত্রের স্তর বুঝতে হয়। Mathematics (গণিত) এক ধরনের নিশ্চয়তা দেয়। Medicine (চিকিৎসা) অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ওপর দাঁড়ায়। Astronomy (জ্যোতির্বিজ্ঞান) মাপ ও সারণির ভাষায় চলে। Philosophy (দর্শন) অনেক সময় metaphysics (অধিবিদ্যা)-এ প্রবেশ করে। Kalam (কালাম) ঈমানি দাবিকে যুক্তির ভাষায় রক্ষা করে। Fiqh (ফিকহ) বাস্তব জীবনের বিধান গড়ে। সব শাস্ত্রকে এক নামে “জ্ঞান” বলে এক ঝুড়িতে ফেললে বিচার নষ্ট হয়। গণিত যে ধরনের নিশ্চয়তা দেয়, চিকিৎসা তা দেয় না। চিকিৎসা যে অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়ায়, অধিবিদ্যা তার ওপর দাঁড়ায় না। ফিকহের প্রশ্ন আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রশ্ন এক নয়। তাই সংঘাত কোথায়, আপত্তি কোথায়, গ্রহণ কোথায়—এসব বুঝতে হলে আগে শাস্ত্রের স্তর আলাদা করতে হয়।

    হাল জামানায়ও একই ভুল হয়। কেউ biology (জীববিজ্ঞান)-এর নাম করে নৈতিকতার ওপর রায় দেয়। কেউ physics (পদার্থবিদ্যা)-এর সূত্র দিয়ে সৃষ্টিকর্তা নেই প্রমাণ করতে চায়। কেউ psychology (মনোবিজ্ঞান)-এর ভাষায় পাপ, তওবা, আত্মসংযম, নৈতিক দায়—সবকিছুকে অসুস্থতা বা সামাজিক নির্মাণ বলে সরিয়ে দিতে চায়। আবার অন্যদিকে কেউ ধর্মের নামে চিকিৎসা, পরিসংখ্যান, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান—সবকিছু নিয়ে অজ্ঞ আত্মবিশ্বাসে কথা বলে। দুই দিকেই একই রোগ। শাস্ত্রের সীমা না জানা।

    ইসলামী জ্ঞানচর্চার পরিণত ঐতিহ্য এই সীমা শেখাত। প্রশ্ন করবে। কিন্তু প্রশ্নের আসন ঠিক করো। উত্তর দেবে। কিন্তু উত্তর কোন শাস্ত্রের ভাষায় দিচ্ছ, তা জানো। ওহীকে মানবে। কিন্তু ওহীর নামে নিজের অজ্ঞতাকে ঢাকবে না। আকল ব্যবহার করবে। কিন্তু আকলকে আল্লাহর আসনে বসাবে না।

    সংঘাত তাই ছিল। কিন্তু সংঘাতের নাম “জ্ঞান বনাম ধর্ম” নয়। তার নাম জ্ঞানের সীমা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, যুক্তির ভূমিকা, রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, এবং মানুষের অহংকার।

    বর্তমানের ভুল পাঠ

    আজও দুই ধরনের অলসতা আছে।

    একদল ইসলামকে জ্ঞানের শত্রু বানায়। তারা এমনভাবে কথা বলে, যেন মুসলিম ইতিহাসে বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন—এসব দুর্ঘটনা। যেন মুসলিমরা ভুল করে জ্ঞানচর্চা করেছিল। তাদের কাছে Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ) ইতিহাসের অস্বস্তিকর ব্যতিক্রম। আল-খাওয়ারিজমি, হুনাইন, আল-কিন্দি, বানু মুসা, সাবিত ইবনে কুররা—সবাই যেন ধর্মীয় সভ্যতার ভেতরে নয়, তার বাইরে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন।

    এটা hostile reading (শত্রুভাবাপন্ন পাঠ)। ইতিহাসকে আগে থেকেই দোষী ধরে পড়ে।

    আরেকদল ধর্মরক্ষার নামে চিন্তাকেই সন্দেহ করে। প্রশ্ন করলেই ভয়। দর্শন বললেই ভয়। কালাম বললেই ভয়। যুক্তি বললেই ভয়। ইতিহাসের জটিলতা দেখালেই ভয়। যেন ইসলাম এত দুর্বল যে একটি প্রশ্নের ধাক্কায় ভেঙে পড়বে। তারা ঈমানকে এমন কাচের পাত্র বানিয়ে ফেলে, যা আলো পেলেও ভাঙার ভয়।

    এই দুই পক্ষই ইসলামী ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় করে।

    Bayt al-Hikmah, kalam (কালাম), falsafa (ফালসাফা), fiqh (ফিকহ), usul (উসুল), logic (যুক্তিবিদ্যা), munazara (মুনাজারা)—এসব একসঙ্গে দেখায়, মুসলিম সভ্যতা চিন্তাকে ভয় পেয়ে বড় হয়নি। কিন্তু সে শিকড়হীন চিন্তাকেও মাথায় বসায়নি। যুক্তি চাই। কিন্তু ওহীহীন সার্বভৌম যুক্তি নয়। কালাম চাই। কিন্তু কালাম যদি ঈমানকে ধোঁয়াশায় হারিয়ে ফেলে, তাকে জবাব দিতে হবে। দর্শন চাই। কিন্তু দর্শন যদি প্রমাণের সীমা ছেড়ে আকিদার কেন্দ্র দখল করে, তাকে থামাতে হবে। বিতর্ক চাই। কিন্তু জ্ঞানহীন চিৎকার নয়।

    আজ অনেক জায়গায় আমরা উল্টো করি। প্রশ্নকে মেরে ফেলি, তারপর অজ্ঞতার নাম দিই তাকওয়া। মতানৈক্যকে নাম দেই বেয়াদবি। রোবটিক আনুগত্য ও বিনা প্রশ্নে নির্দ্বিধায় নিজেকে সঁপে দেওয়াকে বলি ভদ্রতা।। অথচ সূরা আনফাল-এর ২২ নং আয়াত এমন প্রাণীদের আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সাব্যস্ত করেছে। কারণ, সর্বক্ষেত্র সঁপে দেওয়ার সংস্কৃতির ওপর দাঁড়ায় না। বিশেষ করে জ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, ঐতিহ্য কোনোভাবেই কারও কাছে সোপর্দের কিছু নয়। এগুলো বহতা, চলমান। সোপর্দ করলেই পতন অনিবার্য। মহান ইমামগণ এভাবে নিজেদের সঁপে দেননি। ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম শাফিয়ি, ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ, ইমাম বুখারী রাহিমাহুমুল্লাহ নিজেদের এভাবে সঁপে দেননি। দিলে জ্ঞান আগাতো না। পৃথিবী থমকে যেত। জ্ঞানের সূচনাই হত না। তাই আল্লাহ তায়ালা এ ধরনের সঁপে দেওয়া সংস্কৃতির প্রাণীদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সাব্যস্ত করেছেন। কারণ এই ধরনের জীবের কারণে আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে উত্তম সৃষ্টি "জ্ঞান" ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সভ্যতা ধ্বংস হয়। আল্লাহর সৃষ্টির বিশাল রহস্য বাধাগ্রস্ত হয়। আবার কেউ কেউ শিকড় কেটে ফেলে, তারপর তার নাম দেয় মুক্তচিন্তা। দুইটাই দরিদ্রতা। 

    আরেক বিপদ হলো ঘরানা-নির্ভর জ্ঞান। নিজের ঘরানার লোক হলে দুর্বল কথাও জ্ঞান। অন্য ঘরানার লোক হলে শক্ত কথাও সন্দেহ। একদল secular (ধর্মনিরপেক্ষ) মানুষের মুখে ইসলাম শুনলেই বিরক্ত হয়। আরেকদল ধর্মীয় মানুষের মুখে দর্শন শুনলেই সন্দেহ করে। কেউ পাঠ দেখে না। কেউ যুক্তি দেখে না। কেউ evidence (প্রমাণ) দেখে না। সবাই পরিচয় দেখে। এভাবে সভ্যতা হয় না। এভাবে দেয়াল হয়।

    আমাদের সময়ের বড় রোগ হলো অর্ধশিক্ষিত আত্মবিশ্বাস। মানুষ দুই পৃষ্ঠা পড়ে রায় দেয়। একটি ভিডিও দেখে মতবাদ বানায়। একটি উদ্ধৃতি ধরে শতাব্দীর ঐতিহ্য বাতিল করে। কেউ গাজালিকে না পড়ে গাজালির নামে মুসলিম বিজ্ঞানের মৃত্যু ঘোষণা করে। কেউ ইবনে রুশদকে না পড়ে তাঁকে ধর্মহীন যুক্তির পতাকা বানায়। কেউ কালাম না পড়ে কালামকে বিভ্রান্তি বলে। কেউ ফালসাফা না পড়ে তাকে মুক্তির একমাত্র রাস্তা বানায়। লাল কলম হাতে পড়ার লোক কমে গেছে। স্লোগান হাতে লোক বেড়েছে।

    এই অধ্যায়ের প্রশ্ন এখানেই বর্তমান। জ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে হলে ইতিহাস পড়তে হবে। শাস্ত্রের সীমা বুঝতে হবে। পরিভাষার মাপ জানতে হবে। কোন যুগের কথা বলছি, কোন ভূগোলের কথা বলছি, কোন জ্ঞানের কথা বলছি—এসব না জানলে আলোচনা কুয়াশায় ঢুকে যায়।

    সহাবস্থানের শৃঙ্খলা

    জ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক ইসলামী সভ্যতায় সস্তা সংঘাতের গল্প নয়। আবার নরম, অস্পষ্ট, সবকিছু মেনে নেওয়া সহাবস্থানের গল্পও নয়। এটি শৃঙ্খলিত সংলাপের ইতিহাস।

    ওহী সত্যের নোঙর দিয়েছে। আকল বোঝার শক্তি দিয়েছে। কালাম প্রতিরক্ষার ভাষা দিয়েছে। দর্শন প্রশ্নের কঠোরতা এনেছে। ফিকহ বাস্তব জীবনের কাঠামো দিয়েছে। চিকিৎসা শরীরের দিকে তাকিয়েছে। গণিত মাপ দিয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান আকাশকে সারণিতে নামিয়েছে। অনুবাদ বাইরের জ্ঞানকে আরবি ভাষায় এনেছে। মুনাজারা দাবিকে পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

    এই জগতকে “ধর্ম বনাম জ্ঞান” বলে পড়া মানে বইয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে দরজার রঙ বিচার করা। ভিতরে ঢোকা হয়নি, অথচ রায় ঘোষণা হয়ে গেছে।

    ইসলামী সভ্যতার সোনালি যুগ আমাদের শেখায়, ধর্ম চিন্তার দরজা বন্ধ করে না। তবে চিন্তাকে দায়িত্ব ছাড়া ছেড়েও দেয় না। কারণ দায়িত্বহীন চিন্তা অনেক সময় সত্যের নয়, অহংকারের স্বাধীনতা। আর ভয় থেকে জন্ম নেওয়া ধর্মরক্ষা শেষ পর্যন্ত ধর্মকেই দুর্বল করে।

    ভাবো। কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে ভাবো। প্রশ্ন করো। কিন্তু শিকড় কেটে নয়। প্রমাণ দাও। কিন্তু প্রমাণের সীমা জানো। ওহী মানো। কিন্তু না বুঝে মুখস্থ করাকে জ্ঞান ভেবো না।

    এই ভারসাম্যই ছিল ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির শক্তি। এখানে আলেম ছিলেন। দার্শনিক ছিলেন। অনুবাদক ছিলেন। চিকিৎসক ছিলেন। গণিতবিদ ছিলেন। কালামবিদ ছিলেন। ফকিহ ছিলেন। সবাই একই কথা বলেননি। কিন্তু সবাইকে একই মাটির প্রশ্নে দাঁড়াতে হয়েছে। সত্য কী? প্রমাণ কী? ওহীর স্থান কোথায়? আকলের সীমা কোথায়? মানুষের দায়িত্ব কী?

    জ্ঞান বনাম ধর্ম—এ প্রশ্নের উত্তর তাই এক লাইনে নয়। ইসলামী উত্তর হলো—জ্ঞান দরকার, ধর্মের ভিতরে দাঁড়িয়ে। যুক্তি দরকার, ওহীর আলোয়। বিতর্ক দরকার, আদব ও প্রমাণের সঙ্গে। স্বাধীনতা দরকার, কিন্তু সত্যের বিরুদ্ধে নয়। এ ভারসাম্য হারালে সভ্যতা শুকিয়ে যায়। আর এ ভারসাম্যই একদিন মুসলিম বিশ্বকে জ্ঞানের ইতিহাসে উঁচু আসনে বসিয়েছিল।

    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment