Loading...

শব্দগত বর্ণবাদ এবং গণমানুষের ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক অবদমন

শব্দগত বর্ণবাদ এবং গণমানুষের ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক অবদমন
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    শব্দগত বর্ণবাদ ও গণমানুষের ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক অবদমন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে আধুনিক ভাষিক শ্রেণিবিভাজনের প্রতীকী চিত্র

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং আধুনিক সমাজে ভাষাভিত্তিক মর্যাদা ও শ্রেণিবিভাজনের একটি প্রতীকী চিত্র

    Previous Part.......

    ৫:৩

    ফোর্ট উইলিয়ামের ভাষিক জালিয়াতি, সংস্কৃতায়নের খাঁচা এবং প্রাকৃত প্রাত্যহিক শব্দের অবদমন

    একটি জনপদের মুখের জবান কেবল কতগুলো ধ্বনিসমষ্টির যান্ত্রিক আদান-প্রদান নয়, তা হলো সেই মাটির মানুষের শত শত বছরের আত্মিক লড়াই, মনস্তাত্ত্বিক স্বাধিকার এবং ঐতিহাসিক অস্তিত্বের জীবন্ত জেনুইন স্বাক্ষর। যখন কোনো অঞ্চলের মানুষের প্রাত্যহিক শব্দাবলীকে সুপরিকল্পিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে ‘ইতর’ বা ‘অনগ্রসর’ বলে দেগে দেওয়া হয়, তখন তা স্রেফ ব্যাকরণগত পরিমার্জন থাকে না। তা রূপান্তরিত হয় এক ভয়াবহ শব্দগত বর্ণবাদ বা ভাষিক অবদমনে। এই অববাহিকার আদিম ও অনার্য মানুষের মুখের জবান যখন প্রাকৃত ও কওম সংস্কৃতির সহজ মৈত্রীতে বহমান ছিল, তখন তাদের ভাষার ভেতর কোনো কৃত্রিম নান্দনিকতার পাঁচিল ছিল না। ছিল না কোনো বিশেষ শোষক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকারী শাস্ত্রীয় বিধান (মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ২২) কিন্তু ১৮০০ সালের মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পত্তনের সমান্তরালে এই বদ্বীপের হাজার বছরের প্রাকৃত প্রাত্যহিক শব্দাবলীর ওপর এক অভূতপূর্ব ও চতুর ভাষিক জালিয়াতির খাঁচা চাপিয়ে দেওয়া হলো। যা এ দেশের মেহনতি মানুষের মুখের ভাষাকে তাদের নিজেদের চোখেই হীন ও অসভ্য প্রমাণ করার এক দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেছিল (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১১২)।

    এই ভাষিক অবদমনের নেপথ্য রাজনীতিটি বুঝতে হলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ব্রিটিশ রাজপুরুষ ও তাদের অনুগত উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের যৌথ মেকানিক্সটি চেনা জরুরি। প্রাক-কলোনিয়াল বাংলায়, বিশেষ করে স্বাধীন সুলতান ও সুফি-সাধকদের সাড়ে পাঁচশ বছরের গঠনমূলক যুগে, এ দেশের মানুষের মুখের প্রাকৃত ভাষার সাথে আরবি, ফারসি এবং দেশজ শব্দের এক অপূর্ব ও স্বাভাবিক মেলবন্ধন ঘটেছিল। যা ‘দোভাষী বাংলা’ বা পুথি সাহিত্যের মাধ্যমে মেহনতি মানুষের একান্ত নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছিল (রহিম, ডক্টর এম. এ. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৫৫)। সাধারণ মানুষ প্রাত্যহিক স্বাচ্ছন্দ্যে ‘পানি, আব্বা, আম্মা, গোসল, আসমান, ইনসাফ, আণ্ডা’-র মতো যে শব্দগুলোকে নিজেদের অস্তিত্বের অংশ বানিয়ে নিয়েছিল, ফোর্ট উইলিয়ামের ফিল্টারে সেগুলোকে রাতারাতি ‘যাবনী’ বা ‘ইতর পাঠ’ বলে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতা থেকে সমূলে উচ্ছেদ করার এক সুপরিকল্পিত ভাষিক জেনোসাইড বা জালিয়াতি সম্পন্ন করা হয় (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১১২)। লর্ড ওয়েলেসলির নির্দেশে ও উইলিয়াম কেরির তত্ত্ববধানে বসা পণ্ডিতেরা মেহনতি মানুষের মুখের জীবন্ত জবানকে গলা টিপে হত্যা করে এক কৃত্রিম, সংস্কৃতঘেঁষা ও গণবিচ্ছিন্ন ‘ভদ্রলোকি ভাষা’ তৈরি করলেন। যা মূলত উচ্চবর্ণের ধর্মীয় ও সামাজিক আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার এক চতুর জ্ঞানতাত্ত্বিক অস্ত্র ছিল।

    এই কৃত্রিম নন্দনতত্ত্বের কারণে মেহনতি মানুষের মনে এক স্থায়ী হীনম্মন্যতার ক্ষত তৈরি হলো। কারণ তাদের প্রাত্যহিক ঘরের জবানকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সরকারি কাজের ক্ষেত্রে ‘অশুদ্ধ’ ও ‘দণ্ডনীয়’ বলে রায় দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, ভাষার এই বিভাজন কেবল হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যকার একটি ধর্মীয় দূরত্ব তৈরি করেছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, এটি ছিল মূলত এক সর্বগ্রাসী শ্রেণী-শাসন। যা উৎপাদনশীল মেহনতি ভূমিপুত্রদের ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে রাখার জন্য খাড়া করা হয়েছিল (মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ৩০)। আর্য-সেন আমলের সেই প্রাচীন বর্ণাশ্রম প্রথা, যেখানে উৎপাদনবিমুখ উচ্চবর্ণেরা নিজেদের পবিত্র প্রমাণ করতে মেহনতিদের শরীর ও পরিচ্ছদকে অস্পৃশ্য বানিয়েছিল। উনিশ শতকের শুরুতে এসে ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিতেরা মানুষের মুখের শব্দের ওপর সেই একই অস্পৃশ্যতার পাঁচিল তুলে দিলেন। যে জোলা, তাঁতি, জেলে বা গ্রামীণ কৃষক এই মাটির মূল চালিকাশক্তি ছিল, তাদের মুখের স্বাভাবিক ‘পানি’ শব্দটিকে বর্জন করে ‘জল’-এর সংস্কৃতকরণ করার নেপথ্যে কোনো ব্যাকরণগত বাধ্যবাধকতা ছিল না। এর পেছনে ছিল, এক গভীর ক্ষমতার দম্ভ ও মানসিক উপনিবেশ স্থাপন।

    এই ভাষিক জালিয়াতির ফাঁদটি এতটাই সুক্ষ্ম ছিল যে, পরবর্তীকালের সাহিত্য, অভিধান এবং ব্যাকরণের পাতায় তা চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করে। এ দেশের সাধারণ গ্রামীণ মুসলিম প্রজারা যখন নিজেদের প্রাত্যহিক স্বস্তির জন্য এই কৃত্রিম ভদ্রলোকি ভাষাকে বর্জন করে নিজেদের পুথি সাহিত্যের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, তখন উচ্চবর্ণের নব্য-উত্থিত বাবু সমাজ তাদের সংস্কৃতিহীন বা বর্বর বলে দাগিয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রচার শুরু করেছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪৫)। কিন্তু এ দেশের প্রাকৃত জনগোষ্ঠী বাবুদের তৈরি করা সেই সংস্কৃতায়নের খাঁচাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের মুখের ‘আব্বা-আম্মা’ কিংবা ‘গোসল, আসমান’-এর মতো শব্দের ভেতরের আত্মিক ও ধর্মীয় স্বাধিকারকে ধরে রাখার জন্য মরণপণ লড়াই করেছিলেন। কারণ তারা জানতেন, ব্যবহারকারীই ভাষার প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করে, বাইরের কোনো শোষক শ্রেণীর কালচারাল জাজমেন্ট মেহনতি মানুষের মুখের জবানকে হরণ করতে পারে না।

    ফারুক মাহমুদ তাঁর আকর গ্রন্থে সমসাময়িক উপন্যাস ও প্রবন্ধে মুসলমানদের মুখের ভাষাকে ‘ইতর’ বা ‘মূঢ় নির্বাক প্রজা’র জবান হিসেবে উপস্থাপন করার যে চতুর মিডিয়া মেকানিক্সের ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তা আধুনিক বাংলাদেশের কর্পোরেট পরিমণ্ডলের আপার্থাইডের বুনিয়াদকে বুঝতে সাহায্য করে (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ১৮)। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেই ভাষিক জালিয়াতি আজ অবধি আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে, বিজ্ঞাপনে এবং নামী ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোতে একপেশে ‘খ্যাত’ ট্যাগিংয়ের রাজনীতি হিসেবে সচল রাখা হয়েছে। যেখানে নিজের ঘরের জেনুইন শব্দ উচ্চারণ করলেই একজন মানুষকে আধুনিকতার পরিমণ্ডল থেকে ছিটকে দেওয়া হয়। এই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাপদ্ধতি ও পরিবেশ এমনভাবে তৈরি, যেখানে নিখুঁত ইংরেজিতে কথা বলাকে আভিজাত্যের প্রধান শর্ত ধরা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অজান্তেই নিজস্ব সংস্কৃতি ও মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করতে শেখে। যা সেই ঔপনিবেশিক জালিয়াতি ও ভাষিক শ্রেণিবিভাজনেরই একটি আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল শিক্ষার মাধ্যম নয়, বরং সমাজে একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চশ্রেণি (Elite Class) তৈরি করার কারখানা, যা সাধারণ মানুষের ভাষা ও জীবনধারা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

    উনিশ শতকের বাবু অভিধান, ভাষিক অস্পৃশ্যতা এবং সুবে বাংলার সমাজ-মানসের প্রতিরোধ

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সংস্কৃতায়নের ছাঁকনিতে মেহনতি মানুষের মুখের জবানকে ‘ইতর পাঠ’ বলে দেগে দেওয়ার পর, উনিশ শতকে কলকাতার নব্য-উত্থিত বাবু সমাজ এই ভাষিক অপার্থাইডকে সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ, অভিধান এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে এক স্থায়ী আইনি ও সামাজিক রূপ দান করে (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪৫)। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার নব্য-উত্থিত বাবু সমাজ এবং ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর যৌথ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষাকে মেহনতি মানুষের জবান থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের মুখের প্রাত্যহিক ভাষা, যাতে লোকায়ত বুৎপত্তি এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা আরবি, ফারসি ও দেশি শব্দের অবাধ মিশ্রণ ছিল, তাকে ‘ইতর’, ‘ভলগার’ বা ‘অসাধু’ তকমা দিয়ে বাংলা গদ্যের মূল ধারা থেকে ছেঁটে ফেলার প্রক্রিয়াটি ব্যাকরণ ও অভিধানের কাঠামোগত শৃঙ্খলে চূড়ান্ত বৈধতা লাভ করে। এই ঐতিহাসিক ভাষিক অপার্থাইড বা ভাষাগত বর্ণবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মূলত ৪টি প্রধান অভিধান এবং তাদের সংকলকদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী। যা সমকালীন সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় এক দুর্ভেদ্য প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল খাড়া করেছিল।

    ১. উইলিয়াম কেরির ‘এ ডিকশনারি অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (১৮১৫ ও ১৮২৫)

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষা শিক্ষার প্রধান চালিকাশক্তি রেভারেন্ড উইলিয়াম কেরি কলেজের পাঠ্যবই প্রস্তুতকরণ এবং ব্রিটিশ বেসামরিক কর্মচারীদের শাসনকাজের সুবিধার্থে এক বিশাল অভিধান সংকলনের কাজে হাত দেন। এই অভিধানটিই উনিশ শতকে বাংলা ভাষার লৈখিক আভিজাত্য এবং শব্দের শুদ্ধতা নির্ধারণের প্রধান আইনি দলিল হয়ে ওঠে। কেরি তাঁর এই অভিধানে শব্দের জাত বা বুৎপত্তি নির্ধারণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সংকেত পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। যেখানে সংস্কৃত ভাষার মূল ধাতু থেকে আসা শব্দগুলোর পাশে উচ্চ মর্যাদাসূচক চিহ্ন হিসেবে S. (Sanskrit) লিখে সেগুলোকে সাহিত্যের একমাত্র ‘শুদ্ধ ও মান্য’ রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

    অপরদিকে, বাংলার প্রান্তিক চাষী, কারিগর কিংবা শ্রমজীবী মানুষের মুখের তদ্ভব ও খাঁটি লোকায়ত দেশি শব্দগুলোকে কেরি তাঁর অভিধানের পাতায় সরাসরি V. (Vulgar বা ইতর) এবং C. (Corrupt বা জারজ ও অশুদ্ধ) বলে দাগিয়ে দেন (William Carey, A Dictionary of the Bengalee Language, Vol. 1 & 2, 1825)। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ মানুষের মুখের অত্যন্ত পরিচিত শব্দ যেমন ‘পানি’ কিংবা গ্রামীণ উচ্চারণের ‘নুন’, ‘মিছা’ এবং ‘ডর’-এর মতো বহুল প্রচলিত লৌকিক শব্দগুলোকে তিনি খাঁটি বাংলা ভাষার মূলধারায় স্থান না দিয়ে সরাসরি "Low Bengali" বা সাধারণ মানুষের ইতর ভাষা (Vulgar Language of the Common People) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। কেরি তাঁর এই অভিধানের দীর্ঘ ভূমিকাতেই স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, বাংলার সাধারণ আমজনতার মৌখিক ভাষা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, ব্যাকরণহীন এবং তা কোনো উচ্চমানের সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।

    ২. রামচন্দ্র শর্মা (তর্কালঙ্কার)-এর ‘বঙ্গভাষাভিধান’ (১৮১৭)

    কোনো বাঙালি সংকলকের দ্বারা একক প্রচেষ্টায় সংকলিত বাংলা থেকে বাংলা ভাষার প্রথম একভাষিক অভিধান হিসেবে ‘বঙ্গভাষাভিধান’ বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। তবে উনিশ শতকের শুরুতে রামচন্দ্র শর্মা বিদ্যাবাগীশ প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী হলেও, ভাষাতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে তৎকালীন পণ্ডিতি সমাজের অবধারিত সংস্কৃতমুখী ধারা এড়াতে পারেননি। ফলে তাঁর এই সংকলনটি সম্পূর্ণ একটি ‘সংস্কৃতঘেঁষা’ প্রমিত রূপ ধারণ করে। এই কারণে, তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের হাজার হাজার জীবন্ত আরবি, ফারসি এবং লোকায়ত দেশি শব্দ এই প্রথম সম্পূর্ণ বাংলা অভিধানের পরিধি থেকে স্থানচ্যুত বা বাদ পড়ে যায়। বাংলা অভিধানের ক্ষেত্রে এই নীতির সবচেয়ে কঠোর ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন রামকমল সেন (তাঁর ১৮৩৪ সালের ইংরেজি-বাংলা অভিধানে) এবং পণ্ডিত তারানাথ তর্কবাচস্পতি।

    ৩. মোহনপ্রসাদ ঠাকুরের ‘এ ভোকাবুলারি: বেঙ্গলি অ্যান্ড ইংলিশ’ (১৮০৫)

    মোহনপ্রসাদ ঠাকুর ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অত্যন্ত প্রভাবশালী অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান। যিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন কর্মচারীদের বাংলা সমাজ ও ভাষা চটজলদি শেখানোর উদ্দেশ্যে এই শব্দকোষটি তৈরি করেছিলেন। উনিশ শতকের শুরুতে যখন মুদ্রণযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কলকাতার উচ্চবর্ণের বাবু এবং ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়, তখন এই ধরণের অভিধানগুলোই সমাজ ও শিক্ষার মূল ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

    ৪. রাধাকান্ত দেবের ‘শব্দকল্পদ্রুম’ (১৮৫৮ পর্যন্ত বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশিত)

    সরাসরি বাংলা ভাষার একক অভিধান না হলেও, উনিশ শতকের কলকাতার সনাতনপন্থী বাবু সমাজের অন্যতম প্রধান নেতা রাজা রাধাকান্ত দেবের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বহু পণ্ডিতের পরিশ্রমে এই বিশাল এনসাইক্লোপেডিক সংস্কৃত অভিধানটি সংকলিত হয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে শেষভাগ পর্যন্ত এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষার ‘শুদ্ধতা’, আভিজাত্য ও ব্যাকরণগত বৈধতা পরিমাপের সর্বোচ্চ আদালত বা অলঙ্ঘ্য মানদণ্ড হয়ে উঠেছিল। এর মূল আটটি খণ্ড ১৮১৯ থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। ১৮৮৬ বা তার পরবর্তী সময়ে যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো ছিল বরদাপ্রসাদ মজুমদার বা হরিচরণ বসু কর্তৃক প্রকাশিত এর পরবর্তী পুনঃমুদ্রণ বা সংস্করণ।

    বাবু সমাজের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, আইনি শিলমোহর ও সামাজিক বিভাজন

    উনিশ শতকে কলকাতার নব্য-উত্থিত ইংরেজি শিক্ষিত বাবু ও জমিদারেরা এই সংস্কৃতঘেঁষা ভাষাকেই তাদের সামাজিক মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক করে তোলেন (বদরুদ্দীন উমর, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, চিরায়ত প্রকাশন, পৃষ্ঠা ৩৩; সুকুমার সেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪)। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে হলে এবং মেহনতি নিম্নবর্গ থেকে নিজেদের আলাদা দেখাতে হলে একটি ‘ভদ্রলোকি’ ভাষার প্রয়োজন (গোলাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, পৃষ্ঠা ১১১)। এই নতুন বাবু সমাজ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সম্মিলিতভাবে লোকায়ত ভাষার লৈখিক রূপকে চিরতরে বদলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে (সুকুমার সেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫)। তৎকালীন নব্য ধনিক শ্রেণী ও উচ্চবর্ণের পণ্ডিতেরা গ্রামীণ ও মেহনতি মানুষের মুখের ভাষা, যাতে বহু শতকের বিবর্তনে আরবি, ফারসি ও লৌকিক শব্দের সমাহার ছিল, তাকে ব্রাত্য ও অপাংক্তেয় করে তোলে এবং জোরপূর্বক একটি কৃত্রিম তৎসম-বহুল ভাষা কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বয়ং ১৮৫২ সালের ১২ এপ্রিল শিক্ষা সংস্কারের এক খসড়া প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, একটি মার্জিত, ভাবপ্রকাশক্ষম এবং প্রাঞ্জল বাংলা গদ্যরীতি কেবল তাদের পক্ষেই তৈরি করা সম্ভব, যারা সংস্কৃতে সুপণ্ডিত (Vidyasagar's Report to the Council of Education, 1852)।

    উইলিয়াম কেরি থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের বাঙালি পণ্ডিতেরা যে ব্যাকরণ ও অভিধানগুলো সংকলন করেন, সেখানে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে ‘তুচ্ছ’, ‘অসাধু’ বা ‘ভলগার’ (Volgar) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। মুদ্রণযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ উচ্চবর্ণ ও উচ্চবিত্তের হাতে থাকায় এই ব্যাকরণসম্মত রূপটিই ‘পাঠ্যবই’ এবং সরকারি দলিলে স্থান পায়, যা একে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেয়। উইলিয়াম কেরি তাঁর ১৮২৫ সালের অভিধানে তদ্ভব ও লোকায়ত শব্দগুলোর পাশে সরাসরি V. (Vulgar) এবং C. (Corrupt) সংকেত ব্যবহার করে মেহনতি মানুষের ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি নথিপত্রে ‘অপভাষা’ বা ‘জারজ শব্দ’ হিসেবে দাগিয়ে দেন। মুদ্রণ কাঠামোর একচেটিয়া মালিকানার জোরে রামচন্দ্র শর্মার মতো পণ্ডিতেরা সংস্কৃত ধাতুমূলহীন লৌকিক শব্দভাণ্ডারকে পুরোপুরি বর্জন করে একে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন।

    এর ফলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির জগৎ থেকে মেহনতি মানুষ (যেমন—চাষী, জেলে, কারিগর, শ্রমজীবী) পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন (Journal of the Department of English, Vol. 11, 2014, Page 54; বদরুদ্দীন উমর, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, পৃষ্ঠা ৪৪)। তাদের মুখের জবানকে ‘অশিক্ষিত’ বা ‘সংস্কৃতিহীন’ তকমা দিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাদের প্রান্তিক করে রাখার একটি স্থায়ী হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পাঠ্যপুস্তক, যেমন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের প্রবোধ চন্দ্রিকা (১৮৩৩)-এর অতি-সংস্কৃতায়িত গদ্যশৈলী সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষার পথে এক দুর্ভেদ্য ভাষিক দেয়াল বা অপার্থাইড খাড়া করে। যার ফলে তারা সমাজ ও ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি থেকে স্থায়ীভাবে ছিটকে পড়ে।

    এই ভাষিক অস্পৃশ্যতার মূল লক্ষ্য কেবল ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করা ছিল না; এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক লক্ষ্য ছিল সুবে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের মননে এক চিরন্তন হীনম্মন্যতার ক্ষত তৈরি করা। যাতে তারা নিজেদের ঘরের ভাষাকে নিজেরাই ‘লজ্জাজনক’ মনে করতে শুরু করে (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১১২)। কলকাতার উচ্চবর্ণের পণ্ডিতেরা যে নতুন অভিধান ও ব্যাকরণ গ্রন্থগুলো সংকলন করেছিলেন, সেখানে সুপরিকল্পিতভাবে মেহনতি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের শত শত আরবি, ফারসি ও দেশজ মিশ্রিত শব্দকে ‘মুসলমানি বাংলা’ বা ‘অপভাষা’ বলে প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হয় (আহমদ, ডক্টর ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, পৃষ্ঠা ৪২)। এই আভিধানিক আপার্থাইডের কারণে গ্রামীণ মানুষের মুখের স্বাভাবিক জবান রাতারাতি দাপ্তরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে এক অলঙ্ঘনীয় অস্পৃশ্যতার পাঁচিলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে (মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ৩০)। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই ভাষিক পাঁচিল কীভাবে মেহনতি মানুষের কাজের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বাধিকারকে হরণ করেছিল? যার উত্তর লুকিয়ে আছে উনিশ শতকের জমিদারি শাসন ও কাছারিগুলোর ভাষার রাজনীতির ভেতরে।

    উচ্চবর্ণের জমিদারেরা এবং তাদের নিয়োগকৃত আমলারা কাছারির সমস্ত নথিপত্র, হিসাব এবং আইনি দলিলে এক কৃত্রিম, গণবিচ্ছিন্ন ও সংস্কৃতঘেঁষা ‘ভদ্রলোকি’ ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিলেন। যার ফলে সাধারণ নিরক্ষর বা প্রাকৃত শিক্ষার অধিকারী প্রজারা নিজেদের জমির অধিকার সংক্রান্ত দলিলগুলো পর্যন্ত নিজেরা পড়তে পারতেন না (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১১৩)। গ্রামীণ মুসলমানেরা যখন নিজেদের প্রাত্যহিক স্বাচ্ছন্দ্যে কাছারির বাবুদের সামনে ‘পানি’ বা ‘গোসল’-এর মতো স্বাভাবিক শব্দ উচ্চারণ করতেন, তখন তাদের ‘তুচ্ছতাচ্ছিল্য’ ও ‘তুই-তোকারির’ মুখোমুখি হতে হতো। যা তাদের সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানকে বুটের তলায় পিষে ফেলার এক চতুর সামন্ততান্ত্রিক মেকানিক্স ছিল (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১১৪)। এই শব্দগত বৈষম্য এ দেশের আমজনতার মনে এক স্থায়ী অস্তিত্ববাদী পরিচয় সংকট তৈরি করেছিল। কারণ তাদের নিজেদের মুখের জবানকে তাদের নিজেদেরই দেশে ‘অনগ্রসরতা’র প্রধান স্মারক বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১০২)। কিন্তু মেহনতি মানুষের ভেতরের এই অবদমিত ক্ষোভের বারুদ কোনো কৃত্রিম আভিধানিক পাঁচিল দিয়ে চিরকাল আটকে রাখা যায়নি।

    দোভাষী বাংলা, পুথি সাহিত্য ও মুসলিম লেখকদের ভাষিক প্রতিরোধ

    কলকাতার বাবুদের এই ভাষিক সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে বাংলার গ্রামীণ সমাজ-মানস নিজেদের আত্মপরিচয় ও ভাষার স্বাধিকার রক্ষা করার জন্য ‘দোভাষী বাংলা’ বা পুথি সাহিত্যের মাধ্যমে এক অবিনশ্বর প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল গড়ে তোলে (রহিম, ডক্টর এম. এ. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৫৫)। সাধারণ মানুষেরা বাবুদের তৈরি করা সেই সংস্কৃতায়নের কৃত্রিম খাঁচাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ঘরের জবানকে গ্রামীণ পুথি, লৌকিক কিচ্ছা এবং জিকির ও বয়াতের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। যা প্রমাণ করে, ব্যবহারকারীই ভাষার প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করে, কোনো উৎপাদনবিমুখী শোষক শ্রেণীর কালচারাল জাজমেন্ট মেহনতি মানুষের মুখের জবানকে হরণ করতে পারে না।

    উনিশ শতকের এই ভাষিক আপার্থাইড ও বাবুদের অতি-সংস্কৃতায়িত 'ভদ্র' ভাষার দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে বাঙালি মুসলমান লেখক, সাংবাদিক ও পুথিকারেরা এক বিশাল ও অখণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। বাবুদের আভিজাত্যের সমান্তরালে সাধারণ মেহনতি মানুষের মুখের জবানকে সাহিত্যের মূল ধারায় টিকিয়ে রাখতে যে সমস্ত মুসলিম সাহিত্যিক লড়াই করেছেন, তাঁদের নাম ও সুনির্দিষ্ট অবদান নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।

    মুন্সী শাহ গরীবুল্লাহ (১৬৮০–১৭৭০) ও সৈয়দ হামজা (১৭৫৫–১৮১৫) (দোভাষী পুঁথির জোয়ার)। উনিশ শতকে যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার ঐতিহ্যকে অভিধানে 'ইতর' বা 'ভলগার' (Vulgar) বলে দাগিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন মুন্সী শাহ গরীবুল্লাহর প্রবর্তিত এবং সৈয়দ হামজার বিকশিত 'দোভাষী পুঁথি সাহিত্য' উনিশ শতকের বটতলার ছাপাখানার মাধ্যমে মেহনতি মানুষের মুখের আসল মিশ্র ভাষার ঐতিহ্যকে সগৌরবে টিকিয়ে রাখে। বাংলার সাধারণ চাষী, কামার ও জেলেরা শত বছরের বিবর্তনে গড়ে ওঠা যে আরবি-ফারসি-দেশি মিশ্রিত জবান ব্যবহার করত, এই পুথিকারেরা ঠিক সেই ভাষা দিয়েই হাজার হাজার পৃষ্ঠার জনপ্রিয় সাহিত্য রচনা করেছিলেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও কলকাতার বাবুদের চাপিয়ে দেওয়া ভাষিক আভিজাত্য বা আপার্থাইডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৎকালীন লোকায়ত গ্রামীণ ও প্রান্তিক বাঙালি সমাজের প্রধানতম পাঠ্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয় হয়ে উঠেছিল এই দোভাষী পুঁথিগুলো।

    খোন্দকার শামসুদ্দীন মোহাম্মদ সিদ্দিকী (১৮০৮-১৮৭০)। তাঁর রচিত ‘উচিত শ্রবণ’ (১৮৬০) গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম রচিত গদ্য-সংবলিত গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি বাবুদের চাপিয়ে দেওয়া অতি-তৎসম শব্দের চটকদার কৃত্রিম রূপ সম্পূর্ণ অনুকরণ না করে, তৎকালীন প্রচলিত সাধু গদ্যের ভেতরেই মুসলমানদের ধর্মীয়, পারমার্থিক ও প্রাত্যহিক জীবনের শব্দাবলিকে অক্ষুণ্ণ রাখেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা যে ভাষাকে মেহনতি ও সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন, মুসলিম লেখকদের এই নিজস্ব শব্দ ও ভাবপ্রকাশের চেষ্টা ছিল বাবুদের সেই ভাষিক আধিপত্যের দুর্গে প্রথম মনস্তাত্ত্বিক আঘাতগুলোর একটি। পরবর্তীতে এই প্রতিরোধ আরও স্পষ্ট রূপ পায় মীর মশাররফ হোসেনের ‘রত্নবতী’ (১৮৬৯) প্রকাশের মাধ্যমে।

    মীর মোশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)। মুসলিম সাহিত্যিকদের এই ভাষিক দেয়াল ভাঙার লড়াই পরবর্তীতে চূড়ান্ত ও সবচেয়ে প্রভাবশালী রূপ পায় মীর মশাররফ হোসেনের হাতে। যাঁর সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ১৮৬৯ সালে ‘রত্নবতী’ উপন্যাসের মাধ্যমে। তিনি প্রচলিত সাধু রীতির চমৎকার চর্চা করলেও, উনিশ শতকের শেষভাগে এসে বাবুদের গড়ে তোলা কৃত্রিম ভাষার দুর্গটিকে চূর্ণ করতে তাঁর বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক গ্রন্থ ‘গাজী মিঞার বস্তানী’ (১৮৯৯)-তে সংলাপ ও কথোপকথনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চলিত ও লোকায়ত ভাষার সার্থক আশ্রয় নেন। তৎকালীন সমাজ, জমিদার শ্রেণী ও বাবুদের ভণ্ডামিকে নগ্ন করতে তিনি যে ধারালো ও কথ্য বাচনভঙ্গি ব্যবহার করেছেন, তা ছিল বাবুদের আভিজাত্যের ভাষারীতির ওপর এক তীব্র শৈল্পিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, লোকায়ত ও প্রাত্যহিক মুখের ভাষা প্রাতিষ্ঠানিক কৃত্রিম ভাষার চেয়ে প্রকাশক্ষমতায় বহুগুণ শক্তিশালী।

    মৌলভী মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন ও ‘আখবারে এসলামীয়া। উনিশ শতকের শেষভাগে টাঙ্গাইলের করটিয়া থেকে প্রকাশিত ‘আখবারে এসলামীয়া’ (১৮৮৪) পত্রিকা এবং এর সম্পাদক মৌলভী মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন (১৮৩২-১৯০৭) ছিলেন বাঙালি মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এক সোচ্চার কণ্ঠ। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের ‘মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র’ গ্রন্থে এই সাময়িকীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। তৎকালীন কলকাতার বাবুদের গড়ে তোলা চরম সংস্কৃতপ্রধান গদ্যের বিপরীতে মৌলভী নঈমুদ্দীন তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে এমন এক প্রাঞ্জল অথচ মুসলিম ঐতিহ্যবাহী গদ্যরীতির বিকাশ ঘটান, যা মুসলিম সমাজের প্রাত্যহিক ধর্মীয় ও সামাজিক শব্দাবলিকে ধারণ করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্রীয় বা ফোর্ট উইলিয়ামের চাপিয়ে দেওয়া ভাষিক কাঠামোর সমান্তরালে, মুসলমানদের নিজস্ব মনন, শরিয়ত এবং ধর্মীয় ভাবধারা প্রকাশের জন্য যে একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র বাংলা গদ্যের প্রয়োজন রয়েছে—‘আখবারে এসলামীয়া’ ছিল সেই ভাষিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

    মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ও 'আতরাফ' ভাষার বৈপ্লবিক পুনরুত্থান। উনিশ শতকের শেষভাগে এসে ঔপনিবেশিক ও মিশনারি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রান্তিক লোকজ ভাষা দিয়ে সবচেয়ে ধারালো জবাবটি দিয়েছিলেন মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭)। পেশায় একজন সাধারণ দর্জি হয়েও তিনি গ্রামীণ নিম্নবর্গের ('আতরাফ' মুসলিম সমাজ) মনস্তত্ত্ব গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। কলকাতার বাবুদের তৈরি অতি-সংস্কৃতায়িত কৃত্রিম ভাষা এবং খ্রিস্টান পাদ্রিদের ইংরেজিঘেঁষা প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার বিপরীতে তিনি বাংলার সাধারণ মানুষের মুখের তদ্ভব ও আরবি-ফারসি মিশ্রিত 'মুসলমানী বাংলা' বা দোভাষী ধারাটিকে বেছে নেন।

    আধুনিক গবেষকদের মতে, মেহেরুল্লাহ অনুধাবন করেছিলেন, এই ধর্মীয় ও ভাষিক বিতর্কগুলো মূলত ঔপনিবেশিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের হাতিয়ার। এর প্রতিবাদে তাঁর রচিত ‘মেহেরুল এছলাম’ (১৮৯৫) এবং সামাজিক কুসংস্কার-বিরোধী ‘বিধবাগঞ্জনা ও বিষাদভাণ্ডার’ (১৮৯৪) প্রভৃতি পুস্তিকাগুলো সাধারণ মানুষের চেনা লোকায়ত বাচনভঙ্গি এবং জনপ্রিয় 'বাহাস' (ধর্মীয় বিতর্ক) উপায়ে রচিত হয়েছিল। যা গ্রামীণ হাটে-বাজারে লক্ষ লক্ষ মানুষের একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক খোরাকে পরিণত হয়। কলকাতার বাবুদের ড্রয়িংরুমের ভাষা যখন সাধারণ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, তখন মেহেরুল্লাহ প্রমাণ করেছিলেন, প্রান্তিক মানুষের এই লৌকিক জবানই সাধারণ মানুষের আত্মপরিচয় রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

    শেখ জমিরুদ্দীন (১৮৭০–১৯৩৭)। মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর সুযোগ্য শিষ্য ও অন্যতম প্রধান সহযোগী শেখ জমিরুদ্দীন ছিলেন এই প্রচারমুখী ও লোকমুখী ভাষিক ধারার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। খ্রিস্টান মিশনারিদের সুপরিকল্পিত প্রচারণার বিপরীতে সাধারণ মানুষের মন জয় করতে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ও গুরুগম্ভীর গদ্যের বদলে এক লৌকিক ও কথ্য রূপের জোরালো শক্তিকে ব্যবহার করেন। মেহেরুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি ও আদর্শকে ধরে রাখতে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ ‘মেহের চরিত’ (১৯০৯)।

    কলকাতার পণ্ডিত ও বাবুদের অতি-সংস্কৃতায়িত ভাষাকে এড়িয়ে তিনি বাংলার সাধারণ মানুষের মুখের সহজ, সাবলীল ও প্রাত্যহিক ধর্মীয় শব্দমিশ্রিত বাচনভঙ্গিকে যুক্তি-বিতর্ক ও প্রচারপত্রের প্রধান বাহন করে তোলেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের তৈরি করা কৃত্রিম ভাষিক দেয়াল যখন সাধারণ মানুষকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে রাখছিল, তখন শেখ জমিরুদ্দীনের এই জনমুখী ও সাবলীল ভাষা গ্রামীণ প্রান্তিক বাঙালি মুসলিমদের আত্মপরিচয় রক্ষা ও খ্রিস্টান মিশনারি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক অভেদ্য মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

    উনিশ শতকে খোন্দকার শামসুদ্দীন মোহাম্মদ সিদ্দিকী কিংবা মীর মশাররফ হোসেনরা বাবুদের সংস্কৃতায়িত গদ্যের বিরুদ্ধে যে প্রচ্ছন্ন ভাষিক লড়াই শুরু করেছিলেন, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এসে তা প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় রূপ পায় মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮)-এর হাত ধরে। তিনি তাঁর সম্পাদিত ‘দৈনিক আজাদ’ ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকার মাধ্যমে কলকাতার বাবু ও এলিট শ্রেণীর চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম ভাষারীতিকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে এক নতুন ও আধুনিক মুসলিম গদ্যরীতির বিকাশ ঘটান। তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘মোস্তফা চরিত’ (১৯৩৮)-এর সাবলীল ভাষা প্রমাণ করেছিল, সাধারণ মানুষের পরিচিত শব্দাবলি ও ভাবপ্রকাশের মাধ্যমেই বাংলা গদ্যের সর্বোচ্চ শৈল্পিক রূপ দেওয়া সম্ভব। মওলানা আকরম খাঁ কেবল ভাষিক আভিজাত্যের দেয়ালই ভাঙেননি, বরং বাংলা ভাষাকে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও রেনেসাঁসের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। ১৯১৮ সালের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, "দুনিয়ায় অনেক রকম অদ্ভুত ঘটনা ঘটিয়া থাকে, কিন্তু মাতৃভাষার অধিকার লইয়া নিজের দেশের লোকের সহিত লড়াই করার মতো অদ্ভুত কাণ্ড বোধহয় আর কোথাও ঘটে নাই।"

    কওমি উলামা ও সুফি-সাধকেরা এ দেশের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় নৈতিকতা ও আত্মিক মূল্যবোধকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাত্যহিক ‘আব্বা, আম্মা, পানি’ শব্দগুলোর ভেতরের লৌকিক ঐতিহ্যকে এক প্রবল ডিকলোনিয়াল প্রতিরোধে রূপান্তরিত করেছিলেন। যা আর্য ও ব্রিটিশদের চাপানো মানসিক উপনিবেশের মুখে এক মস্ত বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চড় ছিল। এই ভাষিক অস্পৃশ্যতা ও আভিধানিক আপার্থাইডের গভীর ময়নাতদন্ত না করা পর্যন্ত, আধুনিক যুগের দৈনন্দিন জীবনের শব্দগত বর্ণবাদকে কোনোদিনও চিনতে পারব না। একই মাটির সন্তান হওয়া সত্ত্বেও শব্দের শুচিতা ও উচ্চারণকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক পাঁচিল উনিশ শতকে বাবুদের পক্ষ থেকে খাড়া করা হয়েছিল, তা দ্বিজাতি তত্ত্বের ঐতিহাসিক পটভূমিকে সামাজিক স্তরে চূড়ান্তভাবে বেগবান করেছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৫৮)। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে নির্মিত বয়ান ও কলকাতার বাবু সংস্কৃতির খাঁড়া করা কৃত্রিম পাঁচিলের নীচে চাপা দেওয়া হচ্ছিলো আমাদের মুখের প্রাত্যহিক ভাষাকে। নব্য তৈরি সংস্কৃতায়নের খাঁচায় বন্দী করে প্রতিনিয়ত দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিলো এ অঞ্চলের মা, মাটি ও মানুষের ভাষা। কলকাতার বাবু সংস্কৃতির বয়ানের আড়ালে কেড়ে নেওয়া হচ্ছিলো আমাদের মুখের ভাষা। যার বিপরীতে বিংশ শতকের শুরু ও মধ্যভাগে বিপুল জাগরণ ঘটে এ অঞ্চলের ভূমিপুত্রদের মনস্তত্ত্বে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের তাগিদে। নিজের মাটির সহজ জবানকে রক্ষা করার এই যে কালজয়ী সংগ্রাম, তা কোনো সাময়িক বা কাল্পনিক রূপান্তর ছিল না। তা ছিল এ দেশের সর্বস্তরের ভূমিপুত্রদের নিজেদের রক্ত, ঘাম, শ্রম এবং চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির এক অবিনশ্বর প্রামাণ্য ইশতেহার। যা কলোনিয়াল ও সামন্ততান্ত্রিক লোহার পর্দাকে সগর্বে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল।

    আধুনিক বাংলাদেশের প্রমিত বাংলা ভাষা বনাম আঞ্চলিক ভাষার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব

    উনিশ শতকে কলকাতার নব্য-উত্থিত বাবু সমাজ ও ঔপনিবেশিক প্রাতিষ্ঠানিকতার হাত ধরে মেহনতি মানুষের মুখের জবানকে ‘ইতর পাঠ’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার যে ভাষিক আপার্থাইড শুরু হয়েছিল, তার মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার উত্তর-উপনিবেশবাদী আধুনিক বাংলাদেশেও প্রমিত বাংলা বনাম আঞ্চলিক ভাষার দ্বন্দ্বে অত্যন্ত প্রকটভাবে জারি রয়েছে। সমকালীন বাংলাদেশে প্রমিত বা শুদ্ধ ভাষাকে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা, আভিজাত্য, উচ্চশিক্ষা এবং করপোরেট সংস্কৃতির একচেটিয়া সিলমোহর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যা উনিশ শতকের বাবুদের ‘ভদ্র’ ভাষার আধুনিক সংস্করণ।

    এর ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের (যেমন—নোয়াখালী, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, কিংবা উত্তরবঙ্গ) মানুষের প্রাত্যহিক আঞ্চলিক জবানকে মূলধারার গণমাধ্যম, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয় এবং করপোরেট কর্মক্ষেত্রে এক ধরণের অলিখিত ‘অনগ্রসরতা’ বা ‘সংস্কৃতিহীনতা’র তকমা দিয়ে প্রান্তিক করে রাখা হয়। এই ভাষিক আধিপত্যের ফলে আঞ্চলিক ভাষাভাষী মানুষের অবচেতন মনে এক গভীর হীনম্মন্যতা ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যেখানে তারা নিজেদের শেকড়ের ভাষাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে বাধ্য হন এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার তাগিদে এক ধরণের কৃত্রিম প্রমিত ভাষা রপ্ত করার মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভোগেন। উনিশ শতকের মুদ্রণযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের মতোই আধুনিক যুগের টেলিভিশন নাটক, সিনেমা এবং কর্পোরেট বিজ্ঞাপনে আঞ্চলিক ভাষাকে প্রায়শই কেবল ‘কৌতুক’ কিংবা ‘অশিক্ষিত চরিত্রের’ জবান হিসেবে উপস্থাপন করে, সেই ভাষিক বর্ণবাদকেই সমাজে পুনরুৎপাদন করা হচ্ছে। যা মেহনতি ও সাধারণ মানুষের ভাষিক সত্তাকে প্রতিনিয়ত খণ্ডিত ও প্রান্তিক করে তোলে।

    উনিশ শতকের বাবু অভিধান, সংস্কৃতায়নের ছাঁকনি এবং কাছারির ভাষার রাজনীতি মিলে সুবে বাংলার মেহনতি মানুষের মুখের জবানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘ইতর পাঠ’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার যে ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তা কেবল অভিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং রক্তমাংসের সামাজিক বিভাজন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশের এক দুর্ভেদ্য পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেই পাঁচিল কখনোই অলঙ্ঘনীয় হয়ে ওঠেনি। বাংলার গ্রামীণ সমাজ-মানস দোভাষী বাংলা, পুথি সাহিত্য, জিকির-বয়াত, বাহাস এবং লৌকিক ছাপাখানার মাধ্যমে নিজেদের ভাষিক অস্তিত্বকে প্রবলভাবে টিকিয়ে রেখেছিল। মুন্সী শাহ গরীবুল্লাহ থেকে মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ পর্যন্ত এক দীর্ঘ প্রতিরোধ-পরম্পরা প্রমাণ করে দিয়েছিল, ভাষার প্রকৃত মালিকানা ব্যবহারকারীর হাতেই থাকে। কোনো উৎপাদনবিমুখী শোষক শ্রেণীর কালচারাল জাজমেন্ট কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিলমোহর মেহনতি মানুষের মুখের জবানকে চিরতরে হরণ করতে পারে না।

    এই ভাষিক অস্পৃশ্যতা ও আভিধানিক আপার্থাইডের গভীর ময়নাতদন্ত আমাদের সামনে তুলে ধরে যে, শব্দের শুচিতা ও উচ্চারণকে কেন্দ্র করে যে মনস্তাত্ত্বিক পাঁচিল উনিশ শতকে বাবুদের পক্ষ থেকে খাড়া করা হয়েছিল, তার ছায়া আজও আধুনিক বাংলাদেশের প্রমিত বনাম আঞ্চলিক ভাষার দ্বন্দ্বে, করপোরেট কর্মক্ষেত্রে, গণমাধ্যমে এবং শিক্ষালয়ে নানা রূপে পুনরুৎপাদিত হচ্ছে। তাই এই ইতিহাস কেবল অতীতের নয়—এটি বর্তমানেরও। নিজের মাটির সহজ জবানকে রক্ষা করার যে কালজয়ী সংগ্রাম উনিশ শতকে শুরু হয়েছিল, তা বিংশ শতকের জাগরণে এবং একুশ শতকের আঞ্চলিক ভাষা-আন্দোলনে নতুন রূপে বেঁচে আছে। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা হলো অস্তিত্বের ঘোষণা, আত্মপরিচয়ের ইশতেহার এবং মেহনতি মানুষের রক্ত, ঘাম ও শ্রমের অবিনশ্বর স্মারক।

    আধুনিক কর্পোরেট আপার্থাইড, ‘খ্যাত’ ট্যাগিংয়ের রাজনীতি এবং গণমানুষের জবানের ডিকলোনিয়াল মুক্তি

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেই সুপরিকল্পিত ভাষিক ছাঁকনি এবং উনিশ শতকের কলকাতার বাবুদের আভিধানিক আপার্থাইডের বিষাক্ত জেনোসাইড আজও আধুনিক স্বাধীন বাংলাদেশে শেষ হয়ে যায়নি। বরং তা এক নতুন বহুজাতিক অবয়বে কর্পোরেট মিডিয়া, এফএম রেডিও, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর শ্রেণীকক্ষে যেমন জেঁকে বসেছে, তেমনি দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই কাঠামোগত ভাষিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারেনি (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪৫)।

    পার্থক্য শুধু রূপ ও মাত্রায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে সরাসরি কর্পোরেট সংস্কৃতির আদলে ইংরেজিকে পণ্যায়ন করেছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেখানে উচ্চশিক্ষার মূল পাঠ্যবই, পরীক্ষা ও উচ্চতর গবেষণায় ইংরেজিকে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি করে রেখে একই ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব লালন করছে। বহুজাতিক বাজার ও কর্পোরেট সেক্টরে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শেষ পর্যন্ত একই ভাষিক ছাঁকনি ও শ্রেণী-বিভাজনের ফাঁদে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে উনিশ শতকের সেই 'বাবুরূপী' এলিট শ্রেণীর আধুনিক সংস্করণ আজ উভয় ধারার উচ্চশিক্ষালয়গুলোতেই সমানভাবে দৃশ্যমান। যা সাধারণ মানুষের ভাষিক অধিকারকে প্রতিনিয়ত প্রান্তিক করে তুলছে।

    কলোনিয়াল প্রভুরা এ দেশের মেহনতি মানুষের মুখের ভাষাকে যেভাবে ‘যাবনী’ বা ‘ইতর পাঠ’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল, আজকের নব্য-উত্থিত সেকুলার এবং কর্পোরেট এলিটরা ঠিক সেই একই জালিয়াতির মেকানিক্স খাড়া করেছে প্রাত্যহিক জীবনের জেনুইন শব্দাবলীকে কেন্দ্র করে (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১১২)। কোনো সাধারণ বা মেহনতি পরিবারের সন্তান যখন নাগরিক পরিমণ্ডলে এসে স্বাচ্ছন্দ্যে ‘পানি, আব্বা, আম্মা, গোসল, আসমান, আণ্ডা’ ইত্যাদির মতো এই মাটির শাশ্বত লোকায়ত শব্দগুলো উচ্চারণ করে, তখন তাকে আধুনিকতার ছদ্মবেশে থাকা এলিটরা সুপরিকল্পিতভাবে ‘অনগ্রসর’, ‘রুচিহীন’ কিংবা ‘খ্যাত’ ট্যাগ দিয়ে এক সর্বগ্রাসী মানসিক অবদমনের মুখে ঠেলে দেয়। এই কর্পোরেট আপার্থাইড স্রেফ কোনো ব্যক্তিগত উচ্চারণের বা আধুনিক বাচনভঙ্গির রূপান্তর নয়। এটি হলো মূলত উৎপাদনশীল সাধারণ শ্রেণীর মানুষকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকারের বাইরে রাখার এক নতুন বুর্জোয়া রাজদণ্ড (মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ৩০)।

    এই প্রাত্যহিক প্রগতিশীলতার মোড়ক দেখে প্রশ্ন জাগে, কীভাবে একটি স্বাধীন দেশের মিডিয়া ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো নিজেদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের লোকজ জবানকে এভাবে দিনদুপুরে সামাজিক অপমানের হাতিয়ার বানাতে পারে? এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের আধুনিক কর্পোরেট মিডিয়া ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের চলচ্চিত্র ও নাটকগুলোর ভেতরের শ্রেণী-শাসনের রাজনীতিতে। এই চতুর বিনোদনগুলোতে সবসময় সচেতনভাবে দাড়ি-টুপি সংবলিত গ্রামীণ চরিত্র কিংবা মেহনতি রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষের মুখেই কেবল ‘পানি’ বা ‘গোসল’-এর মতো মাটির শব্দগুলো বসানো হয়। আর তথাকথিত উচ্চবিত্ত, শহুরে মধ্যবিত্ত ও প্রগতিশীল চরিত্রগুলোর মুখে এক কৃত্রিম, গণবিচ্ছিন্ন ও বাংলিশ মিশ্রিত বুলি ফুটিয়ে তোলা হয়। এই সুক্ষ্ম মিডিয়া শেইমিংয়ের মূল লক্ষ্যই হলো, নতুন প্রজন্মের মগজে এ কথা স্থায়ীভাবে প্রোথিত করা যে, নিজের মায়ের মুখের আদিম জবানকে আঁকড়ে ধরা মানেই হলো আধুনিকতার পরিমণ্ডল থেকে ছিটকে পড়া এবং এক ধরনের সামাজিক হীনম্মন্যতা ও লজ্জাবোধের খাঁচায় বন্দি হওয়া।

    যে তরুণ সমাজ নিজের সংস্কৃতির মূল শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাকে খুব সহজেই বহুজাতিক কর্পোরেট ভোগবাদের দাসে পরিণত করা যায়। যা মূলত মানসিক উপনিবেশ টিকে থাকারই সবচেয়ে বড় অকাট্য প্রামাণ্য দলিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১০২)। রসনা ও পরিচ্ছদের আপার্থাইডের মতোই শব্দের এই বর্ণবাদকে চূর্ণ করার জন্য এ দেশের সর্বস্তরের মেহনতি ভূমিপুত্রদের জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধিকার ও ‘মালিকের অধিকারের তত্ত্ব’ পুনরায় সজোরে উচ্চারণ করা দরকার। সংস্কৃতির দর্শনে একটি অলঙ্ঘনীয় সত্য চিরকাল দীপ্তিমান থাকে—‘কোনো ভাষার শুদ্ধতা বা গ্রহণযোগ্যতা কোনো মন্দির, রাজদরবার কিংবা কর্পোরেট অফিসের এসি রুমের ফিল্টার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তা নির্ধারিত হয় প্রাকৃতিকভাবে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ঘাম, শ্রম ও যৌথ যাপনের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিতে’। এ দেশের সাধারণ মানুষেরা হাজার বছর ধরে নিজেদের রক্ত দিয়ে যে মুখের জবানকে টিকিয়ে রেখেছেন, তার ওপর কলকাতার বাবুদের বা আধুনিক কর্পোরেট এলিটদের চাপানো কোনো কৃত্রিম কালচারাল জাজমেন্ট চিরকাল রাজত্ব করতে পারে না।

    ডক্টর ওয়াকিল আহমদ তাঁর সমাজ-মানসের রূপান্তর ফ্রেমওয়ার্কে অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে উনিশ শতকে সুবে বাংলার সাধারণ মানুষেরা আভিধানিক উচ্ছেদ ও জমিদারি তুই-তোকারির বিরুদ্ধে নিজেদের মুখের ‘আব্বা-আম্মা’ শব্দগুলোকে এক প্রবল প্রতিরক্ষামূলক দেয়ালে রূপান্তর করেছিলেন (আহমদ, ডক্টর ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, পৃষ্ঠা ৪২)। আজকের আধুনিক বাংলাদেশেও সাধারণ মানুষের নিজেদের জবানের স্বাধিকার রক্ষা করার এই যে নীরব ও অনমনীয় প্রতিরোধ, তা কলোনিয়াল ও সামন্ততান্ত্রিক লোহার পর্দাকে সগর্বে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় (মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ৩২)।

    এই শব্দগত বর্ণবাদের উচ্ছেদ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষার ডিকলোনিয়াল মুক্তি আজ আর কোনো বিমূর্ত তাত্ত্বিক রূপকথা নয়। তা হলো, এই অববাহিকার সাধারণ মানুষের নিজেদের প্রাত্যহিক জীবন, উৎপাদনশীল শ্রম ও চূড়ান্ত মানসিক স্বাধীনতার এক অকাট্য প্রামাণ্য ইশতেহার। আমরা যতক্ষণ না পর্যন্ত এই কর্পোরেট নন্দনতত্ত্বের লুণ্ঠিত পাঁচিল ভেঙে মেহনতি মানুষের মুখের প্রতিটি সহজ জবানকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে সগর্বে অধিষ্ঠিত করতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এই ভৌগোলিক স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গ ডিকলোনিয়াল মুক্তিতে রূপান্তর লাভ করবে না (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১০৬)। সাধারণ মানুষের মুখের প্রতিটি শব্দের ভেতরের আত্মিক ও লৌকিক কৃষ্টিই হলো এই বদ্বীপের আসল ও জেনুইন বুনিয়াদ। যা সমস্ত কৃত্রিম ও চাপানো আপার্থাইডকে প্রতিনিয়ত ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে এক নতুন ভোরের স্বাধিকারকে ঘোষণা করে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment