Table of Contents
![]() |
| বাংলার পোশাক, খাদ্য ও ভাষাকে ঘিরে পরিচয়, ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর |
Previous Part.......
৫:১
পোশাকের আধিপত্য এবং লুঙ্গি-পিরহান বর্জনের রাজনীতি: অনার্যের নগ্নতা, আর্যের শুচিতা এবং পোশাকের কুলীনীকরণ
মাটির সাথে মানুষের যে আত্মিক ও জৈবিক সম্পর্ক, তা সুতো কাটার কায়দা আবিষ্কারের বহু আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এই বঙ্গীয় নদীমাতৃক অববাহিকার আদিম অনার্য গোষ্ঠীগুলোর জীবনযাপন ছিল জলবায়ুর আর্দ্রতা এবং প্রকৃতির উন্মুক্ত প্রসারের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। প্রাক-আর্য যুগের কোল, ভিল, সাঁওতাল, মুণ্ডা বা আদি দ্রাবিড় জনসংখ্যার পোশাক-ভাবনার ভেতর আজকের আধুনিক যুগের সেলাই করা কাপড়ের কোনো জাঁকজমক ছিল না। ছিল না কোনো কৃত্রিম সামাজিক দেওয়াল। তারা শরীরকে ঢাকত প্রকৃতির উপাদান দিয়ে। যেখানে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া এবং কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের স্বাচ্ছন্দ্যই ছিল একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। পুরুষেরা কোমরে এক টুকরো ছোট কাপড় জড়াত। যা কালক্রমে ল্যাঙ্গট বা কৌপিন নামে পরিচিতি পায়। আর নারীরা বুক থেকে হাঁটু কিংবা কেবল কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত একখণ্ড মোটা কাপড় জড়িয়ে রাখত। যাকে দেশজ লোকায়ত ভাষায় থামি বা তুঁত বলা হতো। বয়ন শিল্প বা সুতা কাটার প্রযুক্তি যখন আরও কিছুটা বিস্তৃত হলো, তখন সিন্ধু সভ্যতার ধারা বেয়ে তুলা চাষ এবং সুতা কাটার আদি রূপান্তর এই উপদ্বীপে ডালপালা মেলতে শুরু করে। তবে সেই আদি সুতি বা ক্ষৌম বস্ত্র আজকের মতো মসৃণ বা মিহি ছিল না। তা ছিল বেশ মোটা ও খসখসে। যা চাষাবাদের মাঠ কিংবা কাদা-মাটির কঠোর শ্রমের সাথে মানানসই ছিল।
সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সত্য হলো, অনার্যদের সমাজে পোশাকের চেয়ে শরীর সাজানো বা অলঙ্করণের কদর ছিল অনেক বেশি। তারা বন্য ফুল, ফলের মালা, শামুক-ঝিনুকের খোলস, কড়ি এবং পশুর হাড় ও দাঁত দিয়ে তৈরি গহনা পরত। এই লোকায়ত জনগোষ্ঠীর কাছে নিজের চামড়ার উপর ফুটিয়ে তোলা উল্কি বা ট্যাটুর পবিত্রতা ছিল কাপড়ের চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী ও নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতীক। শরীরে পোশাকের কৃত্রিম আধিক্য না রেখে যতটা সম্ভব হালকা থাকাটাই ছিল তাদের অবদমনহীন সংস্কৃতির আসল রূপ। এই আদিম প্রাকৃত জলবায়ুর সমতাবাদী খোলসটি প্রথম সজোরে ভেঙে পড়ে যখন এই ভূখণ্ডে আর্যদের বহিরাগমন ঘটে। আর্যরা কেবল এই অঞ্চলে নতুন কোনো ধর্মীয় বিধি নিয়ে আসেনি, তারা সাথে করে নিয়ে এসেছিল সূচিশিল্প, বয়ন শিল্পের আভিজাত্য এবং পোশাকের মাধ্যমে সামাজিক ক্ষমতার বিভাজন রেখা।
অনার্যদের কাছে পোশাক যেখানে ছিল শরীর ঢাকা ও আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক মাধ্যম, আর্যদের হাতে তা রাতারাতি রূপান্তরিত হলো সামাজিক মর্যাদা, কুলীন প্রথা ও উচ্চবর্ণের ক্ষমতার প্রতীকে। আর্য সংস্কৃতির হাত ধরে নীবী, বাসস এবং অধিবাসসের মতো ত্রিমাত্রিক পোশাকের ধারণা এই সমাজে চেপে বসে। কোমর থেকে নিচের অংশে জড়ানো ধুতি বা শাড়ির আদি রূপের নাম হলো নীবী। শরীরের ওপরের অংশে জড়ানো প্রধান কাপড়ের নাম হলো বাসস, আর কাঁধের ওপর দিয়ে চাদর বা ওড়নার মতো ঝুলিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত উত্তরীয় বা বস্ত্রখণ্ডের নাম হলো অধিবাসস।
এই পোশাকের আভিজাত্য রাতারাতি সমাজকে চার বর্ণে ভাগ করার ব্রাহ্মণ্যবাদী মারণাস্ত্রের সাথে যুক্ত হয়ে গেল। উচ্চবর্ণের আর্য এবং পরবর্তীকালে সেন রাজবংশের কুলীন শাসকেরা মিহি সুতা, সিল্ক, রেশম এবং সোনা-রুপার সুতার কাজ করা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকের মাধ্যমে নিজেদের সাধারণ অন্ত্যজদের চেয়ে আলাদা ও ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে জাহির করতে শুরু করে। ক্ষমতার এমন নান্দনিকতা সবচেয়ে নগ্নভাবে আঘাত করেছিল অনার্য ও নিম্নবর্ণের অন্ত্যজ নারীদের স্বাধীন যাপনের ওপর। গুপ্ত ও পাল রাজবংশের আমল থেকে শুরু করে সেন আমল পর্যন্ত উচ্চবর্ণের অভিজাত নারীরা স্তন্যপট্ট বা বুক ঢাকার জন্য এক ধরনের চওড়া কাপড়ের ফালি ব্যবহার করত। যা পরবর্তীতে পাল ও সেন আমলে আরও আঁটসাঁট ‘কাঁচুলি’ বা আধুনিক ব্লাউজের আদি রূপে রূপান্তর লাভ করে। কিন্তু এই পোশাক পরিধানের অধিকার কেবল রাজদরবার এবং উচ্চবর্ণের নারীদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। সাধারণ মেহনতি কৃষক, জেলে বা তাঁতি পরিবারের নিম্নবর্ণের নারীদের ওপর কঠোর শাস্ত্রীয় আইন জারি ছিল। তারা শরীরের ঊর্ধ্বাংশ কোনোভাবেই আবৃত করতে পারবে না। তাদের বুক উন্মুক্ত রাখতে বাধ্য করা হতো। যাতে দূর থেকে দেখেই চেনা যায় কে এই সমাজের অধিপতি আর কে অস্পৃশ্য সেবক।
পোশাকের এই কুলীনীকরণ বা পদ্ধতিগত বর্ণবাদ এমন এক সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের পোশাকের স্বাভাবিক স্বল্পতাকে তাদের ‘অসভ্যতা’ বা ‘সংস্কৃতিহীনতার’ তকমা দিয়ে অবদমিত রাখা হতো। মেহনতি মানুষের পোশাক হয়ে উঠেছিল তার দাসত্বের চাক্ষুষ দলিল, আর উচ্চবর্ণের উত্তরীয় হয়ে উঠেছিল শোষণের প্রতীক। এই পোশাকের বিভাজনটি কেবল কাপড়ের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করত না, বরং তা মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর হীনম্মন্যতার জন্ম দিত। যা মেহনতি জনগোষ্ঠীকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে রাখত। মুসা আল হাফিজ তাঁর ‘মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি’ গ্রন্থে বুদ্ধিবৃত্তিক অবদমনের যে নিখুঁত ময়নাতদন্ত করেছেন, তার মূল সূত্র ধরেই বলা যায়—কোনো অঞ্চলের মানুষকে দাসে পরিণত করার প্রথম এবং প্রধান ধাপটি হলো তার নিজস্ব মাটির প্রাত্যহিক অভ্যাস, রুচি ও দেহাবরণকে হীন প্রমাণ করা (হাফিজ, মুসা আল। মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি, পৃষ্ঠা ৯)।
আর্যরা এ দেশের আদিম অধিবাসীদের পোশাককে 'সংস্কৃতিহীন' এবং তাদের মুক্ত শরীরকে 'অপবিত্র' বলে যে ধর্মীয় ও নান্দনিক বয়ান খাড়া করেছিল, তা আসলে এক গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ফাহমিদ-উর-রহমান তাঁর ‘মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান’ গ্রন্থে স্পষ্ট দেখিয়েছেন কীভাবে উচ্চবর্ণের হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং কলকাতার পরবর্তী বাবু সমাজ এই আর্য আমলের বৈষম্যমূলক নান্দনিক কাঠামোকেই নিজেদের স্বার্থে বারবার পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছে এবং সংস্কৃতির মোড়কে একপেশে ক্ষমতার রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছে (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ২৪-২৬)। আদি অনার্যরা কাপড়ের কৃত্রিম আধিক্যের চেয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকাকেই স্বাচ্ছন্দ্য মনে করত (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), পৃষ্ঠা ৪২)। কিন্তু আর্য শাসন এসে সেই সরল স্বাচ্ছন্দ্যকে 'নীচ' বলে দাগিয়ে দেয়। এই নৃতাত্ত্বিক রূপান্তরের যে ঐতিহাসিক বিবরণ, তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট ধরা পড়ে, বাংলার আদিম কওম সমাজ আর্যদের এই কৃত্রিম ও বর্ণবাদী পোশাকের জাঁকজমককে মনে-প্রাণে কখনোই মেনে নিতে পারেনি (রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), পৃষ্ঠা ৪৪)। কারণ এই ভূখণ্ডের আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে জলবায়ুতে আর্যদের চাপানো ভারী উত্তরীয় বা অবরুদ্ধ কাঁচুলি ছিল মেহনতি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কঠোর শ্রমের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলত, আর্য ও সেন রাজাদের তরবারির ভয়ে প্রাকৃত সমাজ বাহ্যিকভাবে মাথানত করলেও, ঘরের ভেতরে তাদের লোকায়ত প্রাত্যহিক রুচি ও হালকা পোশাকের আদিম স্বাধীনতাকে তারা সুপ্তভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
পোশাকের এই আদিম দ্বন্দ্ব এবং উচ্চবর্ণের কৃত্রিম নান্দনিকতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবদমিত ক্ষোভই পরবর্তীতে বাংলায় এক বিশাল সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। মাটির কাছাকাছি থাকা এই বিশাল অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী যখন মধ্যযুগের প্রারম্ভে দলে দলে সুফি-সাধকদের হাত ধরে ইসলামের সমতাবাদী স্রোতে শামিল হতে শুরু করল, তখন তাদের এই রূপান্তরটি কেবল বিশ্বাসের জগতেই সীমাবদ্ধ রইল না, তা দৃশ্যমান হয়ে উঠল তাদের প্রাত্যহিক পোশাকে ও যাপনে। ইসলামের তাওহিদভিত্তিক বিশ্বজনীন দর্শনের প্রথম সামাজিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল মানুষের শরীর ঢাকার আদিম মানবিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। যা আর্য-সেন কাঠামো শত শত বছর ধরে কেড়ে নিয়েছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১০)। নিম্নবর্ণের মানুষ, যাদের এতদিন রাজপথে বুক খুলে আভিজাত্যের সামনে সিজদা করতে বাধ্য করা হতো, তারা ইসলামের চাদরের নিচে নিজেদের শরীরকে সম্পূর্ণ আবৃত করার আইনি ও ধর্মীয় স্বাধিকার লাভ করল। ফাহমিদ-উর-রহমান যেভাবে সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারণাগত পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন, ঠিক সেই আলোকেই দেখা যায়, নতুন বিশ্বাস গ্রহণের পর এ দেশের মানুষ নিজেদের রুচি ও আত্মাকে পবিত্র করার এক নতুন নান্দনিক ঢাল খুঁজে পেয়েছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১০-১১)। কিন্তু এখানে একটি মস্ত বড় মনস্তাত্ত্বিক গ্যাপ সেক্যুলার ইতিহাসবিদেরা সবসময় এড়িয়ে যান। তারা মনে করেন, এই ধর্মান্তরের ফলে আরবের মরুভূমির ঢিলেঢালা জিলবাব, আলখেল্লা বা বোরকা বুঝি রাতারাতি বাংলার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার ওপর জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ধারণাটি কেবল ঐতিহাসিক জালিয়তিই নয়, বরং এই মাটির মানুষের নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি বা এজেন্সিকে অস্বীকার করার শামিল।
এ দেশের মানুষ বহিরাগত উপাদানকে অন্ধভাবে অনুকরণ করেনি, বরং নিজেদের জলবায়ু এবং আরাম অনুযায়ী তাকে দেশীয়করণ বা আত্মীকরণ করে নিয়েছিল। বাংলার এই নতুন মুসলমানেরা আরবের মরুভূমির পোশাক হুবহু গ্রহণ করেনি। কারণ তা বাংলার কাদামাটি, নদী আর আর্দ্র আবহাওয়ার সম্পূর্ণ অনুপযোগী ছিল। তারা অনার্যদের আদিম লঙ্গট বা ছোট ধুতির দেশজ রূপকে ইসলামের শালীনতার কাঠামোর সাথে মিলিয়ে তৈরি করল ‘লুঙ্গি’। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা এই সেলাইহীন আরামদায়ক কাপড়টি বাংলার গরমের জন্য ছিল সবচেয়ে উপযোগী। যা মাঠে চাষাবাদ করা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা হাটে যাওয়ার জন্য পুরুষদের এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা এনে দেয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১)। ডক্টর এম. এ. রহিমের ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থের উপাত্ত ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাক-কলোনিয়াল যুগে পোশাকের এই রূপান্তরটি সমাজে এক অভূতপূর্ব সাম্য এনে দিয়েছিল। যা পূর্বে কল্পনাই করা যেত না (রহিম, ডক্টর এম. এ. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৭৭)। পারস্য বা মধ্য এশীয় কুর্তার কাটিং থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার নিজস্ব মসলিন, জামদানি, খাদি ও সুতি কাপড়ের ছোঁয়া দিয়ে এ দেশের কারিগর ও জোলা-তাঁতিরা তৈরি করল পাজামা ও পাঞ্জাবি। এটি কোনো বিদেশী পোশাক ছিল না, এটি ছিল এ দেশের মানুষের ঘাম আর শ্রমের নির্যাস থেকে তৈরি খাঁটি সুতি পোশাক।
সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে জোলা-তাঁতি—সবাই একই ধরনের সুতি পাঞ্জাবি পরা শুরু করায় আর্য আমলের পোশাকভিত্তিক জাত-প্রথা ও বর্ণ বৈষম্য ধূলিসাৎ হয়ে গেল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪২)। এই পাঞ্জাবির হাত ধরেই জন্ম নিয়েছিল সম্পূর্ণ খাঁটি বাঙালি পোশাক ‘ফতুয়া’। যা গরমের দিনে পাঞ্জাবির হাতা কেটে এবং দৈর্ঘ্য ছোট করে এ দেশের শ্রমজীবী মানুষেরা নিজেদের আরামের জন্য তৈরি করে নিয়েছিল।
সিনক্রিটিজমের তাঁত: সুলতানি ও মুঘল আমলে পোশাকের দেশীকরণ ও রূপান্তর (The Syncretic Loom)
প্রাক-কলোনিয়াল বাংলায় ইসলাম ধর্ম যখন এ দেশের আদি অনার্য ও লোকায়ত সংস্কৃতির গভীর স্পর্শে আসে, তখন তা কোনো জবরদস্তিমূলক বা যান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্ম দেয়নি। বরং তা জন্ম দিয়েছিল এক জীবন্ত ‘সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ’ ও ‘দেশীকরণ’ প্রক্রিয়ার। আর্য এবং সেন রাজবংশের আমলে পোশাক যেখানে ছিল জাত-প্রথা, অস্পৃশ্যতা এবং উচ্চবর্ণের আভিজাত্য প্রদর্শনের প্রধান কলোনিয়াল হাতিয়ার, সুলতানি আমলে এসে সেই ক্ষমতার নান্দনিকতা প্রথম ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ডক্টর এম. এ. রহিমের "বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস" এবং ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর "History of the Muslims of Bengal" গ্রন্থের ঐতিহাসিক প্রামাণ্য পৃষ্ঠাগুলো উল্টালে স্পষ্ট দেখা যায়, বাংলার সাধারণ ধর্মান্তরিত ভূমিপুত্ররা যখন ইসলামের সাম্যবাদী ভাবধারায় দীক্ষিত হলো, তখন তারা আরবের মরুভূমির জিলবাব বা ঢিলেঢালা জোব্বা এ দেশের স্যাঁতসেঁতে জলবায়ুর ওপর চাপিয়ে দেয়নি। তারা এই অববাহিকার আর্দ্র ও গরম আবহাওয়া এবং নিজেদের কর্মময় গ্রামীণ জীবনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করল ‘লুঙ্গি’। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বাংলায় আসা সেলাইবিহীন এই হালকা সুতি কাপড়টি মাঠে কাদা-মাটির বুকে চাষাবাদ করা থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক হাটে-বাজারে যাতায়াতের জন্য পুরুষদের এক অভূতপূর্ব শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি এনে দিয়েছিল।
এই রূপান্তরের নেপথ্যে ঘরের মালিক বা ভূমিপুত্রদের যে স্বাধীন ‘এজেন্সি’ কাজ করেছিল, তা ফাহমিদ-উর-রহমান তাঁর "মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান" গ্রন্থে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে বিবৃত করেছেন। যখন কোনো জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিজের প্রাত্যহিক স্বাচ্ছন্দ্য ও বিশ্বাসের তাগিদে কোনো উপাদানকে আপন করে নেয়, তখন তার ভৌগোলিক উৎস আর বিদেশী থাকে না, তা খাঁটি মাটির সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়। সুলতানি আমলে (১৩৩৮–১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ), বিশেষ করে ইলিয়াস শাহী ও হুসেন শাহী রাজবংশের স্বর্ণযুগে, পারস্য ও মধ্য এশীয় কুর্তার কাটিং থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার কারিগরেরা নিজেদের মসলিন, খাদি ও সুতি সুতার বুননে তৈরি করল পাজামা ও পাঞ্জাবি। এটি কোনো রাজকীয় ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করার সুট-কোট ছিল না। এটি ছিল এ দেশের মানুষের নিজস্ব ঘাম ও শ্রমের ফসল। কৃষক থেকে শুরু করে জোলা-তাঁতি—সবাই একই সুতি পাঞ্জাবি গায়ে দেওয়ায় আর্য আমলের পোশাকভিত্তিক কুলীন বিভাজন লুপ্ত হয়ে যায়।
এই পাঞ্জাবির হাত ধরেই পরবর্তীতে জন্ম নেয় এ দেশের অতি নিজস্ব পোশাক ‘ফতুয়া’। যা গরমের দিনে পাঞ্জাবির হাতা কেটে এবং দৈর্ঘ্য ছোট করে মেহনতি মানুষরা নিজেদের আরামের জন্য তৈরি করে নিয়েছিল। মরক্কোর বিখ্যাত বিশ্ব-পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের আমলে বাংলায় এসে তাঁর ‘রিহলা’ (ভ্রমণবৃত্তান্ত) গ্রন্থে অকাট্য সাক্ষ্য দিয়েছেন, বাংলার মানুষ অত্যন্ত সস্তায় মিহি সুতি কাপড় তৈরি করত এবং সাধারণ মানুষ একখণ্ড কাপড় নিচে জড়িয়ে অন্য খণ্ড গায়ে দিয়ে রাখত। যা ছিল সম্পূর্ণ স্থানীয় আবহাওয়া উপযোগী ও সমতাবাদী সমাজকাঠামোর চাক্ষুষ দলিল।একইভাবে, বাঙালি মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রেও শাড়ির সনাতন কৃষ্টিকে বর্জন না করে, তার দৈর্ঘ্যের বিস্তার ঘটিয়ে তাতে এক অনন্য শালীনতা ও নান্দনিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। আর্য ও গুপ্ত যুগে যে শাড়ি কেবল হাঁটু পর্যন্ত পরা হতো এবং ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত থাকত, মধ্যযুগের মুসলিম সংস্কৃতির স্পর্শে এসে সেই শাড়ি গোড়ালি পর্যন্ত নামল এবং শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা ও বুক ঢাকা বা ‘ঘোমটা’ দেওয়ার চল শুরু হলো। যা মাটির শালীনতাবোধের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে।
মুঘল আমলের ‘অঙ্গিয়া’ বা সেলাই করা চোলির ধারণা বাংলায় এসে দেশজ কাঁচুলির সাথে মিশে যায়। যা নারীদের পোশাককে আরও পরিমার্জিত ও স্বকীয় করে তোলে। মুঘল দরবারের মসলিন ও জামদানির মূল কারিগর ছিলেন এই বাংলারই ভূমিপুত্র তাঁতিরা। তারা পারস্যের জ্যামিতিক নকশার সাথে বাংলার লতা-পাতা, নদী আর পাখির মোটিফ মিশিয়ে পোশাকের চরম ‘বাঙালিকরণ’ ঘটিয়েছিলেন। সুলতানেরা স্থাপত্যে দিল্লির বিশাল মার্বেল পাথরের গম্বুজ বর্জন করেছিলেন। এর বদলে তাঁরা এ দেশের গ্রামীণ খড় ও বাঁশের দোচালা-চৌচালা ঘরের আদল বেছে নেন। মসজিদের দেওয়ালে তাঁরা ফুটিয়ে তোলেন ‘বাংলা চালের বক্ররেখা’ এবং পোড়ামাটির ইটের টেরাকোটা। পোশাকের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ধরনের সিনক্রিটিজম বা সমন্বয় দেখা গিয়েছিল। তাঁতিরা আর্যদের বর্ণবাদী কুলীন পোশাকের এক চমৎকার বিকল্প তৈরি করেন। এই পোশাক এক স্বাধীন ও সমতাবাদী ‘মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতি’র অকাট্য ভিত গড়ে তুলেছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১-৪৪, ৮০-৮২। মুসা আল হাফিজ। মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি, পৃষ্ঠা ১৪৫-১৪৮, ১৮-১৯। সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (ষষ্ঠ সংস্করণ), পৃষ্ঠা ২০-২১)।
অন্তপুরের বয়নশিল্প, পরিচয় সংকট এবং মসলিন-জামদানির দেশজ রূপান্তর
বাঙালি মুসলমান নারীর আত্মপরিচয়ের বিবর্তনকে বুঝতে হলে প্রথমত আমাদের ফোর্ট উইলিয়াম-কেন্দ্রিক ভদ্রলোকি নন্দনতত্ত্বের কৃত্রিম খোলসটি ভেঙে এ দেশের আদিম ও মধ্যযুগীয় অন্তপুরের বয়নশিল্পের দিকে তাকাতে হবে। আদি অনার্য যুগে এই অববাহিকার সাধারণ নারী ও মেহনতি মানুষের পোশাক ছিল অত্যন্ত সাধারণ। যা আবহাওয়ার আর্দ্রতার সাথে লড়াই করার উপযোগী করে তৈরি হতো। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের (১৮৫০ সালের) আগে বাংলার গ্রামীণ সাধারণ নারী—তিনি হিন্দু হোন বা মুসলিম—কারও মধ্যেই শাড়ির নিচে ব্লাউজ, পেটিকোট কিংবা কোনো প্রকার অন্তর্বাস পরার চল ছিল না। তারা কেবল একখণ্ড মোটা সুতি শাড়ি (যেটিকে 'আটপৌরে' শাড়ি বলা হতো) দিয়ে পুরো শরীর ঢাকতেন। কিন্তু আর্য ও পরবর্তী সেন আমল থেকে শুরু করে উনিশ শতকের কলোনিয়াল এলিটদের সময় পর্যন্ত এই গ্রামীণ নারীদের পোশাককে সবসময় ক্ষমতার চোখে মাপা হয়েছে। আর্যরা আসার পর পোশাকের মাধ্যমে যে জাত-প্রথা ও বর্ণ বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, তার ফলে নিম্নবর্ণের অন্ত্যজ নারীদের শরীর সম্পূর্ণ ঢাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। যাতে তাদের সামাজিক অবস্থানকে চাক্ষুষভাবে ছোট করে রাখা যায়।
এই অবদমিত পরিচয় সংকটের মুখে প্রথম বড় ধরনের গুণগত রূপান্তর ঘটে মধ্যযুগের সুলতানি ও মোঘল আমলে। ইসলাম ধর্মের আগমন এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক রুচিতে এক কালজয়ী ও সার্বজনীন মাত্রা যোগ করেছিল। যখন এ দেশের তাঁতি, জেলে ও সাধারণ কৃষক সম্প্রদায় দলে দলে সুফিদের সাম্যবাদী বার্তার দিকে ঝুঁকে পড়ল, তখন তাদের নারীদের পোশাক-ভাবনাতেও এক ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিল। তারা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও প্রাত্যহিক শালীনতার তাগিদে শাড়ির আদি দৈর্ঘ্যকে বাড়িয়ে দিলেন। প্রাক-ইসলামী যুগে যে কাপড় কেবল কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত আবৃত করত, তা বিবর্তিত হয়ে গোড়ালি পর্যন্ত নামল এবং শাড়ির বাড়তি অংশ দিয়ে মাথা ও বুক ঢাকার এক অনন্য লোকায়ত কৃষ্টি তৈরি হলো। যা গ্রামীণ বাংলায় ‘ঘোমটা’ বা ‘আঁচল সংস্কৃতি’ নামে পরিচিত। এই ঘোমটা কোনো বাইরে থেকে চাপানো আরব্য জোব্বা ছিল না। এটি ছিল এ দেশের সুতো ও জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া ভূমিপুত্রদের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তির এক জীবন্ত দেশজ রূপ।
সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সত্য হলো, মুঘল দরবারে যে মসলিন ও জামদানির আভিজাত্য দুনিয়াজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল, তার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন এই বাংলারই সাধারণ মুসলমান তাঁতি ও তাদের অন্তপুরের নারীরা। মুঘলরা বাইরে থেকে পারস্যের জ্যামিতিক নকশার ধারণা নিয়ে এলেও, এ দেশের ভূমিপুত্র কারিগরেরা তাকে অন্ধভাবে অনুকরণ করেননি। তারা সেই নকশার ভেতরে বুনে দিলেন বাংলার লতা-পাতা, নদী, পাখি আর লোকজ মটিফ। ফলে জামদানি বা মসলিন আর কোনো বিদেশী রাজকীয় আসবাব রইল না। তা হয়ে উঠল এ দেশের মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক অকাট্য সাংস্কৃতিক সম্পদ। মুসা আল হাফিজ তাঁর "মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি" গ্রন্থে এই প্রক্রিয়ার গভীর দার্শনিক ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়ে বলেছেন। যখন কোনো স্বাধীন জনগোষ্ঠী নিজের শ্রম, ঘাম এবং মেধা দিয়ে কোনো উপাদানকে নিজের মতো করে গড়ে তোলে, তখন তার চূড়ান্ত মালিকানা সেই মাটির মানুষের হাতেই চলে যায়। বাইরের কোনো আধিপত্যবাদী শ্রেণী তাকে নিজের বলে দাবি করতে পারে না।
দীনেশচন্দ্র সেনের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থের আদি ও মধ্যযুগীয় সামাজিক চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট ধরা পড়ে, ইংরেজদের আসার আগে পর্যন্ত এ দেশের গ্রামীণ মুসলিম নারীদের রুচি ও পোশাকের বিন্যাস ছিল অত্যন্ত মজবুত ও স্বাধীন। কিন্তু উনিশ শতকে কলকাতার বাবু সংস্কৃতির উত্থান এবং ব্রিটিশদের ভিক্টোরিয়ান ‘শালীনতার বয়ান’ এই স্বাভাবিক দেশজ বন্ধনটিকে সুপরিকল্পিতভাবে কেটে আলাদা করে দেয়। কলোনিয়াল এলিটরা গ্রামীণ নারীদের ব্লাউজহীন প্রাকৃতিক শাড়ি পরাকে ‘অসভ্য’ ও ‘বর্বর’ বলে দাগিয়ে দেয়। ঠাকুরবাড়ির হাত ধরে ভিক্টোরিয়ান জ্যাকেট বা কৃত্রিম ব্লাউজ-পেটিকোটের প্রটোকল মধ্যবিত্ত নারীদের ওপর একচ্ছত্রভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে একদিক থেকে যেমন নারীদের পোশাকের হাজার বছরের স্বাধীন মাটির রূপটি হারিয়ে গেল, অন্যদিকে তাদের আত্মপরিচয়টি কলোনিয়াল শাসকদের রুচির মাপকাঠির কাছে বন্দি হয়ে পড়ল। কিন্তু বিশ্বায়নের এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও যখন এ দেশের সাধারণ নারীরা নিজেদের ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র্য এবং মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তির জায়গা থেকে সালোয়ার-কমিজ বা জামদানি বেছে নেন, তখন তথাকথিত সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা তাকে হীন চোখে দেখতে চান। অথচ তারা বোঝেন না, ব্যবহারকারীই পোশাকের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে। এ দেশের সাধারণ মানুষের হাত ধরে যে পোশাকের আত্মীকরণ ঘটেছে, তা কোনো কাল্পনিক বা মনগড়া রূপান্তর নয়। তা হলো এ দেশের মাটি ও পরিচয় রক্ষার এক অনমনীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক বিদ্রোহ (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১-৪৪, ১০২-১০৪। হাফিজ, মুসা আল। মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি, পৃষ্ঠা ৬১, ১৪৫। সেন, শ্রীদীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (ষষ্ঠ সংস্করণ), পৃষ্ঠা ২-৩)।
ঔপনিবেশিক সুতাকল, ভিক্টোরিয়ান শালীনতার জালিয়াতি এবং ধুতি-লুঙ্গির মনস্তাত্ত্বিক আপার্থাইড
১৭৫৭ সালের পলাশী-উত্তর রাজনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয় কেবল এই অববাহিকার শাসনদণ্ডকে কেড়ে নেয়নি, তা মূলত এ দেশের মানুষের প্রাত্যহিক যাপন, রুচি এবং পোশাকের স্বাধীন দেশজ রূপান্তরের ওপর এক সর্বগ্রাসী ঔপনিবেশিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন এই ভূখণ্ডের ক্ষমতা দখল করল, তখন তারা বুঝতে পেরেছিল, কেবল শারীরিকভাবে বা খাজনা আদায়ের মাধ্যমে এ দেশের ভূমিপুত্রদের দীর্ঘকাল গোলাম বানিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মানুষকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করতে হলে প্রথমত তার সংস্কৃতির সংজ্ঞা ও আত্মপরিচয়কে তার নিজের চোখেই ‘হীন’, ‘অনগ্রসর’ ও ‘বর্বরোচিত’ বলে দাগিয়ে দিতে হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খল তৈরি করার জন্য ঔপনিবেশিক প্রভুরা এক চতুর নান্দনিক আধিপত্যের মেকানিক্স দাঁড় করাল। তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রচার করতে শুরু করল, বাঙালি মেহনতি মানুষের জলবায়ু-সংগত আরামদায়ক পোশাক—লুঙ্গি, ধুতি, পাজামা বা হালকা পিরহান হলো আলসেমি ও অসভ্যতার প্রতীক। আর এর বিপরীতে তাদের সুঁই-সুতার সুক্ষ্ম টাইট সুট, কোট-প্যান্ট এবং টাই হলো ‘সভ্যতা’, ‘প্রগতি’ ও ‘আধুনিকতার’ একমাত্র বৈশ্বিক সার্টিফিকেট।
এই ঔপনিবেশিক দাসত্ব তৈরির খেলায় সবচেয়ে বড় ফাঁকফোকরটি তৈরি করা হয়েছিল উনিশ শতকের কলকাতার বাবু সংস্কৃতি এবং জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মধ্যস্থতায়। ফাহমিদ-উর-রহমান তাঁর মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান গ্রন্থে অত্যন্ত ক্ষুরধারভাবে দেখিয়েছেন, উনিশ শতকের তথাকথিত সেকুলার নবজাগরণ বা রেনেসাঁ আসলে কোনো খাঁটি ভূমিজ আন্দোলন ছিল না। তা ছিল ব্রিটিশদের তৈরি করা এক অনুগত মধ্যবিত্ত হিন্দু শ্রেণীর উত্থান এবং তার হাত ধরে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের মনগড়া বিকাশ (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪৫)। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ দেশের সাধারণ গ্রামীণ নারী ও পুরুষেরা কোনো কৃত্রিম অন্তর্বাস বা ব্লাউজ-পেটিকোটের অবরুদ্ধ খাঁচায় বন্দি ছিলেন না (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১)। এটিই ছিল এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার হাজার বছরের প্রাকৃত সত্য। কিন্তু ভিক্টোরিয়ান ব্রিটিশ সমাজের শুচিবাইগ্রস্ত কলোনিয়াল চোখে এ দেশের নারীদের এই স্বাধীন পোশাক-ভাবনা ছিল চরম ‘অশালীন’।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজ ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রথম ভারতীয় আইসিএস কর্মকর্তা হিসেবে ব্রিটিশদের উচ্চ মহলে ওঠাবসা শুরু করলেন, তখন কলোনিয়াল এলিটরা তাঁর স্ত্রীর ব্লাউজহীন ঐতিহ্যবাহী শাড়ি পরার রীতিকে চরম কটাক্ষ করে। এই অপমানের অবিনয়ী জবাব দেওয়ার জন্য এবং ব্রিটিশদের দরবারে নিজেদের ‘সভ্য’ প্রমাণ করার তাগিদে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী বোম্বাইয়ের পারসি নারীদের অনুকরণে জ্যাকেট বা ব্লাউজ এবং পেটিকোটের ভিক্টোরিয়ান প্রটোকল বাংলায় আমদানি করেন (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪২)। ঠাকুরবাড়ির মাধ্যমে চালু হওয়া এই ভিক্টোরিয়ান শালীনতার প্রলেপ ব্রাহ্ম সমাজ হয়ে তৎকালীন সম্ভ্রান্ত ও মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম নারীদের মধ্যেও সুক্ষ্মভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে একদিক থেকে যেমন নারীদের শরীর আধুনিক কায়দায় ঢাকা পড়ল, অন্যদিকে নারীদের হাজার বছরের আদিম ও স্বাধীন পোশাক ভাবনাটি ব্রিটিশদের তৈরি করা ‘শালীনতার মাপকাঠির’ কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪৩)।
মুসা আল হাফিজ তাঁর মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি গ্রন্থে এমন মনস্তাত্ত্বিক অবদমনকে ‘মনের হাটে উপনিবেশ স্থাপন’ এবং গণবিরোধী বুদ্ধিজীবিতার বিকাশ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যখন কোনো জাতি নিজের পোশাক বা রুচিকে অন্যের দেওয়া সংজ্ঞার মাপে ‘সভ্য’ বানাতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন তার ভেতরের ডিকলোনিয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায় (হাফিজ, মুসা আল। মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি, পৃষ্ঠা ৬১)। ব্রিটিশরা পোশাকের এই নান্দনিকতাকে কেবল দাস তৈরির হাতিয়ার বানায়নি, বরং তাদের ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ (Divide and Rule) নীতিকে সফল করতে পোশাকের ভেতরে এক গভীর সাম্প্রদায়িক ফাটল ঢুকিয়ে দিয়েছিল। প্রাচীনকাল থেকে এই মাটির সন্তান হিসেবে বাংলার পুরুষেরা ধুতি, লুঙ্গি বা কোমর-কাপড় পরিধান করতেন। কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে এসে সুক্ষ্ম কলোনিয়াল প্ররোচনায় ধুতিকে রাতারাতি ‘হিন্দুদের পোশাক’ আর লুঙ্গি বা পাজামাকে ‘মুসলমানদের পোশাক’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হলো (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১)। একই মাটির সন্তান হওয়া সত্ত্বেও পোশাকের এই সুপরিকল্পিত বিভাজনের মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অলঙ্ঘনীয় মানসিক আপার্থাইড তৈরি করা হলো।
এর অভিঘাতে এ দেশের বহু মধ্যবিত্ত মুসলমান নিজেদের ‘ভূমিপুত্র’ পরিচয় এবং মধ্যযুগীয় লোকায়ত আত্মীকরণের ইতিহাস ভুলে গিয়ে উত্তর ভারত বা মধ্যপ্রাচ্যের নবাবী আভিজাত্য নকল করতে শুরু করলেন। তারা শেরওয়ানি, টুপি আর আঁটসাঁট পায়জামা পরাকে নিজেদের মুসলিম সংস্কৃতির প্রধান অঙ্গ মনে করলেন, যা এই বাংলার চরম আর্দ্র ও গরম আবহাওয়ার সাথে ছিল সম্পূর্ণ বেমানান। অন্যদিকে কলকাতার বাবুরা ধুতির কোঁচাকে ক্ষমতার আভিজাত্য বানিয়ে মুসলমানদের লুঙ্গি-পিরহানকে ‘ছোটলোক’ ও ‘আনকালচার্ড’ মেহনতিদের পোশাক বলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মিডিয়া শেইমিং শুরু করল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪৬)। সংস্কৃতির এই জালিয়াতি ও রূপান্তরের ফাঁদটি এতই সুক্ষ্ম ছিল যে, এ দেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই নিজেদের মাটির আরামদায়ক পরিচ্ছদকে ‘লজ্জাজনক’ মনে করতে শুরু করল। আর ঔপনিবেশিক প্রভুদের চাপানো ভারী লোহার খাঁচাকেই ‘উন্নতি’র প্রতীক হিসেবে আপন করে নিল।
এই ভাষিক ও পোশাকগত রূপান্তরের গভীর শিকড় মূলত রোপিত হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়ামের সংস্কৃতায়নের আদি যুগে। যেখানে প্রাকৃত ভাষা ও লোকায়ত পুথি ধারাকে সুপরিকল্পিতভাবে অবদমিত করা হয়েছিল। দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে মধ্যযুগীয় পুথি সাহিত্যের সহজ ও লৌকিক কৃষ্টিকে ছেঁটে ফেলে উনিশ শতকে এক কৃত্রিম ‘ভদ্রলোকি নান্দনিকতা’ তৈরি করা হয়েছিল।৷ যা সাধারণ মানুষের পোশাক, ভাষা ও জীবনবোধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল (সেন, দীнеশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ১-২)। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে গ্রামীণ মুসলমান সমাজ এক গভীর পরিচয় সংকটে নিপতিত হয়। কারণ একদিকে তাদের নিজস্ব লোকায়ত পুথি ঐতিহ্যকে ‘ইতর’ বলে খারিজ করা হচ্ছিল। অন্যদিকে রাজদরবারের ফারসি ভাষার বিলুপ্তি তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছিল।
নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালীর ইতিহাস গ্রন্থে অনার্যদের যে আদিম ও সেলাইহীন পরিচ্ছদকে মাটির একান্ত নিজস্ব উপাদান হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন, কলোনিয়াল আমলের এই কৃত্রিম বাবু সংস্কৃতি সেই আদিম সত্যকে সম্পূর্ণ আড়াল করে দেয়। পোশাক তখন আর আবহাওয়া বা স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় রইল না; তা হয়ে উঠল শ্রেণী-শোষণের এক প্রধান মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার। মেহনতি মানুষের চিরকালীন পোশাক লুঙ্গি ও পিরহানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত করে ব্রিটিশরা প্রমাণ করতে চেয়েছিল, তাদের দেওয়া কোট-প্যান্টের গোলামি না করলে কেউ এই সমাজে ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য হতে পারবে না। এই কৃত্রিম নন্দনতত্ত্বের বিষাক্ত বীজ এতটাই গভীরে প্রবেশ করেছে যে, তা আমাদের সমসাময়িক সমাজ-মানসেও এক স্থায়ী হীনম্মন্যতার ক্ষত তৈরি করে গেছে। যা থেকে মুক্ত হতে হলে এই পোশাকের আপার্থাইডের নেপথ্য ইতিহাসকে জানা অত্যন্ত জরুরি (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১-৪৭। মুসা আল হাফিজ। মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি, পৃষ্ঠা ৬১, ১৫০। সেন, শ্রীদীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (ষষ্ঠ সংস্করণ), পৃষ্ঠা ১-২। রায়, নীহাররঞ্জন। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), পৃষ্ঠা ৪২)।
আধুনিক গণমাধ্যমের লুণ্ঠিত নান্দনিকতা, 'মালিকের অধিকার' এবং হিজাব-ওড়নার ডিকলোনিয়াল মুক্তি
কলোনিয়াল প্রভুরা এ দেশ ছেড়ে চলে গেলেও তাদের তৈরি করে যাওয়া নান্দনিক আধিপত্যের লোহার খাঁচাটি যে আধুনিক বাংলাদেশে কতটা নগ্ন ও বিষাক্তভাবে টিকে আছে, তার সবচেয়ে বড় চাক্ষুষ প্রমাণ হলো আমাদের সমসাময়িক গণমাধ্যম, নাটক, সিনেমা এবং কর্পোরেট এসি রুমের পোশাকগত আপার্থাইড। উনিশ শতকের কলকাতার বাবুদের তৈরি করা সেই কৃত্রিম ও সংকীর্ণ ‘ভদ্রলোকি নান্দনিকতা’ আজ ছদ্ম-সেকুলারিজমের মোড়কে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের পোশাকের ওপর এক স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ও শেইমিং চালিয়ে যাচ্ছে। এ দেশের সাধারণ মানুষের জলবায়ু-সংগত আরামদায়ক পোশাক লুঙ্গি, সাধারণ পিরহান কিংবা টুপি-দাড়িকে আমাদের নাটক-সিনেমায় সুপরিকল্পিতভাবে সবসময় ‘অশিক্ষিত’, ‘খ্যাত’, ‘অনগ্রসর’ বা ‘উগ্রপন্থী’ চরিত্রের অবয়ব হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। এই সুক্ষ্ম মিডিয়া শেইমিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো এ দেশের সাধারণ তরুণ প্রজন্মের মনে নিজেদের মূল শিকড় ও মাটির সংস্কৃতির প্রতি এক স্থায়ী হীনম্মন্যতার ক্ষত তৈরি করা। যাতে তারা নিজেদের অজান্তেই ঔপনিবেশিক প্রভুদের চাপানো কর্পোরেট পোশাককে ‘উন্নতি’ ও ‘আধুনিকতা’র একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে অন্ধভাবে পূজা করতে থাকে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক অবদমন ও নান্দনিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব হাজির করে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের ‘থিওরি অব এজেন্সি’ (Theory of Agency) এবং ‘মালিকের অধিকারের তত্ত্ব’। ফাহমিদ-উর-রহমান তাঁর মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান গ্রন্থে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে দেখিয়েছেন, সংস্কৃতির প্রকৃত রূপান্তর ও স্বাতন্ত্র্য বাইরের কোনো শাসকের তলোয়ার বা এলিটদের চাপানো ফতোয়া দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তা নির্ধারিত হয় প্রাকৃতিকভাবে ব্যবহারকারীদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও গ্রহণের মাধ্যমে (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৯)। এ দেশের স্বাধীন ভূমিপুত্ররা যখন নিজেদের আত্মিক শালীনতা, মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের তাগিদে সালোয়ার-কমিজ, ওড়না বা হিজাব বেছে নেন, তখন তাকে তথাকথিত সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা ‘আরবীয় আগ্রাসন’ বা ‘বাঙালি সংস্কৃতির বিলুপ্তি’ বলে চিৎকার শুরু করেন। অথচ তারা বোঝেন না যে, সংস্কৃতির দর্শনে একটি অমোঘ সত্য রয়েছে—‘ব্যবহারকারীই পোশাকের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে’ (The wearer defines the garment)।
যখন কোটি কোটি গ্রামীণ ও কর্মজীবী নারী নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের গতিশীলতা ও সুরক্ষার জন্য কোনো পরিচ্ছদকে আপন করে নেন, তখন তার ভৌগোলিক উৎস আর বিদেশী থাকে না। তা শতভাগ এই মাটির নিজস্ব সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৪১)। আরবের মূল বোরকা বা হিজাব যা ছিল মরুভূমির তীব্র বালুঝড় ও কুচকুচে কালো রঙের মোটা কাপড়, তা এই বাংলার অববাহিকায় এসে এ দেশের কারিগরদের সুতোয়, এ দেশের হালকা সুতি, জর্জেট ও লিনেন কাপড়ে রূপান্তরিত হয়েছে (হাফিজ, মুসা আল। মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি, পৃষ্ঠা ১৪৫)। তার গায়ে লেগেছে জামদানির নকশা, ব্লকের প্রিন্ট আর বাটিকের কাজ। বস্তুটির ঐতিহাসিক নাম হয়ত বিদেশী, কিন্তু তার সুতো, বুনন, রঙ এবং ব্যবহারকারী শতভাগ এই বাংলারই ভূমিপুত্র। ঘরে নতুন কোনো আসবাব আনলে যেমন তার চূড়ান্ত মালিকানা ঘরের মালিকেরই হয়, ঠিক তেমনি এ দেশের মানুষের স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা হিজাব-ওড়না আজ আর কোনো বহিরাগত কৃষ্টি নয়। তা হলো এ দেশের মাটি ও আত্মপরিচয় রক্ষার এক অনমনীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক বিদ্রোহ।
এই পরিচয় সংকটের গভীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দেশের এলিট বুদ্ধিজীবীরা একজাতি তত্ত্বের ছদ্মবেশী ফাঁদ তৈরি করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও লোকায়ত ঐতিহ্য থেকে তাদের সুপরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। ফাহমিদ-উর-রহমানের গ্রন্থে উল্লেখিত ‘কালচারের সাইকেল তত্ত্ব’ অনুযায়ী, একটি জাতি যখন তার নিজস্ব মূল শিকড় ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সে মানসিকভাবে পঙ্গু ও পরাধীন হয়ে যায় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১০২)। স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে এবং গণমাধ্যমে সুক্ষ্মভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুভূতি ও প্রাত্যহিক পরিচ্ছদকে ‘আনকুল’ প্রমাণ করার যে চতুর মেকানিক্স সচল রয়েছে, তা মূলত মেহনতি মানুষের মননে এক স্থায়ী ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল পরাবার চক্রান্ত (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১০৬)।
দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে মধ্যযুগের স্বাধীন সুলতানদের আমলে এ দেশের ভাষা ও লোক-মানস উচ্চবর্ণের সংস্কৃতায়নের অবদমন ভেঙে নিজের স্বকীয়তায় আত্মপ্রকাশ করেছিল (সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃষ্ঠা ২০-২১)। সাহিত্যের সেই প্রাকৃত দেশজ রূপান্তরের মতোই আজ এ দেশের নারীদের হিজাব-ওড়না পরিধান বা পুরুষদের লুঙ্গি-ফতুয়া ধরে রাখার লড়াইটি কোনো সাধারণ ফ্যাশন বদল নয়। এটি হলো, কলকাতার বাবু নান্দনিকতা এবং পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির যৌথ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক অকাট্য ডিকলোনিয়াল মুক্তি ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের অবিনশ্বর ইশতেহার।

Post a Comment