Table of Contents
![]() |
| সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিক কলোনিকরণ ও প্রাকৃত আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার |
Previous Part.......
৫:৫
উচ্চবর্ণের সাহিত্যিক আভিজাত্য, ‘ম্লেচ্ছ’ চরিত্রহননের মেকানিক্স এবং প্রাকৃত ঐতিহ্যের উচ্ছেদ
একটি ভৌগোলিক জনপদকে স্থায়ীভাবে গোলাম বানানোর সবচেয়ে আদিম ও চতুর মেকানিক্সটি কখনো তরবারির ডগায় বা খাজনা আদায়ের দাপ্তরিক খাতায় সম্পূর্ণ হয় না। মানুষকে যদি তার নিজের চোখেই ক্ষুদ্র, অসভ্য এবং অনগ্রসর প্রমাণ করে দেওয়া যায়, তবে সে নিজের শেকড়কে ঘৃণা করতে শুরু করে। এই মনস্তাত্ত্বিক অবদমনের প্রধান রাজদণ্ডটি চিরকাল সচল রাখা হয়েছে সাহিত্যের পাতায়, বড় বড় উপন্যাসের চরণে এবং প্রাতিষ্ঠানিক নান্দনিকতার প্রলেপে (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৫১-৫৭ ও ৯৫-১০০)। উনিশ শতকের কলকাতার নব্য-উত্থিত বাবু সমাজ যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদলেহী সহযোগী হিসেবে এই অববাহিকার শাসন ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদ নিজেদের কব্জিতে নিল, তখন তারা এ দেশের মেহনতি মানুষের হাজার বছরের সমতাবাদী ও প্রাকৃত লোক-সংস্কৃতিকে সমূলে উপড়ে ফেলার এক সর্বগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছিল। এই যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র ছিল তাদের তৈরি করা কৃত্রিম ‘ভদ্রলোকি সাহিত্য’। এই সাহিত্যে সুপরিকল্পিতভাবে এ দেশের মাটির সন্তান, গ্রামীণ জোলা, তাঁতি, কৃষক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজকে সবসময় চোর, খুনি, জারজ কিংবা লৈঙ্গিক বিকৃতির ছাঁচে অবদমিত করার এক নগ্ন চরিত্রহননের মেকানিক্স দাঁড় করানো হয়েছিল, যা বিজিতের অবচেতনে এক স্থায়ী হীনম্মন্যতার ক্ষত বুনে দেয় (মাহমুদ, ফারুক। ইতিহাসের অন্তরালে, পৃষ্ঠা ৮৭–৮৯)।
এই সাহিত্যিক আভিজাত্য ও বর্ণবাদী নন্দনতত্ত্বের আদিম উৎসটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত পশ্চিমা ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের হুবহু এক অনৈতিক অনুকরণ ছিল। ইউরোপীয় কলোনিয়াল প্রভুরা যেমন দুনিয়াজুড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে বাকি বিশ্বকে ‘অসভ্য’ ও ‘খ্রিস্টধর্মহীন’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন ও মনস্তত্ত্বকে অবদমিত করার লুণ্ঠনপ্রক্রিয়া সচল রেখেছিল, কলকাতার বাবুরা ঠিক সেই একই ফিল্টার এ দেশের মানুষের ওপর প্রয়োগ করে। তারা নিজেদের ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকদের দরবারে সভ্য প্রমাণ করার তাগিদে এবং উচ্চবর্ণের ধর্মীয় আভিজাত্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে গিয়ে এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক মুখের জবান, পরিচ্ছদ ও খাদ্যাভ্যাসকে চরম শ্লেষ ও উপহাসের পাত্রে পরিণত করেছিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৫১–৫৩)। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে রবীন্দ্র সাহিত্যের বিভিন্ন গল্প ও নভেলে মেহনতি মানুষের মুখের সহজ ‘পানি’ বা ‘গোসল’-এর মতো প্রাকৃত শব্দগুলোকে ‘যাবনী’ বা ‘ইতর পাঠ’ বলে দেগে দেওয়ার যে আভিধানিক আপার্থাইড সচল রাখা হয়েছিল, তা আসলে এক গভীর ক্ষমতার দম্ভ ও মানসিক উপনিবেশের চাক্ষুষ প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই ছিল না (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১১২)।মানুষের চিন্তা ও রুচিকে যখন অন্যের দেওয়া সংজ্ঞার মাপে বন্দি করা যায়, তখন সে নিজের প্রাত্যহিক স্বাচ্ছন্দ্যকে লজ্জাজনক মনে করতে শুরু করে এবং ঔপনিবেশিক প্রভুদের চাপানো ভারী খাঁচাকেই উন্নতির সার্টিফিকেট হিসেবে অন্ধভাবে পূজা করে।
উনিশ শতকের সেই সামন্ততান্ত্রিক ভদ্রলোকি উপন্যাসগুলো এ দেশের মানুষের মননে এমন এক গভীর পরিচয় সংকটের দেয়াল খাড়া করেছিল। যা প্রমাণ করে, কেবল ভাষার একতা দিয়ে কোনোদিন একটি অভিন্ন জীবন্ত সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব নয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ৫২-৫৭)। প্রাচীন আর্য ও সেন রাজাদের আমলে উৎপাদনবিমুখ উচ্চবর্ণেরা যেভাবে নিজেদের পবিত্র প্রমাণ করতে মেহনতিদের শরীর ও পাতকে অস্পৃশ্য বানিয়েছিল, উনিশ শতকে এসে কলকাতার বাবুরা সাহিত্যের পাতায় মেহনতিদের আত্মপরিচয়কে ঠিক সেই একই অলঙ্ঘনীয় আপার্থাইডে অবরুদ্ধ করে দেয় (মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ২৪–৩২)। যে সাধারণ মানুষ নিজের ঘাম আর শ্রম দিয়ে এই অববাহিকার বুনিয়াদ টিকিয়ে রেখেছিল, তাদের নিজস্ব লোকজ পুথি ঐতিহ্যকে ‘ইতর’ ও ‘আনকালচার্ড’ বলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মিডিয়া শেইমিং করার এই যে চতুর জালিয়াতি, তা মূলত মেহনতিদের ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে রাখার এক সুপরিকল্পিত জ্ঞানতাত্ত্বিক চক্রান্ত ছিল। কিন্তু ইতিহাসের এই লুণ্ঠিত নান্দনিকতা কোনো কৃত্রিম ভদ্রলোকি উপন্যাসের পাতায় চিরকাল চেপে রাখা যায় না। প্রাক-কলোনিয়াল বাংলায় এ দেশের প্রাকৃত লোক-মানসের সমাজচিত্রে উৎপাদনশীল মানুষের কৃষ্টি ও সাহিত্যের যে স্বাধীন বিবর্তন ঘটেছিল, তা এই আর্য ও ব্রিটিশ অবদমনকে প্রতিনিয়ত ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখে। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের সংকলিত প্রাচীন পুঁথির বিবরণী আমাদের স্পষ্ট দেখায়, এ দেশের মানুষের মুখের প্রতিটি সহজ জবান ও লৌকিক কৃষ্টি কোনো বহিরাগত বা যান্ত্রিক আমদানি নয়। তা হলো এই মাটির শত শত বছরের খাঁটি অবিনশ্বর স্বাধিকার ও আত্মার মুক্তির অবিন্যাসী ইশতেহার।
আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের আকর খনন: লৌকিক পুঁথি সাহিত্যের শাশ্বত বুনিয়াদ
কলকাতার বাবু সাহিত্য যখন এ দেশের প্রাকৃত অধিবাসীদের মুখের জবান ও লৌকিক কৃষ্টিকে অবজ্ঞার চোখে দেখছিল, তখন এ দেশের মাটির গভীর থেকে এক অবিনশ্বর প্রতিরোধ ও আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের বৈপ্লবিক জোয়ার সৃষ্টি হয়। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তিনি পল্লিবাংলার ঘরে ঘরে ঘুরে ধুলোবালি ও কীটের করাল দংশন থেকে রক্ষা করে যে হাজার হাজার প্রাচীন পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেছিলেন, তা স্রেফ কোনো পুরাতাত্ত্বিক শখ ছিল না। তা ছিল এই অববাহিকার সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া অবিনশ্বর আত্মপরিচয় ও ডিকলোনিয়াল ইশতেহারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এক প্রবল প্রতিরোধ লড়াই। উচ্চবর্ণের পণ্ডিতেরা প্রচার করতে চেয়েছিলেন, মেহনতি মুসলমানদের মুখের শব্দগুলো কৃষ্টিহীন বা বহিরাগত আমদানি। কিন্তু সাহিত্যবিশারদের সংকলিত পুঁথিগুলোর প্রতিটি পংক্তি প্রমাণ করে দেয়, এই শব্দগুলো এই মাটিরই শত শত বছরের খাঁটি লোকজ সাহিত্যের শাশ্বত বুনিয়াদ। এই আকর খনন প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষের মনকে দাস বানানোর জন্য যে সুপরিকল্পিত আভিধানিক ও সাহিত্যিক আপার্থাইড খাড়া করা হয়েছিল, তার বুনিয়াদ কতখানি পলকা ও কৃত্রিম ছিল।
সাহিত্যবিশারদ সংকলিত পুঁথির বিবরণীগুলোর গভীরে প্রবেশ করলে পাঠক খুব সহজেই বুঝতে পারেন, প্রাক-কলোনিয়াল বাংলায় এ দেশের সদ্য-ধর্মান্তরিত ভূমিপুত্ররা ইসলামের তাওহিদভিত্তিক ও সমতাবাদী বিশ্বজনীন দর্শনকে গ্রহণ করার পর নিজেদের মুখের প্রাকৃত জবানকে বর্জন করেননি। বরং তারা আরব্য-পারস্যের মহাকাব্যিক গল্পগুলোকে এই বাংলার নদী, নৌকা, বর্ষার আবহ এবং লোকজ উপাদানের ছাঁচে ফেলে এক অপূর্ব ‘দেশীকরণ’ বা ‘দেশজ রূপান্তর’ ঘটিয়েছিলেন (রহিম, ডক্টর এম. এ. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৫৫)। এই দোভাষী বাংলা বা পুঁথি সাহিত্য ছিল মূলত এ দেশের সর্বস্তরের মেহনতি জোলা, তাঁতি, জেলে ও সাধারণ কৃষকদের একান্ত নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। যা কোনো রাজদরবারের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা মন্দিরের শুচিতার ফতোয়া মেনে তৈরি হয়নি (মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, পৃষ্ঠা ২৪, ৩৩–৩৮)। যখন কোনো স্বাধীন ভৌগোলিক অঞ্চলের সমাজ নিজেদের প্রতিদিনের শ্রম ও বিশ্বাসের মেলবন্ধনে এক স্বকীয় নন্দনতত্ত্বের জন্ম দেয়, তখন তাকে বাইরের কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি নিজের ফতোয়া দিয়ে চিরকাল অবদমিত করে রাখতে পারে না।
এই ভাষিক স্বাধিকারের সংগ্রাম দেখে প্রশ্ন জাগতে পারে, কীভাবে উনিশ শতকের শেষভাগে এসে সুবে বাংলার কওম ও গ্রামীণ সমাজ-মানস এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজেদের সাহিত্যিক প্রতিরোধকে টিকিয়ে রেখেছিল? এর উত্তর নিহিত আছে ডক্টর ওয়াকিল আহমদের সমাজ-মানসের রূপান্তর ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, জমিদারি ও কাছারিগুলোর চাপানো ভাষিক অস্পৃশ্যতার বিপরীতে সাধারণ মানুষ নিজেদের ঘরের জবানের ভেতরের আত্মিক স্বাধিকারকে রক্ষা করতে পুঁথি পাঠের লৌকিক আসরগুলোকে এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক দুর্গ বানিয়ে তুলেছিলেন (আহমদ, ডক্টর ওয়াকিল। উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, দ্বিতীয় খণ্ড, মুদ্রিত পৃষ্ঠা ১৪৫–১৪৮)। এই লৌকিক পুথি সাহিত্যের শাশ্বত বুনিয়াদী প্রতিরোধ কলকাতার বাবুদের তৈরি করা সেই সংস্কৃতায়নের কৃত্রিম খাঁচাকে ভেঙে চূর্ণ করে দিয়েছিল। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের এই কালজয়ী পুঁথি সংকলিত গ্রন্থ প্রমাণ করেছে, এ দেশের ভূমিপুত্রদের মুখের প্রতিটি সহজ জবান হলো এই অববাহিকার রক্ত, ঘাম, শ্রম এবং চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতার এক অনন্য অবিনশ্বর দলিল। যা কলোনিয়াল লোহার পর্দাকে সগর্বে উচ্ছেদ করে দেয় (আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ সংকলিত। বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ, ভূমিকা ও পুঁথি বিবরণী শাখা, পৃষ্ঠা ১-৮)।
আবুল মনসুর আহমদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ: ‘ভদ্রলোকি’ উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক কলোনিকরণ খণ্ডন
কলকাতার বাবু সাহিত্য এ দেশের মেহনতি মুসলমান প্রজাদের চিরকালীন প্রাত্যহিক লৌকিক কৃষ্টি ও মুখের জবানকে যে মনস্তাত্ত্বিক কলোনিকরণের খাঁচায় বন্দি করেছিল, তার সবচেয়ে নিপুণ, ক্ষুরধার ও ঐতিহাসিক পোস্টমর্টেমটি করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। এই অববাহিকায় একই নদী, একই পলিমাটি এবং একই জলবায়ুর মধ্যে হাজার বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সমাজ একত্রে বসবাস করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতকাল এক দেশে এক সুতোয় বাঁধা পড়ে থাকার পরেও কেন তাদের মধ্যে সামাজিকভাবে কোনো জেনুইন কালচারাল মেলবন্ধন বা একাত্মতা ঘটেনি? এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ফাটলের মূল রহস্যটি কোনো প্রাকৃতিক কারণ ছিল না। এটি ছিল মূলত কলকাতার উচ্চবর্ণের বাবু সমাজের একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী ও আর্যমনস্ক নন্দনতত্ত্বের অবিনশ্বর চক্রান্ত (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১৫৮)। কলকাতার বাবু সাহিত্যিকেরা নিজেদের মনগড়া বিশ্বমানবতা বা ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরে এ দেশের গ্রামীণ মানুষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, মুসলমানদের ভারতীয় হতে হলে তাদের নিজেদের লৌকিক ও ধর্মীয় আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে আর্যদের সেই মহান মহাসমুদ্রে সম্পূর্ণ লীন হয়ে যেতে হবে (আহমদ, আবুল মনসুর। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১৫৯)। এই আধিপত্যবাদী বয়ান কেবল কংগ্রেস বা হিন্দু সভার জনতার স্লোগান ছিল না, তা ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক দর্শনেরও এক অলঙ্ঘনীয় কলোনিয়াল ভিত।
আমরা যখন বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্র সাহিত্যের পাতা উল্টাই, তখন আমাদের সামনে এক অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক বৈপরীত্য উন্মোচিত হয়। যে জোড়াসাঁকোর জমিদারেরা পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়া, শিলাইদহ কিংবা পাবনার শাহজাদপুরের বিস্তীর্ণ মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে প্রজাদের রক্ত পানি করা ঘামের খাজনায় নিজেদের আভিজাত্য টিকিয়ে রাখতেন, তারা গ্রামীণ প্রজাদের মুখের ভাষাকে নিজেদের উপন্যাসে ‘ইতর’ বা ‘মূঢ় নির্বাক’ শ্রেণীর জবান বলে প্রতিনিয়ত শ্লেষ ও উপহাসের পাত্র বানাতেন। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর স্মৃতিচারণমূলক ইতিহাসে অত্যন্ত খসখসে ও বাস্তব ইতিহাসের আলোতে দেখিয়েছেন, কীভাবে জমিদারি কাছারির হিন্দু আমলারা গ্রামীণ মুসলিম প্রজাদের সামান্য ‘পানি’ বা ‘গোসল’ শব্দ উচ্চারণের কারণে ‘তুচ্ছতাচ্ছিল্য’ ও ‘তুই-তোকারির’ লোহার পর্দায় অবরুদ্ধ করে রাখত। এই আভিধানিক আপার্থাইডের মূল লক্ষ্য ছিল, মেহনতি মানুষের মনের ভেতর নিজেদের আদিম ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতি এক স্থায়ী লজ্জাবোধ ও হীনম্মন্যতার বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দেওয়া। যাতে তারা বাবুদের চাপানো কৃত্রিম কালচারাল ফিল্টারকেই সভ্যতার একমাত্র মাপকাঠি বলে পূজা করতে বাধ্য হয়।
এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত ও কাঠামোগত অবদমন দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কীভাবে মেহনতি মানুষের অবচেতনের ঘরে এই নন্দনতত্ত্বের উপনিবেশ গেড়ে বসল? এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মেকানিক্সটি কাজ করত অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে। বাবু উপন্যাসে মুসলমানদের চরিত্রকে হয় চোর, খুনি, জারজ কিংবা লৈঙ্গিক বিকৃতির ছাঁচে উপস্থাপন করা হতো, আর অন্যদিক থেকে তাদের চিরকালীন লৌকিক ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ ‘অপবিত্র’ ও ‘ম্লেচ্ছ’ কৃষ্টি হিসেবে দেগে দেওয়া হতো। কলকাতার এই নব্য-উত্থিত বাবু সংস্কৃতি এ দেশের প্রাকৃত মানুষের হাজার বছরের বহুত্ববাদী ও সমতাবাদী রসনাকে শাসন করার জন্য সাহিত্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক সুপরিকল্পিত বর্ণবাদী শুচিতার পিল বুনে দিয়েছিল। যে কৃষক দিনভর মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জমিদারের রাজকোষ পুষ্ট করত, তাকে নাগরিক পরিমণ্ডলে আজীবন সাব-হিউম্যান বা অনগ্রসর প্রমাণ করে রাখার নেপথ্যে ছিল এক সুগভীর শ্রেণী-শাসন ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের কলোনিয়াল চক্রান্ত।
ইংরেজরা বাংলায় উপনিবেশ স্থাপন করেছিল তিন স্তরে। প্রথম স্তর ছিল সামরিক। পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। দ্বিতীয় স্তর ছিল অর্থনৈতিক। দেওয়ানি লাভের পর তারা রাজস্ব আদায়ের একচেটিয়া অধিকার পায়। তৃতীয় স্তর ছিল সাংস্কৃতিক। এই স্তরটি ছিল সবচেয়ে সুক্ষ্ম এবং সবচেয়ে ভয়াবহ। এই তিনটি স্তর একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল।
ইংরেজরা যে অর্থনৈতিক লুণ্ঠন চালিয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। প্রথমত, তারা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদার শ্রেণী সৃষ্টি করে। এই জমিদাররা প্রায় সবাই ছিল বর্ণহিন্দু। তারা ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় জমিদারী পায় এবং রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পায়। দ্বিতীয়ত, তারা কৃষকদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো খাজনা আদায়ের অধিকার পায়। কৃষকরা দিনভর মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ফসল উৎপাদন করত। কিন্তু সেই ফসলের সিংহভাগ চলে যেত জমিদারের গোলায়। জমিদারের রাজকোষ পুষ্ট হতো কৃষকের ঘামে। আর সেই রাজকোষ থেকে লাভবান হতো ইংরেজ কোম্পানি। তৃতীয়ত, তারা শিল্প ধ্বংস করে দেয়। বাংলার বিখ্যাত মসলিন ও রেশম শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। কারিগররা বেকার হয়ে পড়ে। তারা জমিতে চাষাবাদ করতে বাধ্য হয়। এভাবে কৃষকশ্রেণীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
ইংরেজরা বুঝেছিল, শুধু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘদিন শাসন করা সম্ভব নয়। তাই তারা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কৌশল অবলম্বন করে। ইতিহাস ও সভ্যতার এক নির্মম ও অমোঘ নিয়তি হল, এই আধিপত্যই সবচেয়ে শক্তিশালী। এই উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেতে অনেক সময় কয়েক শতাব্দীও লেগে যায়। ব্রিটিশরা এই মনস্তত্ত্ব খুব ভালো করে জানত, বন্দুকের নল দিয়ে মানুষকে স্তব্ধ করা যায়, কিন্তু তার ভেতরের সত্তা কেনা যায় না। তাই তারা বুলেটের চেয়ে মগজ ধোলাইয়ের শক্তিকে বেশি সমীহ করত।
সহজ ভাষায় বুঝতে গেলে ক্ষমতার দুটি হাত থাকে। একটি হাত দৃশ্যমান ও কঠোর, যা আমরা হার্ড পাওয়ার নামে চিনি। অপর হাতটি অদৃশ্য ও কোমল, যাকে বলা হয় সফট পাওয়ার। হার্ড পাওয়ার হলো সরাসরি আঘাত করা, ভয় দেখানো কিংবা টাকার জোরে কোণঠাসা করা। যেমন সেনাবাহিনী, আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, অর্থনৈতিক অবরোধ, জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, রাজপথে মিটিং-মিছিল, হুমকি-ধমকি ইত্যাদি তড়িৎ প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে, সফট পাওয়ার হলো ভালোবাসায় বা মোহে আচ্ছন্ন করে ফেলা। এর অস্ত্র হলো নিখুঁত শিক্ষা ব্যবস্থা, চোখ ধাঁধানো সংস্কৃতি, বিনোদন, মনকাড়া সাহিত্য এবং আভিজাত্যের ভাষা। হার্ড পাওয়ারকে আয়ত্তে নিতে দরকার বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি, নিষ্ঠুর শাসনযন্ত্র, হুটহাট ধরাশায়ী করে ফেলে এমন জনবল। কিন্তু সফট পাওয়ার আয়ত্ত করার পথটি একদম ভিন্ন। এর জন্য প্রয়োজন যুগের পর যুগ ধরে বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগ। গভীর একাগ্রতায় মনস্তাত্ত্বিক খানাখন্দগুলো চিনে নিয়ে সেখানে নিজেদের বীজ বুনে দিতে হয়। লেখক, কবি, শিক্ষক, দার্শনিক আর নাট্যকারদের নীরব সাধনায় এই শক্তি তিল-তিল করে গড়ে ওঠে।
যখন কোনো আদর্শ বা গোষ্ঠী বিরুদ্ধবাদীদের সামান্য আচরণেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, তখন তারা আসলে হার্ড পাওয়ারের চোরাবালিতে পা দেয়। এই হুট করে জ্বলে ওঠা আর তড়িৎ প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই। এটি আসলে এক ধরণের সাময়িক এবং সস্তা আত্মতৃপ্তি। একে বলা যায় উপস্থিত সুখানুভূতি। এতে সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষকে হয়তো একটু ভয় দেখানো যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর শেষ রেজাল্ট বা চূড়ান্ত পরিণতি হলো চরম বিপর্যয় আর শূন্যতা। কারণ, রাগ এবং ক্ষমতার আস্ফালন কখনো মানুষের ভেতর থেকে আনুগত্য তৈরি করতে পারে না। বরং তা ভেতরে ভেতরে এক তীব্র প্রতিশোধের আগুন উসকে দেয়।
আজকের দিনে যারা সমাজে নিজেদের আদর্শিক বিজয় দেখতে চান, তারা এই তড়িৎ প্রতিক্রিয়ার ফাঁদে বারবার পা দিচ্ছেন। প্রতিপক্ষের একটি উসকানির জবাবে তারা রাজপথে হাজার মানুষের চিৎকার জুড়ে দেন। লাঠিসোঁটা আর স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন। কিন্তু দিনশেষে যখন ঘরে ফেরেন, তখন চারপাশ আবার আগের মতোই শূন্য হয়ে যায়। কারণ তারা মাঠের শক্তি দেখালেও মনের রাজ্য জয় করার কোনো আয়োজন করেননি। তারা ভুলে যান যে, সমাজ পরিবর্তনের আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সংস্কৃতির সূক্ষ্ম অলিগলিতে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, মিডিয়ার ভেতরের বয়ান আর প্রতিদিনের বিনোদনের জগৎ যদি প্রতিপক্ষের দখলে থাকে, তবে শুধু রাজপথ কাঁপিয়ে কোনো লাভ হয় না। শিকড় গভীরে না গেলে ঝড়ো বাতাসে শুধু পাতার শব্দই হয়, গাছ বাঁচে না। মজবুত ভিত্তি ও শক্তিমত্তার সাথে কোনো কিছু রোট লেভেলে দীর্ঘস্থায়ী করে দিতে দরকার সফট পাওয়ারের প্রতিটি খানাখন্দ নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেওয়া। ব্রিটিশ ও বর্ণহিন্দুরা খুব ভালো করে এটা বুঝেছিল এবং সেই পথেই তারা আগায়।
এই কৌশলের প্রথম ধাপ ছিল ইতিহাস বিকৃতি। তারা বাংলার মুসলিম শাসনামলকে অন্ধকার যুগ বলে প্রচার করে। তারা দেখাতে চেয়েছিল, ইংরেজদের আগমনই বাংলার জন্য আলো বয়ে এনেছে। দ্বিতীয় ধাপ ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ। তারা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে যা তাদের প্রতি আনুগত্য শেখায়। মুসলমানদের জন্য এই শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ বৈরী। লর্ড মেকলে প্রবর্তিত সেই শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অব্যাহত। মনস্তাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক ডিকলোনাইজেশন কীভাবে সম্ভব হতে পারে? রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার পরও জাতিগতভাবে আমাদের চিন্তাভাবনা, শিক্ষা, ভাষা, পোশাক ও রুচিতে পুরনো বিদেশী শাসকদেরই শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে ছোট করে দেখার প্রবণতা এই শিক্ষাব্যবস্থায় পুরোদমে বিদ্যমান। এই গোলামি মানসিকতা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে নিজের ভাষা, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়কে পুনরুজ্জীবিত করার লড়াই-ই হলো, আসল ডিকলোনাইজেশন।
ব্রিটিশ উপনিবেশের সফট পাওয়ারের এরিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের তৃতীয় ধাপ ছিল, সাহিত্যের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক অবদমন। কলকাতার বাবুরা উপন্যাস ও নাটকে মুসলমানদের চরিত্রকে বিকৃত করে উপস্থাপন করত। তারা মুসলমানদের চোর, খুনি, জারজ ও লৈঙ্গিক বিকৃতির ছাঁচে ফেলে দিত। আর তাদের লৌকিক ঐতিহ্যকে অপবিত্র ও ম্লেচ্ছ কৃষ্টি বলে প্রচার করত। কলকাতার নব্য-উত্থিত বাবু সংস্কৃতি ছিল ইংরেজদের হাতের পুতুল। এই বাবুরা ইংরেজদের লুণ্ঠন-সহচর হিসেবে কাজ করত। তারা জমিদারী, বাণিজ্য ও দালালিতে লাভবান হতো। তারা তাদের সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষা দিত। আকণ্ঠ ইংরেজদের প্রতি অনুগত থাকত। আর মুসলমানদের প্রতি ছিল তাদের তীব্র বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা। মুসলমানরা আগে রাজদরবারের ভাষা ফারসি জানত। তাই তারা চাকরি ও সুযোগ-সুবিধায় এগিয়ে ছিল। ইংরেজি চালু হওয়ার পর এই সুবিধা বর্ণহিন্দুদের হাতে চলে যায়। ফলে তারা মুসলমানদের প্রতি আরও বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
বাবুরা সাহিত্যকে ব্যবহার করেছিল মুসলমানদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরাজিত করার জন্য। তারা উপন্যাসে মুসলমান চরিত্রকে সবসময় নেতিবাচকভাবে দেখাত। মুসলমান মানে চোর—এই ধারণা তারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। মুসলমান মানে খুনি—এই ছবি তারা আঁকত। মুসলমান মানে জারজ—এই অপবাদ তারা ছড়াত। মুসলমান মানে লৈঙ্গিক বিকৃতি—এই কুৎসা তারা রটাত। অন্যদিকে তারা মুসলমানদের সমৃদ্ধ লৌকিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করত। বাউল, মারফতি, জারি, সারি—এই সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতিকে তারা হেয় প্রতিপন্ন করত। তারা বলত এগুলো ম্লেচ্ছ কৃষ্টি। এগুলো অপবিত্র সংস্কৃতি। এভাবে তারা মুসলমানদের আত্মপরিচয়কে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার চেষ্টা করত।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল শ্রেণী-শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ইংরেজরা চেয়েছিল একদল মানুষ চিরকাল তাদের অধীনে থাকবে। এই মানুষগুলো হবে কৃষক, কারিগর, মজুর ও শ্রমিক। তারা দিনভর খাটবে, কিন্তু তার ফল পাবে না। তাদের সন্তানরাও এই অবস্থায় জন্মগ্রহণ করবে। তারা কখনো উপরের দিকে উঠতে পারবে না। এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য দরকার ছিল একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্র। সেই যন্ত্র ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি। বাবুরা সেই যন্ত্রকে চালাত। তারা মুসলমানদের বোঝাতে চাইত যে, তারা জন্মগতভাবেই নিচু। তারা অনগ্রসর। তারা সভ্য নয়। তারা শিক্ষিত নয়। তারা কখনোই ইংরেজ বা বর্ণহিন্দুদের সমান হতে পারবে না। এই মনস্তাত্ত্বিক অবদমন ছিল অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
যে কৃষক দিনভর মাঠে খাটে, সে যদি নিজেকে মানুষ বলেই না ভাবে, তবে তার পক্ষে বিদ্রোহ করা সম্ভব নয়। বাবুরা তাই কৃষককে সাব-হিউম্যান প্রমাণ করার রাজনীতি চালাত। তারা সাহিত্যে কৃষককে দেখাত পশুর মতো। তারা তাকে দেখাত বুদ্ধিহীন, অসভ্য এবং নোংরা। এই চিত্রায়ণের মাধ্যমে তারা কৃষকের আত্মমর্যাদা ধ্বংস করত। ফলে কৃষক নিজেই নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করত। সে ভাবত, তার অবস্থার জন্য সে নিজেই দায়ী। তার উচিত জমিদারের আনুগত্য করা, ইংরেজদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। এভাবে সে নিজের অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহের চিন্তা পর্যন্ত করতে পারত না।
এই ছিল কলোনিয়াল চক্রান্তের পূর্ণ চিত্র। সামরিক শক্তি দিয়ে শুরু। অর্থনৈতিক শোষণ দিয়ে সম্প্রসারণ। সাংস্কৃতিক আধিপত্য দিয়ে স্থায়ীকরণ। সাহিত্য দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক অবদমন। শিক্ষা দিয়ে আনুগত্যের শিক্ষা। ধর্ম দিয়ে বিভাজন। বর্ণবাদ দিয়ে শুচিতার পিল। এই সবকিছুর সমন্বয়ে ইংরেজরা বাংলায় এক শক্তিশালী উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। যা টিকে ছিল প্রায় দুইশ' বছর। আর এই ব্যবস্থার প্রধান হাতিয়ার ছিল কলকাতার বাবু সংস্কৃতি। যারা নিজেদেরকে শিক্ষিত ও সভ্য বলে দাবি করত। কিন্তু আসলে তারা ছিল ইংরেজদের লুণ্ঠন-সহচর। তারা মুসলমানদের রক্ত শোষণ করে নিজেদের প্রাসাদ গড়ত। তারা বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন করে কলকাতায় সম্পদের পাহাড় তৈরি করত। আর সেই সম্পদ দিয়ে তারা সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে মুসলমানদের আত্মপরিচয় ধ্বংস করত। এই ছিল তাদের কৃত্রিম নন্দনতত্ত্বের উপনিবেশ ও বর্ণবাদী শুচিতার পিল। তাদের কলোনিয়াল চক্রান্তের মূল রহস্য।
কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ সত্য হলো, আর্য-সেন আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি এ দেশের মানুষের মনকে দাস বানানোর যত চক্রান্ত হয়েছে, এ দেশের ভূমিপুত্ররা নিজেদের অর্গানিক প্রতিরোধের আগুন দিয়ে সেই লোহার পর্দা বারবার চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছেন। আজকের বাংলাদেশেও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, টেলিভিশন নাটক কিংবা কর্পোরেট বিজ্ঞাপনী কালচারে সুপরিকল্পিতভাবে দাড়ি-টুপি সংবলিত মানুষ কিংবা গরুর মাংসের প্রতি এক ধরনের শ্লেষ ও এলিট জাজমেন্ট বজায় রাখা হয়েছে। যা মূলত সেই উনিশ শতকী কলোনিয়াল গোলামিরই এক আধুনিক বহুজাতিক কর্পোরেট রূপান্তর মাত্র।
আর্যাবর্ত থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ও কলকাতার বাবু সম্প্রদায় প্রযোজিত সংস্কৃতির এই সংকট ও অবক্ষয়, এ দেশের মানুষের মনে এক স্থায়ী অস্তিত্ববাদী পরিচয়হীনতার গ্লানি প্রোথিত করেছিল। কারণ তাদের প্রতিদিনের পাতের স্বাদ ও মুখের জবানকে আর্য শুচিতার মাপকাঠিতে আজীবন ‘অপরাধ’ বলে সাব্যস্ত করা হচ্ছিল। এই দীর্ঘমেয়াদী সাহিত্যিক অবদমন ও ঐতিহাসিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে শুরু করে আজ অবধি বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা এক অনমনীয় প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল গড়ে তুলেছে। কারণ সংস্কৃতির দর্শনে ব্যবহারকারীই সবসময় পরিচ্ছদ, খাদ্য, ভাষা ও সাহিত্যের প্রকৃত মালিকানা ও সামাজিক পরিচয় নির্ধারণ করে।
আধুনিক বহুজাতিক বয়ান-যুদ্ধ, ‘খ্যাত’ ও ‘আনকুল’ ট্যাগিং এবং ভূমিপুত্রদের ডিকলোনিয়াল ইশতেহার
কোনো সাধারণ বা মেহনতি পরিবারের সন্তান যখন নাগরিক পরিমণ্ডলে বা উচ্চশিক্ষার আঙিনায় এসে স্বাচ্ছন্দ্যে ‘পানি, আব্বা, আম্মা, গোসল, আণ্ডা’র মতো এই মাটির শাশ্বত লোকায়ত শব্দগুলো উচ্চারণ করে, তখন তাকে আধুনিকতার ছদ্মবেশে থাকা এলিটরা সুপরিকল্পিতভাবে ‘অনগ্রসর’, ‘রুচিহীন’ কিংবা ‘খ্যাত’ ট্যাগ দিয়ে এক সর্বগ্রাসী মানসিক অবদমনের মুখে ঠেলে দেয় (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান। পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭)। এই শব্দগত ও সাংস্কৃতিক বর্ণবাদ স্রেফ কোনো ব্যক্তিগত বাচনভঙ্গির বা আধুনিক রুচির রূপান্তর নয়; এটি হলো মূলত উৎপাদনশীল সাধারণ শ্রেণীর মানুষকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকারের পরিমণ্ডল থেকে আজীবন ছিটকে রাখার এক চতুর বুর্জোয়া রাজদণ্ড। মুসা আল হাফিজ কহেন, "আমরা যেভাবে পশ্চিমা চিন্তা-ভাবনায় প্রভাবিত, সেভাবে আমরা আমাদের নিজস্ব শিকড় ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিয়ে ফেলেছি। আমাদের শিক্ষিত সমাজের একাংশ মনে করেন, আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা কিছুই নয়; সবকিছুই পশ্চিম থেকে শিখতে হবে। এই মানসিকতাই বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশ। এই উপনিবেশের ফলে আমাদের নিজেদের মাটির সন্তানরা নিজেদেরকেই 'অনগ্রসর' ও 'অসভ্য' মনে করতে শুরু করে।
ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের একটা শ্রেণী তৈরি হয়েছে, যারা নিজেদেরকে 'এলিট' ভাবে, কিন্তু নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা নিজেদের ভাষায় কথা বললে লজ্জা পায়, নিজেদের পোশাক পরলে হাসি পায়। এই হীনম্মন্যতা কোনো প্রাকৃতিক নয়; এটা সুপরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে ভাষায় আমাদের মা ডাকে, যে ভাষায় আমাদের কৃষক ফসল ফলায়, সেই ভাষাকে 'অশিক্ষিত' বা 'গেঁয়ো' বলে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে।
কিন্তু সত্য হলো, এই লোকায়ত ভাষা ও সংস্কৃতিই আমাদের আসল শক্তি। যে জাতি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শেখে, সে জাতি কখনো মুক্তি পায় না। নিজের শিকড়কে জানতে হবে, ভালোবাসতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাসকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে" (মুসা আল হাফিজ। মনের উপনিবেশ মনের মুক্তি। পৃষ্ঠা ৭৪-৭৫)।
প্রশ্ন হল, কেন একটি স্বাধীন দেশের মিডিয়া, বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও নাট্যকারেরা নিজেদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের লোকজ জবান এবং লৌকিক কৃষ্টিকে এভাবে দিনদুপুরে সামাজিক অপমানের হাতিয়ারে রূপান্তর করতে পারে? এই সর্বগ্রাসী কর্পোরেট ডমিনেশনের ভেতরের আসল রহস্যটি লুকিয়ে আছে অদৃশ্য স্বার্থের নির্দেশে চরিত্র তৈরি করার সেই পুরোনো কলোনিয়াল প্রোপাগান্ডা ফ্রেমওয়ার্কের গভীরে। সমসাময়িক বিনোদন মাধ্যমগুলোতে সুপরিকল্পিতভাবে সবসময় দাড়ি-টুপি সংবলিত গ্রামীণ চরিত্র কিংবা মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের মুখেই কেবল ‘পানি’ বা ‘গোসল’-এর মতো মাটির সহজ শব্দগুলো বসানো হয়। আর তথাকথিত উচ্চবিত্ত ও প্রগতিশীল চরিত্রগুলোর মুখে এক কৃত্রিম, গণবিচ্ছিন্ন ও বাংলিশ মিশ্রিত বুলি ফুটিয়ে তোলা হয়। এই সুক্ষ্ম মিডিয়া শেইমিংয়ের মূল লক্ষ্যই হলো নতুন প্রজন্মের মগজে এ কথা স্থায়ীভাবে প্রোথিত করা যে, নিজের মায়ের মুখের আদিম জবান ও লোকজ ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরা মানেই হলো আধুনিকতার পরিমণ্ডল থেকে ছিটকে পড়া এবং এক ধরনের সামাজিক হীনম্মন্যতার খাঁচায় বন্দি হওয়া।
যে তরুণ সমাজ নিজের সংস্কৃতির মূল শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাকে খুব সহজেই বহুজাতিক কর্পোরেট ভোগবাদের দাসে পরিণত করা যায়। যা মূলত মানসিক উপনিবেশ টিকে থাকারই সবচেয়ে বড় অকাট্য প্রামাণ্য দলিল (রহমান, ফাহমিদ-উর। মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, পৃষ্ঠা ১২৩–১২৮)। এই বহুজাতিক বয়ান-যুদ্ধ ও উৎসবের ছদ্মবেশী আগ্রাসন মোকাবিলা করা জন্য এ দেশের সর্বস্তরের মেহনতি ভূমিপুত্রদের জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধিকার ও ‘মালিকের অধিকারের তত্ত্ব’ পুনরায় সজোরে উচ্চারণ করা দরকার। সংস্কৃতির দর্শনে একটি অলঙ্ঘনীয় সত্য চিরকাল দীপ্তিমান থাকে—কোনো জাতির সংস্কৃতি ও ভাষার শুদ্ধতা বা গ্রহণযোগ্যতা কোনো মন্দির, রাজদরবার কিংবা কর্পোরেট অফিসের এসি রুমের ফিল্টার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তা নির্ধারিত হয় প্রাকৃতিকভাবে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ঘাম, শ্রম ও যৌথ যাপনের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিতে।
আর্য-সেন আমলের সেই প্রাচীন বৈষম্যমূলক সমাজ-কাঠামো থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এ দেশের মানুষের মনকে দাস বানানোর অনেক চক্রান্ত হয়েছে (আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, পৃষ্ঠা ৩২)। কিন্তু এ দেশের মানুষ কখনো নীরব দর্শক হয়ে থাকেনি। তারা নিজেদের লৌকিক পুঁথি সাহিত্য, সহজিয়া কিচ্ছা আর লোকজ প্রতিরোধের আগুন দিয়ে সেই সব শক্ত দেয়াল বারবার ভেঙে দিয়েছেন।
এই প্রতিরোধ কখনো তলোয়ার তথা পেশিশক্তিতে হয়নি। এটি হয়েছে মানুষের মুখের ভাষা, লোকজ প্রতিরোধ, সাংস্কৃতিক মুক্তি আর বিশ্বাসের শক্তিতে। তাই আমাদের ইতিহাস আমাদের শেখায়, নিজেদের সত্য অর্গানিক বিশ্বাস দিয়েই ভ্রান্ত বিশ্বাসীর বিশ্বাসকে টলাতে হয়। সংস্কৃতি দিয়েই সংস্কৃতির মোকাবিলা করতে হয়। নিজস্ব বয়ানের বস্তুনিষ্ঠতার জোরে প্রতিপক্ষের বয়ান ভাঙতে হয়। অসম ও অন্যায্য ব্যবস্থার বিপরীতে সুষম ও ন্যায্য ব্যবস্থা কাঠামো হাজির করতে হয়। ব্যর্থ ও অর্বাচীন আইনের বিপরীতে অব্যর্থ ও বুদ্ধিদীপ্ত কার্যকর আইন উপযোগী করে উপস্থাপন করতে হয়। সফট ও স্মুথ লড়াইয়ের জায়গায় হার্ড ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কার্যকর কোনো পন্থা নয়। সুফল পরিবাহকও নয়।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সংকলিত প্রাচীন পুঁথির বিবরণী আমাদের স্পষ্ট দেখায়, এ দেশের মানুষের মুখের প্রতিটি সহজ জবান কোনো বহিরাগত বা যান্ত্রিক আমদানি নয়। এই ভাষা এই মাটিরই শত শত বছরের অবিনশ্বর সাহিত্যিক বুনিয়াদ (মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, ফাহমিদ-উর-রহমান, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭)। প্রতিটি শব্দের ভেতরে রয়েছে হাজার বছরের শ্রম, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১–১৯৫৩) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা এবং প্রাচীন বাংলা পুঁথির সংগ্রাহক ও ব্যাখ্যাকার। তিনি প্রায় ছয় দশক ধরে বাংলাদেশের নানা অঞ্চল ঘুরে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি পুঁথি সংগ্রহ করেন। তার সংগৃহীত পুঁথির মধ্যে প্রায় এক হাজার পুঁথির রচয়িতা ছিলেন বাঙালি মুসলমান (আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, কালবেলা, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫)। মুসলিম পুঁথিগুলো তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এবং হিন্দু পুঁথিগুলো রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামকে দান করে যান (আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, কালবেলা, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫)।
তিনি ১১টি প্রাচীন বাংলা গ্রন্থ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন এবং পূর্বে অজ্ঞাত প্রায় ১০০ জন মুসলিম কবিকে পরিচিত করিয়ে দেন। তাঁর সম্পাদিত পুঁথিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
শেখ ফয়জুল্লার 'গোরক্ষ বিজয়', আলি রাজার 'জ্ঞান সাগর', বাসুদেব ঘোষের 'শ্রী গৌরাঙ্গ সন্ন্যাস', আলাওলের 'পদ্মাবতী', সৈয়দ সুলতানের 'নবী বংশ', 'শহীদে কারবালা' এবং 'জ্ঞানপ্রদীপ', দৌলত কাজীর 'সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী', মাগন ঠাকুরের 'চণ্ডীমঙ্গল', বিজয়গুপ্তের 'মনসামঙ্গল', শাহ মুহম্মদ সগীরের 'ইউসুফ-জুলেখা', আব্দুল হাকিমের 'নূরনামা' ও 'লালমতী সয়ফুলমুলুক', মুহম্মদ কবীরের 'মধুমালতী', নওয়াজিস খান কৃত 'গুলশনে ইশক', সৈয়দ হামজার 'আমির হামজা', ফকির গরীবুল্লাহর 'ইউসুফ-জুলেখা', 'সোনাভান' এবং 'আমির হামজা' (১ম খণ্ড) — যা তিনি অসমাপ্ত রেখে যান এবং পরে সৈয়দ হামজা তা সম্পূর্ণ করেন। শেখ চাঁদ কৃত 'হালতুন্নবী', সাবিরিদ খান কৃত 'ঢাকাই পান্ডুলিপি' ইত্যাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত পুঁথির তালিকা 'পুঁথি পরিচিতি' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
এই শব্দগত বর্ণবাদের অবসান এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষার ডিকলোনিয়াল মুক্তি আজ আর কোনো বিমূর্ত তাত্ত্বিক রূপকথা নয়। তা এই অববাহিকার সাধারণ মানুষের নিজেদের প্রাত্যহিক জীবন, উৎপাদনশীল শ্রম ও চূড়ান্ত মানসিক স্বাধীনতার এক অকাট্য প্রামাণ্য ইশতেহার। ডিকলোনিয়াল মুক্তি মানে কেবল পতাকা বদল নয়। এটি হলো মনের গভীরে বসে থাকা সেই পরাধীনতার শেকড় উপড়ে ফেলা।
আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত এই কর্পোরেট নন্দনতত্ত্বের লুণ্ঠিত পাঁচিল ভেঙে মেহনতি মানুষের মুখের প্রতিটি সহজ জবান ও লৌকিক কৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে সগর্বে অধিষ্ঠিত করতে না পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এই ভৌগোলিক স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গ ডিকলোনিয়াল মুক্তিতে রূপান্তর লাভ করবে না (মুসলিম সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলমান, ফাহমিদ-উর-রহমান, পৃষ্ঠা ১০৬)।
বাঙালি মুসলিমের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এসেছে, কিন্তু স্বাধিকার আসেনি। সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত মুক্তি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। সেই অসম্পূর্ণতার দায় আমাদের সবাইকে বহন করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মুখের প্রতিটি শব্দের ভেতরের আত্মিক ও লৌকিক কৃষ্টিই হলো এই বদ্বীপের আসল ও খাঁটি বুনিয়াদ। এই বুনিয়াদ সমস্ত কৃত্রিম ও চাপানো আপার্থাইডকে প্রতিনিয়ত ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে এক নতুন ভোরের স্বাধিকারকে ঘোষণা করে। যে ভাষায় মা সন্তানকে ডাকেন, যে ভাষায় কৃষক মাটিকে ভালোবাসেন, যে সংস্কৃতির আযানে এ দেশের আকাশ-বাতাস আজও মুখরিত হয়, সেই ভাষা ও সংস্কৃতিই এই জনপদের চূড়ান্ত শক্তি। সেই শক্তির জাগরণেই আসবে প্রকৃত মুক্তি।

Post a Comment